কালরাত্রি – ২৬

(২৬)

মিস কৌশানী বোস নিজের বেডের ওপরে বসে চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। এমনিতেই আই.সি.ইউ.-র মধ্যে খুব বেশি লোকজনের যাতায়াত নেই। যারা আছে, তাদের মোটামুটি মুখ চিনে নিয়েছে সে। চতুর্দিকে যে সিস্টাররা ঘুরছে, তারা বেশিরভাগই গোমড়ামুখো। অবশ্য ওদের হাসার সুযোগও বিশেষ নেই কারণ এখানে যে পেশেন্টরা আছে, তারা হয় অজ্ঞান, নয় নিজেরাই খিটখিট করে নার্স-ওয়ার্ডবয়দের আরও খিটখিটে বানাচ্ছে। সত্যি বলতে কী এর মধ্যে হাসি নামক পদার্থটাই আসে না। চতুর্দিকে নাকে নল গোঁজা, পঞ্চাশটা যন্ত্রপাতি ঠুসে দেওয়া কিছু মানুষ শুয়ে আছে। চিলড এসির জ্বালায় কাঁপুনি উঠে যায়। তার ওপর কানের কাছে গুচ্ছ যন্ত্রের অদ্ভুত অদ্ভুত আওয়াজ। কোনোটা পিঁক্ পিঁক্ করছে তো কোনোটা বিপ্ বিপ্! এখানে যারা আছেন, তাদের চব্বিশ ঘণ্টাই মনিটরিং চলছে।

সবার মধ্যে একমাত্র কৌশানীই সুস্থ মানুষ। কিন্তু স্যার আবার তাকে কায়দা করে গ্যারাজ করে দিয়েছেন এই আধমরাদের ভিড়ে। মাঝেমধ্যে আশেপাশের দৃশ্য দেখে নিজেকেই অসুস্থ বলে মনে হচ্ছে তার। পাশের বেডের একজনের ইসিজি মেশিন মাঝখানে এমন শোরগোল শুরু করেছিল যে মনে হচ্ছিল এবার বুঝি তারই হার্টফেল হয়ে যাবে! রীতিমতো বুক ধড়ফড় করতেও শুরু করে দিয়েছিল। কী কষ্টে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে তা একমাত্র সে-ই জানে। এই অসুস্থ পরিবেশে ডিউটি দিতে হবে কোনোদিন ভেবেছিল?

তবে যতই অসুবিধা হোক, সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে অক্লান্ত পাহারা দিচ্ছিল সে। সকালবেলা অফিসার আচার্য-র বকা খেয়ে একটু দমে গেলেও টপ বসের ভোক্যাল টনিকে ফের চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। কৌশানী বোস জানে, দুনিয়ায় সবার ভুল হতে পারে, কিন্তু ও লোকটার প্রতিপক্ষকে মেপে নিতে একটুও ভুল হবে না। সে নিভৃতে ওঁর প্রচুর কেস স্টাডি করেছে। একসময় তো নেশার মতো কেসফাইলগুলোকে পড়ত। পেপার কাটিং জমা করে ফাইলে সাজিয়ে রাখত। তাই তার খুব ভালোভাবেই জানা আছে, যেখানে সবার চিন্তা শেষ হয়, সেখান থেকেই অধিরাজ ব্যানার্জি ভাবতে শুরু করেন। আজ স্বয়ং তিনিই ওর ওপর ভরসা রেখেছেন। সে ভরসা ফের কিছুতেই ভাঙতে দেবে না সে। এবং আদৌ ও এতটা মূর্খ নয় যে কোনো পুরুষ অফিসারের বদলে কায়দা করে লেডি অফিসারকে বার্নিং শিখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পেছনের কারণ বুঝবে না। স্যার আগেও বলেছেন, বার্নিং শিখ সবরকম দুষ্কর্ম করতে পারে, কিন্তু কোনো নারীকে সরাসরি, সজ্ঞানে হত্যা করবে না। চেজিং এর সময়ে সে কৃপাণ চালিয়েছিল ঠিকই, তবে সেটাও হালকা জখম দেওয়ার জন্য। নয়তো ওই কৃপাণ বুকে বা পেটে লাগত। আই.সি.ইউ.-র সামনে যতই কড়া প্রহরা হোক, একটা ইউনিফর্ম আর নকল আইডেন্টিটি কার্ড থাকলে গোটা থানাও কর্মীদের আটকাবে না। বার্নিং শিখকে হতভম্ব করার এইটাই মোক্ষম রাস্তা, সেটা কৌশানী বুঝেছে। আর এই জন্যই লোকটার জন্য মরে যেতেও ইচ্ছে করে, বার্নিং শিখের সঙ্গে হাতাহাতি তো কোন ছাড়!

তাই যতই প্রতিকূল পরিবেশ হোক, তার প্রখর দৃষ্টি মেপে নিচ্ছিল উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষকে। সজাগ কৰ্ণেন্দ্রিয় যান্ত্রিক আওয়াজের মধ্যেও অতি সূক্ষ্ম শব্দও শুনে নিচ্ছে। সিস্টার-ওয়ার্ডবয়দের নিজেদের মধ্যে চাপা কথাবার্তা, পেশেন্টদের নিঃশ্বাসের আওয়াজ কিংবা উঃ আঃ, ডাক্তারদের নীচুস্বরের বার্তালাপ–কিছুই মিস্ করছে না।

এমনিতেই স্যারের কথা এখনও পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। যেসব ডাক্তাররা এখানে ঢুকছেন, ওয়ার্ডবয় কিংবা সিস্টারদের হাবেভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে ওঁরা সবাই পরিচিত মানুষ। তাঁরা নিজেরা কোনোরকম ইঞ্জেকশন বা ওষুধ নিজের হাতে দেন না। বরং মন দিয়ে মেডিক্যাল চার্ট বা ফাইল পড়ে নিয়ে খসখস করে কিছু লিখে দেন বা সঙ্গের সিস্টার বা ওয়ার্ডবয়কে মৃদুস্বরে নির্দেশ দিয়ে দেন, ‘বাইশ এ-র একটা এম আর আই স্ক্যান করে সিভিএসটির অবস্থাটা দেখে নাও। থ্রম্বাসটাকে মনিটর করতে থাকো।’ কিংবা ‘তেইশ বি-এর সিজারটা কতটা ফ্রিকোয়েন্ট সেটা দেখে নিয়ে মেডিসিন দিও।’ মোটামুটি এইরকমই সংক্ষিপ্ত বাক্যালাপ সেরে তাঁরা চলে যান। পেছন পেছন সঙ্গের জুনিয়র ডাক্তার বা সিস্টার-ওয়ার্ডবয়রাও চলে যায়। যারা ইঞ্জেকশন বা মেডিসিন দিতে আসে, এতক্ষণে তাদেরও মোটামুটি চিনে ফেলেছে কৌশানী। এখনও পর্যন্ত কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু পায়নি। তারা সব নীরব লম্বা মুখ করে আসে, ফাইল আর চার্টে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর যা করার করে চুপচাপ চলে যায়।

এর মধ্যেই সোমলতা চৌধুরী রীতিমতো গোটা আই.সি.ইউ. মাথায় তুলে রেখেছেন। তাঁর কোনো কিছুই পছন্দ হচ্ছে না। একচুলের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন, তা নিয়ে কোনো কৃতজ্ঞতাবোধও নেই। এখন ব্রেকফাস্টের কোয়ালিটি নিয়ে পড়েছেন। মুখ বিকৃত করে বললেন, “ছ্যাঃ। এগুলো মানুষে খায়?”

যে তরুণী নার্সটি তাঁর ওষুধের চার্ট দেখছিল সে গম্ভীরমুখে বলল, “এটা ফাইভস্টার হোটেল নয় ম্যাম। হসপিটালের আই.সি.ইউ.। এখানে বেশিরভাগ পেশেন্টকেই গলায় নল ঢুকিয়ে খাওয়াতে হয়। আপনার সৌভাগ্য যে আপনি নিজের হাতে খাচ্ছেন!” কৌশানী মুখ টিপে হাসল। বেশ হয়েছে। একটু মুখঝামটা খাওয়া মহিলার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। মুখ কি ওর একারই আছে? সেয়ানে-সেয়ানে কোলাকুলি! ভদ্রমহিলা সবাইকেই নিজের বাড়ির লোক পেয়েছেন। যেন ওঁর দাপটে সবাইকে একেবারে ছুঁচোর মতো হয়ে থাকতে হবে। মিঃ চৌধুরীর জন্য দুঃখ হয়। কী বাঁশটাই না গিলেছেন। এখন না পারছেন ফেলতে, না পারছেন গিলতে। সারাজীবন বেচারি জ্বলন্ত উনুনের ওপর উঠে বসেই থাকলেন। মহিলা একেবারে হাড় ভাজাভাজা করে দিল!

সোমলতা হাঁড়িমুখো নার্সের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন পারলে খাবারের বদলে ওকেই জল দিয়ে গিলে ফেলেন। কিন্তু আর কথা বাড়ালেন না। কৌশানী হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বুড়ি বড়োই খিটখিটে। কী করতে যে স্যার ওকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে বাইরে বের করেছিলেন। শাঁখা-সিঁদুর সহ স্বর্গে গেলেই বেশ হত। অদ্ভুত চরিত্র। দুনিয়ার সবাইকে জ্বালিয়ে না মারা অবধি শান্তি নেই।

সে মনে মনে সোমলতাকে আরও একটু গালিগালাজ করার কথা ভাবছিল, কিন্তু তার আগেই বালিশের নীচে রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠেছে। এখানে মোবাইল রাখা অ্যালাউড নয়। বিশেষ করে আই.সি.ইউ.-র ভেতরে তো একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে বার্নিং শিখের কীর্তিকাহিনি এখন কারোরই অজানা নয়। সি.আই.ডি. হোমিসাইডের অনুরোধে এইটুকু সুবিধা হসপিটাল কর্তৃপক্ষ প্রোভাইড করেছে। সে আলতো করে ফোনটা বালিশের তলা থেকে বের করে আনে। স্ক্রিনে ছবিসহ নামটা দেখেই বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। প্রত্যেকবারই এই ছবি আর নামটা দেখলে ওর হৃৎপিণ্ড দ্বিগুণ বেগে চলতে থাকে। গায়ে যেন চারশো চল্লিশ ভোল্টের ছ্যাঁকা! কীভাবে যে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে তা একমাত্র সে-ই জানে। ফোন তুললে এখনই ভেসে আসবে মন্দ্র উষ্ণ কণ্ঠস্বর। কিছু কিছু মানুষের কণ্ঠস্বরে নেশা থাকে। ওঁর ভয়েজে তো ভগবান কড়া ডোজের এল এস ডিই মিশিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বড়ো বুঁদ করা ব্যক্তিত্ব।

কৌশানী একটা জোরালো শ্বাস টেনে ফোনটা রিসিভ করল, “ইয়েস স্যার?” ওপ্রান্ত থেকে অধিরাজের শান্ত অথচ মখমলি স্বর ভেসে এল, “রেডি থাকুন মিস্ বোস। উনি আপনার দিকেই আসছেন।”

কণ্ঠস্বর আর সংবাদ দুটোই মোক্ষম। এক ঝটকায় গায়ের সমস্ত রোম খাড়া হয়ে গেল তার। সে নীচু স্বরে বলে, “দেখে নিচ্ছি।”

“আমরাও আসছি।” অধিরাজ জানায়, “একজন লেডি খবরি ওর সঙ্গে লেগে রয়েছেন। সেনোরিটা বললেন, তিনি জাস্ট এইমাত্র হসপিটালে ঢুকেছেন। ওয়ার্ডবয়ের ড্রেস আছে, সঙ্গে ব্যাজ, আর নকল আই ডি কার্ডও আছে। তবে হসপিটালের স্ক্যানারের সামনে দিয়ে যখন গেছে তখন সঙ্গে কোনো ওপন্ বা হিডন্ অস্ত্র নেই। অস্ত্রটা ও ওখান থেকেই সংগ্রহ করবে। আমাদের পৌঁছোতে আরও মিনিট পাঁচেক লাগবে। ওকে ধরতে পারবেন কিনা জানি না, কিন্তু আটকান। কোনো ব্যাড নিউজ আমি চাই না মিস বোস।”

“গুড নিউজই পাবেন।” সে দাঁতে দাঁত পিষল, “এবার ওকে ছাড়ব না।”

“গ্রেট।”

ফোন কেটে গেল। সেটাকে ফের বালিশের তলায় চালান করে দিয়ে মেরুদণ্ড একদম টানটান করে শিকারীর ভঙ্গিতে বসে রইল মিস্ বোস। লোকটা ওয়ার্ডবয়ের ছদ্মবেশে আছে এইটুকু তথ্যই যথেষ্ট। বাকিটা সে দেখে নেবে। তার সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র নেই ঠিকই, তবে বার্নিং শিখও নিরস্ত্র। দেখা যাক কতখানি বুদ্ধি ও শক্তি সে ধরে!

কৌশানীর সতর্ক চোখ একটা অপরিচিত মুখ খুঁজতে থাকে। কোথায় সেই বহুরূপী? ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই একটা দলের শিফট শেষ হয়েছে। ওই গ্রুপটাকে সে মোটামুটি চিনে ফেলেছিল। এখন শিফট চেঞ্জ হচ্ছে। অর্থাৎ কয়েকজন ছাড়া আর প্রায় সবই নতুন মুখ এসে জায়গা নেবে। সে আফসোসে ঠোঁট কামড়ায়। একেবারে এই সময়টাতেই বেছে বেছে ঢুকছে লোকটা! শিফট চলাকালীন এলে সহজেই ধরা পড়ত। কিন্তু এখন তার চোখের সামনেই আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে সিস্টার-ওয়ার্ডবয়রা। তাদের জায়গা নিচ্ছে নতুন মানুষেরা। এর মধ্যে কোথায় সে?…এক এক করে তো ওয়ার্ডবয়রাও আসছে… কিন্তু তিনি কোনজন?

