(১৮)
আস্তে আস্তে ফের নেমে এল অন্ধকার।
আজকাল সূর্যাস্ত হলেই কেমন যেন ভয় করে। কলকাতার চিরপরিচিত ব্যস্ত রাস্তাকেও অচেনা লাগতে থাকে। ল্যাম্পপোস্টের আলো এবং অন্ধকারের জাল মিলে মিশে কত যে আবছায়ার জন্ম দেয় তার ঠিক নেই। মনে হয়, ইহজগতের মানুষ শুধু নয়, এই আলো-আঁধারির রহস্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক ছায়াশরীরও। ছড়িয়ে রয়েছে কত রক্তাক্ত ইতিহাসের আবছায়া মূর্তি! এই রাস্তা, এই শহর কত কিছুই না হতে দেখেছে। সেই ইতিহাসরা বুঝি আজও ঘুরে বেড়ায়। হালকা হালকা কুয়াশার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো অনভিপ্রেত চোখ। যে কোনো মুহূর্তে কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়াবে কোনো ভয়াল মূৰ্তি। অথবা এই বুঝি শোনা গেল সেই মৃত্যুর সুর! সেই হাড় হিম করে দেওয়া শিস, গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই….!
অর্ণবের মনের ভেতরের আতঙ্ক মাঝেমধ্যেই তাকে একটা শিরশিরে অনুভূতি দিয়ে যাচ্ছে। কখনো-কখনো মনে হচ্ছে, এই বুঝি মাথায় পাগড়ি পরা কোনো একটা মানুষ সাঁৎ করে সরে গেল অন্ধকারের মধ্যে! সবসময়ই আশেপাশে অপরিচিত কোনো অস্তিত্ব টের পাচ্ছে সে। একঝলক ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে গেলেও চমকে উঠছে। এ কি সত্যিই হাওয়া? না ঘাড়ের কাছে কেউ শীতল নিঃশ্বাস ফেলছে! সন্দেহ নামের বিরাট একটা অজগর ক্রমশ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে তাকে। গুলশন সিং, গুলাব সিং আর গুল্লু, এই তিনটে নামই বারবার তার মস্তিষ্কে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছে। বিশ্বাস নেই… কাউকে বিশ্বাস নেই। এমনকি এই টুইঙ্কল অরোরাটিকেও সে বিশ্বাস করে না। কার মনে কী আছে তা অন্তর্যামী ছাড়া কেউ জানে না। তাই কাউকেই বিশ্বাস করা যাচ্ছে না…!
আপাতত অধিরাজের প্ল্যান মতোই এখন ওরা প্রব্যাবল ভিকটিমদের বাড়ি আর ফ্ল্যাট ভালো করে তল্লাশি করে দেখছে। প্রথমেই আর্বানায় ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটে সে, অর্ণব আর মিস্ অরোরা গিয়ে হাজির। মিস্ আত্রেয়ী দত্ত-ও অকুস্থলে উপস্থিত, তবে চমৎকার অভিনয় প্রতিভায় ভাবটা এমন করল যেন ওদের চেনেই না! অধিরাজের মাথায় এখন একটাই চিন্তা। গ্যাসটা বেডরুমগুলোয় আসছে কোন্ পথে। কোথাও কোনো লুপ হোল, বা হিডন চেম্বার আছে কিনা। তাই সে নম্রভাবে মিঃ দত্তার কাছে অনুরোধ জানায় বেডরুমগুলো একটু সার্চ করে দেখার জন্য। কিন্তু ভূপেন্দ্ৰ দত্তা চটে গিয়ে প্রায় লাফাতে শুরু করলেন, “আপনাদের সাহস তো কম নয়! বেডরুমটা মানুষের প্রাইভেট জিনিস। তার ওপর এ বাড়িতে আমার মেয়ে-জামাইও থাকে। আপনি আমাদের সকলের প্রাইভেসি এভাবে নষ্ট করতে পারেন না!”
“স্যরি স্যার।” অধিরাজ বিনীতভাবেই বলে, “আমি জানি যে কোনো মানুষের প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। কিন্তু এখন এটা আর আপনাদের প্রাইভেট ব্যাপার নেই। এটা এখন আমাদের এবং আপনাদের, উভয়েরই প্রাণের দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়তো আপনার বেডরুমে আপনি কোন সুন্দরীর ছবি রাখেন, রিভলবার রাখেন কিনা বা ইনারওয়্যারের ব্র্যান্ড কী, আপনার স্ত্রী লুকিয়ে লুকিয়ে পান-সুপারি-জর্দা খান কিনা, আপনার মেয়ে-জামাই কোন্ ব্র্যান্ডের সিগারেট খান অথবা কোকেন নেন কিনা, বিছানায় ক-টা টেডি বিয়ার শুয়ে থাকে, সেসব দেখার আমাদের কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আমরা স্রেফ ডিউটি করছি।”
ভূপেন্দ্র এবার বেশ মেজাজের সঙ্গে বললেন, “শুনুন, আপনাদের ডিউটি হল ঐ পাগল কুত্তাটাকে ধরা আর শ্যুট্ করে দেওয়া। তাকে মারলেই গল্প শেষ। সেটা তো আপনাদের দ্বারা হচ্ছে না, উলটে আমাদেরই হ্যারাস করছেন। আমাকে ডিউটি দেখাতে আসবেন না! যখন আপনি জন্মাননি তখন থেকেই আমরা আমাদের ডিউটি করে আসছি। রীতিমতো মাথার রক্ত ঘাম পায়ে ফেলেছি, আপনাদের মতো স্রেফ গায়ে হাওয়া লাগাইনি।”
অধিরাজ মসৃণ হাসল। তারপর একেবারে ভদ্রলোকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, তাঁর কাঁধে হাত রেখে নীচুস্বরে বিড়বিড় করে বলল, “আপনার সেই রক্ত ঘাম পায়ে ফেলা ডিউটির গল্প কপুর-মিত্তল কমিটির রিপোর্টে সবিস্তারে পড়েছি স্যার। কথায় আছে, সিনিয়রদের দেখানো পথেই জুনিয়রদের চলা উচিত। আপনি যদি বলেন, আপনার মতো ডিউটি তো আমিও করতে পারি। এ আর এমন কী কঠিন কাজ? লাইটার তো আমার কাছেও আছে। এখন শুধু বার্নিং শিখের আসার অপেক্ষা।”
তার কথা শুনে ভূপেন্দ্রর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এক লহমায় হুমদারি ভাব উধাও তিনি বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকিয়ে আছেন। যা শুনলেন, তাতে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। অধিরাজ এবার একটু সরে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “মে আই?”
“আপনাদের যা খুশি করুন।”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই তিনি চলে যাচ্ছিলেন। ফের তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছে অধিরাজ। যথারীতি নীচু স্বরেই বলল, “আরও একটা কথা। আপনার বাড়িতে যে ইনকম্পিটেন্ট, অপদার্থ রাঁধুনীটি আছেন, তিনি এখানে নিজের ডিউটিটাই মন দিয়ে করছেন বলে এখনও আপনার পরিবার বেঁচে-বর্তে আছে। তাঁর সতর্ক দৃষ্টির আওতায় আপনার মেয়ে জামাই নাতি নাতনি আছেন বলেই এখনও পর্যন্ত ওঁরা সুরক্ষিত। এখানে উনি আপনাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যই এসেছেন, পঞ্চাশবার আপনার কফি বানানোর অর্ডার আর গালাগালি খেতে আসেননি। সুতরাং এর পর থেকে ওঁর সঙ্গে সসম্মানে কথা বলবেন।”
রক্তাভ ক্রদ্ধ চোখে অধিরাজের দিকে তাকালেন তিনি, “এটা কি অর্ডার? না ওয়ার্নিং?”
“আজকাল একটার সঙ্গে আর একটা ফ্রি চলছে।” তার মুখে চাপা হাসিটা খেলা করছে, “একসঙ্গে দুটোরই কম্বো অফার ভেবে নিন। ফের যদি আমাদের অফিসারের সঙ্গে মিসবিহেভ করেন, উনি পাততাড়ি গুটিয়ে স্রেফ এখান থেকে চলে যাবেন। তারপর আপনার মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনির লাশ বওয়ার দায়িত্ব একা আপনার।
“প্লিজ অফিসার!” আর থাকতে না পেরে এবার ভদ্রলোক অধিরাজের হাত চেপে ধরেন, “এভাবে আমায় মারবেন না। আমি জানি কী করেছি! যে মুহূর্ত থেকে সোনালি জানতে পেরেছে, সেই মুহূর্ত থেকে আমার সঙ্গে একটাও কথা বলছে না। এতক্ষণে একবারও ও আমায় ‘বাবা” বলে ডাকেনি। ও, আয়ান, তানিশা, আমার প্রাণ! আমি ক্ষমা চাইছি। যদি আপনি চান, আমার পায়ে ধরেও ক্ষমা চাইতে আপত্তি নেই। প্লিজ, ওদের যেন কিছু না হয়। ওরা ইনোসেন্ট। প্লিজ…।”
অধিরাজ দেখল ভূপেন্দ্র দত্তার চোখে এবার জল জমেছে। সে সামান্য নড করল, “উইল ট্রাই মাই বেস্ট।”
তিনি এবার ক্লান্ত, পরাজিত সৈনিকের মতো ওখান থেকে চলে গেলেন। কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে তাঁর গর্ব, ঔদ্ধত্য, বদমেজাজ! পাহাড়প্রমাণ ইগো আর অহমিকা। একটা বিধ্বস্ত, ভয়ার্ত মানুষ আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হতে হতে চলে যাচ্ছে। তার কলঙ্কময় ইতিহাস জানার পর হয়তো ভালোবাসার মানুষগুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে। সেটাই স্বাভাবিক। কেউ কারোর পাপের দায়ভার নেয় না। স্বয়ং দস্যু রত্নাকরের পরিবারও সে ভার নিতে প্রত্যাখ্যান করেছিল, ভূপেন্দ্র তো সামান্য মানুষ!
অধিরাজ, অর্ণব ও মিস্ অরোরা ভালো করে বেডরুমগুলোকে পরীক্ষা করল। এখানে একটি বেডরুম স্বয়ং ভূপেন্দ্র-র। আর একটিতে শালিনী তানিশা ও আয়ানকে নিয়েই থাকেন। আর একটি বিরূপাক্ষ ও সোনালির জন্য মজুত। জুজুৎসুর জন্যও একটি ছোট্ট ঘরকে বেডরুম বানানো হয়েছে। সবমিলিয়ে তিনটে মাস্টার বেডরুম থাকলেও জুজুৎসুর জন্য একটি বেডরুম এক্সট্রা। মিস্ দত্তকে শালিনী তাঁর ঘরেই একটি ছোট্ট খাটের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন আপাতত। তবে সে ওখানে শোয় না। তাই তাকে নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।
“ভূপেন্দ্র-র বেডরুমটা ছেড়ে দাও অর্ণব।” অধিরাজ আস্তে আস্তে বলল, “আমার বিশ্বাস বার্নিং শিখ ওঁকে টার্গেট করবে না। বিপদটা ওনার মাথায় নয়, বাকিদের মাথার ওপরেই নাচছে। তাই জুজুৎসুকে নিয়ে তিনটে বেডরুমই চেক করে দেখি। গ্যাসটা ঐ তিনটে রুমেই আসবে। আসুন, মিস্ অরোরা।”
এই ফ্ল্যাটের বেডরুমগুলো দেখার মতো! যেমন সাইজে বিরাট, তেমনই প্রচুর যত্নের সঙ্গে সাজানো হয়েছে। দেখলে মনে হয়, ভূপেন্দ্র বুঝি ইন্টেরিয়র ডেকোরেটরকে দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছেন শয়নকক্ষগুলো। তবে আদতে তা নয়। এসবই শালিনী ও সোনালির কীর্তি। দু-জনেই বহুযত্নে, অর্থব্যয় ও রুচির সংমিশ্রণে সাজিয়ে নিয়েছেন তাদের বাড়ি। কার্পেট, আয়না, ড্রেসিং টেবিল থেকে শুরু করে জমকালো পর্দা, নানারকম শো পিস ও লাইটিং এর বর্ণাঢ্য ব্যবস্থায় প্রায় রাজকীয় শয়নকক্ষ বলা যেতে পারে।
অধিরাজ একটা গভীর শ্বাস টেনে বিড়বিড় করে বলল, “মিঃ ফসজিন অ্যান্ড মিঃ মাস্টার, হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়্যার ইউ আর! কোথা থেকে আপনারা এন্ট্রি নেবেন প্রভু? লেটস সি!”
তিনজনেই রীতিমতো তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করল গোটা বেডরুম। দুই পুরুষ অফিসার দেওয়ালের প্রত্যেকটা ইঁট প্রায় ঠুকে ঠুকে বাজিয়ে দেখছে কোথাও ফাঁপা অংশ আছে কিনা। টুইঙ্কলও তৎপর ভঙ্গিতে বিছানা, বালিশপত্র উলটে পালটে, গদির তলায়, এমনকি কিং সাইজের বক্স খাটের বক্স খুলে দেখছে কোথাও কোনো সন্দেহজনক জিনিস আছে কিনা! ভারি ভারি পর্দাগুলো সরিয়েও দেখছে পেছনে কী আছে। সে শুধু সেখানেই থেমে নেই। ড্রেসিং টেবিলে সাজানো ক্রিম, লিপস্টিক এমনকি পারফিউমও ভালো করে চেক করছে। পারফিউম স্প্রে করতেই মিষ্টি গন্ধ পেয়ে অর্ণব পেছন ফিরে তাকায়, “মিস্ অরোরা। আপনি ঘর সার্চ করতে এসে পারফিউম লাগাচ্ছেন? লিপস্টিক আর ক্রিম ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকারটা কী? মার্ডার ওয়েপন দুটো গ্যাস, এর একটা জিনিসেও ওগুলো থাকতে পারে না।”
টুইঙ্কলের জবাবও হাজির, “স্যার, পারফিউমের বোতলের ওপর কিছুটা ফাঁকা অংশও তো আছে। গ্যাসটা ওর মধ্যেও থাকতে পারে। তাই স্প্রে করে দেখছি।”
“অ্যাকচুয়ালি শি হ্যাজ আ পয়েন্ট অর্ণব! ক্যারি অন মিস্ অরোরা।” বলতে বলতেই সে এগিয়ে গিয়েছে ঘরের এককোণে রাখা মসকুইটো লিকুইডের যন্ত্রটার দিকে, “আজকাল এই নতুন স্টাইল উঠেছে। কেউ এখন মশারি টাঙিয়ে ঘুমোয় না। বরং মসকুইটো লিকুইড চালিয়ে রাখে। এটা কোন্ ব্র্যান্ড?”
অর্ণব ভেবে পেল না এত কিছু থাকতে অধিরাজ মসকুইটো লিকুইডের ব্র্যান্ড দেখতে ব্যস্ত হয়ে কেন পড়েছে। সে মৃদু স্বরে বলল, “মর্টিন।”
“বটে?” অধিরাজ বোতলটাকে যন্ত্র থেকে বের করে এনে তার মুখের কালো স্টিকটা শুঁকল। পরক্ষণেই মুখ বিকৃত করে বলল, “নো ডাউট এটা মর্টিনই। এই মিষ্টি অথচ ইরিটেটিং গন্ধটা আমার একেবারেই সহ্য হয় না। তাছাড়া এটা বোধহয় একটু আগেও চলছিল। এখনও বেশ গরম। দেখো তো।”
অর্ণবও একটু শুঁকে দেখল। এই গন্ধ তার অত্যন্ত পরিচিত। ওর নিজের বাড়িতেই এই মসকুইটো লিকুইডগুলো ইউজড হয়। শিশিটা এখনও বেশ গরম। এবং যে কালো লম্বা অংশটা বেয়ে মশা মারার তেলটা বাইরে আসে সেটাও বেশ তেতে আছে। অর্থাৎ কিছুক্ষণ আগেই এটা ব্যবহার করা হয়েছে। সে মাথা নাড়ল, “মর্টিনই স্যার। নো ফাউল প্লে অ্যাট অল!”
“বেশ। মিঃ লিকুইডেটরকে বেকসুর খালাস করা হল। যথাস্থানেই রেখে দাও।” সে আপন মনেই বলল, “পারফিউম, লিপস্টিক, মশার লিকুইড—এগুলো সবই খুব কমন জিনিস। হয়তো এদের পেছনে ধাওয়া করাটাই বোকামি। তবু কবিগুরু বলে গিয়েছেন, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পার মিঃ ফসজিন। তিনি যে কোথায় ঘাপ্টি মেরে থাকবেন কে জানে!”
অর্ণবের চোখ হঠাৎই ঘরের একদিকে পড়ল। সে একটু উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, “স্যার, ঐ দেখুন এয়ার পিউরিফায়ার
অধিরাজ অর্ণবের ইঙ্গিত লক্ষ্য করে দেখল সত্যিই একটা বড়োসড় এয়ার পিউরিফায়ার ঐ ঘরের এককোণে উপস্থিত। তার চোখ সন্দেহে কুঁচকে গেল। কেউ যদি ঘরে কোনোরকম গ্যাস ঢোকাতে চায় তবে এসি আর এয়ার পিউরিফায়ারের থেকে বেটার অপশন আর নেই। এয়ার পিউরিফায়ারের কাজই হল ঘরের বাতাসকে পরিষ্কার, দূষণমুক্ত রাখা। কিন্তু এর ভেতরে কিছুটা কারিকুরি করলে উলটোটাও করা যেতে পারে। যে এয়ার পিউরিফায়ার বাতাসের দূষণ, ধুলো-ময়লা টেনে নেয়, সে-ই আবার বিষাক্ত গ্যাসও ছড়িয়ে দিতে পারে। সে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল এয়ার পিউরিফায়ারটার দিকে। বাইরে থেকে দেখে তো স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। তবে ভেতরে কী আছে তা বাইরে থেকে দেখে বোঝা সম্ভব নয়।
“হুঁ।” সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “এটাকে ওঠাও। এ মালটাকে আমার সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে এক কাজ করো তো। কায়দা করে জুজুৎসুকে এ ঘরে ডেকে নিয়ে এসো।”
সে মাথা ঝাঁকিয়ে নীরবে হুকুম তামিল করতে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে মিস্ অরোরা শয়নকক্ষের কাবার্ডগুলো চেক করছে। ঠুকে ঠুকে দেখছে যে কাঠের প্যানেলগুলো সলিড কিনা। কিংবা কাবার্ডের ভেতরে কোনোরকম সন্দেহজনক কিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে একটা ছোটোখাটো সাইজের মেশিন জাতীয় কিছু নিয়ে এসে হাজির হল, “স্যার, এটা দেখুন। অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার। এটা কয়েক মিনিট অন্তর অন্তর রুমে পারফিউম বা ঐ জাতীয় সুগন্ধি স্প্রে করে। ইনফ্যাক্ট এখনও স্প্রে করছে।”
অধিরাজ ভালোভাবে দেখছে যন্ত্রটাকে। এ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য একটা মিষ্টি গন্ধের উপস্থিতি টের পেয়েছিল সে। সম্ভবত সেটা এই এয়ার ফ্রেশনারেরই সুগন্ধ। তার দু-চোখে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি। এয়ার ফ্রেশনারের মাধ্যমেও ঘরে গ্যাস ছড়ানো যেতে পারে। তার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ভেসে উঠল কয়েকটা ছবি। আজ পর্যন্ত যে ক-টা ক্রাইমসিনের ছবি দেখেছে সেখানে সর্বত্রই একটা করে এয়ার ফ্রেশনার আর এয়ার পিউরিফায়ার ছিল। এমনকি ত্রিপাঠী সাহেবের বাড়িতেও এই দুটো জিনিসের উপস্থিতি নোটিস করেছিল সে। ভদ্রলোকের বাড়িতে প্রত্যেকটা বেডরুমেই একটা করে এয়ার পিউরিফায়ার ও এয়ার ফ্রেশনার ছিল।
অধিরাজ টুইঙ্কলের দিকে তাকায়, “গুড জব মিস অরোরা। এটাও প্রবাবল ওয়েপন হতে পারে। অন্য দুটো ঘরও চেক করে দেখুন তো সেখানে এয়ার পিউরিফায়ার বা অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার উপস্থিত আছে কিনা!”
“ইয়েস স্যার।”
টুইঙ্কল মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে অর্ণব জুজুৎসুকে নিয়ে এসেছে। অধিরাজ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “জুজুৎসু, এই এসিটার মেইনটেনেন্স কে করে? সবসময়ই কি কোম্পানির লোক আসে? না তোমরা নিজেরাও ছোটোখাট কাজ করে নাও?”
“না সাব।” জুজুৎসু খুদে খুদে চোখ পিটপিট করে বলে, “সবসময়ই কোম্পানির লোককে ডাকা হয় না। ওরা শুধু বছরে দু-বার আসে। গরমের শুরুতে একবার এসে সার্ভিসিং করে যায়। এসি’র পুরোটাই খুলে ভেতরটা অবধি পরিষ্কার করে। গ্যাস কমে গেলে ভরে দেয়। তার ফুটো ফাটা আছে কিনা তাও চেক করে নেয়। তারপর চলে যায়। আবার ‘জাড়’-এর ‘মৌসম’ এলে ফের আর একবার আসে। পুরো সিস্টেমটাই সার্ভিসিং করে চলে যায়। তবে এর মধ্যে এসির জালটা যখন নোংরা হয়ে যায়, তখন আমিই খুলে জল দিয়ে পরিষ্কার করে দিই। দেখে দেখে অনেকটাই শিখে নিয়েছি। ছোটোখাটো কাজ হলে আমিই সামাল দিতে পারি সাব। তবে যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে গেলে তখন আবার কোম্পানির লোককেই ডাকতে হয়।”
“এবছর শেষ কবে সার্ভিসিং হয়েছে?” .
“এই তো। ঠান্ডা পড়ার আগেই। তারপর মাত্র কিছুদিনই এসি চলেছে। যেই ‘সর্দি’ পড়ল, তারপর থেকে এসিও অফ।”
“তুমি এসি খুলতে পারো। তাই না?”
“হাঁ সাব।”
“একটু খুলে দেখো তো। আমরাও দেখি ভেতরে সব ঠিকঠাক আছে কিনা।”
“জি সাব।” জুজুৎসু সোৎসাহে বলল, “আমি আমার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসি?”
“নিয়ে এসো।”
সে বেরিয়ে যেতে না যেতেই টুইঙ্কল একগাদা এয়ার পিউরিফায়ার ও এয়ার ফ্রেশনার নিয়ে এসে হাজির। সে একটু উত্তেজিত, “এ বাড়ির প্রত্যেকটা বেডরুমে এই দুটি পদার্থ আছে স্যার। এয়ার ফ্রেশনার তো একাধিক আছে। এমনকি অ্যাটাচড্ টয়লেটেও উপস্থিত। আমি সবগুলোই তুলে নিয়ে এসেছি।”
“এয়ার পিউরিফায়ারগুলো নিয়ে নাও অর্ণব। ওগুলোকে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে দেখতে হবে।” তার চোখ এবার টুইঙ্কলের দিকে ফিরেছে, “এয়ার ফ্রেশনারগুলো কি এখনও স্প্রে করছে?”
“হ্যাঁ স্যার।” টুইঙ্কল বলল, “সবগুলো থ্রি হান্ড্রেড এম এল এর বোতল। শালিনীজি আর সোনালিজি বললেন, এগুলো গত সপ্তাহ ধরেই আছে। ওঁদের ঘরে সবসময়ই এগুলো মজুত থাকে। তবে আমার মনে হয় না এর মধ্যেও কোনো ফাউল প্লে আছে। সবক-টাকেই ভালো করে শুঁকে দেখেছি। রোজ আর জ্যাসমিনের সুন্দর গন্ধ৷ কোনো গ্যাসজাতীয় কিছু নেই। থাকলে ওরা এতদিন টিকতেন না কারণ এগুলো একসপ্তাহ ধরেই স্প্রে করছে।”
“তাহলে মিস্ এয়ার ফ্রেশনারকেও ক্লিন চিট দেওয়া হল। তবে মিঃ পিউরিফায়ারকে ছাড়া ঠিক হবে না। ওঁদের গ্রেফতার করো অর্ণব।”
“ওকে।”
অর্ণব নির্বিবাদে এয়ার পিউরিফায়ারগুলোকে বাজেয়াপ্ত করল। ততক্ষণে জুজুৎসুও যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে হাজির। অধিরাজের নির্দেশে সে এয়ার কন্ডিশনার মেশিনটাকে খুলল। ওটাকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল ওরা। এমনকি রিমোট দিয়ে চালিয়ে ও দেখা হল। কিন্তু কোথাও কোনো সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না। এসি দিব্যি শীতল ও তাজা হাওয়া ছড়িয়ে চলছে। ভেতরেও কোনো কারিকুরি আছে বলে মনে হয় না। “থ্যাঙ্কস জুজুৎসু।” অধিরাজ মিষ্টি হাসল, “এই বাড়ির ইলেক্ট্রিসিটির কাজ তুমিই করো তাই না? সত্যিই! কত কাজ করতে হয় তোমাকে! একসঙ্গে এত পরিশ্রম করা চাট্টিখানি কথা নয়।”
একে বলে খাঁটি সর্ষের তেলের সঙ্গে এয়ার কন্ডিশনের হাওয়া! জুজুৎসু একেবারে গলে গিয়ে বলল, “অত কিছু নয় সাব। ছোটামোটা কাজ পারি। শুধু ইলেক্ট্রিক নয়, প্লাম্বিং এমনকি ছোটোখাটো মেরামতির কাজও করে দিই। আপনার বাড়িতে কাজ থাকলেও বলবেন। করে দিয়ে আসব।”
“নিশ্চয়ই।” সে বলল, “তবে আর একটু কষ্ট করো। এ বাড়ির সবকটা বেডরুমের এসি, লাইটগুলো একটু খুলে দেখাবে? তোমাদের ঘরের লাইটগুলো আমার বড়োই পছন্দ হয়েছে।”
জুজুৎসু একগাল হাসল, “এগুলো সোনালি মেমসাব আর শালিনী মেমসাব শখ করে লাগিয়েছেন। আগের আলোগুলো এত ঝকঝকে ছিল না। শালিনী মেমসাবের চোখ কাটার পর পড়তে অসুবিধে হত বলে এই জোরালো আলোগুলো লাগানো হয়েছে। এখন মেমসাব দিব্যি বই পড়েন।”
“তাই? বাঃ।” অধিরাজ কৌতূহলী, “কতদিন ধরে আছে এই লাইটগুলো?”
সে একটু মাথা চুলকোল, “ঠিক মনে নেই সাব। তবে কয়েক মাহিনা তো হয়ে গেছেই। প্রথম প্রথম চোখে খুব লাগত। এখন সবার সয়ে গেছে। খুব ভালো লাইট। আপনিও লাগিয়ে নিন।”
“নিশ্চয়ই।”
তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, “আচ্ছা জুজুৎসু, এ ঘরে তো কোনো ফাঁক ফোঁকর দেখছি না। ঘুলঘুলি, ভেন্টিলেশন সিস্টেম তেমন কিছুই নেই। পুরোটাই সিলড্। ঘরে আলো-বাতাস আসে কী করে? এমন বন্ধ ঘরে দমবন্ধ হয়ে যায় না?”
“বদ্ধ ঘর কোথায় সাব?” সে একটু এগিয়ে এসে একটা ভারি পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। তার পেছনেই বিরাট একটা কাচে মোড়া জানলা। জুজুৎসু জানলাটা টেনে খুলে দিয়ে বলে, “প্রত্যেক বেডরুমেই এরকম বিরাট খিড়কি আছে সাবজি। সারা সকাল খোলা থাকে। তাজা হাওয়া-আলো বিকেল অবধি আসে। এখন সর্দির মৌসম চলছে না? তাই সন্ধে থেকে বন্ধ করে দিতে হয়। তাছাড়া সবাই বেডরুমে না-আসা পর্যন্ত সব ঘরের দরজা খোলা থাকে। শুধু ঘুমের সময়টুকুই সব বন্ধ হয়ে যায়।”
“জানলাটা বাইরে থেকে খোলা যায়?”
“না সাব।” জুজুৎসু জানায়, “এগুলো একদম ভেতর থেকে সিল্ড। বাইরে থেকে কেউ খুলতে পারবে না। এমনকি ব্যালকনি থেকেও খুলবে না। শুধু ভেতর থেকেই জানলাগুলো খোলে।”
“বুঝলাম।”
অধিরাজের চোখে দুশ্চিন্তা। সে আর কথা না বাড়িয়ে বলল, “চলো, বাকি ঘরগুলোও দেখা যাক।”
বাকি বেডরুমগুলোও প্রায় একইরকমের। শুধু জুজুৎসুর ঘরে এসি নেই। নয়তো এয়ার পিউরিফায়ার, অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার, মসকুইটো লিকুইডেটর, সবই কমন। অর্ণব বইয়ে পড়েছে যে ক্রিমিনালরা সবসময়ই মার্ডার ওয়েপন এমন জায়গায় রাখে যার দিকে কেউ লক্ষ্যই করবে না। কিন্তু অধিরাজ অত সূক্ষ্ম তল্লাশিতে গেলই না। বরং রীতিমতো ফের দেওয়াল ঠোকাঠুকি করে সিক্রেট চেম্বারের অস্তিত্ব খোঁজা হল। প্রত্যেকটা লিকুইডেটর খুলে খুলে শুঁকে দেখে চোখ মুখ কুঁচকে বলল, “ওঃ! খাঁটি মর্টিন! অসহ্য!”
মিস্ অরোরা যথারীতি পর্দা সরিয়ে, খাট লণ্ডভণ্ড করে, প্রত্যেকটা ড্রয়ার খুলে, ক্যাবিনেট-কাবার্ড খুলে আচ্ছা করে ঠুকে, মেরে দেখল। কোথাও কিচ্ছু নেই! একটি সূক্ষ্ম ছিদ্রও নেই যার ভেতর থেকে গ্যাসটা ঢুকতে পারে। জুজুৎসুও এসি আর লাইট খুলে দেখিয়ে দিল। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকেও ওরা পরীক্ষা করে দেখল যে এসি ডাক্টের মধ্য দিয়ে কোনোভাবে গ্যাস ইনসার্ট করা সম্ভব কিনা। এসি-র রিমোট, ক-টা রিমোট আছে, প্রয়োজনে কখনও একাধিক রিমোট ইউজ হয় কিনা তাও জিজ্ঞাসা করল। অথচ সেখানেও ব্যর্থতা। ওঁদের প্রত্যেকটা এসি-র একটা করেই রিমোট আছে। এইগুলো একেবারে শুরু থেকেই চলছে। আজ পর্যন্ত বিগড়ায়নি, তাই নতুন একাধিক রিমোটের প্রয়োজনও পড়েনি।
নাঃ, লোহার বাসরঘরে কালনাগিনীর ঢোকার কোনো সুযোগই নেই। অধিরাজ অ্যান্ড টিম কিছুই বাদ দেয়নি। এমনকি ওরা জানলা খুলে বাইরের দিকটাও তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছে। বাইরে থেকে জানলা টেনে খোলার চেষ্টাও করল। কিন্তু জুজুৎসুর কথাই সত্যি। একটা জানলাও বাইরে থেকে খোলে না। ঘরের ভেতরে কোনো হিডন চেম্বারও নেই যার মধ্যে থেকে গ্যাস পাস্ করা সম্ভব। তবে?
শালিনী, আয়ান আর তানিশার বেডরুম থেকে বেরোতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল অধিরাজ। ওদের কিংসাইজ বেডের সাইডে অলশভাবে একটা বিরাট গোলাপি রঙের টেডি বিয়ার এলিয়ে পড়ে আছে। এমনিতে দৃশ্যটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যে কোনো শিশুর ঘরে টেডি বিয়ার বা অন্যান্য পুতুল বা খেলনা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অধিরাজের মনে হল টেডি বিয়ারটা একটু বেশিই যেন বড়ো। এতটাই লম্বা চওড়া যে ওর ভেতরে একটা আস্ত মানুষও বুঝি ঢুকে থাকতে পারে। সে জুজুৎসুর দিকে তাকিয়েছে, “এই টেডি বিয়ারটা কার?”
“আয়ান বাবার।”
“আই সি!” অধিরাজ জানতে চায়, “ওটাকে কি খোলা যায়?”
“হাঁ সাব।” জুজুৎসু মাথা ঝাঁকায়, “আমিই তো ওটা নোংরা হলে খুলে কেচে দিই। ওর ভেতরে স্পঞ্জ রয়েছে। পুতুলটার পেছনের চেনটা খুললে ভেতরের স্পঞ্জগুলো বেরিয়ে আসে। ওগুলোকে বের করে খোসাটা কেচে আবার স্পঞ্জ ঢুকিয়ে ফিটফাট করে দিই।”
“ফাইন।”
সে আর কথা না বাড়িয়ে হলঘরে চলে এল। সেখানে শালিনী, সোনালি আর বিরূপাক্ষ-র সঙ্গে মিস্ দত্তও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের মুখেই চিন্তা ও আশঙ্কার মেঘ থমথম করছে। ব্যতিক্রম শুধু আয়ান ও তানিশা। তারা নিজেদের মধ্যে খেলা করতেই ব্যস্ত। অধিরাজ আয়ানের সামনে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বলে, “হ্যাল্লো মিঃ আয়ান।”
ফুটফুটে পুঁচকি ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল, “হাই হ্যান্ডসাম।” বোঝো ঠ্যালা! অর্ণব বিড়বিড় করে বলল, “তোর হবে বাবা। এই বয়েসেই ‘হাই হ্যান্ডসাম’!”
পুঁচকুর ডায়লগ শুনে অধিরাজও এবার ঘাবড়ে গিয়েছে, “ও বাবা! তুমি হ্যান্ডসাম মানেও জানো।”
“হ্যাঁ।” শিশু সরলভাবে মাথা নাড়ল, “হ্যান্ডসাম মানে সুন্দর। এই তো একটু আগেই মা তোমাকে দেখে বলল ‘অফিসার কী দারুণ হ্যান্ডসাম না!’ বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম হ্যান্ডসাম মানে কী, বাবা বলল সুন্দর। তুমি খুব হ্যান্ডসাম আঙ্কল।”
সোনালি তখন সোফার পেছনে লুকোবেন কিনা ভাবছেন। একেবারে ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা। আজকালকার বাচ্চারা সব খেয়াল করে। তাদের সামনে কোনো বেফাঁস কথা বলে ফেললে রক্ষা নেই!
“তুমিও খুব হ্যান্ডসাম।” অধিরাজ সস্নেহে বলে, “বাই দ্য ওয়ে মিঃ হ্যান্ডসাম, তোমার ঘরে একটা বিরাট পিঙ্কি ডলি আছে। তুমি কি ওটা নিয়ে খেলা করো?”
“না।” আয়ান বলল, “ওটা খুব ভারি। আমি তুলতে পারি না। তাই ও আমার ফেভারিট নয়। পুঁচু, সিম্বা আর লিও আমার ফেভারিট ফ্রেন্ড। ওর নাম ঘুটু! ভীষণ পাজি। একদম নড়ে চড়ে না৷”
“পুচু, সিম্বা আর লিও কে?”
“এসো, তোমায় দেখাচ্ছি।”
আয়ান অধিরাজের হাত ধরে টান মারল। অধিরাজও নির্বিবাদে চুপচাপ তার সঙ্গে ওদের বেডরুমে ঢুকল। আয়ান বিরাট টেডির পেছনে চাপা পড়ে থাকা তিনটে পুতুল বের করে এনেছে। রেড প্যান্ডাটার নাম পুঁচু, একটা বড়োসড় স্টাফড ব্যাঘ্রশিশুর পুতুলের নাম সিম্বা, আর ছোট্ট একটা সিংহের নাম লিও। তিনটে পুতুলই ভারি কিউট।
“এগুলো নিয়ে তুমি সবসময় খেলা করো?”
“হ্যাঁ। তবে ঘুটুকে আমি তুলতে পারি না।” আয়ান ঘাড় কাত করল, “মা বলেছে, রোজ দুধ খেলে একসময় আমি ঘুঁটুকেও তুলতে পারব।”
“দুধ খেতে ভালো লাগে তোমার?”
সে জিভ বের করে বলল, “ইয়াক! বিচ্ছিরি।”
“আমি একটু তোমার বন্ধুদের কোলে নিয়ে দেখব?”
আয়ান অত্যন্ত উদারমনস্ক। সে মাথা ঝাঁকায়, “হ্যাঁ। কোলে নাও না। ওরা খুব খুশি হবে।”
অধিরাজ একে একে পুঁচু, সিম্বা আর লিওকে পরীক্ষা করে দেখল। তিনটে পুতুলই ফাঁপা। ওগুলোকে সহজে খোলা যায়, ওয়াশও করা যায়। সে ঘুটুকেও নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখল। এর মধ্যে যে কেউ, যা কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। দৃষ্টি ধারালো। কিছু ভেবে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। সম্বিত ফিরল একটা কচি হাতের স্পর্শে। আয়ান তার বাইসেপস টিপে টিপে পরখ করছে। ভারি খুশি হয়ে বলল, “ওয়াও! তুমি কি রোজ দুধ খাও?”
“ইয়েস মিঃ হ্যান্ডসাম।”
ওখানে আর বিশেষ সময় খরচ করল না ওরা। শুধু মিস্ দত্তকে সুযোগ পেয়ে একপাশে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল অধিরাজ, “এই ফ্লোরে যত মহিলা থাকেন, তাঁদের হাত লক্ষ্য করেছেন কখনও? ওঁরা কেউ ম্যানিকিওর করেন?”
“সবাই করে স্যার। এমনকি নিয়মিতো স্পা-ও করে।”
“ফাইন। এদের মধ্যে কেউ খোঁড়াচ্ছেন কিনা সেটা দেখেছেন?”
“লক্ষ্য করেছি। কেউ খোঁড়াচ্ছে না। সব নর্মাল।”
“ফাইন। সুযোগ পেলে ওঁদের ছবি তুলে রাখবেন। আমরাও একটু সবার হুলিয়া দেখতে চাই। কিন্তু এখন বোধহয় অনেকেই উপস্থিত নেই।”
“না। এরা সব হাই সোসাইটির লেডি। কখন আসে, কখন যায়, কখন ইভনিং ওয়াকে বেরোয় তার ঠিক নেই। একটু আগেই দেখলাম গুরশীল হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যেন গেল। তিতলিও সেই সকালে কোন বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছে, এখনও ফেরেনি। প্রিয়দর্শিনীকেও সকালেই বেরিয়ে যেতে দেখেছি, আর শ্রী একটু আগেই শ্যুটিঙে গেল। কোকিলার এখনও আসার সময় হয়নি। তবে…” আত্রেয়ী মুখ টিপে হাসল, “নারী পুরুষ নির্বিশেষে এ ফ্লোরের সব নমুনার ছবি আমি সুযোগ পেয়ে আগেই তুলে রেখেছি। আপনাকে একটু পরেই হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি স্যার।”
“এক্সেলেন্ট ওয়ার্ক মিস্ দত্ত।” অধিরাজ খুব খুশি হয়ে বলল, “কখনোই আপনি নিরাশ করেন না! একটু রাতের দিকে অর্ণব আপনার স্পেশাল চা খেতে আসবে। আজ এখানে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ওর। ও সঙ্গে একটা গ্যাস মাস্কও নিয়ে আসবে। ওটাকে হাতছাড়া করবেন না। আর তার সঙ্গে আরও একটা ডিউটি আছে আপনার।”
“বলুন।”
“প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের মহিলারা ফিরে এলে ওঁদের কাছে গিয়ে নুন, তেল, চিনি, খুশি চেয়ে নিন। কিংবা অন্য কায়দা অবলম্বন করুন। কিন্তু কাজটা এমনভাবে করবেন যাতে ওঁদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আপনি সহজেই পেয়ে যান। আপনার ব্যাগে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাউডার বা ঐ জাতীয় কিছু আছে তো?”
“আছে।” সে একটু অবাক, “কিন্তু ম্যাচ করাতে গেলে তো ল্যাবে পাঠাতে হবে। আমি কি অফিসার সরকারকে স্যাম্পল দিয়ে দেব?”
“ম্যাচ করার ফান্ডা বিশেষ নেই।” অধিরাজ আত্রেয়ীকে খুলে বলল আহেলির বলা তথ্যগুলো। তারপর বলল, “ইন দ্যাট কেস, এই হাই সোসাইটি বেবসদের একজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আপনি পাবেন না। কারণ তিনি হাই কোয়ালিটির সিলিকন গ্লাভস পরে ঘুরছেন। ফিঙ্গারপ্রিন্ট আসবে না। আমি সেই ফিঙ্গারপ্রিন্টহীন নারীটিকেই খুঁজছি। কাউকে বাদ দেবেন না মিস দত্ত। গুরশীল, কোকিলাবেন, শ্রীদর্শিনী-প্রিয়দর্শিনী, তিতলি, কাউকে ছাড়বেন না। ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্যাম্পল পরে ফেরার সময় অর্ণব নিয়ে
ল্যাবে চলে যাবে। কিন্তু কার হাতের ছাপ এল না, সেটাই জানার কৌতূহল আমার বেশি। যে মুহূর্তে জানবেন, আমায় জানাবেন।”
“ওকে স্যার।”
ওখান থেকে বেরিয়েই ওরা সোজা চলে গেল পি সি চৌধুরীর বাড়িতে। সেখানে এখন প্রায় সকলেই উপস্থিত। শিবু সকালে জানিয়েছিল যে সে আজ আসবে না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, সে দেরিতে হলেও এসে হাজির হয়েছে। মিঃ চৌধুরীকে জানিয়েছে যে এ চাকরি সে আর করবে না। আজই তার এ বাড়িতে শেষদিন। তার হিসাব যেন কর্তা চুকিয়ে দেন, এবং অন্য লোক দেখে নেন। চৌধুরী সাহেবও তেমন। বলেছেন, বকেয়া টাকা তিনি রাতের আগে দিতে পারবেন না। ঘরে অত ক্যাশ এই মুহূর্তে নেই। এটিএম থেকে তুলে আনতে হলে রাতের আগে সম্ভব নয়। আর রাত ন-টার আগে তিনি বাইরে বেরোবেন না। তাই সে এখনও অপেক্ষা করছে। শিখা এবং কমলাও হাজির। ফিজিওথেরাপিস্ট রাজীব চন্দ সোমলতাকে নিয়ে ব্যস্ত। মিস্ বোস রাজীবকে হেল্প করছিল। তিনমূর্তিকে দেখে সে একটু অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। টুইঙ্কলকে কৌশানী আগে কখনও দেখেনি। স্বাভাবিকভাবেই তার চোখে একটা কৌতূহল উঁকি মেরে গেল। পি সি চৌধুরী, পরিমল ও মেঘনা, প্রত্যেকেরই মুখ থমথমে। ওঁরা আজ কেউই বাইরে বেরোননি। দেখলেই বোঝা যায় মরার আগেই সবাই মরে আছেন। শিখা বিরাট একটা চশমা নাকের ওপর তুলে মন দিয়ে বাসন মাজছে। কমলা একটা চাকু দিয়ে খুব মন দিয়ে সবজি কাটছে। তার সামনে গ্যাসের ওপর একটা কড়াই বসানো। তাতে তেল গরম হচ্ছে। অল্প অল্প ধোঁয়াও উঠছে।
নিতান্তই একটা সাধারণ সংসারের ছবি। এর মধ্যে সন্দেহজনক কিছুই নেই। শুধু সদস্যদের মুখগুলোই বড়ো অস্বাভাবিক। এঁরা সবাই যেন মুখে ভয়ের মুখোশ পরে আছেন। দু-চোখে করাল মৃত্যুর আতঙ্ক। পি সি চৌধুরীকে বেডরুমগুলো দেখার কথা বলতেই তিনি বিন্দুমাত্রও আপত্তি করলেন না। বরং স্তিমিত গলায় বললেন, “নিশ্চয়ই দেখুন না। আপনার ডিউটিতে আমরা কেউ বাধা দেব না।”
ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে যা যা হয়েছিল, সেই একই কাণ্ড এখানেও শুরু হল। পি সি চৌধুরীর বেডরুম ছাড়া বাকি দুটো বেডরুমের দেওয়াল, মেঝে এমনকি ছাতও ঠুকে ঠুকে দেখা হল। যথারীতি কোথাও কোনো ফাঁপা জায়গা নেই। এখানেও এয়ার পিউরিফায়ার, অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার, মসকুইটো ম্যাট, এসি, সবই উপস্থিত। অর্ণবের মনে হচ্ছিল, মোটামুটি সব বেডরুমেরই বুঝি নকশা ও আসবাবপত্র একই রকমের। সেই একই ডাবল বা সিঙ্গল বেডের বক্স খাট বা ডিভান, আয়না, ড্রেসিং-টেবল। ড্রেসিং টেবলের ওপরে যথারীতি লিপস্টিক, ক্রিম ও পারফিউম, যা নিয়ে মিস্ অরোরার কৌতূহলের অন্ত নেই। এ বাড়িতে কোনো বাচ্চা নেই, তবু বিছানার ওপর বেশ কিছু সফট টয় সাজানো। এটা বোধহয় পুত্রবধূ মেঘনার শখ। পরিমল ও মেঘনার বেডরুম তুলনামূলক অনেকটাই আধুনিক। তাই কাবার্ডের উপস্থিতি। সোমলতা অসুস্থ বলে তাঁর শয়নকক্ষও আলাদা। এই বেডরুমটা একটু প্রাচীন। এসি বা অন্যান্য জিনিসগুলোও আছে ঠিকই, তবে কাবার্ড বা ড্রেসিং টেবল নেই। বরং বিরাট একটা সেগুন কাঠের আলমারি শোভা পাচ্ছে। তাঁর খাটটাও বক্স-খাট নয়, ওটাও সেগুনের পুরোনো পালঙ্ক। আজকাল এই ধরনের পুরোনো ধাঁচের দামি কাঠের ফার্নিচার দেখতেই পাওয়া যায় না। প্রাচীনতা ও আভিজাত্যের ছাপ ছড়িয়ে রয়েছে এই জাতীয় আসবাবপত্রে। সোমলতার ঘরে তেমন শো-পিস জাতীয়ও কিছু নেই। নিতান্তই সাদামাটা।
অধিরাজের নির্দেশে মিস্ অরোরা আলমারির চাবি চেয়ে নিয়ে ভেতরটাও তল্লাশি করে দেখল। সোমলতা ফিজিওথেরাপি করাতে করাতেই এমনভাবে টুইঙ্কলের দিকে তাকিয়েছিলেন যেন এখনই সে ওঁর ‘আলিবাবার খাজানা’ নিয়ে চম্পট দেবে। তবে শেষপর্যন্ত তেমন কোনো ট্র্যাজেডি ঘটল না। এখানেও যথারীতি এয়ার পিউরিফায়ারগুলোকে নিয়ে নেওয়া হল। অধিরাজ মসকুইটো লিকুইডের বোতল শুঁকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘গুডনাইট!’ টুইঙ্কল এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ ‘ল্যাভেন্ডার আর ‘স্যান্ডালউড’ বলে শনাক্ত করল। জুজুৎসুর মতো শিবুও এসিগুলোকে খুলে-টুলে দেখাল। চালিয়েও দেখা হল। কোনোরকমের সন্দেহজনক কিছুই নেই।
তবে এখানে একটা পার্থক্য অধিরাজের চোখে পড়ল। এ বাড়িতে কোনোকালে ঘুলঘুলি নামক বস্তুটি ছিল। এখন সেটাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সে কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, “মিঃ চৌধুরী, এই ভেন্টিলেটরগুলো বন্ধ কেন?”
“অ্যাকচুয়ালি এসি যারা ইনস্টল করতে এসেছিল তারাই ওগুলোকে বন্ধ করতে সাজেস্ট করেছিল।” তিনি জানালেন, “নয়তো ঘর ভালো ঠান্ডা হচ্ছিল না। ওরা বলল এসির অর্ধেক ঠান্ডা হাওয়াই তো ঘুলঘুলি দিয়ে বেরিয়ে যাবে। আমার ছেলে আর বৌমা আবার একেবারেই গরম সহ্য করতে পারে না। আমার স্ত্রীরও গরমের বাতিক। তাই দুটো বেডরুমেরই ভেন্টিলেটর আর যত ফাঁক ফোঁকর ছিল, সব বন্ধ করে দিয়েছি। আমার অত গরম লাগে না। তাই আমার ঘরেরগুলো খোলাই আছে।”
“ওকে…বে…!”
কিছু একটা বলতে গিয়েও অধিরাজ থমকে গেল। তার চোখ গিয়ে পড়েছে আলোগুলোর দিকে। এই প্রথম তার খটকা লাগল। এখানেও সেই বিশেষ প্রজাতির আল্ট্রাভায়োলেট ভিবজিওর এল ই ডি লাইট উপস্থিত! সর্বত্রই এই বিশেষ আলোর উপস্থিতি কি নিতান্তই কো-ইনসিডেন্স? নাকি এখন সকলেই কিলোদরে এই লাইটগুলোই লাগাচ্ছে। নতুন ট্রেন্ড? নাকি অন্যকিছু? ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতেও তো এই আলোগুলো বহুমাস ধরেই আছে। জুজুৎসু তো আলোগুলো খুলেও দেখাল। তেমন কিছুই তো চোখে পড়ল না। নিতান্তই সাধারণ লাইট। আর পাঁচটা সাধারণ এল ই ডি বাল্ব বা টিউবের থেকে বিশেষ কোনো পার্থক্যই নেই। তার নিজের বাড়িতেই তো এই ধরনের লাইটিং সিস্টেম আছে। এর কোনো ক্ষতিকর এফেক্ট থাকলে এতদিন কি এই আলোয় সকলেই নিরাপদে ঘোরাফেরা করতে পারতেন?
তবু সন্দেহ যায় না। সে পি সি চৌধুরীর দিকে ফিরল, “স্যার, এই স্পেশাল লাইটগুলো কবে থেকে এখানে আছে?”
“এগুলো?” তিনি একটু ভেবে বললেন, “এগুলো আমার ছেলে লাগিয়েছে। মাস দুয়েক হয়ে গেল আছে। আগের বাল্ব আর টিউবগুলো বেশিদিন টিকত না। আলোও কমজোরি। কমলা এমনিতেই চোখে কম দেখে, তার ওপর কম আলোয় নুনের জায়গায় চিনি, চিনির জায়গায় নুন দিয়ে বসে থাকত। শিখারও চোখের প্রবলেম। চশমা খুলে ফেললে স্রেফ অন্ধ! আমার আর মিসেসেরও আই সাইট সুবিধের নয়। সেইজন্যই এই আলোগুলো আমদানি করা হয়েছে। সাধারণ লাইটের তুলনায় অনেক বেটার।”
“আই সি।”
অধিরাজ ঠোঁট কামড়াল। সচরাচর লাইট বা বাল্বের সঙ্গে গ্যাসের কোনোরকম সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু এই খুনিটিকে বিশ্বাস নেই। তার সঙ্গে কোমল কৌরের মতো জিনিয়াসের মস্তিষ্কের কারিকুরির সাপোর্ট আছে। সেই অবিশ্বাস্য টেকনিক যেভাবে সবাইকে ঘোল খাওয়াচ্ছে, তাতে নিরীহ থেকে নিরীহতর জিনিসও বিপজ্জনক হতে পারে। সে একটু চুপ করে থেকে বলল, “শিবুকে বলবেন একটু লাইটগুলো খুলে দেখাতে?”
“শিওর।”
যথারীতি শিবু বেডরুমের সব আলো একটা একটা করে খুলে নামিয়ে আনল। অধিরাজ ও অর্ণব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সেগুলোকে পরীক্ষা করে দেখছে। কোথাও কোনোরকম গোলমাল নেই! একদম পাতি এল ই ডি! এমনকি সকেটগুলোতেও কোনোরকমের অস্বাভাবিকতা নেই। পরিমল ও মেঘনার বেডরুমে একটা ছোট্ট শ্যান্ডেলিয়রও ছিল। সেটাকেও ছাড়ল না ওরা। কিন্তু এত পরিশ্রমের পরও হাতে কিছুই এল না। সব এতই স্বাভাবিক যে দুই অফিসারেরই মাথা বোঁ বোঁ করতে শুরু করেছে। শেষপর্যন্ত ওরা কি ওয়াইল্ড গুজ চেজ করছে? নাকি ঝোপে ঝোপে বাঘ দেখছে। কে বলতে পারে, হয়তো অধিরাজ ফালতু জিনিসের পেছনেই দৌড়ে মরছে আর বার্নিং শিখ ওদের গলদঘর্ম হতে দেখে স্রেফ মুখ টিপে ব্যঙ্গের হাসি হাসছে। এই দুই ফ্যামিলির এতগুলো বেডরুমে একটাও এমন জায়গা নেই, যেখান থেকে মারণ গ্যাসটা আসতে পারে। তবে এই বদ্ধ ঘরগুলোয় দু-দুটো গ্যাস একসঙ্গে ঢুকছে কী করে। কোনপথেই বা আসছে। ওরা ভূপেন্দ্র’র বাড়ির ভেতরে, বাইরে সব কিছু চেক করেছে। সেখানেও কিছু নেই। এখানেও কিছু নেই।
“চলো, বাইরেটা একটু দেখে আসি। মিস্ অরোরা, আপনি এখানেই থাকুন।”
অর্ণবের দিকে কথাটা ছুড়ে দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল অধিরাজ। তার মুখে বিরক্তি। নিজের ওপরেই বিরক্ত হয়ে উঠেছে সে। এখন একমাত্র ভরসা এই এয়ার পিউরিফায়ারগুলো। এছাড়া গোটা ব্যাপারটাই হেঁয়ালির মতো ঠেকছে। আদতে যে কী হচ্ছে তা কিছুতেই বের করতে পারছে না। একটা লোক দু-দুটো গ্যাসের কন্টেনার এনে গ্যাসগুলোকে রিলিজ কী করে করছে? তাও একেবারে বেডরুমগুলোতেই! আজ দ্বিতীয় রাত। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে আটচল্লিশ ঘণ্টা প্রায় পূর্ণ হওয়ার পথে৷ সে মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে। বার্নিং শিখও হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। সে কোনো-না কোনো বাড়িতে অ্যাটাক করবেই। কিন্তু কোথায়? কীভাবে?
ভেতরের মতো বাইরে থেকেও বাড়িটাকে আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখল ওরা। যদি কোথাও কোনোরকম গোপন ট্র্যাক থেকে থাকে। এসির আউটডোর ইউনিটটাও যথারীতি দেখল। ঘুলঘুলি কিংবা জানলাগুলো যদি বাইরে থেকে খোলা যায় সে চেষ্টাও করল ওরা। কিন্তু ভেন্টিলেটরগুলোকে ভেতর থেকে এমন এঁটে বন্ধ করে দিয়েছে যে খোলাই দায়। জানলাও বাইরে থেকে খোলে না। তবে?
শেষপর্যন্ত একরকম ঘেমেঘুমে অস্থির হয়ে হাল ছেড়ে দিল অধিরাজ। আশ্চর্য ব্যাপার। কোথাও কিচ্ছু নেই। এ বাড়িতে বাইরে থেকে গ্যাস ইনসার্ট করা অসম্ভব। ভূপেন্দ্র দত্তা’র ফ্ল্যাটেও তাই। তবে কি এবার কোনো নতুন ওয়েপন আমদানি হতে চলেছে। হয়তো গ্যাসের বদলে অন্য কিছু ব্যবহার করবে সে। তাই বা কী করে হয়! এতখানি প্যাটার্ন চেঞ্জ ও করবে বলে মনে হয় না। অধিরাজ অন্যমনস্কভাবেই ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেট থেকে একটা লম্বা স্টিক বের করে আনে। সেটাকে আপনমনেই ঠোঁটে গুঁজে আস্তে আস্তে বলল, “থিঙ্ক মিঃ ব্যানার্জি। থিঙ্ক। কী হচ্ছে আসলে… কী হচ্ছে? লাইটে কোনো গোলমাল নেই, ঘরে কোনো সিক্রেট প্যাসেজ বা হোল নেই, ভেন্টিলেটর দিয়েও গ্যাস ঢোকানো সম্ভব নয়… তাহলে লোকগুলো মরছে কী করে?” বেশ কিছুক্ষণ অস্থির পায়ে সে বাড়ির বাইরে হাঁটাহাঁটি করল। একটা আস্ত কিংসাইজ সিগারেট শেষ করতে যতক্ষণ সময় লাগে ঠিক ততক্ষণই উঠোনের এ মাথা থেকে ও মাথা ছটফট করতে করতে হেঁটে বেড়াল অধিরাজ। ঘড়ির কাঁটাও থেমে নেই। সময় এখন সাড়ে সাতটা ছাড়িয়ে পৌনে আটটার দিকে চলেছে। চতুর্দিকে চাপ চাপ অন্ধকার ছেয়ে আছে। ওঁত পেতে আছে কালরাত্রি। আর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই এ বাড়ির লোকেরা ডিনার সেরে ঘুমোতে যাবে। কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙবে কিনা সে বিষয়ে এখনও অনিশ্চিত! এতগুলো মানুষের প্রাণরক্ষা করার দায় তার ওপরে। অথচ সে নিজেই বিশ বাঁও জলে।
অন্ধকারে অধিরাজের মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল না অর্ণব। কিন্তু শুনতে পেল তার দৃঢ়স্বর। সে আপনমনে নিজেকেই বলছে, “ওকে ফাইন। যে অঙ্কটা মিলছে না, সেটা থাক। কিন্তু যেটা মিলবে, সেটাকেই ট্রাই করা যাক।”
কোন্ অঙ্কটা মিলবে! অর্ণব আকাশ থেকে পড়ে। এখনও পর্যন্ত সব অঙ্কই তার দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে। কোনোটা মেলার সম্ভাবনা তো দেখাই যাচ্ছে না। তবে কোন্ অঙ্ক মেলাতে চায় অধিরাজ!
সে কিছু বলার আগেই অধিরাজ ফের মোবাইলে কার নম্বর যেন ডায়াল করল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ইয়েস, পবিত্র। কোথায় তুমি?”
ওপ্রান্ত থেকে পবিত্র-র কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “রাস্তার উলটোদিকের বাড়িটার গ্রাউণ্ড ফ্লোরে তাকাও মামা! আমি তোমার নাকের সামনেই বসে আছি। উঠোনে সিগারেট খেতে খেতে পায়চারি করছ, অথচ তোমার স্পেশাল ওয়ান কিছু বলছে না কেন, সেটাই ভাবছি। কাঁধের অলঙ্কারটি আগেই দেখেছিলাম, মাথারটা কি কোমল কৌরের বাড়ির ব্লাস্টে হল? বাই দ্য ওয়ে, লুকিং ট্রিমেন্ডাস হ্যান্ডসাম ইন ব্লু শার্ট।”
“থ্যাঙ্কস।” অধিরাজ সিরিয়াস, “যদি বউদি বা সানি লিওনিকে নিয়ে ব্যস্ত না থাকো, তাহলে তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
“কিছু ঘটতে পারে?”
“হোপ সো। কাম শার্প।”
বলেই সে ফোনটা কেটে দিয়ে সিগারেটটা ফেলে গটগট করে পি সি চৌধুরীর বাড়ির মধ্যে ফের ঢুকে গেল। তার চোয়াল শক্ত, কোনো অজানা সংকল্পে বদ্ধপরিকর। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা বসার ঘরে গিয়ে উপস্থিত। সেখানে চৌধুরী সাহেব, পরিমল আর মেঘনা চিন্তিত মুখে বসেছিল। শিবুও নিজের বকেয়া টাকার অপেক্ষায় চুপচাপ বসে আছে। শিখার কাজ শেষ। সে বোধহয় বেরিয়ে যাচ্ছিল, তার আগেই তাকে আটকাল অধিরাজ, “দু-মিনিট পরে যাবেন। আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।”
শিখা কোনো কথা না বাড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে। টুইঙ্কলও সেখানেই উপস্থিত। সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে শিখাকে দেখছে। রান্নাঘর থেকে গরম তেলের ঝাঁঝালো সুগন্ধ ভেসে আসছে, সঙ্গে হাতা-খুন্তির আওয়াজ। কমলা এখনও শ্লথগতিতে রান্না করছে। ফিজিওথেরাপিস্ট রাজীব চন্দও ততক্ষণে আজকের সেশন শেষ করে বাইরের ঘরে এসেছেন। তিনি নীচু স্বরে নার্সরূপী মিস্ বোসকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তাকেও আটকাল অধিরাজ, “প্লিজ, এখন ঘর থেকে কেউ বেরোবেন না। কয়েকটা রুটিন প্রশ্ন করে নিই।”
রাজীবের চোখে বিস্ময় ভেসে ওঠে, “আপনারা?”
“সি.আই.ডি., হোমিসাইড। প্লিজ কো-অপারেট।”
বলতে বলতেই সে তাকাল পরিমলের দিকে, “মিঃ জুনিয়র চৌধুরী, আপনার ব্যাবসাটা কীসের? হার্ডওয়্যারের না?”
“হ্যাঁ স্যার।”
পরিমল শান্তস্বরেই বলল। অর্ণব তাকে একদৃষ্টে দেখছিল। সত্যিই তার চেহারাটা টিপিক্যাল বাঙালি ছেলেদের মতো একেবারেই নয়। কোনো অবাঙালি মা-বাবার সন্তান হওয়ার চান্স হান্ড্রেড পার্সেন্ট। যদি সে বাংলায় কথা না বলত, তবে তাকে অন্য কোনো প্রদেশের লোক বলেই ভুল হত। কৌশানী ঠিকই বলেছে।
“কতদিন ধরে হার্ডওয়্যারের বিজনেস করছেন?”
বন্দুকের গুলির মতো প্রশ্ন ছুটে গেল। পরিমল একটু অবাক হয়েই বলে, “বহুবছর এ লাইনে আছি। কেন?”
“আপনার শোরুমে তালা চাবি নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। সবই ব্র্যান্ডেড রাখেন না লোকালও থাকে?”
এই প্রশ্নগুলো করার অর্থ কী। পরিমলের চেয়েও বেশি অবাক হচ্ছিল অর্ণব। উত্তরদাতাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগও দিচ্ছে না অধিরাজ। এ যেন র্যাপিড ফায়ার কোয়েশ্চেনিং চলছে। কিন্তু সে মুখের স্বাভাবিকভাব বজায় রাখে। পরিমল ফের নম্রসুরে জানাল, “ব্র্যান্ডেড মালের পাশাপাশি লোকাল জিনিসও রাখতে হয় স্যার। সবাই তো ব্র্যান্ডেড লক্ অ্যাফোর্ড করতে পারে না। অনেকেই কম দামি জিনিস চায়। তাই লোক্যাল প্রোডাক্টও থাকে।”
“তা ঠিক।” অধিরাজ একদৃষ্টে তার চোখে চোখ রেখে বলল, “নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে অনেক লকস্মিথেরও কানেকশন আছে। তালা-চাবি যখন আপনার দোকানের অন্যতম প্রোডাক্ট, সেক্ষেত্রে অনেক সময় চাবি বানানোর জন্য বা লোক্যাল লক্-কি আনানোর জন্য লক্স্মিথদের শরণাপন্ন হতেই হয়, তাই না?”
এবার সে হেসে ফেলল, “হ্যাঁ। সেটাই স্বাভাবিক। অনেক কাস্টমার আবার একটা চাবিতে খুশি হন না, একাধিক চাবির ডিমান্ড করেন। সেজন্য তালা-চাবিওয়ালা, আই মিন লকস্মিথের শরণাপন্ন তো হতেই হয়। অনেকে আবার অত্যাধুনিক লক কিনে তালেগোলে ভেতরে চাবি রেখে বাইরে থেকে দরজা টেনে দেন। ব্যস, দরজা আটকে যায়। তখন আমাকেই দৌড়োতে হয় চাবিওয়ালা নিয়ে। অত দামি তালা তো কথায় কথায় ভাঙা যায় না! সেক্ষেত্রে ডুপ্লিকেট কি-ই ভরসা।”
“আপনার লকস্মিথের নাম কি গুলশন সিং?”
এবার যেন চমকে উঠল পরিমল। একটু আমতা আমতা করে বলল, “পুরো নামটা জানি না। তবে ওকে গুল্লু নামেই চিনি। ওই নামটাই ও ইউজ করে।”
গুল্লু! নামটা শুনেই আঁতকে উঠেছে অর্ণব! এই কানেকশনটা বের করলেন কী করে স্যার! খুনি তো তবে একেবারে বাড়ির ছেলের কাঁধেই বেতাল হয়ে বসে আছে। অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার কী!
“কতদিন ধরে চেনেন তাকে?”
“প্রায় একবছর হল। খুবই ভালো লক স্মিথ। কাজেরও বটে। কম দামে সবরকমের কাজ উৎরে দেয়।”
“গুল্লু আপনার বাড়িতে কতবার এসেছে? ওকে কি আপনি কোনোরকমের আধুনিক লক বা ল্যাচ বাইপাসিং টুল গিফট করেছেন?”
এবার পরিমল একটু নার্ভাস হয়ে যায়, “গুল্লু বাড়িতে আসে না স্যার। ও আমার অফিসেই দেখা করে। কখনো-কখনো ক্লায়েন্টও নিয়ে আসে, তার জন্য পার্সেন্টেজ দিই ওকে আমি। আর আপনি ঠিকই বলেছেন। ওকে ল্যাচ বাইপাসিং টুলও দিয়েছি। কিন্তু এগুলো তো প্রোফেশনাল ব্যাপার….!”
সে আরও কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই অধিরাজ আড়চোখে তাকিয়ে দেখল পবিত্রও দরজার সামনে এসে নীরবে দাঁড়িয়েছে। পরিমলকে কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই সে হঠাৎই চেঁচিয়ে ওঠে, “বো-লে সো নি-হা-ল!”
স্যারের এরকম উদ্ভট কাণ্ডে অর্ণব হকচকিয়ে যায়। বাড়ির লোকেরাও সবাই থতমতো খেয়ে গিয়েছে। আচমকা কথার মাঝখানেই অধিরাজ অপ্রাসঙ্গিকভাবে চেঁচিয়ে ওঠায় প্রত্যেকেই বিস্মিত। কী জন্য, কেন এই আকস্মিক চিৎকার তা কেউই বুঝে উঠতে পারেনি। মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য প্রত্যেকেই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কিন্তু বিস্ময়ের তখনও কিছু বাকি ছিল। এরপর যা ঘটল তাতে অর্ণব, পবিত্র, এমনকি মিস্ অরোরারও রক্তহিম হয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অধিরাজের স্পেশাল ‘ওয়ার ক্রাই” এর উত্তরে একটি পুরুষকণ্ঠ সিংহের মতো গর্জন করে উঠল, “সৎ-শ্রী, অকাল।”
ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সকলের মাথাতেই যেন বাজ ভেঙে পড়ে। প্রত্যেকেই এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে যে এই উত্তরটা এল কোথা থেকে টুইঙ্কল ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “স্যার, আমি কিছু বলিনি।”
“আমি জানি আপনি কিছু বলেননি মিস্ অরোরা।” একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অধিরাজ কিচেনের দিকে ছুটল, “আওয়াজটা রান্নাঘর থেকে এল।”
অর্ণব স্তম্ভিত। রান্নাঘর থেকে পুরুষকণ্ঠে শিখদের ওয়ার ক্রাইয়ের জবাব এল। তার মানে কমলা। ঐ চরম শ্লথ, কুঁজো হয়ে যাওয়া বুড়ি, গড।
আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে অর্ণব, পবিত্র ও টুইঙ্কলও দৌড়োল রান্নাঘরের দিকে। বিদ্যুৎগতিতে তিনজনের হাতেই উঠে এসেছে রিভলবার। একরকম হুড়মুড়িয়েই চারজন গিয়ে দাঁড়াল কিচেনের দরজার সামনে। কিন্তু…!
কেউ কিছু করার আগেই দেখা গেল, বয়েসের ভারে ন্যুব্জ, কুব্জ কমলা একেবারে সটান সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে! স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে ধুরন্ধর প্রতিদ্বন্দ্বীর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। অসতর্কতার মুহূর্তে মুখ দিয়ে ফস্ করে অভ্যাসবশতই বেরিয়ে গিয়েছে আজন্ম পরিচিত শব্দটা। অধিরাজের চালাকিটা ধরতে পারেনি সে। তার কোঁচকানো মুখে ভয়াবহ আফসোস এবং প্রচণ্ড রাগ ক্রর রেখা টেনে দিল। পবিত্র তার দিকে এগিয়েই যাচ্ছিল, তার আগেই অধিরাজ চেঁচিয়ে উঠল, “না…না। সামলে …।” পবিত্র চোখের পলক ফেলারও সময় পেল না। যাকে এতদিন চূড়ান্ত ঢিলে বলে জানত সবাই, সে-ই তড়িৎগতিতে গরম কড়াইটা তুলে নিয়ে ওদের দিকে এক কড়াই টগবগে ফুটন্ত গরম তেল ছুড়ে দিয়েছে। অধিরাজ পবিত্রকে হ্যাঁচকা মেরে টেনে নিলেও সামান্য গরম তেল ছিটকে গিয়ে তার হাতের ওপর পড়ল। পবিত্র কাতরে ওঠে, “উঃ!”
রক্ষা পায়নি টুইঙ্কলও। কিছুটা ফুটন্ত তেল তারও পায়ের ওপর পড়েছে। কিন্তু বুট জুতোর কল্যাণে এ যাত্রায় বেঁচে গেল। সে দাঁতে দাঁত পিষল, “সা-লা। তেরি তো….!” টুইঙ্কল আর অর্ণব এক পা এগিয়ে যেতেই কোণঠাসা বুড়ি এবার কিচেনের ওপর থেকেই কী যেন মুঠো করে তুলে নিয়ে ছুড়ে দিয়েছে ওদের দিকে। অর্ণব শুনতে পেল অধিরাজের নির্দেশ, “ডাক। ডাক।”
সে কথাটা শোনামাত্রই ডাক করল। কিন্তু লাল রঙের গুঁড়ো জিনিসটা মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিচ্ছে বুড়ি ওদের দিকে। পুরো কিচেনেই উড়ছে সেই লাল রঙের ঝাঁঝালো পাউডার। নাকে মুখে জ্বালা ধরছে। কিছুটা এসে অর্ণবের চোখের ওপরের পাতায় পড়া মাত্রই প্রবল জ্বালা করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তীব্র দংশনের জ্বালা অনুভব করল সে। ঠিকমতো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখের নরম চামড়ায় আরও এক দফা রক্তিম পাউডার এসে ছিটকে পড়েছে। অসম্ভব জ্বলছে! অর্ণবের মনে হল, সে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। চোখ খুলতেই পারছে না!
মিস্ অরোরার মুখেও এসে পড়েছিল সেই পাউডার। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, তার যেন কোনো অনুভূতিই নেই! সে হাত দিয়ে মুখের লাল পদার্থ মুছে বলল, “চেষ্টাটা ভালো ছিল। কিন্তু এর চারগুণ বেশি লঙ্কা আমি লাঞ্চে খেয়ে থাকি। অ্যান্ড ফর ইওর কাই ইনফর্মেশন, আই অ্যাম আ হাই ক্যাপসাইসিন টলারেন্ট। আমার সারা মুখে তিখি মির্চির গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলেও আমি কিছুই ফিল করতে পারি না। কিন্তু মির্চি লাগার টাইম এবার তোর।”
বলতে বলতেই সে এগিয়ে গিয়ে একটা জোরদার ঘুষি বসিয়ে দিয়েছে তার চোয়ালে। কমলা সেই জোরদার পাঞ্চ খেয়ে বাসনপত্র সহ উলটে পড়ল কিচেনের মেঝেতে। হাত থেকে ছিটকে পড়ল লঙ্কাগুঁড়োর প্যাকেট। টুইঙ্কল উত্তেজিত, “লগি ক্যায়া?”
তার উত্তরে ওর মাথা লক্ষ্য করে একটা স্টিলের বড়ো ডেকচি ছুড়ে মারল কমলা নিখুঁত টিপ। ডেকচিটা একেবারে সজোরে এসে লাগল টুইঙ্কলের মাথার বাঁ দিকের রগে। একমুহূর্তের জন্য সে-ও চোখে অন্ধকার দেখল। সেই ফাঁকেই স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতোই লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বৃদ্ধারূপী বার্নিং শিখ। সে হেসে বলল, “অব লগি।”
… কিচেনের জানলায় কোনোরকম শিক জাতীয় কিছু ছিল না। কাচের স্লাইডিং পাল্লা ওপরে তুলে দিয়ে ঐ লুজবুজে বৃদ্ধা যেভাবে ক্ষিপ্রবেগে জানলা গলে বাইরের দিকে লাফিয়ে পড়ল তা দেখেই অর্ণব হাঁ! ততক্ষণে কিচেনের শোরগোল শুনে কৌশানী বোসও চলে এসেছে অকুস্থলে। সে-ও কমলার লাফ দেখে ব্যোমকে গিয়েছে। অধিরাজও কমলার পেছনে দৌড়ে যেতে যেতে বলল, “যারা যারা ‘পার্কোর’ জানেন তারা আমার পেছনে আসুন। বাকিরা গলি দিয়ে চেজ করুন। ব্লু টুথে কনফারেন্সে কানেক্টেড থাকুন।”
বলতে বলতেই সে-ও নিজের দীর্ঘদেহটাকে প্রায় বিড়ালের মতো নমনীয়তায় কুঁকড়ে নিয়ে ভল্ট খেয়ে জানলা দিয়ে গলিয়ে ঠিক পাশের বাড়ির কার্নিশে লাফিয়ে পড়ল। পার্কোর একটা অদ্ভুত ধরনের স্পোর্টস। এর ট্রেনিং থাকলে যে কেউ উঁচু-নীচু, ট্যারা-ব্যাকা সারফেসের ওপর দিয়ে অসম্ভব দ্রুতবেগে চলে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, যেখানে দৌড়বার জন্য আদৌ কোনো পথ নেই, সেখান দিয়েও একজন পার্কোর এক্সপার্ট অনায়াসে বেরিয়ে যায়। নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা নেই। স্রেফ এ পয়েন্ট থেকে বি পয়েন্টে প্রতিযোগীকে পৌঁছতে হবে। তার জন্য লং জাম্প, হাই জাম্প, মারাত্মক ভল্ট, সামার সল্ট, অ্যাক্রোব্যাটিকস, জিমন্যাস্টিক্স, সবই চলবে। এর জন্য রীতিমতো ট্রেনিং লাগে, আর লাগে সাহস। অধিরাজ নিজেই ‘পার্কোরে’ মহারথ হাশিল করে বসে আছে। অর্ণবও এই কলা কিছুটা জানে। তাই সে-ও পেছনে দৌড়োল। সবচেয়ে অবাক করল কৌশানী। অর্ণব সবিস্ময়ে দেখল তার দেহটাও একেবারে মাপা স্পিডে মসৃণ একটা ভল্ট খেল। অর্থাৎ ইনিও পার্কোর স্পেশালিস্ট!
বার্নিং শিখ প্রথমে ভেবেছিল যে হয়তো এরা কেউ তাকে চেজ করতে পারবে না। কিন্তু এবার সে-ও সভয়ে দেখল ঐ আলো-আঁধারির মধ্যেই তিনজন অফিসার বাঘের মতো তাকে চেজ করছে। অধিরাজের দেহটা কখনও লাট্টুর মতো বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে শূন্যে উড়ছে, কখনও বা লম্বা লাফ মেরে অবলীলায় সমস্ত বাধা পেরিয়ে যাচ্ছে। সরু কার্নিশ বেয়ে এমন স্বচ্ছন্দে দৌড়চ্ছে যেন ওটা কার্নিশ নয়, গড়ের মাঠ। এক মুহূর্তের জন্য সে মুগ্ধ হয়ে আপনমনেই বলে উঠল, “ওয়াঃ!” তারপরই সম্বিত ফিরে পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে এক ছাত থেকে আর এক ছাতে লাফিয়ে চলে গেল। এই অঞ্চলটায় জনবসতির ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় একটা বাড়ি থেকে আর একটা বাড়ির ছাত কিংবা কার্নিশ বেশ কাছাকাছি। সেই সুযোগটাই নিল বার্নিং শিখ।
পবিত্র আর টুইঙ্কল পার্কোরে তেমন দক্ষ নয়। কিন্তু ওরাও হাল ছাড়েনি। টুইঙ্কলের মুখ এখনও চিলি পাউডারে লাল। পবিত্র’র হাতে ভীষণ জ্বালা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওরা সরু গলিঘুঁজি দিয়ে সমান বেগে দৌড়ে চেজ করছে অপরাধীকে। দৌড়োতে দৌড়োতেই পবিত্র চেঁচিয়ে বলল, “লোকেশন কী রাজা?”
“ছাত থেকে ছাতে লাফিয়ে লাফিয়ে সোজা যাচ্ছে।”
অধিরাজ একটা লম্বা লাফ মেরে এক বাড়ির ছাত থেকে অন্য ছাতে অনায়াসে ল্যান্ড করে দৌড়োতে দৌড়োতেই বলল, “গো স্ট্রেট।” “আয় আয় স্কিপি…।”
পবিত্র ছুটন্ত অবস্থাতেই আগ্নেয়াস্ত্রটা ওপরের পলায়নরত খুনির দিকে তাক করল।
কিন্তু এভাবে ওকে শ্যুট করা প্রায় অসম্ভব। একেই রাতের অন্ধকার প্রেক্ষাপটে লোকটাকে ঠিকমতো দেখাই যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে একটা ছায়া স্রেফ এক বাড়ির ছাত থেকে অন্য বাড়ির ছাতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। বাড়িগুলোয় বা আশেপাশের স্ট্রিটলাইটের আলো নিশানা লাগানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তার ওপর তার পেছনেই আরও তিনটে ছায়ামূর্তি ধাবমান। মুহূর্তের মধ্যেই চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে পজিশন। বার্নিং শিখের খুব কাছাকাছি রয়েছে অধিরাজ। সে একেবারে শিকারী চিতার মতো নমনীয় মসৃণ ভঙ্গিতে লোকটাকে চেজ করছে। কখনও শূন্যে ভল্ট খাচ্ছে, কখনও কার্নিশ থেকে কার্নিশে লাফিয়ে পড়ছে, আবার কখনও বা পাইপ বেয়ে বেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে এগোচ্ছে। তার ছায়াদেহ জলের ট্যাঙ্কের ওপর থেকে নিখুঁত অঙ্কে লাফ মারছে অন্য বাড়ির ছাতে। মুহূর্তের ভুলে বুলেটটা তার গায়েও লাগার ঝুঁকি আছে। পবিত্ৰ হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। এভাবে শ্যুট করা যাবে না!
জীবনে এই প্রথম রুফটপ চেজিং করল অর্ণব। এর আগে তার অভিজ্ঞতা ছিল না। সে সবিস্ময়ে দেখছিল, কমলা ওরফে বার্নিং শিখ কী দ্রুত লাফিয়ে লাফিয়ে একটা বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির ছাত ক্রস করে চলে যাচ্ছে। দেখলে কেউ বলবে, যে আগের দিনই সে উরুতে একটা গুলি খেয়েছে! একটুও খোঁড়াচ্ছে না! তবে দৌড়োতে দৌড়োতেই একটু থেমে গেল। যে ছাতে এখন গিয়ে পড়েছে সেখান থেকে অন্য বাড়িটা একটু দূরে। সে একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল। পরক্ষণেই কোথা থেকে একটা মই জোগাড় করে দুই বাড়ির মাঝখানে রেখে তার ওপর দিয়ে অবিকল মাকড়সার মতো বেয়ে চলে গেল। অধিরাজের দেহটা জিমন্যাস্টিক শিল্পীদের মতো হাওয়াতেই দুটো মারাত্মক ভল্ট খেল। নিখুঁত টাইমিং এ অনায়াসেই ল্যান্ড করল মইটার ওপরে। বার্নিং শিখ তবু চার হাতে পায়ে ভর দিয়ে ঐ দূরত্বটা অতিক্রম করেছিল। অধিরাজ সেসবের তোয়াক্কা না করে একটা লাফ মেরে ক্রস করে গেল মইটাকে। তার পেছন পেছন কৌশানী। সে লাফিয়ে না গেলেও এমনভাবে মইটার ওপর দিয়ে ছুটছে যেন ব্যাপারটা নিতান্তই জলভাত! অর্ণব মনে মনে তার প্রশংসা না করে পারল না! পার্কোর জিনিসটা অত সহজ নয়। মেয়েটা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আচ্ছা আচ্ছা পুরুষ অফিসারদেরও চোখ কপালে উঠবে।
বার্নিং শিখ সোজা যেতে যেতেই আচমকা এবার বাঁদিকের একটা গাছে লাফিয়ে পড়েছে। অধিরাজের নির্দেশ ব্লু-টুথ ইয়ারসেটের মাধ্যমে পৌঁছে গেল সবার কাছে, ‘টেক লেফট টার্ন।”
“কপি দ্যাট।”
অর্ণবের বিস্মিত দৃষ্টির সামনেই অধিরাজ গাছের একটা ডালে লাফিয়ে পড়ল। পরক্ষণেই ফের আর একটা ডিগবাজি খেয়ে অন্য একটা বাড়ির জলের ট্যাঙ্কে। পেছন পেছন সমান তালে মিস্ বোসও। ওদের দু-জনকে দেখলে সন্দেহ হয় আদৌ ওদের দেহে একটাও হাড় আছে কিনা! যেভাবে সাবলীল ছন্দে কখনও ভল্ট খাচ্ছে, কখনও জিমন্যাস্টিক এক্সপার্টদের মতো কার্নিশ বেয়ে, কখনও জানলা বেয়ে হাতের ভর দিয়ে উঠছে নামছে, লম্বা লাফ মেরে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে লাফিয়ে পড়ছে, তাতে মনে হয় এখানে ট্র্যাপিজের খেলা চলছে! অর্ণব নিজেও ‘পার্কোর’ জানে। কিন্তু সে স্বীকার করতে বাধ্য হল, এ বিষয়ে অধিরাজ ও কৌশানী মহাগুরু! স্পিডে সে ওদের সঙ্গে পেরে উঠবে না।
বার্নিং শিখ এবার একটা বাড়ির কার্নিশ থেকে অন্য একটা বাড়ির মাথায় লাফিয়ে পড়তেই বিপত্তি ঘটল। অন্ধকারে সে বুঝতে পারেনি যে যে বাড়িটার ছাতে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছে, সেখানে অন্যদের মতো ছাতই নেই। বরং বিদেশি স্টাইলে পুরোটাই শৌখিন টালি দিয়ে কভার করা। এবং বেশ ঢালু। ল্যান্ডিংটা ঠিকঠাকই করেছিল। কিন্তু ফ্যান্সি টাইলস্ তার ওজন আর চাপ নিতে না পেরে ভেঙে গেল। তার সামনের টালিগুলো চাপ খেয়ে আচমকাই সরে গিয়েছে। সে পা পিছলে ওখানেই উলটে পড়ল। ঠিকমতো উঠে দাঁড়ানোর আগেই তার ঠিক পাশেই এসে ল্যান্ড করল অধিরাজ। কোনোরকম রি-অ্যাক্ট করার আগেই কমলারূপী খুনিকে চেপে ধরল সে। হিংস্র গলায় বলল, “আর কত পালাবি! একটু তো নিজেদের ফ্যানদের দর্শন দিয়ে যা!”
কমলা সজোরে হেসে উঠে অধিরাজকে সপাটে এক ঘুষি মেরেছে। অধিরাজ ও ছাড়ার পাত্র নয়৷ সে হিটটাকে ডজ করে লোকটার টুটি চেপে ধরেছে। তার লৌহকঠিন বাহুর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে বার্নিং শিখ। দু-জনের হাতাহাতিতে ফ্যান্সি লাল টালির ছাত ভেঙে চুরে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিপদের কথা, টালিগুলো এবার ধরধর সরসর করে নীচের দিকে পড়তে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে দু-জন মানুষও নীচের দিকে অনেকটাই নেমে যায়! এই বুঝি দু-জনেই জড়াজড়ি করে সপাটে নীচে আছড়ে পড়ল!
অর্ণব চেঁচিয়ে ওঠে, “আচার্য স্যার, ওঁরা দু-জনেই নীচে পড়ে যেতে পারেন। অ্যালার্ট থাকুন।”
“এগজ্যাক্ট লোকেশনটা বলো।” ও প্রান্ত থেকে পবিত্র-র গলা ভেসে আসে, “দুটো মারামারি কোথায় করছে?”
“লাল টালির বাংলোটা দেখুন।”
“গট ইট।”
লাল টালির বাংলোটাকে শনাক্ত করতে একটুও কষ্ট হল না ওদের। তার ওপর ছাত থেকে ধুপধাপ করে টালির সারি মাটিতে আছড়ে পড়ে সশব্দে ভেঙে খানখান হচ্ছে। সেই শব্দে বাড়ির লোকেরাও সচকিত হয়ে ব্যালকনিতে ছুটে এসেছে। তারা সকলেই সবিস্ময়ে ঘাড় উঁচু করে দেখল, বাড়ির ছাতে দুটো লোকের মরণপণ সংগ্রাম চলছে। কিন্তু দু-জনের কেউই ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারছে না, কারণ অস্থির, পিচ্ছিল টালি পিছলে পিছলে যাচ্ছে। পায়ের চাপে মটমট করে ভেঙে যাচ্ছেও বটে। ফলস্বরূপ দু-জনই ব্যালান্স রাখতে না পেরে বারবার পড়ে যাচ্ছে।
পবিত্র সভয়ে দেখল অধিরাজ একটুর জন্য পা ফস্কে নীচে আছড়ে পড়তে পড়তে কোনোরকমে একটা পাইপ আঁকড়ে ধরে নিজেকে বাঁচিয়েছে। তার পাশ দিয়ে নেমে এসেছে আইভি লতার বেশ মোটা ঝাড়। কোনোমতে লতার গোছা চেপে ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। ছ-ফুট চার ইঞ্চির লম্বা দেহটা আপাতত বিপজ্জনকভাবে শূন্যে ঝুলছে। সে চেঁচিয়ে ওঠে, “রাজা!… সামলাও …!”
বার্নিং শিখ এবার মুক্তি পেয়ে ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেও ঐ ক্রমাগতই সরে যাওয়া টালির ওপরে পা রাখতেই পারছে না। ওদিকে নাছোড়বান্দা অধিরাজ হাতের ওপর জোর দিয়ে লতা বেয়ে ফের ওপরে ওঠার অদম্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! আফসোসে ঠোঁট কামড়াল খুনি! হিসাবে বড্ড ভুল হয়ে গেল। কে জানত এই লোকটাও ‘পার্কোর’ এক্সপার্ট। এরকম রুফ টপ চেজিং, তাও রাতের অন্ধকারে মোটেই সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তাও এই মানুষটা এবং তার টিম করে দেখাল। এখন তার ‘জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ’ পরিস্থিতি। ঘাড়ের ওপর অধিরাজ ব্যানার্জি নিঃশ্বাস ফেলছে। যে কোনো মুহূর্তে ফের নিজেকে সামলে নিয়ে চেপে ধরবে। ওদিকে সামনের ছাতে তার টিমমেটরা দাঁড়িয়ে আছে। নীচে লাফিয়ে পড়ারও উপায় নেই। সেখানেও দুই পুলিশ অফিসার আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে।
মরিয়া হয়ে শেষপর্যন্ত নীচেই লাফিয়ে পড়ল বার্নিং শিখ। অধিরাজও ততক্ষণে হাতের জোরে ঝুলতে ঝুলতে পৌঁছে গিয়েছিল ও বাড়ির ব্যালকনিতে। সদস্যদের দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত স্বরে বলল, “স্যরি।”
আর স্যরি। বাসিন্দারা ততক্ষণে প্রায় ফেইন্ট হতে চলেছে। শব্দটা ছুড়ে দিয়েই সে যথারীতি মার্জার প্রজাতির প্রাণীদের মতো নমনীয় ডিগবাজি খেয়ে একতলার কার্নিশে ল্যান্ড করল। পরক্ষণেই আবার ভল্ট। এবার একদম মাটিতে, একেবারে বার্নিং শিখের ঘাড়ের ওপরে। নিষ্ঠুর লোকটা প্রমাদ গুণল। সামনে উদ্যত রিভলবার, পেছনে
অধিরাজের বজ্রমুষ্টি। সে দাঁতে দাঁত পিষল। অর্ণব সভয়ে দেখল ফের তার হাতে ঝিকিয়ে উঠেছে সেই মারাত্মক কৃপাণ। “পবিত্র ড-জ।”
পবিত্র তার আক্রমণকে ডজ করলেও তার গলার একপাশে আলতো করে চুম্বন করল ধারালো ইস্পাতের ফলা। সে কাতরোক্তি করে ওঠে। পরমুহূর্তেই একটা রক্তের রেখা ফুটে উঠেছে গলার ডানদিকে। মিস্ অরোরাও এগিয়ে আসতেই ফের কৃপাণ আক্রমণ শানালো। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী নারী বলে আঘাতটা মারাত্মক হয়নি। স্রেফ তার কবজির ওপরের কিছুটা অংশ চিরে দিয়ে বেরিয়ে গেল অস্ত্রটা।
অবিন্যস্ত সি.আই.ডি. টিম নিজেকে সামলে নিয়ে প্রত্যাঘাত করার আগেই, লোকটা এবার টেনে দৌড় মারল। অধিরাজ দেখল যে রাস্তা দিয়ে ও এখন দৌড়চ্ছে, সেটা কিছুক্ষণের মধ্যেই মেইন রোডে গিয়ে পড়বে। অন্যদিকে অর্ণব আর কৌশানীও নেমে এসেছে নীচে। দু-জনেই হাঁপাচ্ছে। একেই রুফ টপ চেজিং মোটেই সহজ ছিল না। তার ওপর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা সত্ত্বেও লোকটাকে টার্গেটে কিছুতেই পাওয়া গেল না! প্রত্যেকেই ঘামে স্নান করেছে। পবিত্র এবং টুইঙ্কল আহত! হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ফায়ার করতে পারছে না, কারণ এটা লোকালয়। যে গলি দিয়ে ও দৌড়চ্ছে, সেটা আদৌ জনহীন নয়। যথেষ্ট মানুষজনও, চায়ের দোকানের ভিড়ও আছে! তারা একজন বৃদ্ধ মহিলাকে এভাবে পাঁই পাঁই করে দৌড়োতে দেখে অবাক! “শ্যুট করা যাবে না।” পবিত্র হতাশ স্বরে বলল, “চেজই করি।”
“লেটস গো।”
ফের দৌড়োল টিম অধিরাজ। একজন বৃদ্ধার পেছনে পাঁচজনের একটা দলকে দৌড়োতে দেখে আশেপাশের জনগণ বুঝি বিস্মিত হতেও ভুলে গেল! অধিরাজ দৌড়োতে দৌড়োতেই বলল, “নিন। আপনার কচ্ছপ এখন চিতার মতো ঘণ্টায় একশো কিলোমিটার বেগে দৌড়চ্ছে মিস বোস!”
কৌশানী দাঁতে দাঁত চেপে স্প্রিন্ট টানতে শুরু করল। তার মুখভঙ্গিতেই স্পষ্ট যে মাথায় খুন চেপে গিয়েছে। পবিত্র শুনতে পেল অধিরাজের স্বর, “লোকটা মেইন রোডের দিকে দৌড়চ্ছে কেন তা বুঝেছ?”
“ভিড়ে মিশে যাবে বলে?” সে হাঁফাচ্ছে, “দাঁড়াও, তার আগেই পাকড়াও করছি শালাকে।”
“না। তুমি না।” অধিরাজের স্পষ্ট নির্দেশ ভেসে আসে, “লেডি অফিসাররা লিড করুন। আমার ধারণা ওর প্ল্যানটা কিঞ্চিৎ অন্যরকম। ও যেহেতু মেয়েদের ছদ্মবেশে আছে, তাই পুরুষেরা ওর পেছনে দৌড়লে ও ‘গুণ্ডা গুণ্ডা’ বা ঐ জাতীয় কিছু বলে রাস্তার ভিড়কে খেপিয়ে দেবে। আমরা যে সি.আই.ডি. হোমিসাইডের লোক, সেসব খুলে বলার আগেই লোকে আমাদের ধরে পেটাতে শুরু করবে। মেয়েদের ওপর যে রেটে ক্রাইম হচ্ছে তাতে পাবলিক খেপে আছে। যতক্ষণে তুমি এক্সপ্লেইন করবে ততক্ষণে ভিড় তোমায় ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ দিয়ে দেবে। ও সেই ফাঁকেই পালাবে। যদি আমি ভুল না করি, তবে এটাই ওর প্ল্যান।”
“তবে?” অর্ণব বিচলিত, “লোকটাকে যেতে দেব?”
“না।” অধিরাজ দৌড়োতে দৌড়োতেই বলল, “ও যেটা এক্সপেক্ট করছে আমরা সেটা করব না। এখানে আমাদের লেডি অফিসাররাই কিছু করতে পারেন।” সে একটু থেমে দম নিয়ে বলে, “মিস্ বোস আর মিস্ অরোরা, আপনারা লিডে যান। একটা পয়েন্টে এসে ও নির্ঘাত চেঁচিয়ে বলবে, ‘গুণ্ডা… গুণ্ডা’ বা ‘বাঁচাও… বাঁচাও’। ঠিক তখনই আপনারা দু-জনেই পালটা ‘চোর চোর’ বলে চেঁচামেচি জুড়ে দেবেন। পাবলিক দেখবে সামনে এক শাড়ি পরা বৃদ্ধা দৌড়চ্ছে, তার পেছনে দুই সুন্দরী মহিলা! বুড়ির কথা বিশ্বাস করবে না সুন্দরীদের, তা নিয়েই ওরা নিজেরাই কনফিউজ হয়ে যাবে। তবে সুন্দরী যুবতীদের ক্ষেত্রে সবসময়ই পাল্লা ভারি। সেই সুযোগটা আমরা নেব। আপনাদের কাজ হচ্ছে জনগণকে পালটা ওর বিরুদ্ধেই দাঁড় করিয়ে দেওয়া। ক্লিয়ার?” ঐ পরিস্থিতিতেও অধিরাজের বুদ্ধির তারিফ না করে পারল না অর্ণব। বার্নিং শিখের পরিকল্পনাকে আঁচ করে খুব সহজেই যেভাবে বুমেরাং বানিয়ে দিল তাতে প্ৰশংসা না করে থাকা যায় না! এইজন্যই লোকটা ‘সুপারকপ …।
“ওকে গার্লস।” সে চেঁচিয়ে ওঠে, “ফাস্টার… ফাস্টার… চেজ হিম।”
টুইঙ্কল অরোরা স্পিড বাড়াল। পুরো শিকারী বাঘিনীর মতো ক্ষিপ্রবেগে, ছন্দে দৌড়ে যাচ্ছে সে। পাশাপাশি কৌশানীও বুঝি হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছে। দুই লেডি অফিসার একেবারে উল্কার বেগে ‘রে রে’ করে তেড়ে যাচ্ছে কমলাকে লক্ষ্য করে। পেছন থেকে অধিরাজ চেঁচিয়ে ওদের উৎসাহিত করল, “বাঘ!…বাঘ…। কাম অন টাইগ্রেসেস। গো…গেট হি-ম!”
কমলা অর্থাৎ বার্নিং শিখ পেছনের দিকে না তাকিয়েই উর্ধশ্বাসে দৌড়চ্ছিল। সে আশা করেছিল পুরুষ অফিসাররাই নিঃসন্দেহে তাকে চেজ করছে। সুতরাং যেটা অধিরাজ আন্দাজ করেছিল, ঠিক সেটাই করল সে। যে মুহূর্তে মেইন রোডের শোরগোলময় রাস্তায় পড়ল, ঠিক তখনই চেঁচিয়ে উঠল, “বাঁ-চা-ও…বাঁ-চা-ও! ওরা আমায় মারবে! বাঁ-চা-ও!”
উপস্থিত মানুষজন কৌতূহলী হয়ে পেছনের দিকে তাকায়। এই শাড়ি-পরা নারীমূর্তিটির পেছনে কোনো মুষকো গুণ্ডা বা খুনি, ধেয়ে আসছে? কিন্তু এখানেই গল্পে ট্যুইস্ট। তারা সবিস্ময়ে দেখল, গুণ্ডার বদলে নার্সের সাদা পোষাক পরা এক অতীব সুন্দরী নারী ও প্যান্ট-শার্ট পরা এক টমবয় গোছের যুবতী মেয়ে ঐ বুড়ির পেছনে দৌড়চ্ছে। কিছু বোঝার আগেই তারা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে, “চো-র। চো-র! ধরুন!”
একদমই অপ্রত্যাশিত নারীকণ্ঠের এই কলরব শুনে বার্নিং শিখ একঝলক ফিরে পেছনের দৃশ্যটা দেখল। দেখামাত্রই বুঝি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য সে থতোমতো খেয়ে গেল! এ তো পুরো উলটো বুঝলি রাম! নিজের অস্ত্রে নিজেই ঘায়েল। পুরুষ অফিসাররা ধারে কাছেও নেই, বরং এই মুহূর্তে লেডি অফিসাররাই তাকে চেজ করছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল তার নিজের চালটাই উলটে গিয়েছে। আফসোসে নিজের গালেই থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করল তার। চেঁচানোর আগে দেখা উচিত ছিল পেছনে আসলে কে বা কারা চেজ করছে! সুন্দরী ও যুবতীরা স্বাভাবিকভাবেই পাবলিক অ্যাটেনশন বেশি পাবে।
“ঐ নড়বড়ে বুড়ি চোর! বলেন কী!”
দুটি মেয়েকে ওভাবে পড়িমরি করে দৌড়োতে দেখে কিছু অল্পবয়েসী দরদী জনগণ তাদের পিছু নিয়েছে। একজন সকৌতূহলে জিজ্ঞাসা করতেই টুইঙ্কল তার ‘ইনোসেন্ট’ ভাবটা কাজে লাগায়। চোখ কুম্ভীরাশ্রুতে ভরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “আমার ব্রেসলেট ছিনিয়ে নিয়েছে। ছুরিও মেরেছে! এই দেখুন…!”
তার হাত কৃপাণে কেটে গিয়েছিল। সে হাত তুলে রক্তাক্ত জায়গাটা দেখায়। উলটো দিক দিয়ে কৌশানী বোসও হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “কোনো বয়স্ক মহিলাকে এত জোরে দৌড়োতে দেখেছেন কখনও? কোন অ্যাঙ্গেলে ওকে আপনাদের নড়বড়ে বুড়ি বলে মনে হচ্ছে। হি ইজ আ থিফ ইন ডিসগাইজ!”
মেয়েদের যুক্তি, রক্তাক্ত ক্ষত ও সর্বোপরি আবেদন সম্পূর্ণ কাজে লাগল। বার্নিং শিখ আতঙ্কিত হয়ে দেখল যে এখন আর হাতে গোণা কয়েকজন নয়, একেবারে একটা হিংস্র ভিড় তার পেছনে ‘চোর চোর’ করতে করতে দৌড়ে আসছে। মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল উনিশশো চুরাশির সেই ভয়াবহ ‘মব’কে! কিছুক্ষণের জন্য সে বোধবুদ্ধিহীন হয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক কাজ করছে না। তার মনে এমন আতঙ্ক জন্ম নিয়েছে যে হাত পায়ের পেশী শিথিল হয়ে আসছে। … সেই ভিড় সেই নির্বোধ ভিড়কে ফের তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে ওরা…! এর হাত থেকে নিস্তার নেই…! তার কল্পনায় ভেসে উঠল রড, তরোয়াল নিয়ে ছুটে আসা আততায়ীদের ভিড়টা…….ছুটে আসছে…নেকড়ের দল ছুটে আসছে…… রক্ষা নেই….।
যখন এদিকে এতকিছু ঘটছে, ততক্ষণে পুরুষ অফিসাররাও এসে পড়েছে মেইন রোডে। টুইঙ্কল ও মিস্ বোসের অ্যাক্টিং দেখে অধিরাজ হেসে ফেলল, “ওঁরা দু-জনেই অস্কার ডিজার্ভ করেন দেখছি!”
অবস্থা দেখে পবিত্র চোখ কপালে তুলে ফেলেছে, “এভাবে ওকে ধরব কী করে? মব তো ওকে কেলিয়ে ‘কেলাস’ বানিয়ে দেবে। মালটাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
“অত সহজ নয় পবিত্র।” অধিরাজ দাঁড়িয়ে পড়ে কোমরে হাত দিয়ে শ্বাস টানতে টানতে বলল, “এবার ও আরও মারাত্মক, আরও ফেরোশাস হয়ে উঠতে পারে। ভিড়টাকে দেখে ওর যদি দিল্লির সেই ভয়াবহ ক্রাউডটাকে মনে পড়ে, আমি আশ্চর্য হব না। অত সহজে ধরা পড়বে না।”
“তবে?”
“লেডি অফিসাররা মাস্টারস্ট্রোক খেলে দিয়েছে।” সে এবার উলটোদিকের ফুটপাথের দিকে দৌড়য়, “এবার আমাদের পালা। এসো অর্ণব।”
“কিন্তু উলটো দিকে কেন?”
পবিত্র’র কথার উত্তর না দিয়ে অধিরাজ লেডি অফিসারদের নির্দেশ দেয়, “আপনারা ওকে তাড়িয়ে নিয়ে মোড়ের মাথায় পেট্রোল পাম্পের উলটোদিকের সিগন্যালের কাছে নিয়ে আসুন। আমরা ওদিকেই যাচ্ছি।” “ওকে স্যার।”
ও-প্রান্ত থেকে কৌশানী বোসের কণ্ঠ ভেসে এল। আর কথা না বাড়িয়ে ওরা তিনজনেই ছুটতে শুরু করেছে। যতক্ষণে বার্নিং শিখকে মেয়েরা তাড়া করে মোড়ের মাথায় নিয়ে আসবে, তার মধ্যেই ওদের ওখানে পৌঁছে যেতে হবে। অধিরাজ উলটো দিকের ফুটপাথ পেরিয়ে একটা সরু গলি ধরল। সে জানে এটা শর্টকাট। এই গলিটা একদম গিয়ে পড়বে ঐ মোড়েই। বার্নিং শিখ এখন ভিড়ের তাড়া খেয়ে দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে সোজা ওদিকেই দৌড়বে। তার বিশেষ এদিক ওদিক যাওয়ার সুযোগ নেই। এখন তার সামনে অন্য কোনো এস্কেপ রুটও নেই। তাই অতখানি যেতে সে বাধ্য। তবে তারপর মোড় থেকে টার্নিং পয়েন্ট আছে। তার আগেই সেখানে পৌঁছে যেতে হবে ওদের তিনজনকে।
দৌড়োতে দৌড়োতেই অর্ণব শক্ত করে চেপে ধরেছে আগ্নেয়াস্ত্রটাকে। তার কপাল বেয়ে টপটপ করে শীতল ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। জামাটা ঘামে জবজব করছে!
এখনও পর্যন্ত হাতে রিভলবার থাকা সত্ত্বেও একবারও শ্যুট করার সুযোগ পায়নি কেউই। লোকটা এমন ধূর্ত যে গুলি করার চান্সই দেয়নি। অর্ণব জানে যে নিঃসন্দেহে আগের দিনের মতোই ওর গায়ে একটা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আছে। সঙ্গে যদি বুলেটপ্রুফ প্যান্টও পরে থাকে, তাহলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু আজ ওর মাথায় পাগড়িটা অনুপস্থিত। সে মনে মনে ঠিক করে নিল, আজ শয়তানটার মাথাতেই ছ’টা গুলি ভরে দেবে। গল্পই শেষ! আর ওকে বাড়তে দেওয়া যাবে না!
“মিস্ বোস… মিস্ অরোরা, কারেন্ট স্টেটাস প্লিজ।”
অধিরাজের প্রশ্নের উত্তরে কৌশানীর গলার স্বর ভেসে এল, “ডেস্টিনেশন থেকে আন্দাজ পাঁচশো মিটার দূরে আছি।”
“ফাইভ হান্ড্রেড মিটারস। ও ব্যাটার স্পিড থাকলেও রেকর্ডধারী স্প্রিন্টার নয়। তার মানে দুশো মিটার দৌড়োতে কমসে কম পঁচিশ থেকে ত্রিশ সেকেন্ড লাগবে।” অধিরাজ মাথা ঝাঁকাল, “ওকে, গট্ ইট! আমরা মিনিট খানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব। তবে সাবধানে থাকবেন দু-জনেই। ভিড় দেখে ও কিন্তু মারাত্মক স্টেপ নিতে পারে।”
“অসম্ভব নয়।” কৌশানী জানায়, “লোকটা ভীষণ ভয় পেয়েছে।”
‘সেটাই সবচেয়ে ভয়ের বিষয়।”
বলতে বলতেই অধিরাজ স্পিড বাড়িয়েছে। অর্ণব আর পবিত্রও সমানতালে দৌড়চ্ছে। প্রচণ্ড বেগে স্প্রিন্ট টানছে ওরা তিনজনেই। গলিটা একেবারেই প্রশস্ত নয়। আশেপাশের ঘনসন্নিবদ্ধ বাড়িগুলোর জানলা বন্ধ থাকায় দরুণ অন্ধকারও বটে। মেইন রোড পিচের হলেও এই সঙ্কীর্ণ গলির রাস্তা প্রচণ্ড এবড়ো খেবড়ো। মাঝেমধ্যেই গর্তে পা পড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগছে। ইটের গুঁতো খাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই পা মচকে যাওয়ার উপক্রম। গোটা পরিবেশটাই প্রতিকূল! তবু তিন অফিসার থামল না। প্রায় চিতার মতোই দৌড়ে চলেছে ওরা! সাধারণ কোনো মানুষ এই গলি দিয়ে দৌড়লে হয়তো হাত পা-ই ভাঙবে। কিন্তু চেজিঙে এক্সপার্ট টিম-অধিরাজ তার মধ্য দিয়েই ছুটে চলল গন্তব্যের দিকে।
কিছুটা এগোতেই অন্ধকার গলির শেষপ্রান্তে আলোর রেখা দেখা গেল। কানে এল মানুষের উত্তেজিত কলরব, ‘চো, র! চো, র!’উত্তেজনায় অর্ণবের প্রতিটা স্নায়ু, প্রতিটা পেশী টানটান হয়ে গেল। এইবার চরম মুহূর্ত। ফের শত্রুর মুখোমুখি!
“স্যার, রিচড ডেস্টিনেশন।” ইয়ারসেটে মিস্ বোসের কণ্ঠস্বর কড়কড় করে উঠল, “হি ইজ টেকিং দ্য রাইট টার্ন।”
“আমরা ওখানেই আছি মিস্ বোস!”
ওরা ততক্ষণে গলি থেকে বেরিয়ে ফের মেইন রোডে পড়েছে। শাড়িপরা বার্নিং শিখ ততক্ষণে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে নিজেকে বাঁচাতে। পেছনে একগাদা লোকের ভিড়। থেকে থেকে মুড়ি-মুড়কির মতো এসে পড়ছে ইট-পাথরের টুকরো। সে আশঙ্কায়, আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়েছে। আর যেন দৌড়োতে পারছে না। দৌড়নোর ভঙ্গিটা ভীষণ ক্লান্ত। সজোরে শ্বাস নেওয়া, বুকের প্রবল ওঠানামা দেখলেই বোঝা যায় যে ওর দম প্রায় শেষ। আর বেশিক্ষণ পারবে না।
তার মনোযোগ পেছনের ভিড়ের দিকেই ছিল। সামনের দিকে তাকায়নি। এবার বিশেষ কিছু লক্ষ্য করার আগেই একটা মানুষের সঙ্গে সজোের ধাক্কা খেয়ে রাস্তার ওপরেই ছিটকে পড়ল সে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল সামনে অধিরাজ, অর্ণব ও পবিত্র তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনের হাতেই উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র ছোবল তুলেছে। অধিরাজ শান্ত গলায় বলল, “ম্যারাথন শেষ হয়ে গেলে এবার মামাবাড়ি যাওয়া যাক?”
বার্নিং শিখ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে আতঙ্ক, রাগ ও দারুণ প্রতিশোধস্পৃহা একে একে ছায়া ফেলে গেল। পরক্ষণেই সজোরে হেসে ওঠে। তার হাসি দেখে সন্দেহে অধিরাজের ভুরু বেঁকে যায়। এই পরিস্থিতিতেও লোকটার হাসি পাচ্ছে কেন! অন্য কোনো প্ল্যানিং আছে নাকি। তার দৃষ্টি ওদের পেছনদিকে ন্যস্ত কেন?
সে শুধুমাত্র আঁচ করেছিল। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই একটা বিরাট ট্রাক প্রবলগতিতে এগিয়ে এল ডানদিকের রাস্তা দিয়ে। ওটাকে দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল বার্নিং শিখ। এবার বিনাবাক্যব্যয়ে ক্ষিপ্রভঙ্গিতে লাফ মেরে উঠে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর পেছনের সামান্য বাইরে বেরিয়ে থাকা অংশের দিকে। প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল ট্রাকের পেছনটা। দ্রুতগামী ট্রাকের পেছনে অদ্ভুত কায়দায় নিজেকে আটকে নিয়েছে। অর্ণব দেখল, ট্রাকটা তাকে নিয়েই চলে যাচ্ছে দ্রুত! বেরিয়ে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। এত কায়দা করে, এত প্ল্যান করে, রক্ত-ঘাম ঝরিয়েও ধরা যাবে না শয়তানটাকে?…ট্রাকটাকে দুই লেডি অফিসার, অধিরাজ আর পবিত্রও চেজ করছে। কিন্তু লোকটার মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। সে জানে, দৌড়েও আর তার নাগাল পাওয়া যাবে না তাদের। অর্ণবের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই ট্রাকটার পেছনে ধাওয়া করতে করতে তাক করল তার আগ্নেয়াস্ত্র।
“স্যা-র। ডোন্ট শ্যু-ট। ডোন্ট শ্যু-ট!”
অর্ণব শুনতে পেল টুইঙ্কল অরোরার চিৎকার। সে শ্যুট করতে বারণ করছে! তাতে তার রাগ বাড়ল বৈ কমল না। এই মেয়েটা সব ব্যাপারে আগে এসে টপকে পড়বে। কে বলেছে ওকে দিদিগিরি করতে? নাকি এই চেঁচিয়ে ওঠার পেছনে নিজের স্বজাতিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা আছে। বিশ্বাস নেই… কাউকে বিশ্বাস নেই!
যথারীতি টুইঙ্কলের কথা অর্ণব গ্রাহ্যই করেনি। বার্নিং শিখ তার দিকেই তাকিয়ে ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি হেসে হাত নেড়ে ‘টাটা’ করছে। এইটুকুই তাকে উত্তপ্ত করার জন্য যথেষ্ট। সে পাগলের মতো দৌড়োতে দৌড়োতে বার্নিং শিখকে লক্ষ্য করে একটার পর একটা ফায়ার করে চলেছে। কিন্তু সবগুলোই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। অর্ণব দেখল শয়তানটা ঠিকই আছে। ঠং ঠং করে স্রেফ কিছু ধাতব শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই একটা চেনা উগ্র গন্ধ। সে ব্লু টুথ ইয়ারসেটে শুনতে পেল অধিরাজের গলা। তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট আফসোস, “এটা কী করলে অর্ণব! ফায়ার করার আগে দেখবে তো কোথায় ফায়ার করছ। ওটা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের বারো হাজার লিটারের তেলের ট্যাঙ্কার!”
এতক্ষণে যেন হুঁশ ফিরে পেল অর্ণব। এইবার বুঝল, তার সঙ্গীরা কেন একবারও ফায়ারিং করেনি! কেন টুইঙ্কল শ্যুট করতে বারণ করেছিল। বার্নিং শিখ যে গাড়ির পেছনে ঝুলছে ওটা জ্বালানি তেলের ট্যাঙ্কার। চরম উত্তেজনায় সে হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের লোগোটাও লক্ষ্য করেনি। বোকার মতো একের পর এক ফায়ার করে গিয়েছে। এই জন্যই লোকটা ওকে তাতাচ্ছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সে জানত যে অর্ণব পরপর ফায়ার করতে থাকে! এটা হিন্দি ফিল্ম হলে গোটা ট্যাঙ্কারটাই ব্লাস্ট হত। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ বুলেটের আঘাতে অমন সাঙ্ঘাতিক কিছু হয় না। তবু যা হয়েছে তাও কম বিপজ্জনক নয়। র্যান্ডম ফায়ারিঙের দরুণ তেলের ট্যাঙ্কার ফুটো হয়ে গিয়েছে। জ্বালানি তেল লিক করছে। তার গন্ধটা নাকে এসে ঝাপ্টা মারল অর্ণবের। সে সভয়ে দেখল, বার্নিং শিখ শাড়ির ভাঁজ থেকে একটা লাইটার বের করছে। ট্যাঙ্কারের যে অংশ থেকে তেল লিক করছিল, ঠিক সেখানেই একটু শাড়ির অংশ ছিঁড়ে নিয়ে লাইটারটা জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল লোকটা। জ্বালানি তেল প্রায় নিমেষের মধ্যেই ধরে নিয়েছে আগুন। গাড়ির পেছনে এক লহমায় ধকধকিয়ে জ্বলে উঠল অগ্নিশিখা…! ঐ পরিস্থিতিতেই বার্নিং শিখ মুচকি হেসে শিস দিয়ে ওঠে, “গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই… কিসকো খবর, কৌন হ্যায় উয়োহ, অনজান হ্যায় কোই…!”
“শি-ট! শি-ট! পিছিয়ে যান…. পিছিয়ে যান সবাই!” পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল অধিরাজ, “আর আড়াইশো মিটারের মধ্যেই পেট্রোল পাম্প। গাড়িটা যদি পেট্রোল পাম্পে পৌঁছয় তবে পুরো এলাকাটাই উড়ে যাবে। অফিসারস, গাড়ির চাকায় শ্যুট করতে শুরু করুন। গাড়িটাকে আমাদের এখানেই আটকে রাখতে হবে… যেভাবেই হোক।… ফা-য়া-র!”
নির্দেশ শোনামাত্রই সব অফিসাররা গাড়িটার চাকাগুলোকে তাক করে ‘তাবড়তোড়’ ফায়ারিং শুরু করেছে। উপস্থিত জনতার ভিড় আগুন দেখেই পেছন দিকে সবেগে দৌড়েছে। কারোরই বুঝতে বাকি নেই যে এখানে খুব শীঘ্রই একটা বিস্ফোরণ হতে চলেছে। তাই যে যেদিকে পারল দৌড়োল। শুধু সি.আই.ডি. অফিসাররা সবাই ট্রাকের চাকাগুলোকে ঝাঁঝরা করে দিতে ব্যস্ত। ফায়ারিঙের আওয়াজে, বারুদ আর তেলের গন্ধে মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশটাই যেন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সবাই মিলে আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারটাকে এখানেই আটকে রাখার! চাকা জখম হয়ে যাওয়ায় গাড়িটা স্লো হল ঠিকই, কিন্তু এখনও সোজা এগিয়ে যাচ্ছে পেট্রোল পাম্পের দিকেই। চরম আফসোসে, নিজের ওপর রাগে চোখ বুজে ফেলল অর্ণব। মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকছে সে। ঐ জ্বলন্ত গাড়ি এই মুহূর্তে আর মাত্র একশো কী দেড়শো মিটার দূরে… উলটোদিকের সিগন্যালে একরাশ গাড়ি আটকে আছে….! সামনে কালান্তক পেট্রোল পাম্প!…
বার্নিং শিখ এই হুড়োহুড়ি ও জনতার ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার সুযোগটা নিয়ে টুক করে কখন যে ভিড়ে মিশে গেল তার দিকে কারোর খেয়ালই নেই। চাকাগুলো ফেঁসে যাওয়ার ফলে ট্রাকটা একটু স্কিড করল। ট্রাকের ড্রাইভার এবার জানলা দিয়ে মুণ্ডু বের করে জানতে চাইল, “আরে খোত্তে দা পুত্তর! ক্যায়া কর রাহা হ্যায় …!”
ট্রাকটা যে মুহূর্তে স্লো হয়েছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই অধিরাজ ঐ জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারের পেছন পেছন পাগলের মতো দুরন্ত গতিতে দৌড়চ্ছিল। তার দৌড় দেখলে বুঝি মিলখা সিং-ও লজ্জা পাবেন। সর্বশক্তি দিয়ে স্প্রিন্ট টানছিল ও। যেই মুহূর্তে ড্রাইভার মুণ্ডুটা জানলা দিয়ে বের করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সে লাফিয়ে চলন্ত গাড়ির জানলা ধরে ঝুলে পড়ল। ড্রাইভারটি হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই এক ধাক্কায় জানলা সপাটে খুলে দিয়ে লোকটার কুর্তা ধরে টেনে বাইরে বের করে এনেছে তাকে। বেচারি শিখ ড্রাইভারটিকে একরকম বাইরে ছুড়ে ফেলেই বলল, “পা’-জি, এতক্ষণে তোমার টনক নড়ল! যদি চিকেন তন্দুর না হতে চাও তবে চুপচাপ ওখানেই থাকো।”
ড্রাইভারটির কোমরে বেজায় লাগলেও সে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল অধিরাজ জানলা দিয়েই ঐ জ্বলন্ত ট্রাকের ভেতরে আধখানা শরীর গলিয়ে দিয়েছে। স্টিয়ারিং হুইলটাকে ধরে একদিকে টেনে রেখেছে সে। ঐ বিশালদেহী ট্যাঙ্কার এবার বাঁদিকে গোঁত্তা খেল। ঐদিকটায় বিশেষ দোকানপাট নেই। বরং বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা এখনও পড়ে আছে। এবং একদম সামনেই বিরাট একটা জলাশয়। অর্ণব অধিরাজের প্ল্যানিংটা পরিষ্কার বুঝতে পারল। সে ট্যাঙ্কারটাকে তেলসুদ্ধই ঐ জলাশয়ে ফেলতে
চায়। সেইজন্যই অমন পাগলের মতো স্টিয়ারিং এক্সট্রিম রাইটে ঘুরিয়ে দিয়েছে। জ্বলন্ত ট্যাঙ্কার এবার জখম ঢাকা ও স্টিয়ারিঙের নির্দেশে পুরোপুরি বাঁদিকে ঘুরে গিয়েছে। দাউদাউ করে জ্বলছে ঠিকই, তবে বিস্ফোরণের মতো অবস্থায় এখনও আসেনি। ফুটপাথকে একরকম পিষে দিয়েই তার দৈত্যাকৃতি দেহ বড়োসড় ঝিলটার দিকেই ঘুরল। গাড়িটা যদি সোজা এগিয়ে যেত তবে আর পঞ্চাশ মিটার দূরত্বেই পেট্রোল পাম্প ছিল। কিন্তু অধিরাজের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় তার মুখ ঘুরে গেল সম্পূর্ণ উলটো দিকে। অর্ণব শুনতে পেল পবিত্র বিড়বিড় করছে, “গড হেল্প হিম!”
ঐ মুহূর্তে বাকিরাও বুঝি একই প্রার্থনা করছিল। ঈশ্বরও সেই সমবেত ঐকান্তিক প্রার্থনাকে অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। ট্যাঙ্কারটা অধিরাজের নির্ভুল হিসাবমতোই সোজা হুড়মুড়িয়ে বিরাট জলাশয়ে পড়েছে। ‘ঝপাস’ করে ঐ ভীমদেহী ট্রাকের জলে পড়ার সজোের আওয়াজ! ঝিলের জল যেন প্রবল উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠে চতুর্দিক ভিজিয়ে দিয়েছে। অধিরাজ তার আগের মুহূর্তেই লাফ মেরে সরে যেতে পেরেছিল। সে ছিটকে পড়েছে ঠিক জলাধারের পাশেই। কোনোমতে তাকিয়ে দেখল, আস্তে আস্তে জলে ডুবে যাচ্ছে তেলের জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারটা। বারোহাজার লিটার তেল আগুন সমেত জলেই গেল! আর এক মিনিটও যদি দেরি হত, সামান্য সময়ের হেরফেরও হত, তবে এখানে হয়তো লাশের স্তূপ পড়ে থাকত। গাড়িটা যদি রাস্তাতেই উলটে যেত তবে রাস্তার ওপরেই জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ত, আগুনও সেই তেলের সাহায্যে কতদূর ছড়িয়ে যেত তার ঠিক নেই। মেইন রোডের একদিক দিয়ে গাড়িও চলাচল করছিল, কিছু গাড়ি সিগন্যালে আটকেছিল, আর ডানদিকে সেই পেট্রোল পাম্প! বারোহাজার লিটার জ্বলন্ত তেল লাভার মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকাটাকেই পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারত! এক চুল!… স্রেফ এক চুলের জন্য বেঁচে গিয়েছে ওরা সবাই। ট্রাকটা যদি ঠিক সময়ে জলে না পড়ত তবে যে কী হত তা ঈশ্বরই জানেন৷
অধিরাজ তখনও ক্লান্ত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে মাটিতে। এতক্ষণের উত্তেজনা, পরিশ্রম, প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা, নির্ঘুম রাতের ধকলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন চোখে অন্ধকার দেখল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সে প্রায় বেহুঁশের মতো টানটান হয়ে শুয়েছিল। অর্ণব প্রায় তার ওপর হুমড়ি খেয়ে অনুতপ্ত স্বরে ডাকল, “স্যার স্যার।”
“আমি ঠিক আছি।” অধিরাজের মুখ ক্লান্তিতে, হতাশায় ম্লান। সারামুখে স্বেদবিন্দু গর্জন তেলের মতো চকচক করছে। সে তার দিকে তাকায়, “কিন্তু তোমার কী হয়েছে অর্ণব? তুমি তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর র্যান্ডম ফায়ারিং করে বসলে।”
পবিত্র, মিস্ বোস ও টুইঙ্কলও ততক্ষণে চলে এসেছে ওখানে। পবিত্র প্রায় কড়া ধমক দিয়ে বলে, “একটা লোককে মারতে গিয়ে গোটা এলাকার মানুষদেরই উড়িয়ে দিচ্ছিলে তুমি। মাথা টাথা খারাপ হয়েছে নাকি? মিস্ অরোরা চিৎকার করে বারণ করছিলেন, শোনোনি? না মাথার সঙ্গে কানটাও গেছে।”
পবিত্রকে কোনোদিন এত রাগতে দেখেনি অর্ণব। সে তাপে মাথা হেঁট করল। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে তার চোখে বাষ্প জমছে! নির্বুদ্ধিতা, অবিশ্বাস আর ইগোর ধাক্কায় আজ সে তার প্রিয়তম মানুষটাকেও চরম বিপদে ফেলেছিল। কোনোমতে বুজে আসা কণ্ঠে বলল, “স্যরি স্যার!”
অধিরাজ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অর্ণবের মুখের দিকে। তার মনে একটা অদ্ভুত দুশ্চিন্তা আঁচড় কাটছে। অর্ণব তো কখনও এমন করে না! তবে কি ও টুইঙ্কল অরোরাকে সন্দেহ করছে? নাকি আশেপাশের কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না? যদি তাই হয়ে থাকে তবে বার্নিং শিখ তার মেন্টাল গেমে ওকে ফাঁসাতে সফল হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অবিশ্বাসের ব্যূহ থেকে অর্ণবকে বের করতেই হবে। এর জন্য ধমক নয়, অন্য ট্রিটমেন্ট দরকার।
“হোয়াট স্যরি?… তোমার জন্য আজ লোকটা হাত থেকে বেরিয়ে গেল…!”
পবিত্র আরও জোরে ধমক দিতে যাচ্ছিল। তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়েছে অধিরাজ। আস্তে আস্তে বলল, “যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। কারোর কোনো ক্ষতি তো হয়নি। ফরগেট ইট! আর রইল মরা আর মারার গল্প। সে তো চলতেই থাকবে যতক্ষণ না কোনো একপক্ষ শেষ হচ্ছে। ডোন্ট ওরি, ও পাবলিক ফের ফিরে আসবে তখন ফের ধরার চেষ্টা করব।”
অর্ণবের ভীষণ কান্না পেয়ে গেল! এত বড়ো ভুলের পরও স্যার তাকে প্রোটেক্ট করছেন! এর চেয়ে দুটো চড় মারলেও বুঝি শান্তি পেত। কোনোরকমে আবার অবনত মুখে বলল, “আই অ্যাম স্যরি…।”
“ইটস ওকে অর্ণব।” অধিরাজ সস্নেহে তার কাঁধে হাত রাখে, “ইটস ওকে ডার্লিং। টেক আ চিল পিল।” বলতে বলতেই সে কোনোমতে উঠে বসেছে। বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি কি এখন একটু ফোঁকাফুঁকি বিজনেস করতে পারি?” অর্ণব এত দুঃখেও হেসে ফেলল।
