(৫)
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরি
মঙ্গলপুরীর ভোরটা সেদিন ভীষণ থমথমে ছিল। আমার তো মনে হয় সূর্যটাও সেদিন উঁকি মারতে ভয় পাচ্ছিল। ভোরের আলোটা আজও মনে পড়ে। কী অদ্ভুত বিষণ্ণ ও পিঙ্গল। যেন ওকে পীতরোগে ধরেছে। অন্যান্য দিন রোদে গলা সোনার আভার কারুকার্য থাকে। কিন্তু সেদিন আলোটাকে কেমন যেন বিবর্ণ, রক্তহীন মানুষের মতো মনে হচ্ছিল। এমন ভোর আমি আগে আর কখনও দেখিনি। সচরাচর ভোর হলে রাতের অন্ধকার কেটে যায়। অথচ সেদিন যেন ভোরটাই অন্ধকারের ছায়া নিয়ে এসে উপস্থিত।
রোজ ভোরে আমার ঘুম ভাঙত নানারকম ‘শোর-শরাবায়।’ আমার ‘বাপু’ দিল্লিতে অটো-রিকশা চালাতেন। সংসার খুব স্বচ্ছল ছিল না। তাই আমরা সবাই শ্রমিকদের কলোনিতে থাকতাম। বেশ বড়ো পরিবার ছিল আমার। সবার মধ্যে আমিই ছোটো। দুই দাদা আর এক দিদি ছিল মাথার ওপরে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তারা মহা শোরগোল লাগিয়ে দিত। সরবজিত আর আমনপ্রীত প্রাজির মধ্যে প্রায় মারপিটই লেগে থাকত কে আগে স্নানে যাবে, তাই নিয়ে! দিদি যসমিত কৌর আর ‘বেবে তাদের সামাল দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যেত। বাপুজি অবশ্য এসবের মধ্যে থাকতেনই না। তিনি ভীষণ শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। হাঁকডাক করে কথা বলতেন, জোরে জোরে হাসতেন, কিন্তু কখনও তাকে উচ্চস্বরে ছেলে-মেয়েদের বকা দিতে শুনিনি। বরং তিনি ভালো করে বোঝাতেন, “পুত্তর, নিজের ভীরার সঙ্গে ঝগড়া করতে নেই৷ আমি কি তোদের ‘তাওজি’র সঙ্গে ঝগড়া করি? বড়ো ভাই পিতার সমান হয়। তাকে সম্মান দিতে হয়।”
আমনপ্রীত সরবজিতকে মরে গেলেও বোধহয় সম্মান দেবে না। সরবজিতও ছেড়ে দেওয়ার লোক নয়। সে-ও সম্মান আদায় করেই ছাড়বে। ফলস্বরূপ দু-জনের মধ্যেই কুস্তি লেগে থাকত! যতক্ষণ না পাশের বাড়ি থেকে গুরশরণ ‘তাওজি’র ধমক এসে না পড়ছে, ততক্ষণ ওরা কেউ থামবে না। পেল্লায় দাড়ি নিয়ে বিশালবপু তাওজি তেড়ে এলে তবেই এ ঝগড়া থামবে। কখনও কখনও তো ওদের চিৎকারে তিনি খেপে গিয়ে তরোয়াল নিয়ে দুই নির্বোধ বালককে তাড়া করতেন! আমনপ্রীত ও সরবজিত তখন এমন হাপিশ হয়ে যেত যেন ‘গধে কে সর সে সিং!’ ওদিকে সময়মতো স্নান খাওয়া না করলে স্কুলে যেতে দেরি হবে। অগত্যা সেই তাওজিই ডাকাডাকি করে ‘বাবা রে, বাছা রে’ বলে ওদের ঘরে ফেরাতেন।
আমার বাবা, তাওজি দু-জনেই উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে তাঁরা নিজেদের কষ্টের জীবনের দায়ভার দিতে চাননি। বাবা-বেবে-তাওজি-তাইজি প্রত্যেকেই চাইতেন তাঁদের ছেলেরা পড়াশোনা করে লায়েক হোক। তাই আমার দুই প্রা’জি সকাল সকালই নাওয়া খাওয়া মিটিয়ে স্কুলে চলে যেত। আমিও স্কুলে যেতাম। তবে আর একটু পরে। আমি ছোটো ছিলাম বলে বোধহয় বাপু আমায় নিজেই অটো করে স্কুলে ছাড়তে যেতেন। একটু একটু করে আমাদের সংসার সুখের মুখ দেখছিল। বেবে আগে কাঠপাতার উনুনে রান্না করত। পরে বাপু একটা স্টোভ এনে দিয়েছিলেন। আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বেবেকে ওই স্টোভেই রান্না করতে দেখেছি।
রোজ ভোরে স্টোভের কেরোসিন তেল পোড়া ধোঁয়ার ঝাপটা আমার নাকে এসে লাগত৷ জানি না আর কারোর এমন অনুভব হয়েছে কিনা। কিন্তু স্টোভের কেরোসিন তেল পোড়ার গন্ধটা ভীষণ মিষ্টি লাগত। ওই গন্ধটায় কেমন যেন নেশা হত। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়েই বুক ভরে কেরোসিনের গন্ধটা ফুসফুসে ভরতাম। সঙ্গে শোনা যেত বেবের হাতের কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দ! তার সঙ্গে ভেসে আসত আকাশবাণীর সিগনেচার টিউন। বেবে রুটি বানাতে বানাতে রেডিও শুনত। গরীবের ঘরে ওইটুকু বিলাসিতাই ছিল। বেবের সঙ্গে যসমিত দিদি ‘চুলা-চৌকা’য় সাহায্য করত। তবে বেবে কিছুদিন ধরে তাকে চুলায় বসতে দিচ্ছিল না। কারণটা অবশ্য সর্বজনোবিদিত। যসমিতের সঙ্গে দু-তিনটে বাড়ি পরের প্রতিবেশী নভজ্যোতের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। নভজ্যোতের চেহারাটা আজও মনে পড়ে। মেইন রোডের ওপর ওদের ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান ছিল। নভজ্যোত আমাদের তুলনায় বড়ো ঘরের ছেলে। দিদি অসম্ভব সুন্দরী ছিল। নভজ্যোত তাতেই ক্লিন বোল্ড! ওর ছোটোখাটো পাতলা চেহারাটা দেখলে বেশ হাসি পেত। সেজন্যই হয়তো গাম্ভীর্য বজায় রাখার জন্য সবসময়ই নভজ্যোত ‘জিজাজি’ খুদে শালাদের সামনে হাঁড়িমুখ করে বসে থাকত। আর শালাদের মুখোমুখি হলেই তার একটাই প্রশ্ন, “পড়াশোনা কেমন চলছে? অঙ্ক পারিস তোরা?”
অঙ্কের নাম শুনলেই তিন বাচ্চা-শিখের গায়ে জ্বর আসত। কে জানে, এরপর হয়তো অঙ্কের পড়াই ধরবে! বলাই বাহুল্য কিছুক্ষণের মধ্যেই এই গম্ভীর ও শিক্ষিত জামাইবাবুটিকে ছেড়ে তারা কেটে পড়ত। সরে আসতে পেরে শালার দলও হাঁফ ছেড়ে বাঁচত আর জামাইবাবু তাদের সরাতে পেরে। নয়তো হবু পত্নীর সঙ্গে সুখসম্ভাষণটা কিছুতেই হচ্ছিল না। শালারা পালিয়ে গেলে পরমসুন্দরী যসমিত কৌরের সঙ্গে কুজনে গুঞ্জনে মেতে উঠত নভজ্যোত। আমি তখন একবার উঁকি মেরে দেখেছি। তখন জিজুকে একেবারেই গোমড়ামুখো মনে হত না! আমি দৌড়ে গিয়ে দুই প্রা’জিকে এই দারুণ উত্তেজক সমাচারটা শুনিয়েছিলাম, “ওরে, জিজুব্যাটা হাসতে জানে!”
আমার কাছে ওই ছোট্ট বস্তিটাই স্বর্গের সমস্ত সুখ নিয়ে ধরা দিয়েছিল। শৈশবের মতো স্বপ্নময় সময় গোটা জীবনে আর পাওয়া যায় না। সুখ দুঃখ সবটাই যেন রূপকথার মতো ঠেকে। গোটা কলোনির পাঞ্জাবি বউ, মেয়েরা দুবেলা কল থেকে স্টিলের কলসীতে জল তুলে আনতে যেত। তাদের সমবেত খিলখিল হাসিতে, কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দে, পাজেব বা নূপুরের ঝঙ্কারে আলাদা আলাদা সুর একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করত এক আনন্দময় মিঠে সুরেলা বন্দিশ। বাপু স্নান করতে করতে যখন গাইতেন, “ইক ওঙ্কার সতনাম কর্তা পুর…, নির্ভাউ নির্ভের অকাল মুরত…’ তখন আমাদের দেওয়ালে টাঙানো ‘ওয়াহেগুরু’র ছবিটাও বুঝি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক অপার্থিব হাসি হাসত। বাপুর সঙ্গে গুরুদ্বারায় গেলে আমার বুকটা পরম শান্তিতে ভরে যেত! দুপুরবেলা মাঝেমধ্যেই এসে হাজির হত চুড়িওয়ালা, মিঠাইওয়ালা। কুলপিওয়ালা এলে তো কথাই নেই! গোলগাপ্পা বিক্রেতার চারদিকে মেয়েদের ভিড় দেখে কলোনির ছেলেদের বুকে আগুন জ্বলত। সরবজিত তো ঠিকই করে নিয়েছিল বড়ো হয়ে সে হয় গোলগাপ্পা বেচবে, নয়তো কাচের চুড়ি। চুড়িওয়ালা কেমন সুন্দর মেয়েদের ফর্সা ফর্সা সুগোল নরম হাত টিপে টিপে একটা একটা করে চুড়ি পরিয়ে দেয়। এমন সৌভাগ্য আর ক-জনের হয়! আর আমনপ্রীতের আবার অ্যাম্বুলেন্স গাড়ির ওপরে খুব লোভ ছিল। তার প্ল্যান ছিল সরবজিত প্রা এর ‘শাদিতে’ সে অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি চালিয়ে ‘বারাতি’-দের নিয়ে যাবে! তাওজি তার পরিকল্পনা শুনে চোখ কপালে তুলে বলেছিলেন, “সর্বনাশ! তাহলে কনে বাড়ির সবাই হার্টফেল করবে! ভাববে যে বারাতিরা সবাই মরে গেছে!”
এখনও মনে পড়ে সেদিনগুলো। বেবের হাতের সামান্য ঘি মাখানো রুটি আর ডালেও অমৃতের স্বাদ পেতাম। তাওজি সুযোগ পেলেই আমায় ডেকে পাকা চুল আর পাকা দাড়ি বেছে দিতে বলতেন। আমি তাঁর একটা একটা করে পাকা চুল বা দাড়ি তুলে দিতাম, পরিবর্তে তিনি আমায় একটা একটা করে বাদাম দিতেন। সে বাদামের স্বাদ অতুলনীয়! সন্ধেবেলায় ঘিয়ের প্রদীপ আর ধূপের গন্ধে ম ম করত গোটা এলাকা৷ রাতের খাওয়ার পর বাপুর কোলে শুয়ে কতরকম গল্প শুনতাম। বাপু শোনাতেন গুরু গোবিন্দ সিং-এর কঁহানি। সেই বিখ্যাত চমকৌরের দ্বিতীয় যুদ্ধের গল্প, যেখানে গুরু গোবিন্দ সিং-এর নেতৃত্বে চল্লিশজন শিখ প্রায় দশ লাখ মোঘল সেনার ‘দাঁত খট্টে কর দিয়ে!’ ওয়াজির খান আর ঔরঙ্গজেবের দশ লাখি সেনার সামনে বুক চিতিয়ে লড়ে গিয়েছিল মাত্র চল্লিশজন শিখ। তারা শহীদ হয়ে গেলেও মোগলদের হাত থেকে ফস্কে গিয়েছিলেন গুরু গোবিন্দ সিং। তাঁর কণ্ঠে গমগমিয়ে উঠত সেই রক্ত গরম করে দেওয়া গুরু গোবিন্দ সিং এর বলা শব্দগুলো, “চিড়িয়াঁ তে ম্যায় বাজ তুড়াওয়া, গিদরী তো ম্যায় শের বনাওয়া, সওয়া লাখ সে এক লড়াওয়া, তাঁবে গোবিন্দ সিং নাম কহাওয়া।” তাঁর অনুগত শিখ যোদ্ধারাও ঠিক তাই করে দেখিয়েছিল।
বলতে বলতেই আমার শান্ত বাপুর চোখদুটো যেন দপ্ করে জ্বলে উঠত। আরও একটা প্রিয় গল্প ছিল তাঁর। সেটা বলতে বলতে তিনি কখনওই ক্লান্ত হতেন না, শুনতে শুনতে আমিও না। সেই সারাগঢ়ি ফোর্টের একুশ জন শিখের মরণপণ শেষ যুদ্ধের গল্প! দশ হাজার পাঠানের বিরুদ্ধে হাবিলদার ঈশর সিং-এর নেতৃত্বে একুশ জন শিখ একদম ‘চট্টান’ এর মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরাকজাই আর আফ্রিদি আফগানরা একদিনেই সারাগঢ়ি, লকহার্ট আর গুলিস্তান দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আর সারাগঢ়ির ‘ছত্তিস শিখ ব্যাটেলিয়নের’ একুশজন সিংহ পণ করল যে সন্ধে নামা অবধি পাঠানদের ওখান থেকে এগোতেই দেবে না! একে একে কুড়ি জন মারা যাওয়ার পর যখন সিপাই গুর্মুখ সিং একাই কেল্লার অটল প্রাচীর হয়ে লড়ে যাচ্ছিল তখন গুলিস্তান আর লকহার্টের সেনারাও শুনেছিল তার গর্জন, ‘বো-লে সো নি-হা-ল! স-ত্ শ্ৰী অ-কা-ল!’ কেল্লা পুড়ে গেল, পুড়ে গেল গুর্মুর্খ সিংও, কিন্তু সন্ধের অন্ধকার নামার আগে একচুলও নড়তে দিল না গুল বাদশার দলবলকে!
যখন এসব গল্প আমি বাবার মুখে শুনেছিলাম তখন সাধারণ মানুষেরা এসব জানতই না। পরে ফিল্ম হওয়ার পর লোকে শিখ প্রজাতির বীরত্ব ফিল্মের পর্দায় দেখে কেঁদে ভাসিয়েছিল। কিন্তু তার বহু বছর আগেই বাবা কেঁদেছিলেন! যখন গল্পে গুর্মুখ সিং-এর মৃত্যু হল, তখন বাপুকে দেখে মনে হয়েছিল, বুঝি তাঁরই সন্তান মারা গিয়েছে। আর আমার স্বপ্নে আমার অটোরিক্সাচালক বাপু হয়ে যেতেন সারাগঢ়ির গুর্মুখ সিং! উদ্ধত তরবারি তুলে সিংহের মতো গর্জন করে বলে উঠতেন, ‘বো-লে সো নি-হা-ল!’ আমার শান্তিপ্রিয় বাপুই আবার শহীদ-এ-আজম ভগৎ সিং-এর বেশ ধরে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে চিৎকার করে উঠতেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ!” কখনো-কখনো সেই বাপুই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে সর্দার উধম সিং-এর বেশে সর্বসমক্ষে মাইকেল ও’ ডায়ারকে গুলি মারতেন। বাপু বলতেন, “পুত্তর। জালিয়ানওয়ালাবাগের মাটি আমাদের রক্তে। যুগে যুগে শিখ প্রমাণ করে এসেছে তারা ‘কায়র’ নয়! শিখ অকারণে কাউকে আক্রমণ করে না, কাউকে দাস বানায় না। কিন্তু শিখকে যারা ঘাঁটাতে এসেছে, তারা ‘জিন্দা’ ফেরত যায়নি কখনও। তুই সেই শিখ! একটা ‘জিদ্দি’ শিখ!”
বাপুর বলা প্রত্যেকটা শব্দ আমার রক্তে মিশে গিয়েছিল। সব কিছু যে খুব বুঝতাম তা বলতে পারি না। কিন্তু অজান্তেই একটা প্রভাব পড়েছিল। আমি জানতাম শিখ বীরের জাতি। ইংল্যাণ্ডের রানিও তাঁদের সম্মানে উঠে দাঁড়ান। আমাদের কলোনিতে এক জওয়ানের পরিবার থাকত। সরতাজ সিং। সে ইন্ডিয়ান আর্মিতে ছিল। আমার জীবনে বাপুর পরে সে দ্বিতীয় নায়ক। ওর উদ্ধত লম্বা চেহারা, চওড়া কাঁধ, কাজল কালো চোখ দেখে মনে হত আমি কেন এমন হলাম না। ১৯৭১-এর ইন্দো-পাক যুদ্ধে সে লড়েছিল। বেশ কয়েকটা বুলেট খেয়েও ময়দান ছাড়েনি! যখন সে কলতলায় সরষের তেল গায়ে মেখে স্নান করত তখন ওর গায়ের তেল আদৃত বুলেটের দাগগুলোয় রোদ পিছলে পড়ে চকচক করে উঠত। মনে হত, হীরের থেকেও দামি অলঙ্কার বুঝি ও-ই পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
এমনভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। হয়তো আগামী দিনগুলোও সোনালি রোদে, রূপোলি স্বপ্নে কেটে যেত। নভজ্যোত আর যসমিত দিদির বিয়ের দিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছিল। ওদের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলেও ‘লাড্ডু’ তো আমাদের মনের মধ্যে ফুটছে। বিয়েটা কী জিনিস তখন অত বুঝতাম না। শুধু এইটুকু জানতাম যে যসমিত দিদির বিয়ে হলে আমরা নতুন পোষাক পাব আর খুব ভালোমন্দ খেতে পাব। আমনপ্রীত ভাবছিল অ্যাম্বুলেন্সে বারাত নিয়ে আসার আইডিয়াটা জিজুকে দেবে কিনা! কিন্তু জিজুর সামনে যেতেই সে বলে বসল, “কী রে ক্কাকে! এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছিস? পরীক্ষা কবে তোর?” বেচারি আমনপ্রীত তখন পালাতে পারলে বাঁচে। ঠিক তখনই সেই কালান্তক দিনটা এল! ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪!
সকাল থেকেই চতুর্দিক থমথমে। যসমিত দিদির হাতে আগের রাতেই মেহেন্দি রং জমিয়েছে। অসম্ভব গাঢ় রং হয়েছিল মেহেন্দির! ও শখ করে একদিন আগেই মেহেন্দি পরেছে। ওর বক্তব্য অনুযায়ী বিয়ের আগের রাতে মেহেন্দি করলে নাকি ‘রসম’টার মজাই পাওয়া যায় না! হাত-পা নাড়ার উপক্রম থাকে না। স্ট্যাচু হয়ে থাকতে থাকতে হাত পা ব্যথা হয়ে যায়। আর গায়ে ব্যথা নিয়ে কনের বিয়ে করতে মোটেই ভালো লাগার কথা নয়। তাই একদিন আগেই কাজ সেরে ফেলেছে। হিসেবমতো আজ বাড়িতে প্রচুর শোরগোল আর অতিথিদের ভিড় থাকার কথা। তার সঙ্গে ছাঁচ, লাড্ডু, নমকিন আরও রকমারি খাবার দাবারের স্তূপও সাজানো থাকা উচিত।
কিন্তু এর একটাও হল না! সেদিন ভোরটাই যেন কেমন একটা অদ্ভুতভাবে এসেছিল! হয়তো প্রকৃতি দুর্ঘটনার আগাম সঙ্কেত দেয়। সেদিনও দিয়েছিল। আমরা কেউ তখনও কিছুই বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারেনি গোটা দিল্লিও। শুধু জানত দু-জন তারা ওঁৎ পেতে বসেছিল সঠিক সময়ের জন্য। তখন তাদের নাম জানতাম না। বহুবছর পরে যখন ঘটনাটা নিয়ে পড়াশোনা করেছি তখনই জেনেছি সেই দুটো ভয়াবহ নাম! বেয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং। তাদের ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রের কারণ অনেক পরে বিস্তারিত পড়ার সুযোগ হয়েছে! যাঁকে ঘিরে এই ষড়যন্ত্র এবং যিনি অজান্তেই আমার সারাজীবনের দুরারোগ্য ক্ষতটি উপহার দেবেন, তাঁকেও তখন ঠিকমতো চিনতাম না। ভারতের তৎকালীন ঈশ্বরী এবং সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও ক্ষমতার আর এক নাম— ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর নাম বাপুর মুখেই কথায় কথায় একবার শুনেছিলাম। বাপু তাওজির সঙ্গে বসে রাজনৈতিক আলোচনা করছিলেন। তখনই জানতে পারি অপারেশন ব্লু স্টার আর ভিন্দ্রানয়ালের কথা। তখন কথাগুলো শুধু শব্দ হয়েই কানে বেজেছিল। অর্থ বুঝেছিলাম প্রায় কুড়ি বছর পরে। বাবা বলছিলেন, অকাল তখতের ক্ষতি হওয়াটা শিখদের সেন্টিমেন্টে খুব বড়ো আঘাত। ইন্দিরাজি স্বর্ণমন্দিরের ভেতরে আর্মি না-ঢোকালেই পারতেন। তাওজি ইন্দিরাজির এই হঠকারীতা সমর্থন করেননি। তাঁর ক্ষোভ ছিল, অপারেশনটার কথা জ্ঞানী জৈল সিংকেও পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি প্রধানমন্ত্রী! আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটার কি সুরাহা হত না?
ওঁরা দু-জন আলোচনা করছিলেন বটে, কিন্তু তখন আমার কাছে কে ইন্দিরা গান্ধী আর কে জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালে! আমি তো তখন মায়ের হাতের ঘি মাখানো পরোটা কাঁচা পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা সহযোগে তারিয়ে তারিয়ে খেতে ব্যস্ত। আমার ছোট্ট জীবনে মা, বাপু, দুই দাদা, দিদি, তাওজি-তাইজি, নভজ্যোত আর সরতাজ সমেত গুরু গোবিন্দ সিং, ঈশর সিং, গুর্মুর্খ, ভগৎ সিং, সর্দার উধম— সবাই একসঙ্গে ঢুকে পড়ে বড়োই শোরগোল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কাঁচা মাথার সব রাস্তাগুলো ওঁরাই জ্যাম করে রেখেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বা ব্লু স্টার অপারেশনের জন্য রাস্তা ছিল না! তাই সবই মাথার ওপর দিয়ে গেল।
কিন্তু ৩১ অক্টোবর হঠাৎই মঙ্গলপুরীর শিখ কলোনির মধ্যে অখণ্ড নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল! সেদিন কলোনি জুড়ে কোনো সাড়াশব্দই নেই। কলোনির বাচ্চারাও খেলতে বেরোয়নি। এক তারিখ দিদির বিয়ে। তাই ত্রিশ তারিখেই আমাদের রিশতেদাররা চলে এসেছিলেন। সকালে গানবাজনার পরিকল্পনা ছিল। আরও অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথাও ছিল। আমাদের আর তাওজিদের ঘরভরতি অতিথিরা আগের দিন রাতেও খোশগল্প, রঙ্গ-রসিকতায় মেতে উঠেছিলেন। মেয়েরা দিদির হাতের মেহেন্দি দেখে বলাবলি করছিল, “যস্যির হাতে রং বসেছে দেখো! কী লাল। কী রে যস্যি। নিজের বুকের খুনও মিশিয়েছিস নাকি মেহেন্দিতে?” দিদি শুধু হাসছিল। আর ওর টুকটুকে গাল এত লাল হয়ে যাচ্ছিল যেন এখনই ফোঁটায় ফোঁটায় ‘খুন’ চুঁইয়ে পড়বে।
অথচ পরদিনই সব হাওয়া। প্রত্যেক ঘরে তখন শুধু চাপা স্বরের ফিশফিশ। বেবে কে দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি সাংঘাতিক কোনো ‘অফশগুন’ হয়ে গিয়েছে। বড়োদের মুখ গম্ভীর। কেউ হাসছে না, কথা বলছে না। এদিক ওদিক তাকিয়েও বাপুকে খুঁজে পেলাম না। বেবেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাপু কই?”
বেবে গম্ভীর মুখে সবজি কাটতে কাটতে বলল, “ভোরেই বেরিয়ে গিয়েছে। এত মানা করলাম, বললাম মেয়ের বিয়ে, কিছু শুনলই না। বলেছে, তাড়াতাড়ি ক-টা রাউণ্ড মেরে দুপুরেই ফিরে আসবে।”
আমি আরও কিছু জিজ্ঞাসা করব কিনা ভাবছিলাম। পেটে অনেক প্রশ্নই গুড়গুড় করছে। অথচ বেবের মুখের অবস্থা দেখে সাহসও হচ্ছে না। মনে মনে সাহস জুটিয়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই কচি গলার চিৎকারে চমকে উঠলাম। এতক্ষণের অস্বাভাবিক পরিবেশে স্বাভাবিক চেঁচামেচি কোথা থেকে এল! দৌড়ে বাইরে গিয়ে দেখি কতগুলো আমারই বয়েসী পাগড়ি বাঁধা ছুটকু দৌড়োদৌড়ি জুড়ে দিয়েছে। তাদের হাতে লম্বা লম্বা লাঠি। সেগুলোকে অবিকল বন্দুকের মতো একে অপরের দিকে তাক করে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, “ঠাঁয়…. ঠাঁয়…. ঠাঁয় …!” আর সজোরে হেসে উঠছে। যেন এটা ভারি মজার খেলা। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই, “কী করছিস?”
“গুলি মারছি। ঠাঁয় … ঠাঁয় …।”
“কাকে গুলি মারছিস?”
ছোটো সর্দারজি ঠোঁট উলটে বলল, “মৈনু ক্যায়া পতা? শুনলাম ইন্দিরাজিকে কে যেন গুলি মেরেছে। আমরা সেটাই খেলছি।”
আমি মহা বিপদে পড়লাম। এই ইন্দিরাজিটি আবার কে! তিনি আমাদের খেলার মধ্যেই বা এসে পড়লেন কীভাবে! জিজ্ঞাসা করার আগেই অন্য একটি বাচ্চা বলল, “অরে, ইন্দিরাজিকে চিনিস না? ইন্দিরা গান্ধী। বাবা বলে, এই দেশের রানি! উসকো গোলি মার দিয়া-অ্যায়সে। ঠাঁয় … ঠাঁয় …!”
সরতাজ কোথায় যেন ছিল। তাড়াতাড়ি ছুটে এসে বাচ্চাদের হাত থেকে লাঠিরূপী রাইফেল কেড়ে নিল। চাপা ধমক দিয়ে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে কী ঠাঁয় ঠাঁয় করছিস! এক্ষুনি ঘরে যা। নয়তো এই লাঠিই তোর পিঠে ভাঙব!”
সরতাজকে সকলেই সমীহ করত। ওরা আর কথা না-বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল। সে-ও হাতের লাঠিগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। আমিই পেছন থেকে ডাকলাম, “সরতাজ প্ৰা, ক্যায়া হৈয়া।”
সরতাজ নিজের লম্বা দেহটাকে ঝুঁকিয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে ফিশফিশ করে জানাল, “ইন্দিরা গান্ধীজি আমাদের প্রাইম মিনিস্টার। তাকে গুলি মেরেছে দুষ্টু লোকেরা। তুই চুপচাপ ঘরে গিয়ে বোস। দুষ্টুমি করিস না।” “কে মেরেছে?”
“ওঁর নিজেরই শিখ সিপাইরা।”
আমি অপরিসীম কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “তোমার মতো সিপাই?”
সরতাজের চোখ যেন দপ্ করে একবার জ্বলে উঠল। ক্ষণ মুহূর্তের জন্য হাতের গুলিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “না। ওরা আমার মতো না। ওরা কারোর মতোই না। আমারই ভুল। ওরা সিপাই নয়। সিপাই দেশের জন্য গুলি খেতে পারে, কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রীকে গুলি মারতে পারে না।”
“আচ্ছা সরতাজ প্রাজি…!” সেই দিনের আট বছরের বাচ্চাটা প্রশ্ন করেছিল, “দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি মরে যায়, তবে স্কুল কতদিন ছুটি থাকবে?”
কত বড়ো গাধা হলে মানুষ এমন প্রশ্ন করে! সরতাজ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কী ভাবছিল জানি না। এতগুলো বছর পরে আমার মনে হয়, ও মনে মনে একটা কথাই বলেছিল, ‘অপোগণ্ড!’ সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ও জানত না ছুটিটা লম্বা হলে আমার বড়োই সুবিধা হয়। আজ এমনিই দিদির বিয়ের চক্করে কামাই হয়েছে। কালও স্কুলে যেতে পারব না। হোমওয়ার্কও করতে পারব না। আমাদের অঙ্কের পণ্ডিতজি একদিনের হোমওয়ার্ক না-করলেই কান টেনে লম্বা করে দিতেন। কখনও কখনও বেতের বাড়িও মারতেন। দু-দিনের হোমওয়ার্ক গায়েব হলে না জানি কী করবেন! তাই তাঁর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য একাধিক দিনের ছুটি দরকার ছিল। যাতে হোমওয়ার্কের খাঁড়াটা মাথা থেকে নেমে যায়৷
“উনি এখনও মারা যাননি ক্কাকে। হাসপাতালে ভরতি আছেন। ডাক্তারেরা ও ওয়াহেগুরু নিশ্চয়ই ওঁকে বাঁচাবেন।”
সরতাজ আমার মাথার পাগড়িটা নেড়ে দিয়ে চলে গেল। আমিও বড়োই হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে গেলাম। বড়োরা যথারীতি ঘরে বসে চাপা স্বরে কীসব বলে চলেছে। সম্ভবত রাজনৈতিক আলোচনাই করছে। আমার ওসব নিয়ে কোনোদিনই মাথাব্যথা ছিল না। শুধু ডাক্তারদের ওপর অনেকখানি আর ওয়াহেগুরুর ওপর একটু চটেছিলাম। আমার এমন সাধের ছুটির ওপর জল ঢেলে দিতে চলেছেন ওঁরা! এমনিতেই টান খেয়ে খেয়ে কানদুটো লম্বা হয়ে গিয়েছে। এবার পণ্ডিতজি নির্ঘাৎ টেনে ছিঁড়েই দেবেন মনের দুঃখে সেদিন খেয়ে দেয়ে চুপচাপ বসেই রইলাম। এ কী বিড়ম্বনা। দিদির বিয়ের আনন্দও উপভোগ করতে পারছি না, সবাই মুখ ভার করে বসে আছে। অন্যদিকে পণ্ডিতজির হাত থেকে নিস্তার নেই। ওয়াহেগুরুর এ কী বিচার! অন্তত একটা দিক তো রক্ষা করুন। হয় আমায় আনন্দ করতে দিন, নয় ছুটি মঞ্জুর করুন। লোকে বলে শিশুর প্রার্থনা ঈশ্বর একটু তাড়াতাড়িই শুনে ফেলেন। দিল্লির নিস্তব্ধ রাস্তা ঠিক বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ হঠাৎই অদ্ভুত এক অপ্রত্যাশিত কলরবে চমকে উঠল। যার রেশ একটু পরেই এসে পৌঁছল আমাদের কলোনিতেও। টের পেলাম কলোনির গলি দিয়ে কারা যেন দুড়দাড় শব্দে দৌড়ে যাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে, “সবাই ঘরে যাও! সবাই ঘরে যাও…!”
আমি বাইরের দিকে একটু উঁকিঝুঁকি মারছিলাম। হঠাৎই চোখে পড়ল একটা ভিড় পাগলের মতো দৌড়োতে দৌড়োতে এদিকেই আসছে। তাদের মধ্যে নভজ্যোতও আছে! তার কপাল ফেটে গিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ওর ঠিক পেছনেই আমার বাপু। তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো এদিকেই আসছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল তাঁর হাতে কড়া বা মাথায় অতবড় পাগড়িটা নেই!
বাপু কোনোমতে দৌড়োতে দৌড়োতে এসে আমাদের ঘরের দরজা ভেতর থেকে সজোরে বন্ধ করে দিলেন। তাঁকে অসম্ভব ভয়ার্ত লাগছিল। কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ওরা আমার অটো জ্বালিয়ে দিয়েছে! নভজ্যোতের দোকানে ভাংচুর করেছে। ওকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে। ওদের দোকানেও আগুন লাগিয়েছে। এক সর্দারজির স্কুটারও জ্বলছে দেখলাম। কে জানে, গুরুদ্বারাতেও আক্রমণ করবে কিনা!”
বেবে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বললেন, “ওরা কারা? কী হয়েছে? তোমার পাগড়ি কোথায়?”
“আমার এক বন্ধু খুলে নিয়েছে।” তিনি তখনও হাঁফাচ্ছেন, “ইন্দিরা গান্ধী মারা গিয়েছেন! ওঁর ভক্তরা ‘নারা’ লাগাচ্ছে ‘খুনকে বদলে খুন, সর্দার গদ্দার হ্যায়।’ যে সর্দারকে হাতের সামনে পাচ্ছে তাকেই মারছে। গাড়ি, বাস জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আমার সঙ্গে লাইনে দাঁড়ায় আশরফ, ও-ই বলল, “পাগড়ি, কড়া খুলে বাড়ি যাও সর্দারজি! নয়তো তোমায় আস্ত ছাড়বে না।”
জীবনে সেই প্রথম বাপুকে ভয় পেতে দেখলাম। বেবের ফরসা মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, “তবে কী হবে?”
“জানি না।” তিনি চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন, “আমার কেমন যেন ঠিক লাগছে না। যসমিতের বিয়েটা পিছিয়ে দিতে হবে। দুলহার যদি বিয়ের আগের দিন মাথা ফেটে রক্ত পড়ে, তবে সেটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে বাড়িতে উৎসব রাখাটা ঠিক হবে না। হয়তো ইন্দিরাজির মৃত্যুর খবরে ওঁর ভক্তরা সাময়িক রেগে গিয়েছে। দু-চারটে বাস, গাড়ি জ্বালিয়ে হয়তো গায়ের জ্বালা মিটিয়ে নেবে। কিন্তু এর বেশি আর কী করবে? আস্তে আস্তে ওদের রাগও পড়ে যাবে। দেশে পুলিশ আছে, আইন-কানুন আছে। শুধু আজকের রাতটা ভালোয় ভালোয় কাটলেই বাঁচি…।”
আমি এবার নিশ্চিত হলাম যে ‘রবজি’ আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। ছুটি এবার পাবই। কিন্তু তখন জানতাম না, শুধু আমার একার নয়, প্রায় প্রত্যেকেরই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছে। আমি শুধু সেদিনের জন্য নয়, চিরদিনের জন্যই ছুটি পেয়ে যাব! আর স্কুলে যেতে হবে না আমায়! যস্যি দিদির হাতের মেহেন্দিতে বুকের রক্ত মিশবে! সেই রক্তেই লেখা থাকবে নভজ্যোতের নাম। সরবজিত চুড়িওয়ালা হতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তে তার গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে জমকালো ‘নেকলেস!’ আমনপ্রীতের অ্যাম্বুলেন্সের ওপর খুব লোভ। সেই অ্যাম্বুলেন্সই এরপর তাকে ও বারাতিদের নিয়ে রওনা হবে শেষ প্রস্থানে! সরতাজের সিপাই হওয়া সার্থক হবে। আর আমার সাধারণ বাপু যেসব বীরের গল্প বলতেন, সেই ঈশর সিং আর গুরু গোবিন্দ সিং-এর মতোই রণভূমিতে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি বলেছিলেন, একটা রাত ভালোয় ভালোয় কেটে গেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। সে রাত এল ঠিকই, তবে গেল না!
পরদিন দুপুর হতে-না হতেই দেখা গেল দিনের আলো ও রোদকে ঝাপসা করে দিয়ে কুণ্ডলীকৃত জমা অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে গোটা মঙ্গলপুরীর আকাশ! একদিক থেকে নয়, চতুর্দিক থেকে কালো ধোঁয়া এসে ঢেকে দিয়েছিল সূর্যকে। আমাদের জীবনে রাতের সেই শুরু। কালরাত্রি!
শুনতে পেলাম অজস্র কণ্ঠের ভয়ার্ত চিৎকার ও কান্না, “ওরা গুরুদ্বারা জ্বালিয়ে দিচ্ছে! এলাকার সবক-টা গুরুদ্বারায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে! এখন মশাল নিয়ে এদিকেই আসছে! পালাও… পা-লা-ও!”
আট বছরের এক শিশু স্তম্ভিত হয়ে জানলা দিয়ে দেখেছিল ঈশ্বরের আসন জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে তাঁর শান্তিময় আশ্রয়! সর্বশক্তিমান অসহায়ের মতো লেলিহান আগুনে জ্বলছেন! জ্বলছে সব শান্তির বাণী। প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে যাচ্ছে ভ্রাতৃত্ব, বিশ্বাস, ভালোবাসা! জ্বলছে দিল্লি!
আমি কি এটাই চেয়েছিলাম!
