কালরাত্রি – ২৯

(২৯)

আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা! কোনোদিন ভুলব না লোকটাকে। ওকে ভোলা সম্ভবই নয়। এখনও লোকটা একটুও পালটায়নি। পার্টি বদলেছে, চোলা বদলেছে কিন্তু ‘তেবড়’ একই। যতবার ও সামনে আসে, হাতদুটো নিষপিশ করে। মনে হয়, এখনই গলা টিপে মারি। হারামখোর সরতাজকে কীভাবে মেরেছিল….! ধোঁকা দিয়ে, ভুলিয়ে ভালিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতা করে…!

আজকাল কাউকে দেখলে সরতাজকে বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই খতরনাক চাল, যুদ্ধ করার যজবা, সহজে হাল না ছাড়ার জিদ, মাটি কামড়ে পড়ে থাকার অনমনীয়তা, বাঘের মতো জ্বলজ্বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দুই চোখ! মনে হচ্ছে একটা মানুষেরই বহুযুগ পরে রিপিট টেলিকাস্ট দেখছি। মাঝেমধ্যেই ভুল হয়ে যাচ্ছে। আর এই ভুলই কখনও কখনও দুর্বল করে দিচ্ছে আমায়। ঠিকমতো যুদ্ধটাও করতে দিচ্ছে না। শত্রুর ‘হোঁশ” আর ‘জোশ’ দুইয়েরই প্রশংসা করে ফেলছি, যা আদৌ করাই উচিত নয়। দুশমন তো দুশমনই। তাকে সমূলে উৎখাত করে দিতে হয়। তার বীরত্ব, সাহস, লড়ে যাওয়ার ক্ষমতার তারিফ করতে নেই। বাপু তো বলেছিল, শিখরা নিজেদের শত্রুদেরও সম্মান করতে জানে। কিন্তু বাস্তব আমাকে তা শেখায়নি। শুধু শিখেছি, দুশমনের শেষ রাখতে নেই। ছলে, বলে, কৌশলে তাকে পরাস্ত করতেই হবে। যে করেই হোক, হয় আমি তাকে শেষ করব, নয় সে আমায় শেষ করবে। এই দুই ‘নতিজা’র মাঝামাঝি আর কোনো রাস্তাই নেই। মাঝখানের রাস্তাতেই তো হেঁটেছিল বাপু, সরতাজরা। সন্ধি করতে গিয়েছিল। ‘সুলাহ’ করে অনেকগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে চেয়ে মধ্যমপন্থী হয়েছিল ওরা সবাই। তাতে ফায়দা কী হল?

এখন প্রায়ই স্বপ্নের মধ্যে দিদি এসে হাজির হয়। যসমিত দিদিকে স্পষ্ট দেখতে পাই। কুচকুচে কালো লম্বা বিনুনিটাকে ঝাঁকিয়ে বলে, “ও গুল্লু। কবে আসবি রে? আমরা তো সব ইন্তেজার করছি। দৌড়কে ইখে হমরা নাল আ যা না!

দিদি থাকলে এতদিনে আমি কোনো চঙ্গা মুন্ডা বা চঙ্গি কুরির মামা তো হতামই, এমনকি তাদের বাচ্চাদের ‘নানাজি’ বা ‘দাদাজি’-ও হয়ে যেতাম। ছোটো ছোটো ফুলের কুড়ির মতো শিশু আমার কোলে খেলা করত। তাদের খিলখিল হাসিতে ঘর ভরে উঠত। যস্যিদিদি নিশ্চয়ই এতদিনে অন্যান্য মাঝবয়সী ‘কৌর দের মতোই একটু ভারি চেহারার হয়ে যেত। রংটা মোটা হওয়ার জন্য আরও ফেটে পড়ত। মাথার চুলে নিশ্চয়ই অনেক রুপোলি ঝিলিক দেখা যেত। চোয়াল আর গাল একটু বেশি ভারি হত, যেমন পাঞ্জাবি মেয়েদের হয়। ছেলেপুলে, নাতিপুতি নিয়ে জিজার সঙ্গে সুখে সংসার করে ভারিক্কি গিন্নী-বান্নি হয়ে যেত এতদিনে।

আমি দিদির সেই সুখী সুখী গিন্নিমার্কা ডাকসাইটে জাঁদরেল চেহারাটাকে কল্পনা করার অনেক চেষ্টা করেছি। অথচ কিছুতেই পারি না। বরং যসমিত দিদির বয়েসও বাড়ে না, তাকে কারোর বেবে বা দাদি, নানির মতোও দেখায় না। অতীতের বুক থেকে ভেসে ওঠে সেই চিরযৌবনা যসমিত কৌর যার বয়েস একদিনেই থমকে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য। আমি দিদিকে বলি, “দাঁড়া যস্যিদিদি, সবর কর। তুই তো এখনও একইরকম আছিস্। কিন্তু তোর নান্না ভাই তো আর ছোটো নেই। বুড়ো হয়ে গেছে। এ কী সেই পুঁচকে ছেলেটাকে পেয়েছিস যে একলাফে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে তোর কোলে? বয়েস হয়ে গেছে রে। নড়তে চড়তে একটু তো ওয়াক্ত লাগবেই।”

দিদি মুচকি হাসে, “বুডটা হয়েছিস বলে এত দুঃখে মরছিস কেন রে শুরু? বুড়ো হয়ে মরার যে কী সুখ তা তো আমাদের জানাই হল না। তোর ‘অচ্ছি কিসমত’ যে বুড়ো হওয়ার সুযোগ পেয়েছিস। গোটা জীবন, জওয়ানি, উমর বাড়া, তজুরবা, বুঢ়াপার সব সুখ পেয়েছিস। আমাদের তো জানাই হল না, আস্ত একটা জিন্দগি শুরু থেকে একেবারে শেষ অবধি মৌজ সে কাটাতে কেমন লাগে।”

ওর কথা শুনে ভীষণ অপরাধবোধে ভুগি। সত্যিই তো। অন্যায়ভাবে এতখানি উমর অবধি বেঁচে থেকে বড়োই জুর্ম করেছি। আমার তো বচপন থেকে জওয়ানিতে আসারই কথা নয়। সবার ক্ষেত্রে সময় থমকে গেল। শুধু ওদের বঞ্চিত করে আমি থামলাম না। ওরা সবাই চলে গেল, একা আমিই ফাঁকি দিয়ে রয়ে গেলাম। নতুন জীবন শুরু করলাম। বাঁচলাম। যতটুকু প্রাণ ভরে নেওয়ার ছিল, দুনিয়ার রং-রূপ সব ভোগ করলাম। অন্যায় নয়?

আমি ফিশফিশ করে দিদিকে বলি, “দাঁড়া যস্যিদিদি। আর শুধু শেষের কয়েকঘণ্টা বাকি। জিতে গেলে ভালো। নয়তো তোদের কাছেই তো আসব।” শেষের কয়েকঘণ্টা গুল্লু?”

সে মৃদু মৃদু হাসে, “

শেষের কয়েকঘণ্টা। শুনতেই যেন খুন ফের গরম হয়ে উঠল। হ্যাঁ, সেই ধ্বংসাত্মক দিনগুলোর শেষের কয়েক প্রহর। আখরি কুছ ঘন্টে। কেমন ছিল? মানুষ এখন আর সেসব কথা নিয়ে ভাবে না। ও তো কোন্ জন্মের ইতিহাস! কোথায় ছিল তখন মানুষের প্রতিবাদ? সোশ্যাল মিডিয়ার দাপাদাপি। কোথায় ছিল মোমবাতি মিছিলের ঘটা! উঁচুতলার মানুষেরা, সেলিব্রিটিরা কেউ কোনো কথা বলেননি। ‘দিখাওয়া’র আঁসুও টপকাননি। কেউ প্রতিবাদ করেননি। আজ কোনো মেয়ের বলাৎকার-খুন হলে মানুষ প্রতিবাদে নামে। ফেস্টুনে রাস্তা ঢেকে যায়। টিভিতে, খবরের কাগজে সেই নিয়ে ‘গ্যায়মা-গ্যায়মি’চলতে থাকে। অথচ তখন কতহাজার ‘কৌর’ বিধবা হল, ধর্ষিতা হল, খুনও হল। তিনহাজার শিখের মৃত্যু কিংবা মতান্তরে পাঁচহাজার-কোনোটাই খুব কম নয়। তাও এটা সরকারি হিসাব! বেসরকারি অঙ্কটা গোণার চেষ্টা না করাই ভালো। আর সমস্ত দেশ মিলিয়ে পনেরো থেকে আঠেরো হাজার। আমরা শেষ হলাম। কতগুলো নিরপরাধ ‘মাসুম’আদমি-ঔরতের রক্তে ভেসে গেল গোটা দিল্লি। তা নিয়ে দিল্লির রাজপথে একটা ‘বাগী’ প্ল্যাকার্ডও তো চোখে পড়ল না! যারা বিচার চেয়ে পথে নেমেছিল, তারা সেই অত্যাচারিত শিখেরই অবশিষ্ট পরিবার। এছাড়া একটিও মানুষ মোমবাতি তো দূর ‘মাচিস’ নিয়েও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যেন শিখ প্রজাতিটা এ দেশের কেউ নয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে ‘খালিস্তানের’ দাবি করে কিছু হারামখোর ‘শিখ’দের আগেই ভারতবর্ষের থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল। এবার বেয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং-এর কর্তৃত্বে যেন বাস্তবেই আজন্ম হিন্দুস্তানি শিখেরা ভারতের হৃদয় থেকে খসে পড়ল। বরং কিছু লোক এটাকে পলিটিক্যাল ইস্যু করে নাচানাচি করেছিল। বিরোধী দল রাজীব গান্ধীর সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। ব্যস্। ওখানেই সব শেষ! রাজীব গান্ধী বললেন, “একটা বড়ো গাছ উপড়ে পড়লে মাটি তো কাঁপবেই!” ওটাই তাঁর জবাব।

এখন ভাবলে বুঝি সাচি বাত। মাটি তো কেঁপেছিলই। ধরিত্রী মায়েরও রুহ কেঁপেছিল সেই মৃত্যুমিছিল দেখে। কিন্তু ‘দাঙ্গাই’দের হাত কাঁপেনি। নিরীহ, গরীব শিখদের ধড় থেকে মাথা উড়িয়ে দিতে তাদের বুকও কাঁপেনি। ওরা কারা ছিল যারা প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর বদলে ‘খুন কা বদলা খুন’ নারা লাগিয়ে ফিরে ফিরে আসছিল? ওরা কি আদৌ কোনো নির্দিষ্ট দলের মানুষ? কিছু শোকার্ত, ক্রুদ্ধ মানুষের দল? সজ্জনকুমার, এইচ কে এল ভগৎ কিংবা জগদীশ টাইটলারের মতো ‘বরিষ্ঠ’ নেতারা শিখ পুরুষদের টার্গেট করেছিল। তারা বুক ফুলিয়ে সে কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছে। পাগড়ির ‘কিমৎ’ লাগিয়েছিল ওরা। তবে চুনরি বা দুপাট্টার কিমৎ কে বা কারা লাগাল? সর্দার গদ্দার হ্যায় স্লোগান তবু বুঝি। কিন্তু কৌররাও কি গদ্দার ছিল?

এখানেই দিল্লির সেই দাঙ্গাইদের দ্বিচারিতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। কিছু জায়গায় ‘দাঙ্গাইরা’ শিখ পুরুষদের মেরে ধরে, কুপিয়ে জ্বালিয়ে খুন করে, তাদের ঘর লুটপাট করে, ঘর জ্বালিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছিল। মেয়েদের গয়নাও কেড়ে নিয়েছিল কিন্তু কৌরদের ‘ইজ্জত’ নিয়ে টানাটানি করেনি। নিষ্ঠুরভাবে তাদের চোখের সামনে গোটা পরিবারকে শেষ করে দিলেও বিধবাদের ‘ইজ্জত’ আর ‘জান’ বখ্শ্ দিয়েছিল। মেয়েরা অন্তত বুক চাপড়ে কেঁদে ‘ইনসাফ’ চাওয়ার জন্য বেঁচে ছিল। দিল্লির তিলকবিহার ‘উইডো কলোনি’ অন্তত সেই প্রমাণই দেয়। দিল্লির কিছু কলোনির সৌভাগ্যবতী কৌররা নিস্তার পেয়েছিল এই ‘মর্’-এর হাত থেকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দিল্লিতে একটিও শিখ পুরুষকে জিন্দা না রাখা। মেয়েরা টার্গেট ছিল না।

কিন্তু বেশ কিছু জায়গায় ছবিটা একদমই উলটো। কলোনির পর কলোনি নারীদের বিকৃত, ‘নাঙ্গা’, রক্তমাখা -ছিন্নবিচ্ছিন্ন, দলিত-মথিত শবদেহে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আমি হলফ করে বলতে পারি, ওরা কোনো শোকার্ত কিংবা ক্রুদ্ধ প্রতিশোধকামী মানুষ ছিলই না যারা ‘ইন্তেকামে’র আগুনে জ্বলছিল। ওরা না কোনো দলের, না কোনো রঙের। কিছু বিকৃতমস্তিষ্ক সুবিধাবাদী ‘হ্যায়ওয়ান’ ওই ভিড়ের মধ্যেই নিজেদের শয়তানি লালচ আর হওয়স্ নিয়ে ঢুকে পড়েছিল। তাদের না ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুতে কোনো শোক ছিল, না শিখদের বিরুদ্ধে কোনো ‘ইন্তেকাম’। ওদের পলিটিক্যাল কোনো এজেন্ডাই ছিল না। তারা ঢুকেছিল এই সুযোগে মেয়েদের সর্বনাশ করে, তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে নিজেদের হ্যায়ওয়ানিয়তের ভুখ আর বিকৃত হওয়স্ মেটাতে। এরকম রাক্ষস সব ভিড়ের মধ্যেই নিজের আশ মেটাতে ঢুকে পড়ে। আর ‘ভিড়’ পদার্থটা এমনই মূর্খ যে কিছুই না বুঝে এদের বেশি বেশি করে প্রশ্রয় দেয়। রাগের মাথায় ভেবেও দেখে না, কতগুলো ক্রিমিনাল ওদের দলে লুকিয়ে ঢুকে আছে! তখন পুলিশ, প্রশাসনের মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল। তারাও এই ক্রিমিনালদেরই বাড়তে দিয়েছিল, আমদানিও করেছিল। যার ফলাফল সবাই না ভুগলেও অনেক কলোনিই ভুগেছিল! সেই হতভাগ্যদের মধ্যে আমরাও ছিলাম…।

খুন সে লপত বাপুর চেহারাটা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। তাঁর কান্না কিছুতেই থামছিল না। সরতাজের রক্তমাখা লাশটার ওপর ভিড়ের নৃশংস অত্যাচার তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। একটা মানুষের ‘মওত’ হয়ে যাওয়ার পরও তার মৃতদেহকে কেউ এমন অপমান করতে পারে। এত গায়ের জ্বালা কীসের যে প্রাণহীন শরীরটাকেও বেইজ্জত করতে ছাড়বে না!

কলোনির লোকেদের মুখে কথা সরে না। সবাই ভেতরে ভেতরে সাময়িক শান্তি পেয়েছিল যে হয়তো মিটমাট হয়ে গেলে এবারের মতো প্রাণটা রক্ষা পাবে। কিন্তু ‘সুলাহ’-এর বাহানার পেছনে যে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ছিল তা বুঝতে পেরে তারা সবটাই আগে থেকে পরিকল্পনা করা। এই অবস্থায় ভিড় আমাদের মারতে এলে ওরা বাধা তো দেবেই না, বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। হাথিয়ার ‘জব্দ’ করা, সরতাজকে আমাদের থেকে আলাদা করা, শিখদের নির্বিঘ্ন, নিরস্ত্র করে দেওয়াটাই আসল উদ্দেশ্য ছিল, নিরাপত্তা দেওয়া নয়। আর আমরাও ওদের ওপর, সিস্টেমের ওপর অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলাম। কত বড়ো ভুল সিদ্ধান্ত। যার মাশুল এবার গুণতেই হবে।

তাওজি এবার মরিয়া হয়ে বললেন, “ঠিক আছে। তরোয়াল, লাঠি, চাপাতি দিতে হবে না সাব। কৃপাণগুলো তো অন্তত দাও। অন্যগুলো ঔজার বা হাথিয়ার হতে পারে। কিন্তু কৃপাণ তো আমাদের ধর্ম। শিখের কোমরে কৃপাণ থাকবে না তা কী করে হয়। শিখরা সব ছাড়তে পারে, কিন্তু পাগড়ি আর পঞ্চ ‘ক’ নয়। যার মধ্যে কৃপাণ অন্যতম আর ওটা আমাদের গুরু গোবিন্দ সিং মার-দাঙ্গা করার জন্য রাখতে বলেননি। ওটা ‘স্বাভিমান’, স্বাধীনতা, পরোপকারিতা আর না-ইনসাফির বিরুদ্ধে জিহাদের প্রতীক। ‘কৃপা’ মানে ক্ষমা, আর ‘আন’ মানে ‘অসমত্’, ইজ্জত। এই দুই নিয়েই ‘কৃপাণ।” ওটা আর যাই হোক, খুনোখুনি করার জিনিস নয়। পবিত্র জিনিস। ওটা তো ফেরত দিতেই পার।”

“না।” সে ফের মাথা নাড়ে, “মুখে যতই কৃপার কথা বলিস, ওই পবিত্ৰ কৃপাণ দিয়ে তোরা মানুষ খুন করেছিস। তাই ওগুলো এখন মার্ডার ওয়েপন হিসাবে পুলিশি হেফাজতে আছে। মার্ডার ওয়েপন এভাবে ফেরত দেওয়া যায় না। তার জন্য আগে কোর্ট কাছারি করতে হয়। লম্বা কেস চলে। কোর্ট যদি মনে করে ওই কৃপাণ দিয়ে কোনো খুন হয়নি, তোরা বেকসুর—তবেই ফেরত পাবি।”

বেকসুর! মার্ডার ওয়েপন। ওর কথা শুনে বাপুরা কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। যারা শয়ে শয়ে মানুষ খুন করছে তাদের হাতিয়ার কেড়ে নেওয়ার জন্য পুলিশ আদৌ তৎপর নয়। বরং যারা নিজেদের বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছিল, তাদের শেষ সম্বল পবিত্র কৃপাণটাও কেড়ে নেওয়ার জন্য কী অসামান্য উদ্যোগ। ওই ধর্মীয় পবিত্র জিনিসটা কিনা ওদের কাছে মার্ডার ওয়ে! কৃপাণের মূল অর্থ বুঝতে ওদের বয়েই গিয়েছে। ওরা জানত ঐ আট ইঞ্চির কৃপাণও শিখের হাতে পড়লে মারাত্মক হতে পারে। মুখে ‘মারো মারো’ বললেও কাপুরুষগুলো শিখদের শক্তিকেও ভয় পাচ্ছিল। সেইজন্যই এই ‘টেরামেরা প্যায়ড়া”! খুনের দায় আমাদেরই ঘাড়ে চাপিয়ে দিল ওরা। দাঙ্গাইরা নয়, কাঠগড়ায় আমরা।

বাপু, তাওজি আর কলোনির বাকি লোকেরা কি বোঝেননি যে শত কথা বললেও কোনো কাজই হবে না? তবু তারা প্রত্যেকটি প্রহরীর কাছে গিয়ে হাত জোড় করে মিনতি করছিলেন। ওদের পায়ে ধরে ‘গির-গিরাচ্ছিলেন।” এই চোখদুটো দেখেছে তাদের সকরুণ আর্তি। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের উচ্ছ্বসিত কান্না। পেছন থেকে কোনো আওয়াজ এলেই ত্রস্তব্যস্ত হয়ে সবাই পেছন দিকে তাকাচ্ছিল। এর মধ্যেই কি এসে পড়ল ওরা? এমনকী নিজের মানুষদের পদধ্বনিও বুঝি অচেনা লাগে। অতি পরিচিত কাউকে দৌড়ে আসতে দেখলেও ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি প্রহরারত পুলিশদের দেখে রক্ষী নয়, যমদূত বলে মনে হয়। ওরা নাকি আমাদের নিরাপত্তা দিতে এসেছে। অথচ দু-চোখে কী আক্রোশ। পারলে ওখানেই ধরে গুলি মারে!

একটা আট বছরের শিশুও তখন বুঝতে পেরেছিল যে আর নিস্তার নেই। উর্দিওয়ালাদের পাথরের মতো মুখ, কঠিন চোয়াল দেখেই সে বুঝেছিল, এরা তাদের মরতে দেখলে খুশিই হবে। বুজুর্গেরা হাত পেতে নিজেদের নয়, পরিবারের প্রাণের ‘ভিখ’ চাইছিলেন। কলোনির মেয়েরা, বেবে, তাইজি, এমনকি দাদি-নানির বয়সী বৃদ্ধা মহিলারাও ওদের পায়ে পড়ছিলেন। ওদের শক্ত বুট তাদের চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল। কান্নাবিকৃত গলায় বলছিলেন, “কৃপাণটা অন্তত দাও, ও সাব! অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও দাও। একটা বেলা অন্তত আমার ঘরের মানুষগুলো বেঁচে থাকুক। আমার পোতা-পোতি, মরদ, মেয়ে-ছেলেদের মরার আগে আর এক পহর চোখ ভরে দেখি। বাত আর হাত যদি আমাদের ‘অসমৎ’-এ পৌঁছায়, তবে কথা দিচ্ছি, ওই কৃপাণ শত্রুর বুকে নয়, নিজেদের বুকেই মারব। আমরাই মরব কিন্তু ওয়াহেগুরুর ‘কৃপা’ আর নিজেদের ‘আন’নিয়ে। এটুকু নয় শেষ সময়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে দাও …।” কিন্তু পুলিশেরা দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “কিচ্ছু দিতে পারব না। অর্ডার নেই। তাছাড়া মরবিই বা কেন? আমরা আছি না? এত সহজে মরতে দেব?”

কথাগুলো একেবারে যেন গুলির মতোই এসে বিঁধল। কথার বাঁকা ভঙ্গিতেই স্পষ্ট যে ওরা আছে বলেই আরও বেশি বিপদ! আর যা-ই হোক, সহজ মৃত্যু ওরা দেবে না। একজন তো বলেই ফেলল, “ইন্দিরাজিকে মারার সময় মনে ছিল না?”

অসম্ভব ত্রাস, আতঙ্ক মনের ভেতর নিয়ে আর্ত, বিপন্ন মানুষগুলো অনেক কাকুতি-মিনতি করে, ভিক্ষা চেয়েও ব্যর্থ হল। শেষে ক্লান্ত হয়ে নিজেদের বধ্যভূমিতেই ফিরে এল তারা। হ্যাঁ, আমরা সবাই জানতাম, এটাই আমাদের ‘শশান’ হতে চলেছে। যদি কেউ প্রাণে বেঁচেও যায়, নিজের আত্মীয়র নশ্বর দেহটাও শেষকৃত্যের জন্য খুঁজে পাবে না। শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা দেহ অন্তত লাগে। কিন্তু চতুর্দিকের পরিস্থিতি দেখে আমার মতো একটা বাচ্চাও বুঝেছিল, সেটুকুও বাকি থাকবে না। এটাই ‘আখরি’ ময়দান। আর এখানেই জিন্দা সবার চিতা জ্বলতে চলেছে। হরি সিং, আমাদের কলোনিরই ছেলে। আমার থেকে বছরখানেকের বড়ো ছিল সে। তার বাপু ছিল না। সে হরির শৈশবেই ট্রাক অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল। ওর বেবে রশ্মি কৌর চেয়েচিন্তে, এর ঘরে, ওর ঘরে কাজ করে, রসোই-বর্তন সাফ করে, লঙ্গর রেঁধে কোনোমতে দুটো ‘রোটি’ কামাত। নিজে ভুখা থাকলেও হরিকে কোনোদিন উপবাসী রাখেনি। বিধবা মায়ের বড়ো আদরের ছেলে। আজও এই প্রবীণ চোখদুটোর সামনে ভেসে ওঠে তার নিষ্পাপ করুণ মুখটা। চোখদুটো কেঁদে কেঁদে টকটকে লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে। নোনতা অশ্রুর ছাপ গালে নিয়ে সে শুকনো ঠোঁট চেটে প্রশ্ন করেছিল, “হাঁ রে ক্কাকে, ওরা আমাকে পুড়িয়ে মারবে না তো? আমি একবার তাড়াতাড়ি গরম রোটি খেতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা খেয়েছিলাম। বড়ো জ্বালা করেছিল। ফোস্কা পড়ে চামড়া উঠে গিয়েছিল। বেবে ফুঁ দিয়ে, মরমপট্টি করে ব্যথা কমিয়েছিল ঠিকই লেকিন তারপর থেকে আগকে আমি বড়ো ভয় পাই। পুরোটা পুড়ে গেলে আরও বেশি জ্বালা করবে, আরও দর্দ হবে, তাই না?”

হরির চোখদুটোয় একটু ধূসরের ছোঁয়া ছিল। সবাই বলত, ‘বিল্লোরি আখে”। ওর সেই ধূসর মার্বেলের মতো কাচস্বচ্ছ আর্দ্র দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, কাকেই বা কীসের কথা জিজ্ঞাসা করছে! কিছুক্ষণ আগেই নিজেই ভাবছিলাম আমার মৃত্যুটা ঠিক কোন্ পথে আসতে চলেছে! গরম রুটির ছ্যাঁকার কষ্ট, আর জ্যান্ত মশাল হয়ে আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাঁক হওয়ার যন্ত্রণার মধ্যে যে কতটা পার্থক্য তা এখনও কল্পনাই করতে পারছে না। আমি একটু একটু পারছি কারণ চোখের সামনে অনেক জ্বলন্ত হতভাগ্যের অন্তিম চিৎকার স্বকর্ণে শুনেছি যা শোনা যায় না। তাদের ‘তড়প’ স্বচক্ষে দেখেছি যা দেখা অসম্ভব। গলায় জ্বলন্ত টায়ার পরা অবস্থায় সর্দারদের মরণযন্ত্রণার সাক্ষী ছিলাম আমি। তাই ওর কথাটা শুনে হাসিও পেল, আবার কান্নাও বেচারা হরি জানেও না ঠিক কতখানি ‘দর্পনাক’ মৃত্যুর কথা সে বলছে!

আমার দুই পা-জি সরবজিত আর আমনপ্রীত কোনো কথাই বলছিল না। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল অকালেই বার্ধক্য ওদের খেয়ে নিয়েছে। একা ওরাই নয়, কলোনির সবক-টা শিশু বুঝি অকালবৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারো মুখে কোনো শব্দ, শোর-শরাবা কিচ্ছু নেই। কেউ ‘লঙ্গরের’ কথা ভুলেও বলছে না। বাচ্চাগুলোর শুকনো মুখে স্পষ্ট ছিল ভুখ আর প্যায়াস। তবু কেউ ‘রোটি’ শব্দটাও উচ্চারণ করেনি। রোজ এই সময় ‘কঞ্চে’ খেলার ধুম পড়ে। ছোট্ট ছোট্ট রং-বেরঙের কাচের মার্বেলগুলো আমাদের সবার কাছে হীরে-মানিকের চেয়েও বেশি দামি। অথচ আজ সেই নার্বেলের বয়ান অযত্নে, অবহেলাতেই পড়ে রয়েছে ঘরের অন্ধকার কোণে। কেউ সেদিকে তাকিয়েও দেখছে না। ইন্দিরা গান্ধীকে খুন করার অপরাধ নিয়ে ছোট্ট শিশু খুনিদের দল অন্ধকার ভরা দৃষ্টিতে এ ওর মুখের দিকে দেখছিল। বারবার বড়োদের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল যে এই ‘অন্ধেরা’য় একবিন্দু আশার আলোও আছে কিনা। তারা ভয়ে কাঁপছিল যে কখন বিচারকেরা হাত জ্বলন্ত টায়ার, তেল, রড, চপার, সেই ভয়াবহ সাদা পাউডার আর তরোয়াল নিয়ে এসে হানা দেবে।

সেই খুনিদের ভিড়ে দাঁড়িয়েছিল এক আট বছরের শিশু-ও। বাইরে সূর্যের আলো। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল যে সে অন্ধকার এক নিষ্ঠুর কারাগারের সঙ্কীর্ণ পথ দিয়ে ফাঁসিঘরের দিকে চলেছে! সামনে কতগুলো কালো কালো সিঁড়ির ছায়া। সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই তার ঘাতক অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর সঙ্গে অপেক্ষা করছে। তখন ওসবের নাম জানা ছিল না। বাপুর মুখেই শুনেছিলাম, যে এমন অন্ধকার রাস্তা পেরিয়েই ভগৎ সিং, উধম সিং ফাঁসিতে চড়েছিলেন। কোনোদিন দেখিনি, তবে ওঁর মুখের বর্ণনা এতটাই জীবন্ত ছিল যে সেই বধ্যভূমিতে যাওয়ার রাস্তাটা কল্পনায় দেখতে পেতাম। দু-দিকে কঠিন পাথুরে জেলের দেওয়াল শ্বাস রোধ করে দেয়। সামনে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। সঙ্কীর্ণ কালো পথ চলে গিয়েছে মৃত্যুর দিকে। আর কোনো রাস্তা নেই।

এখন টেকনিক্যাল টার্মগুলো জানি। তাই হয়তো আরও স্পষ্টভাবে বলতে পারি। আমার অবস্থা সেই ফাঁসির আসামীর মতো ছিল, যার ব্ল্যাক ওয়ারেন্টে সই হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। দেশ আমাদের ক্ষমা করেনি। ভয়াবহ মৃত্যুশীতল ‘ডেথ রো’তে একটা আট বছরের শিশু মূক ও বধিরের মতো দাঁড়িয়েছিল। কখনও কাঁপছে, কখনও মূর্তির মতো স্থির। চোখের ভেতরটা কড়কড় করছে, তবু জল আসছে না। তার চোখের সামনে শুধু অপেক্ষমাণ ‘গ্যালোজ’ ক্রুর হাসি হাসছে। সে অপেক্ষা করছে কতক্ষণে জহ্লাদ এসে তাকে টেনে হিঁচড়ে ফাঁসিতে চড়িয়ে দেবে! কখনও মনে হচ্ছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃত্যু হোক। আবার কখনও মনে হচ্ছে, আরও কয়েকটা মুহূর্ত কি পাবে না প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য? এখানেই সব শেষ?

“বাবা কর্নৈল সিং বৈঠা সি দুকান তে
বাবা কর্নৈল সিং গিরেয়া ধড়াম্ সে
পিন্ড্ দে লোগ ফির আ কে কেহন লগ্‌গে,
বাবা কর্নৈল সিং তে গয়া হুঁ কাম সে!”

একটা কান্নামাখা গুনগুনানি শুনে দেখলাম হরি সিং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কবিতা বলছে। এখন যাকে বলে নার্সারি রাইম। শহীদেরা ফাঁসি কাঠে চড়ার আগে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ‘বন্দেমাতরম’ বলত। দোষীরা চিৎকার করত, গালাগালি দিত, শাপশাপান্তও করত। কিন্তু এই প্রথম বোধহয় কোনো ‘মওতের’ সাজা পাওয়া খুনি ‘নার্সারি রাইম’ বলতে বলতে ডেথ রো থেকে গ্যালোজের দিকে যাচ্ছিল। এখন ভাবলে বড়ো কান্না পায়। হরি বুঝতেই পারেনি ওর মনের ‘খওফ’ কী করে প্রকাশ করবে। নিষ্পাপ শিশু বড়ো কোনো বুলি জানত না। চিৎকার করে কাঁদার শক্তিও তার ছিল না। মাসুম বাচ্চা তো গালাগালি, শাপশাপান্ত করতেও শেখেনি। তাই শেষ মুহূর্তে ওর বাবা কর্নৈল সিং-এর করুণ পরিণতির কথাই মনে পড়েছিল। যে বেচারি নিজের দোকানে শান্তিতে বসে ছিল। হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, ধড়াম করে পড়ে গেল। আর উঠল না। গ্রামের সবাই এসে বলতে শুরু করল, বাবা কর্নৈল সিং তো মরেই গেল!

এই কবিতাটা আগে আমাদের বেশ হাসি-মজাকের বিষয়বস্তু ছিল। এখন হরির মুখে শুনে মনে হল, এর থেকে ভয়ংকর কবিতা আর নেই! ও মুখে ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু ওর দেহ সেই প্রচণ্ড ভয়কে সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেছিল। ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেই যাচ্ছিল, “বাবা কর্নৈল সিং…বাবা কর্নৈল সিং তে গয়া হুঁ কাম সে …. তে গয়া হুঁ কাম সে!… তে গয়া হুঁ…!” আর সবার চোখেই পড়েছিল যে ওর পরনের পাজামাটা ‘গিলা’ হয়ে গিয়েছে।

আমরা, ‘বাবা কর্নৈল সিং’-এর দল ওখানেই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কখন যে ধড়াম করে নিজেদের জায়গা থেকে পড়ে গিয়েছি তা কেউ টেরই পায়নি। তবে এখন যে ‘কাম তামাম’তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। সবার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল জ্যান্তই ‘রাখ’ হয়ে গিয়েছে। কাউকে আর পোড়ানোর দরকারই নেই। আশা জিনিসটা নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু মিথ্যে আশার আলো যদি হঠাৎ করে নিভে যায়, তবে তার চেয়ে হৃদয়বিদারক আর কিছু নেই। তৃষ্ণার্তরা কোনোমতে তৃষ্ণার কষ্ট সইয়ে নিচ্ছিল। নিজেদের মতোই চেষ্টা চালাচ্ছিল বাঁচার। কোনো-না-কোনো সময় ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে নিজেরাই ধুঁকে ধুঁকে মরত। আচমকা মরীচিকার ছল কি খুব প্রয়োজন ছিল তাদের বাঁচার লড়াইটুকুকেও একেবারে সমূলে শেষ করে দেওয়ার জন্য?

আমি তখন ভাবছিলাম, যদি সমস্ত সমস্যার ‘জড়’কেই এক নিমেষেই উৎখাত করে দেওয়া যেত! কাশ আমি আরও একটু বড়ো হতাম! কাশ প্রধানমন্ত্রীর দফতরে নোকর-চাকরও হতাম। কাশ, ওই দুই সর্বনেশে শয়তানের বন্দুকের সামনে গিয়ে নিজেই খাড়া হয়ে যেতে পারতাম। আমি ঝাঁঝরা হয়ে মরে যেতাম, তবু সর্দারদের নামের আগে ‘গদ্দার’ কলঙ্কটা মুছে দিয়ে যেতাম। ইন্দিরা গান্ধী তবে আজকে সলামত থাকতেন। সরতাজ আর দেশের বীর শিখ সিপাইরাও নিশ্চিন্তেই থাকত। একদল ‘খুন কা প্যায়াসা ভেড়িয়া’ তাদের পেছনে দৌড়ত না!

আমার অসম্ভব কান্না পাচ্ছিল। আমার কাছে পুলিশ, ফৌজি দেশের নায়ক ছিল। আদর্শ। সেই ফৌজি, যে পুলিশেরই গুলি খেয়ে রাজপথেই লুটিয়ে পড়ল! যে ফৌজিরা এখন দেশ তো দূর, নিজেদেরই কীভাবে বাঁচাবে ভেবে পাচ্ছে না! কানে অল্পস্বল্প খবর যা এসেছিল তাতে জানতে পেরেছি যে ‘মহাবীরচক্র’ সম্মান পাওয়া ফৌজি গ্রুপ ক্যাপ্টেন মনমোহনবীর সিং তলোয়ার অনেক চেষ্টা করেও, নির্বোধ ভিড়কে নিজের সম্মান, পদমর্যাদার কথা বলে, বুঝিয়ে, ইন্দিরা গান্ধীর অমর থাকার স্লোগান দিয়েও নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে পারেননি। দাঙ্গাইরা তাঁর বাড়িতে চড়াও হলে তিনি বাধ্য হয়েই ভয় দেখানোর জন্য গুলি চালিয়েছিলেন। যতক্ষণ জনতা তাঁর বাংলো পোড়ানোর চেষ্টা করছিল ততক্ষণ ওঁর শত অনুরোধেও অকুস্থলে পুলিশ আসেনি। কিন্তু যেই গ্রুপ ক্যাপ্টেন তলোয়ার আত্মরক্ষার্থে ফায়ার করতে শুরু করলেন অমনি পুলিশ গিয়ে হাজির। দাঙ্গাইরা ফায়ারিঙের ভয়ে ভেতর থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও বাংলোর বাইরেই ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ তাদের হাতে অস্ত্র, মশাল, সফেদ পাউডার, তেল, কাটারি-রক্তাক্ত তরোয়াল, সব দেখেছে। অথচ তারা কেউ গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ তাদের একজনকেও ধরার চেষ্টাও করেনি, উলটে মনমোহনবীর সিং তলোয়ারকেই ‘খুনি’ বলে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছে। এই হল ফৌজির দশা! আর এই হল আমার প্রিয় পুলিশের ভূমিকা! যাদের আমি ভালোবাসতাম, চোখ বুজে বিশ্বাস করতাম। পুলিশ চৌকি দেখার আমার খুব ইচ্ছে ছিল। ওই উর্দির মধ্যে নায়কদের দেখতে পেতাম। স্বপ্ন দেখতাম, আমিও খাঁকি পরেছি। কিংবা বর্ডারে দাঁড়িয়ে রাইফেল উঁচিয়ে দেশ পাহারা দিচ্ছি। সরতাজকে বলেছিলাম, “বড়ো হয়ে আমিও পুলিশ হব, দেশের ফৌজি হব। দেশের জন্য জান দেব…।”

আমার চোখ পড়ল সেই খাঁকি উর্দিওয়ালাদের দিকে। কানের মধ্যে তরল সীসার মতো শব্দগুলো যেন আবার ঝনঝন করে বেজে উঠেছে, “এত সহজে মরতে দেব?…ইন্দিরাজিকে মারার সময় মনে ছিল না? ইন্দিরাজিকে মারার সময়?”

জীবনে সেই প্রথমবার টের পেলাম, মৃত্যুর চেয়েও স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা অনেক বেশি ‘দর্পনাক’। ‘সাঁস’ টুটে গেলে কয়েক মুহূর্ত লাগে মরতে। আর ‘বিশোয়াস্’ টুটে গেলে মানুষ প্রতি মুহূর্তে জ্বলতে জ্বলতে মরে। আট বছরের শিশু জলভরা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখছিল, তার নায়কেরা আজ সবাই ‘খলনায়ক।’ উর্দির গৌরবের রোশনির ওপরে কেউ যেন এক দোয়াত কালো ‘সিয়াই” ঢেলে দিল৷ কলঙ্কিত কতগুলো অদৃশ্য রক্তাক্ত উর্দি শুধু আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়েছিল। তার মধ্যে কোনো মানুষকে দেখতে পাইনি। কোনো মানুষ ছিল না সেখানে! আমি কি এটাই হতে চেয়েছিলাম? নির্বোধ। নির্বোধ শিশু!

আমার কী হল কে জানে! বেবে আমায় জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিল। আমি এক ঝটকায় বেবের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে গেলাম সবচেয়ে কাছের উদিটির দিকে। প্রচণ্ড রাগে, ঘৃণায়, কান্নায় আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলেছিলাম, “ইন্দিরাজি কো ম্যায়নে নেহি মারা। সুন রহে হো তুম? ইন্দিরাজিকে আমি মা-রি-নি!”

পুলিশওয়ালা আমার দিকে নৃশংস চোখে তাকাল। আমার সমস্ত সাহস, বীরত্ব উবে গেল এক লহমায়। এ কি কোনো দেশসেবকের চোখ? আমার মনে হয়েছিল, দুঃস্বপ্নে দেখা কোনো রাক্ষসের দপদপে চোখ বুঝি। ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। না, এটা আমি কখনও হতে চাইনি। এ তো খুনির দৃষ্টি! এমন হওয়ার তো কথা ছিল না। টের পেলাম, কত কিছু ভাঙছে আমার ভেতরে! ভেঙে চুরে ‘বিখ্‌রে’ যাচ্ছি। এতটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ যে জোড়া-তালি দেওয়ার কোনো উপায় নেই।

উর্দি পরা লোকটা আমার দিকে আগুনে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর বাঁকা হাসি হেসে অন্যদিকে তাকিয়ে শিস্ দিয়ে উঠল, “গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই, কিকো খবর কৌন হ্যায় উয়োহ্, অনজান্ হ্যায় কোই…!” গানটা এর আগে সহস্রবার রেডিওতে শুনেছি। অনেক পুরোনো গান। প্রায়ই পুরোনো দিনের গানের আসরে বাজত। শুনলেই গা ছম্ছম্ করত। ভূতে খুব ভয় পেতাম। আর ঐ ভৌতিক সুর একটা শিরশিরে অনুভূতি রেখে যেত। তার বেশি কিছু ছিল না। গানটা মনে রাখারও বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। এমন গান তো রেডিয়োতে আকছারই শোনা যায়। বিশেষ করে ওই বছরে অমিতাভ বচ্চনের ‘শরাবি’ রিলিজ করেছিল। লোকে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে মন্ত্ ছিল। বলতে গেলে গোটা বছরটাই বুঝি বাপ্পি লাহিড়ীরই ছিল। ‘শরাবি’ একা নয়। সঙ্গে ‘তোহফা’ও সুপার ডুপার হিট। তখন ‘যহাঁ চার ইয়ার মিল যায়ে’, ‘ইন্তেহা হো গয়ি ইন্তেজার কী’, ‘দে দে প্যায়ার দে’ কিংবা ‘লোগ কেহতে হ্যায় ম্যায় শরাবি হুঁ’ সব মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। দিদিও মাঝেমধ্যে কাজ করতে করতে গুনগুন করত, ‘মুঝে নওলখা মঙ্গওয়া দে রে ও সইয়াঁ দিওয়ানে’। আর বাপু হুঁ হুঁ করতেন, ‘মনজিলেঁ অপনি জগাহ হ্যায়’ সরবজিৎ আর আমনপ্রীত সুযোগ বুঝে গাইত, ‘এক আঁখ মারু তো পর্দা হঠ যায়ে’ কিংবা ‘প্যায়ার কা তোহফা তেরা’। বেবে শুনতে পেয়ে দু-একবার প্রা-জিদের কানও টেনে ধরেছিল। আমিও এই গানগুলো শুনে শুনেই প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। এর মধ্যে গুমনামের মতো ভয়াবহ সুরের জায়গাই ছিল না। একে তো অনেক পুরানো। তার ওপর ভূত আমার মোটেই পছন্দ নয়। তাই গানটা মনে রাখার কোনো কারণও খুঁজে পাইনি। অথচ এইমাত্র শুনে মনে হল, এটা কোনো সাধারণ গানই নয়। আসলে এটা মৃত্যুর সুর! যে ‘খওফনাক’ মরণ দাঁত নখ বের করে ওঁত পেতে বসে আছে, এ বুঝি তারই আওয়াজ। ‘মাতমের ধুন।’ লোকটা যেন আমাকে ভয় দেখানোর জন্যই শিস্ দেওয়া থামিয়ে কথাগুলো আরও স্পষ্ট করে গেয়ে উঠল, “কিস্কো সমঝে হাম অনা/ কল্ কা নাম হ্যায় এক সপ্‌না/ আজ অগর তুম জিন্দা হো/ তো কল্ কে লিয়ে মালা জপনা! ‘

আমার রক্ত বুঝি হিম হয়ে জমে গিয়েছিল। গানটার পেছনের অর্থ ওই বয়েসেই সাফ সাফ বুঝেছিলাম। ওই লম্হাতেই সমস্ত সুর, গান ছাপিয়ে ওই ‘মাতমের ধুন’-টাই ‘জেহনে’ এমন মিশে গেল যে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে আর কোনো সুর নেই। সব গানই বুঝি বেসুরো বাজছে। শুধু আশপাশ থেকে ফিশফিশ্ করে কারা যেন একটানা গেয়েই যাচ্ছে, ‘গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই… কিকো খবর কৌন হ্যায় উয়োহ্… অনজান্ হ্যায় কোই… গুমনাম হ্যায় কোই…!”

“গুল্লু, পুত্তর।”

বাপু আর বেবে এসে আমায় ওখান থেকে টেনে নিয়ে চলে গেলেন। দেখলাম সমস্ত কলোনিবাসীরা তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। ভেতর থেকে খিল এঁটে দিচ্ছে। বোকা মানুষগুলো জানত যে দুর্বল খিল বা হুড়কো ‘ভিড়ের’ তাকতকে ঠেকাতে পারবে না। তবু কাঠবিড়ালীর মতো কোটরের মধ্যে ঢুকে চোখ বুজে ভাবছিল, বুঝি তাদের কেউ দেখতে পাবে না।

“চল্ পুত্তর, ঘর চল্…!”

বাপু আমাকে টেনে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। যস্যিদিদি তো ঘরের ভেতরেই উন্মাদিনীর মতো চুপ করে বসেছিল, বাইরে আর যায়নি। সরবজিত আর আমনপ্রীতও ঘরের এককোণে সাদা ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে প্রেতের মতো বসেছিল। বেবে আর বাপু আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজায় ভেতর থেকে খিল, ছিটকিনি, এমনকি তালাও লাগিয়ে দিলেন। সবাই বুঝতে পেরেছিল, আসলে ‘ডেথ সেলের’অন্ধকারেই ঢুকছে। এখন শুধু জহ্লাদের আসা বাকি।

বাইরে তখনও সেই উর্দিধারী শিস্ দিয়ে চলেছে, “গুমনাম হ্যায় কোই…!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *