(১৭)
“অর্ণব, এবার আরও জোরালো মারের জন্য প্রস্তুত থাকো। কোমল কৌরের মৃত্যুর প্রতিশোধে কোনো-না কোনোদিক দিয়ে হামলা খুব তাড়াতাড়িই আসতে চলেছে। আজকের রাতটা বিপজ্জনক। আজ ও মরণকামড় দেবেই। লেডি অফিসারদের আজ রাতে একা ছাড়া চলবে না। শহরের সমস্ত মেডিক্যাল স্টোরগুলোর সামনে দরকার পড়লে গোটা কলকাতা পুলিশের টিমকেই নামিয়ে দাও। একটা দোকানও যেন আগামী দু-রাতের মধ্যে কোনোরকমের ড্রাগ বা সেডেটিভ বিক্রি না করে। দরকার পড়লে এডিজি সেনকে অনুরোধ করো যাতে উনি এই বিষয়ে প্রেস কনফারেন্স করেন। বেঙ্গল কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশনকে ইনফর্ম করো, দ্য ইন্ডিয়ান ফার্মাসিউটিকল অ্যাসোসিয়েশনকেও চেতিয়ে দাও। প্রয়োজন হলে সমস্ত অফিসাররা সব কাজ শিকেয় তুলে প্রত্যেকটা ইললিগ্যাল ড্রাগ সাপ্লায়ার, ড্রাগ পেডলারকে তুলে আনুক, রাউন্ড আপ করুক, কিন্তু আজ আর কাল রাতে কোনোমতেই যেন একটাও ঘুমের ওষুধ, কোনোরকম ড্রাগ, লিগ্যাল অর ইললিগ্যাল, বিক্রি না হয়।”
অধিরাজ দ্রুত গতিতে ফরেনসিক ল্যাব থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নির্দেশ করল। তার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার রেখা। ঘন অক্ষিপল্লবে ঘেরা অপূর্ব চোখদুটোয় অব্যক্ত আশঙ্কা। ঘেমে নেয়ে একসা হয়েছে। ওর নতুন শার্টটাও রক্তে ভিজে গিয়েছিল। মাথাটা অনেকটাই কেটেছে। ব্লাস্টের ইমপ্যাক্টে ইটটা সজোরে এসে মোক্ষম বেগে লেগেছিল। তবে সৌভাগ্যের কথা আহেলি তার মাথার পরিচর্যা করে দিয়েছে। এই প্রথম মিস্ মুখার্জির স্পর্শে অধিরাজ আপত্তি জানায়নি, কোনোরকম ট্যাঁ ফোঁ-ও করেনি। বরং একটু সহজভাবে হাসার চেষ্টা করেই বলেছে, “থ্যাঙ্ক ইউ মিস্ মুখার্জি! এখন আপনিই আমাদের ভরসা!”
“এতে থ্যাঙ্কসের কিছুই নেই।” আহেলির মুখ গম্ভীর, “যে হারে আপনি নিজেকে কাটাছেঁড়া করতে শুরু করেছেন, ফলে বাবা মোস্তাফার ফেভারিট পেশেন্ট হবেন তাতে আর আশ্চর্য কী!”
ওরে বাবা! পাটকেল। অর্ণব সভয়ে অধিরাজের দিকে তাকায়। অধিরাজ একটু অপ্রতিভ, “স্যরি।”
“ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। শুধু একটিই উপকার করুন আমার।” আহেলির কথায় শশব্যস্তে বলে উঠল অধিরাজ, “ইয়েস… ইয়েস। আপনার ফ্যামিলির প্রোটেকশনের ব্যাপারটা তো? অলরেডি গার্ডরা চলে গিয়েছে। আপনার পরিবার সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।”
“ওটা কোনোরকম উপকার নয়, আপনার ডিউটি।” সে খুব ঠান্ডা গলায় বলে, “ওটা করতে আপনি বাধ্য, তাই কোনোভাবেই আমায় উদ্ধার করছেন না। বাট আমার আর একটা ফেভার চাই।”
“শিওর, বলুন।”
আহেলির বড়ো বড়ো টানা টানা চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ফুটে ওঠে, “আপনি কাঁধ কাটান, কপাল ফাটান, চাইলে হাত ফালা ফালা করুন। পায়েও গোটা কয়েক চিড়-ফাঁড়ও করতে পারেন। বাবা মোস্তাফা সবসময়ই সূঁচ-সুতো নিয়ে রেডি। কিন্তু দয়া করে মরবেন না! আহত-ক্ষতবিক্ষত সব চলবে। বাট কেসের শেষে অন্তত একপিসেই ফিরবেন। এই কৃপাটা করলে আমি নিজেই আপনাকে বিরিয়ানির ট্রিট দেব। সো প্লিজ, ডোন্ট ডাই!”
এটা সম্ভবত ভালোবাসা জানানোর চরম এক্সপ্রেশন। অর্ণবের এত দুঃখের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল। এত কাণ্ড, খুনোখুনির মধ্যেও ভালোবাসা সবসময়ই তিরতির করে বয়ে যায়। ভয়াবহ কয়েকঘণ্টার মধ্যে একমুহূর্তের সুখ! প্রচণ্ড লু এর মধ্যে একপশলা ঠান্ডা হাওয়া। তবে লোকটার মাথায় ঢুকলে হয়৷
“ইউ নো মিস্ মুখার্জি?…” সে মৃদু হাসল, আপনার ওষুধ প্রায় আপনার কথার মতোই জ্বালাময়ী! কপালটা জাস্ট জ্বলে যাচ্ছে! বাট, থ্যাঙ্কস এগেইন! বাই দ্য বাই, দুটো ডেডবডি থেকে নতুন কিছু বেরোল?”
অর্ণব হতাশভাবে মাথা নাড়ে। হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছে, গয়া ভঁইস পানি মেঁ! এ ব্যাটার কিছুতেই হবে না! হওয়ারই নয়। স্বয়ং কামদেবও ওনাকে বোঝাতে পারবেন না! উনি হায়ারোগ্লিফিক বুঝতে পারেন, রকেট সায়েন্স বুঝতে পারেন এমনকি ঠ্যালায় পড়লে জুলু, হিব্রু বা মার্শিয়ান কোডও বোধহয় বুঝবেন। কিন্তু প্রেমের ভাষা ওঁকে বোঝাতে পারে, এমন কেউ এ ধরাধামে জন্মায়নি।
আহেলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, “খুব সাংঘাতিক লিড কিছু নয়। তবে হয়তো প্রয়োজনে লাগতে পারে। শেষমেষ সনৎ আর ইসমাইলের ডেডবডি মোটামুটি জোড়া লাগানো গেছে। দু-জনের মৃত্যুর সময় কাছাকাছিই। কয়েক মিনিট বা বড়োজোর আধঘণ্টার ডিফারেন্স হবে। অসম্ভব ব্রুটাল মার্ডার। ইসমাইলের শরীরে স্ট্রাগলের কোনো চিহ্ন নেই। পেটে মদও নেই। তবে সনতের মুখে এখনও অনেকটা না চেবানো খৈনি রয়েছে। এইখানে একটা পজিটিভ নিউজ আছে। সনৎ স্ট্রাগল করেছিল। আর মানুষ যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য হাতাহাতি করে তখন অনেক সময়ে নখ দিয়ে আততায়ীকে আঁচড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি সেইজন্যই সনতের নখগুলো পরীক্ষা করে দেখছিলাম। সব নখ ক্লিন হলেও একটা আঙুলের তর্জনীতে কিছুটা স্কিন স্যাম্পল পেয়েছি। তাতে খুব বেশি না হলেও কিছু কিছু জিনিস ক্লিয়ারলি বোঝা গিয়েছে।”
“ব্রিলিয়ান্ট।” সে বলল, “যেমন?”
“আপনি মদনের মুখে বার্নিং শিখের গ্ল্যামারাস মোমপালিশ হাতের কথা শুনে চিন্তায় পড়েছিলেন না, যে লোকটা পুরুষ না মহিলা নাকি ট্রান্সজেন্ডার! কিংবা ওরকম একটা ভয়াবহ খুনির অত মসৃণ ফর্সা হাত কী করে হয়?” আহেলি হেসে ফেলল, “আপনার মদন সত্যিই মদন! ও ব্যাটা বুঝতেই পারেনি যে বার্নিং শিখের অত সুন্দর ফ্ল লেস স্কিন আদৌ স্কিনই নয়। ব্যাটা অবিকল স্কিন কালারের ক্রসড্রেসিং সিলিকন গ্লাভস পরেছিল! এই জাতীয় গ্লাভস পারফর্ম্যান্স প্রপস হিসাবেও ইউজড হয়। দেখতে এতটাই ন্যাচারাল যে, যে কেউ ওটাকে আসল স্কিন বলে ভুল করবে। আপনাকেও যদি পরিয়ে দেওয়া হয় তবে যারা দেখবেন, তারা অবাক হয়ে ভাববেন আই জি সাহেবের হাত এমন মেয়েদের মতো ওয়াক্স ও ম্যানিকিওর করা কবে থেকে হল! কিন্তু ওটাকে গ্লাভস বলে চিনতে তাদের রীতিমস্ত কষ্ট হবে। এমনকি গ্লাভসগুলোয় ন্যাচারাল লুকিং নখও থাকে। তাই যে কেউ ভুল করবে! সনৎ ওর হাত আঁচড়ে দিয়েছিল বলে সিলিকন গ্লাভসের একচিলতে নকল স্কিনের টুকরো সনতের নখে ঢুকে গিয়েছে। আমি পরীক্ষা করেই বুঝতে পেরেছি।”
“আই সি।” অধিরাজের চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে ওঠে, “তার মানে লোকটা আপাদমস্তক একজন পুরুষ যে মেয়েদের মেক-আপ নিতেও সিদ্ধহস্ত। এবং যখন সে ক্রাইমসিনে উপস্থিত ছিল, সেই মুহূর্তেও মেয়েদের গ্লাভসটা খোলেনি। এইজন্যই কোথাও তার ফিঙ্গারপ্রিন্টও পাওয়া যায়নি। গ্লাভস সে পরেছিল, তা আগেই বুঝেছিলাম, কিন্তু এমন অভিনব গ্লাভস পরার মানে কী! যে কোনো সস্তা দামের গ্লাভস পরলেই তো চলত।”
আহেলি মৃদু হাসল, “আপনার এই প্রশ্নের উত্তরেই আরও একটা ক্লু আছে। সেটা পুরুষেরা বুঝবে না, কিন্তু মেয়েদের পক্ষে বোঝা সম্ভব।”
“প্লিজ, এক্সপ্লেইন।”
“এই জাতীয় সিলিকন গ্লাভস পরে যদি কোনো পুরুষ মেয়ের ছদ্মবেশ নেয়, তবে তাকে হাই সোসাইটি গার্লের ছদ্মবেশ নিতে হবে। পুরুষ ড্রাইভার, মজুর বা ফাদারের হাত এমন গ্ল্যামারাস হওয়া সম্ভবই নয়, তাই ও সম্ভাবনা বাদ। এবার আসি মেয়েদের কথায়। কতজন লো-প্রোফাইলের মেয়ে, যেমন বাড়ির রাঁধুনী, নার্স, আয়া, ঠিকা কাজের লোককে আপনি ওয়াক্স বা পেডিকিওরের মতো হাই-ফাই স্টাইল মারতে দেখেছেন? বাসন মাজা, রান্না করা বা ঘর মোছার হাতে ম্যানিকিওর করা মানে অর্থ ধ্বংস করা! কোনো ‘নিডি মেয়ে’ তা করে না। ইভেন আত্রেয়ী বা মিস্ বোসও এভাবে রেগুলার পার্লার ভিজিট করার সময় পায় না, ওদের সময়ই নেই। আত্রেয়ী তো এসবের ধারই ধারে না, মিস্ বোস তবু করেন, তাও কালে ভদ্রে। তাই আপনার খুনি লো প্রোফাইলের মেয়ে নয়, নির্ঘাৎ হাই সোসাইটি ‘বেবস’-এর ছদ্মবেশ ধরেন। কোনো কারণে ঐ রূপটাও তাকে ধরতে হয়। হয়তো ব্যস্তসমস্ত হয়ে ত্রিপাঠীসাহেবের বাড়িতে ফার্স্ট মাস-মার্ডার করার সময়ে এবং সনৎকে খুন করার টাইমে তিনি হাতের সিলিকন গ্লাভস খুলে ফেলার প্রয়োজন বোধ করেননি। এবং আমার ডিডাকশন যদি ভুল না হয়, তবে রাতের দিকে তিনি নারীর রূপেই থাকেন। পি সি চৌধুরীর বাড়িতে তিনি কোন বেশে আছেন জানি না, কিন্তু আর্বানায় তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আত্রেয়ী ওভার ফোন আমায় যতটুকু বলেছে, তাতে ওখানে হাই সোসাইটি লেডিজদের ছড়াছড়ি! এমনকি ওদের কাজের মেয়েরাও অসম্ভব স্টাইলিশ! যে বাড়ির মেইড হীরের নাকছাবি, নেকলেস পরে, সেও হাই সোসাইটি লেডিদের থেকে কিছু কম যায় না। আপনি একটু কষ্ট করে আর্বানার মেয়েদের মধ্যে খুঁজুন, আমার ধারণা ওখানেই তাকে পেয়ে যাবেন।”
“ইউ নো মিস মুখার্জি।” অধিরাজ এবার উচ্ছ্বসিত, “ইউ আর আ জিনিয়াস। আর এর জন্য একটা রিটার্ন গিফট আপনার প্রাপ্য রইল। তবে সেটা পরে হবে। আপাতত আপনাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আমরা একজন লেডি অফিসারকে নিয়ে এসেছি। আরও একজন একটু পরেই আসবেন। প্রণবেশদার টিমের মেয়ে। প্রণবেশদা আপনাকে ফোন করে ছবি সহ তাঁর সমস্ত ডিটেইলস পাঠিয়ে দেবেন। আপাতত আপনি আমাদের নতুন টিমমেটটিকেও দেখে রাখুন। ইনি এখন এই কেসে আমাদের অ্যাসিস্ট করছেন। সন্ধ্যা সাতটার পর আপনার কাছে চলে আসবেন।”
“গ্রেট!” আহেলি এবার লাজুক হাসল, “কোথায় তিনি?”
