কালরাত্রি – ১৬

(১৬)

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরি

চোখটা বড্ড জ্বালা করছে। হয়তো কয়েক ফোঁটা চোখের জল বেরিয়ে এলে একটু শান্তি পেতাম। কিন্তু বহুবছর আগেই কান্না জিনিসটা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। এই পোড়া খটখটে চোখদুটো তো কাঁদতেও জানে না। ‘জল’ নামের জিনিসটার অস্তিত্ব আর টের পাই না। সেখানে এখন শুধু আগুন! শুধু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া একটা লাভা আমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়। একটা অদৃশ্য আগুনের লেলিহান শিখা বুকের ভেতরটা খাঁক করে দিয়েছে। সেখানে অশ্রু, দুঃখ, রাগ, ক্ষোভ, ব্যথা, কোনো অনুভূতিই নেই! শাস্তি, নেই, স্বস্তি নেই, সুখ নেই! কিচ্ছু নেই!

তবুও কখনো কখনো কষ্ট হয়। তবু যন্ত্রণা হয়। এই মুহূর্তে টিভিতে খবরের হেডলাইন হিসাবে স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছে কোমলদিদির বাড়ি। না, ভুল হল। বাড়ি নয়, বরং বিধ্বস্ত, ভাঙাচোরা একটা ধ্বংসস্তূপ! আগুনের লকলকে জিহ্বা এখনও লাফিয়ে লাফিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছে। কেউ দেখলে বলবে না, ওটা কয়েক মুহূর্ত আগেও একটি মানুষের বাসস্থান ছিল। রিপোর্টাররা গায়ের জ্বালায় যা খুশি তাই বলে চলেছে ওর সম্পর্কে! কেউ বলছে, ‘বার্নিং শিখের হেল্পার’, কেউ বলছে ‘উগ্রবাদী-খালিস্তানি’, ‘টেররিস্ট’, কেউ বা ওর সঙ্গে আমার প্রেমের ‘রিশতা’ও জুড়ে দিচ্ছে। এরা কেউ কোমলদিদির সম্পর্কে কিছু জানে না, কিচ্ছু বোঝে না! অথচ অর্থহীন প্রলাপ বকেই চলেছে। কোমল কৌর যখন বেঁচে ছিল, তখন তার যন্ত্রণার কথা, জ্বালার ইতিহাস কেউ শোনেনি। কেউ ওর ভেতরের আগুনকে স্তিমিত করার চেষ্টা করেনি। গোটা জীবনে একবিন্দু ভালোবাসাও পায়নি কোমল কৌর। সবাই তার বাইরের রূপ নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে, মেজাজ নিয়ে যা তা বলেছে। সবকিছু দেখেছে, শুধু ওর ভেতরের কষ্টটাকে কেউ বোঝেনি। কেউ বোঝেও না…!

কিন্তু আমি তো জানতাম! আমি দিদিকে বহুবার বলেছি, কখনো না কখনো পুলিশ ঠিক শুঁকে শুঁকে ওর কাছে পৌঁছে যাবে। দিদি হেসেই উড়িয়ে দিত। বলত, “আসল সময়েই এল না, এখন আর এসে কী করবে? যদি এসেও পড়ে, তবে দেখা যাবে।” এমনকি আমাকেও ‘ওয়াহেগুরুর ওয়াস্তা’ দিয়ে রেখেছিল, কোনোদিন যেন ভুলেও ওকে ফোন না করি। প্রয়োজন পড়লে যেন সোজা ওর বাড়িতেই যাই। কারণ কোমল কৌর ধরা পড়লে ওর ‘কল ডিটেইলস রেকর্ড’ খুঁজে দেখবে পুলিশ। দিদি চায়নি, সি ডি আরের মাধ্যমে কোনোমতেই ওরা আমার কাছে এসে পৌঁছক। আমি জানি, ওরা পারবেও না। কোমলদিদি নিজেকে সমেত সব কিছুই উড়িয়ে দিয়েছে। মানুষটা তো ঠিকমতো হাঁটতেও পারত না! জানত, কোনোমতেই ও পালাতে পারবে না। তাই নিজেকে আগুনের মধ্যেই সঁপে দিল। আগুনেই জ্বলে গেল সব দুঃখ, রাগ, কষ্ট। না জানি, ‘জিন্দা’ জ্বলেপুড়ে যেতে ওর কত কষ্ট হয়েছে। কে জানে, লেডি অফিসাররা ওর ওপর কোনো অত্যাচার করেছে কিনা! এখনও ফায়ার ব্রিগেড আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঐ ধ্বংসাত্মক আগুন নেভানোর। রিপোর্টাররা জানাচ্ছে, ঐ বিধ্বংসী বিস্ফোরণের আওতা থেকে পুলিশেরা নিজেদের বাঁচাতে পারলেও কোমল কৌরকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। হয়তো ঐ খণ্ডহরের মধ্যেই পড়ে থাকবে দিদির পার্থিব শরীরের ‘রাখ। আত্মা, মন তো কবেই পুড়েঝুড়ে গিয়েছিল। ১৯৮৪ সালেই ও মরে গিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু খাঁচাটা। সেটুকুর ছাইও আমার ভাগ্যে জুটল না! কোমলদিদি…। আমার দিদি…! সে ও চলে গেল…! আমার জন্য শেষ হয়ে গেল ও! আর এ পৃথিবীতে আমার কেউ নেই! কেউ না!

টিভির পর্দায় এখন সি.আই.ডি. হোমিসাইডের হিরোর ছবি ভেসে উঠেছে। যতবার ওকে রিপোর্টাররা প্রশ্ন করছে, একটাই উত্তর দিচ্ছে, “নো কমেন্টস।” কপালের ধার বেয়ে এখনও রক্ত পড়ছে, অথচ কী তেজি! কী উদ্ধত! কাঁধের জখমটা ওকে থামাতে পারেনি। কপালের ক্ষতও থামাতে পারবে না। কোমলদিদি হাসতে হাসতে বলেছিল, “এবারে ভুল লোকের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছিস ভাই। ওর মুখের তেজ দেখেছিস? তিখি মির্চি! এ ব্যাটাকে হারাতে তোর দাঁত ‘খট্টা’ হয়ে যাবে। সাবধানে থাকিস, নয়তো নাঙ্গা করে দেবে।”

সত্যিই ‘নাঙ্গা’ করে দিচ্ছে! এক এক করে ছিনিয়ে নিচ্ছে আমার সব হাতিয়ার। টায়ার আর কেরোসিন আগেই গিয়েছিল। পেট্রোল তোলাটাই বোধহয় কাল হল। কোমলদিদিই ছিল আমার সবচেয়ে বড়ো জোর। কিন্তু সেখানেও জোরদার ধাক্কা! আমার একমাত্র আশ্রয়টুকুও ছিনিয়ে নিল ও। দিদির সঙ্গে সঙ্গে আমার অন্যান্য হাতিয়ারগুলোও গেল! এখন হাতে আর অ্যাসিড বাল্ব নেই, বম্ব নেই, এমনকি ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো ড্রাগ সাপ্লাই করার লোকও নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই লোকটা শহরের সমস্ত ফার্মাসিগুলোকে অ্যালার্ট করে দেবে যাতে বিনা প্রেসক্রিপশনে কেউ ঘুমের ওষুধ কিনতে না পারে, অথবা কিনলেও বড়জোর দু-দিনের কোটা। অথবা হয়তো ফরমানই জারি করবে যে আগামী দু-দিনের মধ্যে যেন কেউ কোনো সেডেটিভ বা স্ট্রেস ফ্রি জাতীয় ড্রাগস না বিক্রি করে। দ্বিতীয়টার সম্ভাবনাই প্রবল। যেমন আমি ওদের ওপর একের পর এক হামলা করে ওকে দুর্বল করার চেষ্টা করছি, তেমনই ও আমাকেও একটু একটু করে দুর্বল করছে। সকালের খবরে বলা হচ্ছিল যে ফরেনসিক আর ইনফর্মার নেটওয়ার্কের সাহায্য সি.আই.ডি. আর পাবে না। আর এই মুহূর্তের খবর, কোমল কৌরের মৃত্যুর পর বার্নিং শিখ প্রায় নিরস্ত্রই হয়ে পড়েছে। সি.আই.ডি. যেমন কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছিল, তেমন বুঝতে পারছি, আমিও কিছুটা পিছিয়ে গেলাম।

কোই না। এখনও আমার কাছে আসল অস্ত্রটা আছে। আসল তুরুপের তাস। কোমলদিদি নেই, কিন্তু ওর তৈরি করে দেওয়া মারণাস্ত্রটা এখনও প্রচুর পরিমাণে মজুত আছে। সেগুলো ওরা পায়নি। পাবেও না। আপ্রাণ বিশ্বাস করতে চাইছি যে, ‘মিশন কালরাত্রি’ অবশ্যই সফল হবে। কিন্তু তবুও এই প্রথমবারের জন্য, একটা অদ্ভুত সংশয় আমার মনে মধ্যে বারবার ঘুরে মরছে। এই প্রথমবার নিজের ওপরেই সন্দেহ হচ্ছে, ‘কাবলিয়তের’ ওপরেও সন্দেহ হচ্ছে!

এখনও পর্যন্ত যতবার আমার এবং আমার শিকারদের মধ্যে যারা এসেছে, তাদের মেরে, কেটে, জ্বালিয়ে সরিয়ে দিয়েছি। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। ফরেনসিককে সরিয়েছি, ইনফর্মার নেটওয়ার্ককে সরতে বাধ্য করেছি। শিকার ও পুলিশের ওপর নিজের আতঙ্ক বা ‘দহশত’ কায়েম করতে সফল হয়েছি। কিন্তু আই জি অধিরাজ ব্যানার্জি নামের ব্যাটসম্যানটি যতক্ষণ ক্রিজে ‘নট আউট’ হয়ে আছে, ততক্ষণ আমার শান্তি নেই। কোমলদিদি ঠিকই বুঝেছিল। এ লোকটা যতক্ষণ টিকে থাকবে, ততক্ষণ আমায় গলদঘর্ম করে ছাড়বে। আশ্চর্য মানুষ একটা। মাঝেমধ্যে রীতিমতো সন্দেহ হচ্ছে, ও কি কোনো মন্ত্রবলে আমার মাথার ভেতরে ঢুকে বসে আছে? এতদিন একতরফা মেন্টাল গেম আমিই খেলে এসেছি। এ লোক তো দেখছি আমাকেও টেক্কা দিচ্ছে! খবরি বা ফরেনসিক নেহাতই অস্ত্র। অস্ত্রটা তখনই ভীষণ রূপ ধরে যখন তাকে চালাবার হাতটা এবং তার পেছনের মস্তিষ্কটা ‘মারাত্মক’ হয়। ঔজারটা কেড়ে নিলেও সেই শক্তিশালী হাত আর মস্তিষ্ক এখনও রয়েছে, ও আমার প্রতিটা পদক্ষেপ বুঝে নিচ্ছে। এর থেকে বিপজ্জনক আর কিছু হতেই পারে না।

প্রথম ঝট্‌কাটা তখনই খেয়েছিলাম, যখন দেখলাম এই গোটা কলকাতা শহরে আমি ঠিক কাদের ওপর আক্রমণ শানাবো, সেটাই ও বুঝে বসে আছে। বাকি তিনটে শহরে পুলিশ নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু এবার অধিরাজ ব্যানার্জি আমায় পড়ে ফেলল, আর আমারই ‘বেস অব অপারেশনে’ ওদের দল এসে ঘাঁটি গাড়ল। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। তবুও অতটা অবাক হইনি। কারণ দ্বিতীয় ঝটকাটা খাওয়া তখনও বাকি ছিল। আমি আশা করেছিলাম, যদি বুঝেও থাকে সেক্ষেত্রে বড়ো বড়ো চেহারার পুরুষ উর্দিধারীরা এসে উপস্থিত হবে। আর অমন উর্দিধারীদের কুপোকাত করার মন্ত্র আমার জানা আছে!

কিন্তু আমার সেই কনফিডেন্স চুরমার হয়ে গেল যখন দেখলাম, কোনো লম্বা চওড়া উর্দিধারী নয়, বরং নেহাৎই শান্তশিষ্ট দুই লেডি অফিসার এসে হাজির। প্রথমে নির্বোধের মতো হেসে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল, অধিরাজ ব্যানার্জি নামের সুপারকপ এত বড়ো গবেট যে যুদ্ধক্ষেত্রে একদল শক্তিশালী সিপাইয়ের বদলে স্রেফ দুটো মেয়েকে মরতে পাঠিয়ে দিল। যে এতগুলো ভীমভবাণীর মতো চেহারার সিকিউরিটি গার্ডকে নির্বিবাদে কেটে ফেলতে পারে, তার সামনে দুটো ‘হাল্কাফুল্কা’ মেয়ে! এ কি ফাজলামি হচ্ছে? নাকি ‘বার্নিং শিখ’-এর ‘কেহরের’ ভয়ে মেয়েদের পেছনে লুকোচ্ছে!

মূর্খ। কতবড়ো মূর্খ ছিলাম আমি যে নিজেই নিজেকে বুঝতে পারিনি। গবেট ঐ সুপারকপ নয়, আসল গবেট আমি নিজে! আমার অজান্তেই যে কখন ও আমাকে মেপে নিয়েছে, আর দুটো শক্তিশালী কবচকে কাজে নামিয়ে দিয়েছে তা আমার চিন্তাভাবনার অতীত! আমি মেয়েদের শক্তিকে হেয় করেছিলাম। কিন্তু অধিরাজ ব্যানার্জি বিন্দুমাত্রও সেই ভুলটা করেনি। পুরুষদের চরিত্রের গঠন এমনই যে তারা খুব সহজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে যেতে পারে না। নিজেকে দিয়েই বলতে পারি, ছেলেরা একটি পরিবারের সব কিছু, তথা ঘরের ডেকোরেশন থেকে শুরু করে চরিত্রগুলোর কেমিস্ট্রি, কিছুই লক্ষ্য করে না। পুরুষেরা চিরকালই উদাসীন। যতখানি তাদের বলা হয়েছে, ততখানিই করবে, তার বাইরে সব কিছু গোল্লায় যাক। আবার দলে ভারি ও শারীরিকভাবে সবল হওয়ার কারণে পুরুষদের মধ্যে ওভার কনফিডেন্স থাকে। এই যেমন আমার মধ্যে আছে। তারা চট করে বাইরের একটা চা-ওয়ালাকেও বিশ্বাস করে ফেলে। ওদের খাবার, জল, চা-কফি বা অন্যকিছুর মধ্যে ঘুমের ওষুধ বা নেশার কিছু মিলিয়ে দেওয়া আমার বাঁ হাতের খেল।

আর ঠিক এইখানেই অধিরাজ আমায় মাত দিয়ে দিয়েছে। বলা ভালো, চার থাপ্পড় মেরে বুঝিয়ে দিল, ‘গাধা, মেয়েদের ক্ষমতা বোঝার বুদ্ধিও তোর নেই!’ সত্যিই নেই। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি যে ঐ তথাকথিত দুর্বল ‘লেডি অফিসাররাই কী প্রচণ্ড শক্তিশালী দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছে আমার সামনে। মেয়েরা সবার সঙ্গে মিশতে পারে, দুনিয়ার সব খুঁটিনাটি জিনিস লক্ষ্য করে। এমনকি ঘরের ডাস্টবিনে কী আছে, ঘরে কী কী ফার্নিচার আছে, তাদের কোনটার রং কীরকম, সিলিংফ্যানটা কোন ব্র্যান্ডের, কোথায় কী জাতীয় আলো জ্বলছে, কোন্ বেডরুমের বিছানার বেডকভার বা পর্দার রং কী, সব ডিটেইলসে বলে দেবে। ঈশ্বর একটা অতিরিক্ত ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে ওদের পাঠিয়েছেন। যার জন্য দুনিয়ার সব কিছু ওরা নোটিস করে, সবার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারে, এবং আশেপাশে কারা আছে, তাদের মধ্যে কী চলছে, কোনোটাই ওদের চোখ এড়ায় না। ওরা এত দ্রুত সংবাদ সংগ্রহ করে নিতে পারে যা আচ্ছা আচ্ছা ইনফর্মাররাও পারে না!

সবচেয়ে ভয়ের কথা, মেয়েরা সবসময়ই স্বাবলম্বী। তারা নিজের প্রয়োজনীয় খাবার, পানীয়, নিজেরাই বানিয়ে নিতে পারে। একজন লেডি অফিসার তো জলটুকু খাওয়ার আগেও বোতলের সিল পরীক্ষা করে নেন। অন্যজন নিজের খাদ্য, পানীয় নিজেই বানিয়ে নেন। ওদের কোনো হেল্পিং হ্যান্ডের প্রয়োজনই পড়ে না। বাইরের কোনো জিনিস স্পর্শও করেন না। এবং মেয়েদের আরও ভয়াবহ একটা স্বভাব আছে, ওরা পুরুষদের মতো সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। সবসময়ই সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। আমার বেবে, দিদি বা কোমলদিদিকে দেখেই বুঝেছিলাম, মেয়েরা যাকে ভালোবাসে, বিশ্বাস করে, তাকে চিরদিনই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই বিশ্বাসটুকু অর্জন করতে ঘাম বেরিয়ে যায়। এই শিক্ষাটা পেয়েছিলাম ঠিকই, তবু বুঝিনি। অধিরাজ ব্যানার্জি আমায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তুলো জিনিসটা শুনতে বা দেখতে যতটাই নরম, ধুনতে ততটাই প্রাণ যায়! বললে কেউ বিশ্বাস করবে না, এই কয়েকঘণ্টার মধ্যে আমি দুই লেডি অফিসারের ওপর অন্তত দু-বার আক্রমণ করেছি। কিন্তু ওঁরা নিজেদের অজান্তে অনায়াসেই সেই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন। একজনের চায়ে নেশার দ্রব্য মিশিয়ে খুব নিশ্চিন্ত ছিলাম। আমার সব নিশ্চিন্তি হাওয়ায় উড়ে গেল, যখন দেখলাম সেই চা তিনি স্পর্শও করলেন না। উলটে নিজের ব্যাগ থেকে অন্য চায়ের শিশি বের করে হেসে বললেন, “আমি নিজের ব্র্যান্ড ছাড়া অন্য চা খাই না।” ওর ব্যাগটা হাসিল করার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি, ভদ্রমহিলা অষ্টপ্রহর সেটাকে নিজের চোখের সামনেই রাখেন। ওটা হাতানোর চেয়ে টাওয়ার অফ লন্ডন থেকে কোহিনূর হীরে চুরি করাও অনেক সহজ। শুধু তা-ই নয়, নিজের সমস্ত কিছু নিজেই করেন! এতটাই সতর্ক যে আশেপাশে কাউকে ঘেঁষতেই দেন না!

অন্যজন তো আরও ভালো। সে যে কখন খায়, কী খায়, কোথা থেকে তার খাবার আসে তা ঈশ্বরও জানেন না! বাড়ির গিন্নী তাঁর জন্য অন্য একটা নির্দিষ্ট জলের বোতল, খাবার প্লেট, বাটি, চামচ মজুত করে রেখেছেন। স্বাভাবিক! বাইরের একজন নার্সকে কেউ নিজের বাড়ির ডিনার সেটে খাবার দেয় না। একবার সেই নির্ধারিত জলের বোতলে চড়া দাগের সেডেটিভ মিশিয়ে দিলাম। কিন্তু তারপরই হাঁ করে দেখলাম, তিনি একটা সিলড মিনারেল ওয়াটারের বোতল ব্যাগ থেকে বের করে ঢকঢকিয়ে জল খাচ্ছেন। আশায় ছিলাম, যখন কিছুটা খেয়ে রেখে দেবেন, তখন ঐ বোতলের বাকি মিনারেল ওয়াটারে ওষুধ গুলে দেব। কিন্তু আমার সমস্ত প্ল্যানে মিনারেল ওয়াটার ঢেলে দিয়ে তিনি বাকি জলটা বেসিনে ঢেলে স্রেফ বোতলটা ফেলে দিলেন। বুঝলাম, সিলড মিনারেল ওয়াটারের বোতল ছাড়া মহিলা জলই খাবেন না। যেই মুহূর্তে সিল ভাঙা হল, বাকি জলটাও বোতল সুদ্ধ খরচের খাতায়। এবার সিলড বোতলের জলে কারিকুরি কীভাবে করতে পারি। কিছু করতে হলে বোতলের সিল ভাঙতে হবে, আর সেটা অবধারিতভাবেই চোখে পড়বে। ফলস্বরূপ তিনি ঐ জল ছোঁবেনও না।

তবু হাল ছাড়িনি। ওঁর খাবার প্লেটে কিছুটা লিকুইড ড্রাগ মিশিয়েছিলাম। আশা ছিল, অন্তত যা-ই খান, ঐ প্লেটে বা বাটিতেই তো খাবেন। ওমা! উনি তো আরও এককাঠি সরেস! কোথা থেকে থার্মোকলের বাসন আমদানি করেছেন কে জানে! একদম ইউজ অ্যান্ড থ্রো। ঐ বাসনেই যা খাওয়ার তা খান। খাওয়ার শেষে ধরে ফেলেও দ্যান। পরের বার আবার নতুন আর একটা থার্মোকলের প্লেট ও বাটি এসে হাজির হয়।। সম্ভবত ওঁর ব্যাগেই থাকে। কিন্তু প্রথমজনের মতো এই মহিলারও ব্যাগ অবধি পৌঁছোনো অসম্ভব। কারণ দু-জনেই নিজেদের ব্যাগের ওপর গুপ্তধনের বাক্স পাহারা দেওয়া কেউটের মতো ফণা উঁচিয়ে বসে থাকেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। মেয়েদের প্রকৃতি এভাবেই তৈরি করেছে। তারা সবসময়ই সদাসতর্ক, সবাইকেই অবিশ্বাস করে, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সবকিছুই লক্ষ্য করে। কেউ কেশে উঠলে বা বিষম খেলে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে চলে যান ওঁরা। ভালোভাবে চেক করে দেখেন যে কাশি বা হাঁচিটা স্বাভাবিক কিনা। এক কথায় অধিরাজ ব্যানার্জি সিকিউরিটি গার্ড পাঠায়নি, বরং দুটো জলজ্যান্ত অসম্ভব সাবধানী সিসিটিভি ক্যামেরা পাঠিয়ে দিয়েছে, যাদের অতিক্রম করা একরকম অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে!

তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারিনি। বেবে, বাপু, গুরশরণ তাওজি বা সরতাজ, ওঁরা প্রত্যেকেই বারবার মনে করিয়ে দিতেন আমি সাচ্চা শিখের বাচ্চা। সাচ্চা শিখ মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না, তাদের সম্মান করে। উপরন্তু সেই অভিশপ্ত দিনটাতেও সরতাজ আমায় বলে গিয়েছিল সাচ্চা শিখের মতো মেয়েদের পাহারা দিতে, তাদের সুরক্ষার জন্য মোতায়েন থাকতে। শব্দগুলো আমার মাথায় একদম গেঁথে বসে গিয়েছিল। আমি আমার প্রতিশোধের জন্য অনেক মেয়েকে খুন করতে বাধ্য হয়েছি। কী করব! উপায় ছিল না! আমার মারণাস্ত্রটাই এমন যে বদ্ধ ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলে সে নারী-পুরুষ নির্বিচারে মারতে থাকে। বেছে বেছে পুরুষদের মেরে মেয়েদের ছেড়ে দেয় না। ছেলেকে মারতে গেলে সঙ্গে ছেলের বউও মরবে, জামাইকে মারলে মেয়েও! নাতিকে শেষ করতে গেলে সঙ্গে হয়তো নাতনিও শেষ হবে। আর আমার শিকারদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐ শয়তান বুড়োগুলোর হয় স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছিল, নয় তাদের স্ত্রীয়েরা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একই ঘরে থাকত। আমার উদ্দেশ্যই ছিল গোটা পরিবারটাকেই মারা। কী করে ছেড়ে দিতাম? কিন্তু আমার বিবেক তার জন্য প্রত্যেকদিন সহস্রবার চাবুক মারে। যদিও আমি নারীদের গায়ে হাত তোলা তো দূর, ওদের মৃতদেহকেও কোনোরকম অসম্মানও করিনি। চাইলে হয়তো করতেই পারতাম। তবু করিনি কারণ ‘শিখ’ নিজের প্রতিশোধের জন্য সবকিছু করতে পারে, জান নিতে পারে, দিতেও পারে, তবু মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতা করতে পারে না। আমার রক্তে এই শিক্ষা মিশে গিয়েছে। জানি যা করছি সেই পাপের জন্য ‘ওয়াহেগুরু’ কোনোদিন ক্ষমা করবেন না। তবু এইটুকু সান্ত্বনা, অন্তত মেয়েদের দেহ বা আত্মার সঙ্গে কোনোরকম অমর্যাদা করিনি।

এটা আমার মনের অবচেতনেই ছিল। কিন্তু ঐ হতভাগা অধিরাজ ব্যানার্জি কী করে এই দুর্বলতাটা বুঝে ফেলল কে জানে! ‘মর্দানা শক্তি’র বদলে ‘জনানি নজাকত পাঠিয়ে দিল! মর্দ হলে মারার আগে দু-বারও ভাবতাম না। কিন্তু সামনে যে দু-জন নারী! ওরা পুলিশ ঠিকই, তবুও নারী যে! ওদের গায়ে হাত তুলব কী করে? যে শিক্ষা আমার পরিবার আমায় দিয়েছিল, তাকে অগ্রাহ্য করা যে অত সহজ নয়। যখন মেয়ে পুলিশ দেখে আমি হাসছিলাম, তখন বোধহয় ঐ আই জিও মনে মনে হাসছিল। আর বলছিল, “একা শুধু তুই-ই মানুষের মন নিয়ে খেলবি? দ্যাখ, আমিও খেলতে পারি। হারামজাদা, তুই নিজেকেই ততটা চিনিস না, যতটা আমি চিনেছি।” যে পদক্ষেপকে আমি মূর্খামি ভাবছিলাম সেটা আদৌ বোকামি নয়, বরং খুব ঠান্ডা মাথায় তৈরি করা সুচিন্তিত পরিকল্পনা! আমার প্রতিপক্ষ জানে, বার্নিং শিখ পুরুষ সিকিউরিটি গার্ডকে কেটে ফেলতে পারে, কিন্তু একজন মেয়েকে কাটতে হলে, তার দেহকে ‘নাপাক ইরাদায়’ স্পর্শ করতে হলে সে কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে যাবে। তার হাত কাঁপবেই কারণ সে জাতে একজন ধর্মভীরু ‘শিখ!’ আর সত্যিই আমার হাত কাঁপছে।

চিরদিনই আমার স্নায়ু ইস্পাতে গড়া। কখনও ভয় পাইনি। কিন্তু এবার পাচ্ছি। জানি, ঐ লেডি অফিসার দু-জনকেও শেষপর্যন্ত মারতেই হবে, আমি নিরূপায়, তবু এই প্রথমবার আমার বুক কাঁপছে! ভাবছি, আর কত নীচে নামব। নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য শেষে এতটা নীচ হতে হবে আমায় ‘রবজি!’ এ কোন্ ধর্মসঙ্কটে ফেলেছ! ওদের অজ্ঞান করে কাজ হাসিল করতে পারছি না, আবার শিখ হয়ে কতগুলো মেয়ের সঙ্গে হাতাহাতি করব কোন্ লজ্জায়। বুঝতে পারছি, এই দ্বিধা আমায় ক্ৰমাগত পিছিয়ে দিচ্ছে… সময় এগিয়ে যাচ্ছে… হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বালির মতো… তবু এখনও আমি অদ্ভুত দ্বিধায়! …এসবই ঐ অধিরাজ ব্যানার্জির চক্রান্ত।

অথচ সম্ভবত এই প্রথম আমি প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করতে পারছি না! সে আমার অস্ত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে, শেষ আশ্রয়, সাহস, আত্মবিশ্বাস সব ছিনিয়ে নিচ্ছে! ওর জন্য আমার কোমলদিদি চলে গেল। আমাকে চূড়ান্ত ধর্মসঙ্কটে ফেলে কনফিউজ করে রেখেছে, তাও আমি রাগ করতে পারছি না। ও যে অবিকল সরতাজের মতো! তেমনই নির্ভীক, তেমনই বীর, তেমনই বুদ্ধিমান। সরতাজের মতো সিংহবিক্রমে এই লোকটাও বুক চিতিয়ে ‘খুংখার শের’ এর সামনে চরম সাহসে দাঁড়িয়ে পড়েছে…! অবিকল সরতাজ যেমন কতগুলো পাগল খুনির সামনে দাঁড়িয়েছিল…! আজও আমার মনে পড়ে সেই ‘নারা।’ ‘সেই দৃশ্য…’– ‘বো-লে সো নি-হা-ল। …

কয়েকশো কণ্ঠ গর্জন করে উঠল, “সৎ-শ্ৰী-অ-কা-ল!”

