(১৫)
প্রণবেশ লাহিড়ী অফিসার টুইঙ্কল অরোরা হিসাবে যা বলেছিলেন তার সবটাই একদম সঠিক। বিন্দুমাত্রও অত্যুক্তি করেননি তিনি। সত্যিই মেয়েটির হাত ওর মুখের চেয়ে বেশি চলে। সে প্রথম দর্শনেই শুধু মৃদু স্বরে বলল, “অফিসার টুইঙ্কল অরোরা রিপোর্টিং স্যার। বিগ ফ্যান।”
সে যে অধিরাজের মুগ্ধ ভক্ত সেটা যতটা না তার মুখে প্রকাশ পেল, তার থেকেও বেশি বোঝা গেল করমর্দনে। অধিরাজ তার দিকে সৌজন্যবশত হাত বাড়িয়ে দিতেই এমনভাবে খপ করে চেপে ধরেছে তার হাত যে অর্ণবের মনে হল, স্যারের হাতটাই বুঝি ভেঙে গেল! নিজের পরিচয় যতটা সংক্ষেপে দিল মিস্ অরোরা, ঠিক ততটাই দীর্ঘ তার করমর্দন! ঐ লম্বা হ্যান্ডশেকের ঠ্যালায় অর্ণবেরই প্রায় দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়! ম্যারাথন হ্যান্ডশেক করতে করতেই মিস্ অরোরা বললেন, “আপনার সঙ্গে কাজ করা আমার স্বপ্ন স্যার। বলুন কী করতে হবে।”
অধিরাজ অসহায়কণ্ঠে বলল, “আমি তখনই আপনাকে কিছু বলতে পারব সেনোরিটা, যখন আপনি আমার হাত ছাড়বেন।”
“ওঃ। স্যরি…..!” টুইঙ্কল তার হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, “স্যরি স্যার, আমি আসলে ওভার এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম। বাট আই মাস্ট সে, আপনার হাত অসম্ভব নরম! আর এত বড়ো সাইজের, এত চোখ ধাঁধানো হীরে আমি জীবনে এই প্রথম দেখছি। আপনার সুন্দর আঙুলে চমৎকার মানিয়েছে দুটোই।”
এরকম কমপ্লিমেন্ট পেয়ে অধিরাজের খুশি হওয়া উচিত না দুঃখিত, তা ভেবে পেল না সে। দুই হাতের দুটো হীরের আংটিই তার বাবার দেওয়া। এতে তার নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই। এর মধ্যে একটা হীরে এখন সম্ভবত দুর্মূল্য। এটা বংশানুক্রমে এ বাড়ির পুরুষেরা ধারণ করে আসছে। বাবার মুখে শুনেছে, যখন তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ এই হীরেটি কিনেছিলেন, তখনই এর দাম লক্ষ টাকারও বেশি ছিল। বাবার আঙুলে আংটি স্যুট করে না বলে তিনি নিজে কখনও পরেননি। কিন্তু সম্প্রতিই সেটাকে তিনি আধুনিক স্টাইলের আংটিতে বসিয়ে ছেলেকে পাকড়াও করে পরিয়ে দিয়েছেন। টুইঙ্কল ঠিকই বলেছে। এত বড়ো সাইজের হীরে এখন চট করে দেখা যায় না। আর অন্য হাতের লোটাস ডায়মন্ডটিও বাবারই কাজ। ওঁর মতে, হীরে নাকি পজিটিভ এনার্জি দেয়। তাই যত রাজ্যের পজিটিভ এনার্জি ছেলেকেই দিয়ে রেখেছেন। দুটোই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলতে থাকে। সে এ বিষয়ে কী বলবে ভেবে না পেয়ে স্মিত হেসে বলল, “অ্যান্ড ইউ হ্যাভ আ ভেরি স্ট্রং গ্রিপ।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
টুইঙ্কলকে ভালোভাবে মেপে নিচ্ছিল অর্ণব। মেয়েটি আত্রেয়ী বা কৌশানীরই সমবয়েসীই হবে। কিন্তু ওকে দেখে প্রথমেই ছেলে না মেয়ে সেটাই বুঝতে পারেনি সে। একদম ছোটো করে ছাঁটা তামাটে চুল। চওড়া কাঠামোর একটু কঠিন মুখ। পুরুষালি চৌকো চোয়াল তার স্বভাবের দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। টুইঙ্কল ফুলহাতা শার্ট পরে থাকলেও শার্টের তলা থেকেই তার পেশিগুলো বেশ বোঝা যায়। চওড়া বাইসেপস যে কোনো পুরুষকেও লজ্জিত করবে। দৈর্ঘ আন্দাজ পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি। ওজন পঁচাশি কেজি তো হবেই। তারও বেশি হতে পারে। রীতিমতো দারা সিং এর মহিলা ভার্সান। মেয়েদের দৈহিক বাঁকগুলো প্রায় নেই, তাই কোমলতাও নেই। ইনি কোনোভাবেই সানি লিওনির গোষ্ঠির নন বরং সানি দেওলের গোত্রে পড়েন। বসের হাত ও হীরে নিয়ে তার যা ইন্টারেস্ট, কেস স্টাডিতে তার দশ পার্সেন্ট থাকলেও কাজ হত।
“আমরা এখনই কোমল কৌরের বাড়ি যাব। কোমল কৌরের হিস্ট্রি অর্ণব আপনাকে ব্রিফ করে দেবে। আপনাকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হবে মিস্ অরোরা। আমাদের লেডি অফিসাররা অন্যত্র ব্যস্ত আছেন। তাই আপনাকেই একটু কষ্ট করতে হবে। তবে তার পাশাপাশি আপনার আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজও আছে। সেটা পরে জানাচ্ছি।” অধিরাজ সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে-করতেই দেখল টুইঙ্কল অবিকল মেছো বিড়ালের মতো জুলজুল করে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। সে ব্যাপারটা বুঝে প্যাকেটটা তার দিকে এগিয়ে দিতেই মিস্ অরোরা মাথা নাড়ল, “না স্যার। আমি সিগারেট স্মোক করি না। আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আমি একটা চুরুট খেতে চাইব। ওটাই আমার ব্র্যান্ড। সঙ্গেই আছে। তবে আমি কি আপনার সামনে স্মোক করতে পারি? কারণ লাহিড়ীস্যার একদমই অ্যালাউ করেন না তাই…।”
অধিরাজ খুব নম্রভাবেই বলল, “ইয়েস…ইয়েস…অফকোর্স। ইউ ক্যান।”
অর্ণবের বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টির সামনে টুইঙ্কল তার চুরুটের বাক্স বের করল। তারপর ইয়া মোটাসোটা একটা চুরুট মুখে দিয়ে লাইটারের খোঁজে প্যান্টের পকেট হাতড়াচ্ছিল। তার আগেই অধিরাজ সসম্মানে নিজের লাইটারটা জ্বেলে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, “লেট মি হেল্প ইউ সেনোরিটা।”
টুইঙ্কল রীতিমতো অবাক হল। সচরাচর কোনো পুরুষের কাছ থেকে এমন স্বাভাবিক ব্যবহার সে কখনও পায়নি। কিন্তু চুরুটটা নির্বিবাদে ধরিয়ে সে খুব সাবধানে ধোঁয়া ছাড়ল।
আর যা-ই হোক, টপ বসের মুখে ধোঁয়া ছাড়াটা ভদ্রতা নয়। একটু শ্রদ্ধামাখানো আন্তরিক স্বরে বলল, “এতদিন শুধু শুনেছিলাম। এখন স্বচক্ষে দেখছি। আপনি সত্যিই অসাধারণ।”
“অসাধারণত্বের কিছুই নেই মাদমোয়াজেল।” সে নিজের সিগারেটটা ধরিয়ে নির্বিকারভাবেই বলে, “অর্ণব আর মিস্ দত্ত ছাড়া আমরা সকলেই স্মোকার। অর্ণব আগে তবু স্ট্রেস-রিলিফের জন্য মাঝেমধ্যে একটা দুটো টেনে দেখত। পোষায়নি, তাই আর আমাদের মতো নেশা বাঁধায়নি। ইনফ্যাক্ট যিনি আপনাকে স্মোক করতে অ্যালাউ করেন না, সেই প্রণবেশ লাহিড়ীও নিজেই একজন চেইন স্মোকার। আমরা সকলেই জানি যে অভ্যাসটা আমাদের কারোর পক্ষেই ভালো নয়। তবু নিকোটিন ছাড়া এতখানি ধকল নেওয়াও চাপের। বারবার অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। আপনি শান্তিতে স্মোক করতে পারেন। টি বা কফি, কিছু নেবেন?”
“নো থ্যাঙ্কস।”
টুইঙ্কল একটু হেসে নিজের প্রমাণ সাইজের চুরুটে মন দেয়। হাবেভাবেই স্পষ্ট যে সে মাড়ু স্মোকার। তাকে হুশহুশ করে চুরুট টানতে দেখে অর্ণবের চক্ষু চড়কগাছ। সে ঢোঁক গিলে অধিরাজকে আস্তে আস্তে বলে, “নন স্মোকারদের দলে কৌশানী বোসের নাম বলতে আপনি ভুলে গিয়েছেন স্যার।”
“ভুলিনি অর্ণব।” অধিরাজ মুখ টিপে হাসছে, “তোমায় কে বলল মিস্ বোস তোমাদের দলে?”
“মানে?” সে চোখ ব্ৰহ্মতালুতে তুলে ফেলে, “উনিও …!”
“বেশ কয়েকবার ব্যুরোর ছাতে ওঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে স্মোক করতে দেখেছি। ব্র্যান্ডটা সম্ভবত মার্লবোরো। আমার কোনো প্রবলেম ছিল না। কিন্তু যতবার উনি ধূমপানরত অবস্থায় আমার মুখোমুখি হয়েছেন, ততবারই হাতটা হয় আড়াল করেছেন, নয়তো সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন।” সে দেবশিশুদের মতো পেটেন্ট হাসিটা হাসল, “আমার মনে হয়েছে, হয়তো উনি আমাকে নিজের স্মোকিং এর বিষয়টা জানাতে চান না। তাই আমিও ওঁকে জানাইনি যে আমি ব্যাপারটা জানি, কিংবা ওঁর গা থেকে ধোঁয়ার গন্ধটাও পেয়েছি। যে জানাতে চায় না, তাকে বিব্রত করার কী দরকার?”
“তা ঠিক।” অর্ণব আর কথা বাড়ায় না। মিস্ বোসের সিগারেটের ব্র্যান্ড জানার তার কোনো ইচ্ছে নেই। তবে বেশিরভাগ পুরুষদের মতো সে-ও মেয়েদের সিগারেট খেতে দেখলে খুব অস্বস্তিতে পড়ে। এর বিশেষ কোনো কারণ নেই। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, ধূমপায়ী নারীদের একটু এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসে। এই সোশ্যাল ট্যাবুটা সে কিছুতেই কাটাতে পারে না। তাই প্রসঙ্গ পালটাল, “কোমলজির বাড়ির সার্চ ওয়ারেন্ট আর অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট এসে গিয়েছে স্যার। লোকাল পুলিশকে ফোন করব?”
“হ্যাঁ। ওদের টিমের ব্যাক-আপও লাগবে। রেডি থাকতে বলে দাও।”
অর্ণব মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একজন মহিলা টপ বসের নাকের সামনে বসে হুশহাশ করে ধোঁয়া ছাড়ছে, এটা তার অসহ্যই ঠেকছিল। তাই সুযোগ পেয়ে মোবাইল নিয়ে কেবিনের বাইরেই চলে গেল। টুইঙ্কল সাবধানে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “কখন বেরোতে হবে স্যার?”
“আপনার চুরুটটা শেষ হলেই বেরিয়ে পড়ব।”
“ইন দ্যাট কেস, আই অ্যাম ডান।”
অর্ধদগ্ধ চুরুটটাকে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতে যাচ্ছিল টুইঙ্কল। তার তৎপরতা দেখে মুচকি হাসল অধিরাজ, “সাউন্ডস গ্রেট। কিন্তু ওটাকে ফেলে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। এনজয় দ্য পাফ। আপনি রাস্তাতেই আরাম করে ওটা টেনে নিতে পারেন। মৌতাত অসম্পূর্ণ রাখার কোনো দরকার নেই।” বলতে বলতেই সেস সিগারেট হাতেই উঠে দাঁড়িয়েছে, “লেটস গো। কিন্তু আপনি কি জানেন যে আমরা এখন ফোর হুইলার ইউজ করছি না?”
“জানি স্যার।” টুইঙ্কলের দ্রুত জবাব, “আমি আঠেরো বছর বয়েস থেকেই বাইক চালাই। লং ট্রিপও করি। লাহিড়ীস্যার আমাকে আগেই বলেছেন।”
অধিরাজ মিষ্টি হাসল, “ওয়াও।”
সারা রাস্তা আর বিশেষ কোনো কথা হল না। অর্ণব কোনোদিনই বাইকে খুব কমফর্টে নয়। সে ফোর হুইলার চালাতেই ভালোবাসে। কিন্তু একজন মহিলা হাতে ধূমায়িত সিগার নিয়ে পাল্লা দিয়ে বাইক চালাচ্ছেন দেখে সে ইমপ্রেসড হবে না চটে লাল হবে বুঝতে পারছে না। একরকম বিরক্তিমাখানো সুরেই অধিরাজকে বলল, “স্যার, ইনি তো দিব্যি স্মোক করতে করতে বাইক চালাচ্ছেন!”
অধিরাজ নির্বিকার, “তোমার কোনটায় অসুবিধে হচ্ছে? স্মোকিং-এ না বাইক চালানোয়?”
“আমার কেমন যেন অকওয়ার্ড লাগছে!”
