(১২)
সি.আই.ডি. ব্যুরোর অবস্থা দেখলে মনে হয় এখানে সদ্যই কেউ হাইড্রোজেন বম্ব ফেলে দিয়ে গিয়েছে।
গোটা অফিসে কোনো আওয়াজই নেই। অফিসারদের মুখে আতঙ্ক ও সংশয় স্পষ্ট রকি ও ইসমাইলের এই পরিণতি সবাইকেই জোরদার ধাক্কা দিয়েছে। এমন নয় যে ইনফর্মারদের প্রাণের আশঙ্কা একদমই থাকে না। তাদের পরিচয় জানতে পারলে হিস্ট্রিশিটাররা ছেড়ে কথা বলবে না। কিন্তু রকি এবং ইসমাইল দু-জনেই প্রচণ্ড সাবধানী। বহু বছর ধরে এই পেশাতেই ছিল। তাদের কপালে শেষমেষ কিনা এমন বীভৎস মৃত্যু! একজনের দেহ অগুণতি টুকরোয় এল, অন্যজন পুড়ে ছাই! ওদের পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে। ইসমাইলের আম্মি ছেলের বডি দেখেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ওর স্ত্রী যেন মুক ও বধির! কেমন বোবার মতো ভাষাহীন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল স্বামীর লাশের টুকরোগুলোর দিকে। যেন কোনো অনুভূতিই নেই! ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে আছে, কিছু বুঝতেই পারছে না।
রকির অসহায় স্ত্রীয়ের কান্না থামানোই যাচ্ছিল না। ওর বড়ো ছেলে মাকে আপ্রাণ সামলানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই এমন পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়। সে স্বামীর ঐ পোড়া শরীর আঁকড়ে ধরে বুকফাটা হাহাকার করে চলেছিল। কিছুতেই রকির দেহ ছাড়বে না। দুই ছেলে কোনোমতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষমেষ তাকে সরাতে পেরেছে। আপাতত দুটো লাশই ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসব কিছুই অধিরাজ আর অর্ণবের চোখের সামনে ঘটছিল। অধিরাজের মুখ অসম্ভব কঠিন। সে শুধু আর্দ্র কণ্ঠে বলেছিল, “ওদের ফ্যামিলিকে আমি কী জবাব দেব!”
অর্ণব নীরবে তাকিয়েছিল তার দিকে। অধিরাজের মতো একজন বড়ো দরের অফিসারের একজন সামান্য খবরির মৃত্যুতে এত বিচলিত হওয়া হয়তো উচিত নয়৷ রকি ও ইসমাইল যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কাজ করত, সেই প্রণবেশ লাহিড়ীও এতখানি কষ্ট পাননি। কিন্তু অর্ণব জানে, অধিরাজ বাকি সবার মতো নয়। গোটা টিমটাই তার কাছে আস্ত একটা পরিবার! সে অফিসারই হোক কী ইনফর্মার। তার কাছে সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ৷
যে মুহূর্তে এই দুঃসংবাদ পেয়েছিল অধিরাজ, সেই মুহূর্তেই সে পাগলের মতো ঘন্টু, গুল্লু আর যাদবকে ফোন করছিল। তার ভয় ছিল যে ওদের সঙ্গেও কোনোরকম ট্র্যাজেডি না ঘটে যায়। কিন্তু তিনজনই ঠিকঠাক আছে জেনে একটু স্বস্তি পেয়েছে। তার কথামতো অর্ণব পবিত্র-র কাছে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। দু-জন দু-জনকেই একমুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করেনি। অধিরাজ স্বয়ং তাকে বাইকে তুলে নিয়ে এসেছে। পবিত্র ও প্রণবেশ লাহিড়ীকে পইপই করে বলেছে লেডি অফিসারদের কনস্ট্যান্ট মনিটরিং করে যেতে। অধিরাজ বিড়বিড় করেই আপনমনে বলছিল, “আমার মন বলছে, এরপরের অ্যাটাক এই দু-জনের কারোর ওপরই হবে। বুঝতে পারছি, ওদের চরম রিস্কের মুখে ঠেলে দিয়েছি আমি। আরও দুটো রাত… আরও দুটো রাত বাকি আছে। আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে… আমি অনুভব করতে পারছি যে সে কোথায় আছে… কিন্তু প্রমাণ করব কী করে?..এ তো শুধু থিওরি।…আমি তার অ্যাকচুয়াল পরিচয় না পেলেও আন্দাজ করতে পারছি তার অস্তিত্ব… কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়… আমার ভুলও হতে পারে… আর ভুল হলে কেলেঙ্কারির একশেষ হবে.. যা-ই হোক, রাতে অন্তত লেডি অফিসারদের একা থাকতে দেওয়া যাবে না… কিছুতেই না…।”
অর্ণব তার এই স্বগতোক্তি শুনে স্তম্ভিত। কী বললেন স্যার। বার্নিং শিখ কোথায় আছে তা তিনি জানেন! তবে তাকে ধরছেন না কেন? এইভাবে হাতে হাত রেখে বসে থাকার মানে কী! এতে বিপদ বাড়ছে বৈ কমছে না।
প্রশ্নটা করতেই মাথা নাড়ল অধিরাজ, “লাভ নেই অর্ণব। আমরা যদি ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা শার্লক হোমসের মতো প্রাইভেট ডিটেক্টিভ হতাম, তবে পুলিশকে বলে দিতাম, ‘ঐ আপনার খুনি।’ এরপর প্রমাণ করা, বা সাক্ষ্য-সাক্ষী জোগাড় করা, চার্জশিট তৈরি করা পুলিশের দায়। সেটা গোয়েন্দার কাজের মধ্যে পড়ে না। তারপর অপরাধী শাস্তি পাক, কী বেকসুর খালাস, তাতে আর যা-ই হোক, কোর্ট এবং মিডিয়ার ভর্ৎসনা তাকে শুনতে হয় না। কপাল দোষে আমাদের সে সুযোগ নেই। আমি এক্ষুনি গিয়ে লোকটাকে ধরতে পারি। কিন্তু কোর্টে জজসাহেব যখন জিজ্ঞাসা করবেন, ‘কীসের ভিত্তিতে আপনি ওকে গ্রেফতার করেছেন? ইনিই যে বার্নিং শিখ, তার প্রমাণ কী?’ আমি কোনো জবাবই দিতে পারব না। আর যদি নিজের থিওরিটা বুঝিয়েও বলি, তবে জজসাহেব আর উকিলদের তো ছাড়ো, কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাগলটাও হ্যা হ্যা করে হাসবে! কারণ শুরু থেকেই আমি তার যে প্যাটার্ন লক্ষ্য করছি, তার ভিত্তিতেই তার উপস্থিতি টের পাচ্ছি। অথচ, সেটা আইনের চোখে এতটাই অযৌক্তিক, যে কোর্টে আদৌ কোনো প্রমাণ হিসাবে গণ্যই হবে না। বরং সবার একটা উদ্ভট, গাঁজাখুরি ও হাস্যকর থিওরি মনে হবে। এছাড়া হাতে অন্য কোনো প্রমাণও নেই।
লোকটার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, কিংবা ডি.এন.এ. স্যাম্পল আজ পর্যন্ত কোনো ক্রাইম স্পটে পাওয়া যায়নি। কী দিয়ে মার্ডার করে, তাও অজানা। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী কেউ নেই, একমাত্র মদন ছাড়া। তাও সে ওকে মেক-আপ ছাড়া দেখলে চিনতেই পারবে না। সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সও যথেষ্ট নেই। সবাই ভাববে অধিরাজ ব্যানার্জি পেগলে গেছে। তাছাড়া সবসময়ই যে সে প্যাটার্ন বজায় রাখবে এমন কোনো কথা নেই। তার শিকারদের মধ্যে এতদিন ইনফর্মাররা ছিল না। এখন তারাও লিস্টে ঢুকেছে। আর যদি একবারও সে বুঝতে পারে, তার এই প্যাটার্নটাও আমি বুঝতে পেরেছি, তবে সে পুরো প্যাটার্ন চেঞ্জ করে হাওয়া হয়ে যাবে। এখন অন্তত চোখের সামনে আছে। আমি তার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। সেক্ষেত্রে সেটুকুও পাব না! এটা আরও বেশি রিস্কি হবে অর্ণব।” সে আফসোসে মাথা নাড়ে, “আমার অবস্থা ঢাল নেই-তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দারের মতো। বুঝতে পারছি সবই। শত্রুকে চিনতেও পারছি। কিন্তু তাকে ঠেকানোর অস্ত্র নেই আমার কাছে। তার মন পড়তে পারছি। অথচ আইনের কাছে তা মূল্যহীন। এই পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো চয়েস নেই।” i
“স্যার…” অর্ণব জানতে চায়, “ইসমাইল বা রকি কি কোনো তথ্য পেয়েছিল?”
“নির্ঘাৎ পেয়েছিল।” সে আফসোসে মাথা নাড়ে, “হয়তো সেটা আমাদের জন্য ব্রেক-থ্রু হতে পারত। ওরা সবার ঠিকুজি-কুলুজি বের করছিল আর সবার যাতায়াতের ওপর নজর রাখছিল। কিছু না কিছু বুঝতে পেরেছিল ঠিকই। কিন্তু এখন সেটা জানার উপায়ও নেই! অ্যাকচুয়ালি এখানে একে অপরকে নিরস্ত্র করার খেলা চলছে! আর এই গেমটা ও জিতল!”
“মানে?”
“শুরুতে আমরা ওকে নিরস্ত্র করেছি। ওর অ্যাসিড বাল্ব ছিনিয়ে নিয়েছি। তিনটে তোমাকে লক্ষ্য করে ছুড়েছিল। চারটে ওর চোলার তলায় ছিল যেগুলো আমি বের করে নিয়েছিলাম। টোট্যাল সাতটা অ্যাসিড বাল্ব। হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড কিলোদরে কেউ জোগাড় করতে পারে না। আস্ত একটা অ্যাসিডের কনটেনার নিয়ে সে বসে আছে, এটা প্রায় অসম্ভব। সুতরাং মোস্ট প্রব্যাবলি, তার কাছে এই মুহূর্তে আর অ্যাসিড বাল্ব নেই। সম্ভবত বম্বও নেই। একটা ছিল, সেটা ব্যর্থ হয়েছে। যদি এ দুটোর একটাও থাকত, তবে খবরিদের ওপর প্রয়োগ করত। রকিকে সে পুড়িয়ে মেরেছে। তার জন্য কেরোসিনের থেকে হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড বা বম্ব অনেক বেশি সহজ অপশন। ডক যখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেবেন, তখন দেখবে ইসমাইলের মার্ডারে তরোয়াল, আর রকির মার্ডারে কোনো ঘুমের ওষুধ বা ড্রাগসের সঙ্গে কেরোসিনের ইউজ হয়েছে। তার স্টকে অ্যাসিড বা বম্ব থাকলে এটা হত না।”
“এমনও তো হতে পারে যে সেগুলো সে আমাদের জন্য রেখেছে?” “নিশ্চয়ই রাখত। যদি সে এই দুটো আক্রমণের একটাতেও সাফল্য লাভ করত। ও মাল বুঝেছে যে কলকাতা পুলিশ ওর অ্যাসিড অ্যাটাক আর বম্বের বিষয়ে অ্যালার্ট হয়ে আছে। অতএব ও আমাদের তরোয়াল নিয়ে কাটতে আসতে পারে, কিংবা অজানা মার্ডার ওয়েপন দিয়েও মারতে পারে। কিন্তু অ্যাসিড আর বম্বের স্ট্র্যাটেজি চেঞ্জ করবেই। ও জানে আমরা সতর্ক হয়ে আছি এবং ওর স্টাইল সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এখন টিমের কেউ ফোর-হুইলার ইউজ করছে না, সবাই বাইকে যাতায়াত করছে। ইভেন মিস্ দত্ত এবং মিস্ বোসও পবিত্র বা প্রণবেশদার বাইকে যাতায়াত করছিলেন। বাইক ফোর-হুইলারের মতো ঢাকা-চাপা দেওয়া জিনিস নয় যে ইঞ্জিনে বম্ব ফিট করবে। বাইরে থেকেই বোঝা যায় যে কিছু গোলমাল আছে কিনা। তার ওপর ছোটোখাট জিনিস বলে সিকিউরিটির নাকের ডগাতেও পার্ক করা যায়। তাই ওটায় বম্ব সেট করা মুশকিল। বার্নিং শিখ হাড়ে হাড়ে বুঝেছে, যে ওর আক্রমণ পুলিশের কাছে স্টিরিওটাইপড আর ভীষণ প্রেডিক্টেবল হয়ে গেছে। তাই এবার অন্য অস্ত্র আমদানি করবে।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলল, “লোকটাকে মোটেই মূর্খ ভেবো না। পুলিশ অ্যালার্ট আছে, কিন্তু ইনফর্মাররা নয়। সুতরাং অ্যাসিড বা বম্ব ওখানেই ইউজ করত। যখন করেনি, তখন বুঝতে হবে ও দুটো জিনিস এই মুহূর্তে তার স্টকে নেই। দু-কদম এগোনোর পর ওকে চারকদম পেছোতে হল। তার শোধ তুলল দু-জন এক্সপার্ট খবরিকে খুন করে। পুলিশের সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র ইনফর্মার। খুনি এবার সেই অস্ত্র ছিনিয়ে নিল আমাদের কাছ থেকে। ইন শর্ট, আমরাও চারকদম পিছোলাম। ও খবরি মহলে আতঙ্ক ছড়াতে পেরেছে। এটাই ওর সবচেয়ে বড়ো জয়!”
“তাহলে এখন কী করব?”
অধিরাজ ঘড়ি দেখল, “একটু পরেই ঘন্টু আর যাদবের সঙ্গে মিটিং আছে। তার আগে মদনকে ইন্টারোগেট করে নিই। আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বলতে শুধু ও-ই আছে।”
“যদি মুখ না খোলে?”
তার মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, “ইন দ্যাট কেস, দু-নম্বর গানের সবকটা গুলিই আমি ওর মাথায় ঢুকিয়ে দেব। ও এমন কিছু সাধু সন্ত নয় যে কাজে না লাগলে ওকে বসিয়ে বসিয়ে জেলের ভাত খাওয়াতে হবে। অকাজের আবর্জনা রাখার কোনো মানেই হয় না!”
অর্ণব বুঝল যে বার্নিং শিখের এই অপ্রত্যাশিত আঘাতে অধিরাজের মেজাজ চূড়ান্ত খারাপ হয়ে আছে। একদিকে যেমন রাগ, দুঃখ, যন্ত্রণা, অন্যদিকে তেমন অসহায়তায় ভুগছে সে! তার নিজের জীবন নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কিন্তু গোটা টিমের ওপর এখন মৃত্যুর করাল ছায়া পড়ছে। যে কেউ, যে কোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে। ওদিকে আত্রেয়ী দত্ত, কৌশানী বোস, অন্যদিকে পবিত্র আচার্য, প্রণবেশ লাহিড়ী এমনকি অর্ণবও বিপন্ন। কোন্ দিকে দৌড়বে তা সে বুঝতেই পারছে না। ‘বি-অ্যালার্ট” শব্দটা অন্য কোনো কেসে এতবার ওকে বলতে শোনেনি কেউ। বারবার ঐ শব্দটা বলার একটাই কারণ। সে নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বার্নিং শিখ শেষ রাতে ওস্তাদের মার দিয়ে দিয়েছে। অধিরাজকে সে কনফিউজ করতে পেরেছে। একমাত্র উপায় ছিল আর্মি নামিয়ে গোটা শহরকেই স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু বার্নিং শিখ যদি সত্যিই ভেতরে ঢুকে বসে থাকে, যেটা ওর মোডাস অপারেন্ডিও বটে, তাহলে আর্মির বাবাও ওকে ঠেকাতে পারবে না! মাঝখান দিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।
মদনকে ওরা চুপি চুপিই নিজেদের কাস্টডিতে রেখে দিয়েছে। মিডিয়া এখনও এই খবরটা জানে না। তারা বার্নিং শিখকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে ‘কাটার মদন’ তাদের মাথাতেই নেই। তাই মদন যে সি.আই.ডি.-র হেফাজতে তা ওদের জানা নেই। অধিরাজ তাকে অফিশিয়ালি অ্যারেস্টও করেনি। তবে যেহেতু সে প্রত্যক্ষদর্শী তাই ব্যুরোতেই তাকে কড়া সুরক্ষায় রাখা হয়েছে। অত বড়ো একটা গ্যাংস্টার এখনও একটা ছোট্ট শিশুর মতো কথায় কথায় ভয় পাচ্ছে। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না! এতটাই শকড্ যে জবানবন্দিও দিতে পারেনি। সি.আই.ডি. ব্যুরোয় থাকার দরুণ এখন একটু স্বস্তি পেয়েছে বটে, তবে তা সাময়িক। বার্নিং শিখ আর যা-ই হোক, ব্যুরোয় ঢুকে ওকে ভয় দেখাতে আসবে না। কিন্তু তা আর কতক্ষণ? কখনও-না কখনও তাকে বাইরে বেরোতেই হবে। যদি এরাই এনকাউন্টার করে ফেলে, তবে গল্প শেষ। যদি না করে, তবে হাজতবাস অবধারিত। কোর্টেও যেতে হবে! তখন যদি ঐ লোকটা এসে ফের হাজির হয়…!
অর্ণব ভেবেছিল, হয়তো মদন এ বিষয়ে কথা বলতেই চাইবে না। অথবা কথা বলার মতো অবস্থাতেই থাকবে না। কিন্তু অধিরাজকে দেখেই সে আবার কথা নেই, বার্তা নেই তাকে খপাৎ করে জাপটে ধরে হাঁউমাউ করে বলল, “প্লিজ স্যার, আপনি আমাকে বাঁচান! আপনি যা বলবেন, তাই করব। সাক্ষী লাগবে না, আমি নিজেই সব দোষ কবুল করব। জেলে ঢুকে বসে থাকব, ফাঁসিতে ঝুলে যাব, যাবজ্জীবন হলে মাটি কোপাব, পাথর ভাঙব, তারপর যদি আদালতের দয়ায় কোনোক্রমে ছাড়াও পাই তবে আলু, পটল বেচতে বসে যাব কিংবা ভিক্ষা করে খাব। তবু জীবনে আর খুন-জখম কিছু করব না! আর নিতান্তই যদি আপনার মর্জি হয়, তবে এনকাউন্টারই করে দিন। চুপচাপ লক্ষ্মী ছেলের মতো গুলি খেয়ে মরতেও রাজি আছি, কিন্তু ঐ ভূতটার হাত থেকে আমায় বাঁচান!”
মদনের আতঙ্ক দুই অফিসারেরই অগাধ বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে লোক নিজেই একটা আস্ত রাক্ষস, সর্বক্ষণ অটোম্যাটিক রাইফেল নিয়ে লোককে ঝাঁঝরা করে বেড়াচ্ছে, সে কিনা বার্নিং শিখের ভয়ে এতটাই ভীত যে ফাঁসি বা এনকাউন্টারই তার ইপ্সিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তত এই দুটো ক্ষেত্রেই মৃত্যু তুলনামূলক কম যন্ত্রণাদায়ক তার কাছে।
ওদিকে ফের মদন ঘাড়ের ওপর এসে পড়ায় অধিরাজ বিরক্ত হয়ে তাকে সজোরে ধাক্কা মেরে নিজেকে আলিঙ্গন মুক্ত করল, “তুই শুরুটা করেছিস কী? এখানে কি ‘চিপকো’ আন্দোলন চলছে, না আমি তোর গার্লফ্রেন্ড যে কথায় কথায় জড়িয়ে ধরছিস? তোর কোনটা গেছে? মাথা না চরিত্র।”
“আপনি মা-বাপ হুজুর!” তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, “রাখলে আপনিই রাখবেন, মারলে আপনিই মারবেন। কিন্তু দয়া করে ঐ রাক্ষসটাকে ঠেকান…. ও আমায় মারবে…! আমি জানি… ও আমায় মারবে। আপনার পায়ে পড়ি… ওর হাতে তুলে দেবেন না।”
বলতে-বলতেই সে ফের অধিরাজের পা জড়িয়ে ধরতে গেল। অধিরাজ প্রায় লাফ মেরে পিছিয়ে যায়। গর্জন করে ওঠে, “ডোন্ট টাচ মি! আই সে-ই-ড ডোন্ট টা-চ আর একবারও যদি আমার ঘাড়ে এসে পড়িস, তবে বার্নিং শিখকেই তোর নামের সুপারি দিয়ে দেব।”
অর্ণব অধিরাজের এই প্রতিক্রিয়াই আশা করেছিল। বার্নিং শিখের নাম শুনে মদন ভয়ের চোটে চুপ করে গেল। অর্ণব এবার একটু সহজ কণ্ঠে বলে, ‘তুই বিকাশ দুবের শিষ্য হয়ে একটা সাধারণ খুনিকে ভয় পাচ্ছিস?”
“সাধারণ! কে বলেছে ও সাধারণ।” সে শুকনো ঠোঁট চেটে নেয়, “আমি মানুষের সঙ্গে লড়তে পারি, ভূতের সঙ্গে নয়! আর ও ভূতও নয়, সাক্ষাৎ পিশাচ! কী ভয়ানক মুখ…! ওঃ!”
অধিরাজ সজোরে একটা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। সে নিজেও বুঝতে পারছে যে এভাবে রি-অ্যাক্ট করাটা ঠিকও নয়। দুনিয়ায় সবাই একরকম নয়। নিজেকে ক্রমাগতই বুঝিয়ে চলেছে। তবু মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই একটু বেশি রি-অ্যাক্ট করে ফেলে। জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার দরুণ তার উত্তেজনা একটু প্রশমিত হল। এবার তুলনামূলক ঠান্ডা গলায় বলল, “দ্যাখ, আমাদের কপালদোষে তুই-ই লোকটাকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছিস। অর্থাৎ আই-উইটনেস। সেজন্যই এখনও বেঁচে আছিস। সে রাতে কী কী দেখেছিলি যদি ঠিকঠাক বলতে পারিস, তবে এ যাত্রা তোর এনকাউন্টার হবে না। আর যদি মনে না থাকে, তবে তুই কোনো কম্মের না।”
“মনে নেই মানে!” সে রাতের স্মৃতি মনে করেই শিউরে উঠল মদন, “সব মনে আছে। ও মুখ কখনও ভোলা যায় না। কী খতরনাক …!”
“ও মুখ আমরাও দেখেছি। তাও আবার লাইভ।” সে এবার একটু বিরক্ত, “তুই শুধু এইটুকু বল…, ও বাড়িতে ঢোকার পর থেকে বেরিয়ে আসা পর্যন্ত ঠিক কী কী দেখেছিস ও কী কী শুনেছিস…! কোনো পয়েন্ট মিস করবি না। তার আগে আর পরে কী হয়েছে তা আমরা জানি। তাই রিপিট করার দরকার নেই।”
মদন একটু ভেবে নেয়। তারপর বলতে শুরু করে, “স্যার, আপনারা যখন আমায় চেজ করছিলেন তখন আমি জান বাঁচানোর জন্য ওদিকেই দৌড়েছিলাম। কিন্তু কোন্ বাড়িটায় ঢুকব তা বুঝতে পারিনি। তখনই চোখে পড়ল ঐ বাড়িটার দরজা হাট করে খোলা! ভাবলাম, আজ আমার জ্যাকপট লেগেছে। ও বাড়িতে ঢুকতে পারলে কিছু মানুষকে ‘হোস্টেজ বানিয়ে পালিয়ে যাব। তাই ওদিকেই দৌড়োলাম। কিন্তু তখন কে জানত যে ওর ভেতরে কী জিনিস বসে রয়েছে!”
বলতে বলতেই বোধহয় তার গলা শুকিয়ে আসে। সে সামনের জলের গ্লাসটার দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকাতেই অর্ণব বিনাবাক্যব্যয়ে জলের গ্লাসটা তার দিকে এগিয়ে দেয়, “তারপর?”
একটু গলা ভিজিয়ে নিয়েই সে ফের বলতে শুরু করে, “বাড়িতে ঢোকামাত্রই পোড়া মাংসের গন্ধ আর ধোঁয়ায় নাক, চোখ একেবারে জ্বলে উঠল। মিথ্যে বলব না স্যার, নিজে এত খুন করেছি, লোককে জ্বালিয়েছি যে গন্ধটা পাওয়ামাত্রই বুঝেছিলাম যে এখানে কিছু গোলমাল হয়েছে। এমন গন্ধ লাইফে অনেকবার পেয়েছি। ওটা যে ক্রাইম স্পট, সেটাও সন্দেহ হয়েছিল। তবু ভয় পাইনি। তখন নিজের প্রাণের দায় এতটাই বেশি ছিল যে কোথায় কে কাকে খুন করছে তা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। খুনি যদি আমার সামনে পড়েও যেত, তবে তাকেও দু-ঘা লাগিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু…!” এবার তার চোখে অকৃত্রিম ভয় ফুটে উঠেছে। এটা আর যা-ই হোক, অভিনয় নয়।
তার কণ্ঠস্বরও কাঁপছে, “একটু ভেতরের দিকে যেতেই দেখতে পেলাম ছ-ছ’টা লাশকে কেউ নেকলেসিং করে জ্বালিয়েছে। আর কিছু বোঝার আগেই সে পাবলিক একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। সে রূপ আর নতুন করে কী বলব! আগুনের আলোয় তার মুখ দেখে স্যার, আমার খারাপ অবস্থা। ও লোকটা কিছুতেই মানুষ হতে পারে না। শুনেছিলাম অনেক কালাযাদু করনেওয়ালা তান্ত্রিক ভয়াবহ সব পিশাচ আমদানি করে। জীবনে এই প্রথম চোখের সামনে জ্যান্ত পিশাচ দেখলাম! বীভৎস মুখ, অদ্ভুত একটা পাঞ্জাবি ড্রেস! অথচ তার হাতের চামড়া অদ্ভুত রকমের মসৃণ!”
“হাত মসৃণ মানে?” অধিরাজের ভুরু কুঁচকে গেল, “হাত স্বাভাবিক ছিল না? চোলা পরেছিল তো? তবে হাতটা দেখলি কী করে?”
“কবজি থেকে হাতের পাতা অবধি দেখেছি স্যার।” মদন বলে, “মা কালীর দিব্যি, আপনার আর আমার হাতের মতোই নয়। যতখানি বীভৎস মুখ, ততটাই সুন্দর তার হাত! মানে, আপনার হাতও ভীষণ সুন্দর, একেবারে নারায়ণ ঠাকুরের মতো। কিন্তু ছেলেদের হাতের একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। তাদের হাতে লোম থাকে। কিন্তু ওর হাত দুটোয় কোনো লোমই ছিল না। এমনকি ওর মুখের বা গলার চামড়ার রঙের সঙ্গে হাতের রঙের কোনো মিলই নেই। হাতদুটো একদম মোমপালিশ ‘আইটেম’দের মতো মসৃণ একেবারে মাখনের মতো ফর্সা রং আর আগুনের আলোয় রীতিমতো চকচক করছিল।”
“তুই ঠিক কী ধরনের চরিত্রহীন রে!” অধিরাজ ধমকে ওঠে, “একটা বীভৎস নৃশংস খুনি তোর সামনে দাঁড়িয়েছিল, সামনে ছ’টা পোড়া লাশ পড়ে ছিল, আর তুই কিনা তার ‘আইটেম গার্ল’ মার্কা মাখনের মতো হাত দেখছিলি!”
“মানছি আমি পয়লা নম্বরের লুচ্চা।” সে একটুও প্রতিবাদ না করে বলে, “কিন্তু তখন ওটা আমার চোখে পড়েছিল। আমি ভয়ও পেয়েছিলাম, অবাকও হয়েছিলাম অমন বীভৎসমুখো লোকটার বিশ্বসুন্দরীর মতো ওয়াক্স আর ম্যানিকিওর করা হাত দেখে। তবে তারপর যা ঘটল, তাতে আমার প্রায় হার্টফেলই হয়ে যাচ্ছিল। লোকটা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ‘হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা, খানকির ছেলে এইসব বলে একেবারে তেড়ে গালাগালি দিতে শুরু করল। জানি না স্যার, আমি ওর কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি। সে মাল সোজা তেড়েফুঁড়ে আমায় মারতে এল। বলল, ‘তোকেও শালা জ্বালিয়ে মারব।’ আমি আর অপেক্ষাই করিনি। দৌড়ে ওখান থকে বেরিয়ে এসেছিলাম। ঠিকমতো হুঁশই ছিল না কী করছি। যখন হুঁশ ফিরল, দেখলাম আপনারা সামনে..!”
“কোন্ ভাষায় কথা বলছিল? বাংলায়?”
অধিরাজের প্রশ্নে মাথা নাড়ল মদন, “না স্যার। হিন্দিতে। গালাগালিও হিন্দিতেই দিচ্ছিল।” এক মুহূর্ত থেমে কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, “স্যার… হিন্দিতে বলছিল ঠিকই। তবে ওর হিন্দিটা সাধারণ হিন্দি নয়।”
“মানে?”
সে একটু বুঝিয়ে বলে, “যেমন আমাদের এখানে বাংলার অনেকরকম টাইপ আছে, তেমন হিন্দিরও অনেক ভার্সান আছে। কলকাতার বাংলা একরকম, আবার ঘটিদের বাংলা আর বাঙালদের বাংলার মধ্যে একটু হলেও পার্থক্য আছে। মেদিনীপুরে গেলে একরকম বাংলা শুনবেন, আবার সুন্দরবনের টান অন্যরকম। তেমনই হিন্দি ভাষাটারও অনেকধরনের টাইপ পাওয়া যায়। বাঙালির হিন্দি আপনি বুঝতে পারবেন, উচ্চারণেই বোঝা যায়। মুম্বাইয়ের হিন্দি একটু রাফ। হায়দ্রাবাদ বা লখনৌয়ের হিন্দিতে আবার উর্দুর ইউজ বেশি। আর এতটাই নরম আর মিষ্টি যে খিস্তি দিলেও মনে হবে ‘শের বা শায়েরি’ বলছে। তেমনই আবার উত্তরপ্রদেশের হিন্দি অন্যরকম। অমিতাভ বচ্চনের সুদ্ধ ও সুন্দর হিন্দিটা এলাহাবাদের।”
“তাতে কী হয়েছে?”
“সেই লোক বা পিশাচ, যা-ই বলুন সে যে হিন্দি ভাষায় গালাগালি দিচ্ছিল, সেটা একেবারে খাঁটি দিল্লির হিন্দি। এমনকি স্ল্যাংগুলোও দিল্লির।”
“ইন্টারেস্টিং।” অধিরাজ একটু অন্যমনস্কভাবে প্যাকেট থেকে সিগারেটের স্টিক বের করতে-করতে বলল, “আরও একটু এক্সপ্লেইন কর। এমনিতে আমি তো তেমন কিছু বুঝলাম না। হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা এসব তো মোটামুটি ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গোয়েজ। বাঙালিরাও বলে। এর মধ্যে দিল্লি কোথা থেকে এল!”
“দিল্লির লোকেরা কথায় কথায় স্ল্যাং বলে। তবে তারও টাইপ আছে। বিশেষ কিছু ‘লব্জ’ ওরা বলে থাকে। ঐ পিশাচ আমায় রাম গালাগালি দেওয়ার পর বলেছিল, ‘তু সালা একনম্বর কা চোমু! আজ তেরা সারা ভসড় ইয়েহি খতম করতা হু।’“চোমু’ আর ‘ভসড়’ শব্দটা একমাত্র দিল্লির লোক ছাড়া অন্য কোনো প্রদেশের লোক বলবেই না! আর এগুলোই ও একদম কোট-আনকোট বলেছিল। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, ও ভূত, পিশাচ বা মানুষ যা-ই হোক, দিল্লিরই মাল।”
“তুই জানলি কী করে যে এগুলো দিল্লিতে ইউজ হয়?” অধিরাজের মুখে সিগারেটটা গোঁজা হলেও সে এখনও আগুন ধরায়নি। বরং উলটে এবার কৌতূহলী ভঙ্গিতে স্টিকটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে হাতের দুই আঙুলের মধ্যে নিয়ে বলল, “গিয়েছিস কখনও দিল্লিতে?”
“নয়তো এতদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিলাম কোথায়?” মদন মাথা চুলকে বিষণ্ণ বদনে বলে, “লাহিড়ীসাহেব তো আমাকে খরচ করার বন্দোবস্ত প্রায় পাকাই করে ফেলেছিলেন! সে রাতের শ্যুট-আউটের পর আর কলকাতায় থাকার সাহসই ছিল না! জানতাম, লাহিড়ীসাহেব আমার অবস্থা সত্যিই বিকাশ দুবের মতোই করে ছাড়বেন। আমি ভয়ের চোটে ইউপি-তে চলে গিয়েছিলাম। প্রথমে প্রয়াগরাজ, তারপর দিল্লি। কিন্তু সেখানেও আপনারা পুলিশকে আমার ‘থোবড়া’ সমেত ডিটেলস পাঠিয়ে দিলেন। দু-বার প্রায় ধরা পড়তে পড়তে বেঁচেছি। দিল্লি পুলিশ তো পুরো নেটওয়ার্কে আমার ছবি সার্কুলেট করেছিল। আপনাদের কল্যাণে দিল্লির লোকেরাও আমায় চিনেছে। কোথায় যাব বুঝতে না পেরে শেষে তিনদিনের জন্য কলকাতায় ফিরে এলাম। কিন্তু…!”
“হ্যাঁ, কলকাতাতেই তোর কবর খোঁড়া হত, যদি না তুই সেদিন ক্রাইম স্পটে গিয়ে পড়তি।”
মদন ফের হাতজোড় করে ফেলেছে, “বরং সেটাই ভালো হত! পিশাচটা যেভাবে তেড়ে এসেছিল, তাতে ভাবতেই পারিনি যে বেঁচে ওখান থেকে বেরোতে পারব। ভেবেই পেলাম না, ওর আমার ওপর এত রাগ কেন! আমি ওর কোন্ পাকা ধানে মই দিয়েছি?”
“মই দিয়েছিস মানে? তোর তো শ্লা মইয়েরই ফ্যাক্টরি।” অধিরাজ ধমক দিয়ে ওঠে, “লজ্জা করে না বলতে? খুন, এক্সটর্শন, রেপ, কিছুই তো বাকি রাখিসনি! বাঁশের ঝাড় কেটে পাবলিকের পেছনে দিয়েছিস! শুধু পুলিশ কেন, তোকে টপকালে গোটা পশ্চিমবঙ্গই খুশি হবে।”
“পশ্চিমবঙ্গ খুশি হলে বুঝতে পারি।” সে মুখ কাঁচুমাচু করেছে, “কিন্তু মাইরি বলছি, দিল্লিতে আমি কিচ্ছু করিনি। ওখানে স্রেফ গা ঢাকা দিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু তবু দিল্লি পুলিশ আমায় কুত্তার মতো দৌড় করিয়েছে।”
“বেশ করেছে। এবার আর একটু ব্রেনে জোর দে। আরও কিছু মনে করার চেষ্টা কর। এমন কিছু যা স্বাভাবিক নয়। কিংবা তোর খটকা লেগেছে এমন কোনো ঘটনা?” মদনের চোখ সরু হয়ে যায়। সে কিছু ভাবার চেষ্টা করছে। হয়তো ফের প্রত্যেকটা মুহূর্ত মস্তিষ্কের মধ্যে ফিরিয়ে এনে খুঁজছে, কোনো কিছু অস্বাভাবিক সেখানে ছিল কিনা! এক দেড় মিনিট ভাবার পরেই তার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, “হ্যাঁ। আর একটা জিনিস মনে পড়েছে। তবে সেটার কোনো গুরুত্ব আছে কিনা জানি না।”
“কীরকম?”
“ধোঁয়ার গন্ধের সঙ্গে একদম প্রথমে আমি অন্য একটা গন্ধও খুব হালকাভাবে পেয়েছিলাম। পরে আর সেটা পাইনি।”
“কী ধরনের গন্ধ?”
মদন কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “সেটা আপনাদের মতো শহুরে মানুষকে
বোঝানো বহুত মুশকিল। গ্রামের মাঠে যারা খেলা করে, বা চাষবাস করে, সেখানেই এরকম গন্ধ পাওয়া যায়। আমার জন্ম প্রত্যন্ত গ্রামে। বাপ গরীব চাষি ছিল। তাই মাঠেঘাটে খেলে, গড়াগড়ি খেয়ে বেড়াতাম। এ গন্ধটার সঙ্গে আমার আজন্মের পরিচয়। আপনারা কখনও কোনো মেঠো গন্ধ, বা তাজা খড় কেটে নিলে যে বাসটা পাওয়া যায়, সেটা শুঁকে দেখেছেন?”
অধিরাজ এবার একটু রেগেই গেল, “আমাদের কি কুকুর পেয়েছিস যে ঘাস-পাতা, মাঠ, খড়, সব শুঁকে বেড়াব? তাছাড়া এখানে মাঠই বা কোথায়, খড়ই বা কই?”
‘সেজন্যই তো বলছি। গন্ধটা বোঝানো খুব মুশকিল।” সে ফের বিষণ্ণ হয়ে বলল, “আমি আপনাকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারব না। কিন্তু স্মেলটা অবিকল নতুন কাটা খড়ের গন্ধের মতো ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এইমাত্র বুঝি কেউ খড় কুচিয়েছে, বা কেটেছে। কিন্তু পরে আর সেটা পাইনি।”
অধিরাজের গোল্ডেন ব্রাউন চোখের তারায় এবার যেন একটু দ্বন্দ্ব দেখা দিল, “তুই শিশুর?”
“হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যার!” মদন আত্মবিশ্বাসী, “ঐ গন্ধ জীবনে আমি ভুলব না। চোখ বন্ধ করেও ঠিক চিনে ফেলব। ঐ মেঠো গন্ধ আমার মা-বাবা দু-জনের গায়ে অষ্টপ্রহর লেগে থাকত। আমি যখন মাঠে গড়াগড়ি দিতাম, তখনও পেতাম। একদম ঐ বাসটাই আমার নাকে ভক্ করে প্রথমে লেগেছিল। যদি আমি একটুও ভুল বলি, তবে ঐ আপনার বুলেট, আর এই রইল আমার মাথা!”
মদনের আত্মবিশ্বাস দেখে দুই অফিসারই ঘাবড়ে গেল। যদিও আগুনকে আরও বেশি লেলিহান করে তোলার জন্য অনেকসময় খড় ব্যবহৃত হয়, কিন্তু ক্রাইমসিনে তো কোথাও খড়ের ট্রেসও পাওয়া যায়নি! লাশগুলোর গায়ে স্রেফ জ্বলন্ত টায়ার আর কেরোসিন তেল পাওয়া গিয়েছিল। আচমকা এর মধ্যে খড় কোথা থেকে এসে পড়ল। অর্ণব তো জানতই না যে খড়ের আদৌ কোনো গন্ধ থাকে! অধিরাজের অবস্থা আরও তথৈবচ। সে বিড়বিড় করে বলে, “এই খড়ের ধাঁধাটা আবার কী? ক্রাইমসিনে খড়-ঘাস কিছুই তো ছিল না! তবে…!”
অর্ণব বুঝল যে মদনের স্টেটমেন্ট গোটা ব্যাপারটাকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মদনকে টেনে তোলে, “ঠিক আছে। আপাতত চল। পরে দেখছি তোর কী ব্যবস্থা করা যায়।”
“যাই করুন স্যার।” সে ফের অধিরাজের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যায়, “আমায় ঐ পিশাচটার থেকে দূরে রাখুন… ও আমায় মেরে ফেলবে!”
তাকে এগিয়ে আসতে দেখেই অধিরাজ দ্রুত এক পা পিছিয়ে গেল, “আপাতত তুই আমার থেকে দূরে থাক। নয়তো পিশাচ তো তোকে পরে মারবে, আমিই তোকে আগে খুন করব… লুচ্চা, লম্পট কোথাকার।”
মদন অধিরাজের এ জাতীয় প্রতিক্রিয়ার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝল না। তবে সে আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। অর্ণব তাকে যথাস্থানে রেখে ফিরে এসে দেখে অধিরাজের হাতের সিগারেটটায় তখনও অগ্নিসংযোগ হয়নি। সে লম্বা স্টিকটাকে অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করছে। একবার মুখে গুঁজছে, আবার পরক্ষণেই কী ভেবে যেন হাতে নিয়ে নিচ্ছে। সে আলতো স্বরে ডাকল, “স্যার?”
অধিরাজের চোখের ঘন পাতা সামান্য থিরথির করে কাঁপল। উজ্জ্বল বাদামি অর্ধনিমীলিত চোখে সোনালি রোদ খেলা করছে। দৃষ্টি এখনও অন্যমনস্ক, “একজন প্রতিভাবান ক্রিমিনালের দৃষ্টি আর তুখোড় গোয়েন্দার নজরের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই অর্ণব। গোয়েন্দা বা পুলিশ যেভাবে ক্রাইম সিন খুঁটিয়ে দেখে, একজন ধুরন্ধর অপরাধীও অবিকল তাই করে। পার্থক্য একটাই। পুলিশ ক্লু খোঁজে আর ক্রিমিনাল দেখে নেয়, তার নিজের জন্য কোনো বিপদ ওঁত পেতে আছে কিনা। তাই নিজেদের প্রাণের দায়েই ছোটো ছোটো ডিটেইলসও ওরা মিস্ করে না। এক্ষেত্রে মদনের স্টেটমেন্টটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওর ফাঁড়াটা শুধু এই স্টেটমেন্টের জন্যই কেটে গেল।”
“কিন্তু স্যার…..।” অর্ণব একটু অবাক হয়েই বলে, “আমি তো আরও বেশি কনফিউজ হয়ে গেলাম! বার্নিং শিখের হাত মেয়েদের মতো গ্ল্যামারাস। লোকটা সত্যিই পুরুষ তো?”
“জেনেটিক্যালি পুরুষই সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।” এতক্ষণে অধিরাজ সিগারেটটা ধরিয়েছে, “কিন্তু এখন কিছু বলা মুশকিল। আজকাল মেডিক্যাল সায়েন্সের দৌলতে ছেলেরা যে হারে মেয়ে হচ্ছে, আর মেয়েরা ছেলে, তাতে ওর শরীরটা ট্রান্সফর্মড হলেও হতে পারে। মদন রীতিমতো নারীপ্রেমী। কত মেয়ের হাত ধরে লীলাখেলা করেছে তা বোধহয় নিজেও গুণে রাখেনি। ওর অভিজ্ঞতা মিথ্যে বলবে না। ও যদি বলে থাকে লোকটার হাত মেয়েদের মতো মসৃণ আর গ্ল্যামারাস ছিল, তবে তা-ই ছিল। কিন্তু শরীরে যা-ই হোক, আসলে ও পুরুষই। এতখানি গ্রুসাম খুন, লোককে ধরে ধরে কচুকাটা করা, একজন নারীর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।”
“বার্নিং শিখ ওকে তেড়ে কেন গিয়েছিল, সেটা অবশ্য বুঝেছি।” সে বলল, “প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী কোনো ক্রিমিনালই রাখতে চায় না। আমরা যদি না থাকতাম, তবে নির্ঘাৎ মদনও পুড়ে মরত, বা কয়েক পিসে ছড়িয়ে থাকত।”
“হ্যাঁ। ওর খুন হওয়ার চান্স প্রবল ছিল। আরও একটা ভাইটাল পয়েন্ট, লোকটা দিল্লি স্পেশ্যাল হিন্দিতে কথা বলছিল। এই অঞ্চলের সঙ্গে ভাষার হেরফেরের ব্যাপারটা আমিও জানতাম। তবে মদন অনেক বেশি স্পেসিফিকালি বলল। ওর এই ডিডাকশনটাও মিথ্যে নয়। প্রতিভাবান বদমায়েশ হওয়ার এটাই সুবিধা। তারা অনেক বেশি খবর রাখে ও জানে। ভাষাটা যদি দিল্লির হয়, তবে লোকটাও দিল্লিরই।” অধিরাজের মুখে চিন্তার ছাপ, “মদনের বয়ানটা একদম নিখুঁত। এমনকি যে স্মেলের কথা বলেছে, সেটাও। কিন্তু এখন সেটাই খুব বড়ো হেঁয়ালি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মদনের পরই তুমি আর আমি ক্রাইমসিনে ঢুকেছিলাম। আমরা দু-জনেই স্বচক্ষে দেখেছি সেখানে কোনো খড়-বিচালি অথবা কুশপুত্তলিকা জাতীয় কিছুই ছিল না! শুধু সেখানেই নয়, দিল্লি, কানপুর, বেঙ্গালুরুর কোনো ক্রাইমসিনেই ঘাস, খড়, পাতা, কোনও কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। সবক-টা মার্ডার শহরাঞ্চলে ঘটেছে, আশেপাশে মাঠও ছিল না। জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠীর বাড়ির সামনে অবশ্য অনেকটা ফাঁকা জায়গা ছিল, কিন্তু সেটাকে মাঠ ঠিক বলা যায় না। তবে মদনা যে স্মেলটার কথা বলছে, সেটা এল কোথা থেকে!”
“বার্নিং শিখ লোকগুলোকে পোড়াতে ইউজ করেনি তো?” অর্ণব একটু ভেবে বলে, “খড় কিন্তু জ্বালানি হিসাবে মারাত্মক।”
“হ্যাঁ। কিন্তু যেখানে হাতের কাছে কুড়ি লিটার কেরোসিন মজুত আছে, টায়ারও ইউজ হচ্ছে সেখানে কেউ খড়-বিচালি ইউজ করবে কেন? কোনো লজিক নেই!” সে মাথা নাড়ল, “অত সহজ ব্যাপার মোটেই নয়। তবে ‘স্মেল’ শব্দটা আমায় সত্যিই ভাবাচ্ছে!”
“স্মেল?”
“ইয়েস অর্ণব।” অধিরাজ ধোঁয়ার রিং বানাতে বানাতে আস্তে আস্তে বলে, “ডক বারবার জানতে চাইছিলেন, ক্রাইম স্পটে আমরা কোনো সন্দেহজনক স্মেল পেয়েছিলাম কিনা। লাইক ক্লোরিন বা ব্লিচিং পাউডার, কিংবা অন্য কিছু। যথারীতি আমি ‘না’-ই বলে বসে আছি, কারণ সত্যিই আমরা তেমন কোনো গন্ধ পাইনি। যদি পেতামও তবু তুমি বা আমি গন্ধটাকে আইডেন্টিফাই করতেই পারতাম না! তুমি কখনও দেখেছ কিনা জানি না, আমি খড় তেমন দেখিইনি, গন্ধ তো দূর। কিন্তু মদন হালকা হলেও একটা স্মেল পেয়েছিল, এবং ও সেটাকে শনাক্তও করেছে। তোমার মনে হয় না, এটা আমাদের এই মুহূর্তেই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের জানানো উচিত?”
“কিন্তু একটা গ্যাংস্টারের ছোট্ট একটা কথার ওপর বিশ্বাস করা কি ঠিক হবে? ওর তো ভুলও হতে পারে।”
“হ্যাঁ। তার সম্ভাবনা আছে।” তার গভীর দৃষ্টি কিছু যেন খুঁজছে, “তবু একটা চান্স নিয়েই দেখি। কারণ এখন আটচল্লিশ ঘণ্টারও কম সময় হাতে আছে। ঠিক হোক কী ভুল, প্রত্যেকটা ছোটো ছোটো ডিটেলিং আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের হাতে সময় নেই ঠিকই, ফরেনসিকের হাতে আরও সময় নেই! একটা বডিকে ডিটেইলস পোস্ট-মর্টেম করতেই কমসে কম চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা লাগে। আমাদের টাক-বাবু অনেক দ্রুত কাজ করেন বলে অনেক কম সময়েই কাজ সেরে ফেলেন। কিন্তু যেখানে একের পর এক লাশ ঢুকেই যাচ্ছে এবং মেইন মার্ডার ওয়েপনই অজানা সেক্ষেত্রে তিনজন বিশারদের অবস্থা একবার ভেবে দেখো। প্রত্যেকটা লাশের টপ টু বটম একটার পর একটা টেস্ট চালিয়ে যাচ্ছেন ওঁরা। প্রত্যেকে যদি সুপারম্যানের মতো দ্রুতবেগেও কাজ করেন, তবুও আটচল্লিশ ঘণ্টা এনাফ নয়।” বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “ভিডিও কলে ধরো তো ডঃ চ্যাটার্জিকে। উনিই বারবার স্মেলের কথা জানতে চাইছিলেন। ওঁকে বলে দেখি।”
অর্ণব সামান্য নড করে ডঃ চ্যাটার্জিকে ভিডিও কল করল। প্রথমবার উনি ফোনটা ধরলেনই না। সে নাছোড়বান্দার মতো আবারও ট্রাই করে। এবার কাজ হল। ওপ্রান্তের দৃশ্য মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ঠিকই, কিন্তু যা উঠল সেটা দেখে দুই অফিসারই প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ডঃ চ্যাটার্জির ভয়াবহ মুখ দেখতে পাওয়ার কথা। অথচ স্ক্রিনে একটা চকচকে পদার্থ! সেটা যে কী ভগবানই জানেন। অধিরাজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “ডক, এটা কী! ফরেনসিক ল্যাবে কি অ্যালিয়েন আক্রমণ হয়েছে? এত অবিকল ইউ এফ ও’র মতো কী যেন একটা!”
ওপ্রান্ত থেকে ডঃ চ্যাটার্জির গজগজানি ভেসে এল, “তোমরা যা শুরু করেছ তাতে অ্যালিয়েনের বাবাও এখানে আসবে না! ছ-টা লাশ কি কম পড়েছিল যে আরও দুটো পাঠিয়ে দিয়েছ? একে খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি কীর্তন করছে, তার মধ্যে গোটা পলাশীর প্রান্তরই তুলে পাঠিয়েছ। একজনের যা অবস্থা, তাতে গোটা বডি সাইজে আনার জন্য বাবা মোস্তাফার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না! এ তো পুরো স্লাইস! এত বছরের কেরিয়ারে এই প্রথম ফরেনসিক টিম ডেডবডি কাটাছেঁড়া করছে না, উলটে জোড়া লাগাচ্ছে। হরি হরি!”
“চিন্তা করছেন কেন?” সে শান্তস্বরে বলল, “বাবা মোস্তাফা না থাকলেও বেবি মোস্তাফি আপনার ল্যাবেই আছেন। মিস সেলাই এক্সপার্ট। তাঁকেই ধরুন না!” “তিনিই ইসমাইলকে সাইজ করার চেষ্টা করছেন।”
তিনি জানালেন। তবে এবার স্ক্রিনে ইউ-এফ-ওর জায়গায় চাঁদ ভেসে উঠেছে দেখে অধিরাজ কপাল চাপড়ে বলল, “হে ঈশ্বর। ডক, আপনি ফোনটাকে টাকের ওপরে ধরেছেন কোন আক্কেলে? তাই ভাবছি, আপনার চাঁদমুখের বদলে চাঁদমারি ভাসছে কেন!”
“টাক!” ডঃ চ্যাটার্জির ভয়ার্ত স্বর ভেসে এল, “তোমরা ফোনের মধ্য দিয়ে আমার টাক দেখছ কী করে!”
“দেখতে পাচ্ছি কারণ এটা ভিডিও কল।”
ভদ্রলোক প্রায় অসহায়ের মতো ডাকলেন, “আহেলি, ব্রকোলি, লিটল হেল্প প্লিজ!” দুই অ্যাসিস্ট্যান্টের মধ্যে কেউ এল কিনা বোঝা গেল না। কিন্তু এক মিনিট দশ সেকেন্ড পর মোবাইলটা একটু নড়ল। এখন ইউ-এফ-ও বা গ্রহ-উপগ্রহ নেই ঠিকই, কিন্তু দু-খানা বড়ো বড়ো গুহা দেখা যাচ্ছে। মোবাইল মহাকাশ থেকে নামলেও কোনো পর্বতে-কন্দরে আটকে গিয়েছে। বেচারি অধিরাজের কপালে হাত, “টাকের বদলে এখন নাক! ইনফ্যাক্ট নাকও নয়, নাকের ফুটো। মোবাইলটাকে মুখে না লাগিয়ে একটু দূরে রাখুন। নয়তো আমরা দু-জনেই আপনার নাকের গর্তে সেঁধিয়ে যাচ্ছি।”
“এইসব পেজোমি বন্ধ করো!” ডঃ চ্যাটার্জির বিরক্তিমাখা স্বর শোনা গেল, “এই যে, মিস্ ব্রকোলি। ক্যামেরাটা তাক করার জন্য আপনি আমার নাকটাকেই পেয়েছিলেন?” “স্যরি… এক্সট্রিমলি স্যরি স্যার….!” আইভি’র নার্ভাস কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “আমি বুঝতে পারিনি…!”
এবার ক্যামেরা যথাস্থানে এল। ডঃ চ্যাটার্জির খানদানি বদন দেখা যেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অধিরাজ, “যাক, পজিশনে এসেছে। ওদিককার খবর কী?”
“ইসমাইলের ব্লাডে কড়া সেডেটিভের ট্রেস আছে। রকিরও তাই। মানে সেই পুরোনো মেথড আর কী।” ভদ্রলোক বললেন, “রকিকে অজ্ঞান অবস্থাতেই কেরোসিন ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে দিয়েছে। ওর মৃত্যুতে আর কিছু ইউজ হয়নি। তবে ইসমাইলের পেটে অ্যালকোহলও পাওয়া গিয়েছে। ও পাবলিক ড্রিঙ্ক করছিল। দেশি মাল। তবে ড্রিঙ্কের মধ্যে সেডেটিভ ছিল না। কীসে ছিল এখনও বুঝতে পারিনি। বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার পর অ্যাজ ইউজুয়াল প্রথমে গলা ধড় থেকে নামিয়ে দিয়েছে, তারপর বাকিটা। যেভাবে দিল্লিতে সিকিউরিটি গার্ডদের মারা হয়েছিল, সেম স্টাইল। বাট রাজা, দুটো মৃত্যুই খুব বেশিক্ষণ আগে হয়নি। রকির খুন হয়েছে সাড়ে তিনটে নাগাদ। আর ইসমাইলের মার্ডারটা হয়েছে আন্দাজ চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে। তার আগেই ও বাদাম আর ডালমুট খেয়েছিল যেগুলো হজম হয়নি। ইনফ্যাক্ট ওর পাকস্থলীতেও কিছুটা আনডাইজেস্ট অ্যালকোহল এখনও রয়েছে। তবে এতটাও নয় যে নেশায় বেহুঁশ হবে। সম্ভবত অজ্ঞান হওয়ার কারণ চড়া মাত্রার সেডেটিভই।”
“কিউরি-অ-সা-র অ্যান্ড কিউরি-অ-সা-র।” অধিরাজের মুখে চিন্তার মেঘ, “বাদাম বা ডালমুট মদের সঙ্গেই লোকে স্ন্যাকস হিসাবে খায়। হজম যখন হয়নি, তার মানে মদ খাওয়ার পরপরই ও মারা গিয়েছিল। তার অর্থ মোটামুটি এই দাঁড়ায় ও বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার পর খুনি আর অপেক্ষাই করেনি। তৎক্ষণাৎ মেরেছে।”
“হ্যাঁ। এতে আশ্চর্যের কী আছে?”
“আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে সময়টা। চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে ডেথ হলে মদ ও ঠিক ঐ সময়েই খেয়েছিল। যেহেতু স্টমাকের মধ্যেও অ্যালকোহল আছে, তার মানে মৃত্যুর আগেও সে মদ্যপান করছিল। মানে, চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যেই হয়তো মদের লাস্ট পেগটা খেয়েছে। এখানে আপনার খটকা লাগছে না?”
“খটকার কী আছে?” তিনি গজগজ করেন, “মাতালদের মদ খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো টাইমিং নেই। ওদের কাছে সকাল, দুপুর, রাত, সবসময়ই অ্যালকোহল আওয়ার।”
“অন্যান্য মাতালদের না-ই থাকতে পারে। কিন্তু ইসমাইলের ব্যাপার আলাদা। ও ড্রিঙ্ক করে সেটা আমি কেন, অফিসের সবাই জানে। কোন দেশি মদের ঠেকে বসে মাল টানে তাও বলতে পারি। ওর বাড়ির কাছেই ‘জন্নত’ নামের একটা দেশি মদের ঠেক আছে। সেখানেই ও রাতের বেলা খুব পরিমিত নেশা করে। আপনি যে ওর পেটে প্রচুর অ্যালকোহল পাননি সেটাই স্বাভাবিক৷ প্রণবেশদা ওখানেই ওর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিট করেন। ইসমাইল এতটা ওভারলোডেড কখনোই হয় না যে বেহুঁশ হয়ে যাবে। সতর্ক মদ্যপায়ী। তার ওপর জন্নত রাত এগারোটার পর বন্ধ হয়ে যায়। তবে ও মদটা কোথায় বসে খাচ্ছিল? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে ওখান থেকে বোতল নিয়ে অন্যত্র বসে খাচ্ছিল, সেক্ষেত্রেও ঐ ভোরের সময়টায় ও মদ খাবেই না।”
“কেন খাবে না শুনি?” ডঃ চ্যাটার্জি ভুরু কুঁচকেছেন, “ইন্ডিয়ান পিনাল কোডে লেখা আছে বুঝি?”
“আই পি সি সেকশনে লেখা না থাকলেও এটা অলমোস্ট অলিখিত নিয়ম। ইসমাইল জাতে মুসলিম। আর ভোরের বা ফজরের আজানের টাইমিং ঠিক ঐ সময়ের আশেপাশেই। সাড়ে চারটে টু পৌনে পাঁচটার মধ্যেই ভ্যারি করে। শুধু ইসমাইল কেন, অতি বড়ো বজ্জাত, মদ্যপ, উচ্ছৃঙ্খল ইসলামধর্মীও ঐ টাইমিং-এ কিছুতেই মদ স্পর্শ করবে না! তবে ইসমাইলের পেটে অ্যালকোহল কেন?”
এইবার ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন ডঃ চ্যাটার্জি। বিভ্রান্ত স্বরে বললেন, “তাই তো এটা তো ভাবিনি! যতই মদ্যপ বা লম্পট হোক, কোনো মুসলিম ভোরের আজানের ঠিক আগেই মদ খায় না। ইন ফ্যাক্ট, মদ্যপান ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী ‘হারাম’। কিন্তু তারপরও অনেকেই সুরার সেবন করে। তবে আজান বা নামাজ পড়ার আগে কেউ মাল টেনে বসে আছে তা অন্তত আমি কখনও শুনিনি। তবে? কেসটা কী হল?”
“কেসটা গড়বড় ডক।” অধিরাজের চোখ যেন জ্বলছে, “ওর দেহ তো কয়েক টুকরোয় পাওয়া গেছে। পাকস্থলীটা পুরোপুরি আস্ত ছিল? পেটটা কি আস্ত রয়েছে?”
“অলমোস্ট।” তিনি ইতিবাচক মাথা নাড়লেন, “বুক আর পেটের দুটো টুকরো হয়েছে। তবে ভেতরের অর্গ্যানগুলো আস্তই আছে। হার্ট, লাংস, স্টম্যাক, কিডনি, সবই এক পিসেই রয়েছে। সবচেয়ে বেশি টুকরো হয়েছে হাত আর পা। আহেলি সেগুলোকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছে। গোটা দেহটা রি-কনস্ট্রাক্ট করতে পারলে হয়তো আরও কিছু বলতে পারব।”
“মিস্ মুখার্জি গোটা বডিটাকে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন সেটা ভালো সংবাদ।” অর্ণব লক্ষ্য করল অধিরাজের কণ্ঠস্বরে প্রবল সংশয়, “কিন্তু আমার মনে হয় না তিনি সেটা পেরে উঠবেন!
“রাজা!” ডঃ চ্যাটার্জি ধমক দিলেন, “তুমি পার্সোনালি মিস্ মুখার্জিকে অ্যাংরি বার্ড, বাবা মোস্তাফা, যা খুশি বলো। কিন্তু মেয়েটার যোগ্যতার ওপর সন্দেহ করতে পারো না। শি ইজ আ ভেরি গুড ফরেনসিক এক্সপার্ট।”
“ডক, আমি মিস্ মুখার্জির যোগ্যতা নিয়ে আদৌ সন্দেহ প্রকাশ করছি না!” তার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ, “ইনফ্যাক্ট ওঁর সেলাই করার দক্ষতা তো প্রশ্নাতীত। কিন্তু উনি পুরো বডিটা তখনই জোড়া লাগাতে পারবেন, যখন বডি পার্টসগুলো একটাই মানুষের হবে।” “কী!”
ফরেনসিক বিশারদ যেন কয়েকমুহূর্তের জন্য প্রস্তরীভূত হলেন। একটা শব্দও তাঁর মুখ থেকে বেরোচ্ছে না। কিছুক্ষণ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, “তুমি বলতে চাও, এটা একটা বডি নয়? একাধিক লাশ?”
, “ইয়েস ডক।” তার কণ্ঠস্বরেও চাপা আতঙ্ক, “যদি আমি ভুল করে না থাকি, তবে অন্তত পেটসহ স্টমাকের পোর্শনটা ইসমাইলের নয়। ওটা অন্য কারোর। আমরা ভাবছি দুটো খুন হয়েছে। আসলে দুটো নয়, তিনটে খুন হয়েছে। তারও বেশি হতে পারে…।”
“স্যা-র!”
অধিরাজ আরও কিছু বলার আগেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল উত্তেজিত আহেলি মুখার্জির চেহারা। প্রায় ঝড়ের বেগে এসে উপস্থিত হয়েছে সে। তার মুখের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায় যে মেয়েটি ঠিক কী পরিমাণ বিচলিত। হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে সে ডঃ চ্যাটার্জিকে বলল, “ও বডিকে জোড়া দেওয়া সম্ভব নয়। ওটা একজনের লাশ নয়, একাধিক লোকের লাশের পিস।”
“হোয়াট!” ডঃ চ্যাটার্জি তার দিকে তাকিয়েছেন, “তুমি শিওর?”
“ড্যাম শিওর।” সে বিচলিত স্বরে জানায়, “ইসমাইলের বুকের সঙ্গে পেটের সাইজের কোনো মিলই নেই। ওর ছাতির সাইজ অনুযায়ী পেট আর কোমর যতখানি চওড়া হওয়ার কথা, এই পেটের টুকরোটা তার থেকে অনেক কম। ইসমাইল যদি অফিসার ব্যানার্জির মতো গ্রীক গড মার্কা পারফেক্ট ভি শেপড় কোমরও রাখে, তাও ওর কাঁধ, বুকের অনুপাতে বডি স্ট্যাটিসটিক্স অনুযায়ী কোমর আরও কয়েক ইঞ্চি চওড়া হবে। কিন্তু এই কোমরের সাইজটা অলমোস্ট জিরো ফিগারের নায়িকাদের কোমরের চেয়েও বেশি পাতলা। হিউম্যান অ্যানাটমি আর ফিজিওলজি অনুসারে ইসমাইলের হওয়া অসম্ভব। বুকের সঙ্গে যাচ্ছেই না!”
আহেলি মুখার্জি খেয়াল করেনি যে দুই অফিসারই ভিডিও কলে আছে ও সবই তারা দেখতে বা শুনতে পাচ্ছে। ‘গ্রীক গড মার্কা পারফেক্ট ভি শেপড কোমর’ শুনে অর্ণব জুলজুল করে অধিরাজের দিকে তাকাল। অধিরাজ অবশ্য কথাটা শুনতে পেলেও অগ্রাহ্য করল। সে গম্ভীর স্বরে বলে, “আর কিছু গোলমাল মিস্ মুখার্জি?”
এতক্ষণে আহেলি ব্যাপারটা খেয়াল করল। কয়েক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুতও হয়েছে। তার মুখে লজ্জার একটা রক্তিমাভা দেখা দিলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ। দুটো হাতের মধ্যেও কোনো মিল নেই। একটা হাত মোটা আর বেঁটে, অন্যটা রোগা আর লম্বা৷ একটা লোকের দুটো হাতের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ইভেন কাঁধের সঙ্গে লেফট হ্যান্ডটা ফিটই হচ্ছে না! পায়েও গোলমাল। দুটো পায়ের মধ্যে একটা ইসমাইলের। অন্যটা কার তা আমার জানা নেই।”
“মাই গড়!” ডঃ চ্যাটার্জি বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সব শুনছিলেন। এবার বললেন, “তোমার ডিডাকশন হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট রাজা! আদতে তবে ক-টা লোকের বডি পার্টস আছে ওখানে?”
অধিরাজ কিছু বলার আগেই আহেলি বলে উঠল, “মোস্ট প্রব্যাবলি দু-জন। শিওরলি বলা মুশকিল, কারণ ডিটারমিন করার জন্য ডি.এন.এ. টেস্ট করতে হবে। তবে পেট, লেফট হ্যান্ড আর রাইট লেগের মালিক সম্ভবত একজনই। কারণ এই তিনটে পার্টের মালিকই অসম্ভব রোগা, ব্লাড স্যাম্পলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অত্যন্ত কম, মাত্র সিক্স পয়েন্ট নাইন। ইসমাইলের বয়েস আন্দাজ পঞ্চান্ন। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তির বয়েস কোনোমতেই চল্লিশের বেশি নয়। ইসমাইলের হাতের নখে এক চিলতে পানের আঁশ, চুনের দাগ পেয়েছি। আবার এই আননোন ব্যক্তিটির হাতে কাঁচা ডিম আর পিঁয়াজের তীব্র গন্ধ আছে। সোজা কথায় খুন হওয়ার আগে সে রান্না করছিল বা রান্নার প্রিপারেশন নিচ্ছিল। লেফট হ্যান্ডের পামে এখনও গুঁড়ো তামাক এবং নিকোটিনের ট্রেস আছে। সে খৈনি খেয়েছিল। তারপর যখন মদের বোতল নিয়ে বসেছিল তখনও হাত ঠিকমতো ক্লিন করেনি। যদি লোকটা চারটে নাগাদ বোতল নিয়ে বসে থাকে, তবে তার আগেই সে রান্না করে এসেছিল বা রান্নার সমস্ত ইনগ্রেডিয়েন্টস রেডি করেছিল। আর আলো ফোটার আগে যারা রান্না সেরে নেয়, তারা সাধারণ মানুষ বলে আমার মনে হয় না। ইভেন প্রোফেশনাল কুকরাও এত তাড়াতাড়ি ডিউটিতে যায় না। অবশ্য হসপিটালের কুক হলে অন্য কথা। সেক্ষেত্রে হাতের হাইজিনও তার বজায় রাখার কথা, এক্ষেত্রে তা ছিল না!”
আহেলির বক্তব্য শুনে ফিজিক্যালি ও ভার্চুয়ালি উপস্থিত সকলেরই মুখে বিস্ময়মিশ্রিত বিহ্বলতা। ডঃ চ্যাটার্জি কোনোমতে বললেন, “এর মানে কী! দুটো লোকের বডি টুকরো টুকরো একসঙ্গে মিশিয়ে খোদ পুলিশকেই প্রেজেন্ট করার অর্থ কী! পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে চায়?”
“না ডক!” অধিরাজের চোখ যেন জ্বলছে, “ইনি রীতিমতো জিনিয়াস মার্ডারার। সে জানত যে পুলিশ আপাতদৃষ্টিতে বিশেষ ফারাক বুঝবে না, এবং যেহেতু মাথাটা ইসমাইলের, সেহেতু ওটা ইসমাইলের বডি হিসাবেই ধরে নেবে। কিন্তু তার সঙ্গে সে এটাও জানে যে এই গোঁজামিল দেওয়া লাশটা যে একজনের নয় তা ফরেনসিক এক্সপার্টরা খুব সহজেই ধরে ফেলবেন, যেমন মিস মুখার্জি বুঝেছেন। পুলিশকে এভাবে বোকা বানানো সম্ভব। কিন্তু ফরেনসিক এক্সপার্টদের নয়!”
“তাহলে খামোখা একটা থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারের লাশ ঢুকিয়ে দেওয়ার মানে কী!” তিনি মাথা নাড়ছেন, “দুটো খুন অলরেডি করেছে। তিননম্বরটা করলেও পুলিশ তার থেকে বেশি শকড হবে না। একটা অপরিচিত ব্যক্তির লাশ নিয়ে ফরেনসিক বা কী করবে?”
“অপরিচিত ব্যক্তির লাশ নিয়ে কিছু করার নেই।” তার কণ্ঠস্বর আশঙ্কিত, “কিন্তু লাশটা যদি অপরিচিত ব্যক্তির না হয়?”
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে তিন ফরেনসিক এক্সপার্টের বিস্মিত কণ্ঠ একসঙ্গে ভেসে এল, “মানে?”
“বার্নিং শিখ আজ পর্যন্ত কোনো খুন বিনা কারণে করেনি। সে যাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়, তাদের অ্যাটাক করে। যারা তার শত্রুকে নিরাপত্তা দেয়, তাদেরও খুন করে। এমনকি এবার সে খবরিদেরও ছাড়েনি। সোজা কথায়, ইনভেস্টিগেশনে যারা কোনো না কোনোভাবে যুক্ত বা তার মিশনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদেরই রাস্তা থেকে সরাচ্ছে। তার জন্য সে প্যাটার্নও ভাঙছে, বিলো দ্য বেল্ট হিটও করছে। সে সি.আই.ডি. হোমিসাইডকে আতঙ্কে রাখার জন্য, রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সব করবে, কিন্তু যার এ সবের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই, পথচলতি কোনো পথিককে র্যান্ডম কচুকাটা করবে না। তাতে কোনো লাভ নেই। শহরে বড়োজোর আতঙ্ক ছড়াতে পারে, তার বেশি কারোর কিছু হবে না। টোট্যালি মিনিংলেস। এরকম অর্থহীন কাজ বার্নিং শিখ খামোখা করতেই বা যাবে কেন!” অধিরাজ নীচু স্বরে বলে, “আই অ্যাম অ্যাফ্রেড, তৃতীয়জন আমাদের একেবারেই অপরিচিত নয়। ইনফর্মারদের মৃতদেহ সে পুলিশকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। তার সঙ্গে আরও একটা জোরদার ধাক্কা দিয়েছে যেটা পুলিশ বা আমাদের জন্য নয়।”
“যাচ্চলে! তবে কার জন্য?”
অধিরাজের মুখ বিষাদে অচ্ছাভ। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “এই ট্যুইস্টটা আপনাদের জন্য স্যার। সে জানত যে পুলিশ গোটাটা ইসমাইলের বডি ভেবে সোজা ফরেনসিক ল্যাবেই পাঠাবে। আর এটাই লোকটা চেয়েছিল। সে শুধু দেহাংশই পাঠায়নি, গোটা ফরেনসিক টিমকেই মেসেজ পাঠিয়েছে।”
“আমি স্টিল কনফিউজড!” ডঃ চ্যাটার্জি বিহ্বল, “কী বলতে চাইছ তুমি?”
সে আরও কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকল। যেন ভেতরে ভেতরে শক্তিসঞ্চয় করে নিল।
তারপর বলল, “মিস্ মুখার্জি আর মিস ভট্টাচার্যের বাড়ির সবাই ঠিক আছেন তো?” কথাটা শোনামাত্রই যেন ল্যাবে বিস্ফোরণ হল। আহেলি আঁতকে উঠেছে, “কী বলছেন আপনি। এই জাস্ট দু-মিনিট আগে আমি মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছি।”
“ওকে ফাইন। ডোন্ট ওরি। মিস্ ভট্টাচার্য?”
আইভির মুখ ফ্যাকাশে। সে ভীষণ ত্রাসে বলল, “বাড়িতে এখনও ফোন করিনি। বাট আমার বাবা-মা, ঠাম্মি-দাদাই, কাকু-কাকিমা, ওরা কেউ আর্লি রাইজার নন বা আর্লি ব্রেকফাস্ট করেন না। দশটার আগে ওঁদের ঘুমই ভাঙে না। তাছাড়া আমাদের ফ্যামিলির সবাই অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। ডিম বা মদ খাওয়া তো দূর, স্পর্শই করেন না! আমি নিজেও ভেজ খাই।”
ব্রকোলির রহস্য কিছুটা হলেও বোঝা গেল। কিন্তু অধিরাজ এবার মর্মান্তিক দৃষ্টিতে ডঃ চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি সেটা লক্ষ্য করেই ভয়ে কাঁটা হয়ে উঠলেন, “তুমি আমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছ কেন রাজা? আমি একা মানুষ। থাকার মধ্যে আছে এক ভাই আর ভাইপো। কিন্তু অসিত কয়েকদিন আগেই ইউ.এস.এ. তে একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে গেছে। কুক্কুও ওর বাবার সঙ্গেই আমেরিকা ঘুরছে। ওরা কেউ হতেই পারে না!”
“ঈশ্বরের অশেষ কৃপা যে তৃতীয় ব্যক্তিটি ওরা কেউ নন। আপনার আধপাগল ভাই আর যা-ই হোক, দেশি মদ বা খৈনির মতো জিনিস খান না। তাঁর স্বাস্থ্যও আপনার মতোই, সুতরাং জিরো ফিগারের কোমর হতেই পারে না। আর কুক্কু তো বাচ্চা ছেলে।” সে সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে বলল, “কিন্তু একটু আগেই আপনি বললেন যে আপনার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। সেটা তো হওয়ার কথা নয় ডক! আপনি তো সকাল ছ-টার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট সেরে নেন। আর এখন প্রায় সাতটা বাজতে যায়!”
কথাটা শোনামাত্র হতবাক হয়ে যান ডঃ চ্যাটার্জি। অধিরাজ সত্যি কথাই বলছে। বার্নিং শিখের মোডাস অপারেন্ডি দেখে এই মুহূর্তে সবাই খাদ্য ও পানীয় নিয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করছে। পবিত্র আর প্রণবেশ লাহিড়ী রেস্টোর্যান্টের খাবার খান ঠিকই, কিন্তু খাবার প্রিপারেশনের সময় কুকের নাকের কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর কখনোই রেস্টোর্যান্ট রিপিট করেন না। ব্রেকফাস্ট এক জায়গায় করলে লাঞ্চ অন্যত্র, ডিনারও অন্য জায়গায়। বসে খাওয়ার গল্পই নেই, প্যাক করিয়ে নিয়ে দু-জনেই নিজেদের ডেরায় ফেরেন। অর্ণব আর অধিরাজকেও বাইরে খেতে হলে ওরাও সতর্ক থাকে। চা-কফি খেলেও র্যান্ডম কফি শপ বেছে নেয়। সিলড মিনারেল ওয়াটারের বোতল ছাড়া জল খায় না। মিস্ বোসের খাবারের যোগান পবিত্রই দেয়। আর আত্রেয়ী দত্ত নিজেই ওস্তাদ কুক। নিজের খাবার সে নিজেই বানিয়ে নেয়। কফি, দুধের প্যাকেট বা বিভিন্ন রেডি টু কুক স্ন্যাকস জাতীয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সে নিজের একটা ঢাউস ব্যাগে রাখে। বাকি যা রইল, চাল, ডাল, তেল বা কাঁচা বাজার, সেগুলো নিয়ে চিন্তা নেই। কাঁচা সবজি বা চালে কেউ সেডেটিভ মেশায় না। ফরেনসিক এক্সপার্টদের মধ্যে আহেলি আর আইভি ক্যান্টিনেই খেয়ে নেয়৷
ব্যতিক্রম শুধু ডঃ চ্যাটার্জি। তিনি সতর্কতার বিষয়ে আরও এককাঠি সরেস। তাঁর ব্রেকফাস্ট থেকে লাঞ্চ, ডিনার, স্ন্যাকস, সবই বাড়ি থেকে আসে। তাঁর বহুবছরের বিশ্বস্ত কুক এবং সর্বক্ষণের কম্বাইন্ড হ্যান্ড সনৎ একদম টাইম টু টাইম খাবার নিয়ে আসে ফরেনসিক ল্যাবে। ডঃ চ্যাটার্জির সংসার এবং স্বয়ং ভদ্রলোকটিকেও সে-ই সামলায়। অসম্ভব প্রভুভক্ত ও বিশ্বস্ত এই মানুষটি একাধারে ফরেনসিক বিশারদের সন্তানসম, অন্যদিকে গার্জিয়ানও বটে। তার হাতের রান্না ছাড়া অসীম চ্যাটার্জির মুখে অন্য কিছু রোচে না! তিনি যখন দিনের পর দিন ল্যাবেই থাকেন, তখন সনৎই তাঁকে একদম সময়মতো খাবার দিতে আসে। কোনোদিন সময়ের এদিক ওদিক হয় না। অথচ আজ সে এখনও এসে পৌঁছয়নি।
তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো তখনও মূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আহেলির বলা কথাগুলো তাঁর কানে ভাসছে। শীর্ণ দেহের মানুষ!… রক্তাল্পতায় ভোগা শরীর।… কাঁচা ডিম ও পেঁয়াজের গন্ধ!…ডঃ চ্যাটার্জির অভ্যাস ব্রেকফাস্টে ব্রেড, সসেজ আর বড়োসড় একটা ওমলেট খাওয়ার… হাত ঠিকমতো না ধোওয়ার অভ্যাস… ছেলেটাকে বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন তিনি… চল্লিশের কাছাকাছি বয়েস… দেশি মদ…! নরমে গরমে অনেক বুঝিয়েও ছাড়াতে পারেননি… সুযোগ পেলেই দেশি মদ খেতে বসে যায়… ঘণ্টায় ঘণ্টায় খৈনি খাওয়ার অভ্যাস…! মিলে যাচ্ছে… একেবারে খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। ওঃ…. ঈশ্বর।।
কয়েকমুহূর্তের স্তব্ধতা। পরক্ষণেই হাহাকার করে উঠলেন ডঃ চ্যাটার্জি, “সনৎ…স-ন-ৎ। ওঃ…।”
পরক্ষণেই তিনি হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন ক্যামেরার ফ্রেম থেকে। অধিরাজ ভিডিও কলটা অফ করে দিয়ে উত্তেজিতভাবে বলল, “চলো অর্ণব, এক্ষুনি ডঃ চ্যাটার্জির বাড়িতে পৌঁছতে হবে। কু-ই-ক!”
দুই অফিসারও তড়িঘড়ি প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ব্যুরো থেকে। ব্যুরোর বাকি অফিসাররা তাদের অবস্থা দেখে অবাক। দু-জনেই এমন পাগলের মতো দৌড়চ্ছে কেন, তা তাদের মাথায় ঢোকেনি। বাইকে বসতে বসতে অধিরাজ বলল, “কে জানে, ডক একাই গিয়েছেন, না সঙ্গেও কেউ গেল। মিস্ মুখার্জিকে ফোন করো তো… ইমিডিয়েটলি…!”
খুব বেশি কথা বলার সুযোগ না পেলেও আহেলি সংক্ষেপে জানাল যে ডঃ অসীম চ্যাটার্জির সঙ্গে ওরা দু-জনেই আছে। ডঃ চ্যাটার্জির গাড়ি নেয়নি, র্যান্ডম ট্যাক্সি হায়ার করেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কিছু বলার মতো পরিস্থিতিতেই নেই। শুধু বিড়বিড় করে বলছেন, “সনৎ… হোয়াই?…ওকে কেন ….?”
“আমরাও স্পটে আসছি।” অর্ণব বলল, “ডঃ চ্যাটার্জি এখন কিছু বোঝার বা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। কিন্তু প্লিজ, আপনারা মনে রাখবেন, ওটা এখন ক্রাইমসিন হতে পারে।”
“ইয়েস, অফকোর্স।”
