(8)
“আহেলি…. কুইক… তোমার হাতে অনন্ত সময় নেই। এখনই নবাবজাদারা ঘোড়ায় চড়ে আমাদের উদ্ধার করতে আসবেন। এসেই শুরু করবেন, হাই ডক্, কী খবর! …কতদূর! ….কী হল! …কেন হল? …কেন হল না? রিপোর্ট নিতে এই সালেই আসব না পরের বছর?… উঃ, আসামাত্রই এমন হাঁউমাউখাউ শুরু করে দেবে যেন পারলে আমার টাকেই উঠে পড়ে।… একজন মিটিয়ে মিটিয়ে খোঁচা মারবে, অন্যজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে কাশবে! জগাই-মাধাই দুটোকেই খুব ভালো চিনি। তাড়াতাড়ি করো…!”
ডঃ চ্যাটার্জি মাথায় আইসব্যাগ চাপিয়ে আহেলিকে বকার কোটা শেষ করে এবার আইভিকে নিয়ে পড়লেন, “মামণি… তোমার টেস্ট কতদূর! তুমি টেস্ট করছ না রেসিপি লিখছ ভাই? এখানে এসে এত স্লো কাজ করলে চলবে না বাপু! ইনফ্যাক্ট জম্বিরাও তোমার চেয়ে তাড়াতাড়ি নড়াচড়া করে। দরকার পড়লে কাল থেকে কয়েক গ্যালন এনার্জি ড্রিঙ্ক খেয়ে আসবে। সারাদিন ধরে গাছপালা ঘাসপাতা আর তরমুজের শরবত খেলে এই হবে! তোমরা তো আমায় ডোবাবে দেখছি। রিডিকুলাস!”
বেচারি আইভি নিজের ফিগার সম্পর্কে খুব সচেতন। তাই প্রচুর পরিমাণে স্যালাড আর ফ্রুট জুস খায়। এখন সেটারও চচ্চড়ি আর ঘন্ট না বানালে ডঃ চ্যাটার্জির হচ্ছে না! আহেলি আড়চোখে আইভিকে দেখে নেয়। বেচারির মুখ বকা খেয়ে ইতিমধ্যেই বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছে। ডঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে এতদিন থেকে সে খুব ভালো করেই জানে যে ওঁর হৃদয়টা যতটা মিষ্টি, জিভটা ঠিক ততটাই কড়া! প্রথম প্রথম বকুনি খেয়ে ও নিজেই খুব মুষড়ে পড়ত। পরে বুঝেছে, ওই বকুনিই তাকে আরও নিখুঁত, আরও ভালো একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বানিয়েছে। সে কথা আহেলিকে বোঝানোর জন্য কেউ ছিল না। কিন্তু আইভি’র ক্ষেত্রে সে আছে।
আহেলি আইভি’র মুখের অবস্থা দেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে, “স্যার, ওই তো ওর হয়েই এসেছে। আর একটু সময় দিন…!”
“গত দেড় ঘণ্টা ধরেই এই ‘হয়েই গেছে’ ডায়লগটা আমি অন্তত সাড়ে সাতান্নবার শুনেছি।” শান্ত হওয়ার বদলে আরও ক্ষেপে গেলেন ফরেনসিক বিশারদ, “ওর ‘হয়েই গেছে’-টা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা! ওর হওয়া আর সরকারের ডি.এ. দেওয়া একই ব্যাপার। প্রত্যেকবার শুনছি এবার হয়ে যাবে। কিন্তু কোনোবারই হয় না! সব দোষ হচ্ছে ওর ডায়েটের। ঘাসপাতা খেলে নাকি স্লিম, ফিট থাকা যায়। তুমিই বলো, হাতি, গন্ডার, বাইসন রোজ রোজ ভূরি ভূরি পাতা খেয়ে কি ভুঁড়ি একটুও কমাতে পেরেছে? সিংহ, বাঘ বা লেপার্ড কি যথেষ্ট স্লিম, ফিট আর স্পিডি নয়? এসব হয়েছে ওই হতচ্ছাড়া অ্যাভোক্যাডো খাওয়ার ফলাফল। আর একটা কী যেন? পালংশাক আর ফুলকপি মার্কা লামড়োটার নাম যেন কী?”
আহেলি নামটা বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই পেছন থেকে যথারীতি গম্ভীর মোলায়েম অথচ পুরুষালি কণ্ঠে উত্তর এল, “ব্রকোলি।”
“হ্যাঁ। ব্রকোলি!” ডঃ চ্যাটার্জি মেশিনগানের ফায়ার করার মতো বলেই চলেছেন, “সকালে ব্রকোলি স্যুপ, দুপুরে ব্রকোলি স্যালাড, রাতে বেকড ব্রকোলি। ওকে এখন এক কাপ আদা-চা করতে বলতেও ভয় পাই। কে জানে, আদার বদলে যদি ব্রকোলি দিয়ে দেয়!”
“আদার বদলে দেবেন কেন?” এবার অধিরাজ একেবারে ডঃ চ্যাটার্জির নাকের সামনে এসে মসৃণভাবে দীর্ঘদেহটাকে সামান্য ঝুঁকিয়ে বাও করে বলল, “বরং চা আদা দিয়ে করে সঙ্গে ‘টা’-টা ব্রকোলি দিয়ে বানাতে বলুন না! ব্রকোলির পকোড়া খেতে কিন্তু খুব ভালো৷ আমার মা বানাতে পারেন।”
ডঃ চ্যাটার্জি কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার মা ল্যাবে কাজ করতে পারেন?”
সে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল, “নাঃ।”
“তাহলে তিনি আমার কোন্ ভূতের বাপের শ্রাদ্ধে লাগবেন?”
“কেন?” তার মুখ যথারীতি শান্ত, “যে ভূতের বাপের শ্রাদ্ধে আপাতত ব্রকোলি লাগছে!”
“হ্যাত্তেরি!” ডঃ চ্যাটার্জি মুখখানা হাঁড়ির মতো করে ফেলেছেন, “ভূতের বাপের নয়। আমারই শ্রাদ্ধ হচ্ছে। তাও ওই ব্রকোলির দৌলতে। এই মহিলাকে যখনই জিজ্ঞাসা করি, ‘কী খেয়ে এলে?’ সবসময়ই উত্তর, ‘ব্রকোলি।’ তার ফলাফলও দেখে নাও। একটা টেস্টের রেজাল্ট বের করতে গোটা একটা শতাব্দীই লাগছে! এর দায় কে নেবে?”
“ওঃ!” অধিরাজ মিটিমিটি হাসছে, “তাহলে সেনোরিটার এটা ভারি অন্যায়! তিনি নিজে ব্রকোলি খেয়ে থাকুন তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমাদের প্রিয় টাকবাবুকে লাঞ্চে একটু ভালোমন্দ বানিয়ে বা আনিয়ে খাওয়ালে বোধহয় লেট হওয়ার দায়টা উনি নিতে রাজি আছেন! তাই না ডক্?”
অর্ণব সজোরে কেশে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় লাফিয়ে ওঠেন ভদ্রলোক, “ওই যে! বলেছিলাম না আসামাত্রই কাশাকাশি শুরু হয়ে যাবে। এইজন্যই দু-চক্ষে দেখতে পারি না। আমার কী? আমি বেকার মানুষ। সারাজীবন অপেক্ষা করতে রাজি আছি। কিন্তু তোমার খুনি কি ‘আব্বুলিশ’ বলে বাহাত্তর ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করবে?”
এইবার অধিরাজের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ল। সে গম্ভীর হয়ে বলল, “তা ঠিক। আমাদের সত্যিই এবার একটু তাড়া আছে। তাই বলে কাউকে খোঁচা মেরে হুড়মুড়িয়ে কাজ করানোও বোধহয় ঠিক নয়। মাদমোয়াজেল যা করছেন করতে দিন। আপনি বলতে শুরু করুন। সবার আগে বলুন, এই হাড় কাঁপানো শীতে মাথায় আইসব্যাগটি চাপিয়েছেন কেন?”
“কারণ আমার মাথা ঘুরছে। মাথার ভেতরে ঘিলুগুলো টগবগ করে ফুটছে। তোমাদেরও ফুটবে। আগে দুঃসংবাদটা শোনো।”
ডঃ চ্যাটার্জির কথা শুনে অধিরাজ চোখ ছানাবড়া করে বলে, “দুঃসংবাদ! কী সর্বনাশ! আপনি বিয়ে করছেন?”
“যাঃ কচু!” তিনি বিরক্ত হলেন, “এর মধ্যে আমার বিয়ে এল কোথা থেকে!”
“কারণ ওর থেকে বড়ো দুঃসংবাদ আর কিছু হতে পারে না।”
অর্ণব প্রচণ্ড একটা কাশিকে কোনোমতে সম্বরণ করে ফরসা মুখ লাল করে ফেলল৷ ডঃ চ্যাটার্জি গরগর করে ওঠেন, “তোমার এই ধাষ্টামোগুলোকে একটু সাইডে রাখবে! যা বলতে চলেছি তা শুনে দেখো। তারপর এই আইসব্যাগটা তুমিই চাইবে।”
সে এবার গম্ভীর হয়ে বলল, “বলুন। শুনি।”
“অ্যাজ ইউজুয়াল, ক্রাইম স্পটে কোনো অচেনা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। ইনফ্যাক্ট কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্টই নেই! খুনি সব মুছে দিয়েছে। ফোর্সড এন্ট্রি নেই। অন্য কোনো ক্লুও পাইনি। তবে একটা জিনিস নিশ্চয়ই তোমরা ভেবে মরছ।” তিনি বললেন, “ছ-টা লোক জ্যান্ত পুড়ে মারা গেল, অথচ কেউ চেঁচাল না কেন? ছ-জন লোককে কেউ টায়ার পরাল, কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালল, অথচ কোনো আওয়াজ, কোনো চেঁচামেচি বা সামান্য শব্দও হল না! এমন নয় বাড়িটা লোকালয় থেকে দূরে। বরং এখনও পর্যন্ত যে সব জায়গায় খুন হয়েছে সেগুলো সবই বেশ জনবহুল এলাকায় পড়ে। বাড়িগুলো সব পাশাপাশি। তা সত্ত্বেও শব্দ পেল না কেউ। এটা কোন ম্যাজিকে সম্ভব সেটাই নিশ্চয়ই তোমার চিন্তার কারণ।”
“অফকোর্স।” অধিরাজের সুন্দর মুখে চিন্তার মেঘ ঘনায়, “এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের! যে কোনো মানুষের গলায় জ্বলন্ত টায়ার থাকলে সে তো চেঁচাবেই। ইভেন আগুন নেভানোর জন্য দৌড়োদৌড়ি করবে, মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। কিন্তু ক্রাইমসিন দেখে একবারও মনে হয়নি যে ওঁরা এসব কিছু করেছেন। পোড়ার দাগ শুধু ওদের বাড়ির চারদিকেই ছিল। সেটাও টায়ারের ঘষা খাওয়ার দাগ নয়। অর্থাৎ কেউ মাটিতে শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টাই করেননি। জ্বলন্ত অবস্থায় ওই ঘর ছাড়া আর কোনো ঘরে যানওনি। একদম শান্তশিষ্ট হয়ে শুয়ে শুয়ে পুড়েছেন! এটা কী করে সম্ভব!”
“এটা এইজন্যই সম্ভব…!” তিনি উত্তর দিলেন, “কারণ জ্বলার সময় ওঁরা কেউ বেঁচেই ছিলেন না। খুনি ছ-জন জ্যান্ত মানুষকে আদৌ নেকলেসিং করে মারেনি। মারার পর নেকলেসিং করেছে। এই বার্নটা অ্যান্টিমর্টেম বার্ন নয়, পোস্টমর্টেম বার্ন।”
“মানে!” এবার সত্যিই স্তম্ভিত অধিরাজ, “তার মানে ওঁরা পুড়ে মারা যাননি?” “এখানেই তো আসল প্যাঁচ। পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আগে পুরোটা শুনে নাও।” ডঃ চ্যাটার্জি বলতে থাকেন, “দিল্লি, কানপুর বা ব্যাঙ্গালোরের এক্সপার্টরা ব্যাপারটা হয় খতিয়ে দেখেননি, নয় বডির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে বুঝতে পারেননি। ইনফ্যাক্ট বেশিরভাগ লাশই প্রায় ছাই হয়ে গিয়েছিল তাই সম্ভবত ধরাই পড়েনি। কিন্তু কলকাতার বডিগুলো অতখানি পোড়েনি। তাই কিছু কিছু জিনিস বোঝা গিয়েছে। পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি যে এদের কারোর ট্র্যাকিয়ায় কার্বন সুট পার্টিকল্ নেই! অথচ জ্যান্ত মানুষ, ইনফ্যাক্ট সে যদি অজ্ঞানও হয়, তবুও নিঃশ্বাস নেবে। আর তার নাকের মাধ্যমে ধোঁয়া ফুসফুস অবধি পৌঁছবেই। ট্র্যাকিয়ায় কার্বন সুট পার্টিকল্ থাকবেই। কিন্তু এক্ষেত্রে নেই। এছাড়া জ্যান্ত মানুষের দেহে আগুন জ্বালালে ব্লিস্টার্স প্রেজেন্স মানে যাকে বলে ফোস্কা, প্রচুর পরিমাণে থাকবে। আশ্চর্যের বিষয়, এই ছ-টা দেহে প্রায় ফোস্কা পড়েইনি! অ্যান্টিমর্টেম বার্নের ক্ষেত্রে স্কিন তখনও জীবিত আছে ও কাজ করছে, মানে ড্যামেজ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। ওটা যে কোনো জীবিত মানুষের দেহের স্বাভাবিক হিলিং প্রসেস। তাই পুড়ে গেলে স্কিন ব্লিস্টার বা ফোস্কা তৈরি করে দেয় যাতে পোড়া অংশটায় ইনফেকশন না হয়৷ একরকম বাইরের জার্ম থেকে ঢেকে রাখে বলতে পারো। এই মানুষগুলো যদি জ্যান্ত থাকত, তবে পোড়া চামড়ার ওপরে ফোস্কা থাকতই। অথচ চারজনের শরীরে কোনো ব্লিস্টারই নেই! দু-জনের শরীরে হাতে গোণা কয়েকটা আছে। যখন কেটে দেখলাম, তখন ব্লিস্টারগুলো পেল ইয়েলো রঙের দেখা গেল! জ্যান্ত মানুষের দেহের ফোস্কা টকটকে লাল হয়, ইয়েলো নয়! আরও আশ্চর্য, একটা লোককে ধরে জোর করে জ্বলন্ত টায়ার পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা টায়ার পরিয়ে আগুন ধরানো হচ্ছে, তা সত্ত্বেও সে কোনো স্ট্রাগল করল না। এদের কারোর দেহে স্ট্রাগল মার্কস নেই। এছাড়া বডিগুলোর হাত দেখো। একদম স্ট্রেট। মানুষের শরীরের সফট টিস্যু, মাসল পুড়ে কুঁকড়ে গেলে আর বার্নের কারণে ডিহাইড্রেডেট হয়ে গেলে সচরাচর হাত দুটো বক্সারদের মতো বুকের ওপর উঠে আসে। অবিকল বক্সাররা যে পজিশনে হাত রাখে, হাত দুটো ভাঁজ হয়ে তেমনই রূপ ধরে। এটাকে ‘পালিস্টিক অ্যাটিটিউড’ বলে। অথচ এদের সবার হাত একদম স্ট্রেট। বেঁচে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে অ্যাড্রিনালিন লেভেল অ্যাবনর্মালি হাই থাকার কথা। কারণ যে কোনো মানুষই এই পরিস্থিতিতে ফাইট ব্যাক করার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে তাও হয়নি। এর একটাই কারণ হতে পারে। পোড়ার আগে ওদের শরীরের জয়েন্টগুলো একদমই ফ্লেক্সিবল ছিল না। এটা প্রি-বার্নিং স্কেলিটাল ট্রমা থাকলেও হতে পারে। কিন্তু একই স্কেলিটাল ট্রমা একসঙ্গে ছ-জনেরই হবে বা একই হাড় বা জয়েন্টের রোগ বাচ্চা থেকে বড়ো প্রতিটা লোকেরই থাকবে, তা হয় না। এর একটাই অর্থ দাঁড়ায়, এদের শরীরগুলো পোড়ার আগে একেবারেই নমনীয় ছিল না, বরং মৃত্যুকঠিন ছিল। এই ছোটো ছোটো লক্ষণগুলো এক করে হিসেব করলে বোঝা যায় যে এদের মধ্যে একজনও জ্বলে মরেননি, মরে জ্বলেছেন।”
তিনি একটু শ্বাস টেনে বললেন, “আর মরা মানুষের গায়ে আগুন কেন, গোটা আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভা ঢেলে দিলেও সে চেঁচাবে না, বাধা দেবে না বা দৌড়োদৌড়ি করবে না! তাই কোনো আওয়াজ হয়নি, প্রতিবেশী কিংবা বাড়ির অন্য সদস্যেরও ঘুম ভাঙেনি। কতগুলো মরা মানুষকে এক এক করে টায়ার পরিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সাংঘাতিক বলশালী পালোয়ান বা একাধিক মানুষের দরকার নেই। একটা সাধারণ চেহারার মানুষই পারে।”
“যাক্।” অধিরাজ যেন একটু স্বস্তি পেল, “তার মানে ওরা পুড়ে যাওয়ার আগেই মারা গিয়েছিলেন। এইবার বুঝলাম এর পেছনের নীরবতার অর্থ। মরা মানুষ চেঁচায় না!”
“না।”
“তবে ওঁদের মৃত্যুর কারণ কী?”
ডঃ চ্যাটার্জি ফ্যাকাশে হেসে বললেন, “এইবার তোমার মাথায় বাজটা পড়তে চলেছে। ওঁদের মৃত্যুর কারণ বার্ন-ই।”
“হো-য়া-ট!”
অধিরাজ সচরাচর এত জোরে কথা বলে না। তার স্বর সবসময়ই উষ্ণ ও মন্দ্র। কিন্তু বিস্ময়ের ধাক্কায় সেই সহজাত গাম্ভীর্যও সরে গেল, “কী বলছেন ডক্। এইমাত্রই তো বললেন যে ওঁদের আগুনে পোড়ার জন্য মৃত্যু হয়নি। মরার পর লাশগুলোকে নেকলেসিং করে জ্বালানো হয়েছে!”
“আমি এখনও তাই বলছি। এদের মধ্যে কেউ আগুনে পুড়ে মরেনি।” তিনি শুকনো মুখে বললেন, “কিন্তু ওদের প্রত্যেকের মৃত্যুর পেছনে একটাই কারণ। লাংস থেকে ল্যারিংস অবধি ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়া! যেটা বাইরে থেকে আগুন জ্বালানোর ফলে একেবারেই হয়নি। বরং বলা যেতে পারে, ওদের বডির ভেতরে কেউ আগুন জ্বেলে দিয়েছিল, অথবা মারাত্মক কোনো অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ল্যারিংস পুড়ে যাওয়ার জন্য ভোকাল কর্ড পুরোটাই মায়ের ভোগে! বার্ন হওয়ার ফলে রেস্পিরেটরি সিস্টেম ফেল করবে। যার জন্য নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না কেউ। এবং ভোকাল কর্ড পুড়ে যাওয়ায় ওঁরা যন্ত্রণায় চিৎকার করলেও সে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। যেমন বোবার চিৎকার কেউ শোনে না। তেমন এই হতভাগ্যদের মরণ-আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি! প্রথম প্রথম জোরালো কাশির শব্দ শোনা গেলেও যেতে পারে। কিন্তু এই শীতে লোকে হাঁচবে বা কাশবে, সেটা এতটাই স্বাভাবিক যে শুনলেও কেউ পাত্তা দেয়নি।”
শুনতে শুনতে অর্ণবের গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! লোকগুলোকে জ্বালানো হল মৃত্যুর পরে। অথচ আগুন লাগার আগেই তারা পুড়ে মারা গিয়েছিলেন! এ কীভাবে সম্ভব! যখন আগুন জ্বলল, তখন তারা জীবিত ছিলেন না। আবার যখন তাদের দেহের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল, তখন আগুন তাদের ধারে কাছেও ছিল না! এ কী আশ্চর্য হেঁয়ালি!
“তার মানে ওরা অ্যাসিড খেয়েছিলেন?” অধিরাজ বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বলে, “রাইট?”
“রং।” তিনি মাথা নাড়ছেন, “অ্যাসিড খেলে মুখ, জিভ থেকে শুরু করে গ্রাসনালী, পাকস্থলী, ইনটেস্টাইন, সব জ্বলে পুড়ে একসা হয়ে যেত। ওরা কোনোরকম অ্যাসিড পান করেননি। পুড়েছে শুধু ল্যারিংস টু লাংস। অ্যাসিডটা মুখ দিয়ে গেলে সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়া কোথাও কিছু নেই, আচমকা অ্যাসিড খাওয়ার দুর্বুদ্ধি কারোর হবেই-বা কেন? অ্যাসিড কি কোকাকোলা যে ঢকঢকিয়ে খেয়ে নেবে! আর খাবেই-বা কেন শুনি? তুমি বলতে চাও, হঠাৎ শীতের রাতে ওদের মনে হল, শরীরটা ভয়াবহ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, গরম কিছু খাওয়া দরকার! আর অ্যাসিডের চেয়ে গরম আর কী হতে পারে? তাই সবাই বোতল থেকে একগ্লাস করে অ্যাসিড ঢেলে চিয়ার্স করে খেয়ে ফেললেন! শরীর গরম করার অব্যর্থ ওষুধ।”
“ডক্, আপনার ভুল হচ্ছে না তো?” তার হতবিহ্বল মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ক্রমশই এই অদ্ভুত মৃত্যুর ধাঁধার জটে জড়িয়ে পড়ছে, “এমনও তো হতে পারে যে মরার পর হয়তো জ্বলন্ত টায়ারের আগুনই ওদের ফুসফুস আর শ্বাসনালী অবধি পৌঁছেছে। আগুনেই হয়তো ফুসফুস পুড়ে গিয়েছে। আর আপনি গুলিয়ে ফেলছেন।” “শোনো ছোঁড়া।” ভদ্রলোক এবার চটে গিয়েছেন, “যখন তুমি হামাগুড়ি দিচ্ছিলে, আর মায়ের কোলে শুয়ে আঁও আঁও করে কান্নাকাটি জুড়েছিলে, তখন থেকেই আমি মড়া কাটছি! তাই গুলিয়ে ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। টায়ারের আগুন গোটা স্কিনের লেয়ার পুড়িয়ে, মাংস-পেশী অবধি পৌঁছেছে ঠিকই। কিন্তু ফুসফুস বা হার্টের মতো ইন্টারন্যাল অর্গান অবধি পৌঁছতেই পারেনি। তার আগেই সৌভাগ্যবশত তোমরা আগুনটা নিভিয়ে দিয়েছ। নয়তো অন্যান্য মার্ডারগুলোর মতো এখানেও বডি বলে কিছু থাকত না। আমাকেও কয়েকটা হাড়গোড় আর ছাই দেখে বলতে হত, ‘আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে।’ বিশ্বাস না হলে গীতা এনে দাও। হাতে রেখে বলতে পারি এরা কখনোই আগুনে পুড়ে মরেনি। মরার পর আগুন ধরানো হয়েছে। অ্যাসিডও ওরা পান করেননি!”
“তবে!” অধিরাজের স্বাভাবিক স্থৈর্যেও যেন এবার একটু চিড় ধরেছে। সে এবার অধীর কণ্ঠে বলে, “আগুনে পুড়ে মরেননি, অ্যাসিডও খাননি, অথচ পুড়েই মরেছেন! এ কী জাতীয় প্যারাডক্স! তবে আগুন, অ্যাসিড বা কোনোরকম দাহ্যবস্তু ছাড়া মরলেন কী করে? জলে ডুবে! না ফ্রস্টবাইটিং এ?”
“আরে!” ডঃ চ্যাটার্জি রেগে গেলেন, “তখন থেকে বলছি যে পুড়ে মরেছে, আর তুমি মানুষগুলোকে জলে ডোবাচ্ছ! আবার বরফও আমদানি করেছ! এটা কলকাতার শীত, নর্থপোল নয় যে বরফ পড়ে ফ্রস্ট বাইট হবে। ইয়ার্কি হচ্ছে?”
“ইয়ার্কি তো আপনি করছেন ডক্।” এবার তার সম্পূর্ণ ধৈর্যচ্যুতি হয়েছে, “নিজেই বলছেন, ওরা মৃত্যুর পরে আগুনে পুড়েছেন। ওদিকে এ-ও বলছেন, পোড়ার কারণেই মৃত্যু হয়েছে। লোকে হয় আগুনে পোড়ে, কখনও কখনও বরফেও পোড়ে। ওদিকে আপনি বলছেন পুড়েছে, কিন্তু আগুনে বা বরফে পোড়েনি! আসলে হয়েছে-টা কী?”
ডঃ চ্যাটার্জি তেড়েফুঁড়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন তার আগেই আহেলি বলে উঠল, “স্যার ঠিকই বলছেন অফিসার ব্যানার্জি। লাশগুলোর গায়ে যে আগুনের বার্ন দেখতে পাচ্ছেন, সেটা পোস্টমর্টেম বার্ন। আবার লাশের ল্যারিংস থেকে শুরু করে লাংস অবধি যে বার্ন দেখা যাচ্ছে, সেটাই মৃত্যুর আসল কারণ। পুরোটাই পুড়ে গিয়ে রেস্পিরেটরি সিস্টেম ফেইল করেছে। লাংসের মধ্যে প্রচুর ফ্লুইড জমার ফলে চোকিং ও হয়েছিল। ওরা কেউ শ্বাস নিতে না পেরে, ভেতরে ভেতরে পুড়ে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মরেছেন। মারাত্মক গ্রুসাম মৃত্যু। শুধু তাই নয়, লাশের আশপাশ থেকে আপনারা যে ব্লাডের স্যাম্পল্ নিয়ে এসেছিলেন না?”
“হ্যাঁ?” এতক্ষণে অধিরাজ ও অর্ণবের মনে পড়ল যে ক্রাইমসিনে যথেষ্ট পরিমাণে ব্লাডও ছিল। লাশগুলোর নাক মুখ দিয়ে তখনও রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছিল। অধিরাজ এবার একটু শান্ত হয়ে বলল, “ব্লাডে কিছু পাওয়া গিয়েছে?”
“হ্যাঁ।” আহেলি সপ্রতিভভাবে জানায়, “ওটা আসলে ব্লাড ভমিটিং। যে-কোনো কারণেই হোক ভিকটিমরা মারা যাওয়ার আগে রক্তবমি করছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার আমি ওর ভেতরে লাংসের কিছু সফট টিস্যু পেয়েছি। অর্থাৎ লাংস পুড়ে যাওয়ার ফলে সফট টিস্যুগুলো টুকরো টুকরো হয়ে গিয়ে বমির সঙ্গে উঠে আসছিল। যেহেতু ব্লাডের সঙ্গে উঠে এসেছে, এবং ব্লাডটা ভমিট, সুতরাং এটাও সঠিক যে যখন ভেতর থেকে ওদের ফুসফুসগুলো পুড়ছিল তখনও ওরা বেঁচেছিলেন। আর এটাই ওদের মৃত্যুর একমাত্র কারণ। কিন্তু এটাও হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি তাতে আগুনের কোনো ভূমিকা নেই।”
“ব্লাড ভমিটিং?” অধিরাজ যেন ক্রমশই চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। অসহায়ের মতো ভেসে ওঠার একটা শেষ চেষ্টা করল, “তাহলে ওরা কি কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া ইনহেল করেছিলেন? অথবা কোনো রেডিয়েশন বার্ন, বা রেডিও অ্যাকটিভ গ্যাস? বা বিষ?”
এবার ডঃ চ্যাটার্জি জানালেন, “নট অ্যাট অল্। কোনো রেডিয়ো-অ্যাকটিভিটির গল্প এখানে নেই। থাকলে আমায় ল্যাবে লাশের কাছে এভাবে ঘুরঘুর করতে দেখতে পেতে না। স্রেফ পালিয়ে যেতাম। আপনি বাঁচলে তবে লাশ কাটার নাম। আর রইল বিষের কথা?” তিনি সোজা আইভিকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “ওই মিস ব্রকোলিকে জিজ্ঞাসা করো! আমরা ‘সর্বনাশিনী’ কেসে হাবুডুবু খেয়েছিলাম বলে সরকার বাহাদুর ওঁকে আমাদের ঘাড়ে এনে বসিয়ে দিয়েছেন। ফরেনসিক টক্সিকোলজিস্ট কিনা! বিষ বিশারদ পয়জন আইভি! বডি ফ্লুইড আর টিস্যু স্যাম্পল নিয়ে এক যুগ ধরে নাড়াচাড়া করে চলেছেন। এখনও পর্যন্ত কোনো রেজাল্ট পাননি আমাদের পয়জন এক্সপার্ট! পাবেন বলে মনেও হচ্ছে না, কারণ ওঁর ব্রেনের জায়গায় আস্ত একটা ব্রকোলিই বসে আছে!”
অর্ণবের চোখের সামনে একটা ব্রেনের জায়গায় ব্রকোলির ছবি ভেসে উঠল। সত্যি! দুটোকে অনেকটা একইরকম দেখতে। অধিরাজ এবার অসহায়ের মতো আইভির দিকে তাকিয়েছে। তার চোখে এখন হতাশা। আইভি ভেতরে ভেতরে ভীষণ নার্ভাস বোধ করছিল। এমনিতেই ঘেঁটে আছে। তার ওপর এই মানুষটাকে দেখলেই সব কিছু গুলিয়ে ফেলে। এমন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে যার উষ্ণতায় আইভির-ই ল্যারিংস থেকে লাংস অবধি ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাওয়ার জোগাড়। এভাবে তাকাতে হয়? অন্য কোথাও সিরিয়াল কিলার খোঁজার দরকার কী! অফিসার ব্যানার্জির মতো সাইলেন্ট কিলার খুব কমই আছে। এভাবে ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে দিতে তো তিনি ওস্তাদ! সেটা ওঁকে বলে কে? তার কপালে এই শীতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে!
অর্ণব তার অনুরাগ সিক্ত চাউনি আর গালের লাল আভা দেখে মনে মনে হাসল। এই মেয়েটা কিন্তু মোটেই খারাপ টক্সিকোলজিস্ট নয়। পবিত্র-র একটা কেসে ইনি রীতিমতো কামাল করেছিলেন। কিন্তু অধিরাজ সামনে এসে দাঁড়ালেই কেমন যেন ক্যাবলা হয়ে যান। তার ওপর ডঃ চ্যাটার্জির লাফালাফির সঙ্গে এখনও মানিয়ে নিতে পারেননি। সে একটু সহৃদয় স্বরেই বলে, “মিস্ ভট্টাচার্য, আপনার কিছু বলার আছে?” “ইয়েস… ইয়েস…!” আইভি যেন সংবিৎ ফিরে পায়। একটু হতাশ স্বরেই বলে, “আমি চারবার টেস্ট করেছি। চারবারই নেগেটিভ। ফ্লুইডে বা টিস্যুতে কোনো বিষের ট্রেস নেই। তবে একটা ব্যাপার…!”
বলতে বলতেই থেমে গিয়েছে সে। অধিরাজ এবার তার কথা পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আর যখনই সে কোনোকিছু গভীর মনোসংযোগের সঙ্গে শোনে, তখন তার অজান্তেই চোখের দৃষ্টিটায় অল্প উম্মা মিশে যায়। একটু যেন রাগ রাগ ভাব ফুটে ওঠে। আইভি সেটা দেখেই ঘাবড়ে গিয়ে থতমত খেয়ে থেমে গেল। ডঃ চ্যাটার্জি ব্যাপারটা বুঝেই টাক চাপড়ালেন, “নাও, বাকি এপিসোডগুলো ওটিটিতে দেখে নিও। আইভি, হি ইজ অল ইয়ার্স! বলতে থাকো…!”
কপালদোষে ‘হি ইজ অল ইয়ারস্’ শব্দটা আইভি ‘হি ইজ অল ইওরস্’ শুনেছিল। সে একটা ভয়াবহ বিষম খেয়ে বলল, “ইওরস্ মানে!”
“আহেলি।” তিনি রেগেমেগে হুকুম করলেন, “কাল থেকে বাসকপাতা নিয়ে আসবে। এখানে এলেই সবার কাশি পায়! ইওরস্ নয় মামণি, ইয়ার্স! মানে উনি কর্ণময়। অফিসার ব্যানার্জি খুব মন দিয়ে কান খাড়া করে তোমার কথা শুনছেন। উনি আদৌ রেগে নেই। ওঁর চোখটাই ওরকম, ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট। তুমি নিশ্চিন্তে কন্টিনিউ করতে পারো।”
এরকম ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট কেন যে ভগবানের হাত দিয়ে বারবার হয় না! অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আইভি কোনোমতে নিজেকে ফের গুছিয়ে নিল, “হ্যাঁ। একটা ব্যাপার একটু অদ্ভুত লাগছে।”
ডঃ চ্যাটার্জি বললেন, “কী?”
“ফ্লুইডে ক্লোরাইডের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে কার্বাময়েল ক্লোরাইড।” সে একটু থেমে বলল, “পয়জনিং হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে পয়জনটা একদমই আনকমন। হয়তো এখনও বিষটা মার্কেটে আসেনি।”
অধিরাজের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। অসীম চ্যাটার্জি একটু থেমে বললেন, “ইন দ্যাট কেস ক্রোমাটোগ্রাফি করে ভাঙো। খতিয়ে দেখি কী কী কম্পাউন্ড রয়েছে। কম্পোজিশনটা জানতে পারলে হয়তো কিছু বুঝতে পারব।”
“ওকে স্যার।”
আইভি কথা শেষ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সেখান থেকে দ্রুত পায়ে চলে গেল সে। একপ্রকার যেন পালিয়েই বাঁচল। অর্ণব লক্ষ্য করল আহেলির মুখ এক মুহূর্তের জন্য যেন শক্ত হয়ে ওঠে। তারপরই সে চোখ সরিয়ে নিয়েছে ওদিক থেকে। এই দুটি মেয়ের মধ্যে একটা নীরব প্রতিযোগিতা আছে তা অর্ণব ও ডঃ চ্যাটার্জি, দু-জনেই লক্ষ্য করেছেন। একমাত্র যার লক্ষ্য করার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে-ই করে না!
“ডক্।” অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডান হাতটা ডঃ চ্যাটার্জির দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, “আই রিয়েলি নিড ইওর আইসব্যাগ।”
“পথে এসো বাছা।” তিনি হাসতে হাসতে আইসব্যাগটা এগিয়ে দেন, “সব মিলিয়ে কী বুঝলে?”
“কী বুঝলাম?” সে আইসব্যাগটা নির্বিবাদে মাথায় চাপিয়েছে, “বুঝলাম যে, আতাগাছে তোতা পাখি, কত কথা বলা বাকি!”
“সে আবার কী! আধুনিক কবিতা নাকি?” ভদ্রলোক ভয়ানক ভ্রূকুটি করেছেন, “জঘন্য! আমি এক বর্ণও বুঝতে পারি না যে কী বলতে চায়! অর্থহীন!”
অধিরাজ করুণ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনার আজকের রিপোর্টটা ওই আধুনিক কবিতার মতোই অর্থহীন ডক্। কী যে বললেন, কিছুই মাথায় ঢুকল না! আগুন যখন লাগল ততক্ষণে ভিকটিমরা মারা গিয়েছিল। আবার ভিকটিমরা তখনই মারা গেল যখন ফুসফুস পুড়ে গেল। অথচ তখন আগুন লাগেনি। এর অর্থ কী! ওদিকে একজন বাহাত্তর ঘণ্টার ডেডলাইন দিয়ে রেখেছে। এই গোটা শহরের মধ্যে ওই একটা লোককে কী করে খুঁজে বের করব বুঝতে পারছি না। তবু ভরসা ছিল যে মৃত্যুর কারণটা অন্তত জানি। এখন দেখছি তাও জানি না! আরও দুটো পরিবারের শিয়রে সমন। তার মধ্যে আপনিও আধুনিক কবিতার মতো ফরেনসিক রিপোর্ট শোনাচ্ছেন। ইচ্ছে করছে নিজেই নিজের মুখাগ্নি করে দিই।” বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে কাতর চোখে তাকায়, “অর্ণব, তুমি কি বলো?”
সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। অর্ণব স্মিত হাসল। আজকাল অধিরাজের সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার তার হেফাজতেই থাকে। নিতান্তই প্রয়োজন না পড়লে অন ডিউটিতে চারটের বেশি সিগারেট সে অ্যালাউ করে না। অধিরাজও তার এই নিঃশব্দ কড়া শাসন সসম্মানে মেনে নিয়েছে। এই শুভচিন্তক বন্ধুটির ওপর তার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।
অর্ণব কোনো কথা না বলে সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে লাইটারটাও। অধিরাজের একটা হাত আইসব্যাগটা ধরে রেখেছে। অন্য হাতে সিগারেটটা মুখে গুঁজে লাইটার দিয়ে জ্বেলে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “আপনি কী বুঝলেন ডক্?”
“আমি মোটেই ভালো বুঝছি না রাজা।” ডঃ চ্যাটার্জির মুখ গম্ভীর, “জানি না তুমি কী করতে চলেছ। কিন্তু এই লোকটা ডেঞ্জারাস! তুমি তার সম্পর্কে কিছু জানো না! সামনে কোনো সাসপেক্টও নেই! পি সি সরকার শূন্যে হাত ঘুরিয়ে রসোগোল্লা আমদানি করতেন। সেই ম্যাজিকটাই তোমায় করতে হবে। শূন্য থেকে অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হবে। অথচ মার্ডার ওয়েপন কী সেটাও তোমার জানা নেই। নেকলেসিংটা স্রেফ ফরেনসিকের চোখকে ধুলো দেওয়ার জন্য। টায়ার, আগুন-পুরোটাই শো-অফ। ওয়েপনটা কী তা আমার জানা নেই, কিন্তু সেটার মারাত্মক এফেক্ট স্বচক্ষে দেখেছি। বিলিভ মি, জ্বলন্ত টায়ার গলায় পরে পুড়ে মরাটা অসম্ভব গ্রুসাম ডেথ। তবু সে হতভাগার যন্ত্রণায় চিৎকার করার স্বাধীনতা আছে, ফাইট ব্যাক করার অপশন আছে। কিন্তু এখানে কী হয়েছে তা একবার কল্পনা করো। আমি যতদূর বুঝেছি, বলছি।” বলতে বলতে তিনি অধিরাজের সিগারেটটাই টেনে নিয়ে একটা টান মেরেছেন। শীতের মধ্যে উষ্ণ মৌতাত নিয়ে বললেন, “ভেবে দেখো, তোমার শ্বাসনালীটা পুড়ে যাচ্ছে। অথচ তুমি আগুনটা দেখতেই পাচ্ছ না। ধীরে ধীরে তোমার ফুসফুসটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার জানা নেই এই জ্বলাটা থামাবে কীভাবে! গায়ে আগুন জ্বললে গড়াগড়ি দিয়ে, মাটিতে ঘষে, নিদেনপক্ষে হাত দিয়ে চাপড় মেরে থামানো যায়। যে আগুন তোমার রক্তমাংসের ভেতরে, শরীরের অন্দরে ফুসফুসে জ্বলছে, তাকে থামাবে কী করে? তার মধ্যেই ফুসফুসে ফ্লুইড জমা হয়ে দম আটকে আসছে, মনে হচ্ছে কেউ গলা টিপে ধরেছে। সঙ্গে সঙ্গে ভলকে ভলকে তুমুল রক্তবমি! দৌড়োদৌড়ি করার ক্ষমতা দূর, নড়াচড়ার শক্তিও নেই। চামড়ায় আগুন লাগলেই লোকে চেঁচিয়ে একসা করে, তবে ফুসফুসে আগুন লাগলে কী নিদারুণ যন্ত্রণা হতে পারে তা আন্দাজ করো। তুমি গলা ফাটিয়ে মরণ-চিৎকার করছ, তোমার মুখ খুলছে, অথচ গলা দিয়ে টু শব্দটিও বের হচ্ছে না! ল্যারিংসটাই আস্ত নেই, ভোক্যাল কর্ড তো ছাড়ো। অদৃশ্য আগুনটা তোমার লাংসটাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েই চলেছে, কিচ্ছু করার নেই। এভাবেই যতক্ষণ না ফুসফুসটা পুরোপুরি পুড়ে গিয়ে রেস্পিরেটরি সিস্টেম ফেইলিওর হয়ে তোমার শ্বাস বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ তোমার স্রেফ যন্ত্রণা সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এর থেকে গ্রুসাম আর কিছু ভাবতে পারো?”
অর্ণব দৃশ্যটা ভেবেই আঁৎকে উঠল। কী ভয়াবহ মার্ডার ওয়েপন। কী নিদারুণ তার যন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতা! এমন মৃত্যুর চেয়ে নেকলেসিং-এ মরাও বোধহয় ভালো! এতগুলো লোক সম্ভবত এভাবেই মারা গিয়েছে। প্রত্যেকবারই তাদের মরদেহকে খুনি নেকলেসিং এর ভাঁওতা দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফরেনসিক ওর চালাকি ধরতে পারেনি। এবারও সে সফল হয়ে যেত যদি না মদন তাড়া খেয়ে মোক্ষম সময়ে ক্রাইম সিনে গিয়ে পৌঁছোত। আধপোড়া মৃতদেহ উদ্ধার করতে পেরেছিল বলে অন্তত এইটুকু বোঝা গেল যে আসল অস্ত্র টায়ার, কেরোসিন বা আগুন-কোনোটাই নয়!
“লোকটা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই বুদ্ধিমান রাজা!” তিনি এবার চিন্তিত স্বরে বলেন, “বার্নিং শিখের মেইন ভিকটিমরা সকলেই নো ডাউট এভাবেই মরেছে। কিন্তু সিকিউরিটি গার্ড আর পুলিশ অফিসারদের মৃত্যুর গল্পও শোনো। ওদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়েছি আমি। দিল্লির আই.পি.এস. দেবধর চৌবের সিকিউরিটি গার্ডরা রোজ রাতে গরম চা খেত। চৌবের বাড়ি থেকেই সেই চা একটা বিশেষ টি-পটে দেওয়া হত। ঘটনার দিন ওই চায়ে চড়া মাত্রায় ঘুমের ওষুধ মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই চা খেয়ে ওরা গভীর ঘুমে ডুবে গিয়েছিল। তারপর খুনি তরোয়াল দিয়ে প্রথমেই একে একে তাদের গলার নলিটা ফাঁক করে দিয়েছে। তারপর জ্যাক দ্য রিপারের মতো তাদের কেটে টুকরো টুকরো করেছে। এমনকি ইন্টারনাল বডি পার্টস, লিভার, ফুসফুস, প্যানক্রিয়াস, স্টমাক, কিডনি নাড়িভুঁড়ি সমেত বাইরে বের করে এনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে। কানপুরের পুলিশ কনস্টেবলদেরও ঠিক একইভাবে কেটেছিল সে। কানপুরের একজন পুলিশ অফিসারকে দুটো অ্যাসিড বাল্ব ছুড়ে মেরেছিল। অন্যজনের মৃত্যুটাও রহস্যজনক। তবে এইটুকু দেখা গিয়েছে যে সেই অফিসারের গাড়ির ব্রেক ফেল হয়ে গিয়েছিল ও গাড়িতে একটা ব্লাস্টও হয়েছিল। সেটা দুর্ঘটনাজনিত ব্লাস্ট না বম্ব প্ল্যান্ট করা হয়েছিল-তা আজও জানা যায়নি। ইনফ্যাক্ট পুলিশ অফিসারের দেহটাই পুরোটা পাওয়া যায়নি। ব্লাস্টে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। শনাক্ত করাই যায়নি! যা দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল তার ডিএনএ টেস্ট করে মৃতের পরিচয় বের করতে হয়েছে। আর লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট বেঙ্গালুরুর দু-জন পুলিশ অফিসারের গায়ে সেই ভয়াবহ জ্বলন্ত টায়ার ছিল। আমি শিওর, তাঁদেরও ভিকটিমদের মতোই মারা হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, কয়েকটা পোড়া হাড়ে একটু পোড়া মাংস ছাড়া আর বিশেষ কিছু ছিল না ওদের গায়ে। উর্দিটা নেহাৎ পুড়ে গিয়ে মাংসের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল বলে ওঁদের পুলিশ অফিসার বলে শনাক্ত করা গিয়েছিল! সম্পূর্ণ পরিচয়ের জন্য ফের ডিএনএ টেস্ট।”
অধিরাজ তাঁর ভাষণ শুনে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তারপরই কথা নেই বার্তা নেই ভদ্রলোকের হাত থেকে সিগারেটটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “থ্যাংকস ফর দ্য মোটিভেশন।”
“তোমায় মোটিভেট করছি না গর্দভচন্দ্র।” বুড়ো এবার খ্যাঁক করে উঠল, “স্রেফ সতর্ক করে দিচ্ছি। অন্তত এই কেসের ক্ষেত্রে মরে গেলেও বাইরের খাবার-জল-চা-কফি কিচ্ছু খাবে না, কেউ যদি কিছু ছোঁড়ার মতো পোশ্চারে থাকে তবে সেখান থেকে পালিয়ে যাবে, কারণ ছোঁড়ার জিনিসটা বলও হতে পারে, অ্যাসিড বাল্বও হতে পারে। গাড়ি সাবধানে চালাবে, হাঁই হাঁই করে র্যাশ ড্রাইভিং করবে না। আর পারলে সবাই সবাইকে প্রোটেক্ট করবে। যদি কোনো মুহূর্তে কেউ কেশে ওঠে সেক্ষেত্রেও অ্যালার্ট থাকবে। এখানে খুনির পার্সোনাল ফেভারিট কেউ নেই। সে তোমাদের মধ্যে যাকে খুশি অ্যাটাক করতে পারে, তাই সবাই সতর্ক থাকলে ভালো হয়। বাকিটা ভগবান জানেন।” তিনি আস্তে আস্তে যেন নিজের মনেই বললেন, “জানি না আরও কত লাশ দেখতে হবে! বাহাত্তর ঘণ্টাও আর নেই! আর মাত্র সাতষট্টি ঘণ্টা! বড়ো কম সময়… বড়ো কম সময়…!”
বলতে-বলতেই কেমন যেন অন্যমনস্ক পায়ে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেলেন ডঃ চ্যাটার্জি।
