কালরাত্রি – ৩৩

(৩৩)

আর বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট না করে অধিরাজবাহিনী দুই পুলিশ স্টেশনে গিয়েই উপস্থিত!

আমহার্স্ট স্ট্রিটের বার্নিং শিখের ততক্ষণে হুলিয়া পালটে গিয়েছে। ওই ভয়াবহ হ্যালোউইন মেক-আপের তলার মানুষটাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল অধিরাজ। একদম নিরীহ ধাঁচের মঙ্গোলিয় মুখ। দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে অবশ্য বার্নিং শিখের সমানই। কিন্তু এ লোক আর যা-ই হোক, কিছুতেই ‘শিখ’ হতে পারে না। ওর থ্যাবড়া নাক, চ্যাপ্টা ঠোঁট, খুদকুড়ি চোখ যা প্রায় টর্চ মেরে দেখতে হয়, মুখের মঙ্গোলিয় আদল দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সে নেপালি, ভুটানি, তিব্বতি, চাইনিজ, জাপানিজ, লেপচা—সব কিছু হতে পারে, কিন্তু কিছুতেই শিখ নয়।

বেচারা ওসি প্রায় কাঁদোকাঁদো মুখে বললেন, “স্যার, আমাদের দোষ নেই। এ হতভাগা কী যে বলছে তা ভগবানই জানেন। একটা শব্দও বুঝতে পারছি না। চেহারা দেখে নেপালি মনে হয়েছিল। তাই একজন নেপালি দোভাষীকেও ডেকেছিলাম। কিন্তু সেও স্রেফ মাথা চুলকে চলে গেল। এ লোকটা নেপালিও নয়। ভুটানিও নয়। দার্জিলিং এর লোক হলে অন্তত বাংলা জানত। চাইনিজ জাপানিজ হলে জানি না। আর এই দেখুন। এটাও ওর কাছে পাওয়া গেছে।”

বলতে বলতেই তিনি একটা সস্তা দামের নতুন মোবাইল এগিয়ে দিলেন। সেটাতে একটা রেকর্ডেড টিউন খোলা। স্টার্ট বাটন প্রেস করতেই ভেসে এল সেই শিসের সুর, ‘গুমনাম হ্যায় কোই…।

অধিরাজ একদৃষ্টে লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। চাইনিজ বা জাপানিজ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। চীন বা জাপান থেকে যারা ভারতবর্ষে আসে, তারা অল্পবিস্তর হলেও কাজ চালানোর মতো ইংরেজি জানে। আর এর যেরকম দুঃস্থ চেহারা তাতে বিদেশি মানুষ বলে মনে হয় না। লোকটার মঙ্গোলিয় মুখ হলেও সে নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষেরই অধিবাসী। কিন্তু বাংলা না জানলেও অন্তত হিন্দি তো জানবে। গোর্খা প্রজাতির লোকেরা দিব্যি গড়গড়িয়ে হিন্দি বলে। সন্দেহে তার ভুরু কুঁচকে যায়। হিন্দিও যখন জানে না তখন কোনো উপজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত লোক নয় তো। লোকটার সঙ্গে কমিউনিকেটই যখন করা যাচ্ছে না তখন জানা যাবে কী করে? এই লোক ‘গুমনাম’-এর গানও জানবে না, সেইজন্যই রেকর্ডিং করা হয়েছিল। কমদামি হলেও ঝকঝকে নতুন মোবাইলও ওর কাছে থাকার কথা নয়। একা সে-ই নয়। বাকিদেরও নিশ্চয়ই এই শিস সুদ্ধ মোবাইল গিফট করা হয়েছিল। তাদেরও এই একই রেকর্ডেড টিউন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার জন্য শিসের সুরটা সবার ক্ষেত্রেই অবিকল এক ও নিখুঁত। কোনোরকম পার্থক্যই বোঝা যায়নি। কী মস্তিষ্ক লোকটার। সে মানুষটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কী মনে করে একটা শ্বাস টেনে মোবাইলটাকে তুলে ধরে ফিশফিশ করে কী যেন বলল। লোকটাও পিটপিট করে তার দিকেই তাকাচ্ছে। অধিরাজ এবার হঠাৎই আকাশের দিকে হাত তুলে ঘটা করে নমস্কার করে বলল, “দেবা দেবা।”

“উ ব্লেই নংথ।”

ওই মানুষটাও সাষ্টাঙ্গে প্রণামই ঠুকছে বোধহয়। এবার জোর গলায় বলে, “উ ব্লেই নংথ।”

“কী?”

সে প্রশ্নটা বুঝল কিনা কে জানে, আবার বলল, “উ ব্লেই নংথ।”

পবিত্র ফিশফিশ করে বলল, “ওরে আমার হুলো মামার কুটি মামী—কী ভাষায় কথা বলছিস বাপ!”

সে আরও কিছু বলার আগেই একটা যান্ত্রিক স্বর শোনা গেল! যান্ত্রিক স্বরটা অধিরাজের মোবাইল থেকে ভেসে আসছে। কেউ কিছু বোঝার আগেই এক নারী কণ্ঠস্বর নির্লিপ্তভাবে বলল, “উ ব্লেই নংথ ইজ দ্য ক্রিয়েটর গড অব খাসি পিপ্‌ল…!”

“কুটি মামী নয়, গুগল মামী মিস্ট্রি সলভ্ করছেন!” পবিত্র-র বিস্ময়ে চোখ চাঁদিতে চড়ে গিয়েছে, “রাজা, তুমি ‘ওকে গুগল’ মার্কা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট খুলে বসেছিলে?”

“আজকাল টেকনোলজি এত উন্নত যে দোভাষীর দরকারই ছিল না।” অধিরাজ ওসির দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি করেছে, “এই বুদ্ধিটা আপনাদের মাথায় এল না? ও ফি ফু, শিঙ্গু মিঙ্গু যাই বলুক না কেন, গুগলের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের সাহায্য তো নিতেই পারতেন। কিছু জিনিস আছে যা ইউনিভার্সাল। ভাষা বুঝুক না বুঝুক, ইশারা ঠিক বুঝবে। আমি যেই আকাশের দিকে হাতজোড় করে নমস্কার করেছি, ও বুঝেছি আমি ঈশ্বরের কথা তুলেছি বা বলছি। সঙ্গে সঙ্গেই ও নিজের দেবতার নামই বলে দিল। গুগল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট রেডিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওর ভয়েস ক্যাচ করে নিয়ে যা বলার বলে দিয়েছে। উনি খাসি ভাষা বলছেন। খাসি উপজাতির হলেও ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বী নন। ট্র্যাডিশনাল দেবতার পুজো করেন। মেঘালয়ের বাসিন্দা। আমি যদি ভুল না করি, তবে বেচারি গরীব মানুষ। পেটের দায়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য আর শান্তি ছেড়ে সদ্য সদ্যই ইট কাঠ পাথরের দুনিয়ায় এসে পড়েছেন। দিনমজুর হতে পারেন। অথবা এখনও যখন ভাষা জানেন না, তখন আনএমপ্লয়েড হওয়ার চান্সই বেশি। একটা চাকরি পেয়েছিলেন বটে, তবে আর একটু হলেই মেঘালয়ে নয়, সোজা যমালয়ে যেতেন। ইনি যে বার্নিং শিখের কীর্তির কথা জানবেন না, শুনবেন না বা কাগজে টিভিতেও দেখবেন না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ ইংরেজিকে তো শিকেয় তোলো, এ অবতার বাংলা, হিন্দি—কোনোটাই জানে না।”

এইবার বোঝা গেল যে এই লোকটা বার্নিং শিখের মতো অমন বিপজ্জনক ছদ্মবেশ নিয়ে ঘুরছিল কেন! সে বেচারার পক্ষে জানা সম্ভবই ছিল না, আদতে এটা কী জাতীয় বেশ। টিভির নানা ভাষার খবর, বাংলা, ইংরেজি-হিন্দি কাগজের হেডলাইন, জনতার ফুসুর ফুসুর, কিছুই সে বোঝেনি। তাই ও যে একজন ভয়াবহ খুনির রূপ ধরেছে, তা ওকে বোঝাতই বা কে। অজান্তেই পুলিশের গুলি বা গণপিটুনি খেয়ে মরাই ওর ভবিতব্য ছিল। স্রেফ বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছে।

যাদবপুর থানার লোকটির ইতিহাসও গুগল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্সই বলে দিল। সে বেচারি আবার তামিলভাষী। এই তথ্যটি জানার পর অবশ্য তার পরিচয় দ্রুত খুঁজে বের করা সহজ হয়েছিল। তার নাম মাধভন পিল্লাই। তার গ্রামতুতো জামাইবাবু মুখুস্বামীর ফুটপাতে একটি ইডলি-দোসার দোকান আছে। পিল্লাই সেখানেই অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতে সম্প্রতি এসেছে। তামিলভাষীরা একেই হিন্দি বলতেই চায় না। তার ওপর এরা তো গরীব মানুষ। ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রশ্নই ওঠে না। মেঘালয়ের বাসিন্দাটির মতো পিল্লাইয়ের পক্ষেও বার্নিং শিখের ঘটনা জানা সম্ভব নয়। তার গ্রামতুতো জামাইবাবুও খুব ভালো বাংলা জানে না। কাজ চালাবার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই বোঝে। এমনিতেও ফুটপাতে খাবার বিক্রি করার জন্য সুললিত বাংলায় ভাষণ দেওয়ার প্রয়োজন হয়ও না। ইডলি, সাম্বর, দোসা, বড়া—এই শব্দগুলো বুঝলেই চলে। তবু কপালগুণে একজন তামিল দোভাষী পেয়ে যাওয়ায় এর পেছনের গল্পটি বেরোল।

পিল্লাই জানাল যে এক বৃদ্ধ তাকে ও তার সদ্য গ্রাম থেকে আসা আরও তিনজন বন্ধুকে একটা মজার খেলা খেলার জন্য পাঁচহাজার টাকা মাথা পিছু দিয়েছিল। সঙ্গে একটা করে নতুন মোবাইলও। ওর বাকি তিনবন্ধুও ওর মতোই তামিল ছাড়া আর কিছু বোঝেই না। তারা বিভিন্ন সাউথ ইন্ডিয়ান হোটেলে ছোটোখাটো বয়ের কাজ করত। রেস্টোর‍্যান্টের মালিকেরা নিজেরাই তামিলভাষী তাই খুব অসুবিধা কিছু হয় না। একমাসও হয়নি কলকাতায় এসেছে। গ্রামতুতো জামাইবাবু সামান্য মাইনে দিলেও থাকার ব্যবস্থা কিছু করেনি। তাই ওরা একটা বস্তির এক কামরার ঘরে গাদাগাদি করে থাকে, দিবারাত্রি পরিশ্রম করে। টিভি তো দূর, মাথার ওপর একটা পাখাও নেই। শোবার জন্য স্রেফ কতগুলো চাটাই সম্বল। তাই টিভি দেখারও প্রশ্ন ওঠে না। দেখলেও কিছুই মাথায় ঢুকত না। বেঙ্গালুরুর ঘটনাও ওদের প্রত্যন্ত গ্রাম অবধি পৌঁছোয়নি। মাথা পিছু পাঁচহাজার টাকা ওদের কাছে অনেক। আর উপরি পাওনা নতুন মোবাইল। ওরা খুব খুশি হয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিল। বুড়ো মানুষটা বলেছিল যে বিশেষ কিছুই করার দরকার নেই। শুধু তাদের একটু ভয়াবহ রকমের সাজিয়ে দেওয়া হবে। সেই রূপ নিয়ে ওই মোবাইলে রেকর্ডেড একটা বিশেষ শিসের সুর বাজিয়ে, সিটি বাজানোর ভঙ্গি করতে করতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। কিছুই না, লোককে একটু ভয় দেখানো আর কী! যেমন অনেক ইউটিউব চ্যানেল বা অন্যান্য চ্যানেল প্র্যাঙ্ক করে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে তারপর হাসাহাসি করে, ব্যাপারটা তেমনই। বয়স্ক মানুষটি চমৎকার তামিল ভাষায় কথা বলছিলেন। তাই নিজেদের লোক হিসাবে তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে একটুও সময় লাগেনি

কিন্তু তখন কে জানত যে ব্যাপারটা আদৌ হাসির বা মজার নয়। যে পাঁচজন মারা গিয়েছিল, তাদের মেক-আপহীন চেহারা যখন পিল্লাইকে দেখানো হল, সে তৎক্ষণাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। প্রথমবার পুলিশের গুলিতে যে মারা গিয়েছিল সে ওরই এক বন্ধু। বাকি চারটে লাশের মধ্যেও নিজের আরও দুই বন্ধুকে মৃত অবস্থায় পেয়ে তার কান্না থামতেই চাইছিল না! বারবার সে তামিল ভাষাতেই জানতে চাইছিল, ওরা কেন মারা গেল? ওদের কী অপরাধ ছিল? ওরা তো কিছুই জানত না, তবে পুলিশ আর জনতা কেন ওদের শেষ করে দিল!

এর উত্তর কী দেবে তা অধিরাজ কেন, উপস্থিত কেউই ভেবে পায়নি। সকলেই নীরবে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে। কতগুলো গরীব, নিরীহ, খেটে খাওয়া মানুষকে বার্নিং শিখ ভেবে পুলিশ গুলি করে মারল, আর জনতা পিটিয়ে খুন করল। অধিরাজের বুক দুরুদুরু করছে। সম্ভবত যে ক-জন রেপ্লিকাকে দেখা গিয়েছে তাদের প্রত্যেকের ইতিহাসই এমন। এরা সব পরিযায়ী শ্রমিক, বা সদ্য বাইরে থেকে কাজের খোঁজে এসেছে যারা কেউ বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিও জানে না। হয়তো নিরক্ষরও। কী করে গুল্লু নামের লোকটি এদের ট্র্যাক করছে বা খুঁজে বের করেছে তা ঈশ্বরই জানেন। এটা ঘটনা যে বাইরে থেকে বহু মানুষ কলকাতায় মজুরি বা ছোটোখাটো কাজ করতে আসে। তারা কেউ শিক্ষিত নয়। অর্ধেকের বেশি তো বাংলা, ইংরেজিও জানে না! উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের পরিযায়ী শ্রমিকরা হিন্দিটা জানে। তবে এ লোকটা বোধহয় তাদের কাউকে বাছেনি। তার শিকারদের নমুনা তো সামনেই। একজন মেঘালয়ের, চারজন তামিল! কিছু টাকা আর মোবাইলের লোভ দেখিয়ে তাদের জেনেশুনে মৃত্যুর সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। কে জানে এমন ট্র্যাজেডি আরও কতজনের সঙ্গে ঘটবে। যদিও পুলিশ এখন গুলি চালাচ্ছে না, জনতাও নিজেদের কিছুটা হলেও সামলেছে। কিন্তু বিশ্বাস নেই… কাউকে বিশ্বাস নেই!

“লোকটা প্রতিশোধস্পৃহায় পাগল হয়ে গেছে। নয়তো এমন কাণ্ড কেউ করে।” অধিরাজ গাড়িতে বসে বিড়বিড় করল, “এতখানি শয়তানি প্ল্যান! ও শিশুর শট জানত যে পুলিশ ওকে এনকাউন্টার করার মুডেই আছে। তারপরও কতগুলো নিরীহ লোককে মরতে পাঠাল। শুধু এইজন্যই ওর আর বেঁচে থাকাই উচিত নয়।”

এই মুহূর্তে ওদের গন্তব্যস্থল বাইপাসের পাশের হসপিটাল। যেখানে এই মুহূর্তে পি সি চৌধুরীর পরিবার ভরতি। প্রণবেশ লাহিড়ী সেখানে অতন্দ্র প্রহরায় আছেন। বারবার ওঁকে ও মিস্ দত্তকে সতর্ক করা হচ্ছে। মিস্ অরোরা আর অর্ণব মূর্তির মতো স্থির। পবিত্র নীরবে ড্রাইভ করছে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। এ কী কাণ্ড! আগের খুনগুলোকে যদি বা জাস্টিফাই করা যায়, এই মৃত্যুগুলোর কোনো অর্থই নেই। পুলিশকে বোকা বানানোর জন্য শেষপর্যন্ত এইরকম বিপজ্জনক রাস্তাই পেয়েছিল সে। একবারও ভেবে দেখল না যে এই লোকগুলোর সঙ্গে তার কোনো শত্রুতাই নেই? এরাও তার মতোই সাধারণ মানুষ। কিছু টাকার বিনিময়ে ওরা নিজেদের অজ্ঞাতেই একটা মরণ খেলায় নেমেছিল। একবারও কি তার মনে দ্বিধা আসেনি? একবারও ভেবে দেখেনি এরাও কারোর বাবা, কারোর স্বামী, কোনো পরিবারের একমাত্র সহায়। সে নিজের হাতে ওদের মারেনি। কিন্তু বোড়ের মতো এগিয়ে দিয়েছে। আর সি.আই.ডি. হোমিসাইড, পুলিশই বা কী জবাব দেবে এখন। তাদের ঘাড়েই তো সাতটা খুনের দায়। মিডিয়া ইতিমধ্যেই পুলিশকে দোষী সাব্যস্ত করে বসে আছে।

“লোকটা সাউথ ইন্ডিয়ান ভাষা জানে তা আগেই বুঝেছিলাম যখন বেঙ্গালুরুতে ছিল।” অধিরাজ অস্থিরভাবে বলল, “কিন্তু খাসি ভাষা তো অত সহজ নয়। মেঘালয়ের লোকটার সঙ্গে কমিউনিকেট করল কী করে?” বলতে বলতেই সে পবিত্র আর অর্ণবের দিকে তাকায়, “এতক্ষণ পর্যন্ত মোট কতজন বার্নিং শিখকে পাওয়া গেছে? মৃতদের সবার পরিচয় কি জানা গেছে? তাদের কাছেও নতুন মোবাইল ছিল কি? খোঁজ নাও তো।”

পুলিশ নিজেদের নির্বুদ্ধিতায় আর মিডিয়ার গালিগালাজে মরমে মরে গিয়ে এখন উঠেপড়ে তদন্ত করছিল। তারা জানাল যে প্রত্যেকের কাছ থেকেই একটা করে নতুন মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছে। আর সব ফোনেই শুধু ওই ভয়াবহ শিসটাই রেকর্ড করা আছে। এখন সব মৃতদেহেরই মেক-আপ তুলে দেওয়া হয়েছে। তার তলা থেকে যারা বেরোল তাদের চেহারা দেখেই বোঝা যায় এরা সব হাভাতে মানুষ। তিনজনকে আগেই পিল্লাই শনাক্ত করেছিল। বাকি দু-জনের মধ্যে একজনের আবার পুলিশ রেকর্ডও আছে। পুলিশই আইডেন্টিফাই করল তাকে। নামজাদা হিস্ট্রিশিটার নয় অবশ্য। একেবারেই ছোটখাটো গাঁটকাটা! একবার প্রকাশ্য রাস্তায় পিক-পকেট করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। কলকাতারই বাসিন্দা। এই লোকের বাংলা জানার কথা। কিন্তু এখানেই আবার ট্যুইস্ট। চোর হলেও সে মুক ও বধির। বিদ্যার দৌড় টিপছাপ। পুলিশ শিসের শব্দটা শুনে বুঝতেও পারেনি যে লোকটা বোবা! ওই ভয়াবহ রেকর্ডিংই তাদের বোকা বানিয়েছে।

শেষ মৃতদেহটিকেও অবশেষে অনেক গলদঘর্ম হয়ে শনাক্ত করা গেল। এর রেকর্ড পুলিশের কাছে নেই। তবে পুলিশের তৎপরতায় তাকেও চেনা গিয়েছে। এ ফুটপাথবাসী এক বদ্ধ পাগল ভিখারী। খাওয়ার পয়সা না থাকলেও গাঁজা ছাড়া ওর চলে না। একেই মানসিক ভারসাম্যহীন, তার ওপর গাঁজা খেয়ে সবসময়ই ভোম্ হয়ে বসে থাকত। বার্নিং শিখ, লতা মঙ্গেশকর কিংবা পুতিন, সবাই ওর কাছে একই। যার মস্তিষ্কেরই ঠিক নেই, সে শহরে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাই জানবে না। তার শুধু গাঁজা টানতে পেলেই হল। আর ওটাই হয়তো টোপও ছিল। ওদের মতো দুঃস্থ লোক হাতে গরম টাকা আর মোবাইল পেলে বিনাবাক্যব্যয়ে সব কিছু করবে।

“টোট্যাল এগারোজন বার্নিং শিখের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে স্যার।”

অর্ণব আপডেট নিয়ে জানায়, “তার মধ্যে পাঁচজন ডেড। দু-জনকে পুলিশ আগেই তুলেছিল। বাকি চারজনের মধ্যে তিনজনকেও এইমাত্র অ্যারেস্ট করা হয়েছে। এদের সবার ইতিহাসই প্রায় একরকম। কেউ কর্ণাটক থেকে জুয়েলারির দোকানে ডিজাইনের ছোটখাটো কাজ করতে এসেছে। কিন্তু কন্নড় ছাড়া কিছু বোঝে না। একজন কোঙ্কনি লোকও আছে। সে এইসান হাউমাউ করে কোঙ্কনি বলছিল যে অফিসারদের ‘রক্ষে করো রঘুবীর’ অবস্থা। তারা কোন্ দিকে পালাবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিন্তু আপনার পরামর্শ মতো গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের সাহায্যে শেষপর্যন্ত ভাষা ডিটেক্ট করতে পেরেছে। আর একজন অবশ্য বিহারী দিনমজুর। তবে সে মদের বোতল ছাড়া আর কিছু চেনে না। এরা কেউ বার্নিং শিখের ইতিহাস, ভূগোল, অতীত, বর্তমান, কিচ্ছু জানে না। তাকে নিয়ে মাথাব্যথাও নেই। টাকা পেয়েছে, সেলফোন পেয়েছে, চুপচাপ কাজ করেছে। এদের কারোর কাছে বৃদ্ধ মানুষ গিয়েছিল, কারোর কাছে আবার সুন্দরী মেয়ে!”

“জিনিয়াস টাইপের রাক্ষস! কতগুলো ভাষা বলতে পারে তার ঠিক নেই। কত রূপ ধরতে পারে তারও সীমা পরিসীমা নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, গোটা কলকাতাকে হাতের তালুর মতো চিনে বসে আছে। নয়তো এই লোকগুলোকে কোথায় পাওয়া যাবে বা তাদের হিস্ট্রি কী করে জানল! যে টাকাটা ও মেক-আপ, নগদ ক্যাশ, মোবাইল আর অন্যান্য জিনিসের পেছনে ছড়াচ্ছে নিঃসন্দেহে সেটা কোমল কৌরের। কিন্তু ওর শয়তানের মস্তিষ্কটিকে অবহেলা করা যাচ্ছে না।” অধিরাজের মুখে আফশোশ, “ও নিজেও অলমোস্ট খ্যাপা কুকুরই হয়েছে অর্ণব। বারবার বাধা পেয়ে ওর আর কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞান নেই। নিজেই জানে না কোথায় গিয়ে থামবে। টু বি ভেরি অনেস্ট, আমি অন্য জাতীয় থ্রেটের কথা ভেবেছিলাম। এতখানি নিষ্ঠুর হবে তা ভাবিনি। শি-ট্!” বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “দশজনের হিসাব তো পেলাম। বাকি একজন কোথায়? এগারো নম্বর?”

অর্ণব বলতেই যাচ্ছিল যে এগারো নম্বরের খবর এখনও পাওয়া যায়নি। সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা দিয়েই ভ্যানিশ হয়েছে। কিন্তু তার আগেই অধিরাজের মোবাইল ফের বেজে ওঠে। ফোনের ওপ্রান্তে এডিজি সেন।

“স্যার।” তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করল অধিরাজ, “এনি আপডেট?”

“ব্যাড নিউজ ব্যানার্জি।” এডিজি সেনের বিপন্ন গলার পেছনে প্রচুর মানুষের চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে এল। তিনি গলার স্বর যতখানি সম্ভব উঁচু করে বললেন, “তোমাদের মোবাইলে কোনো নিউজ চ্যানেলের লাইভ টিভির অপশন থাকলে এখনই অন করো। ইটস আর্জেন্ট!”

“ইয়েস স্যার।”

অর্ণব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি বিখ্যাত নিউজ চ্যানেলের লাইভ টিভি মোবাইলে চালিয়েছে। কিন্তু তাতে যা দেখল ও শুনল তাতে চক্ষু চড়কগাছ! একটা পেট্রোল পাম্প ভয়াবহ আগুনের আলিঙ্গনে দাউ দাউ করে জ্বলছে! ভেতরে যে ক-টা গাড়ি তেল নিতে ঢুকেছিল, সেগুলো একটাও আস্ত নেই। তার মধ্যে আবার একটা বেসরকারি বাসও আছে। গাড়ি বা বাসের সওয়ারিরাও বেঁচে আছে কিনা সন্দেহ! যেভাবে একের পর এক বিস্ফোরণের আওয়াজ আসছে, আর ভলকে ভলকে আগুন ফুঁসে উঠছে, তাতে শুধু সওয়ারি তো দূর, পেট্রোলপাম্পের একজন কর্মীরও বাঁচার কথা নয়। ভাগ্যিস ফায়ার ব্রিগেড বিকেলের পর থেকেই হাই অ্যালার্টে ছিল তাই যথাসময়ে পৌঁছে গিয়ে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তার ফলে অগ্নিকাণ্ড আরও বিধ্বংসী রূপ নিয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তবু যতটুকু হয়েছে তাকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে নাজেহাল হচ্ছে তারা।

অধিরাজ অনিমেষে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছিল। সে রীতিমতো দরদর করে ঘামছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক সাংবাদিক জানালেন যে কিছুক্ষণ আগেই বাঁশদ্রোণী পেট্রোল পাম্পের সামনে বার্নিং শিখ আবির্ভূত হয়েছিল। যথারীতি অ্যাপিয়ারেন্স একই। সেই ভয়াবহ মুখ, ঠোঁটে সেই ‘গুমনাম’ মার্কা শিস। পুলিশও জনগণ মারফত তার আগমনবার্তা পেয়েই ছুটতে ছুটতে নিমেষের মধ্যেই হাজির। যেহেতু এর আগে পাঁচটা ব্লান্ডার হয়ে গিয়েছে ও কো-ল্যাটারাল ড্যামেজের ধাক্কা এখনও কেউ সামলাতে পারেনি তাই দু-পক্ষই এবার সতর্ক ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী পুলিশ বার্নিং শিখকে সারেন্ডার করতে বলেছিল। কিন্তু তাকে শ্যুট করার কোনো চেষ্টাই করেনি। যেহেতু ওপরমহল থেকে শ্যুট না করার অর্ডার এসেছিল তাই তারাও নিরূপায় নগরবাসীরাও এত বড়ো ম্যাসাকারের পরে কী করবে বোঝেনি। সেই ফাঁকেই এগারোতম বার্নিং শিখ দ্রুত ঢুকে পড়েছিল পেট্রোল পাম্পের ভেতরে। সেখানে কয়েকটি গাড়ির ফুয়েল ট্যাঙ্কে তখন তেল ভরা চলছে। সে চোখের পলকে একটা গাড়ির খোলা ফুয়েল ট্যাঙ্কে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। একটি গাড়ির বিস্ফোরণের ধাক্কায় আশেপাশে যে গাড়িগুলো তেল নিচ্ছিল সেগুলোও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে ওঠে ও আগুন বিধ্বংসী রূপ নেয়। যে কর্মীরা বাইরের দিকে ছিল, তারা কোনোমতে পালিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। যারা ভেতরে জ্বালানি তেল ভরছিল, তাদের বাঁচার সম্ভাবনা শূন্য!

অধিরাজের কপালে হাত, “এই ভয়টাই ছিল। এটাই আসল বার্নিং শিখ! এতগুলো ফলস অ্যালার্ম দেওয়ার পর যে মুহূর্তে দেখল পুলিশ ঘাবড়ে গিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেছে, সেই মুহূর্তেই শুয়োরের বাচ্চাটা ওই ছদ্মবেশ নিয়ে এসে ফের পেট্রোল পাম্প উড়িয়ে দিল। আগেরবার পারেনি, সে শোধটা এবার তুলল। অর্ণব, শেম অন মি। অগ্নিকাণ্ড করাটা ওর অন্যতম স্টাইল! এর ফলে ও আবার কতগুলো নিরীহ লোককে পুড়িয়ে ছাই শুধু করল না গোটা ব্যালেন্সটাই বিগড়ে দিল। এরপর কী হবে বা হতে পারে সেটা ভেবেই আমার ভয় করছে! ১৯৮৪ তে যেরকম নৈরাজ্য, অরাজকতা চলেছিল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছিল, এবার সেটাই হবে। কেউ কিছু বুঝবে না, শুনবে না, একে অপরকে মারবে! আবার সেই মুহূর্তগুলো রি-ক্রিয়েট হবে। চোখের সামনে পটাপট লাশ পড়ছে। কেউ গুলিতে মরছে, কেউ মলিঞ্চিং এ, কোথাও ব্লাস্ট হচ্ছে…

আরও কত লাশ পড়বে জানি না। ‘শেম্ অন্ মি … শেম্ অন্ মি …’ বলতে বলতেই সে একটু থেমে উত্তেজিত স্বরে বলল, “হস্পিটালে পরে যাব পবিত্র… অন্যদিকে নাও। প্রণবেশদা আর মিস্ দত্তকে বলো একদম এক্সট্রিম অ্যালার্মিং পজিশনের জন্য তৈরি থাকতে। মিস্ দত্ত প্রয়োজন পড়লে যেন মিস্ বোসকেও সঙ্গে নিয়ে নেন। আপাতত শিখ কলোনিগুলোতে পেট্রোলিং বেশি জরুরি। হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের সমস্ত অফিসারদের ইমিডিয়েটলি রাস্তায় নামতে বলো। …অন্য সব কেস চুলোয় যাক… এটাই এখন প্রায়রিটি…বলে দাও, চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে যেন পেট্রোলিং চালায় সবাই। আমার ধারণা মর্ অ্যাটাক আর ভায়োলেন্স আবার শুরু হবে…।”

অধিরাজের ভয়টাই বাস্তব! এতক্ষণ কিছু অপ্রত্যাশিত ট্র্যাজেডিতে মিডিয়া এবং মানুষের মন কিছুটা নরম হয়েছিল। কিন্তু চোখের সামনে এরকম একটা ব্লাস্ট দেখার পর সবাই যেন আরও পাঁচগুণ খেপল। চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলা গাড়ি, তার ভেতরের জ্বলন্ত মানুষগুলোকে মর্মান্তিকভাবে শেষ হতে দেখার পর মানুষও এবার কাণ্ডজ্ঞান হারায়। বার্নিং শিখের কাণ্ডকীর্তি এতদিনে সবারই জানা হয়ে গিয়েছে। সে যে ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ তা কারোরই অজানা নয়। তাই আতঙ্কে, রাগে ক্ষিপ্তপ্রায় জনতা এবার শহরজুড়ে তাণ্ডব শুরু করে। প্রথমে যত পাগড়ি পরা শিখদের হাতের কাছে পেল তাদেরই ধরে একতরফা মারদাঙ্গা চালাল। এক সর্দারজির ট্রাক জ্বালিয়ে দিল। একদল লোক শিখ বসতিতে গিয়ে আক্রমণও করেছে। তাদের ধারণা বার্নিং শিখ ওখানেই আত্মগোপন করে আছে। শুধু তাই নয়, দু-চারজন নিরীহ পথচারী, উলোঝুলো পাগল, যাদেরই হাবভাব দেখে একটু সন্দেহ হল, তাদেরই ধরে পেটাতে শুরু করল।

ট্র্যাজেডির পর ট্র্যাজেডি। তবু ভাগ্য ভালো শিখরা অল্পবিস্তর মার খেলেও টিম অধিরাজ যথাসময়ে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করতে পেরেছিল। মব্ অবশ্য থামবার নাম নিচ্ছিল না। তাদের প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টাও হয়েছে, তবু তারা কিছু শুনবেই না। কিন্তু যখন অধিরাজ খেপে গিয়ে পাবলিককে ধরেই বিনাবাক্যব্যয়ে পেটাতে শুরু করল, তখন তার দেখাদেখি অর্ণব, পবিত্র ও টুইঙ্কলও পালটা মার দিতে থাকে। বিশেষ করে রণচণ্ডিটির ভয়ালমূর্তি দেখার মতো ছিল। ‘হা রে রে রে করে তেড়ে আসা ভিড় চার অফিসারের হাতে মারধোর খেয়ে চম্পট দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সর্দারজির ট্রাকটা জ্বললেও মানুষটা রক্ষা পেয়ে গিয়েছে। অধিরাজ আগেই আন্দাজ করেছিল যে উন্মত্ত জনতাদের প্রাথমিক টার্গেট হয়তো শিখেরাই হবে। তাই একদম সঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়ে অধিরাজ ও তার বাহিনী অতিকষ্টে শিখদের বাঁচাতে পেরেছে। সেখানে কোনোরকম ক্যাজুয়ালটি ঘটেনি। সমানতালে চক্কর দিচ্ছে হোমিসাইডের অন্যান্য অফিসাররাও। তার সঙ্গে রাস্তায় নেমেছে গোটা শহরের পুলিশ। তাই কিছু মানুষ বেঁচে গেল। তবে সবার ভাগ্য অত অনুকুল ছিল না। দু-জন পাগল ভিখিরি মানুষের সন্দেহের শিকার হয়ে গণপ্রহারের বলি হল। যেহেতু বার্নিং শিখ বৃদ্ধের ছদ্মবেশ নিয়েছিল, তাই রক্ষা পেলেন না সিনিয়র সিটিজেনরাও। এক অচেনা বয়স্ক ধূপবিক্রেতাকেও মানুষ পিটিয়ে মারল। দু-জন বৃদ্ধকে পুলিশ একরকম মারপিট করেই ভিড়ের হাত থেকে উদ্ধার করল। নয়তো তাদের কপালেও ফাঁড়া নাচছিল।

সত্যিই সারা শহর জুড়ে নেমে এল অরাজকতা! বার্নিং শিখের আর টিকিটিও দেখা গেল না ঠিকই, কিন্তু সন্দেহ বড়ো বিষম বস্তু। বার্নিং শিখ সেই সন্দেহের আগুনে ঘৃতাহুতি, বা বলা ভালো পেট্রোল ঢেলে দিয়ে কেটে পড়েছে। কিন্তু তারপর থেকেই মবকে সামলাতে পুলিশের নাজেহাল দশা। কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করার জন্য কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করেছে। তাতেও যখন কাজ হয়নি তখন লাঠি চার্জ করতেই হয়েছে তাদের। ফলস্বরূপ মিডিয়া ফের পুলিশের বাপান্ত শুরু করল। এর আগেরবার অভিযোগ ছিল, নির্দোষ মানুষদের কেন শ্যুট করা হল। এবার অভিযোগের আঙুল উঠল, আসল বার্নিং শিখকে কেন ওখানেই গুলি করে মারা হল না। খোদ পুলিশের নাকের সামনে দিয়ে সে আস্ত একটা পেট্রোল পাম্প জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেল, অথচ পুলিশ কেন মিউ মিউ করছিল? কেন তার দেহ তখনই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হল না। পুলিশের অপদার্থতার জন্যই আজ এই অবস্থা। তারা আসল বার্নিং শিখকে কেন চিনতে পারেনি? সঠিক লোকটাকে চিনে নিয়ে ওখানেই এনকাউন্টার করে দেওয়া উচিত ছিল। তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি বলেই শহরে এমন বিশৃঙ্খলা! এখন সি.আই.ডি. হোমিসাইড আর পুলিশও পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে পেশীশক্তির প্রদর্শন করছে, জনগণের ওপর লাঠিচার্জ করছে, ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারও করছে!

বার্নিং শিখ এই শেষ মুহূর্তে পুলিশের সামনে ভয়াবহ প্যারাডক্স ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশও প্রচণ্ড ডায়লেমায়। তাদের হয়েছে উভয়সংকট। কোনটা আসল, কোন্‌টা নকল চিনবেই বা কী করে। বার্নিং শিখের মুখ তো অর্ধেক পোড়া। যেটুকু দেখা যায় তাও দাড়ি গোঁফে এমন আচ্ছন্ন যে তার পেছনে কে আছে বোঝাই দায়। ওই মেক-আপে যদি অমিতাভ বচ্চন কিংবা এডিজি শিশির সেনকেও নামিয়ে দেওয়া হয়, তাও একই মনে হবে। এভাবে চেনা সম্ভব? কেউ বুঝতেই পারছে না, যে ফের যদি তার আবির্ভাব হয়, তবে কী করণীয়! শ্যুট করলেও বিপদ। না করলেও বিপদ! পুলিশ ও সি.আই.ডি.-র হোমরা চোমরারা নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে মিটিং করেও সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না যে বার্নিং শিখের জন্য ‘শ্যুট অ্যাট সাইটের’ অর্ডার দেওয়া হবে কিনা। মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো মিডিয়ার পর মানবাধিকার কমিশনের লোকেরাও পুলিশের এই অবিচারের বিরুদ্ধে সরব হলেন। তাদের একটা দল সি.আই.ডি.-র অফিস ঘেরাও করে স্লোগান দিচ্ছে। এডিজি সেন প্রেসের উদ্ভট সব প্রশ্নে জেরবার হয়ে রণেভঙ্গ দিয়ে প্রেস কনফারেন্স থেকে উঠে চলে গিয়েছেন। অধিরাজ কোন্ দিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। গোটা শহর জুড়ে মারপিট চলছে। যত্রতত্র মারামারি-ভাঙাভাঙি! বার্নিং শিখের জ্বালানো ত্রাসের আগুনকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে মিডিয়া। ওরা পেট্রোলিংয়ের ফাঁকে ফাঁকেই লাইভ টিভিতে দেখছিল বিশেষজ্ঞদের প্যানেল ফের নানারকম ভবিষ্যদ্বাণী করতে বসে গিয়েছে। তারা যে যার অভিমত প্রকাশ করছেন। একজন নামজাদা বুদ্ধিজীবী ও তথাকথিত সমাজসেবক বললেন, “আগেই বলেছিলাম যে এই বার্নিং শিখ একজন খালিস্তানি জঙ্গি। হি ইজ আ টেররিস্ট। অনেক আগেই ওকে সমূলে বিনাশ করা উচিত ছিল। এর আগেও ও পেট্রোল পাম্প ওড়ানোর প্ল্যানিং করেছিল। সেবার হোমিসাইডেরই এক অফিসার তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর র‍্যান্ডম ফায়ারিং করে ওকে সুযোগ দিয়ে দিয়েছিলেন। কোনোরকমে শেষরক্ষা করা গিয়েছিল। কিন্তু আজ তো পুলিশ স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল।”

এক সুন্দরী অভিনেত্রী জড়ানো জড়ানো আধো উচ্চারণে কচিখুকির মতো নিজের মতামত পেশ করেন, “আগেই আমরা সন্দেহ করেছিলাম যে ব্লাস্ট হবে। প্রথম ব্লাস্টটা হয়েছে। আমার ধারণা এটা সবে শুরু। মুম্বাই ব্লাস্টের মতোই এবার কলকাতাতেও র‍্যান্ডম ব্লাস্টের ‘সিলসিলা’ শুরু হবে। আর কত লোক মরবে কে জানে!”

কারোর বা আবার বক্তব্য, “বার্নিং শিখকে আরও সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত ছিল। ওকে শুরুতেই শেষ করে দিলে আজ এই অবস্থা হয় না। পুলিশের অপদার্থতায় সে এতখানি বেড়েছে।”

কেউ মতামত পেশ করেন, “সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবছে না। তাদের কী হবে? যে-কোনো সময়ে, যে-কোনো জনবহুল এলাকায় এরকমই মারাত্মক ব্লাস্ট হতে পারে। ক-টা বিস্ফোরণ হবে কে জানে। শয়ে শয়ে হাজার হাজার লোক মারা পড়বে। আমরা কেউ এই শহরে সুরক্ষিত নই। রাস্তায় সাধারণ নাগরিকদের প্রাণ হাতে করে চলতে হচ্ছে। পুলিশের উচিত ছিল এগারোজন বার্নিং শিখকেই গুলি মেরে উড়িয়ে দেওয়া। আমি তো ভিড়কে দোষ দিতে পারছি না। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই পুলিশের যা করা উচিত ছিল তা নিজেরাই করছে।”

“বন্ধ করো তো এই প্যাঁচা-পেঁচীর ভাষণ। কতগুলো বিরিঞ্চিবাবার ফালতু বাতেল্লা।” পবিত্র খেপে গিয়েছে, “আমরা কী নিয়ে, কাকে নিয়ে ডিল করছি তার ধারণা তো এদের নেই-ই। উলটে নিজেরাই প্যানিক ছড়াচ্ছে। বার্নিং শিখ আতঙ্কবাদী? তার চেয়েও বড়ো আতঙ্কবাদী এরা নিজেরা! শালা, যত রাজ্যের টেররিস্টের দল।”

অধিরাজ বিষণ্ণ মুখে মাথা নীচু করে চুপ করে বসেছিল। তার দিকে তাকালেই বুক মুচড়ে উঠছে অর্ণবের। লোকটার কী শোচনীয় দশা। সে জানে যে বার্নিং শিখের মূল টার্গেট হসপিটাল আর ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাট। কিন্তু সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। উলটে গোটা শহরে দৌড়োদৌড়ি করে বেড়াতে হচ্ছে। কখনও শিখ কলোনিতে ছুটছে। কখনও খবর আসছে কোনো গুরুদ্বারায় লোকে হামলা করেছে, সেখানে দৌড়োচ্ছে। একের পর এক জনরোষ ও ভিড়ের অ্যাটাকের খবর আসছে রেডিয়োতে বা মোবাইলে আর ওরা গত দু-ঘণ্টা ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিকে-ওদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ভিড়কে সামলাতে গিয়ে নিজেরাও ইনজিওর্ড। তবু থামবার উপায় নেই। উলটে গোটা শহরের পরিক্রমা করছে। কাছের লোকেশনগুলোয় যেখানেই গোলমাল শুনছে, সেখানেই পৌঁছে যাচ্ছে। তবু ভালো যে যথাসময়ে শিখ কলোনি ও গুরুদ্বারায় পৌঁছতে পেরেছিল। সর্বনেশে মব্ নয়তো প্রতিহিংসায় সব জ্বালিয়ে দিত৷ কলকাতার মতো এক শান্তিপ্রিয় শহরে মানুষের এই দানবীয় চেহারা! যে কল্লোলিনী তিলোত্তমা তার বিশাল হৃদয় ও উদার জনগণের জন্য বিখ্যাত, আজ সেখানেই প্রবল অবিশ্বাস ও হিংসার গন্ধ! ভাবা যায়! একটা লোকখমাত্র একটা লোক সব ছারখার করে দিল। কলকাতার প্রাণ, বিশ্বাস, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব-সব…!

অধিরাজের মোবাইল আবার বেজে উঠেছে। সে এবার সভয়ে বলল, “প্রণবেশদা…।”

“লাউড স্পিকারে দাও রাজা।”

পবিত্র-র বলার দরকার ছিল না। অধিরাজ ফোনটা রিসিভ করেই লাউডস্পিকারে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলে, “হ্যাঁ। বলুন।”

ওপ্রান্ত থেকে প্রণবেশ লাহিড়ীর উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে আসে, “রাজা, এটা শোনো।” তিনি কথা শেষ করতে-না করতেই ব্যাকগ্রাউণ্ডে একটা তীব্র শিস শোনা গেল। অর্ণবের গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। পবিত্র-র মনে হল তার শিরায় শিরায় বরফের স্রোত বইছে! এ সেই বিখ্যাত হন্টিং টিউন! গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই কে যেন মহা উল্লাসে ভয়াল শিস্ দিয়ে চলেছে। ‘অনজান হ্যায় কোই’তে যেখানে সুরটা তীক্ষ্ণ হয়ে চড়ার দিকে উঠছে সেখানে ভয়াবহ গা ছমছমে অনুভূতি। লোকটা ওখানে পৌঁছে গিয়েছে। এবং সগর্বে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।

“শা-লা!” অধিরাজ দাঁতে দাঁত পিষল, “লোকটা কোথায় প্রণবেশদা?”

প্রণবেশ লাহিড়ী ঘড়ঘড় করে ওঠেন, “লোকটা কোথায় জানলে ও মাল সিটি মারার জন্য এতক্ষণ বেঁচে থাকত না। ওরই সিটি বাজিয়ে ছাড়তাম। প্রবলেন ওটাই। আমি বা আমার টিমের কেউ খানকির ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছি না। শুধু এই নিয়ে পাঁচবার এই একই সিটি শুনতে পেলাম।”

“কোন্ দিকে বাজছে বুঝতে পারছেন?”

“ওটা আরও বড়ো প্রবলেম।” প্রণবেশের গলায় বিরক্তি, “কখনও শ্লা ডানদিকে মনে হচ্ছে, কখনও বাঁ-দিকে। কখনও একদম কাছে বাজছে। কখনও দূরে। দূরে বাজতে বাজতে কাছে আসছে। আবার কাছে বাজতে বাজতে দূরে যাচ্ছে। যেন ব্যাটা শিস ভাঁজতে ভাঁজতে পায়চারি করছে। কিন্তু কেউ যদি সিটি বাজায়, তাও এত কাছে, তবে অন্তত চোখে তো দেখতে পাবো। আমাদের সামনে এত ভিড়ও নেই যে একটা লোক হুইসল দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে, পায়চারি করছে অথচ কেউ দেখবে না!”

“আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?”

“হসপিটালের মেইন এন্ট্রান্সের সামনে।”

“ওখানে আর কোনো ঢোকার রাস্তা আছে?”

“এমার্জেন্সি একটা এক্সিট আছে ঠিকই। ফায়ার এক্সিট যাকে বলে। কিন্তু ওখান দিয়ে ঢুকতে গেলে পুলিশ কুকুর ওকে খেয়ে ফেলবে। ও মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মারতে বা সরাতে পারে। সেইজন্য আমি সঙ্গে ফেরোশাস হিসাবে কুখ্যাত কুকুর ‘ফ্যাং’কেও নিয়ে এসেছি। ও কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে ওই গেটেই দাঁড়িয়ে আছে। একটু এদিক ওদিক করে দেখুক। হাড়গোড় সব চিবিয়ে ফেলবে।”

“আশেপাশে কোনো বয়স্ক মানুষ, শিখ বা সন্দেহজনক কাউকে দেখছেন?”

“সব পেশেন্ট পার্টি বলেই মনে হয়। পাগড়ি তো দেখছি না। বুড়োবুড়ি অবশ্য আছে। কিন্তু সে তো একাধিক।”

“আচ্ছা।”

তখনও প্রণবেশের কণ্ঠস্বরের ব্যাকগ্রাউণ্ডে সুরটা শোনা যাচ্ছিল। জোরালো সিটি বাজতে বাজতেই আচমকা মাঝপথে খুব আস্তে হয়ে গিয়েছে। তারপরই ফের তার জোর বেড়ে যায়। অধিরাজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। শিসের মাঝখানে হঠাৎ অমন ছেদ পড়ল কেন? যে সুর ভাঁজছিল, তার দম শেষ হয়ে গিয়েছে? কিন্তু তাহলে পরের মুহূর্তেই অত জোর এল কোথা থেকে? দম নিতেও তো ন্যূনতম সময় লাগে।

“প্রণবেশদা…।” সে উত্তেজিত স্বরে বলে, “যা বলছি খুব মন দিয়ে শুনুন। লাইনটা কাটবেন না। ব্লু টুথে কানেক্ট করে রাখুন। ওখানে লোকজনের ভিড় তেমন নেই বলছিলেন। একটা রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে পারবেন?”

“ব্ল্যাঙ্ক কেন?” তিনি অসন্তুষ্ট, “একবার হুইস্লধারীকে দেখতে পেলে আসল ফায়ারই করব। আমার হাফ সেঞ্চুরি হয়ে যায়।”

লোকটা কিছুতেই শুধরোবে না। অধিরাজ বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকায়, “আসল ফায়ার পরে করবেন। আমি ডামি ফায়ার বা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে বলছি। ব্ল্যাঙ্ক কার্ট্রিজ আছে?”

“আছে।”

“তবে ওটাই ফায়ার করুন।” সে আবার রিপিট করল, “কিন্তু লাইন কাটবেন না।”

“হসপিটালের সামনে এমনি এমনি দুমদাম ফায়ার করব?” তিনি গরগর করেন, “তারপর মিডিয়া এসে ক্যাঁচাল করবে ‘গুলি কেন চালিয়েছেন’? ‘ফায়ার করার মানে কী? পেশেন্ট পার্টিকে ভয় দেখাচ্ছেন কেন? এটা কি দিওয়ালি না আপনার শালার বিয়ে যে ক্যাপ বন্দুক ফাটাচ্ছেন?’ মামাবাড়ির আবদার জুড়ে কান এঁটো করে দেবে ইয়েগুলো…!”

অধিরাজ ভ্রূ-ভঙ্গি করে, “আপনি কবে থেকে মিডিয়ার তোয়াক্কা করছেন? তেমন হলে বলে দেবেন এডিজি সেনের অর্ডার। এমার্জেন্সি ছিল।”

“বেশ।”

প্রণবেশের গলা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হল। কয়েকটা অস্থির মুহূর্ত। পরক্ষণেই প্রচণ্ড জোরে ফায়ারিং-এর আওয়াজ। অধিরাজ, অর্ণব, পবিত্র বা টুইঙ্কলের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ওটা ব্ল্যাঙ্ক রাউন্ড ফায়ারই বটে। তারা ফায়ারিং-এর আওয়াজ শুনে অভ্যস্ত। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে পার্থক্য বোঝা সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ভয়ার্ত চেঁচামেচি, শোরগোল ও দৌড়াদৌড়ির শব্দ ভেসে এল ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শিসের সুর তখনও অব্যাহত! কী আশ্চর্য! লোকটা একটুও ভয় পায়নি। এখনও আরামসে সিটি দিয়ে চলেছে!

“প্রণবেশদা।” অধিরাজের চোখ দুটো দপ করে জ্বলে ওঠে, “আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন। পৃথিবী উলটে গেলেও আপনি আপনার টিম সহ ওখান থেকে নড়বেন না। বার্নিং শিখ ওখানেই আপনার চোখের সামনে আছে। কিন্তু এই হুইসল সে আদৌ বাজাচ্ছে না।”

“হুইসল সে বাজাচ্ছে না মানে? তার হয়ে অন্য কেউ প্রক্সি দিচ্ছে বলছ?”

“কেউ প্রক্সি দিচ্ছে না।” সে বুঝিয়ে বলল, “আদতে কোনো মানুষই সিটি বাজাচ্ছে না। এটা রেকর্ডেড। যদি লাইভ কেউ বাজাত, তবে আপনার ফায়ারিং-এর জোরালো শব্দে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুম্ করে থেমে যেত। যত সাহসী লোকই হোক না কেন, এটা সাধারণ রিফ্লেক্স অ্যাকশন। আমরা ফায়ারিং-এর আওয়াজ শুনে সিজন্ড। তাও কথা বলতে বলতেই কানের কাছে যদি জোরালো কোনো শব্দ- যেমন গাড়ির টায়ার বার্স্ট বা ব্লাঙ্ক ফায়ারের আওয়াজও পাই, তবে আমরাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে যাই। কিন্তু অত জোরে ফায়ারিং-এর শব্দেও শিসটা একটুও থামল না। অথচ একটু আগেই বিনা কারণে একদম হালকা হয়ে এসেছিল। এটা কোনো মানুষের আওয়াজই নয়। সাউন্ডটা পুরো রেকর্ডেড। সম্ভবত কারোর বুকপকেটে মোবাইলে বাজছে। মোবাইলে নোটিফিকেশন বা মেসেজ এলে অনেক সময় সাউন্ড হালকা হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অথচ ফায়ারের সাউন্ডেও থেমে যায়নি। ও আপনাকে মিসলিড করছে। চাইছে আপনি ওই সাউন্ডটা খুঁজুন, তার পেছনে দৌড়ান ও মিসগাইডেড হয়ে যান। বুঝেছে যে ‘ফ্যাংকে বোকা বানানো যাবে না। ওদিকে আপনাকে টপকেও হসপিটালে ঢুকতে পারছে না। তাই নাকের সামনে রাঙা মুলো ঝোলাচ্ছে। আপনি সেটা হতেই দেবেন না। যা-ই ঘটুক একদম ঠায় নিজের পজিশনেই দাঁড়িয়ে থাকুন। আমরা আসছি।”

“ওকে। গট ইট।”

ফোনটা কেটে দিয়েই অধিরাজ শশব্যস্তে পবিত্র-কে বলে, “ফুল স্পিড নাও৷ হসপিটালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছোতে হবে। ও পাবলিক ওখানেই আছে। কিছু করার চেষ্টা ও নিশ্চয়ই করবে। তার আগেই পৌঁছোনো দরকার।”

“ফের ওয়ার্ডবয় হয়ে ঢুকবে বলছ? ফাঁকা সিরিঞ্জ বা লেথাল ইঞ্জেকশন?”

পবিত্র-র কথায় মাথা নাড়ল সে, “না। ওই পাঁয়তাড়া ফ্লপ। এখন শিফট চেঞ্জ হওয়ার সময় নয়। ওয়ার্ডবয়ের ড্রেস বা আইডেন্টিটি কার্ড এখন ওর কাছে নেই। সিরিঞ্জ অবধি পৌঁছোতে পারবে না। মরিয়া হয়ে একটা কাজই করতে পারে।”

“কী?”

টুইঙ্কল অরোরা রুদ্ধশ্বাসে জানতে চায়, “চাকু বা বন্দুক?”

“১৯৮৪’-র শিখ রায়টে বন্দুক ইউজ হয়নি সেনোরিটা। চাকু অবশ্য ইউজ হয়েছিল। কিন্তু সেসব নিয়ে আই সি ইউ-র ভেতরে ঢুকতেও পারবে না। লোকটা উন্মাদ; কিন্তু সেয়ানা পাগল। ও সেটাই করবে যা অলরেডি করে দেখিয়েছে। আর সেটা আই সি ইউ’র বাইরে থেকেও করা যায়।”

“মানে…!”

পবিত্র-র বাচালতাও যেন লোপ পেল। অর্ণব শ্বাস টেনে বলল, “আগুন?”

“ওই একটা অস্ত্রই আছে অর্ণব যেটা ও ইউজ করতে পারে।” অধিরাজ আত্মমগ্নস্বরে বলে, “১৯৮৪ সালের অ্যান্টি শিখ রায়টে বন্দুক, রাইফেল ইউজ হয়নি। কিন্তু শিখদের কলোনি, ব্লকগুলোকে সব কিলোদরে পুড়িয়েছিল ‘মব্’। এমনকি ‘এইমস’ বা ‘সফদরজঙ্গ’ হসপিটালে শিখরা আশ্রয় নিয়েছে জানতে পেরে তারা গোটা হসপিটালকেই ভাঙচুর আর আগুন লাগানোর পরিকল্পনা করেছিল। যদিও শেষপর্যন্ত তেমন সর্বনাশ হয়নি। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ শিখদের আশ্রয় দেয়নি। এমনকী তাদের চিকিৎসাও করেনি। যা-ই হোক, ওই রায়টে আগুনের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। আর বার্নিং শিখের প্যাটার্ন হুবহু ওই রায়টকেই ফলো করছে। তাই হসপিটালে আগুন লাগার সম্ভাবনাই বেশি।”

“কয়েকটা লোককে মারার জন্য গোটা হাসপাতালেই আগুন ধরাবে! ওখানে তো কয়েকশো পেশেন্ট…!” পবিত্র শিউরে ওঠে, “এ কী ধরনের পাগলামি!”

“আজ একজন এরকম পাগলামি করছে। ১৯৮৪ সালের ওই বাহাত্তর ঘণ্টা হাজার হাজার লোক এই পাগলামি করেছিল পবিত্র। এবং সেটাকেই ‘ন্যায়’ হিসাবে সাপোর্ট করেছিল সবাই। কত হাজার শিখ পুড়ে মরেছে, কত হাজার ঘর, কত কলোনি জ্বলেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সরকারি ফাইলে মৃত্যুর যে সংখ্যাটা আছে, সেটাও নেহাতই আই ওয়াশ! দিল্লির সমস্ত গুরুদ্বারা শিখদের সমেত পুড়েছিল। ব্লকের পর ব্লক জ্বালিয়ে দিয়েছিল তারা। পোড়া, কাটা শবদেহের ভিড়ে গলির মধ্যে পা ফেলার জায়গা ছিল না।” সে একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আজ ও অবিকল সেই কাজটাই করছে। আর ওকে এই কাজটা ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা শিখিয়ে দিয়েছে! প্যাটার্ন একদম সেম!”

“তুমি এত কথা জানছ কী করে? লোকটাকে বুঝছই-বা কী করে?” পবিত্র বলে, “১৯৮৪ সালে তোমার জন্ম হওয়া তো দূর, আমার জন্মও হয়নি। এডিজি সেনও বোধহয় বড়োজোর টিন বাজাচ্ছিলেন। অবশ্য যদি তুমি পূর্বজন্মে শিখ হয়ে থাকো, আর ওই দাঙ্গাতেই পটল তুলে থাকো, তাহলে কিছু বলার নেই। আমি জাতিস্মরদের থেকে দূরে থাকতেই চাই।”

“এসব জানার জন্য জাতিস্মর হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু একটু কৌতূহল আর পড়াশোনা থাকলেই হয়। যখন বার্নিং শিখের তাণ্ডব অন্যান্য শহরে চলছিল, তখনই আমি কৌতূহলবশতই একটু রিসার্চ চালাচ্ছিলাম। যেখানে দুটো গুলি মারলেই গল্প শেষ হয়, সেখানে কেন লোকটা এত কষ্ট করে নেকলেসিং করছে, তরোয়ালের মতো ব্যাকডেটেড জিনিস ইউজ করছে, কেন তার অমন অদ্ভুত পৈশাচিক ছদ্মবেশ, এইসব প্রশ্নই মনে আসছিল। তখনই সঞ্জয় সুরির ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর, দ্য অ্যান্টি শিখ ভায়োলেন্স অ্যান্ড আফটার’ বইটা পড়ি। তারপর বিক্রম কাপুরের সম্পাদনায় ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর, ইন মেমোরি অ্যান্ড ইম্যাজিনেশন’, পাভ সিং-এর ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর, ইন্ডিয়াজ গিলটি সিক্রেট’, জর্নেল সিং-এর ‘আই অ্যাকিউজ…’, মনোজ মিত্তা আর এইচ এস ফুলকা’র ‘হোয়েন এ ট্রি শুক ডেলহি’, সনম সুতিরথ ওয়াজিরের ‘দ্য কৌরস্ অব নাইন্টিন এইট্টি ফোর, দ্য আনটোল্ড, আনহার্ড স্টোরিজ অব শিখ ওমেন’, ইশমিত কৌর চৌধুরির ‘ব্ল্যাক নভেম্বর’, নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ‘শিখস্ দ্য আনটোল্ড অ্যাগোনি অফ নাইন্টিন এইট্টি ফোর, সরবপ্রীত সিং এর ‘নাইট অফ দ্য রেস্টলেস স্পিরিটস’-এর মতো অজস্র বই পড়েছি। বেশিরভাগ নামই নিতে পারলাম না, কারণ পুরো লিস্ট দিলে সেটা মহাভারতের থেকেও বড়ো মহাকাব্য হয়ে যাবে। তার মধ্যে অর্ধেক বই আবার ব্যান্ড! কী করে যে পড়েছি তা আমিই জানি। এখানে নিজের প্রভাবটা কাজে লেগেছে আর কী।” সে চুপ করে থেকে বলে, “শুধু তাই নয়, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্থান টাইমস্‌, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে অমর উজালা, দৈনিক জাগরণ, নবভারত টাইম্স, পঞ্জাব কেসরী, রাজস্থান পত্রিকা, দ্য স্টেটসম্যান, দ্য ট্রিবিউন, দৈনিক ভাস্কর, আনন্দবাজার পত্রিকা অবধি যত নিউজপেপার নিউজগুলোকে কভার করছিল, তাদের ওই বাহাত্তর ঘণ্টার প্রত্যেকটা প্রতিবেদন লাইব্রেরি, আর্কাইভ থেকে বের করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। থার্টি ফার্স্ট অক্টোবরের মতো ফিল্ম, এবিপি নিউজের ‘দর্পকে চৌত্রিস সাল’, ‘যব জলি থি দিল্লি’, এবিপি লাইভের টিভি সিরিজ, শেখর কাপুরের ‘প্রধানমন্ত্রী’, ফার্স্টপোস্টের ডকুফিচার, বিবিসি নিউজের ‘দ্য নাইন্টিন এইট্টিফোর রায়টস্’, দিল্লি তকের ডকুমেন্টারি, এন ডি টিভির ‘দ্য হরর দ্যাট স্টিল হন্টস্’, ‘ফরগটেন চ্যাপ্টার?’ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এইচ এস ফুলকার ইন্টারভিউ, সঙ্গত টেলিভিশনের ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর শিখ জেনোসাইড ডকুমেন্টারি’ থেকে যত ডকুমেন্টারি এমনি পেয়েছি, রাজীব গান্ধীর স্পিচ থেকে সমস্ত আসল ফুটেজ, যত ফিল্ম এখনও পর্যন্ত হয়েছে, সব দেখেছি। নানাবতি কমিশন, কপুর মিত্তল কমিটির রিপোর্ট, সজ্জনকুমার এবং অন্যান্য নেতাদের কোর্ট কেসের সমস্ত নথি, ক্লাসিফায়েড ফাইল, ব্যান্ড ফিল্ম-ডকুফিচার, ব্যান্ড জার্নাল, খুশবন্ত সিং এর লেখা, মনমোহনবীর সিং তলোয়ারের এফিডেবিট, কেস ফাইল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান-ইন্টারভিউ কিচ্ছু ছাড়িনি। এই সব কিছুর মূলে যে ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর সম্পর্কেও যতখানি জানা সম্ভব, জেনেছি। তাই সব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে।”

“সব প্রশ্নের উত্তর তুমি জানো?”

“হ্যাঁ।” সে একটু বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ে, “ওর মনের অবস্থা, অবসেশনগুলো অন্তত বুঝতে পারি। ওর প্যাটার্ন, মোডাস অপারেন্ডিও একদম স্পষ্ট। ওই বাহাত্তর ঘণ্টা দিল্লিতে কী হয়েছিল তা তুমি কল্পনা করতে পারবে না। লোকটা শয়তান, রাক্ষস, দানব-সব হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে কপালপোড়াও বটে।”

“হ্যাঁ, সেইজন্য এখন অন্যের কপাল পোড়াচ্ছে। গ্যালন গ্যালন তেল দিয়ে।” পবিত্র ড্রাইভ করতে করতেই জিজ্ঞাসা করে, “কিন্তু তুমি বুঝলে কী করে যে শিসের আওয়াজটা রেকর্ডেড? এমনও তো হতে পারে যে লোকটা ফায়ারিং সাউন্ডটা শুনেও শিস্ দেওয়া বন্ধ করেনি।”

“তোমার মনে হয়- তা হতে পারে?”

“এমন কী অসম্ভব ব্যাপার? ও যা ডেঞ্জারাস টাইপের ডেসপারেট লোক, একটা ফায়ারিং-এর আওয়াজও হয়তো ওকে থামাতে পারেনি। হয়তো…।”

আকস্মিক একটা জোরালো ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দে পবিত্র নিজেই কথাটা বলতে বলতে ঘাবড়ে গিয়ে থেমে গেল। অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে দেখে অধিরাজ মোবাইলটা তুলে দেখায়। সে নিজের ফোনেই একটা রিং বাজাচ্ছিল। আঙুল তুলে বলল, ‘তুমিও তো একজন ডেঞ্জারাস ডেসপারেট কপ্। ওর যা অভিজ্ঞতা তার চেয়ে বেশি গান ফায়ারিং, ব্লাস্ট, বম্বের ধামাকা শুনে অভ্যস্ত। এটা তো জাস্ট নিরীহ একটা ফোন রিং। তবে তুমি ঘাবড়ে গিয়ে থেমে গেলে কেন?”

সে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে মাথা ঝাঁকায়, “বুঝলাম। এর পেছনে ডেয়ার ডেভিল, ডেসপারেট বা ডেঞ্জারাস হওয়ার কোনো ফান্ডা নেই। এটা মানুষের স্বাভাবিক রি-অ্যাকশন।”

অধিরাজ ঘড়ি দেখছে, “বুঝে ধন্য করেছ। এবার টপ গিয়ারে চালাও প্লিজ। আমরা লোকেশন থেকে বেশি দূরে নেই। আমাদের যত তাড়াতাড়ি হোক পৌঁছোতে হবে। অন্য কেউ হলে চাপ ছিল না। কিন্তু প্রণবেশদার ধৈর্যের ওপর আমার বিশেষ আস্থা নেই। লোকটা ওঁকে প্রোভোক করছে। উনি কখনো-না কখনো ঠিক অধৈর্য হয়ে শিসের মালিককে গুলি করতে তেড়ে যাবেনই। আর ওটাই ও চাইছে…!”

কথাটা মুখ থেকে খসাতে-না খসাতেই আবার ফোন বেজে উঠেছে। আবার প্রণবেশ লাহিড়ী। এবার ভিডিও কল। এমন কী হল যে ভদ্রলোক ভিডিও কল করছেন? অধিরাজ উদ্বেগে কাঁটা হয়ে কল রিসিভ করে, “হ্যাঁ প্রণবেশদা…।”

অন্যদিক দিয়ে প্রণবেশের গর্জন ভেসে আসে, “ওই দেখো, হারামজাদা আমার সামনে…!”

কথাটা বলার প্রয়োজন ছিল না। ক্যামেরাটা ঘোরানোই ছিল। অধিরাজের মোবাইলে তখন বার্নিং শিখের লাইভ ফুটেজ ভেসে উঠেছে। সেই এক বেশভূষা, এক ভয়ংকর মুখ। নিস্পৃহ, নিরাসক্ত। সেলাই করা ঠোঁট। প্রণবেশের সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত রেখে অবলীলায় শিস দিচ্ছে, গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই… 1

আশেপাশের মানুষজন আগেই ফায়ারিং-এর আওয়াজ শুনে বোধহয় পালিয়ে গিয়েছিল। কারণ বার্নিং শিখের ধারে কাছে কেউ নেই। সে একাই দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। মুখে ভয়ের কোনো ছাপ নেই। বাইরে শীতের রাতের অন্ধকার থাকলেও সম্ভবত হসপিটালের গেটের সামনে জোরালো আলোর বন্দোবস্ত আছে। তাই লোকটাকে একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখে অর্ণব এক মূহুর্তের জন্য কেঁপে উঠল। একে তো রাতের প্রেক্ষাপটে ওইরকম ভয়াবহ চেহারা! সেই ‘আনক্যানি’ শিরশিরে হুইসল। তার ওপর সে মানুষটার ঔদ্ধত্যে স্তম্ভিত হয়ে গেল। প্রণবেশ লাহিড়ী হাতের কাছে বার্নিং শিখকে পেয়ে নির্ঘাৎ জপমালা নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। এতক্ষণে ওঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র উঠে আসার কথা। কিন্তু গানপয়েন্টে দাঁড়িয়েও শিকারের কোনোরকম হেলদোল নেই। সে খুচখুচ করে মাথা চুলকোচ্ছে। আর নিজের কৃতিত্বে বেজায় খুশি হয়ে আপনমনেই সুর ভাঁজছে, “গুমনাম হ্যায় কোই…।”

ভিডিও কলের মধ্যেই শোনা গেল প্রণবেশের বাজখাঁই গলার হুঙ্কার, “চো-প্-স্না! আজ তোর খেল খতম্…!”

এ পাশ থেকে অধিরাজ প্রাণপণে চেঁচিয়ে ওঠে, “নো…..না… নো…নো। প্রণবেশদা…ডোন্ট ডু দিস্… ….ইটস্ আ ট্র্যাপ…।”

কে শোনে কার কথা! যিনি এনকাউন্টারের সংখ্যা গুণতে ওস্তাদ তিনি ফাঁদের তোয়াক্কা করবেন? মুহূর্তের মধ্যে শোনা গেল ফায়ারিং-এর শব্দ। কিন্তু এবার ব্ল্যাঙ্ক নয়! আসল ফায়ার। তবে বার্নিং শিখ বোধহয় রেডিই ছিল। সার্ভিস গান তাকে লক্ষ করে গর্জে ওঠার আগেই সে পেছন ফিরে দৌড় মেরেছে। যাকে বলে পিটটান দেওয়া প্রণবেশ লাহিড়ীও অত সহজে ছাড়ার লোক নন্। তিনি এবং তাঁর জুনিয়র অফিসাররাও দুড়দাড় করে বার্নিং শিখের পেছনে ধাওয়া করেছেন। তাঁদের দেখতে না পেলেও একাধিক বুটজুতোর ধপাধপ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মোবাইলের ক্যামেরাও সমানতালে লাফাচ্ছে-ঝাঁপাচ্ছে, কাঁপছে।

“প্রণবেশদা…!” সে কাতর কণ্ঠে বলল, “ওর পেছনে যাবেন না। হোল্ড দ্যাট পজিশন। শুনছেন আপনি? ডোন্ট শ্যুট… ডোন্ট শ্যুট…. ডোন্ট চেজ হিম….।” প্রণবেশ কিছু শুনলেন কিনা কে জানে। তাঁর চিৎকার ভেসে এল, “স্ট-প! দাঁড়া বলছি।”

পরক্ষণেই প্রচণ্ড ফায়ারিং-এর আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। লাইনও কেটে গিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। তিনি নিজেই কাটলেন, না দৌড়োদৌড়ি লাফালাফির চোটে কেটে গেল কে জানে। শুধু এইটুকু বোঝা গেল যে প্রণবেশ আপাতত হাফ সেঞ্চুরির দিকেই এগোচ্ছেন। তাঁর স্কোরবোর্ড আটকানোর সাধ্য কারোর নেই। “হে-ল্!”

নিষ্ফল আক্রোশে, রাগের মাথায় হাতের মোবাইলটাকেই গাড়ির মেঝেতে সবলে আছাড় মারল অধিরাজ। ফোনটা দড়াম করে পড়ল গাড়ির মেঝেতে। তবে বিশেষ ক্ষতি হয়নি। অর্ণব আর পবিত্র আগে এমন দৃশ্য অনেকবার দেখেছে। তাই ওদের বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু টুইঙ্কল হাঁ। অধিরাজের বন্য রাগ সে এই প্রথমবার দেখছে! অবাক হয়ে বলল, “স্যার, লাহিড়ীস্যার তো ঠিকই করছেন। চোখের সামনে বার্নিং শিখকে দেখে কি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন? পুলিশ ওকে শ্যুট না করে সারেন্ডার করতে বলেছিল। তার ‘নতিজা’ কী হয়েছে তা আমরা দেখেছি…!”

তার মুখে ফোঁটা ফোঁটা স্বেদবিন্দু। সজোরে শ্বাস টানতে টানতে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, “মিস্ অরোরা, ওই ঘটনাটা যে ঘটিয়েছে সে আসল বার্নিং শিখ। কিন্তু যার পেছনে এই মুহূর্তে প্রণবেশদা ও ওঁর টিম দৌড়চ্ছেন, সে আদৌ বার্নিং শিখই নয়! ওর বারো নম্বর অবতার! যাকে ওই একই ড্রেস আর মেক-আপে সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আবার ফল্স্ খেলেছে।”

“ফলস্!” টুইঙ্কলের চোখে বিস্ময়, “বুঝলেন কী করে?”

“লোকটা শিস দিতে দিতে মাথা চুলকাচ্ছিল। কোনো শিখকে আমি আজ পর্যন্ত পাগড়ি পরা অবস্থায় মাথা চুলকাতে দেখিনি। ও চুলকোচ্ছিল তার একটাই কারণ, পাগড়ি পরার অভ্যাসই ওর নেই। তাই আনইজি ফিল করছে। বার্নিং শিখ কখনও এটা করবে না। সে একজন শিখ। জানে যে পাগড়িসুদ্ধ মাথা চুলকাতে গিয়ে পাগড়ি খুলে যেতে পারে, সরে যেতে পারে। যেটা ওর ধর্মের অপমান।”

এতক্ষণে টুইঙ্কল ব্যাপারটা বুঝল। সে ইতিবাচক মাথা নাড়ে, “সহি! পাগড়িকে কেউ ছেড়ছাড় করে না। এ ব্যাটা শিখই নয়।”

“তাছাড়া ওর চোখ দেখলেই চেনা যায়।” অধিরাজের গলা কাঁপছে, “পুলিশ আর মব্‌ খামোখাই কতগুলো নির্দোষ মানুষকে মারল। তারা যদি সামনের বার্নিং শিখের চোখের দিকে তাকাত তাহলেই ফারাকটা বুঝত। একটা মানুষ সব লুকোতে পারে। শুধু চোখ ও চোখের দৃষ্টি নয়!”

“কিন্তু স্যার…।” অর্ণব এতক্ষণে মুখ খোলে, “ওর তো একটা চোখ নেই।”

“দুটোই আছে। ওটা দুরন্ত মেক-আপ। একটা চোখ দেখা যায় না, মুখোশের আড়ালে থাকে। কিন্তু আর একটা চোখ তো দেখা যায়। সেটা কখনও মন দিয়ে দেখেছ?” সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে বলে, “ওর ওই চোখটায় যেন আগুন জ্বলে। অন্য মেক-আপে ওটা হয় না। যেই বার্নিং শিখের গেট-আপে আসে, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই তার ওই উনিশশো চুরাশির হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়ে যায়। নিজের স্বজনদের কীভাবে মরতে দেখেছে, ওই পাগড়ি কীভাবে জ্বলতে বা কাটতে দেখেছে সেসব ওর চোখের সামনে ভাসে। সেইজন্য ওর চাউনিটাও ভয়াবহ। কিন্তু যে লোকটা প্রণবেশদার সামনে দাঁড়িয়েছিল তার চোখ আমি দেখতে পেয়েছি। একদম শান্ত, নিরুত্তাপ ও ভাসাভাসা দৃষ্টি। ওটা কিছুতেই বার্নিং শিখের চোখ নয়। হতেই পারে না।”

অর্ণবের হৃৎপিণ্ড বুঝি কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল, “তার মানে হুইস্লের ইশারার টোপে যখন লাহিড়ী স্যার গেট থেকে নড়লেন না, তখন বার্নিং শিখের আর একটা রেপ্লিকাকে ওঁর নাকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল।”

“এগজ্যাক্টলি। ও জাস্ট আরও একটা টোপ।” সিটের ওপর সজোরে চাপড় মারল অধিরাজ, “আর এই মুহূর্তে ওই নকল লোকটাকেই খ্যাপা মোষের মতো তাড়া করছেন প্রণবেশদা আর ওঁর টিম। লোকটা পুরো টিমটাকেই নিজের পেছনে ছুটিয়ে ওদের অন্যদিকে সরিয়ে দিল। এখন হসপিটালের গেট ফাঁকা। আর আমার ধারণা, বার্নিং শিখ এখন ওই রূপে নেই। অন্য কোনো ছদ্মবেশে আছে। ওয়ার্ডবয় বা সিস্টারের ছদ্মবেশের দরকার নেই, জেনারেল যে কোনো চেহারা হলেই চলবে। আই সি ইউ আর তার টার্গেটই নয়। সে হসপিটালের ইলেক্ট্রিসিটি রুম বা মেইন পাওয়ার রুমটাই এবার খুঁজবে! স্রেফ যে-কোনোভাবে শর্ট সার্কিট করতে পারলেই কেল্লা ফতে। আমরা যদি সময়মতো গিয়ে না পৌঁছোতে পারি, তবে লোকটা স্রেফ ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বেরিয়ে যাবে! পি সি চৌধুরীর পরিবারকে তো বাদ দাও, কতজন অসহায় পেশেন্ট পুড়ে বা নিঃশ্বাস নিতে না পেরে বিষাক্ত ধোঁয়ায় মরবে তার ঠিক নেই। মরার জন্য সবসময় আগুনের প্রয়োজন নেই। আই সি ইউ তে ভেন্টিলেটর, এসি চলে। বাইরের হাওয়া ঢোকে না। এসি ডাক্টের মাধ্যমে কার্বন মনোক্সাইড ঢুকলেই সব শেষ…! ”

“কেউ মরবে না।”

অনমনীয় সংকল্পেল্প, প্রচণ্ড জেদে পবিত্র গাড়ির গতিবেগ বাড়ায়। তার চোয়াল শক্ত। অ্যাকসিলেটরের ওপর চাপ ক্রমাগতই বাড়ছে। পিচের রাস্তা দিয়ে ফুল স্পিডে ওদের গাড়ি এগোল হসপিটালের দিকে। খোলা জানলা দিয়ে হিমেল হাওয়া ফের ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেখে অর্ণব দ্রুত গাড়ির কাচ তুলে দেয়। টুইঙ্কল অরোরা কী করবে বুঝতে না পেরে টেনশনে ফের একটা জবরদস্ত চুরুট মুখে দিয়ে নিজের দেশলাই বা লাইটারটা খুঁজছিল। কোনো কারণে উত্তেজিত হয়ে গেলে সে আর লাইটার খুঁজেই পায় না। অগত্যা অধিরাজই সেটা লক্ষ করে সসম্মানে ফের তার সিগারটাতে অগ্নিসংযোগ করে দিয়েছে। টুইঙ্কল একটু লজ্জিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে ফের নম্রভাবে বাও করে বলল, “হেইল সেনোরিটা।”

কথাটা বলেই নিজেও অন্যমনস্কভাবে বুক পকেট হাতড়াচ্ছে। অস্থিরভাবে আবার ধূমপানের তাল করছে। অর্ণব মৃদুস্বরে বলল, “ড্যাশবোর্ডে রেখেছেন।”

“থ্যাংকস অর্ণব।”

অধিরাজ আর একটাও কথা না বলে ফের ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেটটা তুলে নেয়। গাড়ির ভেতরে এখন পিনপতনের নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। মনে মনে সকলেই প্রমাদ গুণেছে। প্রণবেশ লাহিড়ী যতক্ষণ পাহারায় ছিলেন, ততক্ষণ কোনো চিন্তা ছিল না। অনেকক্ষণ ধরেই লোকটা ওঁকে সরানোর প্ল্যান করছিল। সে প্রণবেশ লাহিড়ীর দুর্বলতা সম্পর্কে নির্ঘাত জানে। অ্যাকশন পেলে উনি আর কিছু বোঝেনই না। সঠিক, বেঠিক, কিছুই মাথায় ঢোকে না। তাই একদম মাস্টারস্ট্রোক খেলেছে। আর এক নকল বার্নিং শিখকে সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ওঁকে তার পেছনে দৌড় করাচ্ছে। হাসপাতালের গেট এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত! প্রণবেশের ধারণাও নেই যে ওঁর এই ভুলটায় কত বড়ো সর্বনাশ হতে চলেছে! হসপিটালে যদি সত্যিই আগুন ধরে তবে কী জবাব দেবে ওরা! পি সি চৌধুরীর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য এত ঘণ্টা ধরে যে আপ্রাণ লড়াই করে চলেছে, তার কোনো মূল্য তো থাকবেই না। উলটে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ হিসাবে এতগুলো রোগীর প্রাণ…!

মসৃণ রাস্তা বেয়ে তীব্র বেগে হু হু করে গাড়ি এগিয়ে চলল। এদিকে আপাতত আর কোথাও কোনো মারদাঙ্গা নেই। হয়তো লাগাতার এতক্ষণ মারপিট করে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কে জানে ওদিকে এডিজি সেন কী করছেন! শেষপর্যন্ত শহরকে স্তব্ধ করতে পারা যাবে কিনা তাও নেতা-নেত্রী-মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এডিজি সেন এবং বাকি উচ্চপদস্থ আই.পি.এস.-রা প্রেস কনফারেন্স ছেড়ে এখন গভর্নমেন্টের সঙ্গে দর কষাকষি চালাচ্ছেন। তাঁরা অবিলম্বে কার্ফিউ কিংবা এমার্জেন্সি জারি করতে চান। অথচ রাজনীতি আবার জনগণের ভোটব্যাঙ্কের ওপর চলে। তাই মন্ত্রকের কর্তা-ব্যক্তিরা আমতা আমতা করছেন। কিছুদিন আগেই কোভিডের ঠ্যালায় মানুষ গৃহবন্দি হয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। আবার তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটা শহরবাসীদের আদৌ পছন্দ হবে না। তারা সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত হতে পারে। এডিজি সেন ও বাকিরা আপ্রাণ তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র আগামীকাল সূর্যোদয় অবধি নিলেই চলবে। জনগণের এতে রাগ হওয়া উচিত নয়, কারণ এটা তাদের নিরাপত্তার জন্যই। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা মানবেন না। তাদের বক্তব্য, “এই কয়েকঘণ্টার জন্য এত কাণ্ড করার কী দরকার? তার চেয়ে বার্নিং শিখকেই ধরুন। প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে।”

এডিজি সেনের মেসেজ মারফত এই সংবাদ শোনার পর থেকেই আরও বেশি মাথা বোঁ বোঁ করছে অর্ণবের। সরকার কি দেখতে পায় না যে শহরে কী ঘটছে? অধিরাজ আগেই আন্দাজ করেছিল যে লোকটা ওদের ডাইভার্ট করার জন্য সবকিছু করতে পারে। কিন্তু সেটা এইভাবে! ধড়াধড় নিরীহ মানুষের লাশ ফেলে। জনগণকে খেপিয়ে তুলে। সে নিজের এতগুলো ক্লোন বানিয়ে ফেলবে তাই বা কে ভেবেছিল? তার একটা চালেই সি আই ডি কুপোকাত। এতক্ষণ ধরে শুধু গোটা শহর চষে বেরিয়ে ঘেমে নেয়ে অস্থির হল। সম্পূর্ণ একটা ক্যাওয়াস তৈরি করে অযথা ছুটিয়ে মারল। নয়তো হসপিটালে আগেই পৌঁছে যেত ওরা। আর এখন যদি ঠিক সময়ে পৌঁছোতে না পারে, তবে কী হবে!

পবিত্র গাড়িটাকে প্রায় উড়িয়েই নিয়ে চলেছে। আর মাত্র মিনিট দুয়েকের রাস্তা। অধিরাজ শুধু অধৈর্যভাবে ঘড়িই দেখছে। ওদিকে প্রণবেশ লাহিড়ীর তরফ থেকে এখনও কোনো ফোন আসেনি। ওরা ফোন করলে স্রেফ বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে, তিনি তুলছেন না। আফসোসে অধিরাজ ঠোঁট কামড়ায়! এই ভদ্রলোক ডোবাবেন। কী হচ্ছে ওদিকে তাও ওদের জানা নেই।

দ্রুত একটা রাইট টার্ন নিতেই এবার হসপিটালটাকে নাক বরাবর পরিষ্কার দেখা গেল। কিন্তু সে দৃশ্য দেখে ওদের সকলেরই আত্মারাম খাঁচাছাড়া! বার্নিং শিখ বা গুলশন নিজের কার্যসিদ্ধি করে ফেলেছে। অধিরাজ যা ভেবেছিল, অবিকল তাই। হসপিটালের দোতলার জানলা দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে কালো ধোঁয়া৷ কম্পাউন্ডের ধারে কাছে এখনও যায়নি। অথচ ধোঁয়ার প্রাবল্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার সঙ্গে বাতাসে পোড়া গন্ধ! যতখানি দেখা যাচ্ছিল, তাতেই চারজনের বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে প্রকট হয়েছে ধুম্রদানব আর আগুনের রেখা। লোকটা সত্যিই গোটা হসপিটাল জ্বালিয়ে দিল।

“ক্র্যা-প!”

গাড়িটাকে তখনও পবিত্র গেটের ভেতরে ঢোকাতে পারেনি। তার মধ্যেই কানে এল অজস্র মানুষের বিপন্ন আর্তচিৎকার। কিছু লোক ওই জ্বলন্ত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। তারা প্রাণের দায়ে দৌড়োচ্ছে গেটের দিকে। তাদের মধ্যে ডাক্তার, সিস্টার, ওয়ার্ডবয়রাও আছে। সারিসারি কালো মাথা পিলপিল করে বাইরের দিকে ছুটছে। আর হসপিটালের ভেতর থেকে ভেসে আসছে পরিত্রাহি আর্তনাদ—“বাঁ-চা-ও …বাঁ-চা-ও। …হে-ল্প!… হে-ল্প।”

অধিরাজ আর বিন্দুমাত্রও অপেক্ষা না করে ওই চলন্ত গাড়ি থেকেই ভল্ট খেয়ে লাফিয়ে পড়েছে বাইরের দিকে। টুইঙ্কল তার কাণ্ড দেখে সবিস্ময়ে বলল, “ও ত্তেরি।” তারপর নিজেও একইরকমভাবে বাইরে ঝাঁপাল। পবিত্র সজোরে ব্রেক কষে গাড়িটাকে কোনোমতে দাঁড় করিয়ে প্রাণপণে ছোটে দু-জনের পেছন পেছন। সঙ্গে অর্ণব।

“ভেতরে যাবেন না দাদা।”

ভিড়ের মধ্য থেকেই কোনো একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল, “আগুন লেগেছে। শর্ট সার্কিট। আগুন হসপিটালের কিচেন অবধি পৌঁছে গেছে। যে-কোনো মুহূর্তে কিচেনও বার্স্ট করবে। প্রচুর গ্যাসের সিলিন্ডার আছে ওখানে।”

“ইলেক্ট্রিক রুম কোথায়? আর কিচেন?”

অধিরাজ দৌড়োতে দৌড়োতেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করে। এবার এক ভয়ার্ত ওয়ার্ডবয় হাঁপাতে হাঁপাতে জানাল, “দুটোই ফার্স্ট ফ্লোরে।”

সে আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে দৌড়োল। এই পরিস্থিতিতে কেউ লিফ্ট ব্যবহার করে না। কপালগুণে এখনও আগুনটা ফার্স্টফ্লোর ছেড়ে ওপরে ওঠেনি। ওপর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। তবে একবার কিচেন ব্লাস্ট করলে আর রক্ষে নেই। ওটাই এইমুহূর্তে সবচেয়ে অ্যালার্মিং। ওপরের ফ্লোরগুলোয় আর আই সি ইউতে আগুন এখনও পৌঁছোয়নি। কিন্তু এসি ডাক্টের মাধ্যমে এই প্রাণঘাতী কালো ধোঁয়া পৌঁছোলেও পৌঁছোতে পারে। অধিরাজ ছুটতে ছুটতেই পকেট থেকে রুমাল বের করে এদিক ওদিক তাকায়। স্টেয়ারকেসের সামনেই কপালগুণে জেন্টস ওয়াশরুম ছিল। পেছনে টুইঙ্কল, পবিত্র আর অর্ণবকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলল, “সবাই রুমাল ওয়াশরুম থেকে ভালো করে জলে ভিজিয়ে নাক-মুখ আটকে নাও। সময় নেই। পবিত্র, তুমি-সেনোরিটা আর অর্ণব শীগগিরিই আই সি ইউতে যাবে। ভগবান জানে, পেশেন্টদের কী অবস্থা! যদি ওখানে এখনও কিছু ওয়ার্ডবয়-ডাক্তার আর সিস্টাররা থেকে থাকেন তবে ওদের হেল্প নাও। প্রথমেই যারা ভেন্টিলেটরে, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে আছে এবং আই সি ইউতে সিরিয়াস অবস্থায় ভরতি তাদের বের করে অ্যাম্বুলেন্সে অন্য হসপিটালে পাঠানোর বন্দোবস্ত করো। আমি এখনই পাওয়ার অফ করছি না। কিন্তু একটু পরে হলেও পাওয়ার অফ করতেই হবে। তোমাদের হাতে খুব কম সময়। তার আগেই ওদের বের করো। এক্ষুনি হসপিটাল ইভ্যাকুয়েট করতে হবে। মিস্ অরোরা, ফায়ার ব্রিগেডকে ফোন করুন। আমি কিচেনের দিকে যাচ্ছি। ওটা ব্লাস্ট করলে আর কিছু করার নেই।”

“ইয়েস স্কিপি।”

পবিত্র ছোট্ট নড করে তাড়াতাড়ি নির্দেশ পালনে মন দেয়। ওরাশরুমের বেসিনে ওরা চারজনেই রুমাল ভালো করে ভিজিয়ে নিয়ে নাক-মুখ দ্রুত বেঁধে নিল। অধিরাজ কোনোমতে নাক মুখ বেঁধেই কিচেনের খোঁজে দৌড়োল। বাকিরা ওপরের দিকে। এই হসপিটালের গলিঘুঁজিগুলো বড়োই কনফিউজিং। কোন্‌টা যে কোনদিকে গিয়েছে তার ঠিক নেই। তার মধ্যে আবার কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। চড়চড় শব্দ। ওপরের ইলেক্ট্রিকের তার থেকে স্ফুলিঙ্গ যত্রতত্র খসে খসে পড়ছে। প্লাস্টিক পোড়ার গন্ধে কাশি আসছিল। ইলেক্ট্রিক রুম থেকে আগুনের রেখা করিডর বেয়ে চলে গিয়েছে সোজা পথে। যেখানে যেখানে পর্দা, কাপড় বা অন্য কোনো দাহ্যবস্তু পেয়েছে, জ্বালিয়েছে। অধিরাজ ছুটতে ছুটতে প্রত্যেকটা রুমই ভালো করে দেখে নিচ্ছে। উত্তেজনায় এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এবার একটু এগোতেই শুনতে পেল ফায়ার অ্যালার্মের একটানা আওয়াজ। জেনারেল ওয়ার্ড থেকে ভয়ার্ত মানুষের একটা দল আগুনকে এড়িয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে এদিকেই আসছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মোটামুটি সুস্থ পেশেন্ট। তারা চলাফেরা করতে সক্ষম। কিন্তু ভেতর থেকে এখনও চিৎকার ভেসে আসছে, ‘হেল্প! হেল্প!’ যে বেচারিরা এখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম নয় বা নড়াচড়া করতে পারে না, সম্ভবত সেই দুর্ভাগারাই চেঁচাচ্ছে।

“অ্যা-ই!” পলায়নপর মানুষের ভিড়ে কয়েকজন ওয়ার্ডবয়কে দেখে থমকে দাঁড়াল সে। ধমকে উঠল, “ই-উ!”

ওয়ার্ডবয়রা একজন মানুষকে ওভাবে ধমকাতে দেখে একটু থেমে যায়। তারা কিছু বলার আগেই অধিরাজ গর্জন করে ওঠে, “লজ্জা করে না? পেশেন্টদের ফেলে পালাচ্ছেন আপনারা? ওদের রক্ষা করার ডিউটি আপনাদের। কোথায় ওদের আগে বের করবেন, তা নয় আপনারাই আগে পালিয়ে যাচ্ছেন?”

“তুই বলার কে রে?” একজন পালটা রুখে দাঁড়ায়, “আপনি বাঁচলে বাপের নাম।”

“বাপের নাম মনে করাতে হবে?”

অধিরাজ ভ্রূকুটি করল। সাহস তো কম নয়! সে এক মুহূর্ত জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই সপাটে এক চড় মারল। পুলিশের হাত হাত নয়, হাতুড়ি! তার থাপ্পড় আচ্ছা আচ্ছা ক্রিমিনালরা নিতে পারে না, এ তো একটা ওয়ার্ডবয়। লোকটা তৎক্ষণাৎ হাউ হাউ করতে করতে উলটে পড়ে।

পরিস্থিতি সঙ্গীন দেখে বাকিদের অবস্থাও খারাপ! চতুর্দিকে আগুন। সামনে দাঁড়ানো মানুষটার চোখেও যেন ধ্বক ধ্বক করে দাবানল জ্বলছে। ওদের মধ্যেই একজন একটু নিরীহ গোছের ছিল। সে হাতজোড় করে বলে, “স্যার, মারবেন না! এই হারামজাদাটা ভুলভাল বলে ফেলেছে। ও বুঝতে পারেনি আপনি সাধারণ লোক নন। ক্ষমা করে দিন।”

“ফাজলামোর জায়গা পায় না? আমি সাধারণ বা অসাধারণ যা-ই হই না কেন, নিজের ডিউটি করবে না? ওর মাইনের টাকাটার যোগান কমন পিপল দেয়, কোনো ভি.আই.পি. নয়।” সে এবার রুদ্রমূর্তি ধরেছে। জলদগম্ভীর স্বরে আদেশ করল, “কেউ এখান থেকে পালাবে না। আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে। আপনারা সবাই ওয়ার্ডগুলোয় ফিরে যান। যে পেশেন্টরা এখনও বেরোতে পারেনি, তাদের বের করে নিয়ে আসুন। প্রত্যেকটা পেশেন্ট যেন জ্যান্ত অবস্থায় বাইরে যায়। যতক্ষণ না এই ফ্লোর পুরো খালি হচ্ছে, ততক্ষণ আপনারা কেউ বেরোবেন না।” অধিরাজ থেমে হিংস্রভাবে যোগ করল, “আমিও একটু পরেই ফিরে এসে হাত লাগাবো। তখন যদি দেখি কেউ মিসিং, বিলিভ মি, তার বা তাদের মাথায় বুলেট ভরে দিতে একটুও খারাপ লাগবে না আমার।”

অনেক সময় মিষ্টি কথা বা অনুরোধের চেয়ে হুমকি বেশি কাজে লাগে। ততক্ষণে কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ডও দৌড়ে এসেছে। তারা বলল, “স্যার, কেউ যাবে না। আমরা সবাইকে বের করে তবেই যাব। আপনি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন।”

“ফেয়ার এনাফ।” সে আর কথা বাড়ায় না, “কিচেন কোন্ দিকে?”

“সোজা গিয়ে লেফট সাইড।”

অধিরাজ আর কথাবার্তায় সময় নষ্ট না করে সোজা সেদিকেই দৌড়োল। জ্বলন্ত করিডরের ওদিকটাতেই ধোঁয়ার প্রকোপ বেশি। রীতিমতো চোখ জ্বালা করছে তার। তবে একটাই আশার কথা, এখনও কোনোরকম ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়নি। হলে আগুনের রেখা নয়, বিরাট আগ্রাসী হলকা থাকত। তাকে থামানো যেত না। নিমেষের মধ্যে সব পুড়িয়ে দিত। সচরাচর প্যান্ট্রিতেই গ্যাস সিলিন্ডারের মতো মারাত্মক জিনিস মজুত থাকে। এত বড়ো হসপিটালে তো একসঙ্গে অনেক সিলিন্ডার থাকার সম্ভাবনা। দিনরাত এখানে রান্না হচ্ছেই। যে কোনো অজ্ঞাত কারণেই হোক, আগুন এখনও গোটা কিচেনটাকে গ্রাস করতে পারেনি। কিচেনের সিলিন্ডারগুলো যদি একবার ফাটে তবে গোটা ফ্লোরটাই উড়বে। হিটিং, ভেন্টিলেশন এবং এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম, তথা গোটা এইচ ভি এ সি সিস্টেমটাকেও নিয়ন্ত্রণ করে এল পি জি গ্যাসই। বায়ো মেডিক্যাল ওয়েস্ট ও লন্ড্রির বয়লারও এই গ্যাসের সাপোর্টে চলে। এছাড়াও হসপিটালে অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিজেন সাপোর্ট প্রচুর পরিমাণে থাকে যা আগুনকে আরও বাড়ায়। সুতরাং গোটা হসপিটালটাই জতুগৃহে পরিণত হতে বিশেষ সময় নেবে না। সবসুদ্ধ উড়বে। একটা লোকও বাঁচবে না।

সে পড়ি কী মরি করে কিচেনে দৌড়ে গিয়ে দেখল, আগুনের শিখা একগাদা সবজি, কাঁচা বাজার পোড়ানো শেষ করে সবে দুটো সিলিন্ডারকে বেড়ে ধরেছে। বাকিগুলো এখনও সুরক্ষিত। হয়তো আলু, কপি, মাছ, মাংস মাঝখানে পড়ে তার গতিবেগকে স্লথ করে দিয়েছিল। তাই গ্যাস সিলিন্ডার অবধি পৌঁছোতে সময় লেগেছে। বিরাট কিচেন জনশূন্য। উনুনে এখনও অর্ধেক রান্না করা খাবার দাবার বসানো। অর্থাৎ কুক এবং অন্যান্য কর্মীরা ফায়ার অ্যালার্ম শোনামাত্রই পালিয়েছে। চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা মেথড। অথচ কেউ যদি এখানে উপস্থিত থাকত, তবে অন্তত আগুনটা নেভানোর চেষ্টা করতে পারত। সিলিন্ডারের গায়ে আগুন ধরলেও ওগুলো সিলড্ বলে এখনও ক্ষতি কিছু হয়নি। তবে ক্রমাগতই যদি তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, কিংবা অগ্নিশিখা আরও একটু ছড়িয়ে পড়ে তবে সর্বনাশ অবধারিত।

অধিরাজ আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কোথাও কোনো ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে কিনা। প্রায় গোটা ফার্স্ট ফ্লোরই সে কভার করে এদিকে এসেছে। এত বড়ো হসপিটাল, অথচ কোথাও কোনো অগ্নি-নির্বাপক যন্ত্র চোখে পড়েনি। আশ্চর্য! হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম ফায়ার ফাইটিং এজেন্টগুলোও রাখার প্রয়োজন বোধ করে না! এটা সাধারণ আগুন নয়, শর্ট সার্কিটের ইলেকট্রিক্যাল ফায়ার। জল ঢাললে আগুন তো নিভবেই না, উলটে বিপদ বাড়বে। এখানেই তো ফায়ার এক্সটিংগুইশারের প্রয়োজন ছিল। এমনই কপাল যে গোটা হসপিটালে একটাও অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র নেই।

সে বাধ্য হয়েই নিজের গায়ের ভারি কোটটা খুলে সেটাকেই পাগলের মতো সিলিন্ডারগুলোর গায়ের আগুনের ওপর আছড়ে আছড়ে মারতে থাকে। তাতে আগুন একটু স্তিমিত হলেও চট করে নেভেনি। তবে তার ধাক্কায় ছড়িয়ে পড়তে সময় নিচ্ছে। তার রোষ প্রতিহত হচ্ছে। ভারি ব্ল্যাঙ্কেট গোছের কিছু থাকলে সবচেয়ে ভালো হত। কিন্তু এখন ব্ল্যাঙ্কেট খুঁজতে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সময় হাতে নেই। তার সন্ধানী চোখ আঁতিপাতি করে কিচেনে ‘বেকিং সোডা’ খুঁজছিল। হসপিটাল বা রেস্টোর‍্যান্টের কিচেনে এই পদার্থটি থাকবেই। একেই বেকিং সোডা পোটেনশিয়াল অ্যান্টাসিড। যে কোনোরকমের অ্যাসিডিক রেসিপিতে এর ব্যবহার হয়। বিশেষ করে দুগ্ধজাত দ্রব্য, ক্রিম কিংবা দইয়ের প্রিপারেশনে তার হালকা অস্তিত্ব থাকে। লেবুর শরবতেও ইউজ হয়। পাঁউরুটি বা যে-কোনো ধরনের ব্রেড তো বেকিং সোডা ছাড়া হবেই না। এছাড়াও কাঁচা বাজার, ফল পরিষ্কার করার জন্যও বেকিং সোডা লাগে। তার ওপর হসপিটাল বা রেস্টোর‍্যান্টে এতগুলো মানুষের জন্য তিনবেলার রান্না করার জন্য অনন্ত সময় থাকে না। শেফ বা কুকদের দ্রুত কাজ সারতে হয়। ডাল বা ওই জাতীয় কিছু সময়সাপেক্ষ জটিল রেসিপিতে একছিটে বেকিং সোডার প্রয়োগ করলে সেটা অনেক কমসময়ে সুসিদ্ধ ও তৈরি হয়ে যায়। আর একদম সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করলে কোনো ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে না।

তবে এটা কোনো রেসিপির ব্যাপার নয়। ইলেক্ট্রিক্যাল ফায়ার যদি তেমন ভয়ংকর বিধ্বংসী মূর্তি না ধরে তবে বেকিং সোডা বা সোডিয়াম বাইকার্বোনেট সে আগুন নেভাতে ওস্তাদ। বেকিং সোডা আগুনের সংস্পর্শে এসে সোডিয়াম কার্বোনেটে পরিণত হয় ও কার্বন ডাই অক্সাইড ও জল রিলিজ করে। ইলেক্ট্রিক্যাল ফায়ার অক্সিজেনের ইন্ধনে জ্বলে। কার্বন ডাই অক্সাইড তাকে স্তিমিত করে ও ব্ল্যাঙ্কেটের এফেক্ট দেয়।

আগুন অবশ্য সর্বত্রই জ্বলছে। কিন্তু অধিরাজ আপাতত অন্যদিকে মন না দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারগুলোকে নিয়েই পড়ল। একটু খুঁজতেই বেকিং সোডার কন্টেনার চোখে পড়ে। গোটা ফ্লোরের জন্য পর্যাপ্ত না হলেও আপাতত কাজ চলবে। সে আর বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট না করে গোটা কিচেনেই মুঠো মুঠো বেকিং সোডা ছড়াতে শুরু করেছে। একবার যদি কিচেনের আগুনটাকে নেভানো যায় তবে ইলেক্ট্রিক্যাল রুমের পাওয়ার টার্ন অফ করে দিয়ে, ফিউজগুলো খুলে নিলেই কিছুটা হয়তো রক্ষা পাওয়া যাবে। কাজটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে অসম্ভব নয়। অন্তত কোনোভাবে চেষ্টা তো করতে হবে। গোটা ফ্লোরের আগুন নেভানো একমাত্র ফায়ার ব্রিগেড ছাড়া কারোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের আসতেও খানিকটা সময় লাগবে। তাই ততক্ষণ অবধি যতখানি ঠেকানো যায়৷ ঠিক যেমন সে ভেবেছিল, তেমনই ঘটল। বেকিং সোডা পড়তেই কিচেনের আগুন স্তিমিত হল। তারপর আস্তে আস্তে নিভেও গেল। সে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দেখল এ যাত্রা গ্যাস সিলিন্ডারগুলো বেঁচে গেছে। একটাও যদি কোনোক্রমে ফাটত তবে আর দেখতে হত না! এখানে যত সিলিন্ডার আছে সব বার্স্ট করলে কেউ বাঁচবে না! আপাতত কিচেনটা তো বাঁচল। এবার ইলেক্ট্রিক রুম!

ইলেক্ট্রিক রুম বা মেইন পাওয়ার রুম আবার উলটোদিকে। অধিরাজ কিচেনটাকে সাময়িক নিরাপত্তা দিয়ে বেকিং সোডার কন্টেনার নিয়েই ইলেক্ট্রিক রুমের দিকে প্রাণপণে দৌড়োয়। সময় নেই। হাতে একদমই সময় নেই। পথে যেখানে যেখানে আগুন দেখল কোনো কথা না বাড়িয়ে বেকিং সোডা ছড়াতে শুরু করল। ততক্ষণে হুমকির ঠ্যালাতেই হোক, কিংবা মানবিকতার খাতিরে, সিকিউরিটি গার্ড আর ওয়ার্ডবয়রা পেশেন্টদের প্রায় কোলে তুলে নিয়ে নীচের দিকে দৌড়চ্ছে। কিছুটা আগুন নির্বাপিত হল ঠিকই, কিন্তু যতক্ষণ না মেইন পাওয়ার সোর্স টার্ন অফ হচ্ছে ততক্ষণ আগুন ছড়াতেই থাকবে। তাই আপাতত কিছুটা ম্যানেজ করে সে সোজা পাওয়ার রুমেই ঢুকল।

ইলেক্ট্রিক রুমের অবস্থা তখন খুবই খারাপ। গোটা ঘরটাই প্রায় ফার্নেসে পরিণত হয়েছে। তারগুলো পুড়ছে, গলে গলেও পড়ছে। ব্রেকার বক্স আর খোলা ইলেক্ট্রিক্যাল বক্সের ডিস্ট্রিবিউশন প্যানেলের দিকে তাকাতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারল সে। কেউ ইম্পর্ট্যান্ট তারগুলোকে কেটে লন্ডভন্ড করেছে। যেখানে সেখানে এক্সপোজড ইলেক্টিক্যাল ওয়্যার ঝুলছে। শুধু তাই নয়। কাটা তারগুলোর গা বেয়ে এখনও টপ টপ করে জলবিন্দু পড়েছে। অর্থাৎ কেউ তার ওপরে জলও ঢেলে দিয়েছে। শর্ট সার্কিট অবধারিত! “স্কাউন্ডেল!”

ইলেক্ট্রিক প্যানেল আর বক্সে তখনও আগুন জ্বলছে। এক্সপোজড তারও আছে। ওগুলোকে ছুঁতে যাওয়া তো দূর, ধারে কাছে যাওয়াও বিপজ্জনক। মুহূর্তের মধ্যে অমিত শক্তিশালী শক্‌ মেরে প্রাণটাই কেড়ে নিতে পারে। কিংবা আগুনও আঁকড়ে ধরতে পারে। অধিরাজ দরদর করে ঘামছে। সে একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। বোধহয় সমস্ত সম্ভাবনাগুলোকে শেষবারের মতো ভেবে দেখল। এখানে হাত দিতে গেলে তার লাশটাও কাল বাড়িতে পৌঁছোতে পারে। অথবা এত হাজার ভোল্টের ইলেক্ট্রিসিটি শরীর বেয়ে চলে যেতে পারে যে প্রায় ভুনে যাওয়া দেহটাও শনাক্ত করতে মা-বাবার অসুবিধে হবে। কিন্তু এছাড়া আগুনকে মাত দেওয়ার আর উপায় কী? পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ না করলে আগুন থামার নামও নেবে না। যতটুকু সে নিভিয়েছে, হয়তো দ্বিগুণ উদ্যমে আবার জ্বলতে শুরু করে দেবে। এবার আরও বড়ো আকারে। স্প্রিঙ্কলার, ফায়ার এক্সটিংগ্যুইশার, কিচ্ছু নেই! ওদিকে ওয়ার্ডবয় আর সিকিউরিটি গার্ডরা, অন্য ফ্লোরে অর্ণব, টুইঙ্কল ও পবিত্ররা নিশ্চয়ই আপ্রাণ চেষ্টা করছে ইভ্যাকুয়েট করার। ওদের প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। ফায়ার ব্রিগেড এখনও এসে পৌঁছোয়নি। তার কাছে ইলেক্ট্রিসিটির সঙ্গে লড়ার প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই। বিশেষ ধরনের সেফটি গ্লাভস ছাড়া এই জ্বলন্ত প্যানেল স্পর্শ করাই মূর্খামি! অথচ এই মুর্খামিটাই তাকে জেনেবুঝে করতে হবে। অধিরাজের এই পরিস্থিতিতেও হাসি পেয়ে গেল। একেই বলে ঢাল নেই তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার!

সে অতি সাবধানে গোটা প্যানেলটাকেই দেখতে থাকে। মেইন ইলেক্ট্রিক্যাল সাপ্লাই সিস্টেমটাকে বুঝে নিতে যতটুকু সময় লাগল। পরক্ষণেই অগ্রপশ্চাৎ কিচ্ছু না ভেবে একটি বিশেষ সুইচের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। তার হাত যখন সুইচবোর্ড স্পর্শ করেছিল তখনই ফের চোখ বুজে ফেলেছিল অধিরাজ। এবার ভয়ে। তার বুকের ভেতরে উথাল-পাথাল। কপালের রগ ঘেঁষে টপ টপ করে ঘামের ফোঁটা পড়ছে। তর্জনীও ইতস্ততঃ কাঁপছে। কারণ প্লাগটা কী পরিমাণে স্ফুলিঙ্গ উগরে দিচ্ছে তা তার চোখ এড়ায়নি। আগুনে জ্বলছে। পোড়া গন্ধে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সাক্ষাৎ মৃত্যু আবার সামনে! এটা তার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত হয়ে ওঠার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা আছে। এত বড়ো একটা সিস্টেম কয়েকহাজার ভোল্ট ইলেক্ট্রিসিটি উৎপাদন করতে পারে। একবার যদি শক্‌ মারে… একটুও যদি গোলমাল হয়… তবে সব শেষ…!

সুইচটাকে তার আঙুল স্পর্শ করা মাত্রই ফট্ করে একটা জবরদস্ত স্পার্ক। চিড়বিড়ে আওয়াজ। অধিরাজ অনুভব করল তার সারা শরীর বুঝি ঝনঝন করে উঠেছে। অসম্ভব দ্রুত একটা যন্ত্রণাময় অনুভব তার আঙুল সুদ্ধ হাতকে ঝটকা মারল। পেশী, স্নায়ু, শিরা উপশিরাগুলোকে কেউ বুঝি মুচড়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস, সময় থাকতেই দ্রুত আঙুল সরিয়ে নিয়েছে। নয়তো টেনে ধরত! আপাতত ঝঙ্কার ওপর দিয়েই গেল। তার ধাক্কায় পড়ে না গেলেও বেসামাল হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়েছে। তবে এখানেই থামলেই চলবে না। ওটাকে আনপ্লাগ করাও জরুরি। তাই ঝটকাটাকে সামলে নিয়েই কোনোমতে এক টানে মেইন প্লাগটাই খুলে নিয়েছে সে। এবার আগুনও ফোঁস করে ওঠে। হাতে জোরদার ছ্যাঁকা। সে কাতরোক্তি করে ওঠে, “আঃ!”

আঙুলটা বুঝি পুড়েই গেল। কিন্তু যা করতে চেয়েছিল তা হয়েছে। গোটা পাওয়ার সাপ্লাই-ই থেমে গিয়েছে। আশেপাশের আলোগুলো সব দপ্ করে নিভে গেল। এবার সব ফিউজ খুলে দিতে হবে। এখন থামলে চলবে না… কিছুতেই না…!

হাতে ভীষণ জ্বালা। তবু সে একের পর এক প্রত্যেকটা ফিউজ খুলতে শুরু করল। বৈদ্যুতিক সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেলেও যেটুকু আগুন ধরেছিল তা এখনও জ্বলছে। হাতে বারবার ছ্যাঁকা খাচ্ছে। তবু প্রত্যেকটা ফিউজ খুলে না দেওয়া অবধি শান্তি নেই। শর্ট সার্কিটের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষেত্রেই সাবধানের মার নেই। একটা লুপ হোলও চরমতম সর্বনাশ করতে পারে।

“স্যা-র!”

প্রায় সমস্ত ফিউজ যখন খোলা হয়ে গিয়েছে তখন পেছন থেকে অর্ণবের আওয়াজ শুনতে পেল সে। অর্ণব বিচলিত স্বরে বলে, “এ কী অবস্থা! আপনি ফিউজ খোলার রিস্ক নিচ্ছেন কেন? পাওয়ার অফও কি আপনিই করেছেন? কিছু যদি হয়ে যেত….?”

“কিচ্ছু হয়নি অর্ণব।” প্রসঙ্গটাকে এড়িয়ে গিয়ে বলল সে, “ওপরের ফ্লোরগুলোর খবর কী? পেশেন্টরা ঠিক আছেন?”

অর্ণবের মুখ দেখলে মনে হয় বুঝি তার মুখে কেউ কালি মাখিয়ে দিয়েছে। পুরো মুখে কালিঝুলি। রুমালটাও কার্বনের গুঁড়োয় কালো! অধিরাজ নিজের মুখ দেখতে না পেলেও বুঝতে পারছিল যে এই একই অবস্থা তারও। সাধারণ একটা ভিজে রুমালই তাদের কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত গ্যাসচেম্বার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ওদিকে পেশেন্টদের অবস্থা কী কে জানে। তার মনের মধ্যে আশঙ্কা ফণা তুলল। অর্ণবের মুখ কার্বনে কালো হওয়ার অর্থ এসি ডাক্টের মাধ্যমে কার্বন মনোক্সাইড ওপরের ফ্লোরগুলোতেও পৌঁছেছে। পেশেন্টরা সার্ভাইভ করতে পেরেছেন তো! নাকি…

অর্ণবের মুখ ঢাকা থাকলেও চোখ দুটো হাসছে, “সবাই ঠিক আছে স্যার। ইনফ্যাক্ট আমাদের দৌড়োদৌড়ি দেখে ওয়ার্ডবয়-সিস্টার, সিকিউরিটি গার্ড আর ডাক্তাররাও হাত লাগিয়েছিল। যে ক-টা জানলা খোলা যেত, খুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও বেশিরভাগ জানলাই জ্যাম হয়ে বসে আছে। এমনকি যারা প্রথমে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তারাও মিস্ অরোরার মুখ-ঝামটা খেয়ে পরে ফেরত এসেছে। ইনফ্যাক্ট লাহিড়ী স্যারও টিমসমেত চলে এসেছেন। আশেপাশের লোক্যালিটি থেকেও জনা তিরিশ ইয়াং ছেলে মুখে ভেজা গামছা টামছা বেঁধে হাজির। তারাও হাত লাগিয়েছে। ফিফটি পার্সেন্ট পেশেন্টকে অলরেডি বের করে অন্য হসপিটালে শিফট করে দেওয়া হয়েছে। যারা ভেন্টিলেটরে ছিল, তাদেরও কোনো ক্ষতি হয়নি। ইনফ্যাক্ট আই সি ইউ আর ভেন্টিলেটরে থাকা পেশেন্টদেরই প্রথমে বের করে একদম তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে কাছের হসপিটালটাতেই শিফট করার ব্যবস্থা করেছেন ডাক্তাররা। ওরা একদম সেফ আছেন। বাকিদেরও বের করা হচ্ছে। গ্রাউন্ড ফ্লোর, ফার্স্ট ফ্লোর পুরো ফাঁকা সেকেন্ড আর থার্ড ফ্লোরে এখনও কিছু পেশেন্ট আছেন। তবে সবাই মিলে তাদের মুখে ভেজা ব্ল্যাঙ্কেট বেঁধে বের করছে। সাদা ব্ল্যাঙ্কেটগুলো পুরো কালো। এখন তো পাওয়ারও অফ হয়ে গিয়েছে স্যার। ক্যাজুয়ালটির সম্ভাবনা আর নেই।” অর্ণব জানায়, “এ যাত্রা বোধহয় ফাঁড়া কাটল।”

“পি সি চৌধুরীর ফ্যামিলি?”

“ওদের গায়ে একটা আঁচড়ও পড়েনি।” সে শান্তভাবেই জানায়, “সবাই ফিট অ্যান্ড ফাইন।”

“প্রণবেশদার হাফ সেঞ্চুরি হয়েছে?”

এবার অর্ণব সশব্দে হাসল, “না। নকল বার্নিং শিখটি কিছুদুর দৌড় করিয়েই ফের হাঁউমাউ করে সারেন্ডার করেছিল। লাহিড়ী স্যারও ওর ভাষা বুঝতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ইনিও কোঙ্কনি। তবে এইটুকু বুঝেছিলেন যে ইনি আর যা-ই হোক, বার্নিং শিখ নন। তাই ও পাবলিক বেঁচে আছে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

হতচ্ছাড়া দৌড়বীড় ওঁদের অনেক দৌড় করিয়েছে বলে দুটো থাপ্পড় অবশ্য কযিয়েছেন। আর কিছু করেননি। তবে আসল বার্নিং শিখকে লাহিড়ী স্যার না পেলেও এক ওয়ার্ডবয় বোধহয় লক্ষ করেছে। তার বয়ান অনুযায়ী সে নাকি এক বুড়ো থুরথুরে লোককে হাতে পেল্লায় জলের বোতল নিয়ে গুটিগুটি ইলেক্ট্রিক রুমের দিকে যেতে দেখেছিল। তবে পেশেন্ট পার্টি ভেবে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। ওদিকে আরও একটা ওয়াশরুমও আছে। তাছাড়া সে নিজেও ব্যস্ত ছিল।”

“বুঝলাম।”

শব্দটা উচ্চারণ করতে-না করতেই বাইরে থেকে ফায়ার ব্রিগেডের সাইরেন ভেসে এল। ওঃ, ঈশ্বর! ফায়ার ফাইটাররা চলে এসেছে। এখন আর বিশেষ চিন্তার কোনো কারণ নেই। বাকি পেশেন্টদের ওরাই বের করে নিয়ে আগুন নিভিয়ে দেবে। আপাতত তাদের আর কিছু করণীয় নেই।

অধিরাজের নিজেকে অসম্ভব ক্লান্ত লাগছিল। সারা দেহ অবশ হয়ে আসছে। পা-দুটো টলছে। সে কোনোমতে উচ্চারণ করল, “এডিজি সেনকে একবার ধরো তো।”

এডিজি সেন এদিককার অবস্থা কিছুই জানতেন না। সম্ভবত এই অগ্নিকাণ্ডের কথা এখনও মিডিয়ার কানে যায়নি। গেলেই তারাও চলে আসবে। তিনি অধিরাজের মুখে সবকিছু শুনে বললেন, “কী করি বলো তো! সরকারপক্ষ তো আমাদের কথা শুনছেই না। ভাবছে বুঝি দেয়ালা করছি। উলটে আমাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এগারোটা হোক কী একডজন— সব বার্নিং শিখকেই নাকি অন দ্য স্পট মেরে ফেলা উচিত ছিল। যা-ই বলি ওই একই উত্তর। বার্নিং শিখকে ধরুন, মারদাঙ্গা নিজে থেকেই থেমে যাবে। ওদিকে হিউম্যান রাইটস্ চেঁচাচ্ছে…!”

“দরকার নেই স্যার, ছাড়ুন।” অধিরাজ স্খলিত ক্লান্ত স্বরে বলল, “শুধু বলুন, আরও কয়েকটা এক্সপ্লোশনের পর না-হয় আমরাই ওঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করতে যাব। একা নয়, উইথ অল মিডিয়া। সে প্রশ্নের উত্তর যেন আগে থেকেই ওঁরা তৈরি করে রাখেন।”

“অ্যাঁ।” এডিজি সেন বিষম খেলেন, “আরও এক্সপ্লোশন হবে? কী সর্বনাশ!” সে বিষণ্ণ হাসে, “নাঃ। আর সে সম্ভাবনা নেই। এবার শুধু ফাইনাল শো-ডাউন বাকি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *