(১)
তখন কাঁটায় কাঁটায় রাত দুটো বাজে। শীতের শহর লেপ, বালাপোষের কবোষ্ণ আরামে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই! চতুর্দিকে শুধু পিনপতনের স্তব্ধতা। রাস্তায়, পথে ঘাটে, গলি-ঘুঁজিতে কুয়াশার অস্পষ্ট চাদর ছেয়ে আছে। শীতল চাঁদের আলো এসে পিছলে পড়েছে মসৃণ পিচের রাস্তায়। কিন্তু সেই আলোও বড়ো রহস্যময়! যেন ভীতু ভীতু বিবর্ণ একটা আভা ছেড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের গহ্বরে। কুয়াশার আস্তরণ যেন পৃথিবীর মাঝখানে একটা সীমারেখা তৈরি করেছে। এ প্রান্তে শান্তি, ঘুম আর নীরবতা। কিন্তু সেই আস্তরণ ভেদ করে অন্যদিকে চলে গেলেই বুঝি খুলে যাবে অন্য এক পৃথিবীর দ্বার। যেখানে হিংসা, অস্ত্র আর মৃত্যু রক্তাক্ত নখ দাঁত বের করে শিকারের আশায় ওঁত পেতে আছে। কেউ জানে না, কত অজ্ঞাত, অন্ধকার প্রবৃত্তির বাস সেখানে। তারা তাদের ছায়া ছায়া শীর্ণদেহ নিয়ে অতৃপ্ত আত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। নরখাদকের মতো উজ্জ্বল সবুজ হিংস্র চোখে মাপছে অন্ধকারকে। যদি দু-চারটে শিকার পাওয়া যায়।
আচমকাই সেই শান্ত কুয়াশাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে একটা গাড়ি লাল চোখ দেখিয়ে হুশ করে সবেগে চলে গেল অন্ধকারের দিকে। মসৃণ পিচের রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে ছুটে চলেছে লাল রঙের একটা মারুতি সুইফট। তবে সে একা নয়। ঠিক তার পেছন পেছনই প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসছে টাটা সাফারি স্টর্ম। যেন রাতের শুনশান রাস্তায় কার রেসিং চলছে! কে কাকে গতিবেগে টক্কর দেবে সেটাই দেখার। দুটো গাড়িই স্পিডলিমিটের চরম সীমা ক্রস করে ফেলেছে। প্রাথমিকভাবে দেখলেই সন্দেহ হয়, হয়তো বা কোনো বে-আইনি রেস সংঘটিত হচ্ছে এই অন্ধকার রাত্রির আড়াল নিয়ে। নৈঃশব্দের মধ্যে দুটো চার-চাকার দ্রুত চলে যাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
কিন্তু সেই শীতল নিস্তব্ধতার আয়ুও বেশিক্ষণ নয়। নিস্তরঙ্গ শাস্তিকে খান খান করে দিয়ে সরোষে গর্জে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র! প্রচণ্ড বেগে ধাবমান দুটি গাড়ির মধ্যে ফায়ারিং চলছে। মারুতি সুইফটের ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ব্যক্তিটি পেছনের সাফারি স্টর্মের সামনের কাচ লক্ষ্য করে ফায়ার করেছে। বুলেটটা অবশ্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা ধাতব ‘ঠং’আওয়াজ শোনা যায়। সম্ভবত বুলেটটা গাড়ির মজবুত দেহ স্পর্শ করেছে।
“শালা, শুয়োরের বাচ্চা।”
সাফারি স্টর্মের সামনের সিটে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁতে দাঁত চেপে হাত আর কাঁধকে খোলা জানলা দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় খানিকটা বাইরে বের করে সামনের সুইফটটাকে তাক করে দু-বার জবাবি ফায়ার করল। বারুদের গন্ধে এখন নিঃশ্বাস নেওয়াই দায়। কুয়াশার ভেতরেও বারুদের কটু গন্ধ। দুটো গাড়ি সেই অস্পষ্ট চাদরকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করলেও একদম সরিয়ে দিতে পারেনি। যার ফলে দুই পক্ষের কেউই প্রতিদ্বন্দ্বীকে একদম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। তবু আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে একে অপরকে মাত দেওয়ার। সুইফটের গতিবেগ আরও বাড়ছে। তাল মিলিয়ে হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছে সাফারি স্টর্মও।
“টায়ারটা ফাঁসিয়ে দিতে পারলেই হত।” দ্বিতীয় গাড়িতে বসে থাকা গোঁফওয়ালা সুগঠিত চেহারার এক যুবক এতক্ষণ সামনের গাড়িটাকে টার্গেট করছিল। ব্যর্থ হওয়ার বিরক্তিতে বলে উঠল-“কিন্তু কুয়াশার জ্বালায় শা কিছু ঠিকমতো দেখতেই পাচ্ছি না। আর ব্যাটা রেসও লাগিয়েছে দেখো! গাড়ি চালাচ্ছে না স্পেসশিপ বুঝতেই পারছি না। এ মাল তো মনে হয় চাঁদে ল্যান্ড করেই ছাড়বে। ইসরো খামোখাই পরিশ্রম করে মরছে!”
আসলে এই মুহূর্তে কার রেসিং নয়, চেজিং চলছে! সি আই ডি হোমিসাইডের অন্যতম সুপারস্টার খবরি ঘন্টু টিপ দিয়েছিল রাজারহাটের কাছে একটি ‘পাব’-এ বিখ্যাত গ্যাংস্টার ‘কাটার’ মদন আসবে। ‘কাটার’ মদন নামটা শুনতে তুলনামূলক নিরীহ হলেও, লোকটি আদপেও তা নয়। গ্যাংকে তফাতে রাখলে, একা শুধু ওর বিরুদ্ধেই অন্তত পঁচিশটা খুন, এক্সটর্শন, চল্লিশটা রেপ, বারোটা অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের কেস আছে। একটি মেয়েকে সর্বসমক্ষেই রেপ করে তাকে ভোজালি দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছিল। উপস্থিত জনগণ স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল। কেউ ভিডিও তুলছিল, কেউ বা আবার ভয়ে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়েছিল-কিন্তু একজনও প্রতিবাদ করেনি। প্রতিবাদ করবে কী করে। এ দেশের পুলিশের হাতে যে আগ্নেয়াস্ত্র আছে, তার প্রত্যেকটা গুলির হিসাব দিতে হয়। কিন্তু ‘কাটার’ মদন কোনো হিসাবের তোয়াক্কা করে না। তাই তার নিজের এবং সঙ্গীদের হাতে অটোম্যাটিক রাইফেলই বেশি থাকে। গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ার শখ আর যারই হোক—ছাপোষা জনগণের নেই।
সি আই ডি বহুদিন ধরেই ওর পেছনে লেগে আছে। হোমিসাইডের বিখ্যাত এনকাউন্টার এক্সপার্ট প্রণবেশ লাহিড়ী একবার মদনকে ধরার জন্য ওর ডেরায় ফোর্স নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মদন আগেই খবর পেয়ে রেডি হয়ে বসেছিল। যে মুহূর্তে প্রণবেশ টিম সমেত ওর বাড়ির গলিতে ঢুকলেন, ঠিক তখনই সে তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে অতর্কিতে হামলা করল। অবিকল উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত মাফিয়া বিকাশ দুবের স্টাইলে পুলিশের শিকার করার জন্যই আশেপাশে সদলবলে ওঁত পেতে ঘাপটি মেরে বসেছিল মদন। প্রণবেশও ছেড়ে দেওয়ার লোক ছিলেন না। তাঁর টিম ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও একাই লড়ে গিয়েছেন। ফলস্বরূপ পরিণতিটা অত করুণ হয়নি। একজন পুলিশকর্মী বিপজ্জনকভাবে আহত হয়েছিল। স্বয়ং প্রণবেশের কাঁধ ছুঁয়ে একটা গুলি বেরিয়ে গেলেও বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি তথাকথিত সি আই ডি হোমিসাইডের এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্টের। মদন অবশ্য সেই শ্যুট আউটের কভার নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই মিডিয়া তাকে পশ্চিমবঙ্গের ‘বিকাশ দুবে’ বলে ডাকতে শুরু করেছে। গুজব, সে নাকি বিহার-উত্তরপ্রদেশের দিকেই কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে। সে কথা জানতে পেরে আবার প্রণবেশ লাহিড়ী তুমুল চটে প্রেস কনফারেন্সে বলে বসে আছেন—“বটে? বিকাশ দুবে? ওর অবস্থাও তবে বিকাশ দুবের মতো করেই ছাড়ব।” সেই ডায়লগ দেওয়ার পর থেকেই মিডিয়া ফের লম্ফঝম্প শুরু করেছে। পুলিশকে ‘গুণ্ডা’ ও ‘লাহিড়ী কোটালের’ বিবৃতিকে ‘হুমকি’ হিসাবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছে তারা। অপেক্ষা করছে এবার উত্তরপ্রদেশের মতোই পশ্চিমবঙ্গে কবে গাড়ি ওলটাবে।
“কী মনে হয় রাজা? আজ গাড়ি ওলটাবে?”
গোঁফওয়ালা যুবকের প্রশ্নের উত্তরে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ‘রাজা’ তথা অধিরাজ মৃদু হাসল, “তোমার কী মনে হয় অফিসার আচার্য?”
অফিসার আচার্য তথা পবিত্র মুখটা একটু বেঁকিয়ে বলে, “ধুস! জমছে না। গ্যাংস্টারদের কেমন সুন্দর গালভরা নাম থাকে। দাউদ ইব্রাহিম, ছোটো শাকিল, শ্ৰী প্রকাশ শুক্লা, মানেয়া সুর্ভে কিংবা ফিলহালের অতীক এহমদ বা লরেন্স বিশনোই। আর কিছু না হোক, বিকাশ দুবে, গোল্ডি ব্রার বা টিল্লু তাজপুরিয়ার নামের মধ্যেই বেশ গ্যাংস্টার গ্যাংস্টার গন্ধ আছে। সেখানে এ ব্যাটার নাম ‘মদন’ কে রাখল বলো তো! বাড়িতে গিয়ে বউকে যদি বলি, ‘মদনাকে মেরে এসেছি, তাহলে বলবে তার চেয়ে রান্নাঘরের আরশোলাগুলোকে তো মারতে পারো। নামের মধ্যে কোনো ওয়েটই নেই…!”
পবিত্র কথাটা শেষ করতে-না করতেই ফের আগের গাড়িটা থেকে ফায়ারিং শুরু হয়ে গিয়েছে। পবিত্র’র ঠিক সামনের কাচটা সশব্দে ভেঙে পড়ল। সে বিদ্যুৎগতিতে ডাক্ করে সিটের নীচে কভার নিয়েছে। অধিরাজ আশঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই শুনতে পেল তার বিরক্তিমাখা কণ্ঠস্বর, “হারামিটা কনভার্সেশনের মাঝখানে ফায়ার করে কেন। এটা কী জাতীয় ভদ্রতা?”
অর্ণব পেছনের সিট থেকে জানতে চাইল, “স্যার, আপনি ঠিক আছেন?”
“বেঁচে আছি।” পবিত্ৰ সন্তর্পণে উঠে এসে সুইফটটাকে তাক করে ফের ফায়ার করল, “তবে এটার বাপের আর চোদ্দপুরুষের নাম পালটে খগেন না করেছি তো আমার নাম পবিত্র আচার্যই নয়।”
অর্ণব একটু নিশ্চিন্ত হল। তবে চিন্তার কারণ এখনও আছে। আজ ওরা ঠিক এনকাউন্টারের জন্য প্রস্তুত হয়ে আসেনি। হয়তো আরও একটু জনবলের প্রয়োজন ছিল। আসলে বেশ কয়েকমাস ধরেই মদন আন্ডারগ্রাউণ্ডে ছিল। এর মধ্যে খবরিরা তার টিপ দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু একটা টিপও সঠিক ছিল না। যখন ঘন্টু জানাল, সুইট ড্রিম ‘পাব’ এ আজ রাতে মদন আসতে পারে, তখনও খবরটা পাকা কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। ঘন্টু জানিয়েছিল ওই পাবে মদনের সাম্প্রতিক শয্যাসঙ্গিনী চাকরি করে। অনেকদিন ধরে মালটা বিরহে আছে। তার ঠ্যালা সহ্য করতে না পেরে আজ ব্যাটা নিজের গর্ত থেকে বেরোলেও বেরোতে পারে। কিন্তু একদম নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
মদনের জীবনে নারী হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। অথচ তার আগমনের খবরটাও অনিশ্চয়তায় ভরা। ওদের আগের টিপগুলোও ব্যর্থ হয়েছে। তবু অধিরাজ ঘন্টুর ট্র্যাক-রেকর্ড দেখে একটা চান্স নিয়েছিল। সন্ধেবেলা থেকেই অধিরাজ, অর্ণব আর পবিত্র ফিল্ডিং দিচ্ছিল পাবের ভেতরে। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, এই খবরটাও সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হতেই চলেছে। কিন্তু রাত ন-টা নাগাদ যখন এক স্বল্পবসনা সুন্দরী স্বপ্নময় আলোয় পারফর্ম করতে এলেন, তখনই অধিরাজের চোখ পড়ল এক উত্তেজিত কাস্টমারের দিকে। তার সতর্ক দৃষ্টি নিমেষে জানিয়ে দিল নিঃসন্দেহে ওটা মদনই। দাড়ি-গোঁফ, চুল কেটে হুলিয়া বদলেছে ঠিকই। কিন্তু তবুও চিনতে কোনো ভুল হয়নি।
অধিরাজ চুপি চুপি অর্ণব ও পবিত্রকে ইনফর্ম করলেও ওদের কোনোরকম অ্যাকশন নিতে বারণ করল। সে আগে নিশ্চিত করে নিতে চেয়েছিল ‘কাটার মদনের সঙ্গে তার অটোম্যাটিক রাইফেলধারী কোনো সঙ্গী আছে কিনা। যদিও পৃথিবীর সবচেয়ে চালাক খুনিটিও গোপনে নিভৃত অভিসারে যাওয়ার সময় রাইফেল ঘাড়ে নিয়ে যায় না, তবু একবার যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। অধিরাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মদনকে ভালো করে দেখে নিচ্ছিল। না, তার আশেপাশে কেউ নেই। হয়তো বা প্রেমিকার উষ্ণ সান্নিধ্যে থাকার সময়ে সে অন্য কারোর উপস্থিতি পছন্দ করে না। বড়ো বড়ো রাজা-বাদশারাও নিজের রানিদের সঙ্গে প্রেম করার মুহূর্তে বিশ্বস্ততম দেহরক্ষীকেও সরিয়ে দিতেন, মদন তো নামেও মদন, কাজেও মদন! সুতরাং অটোম্যাটিক রাইফেল বা সঙ্গী-সাথীদের উপস্থিতি না থাকাই স্বাভাবিক। তবে জাতে কালকেউটে যখন, তখন ছোট্ট হলেও একটা বিষদাঁত নিয়ে ঘুরবেই। অটোম্যাটিক রাইফেল না থাক, তার কোমরে গোঁজা আগ্নেয়াস্ত্রটা নজর এড়ায়নি অধিরাজের। সে নীচুস্বরে বাকি দুই অফিসারকে বলে, “ওর সঙ্গে গ্লক জি টোয়েন্টি ওয়ান আছে। এখনই কিছু করতে যেও না।”
“ধরব না?” পবিত্র আহত স্বরে বলে, “সেই কখন থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং দিচ্ছি। একটা লোপ্পা ক্যাচ পেলাম, সেটাও তুমি মিস করতে বলছ!”
“মিস করার প্রশ্নই ওঠে না। এরকম সুযোগ বারবার আসে না। আজ ওর সঙ্গে দলবল নেই, রাইফেলও নেই। এই সুযোগেই কর্ণবধ করব না তো কবে করব!” অধিরাজ জানায়, “কিন্তু এটা পাবলিক প্লেস। জেমস বন্ডের মতো দুমদাম করে গুলি চালালে নিরীহ মানুষ মরবে। তার চেয়ে চুপচাপ বাইরে চলো। বিরহী বাঘ যখন বাঘিনীর কাছে এসে হাজির হয়েছে, তখন প্রেমটা নিশ্চিন্তে করেই নিক। যা করার বাইরেই করব।”
বেশ কিছুক্ষণ পরেই মদন তার সুন্দরীর সঙ্গে পার্কিং লটে চলে এল। গাড়িতে উঠল, কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিল না। অর্থাৎ গাড়ির ভেতরেই ফুলশয্যা করার প্ল্যান। পবিত্র ফের ‘রে রে’ করে তেড়েই যাচ্ছিল, অধিরাজ তার হাত ধরে মাথা নাড়ল, “উহু।” “আবার কী হল।”
“চুপচাপ অপেক্ষা করো।” সে কী যেন ভাবছে, “আমি ওর প্রেমিকাকেও জানাতে চাই না যে এখানে সি.আই.ডি. এসেছে!”
“মানে?”
“তুমি লক্ষ্য করোনি।” অধিরাজ আস্তে আস্তে চাপা স্বরে বলল, “পাবের ভেতরে কোনো সিসিটিভি ছিল না। সম্ভবত এইসব অ্যান্টিসোশ্যাল মাফিয়ারা আসে বলে সিসিটিভির বন্দোবস্ত করেনি পাবের মালিকরা। পার্কিং লটেও কোনো ক্যামেরা নেই। অতএব আমরা অদৃশ্য পবিত্ৰ৷”
“তাতেই বা কী?”
“চুপচাপ বসে থাকো।” সে বলে, “কিছুক্ষণ বাদে নিজেই বুঝতে পারবে।” ততক্ষণে মদনের গাড়ির ‘ডান্সিং সেশন’ শুরু হয়ে গিয়েছে। গাড়িটা মাঝেমধ্যেই অজানা শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সশব্দে নড়েচড়ে উঠছে। কাচের ওপর দুটো হাতের আদুরে মাখামাখি। অধিরাজ চুপ করে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি তরোয়ালের মতো তীক্ষ্ণ। মুখ ভাবলেশহীন। পবিত্র কপাল চাপড়ায়, “রাজা, এখন এসবও দেখতে হবে। এই নৃত্যরত গাড়ি দেখে আমারই রাগ হয়ে যাচ্ছে। হাতের কাছে সানি লিওনি বা বউ কেউই নেই, আছ শুধু তুমি আর অর্ণব। এ কী জাতীয় টর্চার।”
বলতে বলতেই তার ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে। কী টাইমিং। ঠিক সেইমুহূর্তে মিসেস আচার্য ফোন করেছেন। গিন্নী হয়তো সুমধুর স্বরে সবে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কোথায় আছ? কী করছ?”
পবিত্র রাগে গরগর করে উঠে বলে, “ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কাটছি। সামনে দুটো হাঙর কামড়াকামড়ি করছে। আর কিছু জানতে চাও?”
মিসেস আচার্য যথেষ্টই বুদ্ধিমতী। স্বামীর উত্তর শুনে কটাং করে ফোনটা কেটে দিলেন। পবিত্র ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তাড়াতাড়ি কর মদনা! গোটা জীবনের প্রেম একদিনেই করে নিবি নাকি রে বাবা।”
কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। প্রেম আর শেষ হওয়ার নামই নেয় না। বেচারা গাড়ি হাই জাম্প মারতে মারতে, মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তার ভেতরের বাসিন্দাদের বোধহয় ক্লান্তি নামক বস্তুটিই নেই। তারা এখনও কামসূত্রে ব্যস্ত। কখনও সাময়িক বিরতি নিচ্ছে, তারপরই আবার দ্বিগুণ আশ্লেষে নেমে পড়ছে মাঠে। অধিরাজ আড়চোখে পবিত্রকে দেখে নিজের রুমাল এগিয়ে দেয়, “খেটেখুটে তো মদন মরছে, তুমি খামোখা ঘামছ কেন।”
রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে পবিত্র, “আমার কান্না পাচ্ছে রাজা। এই খানকির ছেলেটাকে খুঁজে খুঁজে রাত দিন এক করে ফেলেছি। ডিউটির চোটে আমার হোম মিনিস্টার খচে বসে আছে। রোম্যান্টিক মুহূর্তে আচমকাই সুন্দরী বউয়ের জায়গায় এই হতচ্ছাড়ার গোঁফ-দাড়িওয়ালা মুখ ভেসে উঠছে। ফলস্বরূপ রোম্যান্সের গুষ্টির তুষ্টি। ছেলেটাও হয়েছে তেমন। সেদিন প্রায় এক সপ্তাহ পরে বাড়ি ফিরেছি, সে ব্যাটা কিনা আমায় দেখে গিন্নীকে বলছে, “মা, এই মামাটা কে!’ আর এই মালটা এখানে বসে মেগা ম্যারাথন প্রেম করছে।”
এবার অর্ণব হেসে ফেলল। রেগে মেগে তার চোখের ওপর হাত রেখে বলল সে, “খুব হাসি পাচ্ছে? বাচ্চাদের এসব দেখতে নেই। চোখ বোঁজো।”
“অর্ণব একটু পরে চোখ বুজবে।” অধিরাজ বলল, “তার আগে দেখো তো আমাদের দু-নম্বর রিভলভারগুলো কোথায় আছে?”
“দু-নম্বর রিভলভার? মানে যেগুলোর লাইসেন্স নেই। ওগুলোর খোঁজ পড়েছে যখন তখন নিশ্চয়ই সার্ভিস গানের গল্প নেই।” পবিত্র বেজায় খুশি, “তার মানে আজ গাড়ি ওলটাবে।”
অধিরাজ উত্তরে ইতিবাচক মাথা ঝাঁকায়। অর্থাৎ, এনকাউন্টার করারই প্ল্যান আছে। কিন্তু যেহেতু লাহিড়ী কোটাল আগেভাগেই হুমকি দিয়ে বসে আছেন তাই এটাকে পুলিশি এনকাউন্টার হিসাবে সে দেখাতে চায় না। অধিরাজের এনকাউন্টারের স্টাইল কিছুটা এমনই। সবসময়ই সে কিছু বে-আইনি হাতিয়ার মজুত রাখে, যাতে পুলিশি এনকাউন্টারটাকে ‘গ্যাং ওয়ার’ বলেই মনে হয়। এমনভাবে ক্রাইম সিন সাজায় যাতে পুলিশি হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ না থাকে। অর্ণব ও পবিত্র, দু-জনেই জানে একটু পরেই গাড়ির শরীর থেকে ‘সি.আই.ডি.র সমস্ত চিহ্ন, স্টিকার সরে যাবে। বদলে যাবে নম্বর প্লেটও। ট্র্যাফিক সিগন্যালের ফুটেজে ধরা পড়লেও ওটা যে সি.আই.ডি. হোমিসাইডেরই গাড়ি তার প্রমাণ থাকবে না! অধিরাজ সবসময়ই আরও একটা নম্বর প্লেট সঙ্গে রাখে। একটু আগেও মদনের উপস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহ ছিল বলে এই পরিবর্তনগুলো করেনি। কিন্তু এখন মদন তাদের সামনেই আছে। পাবে বা পার্কিং লটে সিসিটিভি থাকলে সি.আই.ডি.-র উপস্থিতি ক্যামেরায় ধরা পড়ত। এখন সে সম্ভাবনাও নেই। মদনের প্রেমকাহিনিতে অধিরাজ সচেতনভাবে ঢুকতে চায় না কারণ ওর প্রেমিকাও ওদের চিনে ফেলতে পারে। গ্যাংস্টারের মৃত্যুর দৃশ্যে কোথাও সি.আই.ডি. ক্লু রাখবে না। সেইজন্যই বলেছিল, ‘আমরা অদৃশ্য।” অর্থাৎ কাল যখন মদনের গুলিবিদ্ধ দেহটা কোথাও পড়ে থাকবে, তখন সি.আই.ডি. টিম ও প্রণবেশ লাহিড়ীর দিকে আঙুল উঠলে দুই পক্ষই, ‘সে কী! আমি তো কিছুই জানি না!’ বলে চোখ কপালে তুলবেন। ট্র্যাফিকের সিসি টিভিতে যে গাড়িটাকে মদনের গাড়ির পেছনে চেজ করতে দেখা যাবে সেটা যে-কোনো গাড়ি হতে পারে। ওর দেহে যে বুলেটগুলো পাওয়া যাবে, সেগুলো সার্ভিস গানের নয়, কোনো বে-আইনি আগ্নেয়াস্ত্রের হবে। সি.আই.ডি.-কে সন্দেহ করলেও কোনো প্রমাণই থাকবে না যে এটা পুলিশি এনকাউন্টার।
এটাই প্রণবেশ লাহিড়ী ও অধিরাজ ব্যানার্জির করা এনকাউন্টারের মধ্যে পার্থক্য! একজন সংখ্যা বাড়ানোর চক্করে নিজেই অপরাধীদের লাশ নিয়ে মিডিয়া বাইট দিতে থাকেন। নিজের ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ তকমাটাকে আরও উজ্জ্বল করার জন্য নিজেই এনকাউন্টারটাকে ‘খবর’ করে দেন। আর অধিরাজ একদম নিশ্চুপে কয়েকটা গুলিতেই গল্প শেষ করে দেয়। কোথাও কোনো ভাষণ নেই, প্রমাণ নেই, কেউ দেখেনি, কেউ জানে না, স্রেফ এক গ্যাংস্টারের বেওয়ারিশ মৃতদেহ কোনো রাস্তায়, গলি-ঘুঁজিতে কিংবা মাঠেঘাটে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাকে কে মারল, কেন মারল, পুলিশ মারল না অপোনেন্ট গ্যাং-যা খুশি ভেবে নেওয়া যেতে পারে। সেজন্যই অপরাধীরা প্রণবেশের থেকেও বেশি ভয় পায় অধিরাজ ব্যানার্জিকে! গরম মাথার বাইসনের থেকে ঠান্ডা মাথার বিষাক্ত সাপ অনেক বেশি বিপজ্জনক।
আরও মিনিট দশেক পরে মদনের গাড়ি সুস্থ ও স্থির হল। কয়েক সেকেন্ড পরেই লক খোলার শব্দ পাওয়া গেল। বিস্রস্ত বসনা সুন্দরী তার পোষাক ঠিকঠাক করতে করতে একটা সাদা ও লম্বা সিগারেটে টান মারতে মারতে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তারপর প্রেমিককে শেষ বারের মতো আলিঙ্গন ও চুম্বন করে বিদায় নিল সে। মদন খুব নিশ্চিন্তেই ধীরে সুস্থে গাড়িটাকে পার্কিং লট থেকে বের করছিল। তার মনে একবারের জন্যও সন্দেহ জাগেনি যে অনতিদূরেই একটা গাড়িতে তিনজন সি.আই.ডি. অফিসার তারই অপেক্ষায় বসে আছে। কিন্তু যখন একটু পরেই বুঝতে পারল একটা সাফারি স্টর্ম খুব নীরবে, নিঃশব্দে তার পিছু করছে, তখনই সজাগ হয়ে উঠল। আর সেখান থেকেই শুরু এই চেজিং-এর ইতিহাস।
এখন সেই সিকোয়েন্স প্রায় ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছে। দুই পক্ষই বেশ কিছুক্ষণ ধরেই মরিয়া হয়ে ‘তাবড় তাবড়’ ফায়ারিং করে চলেছে। অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফুলস্পিডে এগিয়ে গিয়ে জোরদার ধাক্কা মারল সুইফটকে। এভাবে বারবার ঠুকে দিতে শুরু করলে গাড়িতে বসে থাকা মানুষটির স্নায়ুতে চাপ পড়ে। ফলস্বরূপ নার্ভাস হয়ে কিছু না কিছু ভুল করেই বসে। পবিত্র এই ফাঁকেই একটা গুলি বিধিয়ে দিতে পেরেছে গাড়িটার পেছনের চাকায়। টায়ারটা সশব্দে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। নিজের কৃতিত্বে নিজেই খুশি হয়ে বলল, “ঝাক্কাস!”
“অর্ণব, ইয়েহ দিল মাঙ্গে মোর।”
বলতে বলতেই ফের স্পিড তুলল অধিরাজ। অর্ণব এই বাক্যটার অর্থ জানে। তার অত্যন্ত পরিচিত ইশারা। সে সচকিত হয়ে ওঠে। ও জানে এখন তাকে কী করতে হবে। তার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও বটে। বিন্দুমাত্রও উত্তেজিত না হয়ে অর্ণব প্রয়োজনীয় মুহূর্তটার অপেক্ষা করতে থাকে।
অধিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে অ্যাক্সিলেটরের ওপর চাপ বাড়ায়। গাড়িটা যেন এখন বুলেটের গতিতে ছুটছে। অন্যদিকে মদনের গাড়ির একটি চাকা জখম হওয়ায় তার গাড়ির গতিবেগ কমছে। প্রচণ্ড স্পিডের মাথায় এরকম একটা ঝাঁকুনি খেয়ে বেসামালও হয়ে গিয়েছে। অধিরাজ গাড়িটাকে একদম সুইফটের পাশাপাশি নিয়ে গেল। সুইফটের গতিবেগ ক্রমশ কমছে…।
আচমকাই সাফারি স্টর্মের ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে গেল। ঘটনাটা কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে পেরে আঁৎকে উঠল পবিত্র, “নো… নো… নো! রাজা, নট এগেইন।”
অধিরাজ তার মন্তব্যের অপেক্ষা অবশ্য করেনি। সে দরজা খুলেই বিদ্যুৎবেগে লাফিয়ে পড়ল সুইফটের বাঁ-দিকের দরজা লক্ষ্য করে। যেন একটা নমনীয় চেহারার পেশল চিতাবাঘ লাফিয়ে পড়ে সওয়ার হল শিকারের ওপরে। যে মুহূর্তে সে বাইরে লাফিয়ে পড়ল, ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছনের সিট থেকে অর্ণব লাফ মেরে ড্রাইভিং সিটে এসে স্টিয়ারিং সামলাল। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে পবিত্র নিজেই ব্যাপারটা ঠাহর করে উঠতে পারেনি। সে যথারীতি বিরক্ত, “তোমাদের এই বিটকেল মিউজিক্যাল চেয়ার খেলার এখনই দরকার ছিল?”
অর্ণব নির্লিপ্ত মুখে তার দিকে দেখে নিয়ে সজোরে স্টিয়ারিং ঘোরাল। সাফারি স্টর্ম ফের জোরদার ধাক্কা মেরেছে সুইফটকে। একেই একটা টায়ার গিয়েছে, তার ওপর এই ঠোকাঠুকি। গাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চলন্ত গাড়ির জানলায় ঝুলছে অধিরাজ। তার পা পিচের রাস্তায় ঘষা খেলেও সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে খোলা জানলা দিয়ে কায়দা করে শরীরের আধখানা ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই মুহূর্তে মদনের সঙ্গে তার হাতাহাতি চলছে। মদন প্রাণপণে স্টিয়ারিং সোজা রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু অধিরাজ তাকে ঠিকমতো গাড়ি চালাতেই দেবে না। সে প্রাণপণে একহাতে স্টিয়ারিং হুইলটাকে বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মদনের হাতের আগ্নেয়াস্ত্রটা ও প্রথম সুযোগেই এক ঘুষিতে নীচে ফেলে দিয়েছিল। মদন সেটাকে তুলে নেওয়ার জন্য ঝোঁকার চেষ্টা করতেই এবার আর একহাতে চেপে ধরল ওর গলা। হিসহিস করে হিংস্র কণ্ঠে বলল, “তুই লেট! স্বর্গে তোর গুরু বিকাশ দুবে টেনশনে ঘড়ি দেখছে। টাইম টু গো।”
বলতে বলতেই স্টিয়ারিংটাকে এক্সট্রিম লেফটে ঘুরিয়ে দিয়েই সে লাফিয়ে পড়ল রাস্তায়। পড়েই দেখল চোখের নিমেষে গড়িয়ে চলে গিয়েছে এক সাইডে। অর্ণব গাড়িটাকে আগেই পিছিয়ে এনেছিল। সে অধিরাজকে সরে যেতে দেখেই সবেগে এসে ফের মোক্ষম গতিতে পেছন দিক দিয়ে ঠুকে দিয়েছে গাড়িটাকে। তারপরই দক্ষ হাতে বাঁ-দিকে নিয়ে গিয়ে ব্রেক কষল।
ওদের অঙ্ক একদম নিখুঁত ছিল। মদনের গাড়িটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, বেসামাল হয়ে গিয়ে ডানদিকের একটা বড় গাছে গিয়ে সশব্দে ধাক্কা মেরেছে। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল সামনের কাচ। অর্ণব গাড়িটাকে কোনোমতে দাঁড় করিয়েই লাফিয়ে নামল ড্রাইভিং সিট থেকে। নেমে এসেছে পবিত্রও। অধিরাজও এবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গেল সেদিকেই। অর্ণব তার দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকায়, “আর ইউ ওকে স্যার?” “ফিট অ্যান্ড ফাইন।” সে দ্রুত পায়ে দৌড়ে যায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সুইফটের দিকে, “চলো, মাননীয় বিকাশ দুবের চ্যালার খবর নিয়ে আসি।”
কপালগুণে মদন গাড়িটা গাছে ধাক্কা খাওয়ার আগেই কোনোমতে বাইরে লাফিয়ে পড়তে পেরেছিল। সে-ও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। তিন অফিসার তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই সে টেনে দৌড় মারল। কিছুতেই সি.আই.ডি.-র হাতে ধরা দেবে না। চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ মারার দরুণ হাতে পায়ে চোটও পেয়েছে। তবু এই দুর্দান্ত অপরাধী হাল ছাড়ল না। সে জানে পালাতে না পারলে আজই তার অন্তিম দিন। সি.আই.ডি. আজ এনকাউন্টার করার মুডে আছে। ওদের হারাতে না পারলে তার লাশটাও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই সে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে অদুরেই দাঁড়িয়ে থাকা ঘুমন্ত জনপদের দিকে দৌড়োল। মনে একটাই আশা, মানুষজনকে চেঁচামেচি করে জাগিয়ে দিতে পারলে অন্তত সর্বসমক্ষে তাকে গুলি মারবে না। অফিসাররা।
“যাঃ শালা।” পবিত্র একটু হতাশ হয়েই বলে, “এ মাল তো থামার নামই নিচ্ছে না! সামনের বাড়িগুলোর দিকেই যাচ্ছে।”
অকুস্থল থেকে কিছুটা দূরেই বেশ কয়েকটা বাড়ি পরপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় এখানে এখনও ফ্ল্যাট কালচার আসেনি। তবু বাড়িগুলোর চেহারা বেশ সম্ভ্রান্ত। বাড়ি আছে অর্থাৎ মানুষও আছে। মদন আজীবন সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, মেরে এসেছে। কিন্তু আজ যখন তার সামনেও স্বয়ং কাল এসে দাঁড়াল তখন সে সেই মানুষেরই শরণাপন্ন হল। জনবসতির দিকে দৌড়োতে দৌড়োতেই চেঁচাতে শুরু করল, “হে-ল্গ! হে- ল্গ! বাঁ-চা-ও!”
অধিরাজ আর অর্ণব সবেগে তার পেছনে দৌড়চ্ছে। পবিত্র দৌড়োতে দৌড়োতেই ফের তাকে লক্ষ্য করে ফায়ার করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু অধিরাজ চেঁচিয়ে তাকে বারণ করে, “ডোন্ট শ্যুট। ডোন্ট শ্যু-ট। এটা লোকালয়।”
অবশ্য ফায়ার করলেও বিশেষ লাভ হত না। মদনের মতো অভিজ্ঞ শয়তানরা খুব ভালোভাবেই জানে গুলি বক্রগতিতে চলে না। সেজন্যই সে এঁকেবেঁকে দৌড়োচ্ছিল। প্রাণ বাঁচানোর জন্য হাঁচোড় পাঁচোড় করে সামনে যে বাড়িটা পেল সেটাতেই লাফ মেরে গেট টপকে ঢুকে পড়ল সে। অধিরাজরা দূর থেকেই শুনতে পেল তার চিৎকার, “হে-ল্প। হে-ল্প।” “ফি-শ।”
অধিরাজ এবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে নিজের ব্যর্থতায় বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়ে, “ওকে স্বর্গে ডিপোর্ট করার সুযোগটা হাত থেকে বেরিয়ে গেল। এখন অ্যারেস্ট করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
অর্ণব আর পবিত্রও হতাশ হয়ে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছে। আজ ওরা মদনকে বাগে পেয়ে গিয়েছিল। ওর মতো ক্ষমতাশালী মাফিয়াকে গ্রেফতার করেও কোনো লাভ নেই। কেউ ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসবে না। এরা জেলে বসেও রীতিমতো গ্যাংকে চালনা করার ক্ষমতা রাখে। পুলিশ যদি কোনো সাক্ষীকে খুঁজেও বের করে, ওর দলবল খবর পেয়ে সাক্ষীটিকে উড়িয়ে দেবে। এমনই হয়ে আসছে। শেষপর্যন্ত কোর্ট প্রমাণাভাবে এদের ছেড়ে দেয়। ছাড়া পাওয়া মাত্রই আবার সেই নিধনযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। সবচেয়ে বিপদের কথা, এই ধরনের গ্যাংস্টাররা যতবার আইনের হাত থেকে ফস্কে যাবে, ততই এদের আত্মবিশ্বাস আর দুঃসাহস ক্রমাগতই বাড়তে থাকবে। আর্চ ক্রিমিনাল এভাবেই তৈরি হয়। মদন শুধু পালায়নি, অধিরাজদের সমস্ত পরিশ্রমে জল ঢেলে দিয়ে গেল। ও এখন সাধারণ মানুষকে সামনে এগিয়ে দিয়ে প্রাণ বাঁচাবে। যেমনভাবে বিকাশ দুবে মহাকাল মন্দিরের ভিড়কে বাঁচার জন্য ব্যবহার করেছিল। দুবে ভাবতেও পারেনি শেষমুহুর্তে গাড়ি আর পাশা এমনভাবে উলটে যাবে!
“ফাইন। অ্যারেস্টই করব। লেটস গো।”
ওরা ফের দৌড়োল। কে জানে, যদি কোনো মানুষের ক্ষতি করে এই খুনি। ওকে বিশ্বাস নেই। যে বাড়িতে ঢুকেছে সে বাড়ির বাসিন্দারা বিপন্ন। মদনের মতো নিষ্ঠুর ক্রিমিনাল প্রাণ বাঁচানোর জন্য সব কিছু করতে পারে। এই মুহূর্তে যদিও ওর একমাত্র আগ্নেয়াস্ত্রটাও সঙ্গে নেই, সেটা ওই গাড়ির ভেতরেই রয়ে গিয়েছে। তবুও কোণঠাসা বাঘ নিরস্ত্র হলেও ভয়ংকর।
“বাঁ-চা-ও। বাঁ-চা-ও!”
ওরা দৌড়োতে দৌড়োতেই একটা আর্ত চিৎকার শুনে ফের থমকে গেল। সামনের দৃশ্যটা দেখে তিনজনেরই চক্ষু চড়কগাছ। এ কী। মদন ওই বাড়িটা থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। ও অমন পাগলের মতো দৌড়োতে দৌড়োতে এদিকেই ছুটে আসছে কেন? এ তো পুরো উলটপুরাণ! এতক্ষণ সে অধিরাজদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য চেঁচামেচি করছিল। এখন উলটে অধিরাজদের দিকেই সাহায্যের আশায় ছুটে আসছে! যে মৃত্যুর হাত থেকে পালাচ্ছিল, এখন সেই মৃত্যুর দিকেই সে বাঁচার জন্য ছুটছে! এ কী অদ্ভুত কাণ্ড!
“রাজা!” পবিত্র সন্দিগ্ধ স্বরে বলে, “ওর মাথায় ঘুষি টুষি মেরেছ নাকি! না এমনি এমনিই পাগল হয়ে গেল? নাকি ওর পেছনে কোনো ডাইনোসর তাড়া করেছে।” পবিত্র অত্যুক্তি করেনি। এই মুহূর্তে মদনকে দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। যেন কোনো অশরীরী বিভীষিকা ওকে তাড়া করছে। এনকাউন্টারের চেয়েও কত বড়ো ভয় সামনে এসে দাঁড়ালে লোকে মৃত্যুদূতের কাছেই জীবন ভিক্ষা করে! অদ্ভুত আশঙ্কায় অধিরাজের কপালে ভাঁজ পড়ে। মদন যে বাড়িটায় আশ্রয় নিতে গিয়েছিল, ওখানেই সম্ভবত এমন কিছু দেখেছে যে এখন উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্রকেও ভয় পাচ্ছে না! ভয়, আরও বড়ো ভয়!
ওরা কিছু বলা বা করার আগেই মদন তীর বেগে দৌড়ে এসে দড়াম করে ধাক্কা খেল অধিরাজের সঙ্গে। এতক্ষণ বুঝি অন্ধের মতো, বাহ্যজ্ঞানহীনের মতো দৌড়োচ্ছিল সে। এবার অধিরাজকে দেখতে পেয়ে সবলে জাপটে ধরেছে তাকে। যেন স্বয়ং অধিরাজই তার শেষ আশ্রয়! হাঁউমাউ করে বলে উঠল, “আমায় অ্যারেস্ট করুন! ফাঁসি দিন! আমি সব কবুল করব। কিন্তু আমায় ওর হাত থেকে বাঁচান… ও আমায় মারবে… বাঁচান!”
“এ তো ভূতের মুখে রামনাম!” পবিত্র সটান তার মাথায় রিভলভার তাক করল, “পাগলের অ্যাকটিং করে ফাজলামি করা হচ্ছে!”
সে সভয়ে অধিরাজকে আরও জোরে আঁকড়ে চেপে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে ছোটো চারাগাছের মতো কাঁপছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার! তার কম্পন নিজের দেহে অনুভব করতে পারছিল অধিরাজ। সে হাত তুলে পবিত্ৰকে থামায়। মদনের ভয়টা নকল নয়, একদম খাঁটি। সে কিছু দেখেছে। এমন কিছু যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর! তার মন বলছিল, কিছু বড়ো গোলমাল আছে!
“কে তোকে মারবে? কার কথা বলছিস?”
অধিরাজ তাকে এবার একটু নরম সুরেই জিজ্ঞাসা করল, “তুই ওই সামনের বাড়িটাতে ঢুকেছিলি?”
“হ্যাঁ…হ্যাঁ….” অসংলগ্নভাবে উত্তর দিল মদন, “আমি ওকে দেখেছি। …কী ভয়ংকর!…ও মানুষ নয় স্যার…কী ভয়ংকর।…কী ভয়ানক…।”
“কী? কী দেখেছিস?” সে জানতে চায়, “কে ছিল?”
মদন কাঁপা স্বরেই উত্তর দেয়, “জানি না! কিন্তু মানুষ নয়… হতেই পারে না। ওর মুখের একদিকটা মানুষের মতো। কিন্তু অন্যদিকটা। স্যার, অন্যদিকে কিচ্ছু নেই। চোখ, মুখ-কিচ্ছু না! একটা লাশের মতো… যেন এখনই লাশ কাটা ঘর থেকে উঠে এসেছে… এক সাইডটা পুরো জ্বলে পুড়ে খাঁক… ঠোঁটটা সেলাই করা….আমি দেখেছি…. আমি দেখেছি ওকে… ওর একটা চোখ রক্তে লাল…ছ-জনকে মেরেছে, আমাকেও মারবে! বাঁ-চা-ন স্যা-র!”
তার কণ্ঠস্বর স্খলিত হয়ে এসেছিল। এবার হাতও শিথিল হয়ে গিয়েছে। মদন পড়েই যেত, তার আগেই তাকে ধরে ফেলেছে অধিরাজ। উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করছে, “কী বললি! আধখানা মুখ পোড়া। ঠোঁট সেলাই করা। ছ-জনকে মেরেছে! কাকে মেরেছে?”
মদন শুধু কোনোমতে অঙ্গুলিনির্দেশে সামনের বাড়িটা দেখায়। তারপরই এলিয়ে পড়ে। আর তার কোনো সাড়াশব্দই নেই! তার গোটা দেহটা এখন সম্পূর্ণ বেহুঁশ অবস্থায় অধিরাজের বাহুতে ঝুলছে। অধিরাজ স্তম্ভিত! তার বুকের ভেতরটা ধ্বক করে ওঠে। এই মাত্র কী শুনল! ঠিক কার বর্ণনা দিল মদন! সে তবে এখানেও এসে পৌঁছেছে!
“রাজা, তাহলে এখানেও…!”
পবিত্র ঠিক তার মনের আশঙ্কাকেই শব্দে প্রকাশ করল। ওর কণ্ঠস্বরেও ভয় প্রকট। অধিরাজ অজ্ঞান মদনকে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “পবিত্র, টেক কেয়ার অফ হিম। মেরে ফেলো না। ও হিটলিস্টে ছিল ঠিকই, কিন্তু বরাতজোরে সম্ভবত আরও বড়ো কোনো ক্রাইমের আই-উইটনেস হয়ে গিয়েছে। এখন ওর বেঁচে থাকা দরকার।”
পবিত্র কোনো কথা না বাড়িয়ে মদনের নিঃসাড় দেহটাকে ঘাড়ে তুলে গাড়ির দিকে হাঁটা মারল। অধিরাজ আর অর্ণব পরস্পরের দিকে আতঙ্কিত দৃষ্টি বিনিময় করে। ওদের দু-জনেরই মোটামুটি আন্দাজ আছে যে একটা ভয়াবহ ক্রাইম সিন তাদের জন্য অপেক্ষা করছে! এই নারকীয় দৃশ্যের সাক্ষী প্রথমে দিল্লির পুলিশ হয়েছিল। তারপর ক্রমান্বয়ে কানপুর এবং বেঙ্গালুরু। সব জায়গাতেই ক্রাইম সিন এক! প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণও এক! যে বর্ণনা একটু আগেই মদন দিল, সেই একই চেহারা ফিরে ফিরে এসেছে প্রত্যেকের মুখে। ফিরে এসেছে সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনের হেডলাইনে, একটাই বাক্য, ‘সে মানুষ নয়! সে মানুষ নয়!’ অধিরাজের মনে হল, তার মাথার মধ্যে টিক টিক করে একটা টাইমার চলতে শুরু করেছে…! “এই শুরু হল অর্ণব!”
সে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে নিয়ে পকেট থেকে গ্লাভস বের করে পরে নিতে নিতে বলল, “আমরা কোনো ক্রাইমসিন চেক করার জন্য রেডি হয়ে আসিনি। তবু খুব সাবধানে একবার দেখে আসি চলো।”
দু-জনেই নিঃশব্দে এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। দূর থেকে বোঝা যায়নি। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই দেখা গেল বাড়িটার জানলা দরজা দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাইরে বেরিয়ে আসছে। তার সঙ্গেই একটা মাংস পোড়া কটু গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারল। আশ্চর্য! আশেপাশের বাড়ির লোকেরা এখনও টের পায়নি? হয়তো শীতের কারণে সবাই দরজা জানলা বন্ধ করে ঘুমে তলিয়ে আছে বলে এখনও তাদের কাছে ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ পৌঁছোয়নি। তবে আরও কয়েক মিনিট পরেই তারাও জেনে যাবে। কারণ ধূম্রকুণ্ডলী আরও বড়ো আকার ধারণ করছে। সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে দুর্গন্ধের দাপটও৷
অধিরাজের মুখে চিন্তার ছাপ প্রকট। অনেক সময় অর্ণব লিড করে। কিন্তু আজ তাকে লিড করতে দিল না অধিরাজ। বরং সে নিজেই সন্তর্পণে এগিয়ে গেল। অর্ণব লক্ষ্য করল, অধিরাজের হাতে ফণা তুলেছে আগ্নেয়াস্ত্র। এবার সার্ভিস রিভলভার। অর্ণবও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল তার পেছন পেছন। তার হাতেও অস্ত্র। কে জানে! যদি ভেতরে কেউ থেকে থাকে! যাকে দেখে মদনের মতো ছুঁদে ক্রিমিনাল ও ভয়ে কাঁপে, সে আর যা-ই হোক নিরীহ গোছের কেউ নয়। মদন তাকে একটু আগেই দেখেছে। ওরা তাকে ছাড়া আর কাউকে বেরিয়ে আসতে দেখেনি ওই বাড়ি থেকে। অতএব খুনির স্পটে থাকার চান্সই বেশি।
বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার। নৈঃশব্দও থাবা গেড়ে বসে আছে এখানে। এই শীতেও বাড়িটার সমস্ত দরজা জানলা খোলা! অধিরাজ অবাক হল না। কারণ এর আগেও প্রত্যেকটা ক্রাইম সিনেই দরজা জানলা খোলা ছিল। সে সতর্ক দৃষ্টিতে চতুর্দিকটা দেখে নেয়। ভেতরে কেউ কি লুকিয়ে আছে? না মদনকে দেখা দিয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। সেই ভয়ানকদর্শন খুনি তাদেরও কি দেখা দেবে? না আপাতত অন্তরালেই থাকবে? খোলা দরজা জানলা দিয়ে তার পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মদন চেঁচিয়ে মেচিয়ে তাকে সজাগ করে দিয়েছে। সুতরাং পালাবার জন্য যে খুনি অন্য পথ বেছে নিয়েছে হাট করে খোলা জানলাই তার সাক্ষী! সে নিঃশব্দে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। তার দীর্ঘ উদ্ধত দেহ এখন উত্তেজনায় টানটান। প্রত্যেকটা ইন্দ্ৰিয় সজাগ! দেখা যাক কী আছে কপালে।
অর্ণবের বুকের ভেতরটা চরম উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। হৃৎপিণ্ডের জায়গায় প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা যন্ত্র যেন কয়েকশো গুণ বেগে রক্ত পাম্প করে চলেছে। এই অন্ধকার আর ধোঁয়ার পর্দার আড়ালে কার মুখ লুকিয়ে আছে! অথবা কোন্ হাড় হিম করা দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার অপেক্ষা করছে! এই চরম প্রাণঘাতী নিস্তব্ধতার মধ্যে সে শুধু নিজের হৃৎস্পন্দনের আওয়াজ পাচ্ছিল। এত জোরে ধুকপুকিয়ে চলছে যে ভয় হয়, বুকের হাড় পাঁজর ফাটিয়ে না বাইরে বেরিয়ে আসে। দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে পা টিপে টিপে সে অধিরাজের পেছনে ছায়ার মতো সঙ্গে সঙ্গে এগোল। সামনে একটা বিশাল হলঘর। তার জমাট তমিস্রার মধ্যেই ঠিক যেন দুটো ছায়া নিশ্চুপে এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরছে। কিন্তু একরাশ ঠান্ডা হাওয়া শুধু হু হু করে বয়ে এসে আছড়ে পড়ছে শূন্য ঘরের প্রতিটা কোণে। তার দমকে জানলার পর্দাগুলো উড়ছে আর যেন বলছে, কেউ নেই… এখানে কেউ নেই…!”
“অল্ ক্লিয়ার। কেউ নেই। কিন্তু….!”
অধিরাজ ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে পড়ে আশপাশটা ভালো করে দেখে নিয়েছে। তার শাণিত দৃষ্টি অন্ধকার ঘরের প্রত্যেকটা কোণ জরিপ করছে। সে চাপা স্বরে কথা বলতে বলতেই আচমকা থমকে গেল! এই মুহূর্তে তাকে দেখলে মনে হচ্ছে আচমকাই বুঝি প্রস্তরীভূত হয়ে গিয়েছে অধিরাজ! মানুষ নয়, বুঝি কোনো মূর্তিকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার জায়গায়। অধিরাজের দৃষ্টি অনুসরণ করে অর্ণবও সেদিকে তাকাল। দৃশ্যটা চোখে পড়া মাত্রই মনে হল তার গোটা দেহের রক্তই বুঝি বরফ হয়ে গিয়েছে! কোনোমতে বলল সে, “মা-ই গ-ড!”
হলঘরের সংলগ্ন আরও একটি ছোট্ট ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। সেখান থেকেই কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ঘরটা কিন্তু অন্ধকার নয়। বরং লেলিহান আগুনের শিখা চতুর্দিক দিয়ে রক্তিম আগুনে আলোয় আলোকিত করে তুলেছে। এত উজ্জ্বল আর হিংস্র জ্বালাময়ী সহস্র ফণায় জ্বলছে যে তার বিচ্ছুরণ রীতিমতো চোখে লাগে। সেই আলোতেই স্পষ্ট দেখা গেল সামনের পরিস্থিতি!
ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে ছ-ছটা দেহ। তাদের নাক মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে রক্তের ধারা। রক্ত এখনও তাজা! কেউ তাদের বুকের ওপর দিয়ে মালা পরানোর মতো রাবারের টায়ার গলিয়ে দিয়েছে। টায়ারগুলো থেকে এখনও উৎকট কেরোসিন তেলের গন্ধ আসছে! একটা গোটা মৃতদেহকে মৃত্যু আলিঙ্গনে সাপটে নিয়ে ধু ধু করে জ্বলছে টায়ার! তার সঙ্গে জ্বলছে লাশও! ছ-টা জ্বলন্ত টায়ার বুকে নিয়ে শুয়ে আছে ছ-টা জ্বলন্ত মৃতদেহ! পড়পড় শব্দে জ্বলছে তাদের চুল। জ্বলে পুড়ে কুঁকড়ে গিয়েছে চামড়া। মুখের মাংস পুড়ে, খসে খসে পড়ছে। কারোর কারোর গালের মাংস পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে হিংস্র দত্তপংক্তিও বেরিয়ে পড়েছে। নেকলেসিং!
“অর্ণব! কুইক! আগুন নেভাতে হবে।”
অধিরাজের কণ্ঠস্বরে সংবিৎ ফিরে পেল অর্ণব। তার এতক্ষণ মনে হচ্ছিল সে বুঝি ভুল করে শ্মশানভূমিতে এসে দাঁড়িয়েছে! আর চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে চিতা! পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তার পা দুটো এখনও অল্প অল্প কাঁপছে। একটা দুর্দম বিবমিষা পাকস্থলী থেকে উঠে এসে গলার কাছে চাপ মারছিল। তবু সে সামলে নিয়ে বলল, “ইয়েস স্যার….!”
দুই অফিসারই এবার আগুন নেবানোর চেষ্টায় তৎপর হল। অধিরাজ প্ৰথমে হলঘরের বিরাট কার্পেটটাকেই তুলে এনে জ্বলন্ত দেহগুলোর ওপর চাপা দিয়ে, ঝাপটে ঘষে ঘষে আগুনটাকে নির্বাপিত করার চেষ্টা করছে। আগুনের শিখা তাতে কিছুটা অবদমিত হলেও সহজে ছাড়ছে না দেহগুলোকে। অর্ণব দৌড়োল বাড়ির ভেতরের দিকে। যদি আশেপাশে, কিচেনে বা বাথরুমে জল পাওয়া যায়! কিন্তু এত বড়ো বাড়ির কোথায় কিচেন! কোথায়ই বা বাথরুম! বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর শেষপর্যন্ত ওয়াশরুমের খোঁজ পাওয়া গেল। সেখানে একটা জলভরা বালতিও ছিল। অর্ণব আর একটুও সময় নষ্ট না করে ভরা বালতিটা নিয়ে ফিরে এল অকুস্থলে।
কার্পেটের মুহুর্মুহু ঘষা খেয়ে আর কয়েক বালতি জল ঢালার পরে আগুন অবশেষে পরাজিত হল। ততক্ষণে মার্বেলের সাদা মেঝের ওপরে কালো কালো দাগ পড়ে গিয়েছে। কালো কালো পোড়া চামড়া লেপটে আছে রক্তের সঙ্গে। লাশগুলোকে শনাক্ত করাই দায়! সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই না-হলেও শরীরের প্রায় ষাট শতাংশই পুড়ে কাঠ হয়েছে। চামড়ার টায়ারগুলো গলে গিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে মৃতদেহের সঙ্গে যে খোলা প্রায় অসম্ভব! চতুর্দিকে শুধু ছ-টা পোড়া মানবদেহ বীভৎস, গলিত মুখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। কেরোসিন তেলের উগ্র গন্ধে, কালো ধোঁয়ায় বাতাস ভারি। অর্ণবের মনে হল, তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তার দুর্দশা দেখে মরদেহগুলো যেন ভয়াবহ মুখে নারকীয় খল খল হাসি হেসে ওঠে।
“হ্যালো।” অধিরাজ ততক্ষণে মোবাইলে এডিজি শিশির সেনকে ধরেছে। ও প্রান্তে এডিজি সেনের কণ্ঠস্বর জাগ্রত হতেই সে বলল, “ব্যাড নিউজ স্যার। ‘বার্নিং শিখ’ এখন কলকাতায়। একটা মাসমার্ডার হয়ে গিয়েছে। আরও ক-টা হবে জানি না। সেগুলোকে ঠেকানোর জন্য আমাদের হাতে আর মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা আছে…!”
ওরা জানত না, যখন অধিরাজ এবং অর্ণব ও বাড়িতে ঢুকছিল, তখন খানিকটা দুরেই একটা বড়ো গাছের আড়ালে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে ওদের সকৌতুকে দেখছিল। তার মুখ চাদরে ঢাকা। তবু অদূরবর্তী ল্যাম্পপোস্টের চলকে পড়া আলোয় যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! একদিকের মুখ অবিন্যস্ত গোঁফ দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা। অত গোঁফ দাড়ির প্রাবল্যে আসল মুখের আদল বোঝাই দায়। অন্যদিকে মুখ নামক কোনো বস্তুই নেই। গোটাটাই পোড়া! পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া চামড়ার মাঝখান দিয়ে মাঝেমধ্যে লাল মাংসের উঁকি ঝুঁকি। চট করে দেখলে মনে হয়, মুখের একপাশে বুঝি সে কোনো ভয়াবহ মুখোশ পরে আছে। চোখের অংশটা খোবলানো, গালের বেশ কিছুটা খুবলে তুলে নেওয়া। চোয়ালের একপাশ দিয়ে দাঁতসহ হাড় বেরিয়ে পড়েছে। ঠোঁট দুটো এবড়ো খেবড়ো ভাবে কে যেন সেলাই করে দিয়েছে। মদন ভুল বলেনি। বীভৎস সে মুখ! তাকে দেখলে মানুষ কম, পোস্টমর্টেম টেবিল থেকে উঠে আসা লাশ বলেই বেশি মনে হয়! অপলক দৃষ্টিতে সে কিছুক্ষণ দুই অফিসারকে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যেতে দেখল। তার একপাশের চোখে আলগা একটা কৌতুক ঝিকিয়ে ওঠে। তারপরই সে চাদর দিয়ে ভালো করে মুখটা ঢেকে নিয়ে আলতো শিস দিতে দিতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ছায়াটা হালকা হতে হতে কালোয় মিশে গেলেও দূর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল সেই বিখ্যাত গানের কলি, যার সুরে সে তীক্ষ্ণ হুই দিচ্ছিল….!
“গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই… কিসকো খবর, কৌন হ্যায় উয়ো, ….অনজান্ হ্যায় কোই…!”