…আট বছরের বাচ্চা ছেলেটা ভীষণ ভয়ে দেখছিল, কতগুলো নৃশংস খুনি এদিকেই এগিয়ে আসছে। আর পিঁপড়ের মতো পিলপিল করে ছুটে আসছে কতগুলো মানুষ। হাতে রক্তাক্ত তরোয়াল, লাঠি, হুক, চপার! অজস্র, অগণিত নেকড়ে বুঝি দল বেঁধে ছুটে আসছে রক্তপিপাসায়! কলোনির চতুর্দিক থেকে তীব্র আর্তনাদ, মরণ চিৎকার ক্রমাগতই বাড়ছে। আশেপাশের বাড়িগুলোয় আগুন জ্বলছে। তার ধোঁয়ায় চোখ-নাক ভীষণ জ্বালা করছে। চতুর্দিকের এই বীভৎস ‘মনজ’ দেখে আট বছরের শিশুর আত্মা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, দুর্বল স্নায়ু ও মনের ওপর আর এই চাপ সে নিতে পারবে না। এখনই বুঝি ছোট্ট কলজেটার ধুকপুকুনি থেমে যাবে। তবু তার কৌতূহলী চোখদুটো দেখার চেষ্টা করছিল, এই কলোনিতে ঠিক কী হচ্ছে। কী হতে চলেছে তার আপনজনদের পরিণতি!

শিখদের দলে সবার সামনে রাইফেল নিয়ে ‘সিনা তানকে’ দাঁড়িয়েছিল সরতাজ। ভিড়টা যখন ওদের থেকে মাত্র দশ গজ দূরত্বে, তখনই রাইফেলটাকে আকাশের দিকে তুলে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করল সে। তার কান ফাটানো গর্জনে মুহূর্তের মধ্যে শিকারীদের দলটা থমকে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সামান্য হলেও ভয় পেল। এতক্ষণ তারা নিরস্ত্র শিখদের অবলীলায় মেরে, কেটে এসেছে। কোথাও কোনো বাধা পায়নি। কিন্তু শিকারদের মধ্যেও যে কেউ রাইফেল নিয়ে এসে রুখে দাঁড়াবে, তা ভাবতেই পারেনি। আগ্নেয়াস্ত্রর গর্জনে তারা থেমে গেল। এবার ঠিকভাবে চোখে পড়ল সামনের দৃশ্যটা। মঙ্গলপুরীর শিখরাও হাতা গুটিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জোটবদ্ধ হয়েছে তাদের ঠেকানোর জন্য। ওরা নিজেরাও বুঝতে পারল, এবার যুদ্ধটা সহজ হবে না

সরতাজ ওদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে, “আমরা বিনা কারণে রক্তপাত চাই না।। তোমরা যেমন এ দেশের মানুষ, তেমন আমাদের রক্তেও ভারতবর্ষের মাটি মিশে আছে। তোমরা যেমন ইন্দিরা গান্ধীকে ‘মা’ মানো, তেমন উনিও আমাদের ‘মা’। বেয়ন্ত সিং বা সতবন্ত সিং এর সঙ্গে ‘দূর দূর তক’ আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইন্দিরা গান্ধীর মওতে যতটা তোমরা দুঃখিত, আমরাও ঠিক ততটাই শোকার্ত। তাই ফিরে যাও। আমরা কেউ বেইমান বা গদ্দার নই। এখানে সবাই খেটে খাওয়া মানুষ দাঙ্গা চাই না, শান্তি চাই। তাই তোমাদের কাছে অনুরোধ, যে রাস্তা দিয়ে এসেছ, সেই রাস্তা দিয়েই চুপচাপ চলে যাও। নয়তো নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে আমাদেরও বাধ্য হয়ে লড়তে হবে। আমরা তা চাই না!”

“আচ্ছা?” ওদের মধ্যে একজন ব্যঙ্গ করে বলল, “তোরা ইন্দিরাজির মৃত্যুতে শোকার্ত। এতই শোকার্ত যে এখান থেকেই ঘিয়ের মিঠাইয়ের খুশবু পাওয়া যাচ্ছে! ঘরে আবার আলোর রোশনাই সাজিয়ে রেখেছিস। এটা তোদের কী ধরনের শোক প্রকাশের স্টাইল? ইন্দিরাজির মৃত্যুর আনন্দে মিঠাই ‘বাটছিস’, আলো দিয়ে ঘর সাজাচ্ছিস, উৎসব করছিস, তাই না? আবার বলছিস তোরা গদ্দার না!”

এটাকে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী বলব! এ কলোনিতে তো বিয়ের উৎসব হওয়ার কথা ছিল। বহুদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তার প্রস্তুতি। কলোনির পুরুষেরা বলেছিল, “আমাদের ঘরেরই ছেলে-মেয়ের শাদি, কলোনি একটু সাজাব না?” তাই সরতাজ সমেত অনেকে মিলেই কলোনিতে রোশনাইয়ের বন্দোবস্ত করেছিল। নভজ্যোতদের বাড়িও আলো আর ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে কয়েকদিন আগেই। ওদের ঘরেও অনেক অতিথি এসে পৌঁছেছে। নানারকমের রসমের জন্য মিঠাইও এসেছে। কিন্তু তখন কে জানত যে এর মধ্যেই এমন দুর্ঘটনা ঘটবে। এই ‘সাজাওয়ট’ তো ঘটনার অনেক আগেকার। ইন্দিরাজির ‘দর্পনাক’ খুনের পর সে বিয়ের অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু অত মিঠাই লোকে ফেলেই বা দেয় কী করে! সাজসজ্জা খুলে ফেলার কথা তাড়াহুড়োয় মাথাতেও আসেনি। এই মারাত্মক টালমাটাল অবস্থায় গোটা দেশই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। শিখেরা তো আরও বেশি হতবাক হয়েছিল। তার মধ্যে ফুল, আলো, মিঠাইয়ের মতো ছোটোখাটো জিনিসের কথা মাথায়ই আসেনি। অথচ এরা সেগুলো দেখেই ভাবছে যে আমরা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুতে উৎসব করছি।

এইরকম ভ্রান্ত ধারণা দেখে এবার বাপুজি মুখ খুললেন, “ও জি, এটা তোমাদের ‘গলতফ্যায়মি।” এখানে কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না। আমার মেয়ে যসমিতের শাদি অনেক আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তারই ‘রসম’ চলছিল কয়েকদিন ধরে। তোমরা তো জানোই, পাঞ্জাবী কুড়ি বা মুন্ডার শাদির রসম অনেকদিন ধরেই চলে, একটু জমকালোও হয়। যে আলো আর মিঠাইয়ের কথা তোমরা বলছ, সেগুলো যস্যির বিয়ের জন্যই এনেছিলাম আমরা। কিন্তু ইন্দিরাজির মৃত্যুর পর বিয়ের অনুষ্ঠান আপাতত বাতিল হয়ে গেছে। এত তাড়াহুড়োর মধ্যে আলো আর মিঠাইয়ের কোনো ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনি, সেটা আমাদেরই ভুল। আমরা হাতজোড় করে নিজেদের ভুল স্বীকার করছি, আর যদি তোমরা চাও এই সমস্ত ‘সাজাওয়ট’ এখনই খুলে দিচ্ছি, মিঠাইও ফেলে দিচ্ছি। কিন্তু তা বলে তোমরা আমাদের গদ্দার বলতে পারো না। তোমরাও শান্তিতে ফিরে যাও, আমাদেরও শান্তিতে থাকতে দাও।”

“আচ্ছা বাহানা থা! অজুহাতটা নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু কাজে লাগবে না।” ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মুষকো লোক চোখ পাকিয়ে ধমকে ওঠে, “শান্তিতে তো তোদের থাকতেই হবে। একেবারে চিরশান্তির দেশেই পাঠাব তোদের। সা-লা, মাদারচোদ, আপারেশন ব্লু-স্টারে একটা গুরুদ্বারা জ্বলেছে, ভেঙেছে বলে তোদের খুব জ্বলছিল না? লেঃ, সবকটা গুরুদ্বারাই জ্বালিয়ে দিয়েছি। কী করবি অ্যাঁ, বেয়ন্ত সিং আর ভিন্দ্রানয়ালের নাজায়জ ভাই? মারবি? আয়, দেখি তোদের তরোয়ালে কত জোর।”

আবার সশব্দে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করল সরতাজ, “খবর্দার! কেউ এগোবে না। আবারও বলছি, বেয়ন্ত সিং আমাদের কেউ নয়। তোমাদের চোখে ও গদ্দার। আমাদের চোখেও ও ‘নমকহারামই’। একই বিরাদরির মধ্যে হলেও সে কিংবা ভিন্দ্রানয়ালে, দু-জনেই আমাদের চোখে সমান ঘৃণার পাত্র। ইন্দিরা গান্ধী আমাদের কাছে ‘দেবী দূর্গার’ মতোই শক্তির প্রতীক। আমি নিজেই একাত্তরের যুদ্ধ লড়েছি। তাই তাঁকে শতবার স্যালুট করি। তোমাদের সামনে শুধু একটাই ‘বেয়ন্ত সিং’ আছে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী নিজেও জানতেন, যতবার এ দেশের ওপরে শত্রুর নজর পড়েছে ততবারই শিখ ব্যাটেলিয়নের হাজার হাজার ‘সিং’ পদবীধারী জওয়ান ভারতমাতার নামে হাসতে হাসতে নিজের প্রাণের বলি দিয়েছে। তাঁরও বিশ্বাস ছিল, যে মাটি তাঁর বিশ্বস্ত শিখ জওয়ানেরা রক্ষা করছে, সে মাটির দিকে কুদৃষ্টি দিতে ‘দুশমন’ কেন, সাক্ষাৎ শয়তানও ভয় পায়৷ তাদের নাম কি আদৌ তোমরা জানো? তিরাশির বিশ্বকাপে কপিল পা-জির কাপ জিতে নিয়ে আসায় উৎসব করোনি তোমরা? সেই দলে কতজন সর্দার ছিল তাদের নাম কি মনে রেখেছ? আজাদির জঙ্গের ‘ভগৎ সিং, উধম সিং, বলদেব সিং, কর্তার সিং সারাভা, বিবি অমর কৌর, বাবা গুরদিত সিং, সর্দার অজিত সিংকে চেনো না? আরে, আজাদির লড়াইয়ে যে একশো একুশটা লোক ফাঁসিতে চড়েছিল তার মধ্যে তিরানব্বই জনই শিখ। যে দু-হাজার ছশো ছাব্বিশ জন আজীবন কারাবাসে গিয়েছিল তাদের মধ্যে দু-হাজার একশো সাতচল্লিশ জনই শিখ ছিল। অথচ গোটা ভারতবর্ষের জনসংখ্যা অনুযায়ী শিখের সংখ্যা তখন মাত্র দেড় পার্সেন্ট ছিল। কিন্তু শহীদির ক্ষেত্রে সেই সংখ্যাটাই নব্বই পার্সেন্ট। সেই সর্দারজিদের মনে রাখোনি? কুছ তো শরম করো। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল হরবখশ সিং, লেফটেন্যান্ট হরদিত সিং মালিক, মেজর জেনারেল শাবেগ সিং, মনমোহন সিং, ফ্লাইং অফিসার নির্মল জিৎ সিং, সুবেদার যোগিন্দর সিং সহনান, এয়ার কমোডোর মেহর সিং বা মেহর বাবা, বাবা হরভজন সিং, এদের নাম জীবনেও কখনও শুনেছ? ভারতে আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে, এরা বাঘের মতো দেশের জন্য লড়েছে। কেউ শহীদ হয়েছে, কেউ মহাবীরচক্র পেয়েছে। বাবা হরভজন সিং নাথুলা বর্ডারে একাই চীনে শয়তানগুলোর ওপর ভারি পড়েছিল। বাইশ বছর বয়েসে লোকটা দেশের জন্য মরে গেল, অথচ আজও লোকে বিশ্বাস করে যে সেই অমর শহীদ এখনও অক্লান্তভাবে নিজের ডিউটি করে যাচ্ছে। আর্মি থেকে শুরু করে ক্রিকেট, হকি, দৌড়, ভারতের সমস্ত লড়াইয়ে অন্তত একজন শিখ থাকবেই। মিলখা সিং, বলবিন্দর সান্ধুকে দেখোনি? এরা সর্দার নয়? শুধু বেয়ন্ত আর সতবস্তের মতো দুটো ‘হারামজাদা’কে দিয়ে সমস্ত সর্দারকে চিনেছ? আর মূর্খের মতো বলছ ‘সর্দার গদ্দার হ্যায়”!”

“ইন্দিরাজি-ও এই ভুলই করেছিলেন!” সেই ষন্ডামার্কা লোকটা চেঁচিয়ে বলল, “তোদের ওপর ওঁর শেষমুহূর্ত অবধি বিশ্বাস ছিল। কিন্তু আমরা সেই ভুল করব না! তোরা তাঁর বিশ্বাসের সম্মান রাখতে জানিস না গদ্দার কঁহিকা! আমরা তোদের ঠিকই চিনেছি। আর বেয়ন্তের সঙ্গে আজ তোদেরও জাহান্নমে পাঠিয়ে ছাড়ব।” বলতে বলতেই সে অন্যদের দিকে তাকায়, “কী হল? চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন? ওদের বক্তৃতা শোনা বন্ধ করো। মারো, মারতে থাকো, টুকরো টুকরো করে দাও, জ্বালিয়ে রাখ করে দাও ভাইয়েরা! এক ভি সর্দার বচনা নেহি চাহিয়ে!”

শুধু এইটুকুই শোনার অপেক্ষা। শয়ে শয়ে দাঙ্গাই তরোয়াল, লাঠি, মশাল নিয়ে লাফিয়ে পড়ল শিখদের ওপরে। সরতাজ এবার গর্জন করে ওঠে, “বো-লে সো নি-হা-ল!” “সৎ-শ্রী-অকাল!”

শিখের ভিড়ও সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পড়েছে শত্রুর ওপরে। যার হাতে যে অস্ত্র ছিল, তাই দিয়েই বেদম মার মারছে দুর্বৃত্তদের! এতক্ষণ ধরে নিরীহ মানুষগুলোকে যারা ধরে ধরে মারছিল, কাটছিল আর জ্বালাচ্ছিল, এবার তারাও টের পেল যে সর্দাররা রুখে দাঁড়ালে ঠিক কী হয়। আমি সবিস্ময়ে দেখলাম বিশাল চেহারার গুরশরণ তাওজি’র হাতে লাঠি বনবন করে ঘুরছে! বাপুর মুখে শুনেছিলাম যে তাওজি’র একসময়ে কুত্তি আর লাঠি খেলার খুব শখ ছিল। কিন্তু আজ তাঁর হাতে যেভাবে লাঠি কথা বলছিল, তাতে মনে হচ্ছিল শুধু লাঠির জোরেই বুঝি সবাইকে শুইয়ে দিতে পারেন তিনি। ওঁর হাতের লাঠিটাকে ঠিকমতো দেখতেই পাওয়া যাচ্ছিল না। মারতে মারতে শত্রুকে প্রায় আধমরা করে ফেলেছেন, আর চেঁচাচ্ছেন, “খোওেয়া কঁহিকা। সর্দারের তরোয়ালের জোর ‘নাপতে’ চাস? তরোয়াল তো পরে, আগে এই লাঠির সামনা করে দেখা।”

সরতাজের রাইফেলও বেশ কয়েকজনকে ধরাশায়ী করেছে। তবে সে কাউকেই প্রাণে মারেনি। সরতাজ যেরকম নিশানায় দক্ষ ছিল, তাতে অনায়াসে ওদের ধরে ধরে উড়িয়ে দিতে পারত। কিন্তু সব গুলিগুলোই সে শত্রুর কাঁধে বা পায়ে মারছে। অনেকে ওকে নিরস্ত্র করার চেষ্টাও করছে। উলটোদিক থেকে একটা তরোয়াল ওর পিঠ চিরে দিল। কেউ একটা ওর মাথাতে লোহার রডের বাড়িও বসিয়ে দিয়েছে। সরতাজের মাথা বেয়ে রক্ত পড়ছে, জামাটা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। ওর হাত থেকে রাইফেলটা ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে শয়তানরা। তবু ও অদ্ভুত কৌশলে লড়ে চলেছে তাদের সঙ্গে। লাথি, ঘুষি মেরে ছিটকে ফেলছে দুশমনবাহিনীকে। কখনও তুলে আছাড় মেরে ফেলছে মাটিতে। চতুর্দিক দিয়ে ওকে ছেঁকে ধরেছে ওরা। এলোপাথাড়ি আক্রমণ করছে। উত্তরে এক দেশপ্রেমী জওয়ানের হাতের থাপ্পড়, ঘুষি কিংবা লাথি খেয়ে উলটে পড়ছে সবাই! হুঃ! এমনই সব বীর। সরতাজের এক ‘মুক্কা’ খেয়ে সেই মুষকো এমন লাট খেয়ে কাটা কলাগাছের মতো ধড়াস করে পড়ল যে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম, ব্যাটা মরেই গেল বুঝি! গোলা-গুলি নয়, তরোয়াল, লাঠি নয়, স্রেফ একটা হাত পড়েছে, তাতেই এই দশা। এরা আবার বড়ো মুখ করে শিখের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে আসে।

সরতাজের সিংহবিক্রম দেখে সেদিন বুঝলাম, সিপাহী হওয়ার আসল অর্থ কী। যেহেতু তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, সেজন্য তাকেই নিশানা বানিয়েছিল ওরা। অথচ কী অবলীলায় তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিল সে। একের পর এক মার এসে পড়ছে, তবু একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না যে ওর কোনো কষ্ট হচ্ছে। আবার ঐ মারদাঙ্গার মধ্যেই সে প্রমাণ করে দিল, সত্যিই ও দেশপ্রেমিক। লোকগুলোকে মারছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণে মারছে না। নিজের দেশবাসীদের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আর কত বড়ো প্রমাণ দিতে হবে? ওর হাতের রাইফেল কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই পটাপট লাশ ফেলে দিতে পারত। অথচ সরতাজ সচেতনভাবেই সেটা করছে না। ওর মাথায় এটাও আছে, শত্রুরাও এই দেশের মাটিরই সন্তান। তাদের কীভাবে প্রাণে খুন করতে পারত সে।

তবে সবচেয়ে অবাক করলেন আমার বাপু। চিরকালই নিরীহ, শান্ত মানুষটা যেরকম সংহার মূর্তি ধারণ করল তাতে আমি অবাক! তাঁর হাতে সাবলীলভাবে খেলা করছে তরোয়াল। ওঁর হাতে এত জোরও ছিল! অথচ কোনোদিন তাঁকে একটা মশাও তো মারতে দেখিনি। উলটো দিকের লোকেরা তাঁকেও ছাড়ছে না। ঘাড়ে, পিঠে রডের বাড়ি এসে পড়ছে মুহুর্মুহু। তবু বাপুর মুখে একটুও যন্ত্রণার লেশমাত্রও নেই। যেভাবে সাঁই সাঁই করে তরোয়াল চালাচ্ছেন তাতে ওঁকে আমিই চিনতে পারছি না। ইনি কি আমার বাপু? না ঈশর সিং বা গুর্মুখ সিং-এর মতো কোনো বীর! শত্রুকে আহত করছেন, ক্ষতবিক্ষত করছেন, অথচ চাইলেই এককোপে ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দিতে পারতেন তিনি। সেটা আদৌ করছেন না! বিদ্যুৎবেগে কখনও এদিকে, কখনও ওদিকে ফিরে দাঙ্গাইদের মারছেন। তাঁর চোখদুটোয় বুঝি ধ্বকধ্বক করে আগুন জ্বলছে। ‘কাতিলদের এলোপাথাড়ি মারছেন আর বলছেন, “আমাদের গদ্দার বলা। লেঃ; এই লেঃ। তরোয়ালের ধার বুঝে নে! ক-ঞ্জা-র। অকল কা দুশমন!”

বাকিরাও থেমে নেই। ‘অকল কা দুশমন’দের শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে হাতের কাছে যা পেয়েছে, তাই দিয়েই পেটাচ্ছে। ভিড়টা এইবার প্রচণ্ড ভয় পেল। যতখানি রণং দেহী মূর্তিতে তেড়ে এসেছিল তারা, তার থেকেও বেশি সংহার মূর্তি ধারণ করেছে শিখেরা। তারা কাউকে প্রাণে মারছে না ঠিকই, কারণ ওরা কেউ নিষ্ঠুর খুনি নয়৷ কিন্তু একজন সর্দারের তরোয়াল তো দূরে থাক, লাঠির বাড়ির জোর কী জিনিস তা ওদের গোদা মাথায় ঢুকে গেছে। তবে প্রত্যাঘাত তখনও চালিয়ে যাচ্ছে। একজন মশালধারী পেছন থেকে লড়াইয়ে ব্যস্ত গুরশরণ তাওজির কুর্তায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। তাওজি আর একটু হলেই আগুনে পুড়ে যেতেন, তার আগেই সরতাজ লাফিয়ে পড়ে দু-হাত দিয়ে ঘষে ঘষে নিভিয়ে দিয়েছে আগুন। ওর হাত নিশ্চয়ই পুড়েছে। তাও থামানো গেল না তাকে। উঠে দাঁড়িয়ে মশালধারীর কানের নীচে সপাটে একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় মারতেই সে মশাল-টশাল সমেত উলটে পড়ে গেল। সরতাজ তাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটাতে পেটাতে বলে, “শুয়োরের বাচ্চা। কায়রের মতো পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারিস! ক্ষমতা থাকলে সামনা-সামনি লড়ে দেখা!” আমি তখন লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছিলাম আর আতঙ্কে কাঁপছিলাম! একটা আটবছরের ছোট্ট শিশু যুদ্ধের কী বোঝে? সে বাপুর মুখে অনেক যুদ্ধের কাহিনি শুনেছে। কিন্তু স্বচক্ষে কখনও কাউকে মারতে দেখেনি, কাউকে মরতেও দেখেনি। দাঙ্গাইদের চিৎকার, তাদের ভয়াল মূর্তি, গান শট, ফায়ারিঙের শব্দ, রাইফেল, আগুন, তরোয়াল, লাঠি, কোনোটাই তার রূপকথাময় জীবনে কখনও আসেনি। বাড়ি পুড়ে যাওয়ার ধোঁয়া, নিজের মানুষদের জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ সংগ্রাম, আপনজনদের শরীরের রক্তপাত, কোনোকিছুই তার অভিজ্ঞতায় ছিল না। গুরশরণ তাওজি’র কুর্তায় যখন পেছন থেকে ‘আগ’ লাগিয়ে দিল, তখন ভীষণ ভয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠতেই যাচ্ছিলাম। তখনই মনের মধ্য থেকে কে যেন বলল, “চেঁচাস না কাকে। ওদের নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে দিস না। একদম বোবার মতো চুপ করে থাক।” আমি নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরে থরথর করে কাঁপছিলাম। আমার ভেতর থেকে একটা প্রবল কান্না আর চিৎকার বাইরে বেরিয়ে আসার দুর্দম প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, আর আমি নিজেকে চুপ করিয়ে রাখার অসম্ভব ‘কোশিশ’ করে যাচ্ছিলাম। সেটাও কোনো ভয়াল যুদ্ধের থেকে কিছু কম নয়। ভয় পাচ্ছিলাম ভীষণ ভয়…! আমার দেহ যেন অবশ হয়ে আসছে…! বুঝতে পারছি না, কতক্ষণ এই অসহ্য যুদ্ধ চলবে! আর আমার ভালোবাসার মানুষগুলো…? কী হবে তাদের…

সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত বোধ আমার মাথায় এসেছিল। ঐ ছোট্ট বয়েসে এমন চিন্তা আসার কথাই নয়। কিন্তু পরিস্থিতিই আমায় একটা নিষ্ঠুর সত্য বুঝিয়ে দিল। পাশের বাড়ির লোকটা ভগৎ সিং, উধম সিং বা ঈশর কিম্বা গুর্মুর্খ সিং হলে গর্ববোধ হয়। তাদের বীরত্বের কাহিনি ভালোও লাগে। কিন্তু নিজের বাপু, দাদা, তাওজি বা সরতাজের মতো স্বপ্নের নায়ক যদি ওঁদের মতো কেউ হয়, তবে গর্ব বা ভালোবাসার আগেও যে বোধটা গ্রাস করে তার নাম আতঙ্ক! আমি আপ্রাণ চাইছিলাম, বাপু, তাওজি, সরতাজ বা কলোনির একটাও পরিচিত মুখ যেন ঈশর সিং বা গুর্মুখ সিং না হয়! ওদের যে প্রশান্ত মুখের শান্তিময় হাসিটা দেখেছি, সেটাই যেন বাস্তব হয়। বাকিটা দুঃস্বপ্ন!

