(৬)
“ঘন্টু, তুই ঠিক জানিস তো? ওর কাছ থেকেই তিনদিন আগেই কুড়ি লিটার কেরোসিন বিক্রি হয়েছিল?”
ঘন্টু সজোরে মাথা ঝাঁকায়, “হ্যাঁ স্যার। উনি গ্যালন গ্যালন কেরোসিন ব্ল্যাকে চড়া দামে বিক্রি করেন। তবে আমি যেটুকু শুনেছি, তাতে কুড়ি লিটার তেল ঠিক বিক্রি করা হয়নি।”
“মানে?” অধিরাজের মুখে বিস্ময়ের ছাপ, “একটু আগেই তো বললি ব্ল্যাক মার্কেট ডিলার প্রকাশ আপ্তের কাছ থেকে তিনদিন আগে কেউ একসঙ্গে কুড়ি লিটার কেরোসিন কিনেছে।”
ঘন্টু পেন্ডুলামের মতো মুণ্ডুটাকে দু-দিকে নাড়ল, “কিনেছে বলিনি। হাওয়া হয়েছে বলেছি।”
ধন্য ঘন্টু ও তার কথার মারপ্যাঁচ! নেহাত ও সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সর্বশ্রেষ্ঠ খবরি তাই অধিরাজ আর অর্ণব বিশেষ কিছু বলে না তাকে। প্রণবেশ লাহিড়ী হলে বিরক্ত হয়ে ওর গলাই টিপে ধরতেন। ব্যাটা সবসময়ই জিলিপির মতো প্যাঁচ মেরে কথা বলে! পিৎজা সিরিয়াল কিলিং কেসে ও সত্যিই ভালো ব্যাক-আপ দিয়েছিল। তার ওপর ডঃ চ্যাটার্জির প্রিয় পোষ্য ‘দ্রিঘাংচু’ নামক কাকাতুয়াটিকেও এই ঘন্টুই এনে দিয়েছিল। বহু বছর ধরে টিম অধিরাজের সঙ্গে কাজ করছে। প্রায় কুড়ি বছরের এক্সপেরিয়েন্স ওর। কলকাতায় নতুন সুপারি কিলার আসুক, কিংবা একটা নতুন ভিখারি, তার সদাসতর্ক কানে সে খবর পৌঁছবেই। তাই ঘন্টু খবরি মহলে প্রায় সুপারস্টার। মদনের টিপটা ও-ই দিয়েছিল। এখন বার্নিং শিখকে খুঁজতেও মাঠে নেমেছে।
একটু আগেই ব্যুরোয় খবরিদের নিয়ে একটা মিটিং হয়ে গিয়েছে। সেখানে ঘন্টু, যাদব, গুল্লু, ইসমাইল এবং রকি উপস্থিত ছিল। এদের মধ্যে ঘন্টু, যাদব ও গুল্লু সরাসরি অধিরাজ ও অর্ণবের সঙ্গে যুক্ত। ইসমাইল ও রকি প্রণবেশ লাহিড়ীর ইনফর্মার। এরাই এই মুহূর্তে ইনফর্মার ওয়ার্ল্ডের হিরো। কোড নেম,পঞ্চপান্ডব। ওদের মধ্যে মোটামুটি দায়িত্ব ভাগ করে দিচ্ছিল অধিরাজ। গুল্লু তথা গুলাব সিং জাতে শিখ। সেই জন্যই অধিরাজ তাকে নির্দেশ দিয়েছে, “কলকাতার সবক-টা গুরুদ্বারায় গিয়ে খবর নিবি যে গত এক বছরে কোনো নতুন সর্দারজি সেখানে মাথা ঠেকাতে আসছে কিনা?”
গুল্লু মাথা চুলকে বলল, “স্যার, একবছর ধরে যে আসছে তাকে নতুন কীভাবে বলা যায়! তাছাড়া বার্নিং শিখ যে গুরুদ্বারায় যাবেই এমন কোনো গ্যারান্টি আছে?”
“তুই সাচ্চা শিখ?”
বুলেটের মতো প্রশ্নটা ধেয়ে গেল গুল্লুর দিকে। সে ঢোঁক গিলে বলে, “হ্যাঁ হুজুর। আমি সাচ্চা শিখ।”
“নিয়ম করে গুরুদ্বারায় যাস?”
“একদম সাহেব।” গুলাব সিং জিভ কাটছে, “গুরুদ্বারায় যাব না তা কী হয়?
সারাদিন ধরে যত পাপ করছি, তা রবজির কাছে গিয়ে ধুয়ে না-এলে নরকে যাব যে!” “বার্নিং শিখও সাচ্চা শিখ এবং সে সমস্ত বুঝেশুনেই খুন করছে। লক্ষ্য করে দ্যাখ, ছেলেদের পাশাপাশি সে মেয়েদেরও খুন করেছে, কিন্তু রেপ করেনি। করলে কোনো-না কোনো ফরেনসিক রিপোর্টে ঠিকই পাওয়া যেত। ১৯৮৪-এ শিখ মেয়েদের রেপও করেছিল এরা। সে বদলা নিতেই পারত। নেয়নি। তার ওপর অতগুলো লোককে মারার পর বাড়িগুলো অলমোস্ট ফাঁকাই পড়েছিল। প্রত্যেকের বাড়িতেই টাকা, গয়না, কিছু-না কিছু দামি জিনিসপত্র ছিল। কিন্তু একটা জিনিসও চুরি যায়নি। আজ পর্যন্ত কোনো ধর্মভীরু সাচ্চা শিখ চুরি করেনি, জুয়া খেলেনি কিংবা রেপ করেনি। কারণ শিখ ধর্ম এগুলোকে পাপ হিসাবেই গণ্য করে। আমাদের মক্কেল ধর্মভীরু তাই চুরি, ডাকাতি বা রেপ কোনোটাই করেনি। কিলোদরে খুন করছে ঠিকই, তবে সেটাকে দোষীদের শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতি হিসেবে জাস্টিফাই করেছে। তবুও মনের শান্তির জন্য সে গুরুদ্বারায় যাবে না তা কি সম্ভব?”
“না। গুরুদ্বারায় সে যাবে। আপনি একজন ধর্মভীরু শিখকে ঠিকই চিনেছেন।” গুল্লু এবার একমত হল, “কিন্তু স্যার, একবছরটাও তো কমদিন নয়। ‘নতুন মুখ’ হিসাবে তাকে কেউ চিনবে কী করে? তাছাড়া হুলিয়া এতই মামুলি যে ঘন্টুর সঙ্গেও মেলে, রকি, ইসমাইলের সঙ্গেও মেলে, এমনকি আমার সামনে আয়না রাখলেও ওই একই হুলিয়া দেখতে পাব।”
“ঠিক চিনবে। দোকানি আর ভিখিরিরা নিয়মিত ভিজিটরদের ঠিকুজি কুলুজি রাখে। তাছাড়া শিখদের চেহারা একটু বড়োসড়োই হয়। তার মধ্যে একটা মামুলি চেহারা দেখলে আরও বেশি মনে রাখা উচিত। একটু ঘাম ঝরা, মাথাটা খাটা, পেয়ে যাবি। নয়তো তুই আছিস কী করতে গুলাবোঁ?”
গুল্লুর মুখ ‘গুলাবোঁ’ শুনে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, “স্যার, গুলাবোঁ নামটা মর্দানা নয়। কেমন যেন জনানি লাগে। তার থেকে আমি গুল্লুই ভালো আছি। আপনার কাজ হয়ে যাবে।”
অধিরাজ সামান্য আশ্বস্ত হয়। এর আগে ফোবিয়া মার্ডার কেসেও গুল্লু চমৎকার কাজ দেখিয়েছে। এবারও দেখাবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অধিরাজের দৃষ্টি এবার ইসমাইল আর রকির দিকে ঘুরল, “তোদের কাজটা একটু কঠিন। তাই দু-জনে মিলেই করবি। জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠী, পি সি চৌধুরী ও এক্স আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তার সমস্ত ঠিকুজি-কুলুজি বের করতে হবে। পি সি চৌধুরী ও ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে কে কখন আসছে, কী করতে আসছে, কখন বেরোচ্ছে, কত ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে, সবার নাম, ধাম সমেত ডিটেইলস আমাদের আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চাই। প্রত্যেকের ওপর নজর রাখ। তারা কী করে, কী খায় ও বাড়িতে ঢোকার আগে কোথা থেকে আসে, ও বেরোনোর পর কোথায় যায়, সব খবর চাই। ওদের মধ্যে কেউ লেফটি হলে তাকে আরও বেশি নজরে রাখবি। যাকে সন্দেহজনক মনে হবে তার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকবি। শ্যাডো করবি। ক্লিয়ার? আমাদের হাতে কিন্তু খুব কম সময়। যে-কোনো মুহূর্তে অ্যাটাক হতে পারে।”
কাজটা সত্যিই কঠিন। তবে ইসমাইল ও রকি দু-জনেই এ বিষয়ে ওস্তাদ। ওরাও অত্যন্ত অভিজ্ঞ ইনফর্মার। আগেও বহুবার এ কাজ করেছে। তাই কোনো কথা না বলে দু-জনেই মাথা নাড়ল। অর্থাৎ কাজ হয়ে যাবে।
“যাদব আর ঘন্টু, তোরা কেরোসিন তেলের ব্ল্যাক মার্কেটে ঘোরাঘুরি কর।” সে বলল, “যেভাবে লোকটা কিলোদরে পুড়িয়ে মারছে তাতে ওর জ্বালানির প্রয়োজন হবে। এখনও পর্যন্ত ও পেট্রোল বা ডিজেলের ব্যবহার করেনি। কেরোসিন তেলটাই ইউজ করছে। পাতা লাগা এত কেরোসিন তেল আসছে কোথা থেকে! নিশ্চয়ই এটা ও র্যাশন দোকানে লাইন লাগিয়ে একটু একটু করে আইনিভাবে তুলে জমায়নি। অত্যন্ত চালাক লোক। কোনোরকম কাগজপত্র বা সাক্ষ্য-সাক্ষী রাখবে না। পেট্রল পাম্পেও যাবে না। তাই নির্ঘাৎ বে-আইনিভাবেই পুরো কোটা একসঙ্গে তুলেছে। কোথা থেকে, কার কাছ থেকে তুলেছে সেটাই জানার।”
ঘন্টু এতক্ষণ একমনে কী যেন ভাবছিল। এবার মুখ তুলে বলল, “কেরোসিনের ব্ল্যাক মার্কেটে তিনদিন আগে একটা খবর খুব উড়ছিল স্যার। আপনাদের কানে আসেনি?”
“আসেনি। তবে তুই চাইলে এবার আসবে।” অধিরাজ ঠোঁট টিপে হাসল। এই খবরিটি তার অত্যন্ত পরিচিত। আগেই মনে হয়েছিল কিছু-না কিছু খবর অলরেডি ওর কাছে নিশ্চয়ই থাকবে। সে বলল, “এমনি এমনিই কানে তুলবি? না তোর ফেভারিট মাখন মারতে লাগবে!”
“হেঁ হেঁ হেঁ।” ঘন্টু বিনয়ে বৈষ্ণব হয়ে হাত কচলাচ্ছে, “সঙ্গে একটা কোল্ডড্রিঙ্কস।”
“বেশ। অর্ণব।” অধিরাজ সহাস্য দৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকায়। সে প্রায় পোষা বিড়ালের মতো অধিরাজের গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়েছিল। এবার ইশারা বুঝতে পেরে আস্ত ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেটটাই ঘন্টুর দিকে এগিয়ে দেয়, “মাখন নে। কোল্ডড্রিঙ্কস বলে দিচ্ছি। বাকিদের জন্যও আসবে।”
“হাই শা!” ঘন্টু অবাক। সে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, “বড়ো স্যার তো সিগারেটের কথা উচ্চারণও করেননি, আর আপনি তাতেই বুঝে গেলেন! আমার বউও এমনভাবে মনের কথা বোঝে না!”
“তোর বউয়ের কথা পরে শুনব।” অধিরাজ এবার ধমক দেয়, “কাজের কথাটা এবার বল্।”
“স্যার, কেরোসিনের ব্ল্যাক মার্কেটের একটা বড়ো চাঁইয়ের নাম প্রকাশ আপ্তে। লোকটা অবাঙালি। কিন্তু কেরোসিনের ডিলার হয়ে পোচুর টাকা করেছে। কানে এসেছিল, তার দোকান থেকে নাকি দিন তিনেক আগে প্রায় কুড়ি লিটার তেল হাওয়া হয়ে গিয়েছে!”
“কুড়ি লিটার! মাই গড!” বিস্ময়ে অধিরাজের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়, “বলিস কী! এতটা কেরোসিন চুরি হয়ে গেল অথচ কেউ কিছু জানল না? চোরকে কেউ দেখেনি?”
‘দেখেছে স্যার। তবে তেল চুরি যায়নি। হাপিশ হয়ে গিয়েছে।”
ঘন্টুর কথার ধরণ শুনে দুই অফিসারের ভুরু কৌতূহলে কুঁচকে যায়। অধিরাজ বলল, “মানে? চুরি না হলে হাপিশ কী করে হয়ে যায়?”
‘সেটা স্যার আপ্তের মুখ থেকেই শুনতে হবে আপনাকে।” ঘন্টু সিগারেটটা মুখে গুঁজে বুক পকেট চাপড়ে দেশলাই খুঁজছে দেখে অর্ণব তার দিকে অধিরাজের লাইটারটা ছুড়ে দেয়। সে লুফে নিয়ে আরাম করে সিগারেটটা জ্বালিয়ে বলল, “আমি হয়তো ঠিকঠাক বলতে পারব না। ও আমাকেও সবকথা খুলে বলেনি। স্রেফ কয়েকদিন ধরে বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে আছে। মার্কেটেও আসছে না। দু-বেলা ব্যাটা স্রেফ রাম নাম জপছে!”
“সেকী!” সে বিস্মিত, “তুই ওর বাড়িটা চিনিস?” “হ্যাঁ স্যার।”
সেই কথামতোই ঘন্টু ওদের নিয়ে এসেছে আপ্তের বাড়িতে। সে মিথ্যে বলেনি। প্রকাশ আপ্তের বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় লোকটা টাকার কুমীর। বাড়িটা বিশাল বানিয়েছে। যদিও বিশেষ রুচিবোধ নেই। ওর বউ এক গলা ঘোমটা দিয়ে এসে হিন্দিতে বলল, “উনি খুব অসুস্থ। ঘর থেকেই বেরোচ্ছেন না। রকেল নেহি মিলেগা।” অর্ণব সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকায়। সে ‘রকেল’ জিনিসটা কী তা বুঝতে পারেনি। অধিরাজ চাপা স্বরে তার কানে ফিশফিশ করে বলে, “রকেল মানে কেরোসিন।”
“হাম লোগ ইয়াহাঁ মিট্টি কা তেল খরিদনে নেহি আয়ে হ্যায় ভাবিজি।” ঘন্টু দু-হাত জোড় করে সসম্ভ্রমে বলল, “এই দুই স্যার আপ্তে সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। ওঁরা সি.আই.ডি.-র লোক।”
অর্ণব এই ফাঁকে ভদ্রমহিলার মুখ দেখার চেষ্টা করছিল। বাহুতে একটা খোঁচা খেয়ে হেঁচকি তুলে থেমে গেল। পাশ থেকে অধিরাজ ফের চাপা গলায় বলল, “এভাবে মারাঠি বউদের দেখার দুষ্টুমি করতে নেই ডার্লিং। ওর ঘরওয়ালা জানতে পারলে তোমার আর আমার কপালে রিষ্টি আছে।”
যা-ই হোক। সি.আই.ডি.-র লোক শুনে ভদ্রমহিলা বোধহয় একটু আশ্বস্ত হলেন। ওঁর বোধহয় ধারণা যে সি.আই.ডি.-র লোকেরা লুচ্চা, লফঙ্গা হয় না। তাই নিজেই এবার ঘোমটা খুলে নিজের চাঁদমুখ দেখালেন। সসম্ভ্রমে বললেন, “আইয়ে।”
প্রকাশ আপ্তে নিজের ঘরেই চুপচাপ বসে ছিলেন। ঘন্টুর সঙ্গে অপরিচিত আরও দু-জনকে দেখে তাঁর চোখে কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময় ফুটে উঠল। অর্ণব লক্ষ্য করল, ভদ্রলোকের মুখটা কেমন যেন চাইনিজ মুখোশের মতো! গায়ের রং মঙ্গোলিয়দের মতোই পীতাভ ফর্সা। অন্ধকারে এইরকম ফ্যাকাশে রক্তহীন মুখ আচমকা দেখলে যে কেউ ‘বাপ রে’ বলে লাফিয়ে উঠবে। গলার স্বরও তেমনই ভয়ানক। যে কণ্ঠস্বরটা ওঁর মুখ দিয়ে বেরোল সেটা একমাত্র ব্যাঙের ল্যারিংজাইটিস হলে তবেই বেরোতে পারে। অবাক হয়ে বললেন, “আপ লোগ?”
ঘন্টু শ্রদ্ধাবিনীত কণ্ঠে অধিরাজ-অর্ণবের পরিচয় দিল। প্রকাশ আপ্তের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এখনই কেঁদে ফেলবেন। কোনোমতে হাঁউমাউ করে বললেন, “সি.আই.ডি. কিন্তু স্যার, আমি তো রকেলের ব্যাবসা তিনদিন আগেই বন্ধ করে দিয়েছি। মরে যাব, কিন্তু ও ব্যবসা আর করব না। এমনিতেই মরে আছি। তার ওপর আমাকে জেলে পুরবেন না! তাহলে একদমই মরে যাব।”
অর্ণব ফের ফুসফুস করে, “এখনই যদি মরে থাকে তাহলে আর মরবে কী করে?” “মরা বাবা গো, যেও না মরে, কেস!” অধিরাজ নির্লিপ্ত মুখে কথাটা ছুড়ে দিয়েই ভদ্রলোককে হাওয়া দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, “আমরা আপনাকে জেলে পুরতে আসিনি আপ্তে সাব। জাস্ট ইনফর্মেশন নিতে এসেছি। শুনলাম আপনার দোকান থেকে কুড়ি লিটার কেরোসিন চুরি গিয়েছে…!”
“না… না! তিনি মাথা নাড়লেন “ঘাসলেট চুরি যায়নি সাব। হাওয়া হয়ে গিয়েছে।” ফের হাওয়া হয়ে গিয়েছে। অধিরাজ এবার অধৈর্য হয়ে উঠেছে, “হাওয়া হয়েছে মানে? চোখের সামনে থেকে ভ্যানিশ হয়েছে?”
“না!” আপ্তে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন- “ওই লোকটা নিয়ে গেছে।”
“কে?”
আপ্তে হিন্দিতে থুতিয়ে থুতিয়ে যা বললেন তার সারমর্ম কিছুটা এরকম। তিনদিন আগে তিনি নিজের বে-আইনি কেরোসিনের গুমটিতে বসেছিলেন। তখন বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। সারাদিন ধরে বহু লোক খুচরো তেল প্রায় দ্বিগুন দাম দিয়ে কিনে নিয়ে গিয়েছে। যথেষ্ট লাভও হয়েছে। ওদিকে ঘরওয়ালি বারবার ফোন করছিল। তাই তিনি ঝাঁপ টাপ ফেলে বাড়ির পথ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই চাদরে মোড়া এক ব্যক্তি দুটো বড়ো নোট নিয়ে এসে হাজির। আপ্তের জবানিতে, “সাব, আমার কাছে তখন অত ‘চিল্লর’ ছিল না! আজকাল লোকে আবার অনলাইন পে-ও করে তাই খুচরোর ঝিকঝিক নেই। আমি বললাম, ফেরত দিতে পারব না। সে বলে কিনা, পুরোটাই রেখে দাও। কিন্তু কুড়ি লিটার কেরোসিন দাও। ভাবলাম কোনো বড়ো শেঠ-টেঠ হবে। লোকটার মুখের দিকে একঝলক তাকিয়েছিলাম। ঠিক তখনই মুখের চাদরটা আচমকা সরে গিয়েছিল! আপনি ভাবতে পারবেন না সাব, সে কী চেহারা একদম খতরনাক!… “
অধিরাজ আর অর্ণব হাড়ে হাড়েই বুঝতে পারছিল। কারণ আপ্তের ভাবলেশহীন মুখটাই ভয়ের এক্সপ্রেশনে যেরকম ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তাতে এখন ওঁকে দেখলেই লোকে ভূত ভেবে অজ্ঞান হয়ে যাবে! এইরকম মুখের মালিকও যে মুখটা দেখে ভিরমি খায়, সে নিঃসন্দেহে ‘খতরনাক!’
“আমি স্ট্রেট ওখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম।” আপ্তে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, “ও মুখ দুঃস্বপ্নেও কেউ কল্পনা করতে পারে না! ওকে আমার মানুষ বলে মনে হয়নি। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ওখান থেকে ‘রফু চক্কর’ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মালগুলো ওখানেই পড়ে ছিল। একঘণ্টা আমার কোনো হোঁশই ছিল না। করিব করিব দেড়ঘণ্টা পরে পা টিপে টিপে ফের গুমটিতে যখন ফিরে গেলাম তখন ও লোকটা হাওয়া। তার সঙ্গে আমার দুটো দশ লিটার রকেলের কন্টেনারও। তবে চুরি বলতে পারি না। কারণ সে মানুষ বা ভূত যাই হোক, দুটো বড়ো নোটই ওখানে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রেখে গিয়েছিল।”
“শরিফ ভূত বলতে হবে।” ঘন্টু নিস্পৃহ মুখে বলে, “কুড়ি লিটার বলে কুড়ি লিটারই নিয়েছে। আরও বেশি নিতে পারত। খুল্লা পয়সা নিয়েও ঝামেলা করেনি। এমন আরও গোটা চার পাঁচ কাস্টমার হলে তুমি তো লাল হয়ে যাবে আপ্তে শেঠ।”
“দেবা রে দেবা!” আপ্তে হাতজোড় করে ফেলেছেন, “অমন শরিফ কাস্টমারে আমার কাজ নেই ভাই! আমি এখন থেকে কিরানার দুকান দেব। ইমানদারির রাস্তায় রেশনের জিনিস বিক্রি করব। তাতে খেতে পাই তো ভালো, নয়তো ভিক্ষা করে খাব। তবু ও লাইনে আর যাচ্ছি না! রাম… রাম… রাম!”
আপ্তের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অধিরাজ বলল, “ভদ্রলোক আয়নায় নিজেকে দেখে ভয় পান না?”
ঘন্টু হেসে ফেলে, “ওঁর খবর জানি না। তবে ভাবিজি নাকি ফুলশয্যার দিন ফিট পড়েছিল। বোধহয় ওই মুখ দেখেই।” সে একটু থেমে বলল, “স্যার, ফুলশয্যার কথায় মনে পড়ল, আমার ছেলেটার পরের মাসে বিয়ে। আপনাকে নেমন্তন্ন করলে আসবেন?”
ঘন্টুর এত বড়ো ছেলে আছে তা অর্ণবের জানা ছিল না। অধিরাজ অবশ্য খবরটা আগেই জানত। সে বিন্দুমাত্রও অবাক না হয়ে তার হাতে কয়েকটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, “মেনুর ওপর নির্ভর করছে। তবে যদি ডিনারে চাউমিন রাখিস তবে আমার কান যাবেই। আর কান টানলে মুণ্ডুও আসে। অতএব আমাকে নিয়ে যেতে হলে চাউমিন মাস্ট।”
ঘন্টুর হাসিটা আরও চওড়া হল, “অর্ণব স্যার চাউমিন খেতে ভালোবাসেন? তবে তো রাখতে হবেই।”
অধিরাজ উত্তর না দিয়ে অর্থপূর্ণ হাসল। কথাটা এড়িয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল, “এটা জোর খবর দিলি ঘন্টু। তবু তুই আর যাদব কান খাড়া রাখিস। কুড়ি লিটার নিয়ে গিয়েছে মানে এই নয় যে আরও লাগবে না। কিছুটা তো ত্রিপাঠীজির বাড়িতেই ঢেলে দিয়েছে। কেরোসিনের গন্ধে ঢেঁকাই দায় হয়েছিল। হয়তো কম পড়তে পারে।”
“ওকে স্যার।”
ঘন্টু স্যালুট ঠুকে চলে গেল। অধিরাজ এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়েছে, “কী বুঝলে?”
“প্রেতাত্মা হোক কী মানুষ, সাচ্চা শিখ কখনও চুরি করে না!” অর্ণব বলল, “এ লোকটা সত্যিই ধর্মভীরু শিখ। অন্য কেউ হলে আপ্তে পালিয়ে যাওয়ার পর পুরো মালই ঝেড়ে দিত, টাকা রেখে যেত না। ওর চরিত্রটা আপনি একদম ঠিক ধরেছেন স্যার।”
“এই তো! তুমি বুঝতে পেরেছ ডার্লিং!” অধিরাজ মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, “এই আনন্দে আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি?”
“নিশ্চয়ই পারেন। তবে লাঞ্চের পর।” অর্ণব একটু কড়া গলায় বলল, “কারণ এরপর আপনি লাঞ্চের পর আর একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য বায়না করবেন। একটা অলরেডি ল্যাবেই হয়ে গেছে স্যার।”
“ওকে বস্। ওকে!” অধিরাজ পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করতে করতে বলল, “আমি বার্নিং শিখকে কতটা চিনেছি জানি না, কিন্তু তুমি যে হাড়ে হাড়ে আমায় চিনেছ তাতে আমার নাভিশ্বাস উঠছে। সিগারেট আমার মাথায় থাক। ওদিকের আপডেট একবার নিয়ে নিই বরং।”
ওদিকে অবশ্য সি.আই.ডি. হোমিসাইড নীরবে অথচ দ্রুতগতিতে নিজের শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছে। পি সি চৌধুরীর বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেই একটা নতুন রিক্রুটমেন্ট হয়েছে। ওঁর স্ত্রী’র একমাস আগে বাথরুমে পড়ে গিয়ে হিপ জয়েন্ট ভেঙেছে। অপারেশনের পর থেকেই তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। এমতাবস্থায় তাঁর বাড়িতে একজন চব্বিশ ঘণ্টার নার্সের দরকার ছিল। কিন্তু সেরকম শিক্ষিত নার্স পাওয়া যাচ্ছিল না। থাকার মধ্যে আছে এক বুড়ি রাঁধুনী কমলা ও ঠিকা কাজের লোক শিখা। তারা কোনোমতে এতদিন গিন্নীকে সামলাচ্ছিল। কিন্তু মালকিনের কিছুতেই তাদের কাজ পছন্দ হয় না। তাঁর মতে শিখা অত্যন্ত ফাঁকিবাজ। নাকের ওপর চশমা এঁটে শুধু বিবিগিরিই করতে পারে। এবং কমলা বয়েসের ভারে ন্যুব্জ। ওর চেয়ে কচ্ছপও দ্রুত গতিতে চলে। দশটার আগে সে ঢোকেই না! তাই একরকম বাধ্য হয়েই চৌধুরী সাহেব এক পরমসুন্দরী ও তরুণী নার্স আমদানি করেছেন। আজ সকাল আটটাতেই সে জয়েন করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই বুড়োর বাড়িতে সুন্দরী নার্স এলে প্রতিবেশীরা চোখ গোলগোল করে দেখবেই! তার ওপরে চলনে বলনে দারুণ স্মার্ট। অন্য দু-জন পরিচারিকার প্রতিক্রিয়া এখনও জানা যায়নি কারণ তারা একটু বেলা করেই আসবে। কিন্তু কম্বাইন্ড-হ্যান্ড শিবুর খুদে খুদে চোখ নাকি এক ধাক্কায় বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছে।
পবিত্রর বর্ণনা শুনে হাসছিল অধিরাজ। হাসতে হাসতেই বলল, “তুমি কোথায় আছ?”
“আমি ওঁর বাড়ির ঠিক উলটোদিকের বাড়িটাতেই নতুন ভাড়া এসেছি। ব্যাচেলর মানুষ! প্রতিবেশীর সুন্দরী নার্সকে দেখার জন্য একটু কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি মারতেই পারি।” পবিত্র বলল, “তবে আমার বউ জানতে পারলে কেলো হবে রাজা! একটা মারও বাইরে পড়বে না। এমনিতেই সানি লিওনিকে নিয়ে তার অভিযোগের শেষ নেই। তার ওপর সুন্দরী নার্সকে ঝাড়ি মারছি জানলে ব্রুস লির ভাইঝি চুপ্ লি আমার রক্ত ভ্যাম্পায়ারের মতো চুষে নেবে।”
এবার সজোরে হেসে উঠল সে, “সুন্দরী নার্সটি কোথায়? তাঁর কোনো খবর আছে?”
“দাঁড়াও। তাঁকেও ধরছি।”
কিছুক্ষণের জন্য কলটা হোল্ডে চলে গেল। তারপরই কনফারেন্স কলে শোনা গেল কৌশানী বোসের জলতরঙ্গের মতো কণ্ঠস্বর, “হ্যালো স্যার…!”
“হ্যালো মিস্…!” অধিরাজ থমকে গিয়ে একটু বিব্রত হয়ে অর্ণবের দিকে তাকায়, “কী যেন!”
গ্রামাফোন রেকর্ড ফের আটকে গিয়েছে দেখে অর্ণব খেই ধরিয়ে দেয়, “মিস্ বোস।”
“ইয়েস …মিস্ বোস্। নতুন চাকরির জন্য অভিনন্দন।” সে বলল, “পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন বুঝছেন?”
“ঠিকঠাক স্যার।” কৌশানীর কণ্ঠস্বরে উচ্ছ্বাস, “কিন্তু বুড়ো একনম্বরের বদমাশ ঘুঘু! বেশ রসের কথাবার্তা বলতে পারেন। বলেছেন, মাঝেমাঝে যেন আমি ওঁকেও একটু বডিমাসাজ দিই।”
পবিত্র খেপে গিয়ে বলে, “বুড়োর আহ্লাদ দেখো! বার্নিং শিখকে খবরটা দিয়ে দিও রাজা। সে সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে সুন্দর করে বডিমাসাজ দিয়ে দেবে।”
“মাসাজের ব্যাপারটা মিস্ বোস বুঝে নেবেন। তোমার এত চটার কী হল!” অধিরাজ শান্তস্বরেই বলে, “বুড়ো যা-ই বলুক সেনোরিটা, সবসময়ই সজাগ থাকবেন। আগামী কয়েক দিনের জন্য আপনার রেস্ট নেই। ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটা ঘর সার্চ করুন। সন্দেহজনক কিছু দেখলে ইনফর্ম করুন। কোনোরকম ধোঁয়া দেখলে, বা কাশি পেলে বা কাউকে একটু বেশিই কাশতে দেখলেই আমাদের জানাবেন। আপনার জামার বোতামের স্পাই ক্যামটা সাবধানে রাখবেন। পবিত্র আপনার থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে বসেই ল্যাপটপে মনিটরিং করছে। কোনোরকম গোলমাল দেখলেই পৌঁছে যাবে। আর আপনার বিশ্বস্ত সঙ্গীটা সঙ্গেই রেখেছেন তো? লোকটা কিন্তু বিপজ্জনক।”
“এভরিথিং ইজ ওকে স্যার। ডোন্ট ওরি।” কৌশানীর কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, “সব একদম হাতের কাছেই রেখেছি।”
“আর…ইয়ে….মানে…!” অধিরাজ মাথা চুলকোচ্ছে, “নার্সিংটা অল্প স্বল্প জানেন তো? দেখবেন, বুড়িকে আবার উলটোপালটা ওষুধ দিয়ে দেবেন না। উনি টপকে গেলে বার্নিং শিখ কী করবে জানি না, কিন্তু বুড়ো ঘুঘু আমাদের ধরে লটকে দেবে।”
“না!” নারীকণ্ঠের লাস্যময় হাসির শব্দ ভেসে এল, “তেমন চান্স নেই। আমার মা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁর নার্সিং আমিই করতাম। ওটা কাজ চালানোর মতো পারি।”
“ফাইন।” সে গম্ভীর স্বরে বলল, “পবিত্র, আর্বানার খবর কী? অফিসার লাহিড়ীকে ধরো তো।”
এদিকে যেমন পি সি চৌধুরীর বাড়িতে নতুন নার্স এসেছে, তেমনই আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে এক তরুণী রাঁধুনী আমদানি হয়েছে। ব্রেকফাস্টে তার রান্না খেয়ে বাড়ির লোকেরা মুগ্ধ৷ রন্ধন পটিয়সীটিকে পেয়ে গিন্নীও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। এ বাড়ির সকলেরই আবার স্বাদেন্দ্রিয় প্রখর। খাদ্যরসিকদের ভুরু পান থেকে চুন খসলেই বেঁকে যায়। এ বাড়িতে একটিই চব্বিশ ঘণ্টার লোক আছে। সে আবার নেপালি! সুন্দরী কুককে দেখে সে এবং ভূপেন্দ্র’র জামাতা বিরূপাক্ষ বেজায় খুশি হয়েছে। গিন্নীমার কাছ থেকে জানা গিয়েছে এ বাড়িতে প্রতিবেশীদের যাতায়াতই বেশি। ভূপেন্দ্র-র দাবা খেলার নেশা। তিনি দাবা খেলার লোক পেলেই ঘুটি পেতে বসে পড়েন।
কৌশানীকে যা যা নির্দেশ দিয়েছিল অধিরাজ, নতুন রাঁধুনীকেও সে সবই বলল। ভূপেন্দ্র দত্তার উলটোদিকের ফ্ল্যাটেই বসে আছেন অফিসার লাহিড়ী। মিস্ দত্তের পোষাকেও একটি স্পাই ক্যাম ফিট করা আছে। অফিসার লাহিড়ী সেটা চব্বিশ ঘণ্টা মনিটরিং করে আপডেট দিতে থাকবেন।
“সাবধানে থাকবেন মিস্ দত্ত।” সে বলল, “আগামী দিনগুলোয় সব কিছু ঘটতে পারে। আই রিয়েলি মিন- সব কিছু। পুরোটাই হয়তো আপনার এক্সপেক্টেশন ও ইম্যাজিনেশনের বাইরে।”
“চিন্তা করবেন না স্যার।” আত্রেয়ীও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, “আমি একজন কপ্। তাই কাউকেই ছাড়ব না। সবাইকেই রাডারে রাখছি।”
“গুড।”
অধিরাজ ফোনটা কেটে দিয়ে এবার অর্ণবের দিকে মনোনিবেশ করে, “সবাই সবার জায়গায় সেট হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু আমাদের দু-জনের সেট হওয়ার অপেক্ষা। তার আগে চলো, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।”
বলেই সে রাস্তার উলটোদিকে একটি নামকরা চাইনিজ রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটা মেরেছে। অর্ণব অবাক হয়ে বলল, “এখন চাইনিজ?”
“হ্যাঁ।” অধিরাজ মুখ টিপে হাসল, “ওদিকে বুড়ো ঘুঘু মিস বোসকে পটাচ্ছে আর আমি তোমাকে পটানোর চেষ্টা করছি। যদি দয়া করে এখন একটা সিগারেট খেতে দাও। কারণ প্রকাশ করি আর না করি, আমি সত্যিই টেনশনে আছি।” “কেন?”
তার মুখে চিন্তার আভাস, “আজ রাতটা খুব ভাইটাল অর্ণব। আমার মন বলছে, আজ রাতে কিছু ঘটতে পারে।”
অর্ণবের মুখেও এবার উত্তেজনা, “আজ অ্যাটাক হবে?”
“হতে পারে। আবার না-ও পারে।” সে চিন্তামগ্ন স্বরে উত্তর দেয়, “পুরোটাই আমাদের ওপর ডিপেন্ড করছে।”
“মানে?”
“মানে যদি আজ আমরা তার প্ল্যানে বাগড়া দিতে পারি, তবে হয়তো আজ রাতটার জন্য সবাই রক্ষে পাবে।”
“তার প্ল্যান কী সেটা আপনি জানেন?” অর্ণব বিস্মিত।
“সবটা জানি না। যেটুকু আন্দাজ করতে পারি সেটা আমি কেন, তুমিও জানো।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলে, “দেখো, খুনগুলো আসলে কীভাবে হয়েছে তা আমরা এখনও জানি না। ওয়েটা এখনও অজানা। কিন্তু তার স্টাইল সে বজায় রাখবে। অর্থাৎ এবারও নেকলেসিং করার চেষ্টা করবে। নেকলেসিং করতে যে দুটো পদার্থ লাগে তার মধ্যে একটা অলরেডি তার স্টকে রয়েছে। যথেষ্ট পরিমাণে কেরোসিন এখনও তার কাছে রয়েছে। তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আরও একটি জিনিস রয়েছে যেটা ওভাবে স্টক করে ঘরে রাখা যায় না।” সে যেন একটা অঙ্ক মেলাচ্ছে—“টায়ার! কেরোসিনের কন্টেনার তুমি কিচেনে বা স্টোর রুমে লুকিয়ে রাখতে পারো। কিন্তু বিরাট বিরাট টায়ার কোথায় রাখবে? একটা দুটো রাখা তেমন সমস্যা নয়। কিন্তু যদি একডজন টায়ার রাখতে হয় তবে তার জন্য একটা আস্ত গ্যারাজ ভাড়া করা ছাড়া উপায় নেই। আমি যদি ঠিক বুঝে থাকি, তবে সে ওরকম দিনের পর দিন গ্যারাজে টায়ার ফেলে রাখবে না। এমনকি তার যদি নিজের গ্যারাজও থাকে তবুও রাখবে না। কারণ ওটা লোকের নজরে খুব সহজেই পড়ে। আর এই মুহূর্তে বার্নিং শিখের নেকলেসিং এর স্টাইল এ শহরের হেডলাইন।
এত বড়ো রিস্ক সে নেবে না। আবার প্যাটার্নও ভাঙতে চাইবে না।”
অর্ণব চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল। টায়ারের কথা তার মাথায় সত্যিই আসেনি। সত্যিই তো! টায়ার তবে কোথা থেকে আসছে? ইনফ্যাক্ট এই জাতীয় সাবধানী চরিত্রের মানুষ কোনো কার মেকানিকের গ্যারাজ থেকেও টায়ার কিনবে না। তাছাড়া একেকবারে ছ-টা, সাতটা টায়ার সে ব্যবহার করছে। এরকম গণহারে টায়ার তো একজন মেকানিকের কাছেও পাওয়া যাবে না। তবে গোটা শহর ঘুরে ঘুরে তাকে একেকটা টায়ার কিনতে হবে, যেটা হাস্যকর আইডিয়া!
“একমাত্র একটাই রাস্তা আছে।” অধিরাজ ভাবছে, “আমি যদি তাঁর জায়গায় থাকতাম তবে আশেপাশের কোনো বেসরকারি বা ইললিগ্যাল কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ড থেকে টায়ার তুলতাম। তা-ও বেশি আগে নয়। খুন করার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে। আর আজ দুপুর থেকে গোটা রাত তুমি, আমি, পবিত্র আর লাহিড়ীবাবু আলিপুরে পি সি চৌধুরীর বাড়ির কাছের আর আর্বানার সবচেয়ে কাছাকাছি ইল্লিগ্যাল বা প্রাইভেট ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে ওঁত পেতে বসে থাকব।”
“কিন্তু এরকম তো অনেকগুলো ডাম্পিং গ্রাউণ্ড থাকবে!”
সে মাথা নাড়ল, “না। আমি অলরেডি ম্যাপ সার্চ করে দেখেছি। আলিপুরে দুটো আর আর্বানার কাছে মাত্র একটা আছে। আলিপুরের লোকেশনের সবচেয়ে কাছের গ্রাউণ্ডে তুমি আর আমি থাকব, পাশেরটায় পবিত্র। আর্বানার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে প্রণবেশ লাহিড়ী থাকবেন। এখনই খাওয়া-দাওয়া করে সবাই সেট হয়ে যাব। ওখানে বসে ধূমপান করলে আমাদের মক্কেল টের পাবেন। তাই তুমি যদি অনুমতি দাও তবে এখনই কোটার দুটো সিগারেট আরাম করে টেনে নিই।”
অর্ণব কোনো কথা না-বলে তার হাতে ব্র্যান্ড নিউ ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেট আর লাইটার ধরিয়ে দিয়ে বলে, “আপনি শিওর সে আসবে?”
“নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট চান্স আছে যে আসবে। আর এক পার্সেন্ট তার মর্জি।” অধিরাজের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল, “আর ওটাই আমাদের একমাত্র সুযোগ তাকে ধরার বা প্ল্যান ভেস্তে দেওয়ার, যেটা সে একেবারেই প্রত্যাশা করছে না! তার মাথায় পুলিশ প্রোটেকশন আছে, পালটা চাল দেওয়ার প্রব্যাবিলিটি নেই। সো, লেট্স সারপ্রাইজ হিম!”
অর্ণবের বুকের ভেতরটা আবার গুড়গুড় করে ওঠে।
সম্মুখ সমর?
