(২)
১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮
নিউ দিল্লির সফদরজঙ্গ হসপিটাল আর এইমসের মাঝখানের চত্বরটা খুব মন দিয়ে ঝাঁট দিচ্ছিল এক সাফাইকর্মী। এখনও ভোর হয়নি। একটু পরেই ভোরের আলো ফুটবে। তার সঙ্গে সঙ্গেই আস্তে আস্তে ভিড় জমে উঠবে এখানে। দুই দিকে দুটো নামজাদা হসপিটাল থাকার ফলে এই জায়গাটা প্রায় সবসময়ই সরগরম থাকে। দিনের বেলায় তো কথাই নেই। মানুষে মানুষে ছয়লাপ। এমনকি মধ্যরাতের তন্দ্রাময় নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে একের পর এক গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আসতেই থাকে! পেশেন্ট আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। রোগ এবং মৃত্যু জানান দিয়ে আসে না। তাই হসপিটালের দ্বার সবসময়ই খোলা। কখনও কোনো সিরিয়াস রোগি আসছে, কখনও বা রক্তাপ্লুত অ্যাক্সিডেন্টের ভিকটিম। কখনও বা একের পর এক মৃতদেহ ঢুকেই চলেছে মরচুয়ারিতে। স্ট্রেচার, অ্যাম্বুলেন্স, ওয়ার্ডবয় ও ডাক্তারদের ছোটাছুটি সবসময় লেগেই আছে। তাদের কোনো ক্লান্তি নেই, বিকারও নেই! অ্যাক্সিডেন্টে পিষে যাওয়া, দলা পাকানো মৃতদেহগুলোকে দেখেও তাদের বোধহয় কিছুই মনে হয় না!
ঝাঁট দিতে দিতে লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আজকাল সে নিজেই তো কেমন অনুভূতিহীন পুতুলে পরিণত হয়েছে। একসময় খুব ভয় করত। আজও তার মনে পড়ে ছ-বছর আগের সেই দৃশ্যটা! মাসটাও ডিসেম্বরই ছিল। তারিখও কাছাকাছি। একটা জলজ্যান্ত মেয়ের ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে সে বমি করে ফেলেছিল। মাথা থেকে পা অবধি রক্তে স্নান করেছিল মেয়েটা! সবাই বলাবলি করছিল ওর নাকি নাড়িভুঁড়িও বাইরে এসে ঝুলছিল! রেপ ভিক্টিম! তাকে সফদরজঙ্গ হসপিটালে নিয়ে গেল সবাই। মেয়েটার আসল নাম কী ছিল তা ওর জানা নেই। তবে গোটা ভারতবর্ষ তাকে ‘নির্ভয়া’ নামেই চেনে! ঠিক এখানেই দিনরাত এক করে দাঁড়িয়ে থাকত কত মানুষ! ভিড় জমে থাকত মিডিয়ার। ঘণ্টায় ঘণ্টায় মেডিক্যাল বুলেটিনের জন্য ওঁত পেতে থাকত সাংবাদিকরা। কত মানুষ সেই অজানা মেয়েটির খবর নিতে আসত। নিঃস্বার্থভাবে প্রার্থনা করত তার সুস্থ হয়ে ওঠার। কেউ হাত পাতত ঈশ্বরের কাছে, কারোর হাত উঠত ‘খোদার’ উদ্দেশে আবার কেউ বা মোমবাতি হাতে দ্বারস্থ হত জেসাসের! কত চেষ্টা করা হল বাঁচানোর। ডাক্তারদের আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাব ছিল না। অভাব ছিল না কাতর প্রার্থনারও। তবু বাঁচল না!
কত কিছুই না দেখেছে এই দিল্লির রাস্তা, সফদরজঙ্গ হসপিটাল ও এইমসের মাঝখানের এই অংশটা। কত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই হাসপাতাল। জীবনের অনিশ্চয়তা কী, তা একমাত্র এখানে এসে বসে থাকলেই জানা যায়। একদিকে নতুন কোনো পেশেন্ট জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে এসে ঢুকছে, অন্যদিক দিয়ে নিথর লাশ চলে যাচ্ছে মরচুয়ারিতে। জীবন-মৃত্যু একই দরজা দিয়ে ঢুকছে ও বেরোচ্ছে। ঠিক এখানেই ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ‘খুন সে লতপত’ অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। কেউ বলে ওঁর গার্ডরা ওঁকে ত্রিশটা গুলি মেরেছিল, কেউ বা বলে একত্রিশটা। গুলির সংখ্যা যা-ই হোক, পরিণতি একটাই ছিল-মৃত্যু! তখন অবশ্য সে এখানে কাজ করত না৷ নেহাৎই ছোটো ছিল। তাও মনে আছে, বাবার হাত ধরে সে-ও এসে দাঁড়িয়েছিল ঠিক এইখানেই। অবাক চোখে দেখেছিল, অগণিত মানুষের কালো কালো মাথা গিজগিজ করছে চতুর্দিকে। ওই ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে ওর কষ্ট হচ্ছিল বলে বাবা ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন।
তখনও অবশ্য এইমসে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। পরে সে জেনেছে যে দুপুর দুটো বেজে তেইশ মিনিটেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন ডাক্তাররা। গোটা দেহে কিছু ছিল না আর! কিন্তু বাইরে দাঁড়ানো ভিড় তখনও পাকাপাকিভাবে কিছুই জানতে পারেনি। তারা দেখছিল কংগ্রেস নেতাদের ব্যস্ততা, ডাক্তারদের দৌড়োদৌড়ি, একের পর এক বড়ো বড়ো মানুষের গাড়ির এসে থামা! জনতার মধ্যে তখনই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর মধ্যেই সে একঝলক দেখতে পেয়েছিল রাজীব গান্ধীকে। তখনও পর্যন্ত জনগণ বিমূঢ়, শোকাহত অবস্থাতেই দাঁড়িয়েছিল।
আন্দাজ সেইদিনই বিকেল চারটে বা সাড়ে চারটে নাগাদই সেই ভয়ানক স্লোগানটা শোনা যায়! কে প্রথম বলেছিল তা তারও জানা নেই। কিন্তু সমবেত কণ্ঠস্বর চেঁচিয়ে উঠে স্লোগান দিচ্ছিল, ‘সর্দার গদ্দার হ্যায়।’ বেচারি ছোট্ট শিশু কিছুই বুঝতে না পেরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, “গদ্দার কী?” বাবা সেই প্রশ্নের উত্তর দেননি। বরং শিশুপুত্রকে নিয়ে কোনোমতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন জমায়েত থেকে। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে মা-কে বলেছিলেন, “আজ তুমি কাজে বেরিও না। দাঙ্গা লাগবে মনে হয়!
বাবার আশঙ্কা সঠিক ছিল। দাঙ্গা লাগল। অথবা একতরফা খুন বলাই ঠিক। তারা হিন্দু হওয়ায় সে আগুনের আঁচ ওদের গায়ে পড়েনি। কিন্তু এই সফদরজঙ্গ আর এইমসের সামনে এবার মানুষের নয়, লাশের ভিড় জমে ওঠার পালা ছিল। কত হাজার লাশ যে একের পর এক ঢুকতে শুরু করল তার কোনো শেষ নেই! সফদরজঙ্গ আর এইমস্ সেই মর্মান্তিক ইতিহাসেরও সাক্ষী বটে। ৩১ অক্টোবর থেকে যে নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তা তেসরা নভেম্বরে গিয়ে থামল! ততক্ষণে দুই হসপিটালের ডাক্তাররা পোস্টমর্টেম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ওঁদের ভাষায়, “ফির তো লাশ আতে গয়ে… আতে গয়ে… আতে হি গয়ে…!” যে লোকটা আগের দিনই দিব্যি বেঁচেবর্তে ছিল, পরদিনই তার বিকৃত জ্বলন্ত লাশের সাক্ষী থাকল মুখোমুখি দাঁড়ানো এইমস্ আর সফদরজঙ্গ! ওদের প্রাচীন দেহে এমনই কত ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে। কত খুনোখুনি, কত হত্যালীলা, কত পৈশাচিক ঘটনা নিরুত্তাপ দৃষ্টিতে দেখে চলেছে নিরন্তর!
কাজ করতে করতেই আপনমনে হাসল সে। ঈশ্বরেরও কী অদ্ভুত রসিকতা। গতকালই অ্যান্টি শিখ রায়টে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার অপরাধে সজ্জন কুমারের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে! হাঃ, ১৯৮৪ সালের কীর্তির হিসাব হল ২০১৮ সালে। লোকটার বয়েস এখন বাহাত্তর কী তিয়াত্তর! ব্যাটার জীবনের আর কী বাকি রয়েছে। ঠিকমতো সাজা বোঝার আগেই ও মাল টপকে যাবে! এখন যাবজ্জীবন দেওয়া হাস্যকর নয়?
“কিসকো সমঝে হাম অপনা
কল কা নাম হ্যায় এক সপনা,
আজ অগর তুম জিন্দা হো,
তো কল কে লিয়ে মালা জপনা!…”
হঠাৎই অতি পরিচিত গানের কয়েক কলি শুনে সে অবাক হয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। এতক্ষণ এই জায়গাটা শুনশানই ছিল। শেষ অ্যাম্বুলেন্সটা এসেছে ঘণ্টাখানেক আগে। অন্যান্য দিনও শেষ রাতটা শান্ত, নিস্তব্ধই থাকে। আজও তাই ছিল। কিন্তু সাফাইকর্মীটি বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখল দিল্লির বিখ্যাত কুয়াশার মধ্যে আচমকা যেন মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হল একটি মানবদেহ! সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকে আগন্তুককে এ ব্যাটা এখানে টপকে পড়ল কোথা থেকে? এইম্স থেকে বেরোল না সফদরজঙ্গ থেকে? কোনো পেশেন্ট পার্টি কি? কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পেশেন্ট পার্টিকে এভাবে গুনগুনিয়ে গান গাইতে দেখেনি সে!
আস্তে আস্তে কুয়াশার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল এক সর্দারজির দেহরেখা। মাঝারি উচ্চতার রোগাটে চেহারা হলেও বেশ চওড়া কাঠামো। মাথার লাল পাগড়িটা কাছের হসপিটাল চৌহদ্দির বিষণ্ণ আলোয় স্পষ্ট। পরনে ময়লা সাদা চোলা আর পাজামা। সে ঘাবড়ে যায়। এ কী রে বাবা! হসপিটালের সামনে এমন শিখ যোদ্ধার বেশে কে ঘুরছে! এ কি ইতিহাসের পাতা থেকে নেমে এল? নাকি তারই অবচেতন মনের ভুল। এতক্ষণ ধরে সে অ্যান্টি শিখ রায়টের কথাই ভাবছিল। সেই চিন্তারই প্রতিফলন নাকি? সর্দারজি ততক্ষণে তার একেবারে মুখোমুখি। তার মুখ দেখেই হাড় কাঁপানো শীতেও দরদর করে ঘামতে শুরু করেছে লোকটা। এ লোকটা পেশেন্ট নয়। হতেই পারে না! সত্যিই এ ইতিহাস থেকেই নেমে এসেছে। ১৯৮৪ সালে এমন হাজার হাজার বিকৃত মরদেহ ঠিক এখানেই মর্গে পড়ে ছিল! এই লোক ১৯৮৪ সালের সফদরজঙ্গ হসপিটালের মর্গ থেকেই বুঝি কোনো অলৌকিক উপায়ে বেরিয়ে এসেছে। তার মাথা বনবন করে ঘুরতে থাকে। গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছে না। চতুর্দিকে কালো অন্ধকার। কানের মধ্যে কুঁ-উ-উ করে এক যান্ত্রিক শব্দ…!
রক্তাক্ত ও অর্ধদগ্ধ শিখটি কোনো কথা না বলে তার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়েছে। সে কোনোমতে দেখল খামের ওপর হিন্দিতে লেখা আছে, ‘পুলিশ চৌকি।’ কোনোরকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার আগেই সর্দার তাকে পাশ কাটিয়ে কুয়াশার মধ্যে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। শুধু শুনতে পেল সে ওই গানটার সুরেই একটানা শিস দিয়ে যাচ্ছে। গোটা মানুষটা কুয়াশায়, অন্ধকারে মাখামাখি হয়ে তার চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে গেল, তখনও শোনা যাচ্ছে সেই মিষ্টি অথচ হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া শিস, “গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই…!”
সেদিন যে কীভাবে লোকটা কাঁপতে কাঁপতে কাছের পুলিশ স্টেশনে গিয়ে পৌঁছেছিল তা ঈশ্বরই জানেন! দৌড়োতে দৌড়োতেই সে থেকে থেকে বিড়বিড় করছিল, “ভূত…. ভূত…!” কোনোমতে পুলিশ অফিসারের হাতে চিঠিটা তুলে দিয়েই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিল মানুষটা! সেই অবস্থাতেই একবার উচ্চারণ করেছিল, “ভূ-ত!”
১৯৮৪ সালের যে জায়গা থেকে শিখ নিধন যজ্ঞের গল্প শুরু হয়েছিল, সেই সফদরজঙ্গ আর এইমসের মাঝখানের চত্বর থেকেই ফের ২০১৮ সালে ‘বার্নিং শিখ’ বা ‘ফ্যান্টম শিখ’-এর গল্প শুরু হল। তার প্রথম আবির্ভাব ওখানেই। যে চিঠিটা পুলিশ স্টেশনে পৌঁছেছিল তাতে হিন্দিতে লেখা ছিল, “আদরণীয় ‘নালায়ক’ দিল্লি পুলিশ, আমি তোমাদের অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে একটু আগেই রিং রোডের কাছে চমনলাল শর্মার বাড়িতে আটজনের নিধন হয়েছে। “বুডঢা’ চমনলাল অবশ্য সুস্থই আছে, তার কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি। কিন্তু তাকে ছাড়া বাকি সবাইকেই আমি নিজের হাতে খুন করেছি। এতক্ষণে যদি পুড়ে কয়লা না হয়ে গিয়ে থাকে তবে দয়া করে লাশগুলো উদ্ধার করে নাও। এবং তোমাদের জ্ঞাতার্থে আরও জানাই যে আগামী বাহাত্তর ঘণ্টায় আমি আরও তিনটে মাসমার্ডার করব। ক্ষমতা থাকলে ঠেকিয়ে দেখাও, রোক সকো তো রোক লো।”
এখানেই চিঠি শেষ। এরকম ভয়ানক চিঠি পড়ে দিল্লি পুলিশ পড়িমড়ি করে দৌড়াল চমনলাল শর্মার বাড়িতে। গিয়ে যা দেখল তাতে পুলিশেরই ঘাম ছুটে যাওয়ার দশা! আটখানা লাশ পরপর একটা ঘরে সাজানো। প্রত্যেকের বুকে বেড় দিয়ে আছে একটা করে জ্বলন্ত টায়ার! দেহগুলো ততক্ষণে পুড়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। তবে বৃদ্ধ চমনলাল শর্মা বেঁচে ছিলেন। তিনি নিজের ঘরে বেহুঁশের মতো পড়ে ছিলেন। বাড়িতে কী হয়ে গিয়েছে তা টেরই পাননি। তার অজ্ঞাতেই তারই পুত্র, পুত্রবধূ, স্ত্রী এমনকি নাতি-নাতনি সমেত আটজনই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। চমনলালের যন্ত্রণা কমানোর কোনো নিদান বোধহয় ঈশ্বরের কাছেও ছিল না। তাকে সফদরজঙ্গ হসপিটালেই ভরতি করা হল।
এরপরই দিল্লি ‘বার্নিং শিখ’ এর ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। আগামী বাহাত্তর ঘণ্টায় যা ঘটল তা দিল্লি পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। তাদের অসহায়তার সীমাও ছিল না। চমনলাল শর্মার পরিবারের বীভৎস হত্যাকাণ্ডের খবর প্রায় আগুনের মতোই ছড়িয়ে পড়ল গোটা দিল্লিতে। তার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর বিস্তারিত বর্ণনাও বাদ গেল না। ২০০১ সালে মাংকি-ম্যান বা নর-বানরের তাণ্ডব সকলেরই মনে ছিল। অবিকল সেভাবেই ছড়িয়ে পড়ল ‘বার্নিং শিখ’ এর কাহিনি। এরপরই লোকে পথে ঘাটে, যেখানে সেখানে, দিনে-রাতে দিল্লির রাস্তায় সেই অর্ধদগ্ধ শিখকে দেখতে শুরু করল! কোথা থেকে আসে, কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়, কেউ জানে না! দিল্লির বিখ্যাত জমাট ‘কোহরা’ থেকে সে হঠাৎই আবির্ভূত হয়, আবার ‘কোহরা’তেই মিশে যায়! মিডিয়া উঠে পড়ে দিনরাত এক করে পাহারা দিতে শুরু করল। মাংকি ম্যানের দেখা তারা পায়নি। এবার কপালগুণে যদি বার্নিং শিখের একঝলক তাদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে যায়। অষ্টপ্রহর পুলিশের এমার্জেন্সি লাইনগুলো ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল ভয়ার্ত জনতার নানারকম বয়ানে। কেউ জানাল, ‘বার্নিং শিখ’ তাদের বাড়ির ছাতেই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ জানাল কখনও সুলতানপুরীর রাস্তায়, কখনও-বা মহীপালপুর এলাকায় তাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা গিয়েছে। পুলিশ একটা বীভৎস হত্যাকাণ্ড আগেই দেখেছিল। তারা জনতার বয়ানকে নজর আন্দাজ না করে তাদের কথামতো প্রত্যেকটা স্পটে গিয়ে পৌঁছোল যেখানে যেখানে সেই ভয়াবহ মূর্তিকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তখন কেউ নেই! যেমন রহস্যময়ভাবে সে দেখা দিয়েছিল, তেমনই রহস্যময়ভাবে অদৃশ্যও হয়ে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না! পুলিশ ক্রাইম সিন তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো ক্লু পেল না! একটা অজানা ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডি.এন.এ. স্যাম্পল্ল, কিংবা অন্য কোনো প্রমাণ, কিচ্ছু নেই। এমনকি বেডরুম, টেরেস কিংবা মেইন দরজায় কোনো ফোর্সড এন্ট্রির চিহ্নও পাওয়া যায়নি।
পুলিশের সমস্ত পরিশ্রমকেই ব্যর্থ করে দিয়ে প্রথম মাসমার্ডারের ঠিক চব্বিশ ঘণ্টার মাথায় দ্বিতীয় মাসমার্ডারের খবর চলে এল। এবারের শিকার চন্দ্রকুমার ভগতের পরিবার। দৃশ্য একই। জ্বলন্ত টায়ারের মৃত্যু আলিঙ্গনে পড়ে আছে চারটে রক্তাক্ত অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ! আশ্চর্য বিষয়, বৃদ্ধ চন্দ্রকুমার ভগতের শরীরে একটা আঁচড়ও পড়েনি! তিনি অসুস্থ হলেও জীবিত আছেন। তবে এভাবে বেঁচে থাকা অর্থহীন! স্বজনহারা বৃদ্ধ চন্দ্রকুমারের হাহাকার কিছুতেই থামানো যাচ্ছিল না। সত্তর অতিক্রম করা মানুষটি কপালে করাঘাত করতে করতে নিজেরই মৃত্যুকামনা করছিলেন।
দিল্লি পুলিশ ও ক্রাইমব্রাঞ্চ এই খুনগুলোর পেছনের ব্যক্তিটিকে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগল। কিন্তু তাদের হাতে কিছুই ছিল না। দ্বিতীয় কেসেও আততায়ী নিজের কোনো চিহ্নই ছাড়েনি। ফরেনসিকও ক্রাইম সিন খুঁজে কিছুই পায়নি। যথারীতি দরজাগুলোও অক্ষত অবস্থায় আছে। কেউ জবরদস্তি ঢোকার চেষ্টাও করেনি, অর্থাৎ নো ফোর্সড এন্ট্রি! পুলিশ সম্পূর্ণ অসহায়! খুনি কে? তার সূত্র তো দূর, এত বড়ো দিল্লি শহরে কোন্ পরিবারের ওপর ‘বার্নিং শিখ’এর বিধ্বংসী দৃষ্টি পড়তে চলেছে, তাও তাদের জানা ছিল না। গোটা শহরটাকেই হাই অ্যালার্টে রাখা হল। ‘বার্নিং শিখ’-এর বর্ণনা সব পুলিশ চৌকিতে চলে গেল। যে বেচারি পথিক রাস্তা দিয়ে মনের আনন্দে শিস দিয়ে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে চলেছিল, পুলিশ তাকেও খপাৎ করে ধরে হাজতে চালান করে দিল। লাল রঙের পাগড়ি বা চোলা দেখলেই জনতা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। পুলিশ সবেগে এক গাদা লাল পাগড়িকেও রাউন্ড আপ করে জেলে ঢোকাল। তা সত্ত্বেও আলোর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। বরং গোটা ডিপার্টমেন্ট অন্ধকারে হাত-পা মেরে স্রেফ গলদঘর্ম হচ্ছিল।
কয়েকঘণ্টার মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন লাল পাগড়িধারী সর্দারজিকে হাজতে ঢুকিয়ে দিয়েও শেষ রক্ষা হল না। ভগৎ পরিবারের ট্র্যাজেডির ধাক্কা সামলাতে-না-সামলাতেই ফের আর একটা দুঃসংবাদ! এবার খুনি ঢুকে পড়েছে খোদ পুলিশেরই ঘরে। প্রাক্তন পুলিশ কর্মচারী, আই.পি.এস. দেবধর চৌবের বাড়ি থেকেও বেরোচ্ছে ধূমকুণ্ডলী! শুধু তাই নয়, তাঁর বাড়ির বাইরে প্রহরারত গার্ডদের ধরে কেউ কচুকাটা করেছে। পুলিশ যখন অকুস্থলে পৌঁছোল তখন গেটের বাইরেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা! সামনের উঠোনটা রক্তে যেন ভেসে গিয়েছে! তাজা রক্তে উঠোনের মাটি পিচ্ছিল। তার ওপর হতভাগ্য সিকিউরিটি গার্ডদের ক্ষত-বিক্ষত দেহগুলোকে কে যেন টুকরো টুকরো করে কেটে ছড়িয়ে দিয়েছে চতুর্দিকে। কোথাও একটা কাটা হাত পড়ে আছে, কোথাও পা! কোথাও বা খণ্ডিত লাশের পেটের ভেতরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ—অস্ত্র, যকৃত পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও কর্তিত মুণ্ডু। পুলিশের টিম বুঝতেই পারছিল না, এই লাশের স্তূপের ওপর দিয়ে ভেতরে যাবে কী করে। বুটসুদ্ধ পা রাখারই জায়গা নেই। যেখানেই পা রাখছে, হয় পিছল রক্তে পা স্লিপ করছে, নয়তো পায়ের তলায় কারোর কাটা মাথা, হাত, পা পড়ছে। পুলিশেরা নিজেরাই প্রায় তখন উলটোদিকে দৌড় মারতে পারলে বাঁচে। মনে হল, যেন মুহূর্তের মধ্যে তাদের ফের কেউ খাড়া করে দিয়েছে ১৯৮৪ সালের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোতে। অথবা কোনো অদৃশ্য টাইমমেশিনে চড়ে তারা পৌঁছে গিয়েছে সেই কালান্তক বাহাত্তর ঘণ্টায়! এটা বুঝি কোনো আই.পি.এস.-এর বাংলো নয়, বরং হতভাগ্য শিখ শ্রমিকদের কলোনি!
দেবধর চৌবে যথারীতি বেঁচেবর্তে ছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের আর কেউ বেঁচে ছিল না। ইনফ্যাক্ট তিনি নিজেই পোড়া লাশগুলোকে ঠিকমতো শনাক্তই করতে পারছিলেন না। অতবড়ো জাঁদরেল পুলিশ কর্তা, যিনি জীবনে এমন বহু লাশ দেখেছেন, তিনিই স্বজনদের দেহ দেখে কখনও পাগলের মতো কাঁদছিলেন, কখনও শোকে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশ ও ফরেনসিক টিম এবারও যথারীতি ক্লু-লেস।
‘বার্নিং শিখ’ বা ‘ফ্যান্টম শিখ’-এর মোটিভ বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি ক্রাইম ব্রাঞ্চের। ঠিক সজ্জনকুমারের সাজা ঘোষণা হওয়ার পরদিন থেকেই সে মার্ডার করতে শুরু করেছে। নিজের প্রথম আবির্ভাবস্থল হিসাবেও বেছে নিয়েছিল সফদরজঙ্গ ও এইমসের চত্বরকে! কারণ ১৯৮৪ সালের ৩১ শে অক্টোবরও ঠিক এখান থেকেই ক্রুদ্ধ জনতা ‘সর্দার গদ্দার হ্যায়’ স্লোগান দিতে দিতে প্রতিহিংসার আগুন নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা শহরে। রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং-এর গাড়ির ওপরও এখান থেকেই প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে ‘কমল’ সিনেমার সামনে প্রথমবার আক্রমণ হয়। দ্বিতীয়বার সফদরজঙ্গ হসপিটালের সামনেই আক্রান্ত হন তিনি। তাই সফদরজঙ্গ ও এইমস-কেই সাক্ষী রেখে তার এই নাটকীয় আবির্ভাব! এখান থেকেই প্রতিহিংসার কাহিনি সে-ও শুরু করেছে। সময়ও সেই বাহাত্তর ঘণ্টা! মোটিভ সেই এক ও অদ্বিতীয় প্রতিশোধ—‘আঁখকে বদলে আঁখ!’ তার বেছে নেওয়া তিনজন ভিকটিমের নামও সেই কুখ্যাত ‘নানাবতি কমিশনের’ ফাইলে ছিল। চমনলাল শর্মা সেই সময়ে কংগ্রেস নেতাদের কাছের মানুষ ছিলেন। শিখ নিধন যজ্ঞে তাঁকে প্রকাশ্যেই খুনি ভিড়ের নেতৃত্ব দিতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পরে সাক্ষ্য ও সাক্ষীর অভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যান। চন্দ্রকুমার ভগৎ সজ্জনকুমারের অত্যন্ত অনুগত রাজনৈতিক গুণ্ডা! তার মাথায় সরকারের হাত ছিল বলে তাকেও কাঠগড়ায় তোলা যায়নি। কিন্তু সবাই জানত, সজ্জনকুমারের সঙ্গে ওই ভিড়ের মধ্যে তিনিও ছিলেন। ‘নানাবতি কমিশন’ এও জানায় যে আই.পি.এস. চৌবে এবং তাঁর পুলিশকর্মীরা শিখ নিধনে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিল সেই উন্মত্ত ভিড়কে! যদিও তাঁরও কোনো শাস্তি হয়নি। কেস চলাকালীনই তিনি ক্রমাগত প্রোমোশন পেতে পেতে শেষে আরামসে রিটায়ারও করে যান। তাঁর কেস যখন ডিসমিস হল তখন তিনি দিব্যি নাতিপুতি নিয়ে শান্তিতে ভরপুর সংসারের আনন্দে মেতে আছেন।
১৯৮৪ সালের হিসাব সে ২০১৮-তে মেটাবে। কিন্তু কেন? এতবছর ধরে ও কীসের প্রতীক্ষা করছিল? এরকম ভয়াবহ চেহারা নিয়ে লোকটা আত্মগোপন করে কীভাবে? এই মুখ লুকিয়ে রাখা মোটেই সহজ নয়। যতই লোকে তাকে প্রেতাত্মা বা ভূত বলুক না কেন, পুলিশ খুব ভালোভাবেই জানত যে এই তথাকথিত ‘বার্নিং শিখ’ রক্তমাংসেরই মানুষ ও একজন ‘খুংখার’ সিরিয়াল কিলার। হয়তো চুরাশির সেই ভয়ংকর দাঙ্গায় তার মুখ পুড়ে গিয়েছিল। এ পর্যন্ত মোটামুটি সবই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু একটা জিনিসই পুলিশের মাথায় ঢুকছিল না। তার যদি প্রতিশোধ নিতেই হয়, তবে সেই মানুষগুলোর ওপর আক্রমণ হওয়া উচিত যারা সরাসরি এই শিখ-হত্যার পেছনে জড়িত ছিল। সেক্ষেত্রে চমনলাল, চন্দ্রকুমার ভগত বা দেবধর চৌবেকে খুন করলেই তো মিটে যেত! তাদের নির্দোষ পরিবারকে এরকম বীভৎস মৃত্যু দেওয়ার মানে কী! বাড়ি সুদ্ধ সবাই মরল, এমনকি সিকিউরিটি গার্ডরাও বাদ গেল না, অক্ষত শুধু আসল লোকটাই! এই দ্বিচারিতার অর্থ কী! যদি এর পেছনে মানবিক গুণসম্পন্ন খুনির এইটুকু উদারতা থেকে থাকে যে সে অসহায় সিনিয়র সিটিজেনটিকে মারবে না, তবে ছোটো ছোটো শিশুদের ক্ষেত্রে সেই মানবিক গুণ গেল কোথায়? নিষ্পাপ শিশুদেরও তো ছাড়েনি সে। এ কেমন ‘দোগলাপন্’?
পুলিশ ওই বাহাত্তর ঘণ্টার চক্করে এতটাই ব্যতিব্যস্ত ছিল যে তখন তাদের কাছে খুনির মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ করার সময় ছিল না। খুনি তার কথা রেখেছে। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে সে তিনটে মাস মার্ডার করেছে। তার কথামতো আর একটাই মার্ডার বাকি ছিল। হাতে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা! দিল্লি পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ নানাবতি কমিশনের ফাইল নিয়ে বসে গেল। এদের মধ্যেই রয়েছে সম্ভাব্য ভিকটিম ও তার পরিবার। কিন্তু নামের লিস্ট দেখতে দেখতে তাদের প্রায় গলদঘর্ম অবস্থা! শ্রী রাধিকে চন্দ্রাবলী, কারে রেখে কারে ফেলি! যাদের অল্পবিস্তর সাজা হয়েছে তারা তো রয়েছেই, তার সঙ্গে এমন একগাদা নামও রয়েছে যাদের আইন ছুঁতেও পারেনি। এর মধ্যেই একজনের পরিবারের ওপরেই সর্বনেশে মৃত্যুর মেঘ ঘনাচ্ছে। কিন্তু ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে যে। অবস্থা এমন দাঁড়াল, যে প্রায় পুরো দিল্লিতেই আর্মি নামিয়ে দিলে ভালো হয়! সেই শেষ চব্বিশ ঘণ্টার কথা বোধহয় আজীবন ভুলবে না দিল্লি পুলিশ। তাদের হট লাইন, এমার্জেন্সি লাইন, হেড কোয়ার্টারের ফোন অক্লান্তভাবে বেজেই চলেছে। অন্তত সেদিন পাঁচশোরও বেশি ফোন এসেছিল তাদের কাছে। ওপ্রান্ত থেকে অনেকগুলো বিপন্ন কণ্ঠস্বর বলে চলেছিল- “প্লিজ, আমাদের পুলিশ প্রোটেকশন দিন। আমরা ওই শিখের হাতে মরতে চাই না।”
এ প্রান্ত থেকে পুলিশ অফিসাররা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “প্লিজ, শান্ত হোন। এমন কিছুই ঘটবে না।”
ও প্রান্তের মানুষটি খেপে গিয়ে বলেছেন, “ধুর মশাই! হবে না মানে? অন্তত দশটা শিখকে আমি একাই মেরেছিলাম। দশটার পর আর গুনিনি। তার দায় কি আপনি নেবেন? আপনারা আমাদের প্রোটেকশন দিতে না পারলে বলুন। আমরা নিজেরাই কাছের থানায় গিয়ে সারেন্ডার করে হাজতে ঢুকে বসে থাকছি।”
১৯৮৪ থেকে ২০১৮ অবধি আইন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা যা করে দেখাতে পারেনি, একটা উন্মাদ খুনি একাই তা করে দেখাল। ১৯৮৪ সালের হিংসাত্মক ভিড়ের মধ্যে যারা নিজেদের মুখ লুকিয়ে হত্যালীলায় মেতে উঠেছিল, তারাই এবার প্রকাশ্যে এসে সপরিবারে পুলিশ স্টেশনগুলোয় ভিড় জমাতে শুরু করল। অবস্থা এমন জায়গায় গেল যে থানায় আর জায়গাই নেই! চোর, ডাকাত, কেপমার ধরা পড়লেও তাদের ছেড়ে দিতে হচ্ছে! তার ওপর পুলিশের নিজেরই বা নিরাপত্তা কোথায়! আই.পি.এস. চৌবেকে যারা নিরাপত্তা দিচ্ছিল তাদের পরিণতি স্বচক্ষেই দেখেছে। অধিকাংশ পুলিশকর্মীই ওই রাতটা ভয়ে সিঁটিয়ে থেকে কাটিয়েছিল। নিজেদের ছায়া দেখে নিজেরাই ভয় পাচ্ছিল। সার্ভিস রিভলভারটা অনেক অফিসারই সর্বক্ষণ হাতে নিয়ে ঘুরছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, রাউণ্ড দেওয়ার সময়ে মনে হচ্ছিল, যুদ্ধে যাচ্ছেন! আশেপাশে কোনো ছায়া, কোনো মানুষ দেখলেও আঁৎকে উঠছিলেন। ভাবছিলেন, এই বুঝি এসে পড়ল একটা জ্বলন্ত টায়ার! অথবা কোনো উদ্যত তরোয়াল। রাতের গভীরে নিঃসঙ্গ গলি খুঁজিতে বুঝি জাগ্রত হল সেই তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ, ‘গুমনাম হ্যায় কোই…! ‘
কোনো ঝড়-জল-প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, পলিটিক্যাল দলের মারমারি নয়, ধর্মের লড়াই বা আতঙ্কবাদও নয়, শুধুমাত্র একটা মানুষের ভয়ে গোটা দিল্লি জুড়ে অঘোষিত কার্ফিউ নেমে এসেছিল। অন্তিম চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গিয়েছিল, কিন্তু ভয় কাটেনি। বার্নিং শিখ যে-কোনো অজ্ঞাত কারণেই হোক, শেষ মার্ডারটা করেনি। তার দেওয়া বাহাত্তর ঘণ্টার সময়সীমাও শেষ হল। অথচ ভয় শেষ হল না। পুরো নভেম্বর মাসটা সেই আতঙ্কের তাড়সে কেঁপেছে দিল্লি।
বৃদ্ধ চমনলাল শর্মা অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি। সফদরজঙ্গ হাসপাতালে থাকাকালীন দু-বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আর একবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিল তার। পক্ষাঘাতে একদিকটা নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। দু-মাস কোনোভাবে টিকে ছিলেন। শেষে তৃতীয়বার কার্ডিয়াক ফেইলিওর হওয়ার পর সফদরজঙ্গ হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি পুলিশের কাছে খুব কষ্ট করে বয়ান দিতে পেরেছিলেন। খুব বেশি তথ্য অবশ্য দিতে পারেননি। শুধু এইটুকু জানিয়েছিলেন ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঠিক একমাস আগেই তাদের বাড়িতে একটি নতুন মুখের আবির্ভাব হয়েছিল। তার কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কট্টর ক্রিশ্চান পরিবারের মেয়ে ছিল। প্রেমটা কী কারণে ভারতীয় হিন্দুর ছেলেকে করেছিল তা জানা নেই। ভারতীয় সংস্কৃতি বা পূজা পাঠের সঙ্গে হিন্দুধর্মকেও সে গ্রহণ করে নিয়েছিল। কিন্তু পাশাপাশি প্রতি রবিবার চার্চে যেতে কখনও ভুলত না। সে গর্ভবতী হওয়ার পর মন্দির থেকে এক পুরোহিত রোজ সকালে এসে আশীর্বাদ করে যেতেন। আর চার্চ থেকে তার অনুরোধেই এক ফাদারও রোজ এসে তাকে ব্লেসিংস দিয়ে যেতেন। ঠিক একমাস আগেই চেনা ফাদারটি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে চার্চ থেকেই অন্য একজন ফাদারকে পাঠানো হয়। একজন বিধর্মী এসে গোটা বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও পবিত্র জল ছিটিয়ে বেড়াচ্ছে, এ ব্যাপারটা চমনলালের পছন্দ না-হলেও ছেলের গুঁতোয় বাঁশটা হজম করে নিয়েছিলেন। সেই অভিশপ্ত দিনেও নতুন ফাদার এসেছিলেন। তবে সেদিন তার আসতে রাত হয়েছিল। তিনি এসে নম্ন্র কণ্ঠে দেরি করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন, এবং যথারীতি গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে পবিত্র করে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনভেস্টিগেটর জানতে চান, “তারপর আপনি সবাইকে জীবিত অবস্থায় দেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ।” তিনি জবাব দেন, “ফাদার চলে যাওয়ার পর আমরা সপরিবারে ডিনার করলাম। তারপর আমার একটা জরুরি মিটিংও ছিল। মিটিং বেশ রাত অবধি চলেছিল। তখনও আমার ফ্যামিলি জেগে ছিল। বাচ্চারা পড়াশোনা করছিল। ছেলেরা গল্পে ব্যস্ত ছিল। আমরা সবাই একসঙ্গে বসে চা খেতে-খেতে আরও কিছুক্ষণ গল্প করে দরজা টরজা লক করে যে যার ঘরে ঘুমোতে চলে গেলাম। তারপর আর কিছু জানি না।”
পুলিশ এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে সন্দেহের কিছু খুঁজে পায়নি। তবু জানতে চেয়েছিল, “দুই ফাদারের নাম বলতে পারেন?”
“একজনের নাম ফাদার রিচার্ড লরেন্স আর পরের জনের নাম সম্ভবত ফাদার স্টেফানো মাইনো।”
“পরের দিন সকালে কি ফাদার মাইনো এসেছিলেন?”
বৃদ্ধ একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “কই! না তো!”
“বাড়িতে এত বড়ো দুর্ঘটনা ঘটে গেল, আপনি কিছু টের পাননি?” অফিসার জিজ্ঞাসা করেন, “কোনোরকম চেঁচামেচি, চিৎকার শুনতে পাননি?”
“না।” তার ঘোলাটে দৃষ্টিতে সংশয়, “কিচ্ছু শুনিনি! কোনো আওয়াজই পাইনি। ….কেন পাইনি।… কেন পাইনি….।”
পুলিশ আর কথা না বাড়িয়ে সে দিন বাড়িতে যারা যারা উপস্থিত হয়েছিলেন সবারই বয়ান নিতে গেল। সবাইকেই পাওয়া গেল শুধু ফাদার স্টেফানো মাইনো ছাড়া। ফাদার লরেন্স জানালেন এমন কোনো ফাদারকে তিনি চেনেন না। চার্চও এমন কোনো ফাদারকে পাঠায়নি। ওরা যদি চার্চকে অনুরোধ করতেন, তবে নিশ্চয়ই কাউকে পাঠানো হত। কিন্তু ওপক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ না-আসায় চার্চও গা করেনি।
অন্যদিকে চন্দ্রকুমার ভগৎকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে পাঠাতে হয়েছিল। ঘটনার পর থেকেই তার মধ্যে মানসিক সমস্যার প্রবল লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হল মানসিক হাসপাতালে। তিনি কোনো বয়ান দেননি। তবে তার প্রতিবেশীরা জানিয়েছিল যে দিন দশেক আগে থেকে এক পাঞ্জাবি ড্রাইভার তার বাড়ির গাড়ি চালাচ্ছিল। পুরোনো ড্রাইভার ছুটিতে যাওয়ায় সাময়িক ড্রাইভারের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন ওরা। তাতেই সাড়া দিয়ে বহাল হয়েছিল পাঞ্জাবি ড্রাইভারটি। জাতে সে শিখ। নাম কেহর সিং!
বলাই বাহুল্য স্টেফানো মাইনোর মতো কেহর সিংকেও পুলিশ খুঁজে পায়নি।
আই.পি.এস. চৌবের বয়ানও কিছুটা এরকমই। তবে সরাসরি ড্রাইভার বা ফাদার নয়, তার রাঁধুনীর এক নতুন বন্ধু হয়েছিল। দেশোয়ালি ভাই বলা যেতে পারে। রাঁধুনী বিরজু মাঝেমধ্যেই সৎসঙ্গ বা রামলীলা দেখতে যেত। সেখানেই এই নতুন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ। নাথুরাম নামের সেই ছেলেটি মাঝেমধ্যেই বিরজুর সঙ্গে দেখা করতে আসত। তার উপস্থিতি নিয়ে কখনও কেউ তেমন মাথাব্যথা করেনি। বিরজু ওর সম্বন্ধে হয়তো কিছু বলতে পারত। কিন্তু তাকেও খুন করে কেটে রেখে দিয়েছিল ‘বার্নিং শিখ।’ তাই নাথুরামও রইল ধরাছোঁয়ার বাইরে। আই.পি.এস. চৌবে এরপর ছ-মাস বেঁচেছিলেন। ছ-মাস পর তাঁর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গিয়েছিল। সঙ্গে সুইসাইড নোট।
দিল্লির ঘটনার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ‘বার্নিং শিখ’ আবার দেখা দিল। এবার কানপুরের রাস্তায়! আবার ধরধর করে লাফিয়ে উঠল মিডিয়া। আবার শোনা গেল সেই ভয়াবহ শিস। এবার পুলিশকে লেখা প্রেমপত্রে সে জানিয়েছিল, বাহাত্তর ঘণ্টায় তিনটে মাস মার্ডার করবে। দিল্লিতে কথা না রাখলেও কানপুরকে সে হতাশ করেনি। তিনটে মাস মার্ডারই করেছিল। অবিকল একই পদ্ধতিতে! জ্বলন্ত টায়ারের নেকলেস পরিয়ে তিনটে পরিবারের মোট সতেরোজনকে খুন করে কানপুরেও সে ক্ষান্ত দিল। পরিবারের কর্তা বৃদ্ধ মানুষগুলো যথারীতি অক্ষত। পুলিশ এবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল খুনগুলোকে আটকানোর। দুটি ফ্যামিলিকে পুলিশ প্রোটেকশনও দিয়েছিল। কিন্তু যে উর্দিধারীরা ওই ফ্যামিলিকে নিরাপত্তা যোগাচ্ছিল তাদেরও কেটে গেটের সামনে সাজিয়ে দিল বার্নিং শিখ! যেন পুলিশের রক্তে রেডকার্পেট বিছিয়ে দিল! একজন ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের ওপর অ্যাসিড অ্যাটাক হল। আর একজন রহস্যময়ভাবে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন!
কানপুর যখন বার্নিং শিখের জ্বালায় জ্বলছে ঠিক তখনই চীনে ‘কোভিড নাইন্টিনের তাণ্ডব শুরু হল। এরপর কোভিডের লক-ডাউন, মৃত্যুমিছিল, অনাহার, বেকারত্ব, ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা, এই সব উপসর্গেই গোটা বিশ্ব টালমাটাল হল। তখন করোনার ধাক্কায় বার্নিং শিখকে সকলেই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২১-এর শেষের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ঠিক হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ফের হেডলাইনে চলে এল বেঙ্গালুরু! বেঙ্গালুরুতে ফের দেখা গেল লাল পাগড়ি বাঁধা সেই ভয়াবহ মুখ! পুলিশ চিঠিও পেল যে বাহাত্তর ঘণ্টায় সে দুটো খুন করবে। দিল্লি, কানপুরের ঘটনা সম্পর্কে বেঙ্গালুরু পুলিশ রীতিমতো রিসার্চ চালিয়েছিল। দিল্লি, কানপুর এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু বেঙ্গালুরুর পুলিশ অফিসাররাও প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামলেন। কারা খুন হবেন জানা ছিল না, তাই নানাবতি কমিশনের লিস্টে যে ক-জনের নাম পেল, সবাইকেই অন্য বাড়িতে, তথা ‘সেফ হাউসে’ চালান করে দেওয়া হল। তাদের সঙ্গে জাঁদরেল অফিসাররাও প্রহরায় থাকলেন। ফলস্বরূপ দুটি পরিবারের বারোজনের সঙ্গে দু-জন অফিসারও শহীদ হলেন। তাদেরও টায়ার বাঁধা জ্বলন্ত লাশই মিলল! ‘সেফ হাউস’-এর ঠিকানা যে সে কীভাবে পেল তা ঈশ্বরই জানেন! এবার জনতার সঙ্গে পুলিশের মনেও ঢুকে গেল বার্নিং শিখের আতঙ্ক। অনেকে তাকে ‘ফ্যান্টম শিখ’-ও নাম দিল। চ্যানেলে চ্যানেলে তার এই কীর্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হল। মনস্তত্ত্ববিদরা অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করলেন। তাদের মতে লোকটি কোনোরকম মানসিক বিকৃতির শিকার। সে নটোরিটি চাইছে। প্রচারও চাইছে। অনেক জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে এই ‘বার্নিং শিখ’ এর পরবর্তী টার্গেট হয়তো মুম্বাই, রাজস্থান বা বোকারো হতে চলেছে। রাজনীতিবিদরা আবার আর এক দিকে আলোকপাত করলেন। তাঁরা বললেন-এই ‘বার্নিং শিখ’ আসলে খালিস্তানি মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। এটা কোনো একা মানুষের কীর্তি নয়। এর পেছনে আস্ত একটা গ্যাং আছে। কয়েকদিন পর তারা স্বাধীন খালিস্তানের দাবি করবে।
সকলেই নিজের মতামত এবং থিওরি রাখছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে অন্য প্রশ্ন। এরপর কোথায়? এরপর কাদের পালা? কোন শহরের বুকে পড়বে এই সিরিয়াল কিলারের পদচিহ্ন! কাদের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসছে এবার? এবার পুলিশের ভূমিকা কী হবে? সৌভাগ্যবশত দিল্লি পুলিশকে তেমন কোনো ট্র্যাজেডির সামনাসামনি হতে হয়নি। কিন্তু কানপুর আর বেঙ্গালুরুর রেকর্ড চূড়ান্ত খারাপ! পুলিশ কি এবার আদৌ থামাতে পারবে তাকে? না নিজেরাই তার ক্রোধ আর জিঘাংসার শিকার হয়ে যাবে! এই বার্নিং শিখ আসলে কে? বা ঠিক কী? কেন ক্রাইম স্পটে সে কোনো ক্লু ছাড়ে না! না ফিঙ্গারপ্রিন্ট, না ভাঙা দরজা, না অন্য কোনো খুচরো, সূক্ষ্ম প্রমাণ! এ তো পারফেক্ট মার্ডার!
বেশ কিছুদিন ফের চুপচাপ কাটল। কোথাও তার কোনো খবর নেই। ইতোমধ্যে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে বিশ্ব। মানুষের মুখ থেকে মাস্ক সরে গিয়ে হাসি ঝলমলিয়ে উঠছে। মানুষেরা কোভিডের বিভীষিকার স্মৃতি ভুলতে না পারলেও দুঃখগুলো একটু একটু করে সইয়ে নিয়েছে। এই কয়েক বছরে অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। শিশুদের জীবন থেকে অজান্তেই আস্ত দুটো বছর কী করে খসে গিয়েছে তা তারা টেরও পায়নি। এই বছরগুলোয় যাদের আরও প্রতিশ্রুতিবান হয়ে ওঠার কথা ছিল, তারা স্রেফ হতাশায় কাটিয়েছে সময়টা। অনেকেই স্বচক্ষে দেখেছে স্বজনদের অসহায় মৃত্যু। সেসব আঘাত কাটিয়ে এখন ফের জীবনের মূল স্রোতে ফেরার চেষ্টা করছে প্রত্যেকেই।
ঠিক তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সবার অনুচ্চারিত প্রশ্নটার জবাব দিল ‘ফ্যান্টম শিখ’ নামক ব্যক্তিটি। নাঃ, জয়পুর বা মুম্বাই নয়। বোকারো বা বিহারের অন্য কোনো অঞ্চলেও নয়। এবার তার লক্ষ্য কলকাতা, কল্লোলিনী তিলোত্তমা! দিল্লি, কানপুর, বেঙ্গালুরুর পর এবার কলকাতার কেঁপে ওঠার পালা!
“দুশমন হ্যায় হজারোঁ ইয়াহা
জানকে যরা মিলনা নজর পহচানকে
কঈ রূপ মে হ্যায় কাতিল…!”