ওদিকে তরোয়াল আর লাঠির যুদ্ধ ক্রমাগতই বাড়ছে। দুটো তরোয়ালের ঠোকাঠুকির শাণিত ধাতব শব্দ যেন ঠং ঠং করে মাথার ভেতরে বাড়ি মারছিল। লোহার রডের সঙ্গে পাঞ্জা কষছে লম্বা আর মোটা লাঠি। কেউ কুড়ুল দিয়ে শত্রুনিধন করতে ব্যস্ত, আবার কারোর চপার হিংস্র আনন্দে রক্তের স্বাদ উপভোগ করছে। দাঙ্গাইরা যেন পারলে ছিঁড়ে খেয়ে নেয় প্রতিপক্ষকে। তাদের হাতের অস্ত্র নিষ্ঠুর ও আক্রমণাত্মক। অন্যদিকে সর্দারদের ‘ঔজার’ কিছুটা রক্ষণাত্মক। তারা নিজেদের বাঁচাতেই মূলত লড়ছে। শত্রুর প্রাণ নেওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যারা প্রাণ নিতেই শিখেছে, ও খুন করার উদ্দেশ্যেই এসেছে, তারা সহজে থামবে কেন। তাদের মার তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে! ওরা বুঝতে পেরেছে যে শিখদের মানসিক জোরের মূল উৎস সরতাজের বন্দুক। তাই তাকেই ‘ভেড়িয়া’র মতো ছেঁকে ধরছে তারা। এবার সরতাজ বন্দুকটা এক হাতে চেপে ধরে অন্যহাতে কৃপাণ নিয়ে আক্রমণ শানালো। উন্মত্তের মতো সে যেন তাণ্ডবনৃত্য করতে শুরু করেছে। তার হাতের কৃপাণ আততায়ীদের একজনকে জখম করল, অন্যজনের মুখে একটা বিরাট কাটাচিহ্ন উপহার দিল। লোকটা রক্তাক্ত মুখ চেপে ধরে কোনোমতে সেখান থেকে সরে পড়ল। বাকিরা এবার বেগতিক দেখে ওকে একসঙ্গে মারছে। বাপুর মুখে অনেক গল্পের পাশাপাশি মহাভারতের গল্পও শুনেছিলাম। সরতাজকে দেখে মনে হচ্ছিল, চক্রব্যূহের মধ্যে যুদ্ধরত অভিমন্যু। ওর ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই। হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই দিয়েই আঘাত করছে প্রতিদ্বন্দ্বীকে। দাঙ্গাইরা ওর বন্দুকধরা হাতের ওপর দমাদ্দম রডের বাড়ি মেরে চলেছে! বুঝি হাতটাই ভেঙে দিতে চায়। একটা মার এমন মোক্ষমভাবে এসে পড়ল যে রাইফেলটা ওর হাত থেকেই পড়ে গেল। টের পেলাম, আমার হৃৎপিণ্ডটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে। কী নিষ্ঠুরভাবে ওকে মারছে ওরা সবাই। কিন্তু সরতাজও ছাড়ার পাত্র নয়। সে বিদ্যুৎবেগে একটা মস্ত বড়ো আধলা ইট তুলে নিয়ে লোকটার মাথায় বসিয়ে দিল। আমি প্রচণ্ড ভয়ে কাঁটা হয়ে যাচ্ছিলাম। সরতাজ কি এই চক্রব্যূহ থেকে আদৌ বেরোতে পারবে? না তারও পরিণতি অভিমন্যুর মতোই হতে চলেছে।

“আ-গ!…বাঁ-চা-ও!”

এতক্ষণ ধরে লড়াইটা সমানে সমানে চলছিল। আচমকা একটা ভয়াবহ চিৎকারে আমার রক্তহিম হয়ে গেল! আমাদেরই কলোনির লোক, কর্তার সিং, যে স্টেশনে নেহাৎই ‘সামোসা’ বিক্রি করত, সে অসহ্য যন্ত্রণায়, প্রায় গলার শিরা ছিঁড়ে চিৎকার করছে! কেউ কিছু বোঝার আগেই সে পাগলের মতো এদিক ওদিক দৌড়োতে শুরু করল। তারপরই ধড়াস করে পড়ে গেল মাটিতে! তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে অদ্ভুত সাদা সাদা ধোঁয়া! অদ্ভুত রঙের একটা আগুন জ্বলছে গোটা দেহে। কাটা পাঁঠার মতো যন্ত্রণায় দাপাচ্ছে ওর সমস্ত শরীর। আমি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখলাম তার গায়ে কে যেন ‘সফেদ পাউডার’ ছড়িয়ে দিয়েছে। মশাল দিয়ে কেউ আগুন ধরায়নি, তবু আগুন ধরল কী করে! ধারে কাছে কোনো মশালধারী নেই, ওর গায়ে কেরোসিন তেলও বিন্দুমাত্রও কেউ ঢালেনি। কিন্তু তবু জ্যান্ত জ্বলে যাচ্ছে কর্তার সিং! তার চামড়া গলে গলে খসে পড়ছে পিঁয়াজের খোসার মতো! আশেপাশের মানুষগুলো কী করবে, কী করা উচিত বুঝে ওঠার আগেই, ফের একরাশ পাউডার গিয়ে ছিটকে পড়ল আর একজনের ওপরে। কেউ বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, কখনও একটা জ্যান্ত মানুষের চোখকে কেউ জ্বলে গলে যেতে স্বচক্ষে দেখেছে? আমি দেখেছিলাম! যাকে ‘সফেদ পাউডার’ ছুড়ে মারা হয়েছিল, তার মুখের চামড়া যেন স্রেফ একটা রাবারের মতো গলে গেল। আর বেশিরভাগ পাউডার পড়েছিল মানুষটার চোখে! আমি স্পষ্ট দেখলাম, ওর চোখের গোলকদুটো সমস্ত শিরা-উপশিরা সমেত সাদা ধোঁয়া আর আগুনের সঙ্গে জ্বলে পুড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তখনও পুরোটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। সরু সরু ‘নস’গুলোর সঙ্গে বাইরে ঝুলছে দুটো চোখ! সে বীভৎসতার বর্ণনা করা সম্ভব নয়। লোকটার শূন্য অক্ষিকোটর বেয়ে ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে অক্ষিকোটর। ওকে মানুষ নয়, তখনই একটা বীভৎস পোড়া প্রেত বলে মনে হচ্ছিল। অন্ধ, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটার চিৎকারে বোধহয় অকাল তখতও সেদিন কেঁপে উঠেছিল।

তখন শুধু আমিই নই, কেউই বুঝতে পারেনি ঐ সাদা সাদা পাউডারটা আসলে কী কীভাবেই বা চোখের নিমেষে আগুন ধরাচ্ছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে মানবদেহ। আমরা কখনও দেখিনি যে কোনোরকম ‘চিঙ্গারি” বা মশালের ‘শোলা’ ছাড়া এভাবেও আগুন ধরতে পারে! এ কী জাতীয় অদৃশ্য আগুন, কীভাবে এটাকে থামানো যায় তা কেউ বুঝতেই পারছিল না। কয়েকজন আপ্রাণ ওদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। তারা মরিয়া হয়ে পাগলের মতো দৌড়ে কল থেকে জল এনে হতভাগ্য মানুষদুটোর গায়ে ছড়িয়ে দিল, তবু সে ‘আগ’ আর সাদা ‘ধুঁয়া’ থামল না। বরং একটু থেমে বুঝি দম নিল। তারপরই আরও ইন্ধন পেয়ে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠল। লোকগুলো চেঁচাতেই থাকল…. চেঁচাতেই থাকল…! অবশেষে এমন একটা মুহূর্তও এল যখন ওরা আপ্রাণ চেঁচিয়ে যাচ্ছে, অথচ মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছে না! সেই বোবা চিৎকার শোনার বা বোঝার জন্য কেউ ছিল না। আগুন ওদের স্বরনালী সমেত গলাটাও পুড়িয়ে দিয়েছে। তার কিছুক্ষণ পরে ওদের সেই বোবা আছাড়িপিছাড়ি ছটফটানিও কমল। লোকগুলো মরে গেল। তখনও আগুন ওদের শবদেহ জ্বালিয়ে চলেছে।

ওটা কী জিনিস ছিল তা তখন বোঝা যায়নি। ঘটনার প্রায় ত্রিশ বছর পরে আমি জানতে পেরেছিলাম ঐ ‘সফেদ পাউডার’ আসলে কী। সাদা ফসফরাস। যা বাতাসের সংস্পর্শে আসামাত্রই জ্বলে ওঠে। আর একটা গোটা মানুষের হাড়গোড় সুদ্ধ কুরে কুরে পুড়িয়ে খেতে থাকে। ‘হোয়াইট ফসফরাস’ তখন ভারতে ব্যানড প্রোডাক্ট ছিল। শুধু ভারতে নয়, তখন বহু দেশেই সাদা ফসফরাস পাউডার নিষিদ্ধ। কারণ এটাকে মারণাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলে মৃত্যু অবধারিত। হোয়াইট ফসফরাস বাতাসের স্পর্শে জ্বলে ওঠে। এটাকে থামানোও সহজ নয়। তখন আমাদের কারোরই জানা ছিল না, কিন্তু এখন জানি, শুধু সামান্য পরিমাণ জল ঢেলে ওটাকে থামানো যেত না। তার জন্য বরফঠান্ডা পানিতে মানুষগুলোকে পুরো চুবিয়ে দিতে হত। অথবা ‘দলদলে’ নিয়ে ফেলতে হত। আগুন নেভানোর জন্য যে ফায়ার ফাইটিং এজেন্ট ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ওকে নেভাতে পারত না। কারণ ও পেট্রোল, ডিজেল বা কেরোসিন থেকে নয়, বাতাসের অক্সিজেন থেকে ইন্ধন নেয়। জল ঢাললে ঐটুকু সময়ের জন্য হয়তো নির্বাপিত হয়, কিন্তু জল ঢালা বন্ধ হলেই পরক্ষণে দপ করে ফের জ্বলে ওঠে। এই আগ যতই নেভাও না কেন, বারবার জ্বলে উঠবেই। সাধারণ আগুন প্রথমে চামড়া পোড়াতে কিছুটা হলেও সময় নেয়। কিন্তু হোয়াইট ফসফরাসের আগুন খুব দ্রুত চামড়া পুড়িয়ে গভীরে ঢুকে মাংস পেশী পোড়াতে শুরু করে। ও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটা আস্ত মানুষকে গলিয়ে পুড়িয়ে কঙ্কাল বানিয়ে দিতে পারে। এই পাউডার এতটাই ‘ঢিঠ’ যে চামড়ায় আর পোষাকে একবার লেগে গেলে তাকে সরানো অসম্ভব। একদম ‘চিপকে থাকে। আর যতক্ষণ না জ্যান্ত মানুষটাকে হাড়গোড় সমেত খেয়ে ফেলছে, ততক্ষণ ছাড়ে না। আশ্চর্যের ব্যাপার, যে জিনিসটা বাজারে পাওয়াই যায় না, তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ বস্তু’র লিস্টে পড়ে, সেটা অত পরিমাণে দাঙ্গাইদের হাতে এল কী করে? কে তুলে দিয়েছিল? খোদ ভারত সরকার ছাড়া এত ফসফরাস পাউডার কে-ই বা আমদানি করতে পারে! এরকম সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও সাজিশ কোনো গোদা মাথার খুনি বা কতগুলো দাঙ্গাইদের হতেই পারে না! যদি কেউ সন্দেহ করে যে এর পেছনে তৎকালীন ভারত সরকারেরই হাত ছিল, তবে কি সে খুব অন্যায় করবে?

শিখরা তখনও কেউ সাদা পাউডারের মহিমা অতটা জানত না। ফলস্বরূপ আরও দু-জনের গায়ে এসে পড়ল সেই কালান্তক সফেদ পাউডার। তাদের মরণ-আর্তনাদ শুনে হয়তো ঈশ্বরের চোখেও জল এসেছিল সেদিন। হয়তো একবারের জন্য হলেও তিনি আফসোস করেছিলেন, মানুষের নামে কী ভয়াবহ জিনিস সৃষ্টি হল তাঁরই হাত দিয়ে। কিন্তু দাঙ্গাইরা এতেও সন্তুষ্ট হল না। আমি ‘সফেদ পাউডারের’ ধ্বংসলীলা দেখে একদম নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে আজন্মপরিচিত মানুষগুলো জ্যান্ত জ্বলছে, অথচ কিছু করতে না পারার অসহায়তা বোধহয় ঐ আগুনের চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক। আমার ভেতরে তখন ভয় নামক পদার্থটিও সহ্যশক্তির চরম সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে কোনো অনুভূতি অনুভবের সমস্ত সীমা ছাড়ালে মানুষ অনুভূতিহীন পুতুলে পরিণত হয়। আমিও তখন তাই হয়েছিলাম। এক হাতে নিজের মুখ প্রাণপণে চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে দেখছিলাম দুর্বৃত্তরা কয়েকজনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাঁক করে দিয়ে এখন কলোনির বাড়িগুলোর ওপর চড়াও হয়েছে। যখন কলোনির পুরুষেরা তাদের সঙ্গে লড়তে ব্যস্ত ছিল, ঠিক তখনই ওদের আর একটা ‘টুকরি’ পেছন দিক দিয়ে লুকিয়ে এসে সবার অজান্তেই কলোনির বাড়িগুলোয় আগুন ধরানোর চেষ্টা করল! সামনা-সামনি লড়তে পারবে না বুঝতে পেরেছিল ওরা। তাই এই কৌশল! আমি দেখলাম, নভজ্যোতদের বাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে! ভেতর থেকে ভেসে আসছে নারীকণ্ঠের আর্তনাদ। ফুলের কেয়ারি, সাজসজ্জা, আলোর মালা, সব কিছুই জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। বাড়ির মেয়েরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গৃহবন্দি করে ফেলেছিল। কিন্তু এবার বোধহয় তাদেরও রক্ষা নেই। ঐ বাড়িতেই যাওয়ার কথা ছিল যস্যিদিদির। ওটাই ওর ঘর হতে যাচ্ছিল! কম স্বপ্ন সাজায়নি দিদি ওর শ্বশুরঘর নিয়ে। অথচ বিনা কারণেই সেই স্বপ্ন সমেত জ্বলে যাচ্ছে ওর সুখের ঘর!

“বেবে… দিদি… পরজাইজি…!”

নভজ্যোত সরতাজের পাশাপাশি সমানতালে লড়ে যাচ্ছিল। রোগাসোগা গড়নের জিজুও যে এমন কাঁটার টক্কর দিতে পারে তা আমার জানা ছিল না। কিন্তু যে মুহূর্তেই তার নিজের জ্বলন্ত বাড়িখানা চোখে পড়ল অমনিই সব ছেড়েছুড়ে সর্বহারার মতো ছুটে গেল সেই দিকে। পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “কোই বচাও! অন্দর বেবে, দিদি, ভাবি সব হ্যায় … আগ বুঝাও কোই… বে-বে!”

ওর পেছন পেছন কলোনির কিছু লোকজনও ছুটে গেল। যে শয়তানগুলো চুপিসাড়ে আগুন লাগাচ্ছিল লোকে সরোষে তাদের উত্তম-মধ্যম দিতে শুরু করেছে। রাগের চোটে গোটা কয়েক লাঠিই বোধহয় ভেঙে দিল ওদের পিঠে আর মাথায়! কয়েকজন নভজ্যোতের বাড়ির আগুন নেভানোর চেষ্টায় তৎপর হল। কিন্তু ততক্ষণে অগ্নিকাণ্ড ‘হা হা’ করে লেলিহান রূপ ধারণ করেছে। দুর্বৃত্তরা বিপদ দেখে আর মারধোর খেয়ে কোনোমতে পালানোর চেষ্টা করল। তাদের পেছন পেছন লাঠি আর তরোয়াল নিয়ে কয়েকজন সর্দারজি রে রে করে তেড়েও গেল। বাকিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল আগুন নেভানোর কাজে। ভেতর থেকে তখনও ভেসে আসছে নারীকণ্ঠের সম্মিলিত আর্তনাদ! আগুন ধ্বকধক করতে করতে ছড়িয়ে পড়ছে। ছাতে, জানলা, দরজায় এমনকি মুখ্য দ্বারেও একেবারে শেষনাগের মতো সহস্র ফণা ছড়িয়ে নাচছে দুরন্ত বহ্নি। নভজ্যোত কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে সেই জ্বলন্ত দরজার দিকেই ছুটে গেল… “আরে….. নভজ্যোত… কী করছ!”

পেছন থেকে কয়েকজন এসে চেপে ধরল তাকে। একজন ধমকে উঠল, “অপনা জান দেগা ক্যায়া! দেখতে পাচ্ছিস না, সর্বত্র আগুন! ভেতর থেকে হল্কা বেরিয়ে আসছে। দরজা দাউদাউ করে জ্বলছে। এখানে ঢুকতে যাওয়া মানে সাক্ষাত মওতকে নেওতা দেওয়া!”

বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল নভজ্যোত, “ছেড়ে দাও আমায়… যেতে দাও… বেবে, দিদি, পরজাইজি…সবাই যে ভেতরে আছে। ওদের কী হবে…? আমায় ছেড়ে দাও…।” “নভজ্যোত।” আর একজন বলল, “সমঝা কর ইয়ারা। এ তোর কাজ নয়। এই দরজা ভাঙার জন্য হয় ফায়ার ব্রিগেডের লোক লাগবে, নয়তো আর্মির লোক। একমাত্র ওরাই এসব ‘তরকিব জানে।”

ভেতর থেকে চিৎকারের আওয়াজ আরও জোরালো, আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। এত তীক্ষ্ণ যে মনে হয় এবার কানের পর্দা ফেটেই যাবে। নভজ্যোত নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতেই বলল, “আমি ওদের এভাবে একা ছাড়তে পারি না!…ওরা যে মরে যাবে…ছেড়ে দাও…!”

ওদের মধ্যেই একজন চেঁচিয়ে উঠল, “সরতাজ… একমাত্র সরতাজই পারবে। ও জানে জ্বলন্ত দরজা কীভাবে ভাঙতে হয়। কেউ সরতাজকে ডাকো…

ভিড়ের মধ্য থেকেই একজন ছুটে গেল সরতাজের কাছে। কিন্তু তখন তার ধারে কাছে পৌঁছোনোর উপায় নেই! অন্তত পঞ্চাশটা লোক তাকে ঘিরে ধরেছে। একটা মানুষের পক্ষে কতক্ষণ সম্ভব এই অসম যুদ্ধ করা। তা সত্ত্বেও সে লড়ছিল। যে তাকে ডাকতে গিয়েছিল, সে শুধু চিৎকার করে বলল, “স-র-তা-জ। উধর দেখ!”

সরতাজ সামনের দুটো লোককে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে ছাতু করতে করতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দৃশ্যটা একবার দেখল। যে মুহূর্তে আগুনের বিধ্বংসী রূপ ওর চোখে পড়ল সে মুহূর্তেই বুঝে গেল যে এবার যুদ্ধটা এখানেই থামাতে হবে। তার জন্য যদি কয়েকটা লাশও ফেলে দিতে হয়, তবুও সেটা তাকে করতেই হবে। নয়তো নভজ্যোতদের বাড়ির অগ্নিকাণ্ডে ওর পরিবারের মেয়েরা মারা যাবে। শুধু তাই নয়, ঐ আগুন যেভাবে বাড়ছে, তাতে আশেপাশের বাড়িগুলোকেও সাপ্টে ধরবে। এখনই কিছু করা দরকার।

এই প্রথম আমি সরতাজের মুখে একটা খুনির মুখ ভেসে উঠতে দেখলাম। তার ধৈর্যও এবার জবাব দিয়েছে। সে আর একটা কথাও না বাড়িয়ে এবার রাইফেলটাকে সোজা দাঙ্গাইদের দিকে তাক করল। অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে এবার নিষ্ঠুর আঙুলে ট্রিগার টিপল সে। একবার… দু-বার… তিনবার…!

রাইফেল গর্জন করে উঠল। আমি দেখলাম ধুপধাপ করে কয়েকটা লোক পড়ে গিয়েছে। এতক্ষণে সরতাজ আর্মির ‘শ্যুট টু কিল’ পন্থা নিয়েছে। ওকে যারা এতক্ষণ আক্রমণ করছিল, এবার তারাও কয়েক পা পিছিয়ে গেল। বোধহয় বুঝে গিয়েছে, এই লোকটাকে সহজে পরাস্ত করা যাবে না। এবার কিছু করতে গেলেই লাশ ফেলে দেবে ওর রাইফেল। তার এই উগ্রমূর্তি দেখে বাকি শিখরাও রুদ্রমূর্তি ধরল। তাদের লাঠির বাড়িতে, তরোয়ালের আঘাতে এবার অসম্ভব রাগ স্পষ্ট। এতক্ষণ সামলে আঘাত করছিল। এবার সেটুকুও রইল না! আমার চোখের সামনেই দাঙ্গাইরা এবার ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করল। তারা এসেছিল নিজেদের গায়ের জ্বালা মেটাতে। কিন্তু তখন কে জানত মঙ্গলপুরীর মাত্র একটা কলোনির শিখেরা এভাবে তাদের নাস্তানাবুদ করে, ছাড়বে। দেখলাম, গুলির ভয়ে, লাঠির ঘায়ে, তরোয়াল আর চপারের আঘাতে রক্তাক্ত একদল খুনি প্রাণপণে দৌড়ে পালাচ্ছে! যারা প্রাণ নিতে এসেছিল, তারা এবার নিজেদের প্রাণ বাঁচাতেই দৌড়োল! এভাবে বাজি যে পালটেও যেতে পারে তা হয়তো ওরাও ভাবেনি। ফলস্বরূপ প্রবল প্রত্যাঘাতের ধাক্কায় হাল ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল তথাকথিত ‘দেশপ্রেমিকরা। জখম এবং মৃত সাথীদের দেহ কোনোমতে তুলে নিয়ে ‘দুম দবাকে’ ভেগে গেল সব বীরপুরুষ!

সরতাজ ইস্পাতের মতো কঠিন মুখে একবার পলায়নপর শত্রুদের দিকে তাকাল। তারপর একটুও সময় নষ্ট না-করে দৌড়ে গেল নভজ্যোতদের বাড়ির দিকে। আগুন এবার অন্যান্য বাড়িগুলোর দিকেও লেলিহান জিহ্বা বাড়িয়ে দিয়েছে। সে একটা শব্দও উচ্চারণ না করে ঐ জ্বলন্ত দরজা অদ্ভুত কৌশলে দুটো জোরদার লাথিতেই ভেঙে ফেলল। বাকিরাও ততক্ষণে তৎপর হয়ে উঠেছে। সরতাজ আগুনকে সামলে দ্রুতগতিতে ঢুকে গেল জ্বলন্ত জতুগৃহের ভেতরে। কয়েকজন প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে তার পেছন পেছন ছুটল। আমি দমবন্ধ করে দেখছিলাম, এরপর কী হয়। বাইরে তখন বাপু, তাওজি সমেত গোটা ভিড়টা জমা হয়েছে। তারা যে যেদিকে পারল দৌড়োল। মুহূর্তের মধ্যে একদল লোক বালতিতে জল ভরে নিয়ে এসে পাগলের মতো ঢালতে শুরু করল জ্বলন্ত বাড়িগুলোয়। আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওরা আগুন নেভানোর। কিন্তু ঐ আগুন নেভানো কি সহজ কথা! বালতির পর বালতি শূন্য হচ্ছে। লোকগুলো প্রাণপণে দৌড়ে আবার জল নিয়ে আসছে। তবু যেন অগ্নিদেবের তৃষ্ণা মেটে না!

নভজ্যোত আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় বাপুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছিল। বাপু তাকে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। নভজ্যোতের দাদা আর বাপুও এতক্ষণ দাঙ্গাইদের সঙ্গে হাতাহাতি করতে ব্যস্ত ছিল। ওরা একটু সামনের দিকে থাকার দরুণ জানতেই পারেনি যে বাড়ির এই হাল! এবার দেখতে পেয়ে দু-জনেই পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছিল সেই অগ্নিকুণ্ডে! তাদের বাকিরা হা হা করে উঠে থামিয়েছে। বাপু বললেন, “সরতাজ ভেতরে ঢুকেছে। আরও অনেকেই ঢুকেছে। ভিড় বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। বরং তোমরা এই আগুন নেভানোর বন্দোবস্ত করো।”

“নভজ্যোতের দাদা পবনজ্যোত উত্তেজিতভঙ্গিতে বলল, “ফায়ার ব্রিগেডকে ডাকব?” নভজ্যোতের বাপু তার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে দেখছেন। পবনজ্যোত কালকের সব ঘটনা এখনও জানে না! তার ওদের দোকান বা ব্যাবসা নিয়ে কোনো উৎসাহ নেই, তাই ফায়ার ব্রিগেডের কীর্তিটা অজানাই রয়ে গিয়েছে। তিনি কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। শুধু তাঁর চোখ বেয়ে অসহায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নভজ্যোত নিজে যেহেতু সেই সময়ে দোকানে ছিল এবং সমস্ত পরিস্থিতিটাই খুব ভালো করে জানে তাই সে-ই কান্নাজড়ানো স্বরে বলল, “ফায়ার ব্রিগেড আমাদের ডাকে আসবে না রে। কাল যখন দোকানগুলো জ্বালাচ্ছিল, আজও যখন গুরুদ্বারা জ্বলছিল, তখনও ফায়ার ব্রিগেডকে অনেক লোক ফোন করেছে, খবর দিয়েছে।”

“ওরা আসেনি?”

এবার বাপু প্রশ্নটা করলেন। তিনিও এই তথ্যটা জানতেন না। সকৌতূহলে বললেন, “কী হয়েছিল বল তো পুত্তর? তোদের দোকানেও তো আগুন জ্বালিয়েছিল। তোরা ফায়ার ব্রিগেডকে জানিয়েছিলি?”

“সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়েছিলাম বাপু।” নভজ্যোত সজল দৃষ্টিতে তাকায়, “ওরা বলল, ওদের একটাও গাড়িতে নাকি ডিজেল নেই! শহরের কোনো পেট্রোল পাম্পেই নাকি ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ফায়ার ব্রিগেড আসতে পারবে না। শুধু কালকেই নয়, আজও যখন গুরুদ্বারাগুলো জ্বলছিল, তখন অজস্র লোক ওদের ডেকেছে। এমনকি কাছের অফিসগুলোতে গিয়েও ভিড় জমিয়েছে, শোর শরাবা করেছে। ওদের সবারই এক কথা। কোনো গাড়িতেই নাকি তেল নেই। গাড়িগুলো স্রেফ দাঁড়িয়ে আছে। তাই ওদের কিছু করার নেই। পারলে নিজেরাই আগুন নিভিয়ে নাও। লেকিন… “লেকিন?”

“আমাদের দোকানে যখন ওরা আগুন জ্বালাচ্ছিল, তখন ভুল করে দু-চারজন হিন্দুর দোকানেও আগ লেগেছিল। আগুন তো আর হিন্দু, মুসলিম বা শিখের রেয়াত করে না! আমাদের দোকানের আগুন ওদের দোকান অবধি ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা যখন ফায়ার ব্রিগেডকে ডাকাডাকি করছি, তখন ঐ হিন্দুরাও ঐ একই চেষ্টা করছিল।” নভজ্যোতের চোখে বাষ্প, “বিশ্বাস করবে কি না জানি না। দু মিনিটের মধ্যে সাইরেন বাজাতে বাজাতে দমকলের গাড়ি এসে পৌঁছে গেল স্পটে! হিন্দুদের দোকানগুলোর আগুন খুব সহজেই জল টল মেরে নিভিয়েও দিল। আমাদের দোকান তখনও জ্বলছে। যখন আমরা ওদের অনুরোধ করলাম, তখন বলল, হিন্দুদের দোকানের আগুন নেভাতে গিয়ে ওদের ট্যাঙ্কে নাকি জল শেষ হয়ে গিয়েছে। আমাদের দোকানের আগুন নেভাতে পারবে না। আমরা ওদের পায়ে পর্যন্ত ধরেছি। কিন্তু সেই এক জবাব, ট্যাঙ্কে আর জল নেই। আমাদের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও ওরা নাচার!”

“এ কী জাতীয় ফাজলামি হচ্ছে!” বাপু এবার রেগে গেলেন, “দমকল একটা এমার্জেন্সি সার্ভিস। তাদের গাড়িতে তেল নেই। বললেই হল? যদি তেল না থাকে তবে হিন্দুদের এত্তেলায় এসে হাজির হল কী করে? তারপর আবার যেই শিখদের দোকানের আগুন নেভানোর প্রসঙ্গ এল, তখন আবার জল নেই! জীবনে কেউ শুনেছে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িতে তেল, জলের অভাব পড়েছে!” “কেউ শুনেছে কিনা জানি না।”

সকালে যারা কোনোমতে পালিয়ে এসে এই কলোনিতে হাজির হয়েছিল, তারা তখনও অন্যত্র চলে যায়নি। বরং এই শিখ কলোনির ঘরেই ওরা সবাই আশ্রয় পেয়েছিল। পুরুষেরা সরতাজদের সঙ্গে এতক্ষণ লড়েও যাচ্ছিল দাঙ্গাইদের সঙ্গে। ওদের মধ্যেই একজন জানায়, “তবে আমি শুনেছি পা-জি। সকালেও এই একই কাণ্ড। গুরুদ্বারার আগুন নেভানোর জন্য দমকলের কোনো গাড়িতেই ডিজেল ছিল না। আবার গুরুদ্বারার আগুন যেই পাশের হিন্দুবসতির গায়ে ছ্যাঁকা দিল, অমনি ঐ তেলছাড়া গাড়িই এসে উপস্থিত! তখন যে কোথা থেকে ডিজেল এল কে জানে। ঘটনাও যথারীতি একই। হিন্দুবসতির আগুন নেভানোর পর গুরুদ্বারার জন্য ওদের ট্যাঙ্কেও জল ছিল না!

“এ অসম্ভব।” বাপু বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের কানকেও বুঝি বিশ্বাস করতে পারছেন না, “ওরা এমন করতে পারে না। এটা ভারতবর্ষ। এখানে এমন ভেদ-ভাও করা অসম্ভব! অবিশ্বাস্য!”

“বিশ্বাস করতে শেখো পা-জি।” সেই লোকটিই জবাব দিল, “আরও একটা খবর ‘কান খোলকে সুন লো।’ সকালের অগ্নিকাণ্ডে আর পুলিশের মারে যারা আহত হয়েছিল, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। এটাও তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না, কিন্তু একটু চিকিৎসার জন্য গোটা দিল্লির সমস্ত হাসপাতাল চষে বেরিয়েছি আমরা! একা আমরা নই, বিভিন্ন জায়গার আহত শিখেরা সবাই প্রায় হাসপাতালগুলোর দেওয়ালে মাথা ঠুকছিল। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। চিকিৎসা করা তো দূর, ফার্স্ট এইডটুকুও দেয়নি। যাদের অবস্থা সিরিয়াস, তাদের স্রেফ বাইরে কড়া রোদে মাটির ওপর ফেলে রেখেছে। ওরা বাইরে পড়ে পড়ে মরেছে, তবু একটা বেডও ওদের কপালে জোটেনি। সব হাসপাতালই শিখদের দেখলে তাড়িয়ে দিচ্ছে। গুজব শুনেছি, যে সরকারি থেকে বেসরকারি, সব হাসপাতালেই হুকুম করা হয়েছে, কেউ শিখদের চিকিৎসা করবে না। তাই ডাক্তাররাও আমাদের ছুঁতে ভয় পাচ্ছে!”

আমি ওদের থেকে অনেকটা দুরে থাকলেও যেহেতু ওরা উচ্চস্বরে কথা বলছিল, তাই সবই শুনতে পাচ্ছিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, তখনও আমার বোধশক্তি পরিপূর্ণতা পায়নি। তবু এক বৃদ্ধ মানুষের মতো সবই বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি, সরতাজ থানার ভেতরে, পুলিশ ভ্যানে যে ছেলেটিকে দেখেছিল, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি কেন। পুলিশ জানত, হাসপাতালও এখন হতভাগ্য শিখদের পরিত্যাগ করেছে। আমার বুকের মধ্যে ফের সেই অবুঝ কান্নাটা হাঁকপাক করে উঠল। ‘ওয়াহেগুরু’ও কি তবে আমাদের ত্যাগ করেছেন? এমন কী করে হয় রবজি? সব দরজা একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জন্য পুলিশ নেই, আইন নেই, দমকল নেই। এমনকি ডাক্তারও নেই। তবে এই মানুষগুলো যাবে কোথায়? রবজির কাছেও দুঃখ, কষ্ট জানাতে যেতে পারবে না কারণ সব গুরুদ্বারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। জাহান্নম ছাড়া তবে কি আর কোনো দরজা খোলা নেই? আর সব নষ্টের গোড়ায় বসে আছেন সেই ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর হত্যাকারী ‘গদ্দার’ বেয়ন্ত সিং!

আমার চোখ তখনও নভজ্যোতদের বাড়ির দরজার দিকে স্থির। ভেতর থেকে আগুনের গোলা যেন সব জ্বালা থেকে থেকেই উগরে দিচ্ছে বাইরে। দরজার আশেপাশে কেউ যেতেই পারছে না। কলোনির মানুষগুলোর প্রচেষ্টায় বাইরের আগুন খানিকটা স্তিমিত হলেও ভেতরটা এখনও অনির্বাণ জ্বালায় জ্বলছে। ঐ কয়েকটা মিনিট আমি শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলাম, আমার হৃৎপিণ্ডটাও বুঝি থেমে গিয়েছিল। থেমে গিয়েছিল রক্ত চলাচলও। শিরার ভেতরে হিমশীতল জমাট রক্ত একটু উষ্ণতা, একটু স্বস্তি ও নিরাপত্তা খুঁজছিল। সরতাজরা তো ঐ জ্বলন্ত ফার্নেসের মধ্যে ঢুকে গেল। কিন্তু এখনও কেউ বেরোচ্ছে না কেন? সরতাজেরও দেখা নেই। বাকিরাও যেন ঐ আগুনের মধ্যেই মিলিয়ে গিয়েছে। আদৌ কি কেউ বেরিয়ে আসবে? আর কতক্ষণ এই অসহ্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিটা ‘লমহা’ যেন এক একটা বছরের দৈর্ঘ নিয়ে কাটছিল। আর আমি অসহায়, উদ্বিগ্নদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম নভজ্যোতদের বাড়ির দিকে। এখন তো আর চিৎকার-চেঁচামেচিও শোনা যাচ্ছে না। এই নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতা অসহ্য। এর চেয়ে কিছু তো ঘটুক। কেউ তো আসুক…!

“বেবে!…বেবে!”

নভজ্যোত আর পবনজ্যোত, দু-জনেই ব্যাকুল স্বরে চেঁচিয়ে উঠল। দেখতে পেলাম ঐ জ্বলন্ত দরজা দিয়েই নভজ্যোতের বেবেকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বেরিয়ে আসছে সরতাজ। তার পেছনে একে একে বাকিরাও। ওদের দু-হাতের মধ্যেই নভজ্যোতের দিদি ও পরজাইজি ঝুলছে। দিদি আর ভাবি মারাত্মক জ্বলে গেলেও তবু নড়াচড়া করছে। কিন্তু ওর বেবেকে প্রায় চেনাই যায় না! মোটাসোটা চেহারার টুকটুকে ফর্সা রাশভারি মানুষটির এ কী হাল! এ কি আদৌ সেই হাসিখুশি কলোনির ‘গওহর মা!’ না একটা পুড়ে যাওয়া কাঠের তক্তা।

“আরে, পানি লাও…।”

সরতাজের মুখ বিষণ্ণ। তার পাগড়িতে আগুন জ্বলছিল। বাপু ক্ষিপ্রহাতে জলের বালতিটা তার মাথাতেই উপুড় করে দিলেন। ওর পাগড়ির আগুন নিভে গেলেও বেচারা আপাদমস্তক ভিজে গেল। কিন্তু সরতাজের সেদিকে খেয়ালই নেই। সে নভজ্যোতের বেবেকে সামনের চাতালে শুইয়ে দিয়ে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ওদের বাপু ও দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে মাথা নাড়ল। তারপর মাথা হেঁট করে ফেলল।

সরতাজের ইশারাতেই স্পষ্ট, গওহর মা আর জীবিত নেই। নভজ্যোত পাগলের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ল পোড়া কাঠের মতো লাশটার ওপরে। দু-হাতে জাপ্টে ধরল নিজের মাকে। বুকফাটিয়ে কেঁদে উঠল, “বেবে… বে-বে! আঁখে খোল… আঁখে খোল মা…তুঝে রব…জি কি কসম…মা…মা…অ্যায়সে ছোড়কে মত যা ….আঁখে খোল…!”

সরতাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর কাঁধে হাত রাখে। গওহর মায়ের নাক আর মুখে এখনও লেগে রয়েছে কালো কালো ছোপ! ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে শ্বাস নিতে পারেননি বয়স্ক নারীটি। হয়তো বা আগুনে পোড়ার আগেই মারা গিয়েছিলেন তিনি। তবে দিদি আর ‘ভাবি’ তখনও নড়াচড়া করছে। ভাবি ফিশফিশ করে স্তিমিত স্বরে বলছে, “পানি…পানি….।”

পবনজ্যোত পড়ি কী মরি করে ছুটে গিয়ে জল নিয়ে এল। নিজের স্ত্রী আর বোনের মুখে এক আঁজলা জল দিয়ে ব্যাকুল স্বরে বলল, “কোই না! চিন্তা করিস না পদ্মী। সব ঠিক হয়ে যাবে… সব ঠিক হয়ে যাবে…।”

সরতাজ চিন্তিত মুখে বলল, “এখনই হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। নয়তো বাঁচানো যাবে না।”

‘হসপিটাল’ শব্দটা শুনে প্রত্যেকেই এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। হাসপাতালের করুণ কাহিনি সরতাজ জানে না। একটু আগেও কেউ জানত না। কয়েক মুহূর্ত আগেই সেই বিভীষিকার কথা শুনেছে। এখনও বুঝি অনেকেরই বিশ্বাস হয়নি। তবুও সবাই বোবা দৃষ্টিতে সরতাজের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে বিস্মিত হয়ে বলল, কী হল! তোমরা আমায় এভাবে দেখছ কেন!”

বাপু খুব বিষণ্ণ স্বরে তাকে হাসপাতালের ‘দর্পনাক’ কাহিনি শোনালেন। সরতাজের দু-চোখে অবিশ্বাস, “সে কী! এমন কী করে হতে পারে। শিখদের চিকিৎসা করবে না বললেই হল? ডাক্তারদের কাছে আবার হিন্দু, মুসলিম, ক্রিশ্চান বা শিখ আবার কী? ওরা যে কোনো পেশেন্টের চিকিৎসা করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”

“সেটা তুমি ওদেরই বোঝাও।” সেই লোকটিই এবার বলল, “বিশ্বাস না হলে নিজেই হাসপাতালে গিয়ে মনজরটা দেখো। প্রত্যেকটা হাসপাতালের সামনে একগাদা সর্দারজিদের ভিড় পাবে। কাটা, ছেঁড়া, পোড়া, সব হাসপাতালের সামনেই মাটিতে শুয়ে শুয়ে পচছে। গড়াগড়ি দিচ্ছে, যন্ত্রণায় গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। কেউ ওদের ফিরে দেখছেই না, ইলাজ করা তো দূর। এতক্ষণে বোধহয় প্রায় সবাই বিনা চিকিৎসায় মরে গিয়েছে। শুধু মরে গেলেই বডি তুলে নিয়ে ফেলে দিচ্ছে মর্গে। তার জায়গায় আবার নতুন কেউ আসছে। সেও যতক্ষণ না মরবে ততক্ষণ অবধি হাসপাতালের লোকেরা তাকে ছোঁবেই না। এমনকি গুরু নানক হাসপাতালেরও একই অবস্থা।”

তার মুখে এবার দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের ছাপ। সে একবার তার সহযোদ্ধাদের দিকে তাকাল। এতক্ষণের যুদ্ধে তারাও রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। কারোর বুকে তরোয়ালের আঘাত, কারোর মাথা ফেটে গিয়ে রক্তে চোখমুখ ভেসে যাচ্ছে। ঐ ভিড়ে একটা লোকও নেই যে অক্ষত৷ এদের কী হবে! সরতাজ নিজেও ‘খুন সে লতপত।” একাধিক ক্ষত তারও দেহে। দাঙ্গাইরা আপাতত ভেগে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ‘জখমি’ মানুষগুলোর কি সামান্য চিকিৎসার অধিকারটুকুও নেই ঈশ্বর! ওদিকে চারটে অগ্নিদগ্ধ লাশও যে পড়ে আছে। তাদের কী হবে?

একটা ভাবনা মাথায় আসতেই সরতাজের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে আমাদেরই কলোনির একটি ছেলেকে ডেকে বলল, “সুন ক্কাকে, তাড়াতাড়ি দৌড়ে যা তো ‘এস’ ব্লকে গৌরীদিদির বাড়িতে। ওটা পুরোটাই হিন্দুদের কলোনি, কোনো শিখ পরিবার নেই। ওখানে দাঙ্গাইরা ঢুকবে না। আজ যা পরিস্থিতি তাতে গৌরীদি বোধহয় হাসপাতালে যায়নি। বাড়িতে থাকলে ওকে তাড়াতাড়ি ডেকে নিয়ে আয়।”

গৌরী দিদি বা গৌরী বিশ্বাসকে আমিও চিনতাম। এস ব্লকে, পোস্ট অফিসের কাছেই ওঁর বাড়ি। পেশায় গুরু নানক হাসপাতালের গ্রেড ওয়ান নার্স। আমাদের মতো গরীব মানুষরা কথায়-কথায় ডাক্তারের কাছে যেতে পারে না। তখন গৌরীদিদিই ভরসা। সামান্য জ্বর-জারি, পেটখারাপ, ইত্যাদির চিকিৎসা উনিই বিনামূল্যে করে দিতেন। খুব ‘হাসমুখ’ আর ভালোমানুষও বটে। ডাক্তারদের সঙ্গে এত বছর থেকে থেকে অভিজ্ঞ ও হয়ে গিয়েছেন। আপাতত তিনিই শেষ ভরসা।

অনেক ভরসা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সরতাজ তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিল। কপালগুণে তিনিও আজ বাড়িই ছিলেন। খবর পাওয়া মাত্রই যেটুকু ওষুধ, ফার্স্ট এইড বক্স আর ক্ষতস্থান সেলাই করার সরঞ্জাম ছিল, সব নিয়ে তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন। কিন্তু চতুর্দিকের অবস্থা দেখে তিনি হতবাক। বুঝতেই পারছেন না কী করবেন, কোথা থেকে চিকিৎসা এবং পরিচর্যা শুরু করবেন! সরতাজ বলল, “দিদি, তুমি আগে নভজ্যোতের দিদি আর পরজাইজিকে দেখো। দেখো কিছু করতে পারো কিনা।”

গৌরী নভজ্যোতের দিদি আর পদ্মী কৌরের অবস্থা দেখেই আঁতকে উঠলেন। কয়েক মুহূর্ত কথাও বলতে পারলেন না। তারপর চাপা স্বরে সরতাজকে বললেন, “ভাই, আমি একজন নার্স মাত্র। ডাক্তার নই। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, ওদের চিকিৎসা করা আমার সাধ্যের বাইরে। থার্ড ডিগ্রি বার্ন কেস। ইমিডিয়েটলি হসপিটালাইজ না করলে দু-জনের কেউ বাঁচবে না। ওদের হাতে সময় খুব কম। হসপিটালের বার্ন ইউনিট ছাড়া কেউ ওদের বাঁচাতে পারবে না। আর এখানে যত তোরা ফেলে রাখবি, ততই ইনফেকশন ছড়াবে। সাক্ষাৎ ভগবানও ওদের প্রাণরক্ষা করতে পারবে না। বাকিদের তবু আমি স্টিচ দিয়ে, ড্রেসিং করে ঠিক করতে পারব। কিন্তু এখানে আমারও কিছু করার নেই।”

“দেখো না দিদি, যদি তুমি কিছু করতে পারো।” পবনজ্যোত ভেজা গলায় বলল, “বেবেকে তো বাঁচাতেই পারলাম না। অন্তত যদি দিদি আর পদ্মী বাঁচে।”

গৌরী হতাশভাবে মাথা নাড়লেন, “হসপিটাল ছাড়া সম্ভবই নয় পবন। এ জাতীয় বার্ন কেসে অনেকরকম প্রোটেকশন লাগে। ইনফেকশন আটকাতে হয়। এটা ফুল থিকনেস বার্ন। সার্জিক্যাল হেল্প থেকে শুরু করে কভার, নানারকম ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিবায়োটিকস, আরও অনেক কিছু লাগে যা একমাত্র হসপিটালই দিতে পারে। কথা না বাড়িয়ে এখনই ওদের হসপিটালে নিয়ে যা। যত তুই কথা বাড়াবি, ওদের বিপদ ততই বাড়বে।”

সরতাজ এবার বাধ্য হয়েই হাসপাতালের পরিস্থিতি গৌরীকে জানায়। গৌরীর দু-চোখে অবিশ্বাস, “কী বলছিস সরতাজ! এরকম কী করে হয়? হতেই পারে না। এসব গুজব!”

যে লোকটি এই তথ্যটা দিয়েছিল, সে এবার প্রতিবাদ করে ওঠে, “একদম একশো শতাংশ সত্যি কথা। আপনি নিজেই হসপিটালে গিয়ে দেখুন।”

“বেশ।” প্রবীণ নার্স উঠে দাঁড়ালেন, “চলো তোমরা আমার সঙ্গে। আমরা সবাই গুরু নানক হসপিটালেই যাব। বার্ন পেশেন্টদেরও নিয়ে চলো। আমিও দেখব, হসপিটাল কর্তৃপক্ষ সত্যিই ট্রিটমেন্ট দিতে অস্বীকার করে কিনা। সরতাজ, তুইও চল।”

সরতাজ মাথা নাড়ল, “না দিদি, আমি গেলে চলবে না। আমার মন বলছে, শয়তানগুলো এবারের মতো পালিয়ে গেলেও আবার ঠিক ফিরে আসবে। এবার আরও বেশি ‘তাদাদে’। ‘বদজাত’রা যদি বাধা পায়, বা মার খায় তবে ওদের রাগ আরও বেড়ে যায়। তার ওপর ওদের সঙ্গীদের মধ্যেও কয়েকজন মরেছে। ওরা ছেড়ে কথা বলবে না, বদলা নিতে ফের আসবে। এবার আরও বেশি সংখ্যায়, আরও বেশি ‘ঔজার’ নিয়ে। আমার এখানে থাকা দরকার। তুমি বরং তোমার ফার্স্ট এইড বক্স থেকে কিছু জিনিসপত্র আমায় দিয়ে দাও। আমি সিপাহী মানুষ। প্রয়োজনে নিজেই নিজেকে ফার্স্ট এইড দিয়ে দিতে পারি।”

“সরতাজ।” গৌরী ব্যাকুল স্বরে বললেন, “কেন খামোখা ওদের সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছিস? নিজের অবস্থা তো দ্যাখ! এই অবস্থায় কতক্ষণ লড়বি। তার চেয়ে আমাদের কলোনিতে চল। ওটা হিন্দু কলোনি। কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। ক-টা দিন না হয় আমার বাড়িতেই থাকবি। কেউ জানতে পারবে না। অন্তত যতক্ষণ না এসব ঝামেলা থামছে…!”

“লুকোতে বলছ?” সরতাজ করুণ হাসল, “কতজনকে তুমি আশ্রয় দেবে দিদি? এখানে কলোনির পর কলোনি শিখ! কতজনকে বাঁচাবে? ওদের যদি বাঁচাতেই না পারি তবে আমি একা মুখ লুকিয়ে, প্রাণ বাঁচিয়ে কী করব? আমি ফৌজি, লড়তে শিখেছি। ভাগতে শিখিনি। তুমি বরং দেখো ওদের হসপিটালে অ্যাডমিট করতে পারো কিনা। আমি আর আমার রাইফেল, দু-জনেই এখানেই বসে পাহারা দেব। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ লড়ে যাব।”

গৌরী বুঝলেন সরতাজকে তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরানো যাবে না। অগত্যা তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে বাকিদের নিয়ে চলে গেলেন।

আমি বাড়ির ছাত থেকে তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি তার দিকে। ওর বলা কথাগুলো আমার কানে তখনও বাজছে, “ওরা আবার ফিরে আসবে… আরও বেশি সংখ্যায়… আরও বেশি ঔজার নিয়ে… বদলা নিতে আসবে…।”

ভাবতেই আমার আট বছরের দেহটা বুঝি পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো অনড় হয়ে গেল। আবার আসবে ওরা! আবার হামলা করবে মনুষ্যরূপী পশুরা! খুন কা বদলা খুন! চক্রাকারে এই বদলা, প্রতিশোধ চলতেই থাকবে। এর কোনো বিরাম নেই! কতক্ষণ চলবে এই অকারণ নরমেধযজ্ঞ! যতক্ষণ না কলোনির সবাইকে মেরে ফেলছে, ততক্ষণ থামবে না ওরা! মারবে… কাটবে… জ্বালাবে! ব্যর্থ হলে বারবার ফিরে আসবে! আমাদের কাউকে ছাড়বে না। কাউকে না। কেউ বাঁচবে না… আমার বাপু, তাওজি, বেবে, দিদি, সরবজিৎ-আমনপ্রীত প্রা-জি, সরতাজ, নভজ্যোত, এমনকি আমিও না!

আমার ছোট্ট বুকটার মধ্যেই ভয়াবহ আতঙ্ক তাণ্ডব শুরু করল। প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে, তবু চোখের জলও বুঝি ভয়ে বাষ্প হয়ে যাচ্ছে। কেরোসিন তেল পোড়ার মিষ্টি গন্ধটায় আমার নেশা হত। গন্ধটা খুব প্রিয় ছিল। এখন চতুর্দিকে শুধু কেরোসিন তেল আর মাংসপোড়ার কটু গন্ধ! ঐ গন্ধটা যে এমন ভয়াবহ রূপ ধরতে পারে তা কে জানত! ঐ স্টোভের সুবাসে আমার বুক ভরে যেত। আর এই দুর্গন্ধে ভীষণ বমি আসছে। এই কেরোসিনের ‘খুশবুতেও বুঝি ঘেন্না ধরে গিয়েছিল ঐ মুহূর্তেই। সহ্য হচ্ছে না! আর সহ্য হচ্ছে না এই ‘বদবু।’

আমার চোখের সামনেই সরতাজ মৃত মানুষগুলোর পরিবারকে একে একে দুঃসংবাদ দিল। মেয়েরা সব ঘরের ভেতরে জানলা দরজা বন্ধ করে ছিল, তাই বাইরে কী হচ্ছে জানতে পারেনি। যখন জানল তখন গোটা কলোনি সচকিত হয়ে উঠল তাদের আকুলি-বিকুলি কান্নায়। সফেদ পাউডারে জ্বলে যাওয়া, জ্যান্ত গলে যাওয়া স্বামীদের পাশে বসে মাথা ঠুকে, বুক চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল হতভাগিনীরা। ওদের মধ্যে একটি ছেলে ছিল, যার কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে! তিনদিন আগেই সবে ‘সুহাগরাত’ কেটেছে। বউয়ের হাতের মেহেন্দি এখনও ফিকে হয়নি। অথচ যার নামের মেহেন্দি, সেই মানুষটাই পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে! আমি দেখলাম, সেই সদ্যবিবাহিতা মাটিতে হাত আছড়ে আছড়ে সযত্নে পরানো লাল টুকটুকে ‘চুড়া’ ভাঙছে। যে হাত মেহেন্দিতে লাল ছিল, সেই হাত চুড়ার ভাঙা কাচে কেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। দু-হাতে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্তবিন্দু দেখা দিল। কর্তার সিং-এর বউও কাচের চুড়ি কপালে মেরে মেরে ভাঙল। ওরও কপাল, হাত বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বেসামাল কান্না সারা কলোনিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে! ওঃ! আর কত কান্না শুনতে চায় দিল্লির আকাশ বাতাস! আর কত রক্তপান করবে দিল্লির মাটি।

এত কিছুর মধ্যেও প্রচণ্ড জেদে অনড় হয়ে বসে আছে সরতাজ সিং! চোখে ভীষণ সাহস! হাতে জাগ্রত রাইফেল। একাই পাহারা দিচ্ছে গোটা কলোনিটাকে! সেই সরতাজ…!

সরতাজ নাকি অধিরাজ? নাম আলাদা, রূপ আলাদা, অথচ মানুষটা একই। ও জানে, প্রত্যাঘাত আসবে, আরও জোরে, আরও দ্বিগুণ বেগে…! আততায়ী বারবার ফিরে আসবে। ওর সাথীদের মারবে, ওকেও মারবে। কিন্তু তবু অসম্ভব জেদে পাহারা দিয়ে চলেছে। সেই সিংহবিক্রম। সেই রাগ। সেই তেজ! সেই ঔদ্ধত্য!

নাঃ। আবার আক্রমণে যেতে হবে। আমারও যে ছুটি নেই! ঘড়ির কাঁটা একটু একটু করে এগোচ্ছে আর মনে করিয়ে দিচ্ছে, এ জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত অনিশ্চিত। কখন কী ঘটবে, কেউ জানে না। এরপরে কী হবে আমিও জানি না, অধিরাজ ব্যানার্জিও না।

“না ম্যায় জানু, না তু জানে, কিস ঘড়ি মেঁ, হোনা হ্যায় ক্যায়া। জিন্দেগি কি, ইস জুয়ে মেঁ, পানা ক্যায়া হ্যায়, খোনা হ্যায় ক্যায়া…!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *