(২৭)
আই জি, সি আই ডি, হোমিসাইডের কেবিনে এখন নিস্তরঙ্গ নিস্তব্ধতা। একের পর এক ইন্ডিয়া কিংসের শ্রাদ্ধ হচ্ছে। অ্যাশট্রে ক্রমশই ভরে উঠছে গুচ্ছ গুচ্ছ দগ্ধ সিগারেটের বাটে। টেবিলের ওপর কফির একগাদা কাপ। একটা ছাড়া বাকিগুলো শূন্যগর্ভ। কফির উগ্র গন্ধ আর সিগারেটের পোড়া তামাকের সুবাস মিলে মিশে একসা। কফির পাশে একটা প্লেটে কিছু স্যান্ডউইচ আর ডিমসেদ্ধও রেখেছিল অর্ণব। সেগুলো এখনও পর্যন্ত স্পর্শ করাই হয়নি। বরং সিগারেট আর কফি দিয়েই ব্রেকফাস্ট চলছে।
অফিসে ফেরার পর বিগত আধঘণ্টা ধরেই অধিরাজ একদম চুপ মেরে গেছে। তার দু-চোখে যথারীতি সেই আত্মমগ্ন দৃষ্টি। কোন চিন্তায় ডুবে আছে তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু কিছু যে বুঝেছে বা বুঝতে চাইছে তা ভঙ্গিতেই স্পষ্ট। মাঝেমধ্যে নিজের মনেই বিড়বিড় করে অস্ফুটে কিছু বলছে যা উদ্ধার করা দুঃসাধ্য। তার এই রূপ অর্ণবের এতটাই পরিচিত যে সে বাজি ধরে বলতে পারে, স্যান্ডউইচ আর ডিমসেদ্ধ-র কপালে আজ আর ওঁর পেটে ভ্রমণ করা লেখা নেই। ওরা ক্যান্টিনেই ফেরত গিয়ে অন্য রুট ধরবে।
একটু আগেই অবশ্য পবিত্র এসে খবর দিয়ে গিয়েছে যে মিস বোস এখন ঠিক আছে। ক্ষত গভীর হলেও প্রাণঘাতী নয়। বেশ কয়েকটা সেলাই পড়লেও ডিউটি ছাড়তে তার আপত্তি আছে। সে নিজের শুশ্রুষা করিয়ে, মিস অরোরার সঙ্গেই ব্যুরোয় ফিরছে। কৌশানী এ-ও জানিয়েছে যে লোকটা নিজের নাম ‘স্যাম’ বলেছিল। অধিরাজ তথ্যটা শুনে আদৌ অবাক হয়নি। বরং অন্যমনস্ক স্বরে বলেছে, “জানি। ওর ফেক আইডেন্টিটি কার্ডেও ওই নামটাই লেখা ছিল। স্যাম ত্রিবেদী।”
“স্যাম!” অর্ণব আমতা আমতা করে বলে, “ওটা তো মিস দত্ত-র কাজিন সিস্টারের নিকনেম বোধহয়। মিস্ দত্ত একবার বলেছিলেন যে স্যাম আপনার খুব ফ্যান!”
“মিস দত্ত-র কাজিন সিস্টার একখানা মোচ গজিয়ে বার্নিং শিখ সেজে অটোগ্রাফ নিতে এসেছিলেন বলছ? না খোদ বার্নিং শিখ মিস দত্ত-র কাজিন সিস্টার সেজে বসে আছে?” সে উদাসীন স্বরে জবাব দেয়, “দুটোই বোধহয় অসম্ভব ব্যাপার। যাক গে, তোমরা দু-জনেই তো সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলে। হায়ার সেকেন্ডারিতে বায়োলজি ছিল। কখনও খোলা আকাশের নীচে ব্যাঙ কেটেছ?”
“ব্যাঙ!” অর্ণব আকাশ থেকে পড়ে, “সে তো বায়োলজি ল্যাবেই কেটেছি। এমনকি প্র্যাকটিক্যালের সময়ও ল্যাবেই কাটতে হয়েছে। ওপেন তো কখনও কাটিনি। সে সুযোগ কখনও হয়নি।”
“ধুর ব্যাঙ!” পবিত্র বিরক্ত, “এটা কী জাতীয় প্রশ্ন? বলতে কী চাও? এখন ব্যুরোর ছাতে গিয়ে ব্যাঙ কাটব? তাছাড়া এই শীতে ব্যাঙ আসবেই বা কোথা থেকে? বর্ষাকাল হলে তবু পুকুরের ধার থেকে গোটা দুয়েক ধরে আনতে পারতাম। চায়না টাউনের কিচেনে খোঁজ করব?”
“বুঝলাম।” সে আপনমনেই টেবিলের ওপর পেপারওয়েটটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “তুমি কতদিন বাড়ি যাওনি পবিত্র? বউদি ঠিক কতদিন ধরে তোমার বিরহে কাঁদছেন?”
“ব্যাঙের সঙ্গে আমার বউয়ের আবার কী সম্পর্ক। যাত্তারা! হ্যাঁ, দু-জনেই কানের কাছে গলা ফুলিয়ে গ্যাঙরগ্যাঙ করে ঠিকই। তবু ব্যাঙের একটা নির্দিষ্ট মরশুম আছে। বউ তো টোয়েন্টিফোর সেভেন অন। ব্যাঙকে ‘হুশ হুশ’ করে তাড়ালে পালিয়েও যাবে। বউকে ‘হুশ হুশ’ করে দেখো, শিল নোড়ার বাড়ি মেরে বেহুঁশ করে দেবে।” অফিসার আচার্য এবার বিমর্ষমুখে বলল, “তাছাড়া আমার বউ কাঁদবে কেন? প্রেমিক-প্রেমিকা বিয়ের আগে একে অপরের জন্য কাঁদে। আর বিয়ের পর একে অপরকে কাঁদায়। ও তুমি বুঝবে না। তোমার বউদি কতদিন কেঁদেছেন জানি না, তবে আমি কতদিন কাঁদিনি তা বলতে পারি।”
“নাঃ। তা বুঝব না ঠিকই।” সে অদ্ভুত সুন্দর গ্রীবাভঙ্গি করেছে, “তাহলে এক কাজ করো। সূর্যাস্ত অবধি তোমার আপাতত তেমন কোনো কাজ নেই। আজ কয়েকঘণ্টার জন্য বউদিকে সারপ্রাইজ ভিজিট দিয়েই এসো। রাতেও হয়তো বাড়ি ফিরতে পারবে। কিন্তু তখন আর পরস্পরকে কাঁদাবার এনার্জি থাকবে না বলেই আমার ধারণা।”
“বাড়ি যাব!” পবিত্র হতবাক, “কিন্তু এদিকের ব্যবস্থা কী হবে? প্রণবেশদাও তো হসপিটাল পাহারা দিতে গেলেন। মিস্ বোস, মিস্ অরোরা এখনও এসে পৌঁছোননি। মিস্ দত্তও তো একা কুম্ভ হয়ে ভূপেন্দ্র দত্তা-র বাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। ব্যাক আপ নেই। এই পরিস্থিতিতে আমি বাড়ি ফিরি কী করে?”
“কিছুক্ষণ পরে মিস্ বোস আর মিস্ অরোরা দু-জনেই চলে আসবেন। ততক্ষণ তুমিই না হয় প্রণবেশদার জায়গায় মোতায়েন থাকো আর মিস্ দত্তকে ব্যাক আপ দাও, মিস্ বোস এলে তোমার এ বেলার জন্য ছুটি।” অধিরাজ দুষ্টু হাসল, “তারপর বউদিকে চাঁদমুখ দেখিয়ে এসো মামা। সঙ্গে গোলাপের বোকে নিয়ে যেতে ভুলো না। আর অর্কিড দিয়ে সাজানো সারপ্রাইজ কেক। বলো তো বুক করে দিই।”
“ওকে।” পবিত্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে দুঃখ দুঃখ মুখ করেছে, “অ্যাজ ইউ উইশ। করে দাও। কিন্তু ‘মামা’ বোলো না বস! বড়ো প্রাণে লাগছে আজকাল ওই শব্দটা শুনলেই। বাড়িতেও মামা, এখানেও মামা।”
চায়না টাউনের কিচেনে ব্যাঙ থাকে শুনে অর্ণব মর্মান্তিক চটেছিল। এবার ‘মামা’ শব্দের প্রতিক্রিয়া দেখে অতিকষ্টে হাসি সামলাল। সিনিয়রদের সামনে হো হো করে হাসা উচিত নয়। নয়তো নির্ঘাত হেসে ফেলত। বেশ হয়েছে। বউদি নির্ঘাত অফিসার আচার্যকে বাঁশ দেওয়ার জন্যই ছেলেকে এসব শেখাচ্ছেন। মিসেস আচার্যও কিছু কম যান না। ডক তো রাজশ্রী বউদিকে বিশেষ পছন্দ করেন। একবার অধিরাজকেই বলেছিলেন, “রাজশ্রী খুব মিষ্টি মেয়ে। অবিকল আমার মতো।”
কথাটা শুনে পরে অধিরাজ ফিশফিশ করে অর্ণবকে বলেছিল, “রাম… রাম… রাম। বউদি ডকের মতো মিষ্টি। বুঝেছ তো? শুনেই আমার সবকটা হাড় কেঁপে গেল।” সুতরাং রাজশ্রী বউদির পক্ষে এরকম দুষ্টুমি অসম্ভব নয়। পবিত্র আচার্যকে জব্দ করার মতো কোয়ালিটি নিঃসন্দেহে ডকের মিষ্টি ফিমেল ভার্সানটির আছে। অধিরাজও এবার হেসে ফেলে, “তা ঠিক খুড়ো। প্রেমিকার ছেলেও মামা বললে এত দুঃখ হয় না, যতটা নিজের বউয়ের ছেলে বললে হয়। এখন থেকে তবে খুড়ো, বস্, ব্রো, গুরু—এসবই ডাকব। মামা একদম নয়।”
“মনে থাকে যেন।”
ব্যাজার মুখ করে পবিত্র বিদায় নিল। এখন তাকে আর্বানায় গিয়ে মিস দত্তকে ব্যাক-আপ দিতে হবে। কৌশানী ফিরে এলে তবেই তার ছুটি। সে চলে যেতেই অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকায়, “তোমারও যদি মিস দত্তের হাতের স্পেশাল চা খাওয়ার ইচ্ছে হয় তবে পবিত্র-র সঙ্গে যেতে পারো। একদমই বারণ করব না। এই মুহূর্তে আমাদের হাতে কোনো কাজ নেই। ওদিকে যা করার প্রণবেশদা করবেন। আর করবে বিশ্ব। যদি রমানাথ চক্রবর্তী চিরঞ্জীব জয়সওয়ালকে পটিয়ে পাটিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর রেকর্ডিংগুলো যথাসময়ে পাঠাতে পারেন তবেই। আমার এখন একটাই ইম্পর্ট্যান্ট কাজ। স্রেফ ভাবা।”
কথাটা শুনেই অর্ণব ভয়ে ভয়ে চোরের মতো আড়চোখে বসের দিকে তাকায়। এখন মিস্ দত্ত-র হাতের চা পেলে মন্দ হত না। মনে মনে সেই কথাই ভাবছিল। কিন্তু স্যার কী করে বুঝে ফেললেন?
“ওই বম্বাস্টিক আই সাইড আমায় দেখিও না।” অধিরাজ বলল, “গোয়েন্দাগিরি আমার শখ নয়, পেশা। এর জন্য খোদ সরকার আমায় মোটা পে প্যাকেজ দেয়। কে কার হাতের চাউমিন, চা আর কুকিজ খেয়ে ধন্য হচ্ছে তা খুব ভালোভাবেই জানা আছে। কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয় অর্ণব। প্রশ্ন হল, স্পেশাল চায়ে স্পেশাল ঠিক কী আছে?”
“মানে?” সে প্রশ্নের মর্মার্থ বুঝতে না পেরে আমতা-আমতা করে বলে, “উনি সত্যিই ভীষণ ভালো চা বানান।”
“বটে?” তার একটা ভুরু ফের উঠে গিয়েছে, “উনি আর কী কী ভীষণ ভালো করেন অর্ণব?”
“কে? মিস দত্ত?” অর্ণব এবার চিন্তায় পড়েছে, “মিস দত্ত ভীষণ শান্ত ঠান্ডা। খুব ঘরোয়া। খুব সুন্দর ঘর গোছাতে পারেন। আর রান্নার হাতও চমৎকার। যে কোনো কুইজিন ফটাফট বানিয়ে ফেলতে পারেন। আর ওর ড্রেসিং সেন্সও খুব ভালো।”
“ক্কীঃ!” অধিরাজের চোখ কুঁচকে যায়। সে বিস্মিত স্বরে বলল, “এইগুলো ওঁর স্পেশ্যালিটি?”
“হ্যাঁ।” সে একটু ঘাবড়েই যায়, “নয়তো আর কী?”
“গ-শ!” অধিরাজের সুন্দর মুখে এবার যেন একটু বিরক্তির ছোঁয়া, “কা-ম অ-ন! শি ইজ আ কপ্! তোমার মতো, আমার মতো একজন রক্ষক। শেষে এই স্পেশ্যালিটিটাই চোখে পড়ল? স্পেশাল চা? মিস্ আত্রেয়ী দত্ত একজন দুর্দান্ত স্প্রিন্টার অর্ণব। ন্যাশনালে ওমেনস চারশো মিটারে গোল্ড মেডালিস্ট। ইন্টারন্যাশনালে যাননি, কারণ তোমার আমার মতোই রানার হওয়ার থেকে পুলিশ হওয়ার ভূত মাথায় বেশি চেপেছিল। শি ইজ আ হাই ক্লাস ব্ল্যাক বেল্ট অলসো। ট্রেনিং পিরিয়ডে ওঁর রেকর্ড দেখার মতো ছিল। শ্যুটিং স্কিলও যথেষ্ট ভালো। ওসব যদি বাদও দাও, ম্যাথমেটিকসে ফার্স্টক্লাস নিয়ে এম.এস.সি. করা তোমার সহজ কাজ মনে হয়? শি ইজ আ ব্রিলিয়ান্ট পার্সন! চুপচাপ থাকেন, শান্ত-নিরীহ, কিন্তু তোমার আমার থেকে অনেক বেশি দেখেন, শোনেন ও বোঝেন। সাইলেন্ট অবজার্ভার। ওঁর মধ্যে আমি মিস মার্পলের সমস্ত গুণগুলো দেখতে পাই। মিস্ অরোরা বা মিস্ বোসের মতো অ্যাগ্রেসিভ নন, কিন্তু তীক্ষ্ণ শাণিত মস্তিষ্কটিকে অগ্রাহ্য করা যায় না। তার ওপর চমৎকার গুছিয়ে কথা বলেন। আজ পর্যন্ত আমি ওঁর কাছে যতটুকু এক্সপেক্ট করেছি, উনি তার থেকে বেশিই দিয়েছেন, নিরাশ করেননি। এখনও বার্নিং শিখের মতো মারাত্মক ক্রিমিনালের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এগুলো তোমার চোখে পড়ল না? নাকি জানতেই না?”
অর্ণব একটু অপ্রতিভ হয়। আত্রেয়ী সম্পর্কে এত কথা স্যার জানেন। অথচ আজ পর্যন্ত সে নিজে কখনও অর্ণবকে বলেনি। সে একটু চুপ করে থেকে বলে, “আমি কী করে জানব স্যার? মিস্ দত্ত আমায় কখনও বলেননি৷”
“মিস্ দত্ত খামোখা বলেই-বা বেড়াবেন কেন? ওঁর ফাইলেই তো সব লেখা আছে সার্টিফিকেট সমেত। তুমি জুনিয়রদের ফাইল, তাদের স্পেশালিটি পড়ে নাও না?
আমিও তো বলে বেড়াই না যে আমি কী কী করতে পারি। তুমি কি জানো সেগুলো?” “আপনি চমৎকার গান গাইতে পারেন। গিটার, স্প্যানিশও দারুণ বাজান। কোবিয়া কেসের সাসপেক্টকে শোনালেন, কিন্তু আমাকে কখনও শোনাননি।” একটু অভিমানে তার ওষ্ঠাধর স্ফূরিত, “সেদিন নিজের কানে না শুনলে জানতেও পারতাম না যে আপনি রীতিমতো প্রোফেশনালদের মতো গেয়ে থাকেন।”
“এটা আমি বলিনি। কিন্তু তুমি জেনেছ। কারণ সামনা-সামনি দেখেছ। তবে কর ইয়োর কাইন্ড ইনফর্মেশন, শুধু গিটার নয়, যে কোনো তারের যন্ত্র বা স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্ট আমি বাজাতে পারি। ওটা আমার মা, মানে প্রিন্সেসের গুণ। ওঁর কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ও শেখা। এটা বলেই দিলাম।” অধিরাজ একটু থেমে বলে, “কিন্তু তুমি কি মিস দত্তকে কখনও স্প্রিন্ট টানতে দেখোনি? ফায়ার করতে দেখোনি? একবারও ওর পুলিশি মূর্তি দেখোনি? অতন্দ্র পাহারায় থাকতে দেখোনি? সেগুলো কি সব মিস করেছ? রান্নাটাই দেখলে? আর রান্নারই বা কী আছে? ছুটির দিন তুমি সকালে যদি বাড়িতে চলে আসো তবে আমাকেও নানারকমের ক্যুইজিন রান্না করতে দেখবে। একা মিস্ দত্ত নয়, ও কাজটা আমিও পারি। তবে কি তুমি আমায় শেফ বলবে?”
এবার অর্ণবের চক্ষু চড়কগাছ। স্যার আর কুকিং। সে বিস্ময়ের ধাক্কায় তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আ-আ-আপনি রান্না ক-করেন!”
“অফকোর্স। তার প্রমাণও তুমি পেয়েছ।”
“প্রমাণ? কীভাবে?”
“চোখে দেখে এবং চেখে দেখে।” অধিরাজ চোখ সরু করেছে, “এই কেসটা আসার দু-সপ্তাহ আগে রবিবারের লাঞ্চে দই কাতলা, ইলিশের পাতুরি, আর কচি পাঁঠার ঝোল খেয়ে তো উলটে পড়েছিলে। প্রিন্সেসকে কমপ্লিমেন্টেও ঢেকে দিলে। জানতেও চাইলে কোমরে ওরকম বেল্ট পরে এত কিছু রান্না করল কী করে? তোমার একবারও মনে হয়নি যে কোমরে অত কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে ঠায় উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে একটা লোক রান্নাই করতে পারে না?”
“তবে ওগুলো…!”
এবার অর্ণবের মনে পড়ল ওর প্রশংসা শুনে অধিরাজের মা, তথা ‘প্রিন্সেস’ কেমন যেন আমতা আমতা করছিলেন। অবিকল চোরের চাকরের মতো অপ্রতিভ হচ্ছিলেন। আর পপসি, তথা বাবা মুচকি মুচকি হেসে রহস্যময়ভাবে খুকখুক করে কাশছিলেন। তখন ব্যাপারটা বোঝেনি। এতক্ষণে বুঝল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল তার মাথায় ইন্দ্র সোজা বজ্রটাই ছুড়ে মেরেছেন। সে কোনোমতে বলে, “আপনি রেঁধেছিলেন? আপনি তো মিস্ দত্তকেও হার মানাবেন স্যার। আর আমি গবেটের মতো কাকিমাকে দ্রৌপদী বলে এলাম!”
“একা দ্রৌপদী নয় অর্ণব। ভীমও দুর্দান্ত রান্না করতেন।” অধিরাজ সখেদে মাথা নাড়ল, “সেটাই তোমাদের মনে থাকে না। রান্নাটা নিঃসন্দেহে আর্ট। ওটাকে ছোটো না করেই বলছি, তুমি কি এরপর আমাকেও মিস্ দত্তের মতো গ্রেট শেফ-কপ্ উপাধি দেবে? দ্রৌপদী চমৎকার রান্না করতেন, কিন্তু বিরাট রাজের রয়্যাল কুক ছিলেন ভীম। একটা রাজবাড়ির হেঁশেল সামলাতেন তিনি। রাজাদের টেস্টবাডকে খুশি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। ভীম ‘বল্লভ’ ছদ্মনামে সেটা করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তার মানে, রান্নাটা হয় তিনি দ্রৌপদীর সমানই জানতেন, অথবা তার থেকেও ভালো। অথচ কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার সময়ে তুমি প্রিন্সেসকে ‘রান্নায় দ্রৌপদী’ বলে এলে। ভীম বললে না কেন অর্ণব?”
অর্ণব তখন প্রায় খাবি খাচ্ছে। এই সামান্য একটা কথার পেছনে যে স্যার একেবারে গোটা মহাভারত এনে ফেলবেন তা কে জানত। সে ইতস্ততঃ করে বলে, “ইয়ে… মানে…!”
“মানে একটাই। ভীম যতই চমৎকার রান্না করুন, আর অর্জুন যতই ভালো নৃত্যশিক্ষক হোন—দিনান্তে ওঁরা পুরুষ। তাই মধ্যম ও তৃতীয় পান্ডবের আসল পরিচয়, ওঁরা বীর। আর যেহেতু দ্রৌপদী নারী, তাই তিনি যতই ধৃতরাষ্ট্রের সভায় দাঁড়িয়ে নিজেকে পাঁচজন মহান ও বীর স্বামীর চেয়েও বেশি বুদ্ধিমতী, যুক্তিবাদী ও বীরাঙ্গনা প্রমাণ করুন, যতই দেখা যাক যে তিনি অবলা নন-জয়দ্রথ আর কীচকের মতো ষাঁড়কে একধাক্কায় উলটে ফেলেছিলেন, রীতিমতো বাগ্মী, জ্ঞানী কিংবা যতই অগ্নিসম্ভূতা হন—শেষপর্যন্ত তিনি শ্রেষ্ঠ রাঁধুনীর শিরোপাই পাবেন। হাউ টিপিক্যাল! আমিও একজন পুলিশ অফিসার, মিস্ দত্তও তাই। আমাকে তোমরা হিরো বলো, আর মিস্ দত্ত চা-ওয়ালি? এটা কী ধরনের বিচার হল?”
অর্ণব অবনতমুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কী বলবে বুঝে পায় না। সে স্যারের মতো করে ভাবতে পারে না। সারাজীবন যা দেখেছে, সেটাই তার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী বলতে সে সিগারেট বা চুরুট ফোঁকা রণচণ্ডীকে মেনে নিতে পারে না। যে নারী নিজের মুখে পুরুষের সামনে এসে তাকে নিজের ভালোবাসা বা কামনার কথা জানায় তাকে তার নির্লজ্জ বলে মনে হয়। বিড়ালের মতো নারী সে মানতে পারে, কিন্তু ঘোড়ার মতো দামাল নারীদের দেখলে অস্বস্তি হয়। নিজের বাড়িতেও আজীবন মা, কাকিমা, জেঠিমাদের মধ্যে শান্ত গৃহলক্ষ্মীর মূর্তিই দেখেছে। যাদের নেশা বলতে বড়োজোর জর্দা, দাঁত মাজার তামাক কিংবা পান সুপারি। যাদের গা থেকে সর্যের তেল আর হলুদের গন্ধই আসে। যারা পাঁচালি পড়েন কিন্তু শেক্সপীয়র পড়েন না। এমন নারীই যদি তার কাছে আদর্শ হয় তাতে অন্যায় কী?
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ণবের মধ্যে কিছু সোশ্যাল ট্যাবু আছে তা তারও অজানা নেই। তার সমস্ত দোষ-গুণ সমেতই ওকে ওর মতো করেই গ্রহণ করেছে, ভালোবেসেছে। বুঝিয়েছে, তবে কোনোভাবে পালটানোর চেষ্টাই করেনি। আগেও কয়েকবার অর্ণবের মেল শভিনিজম তার চোখে পড়েছে। নম্রভাবে বোঝালেও মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এবার সেটা যেন বড়ো বেশিই কেসটার ওপর প্রভাব ফেলছে। সে আস্তে আস্তে বলল, “তোমার মিস চাউমিন বন্ডকেও বোধহয় পছন্দ হয়নি, তাই না?”
এবার অর্ণব মরিয়া, “কাম অন স্যার! ওই পুতুলের মতো মেয়ে ইনফর্মার? ইনফর্মারদের কত কিছু জানতে হয়। উনি মারাত্মক খুনিদের স্টক করবেন? তাদের খবর তুলে আনবেন? যে কথায়-কথায় আছাড় খায় আর তোতলায়? উনি ‘ডর’ ফিল্মের শাহরুখের মতো ‘ক্…ক্… কিরণ’ করতে-করতে যতক্ষণে খুনি সম্পর্কে একটা খবর দেবেন ততক্ষণে আরও চার পাঁচটা খুন হয়ে যাবে। আর কেউ যদি আক্রমণ করে? ওঁর জন্যই তো চার-পাঁচটা বডিগার্ড মোতায়েন রাখতে হবে। তার ওপর যাতে আছাড় না খান সেটার জন্য বেবিসিটার এক্সট্রা। এরকম খবরি কোন্ কাজে লাগবে?”
“এমন খবরিই তো বাজি মাত করে।” সে মৃদু হাসল, “তুমি আছাড় আর ধাক্কা খাওয়াটাই দেখলে? আমি যখন ওঁকে ধরেছিলাম তখন ওঁর কপালে ঘামের বিন্দু দেখেছি অর্ণব। ইসমাইল আর রকির মতো মারাত্মক ধুরন্ধর ইনফর্মারকে যে অত সহজে স্বর্গে ডিপোর্ট করে দেয়, সেই মারাত্মক খুনিকে উনি সেই ভোর থেকে স্টক করেছেন। আঠার মতো সেঁটে আছেন অথচ বার্নিং শিখের মতো ধুরন্ধর লোক টেরও পায়নি! এমনকি সে হসপিটালে ঢোকার পর গোটা এলাকা ঘুরেও দেখেছেন। কতখানি পরিশ্রমী হলে ও উপস্থিত বুদ্ধি থাকলে লোকে এ কাজ করে! আর তুমি বলছ ওঁকে দিয়ে কাজ হবে না?”
“গোটা এলাকা ঘুরে দেখেছেন কী করে বুঝলেন?”
“নয়তো জানলেন কী করে যে বার্নিং শিখ যে গলিটায় ঢুকেছে, সেটার শেষে স্রেফ ডেড-এন্ড?” অধিরাজ মুচকি হাসল, “উনি জ্যোতিষী নন যে জানবেন যে বার্নিং শিখ তাড়া খেয়ে ওই গলিটাতেই ঢুকবে। আর দেখলেই তো, নিজে চেজ করতে গিয়ে মাঝরাস্তাতেই উলটে পড়লেন। তবে মিস চাউমিন জানলেন কী করে যে গলিটার ও প্রান্তে ডেড এন্ড ছাড়া কিছু নেই। আগেই চারপাশটা দেখে না নিলে বলতে পারতেন না। ভেরি ভেরি ইন্টেলিজেন্ট অ্যান্ড ইম্প্রেসিভ!”
“ইম্প্রেসিভ অন হোয়াট সেন্স?” সে বিরক্ত, “ওঁকে দেখলে কোন্ দিক দিয়ে পোটেনশিয়াল ইনফর্মার মনে হয়? টিপিক্যাল আনস্মার্ট, বাচ্চা বাচ্চা হাবভাব। সবকিছু ভন্ডুল করতে ওস্তাদ। এরকম খবরি দেখলে ক্রিমিনালরা হাসবে। উনি র্যাম্পেই ঠিক আছেন। এখানে মানায় না।”
“সব কিছুই তুমি দেখে বিচার করবে?” অধিরাজ হাসল, “তুমি নিজেই তো আবার কবি। উর্দু শায়েরি লেখো, পড়ো। কেউ তোমার আড়ংধোলাই দেখলে বলবে ইনিই আবার গালিবের শিষ্য? তোমার মধ্যে যদি বা একটু কবি কবি লুকও থাকে, আমায় দেখলে কেউ বলবে যে রং তুলির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে?”
বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের আঘাতে অর্ণব থ। রং তুলির সঙ্গে সম্পর্ক? অধিরাজ ছবি ভালোবাসে সে জানে। ওর বেডরুমে প্রচুর অপূর্ব অপূর্ব নেচারের পেইন্টিং দেখেছে। পোর্ট্রেটও দেখেছে যেগুলো দেখলে মনে হয় যে কোনো প্রোফেশনাল নামজাদা আর্টিস্ট এঁকে দিয়ে গিয়েছেন। সে মুক্তকণ্ঠে ছবিগুলোর প্রশংসাও করেছে। কিন্তু শিল্পীর নাম খেয়াল করেনি। খেয়াল তো দূর, শিল্পীর নামই বোধহয় ছিল না। তার মনে এবার সন্দেহ জাগে। তবে কি…!
অধিরাজকে প্রশ্ন করতেই সে হেসে ফেলল, “ধরেছ ঠিকই। ওটা আমার টাইমপাসের আরও একটা মাধ্যম। আমার মামা নামজাদা আর্টিস্ট ছিলেন। জিনটা রক্তে রয়েছে। নয়তো কোন পিকাসো আমার বেডরুম ছবিতে সাজিয়ে দেবেন? এখন অবশ্য পপসি পিকাসোর সঙ্গে ফুল-লতা-পাতাও আমদানি করেছেন। আমি অফিসে বসে ঝটপট ছবি আঁকতে পারি না বলে, একেবারেই পারি না-তা সঠিক নয়। যে হাত রিভলবার ধরে, মারপিট করে, সেই হাতই স্প্যানিশ, গিটার, এস্রাজ, ভায়োলিন, সেতার ধরে, হাতা খুন্তিও ধরে, রং-তুলিও ধরে। কিন্তু সেটা কি তুমি আমায় দেখে বুঝতে পারো? না আমি বলতে গিয়েছি?”
অর্ণব কী বলবে ভেবে পায় না। সে নিজের প্রকাশের সমস্ত ভাষাই বুঝি হারিয়ে ফেলেছে। তবু গোঁয়ারের মতো বলল, “কিন্তু স্যার, ওই মডেলের মতো নরম সরম মেয়ে…।”
“দেখতে সুন্দরী ও নিরীহ জাপানি পুতুল বলেই উনি অসম্ভব পোটেনশিয়াল খবরি অর্ণব। ভদ্রঘরের মেয়ে, স্টুডেন্ট, ওয়েল এডুকেটেড, বুদ্ধিমতী তার ওপর ওঁর যে কোয়ালিটিগুলোকে তুমি নেগেটিভ ভাবছ, ওগুলোই সবচেয়ে বড়ো প্লাস পয়েন্ট। তুমি সি.আই.ডি. হোমিসাইডের একজন ঘুঘু অফিসার হয়েই ওঁকে একজন ইনফর্মার হিসেবে কল্পনাও করতে পারছ না।” অধিরাজ ঠোঁট টিপে হাসে, “বার্নিং শিখ-ও ওঁকে স্পট করতে পারেনি সম্ভবত ওই আনস্মার্ট হাবভাবের জন্যই। তোমার কি মনে হয়? বড়ো বড়ো হিস্ট্রিশিটার কিংবা তুখোড় ক্রিমিনালরাও মিস বন্ডকে খবরি হিসেবে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করবে? ইভেন ওঁর তো কাউকে স্টক করারও দরকার নেই। অমন ফুটফুটে নিষ্পাপ তরুণী দেখলে মদন বা কার্লোসের মতো চরিত্রের আর্চ ক্রিমিনাল বা গ্যাংস্টাররাও বলবে, ‘এত কষ্ট করে হাঁটবেন কেন সেনোরিটা? ইয়ে হসি পৈর জমি পে মতো ডালিয়েগা। মৈলা হো যায়েগা। আসুন আমিই আপনাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।’ যে-কোনো কেসে উনি আমাদের তুরুপের তাস হতে পারেন। সেটা আমি বুঝতে পারছি। কারণ আমি ওঁকে দেখে বিচার করিনি। দেখেই যদি মানুষকে বিচার করা যেত তবে আমাদের এম কে স্তালিন আর এ পি জে আবদুল কালাম জেলে থাকতেন। শ্রীপ্রকাশ শুক্লা বা দাউদ ইব্রাহিম দেশের রাষ্ট্রপতি হত। স্টিফেন কিং জঙ্গী হতেন আর আজমল কাসভ বিশ্ববিখ্যাত শায়র।” ,
অর্ণব এর বিপক্ষ কোনো যুক্তি খুঁজে না পেলেও ঠিক ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে না। একটা ভদ্রঘরের মেয়ে শেষে কিনা গ্যাংস্টারের পেছনে খবরিগিরি করে বেড়াবে। রাত-বিরেতে তাদের সঙ্গে বা পিছু পিছু ঘুরবে। একজন পুরুষ যা পারে, একজন মেয়ে কি তা পারে? স্যার ভুল ঘোড়ার ওপরে বাজি রাখছেন না তো।
“আর রইল সেলফ ডিফেন্সের কথা।” অধিরাজ আপনমনে সিগারেট বের করে আনতে আনতে বলে, “ওটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমি বেশ কিছু অথেন্টিক মার্শাল আর্ট অ্যাকাডেমির খোঁজ জানি। আচ্ছা করে মিক্সড মার্শাল আর্ট আর কালারিপায়াত্তুর ডেডলি কম্বিনেশন গুলিয়ে খাইয়ে দেবে ওরা। মিস্ বন্ড একাই একশো হয়ে দাঁড়াবেন। কোনো বডিগার্ড লাগবে না। যদিও ওঁর তোতলানো আর আছাড় খাওয়ার দুরারোগ্য ব্যাধি তাতে যাবে না। তবে ও দুটো থাকলেও কোনো অসুবিধে নেই। তুমি ওঁর চিন্তা ছাড়ো। বরং এক কাজ করো। বিশ্বকে একটু ফোন করে দেখো যে দরকারি ফাইলগুলো এল কিনা।”
তারপর থেকেই সে নির্বিকল্প সমাধি নিয়েছে। অর্ণব তাকে আর বিরক্ত করেনি। সে জানে, লোকটা যখন ভাবে তখন তাকে ডিস্টার্ব করা একেবারেই উচিত নয়। তাই আর একটুও ঘাঁটায়নি। তাছাড়া সময় এখন শেষের পথে যাচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত অমূল্য। সেইজন্য সে আর কথা বাড়ায়নি। বরং নিয়মিত প্রণবেশ লাহিড়ীর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট রাখছে। ওদিকে বিশেষ কোনো আপডেট নেই। তবে এতদিনে একটু অ্যাকশন করার সুযোগ পেয়ে তিনি মহানন্দে হাত-পা ঝাড়া দিচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, বার্নিং শিখ অবশেষে এনকাউন্টারেই মরবে।
বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো খবরাখবর নেই। বিশ্বজিতের কাছে এখনও রমানাথ চক্রবর্তীর তরফ থেকে কোনো মেইল আসেনি। সে নিজেও ওই বিশেষ মেইলটির অপেক্ষাতেই বসে আছে। আর লাগাতার জগদীপ সিং ভাট্টিকে ট্র্যাক করে চলেছে। মেইল এলেই জানাবে। ভাট্টিসাহেব আপাতত নিজের পার্টনারের সঙ্গে বিজনেস রিলেটেড ভাট বকছেন। কেঁউমেউ করে আর্গুমেন্টও করছেন। দাঁতের ব্যথা অনেকটাই কমেছে হয়তো। ‘নাশতা ও করেছেন। ওদিকেও সন্দেহজনক কিছু নেই।
এর ঠিক ঘণ্টাখানেক পরই খবর এল যে মিস্ বোস ব্যুরোয় না এসে আপাতত ডাইরেক্ট আর্বানায় পৌঁছে গিয়েছে। পবিত্র-র কাছ থেকে চার্জ বুঝে নিয়ে কৌশানী আপাতত সেখানেই প্রহরারত। পবিত্র আচার্য আপাতত অধিরাজের বুক করা ফুল আর কেক নিয়ে মিসেস আচার্যকে খুশি করতে বাড়ি রওনা দিয়েছে। মিস অরোরা ব্যুরোয় এসে এখনও পৌঁছয়নি। কে জানে তার হয়তো আবার খিদে পেয়েছে। ফের হয়তো কোনো রেস্টোর্যান্টে বসে পরোটা-টরোটা খেয়ে নিজের ব্যাটারিতে চার্জ দিচ্ছে। অথবা সিগার টিগার ফুঁকতেও পারে। অর্ণবের টুইঙ্কলের এই ফোঁকাফুঁকির ব্যাপারটায় বিরক্তি থাকলেও সে চেষ্টা করছে নিজের পার্সোনাল পছন্দ অপছন্দকে প্রোফেশনাল লাইফ থেকে সরিয়ে রাখতে।
এর ফাঁকে ডঃ চ্যাটার্জির ফোনও একবার এল। তিনিও বেশ উদ্বেগে আছেন। ক্লোরোফর্ম অ্যাটাকের খবর আহেলির কাছ থেকে আগেই পেয়েছিলেন। আপডেটও নিয়েছেন। আর একপ্রস্থ অর্ণবকেও জেরা করে জেনে নিলেন যে ওরা সবাই ঠিক আছে কিনা। অধিরাজের মা-বাবাকেও আশ্বস্ত করল অর্ণব। এই বিশেষ সময়গুলোতে অধিরাজের ফোন সাইলেন্ট বা ডু নট ডিস্টার্ব মোডে থাকে বলে সবাই তার খোঁজ অর্ণবের কাছ থেকেই নেয়। অর্ণবের মা-বাবাও চিন্তায়। তার মধ্যেই মিডিয়ার অজস্র ফোন। হসপিটালের পাশের গলিতে দৌড়ের ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছেও পৌঁছেছে। অধিরাজ ব্যানার্জিকে চিনতে তাদের অসুবিধে হয়নি। কিন্তু তার সামনে কে দৌড়চ্ছে, কেন দৌড়চ্ছে, কত কিলোমিটার পার আওয়ার বেগে দৌড়চ্ছে-সব না জানলে তাদের শাস্তি হচ্ছে না। এদের ফোন নম্বর দেয় কে!
এই অলস সময়টুকুতে খুঁটিনাটি কাজগুলো করে গেলেও অর্ণব সতর্কদৃষ্টি রেখেছে অধিরাজের দিকে। খাবারগুলো আদৌ পেটে গেল কিনা, ক-কাপ কফি আর ক-প্যাকেট সিগারেট উড়ল, সবই নিঃশব্দে দেখে চলেছে। তবে তার সঙ্গে আরও একটা জিনিস তার চোখ এড়ায়নি। অধিরাজের কপালে চিন্তার ভাঁজ আর চোখে অদ্ভুত একটা দ্বন্দ্ব। কিছু একটা নিয়ে সে সংশয়ে আছে তা দৃষ্টিতেই প্রকট। দীর্ঘ দেহটাকে এলিয়ে দিয়েছে চেয়ারে। ঠোঁট বেয়ে গল গল করে পারফেক্ট ধোঁয়ার রিং বেরোচ্ছে। কিন্তু হাতের আঙুলগুলো অস্থিরভাবে পেপার ওয়েটটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
এভাবেই অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর শেষপর্যন্ত অধিরাজ বাহ্যচেতনা ফিরে পেল। অর্ণব তার মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি দেখতে পেয়ে দরজা খুলে কেবিনের মধ্যে উঁকি মারে, “আসবো?”
“চলে এসো।” অধিরাজ একটু চিন্তান্বিত মুখেই বলল, “অত অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। বাইরের কোনো খবর পেলে?”
অর্ণব যতটুকু যা জানত সবই বলল। ডঃ চ্যাটার্জি ফোন করেছিলেন শুনে সে একটু সচকিত হয়ে ওঠে, “সহিংস লামা ফোন করেছিলেন? রিংব্যাক করো তো ওঁকে।” বলাই বাহুল্য, বৌদ্ধ লামাদের মতো ন্যাড়ামুণ্ডি মস্তকের জন্যই ডঃ চ্যাটার্জির এই নতুন নামকরণ। তবে তিনি আর যাই হোন, কোনোমতেই অহিংস নন। সেইজন্যই ‘সহিংস’ শব্দটা ওঁর নামের আগে বসেছে। অর্ণব হাসি সামলে বিনাবাক্যব্যয়ে ডঃ চ্যাটার্জিকে ফোনে ধরে। এপ্রান্ত থেকে অধিরাজ ‘হ্যালো’ বলতেই ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল সেই আদি ও অকৃত্রিম গজগজ, “আর কত হেলাবে? তোমার কর্মকাণ্ড দেখে হেলে হেলে হেলেসাপ হয়ে গেছি। বলি কী অদ্ভুত আক্কেল তোমার? লোকে মুখে ক্রিম মাখে, লোশন মাখে, পাউডার মাখে, ডিম-মধু কিংবা শশা-কমলালেবুর রস মাখে, ফেস-প্যাক নাকি—সেসবও মাখে শুনেছি। তুমি ক্লোরোফর্ম ছাড়া আর কিছু মাখার পেলে না?”
“কী করব বলুন।” অধিরাজ গোবেচারা মুখ করেছে, “আপনার মতো ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির স্টক নেই বার্নিং শিখের কাছে। যা ছিল, তাই দিয়েই রূপচর্চা করিয়েছে। ক্লোরোফর্ম ফেশিয়াল হিসাবে কিন্তু খারাপ নয়। ট্রাই করে দেখতে পারেন।”
“শোনো জ্যাঠা ছেলে!” গাঁক গাঁক করে ওঠেন তিনি, “নিজের ফান্ডা নিজেই মারো। ওনাকে হুঁশে আনতে আহেলির প্রাণ গেছে, আর উনি চামচিকের মতো চিক্ চিক্ করছেন।”
“মিস্ মুখার্জি ওঁর প্রাণ যাওয়ার রিভেঞ্জ আমাকে জ্যান্ত অবস্থায় মড়ার ট্রলিতে শুইয়েই ষোলো আনা পুষিয়ে নিয়েছেন। ওঁর কথা আপাতত থাক। আপনি আমাকে একটা ইনফর্মেশন দিন।” অধিরাজের বাদামি চোখ চকচক করছে, “সেদিন যে অসোউইক ফোর্টের ‘অ্যাটাক অব দ্য ডেড ম্যানের’ গল্পটা বলছিলেন সেটা ঠিক কখন ঘটেছিল?”
“তুমি কি আমায় উইকিপিডিয়া পেয়েছ যে সন তারিখ সব যখন তখন গড়গড়িয়ে বলে দেব? ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় ঘটেছিল। দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্ৰ এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।”
“সে কী। আপনি উইকিপিডিয়ার নাম জানেন?” কৌতুকে তার একটা ভুরু ফের উঠে গেল, “উইকিপিডিয়ার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, প্রপ্রপিতামহ-সবাই এতদিনে ধন্য হল ডক্।”
“শুধু তাই নয়, ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলও খুলেছি। কুক্কু শিখিয়েছে।” ডঃ চ্যাটার্জি খ্যাঁক করে ওঠেন, “তোমার এত আজাইরা আহ্লাদ কীসের হে ছোঁড়া? নিজের ডিপিতে তো আমার মুখ সাঁটিয়েছ। আমি কি টাইগার শ্রফের ছবি সাঁটাব?”
এই রে! বুড়ো দেখে ফেলেছে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেই বিপদ হল। কুকুমিঞাকে আগেই চেতিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। না জানে এবার তিনি কতক্ষণ এই ইস্যু নিয়ে তাণ্ডব করে বেড়াবেন!
“তা পারেন। তবে তাতে ‘টাইগার মুর্দা হ্যায়’ না হয়ে যায়।” অধিরাজ ফিচেল হাসছে, “আই মিন টাইগার শ্রফ আনন্দে না হার্টফেল করেন। লোকে আজকাল ‘সেভ টাইগার’ স্লোগান দিচ্ছে কিনা। আপনি বরং অর্জুন কাপুরকে ট্রাই করতে পারেন। তিনি রাগ হলেও যা এক্সপ্রেশন দেবেন, আনন্দিত হলেও সেই একই এক্সপ্রেশন! পখর কো কহো তো ভি শায়দ এক্সপ্রেশন দে দে, লেকিন এক্সপ্রেশন কা ক্যায়া মজাল কে অর্জুন কাপুরকে শকল মে আয়ে!”
“তোমার প্রবলেমটা অ্যাকচুয়ালি কী? আমি, টাইগার শ্রফ, অর্জুন কাপুরের এক্সপ্রেশন না অসোউইক ফোর্ট?”
“আপাতত অসোউইক ফোর্ট। আপনি শুধু জানান যে অ্যাটাকটা কখন হয়েছিল। দিনে না রাতে?”
“দিনের বেলা।” তিনি জানালেন, “এটা একদম শিওর।” “কেন?”
“কারণ রাশিয়ান সেনারা ক্লোরিনের ক্লাউডটা স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছিল। সেটা যে আস্তে আস্তে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে সেটাও দেখেছিল। কিন্তু তখনও বোঝেনি যে কী হয়েছে। রাতের বেলা ঘটলে দেখতে পেত না।”
“প্রতিপক্ষ ক্লাউডটা দেখতে পাবে জেনেও জার্মানরা ক্লোরিন-ব্রোমিনের মিক্সচারটাকে দিনের বেলাতেই রিলিজ করল কেন? এক্ষেত্রে রাতটাই তো সেফ ছিল।”
“ওরা কি আর অত ঠিক করে অ্যাটাক করেছে? আমার সঙ্গে পরামর্শ করেও তো করেনি।” তিনি একটু থেমে বললেন, “তবে যতদূর জানি, বেসিক্যালি অ্যাটাকটা আরও আগে যে কোনো সময়ে হতে পারত। ওরা বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টাও চালাচ্ছিল। তখন তো টেকনোলজি এত উন্নত ছিল না। গ্যাসগুলোর পা-ও নেই যে হেঁটে যাবে। তাই উইন্ডের যথেষ্ট প্রেশার দরকার ছিল। জার্মানরা হাওয়াটা কোনদিকে বইছে সেটাই আগে কিছুদিন ধরে ট্র্যাক করছিল। যে মুহূর্তে হাওয়ার গতিপথ অসোউইক ফোর্টের দিকে ঘুরল, উপযুক্ত জোর পেল, সেই মুহূর্তেই কন্টেনার খালি করে দিয়েছিল ওরা।”
“আচ্ছা। আর ভোপাল গ্যাস কাণ্ডটা তো বোধহয় রাতে। তাই না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু ওটা তো মিথাইল আইসোসায়ানেট লিক করে হয়েছিল। যদিও ওখানে ফসজিনের অস্তিত্বও ছিল। কিন্তু সর্বনাশটা এম আই সি-ই বেশি করেছে।” “ওটা যদি রাতের বেলা না হয়ে দিনের বেলা ঘটত, তবে কি ডেথ টোল আরও বাড়ত?”
“জানি না, যাও তো!” গজগজ করে ওঠেন ফরেনসিক বিশারদ, “এক্ষেত্রেও কোনো গ্যাসই আমার পারমিশন নিয়ে লিক করেনি। তাই দিনের বেলা হলে কী হত তা বলতে পারছি না। আমার ধারণা ফলাফল প্রায় একই হত। তবে যেহেতু দিনের বেলা রাস্তাঘাটে মানুষজনের ভিড় থাকে, সেহেতু ইনস্ট্যান্ট ডেথ হয়তো বেশি হত। কিন্তু আল্টিমেট ডিজাস্টার সেমই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আগে হোক পরে হোক, মরতই।”
“বুঝলাম। বাই দ্য ওয়ে, ইনস্টাগ্রামে কিন্তু মিস্ কাটামুণ্ডু নিজেই আছেন। ওঁকে ফলো করে আমার তরফ থেকে ‘হাই” বলে দেবেন প্লিজ। আর জানতে চাইবেন, এত বিটকেল বিটকেল মার্ডার ওয়েপন ওঁর মাথায় আসে কী করে। এবার শুনলাম নাকি বিরাট একটা মোটকা বই কার মাথার ওপর ফেলে খুন করেছেন। মার্ডার ওয়েপন শেষে বই। তাহলে তো কালীপ্রসন্ন সিংহমশাইয়ের মহাভারতের চেয়ে বড়ো মার্ডার ওয়েপন আর ত্রিভুবনে নেই।”
ডঃ চ্যাটার্জি আর কোনো কথা না বলে রেগেমেগে ঘটাং করে লাইন কেটে দিলেন। অর্ণব এতক্ষণ চুপচাপ গোটা কনভার্সেশনই শুনছিল। এবার কৌতূহলী স্বরে জানতে চায়, “স্যার, এর সঙ্গে অসোউইক ফোর্ট বা ভোপাল গ্যাস ডিজাস্টারের সম্পর্ক কী?” অধিরাজ মৃদু হাসল, “একটা দিনে হয়েছে। অন্যটা রাতে। এটাই সম্পর্ক।”
“কিন্তু দুই জায়গায় তো গ্যাসগুলো আলাদা!”
অধিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার মুখে একটা অচ্ছাভ বিষণ্ণতা লক্ষ করে অর্ণব। অদ্ভুত ব্যাপার তো। স্যারের হল কী! হঠাৎ এমন বিষাদ ওঁর মুখে ছেয়ে গিয়েছে কেন? বার্নিং শিখকে ধরতে না পারার হতাশায় কি?
অর্ণব জানতে চাইতেই আলতো মাথা নাড়ল সে, “না। সমস্যাটা সেটা নয়। বার্নিং শিখকে ধরা ঠিকই যাবে অর্ণব। তাকে মারাও যাবে, শেষও করা যাবে। কিন্তু তার পেছনের লোকটাকে আমি যদি ঠিক বুঝে থাকি, তবে ওই তথাকথিত “গুল্লুকে ধরা যাবে না। ওকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারব না আমরা।”
“মানে?”
তার কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারে না অর্ণব। এ আবার কী হেঁয়ালি। বার্নিং শিখকে ধরা যাবে, মারাও যাবে। কিন্তু গুল্লুকে ধরা যাবে না! এ কেমন কথা! দু-জনেই তো এক ব্যক্তি!
“নাঃ।” অধিরাজের মুখ গম্ভীর, “আগেও বলেছি যে বার্নিং শিখকে তুমি ভূতও বলতে পারো। একটা মানুষের ভয়াবহ শৈশব থেকে উঠে আসা একটা পচাগলা পোড়া ইতিহাসের ভূত। আর গুল্লু সেই ভূতের হাতে পজেড একটা মানুষ। এতটাই সে ওই প্রেতের দখলে যে চাইলেও নিষ্কৃতি পাবে না বা তাকে থামাতে পারবে না। আর যে মুহূর্তে দু-জন আলাদা হবে, বার্নিং শিখ ধরা পড়বে কিন্তু গুল্লুর মরা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। ইউ নো অর্ণব…?”
“উঁ?”
তার দীঘল চোখের পাতায় ফের বিষণ্ণতার ছায়া, “কখনও কখনও মনে হয়, এই কেসটা নিয়ে কি আদৌ ঠিক করলাম? অনেস্ট কনফেশন, লোকটা যদি ওর টার্গেটদের ইনোসেন্ট পরিবারকে না মেরে সোজা টার্গেটদেরই মারত, তবে এই কেসটা হাতে নিতামই না আমি। নেহাৎ কতগুলো নিরপরাধ মানুষের প্রাণের দায়। নয়তো বার্নিং শিখকে আটকানোর চেষ্টাই করতাম না।”
অর্ণব স্তম্ভিত! এ কী কথা বলছে অধিরাজ! একজন খুনির প্রতি এতখানি সহানুভূতি কেন তার? বার্নিং শিখ লোকগুলোর পরিবারকে না মেরে লোকগুলোকে মারলে কিনা তাকে আটকাতই না! তাছাড়া সে এখন থেকেই বা কী করে বলতে পারে যে গুল্লুকে জ্যান্ত ধরা যাবে না-সে মরবেই।
তার অনুচ্চারিত প্রশ্নটার উত্তর অধিরাজ অন্যমনস্কভাবে নিজেই দিয়ে দিয়েছে, “লোকটা জগদীপ ভাট্টিকে কী বলেছিল মনে আছে? নিজের কবরটাও ও খুড়ে রেখেই এই পাপকাজে নেমেছে। যে মুহূর্তে বার্নিং শিখ ধরা পড়বে, সে মুহূর্তে গুল্লুর বেঁচে থাকার একমাত্র কারণটাও শেষ। ও আর বাঁচবে না কারণ বাঁচার ইচ্ছেই ওর নেই। সে মারতে শিখেছে। মরতেও শিখেছে। এর শেষ গ্রেফতারিতে নয়, মৃত্যুতেই হতে চলেছে… ין
কথাটা শেষ করতে-না করতেই এবার অধিরাজের ফোন সশব্দে বেজে ওঠে। একটু আগেই সে নিজের ফোনটাকে অ্যাকটিভ করেছে। হোয়াটস্অ্যাপের দিকে তাকিয়েই তার চোখ কুঁচকে যায়, “আবার পবিত্র মেসেজ করছে! কী হল হঠাৎ? নতুন কোনো অঘটন?”
সে তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলে পড়ল। উদ্বেগে তার বুকের মধ্যে একটা কম্পন হচ্ছিল। কে জানে, বার্নিং শিখ আক্রোশবশত আবার কাউকে ওপরে পাঠাল কিনা। কিন্তু পড়া মাত্রই ফিক্ করে হেসে ফেলেছে, “আর একজনও আজ নির্ঘাৎ মরবে। বউয়ের হাতে! দেখো, কী পাঠিয়েছে।”
অর্ণব সবিস্ময়ে মেসেজটা পড়ে। পবিত্র লিখেছে, “এখনই কয়েকঘণ্টার জন্য বাড়ি আসছি। মামার ভাগনেকে কিছুক্ষণের জন্য মামাবাড়িতে পাচার করে দাও। ফিলিং হর্নি। আজ আমি তোমাকে পাগল করেই তবে ছাড়ব।”
সে-ও এবার হেসে ফেলল। আচার্য স্যার রাজা আর রাজশ্রী নাম দুটোতে গুলিয়েছেন! মেসেজটা যাওয়ার কথা রাজশ্রী বউদির কাছে। উত্তেজনার চোটে চলে এসেছে ‘রাজা’র হোয়াটস্অ্যাপে। দুটো নামের প্রথম কিছু অক্ষর এক হওয়ার ফলাফল!
অধিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ভাবল কী করবে। কারণ পবিত্র যাঁকে মেসেজ পাঠাচ্ছিল, তাঁর কাছে সংবাদটি যায়নি। উপরন্তু মেসেজটা এসেছে বসের কাছে। উত্তর দিলেও পবিত্র সেটা লক্ষ করে দারুণ লজ্জায় পড়বে। আবার ওকে না জানিয়েও উপায় নেই। পবিত্র যদি জানতেই না পারে যে এমন রোম্যান্টিক বার্তাটি আসল লোকের কাছে আদৌ পৌঁছয়নি, তবে কপালে দুঃখ আছে। মামার ভাগনে বাড়িতেই থাকবেন। উপরি পাওনা বউদির ঝাড়! দিনটাই চৌপাট।
অগত্যা সে অবশেষে ভেবেচিন্তে মেসেজটার রিপ্লাইয়ে লিখল, “এতে আর আশ্চর্যের কী আছে হর্নি খুড়ো? সানি লিওনির কসম, বিগত কয়েকবছর ধরে তুমি তো গোটা ব্যুরোর সবাইকে, এমনকি আমাকেও প্রতিদিন পাগল করেই ছাড়ছ।”
এত টেনশনেও এবার অর্ণবের বেদম হাসি পেয়ে গেল! অর্জুন কাপুরের এক্সপ্রেশনের কথা জানা নেই। কিন্তু এই মেসেজ পেয়ে পবিত্র-র কী এক্সপ্রেশন হতে পারে তা সে একেবারে দিব্যদৃষ্টিতে দেখে ফেলেছে।