সে ক্রমাগত বিহ্বল হচ্ছিল! চোখের সামনে এখন সব অচেনা চেহারা। পোষাক একই, ইউনিফর্মও এক। প্রত্যেকের গলায় আই ডি কার্ডও ঝুলছে। কিন্তু এদের মধ্যেই মিশে আছে একটা নকল মুখ আর নকল পরিচয়। বুঝবে কী করে? তার সঙ্গে মনের মধ্যে একটা আশঙ্কাও কাজ করছে। যদি চিনে নিতে না পারে? যদি আবার কোনো ভুল হয়ে যায়? বার্নিং শিখ হয়তো ইচ্ছাকৃতই এই শিফট চেঞ্জের সময়টা বেছে নিয়েছে। কারণ বিশেষ করে এই সময়টা কেউ কাউকে ঠিকমতো দেখেও না। যারা আগে ডিউটিতে ছিল তাদের বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। যারা নতুন আসে তারা নিজের পজিশন বুঝে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে একটা হট্টগোলের পরিবেশ। এর মধ্যে খোশগল্প করার বা ঠিকমতো পরস্পরকে বুঝে বা দেখে নেওয়ার সময়টুকুও মেলে না। তাই কোনো নতুন মুখও যদি এদের মধ্যে মিশে থাকে তবে চট করে নজর করা কষ্টকর। আর এই চতুর ক্রিমিনালের জন্য ওই কয়েক মুহূর্তের অসাবধানতাই যথেষ্ট। তার মধ্যেই বাজি মাত করে বেরিয়ে যাবে সে। তাই এক মুহূর্তের জন্যও ঢিল দেওয়া যাবে না।

কৌশানী সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে বসে থাকে। তার হৃৎস্পন্দন তুঙ্গে। স্যার যদি সঠিক বুঝে থাকেন তবে কোনো-না কোনো ইঙ্গিত ওদিক থেকে আসবেই। সে সূক্ষ্ম ও ধারালো দৃষ্টিতে চতুর্দিকটা পরখ করতে থাকে। কাউকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে কি? ওই তো একজন দাড়িওয়ালা ওয়ার্ডবয় একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। স্যালাইনের বোতলের দিকে তাকিয়ে আছে। ও নয় তো? গোটা মুখই তো দাড়ি-গোঁফে আচ্ছন্ন। আসল চেহারা বোঝা দায়। এটা কি আসল মুখ না ছদ্মবেশ? কিংবা এইমাত্র যে ওয়ার্ডবয়টি ওষুধের ট্রলি নিয়ে ঢুকল সে? এর মুখে অবশ্য দাড়ি নেই, তবে মোটাসোটা গোঁফ আছে। দেখে তো বাঙালিই মনে হয়। নিরীহ চেহারা… কিন্তু বিশ্বাস নেই।

কৌশানী বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এখানে দু-জনই ওয়ার্ডবয় আছে। এদেরও সন্দেহের বাইরে রাখছে না ঠিকই। কিন্তু দু-জনেরই চলনে বলনে যথেষ্টই পেশাদারিত্বের ছাপ আছে। দু-একবার তার দিকে তাকিয়েওছে ওরা। কিন্তু ওদের সদা নির্লিপ্ত মুখে কোনোরকম চমকে ওঠা বা নার্ভাসনেস তো দূর, বিন্দুমাত্র কৌতূহলেরও ছাপ নেই। এখন মেল পেশেন্টদের কাছে যে ওয়ার্ডবয়রা আছে, তাদের দেখে নেওয়ার পালা।

মেল আর ফিমেল পেশেন্টদের জন্য এই বিরাট পোর্শনেই এরিয়া ভাগ করা আছে। কাচ আর পর্দা দিয়ে পার্টিশন করা। কিন্তু কৌশানী সেদিকেও নজর রাখছে। যেহেতু ডাক্তাররা ওর পরিচয় জানেন, তাই হয়তো তেমন কিছুই নির্দেশ দেওয়া আছে মূল স্টাফদের। তাই তাকে কেউ আটকাচ্ছে না। সে স্বচ্ছন্দেই কয়েকবার চুপচাপ রাউন্ড দিয়েছে। সকলেই জানে, কারোরই হাতে এখন নিয়ম মানার মতো সময় নেই। বাহাত্তর ঘণ্টার মেয়াদ শেষ হলে দেখা যাবে। এখন নর্মস, রুলস দেখতে গিয়ে বেঘোরে কারোর প্রাণ যাক তা কর্তৃপক্ষও চান না। আর এর মধ্যেই মৃত্যুর তাণ্ডব ওঁরা দেখেছেন ও জানেন। তাই আপত্তি করার কোনো জায়গাই নেই।

মেল আই.সি.ইউ.-র কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছিল কৌশানী। সেখানে এই মুহূর্তে তিনজন ওয়ার্ডবয় আছে। একজন এক পেশেন্টের ক্যাথিটার চেঞ্জ করতে ব্যস্ত। সে মাথা নাড়ল। এ হতে পারে না। কারণ এর সঙ্গে ডাক্তারও আছেন। যেভাবে কথাবার্তা চলছে তাতে স্পষ্ট, ডাক্তারের চেনা।

বাকি রইল দু-জন। একজন কিছু মেডিসিন নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, অন্যজন পরিমলের বেডের চাদর গুছিয়ে দিচ্ছে। দু-জনেই পরিমলের খুব কাছাকাছি। তার ভুরু নেচে ওঠে। এই দু-জনকেই একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক।

সে চুপচাপ কথা না বাড়িয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। যে লোকটি পরিমলের বিছানা ঠিকঠাক করছিল, সে একঝলক তাকাল তার দিকে। তার চোখে কৌতূহল। অন্য ওয়ার্ডবয়টি মেডিসিন নিয়ে এদিকেই আসছিল। কৌশানীর তীব্র দৃষ্টি তাকে ছুঁয়ে যেতেই অদ্ভুত এক কাণ্ড হল! ওয়ার্ডবয়টি যেন খণ্ডমুহূর্তের জন্য চোখ সরিয়ে নিয়েছে তার দিক থেকে। জাস্ট সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য সে যেন একটু নার্ভাস হয়ে গিয়েছে। একটু যেন থমকেও গেল। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বেশ তেজি গলায় বলল, “ম্যাডাম, আপনি মেল ইউনিটে কী করছেন?”

কৌশানী ঠোঁট কামড়ে ধরে একটু চটুল হাসল। স্যার একটুও ভুল আন্দাজ করেননি। কী করে যে পারে লোকটা সেটা আজও বুঝে উঠতে পারেনি সে। কিন্তু স্বচক্ষেই দেখছে যে পেরেছেন। কোনো সন্দেহই নেই যে ইনিই তিনি। কয়েক মুহূর্তের দ্বিধা, থমকে যাওয়া, চোখ লুকিয়ে ফেলাই ওর পরিচয় বলে দিয়েছে। আর কী অদ্ভুত ওর মেক-আপের ক্ষমতা! কোথায় সেই বুড়ি থুরথুরি কমলা, আর কোথায় এই শক্তপোক্ত ওয়ার্ডবয়! ওই সেকেন্ডের ভুলটা না করলে ওকে ধরাই যেত না।

সে মোহিনী হাসি হাসল, “তেমন কিছুই করছি না। জীবনে তো এই প্রথমবার হসপিটালে বেড়াতে এসেছি, তাই একটু ট্যুর করছিলাম। তার সঙ্গে সমস্ত ওয়ার্কারদের সঙ্গে একটু গল্পগাছাও করছি। কী করব বলুন, গাইড নেই কিনা। তাই হিস্ট্রি, জিওগ্রাফি সবই নিজেকেই জানতে হচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটা…?”

“স্যাম…!” ওয়ার্ডবয় বেশ কড়া গলায় বলে, “হসপিটালটা আপনার ট্যুর করার জায়গা বলে মনে হয়? যান, নিজের বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

“ট্যুর করার জায়গা না হোক।” এবার তার কণ্ঠস্বরে পুলিশি টোন, “ইন্সপেকশন করার জায়গা তো হতেই পারে।”

“ইন্সপেকশন?” লোকটা এবার একটু ঘাবড়ে যায়, “কীসের ইন্সপেকশন?”

“যেমন রোগীদের খাবার কোয়ালিটি। তাদের যত্ন-আত্তি ঠিক হচ্ছে কিনা, কিংবা ওষুধ-পত্র ঠিকঠাক দেওয়া হচ্ছে কিনা।” মিস বোস নিরীহ মুখে জানতে চায়, “আপনি ট্রেতে ওটা কী নিয়ে যাচ্ছেন? সিরিঞ্জ?”

“হ্যাঁ। একটা মেডিসিন দেওয়ার টাইম আছে ম্যাডাম।”

“ওকে মিঃ স্যাম।” কৌশানী সিরিঞ্জটার দিকে তাকায়, “কী মেডিসিন আছে এতে? হাওয়া? আই মিন্ এয়ার বাবলস্? কারণ সিরিঞ্জ তো ফাঁকা৷ ট্রে-তে কোনো মেডিসিন ভায়ালও দেখছি না। কাকে দেবেন? মিঃ পরিমল চৌধুরীকে? ফ্রেশ এয়ার এমনিতে স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। কিন্তু ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গেলে…!”

মুহূর্তের মধ্যে লোকটার মুখে গভীর আফশোশ, রাগ, বিরক্তি সব একসঙ্গে ভেসে উঠল। তার মুখের ভাঁজগুলো চরম নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। বোধহয় ভাবতেই পারেনি যে এভাবে ধরা পড়ে যাবে। সেই হতাশাই তাকে আরও ক্রুর করে তুলল। সে আচমকা হাতের ট্রে-টা কৌশানীর দিকে ছুড়ে মেরে সবেগে ছুটল বাইরের দিকে। কৌশানী আন্দাজই করেছিল যে এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সে বিদ্যুৎবেগে ডাক করে। প্রাথমিক আক্রমণটা ডজ করেই সে-ও তাকে চেজ করছে। চেঁচিয়ে বলল, “দাঁ-ড়া!”

উপস্থিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিস্থিতি দেখে স্তম্ভিত। তারাও বুঝি কিছুক্ষণের জন্য মূর্তিবৎ হয়ে গিয়েছে। কেউ কিছু বোঝার আগেই আততায়ী সবাইকে পেছনে ফেলে তীরবেগে সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল আই.সি.ইউ. থেকে। তার পেছন পেছন পেশেন্টের পোষাকে মিস্ বোস প্রায় বাঘিনীর মতো ধাওয়া করল। মনে মনে বলল, “শুয়োরের বাচ্চা! আমায় গাঁজা খাওয়ানো! দেখাচ্ছি।”

বার্নিং শিখ দৌড়োতে-দৌড়োতেই ভয়ার্তভাবে দেখল যে পেছনের লেডি অফিসার মারাত্মক বেগে স্প্রিন্ট টানছে। মুখভঙ্গিতেই স্পষ্ট, সহজে ছাড়বে না। একেবারে সাক্ষাৎ মা চণ্ডীর মতো বেগে ধেয়ে আসছে। সে মুহূর্তের জন্য অসহায়বোধ করল। পুরুষ অফিসার হলে ঠিক ডাক্তারি ছুরি বা চাকু ম্যানেজ করে পেট ফাঁসিয়ে দিত। কিন্তু আবার সেই লেডি অফিসার। অধিরাজ ব্যানার্জি শুরুটা করেছে কী! একে তো বাইরে থেকে দেখে বোঝাই দায় যে কোথাও সিকিউরিটি আছে কিনা। অন্তত দেখে মনে হয়েছিল, নেই। দিব্যি নিশ্চিন্ত মনে সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। রাস্তা ফাঁকা। কাজ হয়েও যেত। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ফের সেই লেডি অফিসার এসে মাথায় পড়ল। কী করে বুঝল, কী করে ধরল ভগবানই জানে। এখন একে থামাবে কী করে! প্রত্যেকবার তার দুর্বলতার সুযোগ নেবেই এই ধুরন্ধর আই জি! এই নারীজাতি প্রত্যেকবারই তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ায় কেন? এ কী বিপদ। এমনিতেই অনেক নীচে নেমেছে। আর কত নামতে হবে?

সে ভেবে পাচ্ছিল না কী করবে। অন্যদিকে কৌশানী বোস চিতার মতোই স্প্রিন্ট টানতে-টানতে আচমকা শরীরটাকে চরম দক্ষতায় ছুড়ে দিয়েছে শূন্যে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উড়ন্ত অবস্থাতেই পা চালিয়েছে। জোরালো পায়ের জোরদার লাথি পিঠে খেয়ে লোকটা একদম দড়াম করে ছিটকে পড়ে মাটিতে। উত্তেজনায় দরদর করে ঘামছিল কৌশানী। আলগা করে হাতায় মুখ মুছে নিয়ে বলল, “ব্যাটাচ্ছেলে!” বার্নিং শিখ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কোনোমতে মারটা সামলে নিয়ে সোজা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। তার আগেই একখানা পা তার বুকের ওপর তুলে দিয়ে তাকে মাটিতে চেপে ধরে বলল লেডি অফিসার, “একদম না! ভুলেও চেষ্টা করবি না।” এই মুহূর্তে এই কৃষ্ণাঙ্গী, দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরীকে সত্যিই মহাকালীর মতো দেখাচ্ছে।

পদানত অসুরের বুকে পা দিয়ে যেন ভয়ংকরী মহাশক্তি দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিধ্বংসী রূপ, সেই রণরঙ্গিনী অসুরদলনী। শুধু মুণ্ডমালাটাই যা বাকি!

তার ওই রুদ্রমূর্তি দেখে অমন ভয়াবহ খুনিও বুঝি কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গেল। তার মুখভঙ্গিতেই স্পষ্ট, কী করবে বুঝতে পারছে না। একেই প্রতিদ্বন্দ্বী এক নারী। তার ওপর জবরদস্তি করার শিক্ষা সে কখনোই পায়নি। কিন্তু এইটুকু বুঝল যে করেই হোক পরিত্রাণ তাকে পেতেই হবে। এ তো শুধু ‘মোহরা।’ এর পেছনের শাণিত মস্তিস্কটিও নিশ্চয়ই যে-কোনো মুহূর্তে এসে পৌঁছোবে। আর ওই বিপজ্জনক মানুষটিকে এখন রীতিমতো ভয় পেতে শুরু করেছে সে। যে লোক ছাতের ওপর দিয়েও চেজ করতে ছাড়ে না, চলন্ত ও জ্বলন্ত তেলের ট্যাঙ্কারকে প্রাণ হাতে করে জলে ফেলে দেয়, সে সব কিছু করতে পারে! এমনকি তার গোপন ঘাঁটিতেও পৌঁছে গিয়েছিল। ওই লোকটা তাকে কিছুতেই জিততে দেবে না। আজ যদি পালাতে না পারে, তবে সব শেষ। এতদিনের পরিশ্রম… প্রচেষ্টা… সব ব্যর্থ!

মরিয়া আততায়ী এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতের কাছে একটা ট্রলি দেখতে পেল। কোনো সিস্টার বা ওয়ার্ডবয় হয়তো ওখানে রেখে গিয়েছে। এগুলোতে সব প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল অ্যাপারেটাস থাকে। সে তাকিয়ে দেখল নীচের তাকে একটা স্টিলের প্যান জাতীয় কিছু একটা আছে। অপারেশন থিয়েটারে এমন বস্তু দেখা যায়। গরম জল বা তরল কিছু রাখার জন্যই ব্যবহৃত হয় ওগুলো। ও অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে হাত বাড়িয়ে সেটাকেই টেনে নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে কৌশানীর মুখ লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল।

মিস্ বোস এই জাতীয় আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ধাতব জিনিসটা নিখুঁত লক্ষ্যে তার কপালে গিয়ে সজোরে আছড়ে পড়েছে। খণ্ডমুহূর্তের জন্য সে দিনের বেলাতেই বোধহয় চোখে চাঁদ-তারা সব একসঙ্গেই দেখে ফেলল। সেই সুযোগেই একধাক্কায় তাকে সরিয়ে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল বার্নিং শিখ। পরক্ষণেই ফের দৌড়!

কৌশানী টের পেল কপাল বেয়ে একটা উষ্ণ কিছু নামছে। জোরদার ব্যথাও লেগেছে। কিন্তু হেরে যেতে সে-ও শেখেনি। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। হারামিটা কিছুতেই থামার নাম নিচ্ছে না। হাতের কাছে রিভলবারটা থাকলে এখনই শ্যুট করে দিত। এমনিতেও এ লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। অথচ সঙ্গে অস্ত্রটাও নেই। অগত্যা সে-ও লোকটার পেছন পেছন দৌড়োয়। এবার কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না ওকে। অনেকবার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে…।

হসপিটালটা বহরেও খুব ছোটো নয়। অনেকগুলো করিডর এঁকেবেঁকে একেকদিকে চলে গিয়েছে। এই ফ্লোরে প্যাথোলজি ডিপার্টমেন্ট, ল্যাবও আছে। আই.সি.ইউ.-র সিরিয়াস পেশেন্টদের বেশি নাড়াচাড়া করা যায় না বলে এখানেই স্ক্যান, এক্স রে থেকে শুরু করে যাবতীয় পরীক্ষার বন্দোবস্ত আছে। স্বাভাবিকভাবেই তাই গলিঘুঁজি, আর গা ঢাকা দেওয়ার জায়গা অনেক বেশি। ইউরোলজি আর নিউরোলজির ডিপার্টমেন্টও এখানেই। মস্তবড়ো ওপিডি। লুকোচুরি খেলে চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট জায়গা। লোকটা হসপিটালের কর্মীর ছদ্মবেশে আছে। যে কোনো জায়গার অ্যাক্সেস পেতে ওর অসুবিধে হবে না। কৌশানী টের পেল, সে সামান্য হলেও ব্যাকফুটে। হসপিটালের সবাই যেমন বার্নিং শিখকে চেনে না, তেমন তাকেও চেনে না। আই.সি.ইউ.-র মেইন কিছু লোককে অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছিল বলে সমস্যা হয়নি। কিন্তু সবাইকে বলে রাখা তো সম্ভব নয়! তাছাড়া এটা হসপিটাল। সিরিয়াস পেশেন্টরা আছেন। শোরগোল করাও যাবে না। যা করার নীরবেই করতে হবে, কোনোরকম অস্ত্র ছাড়াই।

করিডরে একটা লেফট টার্ন নিতেই মিস্ বোস হতবাক। যা বাব্বা! লোকটা গেল কোথায়! এতক্ষণ তো চোখের সামনেই ছিল। সামনেই পড়িমড়ি করে দৌড়োচ্ছিল। কিন্তু বাঁক নিতেই ভ্যানিশ! হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি? একটা জলজ্যান্ত মানুষ এত সহজে অদৃশ্য হয়ে যায় কী করে? টেকনিক্যালি সেটা অসম্ভব। যদি না …

মিস বোসের সতর্ক দৃষ্টি চতুর্দিকটা একবার দেখে নিল। সে তখনও হাঁপাচ্ছে। কপালের পাশ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় শীতল ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতরে জোরদার আন্দোলন। তবু তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ্য করল, করিডরের পাশের বন্ধ দরজাগুলোর মধ্যে কোনোটা সামান্য হলেও নড়ছে কিনা। এটা ছাড়া লোকটার গায়েব হয়ে যাওয়ার আর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। করিডর বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। ওদিকে ডেড এন্ড। সুতরাং পালাবার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে সে এদিকেই আছে। এই সার সার বন্ধ দরজাগুলোরই কোনো একটার পেছনেই লুকিয়ে রেখেছে নিজের অস্তিত্ব। কিন্তু কোন্ ঘরটায় ঢুকল? কোথায়…?

কৌশানীর অনুসন্ধানী চোখ পেশাদারি দক্ষতায় নির্দিষ্ট ঘরটিকে খুঁজতে থাকে। মোটামুটি সব ঘরেই আলো জ্বলছে। ভেতরে নিশ্চয়ই পেশেন্ট আর টেকনিশিয়ান বা প্যাথোলজিস্টরাও আছেন। অন্তত একাধিক ছায়ার নড়াচড়া এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। ওপিডিতেও প্রচুর লোকজনের চলাফেরা। ডাক্তার, সিস্টারদের ব্যস্তসমস্ত ছন্দেই স্পষ্ট ওখানে তালভঙ্গ করার জন্য কোনো লোক দৌড়ে ঢোকেনি। ঢুকলে সাময়িক হলেও সবাই একটু অবিন্যস্ত হয়ে যেত। দরজাও একদম অনড়। সামান্য সুইং-ও করছে না। কয়েকমুহূর্ত আগেও খুলেছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া হয়তো লোকটা ওপিডিতে ঢোকার রিস্কও নেবে না। এখানে অনেক লোকজন থাকার দরুণ যেমন মিশে যাওয়ার সুবিধাও আছে, তেমনই একবার কেউ স্পট করলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। সে নিজেকে কোনো নির্জন জায়গাতেই লুকোবে। কিন্তু কোথায়…?

একটা সূক্ষ্ম শব্দে তার কান খাড়া হয়ে যায়। একটা ভারি দরজার আস্তে আস্তে বন্ধ হওয়ার আওয়াজ নয়? কোটা বন্ধ হচ্ছে? তার দৃষ্টি আবার প্রত্যেকটা দরজার ওপর প্রায় সার্চলাইটের মতোই পড়ল। ডানদিকের গুলো সব বন্ধ। দেখে মনেও হচ্ছে না যে কেউ সম্প্রতি খুলেছে। তবে বাঁদিকের একটা দরজা এখনও সামান্য নড়ছে। বলা ভালো, সুইং করছে। হাইড্রলিক ডোর ক্লোজারের কৃপায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। এটা ওপেন এম.আর.আই. স্ক্যানের রুম। এমনিতে এম.আর.আই. স্ক্যানের অন্যত্র ব্যবস্থা থাকলেও আলাদা করে ওপেন এম.আর.আই. সেইসব পেশেন্টদের জন্যই রাখা হয়, যারা ক্লস্ট্রোফোবিক। বা অনেকের আবার এম.আর.আই.-এর জন্য প্রয়োজনীয় সরু স্পেসে ঢুকতে আপত্তি আছে। তাই ওপেন এম.আর.আই.-এর জন্য আলাদা রুমের বন্দোবস্ত। যদিও এই রুমটার ভেতরে এই মুহূর্তে কোনো স্ক্যান হচ্ছে না। লাইটও বন্ধ। ভেতরের অন্ধকার আবহ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তবে কি এইখানেই…?

কৌশানী কয়েকমুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে আবার একটা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিল। তারপর ভারি দরজাটাকে যথাসম্ভব নিঃশব্দে ও আস্তে টেনে খুলেছে। ভেতরে কোনো আলো জ্বলছে না। এম.আর.আই. মেশিনটা এখন কোনোরকম আওয়াজ করছে না। কিন্তু ভয়াবহ চিলড এসির স্পর্শে সারা শরীর ছ্যাঁত করে উঠল। অসম্ভব কনকনে ঠান্ডা। প্রায় দাঁত কপাটি লেগে যাওয়ার জো! আশেপাশে কোনো টেকনিশিয়ানও নেই। শুধু অন্ধকার আর শীতলতায় ছেয়ে আছে ঘরটা। দরজা বন্ধ হয়ে যেতে-না যেতেই একদম পিনড্রপ সাইলেন্স। বাইরে যে একটা বিরাট মহাযজ্ঞ চলছে, তার বিন্দুমাত্র রেশও নেই।

নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ ওখানেই দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছিল সে। বুকের ভেতর যেন দামামা বাজছে। সব কিছু ছাপিয়ে যেন ওই শব্দই ধ্বনিত হচ্ছে গোটা ঘরে। চারপাশে তেমন স্পষ্ট আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু ওপেন এম.আর.আই. মেশিনটার প্রকাণ্ড দেহ আর কিছু ছায়া ছায়া অ্যাপারেটাস। পুরো রুমেই আলো-আঁধারির লুকোচুরি। এর মধ্যে একটা লোক কোথায় লুকিয়ে আছে তা বোঝা প্রায় দুঃসাধ্য!

এ ঘরের আলো বা অন্যান্য মেশিনের সুইচ অপারেটেড হয় এরই সংলগ্ন একটি কাচের রুম থেকে। ওই ঘরেই সমস্ত কম্পিউটার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কন্ট্রোলস, সুইচ— সব থাকে। টেকনিশিয়ানরা এই ঘর থেকেই গোটা সিস্টেমটাকে অপারেট করে। তবে এই মুহূর্তে ওই ঘরেও কোনো আলোর জোরালো রশ্মি নেই। খুব সামান্য একটা নীলচে প্রভার রেশ ছড়িয়ে আছে মাত্ৰ।

সে প্রথমে এম.আর.আই. মেশিনটাকে ভালো করে দেখে নেয়। সতৰ্ক পায়ে, গুটি গুটি এগোচ্ছে। এই শীতের মধ্যেও বিন্দু বিন্দু ঘাম তার কপালে ও ঠোঁটের ওপরে ফুটে ওঠে। এতক্ষণ দৌড়োচ্ছিল বলে হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে নিঃশ্বাসও দ্রুত তালে চলছিল। কৌশানী নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকে আপ্রাণ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। নয়তো তার জোরে শ্বাস টানার শব্দ শুনেই লোকটা তার উপস্থিতি টের পেয়ে যাবে। তার সঙ্গে সঙ্গে উৎকর্ণ হয়ে শোনার চেষ্টা করছে যে অন্য কোথাও আরও একটা ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় কিনা। বার্নিং শিখও নিশ্চয়ই টানা দৌড়ে এসে এখন হাঁপাচ্ছে। তার মন বলছে, যতই চেপে থাকার চেষ্টা করুক, দুষ্কৃতী অন্তত একবার বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করবে। এখন শুধু সেই মুহূর্তটার অপেক্ষা!

অবশ্য মিস্ বোসও আদৌ অলসভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার লোক নয়। সে খুব সতর্কভাবে আঁতিপাতি করে খুঁজছে ঘরটা। ওপেন এম.আর.আই.-এর বিরাট মেশিনটাকে একবার ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নিল। আলো জ্বালা সম্ভব না হলেও অন্তত একটা মানুষের ছায়াকে দেখে ফেলতে তার খুব অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। চোখদুটোও রীতিমতো অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বকে চিনে ফেলার জন্য ওয়েল ট্রেইনড। তাই সে প্রথমেই স্ক্যানের সাউন্ডপ্রুফ ঘরটাকে হাতড়ে হাতড়ে দেখে নেয় যে এখানে কেউ আছে কিনা। ওরকম বড়ো একটা মেশিন, তার আশেপাশের যন্ত্রপাতি যেভাবে জায়গা দখল করে আছে, তার আড়ালে যে কেউ ওঁত পেতে বসে থাকতে পারে। তাই একটুও অন্যমনস্ক হওয়ার বা ভুল করার উপায় নেই। সমস্ত স্নায়ু উত্তেজনায় টানটান। সে দমবন্ধ করে খুঁজতে থাকে। ওই পর্দার পেছনে…, মেশিনের ব্যাক সাইডে… যন্ত্রগুলোর পেছনে… টেবিলের নীচে… অন্ধকার কোণায় কালোর সঙ্গে মিশে… কেউ বসে নেই তো।

মাঝেমধ্যেই একটা হিমশীতল অনুভূতি কৌশানীর পিঠ আর মেরুদণ্ড ছুঁয়ে যাচ্ছিল। জীবনে অনেক ক্রিমিনালদের সঙ্গে পাঞ্জা কষেছে। কিন্তু এ লোকটা যেন কিছুতেই বাগে আসছে না! যতবার মনে হচ্ছে এই ধরা পড়ল বুঝি, ঠিক তখনই কিছু না কিছু উপায়ে পাঁকাল মাছের মতো ফস্কে যাচ্ছে। এতগুলো লোক মিলেও তাকে ধরতে পারল না! যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই চতুর! একখানা বিষধর কালসাপের চেয়ে কিছু কম যায় না। আর সেই সাপটাই এখন এই অন্ধকারে লুকিয়ে বসে আছে… যে-কোনো মুহূর্তে করাল ফণা তুলে ছোবল মারবে… .!

তবে এই ঘরটায় তেমন কিছু নেই। সে একটু হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এই রুমটা ক্লিন। কিন্তু স্বস্তির পাশাপাশি এবার আশঙ্কাও চেপে ধরছে। তাহলে কি ওই লাগোয়া ঘরটা? টেকনিশিয়ানের চেম্বার? এছাড়া আর কোনো এস্কেপ রুটও তো নেই। ওখানেই কি তবে…?

গুটিগুটি পায়ে, সাবধানী পদক্ষেপে অ্যাটাচড রুমটার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই তার কানে এসে পৌঁছল একটা চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ। কেউ যেন আর থাকতে না পেরে একঝলক বাতাস ফুসফুসে টেনে নিল। এতক্ষণ বুঝি রুদ্ধশ্বাসে সে-ও বসেছিল। কিন্তু আর পারল না। আর এই ভুলটারই এতক্ষণ ধরে কৌশানী প্রতীক্ষা করছিল!

লেডি অফিসার তড়িৎগতিতে শব্দটার উৎসস্থলের দিকে ছুটল। নিঃসন্দেহে ওই ঘরেই আছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। এবার আর ওর রক্ষা নেই। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার গেম ওভার….।

অপারেটিং রুমটাও প্রায় অন্ধকারে ডুবে আছে। শুধু কোনো একটা কম্পিউটারে তখনও ক্ষীণ আলো জ্বলছিল। তারই হাল্কা নীলাভ আভাস খুব সামান্যই আলোকিত করেছে। এছাড়া আর কোনো তীব্র আলোর উপস্থিতি নেই। সত্যি কথা বলতে কী, এর থেকে একদম অন্ধকার হলেই বোধহয় বেশি ভালো হত। অন্তত অন্ধকার চোখকে কিছুটা হলেও আরাম দেয়। আঁধার কোনো কিছুকেই প্রকাশ করে না। কিন্তু এই নীলাভ কুয়াশার মতো রহস্যময় আলো একে তো চোখকে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করে, তার ওপর আপাতদৃষ্টিতে প্রকাশ করছে মনে হলেও আসলে সে সবকিছুই অপ্রকাশিত রাখে। যেন আলোর হেঁয়ালি! কিছু দেখা যায়, বেশিটাই দেখা যায় না। অদ্ভুত এক দ্বিচারিতা!

কৌশানী চোখ কুঁচকে চতুর্দিকটা দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রথম দর্শনেই চমকে উঠল! তার সামনে ওই ছায়াটা কে! কে দাঁড়িয়ে আছে? তার হাত দুটো বিদ্যুৎবেগে স্টান্স নিল। কী আশ্চর্য। উলটোদিকের মানুষটাও অবিকল একইভাবে আক্রমণ শানাচ্ছে। সেই একই ভঙ্গি। একই স্টান্স। সে এবার ততক্ষণাৎ অন্য স্টান্স নেয়। এবার ডিফেন্সিভ। কিন্তু ওই ছায়ামূর্তিরও ভঙ্গি সঙ্গে সঙ্গেই পালটে গেছে। এবার ও ডিফেন্সিভ, অবিকল কৌশানীর মতোই।

সন্দেহে তার চোখ কুঁচকে যায়। আদতে হচ্ছেটা কী? এ ঘরে কি কোনো ম্যাজিক আছে? নাকি ট্র্যাপ? এ কী জাতীয় মায়াবী খেলা। ওদিকের মানুষটা বাস্তব, না কোনোরকমের হ্যালুসিনেশন? কেউ কি তার সঙ্গে মেন্টাল গেম খেলছে? এই নীলাভ আধো অন্ধকার ছায়া ছায়া আবহের মধ্যেই এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল সে। কোনো অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপার নয়তো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, একটা ভয়াবহ বিষাক্ত মাকড়সা মারাত্মক একটা জাল বুনে রেখেছে। আর কৌশানী একদম তার কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে আটকে আছে বুঝি। যে কোনো সময়ে শিকারী এগিয়ে আসতে পারে… তার কড়কড়ে বিষাক্ত পা দিয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসবে…

সেই অজানা আতঙ্কের মধ্যেই তার চোখ আচমকাই বাস্তবটা আবিষ্কার করল। ঘটনাটা আদৌ কোনো অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপার নয়। এ ঘরে চতুর্দিকে কাচ লাগানো আছে। সেই সার সার কাচে তার নিজেরই ঝাপসা প্রতিবিম্ব দেখেই আঁতকে উঠছিল। ব্রুস লি-র ‘এন্টার দি ড্রাগন’ সে বহুবার দেখেছে। কিন্তু কোনোদিন স্বয়ং তাকেই ওই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে এমন সম্ভাবনা মাথাতেও আসেনি। ব্রুস লি-র ক্ষেত্রে অন্তত একটা জোরদার আলো ছিল। এখানে তো আলো থেকেও নেই। অথচ চতুর্দিকে শুধু সার সার কাচ। যেন হাউজ অব মিররস। সেই কাচে নিজেরই আবছা প্রতিফলন দেখে নিজেই বারবার চমকে উঠছে। মনে হচ্ছে, চুপিসাড়ে তার আশেপাশে বুঝি বেশ কয়েকটা অস্তিত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো এই ছায়াগুলোর মধ্যেই একটা সত্ত্বা মিশে আছে। ধরা দিচ্ছে না, কিন্তু সে আছে। অবশ্যই আছে।

লৌকিক ও যৌক্তিক ঘটনাটা বুঝতে পেরে মিস বোস ক্ষণিকের শাস্তি পেল ঠিকই, তবে স্বস্তি পেল না। একটু আগেই সে লোকটার শ্বাস টানার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। আসল বিপদ মাথার ওপর থেকে এখনও সরেনি। বার্নিং শিখ এ ঘরেই আছে, এখানেই আছে।

সে সন্তর্পণে সবে কয়েক পা এগিয়েই গিয়েছিল, কিন্তু আরও কিছু বোঝার বা করার আগেই ওই নীলাভ ছায়াময় অন্ধকারের ভেতর থেকেই একটা কম্পিউটরের মনিটর তড়িৎবেগে উড়ে এসে দড়াম করে আছড়ে পড়ল তার বুকের ওপর। ধাক্কার অভিঘাতে মনে হল, পাঁজরগুলো বুঝি ভেঙেই গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় কৌশানী ক্ষণিকের জন্য একটু টলে গেলেও একটা ছায়ামূর্তির সাঁৎ করে সরে যাওয়া তার নজর এড়ায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী দরজার দিকে দৌড়চ্ছে। ও পালাবে। “থা-ম্ শা-লা!”

লেডি অফিসার প্রায় গর্জন করে ওঠে। লোকটা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই সে লাফিয়ে পড়ে চেপে ধরেছে ওর গ্রীবা! শক্তিশালী হাতটা সাপের মতো তার গলা পেঁচিয়ে ধরল। ধরার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লক অ্যান্ড চোক!

বার্নিং শিখ এবার চোখে অন্ধকার দেখল। একটা মেয়ের হাতে এত শক্তি থাকতে পারে তা তার ধারণার বাইরে। অমন পেলব সুন্দরী মেয়েটা যে প্রয়োজনে এমন ‘মর্দানি’ হয়ে উঠতে পারে তা কে জানত। সে হাঁকপাক করতে-করতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। যে-কোনো নারীর চেয়ে ও নিজে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বেপরোয়া। কিন্তু মত্ত হাতির পিঠে যখন অপেক্ষাকৃত ছোটো চেহারার লেপার্ড চেপে বসে তার ঘাড় কামড়ে ধরে, তখন ওই অমিত বলশালী প্রাণীটিও অসহায়। এমন বেকায়দায় ধরেছে যে ছাড়াতেও পারছে না। সে তবু প্রবল জেদে কৌশানীকে সুদ্ধই দেওয়ালে ধাক্কা মারতে শুরু করল। পিঠের দিক দিয়েই সমস্ত যন্ত্রপাতির ওপর আছড়ে ফেলছে নিজেকে। পিঠ দিয়েই দেওয়ালের কাচ সজোরে ঝনঝনিয়ে ভাঙছে। যে করেই হোক, নিজেকে মুক্ত করতেই হবে। তার ধাক্কায় লেডি অফিসারের মাথা দেওয়ালে ঠুকে যাচ্ছে, হাত পা ঘষা খেয়ে ছড়ে যাচ্ছে, কঠিন যন্ত্রের আঘাতে ব্যথা পাচ্ছে, কাচ ভেঙে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত, আহত হচ্ছে, তবু ও মেয়ে ছাড়ার নাম করে না। তার লৌহ আবেষ্টন ক্রমাগতই চেপে বসছে কণ্ঠনালীর ওপরে। এ কী! ইনি কি মরে গেলেও ছাড়বেন না!

মত্ত হস্তীর মতো বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর বার্নিং শিখ বুঝতে পারল যে তার পালানোর পথ ক্রমাগতই সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। এই ঘরে যা ভাঙাভাঙির আওয়াজ হচ্ছে তাতে হসপিটালের কর্মীরা এখনই ছুটে আসবে। তাহলে আর পালাবার পথ নেই। তার নিজের নিয়ম এবার তাকেই ভাঙতে হবে। সম্পূর্ণ জেনে-বুঝে, ওয়াহেগুরুর মর্যাদার সর্বনাশ করে এক নারীকে অপ্রয়োজনে নিজ হাতে খুন করতেই হবে! আর কোনো উপায় নেই।

দু-জনের মারামারির চোটে বেশ কিছু মনিটর ও যন্ত্রপাতি ততক্ষণে ভেঙে খান খান। এমনকি দেওয়ালে লাগানো বেশ কিছু কাচ ভেঙে গিয়ে খানিকটা ধারালো অংশ তীক্ষ্ণ ছুরির মতো তখনও খাড়া হয়ে আটকে ছিল। সে আর অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে কৌশানীকে নিয়েই প্রায় উলটে পড়ল ওটারই ওপর। তার হিসাবমতো ওই ধারালো

কাচটায় কৌশানীর গলা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হিসাবে সামান্য ভুল থাকার দরুণ গলার মাঝখানে না লেগে কাচটা মেয়েটার গ্রীবার ডানদিকে গেঁথে গেল। এইবার সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছে। ব্যথার তাড়সে বজ্র আঁটুনি আলগা ও হয়ে যায়। সেই সাময়িক দুর্বলতারই সুযোগ নিল বার্নিং শিখ। সে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে বাইরের দিকে দৌড়োল।

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মেয়েটা কুঁকড়ে গিয়েছিল। তবু দাঁতে দাঁত চেপে একটানে বের করে আনল তীক্ষ্ণ কাচের টুকরোটা। কাচটা একদম ভেতরে বসে গিয়েছিল। বের করে আনতেই রক্তের ধারাও বেরিয়ে এল। সে বিন্দুমাত্রও পাত্তা দিল না। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা। লোকটা পালাচ্ছে। যেভাবেই হোক, ওকে ধরতে হবে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। ছাড়বে না… কিছুতেই ছাড়বে না…!

ওয়ার্ডবয়ের পোষাকে এক ব্যক্তিকে ওভাবে করিডর দিয়ে পড়িমড়ি করে দৌড়োতে দেখে ডাক্তার, সিস্টার, এমনকি পেশেন্ট পার্টিরাও হতবাক! মানসিক রোগগ্রস্ত পেশেন্ট হসপিটাল থেকে পালাতে পারে, এবং তার পেছনে ওয়ার্ডবয় বা সিস্টাররা তাকে পাকড়াও করার জন্য ছুটতেও পারে। কিন্তু জীবনে বোধহয় সবাই এই প্রথমবার কোনো ওয়ার্ডবয়ের পেছন পেছন কোনো রোগিনীকে ছুটতে দেখল। তাও রোগিনীর কী অবস্থা! আপাদমস্তক রক্তাপ্লুত। পোশাকটা রক্তে লাল। কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেবে কী, সবার চক্ষুস্থির! এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থারই সুযোগ নিল বার্নিং শিখ। এক সিস্টার উলটো দিক দিয়ে এক বৃদ্ধকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে নিয়ে আসছিল ওয়ার্ডের দিকে। সে আচমকাই তার ঘাড়ের ওপর পড়ে বৃদ্ধকে হুইলচেয়ার সুদ্ধই এক জোর ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল কৌশানীর দিকে।

বৃদ্ধ বেসামাল হয়ে ভয়ের চোটে সজোরে চিৎকার করে উঠলেন। কৌশানী প্ৰমাদ গুণল। ভয়াবহ বেগে হুইলচেয়ার সুদ্ধ পেশেন্ট একেবারে এসে আছড়ে পড়তে চলেছে তার ওপর। জোরদার ধাক্কা খেলে পেশেন্টটির অবস্থা কী হবে কে জানে। কী ডেসপারেট ক্রিমিনাল! একবারও ভেবে দেখল না যে ওই অসহায় নিরীহ নিরপরাধ বৃদ্ধ মানুষটির কতখানি ক্ষতি হয়ে যেতে পারে! সে প্রায় ডাইভ মেরে ভদ্রলোকের হুইল চেয়ারটাকে ধরে আটকাল। দ্রুতবেগে চলা হুইলচেয়ার এক ঝটকায় থেমে যেতেই অসুস্থ লোকটি জোরালো ঝাঁকুনি খেয়ে প্রায় পড়তেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই কৌশানী তাঁকে ধরে ফেলেছে। ভদ্রতাবশত তিনি ঠিক আছেন কিনা জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। অথচ তার হাতে সময় নেই। সে দেখল দুষ্কৃতি দুড়দাড় করে দৌড়োচ্ছে লিফটের দিকে। যতক্ষণ বিপন্ন পেশেন্টটিকে সামলাতে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগেই ঢুকে পড়েছে লিফটে। কিছু করার আগেই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শেষমুহূর্তে শুধু শয়তানটার ঠোঁটের কোণে একটা অম্লরসাক্ত হাসি ভেসে ওঠে। ভাবটা এমন, “কী করবি করে নে।”

এই ফ্লোরে সাধারণ ও কর্মীদের ব্যবহার করার জন্য অনেকগুলো লিফটই আছে। এমনই কপাল যে তার একটাও এই মুহূর্তে ধারে কাছেও নেই। সবগুলোই ব্যস্ত। মিস্‌ বোসের হাতে নষ্ট করার মতো যথেষ্ট সময়ও নেই। সে শশব্যস্তে দৌড়োল সিঁড়ির দিকে। যেভাবে লাফ মেরে মেরে সিঁড়ি ভাঙছে তা দেখলে বুঝি শ্রেষ্ঠ লংজাম্পারও লজ্জা পাবে। যে-কোনো পার্কোর-এক্সপার্টের কাছে এইসব স্টেয়ারকেস জাম্প বা ভল্ট মেরে পেরিয়ে যাওয়া প্রায় বাঁ হাতের খেল। অধিরাজ ব্যানার্জির মতো এ বিষয়ে মহাগুরু না হলেও কৌশানী যথেষ্ট স্পিডি। সে কিছুক্ষণের মধ্যেই দৌড়ে নীচে পৌঁছে গিয়েছে। একেবারে বিদ্যুতের মতো তেজি, কালসাপের মতো মসৃণ তার গতি।

কিন্তু এ কী! লিফটের দরজা খোলা। ভেতরে কেউ নেই। এত কাণ্ডের পরও স্রেফ একটুর জন্য মিস্ করেছে লোকটাকে! কৌশানী অসহায়দৃষ্টিতে দেখল হসপিটালের সীমানা পেরিয়ে ততক্ষণে একটা ভিড়ের দিকে দৌড়োচ্ছে সে। ওর পেছনে যাওয়ার আর কোনো মানে হয় না। লোকটা অত্যন্ত চালাক। ঠিক ভিড়ের মধ্যে মিশে যাবে। কিন্তু চৌধুরী পরিবারকে অরক্ষিত রেখে সে কোথাও যেতে পারবে না। কারণ টপ বসের নির্দেশ একদম স্পষ্ট, লোকটাকে ধরার চেয়ে আটকানো বেশি জরুরি। কে বলতে পারে, কৌশানীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সে হয়তো আবার অন্য পথে ফিরে আসবে!

অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাল ছেড়ে দেয় মেয়েটা। এতক্ষণ উত্তেজনায় নিজের ক্ষতবিক্ষত দেহটার পরোয়া করেনি। কিন্তু এখন তীব্র যন্ত্রণা টের পেল। রক্তক্ষরণে, হতাশার ক্লান্তিতে কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছে। সে সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। এইভাবে হেরে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। জীবনে এই প্রথম বুঝি রাগে, দুঃখে তার চোখ বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে…! “মিস্ বোস?”

কানে এল অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর। কৌশানী মুখ তুলে দেখল অধিরাজ, অর্ণব এবং টুইঙ্কল, তিনজনেই দ্রুতবেগে ছুটে আসছে তার দিকে। আরও একটু আগে এলে হয়তো খেল খতম হয়ে যেত বার্নিং শিখের। কিন্তু দেরি হয়ে গেল! …একটুর জন্য…। আধমিনিটেরও কম সময়ের দাম দিতে হল!

“লোকটা পালিয়ে গেল স্যার…।” তার কণ্ঠস্বরে আফশোশ, “একটুর জন্য ধরতে পারলাম না। জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফস্কে গেল।”

“ওঁরা সবাই ঠিক আছেন?”

“হ্যাঁ।” সে সজোরে দম নিতে নিতে বলে, “ওঁদের কিছু হয়নি।”

“ইটস ওকে… গ্রেট ওয়ার্ক ইনডিড।” অধিরাজ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে একঝলক তার গ্রীবার ক্ষত দেখে নেয়, “আপনার এখন ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। ওকে আমরা দেখে নিচ্ছি। কোন্‌দিকে গেল?”

সে হাত তুলে বার্নিং শিখের গমনপথের দিক নির্দেশ করে। অধিরাজ এবার টুইঙ্কলের দিকে তাকিয়েছে, “মিস্ অরোরা, প্লিজ টেক কেয়ার অব হার। এক্ষুনি ওঁকে ওপরে নিয়ে যান। শি ইজ ব্লিডিং। আমরা ওদিকে যাচ্ছি।”

মিস্ অরোরা একটাও কথা না খরচ করে মিস্ বোসকে সাবধানে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। মিস বোস তার কাঁধে ভর দিয়ে চলে যেতে যেতে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দেখল যে দুই অফিসার জ্যা মুক্ত তীরের মতো দ্রুতবেগে বার্নিং শিখের খোঁজে দৌড়োচ্ছে। ব্যর্থতার গ্লানির কামড় বুকের মধ্যে একটা তীব্র কষ্টের সৃষ্টি করলেও সে মুখে কিছু বলল না। বরং টুইঙ্কলের হাত ধরে অতিকষ্টে ভেতরের দিকে চলে গেল।

বাইরে তখন রাস্তায় দমবন্ধ করা ভিড়। এর মধ্যেই কোনো এক বিরোধী পার্টির প্রতিবাদ মিছিল চলছে। নানারকম প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে অগুণতি মানুষ স্লোগান দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে। অধিরাজ এবং অর্ণব অসহায় দৃষ্টিতে দেখল, ওই মুখের মিছিলে যে-কোনো একজনকে স্পট করা প্রায় অসম্ভব। তাদের দৃষ্টি একরকম ব্যর্থ হয়েই গোটা মিছিলকে মাপছিল। কিন্তু নাঃ, এভাবে কোনোমতেই কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভবপর হবে না। তবে কি সে এই ভিড়ের মধ্যেই মিশে গিয়ে সরে পড়ল? না অন্য কোথাও লুকিয়েছে?

অর্ণব হতাশভাবে মাথা নাড়ল, “ইম্পসিবল। আবার পালিয়ে গেল।”

অধিরাজ একদৃষ্টে মিছিলের দিকেই তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। অর্ণবের কথা শুনে সংবিৎ ফিরে পেয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, “গুল্লুর লেডি ইনফর্মার বার্নিং শিখকে স্টক করছিলেন না? তিনি কোথায়? তাঁর তো এখানেই থাকার কথা। ফোনে তোমায় বলেছিলেন না যে এখানেই থাকবেন?”

এতক্ষণে অর্ণবের মনে পড়ল। হ্যাঁ, দৃষ্টি দত্ত নামের মেয়েটি তো বার্নিং শিখের পেছনেই ছিল। ফোনে অধিরাজ নিজে কথা না বললেও অর্ণবের তার সঙ্গে বাক্যালাপ হয়েছে। সে জানিয়েছিল, “আমি একদম ওর থেকে দশ হাত দূরত্বেই আছি। আপনারা চিন্তা করবেন না। একেবারে বেহায়া চিনে জোঁকের মতো লেগে থাকব।”

অর্ণব বিড়বিড় করে, “তাই তো। বেহায়া চিনে জোঁকটি গেল কোথায়? গোলমাল দেখে ভেগে গেল? দেখতে কেমন তাও তো জানি না। হয়তো ভয় পেয়ে সিন থেকে সরে পড়েছে। আফটার অল মেয়ে…!”

“আই ডোন্ট থিঙ্ক সো।” তার কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, “ওই দেখো, ভিড়ের ঠিক উলটোদিকে নীল রঙের ড্রেস পরা এক ইয়াং সেনোরিটা হাঁউমাউ করে ঠিক অপোজিট দিকে দৌড়চ্ছেন। আমার মনে হয় ইনি তিনিই! নয়তো কোথাও কিছু নেই, মিছিল সামনের দিকে, আশেপাশে পুলিশও নেই যে তাড়া খাবেন, ধারে কাছে ইভটিজারও নেই, দিনের বেলায় কোনো মেয়ে ওরকম অকারণে দৌড়বে কেন? যদি না সে কাউকে চেজ করে!”

তার কথা শুনে অর্ণব আবিষ্কার করল যে সত্যিই তাই! এক নীলবসনা সুন্দরী একেবারে প্রাণপণ মিছিলের উলটো ডিরেকশনে দৌড়োচ্ছেন। অধিরাজের কথা মিথ্যে নয়। ওরকম পাঞ্জাব মেলের মতো ছোটার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। সে বলল, ফোন করব? কিন্তু উনি তো ডাইনে-বাঁয়ে তাকাচ্ছেনই না! আমাদের দেখতে পাবেন না। ফোন বাজলেও ধরবেন বলে মনে হয় না!”

“শুধু ডাইনে বাঁয়ে নয়।” মেয়েটির অবস্থা দেখে অধিরাজের কপালে হাত, “সবচেয়ে ভয়ের কথা, উনি সামনের দিকেও তাকাচ্ছেন না! কোন দিকে দেখছেন তা ভগবানও জানে না। সামনে প্রমাণ চেহারার ল্যাম্পপোস্ট! ওটাতেই শিশুর শট ধাক্কা খেতে চলেছেন। সর্বনাশ করেছে!”

কথাটা বলতে বলতেই সে প্রায় হুড়মুড়িয়ে অভদ্রের মতোই ভিড় ঠেলেঠুলে উলটোদিকের ফুটপাথের দিকে দৌড়োল। ছুটতে ছুটতেই চেঁচিয়ে বলল, “উনি ফোন ধরবেন কী? ওঁকে কে ধরে তারই নেই ঠিক। …”

মেয়েটি নীল রঙের চুড়িদার, শান্তিনিকেতনি ঝোলা ব্যাগ, আর ওড়না সামলাতে সামলাতে তীরবেগে ছুটছিল। বেচারির ওড়নাটা এতই ওড়াউড়ি করে বিরক্ত করছে যে তার দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে সামনের লম্বা চওড়া ল্যাম্পপোস্টটার দিকে তাকায়ইনি। ফলতঃ অধিরাজ যা আন্দাজ করেছিল ঠিক তাই হল। প্রবল বেগে গিয়ে, সজোরে আছড়ে পড়ে, ঠকাস করে এক ধাক্কা খেল ল্যাম্পপোস্টটার সঙ্গে। অর্ণব ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। কোন্টা গেল? মাথা না নাক

মেয়েটির ভোগান্তির তখনও আরও কিছু বাকি ছিল। মাথায় জোরদার আঘাত পেয়ে এমনিতেই চোখে সরষেফুল দেখছিল, তার ওপর ঠিক ওই মুহূর্তেই অসাবধানে পা-ও স্লিপ করেছে। ফুটপাথের ওপরেই সে সজোরে আছাড় খেতে চলেছে দেখে আশেপাশের

লোকজন হাঁ হাঁ করে ওঠে। ভয়ের চোটে চোখ বুজে দৃষ্টি নিজেও চেঁচিয়ে উঠল, “ভ-গা। গে-ছি। গে-ছি!”

রাস্তার ওপরেই সপাটে আছড়ে পড়ছিল তার হালকা দেহটা। পড়লে হাড়গোড় কিছু আস্ত থাকত কিনা কে জানে। কিন্তু তার আগেই দুটো সবল বাহু তাকে জাপটে ধরেছে। কানের কাছে একটা উষ্ণ স্বর, “এখনও যাননি সেনোরিটা। কিন্তু আর একটু হলেই যেতেন!”

দৃষ্টি টের পেল যে সে নিরাপদ আশ্রয়ে শূন্যে ঝুলছে। ব্যাপারটা কী হল তা বোঝার জন্য সে একখানা চোখ খুলে নিজের রক্ষাকর্তাকে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু সামনে যা দেখল তাতে এখন সরষেফুল নয়, মোটামুটি পুরো ভ্যালি অব দ্য ফ্লাওয়ারই দেখতে শুরু করেছে মেয়েটি। সামনে এই লম্বা লোকটা কে! এতদিন টিভিতে, পেপারে দেখেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। এখন বুঝল, ক্যামেরা কতখানি অপদার্থ। স্বপ্ন দেখছে না মরতে চলেছে? সে প্রায় মরণাপন্ন রোগীর মতোই শ্বাস টানতে টানতে বলল, “ব..ব…ব…ব…!” অর্ণবও ততক্ষণে তার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। খবরির অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “ব…ব… মানে? বাস? বাড়ি? ব্যুরো? বরফ? না বিড়ি? কোথায় যেতে চাইছেন? বা কোনটা চাইছেন?”

দৃষ্টি তোতলাতে তোতলাতেই বলল, “ন…ন…না! ব…ব-স্।”

এতক্ষণে তার ‘ব’ এর অর্থ বুঝতে পেরে দুই অফিসারই একসঙ্গে কথা বলে ওঠে। অধিরাজ সবে বলছিল, “আর ইউ ওকে মিস্? আপনার নামটা কী যেন?” কিন্তু তার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই অর্ণব বলে উঠল, “লোকটা কোথায়?”

সে যথারীতি তেমনভাবেই বলল, “চ…চ… চাউমিন।”

অধিরাজ প্রায় আঁতকে ওঠে, “ক্ষীঃ! আপনার নাম চাউমিন?”

‘চাউমিন’ শব্দটা শুনে অর্ণবের অন্তত খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু সে উলটে বেজায় রেগে বলল, “চাউমিন মানে? লোকটা চাউমিন খাচ্ছে? কীসব বলছেন যা তা! আপনি কী জাতীয় ইনফর্মার?”

ও আরও কিছু বলার আগেই অধিরাজ হাত তুলে থামিয়েছে তাকে। সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে যে মেয়েটা নার্ভাস। প্রায় কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে একদম সামনের একটা ওপেন ক্যাফের টুলে তাকে বসিয়ে দিয়ে দ্রুতভঙ্গিতে বলল, “মাদমোয়াজেল, আমাদের হাতে একদম সময় নেই। আপনি কি জানেন লোকটা কোনদিকে গেছে?” দৃষ্টি তখনও শক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। কোনোমতে বলল, “চা…চ… …!”

“এখন আপনি আবার চা খাবেন?” অর্ণব পুলিশি টোনে ফের ধমক দেয়, “আরে লোকটা কোথায়? আপনি স্টক করছিলেন না?”

অধিরাজ প্রায় মরিয়া হয়ে বলে ওঠে, “সেনোরিটা। এখন ‘ঘণ্টাখানেক সঙ্গে সুমনে’-র সময় নেই। তাড়াতাড়ি অর্ণব গোস্বামীর মোডে আসুন। নেশন ওয়ান্টস টু নো-হোয়্যার ইজ হি? দাঁড়ি, কমা, পজ—সব গুলি মারুন।”

“লোকটা ও…ওই চাউমিনের দো…দোকানের পাশের সরু গলিটা দিয়ে ঢু …ঢুকে গেছে ভে…ভেতরে।” সে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি বলার চেষ্টা করল, “ক…. কিন্তু গলিটার শেষে কিছু নেই। ডে…ডেড এন্ড। তবে ও এ…এখনও বাইরে বেরোয়নি, …ওখানেই আ…আছে।”

“ওকে। থ্যাংকস। অর্ণব, তুমি এখানেই দাঁড়াও। যদি বাই এনি চান্স ও আমায় বিট করে এদিক দিয়ে বেরোতে যায়, তবে ধরার চেষ্টা করবে। লক্ষ রেখো। ততক্ষণ সেনোরিটা একটু জলখাবার কফি খেয়ে নিন। অনেক কষ্ট করেছেন। বিল অন্ মি।” কথাটা ছুড়ে দিয়েই সে পড়িমড়ি করে ছুটেছে উক্ত গলিটির দিকে। লোকটা এখনও যখন বেরোয়নি তখন ওদিকেই কোথাও আছে। কিন্তু মিস্ ‘চাউমিন’ আবার বললেন যে গলিটার শেষে ডেড এন্ড। ওখান থেকে বেরিয়ে তার কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। তবে সে হাপিশ হল কোথায়! গলির ভেতরে ওঁত পেতে রাস্তা ক্লিয়ার হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে কি? কোথায়?

মিস দৃষ্টি দত্ত এবার স্বপ্নালু দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ সেইদিকেই তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসল। অর্ণব রীতিমতো কটমট করে সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে তাকে দেখছিল। এ কেমন ইনফর্মার? একেবারে নবনীকোমল চেহারা! বাচ্চা বাচ্চা মিষ্টি মুখ। দেখলেই মনে হয় টিপিক্যাল ভালোমানুষ সাহিত্যের ছাত্রী! তার ওপর আবার তোতলা। খবরি কখনও এমন তোতলায়? শুধু তাই নয়, প্রথম দর্শনেই দড়াম করে একখানা আছাড় খেতে চলেছিল। ইনি ‘সখী ধরো ধরো’ চালে র‍্যাম্পে হাঁটলেই ঠিক আছে, খবর তুলে আনা এনার কম্ম নয়। এরকম আনস্মার্ট ইনফর্মার যদি হোমিসাইডের নেটওয়ার্কে ঢোকে তবে গোটা ব্যুরোটাই লাটে উঠে যাবে।

অধিরাজ মিলিয়ে যেতেই দৃষ্টি আলগোছে একটা হাই তুলল। তারপর ক্যাফের ওয়েটারকে ডেকে বলল, “হেই ডিয়ারি, টু চিকেন স্যান্ডুইচ, ওয়ান চিজ ওমলেট, সসেজেস অ্যান্ড আ হট মাটন বার্গার! সঙ্গে জমিয়ে কোল্ড কফি। ওকে?”

মেনুর ফিরিস্তি শুনে অর্ণবের চক্ষু চড়কগাছ। এই মেয়েটা এত খাবে। সে প্রায় অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে দৃষ্টি ফের হাই তুলে বলল, “হে-ই। চিল্‌ ব্রো! হোয়াই সো সিরিয়াস? টাকাটা তো তোমার গ্যাঁট থেকে খসছে না।”

একেই ‘ব্রো।’ তার ওপর আবার ‘তুমি।’ এ আবার কী জাতীয় আলগা পিরিত! অর্ণবের মাথায় চড়াৎ করে রক্ত চড়ে যায়। হোমিসাইডের অফিসারকে ‘ব্রো’ বলে ডাকছে। সাহস তো কম নয়! তাছাড়া এখন তো একবারও তোতলাচ্ছে না। তবে তখন অমন থুতিয়ে থুতিয়ে কথা বলছিল কেন? এ তো আজব পাবলিক। তখন পুরো কাঠগুদামের স্পিডে কথা বলছিল। অথচ এখন পুরো রাজধানীর মতো তড়বড়িয়ে চলেছে। এর সঙ্গে বেশি কথা না বাড়ানোই ভালো। সে সামান্য ভদ্রভঙ্গিতে মৃদু হেসে ক্যাফের বাইরে চলে আসে। ও মেয়ে ফাঁসির খাওয়া গিলুক। কিন্তু এই মুহূর্তে গলির মুখ থেকে তার চোখ সরানোর উপায় নেই। যাতে পুরো ভিউটা ক্লিয়ার পাওয়া যায় সেই আন্দাজেই শিকারীর ভঙ্গিতে পজিশন নিল ও। সামনে দিয়ে একগাদা লোকের লম্বা মিছিল চলেছে। কিন্তু অর্ণবের চোখ অর্জুনের মতো পাখির চোখই দেখছে। যাই ঘটে যাক, এখন এখান থেকে নড়া যাবে না।

মেইন রাস্তাটা যেখানে একটা বাঁক নিয়ে সরু গলির মধ্যে ঢুকে গিয়েছে ঠিক সেখানে সত্যিই একটা চাউমিনের দোকান আছে। মেয়েটা ভুল বলেনি। দোকানি তখন ঘাড় গুঁজে চিকেন চাউমিন বানাচ্ছিল। একটা লম্বা লোককে ওরকম পাগলের মতো দৌড়োতে দেখে সামান্য বিস্মিত দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকাল। পরক্ষণেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে চাউমিনে। এই গলির মুখ থেকে ভেতর অবধি নানারকমের ছোটখাটো ফুড স্টল আর মাঝারি রেস্টোর‍্যান্ট এমনকি সস্তার ভাতের হোটেলও আছে। হসপিটালে ভরতি পেশেন্টদের আত্মীয়রা অনেকেই দূর থেকে আসেন, সারা দিন থাকেন। সকালে ভিজিটিং আওয়ারে দেখা করে এখানেই অপেক্ষা করেন এবং সন্ধেবেলা ফের অসুস্থ প্রিয়জনকে দেখে ফেরত যান। সিরিয়াস পেশেন্টদের লোকেরা তো সর্বক্ষণই থাকেন। তাই কিছু খেতে হলে এখানেই আসতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকটা দোকানের সামনেই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত কাস্টমারদের ভিড় উপছে পড়ছে। এর মধ্যে কি বার্নিং শিখ থাকতে পারে?

তার তীব্র দৃষ্টি প্রত্যেকটা স্টল, হোটেল, রেস্তোরাঁ খুঁজে দেখল। গুলশন বা শুরু যা-ই হোক, সে মিস্ বোসের তাড়া খেয়ে এদিকেই এসেছে। মিছিলে মিশতে পারেনি কারণ ওর ছদ্মবেশটাই আটকে দিয়েছে। ওয়ার্ডবয়ের পোষাকে আর যা-ই হোক, মিছিলে হাঁটা যায় না। সবার চোখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। ইউনিফর্মটা খোলার মতো সময় পায়নি। তাই আর জায়গা না পেয়ে এদিকেই পালিয়েছে। সম্ভবত হুলিয়াটা একটু বদলে নেওয়াই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু তার জন্য নিশ্চয়ই জনবহুল রেস্তোরাঁয়, হোটেলে বা স্টলে যাবে না। সে একটু ফাঁকা জায়গাই খুঁজবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, বা জনসমক্ষে নিশ্চয়ই চেঞ্জ করবে না। তবে গেল কোথায়?

সে সতর্ক ভঙ্গিতেই চতুর্দিকটা দেখতে দেখতে গলি বেয়ে সামনের দিকে এগোল। শুধু খাবার নয়, এখানে প্রচুর ওষুধের দোকানও আছে। বেশ ভালোই বিজনেস স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে এরা। এখানেও নিশ্চয়ই ঢুকবে না। দোকানের সামনে মানুষের লাইন। অধিরাজ বিড়বিড় করে বলল, “ফাঁকা জায়গা…যেখানে মানুষ নেই…অ্যাবানডন্ড? আমি হলে সেখানেই যেতাম…। কোনো অ্যাবানডন্ড জায়গা বা ফ্যাক্টরি বা বিল্ডিং…স্টল…আছে এখানে…? হাই প্রব্যাবিলিটি…!”

গলি ধরে আরও কিছুটা এগোতেই তার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। সরু রাস্তাটা যত শেষের দিকে এগোচ্ছিল, ততটাই মানুষের ভিড় হালকা হয়ে আসছিল। যত দোকান সব সামনের দিকেই। পেছনে তেমন দোকানের সারি নেই। বরং কয়েকটা পুরোনো বাড়ি, বেশ কিছু পুরোনো আমলের লম্বা বিল্ডিং, যেগুলোকে সস্তার লজিং হিসাবে ব্যবহার করা হয়, এক কামরার ঘর নিয়ে মানুষ থাকে, তেমনই কিছু পড়ল। কিন্তু সেখানে ভিড় না থাকলেও বাসিন্দারা আছে। তারা কেউ দেখে ফেলতেই পারে। বার্নিং শিখ সে রিস্কও হয়তো নেবে না। এরকম মান্ধাতা আমলের বাড়িতে কোনো অপরিচিত মুখ ওয়ার্ডবয়ের পোষাকে ঢুকছে দেখলেই মানুষ নোটিস করবে। সে এত মাথামোটা নয় যে বুঝবে না, মিস্ বোস যদি অকুস্থলে থেকে থাকেন তখন হোমিসাইডের টিমও তার পেছন পেছন আসবে। তাই এমন কোথাও যাবে না যাতে সাধারণ মানুষের নজরে পড়ে। সে এখানেই আছে। কিন্তু অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।

আরও কয়েককদম এগিয়েই থমকে গেল অধিরাজ। গলিটা এখানেই শেষ। শেষপ্রান্তে বিরাট উঁচু একটা পাঁচিল যেটাকে টপকে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু ঠিক তার লাগোয়াই একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অন্য বাড়িগুলোর মতোই প্রাচীন আর লম্বা বারান্দা যুক্ত। ভেতরের সার সার খুপরি খুপরি পায়রার খোপের মতো ঘরের দরজাগুলো বাইরে থেকেই স্পষ্ট। হয়তো অন্যগুলোর মতোই কখনও এই বাড়িটাকেও ভাড়া দেওয়া হত বা সস্তায় লজিং এর জন্য ব্যবহার করা হত। আলাদা বিশেষত্ব কিছু নেই শুধু একটা সাইনবোর্ড ছাড়া। কলকাতা পৌরসংস্থার তরফ থেকে এর গায়ে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে বেশ বড়ো বড়ো করে লেখা, ‘সাবধান। বিপজ্জনক বাড়ি।’

সে আপনমনেই ইতিবাচক মাথা নাড়ে। নিজেকে লুকোনোর জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা। মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে মানে বাড়িটা পরিত্যক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। অন্যান্য বাড়িগুলোর মতো এখানে জন সমাগমের চিহ্নমাত্রও নেই। প্রাচীন বিধ্বস্ত অট্টালিকার বাইরে নীরবতা ছেয়ে আছে। লম্বা বারান্দায় কোনো দড়ি টাঙানো নেই, জামাকাপড়ও ঝুলছে না। দরজাগুলো হাট করে খোলা। ভেতরে অন্ধকার খাঁ খাঁ করছে। বাইরে পায়রারা মনের সুখে বাসা বানিয়েছে। তাদের ডানার ঝটপট আর বকবকম ছাড়া কোনোরকম শব্দ নেই। কোনো মানুষের অস্তিত্বের লক্ষণ নেই। দেখলেই বোঝা যায়, বাসিন্দারা সবাই এ বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। লুকোনোর জন্য একদম পারফেক্ট প্লেস।

অধিরাজ খুব সন্তর্পণে নিজের কানে ব্লু টুথ ইয়ারসেটটা পরে অর্ণবকে ফোনে ধরল। ওপ্রান্ত থেকে তার সাড়া আসতেই নীচুস্বরে বলল, “মনে হচ্ছে ওর কারেন্ট লোকেশনের খোঁজ পেয়েছি। যদি ভুল না করি তবে ওর গেট-আপ চেঞ্জ হচ্ছে অর্ণব। এখন আর ওয়ার্ডবয়ের ইউনিফর্ম দেখে ওকে চেনা যাবে না। রূপ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।”

“আমিও ওখানে আসব?” অর্ণব উদ্বিগ্ন, “পোষাক পালটে গেলে এখান থেকেও তো চেনা যাবে না। ধরব কী করে?”

“ইজি।” সে জবাব দেয়, “হয় আমিই ওকে ধরব। নয়তো ওকে চেজ করব। এখানে যারা আছে, তারা বড়োজোর দ্রুতগতিতে হেঁটে গলি থেকে বেরোবে। একমাত্র ওই একজনই দুড়দাড় মারমার করে দৌড়বে। আমি ওকে দৌড় করাবই। তাড়িয়ে নিয়ে আসব। যে লোকটাকে গলি থেকে কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো ছুটে বেরোতে দেখবে, তাকেই ধরার চেষ্টা করবে। সে পুরুষ-মহিলা যে হুলিয়াতেই থাকুক না কেন। ক্লিয়ার?”

“ক্রিস্টাল ক্লিয়ার স্যার।”

অর্ণব কানের ইয়ারসেটটা সামান্য চেপে দেয়। অধিরাজ লাইন কাটেনি। ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রয়োজনে যে কোনো মুহূর্তে ওপ্রান্ত থেকে নির্দেশ আসতে পারে। তার বুকের মধ্যে একটা অস্থির অনিশ্চয়তা। স্যারকে একা ছেড়ে দেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? আবার কোনো ব্লান্ডার হবে না তো! সবসময়ই একটা অদ্ভুত ভয় কেন যে তাকে তাড়া করে বেড়ায় কে জানে। প্রাণপণ প্রচেষ্টা করেও এই আতঙ্ককে তাড়াতে পারছে না সে। আবার বার্নিং শিখ আর অধিরাজ মুখোমুখি। যতবার এই দু-জনের সম্মুখ সমর হয়েছে, ততবারই কোনো-না কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগেরবার তো আচার্য স্যার থেকেও বার্নিং শিখকে আটকাতে পারেননি। ওটা তবু অল্পের ওপর দিয়ে গিয়েছিল। এবার যদি আরও মারাত্মক কিছু হয়? যদি তেমন কিছু হয়ে যায়, তবে নিজেকে কী জবাব দেবে অর্ণব?

সে আপনমনেই মাথা নাড়ে। শুনবে না। গোঁয়ার, অবাধ্য লোকটা কিছুতেই কারোর কথা শুনবে না! কেন যে বারবার রিস্ক নেন তা উনিই জানেন। প্রাণটা কি এতই সস্তা? একবার কি প্রিয় মানুষগুলোর মুখও মনে পড়ে না? তার মধ্যে কি অর্ণব নেই? জানে না! আপাতত ও নিজে এটুকুই জানে যে এখন এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এখন ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড কিংবা মাথার ওপরে বোম ফাটলেও কিছুতেই নড়বে না। ওই একটি মানুষের অবাধ্য হতে সে জানে না, জানতেও চায় না। গোটা দুনিয়া একদিকে আর অধিরাজ অন্যদিকে। তাই নিজের মনের চিন্তাভাবনাকে একরকম অগ্রাহ্য করেই অর্ণব চুপচাপ গলির ঠিক মুখেই দাঁড়িয়ে পজিশন নিল।

অধিরাজ অত্যন্ত সাবধানে পা টিপে টিপে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। মাথার ওপরে পায়রার ঝটপটানি ছাড়া আপাতত আর কোনো আওয়াজ নেই। গোটা বাড়িটাই ফাঁকা পড়ে আছে। তার ডান ভুরু কৌতূহলে একটু উঠে যায়। ও কি আগে থেকেই জানত যে এরকম একটা গা ঢাকা দেওয়ার জায়গা এখানে রয়েছে? সেটার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ আজ পর্যন্ত বার্নিং শিখ যত ক্রাইম করেছে সবটাই প্রি-প্ল্যানড। যে মুহূর্তে চৌধুরী পরিবারকে এখানে শিফট করা হয়েছিল, সেই মুহূর্তেই সে পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখে নিয়েছে। মিস্ বোস যদি না-ও থাকতেন, তাও চৌধুরী পরিবারকে হত্যা করার পর এখানেই এসে হুলিয়া বদল করার প্ল্যান ছিল। কী অদ্ভুত মস্তিষ্ক। কী অসাধারণ হিসাব! মনে মনে লোকটার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারল না সে।

তার সতর্ক হাতে ফের উঠে এল আগ্নেয়াস্ত্র। সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে পা টিপে টিপে প্রায় অন্ধকার করিডর ধরে এগোল। দিনের বেলাতেও এই প্রাচীন বাড়িগুলোয় সূর্যালোক কম ঢোকে। তার ওপর প্রায় কুড়ি ইঞ্চির দেওয়ালগুলোও এখনকার ফ্ল্যাট বা আধুনিক বাড়ির তুলনায় অনেক বেশি পুরু। তাই এই শীতের সময়ও ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ছ্যাঁৎ করে আরও একরাশ হিমশীতল ড্যাম্প ধরা অনুভূতি স্পর্শ করে গেল। পুরসভা এটাকে বিপজ্জনক বাড়ির তকমা দিয়ে বিন্দুমাত্রও ভুল করেনি। খসে পড়া ছাত, দাঁত বের করা ইটের নোনা ধরা ভাঙা ভাঙা দেওয়াল দেখলেই বোঝা যায় যে এ বাড়ি আদৌ বাসযোগ্যই নয়। তাও হয়তো নিরূপায় মানুষগুলো কোনোমতে এখানেই মাথা গুঁজে পড়ে ছিল। শেষপর্যন্ত পুরসভার হুড়ো খেয়ে ঘর ছাড়তে হল তাদের।

একতলার প্রত্যেকটা ঘর অত্যন্ত সতর্কভাবে জরিপ করল অধিরাজ। তারপর নীচু স্বরে ব্লু টুথ স্পিকারে অর্ণবকে জানায়, “গ্রাউণ্ড ফ্লোর ক্লিয়ার। লোকটার ফার্স্ট ফ্লোরেই থাকার চান্স বেশি। আমি ওদিকেই যাচ্ছি। বি অ্যালার্ট।”

ওপ্রান্ত থেকে উত্তর এল, “ওকে স্যার।”

খুব ধীর ভঙ্গিতে করিডর পেরিয়ে সে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। সিঁড়ির অবস্থা দেখে একমুহূর্তের জন্য হলেও সেই কালান্তক স্লটারহাউজের দৃশ্য তার চোখের সামনে ফের হঠাৎই ভেসে ওঠে। সেই ভেঙে পড়া, নড়বড়ে, চিড় ধরা সিঁড়ি। পুরোনো সেই কেসটা মাথায় আসতেই আবার সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি। যা সে ভুলে যেতে চায়, সেটাই বারবার এমনভাবে মনে পড়ছে কেন? যখন তখন এসে চোখের সামনে হানা দিচ্ছে। বলতে কী চায়? সেই একই দৃশ্য সামনে। দিনের বেলাতেও অন্ধকার সিঁড়ির ধাপ উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। পা ফেলতেই ভয় লাগে। মনে হয়, হুড়মুড়িয়ে এখনই ভেঙে পড়বে না তো!

অধিরাজ ঠোঁট কামড়ে ধরে। যে করেই হোক, সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে মস্তিষ্ক থেকে দূর করতেই হবে। নয়তো তার নার্ভের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়ছে। বর্তমানের বার্নিং শিখ আর অতীতের সার্জিক্যাল স’ কিলার-দু-জনেই ঘাড়ে চেপে বসছে। সে প্রাণপণে বর্তমানের দিকেই মনোসংযোগ করল। নীরব ও হালকা পা ফেলে একরকম গুড়ি মেরেই উঠছে ওপরের দিকে। হাতে জাগ্রত রিভলবার। এক মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি সরছে না সামনে থেকে। গোল্ডেন ব্রাউন চোখ দুটোয় শিকারীর তীব্র চাউনি। রোদের সরলরেখা চোখের ওপর পড়ে থেকে থেকে ঝিকিয়ে উঠছে। একবার শুধু শিকারকে হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।

একতলার মতো দোতলাতেও সেই একই লম্বা করিডর। ডানদিকে খুপরি খুপরি ঘর। ওদিকের জানলা বন্ধ বলে প্রায় অন্ধকার। যেটুকু ক্ষীণ আলো আসছে তা দরজা দিয়ে। কিন্তু তা সবটা দেখার জন্য যথেষ্ট নয়। তবু ছায়াময় পরিবেশটাকে চোখে সইয়ে নিয়ে সে একের পর এক ঘরে উকি মারতে শুরু করল। ঘরগুলো সব ফাঁকা। অবস্থা খুবই খারাপ। মনে হয় না জীবনেও এই বাড়ির বিন্দুমাত্রও যত্ন নেওয়া হয়েছে। সত্যি বলতে কী, মানুষে এরকম ঘরে থাকতে পারে না। তবু পরিস্থিতির চাপে থাকতে হয়।

তার রন্টজেন দৃষ্টি একটার পর একটা ঘরকে দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে থাকে। এগোতে এগোতেই হতাশ হচ্ছিল অধিরাজ। লোকটা গেল কোথায়! কোথাও কিছু তো থাকবে। একটা লঘু পায়ের আওয়াজ, কিংবা নিঃশ্বাসের শব্দ, অথবা তার খুলে ফেলা সাজসজ্জা, একটা ক্লু, একটা ইশারা, একটা ইঙ্গিত, কিছু তো থাকার কথা। কিন্তু কোথায়? আততায়ীকে কি এই ক্ষুধিত পাষাণমার্কা বাড়িই গিলে নিল? না সে অদৃশ্য হওয়ার শিল্প জানে?

নিজের মনেই এসব ভাবতে ভাবতে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল সে। আচমকাই একটা জিনিস চোখে পড়তেই থমকে গেল। চোখের পলকে তার দীর্ঘ দেহ টানটান হয়ে যায়। সারা দেহে তড়িৎপ্রবাহ। এতক্ষণের প্রতীক্ষার পর একটা চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে।

একটা ছোট্ট দশ ফুট বাই দশ ফুটের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে ওয়ার্ডবয়ের ড্রেস। হালকা নীল রঙের হাফ হাতা শার্ট, নীল প্যান্ট। ওই রঙেরই টুপি, গ্লাভস। সঙ্গে একটা মাস্কও আছে। কিন্তু ভীষণ অবিন্যস্ত। যেন কেউ চরম অবহেলায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ধীরে সুস্থে চেঞ্জ করলে এমন হওয়ার কথা নয়। যেভাবে ছুড়ে ফেলেছে তাতে স্পষ্ট, ওর ভীষণ তাড়া ছিল। এর সঙ্গে আর কিছু আছে কি? অধিরাজ একটু এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে জামাকাপড়গুলো পরীক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হসপিটালের একটা আই ডি কার্ডও তো পড়ে আছে সঙ্গে। নাম কী?…স্যাম ত্রিবেদী….! স্যাম না শ্যাম? বানান তো…!

“শি-ট!”

পোষাক স্পর্শ করতেই আসন্ন বিপদের সঙ্কেত টের পেল ও। পোষাকগুলোয় এখনও কারোর দেহের উষ্ণতা লেগে রয়েছে। ঠান্ডা হয়নি। এমনকি ঘামের ছাপ তো বটেই, সুক্ষ্ম বিন্দুও শুকোয়নি। তার মানে সদ্যই চেঞ্জ হয়েছে। লোকটা ধারে কাছেই আছে। সে কোথাও যায়নি…!

অধিরাজের মাথায় সবে এই সম্ভাবনার কথাটা এসেছিল। আকস্মিকভাবেই পেছনে খচমচ করে প্লাস্টিকের অস্ফুট শব্দ। পরক্ষণেই ওর মুখের ওপর সপাটে এসে পড়ল একটা মোটা প্লাস্টিকের প্যাকেট! এতটাই আকস্মিক, দ্রুত ও অতর্কিতে ঘটনাটা ঘটল যে বাধা দেওয়া তো দূর, আক্রমণটা বুঝে ওঠার সুযোগও পায়নি। কিছু করার আগেই শ্বাসরোধী প্লাস্টিক তার মুখ আর গলা সাপটে ধরে মাথা দিয়ে ঢুকিয়ে গিয়েছে। দুটো লৌহকঠিন প্রচণ্ড শক্তিশালী হাত তাকে সেই অবস্থাতেই পিছমোড়া করে ধরে আছড়ে ফেলল দেওয়ালের গায়ে।

এতখানি অসহায়তা অধিরাজ নিজের গোটা কেরিয়ারেও কখনও অনুভব করেছে কিনা সন্দেহ। খুনি তাকে বেকায়দায় দেওয়ালের গায়ে ঠেসে ধরেছে। তার সম্পূর্ণ দেহের ভার অধিরাজের ওপর। হাত দুটো পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে এক হাতে এমন টেকনিকে চেপে ধরেছে যে টানাটানি করেও ছাড়াতে পারছে না। আর এক হাত দিয়ে তার মুখের ওপরের প্লাস্টিকটা শক্ত করে টেনে ধরে আছে। একেবারে বজ্র আঁটুনি। প্লাস্টিকটা ক্রমাগতই টাইট হয়ে চেপে বসে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর বেড়ি লাগাচ্ছে। শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না!…শ্বাস নেওয়া সম্ভব নয়… ক্রমশই দম বন্ধ হয়ে আসছে… অক্সিজেন… একটু তাজা হাওয়া… একটু অক্সিজেন… আঃ!

তার নিঃশ্বাস প্লাস্টিকের গায়ে ধোঁয়া হয়ে জমছে। গরম কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঝাপটায় প্রশ্বাসের লাগাম ছুটছে। অসহ্য কষ্টে দরদর করে ঘামছিল অধিরাজ। মুখটা প্লাস্টিকসুদ্ধ দেওয়ালে ঘষা খাচ্ছে। আপ্রাণ চেষ্টা করছে হাতদুটোকে ছাড়ানোর। কিন্তু কব্জির ‘টেন্ডন’কে এমন কায়দায় লক করেছে প্রতিদ্বন্দ্বী যে একটা আঙুলও সে ঠিকমতো নাড়াতেই পারছে না, প্রতিঘাত করা তো দুর। ওই পরিস্থিতিতেও হাড়ে হাড়ে বুঝল, কম্ব্যাট স্টাইলে এ লোক কিছু কম যায় না। খুনি তাকে দেওয়ালে চেপে ধরেছে ঠিকই, কিন্তু অধিরাজের মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি তাকে জ্যান্তই দেওয়ালে কবর দিচ্ছে। নিজের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসেই চতুর্দিক ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখে ঠিকমতো দেখতেও পাচ্ছে না। তার ছটফটানির চোটে দুর্বল দেওয়ালের চাঙড়ও সশব্দে মেঝেতে খসে পড়ল। ওদিকে প্লাস্টিকটা আরও এঁটে বসছে। গোটা দুনিয়া থেকেই বুঝি অক্সিজেন নামক বস্তুটাই গায়েব হয়ে গিয়েছে। কী প্রচণ্ড যন্ত্রণা …মনে হচ্ছে ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড সমেত গোটা বুকটাই বুঝি এবার ফেটে যাবে…।

শ্বাস নিতে না পারার দুর্বিষহ কষ্টে দেওয়ালের গায়ে আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে ও… দুটো হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যেন শূন্যেই একটু বাতাস আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হাত আটকা পড়েছে বলে ব্যর্থ হচ্ছে… বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবু পারছে না! চোখদুটো বিস্ময় ও যন্ত্রণায় বিস্ফারিত, কষ্টে জলও বেরিয়ে আসতে চাইছে… ওষ্ঠাধর ফাঁক হয়ে গিয়ে বুকে বাতাস ভরার আকুলিবিকুলি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে…. কিন্তু হচ্ছে না… কিচ্ছু হচ্ছে না!… দেহের সমস্ত রক্ত বুঝি চোখে আর মুখেই এসে জমেছে… দেখলে আশঙ্কা হয় এখনই চোখ-নাক দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত বেরিয়ে আসবে! …মৃত্যুযন্ত্রণা কি একেই বলে?…সব শেষ হওয়ার আগের অনুভূতি কি তবে এটাই?…

যত সময় যাচ্ছিল, ততই তার প্রাণান্তকর বাঁচার লড়াই ব্যর্থ হচ্ছিল। এখন চোখের সামনে ক্রমশই ঝিম ধরা অন্ধকার ছেয়ে আসছে। দৃষ্টিতে শূন্যতা। দেহটা অক্সিজেন না-পেয়ে ধড়ফড় করতে-করতে এখন অনেকটাই নিস্তেজ। লম্বা শরীরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে মৃত্যুর নেশায় নিঃসাড় হয়ে এলিয়ে পড়ছিল অধিরাজ। যা গুলি, বম্ব, ছুরি, ছোরা করতে পারেনি, আজ বুঝি একটা নিরীহ প্লাস্টিকের প্যাকেটই তা করে দেখাবে। সে বুঝতে পারল, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হতে চলেছে। এই নিঃসঙ্গ প্রাচীন বাড়িতেই পড়ে থাকবে তার লাশ। অর্ণব কিছু জানতেও পারবে না! সে ক্যাসাবিয়াঙ্কার মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা গলির সামনেই তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আর ভাববে, স্যার কোথায় গেলেন! যখন জানবে, তখন…!

কথাটা মনে পড়তেই কোথা থেকে যেন এক আসুরিক শক্তি ভর করল তার দেহে না, এভাবে হারতে পারে না সে। পরিস্থিতি বিপজ্জনক। কিন্তু কোনো না কোনো রাস্তা তো খোলা থাকবে। হাত আটকা, মুখ আটকা, মস্তিষ্ক নয়। সে অতিকষ্টে চোখ বুজে মনে মনে বলে, “থিঙ্ক… থিঙ্ক মিঃ ব্যানার্জি। কোনো রাস্তা… কোনো ফাঁক…কোনো দুর্বলতা। ফর গড সেক, ফা-ই-ট ব্যা-ক!”

এক লহমায় মস্তিষ্কের মধ্যে যেন বিদ্যুৎরেখা খেলে গেল। হাত আটকা, কিন্তু কনুই বা এলবো উন্মুক্ত। পা দুটোও খোলা। অসহনীয় যন্ত্রণায় কাঁপছে। তবু স্থির তাকে হতেই হবে। খুনির বুকের পাঁজর একদম এলবোর কাছে। ওর পায়ে বুলেটের ক্ষতটা নিশ্চয়ই এখনও শুকোয়নি। সে নিজেই মনে মনে ধমকে উঠল, “স্টে-ডি!”

শুধু ওইটুকু ভাবতেই এবং পুরো অঙ্কটা কষতে যেটুকু সময় লাগে। পরক্ষণেই প্রচণ্ড শক্তিতে ‘মোয় থাই’য়ের বিপজ্জনক ব্যাকওয়ার্ড এলবো থার্স্ট আর মারাত্মক ব্যাকওয়ার্ড কিক একসঙ্গে চালাল অধিরাজ। ওই অবস্থাতেও তার মার একদম অভ্রান্ত ও মোক্ষম আঘাতটা একদম যথাস্থানে গিয়ে পড়েছে। দুষ্কৃতী ব্যথায় ‘আঁক’ করে কাতরে উঠল। পালটা মারের অভিঘাতে হাতের গ্রিপও স্খলিত। হাত ছুটে গিয়েছে। সেই সুযোগেই মুখের প্লাস্টিকের থলিটা একটানে খুলে ফেলে ঘুরে দাঁড়াল অধিরাজ। সারা মুখ, চোখ, নাক লাল হয়ে গিয়েছে! এবার কোনোমতে জোরে জোরে শ্বাস টানছে সে। ভীষণ একটা কাশির দমক কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। তবুও নিজেকে একরকম সামলে নিয়ে আক্রমণে গেল। এখন খুনি তার সামনে! একটা গুঁফো লোক, যার সঙ্গে আগের একটা হুলিয়ারও মিল নেই। এতটাই সাধারণ যে আলাদা করে চেনাও যায় না। কিন্তু নিঃসন্দেহে ইনিই তিনি। এই মুহূর্তে শহরের মোস্ট ওয়ান্টেড ‘বার্নিং শিখ’ ওরফে গুল্লু।

অধিরাজকে ওইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল সে। প্রচণ্ড রাগে ঠিকই করে ফেলেছিল, এই মানুষটাকে আজ সরিয়েই দেবে। হাতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সময় চলে যাচ্ছে। অথচ দুটো পরিবারের একজনকেও সে ছুঁতে পারেনি। চীনের প্রাচীরের মতো তার আর ওদের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই আই জি, হোমিসাইড! ও বুঝেছিল, এই প্রাচীরকে ভাঙতে না পারলে এই প্রথম তাকে ব্যর্থ হতেই হবে। তাই তার কাহিনি আজই শেষ করতে চেয়েছিল। নির্মমের মতো প্রায় মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দিয়েছিল। সামনা-সামনি পেরে উঠবে না বুঝেই পেছন থেকে অ্যাটাক করেছে। জানত, এটা কাপুরুষের কাজ। তবু, জীবন তাকে শৈশব থেকেই কাপুরুষ আর শয়তান হওয়ার শিক্ষাই দিয়েছে যে! যে শিক্ষা পেয়েছে, তেমনই তো কাজ করবে।

কিন্তু তখন কে জানত যে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী এভাবেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে?

সে তো নিশ্চিত ছিল ওই পজিশন থেকে কেউ বেঁচে ফিরতেই পারে না। তার বিশ্বাস কিছুটা সত্যিও হয়েছিল। আর কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখতে পারলে মৃত্যু অবধারিত ছিল। অথচ আশ্চর্য। যেভাবে উলটোদিকের মানুষটা যুদ্ধে ফিরল, গোটাটাই বুঝি অবিশ্বাস্য। মুহূর্তের ভুলে সে অস্ফুটে বলল, “সরতাজ!”

আর কিছু বলার আগেই মুখের ওপর জোরদার ঘুষি খেয়ে ছিটকে পড়ল বার্নিং শিখ। উঃ! ধারালো কিছুতে গালের একপাশটা বুঝি কেটে গেল। মানুষের হাতের আঙুল, কিংবা নখও এত ধারালো হয় না যে প্রস্থেটিকের নকল চামড়া ভেদ করবে। প্রস্থেটিক মেক-আপের দরুণ ক্ষতটা খুব গভীর হয়নি। কিন্তু কীসে লাগল সেটা পরমুহূর্তেই বোধগম্য হল। শত্রু তখনও হাঁফাচ্ছে, কাশছে। সেই ফাঁকেই ওর দু হাতের আঙুলে বড়ো আর চোখ ধাঁধানো হীরের আঙটি দুটো দেখতে অসুবিধে হল না। এই সামান্য আলোতেও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলছে! ওই হীরের আংটির খোঁচাতেই গাল কেটে গিয়েছে! আরও যদি কয়েকটা এরকম ঘুষি এসে পড়ে তবে হয়তো প্রস্থেটিকের মুখোশও তার আসল মুখকে আর ঢেকে রাখতে পারবে না। সব মাটি হয়ে যাবে… সব কিছু…!

সে মনে মনে প্রমাদ গুণল। এখনও বিপক্ষ নিজেকে ঠিকমতো গুছিয়ে নিতে পারেনি। চোকড হয়ে যাওয়ার কষ্টে এখনও হাঁফাচ্ছে, কাশছে। এই ফাঁকে পালিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অধিরাজের অবিন্যস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বার্নিং শিখ। তারপর একটা শব্দও খরচ না করে হাঁচোড় পাচোড় করে সোজা পিটটান! বুঝেছে, এখন বীরত্ব দেখাতে যাওয়া একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রতিপক্ষও জেদি ও শক্তিশালী।

তাকে ওভাবে পালিয়ে যেতে দেখে অধিরাজও আপ্রাণ ধাওয়া করল তাকে। হাঁপাতে-হাঁপাতেই কোনোমতে অর্ণবকে জানায়, “পাখি উড়ছে… গলির মুখ চলে এসো… ব্ল্যাক টি-শার্ট, গ্রে ট্রাউজার।”

অর্ণব তৈরিই ছিল। সে রিভলবারটাকে উঁচিয়ে ধরে উদ্বেগমিশ্রিত কণ্ঠস্বরে বলল, “আপনার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন স্যার?”

“চেজ… করছি।” অধিরাজ আসল কারণ চেপে যায়, “ওর পেছনেই আছি… হি ইজ এগেইন রানিং ইন জিগজ্যাগ ওয়ে… গলির মুখ থেকে দুশো মিটার দূরত্বে … ডোন্ট শ্যুট… প্রচুর মানুষ রয়েছেন এখানে… নো ডিসপ্যাচ… জাস্ট ব্লক দ্য ফিউজিটিভ।” অর্ণব আর কথা বাড়ায় না। শুধু বলল, “রজার।”

গলির মধ্যে ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় তখন আরও বেড়েছে। ওষুধের দোকানগুলোয়ও লাইন বাড়ছে বই কমছে না। রাস্তা ফাঁকা থাকলে দুশো মিটার দৌড়ে আসতে কত সময় লাগবে তা আন্দাজ করা সহজ হত। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে, বাধা অতিক্রম করে পাখি কতক্ষণে এসে পৌঁছোবে তা বোঝা মুশকিল। অর্ণব তবু একটুও বিচলিত না হয়ে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে থাকল। অন্তত দুটো প্রয়োজনীয় তথ্য সে জানে। খুনির ড্রেস ও তার দৌড়োনোর ভঙ্গি। এই দুটো জিনিস কমন পেলেই চলবে। স্যারের নির্দেশ স্পষ্ট। এর মধ্যে গুলি চালানো চলবে না। অপরাধীকে জ্যান্ত ধরতে হবে।

অন্যদিকে অধিরাজ প্রায় মারমার করে বার্নিং শিখের দিকে ছুটে যাচ্ছে। সে ওই ভিড়ভাট্টার মধ্যেও যতটা দ্রুত সম্ভব স্প্রিন্ট টানছিল। লেপার্ড যেমন অপূর্ব নমনীয় ভঙ্গিতে রাস্তার সব বাধাকে কখনও লাফিয়ে, কখনও বিদ্যুতের ছন্দে এড়িয়ে যায়, সে-ও তাই যাচ্ছিল। বার্নিং শিখের মনে হল, তার পেছনে কোনো মানুষ নয়, ওইরকমই কোনো দ্রুতগামী চারপেয়ে বন্য প্রাণী দৌড়োচ্ছে। অদ্ভুত বন্য মানুষ একটা। একমুহূর্তের জন্য ফের মুগ্ধ হয়ে আপনমনেই বলল, “বাঃ!” পরক্ষণেই তার মনে পড়ল, এ মানুষটা আদৌ বন্ধু নয়, বরং শত্রু। অগত্যা দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজের গতিবেগকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। যে করেই হোক, এখান থেকে বেরোতেই হবে। নয়তো নিস্তার নেই।

যারা ভাতের হোটেলে, বা ফাস্টফুডের দোকানে ভিড় করেছিল, তারা হঠাৎ দুটো লোককে হুড়মুড় করে দৌড়োতে দেখে ঘাবড়ে যায়। এক বেচারা দোকানি আলুকাবলি, ভেলপুরির ঠ্যালা নিয়ে ধীরে সুস্থে চলেছিল। বার্নিং শিখ তাকে ধাক্কা মেরে, তার ঠ্যালাটা রাস্তা ব্লক করার জন্য অধিরাজের দিকে সজোরে ঠেলে দিয়ে কেটে পড়ল। ভেলপুরী বিক্রেতা হাঁ হাঁ করে ওঠে। বেচারার সমস্ত সরঞ্জাম- মুড়ি, তেল, মশলা, লেবু, আর টকজল থেকে শুরু করে আলু, টম্যাটো, ধনে পাতা, কাঁচালঙ্কা, ছোলা মটরেরর মতো সব্জিও ওই ঠ্যালাতেই সাজানো। ধাক্কা খেয়ে তার বেশ কিছুটা মাটিতেই ছড়িয়ে পড়ে গেল। তার ওপর যে লম্বা টাওয়ার টর্নেডোর গতিতে ধেয়ে আসছে, সে-ও যদি আছড়ে পড়ে তবে আজকের পুরোদিনটাই মাঠে মারা যাবে। গরীব মানুষের একদিনের রোজগার চলে গেলে দিনযাপন বড়োই কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। সেই ভয়েই সে চেঁচিয়ে উঠল, “বাঁ-চা-ও! বাঁ-চা-ও। মেরি গাড়ি…।”

অধিরাজ যেন বার্নিং শিখের এই কাণ্ডের জন্য প্রস্তুতই ছিল। সবার বিস্মিত, ভয়ার্ত দৃষ্টির সামনেই সে বিদ্যুতের মতো এক মসৃণ লাফ মেরে গাড়িটাকে পেরিয়ে গেল। ভেলপুরীওয়ালা বুঝি শ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছিল। এবার একটু স্বস্তির শ্বাস নিল। অধিরাজ দৌড়োতে দৌড়োতেই মুখ ঘুরিয়ে কোনোমতে বলল, “স্যরি।”

আশেপাশের মানুষেরা কী রি-অ্যাকশন দেবে বুঝে পায়নি। তার মধ্যেও কেউ কেউ মোবাইলে রেকর্ড করছে এই দুটি মানুষের প্রাণপণ দৌড়। আদতে যে কী হচ্ছে তা কেউ বোঝেইনি। বরং হয়তো এটাকে কোনো রোডরেস জাতীয় কিছু ভেবে নিয়েছে। বার্নিং শিখ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখল, যে তার তৈরি করা বাধা অধিরাজ ব্যানার্জি অনায়াসেই অতিক্রম করে এগিয়ে আসছে। অদ্ভুত টিম এদের। প্রথমে ম্যাডামরা ছুটিয়ে মারলেন, এখন স্যারেরা হাত-পা ধুয়ে পেছনে পড়েছেন। কেউ ছেড়ে কথা বলছে না। সে ভয় পেলেও হাল ছাড়ল না। জানে, এই গলিতেই বরং ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কোনোমতে যদি একবার মেইন রোডে গিয়ে পড়তে পারে তবে কিছু-না কিছু ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।

“তোমার দিকেই স্ট্রেট আসছে…!” অধিরাজ ছুটতে ছুটতেই বলল, “আর একবার সারপ্রাইজ দিয়ে দাও।”

কথাটা শোনামাত্রই অর্ণব উদগ্রীব দৃষ্টিতে সামনের দৃশ্যটা মেপে নেয়। বিশেষ কষ্ট করতে হল না। একটু দূরেই ছুটন্ত ব্ল্যাক টি-শার্ট আর গ্রে ট্রাউজারকে দেখতে পেল। উল্কার বেগে ছুটে আসছে। তার পেছনেই অধিরাজের দীর্ঘ চেহারা। দু-জনের মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব নেই। কিন্তু মাঝখানে কিছু লোকের ভিড় আর লাইন পড়েছে বলে ডাইভ বা ফ্লাইং কিক মেরে উলটে ফেলাও অসম্ভব। অপরাধীকে আক্রমণ করতে গেলে ফালতু কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির আহত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেজন্যই সে চেষ্টাও করছে না। অর্ণব সামনে দিয়ে হামলা করার জন্য তৈরি হল। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার খেল খতম।

ধুরন্ধর আততায়ী তাড়া খেয়ে একদম কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো এলোপাথাড়ি দৌড়োচ্ছিল। সে ঠিক গলির মুখে চাউমিনের দোকানটার সামনে এসে একজন ক্রেতাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। মানুষটার হাত থেকে খাবারের প্লেটটা মাটিতে ছিটকে পড়েছে। আশেপাশের লোকজন ‘কী হচ্ছে… কী হচ্ছে’ করে ওঠে। অর্ণব ঠিক সেই মুহূর্তেই বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ে চেপে ধরেছে তার টি-শার্ট। হ্যাঁচকা টান মেরে সাইডে সরিয়ে এনে বলল, “অনেক দৌড়েছিস। এবার রেস্ট নে।”

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল অর্ণবের উপদেশ তার আদৌ পছন্দ হয়নি। অর্ণব সবিস্ময়ে দেখল ওর ডানহাতটা স্প্রিং এর মতো দ্রুত লাফিয়ে উঠে এসেছে একদম মুখের সামনে। সে কোনোমতে প্রাথমিক হিটটাকে ডজ করলেও তাকে বিন্দুমাত্রও সুযোগ না দিয়ে বার্নিং শিখ এবার বাঁ-হাতে তার চোয়ালে জোরাল একটা আপারকাট বসাল।

বাঁ-হাতেও কী মারাত্মক জোর! কোনো সন্দেহই নেই, সে সব্যসাচী। একমুহূর্তের জন্য অর্ণবের চোয়াল থেকে মাথা অবধি একটা তীব্র ব্যথার রেশ ছড়িয়ে পড়ল। সে কাতরোক্তি করে ওঠে, “ওঃ!”

বার্নিং শিখ এবার এক ধাক্কায় তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মেইন রোডে দৌড়োল। ততক্ষণে অধিরাজও এসে পৌঁছেছে। অর্ণবকে কিছু বলার বা জিজ্ঞাসা করার আগেই ওরা দু-জনেই সবিস্ময়ে দেখল ব্ল্যাক টি-শার্ট পরা খুনি একলাফ মেরে উঠে গিয়েছে একটি ফুল স্পিডে চলা চলন্ত বাসে। অর্ণব প্রচণ্ড রাগে বাসটাকে চেজ করতেই যাচ্ছিল কিন্তু তার হাত টেনে ধরল অধিরাজ। সে মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু। যেতে দাও। কতক্ষণ আর পালাবে!”

অর্ণব করুণ দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকায়। অধিরাজের চোখ, মুখ তখনও স্বাভাবিক হয়নি। ঘেমে নেয়ে একসা হয়েছে। এতটাই ঘামে ভিজেছে যে বলিষ্ঠ ও অসম্ভব সুগঠিত দেহরেখাও স্পষ্ট। দেখলে মনে হয়, এই শীতে তার পোষাকের ওপর কেউ জল ঢেলেছে। মাথার চুলগুলোর ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে। সম্পূর্ণ অবিন্যস্ত। এখনও হাঁপিয়ে যাচ্ছে! প্রশস্ত ও কবাট বুকের হাঁপরের মতো ওঠানামা স্পষ্ট। কোনোমতে বাঁহাত দিয়ে ডানহাতের ঘড়িটাকে ঠিক করছে। লজ্জায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। স্রেফ একটা ঘুষিতেই চিৎপাত হয়ে গেল! স্যার এত ঝুঁকি নিয়ে, এত কষ্টে তাড়িয়ে আনলেন লোকটাকে। একেবারে রসোগোল্লার মতো প্লেট থেকে প্রায় মুখেই তুলে দিয়েছিলেন বলতে গেলে। অথচ সে ধরতেই পারল না! মিথ্যাই পবিত্র আচার্যকে দোষারোপ করছিল। আদতে সে নিজেই একটি অপদার্থ।

“স্যরি স্যার।” অর্ণব মাথা নীচু করেছে, “মাই ফল্ট! হাতে এসেও ফসকে গেল!” অর্ণবের পিঠ আলগোছে চাপড়ে দেয় অধিরাজ, “ইটস ওকে অর্ণব। এখনও অনেক সুযোগ আসবে। আমি যদি ঠিক রাস্তাতেই ভাবি, তবে এখনও কিছু হয়নি। আর হবেও না। আসল শো তো সূর্যাস্তের পর শুরু হবে। রেডি থেকো। তখন দেখা যাবে।”

“তবে কি মিঃ চৌধুরীর পরিবার এখন সেফ?”

ক্লান্তভঙ্গিতে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেটের বাট আলতো কামড়ে ধরে মাথা নাড়ল সে, “না। ও আবার ফিরে আসতে পারে। যেমন অ্যান্টি শিখ রায়টের দুষ্কৃতীরা টানা বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে ফিরে ফিরে এসে আক্রমণ করছিল। ওই স্টাইলটাই ও নেবে। তবে এবার প্রণবেশদাকে বলো ওঁর টিম নিয়ে এসে এখানে পাহারা দিতে। বার্নিং শিখ যে হারে হোমওয়ার্ক করেছে, তাতে ও নিশ্চয়ই জানে যে প্রণবেশ লাহিড়ী ঠিক কোন্ লেভেলের এনকাউন্টার এক্সপার্ট। হসপিটালের বাইরে থেকে ভেতর অবধি যেন গোটা টিম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। একবার মিস্ বোসের কাছে তাড়া খেয়েছে। ওয়ার্ডবয়ের ছদ্মবেশ, নকল আইডেন্টিটি কার্ড আর ওর কাছে নেই। এত কম সময়ে নিশ্চরই একাধিক ইউনিফর্ম আর কার্ড জোগাড় করে বসে নেই। ওগুলো রেডি করতেও মিনিমাম একটা সময় লাগে। সুতরাং এবার তাকে আন-প্রিপেয়ার্ড অবস্থাতেই আসতে হবে। কনফিডেন্স কম থাকবে। প্রণবেশদাকে ঘুরঘুর করতে দেখলে আর চান্সই নেবে না। উনিও বসে বসে পাহারা দিয়ে বোর হয়ে গিয়েছেন। এনকাউন্টারের সংখ্যা বাড়ানোর চান্স পেলে খুশিই হবেন।”

“কিন্তু যদি লাহিড়ী স্যারকেও ঘুমের ওষুধ, ক্লোরোফর্ম বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে ইন-অ্যাকটিভ করে দেয়?”

অর্ণবের গলায় আশঙ্কা। বার্নিং শিখের কাণ্ডকীর্তির যা বহর দেখছে তাতে তাকে একটুও বিশ্বাস করতে পারছে না। সে সব পারে। যদি প্রণবেশ লাহিড়ীর খাবারে বা চায়ে ক্লোরোফর্ম বা সিগারেটে গাঁজা জাতীয় কিছু মিশিয়ে দেয়?

অধিরাজ এবার গোল্ড প্লেটেড লাইটারটা দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে হেসে ফেলল, “প্রণবেশদার হ্যাবিট সম্পর্কে তুমি জানো না? উনি নিজের টিমমেটদেরই বিশ্বাস করেন না! সবাইকে দড়ির ওপরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। মেয়েদের সঙ্গে রুড ব্যবহারের কথাটা যদিও আজই প্রথম জানলাম। কিন্তু এটা জানি, প্রণবেশদা বউদিকেও বিশ্বাস করেন না। উনিই একমাত্র পুরুষ যিনি বউয়ের সঙ্গেও ঝগড়ায় জেতেন। বাইরের খাবার একদমই খান না, পঞ্চাশটা ডাব্বায় করে নিজের খাবার আর ফ্লাস্কে চা নিয়ে ঘোরেন। এনকাউন্টার স্পেশালিস্টের শত্রু তো কম না। তাই প্রচণ্ড সাবধানী। প্যাকেট প্যাকেট সিগারেটও নিজের হাতেই কেনেন আর টানেন। ওঁকে কোনো খাবার অফার করতে গেলে বার্নিং শিখ নিজেই গুলি খাবে। সিগারেটে গাঁজা আর চায়ে ক্লোরোফর্ম তো…!”

বলতে বলতেই হঠাৎ স্থির হয়ে গেল সে। অর্ণব দেখল তার বাদামি দুই চোখ যেন দামি রত্নের মতো জ্বলজ্বল করছে, ঝিলিক দিচ্ছে। একবার বিমূঢ়ের মতো নিজের হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত ধূমায়িত স্টিকটার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অধিরাজ। পরক্ষণেই বিড়বিড় করল – “ক্লোরোফর্ম … গাঁজা।….. সিগারেট। মাই গড! মা-ই গ-ড। এটা আগে কেন মাথায় আসেনি! মা-ই গুডনেস!”

কী মাথায় আসেনি। সিগারেট-গাঁজা কিংবা ক্লোরোফর্মের মধ্যেই বা স্যার কী পেলেন তা অর্ণবের মাথায় ঢুকল না। সে কিছু বলার আগেই অধিরাজ অন্যমনস্কভঙ্গিতে তার কাঁধে আলতো হাত রেখে বলল, “অর্ণব। ইউ আর আ জিনিয়াস ইনডিড।”

অর্ণব আবার কী করল। সে নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “অ্যাঁঃ!”

“অফকোর্স ইউ আর আ জিনিয়াস…!” অধিরাজ ক্রমশই চিন্তার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে, “সব বুঝিয়ে দেব। কিন্তু আপাতত মিস চাউমিন বন্ডের বিলটা পে করতে হবে। সেই কখন থেকে উনি লোকটাকে শ্যাডো করে চলেছেন। রাস্তায় কতবার আছাড় খেয়েছেন তার ঠিক নেই। ওঁর জন্যই আজ চৌধুরী পরিবার বেঁচে গেল। এইটুকু তো করতেই পারি।”

“চাউমিন বন্ড!”

যদিও অর্ণবের দৃষ্টি দত্তকে কৃতিত্ব দেওয়াটা মোটেই পছন্দ হয়নি। এরকম অপদার্থ খবরি সে কমই দেখেছে। কিন্তু তবু তার নিকনেম শুনে অবাক না হয়ে পারল না। ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “চাউমিন কেন স্যার? ওটা তো খাওয়ার জিনিস?”

“জেমস যদি বন্ড হতে পারেন, তবে চাউমিন কী দোষ করেছে?” সে মুখ টিপে হাসছে, “ক্যাডবেরি জেমসও তো একধরনের ক্যান্ডি। কী যেন? জ্যায়াদা মস্তি, জ্যায়াদা চকলেটি, জেমস! সেটাও তো খাবারই। ওঁর আসল নামের চেয়ে চাউমিন বন্ড নামটাই আমার বেশি মনে থাকবে।”

অর্ণব মনের মধ্যে গরগর করলেও মুখে কিছু প্রকাশ করে না। কোথায় সুপার স্পাই জেমস বন্ড, আর কোথায় এই তোতলা খবরি! তুলনাই হয় না। তবু চুপচাপ কিছু না বলে সে-ও অধিরাজের পেছন পেছন ক্যাফের দিকেই গেল। কে জানে, আরও কী কী অর্ডার করেছে ওই মেয়ে! যেভাবে মহারানির মতো অর্ডার করছিল, তাতে গোটা ক্যাফেটাই না পেটায় নমঃ করে ফেলে। যে বেচারি অর্ডার নিচ্ছিল, তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল ক্যাফেতে বুঝি ডাকাত পড়েছে।

মিস ‘চাউমিন’ তখন আয়েশ করে বসে পেল্লায় হাঁ করে বার্গারে কামড় দিচ্ছিল। অধিরাজকে আসতে দেখেই গপাৎ করে মুখের গ্রাসটা গিলতে গিয়ে প্রথমে বিষম টিষম খেয়ে অস্থির হল। অধিরাজ তার মাথায় আলতো চাপড় মারতে মারতে বলল, “আস্তে… আস্তে সেনোরিটা। জল খাবেন?”

চাপড় খেয়ে ততক্ষণে দৃষ্টি একটু ধাতস্থ হয়েছে। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “জ…জ…জল তো আমি খাব। কিন্তু আপনি বিনা জল আর উইদাউট ক্যাটরিনা কাইফেই ‘টিপ টিপ বরসা পানি’র অ…অ..অক্ষয়কুমার হয়ে গেলেন কী করে ব…ব… বস?” অর্ণবও এবার পেল্লায় বিষম খেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *