(২৪)
“মিস্ বোস। এখন কেমন আছেন আপনি?”
গাড়িতে যেতে যেতেই কৌশানী বোসের খবর নিল অধিরাজ। আহেলির ওপরে যতই খ্যাঁকখ্যাক করুক, তার কথা আপাতত মেনেই চলছে সে। কোনোরকম খাবার, এমনকি জলটুকুও খায়নি। সে কাউকে কিছু বলছে না, মুখেও প্রকাশ করছে না। কিন্তু সত্যিই শরীরটা অসম্ভব খারাপ লাগছে তার। থেকে থেকেই মাথাটা পাক মারছে, বমি বমি ভাব, আরও বেশি ক্লান্তি যেন চেপে ধরেছে। সর্বোপরি মাথাটা এখনও ভার। অর্ণব একবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে হয়তো আরও একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তার। তাছাড়া যে পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে তাতে ব্লাড নিলেও ভালো হত। কথাটা সে ভুল বলেনি। কিন্তু অধিরাজ মাথা নেড়ে বলেছে, “সময় নেই অর্ণব। আমি রেস্ট নিতে গেলে বাকিরা রেস্ট ইন পিস হয়ে যাবে। আমরা এই মুহূর্তে সব চেয়ে মারাত্মক স্টেজে আছি। ও লোকটা নাছোড়বান্দা, আর মরিয়া হয়ে বসে আছে। ও আবার অ্যাটাক করবে। আমি খুব আশ্চর্য হব না যদি ও আজ আবার অন্য কোনো স্ট্র্যাটেজি নেয়। সবকিছুর জন্যই তৈরি থাকা ভালো।”
অর্ণব আর কথা বাড়ায়নি। কিন্তু তার মনের মধ্যে এখনও প্রবল আশঙ্কা। এই মানুষটার ওপর দিয়ে ঝড়-ঝাপটা বড়ো বেশি যাচ্ছে। অধিরাজ ঝুঁকি নিতে ভালোবাসে। তাই বলে সবসময়ই একটা সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে? সবসময়ই প্রাণটা হাতে নিয়ে বসে থাকতে হয়। প্রতি মুহূর্তে ভয়, এই বুঝি পা ফস্কে গেল! আর অর্ণবের চোখের বাইরে থাকলে তো কথাই নেই। সবকিছু হতে পারে! সবকিছু। অধিরাজকে একাধিকবার সে প্রায় হারিয়েই ফেলেছিল। সেই মুহূর্তগুলো মনে করলেই ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যায়। সেই সময়ে বুঝতে পেরেছে, এই মানুষটা তার ঠিক কতখানি অংশ অধিকার করে বসে আছে। টুইঙ্কল ভুল বলেনি। সে বিষ্ণুর শেষনাগই বটে, যার নিরাপত্তায় নিশ্চিন্তে থাকেন তিনি। অথচ যতবার সেই শেষনাগের ছায়া তার মাথার ওপর থেকে সরে যায়, ততবারই কোনো-না কোনো বিপদ এসে উপস্থিত। পবিত্র আচার্য যথেষ্ট দায়িত্বশীল অফিসার। তার সিনিয়রও বটে। তবু মনে মনে কিছুতেই তাকে ক্ষমা করতে পারছে না অর্ণব। আর নিজেই নিজেকে দোষারোপ করে চলেছে। অতবড়ো ব্লান্ডারটা না করলে হয়তো অধিরাজ তাকে মিস্ দত্ত-র কাছে পাঠিয়ে দিত না। রাতের অভিযানে সঙ্গেই রাখত। যখন সে আরাম করে মিস্ দত্ত-র হাতের কুকিজ আর চায়ের স্বাদ আয়েশ করে নিচ্ছিল, তখন এই লোকটা বার্নিং শিখের সঙ্গে মরণপণ সংগ্রাম চালাচ্ছিল। এর জন্য তার দায়ও কিছু কম নয়। একটা ভীষণ অপরাধবোধ তাকে ক্রমাগতই গ্রাস করে নিচ্ছে। তার স্যারের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। ওঁকে ছাড়া একদমই ঠিক হয়নি।
আজ পবিত্রই ড্রাইভ করছে। অধিরাজ তার পাশে বসে কৌশানী বোসের খবরাখবর নিতে ব্যস্ত। কৌশানী অনুতপ্ত স্বরে বলছিল, “আই অ্যাম রিয়েলি সরি স্যার! কাল একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছি… আমি জানি না ঠিক কী করেছি…।”
অধিরাজ খুব শান্তস্বরে উত্তর দেয়, “মিস্ বোস, কাল আপনি কী করেছেন তা নিয়ে বিলিভ মি, আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আপনার যখন মনে নেই যে কী করেছেন, তখন আপনি কিছুই করেননি। ফাইন? চ্যাপ্টার ক্লোজড। তবে একটা পরামর্শ অবশ্যই দেব।”
“বলুন।”
“আপনি একজন দক্ষ অফিসার। অনেক রক্ত, ঘাম ঝরিয়ে, প্রচুর পরিশ্রম করে আজ আপনি এখানে এসে পৌঁছেছেন, যেটা অবশ্যই ডিজার্ভ করেন।” সে ঠান্ডা স্বরেই বলল, “এমন কোনো ভুল করে বসবেন না, যাতে সবাই আপনাকে ইনকম্পিটেন্ট ভাবে। ক্লিয়ার?”
“ক্রিস্টাল স্যার।”
“গ্রেট।” সে প্রসঙ্গান্তরে গেল, “ওদিককার অবস্থা কী?”
কৌশানী জানাল যে চৌধুরী পরিবারের সকলেই এই মুহূর্তে স্টে। যদিও তাদের আটচল্লিশ ঘণ্টা কড়া মনিটরিং-এ রাখার জন্য আই.সি.ইউ.-তে রাখা হয়েছে, তবে লাইফ থ্রেট নেই। ডাক্তাররা মাঝেমধ্যেই ভিজিট করছেন এবং সিস্টারদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। সোমলতা তাঁর স্বভাবমতোই বেশ বিরক্ত। কথায় কথায় খ্যাচখ্যাঁচ করছেন ও ডাক্তার-সিস্টারদের জ্বালিয়ে মারছেন। মেঘনা চুপচাপই আছে। তবে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে পরিমল। সে অদ্ভুতরকমের গুম্ মেরে বসে আছে। কারোর সঙ্গেই কোনো কথা বলছে না। পি সি চৌধুরী ভিজিটিং আওয়ারে একবার কিছুক্ষণের জন্য ঢুকেছিলেন। স্ত্রী, পুত্রবধূর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। প্রাণপ্রিয় ছেলের সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করেননি। পরিমল হয়তো কিছু বলতে চাইছিল, অথচ তিনি একদমই অগ্রাহ্য করে চলে গিয়েছেন। দেখলে মনে হয় ছেলে ও বাবার মধ্যে কোনো মান-অভিমান পর্ব চলছে।
“ফ্যামিলি ইস্যু। ছেড়ে দিন।” সে জানতে চায়, “আপনি কোথায় আছেন?”
“আমি একদম ওঁদের পাশের বেডেই স্যার।” কৌশানী এবার একটু অধৈর্য, “কিন্তু ডাক্তাররা আমাকে এখানে কেন রেখেছেন? আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি। ডিউটিতে জয়েন করতে চাই…!”
“আপনি অলরেডি অন্ ডিউটি মিস্ বোস।” সে তাকে শান্ত করল, “আপনি ওখানেও নিজের ডিউটিই করছেন। স্রেফ একটু অন্যভাবে।”
“মানে?”
“বার্নিং শিখ এত সহজে হাল ছাড়বে না সেনোরিটা। সে ওদের মারার জন্য ফের চেষ্টা করবে। এবং হসপিটালের ভেতরে ঢুকেই অ্যাটেম্পট্ করবে।” অধিরাজ বুঝিয়ে দেয়, “আমরা বাইরে কোনো সিকিউরিটি রাখিনি। রেখে লাভও হত না। কারণ বার্নিং শিখও এটাই এক্সপেক্ট করছে। সে মূর্খ নয়। জানে যে বাইরে গার্ড থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তাই আদৌ নিজের পেটেন্ট হ্যালোউইন বেশে আসবে না। যতই সিকিউরিটি মোতায়েন থাকুক, তারা হসপিটালের সব স্টাফকে চেনে না, তাই স্টাফের ছদ্মবেশে থাকলে বাধাও দেবে না। হসপিটালের মধ্যে নিতান্তই গবেট না হলে কেউ কোনোরকম অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে যাবে না, মেটাল ডিটেক্টরে আটকাবে। তাই ছুরি, বন্দুকের প্রশ্নই ওঠে না। অ্যাসিড বা বম্ব ওর কাছে নেই। সবচেয়ে ভালো রাস্তা হল লেথাল ইঞ্জেকশন বা ফাঁকা সিরিঞ্জে হাওয়া ভরে টুক করে দিয়ে দেওয়া। আমি যদি ভুল না করি, তবে সে সেটাই করবে।”
“কিন্তু আমিই-বা এতজন ডাক্তার বা সিস্টারের মধ্যে ওকে আইডেন্টিফাই করব কী করে?” কৌশানী একটু বিপন্ন, “এখানে তো বিভিন্ন শিফটে বিভিন্ন ডাক্তার, সিস্টার, ওয়ার্ডবয় আসছে! তারা কেউ-না কেউ ইঞ্জেকশনও দেবেই। চিনব কী করে?”
“আপনাকে চিনতে হবে না।” সে মৃদু হাসল, “ও নিজেই আপনাকে চিনে নেবে। সেখান থেকেই আপনিও চিনবেন। সেটা পরে এক্সপ্লেইন করছি। তার আগে একটা কথা বলি, সচরাচর আই.সি.ইউ.-তে যে ডাক্তাররা ঢোকেন তাঁরা সিনিয়র ও স্পেশালিস্ট। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের স্টাফরা সবাই চেনে। ওঁরা নিজেরা কোনো মেডিসিন বা ইঞ্জেকশন দেন না। ওটা সিস্টার বা ওয়ার্ডবয়দের কাজ। বার্নিং শিখ আর যা-ই হোক, ডাক্তার সাজার ভুলটা করবে না। তবু লক্ষ্য রাখবেন কোনো ডাক্তার হাতে সিরিঞ্জ নিয়ে আসছেন কিনা। যদি আসে তবে চেপে ধরবেন।”
“ওকে স্যার।”
“এটার সম্ভাবনা অবশ্য ক্ষীণ। কারণটা আগেই বলেছি। ডাক্তারদের মুখ সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এবার আসি দ্বিতীয় ও শেষ সম্ভাবনায়। সিস্টার বা ওয়ার্ডবয় সেজে কাজ করাটা তুলনামূলক সোজা। বাইরে সিকিউরিটি না থাকা ওর জন্য সম্পূর্ণ আনএক্সপেক্টেড। তবে তাতে ও খুশিই হবে। কিন্তু এর থেকেও বড়ো আনএক্সপেক্টেড টার্ন যে ভেতরে অপেক্ষা করছে সেটা ওর জানা নেই। আমিও জানতাম গাঁজা খেলে কাউকে হসপিটালে ঢোকানোর প্রয়োজন পড়ে না, কয়েকঘণ্টা শুইয়ে রাখলেই ঠিক হয়ে যায়। তবু আপনাকে ইচ্ছে করেই হসপিটালে ঢুকিয়ে দিয়েছি। বার্নিং শিখ প্রত্যাশাই করবে না যে আপনি অ্যাজ এ পেশেন্ট ওখানে থাকবেন। কমলা আপনাকে সি.আই.ডি. অফিসার হিসাবে ভালো করেই চেনে। যতই মেক-আপ করুক, মনের মধ্যে চোর। আপনাকে চিনতে পারলেই একমুহূর্তের জন্য হলেও চমকাবে বা থমকাবে। ওটাই হচ্ছে আপনার কল। সেজন্যই আপনি ওখানে আছেন।” অধিরাজ গম্ভীর স্বরে নির্দেশ দিল, “প্রত্যেকটি নার্স ও ওয়ার্ডবয়কে খুঁটিয়ে একেবারে শকুনের দৃষ্টিতে দেখতে থাকুন। ওদের মধ্যে কেউ-না কেউ আপনাকে দেখে হয় মুখ নীচু করবে, নয়তো ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডের জন্য থমকে যাবে। দেখবেন, তার হাতে কোনো সিরিঞ্জ আছে কিনা। সব ক-টা ক্রাইটেরিয়া মিললে কোনো কথা না বলে আপনি তাকেই পাকড়াও করবেন। আশেপাশের স্টাফদের ডেকে জিজ্ঞাসা করবেন তারা কেউ এই বিশেষ ব্যক্তিটিকে চেনে কিনা। যেভাবেই হোক, ইঞ্জেকশন কিছুতেই দিতে দেবেন না। একদম সতর্ক হয়ে বসে থাকুন। গট্ ইট?”
“ইয়েস স্যার।” মিস্ বোসের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আমিও এবার দেখে নেব। ডোন্ট ওরি।”
“গ্রেট। আপনার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা আছে। আপনি পারবেন।” সে হাসল, “ওভার অ্যান্ড আউট।”
অধিরাজ ফোনটা কেটে দিয়ে দেখল তিনজোড়া চোখ তার দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। সে অবাক, “কী হল?”
পবিত্র একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, “ব্রেইনটা একটু ধার দাও মামা। তুমি কি লোকটার কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া জুড়ুয়া ভাই? ওর প্রত্যেকটা স্টেপ রিড করে আগে থেকেই টাইট মারার বন্দোবস্ত করে রাখো কী করে! আমি হলে একগাদা পুলিশ বাইরে দাঁড় করিয়ে দিতাম। বাট, ইউ আর রাইট। তাতে কাজের কাজ কিছুই হত না। তাই ভাবি! সামান্য গাঁজা খাওয়ার জন্য মিস্ বোসকে হসপিটালে ঢুকিয়ে দিলে কেন! আমিও তো টিন এজে কম টানিনি। কখনও হাসপাতালে যেতে হয়নি। তাও আবার সটান আই.সি.ইউ.। এতক্ষণে বুঝলাম, তুমি ফের সিসিটিভি ফিট করেছ। পেন্নাম হই জাঁহাপনা৷”
“পেন্নামের কিছু নেই।” অধিরাজ ধীর স্বরে বলে, “সি সাইকোলজি। তুমি যা এক্সপেক্ট করছ, সেটা এলে চমকানোর কিছুই নেই। কিন্তু যা সম্পূর্ণ আনএক্সপেক্টেড, সেটা হলে যতবড়ো আর চতুর অপরাধীই হোক না কেন, একমুহূর্তের জন্য হলেও ঘাবড়ে যাবে। তার বুক ধড়াস করে উঠবেই, ভয়ও পাবে। যত ভালো অভিনেতাই হোক না কেন, মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য তার মুখোশটা একটু সরবে। ওইটুকু লক্ষণই যদি কেউ ধরতে পারে তবে বাকিটা তার জন্য জলভাত।”
“কিন্তু স্যার…!” অর্ণব একটু ইতস্ততঃ করে, “মিস্ বোস কি সেটা বুঝতে পারবেন?”
“আবার তুমি একজন মেয়ের পর্যবেক্ষণ শক্তিকে আন্ডার-এস্টিমেট করছ অর্ণব।” সে নিশ্চিন্তভঙ্গিতে বলল, “মিস্ বোস, মিস্ দত্ত বা মিস্ অরোরাই আমাদের থেকে অনেক ভালো বুঝতে পারবেন। মেয়েরা অসম্ভব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে যা আমরা করি না। মিস্ বোসের যোগ্যতার ওপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। বিশ্বাস না হয়, পবিত্রকেই জিজ্ঞাসা করো। ও যখন পার্টি করে সব ঢাকা-চাপা দিয়ে ম্যানেজ করে বাড়ি ফেরে, তখন বউদি ঠিক কী বলেন?”
পবিত্র-র মুখ বিষণ্ণ, “আমি সহমত। রাজার কথা সম্পূর্ণ সত্যি। ছুটির দিনে যদি আয়েশ করে এক পেগও টানি, তবু রক্ষে নেই। অনেক কিছু করে দেখেছি, পান মশলা, জর্দা, ভিকস, মিন্ট চুইংগাম, এমনকি ছাগলের মতো কাঁচা পেয়ারাপাতাও কচরমচর করে চিবিয়েছি। মুখ থেকে কোনো স্মেল আসার কথাই নয়। এক পেগে নেশাই হয় না তো মাতলামির সিনই নেই। তাও দেবী ঠিক ধরে ফেলেন! এমন মা মনসার মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে এসে বলবেন, ‘ফের গিলেছ!’ যে ভয়ের চোটে নাকের সামনে ধূপ, ধুনো দিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। আমি আজও বুঝিনি যে মহিলা বোঝে কী করে?”
অধিরাজ এবার হেসে ফেলল, “প্রশ্নের উত্তর পেলে অর্ণব?”
এবার টুইঙ্কলও মাথা নাড়ল, “সহি বাত। আমার বাবাও প্রায়ই ধরা পড়েন। কোনোরকম গড়বড় করলে বা মিথ্যে বললে আর রক্ষে নেই। মা বলে বাবা মিথ্যে বললে নাকি ওঁর নাকে ভাঁজ পড়ে! আমি তো আজ পর্যন্ত কোনো ভাঁজই দেখিনি। মা কী করে দেখে কে জানে!”
অর্ণব দেখল অধিরাজ মুচকি হেসে চুপ করে গেল। তার হাবেভাবেই স্পষ্ট যে মিস্ বোসের যোগ্যতার ওপর কোনো সন্দেহ নেই। অর্ণব নিজেও অবশ্য মিস্ বোসের চেজিং এর ক্ষমতা স্বচক্ষে দেখেছে। মেয়েটি পুলিশ অফিসার হিসেবে নিঃসন্দেহে যোগ্য। তবু, খুঁতখুঁতুনি একটু যেন লেগেই থাকে। কে জানে, যদি মিস হয়ে যায়!
অধিরাজ ততক্ষণে ফের গুল্লুকে ফোনে ধরেছে, “গুলাব সিঞা, সৎ-শ্রী-অকাল!” “সৎ-শ্রী-অকাল স্যারজি।” গুল্লু বলল, “বলুন কী হুকুম? কাল বলছিলেন কাকে যেন স্টক করতে হবে?”
“হ্যাঁ। বলছিলাম।” সে নির্দেশ দেয়, “তবে তুই নিজে স্টক করবি না। তোকে ও স্পট করেছে হয়তো। ছেলেপুলেগুলোকে নামা। তাদের বলবি, একেক শিফটে যেন একেকজন ফলো করে। আজ সকাল আটটা থেকে রাত দশটা অবধি কোথায় থাকছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সব খবর আমার চাই। তোকে ফোন করার আগেই দ্যাখ নাম, ঠিকানা, ছবি সমেত হোয়াটস্ অ্যাপ করেছি।”
“একটু আগেই যে মেসেজটা এল?” গুলাব সিং-এর বিস্ময়ের অবধি নেই, “বলেন কী স্যার। এনাকে স্টক করব? তার মানে ইনিই….!”
“বলার দরকার নেই। বুঝে নে।” তার বক্তব্য সোজাসাপটা, “তুই শুধু উক্ত ব্যক্তিকে এখন থেকেই ফলো করা চালু করে দে। আবারও বলছি, নিজে করতে যাবি না। ওস্তাদ ছেলেপুলেগুলোকে দিয়ে করা। ওদের বলবি, শিকার যেন এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল না হয়।”
“হবে না স্যার।” গুল্লু জানায়, “গ্যারান্টি। পল পলের খবর আপনার কাছে পৌঁছোবে।”
“থ্যাঙ্কস!”
অধিরাজ ফোনটা কেটে দিয়ে একটু চিন্তিত মুখেই সামনের দিকে তাকাল। এখন ওরা পি সি চৌধুরীর বাড়ির দিকে চলেছে। তার মনের মধ্যে এখনও অনেক প্রশ্ন। মার্ডার ওয়েপন কী তা জানা গেলেও সেটার উৎস এখনও পাওয়া যায়নি। একটা বদ্ধ ঘর। ভেতর থেকে ল্যাচ আটকানো। ঘরের মধ্যে কেউ ঢোকেনি, বেরোয়ওনি। ভেতরে মিস্ বোস ছিল, বাইরে পবিত্র। মিস্ বোস ভুলবশত গাঁজা খেলেও একদম প্রথমেই বেহুঁশ হয়নি। পবিত্র-র কথা সম্পূর্ণ সঠিক। ওর জায়গায় যে কেউ সামনে পড়লেই কৌশানী তাকে চেপে ধরে ভুলভাল বকত। অথচ পবিত্র ক্যামেরায় কিচ্ছু দেখেনি। ভেতরে কেউ ছিল না। বাইরেও পবিত্র-র সতর্ক নজরকে টপকে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। তবে গ্যাসটা ইনসার্ট করল কে?
এই অদ্ভুত রহস্যের কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। ঘটনার আগেই ওরা পুরো ঘর তল্লাশি করেছে। যা যা ছিল, সব ভালো করে বাজিয়ে দেখেছে। কোথাও কোনো ‘মাংকি বিজনেস’ ছিল না। কিছু মিস্ করেছে বলে তো মনে হয় না। সে চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করে। অন্যমনস্কভাবে ফের একটা সিগারেট কামড়ে ধরে বের করে আনল। কিন্তু এখনও অগ্নিসংযোগ করেনি। তখনও তার মন অতীতের দৃশ্যটাকে মনে করার চেষ্টা করছে। কী কী ছিল ওখানে? এসি, মসকুইটো লিকুইড, অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার, এয়ার পিউরিফায়ার কয়েকটা সফট টয়, কাবার্ড-আলমারি, বেড, গুটি কয়েক ফার্নিচার, শো পিস, একটা দুটো পেইন্টিং—এই তো। এগুলো সব ওরা ধরে ধরে পরীক্ষা করেছে। এর বাইরে এমন কিছুই ছিল না যা সন্দেহজনক। তবে? আদতে হচ্ছেটা কী? কোন্ জিনিসটা ওদের এখনও চোখে পড়েনি? আদৌ কি তেমন কিছু আছে? ক্রাইমসিনটা আবার ভালো করে দেখতে হবে…।
সিগারেটটা সে একটু অন্যমনস্কভাবেই লাইটার দিয়ে ধরাতে যাচ্ছিল। তার আগেই তার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে দিয়ে বেজে উঠেছে ‘দেশ’ রাগ। ফোন এসেছে। অধিরাজ একঝলক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বিরক্ত হয়ে বলল, “নট্ এগেইন
অর্ণব আর পবিত্র দু-জনেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখল, স্ক্রিনে কোনো নম্বর শো করছে না। কোনো প্রাইভেট নম্বর থেকে ফোন আসছে। অধিরাজের মুখে বিরক্তি দেখে অর্ণব জানতে চায়, “কে ফোন করছে স্যার?”
“ভগা জানে।” সে বিরক্ত, “কাল থেকে করেই যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময়ই তুলি না। একবার-দু বার তুলেছি, কেউ কোনো কথা বলেই না। আমি একাই হ্যালো হ্যালো করে মরছি। ওদিক থেকে কোনো জবাবই নেই! বুঝি না, কথাই যখন বলবে না তবে ফোন করে কেন। ঘোস্ট কলার। দেখবে?”
বলতে বলতেই অধিরাজ ফোনটাকে লাউডস্পিকারে দিয়ে বলল, “হ্যালো! হু ইজ দিস্?”
ও প্রান্তে কোনো উত্তর নেই। কেউ কোনো উত্তর দিল না। তবে একদম নৈঃশব্দ নয়। কারোর একটা ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে ফের বলল, “ইয়েস? কে বলছেন?”
তাতেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। এমন নয় যে ভুলবশত কেউ ফোন করেছে। রং নাম্বার হলেও লোকে কিছু কথা অন্তত বলে বা সাড়া দেয়। দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অন্যদিকের আওয়াজ এদিকে এসে পৌঁছোচ্ছে না তাও হতে পারে না। ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্যান্য লোকের আওয়াজ এবং একটা শ্বাস ফেলার ফোঁস ফোঁস জোরালো শব্দ দিব্যি শোনা যায়। অধিরাজ বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিতেই যাচ্ছিল তার আগেই টুইঙ্কল অরোরা চেঁচিয়ে বলল, “আবে ভূতনিকে, তোর শেষ নিঃশ্বাস পড়ছে নাকি? অক্সিজেন লাগবে?”
ওপ্রান্তের ঘোস্টকলার বোধহয় এই ধরনের স্বাগতভাষণ আশা করেনি। সে ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কেটে দিয়েছে। পবিত্র অর্ণবের কানের কাছে ফিশফিশ করে, “সত্যিই হনুমান। চাল্লিসা পড়ারও দরকার নেই। ধমক খেয়েই ভূত পালাচ্ছে।”
“থ্যাঙ্কস মিস অরোরা।” অধিরাজ ফোনটা ড্যাশবোর্ডের ওপর রেখে বলল, “এরপর আবার ঘোস্টকলারের ফোন এলে ফের প্রণবেশদার কাছেই দৌড়োতে হবে, আপনার হেল্প নেওয়ার জন্য।”
“ইয়ে…স্যার…।” অর্ণব খুব শান্তস্বরে অনুরোধমাখা কণ্ঠে বলল, “মিস্ অরোরার একটা আর্জি আছে। আপনি এই ফাঁকে যদি একবার শুনে নেন …”
“আর্জি?” সে এবার লাইটারটা জ্বেলে সিগারেটে আগুন ধরায়, “শুনি।”
টুইঙ্কল একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করেছে। সে আস্তে আস্তে বলল, “স্যার, আমি আপনার শ্রীচরণের হনুমান হতে চাই।”
পবিত্র হাসি চাপতে গিয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে গেল। অর্ণবের কপালে হাত। এই মেয়েটা যা খুশি তাই বলে বসে থাকে! কেউ এভাবে টপ বকে টিমে রাখার অনুরোধ করে? অধিরাজ বেচারি সবে সিগারেটটায় একটা সুখটান মেরেছিল। ভড়কে গিয়ে গলায় ধোঁয়া আটকে বিষম টিষম খেয়ে অস্থির! প্রায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা। অর্ণব কিছু করার আগেই টুইঙ্কল তার মাথায় দুমদুম করে চাপড় মারতে মারতে বলল, “স্যরি স্যার। এক্সট্রিমলি স্যরি…।”
“সেনোরিটা…!” কাশতে কাশতে প্রায় দমবন্ধ হয়ে আসা অবস্থায় উচ্চারণ করল অধিরাজ, “ইউ আর হার্টিং মি…!”
অর্ণব তাড়াতাড়ি খপ্ করে টুইঙ্কলের হাত ধরে ফেলেছে। একেই স্যারের মাথায় ওই সাইডটাতেই চোট লেগেছে। কপালে জখম তো বটেই, তার সঙ্গে বার্নিং শিখ একটা ইট দিয়েও নাকি মেরেছিল। তার ওপর ওই ভয়াবহ হাতের চাপড় খেলে টুইঙ্কলকে ভুলেও টিমে জায়গা দেবেন না। সে চোখের ইঙ্গিতে মেয়েটাকে থামতে বলে। কাশিতে অধিরাজের চোখমুখ লাল হয়ে যাচ্ছে দেখে নিঃশব্দে জলের বোতল এগিয়ে দিয়েছে। জলটল খেয়ে একটু সুস্থ হয়ে সে কোনোমতে বলল, “স্যরি, আমি ঠিক বুঝলাম না। উনি বলতে কী চাইছেন?”
“বাংলাতেই তো বললেন!” পবিত্র ঠোঁট টিপে হাসছে, “যা বললেন তাই। উনি হনুমান হতে চান। তাও তোমার শ্রীচরণের।” পবিত্র অধিরাজকে আরও উলটোপালটা কিছু বোঝানোর আগেই অর্ণব বলে ওঠে, “স্যার, উনি এই টিমেই পার্মানেন্টলি থাকতে চাইছিলেন। লাহিড়ীস্যারের টিমে ফিরতে চান না।”
কাশির ধাক্কায় অধিরাজ একটু বেসামাল হয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কেন?”
এবার মিস্ অরোরাই উত্তর দিল, “কারণ ওখানে আমার ভালো লাগে না। কোনো সম্মান নেই। ও টিমে কেউ হাসে না স্যার। সবসময়ই ভামের মতো মুখ করে বসে থাকতে হবে। তাও তবু সহ্য হয়। কিন্তু লাহিড়ীস্যারের গালিগালাজ হজম করা খুব কঠিন। আমার সবকিছুতেই ওঁর আপত্তি। একটু ‘টস্’ সে ‘মস্’ হলেই মা-বাপ তুলে গালি দিয়ে দেন। নিজের অপমান সহ্য হয়। আমি ওর নোকর হতে পারি, কিন্তু আমার বাড়ির লোক তো দাসখত লিখে দেয়নি। মা-বাপ তুলে বললে ছেড়ে দেব কেন বলুন? আমিও তেমন পালটা ওঁকেও মা-বাপ তুলে আচ্ছা করে দিয়েছি…!”
অধিরাজের মুখ দেখে অর্ণবের মনে হল এবার লোকটা স্রেফ বিষম খেয়েই মরে যাবে। তবে এতক্ষণে বোধহয় কিছুটা শকপ্রুফ হয়ে গিয়েছে সে। শুধু বলল, “আপনি প্রণবেশদাকে মা-বাপ তুলে বলে দিলেন! উনি আপনার এনকাউন্টার করেননি?” টুইঙ্কল বিষণ্ণবদনে বলে, “বন্দুক কি ওঁর একার আছে?”
পবিত্র সজোরে একটা হেঁচকি তুলেছে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, “স্যরি, স্যরি।” মেয়েটি মুখ করুণ করে জানায়, “তবে বেশ কিছুদিনের জন্য সাসপেন্ড করে দিয়েছিলেন। বরং সেটাই ভালো। ওঁর সঙ্গে ডিউটি করা মানেই পানিশমেন্ট। দমবন্ধ হয়ে আসে। সবসময় ‘মেয়েছেলে মেয়েছেলে’ বলে অ্যাড্রেস করেন। আবার বলেন রান্না করা, বাসন মাজা হাত বন্দুক ধরতে পারে না!”
কথাটা শুনেই অধিরাজের মুখ বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “প্রণবেশদা এরকম করেন নাকি?”
অর্ণব আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। এ কথা মোটামুটি অফিসের সকলেই জানে। প্রণবেশ লাহিড়ীর ভয়াবহ মেজাজ এবং লেডি-অফিসারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কথা মোটামুটি সর্বজনোবিদিত। ব্যুরোয় এমন একটা লোকও নেই যে ওঁকে পছন্দ করে। একমাত্র দুটো মানুষকেই উনি সমঝে চলেন। অধিরাজের প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেও ওকে ঘাঁটাতে সাহস পান না। আর এডিজি শিশির সেনের সামনে ওঁর ‘বোলতি বন্ধ’। এছাড়া পৃথিবীর কারোর সঙ্গে ওঁর সদ্ভাব নেই।
অধিরাজের কপালের মাঝখানে একটা ভাঁজ পড়েছে। কোনোকিছু তার গুরুতর অপছন্দ হলেই এই ভাঁজটা পড়ে। সে আপনমনেই চুপ করে কিছুক্ষণ ধোঁয়ার রিং বানাল। তারপর বলল, “অ্যাকচুয়ালি সেনোরিটা, আমিও ভাবছিলাম প্রণবেশদাকে বলে আপনাকে আমার টিমেই নিয়ে নিই। যদি আপনার এবং প্রণবেশদার আপত্তি না থাকে….!” সে কথাটা শেষও করতে পারেনি। তার আগেই টুইঙ্কল পেছন দিক দিয়েই উচ্ছ্বাসের চোটে বাচ্চা মেয়ের মতো তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “সচ্চি… আমার কোনো প্রবলেম নেই। প্লিজ…প্লিজ…বলুন স্যার! আই অ্যাম ইওর বিগ ফ্যান…. আপনার সঙ্গে কাজ করতে পারলে আমার আর কিচ্ছু চাই না… ইনফ্যাক্ট স্যালারিও চাই না। ইটস মাই ড্রিম …।”
তার উচ্ছ্বসিত আলিঙ্গনে অধিরাজের প্রায় দমবন্ধ হয়ে এসেছিল। সে হাঁসফাঁস করতে করতে কাতরস্বরে বলল, “সেনোরিটা! আপনি তখনই আমার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন যখন আমি বেঁচে থাকব…!”
সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অধিরাজকে ছেড়ে দিয়েছে, “স্যরি…স্যরি!”
“ইটস ওকে।” সে অল্প কেশে নিয়ে বলল, “আমি এই কেসটা ক্লোজ হলেই প্রণবেশদার সঙ্গে কথা বলব। ওঁর আপত্তি না থাকলে আপনি থাকছেন মাদমোয়াজেল।” পবিত্র মাথা নাড়ল, “নিশ্চিন্ত থাকো। মিঃ লাহিড়ীর কোনো আপত্তি থাকার কথাই নয়। ইনফ্যাক্ট তুমি যে মুহূর্তে চাইবে, উনি তৎক্ষণাৎ মিস অরোরাকে তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কেটে পড়বেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওইদিন উনি গঙ্গাস্নানটাও সেরে ফেলবেন।”
“কেন স্যার?” অর্ণব জানতে চাইল, “ওঁর কথায় তো তেমন কিছু মনে হল না!” “অর্ণব। তুমি জানো রাবণকে মারার জন্য আর লঙ্কার বারোটা বাজানোর জন্য রাম আর হনুমানের দরকার কেন পড়েছিল?”
অফিসার আচার্য-র কথা শুনে একেবারেই ঘেঁটে গেল অর্ণব। এর মধ্যে রাম আর রাবণ কোথা দিয়ে টপকে পড়ল! সে একটু অনিশ্চিতভাবেই বলে, “ডেস্টিনি?”
“একেবারেই নয়।” পবিত্র বুঝিয়ে বলে, “রাম আর হনুমানের প্রয়োজনই পড়ত না যদি লঙ্কায় রাবণের আর একটা জুড়ুয়া ভাই বা বোন থাকত। থাকার মধ্যে ছিল ওই কুম্ভকর্ণ, যে ব্যাটা স্রেফ ঘুমিয়েই লাইফ কাটিয়ে দিল। আর ঘরশত্রু হলেও নিতান্তই গোবেচারা বিভীষণ। নিজের কিছু করার ক্ষমতা নেই, অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রাখতে ওস্তাদ। আর শূর্পনখা চেরি অন টপ। কিন্তু ভেবে দেখো, যদি লঙ্কেশের আরও একটি দশমাথাওয়ালা, সমান গরম মেজাজের যমজ ভাই বা বোন থাকত তাহলে কী হত। সোনার লঙ্কা আগেই বরবাদ হয়ে যেত। দুটোই নিজেদের মধ্যে মারপিট করে, খিস্তি-খেউড় করে, বোম-টোম মেরে নিজেরাই মরে যেত, রাম-লক্ষ্মণ, হনুমান কাউকেই লাগত না। এখানেও তাই। লঙ্কায় অলরেডি একটা রাবণ বসে আছে। তার ওপর যদি লেডি রাবণ এসে টপকে পড়ে, তাহলে বাইরে নয়, হোমিসাইডের ভেতরেই এনকাউন্টার হয়ে যাবে। যে কোনো এলাকায় একটা গুণ্ডাই কাফি। তাই লাহিড়ীসাহেব বিন্দুমাত্রও আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না।”
পবিত্র-র কথা শুনে এতক্ষণে অধিরাজের মুখে ফের সেই শিশুসুলভ হাসিটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। অর্ণবও হাসছে। শুধু টুইঙ্কল গম্ভীর মুখে বলল, “পা-জি, আপনি কি আমাকে কায়দা করে রাবণ বলছেন?”
“নো মাই সিস্টার। আমার ঘাড়ে একটাই মাথা আছে। আমি শুধু মিঃ লাহিড়ীকে রাবণ বলছি।”
মিস্ অরোরা আর কোনো কথা বাড়ায় না। তারা ইতিমধ্যেই ক্রাইমসিনের কাছে চলে এসেছে। পবিত্র গাড়িটাকে টার্ন নিয়ে গলির মধ্যে ঢোকাতেই দেখা গেল, এই সাতসকালেই সামনে প্রচণ্ড ভিড়। চার অফিসারই একটু অবাক হল। আশ্চর্য! এমন তো হওয়ার কথা নয়। এখনও কুয়াশা পুরোটা সরেনি। কিন্তু এখান থেকেই উত্তেজিত জনকোলাহল শোনা যাচ্ছে। শীতের সকালে মানুষজন এত সকালে খুব একটা ওঠে না। যাদের জীবিকার তাগিদ, একমাত্র তারাই এখন বাইরে বেরোয়। বাকিদের এখনও ঘুম ভাঙার সময় হয়নি। অথচ দেখে মনে হচ্ছে, গোটা লোকালয়ই ভেঙে পড়েছে সামনে। গুরুতর কিছু না ঘটলে এরকম হওয়ার কথা নয়। কী হল তবে?
“সামথিং ইজ ফিশি রাজা!” পবিত্র গাড়িটাকে দ্রুত সাইড করেছে, “সামনে যা ভিড়, তাতে আর গাড়ি এগোবে না। এত সকালে ভিড় কেন!”
“নট ওনলি ফিশি পবিত্র।” অধিরাজ প্রায় লাফিয়েই গাড়ি থেকে নামল, “সামথিং ইজ রটেন ইন দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক! তোমরা বলছিলে না, বার্নিং শিখ চুপচাপ আছে? সে চুপ থাকার লোকই নয়। আরও একটা চমকের জন্য রেডি হও।”
ওরা চারজনেই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ভিড় ঠেলেঠুলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল পি সি চৌধুরীর বাড়ির দিকে। এটা একটা ক্রাইমসিন। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের প্রহরা থাকার কথা। তেমনই কথা হয়েও গিয়েছিল। সাধারণ জনগণ সেখানে প্রবেশাধিকার পায় না। অথচ পি সি চৌধুরীর বাড়ির চতুর্দিকে উপছে পড়েছে জনতা। তাদের চিৎকার, ভয়ার্ত শোরগোলই বলে দিল, এখানে কিছু গোলমাল হয়েছে। একটু এগোতেই যা চোখে পড়ল তাতে ওদের চারজনেরই বিস্ময়ের অবধি থাকে না! বাড়িটার ভেতর থেকে কালো ধোঁয়া গলগল করে বেরিয়ে আসছে। লালচে একটা অবদমিত আভাও সিলড দরজা জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। বাতাসে ভয়াবহ গন্ধ। ইঙ্গিতেই স্পষ্ট, ভেতরে আগুন লেগেছে!
পবিত্র উত্তেজিত হয়ে গেটটা খুলে নীচের দিকে না তাকিয়েই সেদিকে দৌড়োতে যাচ্ছিল। হঠাৎই তার পায়ের নীচে কী যেন একটা পড়ে জোরালো শব্দে ফট্ করে ফেটে গেল। আর মাটিটাও আশ্চর্য পিছল! সে স্লিপ করে ভারসাম্য হারিয়ে উলটে পড়ল মাটিতেই। দু-হাতের পাতা মাটিতে রেখে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই একটা ভয়াবহ জিনিস আবিষ্কার করল পবিত্র আচার্য। দেখেই প্রায় শিউরে উঠে চেঁচিয়েই উঠেছে, “রা-জা!”
পবিত্র-র কিছু বলার আগেই সামনের দৃশ্যটা প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছিল অধিরাজ, অর্ণব ও টুইঙ্কলের বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে। পবিত্র-র পা যে জিনিসটার ওপর পড়েছিল, সেটা একটা রক্তাক্ত, ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের খুলি। কাটা একটা মাথা! পবিত্র-র দেহের চাপ আর ভারি বুটের আঘাত নিতে না পেরে একদিকটা সশব্দে ফেটে গিয়েছে। গোটা রাস্তাটা ভাসছে রক্তের ফেনায়। তাতেই পিছলে পড়েছে পবিত্র আচার্য। তার সারা গায়ে রক্ত মাখামাখি হয়ে আছে। শুধু খুলিই নয়, একগাদা কাটা মাংসের স্তূপও চতুর্দিকে ইতস্ততঃ পড়ে রয়েছে। যেন কেউ একপাল পশুকে পিস পিস করে কেটে রেখেছে। পার্থক্য শুধু একটাই। এই মাংসপিণ্ডগুলো কোনো ছাগল বা ভেড়ার নয়, মানুষের!
“হোয়াট দ্য…।”
অধিরাজ কথাটা শেষ করার আগেই টুইঙ্কল বমি করে ফেলল। এই দৃশ্য দেখে শুধু চক্ষুস্থির হয় না বা ভয় লাগে না, সঙ্গে প্রচণ্ড একটা দুর্দম বিবমিষাও পাকস্থলী থেকে উঠে আসে। মেয়েটার দোষ নেই। এ পর্যন্ত অনেক মারাত্মক, রক্তাক্ত ক্রাইমসিন সে দেখেছে। কিন্তু এরকম ভয়াবহ কিছু দেখার কথা মানুষ অতিবড়ো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না। যতই পুলিশ হোক, মানুষ তো বটে। অর্ণব আর অধিরাজেরও গা গুলিয়ে উঠছিল। ওঃ! এ কী ভয়ংকর নারকীয় দৃশ্য। জীবনে ভাবেনি এমন দিনও দেখতে হবে। স্লটারহাউজের বীভৎসটাই চরম মনে হয়েছিল ওদের। এখন মনে হচ্ছে, ওটা কিছুই না। অধিরাজ তাড়াতাড়ি টুইঙ্কল অরোরাকে সামলায়। টুইঙ্কল তার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে অনেকটা বমি করে একটু সুস্থ হল। সে মেয়েটার হাতে একটা ছোট জলের বোতল ধরিয়ে দিয়েছে। এই জলের বোতল থেকে একটু আগেই নিজেই জল খেয়েছিল, তাই বোতলটা সঙ্গেই রয়ে গিয়েছে। টুইঙ্কল আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে জল খেয়ে নিল। তার মুখ বিবর্ণ। অধিরাজ উদ্বিগ্নস্বরে জানতে চায়, “মিস্ অরোরা, আপনি ঠিক আছেন?”
কোনোমতে লেডি অফিসার মাথা নেড়ে জানায় যে সে ঠিক আছে। ওদিকে পবিত্র যতবার হাতে পায়ে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, ততবারই পিছলে যাচ্ছে। মাটি প্রায় দেখাই যায় না। তার ওপর রক্তের মোটা প্রলেপ যেন হিংস্র হাসি হাসছে। যতবার হাতে বা পায়ে জোর দিচ্ছে ততবারই স্কিড করছে। তার হাতের সামনে একটা অদ্ভূত শেপের বিরাট লম্বা দড়ি ছিল। লম্বায় প্রায় ষোল সতেরো ফুট। সে কোনোমতে দড়িটা আঁকড়ে ধরে বলল, “অর্ণব! হেল্প। আমি উঠতে পারছি না। দড়িটা ধরে টানো প্লিজ।”
দড়িটা এঁকেবেঁকে গেট অবধি এসেছে। অর্ণব তাড়াতাড়ি ওটাকে দু-হাত দিয়ে ধরেই থমকে গেল। পরক্ষণেই সে-ও হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলেছে। দড়িটাকে হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। অধিরাজ সভয়ে দেখল ঘেন্নায়, কষ্টে তার দেহ কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে টুইঙ্কলকে একপাশে সযত্নে বসিয়ে দিয়ে ছুটে গেল অর্ণবের দিকে। অর্ণবের ফর্সা মুখ ততক্ষণে লাল টকটকে। রীতিমতো ঘামছে। হাবেভাবেই স্পষ্ট যে একটা প্রচণ্ড আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অধিরাজ তাকে ধরে ফেলল, “অর্ণব!”
অর্ণব অতিকষ্টে থেমে থেমে জবাব দেয়, “স্যার…। পবিত্র, স্যারের হাতে ওটা দড়ি নয়…!”
“দড়ি নয়? তবে?”
সে শুধু উচ্চারণ করল, “ওটা হিউম্যান ইনটেস্টাইন…!”
বলতে বলতেই আবার বমির দমক এল। অর্ণব পুরো বেঁকে গিয়েছে। সে আপ্রাণ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে ঘেন্না পায় বলেই তো মেডিক্যাল কলেজের পাঁচিল টপকে পালিয়ে এসেছিল। অথচ আজ সেই মানুষের অস্ত্র তার হাতে! ভাবতেই সর্বশরীর ঘিন ঘিন করে উঠছে। অধিরাজ তাকে ধরে ফেলে বলল, “ইটস্ ওকে… ইটস্ ওকে… থ্রো আপ! চেপে রাখার চেষ্টা কোর না। থ্রো ইট আপ…! ইউ উইল ফিল বেটার…!”
এদিকে টুইঙ্কল অরোরার মতো তেজি মেয়েরও এই অবস্থা। তার মধ্যে অর্ণব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পবিত্র কী করবে বুঝতে পারছে না। ফেনায়িত তাজা রক্তে ভাসছে। আজই তার পরনে সাদা শার্ট ছিল। অথচ এখন সেটা রক্তাভ লাল। তিন অফিসারের অবস্থা দেখে অধিরাজ নিজেই কোন্ দিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। একবার এদিকে দৌড়চ্ছে, আর একবার ওদিকে। টুইঙ্কল চোখ বুজে ওখানেই বসে আছে। অর্ণব এখনও কাঁপছে। বমি হয়ে যাওয়ার পরও ঘেন্না আর দুর্বলতা তাকে ছাড়ছে না। ওদিকে পবিত্র-রও হেল্প দরকার!
সে সযত্নে অর্ণবকে জল খাইয়ে দেয়। তারপর তাকেও টুইঙ্কলের পাশেই বসিয়ে দিয়ে বলল, “অর্ণব, মিস্ অরোরা—দু-জনেই এখানে একটু বসুন। ওদিকে এখন তাকাবেন না। কিচ্ছু হয়নি। ওকে? জাস্ট স্টে হিয়ার… স্টে সেফ।” অর্ণব ক্লান্তস্বরে উত্তর দেয়, “ইয়েস স্যার…!”
তার কাঁধে একটা আলতো চাপ দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল অধিরাজ। তারও উপায় নেই। অতি সন্তর্পণে গেট খুলে পবিত্র-র দিকে এগোল। নীচের দিকে তাকাতে তারও বুক কাঁপছে। বিভিন্ন দেশের, অনেক ভাষার অনেকরকম ‘মিথে’ রক্তের নদীর কথা অনেকবার শুনেছে ঠিকই। কিন্তু জীবনে এই প্রথম দেখল। বীভৎস বললেও কম বলা হয়। মাটিতে মিশে ঘন কালচে লাল রক্ত প্যাচপ্যাচ করছে। কিছুটা তরল! তার মধ্যেই টুকরো টুকরো মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কোথাও কোথাও ভাসছে। কোথাও হাতের পাতা, কোথাও একগাদা আঙুল। উরু, হাঁটুও চোখে পড়ল। বাকি নেই আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গও। একটা রক্তমাখা প্লীহা চোখে পড়তেই একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলল অধিরাজ৷ মনে মনে নিজেকেই বলল, “স্টেডি… স্টেডি….!”
পবিত্রও ততক্ষণে চতুর্দিকের দৃশ্যটা দেখে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। কাল ক্রাইম সিন সিল করে দিয়ে এখানে নিরাপত্তারক্ষী দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল লোকাল পুলিশ। এই দেহাংশ সম্ভবত সেই হতভাগ্য নিরাপত্তারক্ষীদেরই। কারণ উর্দিগুলোও তার মধ্যেই টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। সে সভয়ে বলে, “আমাদের ঝালটা বোধহয় ওদের ওপর দিয়েই ঝেড়েছে।”
অধিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে পা টিপে টিপে এগোচ্ছে। সে কোনো জবাব দিল না। এই মুহূর্তে একটুও যদি ভারসাম্য হারায় তবে সে-ও আর সহজে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। পা-টা ঠিকভাবে রাখার জায়গাটুকুও নেই। মানুষের দেহের টুকরো ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার মধ্যে পিচ্ছিল চটচটে রক্ত! অর্ণব আর টুইঙ্কলের মতো তারও আঁশটে দুর্গন্ধে প্রায় অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসছে। ভনভন করতে করতে কতগুলো নীলরঙের মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে। দু-একটা তার গায়েও এসে বসার চেষ্টা করছে। তবু নিজেকে অতিকষ্টে স্থির রেখে সে এগিয়ে গেল পবিত্র-র দিকে। একটু ঝুঁকে পড়ে হাত এগিয়ে দিয়েছে, “ওঠো! সাবধানে…!”
পবিত্র তার হাত ধরল। অধিরাজ আপ্রাণ শক্তিতে তাকে লিফট করার চেষ্টা করছে। সে পায়ের সবটুকু জোর জড়ো করে এবার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস চালাচ্ছে। যদিও কাজটা সহজ ছিল না। গেটের বাইরের জনতা অপ্রয়োজনীয় চিৎকার-চেঁচামেচি করে যথেষ্টই বিরক্ত করে চলেছে। পবিত্র ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দু-একবার পিছলে গিয়েছিল; তাতেই রব উঠল, “গেল… গেল…”
সে একবার জনতার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায়। এদের কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। সামনে কতগুলো কেটে টুকরো টুকরো করা লাশ রক্তে ভাসছে। বাড়িটার ভেতর থেকে জোরদার আগুনের হলকা বেরোতে শুরু করেছে। একজন পুলিশ অফিসার ধরাশায়ী, অন্যজন প্রাণপণে তাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তার মধ্যে লোকগুলো চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার ফোন বের করে ভিডিও তুলছে। যেন এখানে আই.পি.এল.-র টোয়েন্টি-টোয়েন্টি ম্যাচ চলছে। এখানে একটা বাড়িতে আগুন জ্বলছে, খুনোখুনি হয়ে গিয়েছে, সবাই সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আর ফটো তুলছে। এদের মধ্যে একজনও পুলিশ কিংবা ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করার কথা ভাবেনি। ওরা ক্রাইম সিন ভিজিট না করতে এলে জানতেই পারত না যে এখানে এতসব কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। সবাই চিৎকার করছে, ভিড় জমাচ্ছে, অথচ কাজের কাজ কেউ করছে না! অদ্ভুত মনস্তত্ব৷
“কাম্ অন্ পবিত্র।” অধিরাজ তার হাত টেনে ধরেছে, “ওদিকে তাকিও না। উঠে দাঁড়াও…!”
“ইয়েস স্কিপি…।”
অতিকষ্টে, টেনেটুনে অবশেষে পবিত্রকে দাঁড় করানো গেল। সে নিজের অবস্থা একঝলক দেখে বলল, “ইশশ্। আমি কোন্ কুক্ষণে গাধার মতো ঠিকমতো না দেখেই ভেতরের দিকে দৌড়চ্ছিলাম। ব্যুরোয় ফিরে স্নান করতে হবে।”
“অর্ণব আর মিস্ অরোরার অবস্থা আরও খারাপ।” অধিরাজ চিন্তিত স্বরে জানায়, “এই সিন দেখে ওরাও একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
পবিত্র কোমরে হাত দিয়ে চতুর্দিকটা ভালো করে দেখল। তার কণ্ঠস্বরে বিস্ময় ও আতঙ্কের মিশ্রণ, “এ আদতে কী জিনিস রাজা? মানুষ না অন্যকিছু?”
“২০১৮ সাল অবধি মানুষই ছিল।” অধিরাজ মোবাইল বের করে এনে ফায়ার ব্রিগেডের নম্বর ডায়াল করতে করতে বলল, “এখন যা হয়েছে তা তুমি নিজের চোখেই দেখছ!”
এতক্ষণে বাড়ির ভেতরের অবদমিত আগুনটা বাইরে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভলকে ভলকে জ্বালাময়ী শিখা উদগার করে আগুনের লোলজিহ্বা বাড়ির বাইরেটাও সাপ্টে নিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অধিরাজ হতাশভাবে মাথা নাড়ে। এই ক্রাইমসিন আর তল্লাশি করে দেখা যাবে না! তেজি আগুন সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। এর মধ্যে কোনোরকম কু বা এভিডেন্স খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। লোকটা জানত যে সি.আই.ডি. হোমিসাইডের টিম মার্ডার ওয়েপনের খোঁজ করতে আবার ঠিকই ফিরে আসবে। তাই কোনো চান্সই নেয়নি। গোটা বাড়িতেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আর এ আগুন একমাত্র ফায়ারব্রিগেডই নেভাতে পারে। রাতে যারা পাহারায় ছিল, সেইসব পুলিশকর্মীকেও টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এই বডি বা দেহাংশগুলোর আর কিছু করার নেই। একা আহেলির পক্ষে এতগুলো লাশ সামলানো সম্ভব নয়। ডঃ চ্যাটার্জি যতক্ষণ না আবার আসছেন, ততক্ষণ টুকরোগুলোকে রেখে দেওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু করা যাবে না। অধিরাজ মনে মনে বুঝতে পারল, আবার এক কদম পিছিয়ে গেল ওরা। যদি-বা মার্ডার ওয়েপনের কিছু কারিকুরি বোঝার সুযোগ ছিল, সেটাও হাতছাড়া হয়ে গেল।
সে আপনমনেই বলল, “স্লগ ওভার শুরু হয়ে গিয়েছে পবিত্র। কোমর কষে নাও। এ লোক এবার হাত খুলে পেটাবে! কী আসছে, বাউন্সার, ইয়র্কার না ফুলটস দেখবেই না, স্রেফ মারবে। গত দু-দিন ধরে যা দেখছ, সেটা নেহাৎ ট্রেলার ছিল। আজকে ওর সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপ দেখার অপেক্ষা করো।”
“আরও বিধ্বংসী! এর থেকেও বেশি কিছু হতে পারে?”
“১৯৮৪ সালের ওই বাহাত্তর ঘণ্টায় সবচেয়ে মারাত্মক ছিল শেষ কয়েক ঘণ্টা। এ লোক সেই দিনগুলোকেই রি-ক্রিয়েট করছে। শুধু অন্যভাবে। তাই শেষ রাত্রে ও ওস্তাদের মার দেওয়ার ডেসপারেট চেষ্টা করবে।” তার মুখে ফের চিন্তার মেঘ, “আমরা এর আগে যা ভুল করেছি, করেছি। এবার আর একটাও ভুল করা যাবে না। একটাও না!”
“কিন্তু ওর মার্ডার ওয়েপনগুলো তো আমরা সরিয়ে নিয়েছিলাম! কিছুটা অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়েছে। নতুন হাতিয়ার আবার কোথা থেকে আমদানি হল?”
“সব ওয়েপন ধ্বংস হলেও কিছু জিনিস ও একদম হাতের কাছে রেখেছে নিশ্চয়ই।” অধিরাজের দৃষ্টি প্রখর, “সবচেয়ে বড়ো কথা গ্যাসের উৎস আমরা এখনও খুঁজেই পাইনি। যে অন্ধকারে ছিলাম, সেই অন্ধকারেই আছি।”
“তবে?”
“তবে?” পবিত্র-র কথা শুনে সে একটু মৃদু হাসল, “এখনও তেমন কিছুই হয়নি। আসল কাণ্ড তো সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হবে।”
“আরও লাশ পড়বে।” পবিত্র স্তম্ভিত, “কার?”
“জানি না। কিছু মিস্হ্যাপ আমরা আটকাতে পারব। কিন্তু সবগুলো ঠেকাতে পারব না।” অধিরাজের কণ্ঠস্বরে হতাশা, “এত প্রচেষ্টার পরও অন্তত একটা তরোয়াল বা চপার এখনও ওর কাছে আছে। গ্যাস আছে। সেটা প্রয়োগের মাস্টারস্ট্রোকও ওর জানা, কিন্তু আমরা জানি না। আর যদি ভুল না করি, তবে পেট্রোলও আছে। ঈশ্বরকে অসীম ধন্যবাদ যে অ্যাসিড বা বম্ব নেই। কিন্তু ওর মারাত্মক স্ট্র্যাটেজিটা আছে। আজ সূর্যাস্তের পর ও আমাদের কনফিউজ করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সবকিছু হতে পারে। দেখে নিও।”
“তবে?”
অধিরাজ জোরদার একটা সাইরেনের শব্দ শুনে সামনের দিকে তাকায়। ফায়ারব্রিগেডের গাড়ি ঢুকছে। সে আত্মমগ্নভাবেই বলল, “ভেবো না ব্রাদার-আজ রাতেই বার্নিং শিখের চ্যাপ্টার আমি ক্লোজ করব। সমূলে উৎখাত যাকে বলে। কলকাতাতেই ওর খেলা শেষ হবে। শুধু লোকটার জন্যই দুঃখ হয়! ও এটা ডিজার্ভ করত না। কিন্তু ওকে থামাতেই হবে…!”
পবিত্র শেষের কথাগুলো শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। লোকটার জন্য দুঃখ হয় মানে? কোন্ লোক? বার্নিং শিখ?
বার্নিং শিখের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে অধিরাজ! সে কী!
