(২৫)
অনেকক্ষণ ওরা কেউ কোনো কথা বলেনি।
অর্ণব আর টুইঙ্কল এখন কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে। অবশ্য টুইঙ্কলের চাঙ্গা হতে আটটা চিকেন ক্লাব স্যান্ডউইচ, দু-গ্লাস হট চকোলেট ও চারটে চুরুট লেগেছে। কিন্তু অর্ণব প্রথমে কিছুই মুখে তুলতে পারছিল না। অধিরাজ উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে যতবার কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, ততবারই সে নঞর্থক ভাবে ঘাড় নেড়েছে। একটু লিকার চা খাওয়ার চেষ্টা করেছিল। অথচ তরলটা দেখেই মনে হল, ওটা চা নয়। কাঁচা রক্ত গ্লাসে ভাসছে! কিছুতেই সে চা পান করতে পারল না। বরং হাত কাঁপছিল তার। মনে হচ্ছে, মানুষের ওই চটচটে রক্তাক্ত অস্ত্রটা বুঝি এখনও তার হাতে লেগে আছে। তার দুর্গন্ধ কিছুতেই পেছন ছাড়ছে না। অধিরাজ সেটা লক্ষ্য করেই বোধহয় কোথা থেকে নীরবে ব্রেড আর দুধের গ্লাস নিয়ে এসেছিল। দুধের সাদা রংটাই শেষপর্যন্ত বাঁচাল অর্ণবকে।
“থ্যাংকস স্যার…!” সে একটু হাসার চেষ্টা করে, “মিস আ লট।”
অধিরাজের চোখে কৌতুক, “এনি টাইম স্পেশাল ওয়ান!”
অর্ণব হেসে ফেলেছিল। তারপর থেকে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। পবিত্র ও নিজের রক্তাক্ত ধড়াচুড়ো সব পালটে নিজেকে সাফ করে নিয়েছে। এইমুহূর্তে ওরা আর্বানার দিকে যাচ্ছে। গুরশীল ও আমনদীপকে বাজিয়ে দেখাই আপাতত ওদের মূল উদ্দেশ্য। তার সঙ্গে বাকিদেরও একটু দেখে নেবে। সকালের ঘটনাটা অধিরাজ আশা করেছিল কিনা কে জানে, কিন্তু বাকি তিন অফিসার দুঃস্বপ্নেও এমন আশঙ্কা করেনি। পবিত্র কখনোই কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। তাই সে অতটা ধাক্কা খায়নি। কিন্তু অর্ণব একেবারে ভেতর অবধি কেঁপে গিয়েছে! ওই শূন্য ঘরে এমন কী ছিল যে গোটা বাড়িটাকেই আগুন লাগিয়ে দিতে হল। যে পুলিশকর্মীরা পাহারা দিচ্ছিল, তারাই-বা কী অপরাধ করেছে যে অমন নৃশংসভাবে তাদের মারতে হবে। ইসমাইল বা সনৎকে তবু চেনা যাচ্ছিল। এদের তো চেনাই দায়! অধিরাজের ক্ষমতা আছে বলতে হবে যে সে লোকাল পুলিশদের সঙ্গে ওই রক্তে ভাসা ক্রাইমসিন ঘুরে ঘুরে দেখছিল ও অভ্যস্ত হাতে এভিডেন্স কালেক্ট করার চেষ্টা করছিল। বেশ কয়েকটা রক্তমাখা শূন্য চায়ের কাপ রীতিমতো ভুরু কুঁচকে তুলে তুলে পরীক্ষা করে দেখে এভিডেন্স ব্যাগে ভরেও নিল। তার হাতের সাদা গ্লাভসটা পুরো লাল! পবিত্র-র মতো লোকেরও অতখানি সাহস হয়নি। লোক্যাল পুলিশ টিমকে দেখে মনে হচ্ছিল যে তারা ওখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে। নেহাৎ স্বয়ং আই জি, হোমিসাইড কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে ক্রাইমসিন পরীক্ষা করছেন দেখে তারাও বাধ্য হয়ে মাঠে নামল। নয়তো স্রেফ উলটো দিকে পিটটান দিলেও আশ্চর্যের কিছু ছিল না।
ফায়ার ব্রিগেড যতক্ষণে অতি কষ্টে গোটা বাড়ির আগুন নেভাল, ততক্ষণে ভেতরে আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট ছিল না। আততায়ী একটা জানলা কেটে ভেতরে ঢুকেছিল। পেট্রোলের গন্ধে বুঝতে বাকি নেই যে আগুনটা ঠিক কেমন করে লেগেছে। ঘরে যা যা ছিল সবই পুড়ে ছাই! এভিডেন্স বলতে আর কিছু পড়েই নেই। ফার্নিচার থেকে শুরু করে ইলেক্ট্রিক্যাল গ্যাজেট—কিছুই অক্ষত নেই। অধিরাজ তবু একবার অক্ষম একটা প্রচেষ্টা চালাল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। নাঃ, এই সিন থেকে কিচ্ছু বোঝা সম্ভব নয়। তৃতীয় দিনের শুরুতেই বার্নিং শিখ পেল্লায় একটা ছক্কা হাঁকিয়ে দিয়েছে। তাকে আর পবিত্রকে শেষ করতে না পারার রাগে, সাময়িক হারের জ্বালায় সে চরম নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। গুল্লুকে আরও একটু আগে সতর্ক করতে পারলে হয়তো এই ট্র্যাজেডিটা আটকাতে পারত। অথচ ঠিক তখনই ক্লোরোফর্মের নেশায় পড়ে ছিল অধিরাজ। সেই সুযোগেই যা করার লোকটা করে দিয়ে গেল। ক্রাইম সিন লোকাল পুলিশ টিম সিকিওর্ড রেখেছিল। কেউ ভাবতেই পারেনি যে অ্যাটাকটা এদিক দিয়ে আসবে!
তারপর থেকেই সরাসরি গুল্লুর সঙ্গে কন্ট্যাক্টে আছে অধিরাজ। গুল্লু জানিয়েছে, যাঁকে নজরে রাখা হচ্ছে, তিনি এখনও বাড়ি থেকেই বেরোননি। তার ছেলেপুলে লেগে আছে তাঁর পেছনে। একজন নয়, অনেকজন নজর রাখছে। ওরা আশেপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছে যে তিনি সারারাত বাইরেই ছিলেন এবং ভোরে ফিরেছেন। তারপর থেকে বাড়িতেই আছেন। এখনও কোনো নড়াচড়া নেই।
এর মধ্যেই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো লোকে, ওই বীভৎস ক্রাইমসিনের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে শুরু করে দিয়েছে। সকাল সকাল যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুলে বসেছিলেন, তাঁদের সকলের আক্কেল গুড়ুম। সকালের চা-ব্রেকফাস্ট আর খেয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা। ওই দৃশ্য দেখার পর কিছু মুখে দেওয়া সম্ভবই নয়। লোকে জানে, তবু পোস্ট করবে। মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই ভাইরাল! ইউটিউবাররাও প্রথমে রিপোর্টিং শুরু করেছিল, ‘এই দেখুন, রক্তে ভেসে যাওয়া ক্রাইমসিন!… ওই দেখুন কাটা হাত-পায়ের স্তূপ…’ বলে। কিন্তু পুলিশ ডান্ডা উঁচিয়ে তাড়া করতেই আপাতত পালিয়ে গিয়েছে। গোয়েন্দা দপ্তর, সাইবার টিম কোনোমতে সামাল দিয়েছে ঠিকই। ভিডিও এবং ছবিগুলোও আপাতত উড়ে গিয়েছে। তবে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে এর মধ্যেই। বার্নিং শিখের কাজের বীভৎসতায়, আতঙ্কে ফের কলকাতার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম!
একেই একদিকে প্যানিক যতটা সম্ভব ছড়িয়ে গিয়েছে। এডিজি সেনের নাভিশ্বাস উঠছে প্রেস কনফারেন্স করতে-করতে। বেচারা শিশির সেন বারবার অনুরোধ করছেন, মানুষ যেন অযথা প্যানিক না করে। এটা কোনোরকম আতঙ্কবাদী অ্যাটাক নয়, কিংবা উগ্রপন্থীদের সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই। কিন্তু সাংবাদিকরা মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য খোদ পুলিশের গাড়িতে বম্বিং, প্রকাশ্য রাস্তায় ফায়ারিং, জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারের বিস্ফোরণ হতে হতে বাঁচা, গণহারে হত্যা হওয়ার পরও কী করে সি.আই.ডি., হোমিসাইড সবাইকে শান্ত থাকতে বলতে পারে। কে বলতে পারে এরপর হয়তো রাস্তার মধ্যেই কিলোদরে বিস্ফোরণ হতে শুরু করবে। এডিজি সেন তাদের আশ্বস্ত করতে-করতে প্রায় গলদঘর্ম হয়ে উঠেছেন। মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে, আর মিডিয়া ভয় দেখাতে। বার্নিং শিখের কাণ্ডকারখানায় আর কিছু না হোক, টি আর পি চড়চড়িয়ে উর্ধ্বগামী।
“তুমি গুল্লুকে কাকে স্টক করতে বললে রাজা?”
অনেকক্ষণের নিস্তব্ধতা ভেঙে অবশেষে পবিত্র বলে ওঠে, “বার্নিং শিখের কোনো লিঙ্ককে? ওই ভদ্রলোক, কী যেন নাম…. মনে পড়েছে, জগদীপ সিং ভাট্টিকে?”
“না।” সে খুব শান্তস্বরেই উত্তর দেয়, “তিনি অলরেডি বিশ্ব-র র্যাডারেই আছেন। কাল রাতে কোথাও যাননি। সারা রাত বেচারা বিশ্বজিৎ ওঁর নাসিকাগর্জন শুনেই কাটিয়েছে। আজ সকালে দুধ-কর্নফ্লেক্স খেয়ে ব্রেকফাস্ট করেছেন। এখনও বাড়িতেই বসে মিটিং-এর তোড়জোড় করছেন। গুল্লুর টিম ওঁকে স্টক করছে না। তারা খোদ বার্নিং শিখকেই ম্যান টু ম্যান মার্কিং-এ রেখেছে।”
“কী!” পবিত্র প্রায় লাফিয়ে ওঠে, “বার্নিং শিখ কোথায় আছে সেটা তুমি জানো?” “শুধু আমি কেন?” সে জানায়, “তোমরা সবাই জানো।” “আমরা সবাই!”
“জানা তো উচিত।” অধিরাজ নির্লিপ্ত মুখে বলে, “সব তোমার চোখের সামনে আছে, শুধু দেখে নাও৷”
“চোখের সামনে আছে মানে? চোখের সামনে আছেটা কী?” পবিত্র স্তম্ভিত, “তুমি যা দেখছ, আমরাও তাই দেখছি। তুমি যা জানছ, আমরা সবাই তাই জানি! তুমি একা কোথাও যাওনি, কারোর সঙ্গে কথা বলোনি, আমরা কেউ-না কেউ তোমার সঙ্গে ছিলাম। তাহলে একা তুমিই টের পেলে কী করে? আমরা তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না!”
“বউদি আর সানি লিওনি চোখের সামনে থেকে সরবেন, তবে তো দেখতে পাবে।” সে মৃদু হাসল, “নয়তো তুমিও জানতে, হোয়্যার টু গো অ্যান্ড হোয়াট টু ডু।”
“তার মানে তুমি সব জানো! কে এই বার্নিং শিখ?”
একা পবিত্র নয়, টুইঙ্কলও এখন বিস্মিত দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকেই দেখছে। ওদের সবার কাছেই এটা একটা চরম বিস্ময়। শুধু অর্ণব আগে থেকেই জানত যে সে কিছু আন্দাজ করেছে। কিন্তু প্রমাণাভাবে কিছু করে উঠতে পারেনি। কিন্তু কী আঁচ করেছে, কীভাবে করেছে—তা তার জানা নেই। সে জানে, সময় এলেই স্যার সব খুলে বলবেন।
“দুর্ভাগ্যবশত সবটা জানি না।” তার মুখে এবার একটু চিন্তা, “একটা পাজলের উত্তর এখনও পাইনি। সেটা পেলেই আর কিছু অজানা থাকবে না। তবে আমার জানা যথেষ্ট নয়, আইনের জানা বেশি জরুরি। নয়তো আজকাল সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সও তেমন স্ট্রং প্রমাণিত হচ্ছে না। জজসাহেব তো বলার জন্য বসেই আছেন, “বেকসুর খালাস!”
“আমরা কিছুটা হলেও মোক্ষম এভিডেন্স পেয়েছি।”
“পেয়েছি পবিত্র। সেটা বার্নিং শিখও জানে। সেজন্যই এত খেপেছে!” অধিরাজ একটু চিন্তিত, “সে এটাও জানে যে এই এভিডেন্সগুলো তখনই লাগবে যখন আমরা তাকে কোর্টে তুলব। তার আগেই সে নিজের কাজ শেষ করে কেটে পড়বে।”
“কিন্তু লোকটা কে? নাম কী?”
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “নামটা বহুবার তোমরা শুনেছ। গুলশন সিং ওরফে গুল্লু। একটি কথাও সে নিজের সম্পর্কে মিথ্যে বলেনি।”
“কিন্তু সিনে তো এই গুলশন সিং নামক ব্যক্তিটি ছাড়া বাকি সবাই আছে। গুল্লু একটাই আছে, কিন্তু সে গুলশন সিং নয় গুলাব সিং। গোটা কলকাতাই আছে, মনুমেন্ট আছে, হাওড়া ব্রিজ আছে, ময়দান ভিক্টোরিয়াও আছে, পিসি-ভাইপো সবাই উপস্থিত—শুধু সে ব্যাটাই নেই।” পবিত্র মহা বিরক্ত, “এ তো মহা বিপদ। যে লোকটাকে চোখেই দেখা যায় না, উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না, তুমি তার দিকে আঙুল তুলছ। এ তো ঘোস্ট মার্ডারার দেখছি! তুমি কি বাতাসের পেছনে দৌড়চ্ছ?”
“কমলার পেছনে দৌড়ে তোমার তাকে বাতাস বা ঘোস্ট বলে মনে হয়েছে বুঝি?” সে ঠোঁট টিপে হাসল, “বেশ…বেশ…।”
পবিত্র আর কিছু বলল না। সে খুব ভালোভাবেই জানে যে বলে কোনো লাভ নেই৷
তাছাড়া ততক্ষণে ওদের গাড়ি আর্বানার বিশাল গেট দিয়ে ঢুকছে। তার মনে প্রশ্ন অনেক, কিন্তু আপাতত চেপে গেল। এখন টার্গেট গুরশীল ও আমনদীপ। কে জানে, ওদের কথাই বলছে কিনা। আত্রেয়ী কিছুক্ষণ আগেই ইনফর্ম করেছে যে ওরা ফ্ল্যাটেই আছে। এখনও কেউ বেরোয়নি। বাকি বাসিন্দারাও আছেন।
এখনও পর্যন্ত যতবার এখানে এসেছে অর্ণব, ততবারই তার মন খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। বড়ো সুন্দর এই কমপ্লেক্সের পরিবেশ। চতুর্দিকে সবুজের ঢল দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়, মন প্রশান্তি পায়। এমন জায়গায় থাকতে পারলে বোধহয় মন খারাপ নামক বস্তুটা কাউকে স্পর্শই করবে না। মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ ভুলে যাবে যে তারা ইট-কাঠ-পাথরে ভরা কলকাতা শহরে আছে। এমনও ভুল হয়, যে হয়তো আশেপাশেই কোনো অরণ্য রয়েছে, অথবা শান্ত নদী কুলকুলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ‘হোম সুইট হোম’ বোধহয় একেই বলে। একদম শান্তির স্বর্গ।
অথচ সেই স্বর্গটাই এখন অসুরের দখলে! আর্বানার সিকিউরিটি নিয়ে কোনো প্ৰশ্নই ওঠে না। অসম্ভব কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্য দিয়ে মাছিও গলতে পারবে না। অধিরাজদেরই বারবার নিজেদের আই ডি দেখাতে হয়। কিন্তু যখন শয়তানটি বার্নিং শিখের মতো চতুর, তখন তাকে আটকানো একরকম অসাধ্যই। সে একেবারে ভেতরে ঢুকে বসে আছে। বাইরে থেকে কিছু করার উপায় নেই।
এতক্ষণে এখানকার সকালও রুটিনমাফিক শুরু হয়ে গিয়েছে। কর্মীরা কাজ করতে ব্যস্ত। লনে, ঘাসে, ফুলগাছে জল দেওয়া হয়েছে একটু আগেই। স্বচ্ছ জলবিন্দু এখনও ঘাসের বুকে ঝিলিক মারছে। সদ্য ফোটা ফুলের নিষ্পাপ মুখে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে যেটা স্বস্তিদায়ক, সব কিছুই এখানে বড়ো নিঃশব্দে ঘটে। শহরের কোনোরকম কোলাহল, কোনোরকম দূষণ স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু মানুষের মনের দূষণ, অশান্তি কোথায় যাবে!
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা সবাই দ্রুত ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটের সামনে হাজির। কলিংবেল বাজাতেই মিস্ দত্ত উকি মারল। সে প্রস্তুত হয়েই বসেছিল। অধিরাজকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, আপনি কেমন…!”
“ঠিক আছি।” সে তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দ্রুত প্রশ্ন করল, “গুরশীল?” আত্রেয়ী অঙ্গুলিনির্দেশে দেখিয়ে দিল ফ্ল্যাটটা। গলা নামিয়ে বলল, “ঘরে আছে।” “আপনি সবার পেছনে আসুন।” অধিরাজ নির্দেশ দেয়, “যদিও ছবি দেখেছি। তবু চিনতে বা বুঝতে না পারলে সাবটাইটেল দিয়ে দেবেন।”
মিস্ দত্ত ফিক্ করে হেসে ফেলেছে, “ওকে স্যার।”
ওরা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে গুরশীল-আমনদীপের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অধিরাজ একটা শ্বাস টেনে টুইঙ্কলের দিকে তাকিয়েছে, “আপনার হাতের খবর কী? সে আজ কুচুপুচু করতে চাইছে, না গোলুগোলু সেনোরিটা?” “দুটোই।”
‘কুচুপুচু’ আর ‘গোলুগোলু’ শুনে টুইঙ্কল এখন ফুল চার্জড হয়ে গিয়েছে। সে দ্রুতবেগে হাতা গুটিয়ে নিচ্ছে, “শুধু একবার বলে দেখুন স্যার।”
“বলব।”
তার দৃষ্টি এবার অর্ণবের দিকে ফেরে। ইশারাটা বুঝেই অর্ণব কলিংবেলের ওপর ফুলফোর্সে চাপ দিল। পুলিশ কখনোই বন্ধ দরজার সামনে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে অভ্যস্ত নয়। তাই সে বারংবার ডোরবেল বাজাতেই থাকল যাতে ভেতরে থাকা মানুষের কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এই টেকনিকটা সম্প্রতি টুইঙ্কলের কাছ থেকেই শিখেছে। একদম তাকে নকল করেই বেলটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মিস্ অরোরা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “টু-উ গুড পা-জি!”
অর্ণব মুখ টিপে হাসে, “থ্যাঙ্কস্ মিস্।”
“আরে, কে বেল বাজাচ্ছে!”
ভেতর থেকে একটা বিরক্তিমাখা পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আসছি তো। দো মিনিট ইয়ার। হু ইজ দিস?”
পবিত্র এবার অর্ণবকে সরিয়ে দুমদাম করে দরজা পিটিয়ে বলে, “ডেলিভারি ম্যান।” তার ডায়লগ শুনে অধিরাজ নিজেই ব্যোমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার দিকে। তার চোখে বিস্ময় আর প্রশ্ন, “ডেলিভারি ম্যান! বলার জন্য তুমি এটাই পেলে?” পবিত্র অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকোয়, “ইয়ে… মানে ম্যাডামের ডেলিভারির টাইম হয়ে গেছে কিনা!”
কী ভয়াবহ যুক্তি। অধিরাজ তাকে আর কিছু বলার আগেই দরজা সশব্দে খুলে গিয়েছে। সামনে একজন চকচকে যুবক। ফর্সা, লম্বা। সুদর্শন বলাই যেত, তবে চোয়ালটা ভারি হওয়ার দরুণ একটু অদ্ভুত দেখতে লাগে তাকে। পেছন দিক দিয়ে আত্রেয়ীর চাপা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল অর্ণব, “আমনদীপ।”
আমনদীপ একটু অবাক হয়ে ওদের সবার দিকে তাকায়, “ডেলিভারি? কীসের ডেলিভারি? আমরা তো কিছু অর্ডার করিনি।”
অধিরাজ তাকে প্রায় অসভ্যের মতোই এক ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকে পড়ল, “স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে আসছি। আমাদের কাছে খবর আছে যে আপনার স্ত্রী বা গার্লফ্রেন্ড প্রেগন্যান্ট অবস্থায় সিগারেট টানছেন, ড্রাইভিং করছেন এবং অনেক সময় লিফটের জায়গায় সিঁড়িও ভাঙছেন। আপনি কি জানেন এগুলো বিপজ্জনক? সেজন্যই আমরা এসেছি।”
“কিন্তু… আপনারা…
আমনদীপের চোখ এমনিতেই কপালে উঠেছিল। সে আমতা আমতা করে বলে, “স্বাস্থ্যবিভাগের কোন্ শাখা থেকে…?”
“নতুন স্কিম।” অধিরাজ দুষ্টু হাসল, “দুয়ারে ডেলিভারি। শোনেননি?”
“হোয়াট?”
“আপনার বান্ধবী কোথায়? তাঁকে দেখছি না তো?” সে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এসেছে। চোখের ইঙ্গিতে টুইঙ্কলকে এগিয়ে আসার ইশারা করে, “আমরা ওঁর জন্য স্পেশাল লেডি ডক্টরও নিয়ে এসেছি। ফর চেক আপ। ডঃ অরোরা, আপনি রেডি?”
ডঃ অরোরা হাতা গুটিয়ে বলল, “ইয়েস স্যার….!”
“পেশেন্ট মনে হয় বড়োই লাজুক। একটু সার্চ করে দেখুন তো তিনি কোথায় গেলেন। এসেছি যখন, কাজটাও করেই দিয়ে যাই।”
আমনদীপের মুখ ফ্যাকাশে। তার নজরে সন্দেহ, “আপনারা কারা?”
অধিরাজ ফের পেটেন্ট দুষ্টু হাসিটা হাসল, “বললাম তো। দুয়ারে ডেলিভারি। সোশ্যাল সার্ভিস। আমরা বাধ্যতামূলকভাবে মানুষের সেবা করে থাকি। সেবা চাইলে করি। না চাইলে তো আরও বেশি করি। আপনি চান আর না চান, আমরা আর্তদের সেবা করেই তবে ছাড়ব। আমরা দেশসেবী রণক্লান্ত, আমরা কিছুতে দেব না ক্ষান্ত পরিষেবা নেবেন না মানে? দিয়েই ছাড়ব। অবশ্য অনেকে আমাদের গালাগালি দিয়ে ‘সি.আই.ডি. হোমিসাইডও’ বলে।”
এইবার আমনদীপের শান্ত, সহজ, সরল চেহারার মুখোশ সরে গিয়ে একটা হিংস্র মুখ বেরিয়ে এল। সে শুধু বলল, “পুলিশ?”
“রাইট ইউ আর।”
“কিন্তু এখানে আপনাদের কী দরকার?” কেটে কেটে বলল আমনদীপ, “এখানে কোনো ইল্লিগ্যাল বিজনেস্ হচ্ছে না। এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার এখন লিগ্যাল।” অধিরাজ আরও এককাঠি সরেস। সে একেবারে নিরীহভাবে বলে, “আমরা আপনার পার্সোনাল ম্যাটারে হস্তক্ষেপ করতে আসিনি স্যার। আপনি একডজন এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার করুন না। এমনকি আপনাদের সন্তানও বৈধ। একটা গোটা দেশের জনগণের জন্ম দিলেও আপত্তি নেই। আমাদের শুধু একটা বিষয়েই কৌতূহল।
আপনার বান্ধবী প্রেগন্যান্ট। অথচ তিনি রোজ একাধিকবার দাড়ি কামাচ্ছেন। একেবারে কিলোদরে গাল শেভ করছেন। এ কীরকম কথা। দুটো তো একসঙ্গে হতে পারে না। এরমধ্যে আসলে কোনটা, সেটাই দেখার। বিশ্বাস করুন, চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করেই চলে যাব। মিস্ অরোরা… প্লিজ সেনোরিটা?”
টুইঙ্কল আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে গটগটিয়ে হেঁটে চলে গেল। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে দেখে আমনদীপ এবার ফোঁস করে ওঠে, “আপনারা একজন শিখ মহিলার প্রাইভেসি এভাবে নষ্ট করতে পারেন না। এটা আমাদের ধর্মে আঘাত করা। আমি আপনাদের বিরুদ্ধে কেস করব।”
“অন হোয়াট গ্রাউন্ড!” সে সবিস্ময়ে বলে, “আমরা পুরুষেরা ওঁকে হাতও লাগাচ্ছি না। আইন অনুযায়ী আমাদের লেডি অফিসার পরীক্ষা করে দেখবেন। আমরা জাস্ট একটা ‘ওয়েলনেস চেক’ করছি। সেটা বিদেশেও পুলিশরা করে। এখন অনুপ্রেরণার জমানা চলছে কিনা। তাই আমরাও অনুপ্রেরিত হয়েছি।”
“কে বলেছে আপনাদের ওয়েলনেস চেক করতে?” আমনদীপ গর্জন করে ওঠে, “আপনাদের হেল্প লাগবে না আমাদের।”
সে সখেদে মাথা নাড়ে, “আজব মানুষ তো আপনি মশাই! পুলিশ হেল্প না করলে অভিযোগ, কেন পুলিশ হেল্প করে না? আবার করলেও জানতে চাইবেন কেন পুলিশ হেল্প করছে। অদ্ভুত ভূতুড়ি!”
“কিন্তু তাই বলে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলাকে ডিস্টার্ব করবেন?”
“ডিস্টার্ব কোথায় করছি?” অধিরাজ আহত গলায় বলল, “আমরা এত কষ্ট করে ওঁর জন্য স্পেশাল লেডি ডক্টর খুঁজে আনলাম। উড বি মাদারের স্বাস্থ্য পরীক্ষাই তো করতে চাইছি। খবর নিয়ে জানলাম, এতদিনে উনি একবারও গাইনোকলজিস্টের কাছে যাননি। সেজন্যই ছুটে এলাম। আপনি এমন করে বলতে পারলেন! একটুখানি হেল্প ও করতে দেবেন না?”
“বাট্…!”
সে আরও কিছু বলার আগেই ভেতরের ঘর থেকে টুইঙ্কল প্রায় গুরশীলের ঘেঁটি ধরে অবিকল একটা বিড়ালছানার মতো ঝোলাতে ঝোলাতে নিয়ে এল। উপস্থিত সকলেই সবিস্ময়ে দেখল গুরশীল নামক মহিলার মাথায় একটাও চুল নেই। সেখানে আস্ত টাক! তার সমস্ত চুলটাই এখন টুইঙ্কলের বাঁ-হাতে ঝুলছে। অধিরাজ আঁতকে ওঠে, “ইরক্। মিস্ অরোরা, করেছেন কী। আপনি ওঁর মাথার সব চুল টেনেই তুলে ফেলেছেন!”
“স্যার।” সে কাঁচুমাচু মুখে জানায়, “আমি শুধু অল্প একটু টেনেছিলাম। কী করব? উনি আসতেই চাইছিলেন না। তার ওপর মুখের ওপর আস্ত অ্যাশট্রে ছুড়ে মেরেছেন। ভাবলাম, চুল ধরে টেনে আনাই সবচেয়ে ভালো অপশন। বিশ্বাস করুন, আমি ঠিকমতো টানও মারিনি। একটু ছুঁয়েছি মাত্র। তাতেই পুরো চুল খুলে হাতে চলে এল।” অধিরাজ একঝলক গুরশীলের অবস্থা দেখল। সে বাঘের থাবায় লটকে থাকা ইঁদুরের মতো ঝুলছে। মাঝেমধ্যে শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু সবটাই ব্যর্থ। টুইঙ্কল তাকে দিব্যি একহাতে লিফট করে ধরে আছে। অধিরাজ গম্ভীরমুখে বলে, “মিস্ অরোরা, এমন দুরবস্থা তো দুঃশাসনও দ্রৌপদীর করেননি। তিনিও চুল ধরেই টেনে এনেছিলেন। তাতে দ্রৌপদী ওঁর বুকের রক্তে চুল ধোয়ার আগে চুল বাঁধেননি। কিন্তু তাঁকেও টাকলু হতে হয়নি! না বাঁধার জন্য অ্যাটলিস্ট মাথায় চুল বাকি ছিল। আপনি তো সে অপশনও…!”
মিস্ অরোরা তার হাতের চুলের গুচ্ছ অধিরাজের দিকে ছুড়ে দিয়েছে, “কারণ দ্রৌপদী উইগ পরতেন না। এটা উইগ স্যার। ইনি তো পুরো ‘উজড়া চমন।” “সে কী!”
তার কৌতুকমাখা সহাস্য চোখ এবার আমনদীপের দিকে ঘুরল। সবিস্ময়ে জানতে চাইল, “আপনি কি আপনার ডার্লিং এর এই নতুন হেয়ারস্টাইল সম্পর্কে জানতেন? উনি কি বলেছেন যে পার্লারে গিয়ে গুচ্ছের টাকা গচ্চা দিয়ে এই অবাক পৃথিবী কাট কেটেছেন? মেয়েরা হেয়ার স্ট্রেট করায় জানতাম, ইনি তো গোটা মুণ্ডুটাই স্ট্রেট করে ফেলেছেন।”
আমনদীপ উত্তর দেবে কী! সে তখন কুলকুল করে ঘামছে। ফরসা মুখ রাগে লাল। কোনো কথাই তার মুখ দিয়ে বেরোল না। ওদিকে গুরশীল বেগতিক দেখে লম্বা লম্বা নখ দিয়ে টুইঙ্কলকে আঁচড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। লেডি অফিসার প্রথম দু-একবার তার খামচা চুপচাপ সহ্য করল। তারপর একটা নখ লেগে তার গাল ছড়ে যেতেই তাকে মেঝেতে ফেলে তার হাত চেপে মুচড়ে ধরল। গুরশীল খ্যাঁচাকলে পরে কাতরে ওঠে। টুইঙ্কল দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “তেরি তো… 1 সালি, নাখুন চালায়েগি? দেখুন স্যার, কীরকম ভ্যাম্পায়ারের মতো নখ রেখেছে…!”
সে বেচারি গুরশীলের নখ সর্বসমক্ষে প্রদর্শন করার জন্য নখসুদ্ধ আঙুলটা চেপে ধরেছিল। কিন্তু ফের অঘটন। তার চাপের ঠ্যালায় গোটা নখটাই উপড়ে উঠে এল। অধিরাজ চোখ কপালে তুলে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে, “চুলের পর এবার নখও গেল। আপনি কি ওঁকে পার্ট বাই পার্ট ডিম্যাট্ল করতে চাইছেন? মিঃ আমনদীপ তো বিধবা হবেন। ওঁর সুহাগের কী হবে?”
আত্রেয়ী এতক্ষণ অর্ণবের পেছনে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল। এবার অর্ণবকে চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করল, “এই ছোটা ভীম কি আমাদের নতুন কলিগ?”
অর্ণব হেসে ফেলে, “আজ্ঞে। এই কেস থেকেই জয়েন করেছেন। আশা করছি ভবিষ্যতেও থাকবেন।”
আত্রেয়ী আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যায়। টুইঙ্কল ততক্ষণে গুরশীলের হাত চেপে ধরে তার নখ উৎপাটনে ব্যস্ত। কোনো কথা না বাড়িয়ে একেবারে টপাটপ বাকি ন-টা নখও তুলে নিয়ে দেখাল অধিরাজকে, “একটাও আসল নয়। এগুলো সব ফেক স্যার। আজকাল নতুন স্টাইল উঠেছে আর্টিফিশিয়াল নেইল রাখার। আর সেই আর্টিফিশিয়াল নখ দিয়ে তুই আমায় খোঁচাচ্ছিলি পেত্নী কোথাকার…।”
“কিউরি’ অ-সা-র অ্যান্ড কিউরি’ অ-সা-র!” অধিরাজ ডানহাতের তর্জনী দিয়ে চিবুকের ভাঁজটা ঘষল, “ওঁকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে। বাকি বডি পার্টসগুলো আসল না নকল সেগুলোও দেখে নিন একবার।”
“গোলুগোলু স্যার?”
সে মাথা ঝাঁকায়, “একদম র্যাম্পার্ট গোলুগোলু।”
“চল্ বেটা। তেরা নম্বর আ গয়া!”
টুইঙ্কল এবার একেবারে ঠেসে ধরেছে গুরশীলকে। গুরশীলও ছাড়ার পাত্র নয়। সে টুইঙ্কলের চেয়ে বেঁটে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল হাত-পা চালাতে ওস্তাদ। বেচারার মিস্ অরোরাকে বুঝতে একটু ভুল হয়েছিল। ওই হাত তো বোধহয় ‘গদর’ ফিল্মের সানি দেওলের মতো আস্ত হ্যান্ডপাম্প একটানে তুলে অভ্যস্ত! মানুষ আর কী জিনিস সে বেশ কয়েকবার এদিকে ওদিকে তুলে গুরশীলকে অনায়াসে পারফেক্ট ‘ধোবি পছাড় মারল। তারপর র্যান্ডম থাপ্পড় কষাতে কষাতে বলল, “ফাজলামির জায়গা পাস না! অ্যাশট্রে ছুড়ে মারবি, আঁচড়ে রক্ত বের করে দিবি, ঘুষি মারবি। লোকে আমাদের মামা বলে, তাই ‘মামাবাড়ির আবদার’ পেয়েছিস টাকলা পুতনা রাক্ষসী?”
সবাই যখন গুরশীল আর টুইঙ্কলের যুদ্ধ দেখতে ব্যস্ত ছিল, তখনই আমনদীপ সুযোগ পেয়ে বিদ্যুৎবেগে টেবিলের ড্রয়ার খুলে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এনেছে। তার প্রথম লক্ষ্য মিস্ অরোরাই ছিল। কিন্তু কিছু করার আগেই রিভলবার ধরা হাতটায় একটা জোরদার মার খেয়ে কাতরে উঠেছে সে। ঘুষিটা এতটাই মারাত্মকভাবে পড়েছে যে তার হাত থেকে কাঁধ অবধিই যেন অবশ হয়ে গেল। পরক্ষণেই সবিস্ময়ে দেখল, সে নিজেও শূন্যে ভাসছে। পা দুটো হাওয়ায়! একটা চরম শক্তিশালী হাত তার কলার ধরে টেনে তুলে ধরেছে ওপরে। নাকের সামনে একটা অনিন্দ্যসুন্দর হাসিমাখা মুখ। সে মাথা নেড়ে আক্ষেপসূচক আওয়াজ করে খুব শান্তভঙ্গিতে বলল, “নাও, দ্যাটস রিয়েলি চিটিং মিঃ আমনদীপ! একে তো মিস অরোরা গুরশীল কৌরের সঙ্গে হিসাব বুঝছেন। ওঁরা দু-জন দু-জনকে বুঝে নেবেন। দু-জনের মল্লযুদ্ধের মধ্যে আলটপকা তৃতীয়জনের ঢোকা একেবারেই উচিত নয়। ওটা নীতিবিরুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, শত্রুকে পেছন থেকে আক্রমণ করা, পিঠে গুলি মারা কাপুরুষের কাজ। আপনার হাতাহাতি করার শখ হলে আমরা আছি তো! বললাম না, পরিষেবা দিয়েই ছাড়ব!”
টুইঙ্কল অধিরাজের বক্তব্য শুনে গুরশীলের পিণ্ডিপাঠ করা থামিয়ে এদিকেই তাকিয়েছিল। তাকে বিরতি দিতে দেখে অধিরাজ মুখ ফিরিয়ে অবিকল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো ভেলভেটি ভয়েসে বলল, “আঃ! থামলেন কেন? বা-জা-ন!”
“ইয়েস স্যার…।”
সে আবার গুরশীলের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ধস্তাধস্তি, ঘুষোঘুষি, চড়-চাপাটি ফের চালু হয়ে গেল। অধিরাজ এবার ভারি সুন্দর গ্রীবাভঙ্গি করে ডানদিকের ভুরুটা সামান্য তুলে তাকায় আমনদীপের দিকে, “হ্যাঁ… আমরা যেন কোথায় ছিলাম?”
“দিস ইজ ইলিগ্যাল…!” আমনদীপ হিসহিস করে বলল, “এভাবে একজন সম্মানিত নাগরিককে বিরক্ত করতে পারেন না আপনি। আমাকে জেনারেল পাবলিক পাননি। আমরা হাই সোসাইটির লোক …”
“উপস্! তাই তো!” সে লোকটাকে আরও একফুট ওপরে তুলল, “হাই সোসাইটি হিসাবে এই হাইটটা ঠিক আছে? না আরও একটু তুলব!”
আমনদীপ কী করবে বুঝতে পারছে না। সামনের ব্যক্তির চেহারা ভীষণ বলিষ্ঠ, অসম্ভব সুগঠিত ও অপূর্ব ঠিকই, কিন্তু সুমো পালোয়ান বা ডাব্লু ডাব্লু ই-এর রেসলারদের মতো আন্ডারটেকারমার্কা ভীমভবাণী আদৌ নয়। অথচ সেই লোকটাই তার মতো শক্তিশালী পুরুষকে প্রায় ইঁদুরের মতো শূন্যে তুলে ধরে আছে! কী অমানুষিক শক্তি! তবু সে হাল ছাড়ল না। দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “আমার হাত কিন্তু যথেষ্ট ওপর অবধি আছে…।”
অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ে। তারপর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে লোকটাকে আরও একফুট তুলে বলল, “এতটা ওপরে?”
“রাজা, আর তুলো না!” পেছন থেকে পবিত্র এবার ভয়ার্ত স্বরে বলে, “ওপর ওপর করতে-করতে এবার ডাইরেক্ট ওপরেই না পৌঁছে যান! শেষপর্যন্ত ওঁর হাত কি স্বর্গে গিয়ে থামবে?”
“কী করব মামা?” সে ফের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, “ওঁর টাওয়ারের প্রবলেম আছে। আমার কথা বা বক্তব্য কোনোটাই ধরতে পারছেন না। তাই ওপরে তুলে চেক করছি, যদি সিগন্যাল ধরতে পারেন।”
বলাইবাহুল্য, আমনদীপের মাথায় কোনোরকম সিগন্যালই ঢোকেনি। সে রাগে চেঁচিয়ে বলে, “আপনারা আমায় চেনেন না। আমি সবার এগেনস্টে কমপ্লেইন করব। আমার এক বন্ধু নামকরা উকিল। সবক-টাকে দেখে নেবো। সবক-টাকে কোর্টে তুলব…।”
“অর্ণব!” সে আবার ঘাড় ঘোরায়, “ইজ হি স্কেয়ারিং মি?”
অর্ণব মনে মনে প্রমাদ গোণে। এই ডায়লগটা তার অত্যন্ত পরিচিত! জীবনে বহুবার শুনেছে। এবং তার ফলাফলও স্বচক্ষে দেখেছে। সে মাথা নাড়ে, “মনে তো হয়।”
“আমার কি ভয় পাওয়া উচিত?”
কার যে এখন ভয় পাওয়া উচিত তা সকলেই বুঝেছে। অর্ণব আতঙ্কিত। আমনদীপ এখন চুপ করলেই তার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। সে শুনল, পবিত্রও বিড়বিড় করছে, “কন্ট্রোল… গুরুদেব… কন্ট্রোল!” কিন্তু আসল ব্যক্তিটির মাথায় তখনও সেটা ঢোকেনি। সে হিংস্রভাবে বলল, “ইউ…ইউ! ইউ ডোন্ট নো মি! আমি কী করতে পারি, কতদূর যেতে পারি, আপনাদের কোনো ধারণাই নেই….।”
অর্ণব মনে মনে ফের কপাল চাপড়াল। পবিত্র আলতো করে গোঁফের ওপর হাত বোলায়। এখানে কিচ্ছু করার নেই। এখন স্বয়ং ঈশ্বরই আমনদীপকে রক্ষে করুন। “রাইট। ওপরে ওঠা তো দেখলাম।” অধিরাজ ঘাড় কাত করে খুব নিষ্পাপ দৃষ্টিতে দেখছে তাকে, “এবার কতদূর যেতে পারেন সেটাও দেখে নিই৷”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই তার পেটে মোক্ষম একটা কিক। লং লেগের লাথি বলে কথা! লম্বা সুন্দর পায়ের জন্য অনেকেই পেছনে আদর করে তাকে‘লেগসাম ম্যান’ও বলে। কিন্তু তার কিটাও মারাত্মক। আমনদীপ সত্যিই একেবারে অক্ষরে অক্ষরে অনেকখানিই দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল। উঃ, আঃ জাতীয় কোনোরকম কাতরোক্তি করার আগেই মাথাটা একেবারে সজোরে দেওয়ালে ঠকাস করে ঠুকে গিয়েছে। একটা শব্দ করারও সুযোগ পেল না সে। একেবারে ধড়াস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
“ফাইন।” অধিরাজ স্থির দৃষ্টিতে প্রায় স্থির দেহটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আই অ্যাম স্কেয়ারড। ভয় পেয়েছি। স্যাটিসফায়েড নাও? বাই দ্য ওয়ে, ওজন আর হাইট অনুপাতে অনেকদূরই গেছেন। কী বলো অর্ণব?”
অর্ণব দুষ্টু হাসল, “হ্যাঁ স্যার। ঠিকই বলছিলেন উনি। সত্যিই অনেকদূর যেতে পারেন।”
পবিত্র ততক্ষণে এগিয়ে গিয়ে আমনদীপকে চেক করছে। নাকের কাছে হাত রেখে বলল, “যাঃ শালা, বেঁচে আছে। এমন করে পড়ল, ভাবলাম টপকেই গেল বুঝি। মরহাব্বা, মাশাআল্লাহ, জাহনর্শি, জোরদার মার থা জনাব।”
“শুক্রিয়া!”
সে এবার লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল টুইঙ্কল আর গুরশীলের দিকে। ওদিকে শুরশীলকে ঠেঙিয়ে প্রায় লম্বাই করে ফেলেছে মিস অরোরা। চড়, ঘুষি তো বটেই, হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই দিয়েই পেটাচ্ছে। পেটাতে পেটাতে তাকে প্রায় আধমরা করে, একেবারে ধরে উলটো করে পেল্লায় একটা ঝাঁকুনি দিল সে! গুরশীলের মুণ্ডুটা মেঝে থেকে কিছুটা ওপরে। মেঝে থেকে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঝুলছে। টুইঙ্কল ছেড়ে দিলেই ঘাড়টা মেঝেতে পড়ে মচকে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। লেডি অফিসার তার ঠ্যাঙদুটো আচ্ছা করে চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, “নকলি চুড়েল কোথাকার। আমার সঙ্গে হাতাহাতি করবি? তুই চুড়েল হলে আমিও ডায়েন দি গ্রেট। ঘাড় মটকে ছেড়ে দেব।”
অধিরাজ খুব শান্তভঙ্গিতে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আরাম করে বসল ওদের সামনে। আস্তে আস্তে গুরশীলকে বলল, “আর ইউ এনজয়িং দ্য রোলার কোস্টার রাইড সেনোরা? অর শ্যুড আই সে সেনর?”
গুরশীল কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ধপাধপ করে দুটো নরম বল তার জামা থেকে মাটিতে খসে পড়ল। টুইঙ্কলের রামঝাঁকুনির ফলাফল। এগুলোকে হ্যান্ড এক্সারসাইজ বল বলে। স্ট্রেস কমানোর জন্য বা হাতের এক্সারসাইজের প্রয়োজনে এই বলগুলো ব্যবহৃত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের নারীসুলভ বাঁকও হাওয়া। মিস অরোরা চূড়ান্ত চটে গিয়ে বলল, “সা-লা! এটাও নকল! শরম নেহি আতি! আমার গোঁত্তা খেয়ে ‘অম্রুতও এমন টপাটপ পড়ে না। বুকে বল আটকে মেয়ে সেজে ঘুরছিস? ঘোরাচ্ছি তোকে।”
আবার পেল্লায় একটা ধাক্কা। গুরশীলকে দেখে মনে হচ্ছিল, বুঝি পাহাড়ে ভূমিকম্প হচ্ছে এবং একের পর এক ল্যান্ডস্লাইড হয়েই চলেছে। এবার ভূ-কম্পে তার নকল পেটটাই খসে পড়ল। বলাই বাহুল্য, প্রস্থেটিক পেট। কিন্তু সেই স্ফীতোদরের ভেতর থেকে ঝনঝনিয়ে যে ধাতুর টুকরোগুলো সশব্দে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল সেগুলো দেখে সবারই চক্ষু চড়কগাছ! তার নকল গর্ভের ভেতরে কোনো মানবসন্তান নয়, গুচ্ছ গুচ্ছ বুলেট লুকনো ছিল। অর্ণব সবিস্ময়ে অধিরাজের মুখের দিকে তাকায়। সে নিস্পৃহ মুখে গালে হাত দিয়ে বসে চুপচাপ মজা দেখছে। মুখভঙ্গিতে কোনোরকম বিস্ময়ের ছাপ নেই। যেন জানত, এরকমই কিছু হতে চলেছে। বরং ফের ঠোঁট দিয়ে টেনে একটা সিগারেট কামড়ে বের করে এনে খুব ঠান্ডাভাবেই ধরাল। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ রিং বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অর্ণবের কানের কাছে পবিত্র ফের ফিশফিশ করে, “শুনেছি কদ্রু একগাদা সাপকে জন্ম দিয়েছিলেন। ইনি তো আরও এককাঠি ওপরের ডেঞ্জারাস জিনিস ডেলিভারি দিচ্ছেন দেখছি। ওই পেটের ভেতরে এ কে ফর্টি সেভেন, মিসাইল-টিসাইলও নেই তো।”
অধিরাজ রিং বানাতে বানাতেই বলল, “এমন প্রতিভাশালী বুলেটগর্ভাকে আর্মির স্পেশাল কেয়ারে রাখা উচিত। বুলেটের জন্য চিন্তাই করতে হবে না!”
অর্ণব আর মিস্ দত্ত হাঁ করে সব দেখছিল। যেমন করে লোকে গাছ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আম বা কুল পাড়ে, মিস অরোরা তেমনই বুলেট পাড়ছে। এককথায় প্রায় বুলেটের বৃষ্টিই হয়ে চলেছে। গুরশীল কথা বলার অবস্থাতেই নেই। সে বোধহয় সরষের ফুল, ধুতরো আর কদমফুল, সবই একসঙ্গে দেখছে। মোটামুটি ধোয়া এবং ঝাড়া পর্ব শেষ হতেই টুইঙ্কল একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “হয়ে গেছে স্যার। কোথাও আর কিছু নেই। আরও বেশি ধাক্কামুক্তি করলে এবার আসল অর্গানগুলোও বেরিয়ে পড়বে।”
অধিরাজ এবার টানটান হয়ে উঠে দাঁড়ায়, “নো প্রবলেম মাদমোয়াজেল। বাকিটা আমরাই টুকটুক করে খুলে নেব। ইলেক্ট্রিসিটি থেকে প্লাম্বিং, ভাঙা থেকে জোড়া—সব কাজই মোটামুটি পারি। আপনি বরং, এই চেয়ারটাতে বসুন। খাবেন কিছু?”
টুইঙ্কল মাথার ঘাম মুছে বলল, “পরে। আমি আপাতত খাওয়ানোর মুডে আছি স্যার।”
“নিশ্চয়ই মিস অরোরা।” সে হাসছে, “সে সুযোগও দেব। আপনি ততক্ষণ একটু জল-চুরুট খেয়ে রিচার্জ হয়ে নিন। এই ফাঁকে আমরাও একটু ঘোলা জলে মাছ ধরে আসি।”
বলতে-বলতেই অধিরাজ হাতা গুটিয়ে এগিয়ে গেল। পেছন পেছন অর্ণব আর পবিত্রও। গুরশীল গোটা ব্যাপারটাই হাঁপাতে হাঁপাতে অতিকষ্টে দেখছিল। এবার হাত তুলে বলল, “প্লিজ, স্টপ। প্লিজ!”
“কেন? মিস অরোরার সেবাতেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন? বড়ো অল্পেই সন্তুষ্ট দেখছি।” অধিরাজ বড়োই দুঃখিত হয়ে ভুরু তুলেছে, “আমাদের একটু সেবা করার সুযোগ দেবেন না? বেশি না…. একটুখানি।”
“প্লিজ।” গুরশীল কোনোমতে বলে, “আমি… আমি কো-অপারেট করছি। আর নয়।
“গুড।” সে অর্ণব আর পবিত্র-র দিকে একঝলক অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, “শি….আই মিন, হি ইজ ইন্টেলিজেন্ট। তাই না?”
পবিত্র গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসল, “নিঃসন্দেহে। সেইজন্যই তো প্রেগন্যান্সির আড়ালে মেটাল ডিটেক্টরের তলা দিয়ে না যাওয়ার স্কোপ খুঁজে নিয়েছিলেন। আশা করি মিস্ অরোরার হাতের তলা দিয়েও দ্বিতীয়বার আর যাবেন না। ওটা মেটাল ডিটেক্টর নয়, মেটাল ডেস্ট্রয়ার।”
“অফকোর্স!” তার চোখে কৌতুক, “এমনিতেই ন্যাড়ার বেলতলা দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। আর উনি তো পুরো ইন্দুলুপ! তাও আবার বেলতলা নয়, তালতলা দিয়ে যাচ্ছিলেন। যাক গে, মিঃ…!”
“আকাশ সিং।”
গুরশীল, ওরফে আকাশ মিউমিউ করে জবাব দিল। ঝাঁকুনির চোটে এখনও বোধহয় তার হাড়গুলো খটখট করে কাঁপছে। চোখ, মুখ লাল
“আকাশ সিং।” অধিরাজের নিরীহ প্রশ্ন, “হঠাৎ আকাশ থেকে পাতাল হয়ে গেলেন কেন? এতকিছু থাকতে খামোখা জেন্ডার চেঞ্জ করার কারণ?”
আকাশ থুতিয়ে থুতিয়ে যেটুকু বলল তাতে বোঝা গেল যে ওরা গোয়ার বিখ্যাত ড্রাগমাফিয়া কার্লোসের হয়ে কাজ করে। কার্লোস নিজে মূলত গোয়ায় গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। কিন্তু ওর এজেন্ট, ক্যান্ডিম্যানরা সর্বত্র বিরাজমান। কার্লোসের আবার একটি হেভিওয়েট গডফাদারও আছে যার হয়ে ও ভারতবর্ষে কাজ করছে। সবাই তাকে রিচার্ড গডম্যান বা রিকি গডম্যান নামেই চেনে। তার মতো চতুর ও প্রভাবশালী ক্রিমিনালও খুব কম আছে। সবাই তার কীর্তিকলাপ জানে, কিন্তু আজ পর্যন্ত পুলিশ ওর কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। আকাশ সিং বা তার সঙ্গী আমনদীপ নিতান্তই চুনোপুঁটি মাত্র।
আকাশ এর আগে উগ্রবাদীদের সঙ্গে কাজ করত। কট্টর খালিস্তানি সমর্থক ছিল। একবার বম্ব বানাতে গিয়ে ছোটখাটো ব্লাস্টের শিকার হয়েছিল। তাতে দেহের কিছু অংশ আর দুটো হাত পুড়ে গিয়েছিল। অক্ষত থাকলে মানুষের সাহস বেশি থাকে। কিন্তু ছ্যাঁকা খেয়ে বিপ্লব মাথায় উঠেছিল তার। অগত্যা হিস্ট্রিশিটারের দলে নাম লিখিয়েছে। প্রথমে পাতার ছোটখাটো কারবারি ছিল। তারপর সস্তা পাউডারের। এখন কার্লোসের কৃপাদৃষ্টিতে দামি পাউডার বেচছে।
“বার্নিং শিখের সঙ্গে কী লিঙ্ক তোদের? তাকে কী বেচেছিস? ড্রাগস না গাঁজা?”
“বার্নিং শিখ!” সে অবাক, “তাকে তো চিনিই না। জন্মেও দেখিনি।”
“তাকে দেখে চেনার জন্য তোকে একশোবার মরে জন্মাতে হবে। এক জন্মে হবে না। অ্যাসিড, বম্ব জাতীয় কিছু দিয়েছিস কাউকে? তোর তো আবার বম্বের হিস্ট্রিও আছে। খালিস্তানি সমর্থকও বটে! একেবারে সর্বগুণসম্পন্ন কাঁঠালি কলা দেখছি।”
“সত্যি বলছি স্যার, ওই ব্লাস্টের পর জীবনে আর বম্ব বানাইনি। এখন এটাই আমাদের ব্যাবসা।” আকাশ বলল, “আর বার্নিং শিখ আমার কাছে আসেইনি খালিস্তানি ছিলাম। অল্পবয়েসে সাপোর্টও করতাম। কিন্তু এখন ভুল বুঝেছি।”
“বাঃ! আর এই বোধোদয়ের কারণ?”
ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বুদ্ধি পাকার সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম খালিস্তান কোনো কাজের জিনিসই নয়। ওই ছোট্ট একটা অংশে শিখরা আদৌ নিরাপদ নয়। পাকিস্তান এমনিতেই দেশভাগের সময় পাঞ্জাবের অর্ধেকটা নিয়ে নিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা সরে গেলে বাকিটাও দখল করার চেষ্টা করবে। শিখদের কাটবে। স্বর্ণমন্দির ভাঙবে। তাছাড়া আমাদের কাছে কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই। ফসল ছাড়া ইনকামের রাস্তা নেই। এই বিরাট দেশের সাপোর্ট ছাড়া খালিস্তান না খেতে পেয়ে স্রেফ ধুঁকে ধুঁকে মরবে! কোনো উন্নতি হবে না, কাজ মিলবে না, কিচ্ছু হবে না। খালিস্তান স্রেফ একটা মিথ ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। বাস্তবে সম্ভব হলে আমরাই মরব। তাই বার্নিং শিখকে হেল্প করে নিজের পায়ে কেন কুড়ুল মারব? ওকে আমরা চিনিও না, কোনো লিঙ্ক নেই।”
“তবু ভালো। বুদ্ধি হয়েছে। কোকেন, হেরোইন, ড্রাগস তো বুঝলাম।” অধিরাজ ভুরু কুঁচকেছে, “কিন্তু এর মধ্যে বুলেট কোথা থেকে এল? কার্লোস কি অন্যকিছু প্ল্যান করছে? না তোর তেজস্ক্রিয় পেটের হিটে পাউডার সব জমে বুলেট হয়ে গেছে?”
“স্যার।” গুরশীল ওরফে আকাশ দু-হাত জোড় করে ফেলেছে, “আমরা আগে ড্রাগসের কারবারই করতাম। কিন্তু কার্লোসের অর্ডারে এখন ফায়ার আর্মসের ডিলও করি।”
“কার্লোস ড্রাগের পাশাপাশি এখন ফায়ার আর্মসের ব্যাবসাও করছে? নাকি কোনো জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওয়েপন সাপ্লাই করছে। প্ল্যান কী তোদের?” সে ধমকে উঠল, “ব-ল্।”
“আমরা আদার ব্যাপারি।” আকাশ প্রায় কেঁদেই ফেলেছে, “জাহাজের খবর কী করে জানব? আমাকে আর আমনকে যতটুকু অর্ডার দেওয়া হয়, ততটুকুই করি। তার বদলে মোটা টাকা পাই। এর বাইরের খবর জানি না।”
“আদার ব্যাপারি? তবে আদার খবরই বল।” অধিরাজ দুটো হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে জড়ো করে, “জাহাজের খবর আমরা ঠিক বের করে নেব।”
“স্যার, এই ফ্ল্যাটের ব্যবস্থাটা আমাদের কার্লোসই করে দিয়েছিল। বলেছিল, একজনকে মেয়ে সাজতে হবে। আমন লম্বা চওড়া। ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই আমিই মেয়ে সেজেছিলাম। আমাদের ওপর অর্ডার ছিল যে একটা নকল স্ক্যান্ডাল তৈরি করতে হবে যাতে ওর একজন মেল আর ফিমেল এজেন্ট ইজিলি আমাদের কাছে যে-কোনো সময়ে প্রয়োজনমতো আসতে পারে, অথচ কেউ সন্দেহও না করে। সেজন্যই দু-জন বিবাহিত লোকের এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ারের প্লট খাড়া করতে হল। ওদিকে আমনের বউ হিসাবে একজন ফিমেল এজেন্ট আসত, আর গুরশীলের বর হিসাবে একজন মেল এজেন্ট। ওরা প্রয়োজনমতো ড্রাগস নিয়ে যেত। কার্লোসের কলকাতায় বিভিন্ন এরিয়ায় মোট দু-জন মেইন সাপ্লায়ার আছে। তাদের মধ্যে আমরা এক পার্টি। আমাদের মাল হাই কোয়ালিটির, হাই প্রাইজের। তাই ডিমান্ডও আছে। এজেন্টরা এসে নকল বর-বউ সেজে খিস্তিখেউড় করার ফাঁকেতালে ড্রাগস নিয়ে চলে যেত। সবাই তামাশা দেখতে এত ব্যস্ত থাকত যে কেউ অন্য কিছু সন্দেহ করেনি। ওরাই ক্যান্ডিম্যান বা ড্রাগ পেডলারদের হাতে হাতে প্যাকেট পৌঁছে দিত। এই অবধিই সব ঠিক ছিল। হঠাৎ কার্লোস বলল যে গান আর বুলেটও সাপ্লাই করতে হবে। কিন্তু মাল নিয়ে আসা আর নিয়ে যাওয়ায় প্রবলেম হচ্ছিল। চেকিং সিস্টেম, মেটাল ডিটেক্টর…!”
“সেজন্যই প্রেগনেন্সির নাটক।” সে আকাশ সিংকে জোরদার এক চড় মারল, “পেহলা মালা খালি! এত কিছু প্ল্যান করলি আর মাথায় এটা এল না যে মহিলারা দিনে বারবার শেভ করে না, ওটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ? যে মহিলা নিজের বেবির সেফটির জন্য মেটাল ডিটেক্টরের তলা দিয়ে যায় না, সে প্রেগনেন্সির সময়ে মরে গেলেও স্মোক করবে না, গাড়ি চালাবে না! মেয়েরা স্মোকার হতে পারে, গর্ভবতী মায়েরা হয় না। ওরা সারাজীবন নিজে বিষ নিতে পারেন, চেইন স্মোকারও হতে পারেন, কিন্তু ডিউরিং প্রেগন্যান্সি নিজের শিশুর রক্তে কিছুতেই নিকোটিনের মতো বিষ মেশাবেন না, তা সে যতই কষ্ট হোক। সেইজন্যই ওঁরা মা। এই রিসার্চটাও করিসনি। কোন লেভেলের ইডিয়ট তোরা?”
থাপ্পড়টা খেয়ে আকাশ সিং একদম মুখ থুবড়ে পড়ল। আর উঠলই না! অধিরাজ নিজের মনেই গজগজ করে, “স্কাউন্ড্রেল! ডিসগাইজটাও ঠিকমতো করতে পারে না। কার্লোস এই গর্দভদের নিয়ে এখনও বিজনেস চালাচ্ছে কী করে? কে বেশি অপদার্থ? পুলিশ? না কার্লোস?”
“ও ত্তেরি!” টুইঙ্কল প্রায় শহীদ হয়ে যাওয়া আকাশ সিং এর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ মালটাকে নিয়ে এতক্ষণ আমি জাগলিং করছিলাম। তারপরও ব্যাটা টিকে ছিল। আপনি এক লাফা মারলেন অমনি ছিপকলির ‘দুম’ এর মতো টুকুৎ করে খসে পড়ল। মান গয়ে হুজুর। হোয়াট আ সেক্সি লপ্পড়।”
অর্ণব উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকাল। ‘সেক্সি’ শব্দটা তার অত্যন্ত অপছন্দের। এই শব্দটাকে সে মনে প্রাণে ঘৃণা করে। সভয়ে দেখল একঝলক অসন্তোষ তার মুখে ভেসে উঠল। তবে টুইঙ্কলকে চিনতে ওর-ও বাকি নেই। তাই বিরক্তির ছাপটা দ্রুতই সরে গিয়েছে। মৃদু অপ্রতিভ স্বরে বলল, “থ্যাঙ্কস।”
তার চোখ এবার অর্ণব আর পবিত্র-র দিকে পড়েছে, “তোমরা একটু আশেপাশের প্রতিবেশীদের ডেকে আনো। ওঁদের সাক্ষী রেখে ফ্ল্যাটটাকে আগাপাশতলা সার্চ করে দেখো আর কী কী পাও। যা পাবে এভিডেন্স ব্যাগে ভরবে। আমার ধারণা বুলেট যখন আছে তখন ফায়ার আর্মসও আছে। সেগুলোও পাওয়া যাবে। তন্নতন্ন করে খোঁজো। কোনো জায়গা বাদ দেবে না। কার্লোসকে আমরা এখন ধরতে পারব না। কিন্তু ওকে একটু লসের শোক তো দিতেই পারি। সব খুঁজে বের করে, জ্যান্ত লাশদুটোকে হেফাজতে নিয়ে, মাল বাজেয়াপ্ত করে, ফ্ল্যাটটা সিল করে দাও। তারপর বাকি খবর নিচ্ছি।”
দুই অফিসারই মাথা ঝাঁকিয়ে দ্রুত প্রতিবেশীদের ডাকতে গেল। ভূপেন্দ্ৰ দত্তা ও এলেন। শ্রীদর্শিনী, প্রিয়দর্শিনী, তিতলি, বসন্ত, কোকিলা, এমনকি নিরীহ মুখে খোদ প্রণবেশ লাহিড়ী-প্রায় প্রত্যেকেই এসে হাজির। ওঁরা সকৌতূহলে উঁকিঝুঁকি মারছেন। এবার অফিসাররা তল্লাশিতে লেগে পড়ল। প্রণবেশ এগোলেন না। হয়তো নিজের কভারটা নষ্ট করতে চান না। আত্রেয়ীও দাঁড়িয়ে থাকলেও হাত লাগায়নি। যেন সে নিতান্তই সাক্ষী। অন্যদিকে যদিও অধিরাজ টুইঙ্কলকে কোনো নির্দেশ দেয়নি, তবু সে সার্ভিস দেওয়ার একটা চান্সও ছাড়তে রাজি নয়। ও তড়াক করে উঠে হাত লাগিয়েছে ওদের সঙ্গে। খুব বেশি অবশ্য কষ্ট করতে হল না। সোফার গদির ভেতরে, তাকিয়া, ফুলদানির ভেতর, বক্স খাটের বক্সে, অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে, বইয়ের ভাঁজে, আলমারির মাথা এবং অন্যান্য সমস্ত জায়গা থেকে টপাটপ ড্রাগসের প্যাকেট, আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট, টাকার গুচ্ছ বান্ডিল- সবই একেবারে সর্বসমক্ষে বেরোতে শুরু করল।
“কার্লোস কে স্যার?” এতক্ষণে আত্রেয়ী দত্ত চাপা স্বরে জানতে চায়, “নতুন হিস্ট্রিশিটার?”
“নাঃ। পুরোনো পাপী।” অধিরাজ একটু অন্যমনস্ক, “অনেকদিন ধরেই পুলিশকে ল্যাজে-গোবরে করে রেখেছে। কিন্তু সেটার থেকেও বেশি চিন্তার বিষয়, আকাশ সিং-এর স্টেটমেন্ট। কলকাতায় কার্লোসের দু-জন মেইন সাপ্লায়ার আছে। একটা তো বেরোল। আর একটা কে? বা কারা?”
“আরও একটু ইন্টারোগেট করতে পারতেন।”
সে মাথা নাড়ল, “উঁহু মিস্ দত্ত। আপনি কার্লোসকে চেনেন না। ওর ডান হাতও বাঁ হাতের খবর রাখে না। হাতের কথা তো ছাড়ুন, ওর পাঁচটা আঙুলও জানে না একটা এক্সট্রা বুড়ো আঙুলও আছে কিনা। তবে ইন্টারোগেট অবশ্যই করব। আমনদীপের ফলস বউ আর আকাশ সিং-এর ফল্স বর অবধি পৌঁছোতে পারলে আস্তে আস্তে পুরো নেটওয়ার্কের অনেকটাই হাতে আসবে। তবে এখন নয়। আগে বার্নিং শিখকে দেখে নিই।”
আত্রেয়ী একটু চিন্তিত, “ওদের সঙ্গে তবে সত্যিই বার্নিং শিখের কোনো সম্পর্ক নেই?”
“নাঃ। এটা কনফার্ম।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলে, “বার্নিং শিখ খালিস্তানি মুভমেন্টকে সমর্থন করে না। আর সে যদি আকাশের কাছে আসত, তবে আকাশও তার এই অপছন্দের কথা জানত। কিন্তু তার কথাতেই স্পষ্ট যে বার্নিং শিখ সম্পর্কে এই তথ্যটি তার জানা নেই।”
“তবে সে কোথায়?”
আত্রেয়ীর প্রশ্নে হতাশভাবে মাথা ঝাঁকায় অধিরাজ, “এখানেই আমার বুঝতে একটু ভুল হয়ে গেল মিস্ দত্ত। ডাইরেক্ট সম্পর্ক নেই তা বুঝেছিলাম। কিন্তু সামান্য আশা ছিল যে গুরশীল-আমনদীপের সঙ্গে তার সূক্ষ্ম লিঙ্ক থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্তে আকাশ বলল যে সে খালিস্তানি সাপোর্টার ছিল, সেই মুহূর্তেই বুঝলাম, ডিডাকশনটা ভুল। বার্নিং শিখ যে খালিস্তানিদের দেখতে পারে না তা আমরা সবাই জানি।”
“তার মানে আমাদের হাত ফের ফাঁকা?”
“উঁহু।” সে অন্যমনস্কভাবে বলে, “একদমই নয়। অ্যাট লিস্ট একটা ছোটখাটো মাছ তো হাতে পড়ল। আর এটাও জানা গেল যে কার্লোসের আর একটা ঘাঁটি আছে। যে কোনো সঠিক ইনফর্মেশন সবসময়ই ভ্যালুয়েল্। ঠিক কোনো না কোনো সময়ে কাজে লেগে যাবে। তাছাড়া সবচেয়ে বড়ো তিমিঙ্গিল গিলগিল রিকি বা রিক গডম্যান তো আছেই।”
“হুঁ।”
আত্রেয়ী আড়চোখে দেখল, বাইরে তখন ছোটোখাটো ভিড় জমে গিয়েছে। তিতলি আর শ্রী মুগ্ধ দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকেই দেখছে। কোকিলাও কিছু কম যায় না।
অনেকেরই চোখে আত্রেয়ীর জন্য ঈর্ষা। এই মুহূর্তে বার্নিং শিখের পাশাপাশি অফিসার ব্যানার্জিও ‘টক অব দ্য টাউন’। এটাই খুব স্বাভাবিক। একের পর এক কেসে যা পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন ভদ্রলোক, তাতে মিডিয়ার ‘ডার্লিং’ হবেন তাতে আর আশ্চর্য কী। তার ওপর মেয়েদের মধ্যে রীতিমতো হাই ভোল্টেজ ‘সেনসেশন’! কাল অয়েল ট্যাঙ্কারের সঙ্গে ওঁর একা যুদ্ধ করার ফুটেজ দেখে অনেকেই ঘাড় মুচকে পড়েছে। আত্রেয়ীর নিজের এক কাজিন সিস্টার আছে, সমন্বিতা ওরফে ‘স্যাম’। সে প্রায় ওঁর ব্যাপারে পাগল! দিদিকেও পাগল করে রেখেছে, যে করেই হোক ‘স্যার’কে দেখতে সে যাবেই। সেইখানে তিনি একরাশ মানুষের সামনে আত্রেয়ীর কাছে দাঁড়িয়ে অত সহজভাবে কথা বলছেন, এটা যে অনেকেরই সহ্য হবে না সেটা সর্বজনোবিদিত। আত্রেয়ী অল্প গলাখাঁকারি দিয়ে একটু তফাতে সরে দাঁড়ায়। প্রমীলাবাহিনীকে খেপিয়ে লাভ নেই। সে সি.আই.ডি. অফিসার হতে পারে, কিন্তু রজনীকান্ত নয় যে একাই চল্লিশ-পঞ্চাশজনকে পিটিয়ে দেবে। একটা বুলেটকে চাকু দিয়ে দু-টুকরো করে দু-জনকে মারার মতো ক্ষমতাও রাখে না। তাই সেফ সাইডে থাকাই ভালো।
অর্ণব, পবিত্র আর টুইঙ্কল গোটা ফ্ল্যাট তল্লাশি করে ততক্ষণে প্রায় কুবেরের ভান্ডার এনে রেখেছে। মিস অরোরার মাথায়, মুখে সাদা ময়দার প্রলেপ দেখে অধিরাজ চিন্তিতস্বরে বলে, “মিস অরোরা! আপনি এমন সাদা হয়ে গেলেন কী করে? ট্যালকম পাউডার মেখেছেন?”
“কী করব স্যার?” টুইঙ্কল বিরক্ত, “এই ‘অকল কা দুশমন’ পাবলিকগুলো ময়দার বস্তার মধ্যে ড্রাগসের প্যাকেট রেখেছিল। সেগুলো আনতে গিয়েই… ין
“বুঝলাম।” সে মাথা ঝাঁকায়, “আল্টিমেটলি কী কী পাওয়া গেল অর্ণব?”
“এগারোটা গান আছে স্যার।” অর্ণব জানায়, “তার মধ্যে চারটে স্মিথ অ্যান্ড ওয়ে মডেল নাইন্টিন, তিনটে কোল্ট পাইথন, দুটো স্মিথ অ্যান্ড ওয়ে মডেল টোয়েন্টি নাইন, আর দুটো জে-ফ্রেম!”
সে ঠোঁট ওলটায়, “কেয়া বাত! এইজন্যই সমাজবিরোধীরা সব ভয়াবহ ফায়ার আর্মস নিয়ে ঘুরছে। আমরা যে কেন পাই না কে জানে! আর কিছু?”
“ইয়েস।” এবার পবিত্র বলল, “প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার হাই কোয়ালিটির ড্রাগস, আন্দাজ আশি লাখ টাকা শুধু ক্যাশ। বেশি-কম হতে পারে কারণ তাড়াহুড়োয় আন্দাজে গুণেছি। ব্যুরোয় নিয়ে গিয়ে ভালো করে গুণতে হবে। আর প্রচুর বুলেট। এককথায় গুপ্তধন রাজা।”
“সব বাজেয়াপ্ত করে সিল মারো। তার আগে একসঙ্গে রেখে ছবি আর ভিডিও তুলে নিও। সাক্ষীদের ভেতরে ডেকে নাও। মালপত্র দেখিয়ে অল্পবিস্তর জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দাও।”
মোটামুটি আর দু-ঘণ্টার মধ্যেই সব ফর্ম্যালিটি শেষ হয়ে গেল। অত টাকার মাল উদ্ধার হলেও অধিরাজের মুখমণ্ডলে এখনও চিন্তার ছাপ প্রকট। হিসাবে সামান্য ভুল হয়ে গিয়েছে। এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা কেস। তার চোখদুটো ফের অন্যমনস্ক। মিডিয়া এটাকে নিয়েও ঘোঁট পাকাবে। কিন্তু কার্লোসের থেকেও বড়ো থ্রেট এখন বার্নিং শিখ। কার্লোস আর তার বসকে ধরার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। বার্নিং শিখ আর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই যা করার করবে। আর ইয়া পার। ঘড়ির কাঁটা চিন্তাভাবনা করার জন্য এক্সট্রা এক সেকেন্ড সময়ও দেবে না। দিনও চব্বিশঘণ্টার বেশি লম্বা হবে না। আর এখন তো হাতে চব্বিশ ঘণ্টাও বাকি নেই। অথচ গ্যাসদুটোর প্রবেশ পথ এখনও আবিষ্কার করা যায়নি…! মারণাস্ত্রটা ঢুকছে কোন্ পথে।
“স্যার… স্যা-র!”
ওরা সমস্ত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করে, ফ্ল্যাট সিল করে দিয়ে লিফটের দিকেই যাচ্ছিল। বেশিরভাগ মালই অর্ণব আর অধিরাজের হাতে। পবিত্র-র কাঁধে ঝুলছে আমনদীপ। এখনও তার হুঁশ ফেরেনি। তবে আকাশকে মারা চড়টা বোধহয় অতখানি মারাত্মক ছিল না। সে নিজের পায়েই হেঁটে চলেছে। পেছন থেকে বলির পাঁঠার মতো তাকে চেপে ধরে আছে মিস্ অরোরা। মিস্ দত্ত আবার সুযোগ বুঝে সুড়ুৎ করে ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটে সেঁধিয়ে গিয়েছে। প্রণবেশও ধারে কাছে নেই। ওরা সবাই নীচে নামার জন্য লিফটের অপেক্ষাই করছিল। হঠাৎই পেছন থেকে নারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “স্যার… এক মিনিট…”, ‘স্যার’ শব্দটা তিনজন পুরুষ অফিসারের ক্ষেত্রেই খাটে। অগত্যা অধিরাজ, অর্ণব আর পবিত্র, তিনজনেই পেছনদিকে ফিরে তাকায়। অর্ণব সবিস্ময়ে দেখল তিতলি আর শ্রীদর্শিনী এদিকেই আসছে। তিতলির শিফনের শাড়ি স্লিভলেস ব্লাউজের ওপর থেকে মাঝেমধ্যেই স্লিপ করছে আর শ্রীদর্শিনীর পরনে এখনও অর্ধস্বচ্ছ নাইট গাউন। আগে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিল বলে খেয়াল করেনি। কিন্তু এবার চোখে পড়তেই প্রবল বিরক্তিবোধ করল সে। হাই সোসাইটির মেয়েরা কি এমনই হয়? সে প্রবল বিরক্ত হয়ে বলল, “ইয়েস?”
অর্ণবকে রাস্তা থেকে প্রায় একধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে তিতলি বলল, “আপনি না। উনি।”
অর্ণব হাঁ। পবিত্র মুখ টিপে হাসছে। যথারীতি তীর নিশানাতেই লেগেছে। তিতলির ‘উনি’-টি অধিরাজই বটে। সে মেয়েদুটির দিকে তাকিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তখনও তার দৃষ্টিতে আত্মমগ্নতা। মনে মনে অন্য কিছুই ভাবছে। একটু মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “উঁ?”
“স্যার, আমরা আপনার খুব ফ্যান। একটা সেলফি হবে? ইনস্টাগ্রামে দেব। আপনার সব ভিডিও, ছবি ইনস্টাগ্রামে, ফেসবুকে ভাইরাল হয়। কয়েক মিলিয়ন লাইক পড়ে কয়েক হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়। তার সঙ্গে আমারটাও হয়ে যাবে। প্লিজ… একট সেলফি!”
এবার শ্রীদর্শিনী প্রায় একনিঃশ্বাসেই গড়গড়িয়ে বলে গেল কথাগুলো। অর্ণব একেই ধাক্কা খেয়ে খেপে ধানিলঙ্কা হয়েছিল। তার ওপর শ্রীদর্শিনীর এই ন্যাকাপনা দেখে তার পিত্তি আরও জ্বলে গেল। কিন্তু কিছু বলার আগেই তিতলি বায়না জুড়ল, “অটোগ্রাফ স্যার।”
“সেলফি! অটোগ্রাফ!” অধিরাজ এতক্ষণে সংবিৎ ফিরে পেয়ে অবাক, “স্যরি আপনারা ভুল করছেন। আমরা সেলিব্রিটি বা হিরো নই। আমরা তো….!”
“সি.আই.ডি. হোমিসাইড।” তিতলি প্রায় নাচতে নাচতেই বলল, “আপনাকে তে প্রায়ই টিভিতে দেখি স্যার। বাকি হিরোদের কী? ওরা তো ‘রিল লাইফ হিরো’। যত কেরদানি ঐ ক্যামেরার সামনেই। তাও অর্ধেক স্টান্টম্যানই করে। পুরোটাই নকল। আর আপনি ‘রিয়েল লাইফ হিরো’। আমার ক্রাইম নিউজে খুব ইন্টারেস্ট। খবরের কাগজেও দেখেছি। আমি আপনার বিগেস্ট ফ্যান, থ্রি টন ইনভার্টার এসিও বলতে পারেন। আমার ফ্যান্টাসি ছিল আপনাকে সামনাসামনি একবার দেখার। কিন্তু কখনও ভাবিনি, আসল মিটিঙের সময়ে আমি এত ঘাবড়ে যাব, আর আপনি ছবির চেয়েও অনেক বেশি হ্যান্ডসাম হবেন!”
পবিত্র আড়চোখে তাকিয়ে দেখল অর্ণব চোখ মুখ লাল করে ক্ষ্যাপা মোষের মতো মেয়েদুটির দিকে তাকিয়ে আছে। দেখলেই ভয় হয়, এই বুঝি গুঁতিয়ে দিল। তার ওপর বিপদ শুধু এদিকেই নেই। অন্যদিকে তিতলিদের ফ্ল্যাটের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে বৃদ্ধ বসন্তের ক্রুদ্ধ মুখ! সে অধিরাজকে চেতিয়ে দেবে কিনা ভাবছিল। তার আগেই একটা মোটা সোটা ফেল্ট পেন তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে তিতলি, “অটোগ্রাফ প্লিজ!”
“ওকে সেনোরা, অ্যাজ ইউ উইশ!”
অধিরাজ এই মুহূর্তে ঝামেলা বাড়ানোর বা তর্কে গিয়ে সময় নষ্ট করার মুডেই নেই। সে এখন কোনোমতে নির্বিবাদে এখান থেকে কেটে পড়তে পারলে বাঁচে। পেনটা তিতলির হাত থেকে নিয়ে বলল, “পেপার?”
উত্তরে নিজের ধবধবে সাদা ও নরম ম্যানিকিওর করা ডানহাতের পাতা এগিয়ে দিয়েছে মেয়েটি, “এখানে সাইন করুন…।”
“আপনার হাতে!” এইবার বেচারি ‘স্যারের’ চক্ষু চড়কগাছ। সে বিপন্নভাবে বলল, “কিন্তু জল লাগলেই যে কালি গলে লেপটে গিয়ে পুরো হাত কালো হয়ে যাবে ম্যাডাম। পেপার নেই? ডায়েরি বা অটোগ্রাফ বুক?”
অর্ণব মনে মনে বলে, “মুখেও কালি লাগলে বেশ হয়। তার সঙ্গে একটু চুনও।” “ডায়েরি বা অটোগ্রাফবুক তো হারিয়েও যেতে পারে। তাছাড়া আপনি আমার হাতে সাইন করলে আমি এই হাতটা জলেই দেব না! দরকার পড়লে স্নানও করব না।” সুন্দরী একগাল হাসল, “বরং এটার ওপর দিয়েই পার্মানেন্ট ট্যাটু করিয়ে নেবো। প্লিজ, সাইন করে দিন।”
সর্বনাশ করেছে। এর ওপর দিয়ে ট্যাটু করাবে। শুরু করেছে কী? এ কী জাতীয় পাগলামি! মানসী জয়সওয়ালের পর ইনি বোধহয় দ্বিতীয় নমুনা। এবার অর্ণবও দেখল, তিতলির ‘অতি বড়ো বৃদ্ধ পতি’র কপালে নয়, চোখে আগুন। শুনতে পেল পবিত্র গুনগুন করে গাইছে, “বসন্ত ক্ষেপে গেছে-এ-এ/ বসন্ত ক্ষেপে গেছে…।” সে মনে মনে প্রমাদ গোণে। শেষে এই অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ নিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড না হয়ে যায়!
শেষপর্যন্ত অবশ্য তেমন কোনো ভয়ংকর ব্যাপার ঘটল না। অধিরাজ আর কোনো কথা না-বাড়িয়ে তিতলির হাতে নিজের নাম সই করে দেয়। এখন এসব নিয়ে কোনোরকম ইস্যু চায় না সে। তাকে সেলফি তুলতে দিয়েও সন্তুষ্ট করল। শ্রীদর্শিনীর সঙ্গে সেলফি দিতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ শ্রী খুব লম্বা নয়। তার পাশে অধিরাজ সত্যিই বুর্জ খলিফা। তবু সে কোনোরকমে ঝুঁকে পড়ে সেলফি দিয়ে দিল। কিন্তু শ্রী তাতেও সন্তুষ্ট নয়। স্বাভাবিকভাবেই অধিরাজ তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার কোমর ধরে কাছে টেনে নিয়েছে, “কাছে আসুন প্লিজ, নয়তো ফ্রেমটা ঠিক হচ্ছে না।”
“সেনোরিটা।” অধিরাজ এবার প্রায় কাতর অনুনয়ে বলল, “আমাদের লেট হয়ে যাচ্ছে। পরে সেলফি দিলে চলবে?”
এবার অর্ণবের ধৈর্যশক্তি জবাব দিয়েছে। এ আবার কী! সেলফি অবধি ঠিক ছিল। তাই বলে কোমর ধরে টানাটানি করবে। সে একেবারে খেপে দুর্বাসা হয়ে এক ঝটকায় অধিরাজকে টেনে সরিয়ে নিয়ে বলে, “এটা কী জাতীয় ভদ্রতা ম্যাডাম! আপনি সেলফি তুলছেন ভালো কথা, তাই বলে এভাবে ওঁকে ধরে টানাটানি করবেন?”
“কেন?” শ্রীদর্শনী খুব সহজভাবেই উত্তর দেয়, “আমি তো আমার কো-অ্যাক্টরদেরও জড়িয়ে ধরে ছবি তুলি। ওদের তো কোনো প্রবলেম হয় না! আপনার কী প্রবলেম হচ্ছে? আপনাকে ধরে তো টানছি না।”
শখের অন্ত নেই। জড়িয়ে ধরে ফটো তুলবে এখন! অর্ণব ফায়ার হয়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই তাকে হাত তুলে থামিয়েছে অধিরাজ, “মাদমোয়াজেল, আমরা এখন একটু তাড়ায় আছি। অন-ডিউটি, বুঝতেই পারছেন। পরে যদি দেখা হয়, তবে ভালো করে সেলফি দেব। শুধু আমি কেন, পুরো টিমই দেবে। এখন যদি আপনি অনুমতি দেন, তবে…”
“ইয়েস… ইয়েস স্যার।” শ্রী একেবারে বিগলিত হয়ে বলল, “আপনি ডিউটি করুন। তবে আপনার নম্বরটা যদি দেন তাহলে ভালো হয়। আমরা একসঙ্গে কফি তো খেতেই পারি। আমি ফিশ ফিঙ্গার খুব ভালো বানাই।”
“শিওর।”
সে আর কথা না বাড়িয়ে তার ফোন নিয়ে নিজেই ফোন নম্বর টাইপ করে দেয়। তিতলিরও দেখাদেখি ফোন নম্বর চাই। অগত্যা চূড়ান্ত ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দু-জনের ফোনেই নির্বিবাদে নিজের ফোন নম্বর সেভ করে দিয়ে অধিরাজ ও বাকিরা দ্রুত নীচে নেমে আসে। সময় নেই। হাতে সময় একদমই নেই। এই দুটো হিস্ট্রিশিটারকে বামালসমেত যথাস্থানে জমা করে দিতে হবে। ওদিকে গুল্লুর টিম বার্নিং শিখের মুভমেন্টের ওপর নজর রাখছে। এখনও তার কোনো খবর নেই ঠিকই। তবে যে কোনো মুহূর্তে আসতে পারে। অধিরাজের মন বলছে, সে আদৌ হাত গুটিয়ে বসবে না। সকালের ঘটনাতেই স্পষ্ট যে-কোনো মুহূর্তে বিষাক্ত ছোবল এসে পড়তে পারে…
“স্যার।” অর্ণব চটে লাল, “আপনি ওই দুই মহিলাকে নিজের নম্বর দিয়ে দিলেন। তাও আবার মুখে বলে নয়, ডাইরেক্ট ওঁদের ফোনে নিজেই সেভ করে দিলেন? এটা কী হল? একা কি মানসী জয়সওয়াল কম উৎপাত ছিল যে আপনি আরও বাড়াচ্ছেন?”
“কী করতাম অর্ণব।” সে একটু বিব্রত হয়েই বলে, “উপায় ছিল না। মেয়েরা নম্বর চাইলে না বলাটা অভদ্রতা। আবার যদি চেঁচিয়ে নিজের নম্বর ডিক্টেট করতাম, বা নম্বরটা মুখে বলতাম তাহলে ওঁরা কেন, তুমিও বুঝে যেতে কোন নম্বর দিচ্ছি। তাই নিজেই টাইপ করে নিজের নামে সেভ করে দিলাম।”
“মানে!” এবার রাগের জায়গায় অগাধ বিস্ময় ফুটে উঠেছে অর্ণবের মুখে, “কোন নম্বর বুঝে যেতাম মানে? কার নম্বর দিয়েছেন আপনি?”
অধিরাজ দুষ্টু হাসল, “আরে, ওই নম্বরটা। যেটা সর্বত্র হোর্ডিঙে লেখা থাকে। কী যেন…? ইয়েস, ‘দিদিকে বলো।’ মুখে বললে ওঁরা বুঝতে পারতেন না?”
“অ্যাঁ।” সে আকাশ থেকে পড়বে না পাতালে প্রবেশ করবে ভেবে পায় না, “আপনি চিফ মিনিস্টারের হট লাইনের নম্বর দিয়ে দিলেন?”
“কী করব বলো!” অধিরাজ মাথা চুলকাচ্ছে, “ওই নম্বরটাই ওই মুহূর্তে মনে পড়ল। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর কি কফি, ফিশফিঙ্গার খেতে ইচ্ছে করে না? এমন একটা ডেট পেলে যেতেও তো পারেন।”
“খুড়ো!” পবিত্র হাতজোড় করে ফেলেছে, “স্বীকার করে নিচ্ছি, শয়তানি বুদ্ধিতে তুমি রাজশ্রী, মানে আমার বউয়েরও বাপ! এমন লেভেলের বজ্জাত তো আমার বউ কিংবা শাশুড়িও নয়। পেন্নাম হই!”
“বেঁচে থাকো বাবাজীবন।”
বলতে বলতেই হঠাৎ অধিরাজের ফোনটা বেজে ওঠে। সে চকিতে দেখল, স্ক্রিনে তখন গুল্লুর নামই ভেসে উঠেছে। একেই বলে টেলিপ্যাথি। ব্যাটা অনেকদিন বাঁচবে। সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা রিসিভ করে লাউডস্পিকারে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ। বল।”
ওপ্রান্ত থেকে গুল্লু উত্তেজিত স্বরে দ্রুত জানায়, “স্যার, এই এক সেকেন্ড আগেই তিনি বেরোলেন। আমার লোক লেগে আছে। সবেই বেরিয়েছে…।”
“কোথায় যাচ্ছে কোনো আন্দাজ আছে?”
“আন্দাজা নেই। কিন্তু ব্যাটা ড্রেস চেঞ্জ করেছে। এই মুহূর্তে গেট আপটা স্যার ওয়ার্ডবয়ের। ওই ছদ্মবেশটাই আজ নিয়েছেন উনি।”
সে মাথা ঝাঁকায়, “আর কোনো আভাস পাওয়ার দরকার নেই গুল্লু। ওর ছদ্মবেশটাই বলে দিয়েছে যে কোথায় যাচ্ছে। তোর ছেলেটা কি এখনও লেগে আছে?”
“একদম ছায়ার মতো চিপকে আছে।” গুল্লু একটু থেমে বলল, “তবে ছেলে নয়, মেয়ে স্যার। দৃষ্টি দত্ত। ইয়াং, খুবসুরত।”
“অ্যাঁ!” অধিরাজের মাথায় বিস্ময়ের পাহাড় ভেঙে পড়ে, “খবরি শেষে সুন্দরী তরুণী। গুল্লু, উনি মাটি করবেন না তো রে! মেয়েদের আমি আন্ডার এস্টিমেট করি না। কিন্তু ইনফর্মার হিসাবে আগে কখনও কোনো মেয়েকে দেখিনি।”
গুল্লুর হাসির শব্দ ভেসে এল, “আন্ডার এস্টিমেটের প্রশ্নই নেই। হেবি হুঁশিয়ার মেয়ে। টাকাপয়সা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ভালো ঘরের শিক্ষিত মেয়ে, আমাদের মতো ‘আনপড়”, হাভাতে নয়। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের খুব শখ। গোয়েন্দাগিরির ভূত মাথায় সওয়ার। আর এত সাবধানী যে কিছু বলারই নেই। আগেও অনেকবার উৎরে দিয়েছে। আর ভীষণ শান্ত আর সুইট বলেই আরও কেউ ইনফর্মার বলে সন্দেহ করে না। খুব সাহসী। এখন ও-ই লেগে আছে।”
“যদিও মোটামুটি বুঝেছি যে তিনি কোথায় যাচ্ছেন, তবু মাদমোয়াজেলের নম্বরটা পাওয়া যাবে?” সে একটু থেমে যোগ করল, “তাহলে লোকটার মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে পারব।”
“এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।” গুল্লু ফিচ করে হাসল, “তবে ও কিন্তু আপনার অন্ধ ফ্যান স্যার। খোদ আপনারই ফোন পেলে হয়তো ভয়েই তোতলাবে। তাতে রাগ করবেন না! এসব আজকালকার মেয়েদের ইশক-মুশকের চক্কর। একটু ‘ঝেলে নিন।”
“ডান। ‘ঝেলে’ নেব। তুই নম্বর দে।”
ফোনটা কেটে দিয়েই বলল অধিরাজ, “পবিত্র, হাতে সময় নেই। তুমি এই গাড়িতেই মক্কেলদের নিয়ে চলে যাও। একটা এখন উঠবে বলে মনে হয় না, আর একটা বেশি ট্যা-ফোঁ করলে এক ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে দিও। ঠুকেও দিতে পারো, আই ডোন্ট কেয়ার। যে কোনো একটাকে বাঁচিয়ে রাখলেই হল। আমি, অর্ণব আর মিস্ অরোরা এখনই একটা ক্যাব ডেকে হসপিটালের দিকে যাচ্ছি।”
এতক্ষণ ওরা প্রত্যেকেই গুল্লুর কথা শুনছিল। তার কথা শুনে বুঝতে ওদের কারোরই অসুবিধে হয়নি যে বার্নিং শিখ এখন ঠিক কোথায় যাচ্ছে এবং কেন যাচ্ছে। ওরা প্রত্যেকেই জানত যে এই স্টেপটা সে যে-কোনো মুহূর্তে নিতে পারে। তবে এত তাড়াতাড়ি নেবে তা ভাবেনি।
উত্তেজনায় অর্ণবের হৃৎপিণ্ড দ্বিগুণ বেগে চলতে শুরু করল। আরও একবার সম্মুখ সমরের সম্ভাবনা আছে! কিন্তু সফল হবে কি? মিস্ বোস কি আটকাতে পারবেন লোকটাকে? ওরা কি ঠিক সময়ে পৌঁছোতে পারবে? যদি ভুল হয়ে যায়! যদি সুন্দরী খবরি তাকে হারিয়ে ফেলে। আফটার অল, মেয়ে। পেরে উঠবে কি অমন ধুরন্ধর ক্রিমিনালের সঙ্গে?
ইটস হাই টাইম। এই মুহূর্তে আর একটাও ভুল করার উপায় নেই। একটাও না।