নিজের অস্বস্তির কথা বলেই ফেলল অর্ণব। শুরু থেকেই এই লেডি অফিসারটিকে তার একেবারেই পছন্দ হয়নি। প্রণবেশ লাহিড়ী আর কাউকে রেফার করার জন্য খুঁজে পেলেন না। এই ‘শিখনী’কেই তার পছন্দ হল। হবে না-ই বা কেন? তিনি নিজেও যেমন তথাকথিত ‘রাবণ’, তেমন ‘হিড়িম্বা’-ই তো ওঁর ফেভারিট হবে।
“তোমার এইজন্য অকওয়ার্ড লাগছে, কারণ উনি একজন মহিলা। নয়তো আমিও তো স্মোক করতে-করতেই বাইক চালাচ্ছি।” অধিরাজ খুব শান্তভাবেই সিগারেটটায় শেষ সুখটান মেরে রাস্তার পাশের একটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল, “সোশ্যাল ট্যাবু এখনও তোমার মধ্যে এখনও একটু রয়েই গিয়েছে ডার্লিং। ওঁর হ্যাবিটে কী আসে যায়? উনি আমাদের সঙ্গে রয়েছেন তার কারণ উনি একজন ভালো অফিসার। লেডি না ল্যাডা, স্মোকার না ননস্মোকার, তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। তাছাড়া আমরা সবাই জানি যে ইউনিফর্মে স্মোক করা বারণ। কিন্তু ইউনিফর্ম আমরা কালেভদ্রেই পরি। আপাতত কেউ ইউনিফর্মে নেই, তাই বে-আইনি কিছুও করছেন না। ফরগেট ইট।”
অধিরাজ যত সহজে ‘ফরগেট ইট’ বলে হেলমেটটা টেনে দিয়ে অনায়াসেই নির্লিপ্তির সঙ্গে ব্যাপারটা গ্রহণ করল, অর্ণব ঠিক ততটা পারল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসেই রইল। আপাতত টুইঙ্কলের চুরুটের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোমল কৌরের বাড়ি। খবরিদের সমস্ত টিপই ওই ভদ্রমহিলার দিকে ইশারা করছে। ভাবতেই অর্ণবের বুক ঢিপঢিপ করে ওঠে। না জানি তিনি কী বস্তু হবেন! বার্নিং শিখ নিজে যে লেভেলের ডেঞ্জারাস, তার সঙ্গীও হয়তো কিছু কম যান না। কে জানে, তার বাড়িতে কী অপেক্ষা করছে।
পঁয়তাল্লিশ নম্বর বাড়িটা খুঁজে পেতে বেশি সমস্যা হল না। অর্ণব লক্ষ্য করছিল যে কলোনির বেশিরভাগ লোকই কোমল সিং ভল্লাকে চেনে। এখানে শুধু পাঞ্জাবি বা শিখদের বসতি নয়, অন্যান্য অবাঙালি বাসিন্দারাও দিব্যি মিলেমিশে রয়েছে। তবে ওদের দেখে সকলের চোখেই একটা কৌতূহল ফুটে উঠছিল। বাড়ির কাছাকাছি যেতে-না যেতেই চোখে পড়ল পুলিশের জিপ। লোকাল পুলিশও তবে চলে এসেছে।
কোমল কৌরের বাড়িটা বিরাট। দেখলেই বোঝা যায় যে প্রচুর টাকার মালকিন। কিন্তু কেমন যেন বেখাপ্পা টাইপের। বাড়ির প্ল্যানিং খুবই খারাপ! কোনোরকম ঢক-পদ নেই। দেখলে বাড়ি কম, একটা বিটকেল দূর্গ বলেই বেশি মনে হয়। সবচেয়ে যেটা বিরক্তিকর, অত বড়ো বাড়িটায় মাত্র হাতে গোণা কয়েকটা জানলা! তা-ও সাইজে এত ছোটো যে হাওয়াও ঢোকার আগে পাঁচবার ভাববে যে ঢোকা উচিত হচ্ছে কিনা! জেলের সেলগুলোর জানলার আকারও বোধহয় এর দ্বিগুণ। সামনের লোহার গেট আর উঁচু পাঁচিল দেখে অর্ণবের ডঃ চৌধুরীর মেন্টাল অ্যাসাইলামের গেটটার কথা মনে পড়ে গেল। এই গেট আর পাঁচিল স্বয়ং প্রভু হনুমানও ডিঙোতে পারবেন কিনা সন্দেহ স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের ওসি সূর্যনারায়ণ মল্লিক তাঁর দলবল নিয়েই অপেক্ষা করছিলেন। অধিরাজকে দেখেই সহাস্যে এগিয়ে এলেন। প্রাথমিক সৌজন্যপর্ব খুব সংক্ষেপে সেরে নিয়ে তিনি জানালেন, “আমরা কোমলের সম্পর্কে আরও একটু বিস্তারিত তথ্য জেনেছি। ১৯৮৪ সালে যখন দাঙ্গাটা হয় তখন ওঁর বয়েস দশ বছর ছিল। ঐ সালেই উনি কলকাতায় আসেন। নিজের পিসি ও পিসেমশাইয়ের সঙ্গে থাকলেও তিক্ত অতীতের স্মৃতি ওঁকে কখনোই ছাড়েনি। যারা যারা ভদ্রমহিলাকে চেনে, তাদের সকলেরই একটাই মতামত। কোমল সিং ভল্লা অত্যন্ত পিকিউলিয়ার টাইপের মানুষ। এত বছর ধরে কলকাতায় আছেন, পড়াশোনা করেছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গিয়েছেন, দুরন্ত রেজাল্টও করেছেন, গোটা যৌবন কাটিয়েছেন, কিন্তু তাঁর জীবনে একটিও বন্ধু বা বান্ধবী নেই। এখানকার পুরোনো বাসিন্দারা বলছিল, কোনোদিন ওরা ওঁকে হাসতে দেখেনি। যখন কোমলের পরমাত্মীয় পিসি ও পিসেমশাইয়ের দেহান্ত ঘটেছিল, তখন তিনি একফোঁটা চোখের জলও ফেলেননি! এমনকি ওঁর চাকর-বাকরেরাও বলে, ম্যাডাম কখনও হাসেন না, কখনও কাঁদেনও না। সবসময়ই অদ্ভুত নির্বিকার মুখ। আর সবসময়ই কী একটা রাগে যেন জ্বলছেন। বাড়ির মেড, সার্ভেন্টরা ওঁর মুখের চোটে টিকতে পারে না।”
“বাপ রে।” অধিরাজ ফের অন্যমনস্ক, “ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার!”
“শুধু তাই নয়।” অফিসার মল্লিক কন্টিনিউ করলেন, “সম্ভবত ভীষণ প্যারানয়েডও। বাইরের লোক ওঁর বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মারবে এটা একেবারেই পছন্দ করেন না। ঐ যে ছোটো ছোটো খুপরিমার্কা জানলা দেখছেন, ওগুলো আগে ছিল না। একদম বড়ো বড়ো চওড়া এবং খোলা জানলাই ছিল। এবং সংখ্যায়ও অনেক বেশি ছিল। পিসির মৃত্যুর পর কোমল মিস্ত্রি ডেকে নাইন্টি পার্সেন্ট জানলাই সিল করে দিয়েছেন। অত বড়ো বাড়িটায় ন্যূনতম অক্সিজেন ঢুকতে যতখানি স্পেস লাগে, ততখানি চওড়া ছোট্ট সুড়ঙ্গ টাইপের জানলা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর নাকি ভয়, বেশি জানলা থাকলেই প্রতিবেশীরা বাড়ির মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারবে। ভেতরে কী কী আছে দেখে ফেলবে। দুনিয়ার কাউকে বিশ্বাস করেন না। যাতে তাঁকে কেউ না দেখে ফেলে, বা তাঁর আসা-যাওয়ার ওপর কেউ নজর রাখতে না পারে, সেজন্য রাতেই বেরোন। দিনের আলোয় লোকে ওঁকে বহুবছর দেখেনি। ওঁর পার্সোনাল মেড বা সার্ভেন্টদের কাছ থেকে যতটুকু বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে, তাতে বোঝা গেছে যে ভদ্রমহিলা ওবেসিটির পেশেন্ট। ওজন প্রায় দুশো কুড়ি কেজির কাছাকাছি। ডাক্তাররা আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছেন যে আরও কিছুটা মোটা হলে উনি আর এই ধরাধামেই থাকবেন না। তাতে কিঞ্চিৎ খাওয়ার পরিমাণ কমেছে বটে, কিন্তু নড়াচড়া করার ব্যাপারে প্রায় শালগ্রাম শিলা। আপনার মনে হয়, এ জাতীয় চরিত্র বার্নিং শিখের পৃষ্ঠপোষকতা করবে বা তাকে বিশ্বাস করবে?”