“আপাতত বাইরে দাঁড়িয়েই পাহারা দিচ্ছেন। ব্লাস্টে সামান্য ইনজিওর্ডও হয়েছেন।” অধিরাজ জানাল, “আমরা ওঁকে একটু মেরামতির জন্য আমাদের সঙ্গেই আসতে বলেছিলাম। কিন্তু ওঁর আবার সিগারের নেশা আছে। তাই বাইরে দাঁড়িয়ে একটা পাশবালিশের সাইজের চুরুট ফুঁকছেন।”
আহেলি একটু অবাক, “এতক্ষণ ধরে চুরুট ফুঁকছেন। আপনারা এসেছেন প্রায় একঘণ্টা হতে চলল। এরমধ্যেও তাঁর সিগার শেষ হয়নি? গোটা কার্টনটাই ফুঁকছেন নাকি।”
“আরে, তাই তো!” এতক্ষণে অধিরাজের খেয়াল হল। তার কপালে ফের চিন্তার ভাঁজ, “একটা সিগার টানতে তো এত সময় লাগে না। হল কী। চলো তো অর্ণব…!” দুই অফিসারই একরকম পড়িমরি করে দৌড়েই ল্যাবের বাইরে গেল। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। বার্নিং শিখ যা খেল দেখাচ্ছে তাতে সে কখন কী করবে তার ঠিক নেই। কোন মুহূর্তে কী ঘটবে, কেউ জানে না। মিস্ অরোরা ডেয়ার ডেভিল ঠিকই, কিন্তু এই কেসে নতুন। সব কিছু ওর জানা নেই। তার কোনোরকম বিপদ হল না তো…!
একবুক ভয়াবহ আশঙ্কা ও আতঙ্ক নিয়ে অধিরাজ আর অর্ণব ল্যাবের বাইরে এল। কিন্তু কোথায় মিস্ অরোরা। একটু আগেও তো সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে দাঁড়িয়ে সিগার টানছিল। অথচ এখন সে সেখানে নেই। সব ভোঁ ভাঁ! মেয়েটা যেন আচমকাই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। চতুর্দিকের শূন্যতা যেন ওদের দু-জনের অবস্থা দেখে নীরবে ব্যঙ্গ করছে। কোথায় গেল টুইঙ্কল! এই একটু আগেও তো কথা বলছিল, গল্প করছিল! উত্তেজিত ব্যাকুল কণ্ঠে অধিরাজ ডেকে ওঠে, “মিস্ অরোরা! …মিস্ অ-রো-রা!” আতঙ্কে তার বুক প্রায় শুকিয়েই আসছিল। তবে আরও বেশি চিন্তায় পড়ার আগেই ছাতের দিক থেকে টুইঙ্কলের গলার আওয়াজ ভেসে এল, “এই তো স্যার। আমি এখানে, আসছি।”
এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল দু-জনেই। অর্ণব মনে মনে আরও খানিকটা চটেছে। এভাবে খামোখা ভয় দেখানোর কোনো মানে হয়? এই মেয়েটা একটুও কি সুস্থির থাকতে পারে না! এখনই হঠাৎ ছাতে যাওয়ার তার কী হল? টুইঙ্কলের বুটের খটখট আওয়াজ এখান থেকেই শোনা যাচ্ছিল। অর্থাৎ সে নীচের দিকে নেমে আসছে। ওরা দু-জনেই ওপরের স্টেয়ারকেসের দিকে তাকায়।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের সামনে মিস্ অরোরা প্রকট হল। কিন্তু তাকে দেখে একরকম ঘাবড়েই গেল অধিরাজ। অর্ণব আর একটু হলেই ফেইন্ট হয়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলেছে। টুইঙ্কল সম্পূর্ণ অক্ষত শরীরে আছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে সে একটা কাঁচা সাদা মুলো খেতে ব্যস্ত। আর একটা হাতে আরও গোটা দুয়েক মুলো আর গাজর ধরা রয়েছে।
“মিস্ অরোরা…।” অধিরাজ সবিস্ময়ে বলল, “আপনি এতক্ষণ ছাতে বসে মুলো খাচ্ছিলেন।”
“কী করব স্যার।” টুইঙ্কল একটু লজ্জিত। সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “বড়ো খিদে পেয়েছিল। আমার এই এক বদ অভ্যাস। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খিদে পায়। লাহিড়ী স্যার আগেই আমায় সতর্ক করেছিলেন বাইরের কোনো খাবার যাতে না খাই। তাই মুলো আর গাজর দিয়েই কাজ চালাচ্ছি।” বলতে বলতেই সে আর একটা হাতে ধরা মুলো আর গাজর এগিয়ে দেয় অধিরাজের দিকে, “আপনিও খান না। ভয় নেই, আমি জাস্ট এখান থেকে বেরিয়ে সামনের সবজি মার্কেট থেকে কিনে এনেছি। ভালো করে ধুয়েও নিয়েছি। বার্নিং শিখ আর যা-ই হোক, মুলো বা গাজরে সেডেটিভ মেশাবে না।” অর্ণব এতক্ষণে বিরক্তিমাখা স্বরে বলে, “তাই বলে সবজি মার্কেটে আর কিছু পেলেন না? সাদা মুলো কেউ মেইন ডিশ হিসাবে খায়। তাও আবার কাঁচা!”
টুইঙ্কল অম্লানবদনে মুলোটায় এক কামড় বসিয়ে দিব্যি কচকচ করে খেতে খেতে বলল, “আমি তো ছোটোবেলা থেকেই খাই। এমনকি লাল মুলোও কাঁচা খেতেই বেশি ভালো লাগে। ইনফ্যাক্ট, রান্না করা মুলোই বরং কম খাই। খেতে খুব ভালো, স্বাস্থ্যকরও বটে। আপনিও ট্রাই করুন না স্যার!”
অর্ণব দাঁত কিড়মিড় করে সোজা তেলে পড়বে না জলে, ভেবে পাচ্ছিল না। তার আগেই অধিরাজ পরিস্থিতি সামাল দেয়, “ওয়েল সেনোরিটা, এতক্ষণে আমি নিশ্চিত বার্নিং শিখ আপনাকে কোনোভাবেই সেডেটিভ খাওয়াতে পারবে না। সে খাবারে ওষুধ মেশাতে পারে, কিন্তু আপনার ফেভারিট ডিশগুলো দেখলে হয়তো ও বেচারা দেওয়ালে মাথা ঠুকবে। বাই দ্য ওয়ে, আর কী কী আছে আপনার ফেভারিট কাঁচা ফুডের লিস্টে? আই মিন, মুলো আর গাজর ছাড়া?”
টুইঙ্কল হাতের মুলোটা শেষ করে অম্লানবদনে আরও একখানায় মনোনিবেশ করে বলল, “মাঝে-মধ্যে কাঁচা কপি খেতেও ভালো লাগে। বিশেষ করে বাঁধাকপি। এছাড়া মটরশুঁটি, চানা-ছোলা, মাঝেমধ্যে করলা, পুদিনা পাতা, আমলকি, শসা, কচি ভুট্টার দানা, নিতান্তই কিছু না পেলে কুমড়োর বীজ—এইসবই খাই।”
এমনিতেই কাঁচা মুলোর গন্ধে অর্ণবের পেট গোলাচ্ছিল। তার ওপর কাঁচা করলা শুনে প্রায় বমিই পেয়ে গেল। টুইঙ্কল ফের আর একটা আস্ত মুলো আর গাজর এগিয়ে দিয়েছে অধিরাজের দিকে, “টেস্ট করে দেখুন না স্যার। দারুণ খেতে।”
“আপনি যখন বলেছেন তখন নিঃসন্দেহে দারুণ।” অধিরাজ মোলায়েম হেসে বলল, “কিন্তু আই থিঙ্ক, আপনি সত্যিই ক্ষুধার্ত। আর মাত্র কয়েকটাই মুলো আর গাজরই বাকি আছে… ইয়ে মানে, আগে ক-টা ছিল?”
“ছ-টা মুলো আর আটটা গাজর ছিল। বাকিগুলো খেয়ে ফেলেছি।”
“হ্যাঁ। সেটাই স্বাভাবিক।” সে নিরীহ মুখেই বলে, “একেই এত কম পরিমাণ। তার ওপর আমরাও যদি ভাগ বসাই, তবে আপনার কম পড়ে যাবে। আপনি বরং এখানে দাড়িয়েই বাকিগুলো শেষ করুন। তারপর ডিউটির পর রাতে যাঁকে পাহারা দেবেন, সেই মিস্ মুখার্জির সঙ্গে আপনার আলাপটাও করিয়ে দেব। আপনার কি রাতেও এরকম খিদে পায়?”
টুইঙ্কল বড়োই লজ্জিত হয়ে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, “কী করব স্যার। ছোটোবেলা থেকেই আমার এই এক দোষ। কিছুতেই খিদে কন্ট্রোল হয় না।”
“ইটস অলরাইট।” অধিরাজ একটু আতঙ্কিত দৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকায়, “তাহলে এখনই কয়েক ব্যাগ তরি-তরকারি রাতের জন্য মজুত করে রাখাই ভালো। কী বলো অর্ণব? মেয়েরা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী ও অন্নপূর্ণা। তাদের খালি পেটে রাখা একেবারেই উচিত নয়।”
অর্ণব কিছু বলার আগেই আচমকা পিলেচমকানিয়া ভয়ানক একটা আওয়াজে ব্যোমকে গিয়ে থেমে গেল। না, সাঙ্ঘাতিক কোনো ঘটনা নয়। ফরেনসিক ল্যাবে বোমও পড়েনি। টুইঙ্কলের খাওয়া শেষ হয়েছে, এবং সে ‘ঘুড়ুৎ’ করে একটা পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে। তাতেই বোধহয় গোটা ফ্লোরটাই কেঁপে উঠল। নিজেই ফের অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “স্যরি।”
“স্যরি বলার প্রয়োজন নেই মাদমোয়াজেল।” সে একটু হাসল, “পেট ভরে গেলে মানুষ যদি ঢেঁকুরই না তোলে, তবে বোঝা যাবে কী করে যে পেট ভরল কিনা। আশা করি আপনার পেট এখন শান্ত।”
“একদম স্যার।”
“তাহলে প্লিজ ভেতরে চলুন।” অধিরাজ ফরেনসিক ল্যাবের দরজাটা খুলে দিয়ে সসম্মানে দীর্ঘ দেহটাকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে, “আফটার ইউ।”
টুইঙ্কল গটগটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। অর্ণব অধিরাজের কানে ফিশফিশ করে, “স্যার, সিরিয়াসলি? কাঁচা মুলো, কপি আর করলা। ইনি মহিলা নন। সাক্ষাৎ হনুমান!”
“ওরকম বলে না ডার্লিং!” অধিরাজ ঠোঁট টিপে হাসছে, “হনুমান হতে যাবেন কোন দুঃখে। তবে বজরঙ্গবলীর ভক্ত হলেও হতে পারেন। তাছাড়া যেখানেই জন্মান না কেন, রক্তে পাঞ্জাবের মাটি আর শিখের জিন বইছে। পাঞ্জাবিদের ফেভারিট ডিশের মধ্যে কাঁচা মুলো ও গাজর অন্যতম। ছোটোবেলা থেকে অভ্যাস বেচারির। যতই কলকাতার প্রলেপ পড়ুক, জিন আর অভ্যাস কিছুতেই পেছন ছাড়ে না!”
বলতে বলতেই হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। কিছু যেন তার মনে পড়ে গিয়েছে। একমুহূর্তের জন্য ঝকঝক করে উঠল গোল্ডেন ব্রাউন চোখের তারা। বিড়বিড় করে বলল, “তাই তো। মাই গড়….মা-ই গ-ড!”
অর্ণব থমকে যায়, “কী হল?”
অধিরাজ পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়, “না। তেমন কিছু না। হঠাৎই একটা জিনিস মনে পড়ে গেল। যাক গে, চলো অর্ণব। মিস অরোরার সঙ্গে মিস মুখার্জির আলাপ করিয়ে দিই। তারপর অনেক কাজ বাকি আছে। সময় স্থির হয়ে থাকে না, আমাদেরও স্থির থাকার উপায় নেই।”
কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল আহেলির সঙ্গে টুইঙ্কলের কয়েক মিনিটের মধ্যেই দিব্যি সদ্ভাব হয়ে গেল। আহেলি এই তথাকথিত টমবয়টিকে দেখে ভারি মজা পেয়েছে। মিস্ আত্রেয়ী দত্ত তার প্রিয় সখী ও বোনের মতো। তাকে নিয়ে কোনোদিনই সমস্যা ছিল না। কিন্তু কৌশানী বোসকে তার সহ্য হয় না। ক্লিওপেট্রা বা পদ্মিনীমার্কা সুন্দরীটির অ্যাটিটিউড ঠিক পছন্দ নয়। তার ওপরে সে অধিরাজকে দেখলেই যেমন হামলে পড়ে, তাতে আহেলির কিঞ্চিৎ রাগও আছে। কিন্তু টুইঙ্কলকে তার প্রথম দর্শনেই ভারি পছন্দ হল। অধিরাজ মিস্ অরোরাকে বুঝিয়ে বলল যে তাকে কী করতে হবে। সতর্ক করে দিয়ে বলল, “ওঁর পাশ থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও নড়বেন না। সিগার খান, কলা-মুলো, যা খুশি খান, কিন্তু ধূমপান থেকে শুরু করে সব কিছু এখানেই করবেন। আমরা আপনার কাঁচা থেকে পাকা, সবরকমের খাবারই এখানে রেখে যাব। আপনার পছন্দের সিগারের কার্টনও এসে যাবে। এখানে মাইক্রোওয়েভও আছে। রান্না খাবারগুলো দরকার পড়লে গরম করে নেবেন। কিন্তু মিস্ মুখার্জিকে একচুলের জন্যও চোখের আড়াল করবেন না।”
“কিন্তু আমার যদি ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়?”
কথাটা আহেলি সকৌতুকেই বলেছিল। কিন্তু মিস্ অরোরা ভয়াবহ সিরিয়াস, “তবে আমিও আপনার পেছন পেছন যাব! আগে দেখে নেব ভেতরে কোনোরকমের গোলমাল আছে কিনা। তারপর আপনি ঢুকলে আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। দু-মিনিট অন্তর অন্তর জিজ্ঞাসা করব আপনি ঠিক আছেন কিনা। যদি ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর না পাই, তবে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যাব।”
অর্ণব আর অধিরাজ পরস্পরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে। সুযোগ পেলেই টুইঙ্কল দরজা ভাঙার তাল করে। এ তো সি.আই.ডি.-র দয়ানন্দ শেঠির ফিমেল ভার্সন। অধিরাজ একটু ভয়ে ভয়েই বলে, “আর যদি বার্নিং শিখ অ্যাটাক করে?”
টুইঙ্কল তেজি স্বরে বলে, “তবে সে ব্যাটার মাথায় এই গোটা ল্যাবটাই ভাঙব আমি। ওর একটা হাড়ও আস্ত রাখব না৷”
ফের ভাঙাভাঙি কেস এসে পড়েছে দেখে অর্ণব ফুসফুস করে, “এ তো পুরো বুলডোজার। শেষ পর্যন্ত কমলবনে মত্ত হস্তী না হয়ে যান!”
অধিরাজও চাপা স্বরে বলল, “বিকাশ দুবের মতো আর্চ ক্রিমিনালের ঘাঁটি ভাঙার জন্য বুলডোজারই লাগে অর্ণব। আর বার্নিং শিখ সব কিছু হতে পারে, তবে কিছুতেই ‘কমলবন’ নয়। সে আস্ত কার্গিল। তার বুকের ওপর উঠে হস্তী লাফালাফি করলে আমি খুশিই হব।”
“কিছু বললেন স্যার?” টুইঙ্কল সরলকণ্ঠে বলল, “এনি অর্ডার?”
“না। তেমন কিছু নয়।” সে শান্তস্বরেই বলল, “আপনি বার্নিং শিখের হাড় ভাঙলে আমার কোনো প্রবলেম নেই। তবে ল্যাবটা দয়া করে ভাঙবেন না। এই ল্যাবের যিনি আসল বস, ডঃ অসীম চ্যাটার্জি যদি এসে দেখেন তাঁর সাধের ল্যাব ভেঙেছে, তাহলে আমাদেরই ভেঙে রেখে দেবেন। উনি মানুষের চেহারায় আস্ত একটা অ্যাটম বম্ব। লোককে মারতে হাত-পা চালান না। জাস্ট চোখ আর কথার রেডিয়েশনের ঝাঁঝেই ভস্ম করে দেবেন। তাই ল্যাবটার যেন ক্ষতি না হয়।”
“ওকে স্যার। গট ইট!”
আর কথা বাড়ায় না অধিরাজ। রসালাপের আপাতত সময় নেই। কোনোমতে ফরেনসিক ল্যাবের বাথরুমেই রক্তাক্ত শার্টটা পালটে নিয়েছে। এখনই আবার পার্ক স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনে দৌড়োতে হবে। ওখানেই এই মুহূর্তে উপস্থিত আছেন জগদীপ সিং ভাট্টি। কিছুক্ষণ আগেই পার্ক স্ট্রিট থানা থেকে অফিসার বিমল রুদ্র ফোন করে জানিয়েছেন, “স্যার, এ মহা ট্যারা পাবলিক। আমরা জাস্ট ওঁকে ভদ্রভাবেই মিন্টোপার্কের অফিস থেকে নিয়ে এসেছি। এখনও পর্যন্ত জেরা তো দূর, আপনার নির্দেশমতো একটাও কড়া কথা বলিনি। এমনকি আদর করে বিরিয়ানি, রায়তা, চিকেন তন্দুর এমনকি লস্যিও খাইয়েছি। কিন্তু এ তো সঙ্গে সাইড ডিশ হিসাবে আমাদের ভেজাফ্রাই করেও খেয়ে ফেলছে! বলছে যে, অনেক নেতা মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কমিশনার সাহেবকে ফোন করার ভয়ও দেখাচ্ছে! চাকরি খেয়ে নেবে!” “বিরিয়ানি, চিকেন তন্দুর খাওয়ার পরেও উনি ‘ভেজা’ আর চাকরি খাওয়ার বায়না করছেন, এত ক্ষিদে তো বোধহয় বকরাক্ষসেরও ছিল না।”
অধিরাজ কপালে দুটো আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল, “আপাতত ভেজাটিকে বাঁচানোর জন্য হেলমেট আর কানের মধ্যে তুলো ঠুসে রাখুন। বকরাক্ষসকে সোজা করার জন্য ভীমকে নিয়ে আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।”
ওপ্রান্ত থেকে অফিসার রুদ্র’র হাসির আওয়াজ ভেসে এল, “ওকে স্যার।” মিস্ মুখার্জির সঙ্গে মিস অরোরার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ শেষ হতে-না হতেই প্রণবেশ লাহিড়ীর আর এক লেডি অফিসার মণীষা চক্রবর্তী ল্যাবে এসে রিপোর্ট করল। তার আই ডি, পরিচয় কনফার্ম করে ওখান থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ফরেনসিক ল্যাব থেকে দ্রুতবেগে বেরিয়ে যেতে যেতেই অর্ণবকে পরবর্তী নির্দেশ দিচ্ছিল অধিরাজ। তার মনে এখন গভীর শঙ্কা। কোমল কৌর যে ‘বার্নিং শিখ’-এর উইক পয়েন্ট তা বুঝতে বাকি নেই। দুর্বল জায়গায় আঘাত পড়লে এই ধরনের ক্রিমিনালরা আরও বেশি প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে ওঠে। কোমলের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবেই। অধিরাজ বুঝতে পারছিল, ঘা খাওয়া বিষাক্ত সাপ ফণা উঁচিয়ে বসে আছে। যে কোনো মুহূর্তে এসে পড়বে বিষাক্ত ছোবল। বিশেষ করে লেডি অফিসারদের নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত সে। অর্ণব একটু ভেবে বলল, “স্যার, লেডি অফিসারদের পাঠিয়ে দেওয়াটা ভুল হল না তো! পুরুষ অফিসারদের অবস্থা বার্নিং শিখ যা করেছিল, তাতে লেডি অফিসারদের উড়িয়ে দেওয়া তো তার বাঁ হাতের খেল!”
এবার তার চিন্তিত মুখেও একটা দুষ্টু হাসি ভেসে ওঠে, “উঁহু অর্ণব। বরং উলটোটাই। লেডি অফিসাররা আছেন বলেই সে এতক্ষণেও দুই পরিবারের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। পুরুষ অফিসাররা থাকলে এর মধ্যেই তারা কচুকাটা হয়ে যেত ও দুটো ফ্যামিলিই মারা পড়ত, বাহাত্তর ঘণ্টাও লাগত না। মেয়েরা আছে বলেই ব্যাটা কিচ্ছু করতে পারছে না।”
অর্ণব বিস্মিত, “মানে?”
“মানে ছেলেরা যা পারে না একজন মেয়ে অনায়াসেই সেটা করতে পারে।” সে বলল, “আমার ইতিহাসে কিঞ্চিৎ ইন্টারেস্ট আছে। সেখান থেকেই একটা ভারি মজাদার তথ্য পেয়েছিলাম। একবার ঔরঙ্গজেব রেগেমেগে কুতুবশাহী সুলতানের দুর্গের ওপরে আক্রমণ করেছিলেন। গোলকোণ্ডা ফোর্ট, নাম শুনেছ নিশ্চয়ই। কুতুবশাহী সুলতান এইসান বীরপুরুষ যে ঔরঙ্গজেবের ভয়ে স্রেফ পালিয়েই বেঁচেছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক। ঐ মুহূর্তে ঔরঙ্গজেবের লেভেলের নিষ্ঠুর, বদমায়েশ, কুচক্রী ও ক্ষমতাশালী লোক প্রায় ছিলই না। তার ওপর একগাদা মোগল সৈন্যের সামনে ফোর্টের কমসংখ্যক সিপাহী কতটুকুই বা প্রতিরোধ করত। ভেবে দেখো, দুর্গে খোদ সুলতান নেই, তিনি পিট-টান দিয়েছেন, যথেষ্ট ফৌজ নেই, বাইরে ঔরঙ্গজেবের মতো রক্তপিপাসু এবং যুদ্ধবাজ একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। এই মুহূর্তে ঠিক কী হতে পারত বলে তোমার মনে হয়?”
“নিশ্চয়ই উনি দুর্গটা জিতে নিয়েছিলেন। এ তো ফাঁকা মাঠে গোল।”
অধিরাজ অর্ণবের কথা শুনে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “নাঃ। দুর্গ-জেতা তো দূর, যুদ্ধটাই হয়নি। ঔরঙ্গজেবই উলটে রণে ভঙ্গ দিয়ে দলবল নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। তুমি ফাঁকা মাঠ দেখছ ঠিকই, কিন্তু গোলকিপারটি তখনও গোলপোস্ট পাহারা দিচ্ছিলেন। একা তাঁর বুদ্ধির ঠ্যালাতেই ঔরঙ্গজেব লোক-লস্কর সমেত কুপোকাত এবং গোলকিপারটি কোনো পুরুষ নন, একজন নারী।”
অর্ণব প্রায় হাঁ! ঔরঙ্গজেবের মতো কুচুটে, বদমাশ বুড়োকে কিনা এক মহিলা হারিয়ে দিয়েছিলেন! ঐ হতভাগা মোগল শাসকের জীবনে এমন কোনো মহান পাপ নেই যা তিনি করেননি। শিবাজিই একমাত্র লোক যিনি ঔরঙ্গজেবকে উত্যক্ত করে মেরেছেন। তার ফলও অবশ্য তাঁকে হাতেনাতে ভুগতে হয়েছে। ঔরঙ্গজেবের প্রচণ্ড প্রতিশোধস্পৃহার মাশুলও গুণেছেন। শিবাজির সন্তানকে বহুবছর বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি। শিবাজির হাত থেকে একাধিক ফোর্টও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। শিবাজিপুত্ৰ শম্ভাজিকে নারকীয় অত্যাচার করে শেষে মৃত্যু দিয়েছিলেন। অন্যদের কথা তো দূর, নিজের ভাইদের ও খোদ বাবাকেও ছাড়েননি! এরকম একটি নৃশংস, খুনি, শয়তান ও সাম্রাজ্যবাদী লোক কিনা স্রেফ এক নারীর খপ্পরে পড়ে হেরে গিয়েছিলেন!
প্রশ্নটা করতেই অধিরাজ হেসে ফেলল, “এইজন্যই তো বলছিলাম, মেয়েদের ক্ষমতাকে আন্ডার-এস্টিমেট কোর না। গোলকোণ্ডা ফোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ঔরঙ্গজেব দাঁত কিড়মিড় করে প্রস্তুত হচ্ছিলেন সুলতানকে কচুকাটা করার জন্য! ওটাই ওঁর ফেভারিট হবি। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল তা একদম আনএক্সপেক্টেড। দুর্গের দরজা খুলে এক সুন্দরী মহিলা বেরিয়ে এলেন। তিনি সুলতানের মা রাজমাতা হায়াত বক্সী বেগম ঔরঙ্গজেব ভেবেছিলেন একপাল সৈন্য নিয়ে মা টা বাগিয়ে সুলতান তেড়ে আসবেন। তাঁর বদলে কিনা এক সুন্দরী মহিলা! এরকম ঘটনা ঘটতে পারে তা ভদ্রলোক অতি বড়ো দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। সামনে ভীমভবাণী পুরুষ যোদ্ধা থাকলে তরোয়াল বাগিয়ে মারপিট করা যায়, কিন্তু মহিলার সঙ্গে কী যুদ্ধ করবেন! আমার ধারণা সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে হায়াত বক্সী বেগমকে দেখে জাঁহাপনা বোধহয় ঘোড়া থেকে উলটেই পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অনেক দোষ ছিল। ভ্রাতৃহত্যার পাপ করেছিলেন, বাবাকে বন্দি করেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের জন্য অনেক রাজ্য ছারখার করেছেন, হাতে অনেক মাথা কেটেছেন, ছলে-বলে-কৌশলে সবকিছু আদায় করেছেন, হিন্দুদের ওপর অত্যাচারও কম করেননি। কিন্তু…!” অধিরাজ একটু থেমে বলল, “তাঁর চরিত্রে অনেক দোষের মধ্যেও একটি গুণ ছিল। তিনি একজন সাচ্চা ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। মোগল সম্রাটদের মধ্যে শুধুমাত্র ঔরঙ্গজেবই এমন একজন লোক, যিনি দুশ্চরিত্র ছিলেন না বা মেয়েদের নিয়ে বিলাস-ব্যসনে ফূর্তি করে টাকা ওড়ানো পছন্দ করতেন না। নিজের জামা নিজেই সেলাই করতেন, বাদশাহী খাবারে বিশেষ রুচি ছিল না, নিরামিষাশী ছিলেন, মদ্যপানও করতেন না। সবচেয়ে বড়ো কথা, নারীদের সম্মান দিতে জানতেন। তাঁর সবচেয়ে বড়ো সমালোচক ছিলেন ওঁরই বড়ো বোন জাহানারা। কিন্তু আলমগীর তাঁর গালমন্দ, শাপ-শাপান্ত চুপচাপ সহ্য করতেন, এমনকি বাবার অবর্তমানে বিদ্রোহী দিদিটির যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য মোটা টাকার পেনশনের বন্দোবস্তও করেছিলেন। ইসলাম ধর্ম নারীদের সঙ্গে মারপিট করতে শেখায় না। তাই প্রবল ধর্মসঙ্কটে পড়লেন তিনি। তরোয়াল টরোয়াল মাথায় রেখে একেবারে লক্ষ্মী ছেলের মতো সুড়সুড় করে হায়াত বক্সী বেগমের মধুর আহ্বানে আতিথ্য স্বীকার করলেন। খেলেন-দেলেন-ঘুমোলেন। তারপর কিছু উপঢৌকন নিয়ে শেষমেষ সন্ধি করে ফের দিল্লির পথ ধরলেন। যুদ্ধ তাঁর মাথায় উঠল। যাওয়ার আগে স্বীকার করে গেলেন, ‘এমন মহিলা আমি সারাজীবনে দেখিনি।’ সাম্রাজ্যবাদী খুনি লোকটা স্রেফ এক নারীর সামনে পড়ে হেরে গেল! আর ঠিক এটাই বার্নিং শিখের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। সে আন্ডারটেকার, খলি-রকদের সঙ্গে হাতাহাতি করার জন্য বসে ছিল, কিন্তু তার জায়গায় এন্ট্রি নিলেন ছোটোখাটো চেহারার দুষ্টুমিষ্টি আলিয়া ভাট আর সুন্দরী দীপিকা পাড়ুকোন! এইটাই তার বুদ্ধি গুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কী করবে সেই কনফিউশনেই ও কনফ্যুসিয়াস হয়ে গিয়েছে। তার ওপর সাচ্চা শিখ হওয়ার দরুণ মেয়েদের গায়ে হাতও দিতে পারবে না! যে পরিবারগুলোকে মেরেছে, সেখানে মহিলারাও ছিলেন ঠিকই। ও পাপটা সে বাধ্য হয়েই করেছে। মুশকিল হল ফসজিন বা মাস্টার্ড গ্যাস তো জেন্ডার বুঝে আক্রমণ করবে না! অগত্যা নারীরাও মারা গিয়েছেন, কিন্তু লোকটি তাদের মৃতদেহের সঙ্গেও কোনোরকম অসম্মান করেনি। ও ছেলেদের ধরে মারবে, অথচ মেয়েদের স্পর্শ করতে গেলেও পঞ্চাশবার ভাববে। এই আনপ্রেডিক্টেবিলিটি আর ধর্মসঙ্কটের জ্বালাতেই ও তিনদিনের মধ্যে অলমোস্ট দেড়দিন খরচ করে ফেলেছে। আর লেডি অফিসারদেরও কম ভেবো না। তাঁরাও যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। ইনফ্যাক্ট তাঁরা আছেন বলেই ওই দুটো পরিবার এখনও টিকে আছে। মেয়েরা শক্তির প্রতীক অর্ণব। যাঁকে ঘিরে এত কাণ্ড, ১৯৮৪-এর রায়ট থেকে শুরু করে অধুনা বার্নিং শিখের তাণ্ডব, সেই ইন্দিরা গান্ধীও একজন নারীই ছিলেন, আয়রন-লেডি।”
“তাহলে তো চিন্তার কারণই নেই স্যার।” অর্ণব বলে, “মিস্ বোস আর মিস্ দত্তকেও ও আর যাই করুক, মারবে না।”
“চিন্তার কারণ আছে।” অধিরাজের মুখে ফের দুশ্চিন্তার মেঘ, “হাত দিয়ে মারবে না বা স্পর্শ করবে না। কিন্তু অন্য কোনো কৌশলে মারতে পারে বা সরিয়ে দিতে পারে। মেয়েদের পাঠানোর পেছনে আমার একটাই এজেন্ডা ছিল। যা ও একেবারেই আশা করেনি, তাই দিয়েই ওকে একটু হতবুদ্ধি করে দেওয়া। এবং তাতে আমি কিছুটা সফলও। দেড়দিন অবধি ওকে আটকে রেখেছি। কিন্তু কোমল কৌরের মৃত্যুর পর ওকে থামানো অসম্ভব। আজ কিছু ঘটবেই। এবং সেটা রাতেই। সেইজন্যই যা যা বললাম সেগুলো করে ফেলো, আর দুই লেডি অফিসারের খবর নিয়ে নাও। মিস্ বোসকে জিজ্ঞাসা কোরো মিসেস চৌধুরীর ফিজিওথেরাপিস্ট মিঃ রাজীব চন্দ আজ ঠিক ক-টায় উপস্থিত হবেন।”
“ওকে স্যার।”
অর্ণব বিনাবাক্যব্যয়ে হুকুম তামিল করল। এমনিতেই গোটা কলকাতা পুলিশ হাই অ্যালার্টে আছে। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তারা কাজে নেমে পড়ল। এডিজি শিশির সেন ও খোদ কলকাতা পুলিশের কমিশনার সাহেব যুগ্মভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেস কনফারেন্সের বন্দোবস্তও করে ফেললেন। ওঁরাই দায়িত্ব নিয়ে বেঙ্গল কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশন আর দ্য ইন্ডিয়ান ফার্মাসিউটিকল অ্যাসোসিয়েশনকেও অর্ডার দিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি ফার্মাসিতে মেইল ও ফ্যাক্স যেতে শুরু করল। সাদা পোষাকের পুলিশ যত ইললিগ্যাল ড্রাগ বিক্রেতা ও ড্রাগ পেডলারকে চটপট ধরে ধরে হাজতে ঢোকাচ্ছে। কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত অন্য কোনো কেসে পুলিশ এত দ্রুত অ্যাকশন নিয়েছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু ‘বার্নিং শিখ’-এর কেসে তারা বিন্দুমাত্রও সময়ের অপচয় করছে না।
যতক্ষণে ওরা তিনজন পার্কস্ট্রিট থানায় গিয়ে পৌঁছল, ততক্ষণে মোটামুটি সব কাজই সেরে ফেলেছে অর্ণব। দুই লেডি অফিসারের খোঁজখবরও নেওয়া হয়ে গিয়েছে। দু-জনেই ঠিক আছে। তেমন বিপদের কোনো সঙ্কেতও নেই। মিস্ বোস জানিয়েছে যে মিঃ চন্দ আজ সন্ধে সাড়ে ছ-টায় আসবেন।
“সাড়ে ছ-টা!” অধিরাজ মাথা ঝাঁকায়, “ফাইন।”
ওদের মধ্যে আর বিশেষ কোনো কথাবার্তার আদান প্রদান হয়নি। অধিরাজের চিন্তান্বিত গম্ভীর মুখই বলে দিচ্ছে যে সে রীতিমতো মানসিক আর স্নায়বিক চাপে আছে। একটু একটু করে যত সময় এগোচ্ছে, ততই তার টেনশন বাড়ছে। আজ ওরা অধিরাজের ফোর-হুইলারেই বেরিয়েছে। কোমল কৌরের মৃত্যুর পর বার্নিং শিখের হাতে আপাতত আর বম্ব নেই, এটাই ওদের সাময়িক নিশ্চিন্তির কারণ। তাও বেরোনোর আগে দু-জনেই ভালো করে চেক করে নিয়েছে সমস্ত কলকব্জা। অর্ণব ড্রাইভ করতে করতেই লক্ষ্য করল সে যেন আরও কিছু অজানা চিন্তায় ডুবে আছে। সেই অর্ধনিমীলিত চোখের ফাঁক দিয়ে প্রায় গভীরে ডুবে থাকা দুটো সোনালি-বাদামি চোখ! ঈষৎ স্ফুরিত ওষ্ঠাধর। দেখলেই বোঝা যায়, এই মুহূর্তে আশেপাশে কী ঘটছে সে বিষয়ে একেবারেই সচেতন নয়। মাথার চুল সামান্য অবিন্যস্ত। ফুরফুরে হাওয়া চুল এলোমেলো করে দিয়ে খেলা করছে। বিকেলের সূর্যের নরম রশ্মি মুখের একদিকে এসে অদ্ভুত একটা আলোছায়া মাখা পরিবেশ তৈরি করছে! অর্ণবের উত্তেজনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। স্যার কি তবে কোনো লিড খুঁজে পেলেন? ঘটনা পরম্পরা এতই দ্রুত যে তার নিজের মাথাতেই বিশেষ কিছু ঢুকছে না। অথচ অধিরাজের এই অর্ধ-অচেতন রূপ তার অত্যন্ত পরিচিত! সে একটা হিসাব খুব নিখুঁতভাবে মেলাচ্ছে। একটা লম্বা ও কঠিন অঙ্ক ধাপে ধাপে কষে যাচ্ছে।
“খচাস।”
আচমকা একটা শাটার টেপার আওয়াজে হকচকিয়ে গেল অর্ণব। পেছনে ফিরে দেখল, অধিরাজের এই সম্পূর্ণ বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থার একটা ফটো তুলে নিয়েছে টুইঙ্কল! সে জানে, এই অবস্থায় কোনোভাবেই স্যারকে ডিস্টার্ব করা উচিত নয়। অথচ এই মহিলা কি নিজের বসকে তাজমহল পেয়েছে, যে খট খট করে শাটার টিপছে! অর্ণব রেগে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। কানের কাছে চেঁচালে অধিরাজের ধ্যানভঙ্গ হবে যা কোনোমতেই অভিপ্রেত নয়। অগত্যা সে চাপা অথচ ক্রদ্ধ স্বরে বলল, “এটা কী হল।”
“যা দেখছেন তাই হল।” টুইঙ্কল নিজের শিল্পকীর্তি দেখে ভারি খুশি হয়ে বলল, “বাঃ। ছবিটা পুরো ফাটাফাটি উঠেছে।” বলতে বলতেই সে নিজের ফোনটা অর্ণবের নাকের সামনে ধরে বলল, “দেখুন। ইনি তো বলিউড-হলিউডের সমস্ত হিরোকে এক থাপ্পড় মেরে বসিয়ে দেবেন।”
অর্ণব ড্রাইভ করতে করতেই একঝলক অধিরাজের ক্লোজ-আপ ছবিটা দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। স্যারকে বহুবার সে এই অবস্থায় দেখেছে। কিন্তু কোনোদিন লক্ষ্য করেনি এই আত্মমগ্ন অবস্থাতেও লোকটাকে কী অপ্রতিরোধ্য সুন্দর লাগে! মুখের ওপর সোনালি রোদের আলোছায়া লুকোচুরি খেলছে, অর্ধনিমীলিত রহস্যময় দৃষ্টি, চোখের তারায় নরম রোদ পড়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে, সারা মুখে ধ্যানস্থ মগ্নতা ছড়িয়ে, নিখুঁত ‘জ’ লাইন, থুৎনিতে অসম্ভব আকর্ষণীয় একটা কাটা দাগ, সামান্য দ্বিধাবিভক্ত ওষ্ঠাধর ও উস্কোখুশকো চুলে একদম স্বর্গীয় সৌন্দর্য। এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখার কথা কখনও তার মনে হয়নি। অথচ এই মহিলা এসেই খটাৎ করে ছবি তুলে নিল।
“ইটস কল্ড ডিভাইন বিউটি।” টুইঙ্কল নীচু স্বরেই বলে, “একমাত্র ওয়াহেগুরুর চোখদুটোই এমন অপূর্ব সুন্দর। আমি ছোটোবেলায় বাবাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতাম, ওয়াহেগুরুর মতো অমন অপূর্ব চোখ কি কোনো মানুষের হয়? বাবা বলতেন, হয়। তবে কয়েকশো কোটিতে একটা। আর যার অমন সুন্দর চোখ থাকে সে মানুষটাও তার স্রষ্টার মতোই পবিত্র। সো, আই গট দ্য স্যাক্রেড মোমেন্ট! বিউটিফুল!”
এরকম উত্তরে অর্ণব রাগবে না খুশি হবে তা বুঝে পেল না। সে শুধু বলল, “নিজের বসকে বিউটিফুল বলে মনে হচ্ছে আপনার?”
টুইঙ্কল সরলভাবে উত্তর দিল, “ও ত্তেরি। বিউটিফুলকে বিউটিফুল মনে হবে না তো কী মনে হবে? আমি সামনে গোলাপফুল দেখলে গোলাপই তো বলব, থোড়াই ক্যাকটাস বলতে যাব!”
অধিরাজ নাকি গোলাপফুল। তবে ক্যাকটাসটা কে? অর্ণব? মনে মনে সে খেপে চিড়বিড় করতে শুরু করেছে। পারলে সত্যিই ক্যাকটাসের মতো কাঁটা ফুলিয়ে তাকে তাড়া করত। এই মহিলাকে কিছুক্ষণ সহ্য করাই দায়। এখন আরও দেড়দিন একে সয়ে যেতে হবে! উঃ, এ কী জাতীয় টর্চার! পৃথিবী গোল্লায় যাক, তবু মিস্ অরোরাকে কিছুতেই বিশ্বাস করছে না অর্ণব। এ পাবলিক মহা গোলমেলে!
সারাটা রাস্তা নিঃশব্দেই কাটল। ওদের গাড়িটা পার্কস্ট্রিট থানার কাছাকাছি আসতেই সচেতন হয়ে উঠল অধিরাজ। এই প্রথম তার চোখের পলক পড়ল। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “এসে গিয়েছি?”
“ইয়েস স্যার।”
তার মুখে একটা তীর্যক হাসি ভেসে ওঠে, “চলো, ভাট্টি সাহেবের ভাঁটার মতো চোখের সঙ্গে মোলাকাত করে আসি।”
ভাঁটার মতোই চোখ বটে! তার চেয়েও ভয়ানক তাঁর বজ্রনিন্দিত কণ্ঠস্বর। থানায় ঢুকতে-না ঢুকতেই শোনা গেল বাজখাঁই গলার ধমক, “আপনারা এভাবে আমার সময় নষ্ট করতে পারেন না। আমার কোম্পানির একটা বড়ো মিটিং ছিল। কোটি টাকার ডিল হওয়ার কথা। ইকোনমিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা সেটাও অ্যাটেন্ড করতে দিলেন না। তারপর আমার ডেন্টিস্টের সঙ্গেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। দাঁতের ব্যথায় অলমোস্ট মরে যাচ্ছি! মাড়ি ফুলে ঢোল। কমসে কম তিনমাসের আগে ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্টই পাওয়া যায় না। অনেক কষ্টে তাঁর ডেট পেয়েছিলাম। আপনাদের জন্য সব গেল। এর খেসারত আপনাদের দিতেই হবে।”
জগদীপ সিং ভাট্টিকে দেখে প্রথম দর্শনেই মনে হল, খোদ কিংকং বুঝি পর্দা থেকে নেমে এসে পাগড়ি পরে বসে আছে। দারা সিং-ও বুঝি ওঁকে দেখলে ভির্মি খেতেন। লম্বায় প্রায় অধিরাজেরই সমান। কিন্তু চার-পাঁচটা অধিরাজকে একসঙ্গে জুড়লে হয়তো ভদ্রলোকের বপুর কিঞ্চিত আভাস পাওয়া যায়। তার ওপর গোঁফ দাড়ির জঙ্গলে আর পাগড়ির জ্বালায় মুখ প্রায় বোঝাই যায় না। শুধু আগুনে দুটো চোখ দেখেই আন্দাজ করা যায় তিনি প্রবল চটে আছেন। মুখের একদিকে গালটাও বেশ ফুলে আছে। সত্যিই ভদ্রলোক দাঁত ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন।
অফিসার বিমল রুদ্র অধিরাজকে দেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলেন। বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বললেন, “অনেক বজ্জাত, শয়তানকে নিয়ে ডিল করেছি স্যার, কিন্তু এইরকম ট্রিমেন্ডাস গালি কখনও খাইনি। ভাট্টি সাহেব একেবারে হিন্দি, ইংরেজি, পাঞ্জাবি সব ভাষাতেই গালাগালি দিয়ে যাচ্ছেন। তার ওপর ফাউ হিসাবে শাপশাপান্ত। আমাদের সবার বাপ-মা চোদ্দগুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়ছেন!”
“বটে?”
অধিরাজ মৃদু হাসি ছুড়ে দিয়ে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল জগদীপ সিং ভাট্টির সামনে। বিনম্র গলায় বলল, “স্যরি মিঃ ভাট্টি। আমরা আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করছি, তার জন্য আগাম দুঃখিত। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার বিজনেস এবং দাঁতের সমস্যার চেয়েও অনেক বড়ো সমস্যা আমাদের সামনে আছে। একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসাবে আপনার কো-অপারেশন চাই।”
মিঃ ভাট্টি অধিরাজকে কিছুক্ষণ বড়ো বড়ো চোখ করে দেখলেন। তারপর ফের ধমকে উঠলেন, “এই চিকনাটা আবার কে! কী ‘খিচড়ি’ পাকাচ্ছেন আপনারা? একবার ঐ অফিসার আসছেন, একবার এই হিরো এসে উপস্থিত। কথা নেই বার্তা নেই, অফিস থেকে তুলে আনলেন। হাতে পাওয়ার আছে বলে যাকে খুশি হ্যারাস করবেন? কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না! হোয়াটস গোইং অন?”
অধিরাজ তাঁর তাচ্ছিল্যের বিন্দুমাত্রও পরোয়া না করে শান্ত স্বরে আবার বলল, “প্লিজ কো-অপারেট।”
“তেরি কো-অপারেশন কি তো অ্যায়সি কি ত্যায়সি!” ভদ্রলোক যথারীতি মুখ খিস্তি শুরু করেছেন, “তেরি মা কি তো…!”
টুইঙ্কল অরোরা পেছনেই দাঁড়িয়েছিল। তার চোখ যেন ধ্বক করে জ্বলে ওঠে। সে এবার অধিরাজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে বলল, “আপনি সি.আই.ডি. হোমিসাইডের আই জি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন। তমিজ সে বাত কিজিয়ে…।” “আরে আই জি গয়া তেল লেনে…।” তিনি আরও খেপে গিয়েছেন, “ওসব আই জি, ডি আই জি-রা আমার জুতোর তলায় থাকে, বুঝেছিস? একটা ফোন করব, উর্দি খুলে নিয়ে নাঙ্গা করে দেব তোদের। আমার হাত অনেক ওপরে আছে। এস পি, কমিশনার আমার পোষা কুত্তা। আর তুই কোথাকার দু-কড়ির মেয়েছেলে যে আমায় ‘তমিজ’ শেখাচ্ছিস…।”
আরও কিছু জ্বালাময়ী বাক্যও হয়তো এর পেছন পেছনই আসছিল। কিন্তু তার আগেই প্রবল একটা শব্দ! অর্ণব বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখল টুইঙ্কলের ভারি হাত একেবারে বিদ্যুৎবেগে সপাটে গিয়ে পড়েছে ভাট্টিসাহেবের গালে। একেবারে ডাম্বেল ভাঁজা ‘ঢাই কিলো’ হাতের মোক্ষম দুশো বিরাশি সিক্কার চড়। জগদীপ সিং প্রায় ‘আঁক’ করে উঠে ঐ বিপুল কলেবরসুদ্ধই হুড়মুড়িয়ে চেয়ার সমেত ধড়াস করে উলটে পড়লেন। অর্ণব তাকিয়ে দেখল, অধিরাজের মুখ গম্ভীর, কিন্তু চোখে আলগা একটা দুষ্টু হাসির আভাস। সে যেন আগে থেকেই জানত এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বুকের ওপর দু-হাত জড়ো করে শুধু ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠস্বরে ছদ্মবিস্ময়ে বলল, “উপপস।”
“লাতোঁ কে ভূত বাতোঁ সে নেহি মানতে! লঙ্গুর কি দুম! তোর হাত ওপরে তো আমার হাতও তোর গালে!…উঠ…সালে।”
টুইঙ্কল একেবারে চণ্ডীমূর্তি ধরেছে। কলার ধরে টেনে সে ঐ পেল্লায় লাশকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে একটার পর একটা চড় কষাতে কষাতে বলল, “আমাদের উর্দি খুলে নাঙ্গা করবি তুই অ্যাঁ? আমাদের বসকে জুতোর তলায় রাখবি? পুলিশ তোর পোষা কুত্তা?…আই জি গয়া তেল লেনে! আজ তোর তেল না বের করেছি তো আমিও এক বাপের মেয়ে নই…!”
একটা করে বাক্য, তার সঙ্গে একটা করে পেল্লায় থাপ্পড় ফ্রি! কোনো সন্দেহই নেই এই মেয়েটির বাবা মহাকালীর ভক্ত! স্বয়ং মহাকালীই খুশি হয়ে ডাকিনী-যোগিনীকে কম্বাইন্ড করে ওঁর মেয়ে হিসাবে পাঠিয়ে দিয়েছেন! ভাট্টিসাহেবের অবস্থা কী হচ্ছে ভগবানই জানেন। কিন্তু অর্ণব কাণ্ড দেখে প্রায় তৃরীয় দশায় পৌঁছে গিয়েছে। কোনোমতে ঢোঁক গিলে বলল, “স্যার, উনি তো ভাট্টিসাহেবের মুখের জিওগ্রাফিই বদলে দিচ্ছেন। আপনি কিছু বলুন।”
অধিরাজ মৃদু স্বরে বলে, “জয় গুরু, এনজয় গুরু। আমি আপাতত শো-টা এনজয় করছি। ভেবে দেখো, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের বল্লম ছিল, অর্জুনের তীর-ধনুক ছিল, নকুল-সহদেবের তরোয়াল আর কুঠারও ছিল। সর্বোপরি কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রও ছিল। কিন্তু দুর্যোধন আর দুঃশাসনের বারোটা বাজাতে ভীমের গদাটাই সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে।”
“উনি ভীম?”
“অফকোর্স। ইউনিসেক্স ভীম বলতে পারো।” অধিরাজের মুখে ফের সেই দুষ্টু হাসি, “ইন্ডিয়ান পিনাল কোডে এটা লেখা আছে ঠিকই যে পুরুষ পুলিশ মেয়েদের গায়ে হাত দিতে পারবে না। কিন্তু এটা কোথাও লেখা নেই যে মহিলা পুলিশ কোনো পুরুষকে পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখাতে পারবে না। প্রণবেশ লাহিড়ী মেয়েদের পেটাতে পারবেন না। কিন্তু ইনি পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সবাইকেই পিটিয়ে আমসত্ত্ব করে দিতে পারেন। আই থিঙ্ক শি ইজ কাইন্ড অব কিউট!”
এই শ্রীমতি ভয়ংকরী কিনা কিউট। মার খাচ্ছেন জগদীপ সিং ভাট্টি, আর ঘেমে চলেছে অর্ণব। র্যান্ডম থাপ্পড়ের চোটে ভদ্রলোকের একটা দাঁত ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল। সম্ভবত এটাই সেই দাঁত, যার জন্য তিনি ডেন্টিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন। অধিরাজ এবার মোলায়েম স্বরে যেমন শিক্ষক দুষ্টু ছাত্রকে সস্নেহে প্রশ্রয়মিশ্রিত বকুনি দেয়, তেমন করেই ডাকল, “মিস্ অরোরা… প্লিজ স্টপ!”
“ইয়েস স্যার।”
টুইঙ্কল…. থাপ্পড় মারা থামিয়ে এবার জগদীপ সিং ভাট্টিকে চেয়ারে ধপাস করে বসিয়ে দিল। অধিরাজ খুব শান্তভাবে শহীদ দাঁতটাকে তুলে নিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে জগদীপের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আপনার প্রপার্টি!”
জগদীপ কী বলবেন বুঝে পাচ্ছেন না। তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সম্ভবত দাঁতটাই সমূলে উৎখাত হওয়ার কারণে। অধিরাজ তাঁর দিকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়েছে, “ব্যথা দাঁতটাই গেছে তো? না কাঁচা দাঁত গেল? রক্তটা একটু বেরিয়ে যেতে দিন। ওটা ইনফেক্টেড পুঁজ-রক্ত। বেরিয়ে গেলে পেইন কমবে।”
ভদ্রলোক কোনোমতে মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ ব্যথা দাঁতটাই গিয়েছে। তিনি জল দিয়ে কুলকুচি করছেন দেখে অধিরাজ অফিসার রুদ্রর দিকে তাকায়, “আইসক্রিমের বন্দোবস্ত আছে? থাকলে কনস্টেবলকে বলুন বেশ বড়োসড় দেখে একটা আইসক্রিম আনতে। ওঁর দাঁতের ব্যথা আর ব্লিডিং এখনই কমে যাবে। একটু তুলো হলেও ভালো হয়।”
মুহূর্তের মধ্যেই এসে গেল আইসক্রিম। ভাট্টিসাহেব লজ্জিত, অপমানিত ও বিষণ্ণ মুখে একটু একটু করে আইসক্রিম মুখে দিচ্ছেন। অধিরাজ কোনো কথা বলছে না। সে অপেক্ষায় আছে আইসক্রিমটার শেষ হওয়ার। অর্ণব আস্তে আস্তে টুইঙ্কলকে বলল, “চড় মেরে দাঁত ভেঙে দেওয়ার কী দরকার ছিল?”
টুইঙ্কল ফের নিরীহ মুখ করেছে, “আপনি শুধু দাঁত ভেঙে দেওয়াটাই দেখলেন স্যার? ওঁর ডেন্টিস্টের ফি-টা যে বেঁচে গেল সেটা দেখলেন না? জানেন, এরকম বড়োলোকেরা দু-হাজারি, তিন-হাজারি ডাক্তার ছাড়া দেখান না। আজ যে সেই টাকাটা খরচ করার দরকার পড়ল না তাতে ওঁর মুনাফা হল, না লোকসান?”
অর্ণব যুক্তির ধাক্কায় চুপ করে গেল। টুইঙ্কলের সঙ্গে কথা বলার কোনো মানেই হয় না! সে এখনও পর্যন্ত অনেক লেডি অফিসার দেখেছে। কিন্তু এইরকম নমুনা আর দ্বিতীয়টি দেখেনি। দেখার বিশেষ ইচ্ছেও নেই। একটাকেই সামলানো দুষ্কর, দ্বিতীয়তে কাজ নেই!
“দেখুন মিঃ ভাট্টি…!” অধিরাজ খুব শান্ত স্বরেই বলল, “আপনাকে বিরিয়ানি, রায়তা, চিকেন তন্দুর, লস্যি, সব খাওয়ানো হল। তারপরও আপনি কো-অপারেট করলেন না। শেষমেষ থাপ্পড়ও খেলেন। এখন আইসক্রিমও খাচ্ছেন। এতকিছু খাওয়ার পরও যদি আপনি কথা না শোনেন, তবে খাওয়ার লিস্ট আরও বাড়বে। এতক্ষণ মিস্ অরোরার হাত নিতান্তই ‘কুচুপুচু’ করছিল। অর্থাৎ, যে ট্রেলার দেখেছেন সেটা নেহাতই ওঁর আদর। প্রয়োজন পড়লে গোটা মুভিটাও উনি ‘গোলুগোলু করে দেখিয়ে দেবেন! বিলিভ মি, এই লেডি অফিসারটির রাগকে চ্যালেঞ্জ করতে যাওয়াটা একদমই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই এবার কিছু প্রশ্নের জবাব দেবেন কি?”
আইসক্রিমটা কোনোমতে শেষ করে মিঃ ভাট্টি বললেন, “জল!”
এবার ওঁর দিকে পুরো জলের জগটাই এগিয়ে দিয়েছে অধিরাজ। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “বার্নিং শিখ নামের যে উপদ্রবটি সম্প্রতি কলকাতায় নাচা-কোঁদা করছে, তিনি কি বাই এনি চান্স আপনার কাছে এসেছিলেন?”
তিনি কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে রইলেন। কিছুটা তুলো ছিঁড়ে নিয়ে রক্তাক্ত মাড়িতে গুঁজলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “দেখুন, সে এসেছিল একথা সত্যি। কিন্তু আমি তাকে কোনোরকম সাহায্যই করিনি, এটাও সত্যি।”
“পুলিশকে ইনফর্ম করেননি কেন? এতদিন এই মূল্যবান তথ্যটি চেপে যাওয়ার কারণ কী?”
“আমি সাদামাটা ব্যবসায়ী লোক। পুলিশ, আইন, কোর্টের চক্করে পড়তে চাইনি।” মিঃ ভাট্টি জানালেন, “তাছাড়া কী-ই বা বলতাম? ও লোকটা তো নিজেই আপাদমস্তক ‘ইম্পস্টার’। যে রূপে সে আমার কাছে এসেছিল, সেটাই ভীষণ কনফিউজিং! ঐ মুখ আর গেট আপ দেখে আসল লোকটাকে চেনা, স্বয়ং আমি কেন, রবজির পক্ষেও অসম্ভব। ঐ ‘বনাওয়াটি’ মেক-আপ করা মুখ দেখলে ঈশ্বরও কনফিউজ হয়ে যাবেন যে আসল চেহারাটা তিনি ঠিক কী বানিয়েছিলেন। আপনারা বার্নিং শিখকে কী রূপে দেখেছেন জানি না। তবে আমার কাছে যে এসেছিল, সে একটা কুঁজো হয়ে যাওয়া খুনখুনে বুড়ো। সাদা দাড়ি, সাদা গোঁফ। তবে হ্যাঁ, শিখের বেশেই ছিল। মাথায় পেল্লায় একটা পাগড়ি ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, ঐ পাগড়ির নীচে অরিজিনাল শিখদের পেটেন্ট লম্বা চুল ছিল না।”
“এটা আন্দাজ করলেন কীভাবে?”
এতক্ষণে তিনি অতিকষ্টে মুখ বেঁকিয়ে একটু করুণ হাসলেন, “আমার চোদ্দপুরুষ শিখ। শিখদের পাগড়ি আমি খুব ভালোভাবেই চিনি। শিখ পুরুষদের মাথায় একঢাল চুল থাকে বলে কখনও তারা উঁচু করে খোঁপা বাঁধে, কখনও বা লম্বা বিনুনি বেঁধে পাকিয়ে নেয়। পাগড়ির মধ্যেই ঐ গোটা খোঁপা বা বিনুনিটা সেট করা থাকে বলে ‘পগ’টা ফুলে ফেঁপে ওঠে। এখানেই অন্যান্য প্রজাতির পাগড়ির সঙ্গে শিখদের পাগড়ির পার্থক্য। কিন্তু ওর পাগড়িটা অতটা ফোলা ছিল না। ব্যাপারটা আপনাদের বুঝিয়ে বলা মুশকিল। তবে নিজেই একজন শিখ হওয়ার দরুণ পাগড়িটা দেখেই বুঝতে পেরেছি ওর তলায় লম্বা চুল নেই। ওর চুল সাধারণ মানুষের মতোই ছোটো করে ছাঁটা।”
“আচ্ছা। সে আপনার কাছে এসেছিল কেন?”
“আমার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার জন্য।” জগদীপ মুখ নীচু করে জানান, ‘বিরাদরির’ ‘ওয়াস্তা’ দিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছিল।”
“নিজের পরিচয় কিছু জানিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
তিনি জানালেন যে বার্নিং শিখ তাঁর কাছে কিছুই গোপন করেনি। যে লোকটাকে মিডিয়া ‘বার্নিং শিখ’ নাম দিয়েছে, তার আসল নাম গুলশন সিং ধিলোঁ। ডাকনাম গুরু। যখন ১৯৮৪ সালে অ্যান্টি-শিখ রায়ট হয়, তখন তার বয়েস মাত্র আটবছর ছিল। দিল্লির মঙ্গলপুরীর শিখ কলোনিতে সে সপরিবারে থাকত। কিন্তু দাঙ্গার ফলে সবাই মারা গিয়েছিল। সে নিজেও প্রায় মরতেই বসেছিল। আততায়ীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে গেলেও, তখনও তার দেহে প্রাণ ছিল। ঐ মাত্র আট বছরের শিশু ধাক্কা খেয়ে খেয়ে এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছিল যে দেহের মারাত্মক যন্ত্রণাও সে টের পায়নি। আততায়ীরা তার ডান হাতের ওপর লাফালাফি করে হাতখানা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। কিন্তু তবু ঐ অসহায় শিশু থামেনি। সে কোনোমতে বাঁ হাতের ওপর ভর দিয়ে, বাঁ হাত দিয়েই রক্তাপ্লুত ক্ষতস্থান চেপে ধরে দৌড়োতে দৌড়োতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পেরেছিল। ডান হাতের হাড় এতটাই খারাপভাবে ভেঙেছিল যে ঐ হাতটা সারতে সারতে কয়েকবছর লেগে গিয়েছিল। অন্য কেউ হলে ভেঙে পড়ত। কান্নাকাটি করত। কিন্তু গুলশন সিং নিজের জেদে বাঁ হাত দিয়েই সমস্ত কাজ করতে শুরু করল। প্রচণ্ড মেন্টাল স্ট্রেংথ, ট্রেনিং ও চেষ্টার ফলে তার বাঁ হাতও ডানহাতের সমান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখন সে দুই হাতই সমানভাবে চালাতে পারে।
“আপনিও তো শিখ! আপনার পরিবারও নিশ্চয়ই সেই দাঙ্গার ফল ভুগেছে বা আপনিও দেখেছেন। তা সত্ত্বেও নিজের ধর্মভাইকে সাহায্য না করার কারণ?”
“দেখুন অফিসার।” তিনি বললেন, “এ কথা সত্যি যে ঐ সময়টায় শিখদের ওপর অত্যন্ত অন্যায় অত্যাচার হয়েছিল। কিন্তু তখন আমিও নেহাত ছোটো। টেনেটুনে দশ কি বারো বছর বয়েস। তাছাড়া আমার পরিবারের ওপর দাঙ্গার ভয়াবহ আঁচও পড়েনি। আমার বাবার কাঠের ফার্নিচারের বড়ো বিজনেস ছিল। ওঁর দুই পার্টনার অর্জুন দেশমুখ ও সাকেত হোসেন আমাদের দিল্লিবাসী গোটা পরিবারকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। এক তারিখ সকাল থেকে ছ-তারিখ দুপুর অবধি আমরা ওঁদের বাড়িতেই ছিলাম। অর্জুন আর সাকেত কাউকেই জানতে দেয়নি যে ওদের বাড়িতে কোনো শিখ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তিন তারিখ আর্মি নামার পর আরও তিনদিন ওরা আমাদের রেখেছিল। তবে বাবা শুনেছিলেন, কলকাতা অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক নিরাপদ। তাই ছ-তারিখ রাতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ওঁরা সবাই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। অর্জুন আর সাকেতের কৃপায় আমার গোটা ফ্যামিলির ‘বালও বাঁকা’ করতে পারেনি কেউ। তাই আমার সঙ্গে তেমন কোনো ট্র্যাজেডি হয়নি। রবজির কৃপায় মা-বাবা, দাদা-দিদি, কাকু-জ্যেঠুসমেত কাজিন ব্রাদার, সিস্টাররা এখনও দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন। তবে খামোখা আমি চুরাশির দাঙ্গার প্রতিশোধ নিতে যাব কেন! গুল্লুর ট্র্যাজেডির সঙ্গে আমি নিজেকে কানেক্ট করতেই পারিনি। তার ওপর আমি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বিনা কারণে নিজের পায়ে কুড়ুল মারতে রাজি নই। গুল্লুর ইস্যু গুল্লু বুঝুক, তাতে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
“লোকটা শিখই তো? ওর মাথায় লম্বা চুল ছিল না বলছেন। শিওর হলেন কী করে যে ও শিখ?”
“ওর কথাতেই বুঝেছি। অন্য ধর্মের লোকেরা ‘গুরুবাণী” কাকে বলে, খায় না মাথায় মাখে তা জানে না। আমার বসার ঘরে একটা স্বর্ণমন্দিরের ছবির নীচে গুরুমুখী ভাষায় কিছু লেখা ছিল। ও দিব্যি সেগুলো পড়ছিল। কথাই শুরু করেছিল, “ওয়াহেগুরু জি কা খালসা, ওয়াহেগুরু জি কি ফতেহ’ বলে। নিঃসন্দেহে লোকটা শিখই।”
খালিস্তানি সমর্থক? কনভার্সেশনে কী মনে হল আপনার?”
“এটাই খুব আশ্চর্যের ব্যাপার অফিসার।” জগদীপের চোখে অগাধ বিস্ময়, “শুনেছি ঐ দাঙ্গার পর অনেক শিখই ভারতবর্ষকে নিজের দেশ বলে মনে করছিল না। ভারত সরকারের ওপর ঘৃণায়, রাগে অনেকেই খালিস্তানি উগ্রবাদীদের দলে নাম লিখিয়েছিল। গুরুও যদি তাই করত, তবে অবাক হতাম না। কিন্তু দেখলাম, ও খালিস্তানি জঙ্গীদের ওপর ‘আগ-ববুলা’ হয়ে আছে! আমি নিজেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে ও খালিস্তানি কিনা। তাতে একেবারে খেপে গিয়ে বলল, ‘ঐ হারামজাদা ভিন্দ্রানয়ালে, কেহর সিং ও শুয়োরের বাচ্চা বেয়ন্ত সিংই হল যত নষ্টের গোড়া! এসব কিছুই হত না যদি না ঐ কুয়ো ভিন্দ্রানয়ালে খালিস্তানের দাবি করে হিন্দুদের কেটে ফালাফালা করত। যে লোক নিজেই স্বর্ণমন্দিরের ভেতরে গোলাগুলি ঢোকায়, অকাল তখতের ওপর কব্জা করে, স্বর্ণমন্দিরের পবিত্র সিঁড়ির ওপরই মানুষের লাশ ফেলে দেয়, সে হারামি কোথাকার সন্ত, আর তার শিখজাতির ওপর কী-ই বা শ্রদ্ধা! সে শালা নিজের স্বার্থে বকধার্মিক হয়েছে, ওর আসল লক্ষ্য ছিল একচ্ছত্র ক্ষমতা। না ইন্দিরা মা ব্লু-স্টার অপারেশন করতেন, না বেইমান বেয়ন্ত সিং ইন্দিরা মা-কে উড়িয়ে দিত। শিখরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়েছে! নয়তো ‘আখরি দম তক’ ইন্দিরা মা বিশ্বাস করেছিলেন যে বেয়ন্ত সিং তাঁর চরম ‘ওয়াফাদার।’ শিখদের বীরত্ব ও ইমানদারি তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। ঐ শিখ জাতির কলঙ্ক ‘নমকহারাম ‘টার জন্যই আমাদের এই দুর্দশা! আমরা শিখরা যুগ যুগ ধরে এই মাটিকে রক্ষা করে এসেছি যার নাম ‘হিন্দুস্তান।’ সেই মাটিটা যদি বা বিদেশিদের হাত থেকে রক্ষা পেল, তবু এখন নিজেদের লোকেরাই এটার টুকরো টুকরো করছে। মুসলমানরা এটাকে ভেঙে পাকিস্তান করে ফেলল, গোর্খারা গোর্খাল্যান্ড বানানোর চেষ্টা করছে, শিখদের খালিস্তান চাই, এরপর বৌদ্ধ, জৈন, ক্রিশ্চানরাও নিজেদের আলাদা দেশের দাবিতে নেমে হিন্দুস্তানকেই লাটে তুলে দেবে। এ কি মাজাকি চলছে?’ একদম কোট-আনকোট আপনাকে বললাম। আমার মনে হয় না কোনো খালিস্তানি সমর্থক এ কথা বলবে। ওদের কাছে ভিন্দ্রানয়ালে ‘সন্ত’, বেয়ন্ত সিং অমর শহীদ। আর যা-ই হোক, এই কথাগুলো কোনো উগ্রবাদীর নয়।”
“হুঁ।” অধিরাজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, “ও কি ইন্দিরা গান্ধীকে ‘ইন্দিরা মা’-ই বলছিল?”
“হ্যাঁ অফিসার। ও যতবার ইন্দিরাজির নাম নিয়েছে, ততবারই ‘ইন্দিরা মা’ বলেছে। এমনকি ও তো এটাও বলেছে যে অতগুলো গুলি খাওয়ার পরও ইন্দিরা মা যদি কোনোক্রমে বেঁচে যেতেন, তবে শিখদের এমন দুর্দশা কখনোই হতে দিতেন না। হ্যাঁ, বেয়ন্ত সিং মরত, হয়তো সতবন্ত সিং আর কেহর সিং-এরও ফাঁসিই হত। ওদের মরাই উচিত। কিন্তু ঐ তিনটে ‘বেইমানের’ জন্য পুরো কৌমটাকে উনি কখনোই ‘গদ্দার’ বলতেন না।”
“ইন্টারেস্টিং… ভেরি ইন্টারেস্টিং…!” অধিরাজ বিড়বিড় করে আপনমনেই বলে, “মিলে যাচ্ছে। পুরো মিলে যাচ্ছে। যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই…!”
অর্ণব এতক্ষণ চুপ করেছিল। এবার প্রশ্ন করল, “আর কিছু বলেছে ও? আর কোনোরকম তথ্য?”
“তেমন কিছু নয়। কিন্তু লোকটা ভারি অদ্ভুত।” জগদীপ জানালেন, “ও খালিস্তানি নয়, উগ্রবাদীও নয়, তা সত্ত্বেও এরকম নিষ্ঠুর হত্যা করে বেড়াচ্ছে। আমি বলেছিলাম, যে ‘কখনো-না কখনো পুলিশ তোমায় ঠিকই ধরবে। আর ফাঁসিতে ঝুলতে হবে তোমাকে। সে কথা ভেবে দেখেছ কি?’ গুরু বলল, ‘প্রা-জি, কোই না। আমি সবার কবর খোঁড়ার আগে নিজের কবরটাও খুঁড়ে এসেছি। “সর পে কফন” বেঁধেই এ কাজে নেমেছি। জানি, এ পাপের কোনো ক্ষমা নেই। আমার ঠাঁই নরকেও হবে না। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ বেশিরভাগ খুনিই মনে করে সে যা করছে, তা একদম ঠিক করছে। কিন্তু গুল্লু ভালোভাবেই জানে যে সে যেটা করছে সেটা ক্ষমার অযোগ্য পাপ। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘যখন জানোই যে অন্যায় করছ, তখন এসব করার মানে কী?’ ও শুধু একটা কথাই বলল। বলল যে, ‘অনেক বছর ধরেই ভেতরে ভেতরে জ্বলে যাচ্ছি প্রা-জি। আমি নিজে নিজে রাক্ষস হইনি। কিন্তু এই ‘অন্ধা-কানুন’ আমার সমস্ত জ্বালা সহ্যের সীমার বাইরে নিয়ে গিয়েছে। আমি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে গিয়েছি। যারা এই ফ্ল্যাঙ্কেনস্টাইনকে তৈরি করেছে, তাদের তো ভূগতেই হবে। আমার সঙ্গে ওদেরও জ্বলতে হবে। আর এ রাক্ষসকে থামাবার সাধ্য আমার নিজেরও নেই। “
“কিউরি-অ—সার অ্যান্ড কিউরি-অ-সার।” তার চোখে যেন বিদ্যুৎ জ্বলছে, “অদ্ভুত মনস্তত্ব। একই সঙ্গে দুটো সত্ত্বা কিন্তু স্প্লিট পার্সোনালিটি নয়। ও জানে যে অন্যায় করছে, পাপবোধ আছে, অনুতাপও আছে। তবু থামছে না। ওর নিজের কথা অনুযায়ী, নিজেই নিজেকে থামাতে পারছে না! স্ট্রেঞ্জ!” বলতে বলতেই সে জগদীপের দিকে তাকায়, “যখন গুল্লু ইমোশনাল কথা বলছিল, বা অনুতাপের কথা জানাচ্ছিল, তখন ওর মুখের এক্সপ্রেশনটা লক্ষ্য করেছিলেন? কীভাবে কথাগুলো বলছিল? দুঃখে, বিষণ্ণতায় কিংবা একটু কাঁপা স্বরে?”
“না।” জগদীপ বললেন, “হি ওয়াজ টোট্যালি এক্সপ্রেশনলেস! একবারের জন্যও চোখের পলক পড়েনি, চোখে জল আসেনি কিংবা গলাও কাঁপেনি। আমার তো মনে হয়, ওর কোনো এক্সপ্রেশনই নেই।”
“সম্ভবত আপনার আন্দাজই সঠিক।” সে একটু ভেবে বলে, “লোকটা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কী করে? ফোন করেছিল? না নিজেই এসেছিল?”
“ফোন করেছিল প্রথমে। বলেছিল, ওর নাম গুলশন সিং ধিলোঁ। খুব অর্থকষ্টে আছে। আমি যদি ওকে ছোটোখাট কোনো কাজ দিতে পারি। আমিও ভাবলাম বিরাদরির লোক যখন তখন হেল্প তো করতেই হয়। তাই ওকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে বাড়িতেই ডেকে নিয়েছিলাম।” তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তখন কি জানতাম একটা মার্ডারারকে ‘নেওতা’ দিচ্ছি!”
“নম্বরটা আছে আপনার কাছে?”
“হাঞ্জি!”
“প্লিজ আমাদের নম্বরটা দিয়ে দিন।”
বাক্যটা বলে সে উঠে দাঁড়ায়, “থ্যাংকস ফর দ্য কো-অপারেশন মিঃ ভাট্টি৷ আপনি যদি এখনও ডেন্টিস্টকে দেখাতে চান, তবে ডক্টরের নাম আর নম্বরটা দিতে পারেন। উনি জেনারেল পেশেন্টকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না দিলেও পুলিশের হুড়ো খেলে আবার নতুন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চয়ই দেবেন। আর হ্যাঁ, আগামী দু-রাতের মধ্যে কলকাতা ছাড়ার চেষ্টা করবেন না। যদি গুলশন সিং আবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাহলে সঙ্গে-সঙ্গেই আমাদের খবর দেবেন।”
“ওকে। থ্যাংকস।”
জগদীপ বোধহয় ভাবেনইনি যে এত সহজে নিস্তার পাবেন। তিনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস টেনে ডাক্তারের নাম ধাম, গুল্লুর নম্বর, নিজের নম্বর-সব দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক দৃষ্টিপথের বাইরে যেতেই অধিরাজ নীচুস্বরে অফিসার রুদ্রকে বলল, “ওঁর পেছনে দু-জন সাদা পোষাকের পুলিশ লাগিয়ে দিন। আগামী দেড়দিনে মিঃ ভাট্টি কোথায় যাচ্ছেন, কী খাচ্ছেন, কখন ঘুমাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিট করছেনসব খবর আমার চাই।”
“শিওর।”
অফিসার রুদ্র ত্রস্তব্যস্ত হয়ে জগদীপকে স্টক করার বন্দোবস্ত করতে গেলেন। অধিরাজ অন্যমনস্কভাবে স্খলিত পায়ে চলতে-চলতে থানার বাইরে এল। মোবাইলে কার নম্বর যেন টুকটুক করে ডায়াল করছে। বেশ কিছুক্ষণ ও প্রান্তে রিঙের একঘেয়ে শব্দ। তারপরই জাগ্রত হল আর একটি কণ্ঠস্বর, “ইয়েস স্যার।”
“শ্রীযুক্ত সাইবার বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিত বাবু মহারাজ।” অধিরাজ অতি বিনয়ের সঙ্গে বলল, “দুটি কাজে আপনার হেল্প চাই।”
বিশ্বজিত হাসল, “তাই ভাবছি এতদিনেও আপনি একবারও হতভাগ্যকে স্মরণ করছেন না কেন! বলুন কী খিদমত করতে পারি?”
“দুটো নম্বর পাঠাচ্ছি। একটা জনৈক গুলশন সিং ধিলোঁর নম্বর। অন্যটি জগদীপ সিং ভাট্টির। দুটো মোবাইলের অন্তত একমাসের সি ডি আর, আর লোকেশন বের করে ফেলুন। আপনি তো পয়লা নম্বরের হ্যাকিং এক্সপার্টও বটে। সেই বিদ্যে মনে আছে? না বাল্মীকি হয়ে দস্যু রত্নাকরকে ভুলে মেরে দিয়েছেন?”
বিশ্বজিত হেসে ফেলল, “হ্যাকারদের গজনি ট্রিটমেন্ট দিলেও তারা নিজেদের নাম, ধাম, সব ভুলতে পারে, কিন্তু হ্যাকিং-এর শিল্পটি ভুলবে না স্যার। আনএথিক্যাল হ্যাকিং?”
“হ্যাকিং এথিক্যাল কবে ছিল? কিন্তু করতে হয়, নয়তো পিছিয়ে পড়তে হয়।” সে এবার সিরিয়াস, “দুটি মোবাইলের মধ্যেই ঢুকে পড়ুন। গুলশন সিং ধিলোঁর মোবাইলটি সম্ভবত পাওয়া যাবে না। যদি কপালগুণে পাওয়া যায় তো ভালো। না পেলে আরও ভালো। কিন্তু জগদীপ সিং ভাট্টির মোবাইলে অবশ্যই ঢুকবেন। তিনি কী করছেন, ফোনের ইন্টারনেট থেকে সানি লিওনি বা উর্ফি জাভেদকে দেখছেন কিনা, কিংবা তাঁর ফোনের ক্যামেরাটিকেও যদি হাত করতে পারেন, তাহলে তো সবচেয়ে ভালো। পারবেন?”
“ওয়েল!” বিশ্বজিতের হাসির শব্দ ভেসে আসে, “কাজটা মোটেই খুব সহজ নয়। ইনফ্যাক্ট কঠিনই। কিন্তু আপনি আমায় দিয়ে পাপকাজ না করিয়ে ছাড়বেন না। নম্বর দুটো দিন। আমি দেখছি কী করা যায়।”
“গ্রেট। হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।”
“ওকে।”
বিশ্বজিতকে নম্বর দুটো হোয়াটসঅ্যাপ করে সে চিন্তিত মুখে বাইরে এসে দাঁড়ায়। তার পেছন পেছন অর্ণব এবং টুইঙ্কলও। অর্ণব এতক্ষণ যা শুনছিল তার মধ্যে একটা তথ্যই তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যতবার সে নামটা শুনেছে, ততবার সন্দেহের বিষাক্ত ছোবল এসে পড়েছে তার মনে। এতক্ষণ বলার সুযোগ পায়নি। এইবার আস্তে আস্তে বলল, “স্যার, গুলশন সিং আর গুলাব সিং, দুটো নামের মধ্যে অদ্ভুত মিল। এমনকি দু-জনেরই ডাকনাম ‘গুল্লু’। এটা কি নেহাতই কো-ইনসিডেন্স?”
অধিরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “শুধু তাই নয়, চুরাশি সালে গুলশন সিং এর বয়েস যদি আট বছর হয়ে থাকে তবে এখন তার এগজ্যাক্ট বয়েস ছেচল্লিশ থেকে সাতচল্লিশের কাছাকাছি। সে আমাদের গুলাব সিং-এরই সমবয়েসি। খবরিশ্রেষ্ঠ-র বয়েসও পঁয়তাল্লিশ থেকে আটচল্লিশের মধ্যে। দু-জনেই একই এজ গ্রুপের।”
“তাহলে?”
অর্ণবের কণ্ঠে গভীর আতঙ্ক। খাল কাটারও দরকার নেই, কুমীর কি নাকের ডগাতেই বসে লেজ নাড়াচ্ছে?
“গুলাব, গুলশন, গুলফাম, গুলমোহর, গুলাল, গুলশনবীর, সবই শিখদের মধ্যে খুব কমন নাম। আর মজার কথা, খুঁজলে দেখা যাবে যে এদের সবার ডাকনামই ‘গুল্লু।’ এটা খুব জোরদার কোনো পয়েন্ট নয়। ধোপে টিকবে না।”
“তাহলে কি বার্নিং শিখ নিজের নাম ভুল বলেছে? তার আসল নাম ধাম সব মিথ্যে?”
“না অর্ণব।”
অধিরাজের মুখে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তার পরিচয়টা সম্পূর্ণ সত্য। নামটাও। সে আদ্যোপান্ত সত্যি কথাই বলেছে।”