“শুধু মনেই হয় না অফিসার…।” সে দৃঢ়স্বরে বলল, “চরিত্রটি শোনার পর আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই জাতীয় মানুষই একমাত্র বার্নিং শিখকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে সাপোর্ট করবে। চলুন, আর দেরি না করে যাওয়া যাক। আশা করি পুলিশকে দেখে উনি আর যা-ই হোক, চোর ভেবে বাইরে বের করে দেবেন না। মন্দিরে এসে শালগ্রাম শিলার দর্শন করাটা আবশ্যিক।”
কিন্তু বাড়ির ভেতর ঢুকতে যাওয়ার আগেই বাধা। বাইরের গেটে পেল্লায় একটা তালা ঝুলছে। কোনো গেটকিপারও নেই। সম্ভবত সে-ও ছুটিতে গিয়েছে। অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকায়, “তুমি তো তালা স্পেশালিস্ট। জিনিসপত্র আছে কিছু?”
অধিরাজের কথা সম্পূর্ণ সত্যি। একটুকরো তার, পিন বা মেয়েদের চুলের কাঁটা জাতীয় কোনো পদার্থ পেলে অর্ণব অনায়াসেই যে কোনো তালা খুলে ফেলতে পারে। সে অধিরাজের কথার উত্তরে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই একটা প্রচণ্ড আওয়াজ! গেটের প্রমাণ সাইজের তালা ভেঙে দু টুকরো হয়ে পড়ে গেল। ওরা সবিস্ময়ে দেখল টুইঙ্কল তার ধোঁয়া ওঠা আগ্নেয়াস্ত্রে ফুঁ মারছে, “তালা ছিল। এখন আর নেই স্যার!”
এই মহিলা বোধহয় মশা মারার জন্য বোফর্স কামান আমদানি করেন! অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দরজা খুলে ভেতরের দিকে গটগট করে হাঁটা মারল। তার পেছন পেছন পুলিশবাহিনী। টুইঙ্কলের এই আচমকা দিদিগিরি আর দুমদাম কাজ করা দেখে অর্ণব মর্মান্তিক চটেছে! একটা সামান্য তালা খোলার জন্য বুলেট নষ্ট করার কোনো মানে হয়! আর পাখি যদি ভেতরে ঘাপ্টি মেরে বসেও থাকে, তবে ফায়ারিং এর আওয়াজ শুনেই পালিয়ে যাবে। কলোনির লোকেরাও হয়তো আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। খামোখা আনতাবড়ি ফায়ার করে মানুষকে অতিষ্ঠ করাটা কী ধরনের স্টাইল। আপনমনেই গরগর করতে-করতে সে অধিরাজের পশ্চাদ্ধাবন করে। অফিসার মল্লিকের টিমেও দু-জন মহিলা কনস্টেবল ছিল। অধিরাজ একটু পিছিয়ে এসে তাদেরই আগে যেতে দিল, “আপনারাই লিড করুন। কোমল কৌর যেহেতু একজন নারী, তাই তার সঙ্গে লেডি অফিসাররাই আগে কথা বলে নিক।”
“প্রয়োজনে চড়-থাপ্পড় মারা অ্যালাউড?” টুইঙ্কল বলল, “যতটুকু শুনলাম, মনে হয় না সোজা আঙুলে ঘি উঠবে।”
তার কথা শুনে অধিরাজ হেসে ফেলল, “আপনার হাত আটকে রাখবে, এমন লোক এখনও জন্মায়নি। তবে প্রথমে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করাই ভালো।”
কোমল কৌরের বাড়িতে ঢোকা সত্যিই কঠিন। প্রথমেই গেটে ওরকম জগদ্দল একটা তালা। তার ওপর বেশ কয়েকবার বেল বাজিয়েও কোনো সাড়া মিলল না। এমনিতেই পুলিশদের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার অভ্যাস নেই। ডোরবেল বাজিয়েও যখন কাজ হল না, তখন টুইঙ্কলই অধৈর্য হয়ে গুমগুম করে দরজার গায়ে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিল। তার ধাক্কাধাক্কির ঠ্যালায় মরা মানুষও বোধহয় উঠে এসে দরজা খুলে দেবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সে-ও ব্যর্থ।
বেশ কয়েকবার দরজায় ধাক্কা আর ঘুষি মেরে শেষে মহাবিরক্ত হয়ে মিস্ অরোরা বলে, “দরজা ভেঙে দেব?”
রীতিমতো বিধ্বংসী মহিলা। অধিরাজ খুব শান্তভাবেই মাথা নাড়ে, “না সেনোরিটা। আর একটু অপেক্ষা করি। একেই ঘরে কোনো চাকর-বাকর নেই। তার ওপর ভদ্রমহিলার ওজন প্রায় দুশো কুড়ি। অতখানি ওয়েট নিয়ে নড়াচড়া করতেও তো সময় লাগবে! আপনার হাত যদি নিতান্তই সুড়সুড় করে, তবে কলিংবেলটার সঙ্গেই একটু ‘কুচুপুচু’ করে নিন।”
কুচুপুচু আবার কী! অর্ণব এবার সত্যিই রেগে লাল। এই মেয়েটাকে এত লাই দেওয়ার কী হয়েছে! ওর কাণ্ড দেখেই তো মেজাজ গরম হয়ে যায়। কথা নেই বার্তা নেই, দুমদাম ফায়ারিং করে! সবসময়ই ভাঙাভাঙির তালে আছে। আর স্যার ওকে সহ্যই বা করছেন কী করে? শুধু সহ্যই নয়, রীতিমতো প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার প্রশ্রয় পেয়েই টুইঙ্কল ফের ডোরবেলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তার বেল দেওয়ার চোটে পুলিশদেরই কানে তালা লাগার জো! কলিংবেলটার প্রাণ থাকলে সে এতক্ষণের অত্যাচারে স্রেফ পালিয়ে যেত।
একটা অদ্ভুত সন্দেহে অধিরাজের ডান ভুরুটা একটু ওপরে উঠে গেল। ভদ্রমহিলা বাড়িতেই আছেন তো? নাকি কোথাও কেটে পড়েছেন? সে সন্দেহ প্রকাশ করার আগেই এই প্রথম ভেতর থেকে এক কড়কড়ে নারী কণ্ঠস্বর ধমকে উঠল; “আরে খোওেয়া। জান লেগা ক্যায়া! আতি হুঁ।”
অধিরাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, “ওঃ ঈশ্বর। কলিংবেলের আওয়াজ অবশেষে ওনার কানে গেল!”
আরও মিনিট দুয়েকের অপেক্ষা। তারপর খট করে দরজা খোলার আওয়াজ। সামনে যিনি প্রকট হলেন, তাকে দেখে রীতিমতো ভয়ই করে। নিঃসন্দেহে ইনিই কোমল সিং ভল্লা! কারণ খোদ কলকাতার বুকে এমন গন্ধমাদন একটার বেশি আমদানি হয় না। উনি পাঁচটা কেন, দশটা পরোটা খেলেও অর্ণব আশ্চর্য হত না। তিনটে পরোটাই বরং ওর জন্য অস্বাভাবিক! পাখির আহার!
অধিরাজ একদৃষ্টে কোমলের দিকে তাকিয়েছিল। টকটকে ফর্সা রং। বহুদিন সূর্যের আলো যে ওঁকে স্পর্শ করেনি তা পান্ডুর ফ্যাকাশেভাবেই স্পষ্ট। তাঁর চোখ মুখের আদল বলে দেয় যে যৌবনে সুন্দরী ছিলেন। এখনও হয়তো দেখতে ওঁকে এতটা অদ্ভুত লাগত না, যদি ওঁর মুখে মিনিমাম এক্সপ্রেশনটুকুও থাকত। পৃথুলা, অথচ সুন্দরী মহিলার সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু এমন ভাবলেশহীন চেহারা রোবটের হতে পারে, মানুষের হওয়া অসম্ভব। বড়ো বড়ো চোখদুটোর দৃষ্টি পাথরের মতো কঠিন ও শীতল। মুখে একটাও ভাঁজ নেই। “ওবেসিটি’ ওঁর রোগ হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে ‘এক্সপ্রেশনলেস’ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
কোমল কৌর দেহে ‘মোটা’ হতে পারেন, কিন্তু আদপেই মাথামোটা নন। বরং উর্দিধারী আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে এবার কড়কড়ে কণ্ঠস্বরটাকে যথাসাধ্য মোলায়েম করে বললেন, “পুলিশ।”
“আপনার বাড়ির সার্চ ওয়ারেন্ট আছে ম্যাডাম।” কোনোরকম বাড়তি কথায় না গিয়ে টুইঙ্কল বলল, “আপনার বাড়ি সার্চ করার অর্ডার আছে।”
কোমল সবাইকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। টুইঙ্কলের কথার উত্তরে ঠান্ডাস্বরে বললেন, “অর্ডার যখন আছে, তখন সার্চ করুন।”
“আপনার কোনো আপত্তি নেই তো?”
মিস্ অরোরা একটু যেন বিস্মিত। সে ভেবেছিল কোমলের দিক থেকে নিশ্চয়ই বাধা আসবে। কিন্তু সে সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন তিনি, “আপত্তির কী আছে? আপনারা পুলিশ! চোর তো নন যে আমার টাকাপয়সা, জুয়েলারি হাতিয়ে নেবেন!” উপস্থিত পুলিশ টিমের দৃষ্টি এবার অধিরাজের দিকে নিবদ্ধ। সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই পুলিশকর্মীরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকজন দোতলার দিকেও গেল। অধিরাজ, অর্ণব আর অফিসার মল্লিক বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন। কোমল ভাবলেশহীনভাবেই বললেন, “আপনারা ভেতরে আসতে পারেন।”
এতখানি উদারতা অবশ্য ওরা কেউই আশা করেনি। কিন্তু বিস্ময়কে চেপে রেখেই ওরা নিশ্চুপে ঘরের ভেতরে পদার্পণ করল। বাইরের মতোই ভেতরের অবস্থাও একই। সবই আছে, অথচ বড়ো অগোছালো! দেওয়ালে বিরাট টিভি, দামি দামি ফার্ণিচার, সোফা, শোকেস, দামি কার্পেট, অপূর্ব সব শো-পিস, একজন ধনী ব্যক্তির বাড়িতে যা যা থাকার কথা, সবই উপস্থিত। তবু দেখলে মনে হয়, কেউ বুঝি অনাদরে, অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখেছে।
কোমলের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে অধিরাজের ওপরে। অস্ফুটে বললেন, “আপনাকে আমি চিনি। কলকাতা পুলিশের হিরোই বটে। বাঙালিদের চেহারার প্রশ্নই ওঠে না। ভারতীয়দের মধ্যে তো দূর, বিদেশিদের মধ্যেও খুব কমই এমন নিখুঁত চেহারা পাওয়া যায়। রবজি’র অপূর্ব সৃষ্টি। তার সঙ্গে খাঁটি রাজপুতি ঔদ্ধত্য আর তেজ। আপনি শিওর যে আপনি বাঙালিরই সন্তান? বাই এনি চান্স, অ্যাডপ্টেড নন তো? আমাদের মতো?”
“না।” অধিরাজ তাঁর দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। মহিলা শুরু থেকেই মেন্টাল গেম খেলতে নেমে পড়েছেন, “আমার বাপ-ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষই বাঙালি। অ্যাডপ্টেড হওয়ার গল্পই নেই। তবে বহু পুরুষ আগে যদি কেউ অবাঙালি থেকে থাকেন, তবে সেটা আমার জানা নেই৷”
“বুঝলাম।” কোমল অতি কষ্টে হেঁটে গিয়ে সোফার ওপর বসলেন। নরম সোফা প্রায় বিদ্রোহই করে উঠল। সেটাকে পাত্তা না দিয়েই বললেন, “আমার চোখ কিন্তু খুব একটা ধোঁকা খায় না। আপনাদের লেডি অফিসারটি নির্ঘাৎ শিখ! ‘পাঞ্জাবি কুড়ি ছাড়া ওরকম চেহারা হয় না।”
“হ্যাঁ। উনি শিখ।” অধিরাজ শান্তস্বরেই বলল, “আপনার কোনোরকম আপত্তি আছে?”
“না না।” তিনি মাথা নাড়লেন, “শিখ মানে উনি আমার ধর্মবোন। কিন্তু এমনই কপাল খারাপ যে আপনাদের আদর-আপ্যায়ণও করতে পারছি না। আমার শরীরটা আজ সকাল থেকেই বেশ ভোগাচ্ছে। নয়তো সকালেই আমার কাছে আপনাদের আসার খবর এসে গিয়েছিল। কিন্তু তবিয়ত খারাপ বলে আপনাদের খাতির করার সুযোগটুকুও পাইনি। কুকটাও চলে গেছে।”
“আদর-আপ্যায়ণের জন্য তো আপনার গেস্টই আছেন।” সে সতর্কদৃষ্টিতে চতুর্পাশটা দেখে নেয়, “কিন্তু তাঁকে তো দেখতে পাচ্ছি না! আপনার অতিথি কি বিদায় নিয়েছেন?” এতক্ষণে একটা অদ্ভুত বদমায়েশি হাসি ফুটে উঠল কোমলের মুখে, “আপনারা কি তাঁকে খুঁজতে এসেছেন?”
“না খুঁজে উপায় কী? তিনি গোটা শহরকে যেভাবে নাচিয়ে ছাড়ছেন, তাতে তাঁর খোঁজ তো করতেই হত।” অধিরাজ যেন আরও শীতল, “বাই দ্য ওয়ে, কে হন্ তিনি আপনার?”
“আমার বোন।” কোমলের চোখের পলকও পড়ল না, “দিল্লিতে থাকে। কিছুদিনের জন্য এসেছে।”
“হ্যাঁ। সম্ভবত বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য। তাঁর টাইমিংও ভারি অদ্ভুত। দিনের বেলা কী করেন তিনি? কলকাতা দর্শন?”
“ধরে নিন তেমনই কিছু।”
“নাম?”
“সোনম কৌর।” এবার তিনি একটু ব্যঙ্গাত্মক, “বয়েস বেয়াল্লিশ। আনম্যারেড। যদিও আপনার থেকে বয়েসে অনেক বড়ো, তবু বেশ সুন্দরী। ঠিকানা বা ফোন নম্বর লাগবে?”
“পেলে ভালোই হত। তার চেয়েও ভালো হত মুখোমুখি সাক্ষাত হলে।”
“ডিনার ডেটে নিয়ে যেতে চাইলে আমার দিক থেকে আপত্তি নেই। সোনমও আপনার মতো বেহদ ‘হাসিন’ পুরুষ দেখলে খুশিই হবে।”
অর্ণবের মনে হচ্ছিল দু-জন দক্ষ যোদ্ধা যেন তরোয়াল দিয়ে একে অপরকে মেপে নিচ্ছে। দুটো শাণিত তরবারি যেন একে অপরকে আঘাত করছে, কিন্তু যোদ্ধারা কেউই কাউকে পরাজিত করতে পারছে না। কখনও আক্রমণে যাচ্ছে, কখনও বা ডিফেন্সিভ। তবু কেউ কাউকে ছুঁচ্ছে না। অধিরাজ এমন ভয়াবহ কমপ্লিমেন্ট পেয়েও বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়ে বলল, “তিনি যখন নেই, তখন আপনাকেই ডিনারে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছি। দুঃখের বিষয় জেলে পরোটা পাওয়া যায় না।”
“হুঃ।” কোমল একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, “আপনাদের আইন ব্যবস্থার মতো জেলের অবস্থাও শোচনীয়!”
সে তার উত্তরে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই টুইঙ্কল অরোরার জোরালো গলা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল, “স্যা-র।”
অধিরাজ পূর্ণদৃষ্টিতে শব্দের উৎসের দিকে তাকায়। টুইঙ্কল সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে আসছে। তার গ্লাভস পরা দু-হাতে দুটো বিরাট কন্টেনার। যেভাবে অনায়াসেই সে অমন ভারি কন্টেনারগুলোকে টেনে আনছে তাতে মনে হয় মেয়েটা জিমে রীতিমতো লোহা-লক্কড়, ডাম্বেল-বার্বেল তোলে! ওয়েট লিফটিং করলেও আশ্চর্য হবে না অর্ণব।
“ইয়েস মিস?”
যথারীতি মিস্ এর পর পদবীটা মিসিং। পাশ থেকে অর্ণব বলে দেয়, “অরোরা।” টুইঙ্কল অবশ্য তার সম্পূর্ণ নাম উচ্চারিত হওয়ার অপেক্ষা করেনি। সে হাতের কন্টেনারদুটো তুলে দেখাল, “হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড স্যার।”
“হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড? এই দুটো কন্টেনারই আছে?”
“না। টোট্যাল বারোটা। দোতলার স্টোররুমে রাখা ছিল।” টুইঙ্কল নীচে নেমে এসে কন্টেনারদুটো অধিরাজদের সামনে রেখে দিয়ে বলে, “বাকিগুলো ওরা নিয়ে আসছে।”
সে প্যান্টের পকেট থেকে একটা বিল বের করল, “সঙ্গে এটাও পেয়েছি। বারোটা হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিডের কন্টেনার আজ সকালেই এখানে ডেলিভারড হয়েছে। টোট্যাল অ্যামাউন্ট বা অন্যান্য সব ডিটেলস বিলেই আছে। আমি কন্টেনারগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে নিয়েছি। সবক-টাই ভালোভাবে সিলড। কোনোটার সিলই ভাঙা হয়নি।”
অধিরাজ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বার্নিং শিখের হাতে তবে এখনও হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড পৌঁছয়নি। নয়তো অন্তত একটা কন্টেনার মিসিং থাকত বা কোনোটার সিল খোলা থাকত। টুইঙ্কলের কর্মতৎপরতায় সে বেশ খুশি হল। মেয়েটা শুধু শক্তিই রাখে না, বুদ্ধিও আছে। সব কিছু খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছে। সে সপ্রশংস ভঙ্গিতে বলে, “গুড ওয়ার্ক মিস্ অরোরা।” তার দৃষ্টি এবার কোমলের দিকে ফিরল, “এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?”
“বক্তব্যের আবার কী আছে?” তিনি রীতিমতো বিরক্ত, “কৌনসা তীর মার লিয়া আপনে? আমার বিজনেসে হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড সবসময়ই লাগছে। ওটা আমার ফ্যাক্টরিতে লাগে। আমার কাছে পারমিট আছে।”
“অ্যাসিড বাল্ব তৈরি করার পারমিটও নিশ্চয়ই আপনার কাছে আছে?” অধিরাজ ইস্পাতকঠিন স্বরে বলল, “তার সঙ্গে বম্ব বানানোরও পারমিশনটাও কি নিয়ে নিয়েছেন?”
“আমি বম্ব বানাই এ খবরটা আপনাকে কে দিল?” কোমলের মুখও শক্ত, “প্ৰমাণ ছাড়া এভাবে অ্যালিগেশন আপনি লাগাতে পারেন না।”
“প্রমাণ আছে স্যার।”
কয়েকজন কনস্টেবল একতলাটা তন্ন তন্ন করে সার্চ করছিল। তারা এবার কয়েকটা কার্ডবোর্ড বক্স নিয়ে ফিরে এসেছে। অর্ণব সবিস্ময়ে দেখল তার মধ্যে নানারকমের ডিভাইস এবং বম্ব বানানোর জিনিসপত্র। বেশ কিছু আউটার কেসিং এবং ইনার এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যালও রয়েছে। তার মধ্যে একটা দুটো আস্ত বম্বও চোখে পড়ল। যদিও এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ফিউজ আর সার্কিট লাগানো এখনও বাকি! তবু দেখলেই চেনা যায়, বম্বই বটে।
সে অফিসার সূর্যনারায়ণ মল্লিককে বলল, “এগুলোকে ইমিডিয়েটলি বম্ব স্কোয়াডের কাছে পাঠিয়ে দিন।”
“ইয়েস স্যার।”
অধিরাজ এবার কোমলের দিকে তাকাল, “এবার কী বলবেন কোমলজি? নিশ্চয়ই এগুলো আপনি নিউ ইয়ারে আতশবাজি করার জন্য বানাননি?”
“নিউ ইয়ার অবধি অপেক্ষা করবেন কেন?” কোমল মুখ টিপে হাসলেন, “আমার আতশবাজি কি আপনারা অলরেডি দেখেননি? খুব খারাপ ছিল না নিশ্চয়ই।”
এবার বোধহয় টুইঙ্কলের ভদ্রমহিলার ঔদ্ধত্য আর সহ্য হল না। সে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে কোমলকে, “শরম নেহি আতি? একগাদা বম্ব তৈরি করে একটা রাক্ষসের হাতে তুলে দিয়েছিস তুই। সে সারা শহরে যাকে পারছে বম্ব মেরে ওড়াচ্ছে, যাকে খুশি অ্যাসিড বাল্ব ছুড়ে মারছে। তরোয়াল দিয়ে কুচিকুচি করে নিরীহ মানুষগুলোকে মারছে, পোড়াচ্ছে, আর তুই হাসছিস? বজ্জাত ঔরত। শিখের নামে কলঙ্ক।”
কোমলের ফর্সা মুখে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গিয়েছে। তাঁর ঠোঁট কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছিল। কিন্তু এতক্ষণে দু-চোখে যেন ধ্বক করে দাবানলের আগুন জ্বলে উঠল। তিনি আঙুল দিয়ে রক্তের বিন্দু মুছে নিয়ে প্রচণ্ড রাগে বললেন, “নেহি আতি শরম! দু-চারটে লোককে উড়িয়েছে, পুড়িয়েছে, কেটে টুকরো টুকরো করেছে, তাতে কী হয়েছে? ক্যায়া গুনাহ কিয়া? আর এই যে সেদিনের ছুকরি, একটা লোক….মাত্র একটা লোক কয়েকটা মানুষকে মেরেছে, কেটেছে, তাতেই তোর এত জ্বলছে! তাকে তুই রাক্ষস বলছিস। আর এমনই হাজার হাজার ‘রাক্ষসের টোলি’ দিল্লির রাস্তায় নেমে কতগুলো নিরীহ শিখকে ধরে সবার সামনে জ্বালিয়েছে, কেটেছে, অ্যাসিডে পুড়িয়েছে, ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, তাদের কী বলবি? একজন আজ ঐ একই কাজ করছে বলে সে সিরিয়াল কিলার! আরেঃ, এমন হাজার সিরিয়াল কিলারে ভরে গিয়েছিল দিল্লির রাস্তা। তোর আইন তাদের ছুঁতেও পারেনি, শা-লা কঞ্জার সব। শুধু তাই নয়, যে মেয়েগুলোর চোখের সামনে স্বামীদের জ্বালিয়েছে, কেটেছে, সেই বিধবাগুলোকে পর্যন্ত ছাড়েনি। ধরে ধরে গ্যাং রেপ করেছিল তোর সরকারের পোষা গুণ্ডাগুলো। ‘দরিন্দগির’ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তারা। আজ সেই রাক্ষসগুলোই সব মুনিঋষির ভেক ধরে বসে আছে, সবাই ভুলেছে, কিন্তু আমরা ভুলিনি।”
টুইঙ্কল ফের হাতা গুটিয়ে তেড়েমেড়ে যাচ্ছিল। তাকে চোখের ইশারায় শান্ত করল অধিরাজ, “আপনার সঙ্গী এখন কোথায়?”
“বলব না! মরে গেলেও বলব না।” গর্জন করে উঠলেন তিনি, “যা করার করে নিন আপনারা। আজ আপনাদের ‘দুখতি রগে’ হাত পড়েছে বলে খুব ব্যথা করছে, তাই না? এতদিনে জেনেছেন যে আপন মানুষগুলোর এমন দুর্দশা, এমন ‘ওয়াহিয়াত মওত’ হলে কেমন লাগে! এখন নিজেদের ঘরে আগুন লেগেছে বলে পোড়ার জ্বালা টের পাচ্ছেন!” বলতে বলতেই উত্তেজনায় নিজের বুকের ওপর হাত দিয়ে জোরে আঘাত করলেন কোমল, “আমরা সেই জ্বালা নিজেদের ছাতিতে এতদিন ধরে বয়ে বেরিয়েছি। আমায় জিজ্ঞাসা করুন, চোখের সামনে নিজের বাপ-দাদা-জ্যেঠাকে জ্যান্ত পুড়ে মরতে দেখলে কেমন লাগে? আমায় প্রশ্ন করুন, একটা দশ বছরের মেয়ের চোখের সামনে তার মাকে দশজন একসঙ্গে বলাৎকার করে যখন তার ‘আঁতরি’ বের করে ফেলে তখন কী মনে হয়! জানতে চান, যে দশ বছরের একটা নরম মেয়েকে যখন কতগুলো দরিন্দা রেপ করে, তখন তার কতটা রক্তক্ষরণ হয়! জানেন আপনারা? কিচ্ছু জানেন না! যে নরকের একঝলক আপনারা দেখছেন, সেই নরকের গোটাটা আমি দশ বছর বয়েসেই দেখে নিয়েছি। নিজের চোখে নিজের সুখের সংসার জ্বলতে দেখেছি। যখন শয়তানগুলো আমার ওপর আশ মিটিয়ে অত্যাচার করে, আধমরা অবস্থায় ফেলে দিয়ে গেল, তারপর আমি ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে আমার বাবা-মা, দাদা-জ্যেঠু সবার লাশ খুঁজে হাতড়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। গোটা গলিতে শুধু রক্তমাখা কতগুলো কাটা অঙ্গ, আর ছাইয়ের স্তূপ পড়েছিল। একটা দশবছরের মেয়ে তার মধ্যে অন্তত একটা পরিচিত মুখ খুঁজছিল, একটা আপন মানুষকে….! কিন্তু সেখানে ছাই-ভস্ম আর রক্ত ছাড়া কিছু ছিল না। কোই নেহি মিলা… কোই নেহি মিলা মুঝে… ম্যায় রাতভর টুন্ডতি রহি, রোতি রহি, মা-বাপু কো পুকারতি রহি, কোই নেহি থা ওয়াহাঁ… কোই নেহি…!” বলতে-বলতেই ভদ্রমহিলার চোখ রাগে, দুঃখে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে, “ওদের শেষ দেখার সুযোগটুকুও দেয়নি শয়তানগুলো! আমি আপনজনের লাশগুলোকে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো চিৎকার করে কাঁদতে চাইছিলাম। কিন্তু ওখানে শুধু কতগুলো পোড়া হাড় ছিল! কাউকে চিনতে পারিনি…। ….কোই নেহি মিলা…!”
সেই কোমল কৌর, যাকে কেউ কখনও কাঁদতে বা হাসতে দেখেনি সেই ইস্পাতকঠিন মানুষটারই চোখ বেয়ে এবার নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তাঁর মুখটা বিকৃত হয়ে গিয়েছে। যেন প্রচণ্ড একটা ভূমিকম্পকে কোনোমতে আটকানোর চেষ্টা করছেন। অধিরাজ কিছুক্ষণ মাথা হেঁট করে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যিই এখানে কিছু কি তার আদৌ বলার আছে! এই নারীকে সান্ত্বনা দেওয়ার সাহসও তার নেই। কিন্তু তার কর্তব্য তাকে করতেই হবে। পুলিশের কর্তব্য কখনো কখনো বড়ো অমানবিক। তবু…। সে কিছুটা সময় ওঁকে দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা বজায় রাখল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “বার্নিং শিখ এইমুহূর্তে কোথায়? তার আসল পরিচয় কী? এরকম ব্রিলিয়ান্ট মার্ডার ওয়েপন নিশ্চয়ই তার মাথা থেকে বেরোয়নি। ওটা আপনার মতো জিনিয়াসের পক্ষেই সম্ভব। কীভাবে গ্যাসটাকে ইনসার্ট করছে সে?”
“বার্নিং শিখ কে?” তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “সে আমার পরমাত্মীয়। আমার একমাত্র সমব্যথী। সে ছাড়া এ জীবনে আমার আর আপন কেউ নেই। তার সঙ্গে বেইমানি করতে বলছেন? মরে গেলেও বলব না।”
ততক্ষণে বাকি পুলিশকর্মীরাও সার্চ শেষ করে ফিরে এসেছে। নামিয়ে আনা হয়েছে সবক-টা অ্যাসিডের কন্টেনার। দু-জন মহিলা কনস্টেবলও ফিরে এসেছেন। একজন বললেন, “পুরো বাড়ি সার্চ করেছি স্যার। উনি ছাড়া এ বাড়িতে আর কেউ নেই। কুকও নেই। সে দুপুরের লাঞ্চ বানিয়ে টেবিলের ওপর ঢাকা দিয়ে চলে গেছে।”
অধিরাজ চিন্তিত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাল, “কোনোরকম গ্যাসের কন্টেনার পেয়েছেন আপনারা? বা পেট্রোলের বোতল?”
প্রত্যেকেই নেতিবাচক মাথা নাড়ছে, “না স্যার।”
“ফাইন।” সে টুইঙ্কলের দিকে তাকায়, “এঁকে অ্যারেস্ট করুন। দেখা যাক জেলের খাবার খেয়ে ওঁর পেট থেকে সব খবর বেরোয় কিনা।”
কোমলের চোখে কৌতুক আর বিদ্রূপ ভেসে ওঠে, “আপনাদের জেলে তো এসি নেই বোধহয়। আমি আবার মোটাসোটা মানুষ। অল্পেতেই ঘেমে যাই। গরম লাগে। শেষবারের মতো একটু এসির হাওয়া খেয়ে নিই। কেমন?”
এই শীতে এসি। অর্ণব অবাক। মহিলা কি মেন্টাল পেশেন্ট। সে অধিরাজের দিকে তাকায়। অধিরাজের চোখে গভীর সন্দেহ। সে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে কোমলের দিকে তাকিয়ে আছে। কোমল ইতিমধ্যেই টেবিলের ওপরে রাখা একটা ছোট্ট রিমোট তুলে নিয়েছেন। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সেদিকে তাকিয়ে থাকল অধিরাজ। পরক্ষণেই অসম্ভব ত্রাসে উন্মত্তের মতো চেঁচিয়ে উঠল, “এভরিবডি! আ-উ-ট! আ-উ-ট! বাইরে চলে যান, ইমিডিয়েটলি।”
উর্দিধারীরা কিছু বুঝল কিনা কে জানে। কিন্তু তারা প্রাণপণে দুড়দাড় করে ছুটে গেল বাইরের দিকে। অফিসার মল্লিকও দৌড় লাগালেন বাইরে। টুইঙ্কলও জ্যা মুক্ত তীরের মতো সবেগে ছুটেছে দরজার দিকে। অর্ণব তখনও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! সে সভয়ে দেখল কোমল রিমোটের একটি বিশেষ বোতাম টিপতে চলেছেন। শুনতে পেল, তাঁর উন্মাদের মতো খলখল হাসি! কী ভয়াবহ সে হাসি…! কী ভয়ংকর!
“অর্ণব…!” তার হাত ধরে প্রচণ্ড জোরে টান মারল অধিরাজ, “দেখছ কী! ওটা এসির রিমোট নয়! রা-ন…!”
এতক্ষণে সম্বিত ফিরে পেল অর্ণব। দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আপ্রাণ দৌড় মারল বাইরের দিকে। তার পেছনে অধিরাজও। দৌড়োতে দৌড়োতেই শুনতে পেল কোমলের অট্টহাসি। ডাইনির মতো খলখলিয়ে হেসেই চলেছেন তিনি। হাসির তালে তালে কেঁপে কেঁপে উঠছে তাঁর দেহের থরে থরে নেমে আসা মেদ। হাসতে হাসতেই চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “টেন… নাইন… এইট… সেভেন…।”
পুলিশের টিম লেডি কনস্টেবল ও অফিসারদের সমেত সবে বাড়ির গেট অবধিই পৌঁছতে পেরেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে একটা জোরালো বিস্ফোরণের শব্দে যেন মাটি থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। অর্ণব শুনতে পেল অধিরাজের আর্তস্বর, “…লাই ডাউন… টেক কভার… লাই ডাউন…।”
উপস্থিত সকলেই সটান মাটির ওপরেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। ওদিকে বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরণ হয়েই চলেছে! চতুর্দিক প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিঃশ্বাসে ধোঁয়ার কটু গন্ধ! অর্ণবের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কভার দিয়েছে অধিরাজ। টুইঙ্কল দেওয়ালের সেফ সাইডে কভার নিয়ে শুয়ে পড়েছে। তার সঙ্গেই লেডি কনস্টেবলরা রয়েছে। বাকিরাও মাথা আর কান দু-হাত দিয়ে ঢেকে ভূমিশয্যা নিয়েছে।
পেছনের অট্টালিকা তখন মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত। বেশ খানিকটা অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙেও পড়ল! আগুনের হল্কা ভলকে ভলকে খোলা দরজা দিয়ে, ছোটো ছোটো জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। গোটা কাঠামোটাই একটু একটু করে ধ্বসে পড়ছে। বাকিটাকে গ্রাস করে নিচ্ছে লেলিহান আগুনের শিখা। সেই বিস্ফোরণ থেকে নিস্তার পাওয়া অসম্ভব। হয়তো ঐ ভাঙা খণ্ডহরের মধ্যে, আগুনের জ্বালাময়ী আলিঙ্গনেই হাসতে হাসতে হারিয়ে গেলেন কোমল। তবুও মুখ খুললেন না!
অধিরাজ এবার অর্ণবের ওপর থেকে সরে যায়। এক্সপ্লোশনের ইমপ্যাক্টে তার গায়ে বাড়ির দু-চারটে ইঁটের টুকরো ছিটকে এসে লেগেছে। মাথার একদিকটা কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। কিন্তু অর্ণবের গায়ে আঁচটুকুও লাগেনি। বাকিরা প্রাণে বাঁচলেও সম্পূর্ণ অক্ষত নেই। কারোর মাথা ফেটেছে, কারোর বা বিস্ফোরণের ধাক্কায় সামান্য হলেও হাত, পা পুড়েছে। গোটা টিমটাই যখন উঠে দাঁড়াল, তখন দেখে মনে হল ওরা বুঝি এইমাত্রই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরেছে।
অর্ণব কোনোমতে বলল, “উনি আগেই জানতেন আমরা আসব। এটা ট্র্যাপ ছিল স্যার!”
অধিরাজ আলগোছে কপালের রক্ত মুছল। তার চোখে সংশয় ও সন্দেহ স্পষ্ট। গম্ভীর মুখে শুধু বলল, “হুঁ।”
