কালরাত্রি – ৮

(৮)

“অফিসার ব্যানার্জি, আপনি একটু স্থির হয়ে বসবেন প্লিজ?”

আহেলি অধিরাজের ক্ষতস্থান স্টিচ করতে করতে তাকেই ধমক দিয়ে দিল, “আর ওটা কী হচ্ছে! যতবার বলছি, আপার পোর্শনের কাপড়টা রিমুভ করুন, কিছুতেই আপনি শুনছেন না! আমি কি কাপড় চামড়া স্টিচ করব?”

ডঃ চ্যাটার্জি এবার অধৈর্য হয়ে মাথা নাড়লেন। গত আধঘণ্টা ধরে ফরেনসিক ল্যাবে এই একই যুদ্ধ চলছে। অধিরাজের কাদামাখা রক্তাক্ত মূর্তি দেখে এমনিতেই তাঁর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হচ্ছিল। কৃপাণটা একদম গভীর অবধি চলে গিয়েছিল। ক্ষত খুব গভীর। তার ওপর একটুর জন্য একটা ভাইটাল শিরা কাটতে কাটতে বেঁচে গিয়েছে! ছুরিটা যদি আর এক-দু-ইঞ্চি এদিক ওদিক পড়ত তবে সর্বনাশ হত! যেটুকু হয়েছে তাও কিছু কম নয়। সঙ্গে সঙ্গেই ড্রেসিং প্রয়োজন ছিল। রক্তক্ষরণও যথেষ্ট হয়েছে। সবমিলিয়ে চিন্তার কারণ যথেষ্টই আছে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! অধিরাজকে প্রায় ঠেলেঠুলে ল্যাবের বাথরুমে স্নান করার জন্য পাঠিয়েছিলেন তিনি। ওরকম কাদামাখা অবস্থায় ক্ষত-র পরিচর্যা করা যায় না। সচরাচর এরকম অ্যালার্মিং পরিস্থিতিতে অফিসারদের এক সেট জামাকাপড় ব্যুরোতেই থাকে। অথচ এবার কপাল দোষে এবং তাড়াহুড়োতে অধিরাজের ড্রেসের সেটটা আনা হয়নি। ওরা কাজের মধ্যে এত মগ্ন ছিল যে খেয়ালই হয়নি যে এক্সট্রা সেটটা ব্যুরোয় নেই। ওদিকে অধিরাজ চুপচাপ স্নান সেরে নিলেও শুধুমাত্র টাওয়েল পরে কিছুতেই সবার সামনে আসবে না। ডঃ চ্যাটার্জি তার এই অস্বস্তির কারণ জানেন। অর্ণবও বুঝতে পারে। কিন্তু ওদিকে রক্তক্ষরণও তো বন্ধ হচ্ছে না! বাধ্য হয়েই তিনি হেঁকে বললেন, “রাজা, আমি একটা বুড়ো ভাম হয়েও ওই টাওয়েলটা পরেই বেরোতে পারি তো তুমি পারবে না কেন?”

“পারব না কারণ এটা লিলিপুটদের টাওয়েল!” ভেতর থেকে অধিরাজের মন্ত্র স্বর ভেসে এল, “আপনার কাছে এটা গাউন হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটা রুমাল। আর আমি হারগিস রুমাল পরে ঘুরে বেড়াতে রাজি নই।”

“উর্ফি জাভেদের রুমালও লাগে না!” বেচারি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রায় অনুনয় করেই বললেন, “তোমার কাছে তবু আস্ত রুমাল আছে। প্লিজ বেরিয়ে এসো।”

এবার অধিরাজ না বেরোলেও তার মুণ্ডুটা বেরিয়ে এল। সে ভ্রূকুটি করেছে, “আপনি আজকাল উর্ফি জাভেদের ড্রেস নিয়ে খুব উৎসাহিত হয়ে পড়েছেন দেখছি! মিস কাটামুণ্ডু জানেন?”

বুড়ো এবার চটে লাল, “ফিচলেমি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসো বলছি।”

“হারগিস না।” সে আবার সুড়ুৎ করে টয়লেটে ঢুকে গিয়েছে, “আমি সলমন খান, হৃত্বিক রোশন বা জন আব্রাহাম নই যে এইট প্যাকের প্রদর্শনী করে বেড়াব।”

“এ তো আচ্ছা হালুয়া!” তিনি মরিয়া হয়ে বললেন, “এখানে কোন্ পাপারাজ্জি তোমার দিকে ক্যামেরা তাক করে বসে আছে? আমি তোমার বাপের বয়সি আর অর্ণব তোমার প্রিয় সখা কাম ব্রাদার। বাকি রইল মেয়েরা। ওদের ডাক্তার ভেবে নাও৷ তুমি তো মেয়েদের মতো লজ্জা পাচ্ছ! কাম্ অন্! আমায় তোমার উন্ডটা দেখতে দাও।”

“না!”

এবার উপায়ান্তর না দেখে অর্ণবের দিকে তাকালেন ডঃ চ্যাটার্জি, “এভাবে হবে না। যাও তো ল্যাবের পর্দাগুলো খুলে নিয়ে এসো।”

অর্ণব তাড়াতাড়ি তাঁর হুকুম তামিল করতে চলে যায়। অবস্থা দেখে ডঃ চ্যাটার্জির দুই ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মুচকি মুচকি হাসছিল। তাদের দিকে তাকিয়ে গরগর করে উঠলেন ভদ্রলোক, “এখানে কি কমেডি সার্কাস চলছে? বত্রিশ পাটি বেরোনোর মতো কী হল!”

বকা খেয়ে দুই অ্যাসিস্ট্যান্টই ছদ্ম গাম্ভীর্য অবলম্বন করেছে। অর্ণব ঝড়ের বেগে হাতের কাছে যতগুলো পর্দা পেয়েছে নিয়ে এসেছে। ডঃ চ্যাটার্জি অধিরাজকে সেগুলো ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এগুলো দিয়ে তুমি ঘোমটা বানাও, বোরখা বানাও, প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরো, আই ডোন্ট মাইন্ড! কিন্তু দয়া করে তাড়াতাড়ি বেরোও। নয়তো আমিই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ব।”

শেষপর্যন্ত ঝুলি থেকে বিড়াল বেরোল। অর্থাৎ বাথরুম থেকে অধিরাজ। সে একটা পর্দাকে কটিবস্ত্র বানিয়েছে। আর একটাকে অঙ্গবস্ত্র। উর্ধাঙ্গে পর্দাটাকে প্রায় শালের মতো লেপ্টে রেখেছে দেখে ডঃ চ্যাটার্জি অসহায় ভঙ্গিতে দু হাত ছড়িয়ে বললেন, “এভাবে মমি সেজে বসে থাকলে আমি জখম জায়গাটা কীভাবে দেখব!”

অধিরাজের ভেজা চোখের পাতায় আর মাথার চুলে চিকচিক করছে জলবিন্দু। মুখ এখনও জলসিক্ত। লম্বা গ্রীবা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। সে মাথা নাড়ল, “যা দেখার এভাবেই দেখুন।”

“রাজা! আমার চোখে রন্টজেন রশ্মি বসানো নেই।” তিনি বললেন, “অন্তত কাঁধটা দেখাও। নয়তো আমি কেন, গোটা বিশ্বের ডাক্তার মায় স্বর্গ থেকে ধন্বন্তরিকে টেনে আনলে তিনিও কিছু করতে পারবেন না।”

“ওকে।”

অধিরাজ খুব সাবধানে কাঁধের অংশটুকু উন্মুক্ত করল। ঠিক যতটুকু না করলেই নয়, ততটুকুই। ডঃ চ্যাটার্জি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ক্ষতটা এবার ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পরিচর্যায় লেগে পড়লেন। ভালো করে উন্ডটাকে পরিষ্কার করতে করতে বললেন, “থ্যাংক গড। জুগুলার ভেইনটা একটুর জন্য রক্ষে পেয়ে গেছে। কিন্তু জখম বেশ ভালোই হয়েছে। ব্লাড লসও হয়েছে। স্টিচ দিয়ে ড্রেসিং না করলে হবে না। তোমরা হসপিটালে গেলেই ভালো করতে। একটু ব্লাড দিয়ে দিলে ভালোই হত। তুমি এরকম উন্ডেড অবস্থায় এতটা রাস্তা বাইকে কী করে এলে সেটাই আশ্চর্যের।”

“সময় নেই ডক্।” সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়, “ওখান থেকে যে ফরেনসিক স্যাম্পল নিয়ে এলাম তার থেকে কিছু পাওয়া গেল?”

আসার সময়ে ওরা ভাঙা অ্যাসিড বাল্বের কাচ, বার্নিং শিখের রক্ত মাটিতে যেটুকু পড়েছিল, তার ফুটপ্রিন্টের স্যাম্পল তুলে এনেছিল। ডঃ চ্যাটার্জি আড়চোখে আহেলির দিকে তাকালেন। সে অ্যাসিড বাল্বের কাচ পরীক্ষা করে দেখছিল। এবার মুখ তুলে বলল, “এটা হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড স্যার। এর আগের কেসগুলোয় সালফিউরিক অ্যাসিড ছিল, কিন্তু এবার সে হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড ইউজ করেছে।”

“সর্বনাশ!” তিনি সভয়ে বলেন, “লোকটা হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড বাল্ব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এ তো পুরো জ্বালাময়ী পাবলিক। ঈশ্বরের অসীম কৃপা যে গায়ে লাগেনি। কাকে মেরেছিল?”

অর্ণব আস্তে আস্তে বলে, “আমায়। তিনটে মেরেছিল।”

“তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ ভগবান ছিলেন অর্ণব। নয়তো একটাও যদি কোনোক্রমে লাগত তবে তুমি এতক্ষণে হসপিটালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে।” ডঃ চ্যাটার্জি ভেবেই যেন কেঁপে উঠলেন, “হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিডের নিয়মই হচ্ছে স্লো লি একেবারে ডিপে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া। ও শুধু চামড়া পুড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, চামড়া পোড়াতে পোড়াতে মা টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর কুরে কুরে হাড় অবধি চলে যায়। হাইড্রোক্লোরিক বা সালফিউরিক অ্যাসিডের হাত থেকে তবু নিস্তার আছে। কিন্তু হাইড্রোফ্লুওরিক একদম সাইলেন্ট কিলার। স্লো বাট পেইনফুল ডেথ দিতে ওস্তাদ।”

অর্ণব অ্যাসিড বাল্বগুলোর তেজি এফেক্ট দেখেই ভয় পেয়েছিল। এখন অ্যাসিডটার বিস্তারিত বিবরণ শুনে হাড়ে বুঝি কাঁপুনি লেগে গেল। সে কাঁপা স্বরে বলে, “ভগবান সঙ্গে ছিলেন কিনা জানি না, তবে স্যার ছিলেন।”

অর্ণবের ঠিক ওই মুহূর্তটা মনে পড়ল যখন অধিরাজ ঝাঁপিয়ে পড়ে সাক্ষাৎ মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে তাকে প্রায় ছিনিয়েই নিয়েছিল। ভাবতেই এখন ভয় লাগছে। কীরকম বোকার মতো সে এগিয়ে গিয়েছিল লোকটার দিকে। লক্ষই করেনি যে ওর চোলার নীচে অতগুলো অ্যাসিড বাল্ব রাখা আছে। লোকটা সাক্ষাৎ কাল!

“আমি বুঝতে পারি না এ পাবলিক এসব আমদানি করছে কীভাবে!” ডঃ চ্যাটার্জি মাথা নাড়ছেন, “এ তো লেভেলের লোক দেখছি! হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড পাওয়া অত সহজ নয়৷ হাইড্রোক্লোরিক বা সালফিউরিক যদি পাওয়াও যায়, হাইড্রোফ্লুওরিক একদম হাতে গোণা কয়েকটা জায়গা ছাড়া অ্যাভেইলে নয়। মূলত ফার্মাসিউটিকলস্, হাই অক্ট্যান গ্যাসোলিন, ফ্লুওরিসেন্ট লাইট বাল্ব আর ইলেক্ট্রিকাল জিনিসপত্রে ইউজ হয়। এর বিক্রির ওপর অনেক নিষেধাজ্ঞা আছে।”

অধিরাজ একটু ভেবে বলে, “সত্যিই লেভেলের লোক। সমস্ত চোরা কারবারের হদিশ জানে। কোথায় গেলে ইললিগ্যালি কেরোসিন কেনা যাবে, কোথায় টায়ার পাওয়া যাবে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ওষুধ কারা বিক্রি করে, হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড চোরা-গোপ্তায় কোথায় বিক্রি হয়, সব তার নখদর্পণে ডক্। বলেছিলাম না! এ লোকটা ‘র’ এজেন্টের থেকেও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এমনকি পুলিশ অফিসারও হতে পারে! আমাদের ডিপার্টমেন্টের লোক হলেও আমি অবাক হব না। একদম আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছে!”

“হুম।”

তিনি চিন্তিত স্বরে বলেন। এতক্ষণ ধরে ক্ষতটাকে সযত্নে পুরোপুরি ওয়াশ করছিলেন। এবার তুলো, বেটাডিন সরিয়ে রেখে বললেন, “ক্লিন হয়ে গিয়েছে। আহেলি, এবার স্টিচ মেরে দিয়ে ভালো করে ড্রেসিং করে দাও।”

আহেলির নাম শুনেই অধিরাজ হাঁ হাঁ করে ওঠে, “আবার মিস্ মুখার্জি কেন? আপনিই করে দিন না!

“মিস্ মুখার্জি কেন মানে?” ডঃ চ্যাটার্জি ভ্রুকুটি করেছেন, “তোমার মিস্ মুখার্জিতে এত অ্যালার্জি কেন? উনি শুধু স্টিচ করে ড্রেসিং করে দেবেন। তোমায় মারবেন না। এসব কাজ মেয়েরা ভালো পারে।”

“আপনিও ভালো পারেন।” অধিরাজ নাছোড়বান্দা, “আপনিই টুকটুক করে স্টিচটাও মেরে দিন।”

“আমি কি তোমার প্রাইভেট নার্স?” তিনি ধমকে উঠলেন, “যখন বলেছি আহেলি করবে, তখন আহেলিই করবে।”

অগত্যা। তারপর থেকেই চলছে পর্দা কাণ্ড। পর্দে মে রহনে দো, পর্দা না উঠাও! আহেলি যতবার তাকে উর্ধাঙ্গ অনাবৃত করতে বলছে, ততবারই সে পর্দাটাকে আরও চেপে পেঁচিয়ে ধরছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতস্থান স্টিচ করবে কী করে! ওদিকে আহেলির নরম হাত তাকে স্পর্শ করলেই সে নড়েচড়ে উঠছে। মুখভঙ্গিতেই স্পষ্ট, অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু সেটা বলতেও পারছে না আবার সইতেও পারছে না! আহেলির শত অনুনয়ে, বিনয়ে, ধমকেও কাজ হচ্ছে না! বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করে আহেলি কাতর দৃষ্টিতে ডঃ চ্যাটার্জির দিকে তাকায়, “স্যার, উনি কিছুতেই কথা শুনছেন না!”

“হ্যাত্তেরি!”

এতক্ষণে ডঃ চ্যাটার্জির ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। তিনি একটানে অধিরাজের অঙ্গবস্ত্রটা খুলে নিলেন। অধিরাজ প্রায় লাফিয়েই উঠতে যাচ্ছিল তার আগেই মোক্ষম একটা ধমক খেল, “চু-প! একদম চুপ করে বসে থাকো! দরকার পড়লে নিজের বউয়ের সামনে ঘোমটা টেনে, বোরখা পরে বা বস্তায় ঢুকে বসে থেকো। কিন্তু ডাক্তারদের সামনে তোমার ট্যাঁ ফোঁ চলবে না চাঁদু। বেশি লাফালাফি করলে নীচেরও পর্দাফাঁস করে দেব!”

এরকম হুমকি দিলে আর কিছু করার থাকে না! ওপরের পর্দাটা সরে যেতেই প্রকট হল ঈশ্বরের ঝলমলে অপূর্ব কারুকার্য। অর্ণব আড়চোখে দেখল, আইভি ফের ঘামতে শুরু করেছে। এ কী ভয়ংকর সুন্দর ভাস্কর্য। সলমন খান, হৃত্বিক রোশন বা জন আব্রাহাম দেখলেও লজ্জা পাবে। তার সামনে বুঝি লজ্জায় মুখ নীচু করে বসে আছে মাইকেল এঞ্জেলোর ‘ডেভিড’! এ দেহ যে কোনো ভাস্করের স্বপ্ন হতে পারে। লজ্জাবনত এ মুখ কোনো দেবশিশুর। শিল্পীদের জন্য একেবারে আইডিয়াল মডেল। সৌন্দর্য ও যৌবনের শিখরে থাকা গ্রীক ভাস্কর্য। সে চোখ সরাতে চায়, কিন্তু কোন এক চৌম্বকশক্তিতে তার দৃষ্টি ওদিকেই আটকে গিয়েছে। আইভির বেহাল অবস্থা দেখে আহেলি গম্ভীর হয়ে অধিরাজকে যেন একটু গার্ড করে দাঁড়ায়। আইভি এবার একটু বিব্রত হয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছে।

অর্ণব মনে মনে হেসে নিশ্চপেই বাইরে বেরিয়ে গেল। স্যার এবার সত্যিই বিপদে পড়েছেন। ভাগ্য ভালো, কৌশানী বোসও এখানে উপস্থিত নেই। থাকলে ওঁর কপালে দুঃখ ছিল। কিন্তু ডাক্তারদের সামনে সে-ও স্যারকে সাহায্য করতে পারবে না। তার চেয়ে এই ফাঁকে ওঁর বাড়ি থেকে জামাকাপড়ের একটা সেট নিয়ে আসা ভালো। নয়তো উনিই এরপর বলবেন, “অর্ণব, আমি কি আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা টারজান বয় হয়েই কাটাব?” যতক্ষণ ওঁর শুশ্রুষা চলছে, তার মধ্যেই জাস্ট যাবে আর আসবে সে! “ডক্।”

অধিরাজ প্রায় পাতাল প্রবেশ পারলে বাঁচে। তার অনাবৃত কাঁধের ওপর আহেলির নরম আঙুল নড়ছে চড়ছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি জীবনে সে প্রথমবার টের পেল। সেলাই ব্যাপারটা যন্ত্রণাদায়কও বটে। ব্যথায় মাঝেমধ্যে তার মুখ কুঁচকে যাচ্ছে। তবু কোথায় যেন একটা আরামের অনুভূতিও তিরতির করে বইছে। সে সেটাকে সজোরে অস্বীকার করার জন্য প্রসঙ্গান্তরে গেল, “আপনি মার্ডার ওয়েপনের কোনো হদিশ পেলেন?”

ডঃ চ্যাটার্জি হতাশভাবে মাথা নাড়েন, “কিস্যু বুঝতে পারছি না রাজা! যতক্ষণ না ক্রোমাটোগ্রাফির ফুল রিপোর্ট পাচ্ছি কিছু বলা মুশকিল। প্রথম দিকে ভাবছিলাম কোনো অ্যাসিডের ধোঁয়া মার্ডার ওয়েপন হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে শুধু শ্বাসনালী নয়, গোটা দেহটাই অ্যাফেক্টেড হবে। বেছে বেছে ওইটুকুই কেন পুড়ল! নার্ভ এজেন্টগুলোও এভাবে কাজ করে না। একবার ভেবেছিলাম ক্লোরিন বুঝি। ক্লোরিন গ্যাস হিসাবে অসম্ভব বিধ্বংসী। কিন্তু ক্লোরিনের যা ভয়াবহ গন্ধ! ভিকটিমদের নাকের কাছে কেউ ক্লোরিন ধরলে তারা আগেই টের পেয়ে পালিয়ে যেতেন। তাছাড়া বন্ধ ঘরে ক্লোরিনই বা আমদানি করবে কী করে? ভিকটিমরা নিশ্চয়ই সবাই একই লোকেশনে ছিলেন না! কেরোসিন আর টায়ার না-হয় পরে প্রয়োজন পড়েছে। কিন্তু তার আগে একাধিক ক্লোরিন গ্যাসের কন্টেনার ঘাড়ে করে খুন করতে যাওয়া মোটেই ভালো আইডিয়া নয়। তোমরা কি ক্লোরিনের গন্ধ পেয়েছিলে? কিংবা কড়া ব্লিচিং পাউডারের?”

“না।” সে মাথা নাড়ে, “ওখানে শুধু পোড়া মাংস আর চড়া কেরোসিনের গন্ধ আসছিল। তবে ডক্, ঘর কিন্তু বন্ধ ছিল না। বরং এই শীতের মধ্যে সব জানলা খোলা দেখে আমরা অবাকই হয়েছিলাম। এমন নয় তো যে ক্লোরিনটা জানলা খুলে দেওয়ার ফলে বেরিয়ে গিয়েছে?”

“উঁহু।” তাঁর মুখে প্রবল চিন্তার ছাপ, “ক্লোরিন অত সহজে যায় না। ও গ্যাসটা ভীষণ ভারি। তুমি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অসোউইক ফোর্টের কেসটা জানো কিনা জানি না। জার্মানরা ক্লোরিন, ব্রোমিনের সঙ্গে আরও কিছু বিষাক্ত গ্যাস মিশিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল অসোউইক ফোর্টের সামনে। একা ক্লোরিন বা ব্রোমিন নয়, সঙ্গে আরও কিছু ছিল যা জার্মান সরকার কখনও প্রকাশ করেনি। ভেবে দেখো, একটা গোটা ফোর্ট যেটা মোটেই পুরোপুরি বদ্ধ জায়গা নয় সেখানে এই ক্লোরিন-ব্রোমিনের মিক্সচার গিয়ে লোকগুলোকে জীবন্তই পুড়িয়ে মেরেছিল। জার্মান সেনারা কেমিক্যাল অ্যাটাকটা এমনভাবেই করেছিল যাতে গোটা মিক্সচারটা বাতাসের জলীয় বাষ্প আর হাইড্রোজেনের সঙ্গে রি-অ্যাক্ট করে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। হতভাগ্য রাশিয়ান সেনারা ক্লোরিনের ক্লাউডটা দেখতে পর্যন্ত পেয়েছিল। কারণ গোটা ব্যাপারটা দিনের আলোতেই ঘটেছিল। জার্মানরা হাওয়ার গতিমুখ অসোউইক ফোর্টের দিকে সেটা বুঝেই একেবারে নিখুঁত ক্যালকুলেশনে কনটেনার থেকে গ্যাস রিলিজ করেছিল। রাশিয়ানরা বুঝতে পেরেছিল যে গ্যাস অ্যাটাক হয়েছে, কিন্তু ওদের ক্লোরিন বা ব্রোমিন সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। তাই ওরা ভেজা রুমাল মুখে বেঁধে নিয়েছিল বাঁচার জন্য। এতে ফল হল উলটো! ভিজে রুমালের জল গ্যাসের মিশ্রণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পিওর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের বাষ্প তৈরি করছিল। এমনিতেই ওই গ্যাসটা শুধু জলীয় বাষ্পই নয়, মানুষের দেহের জলীয় অংশের সঙ্গে বিক্রিয়া করেও দেহের ভেতরে ভেতরেই হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করে। বিশেষ করে খোদ লাংসের ভেতরের ফ্লুইডটাই হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়। সেক্ষেত্রে ভেতরের সবকিছু জ্বলে পুড়ে মরতে কিছুটা হলেও সময় লাগত। ভেজা রুমালের দৌলতে মৃত্যুটা আরও ত্বরান্বিত হয়েছিল। বেচারা সেনারা প্রত্যেকটা শ্বাসের সঙ্গে অক্সিজেন নয়, হাইড্রোক্লোরিকের বাষ্প ডাইরেক্ট ফুসফুসে ভরেছিল! এবার অবস্থাটা একবার বুঝে দেখো। যদি ক্লোরিন হালকা হত তবে হাওয়ার সঙ্গে অসোউইকের ওপর দিয়ে চলে যেত না? তাতে ক্ষতি হলেও অতটা ফ্যাটাল হত না। অলমোস্ট রাশিয়ানরা জীবন্তই অ্যাসিডে পুড়ছিল। গ্যাসটা এতটাই ভারি যে সহজে ফোর্ট থেকে নড়েনি। কিছুক্ষণ পরে জার্মানরা যখন ঢুকল তখন ওদেরও গ্যাস মাস্ক পরতে হয়েছিল….।”

এবার উত্তেজনায় অধিরাজ প্রায় লাফিয়েই ওঠে, “এ তো হুবহু বার্নিং শিখের মোডাস অপারেন্ডি! সেইরকমই ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে ফুসফুসের পুড়ে যাওয়া! এখানেও তো তাই হয়েছে! এ আপনার ওয়ার্ল্ডওয়ার ওয়ানের ক্লোরিন আর ব্রোমিনের মিক্সচার নয়তো?”

“নাঃ।” তিনি মাথা নাড়লেন, “সেটা নয়। যদি হত তবে তোমাদের মদন ক্রাইম সিনে গিয়ে পড়েও বেঁচে থাকত না। ওর কিংবা তোমাদের মুখে তখন গ্যাস মাস্ক ছিল না। যতই জানলা খোলা থাকুক, ক্লোরিন এতটাই ভারি গ্যাস যে সহজে নড়ার নাম করে না। কিছুটা বেশ কিছুক্ষণ স্পটেই থেকে যায়। তার ওপর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই মার্ডার ওয়েপনল্টা ক্লোরিন-ব্রোমিনের জগাখিচুড়ি— তাহলেও এই শীতে হাওয়ায় জলীয় বাষ্প ততটা থাকবে না। যদি তাও থাকে, তবু ক্লোরিনের ভয়াবহ গন্ধ আর সবুজাভ হলদেটে রং দেখেই যে কেউ প্রাথমিক ইরিটেশনে আর ভয়ে পালিয়ে যাবে। যারা মারা গিয়েছেন, তাদের অসোউইক ফোর্টের সেনাদের মতো একা কুম্ভ হয়ে কেল্লা পাহারা দেওয়ার দায় ছিল না। তারা চোখের সামনে দেখছেন একটা ভয়ানক সবজে হলুদ ধোঁয়া তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, সঙ্গে তীব্র ক্লোরিনের গন্ধ, অথচ কেউ নকল বুদিগড় ছেড়ে পালানোর চেষ্টাও করলেন না! তোমরাও গ্যাসটাকে দেখলে না, গন্ধ পেলে না, এটা কী করে সম্ভব! কিছুটা ক্লোরিন ডেফিনিটলি তখনও থাকত। আর কেরোসিনের গন্ধ ওই ভয়াবহ গন্ধকে চাপা দিতে পারে না। সবচেয়ে যেটা চিন্তার কারণ জার্মানরা ক্লোরিন-ব্রোমিনের কেমিক্যাল অ্যাটাক করার পরও ফোর্টটাকে জিততে পারেনি। রাশিয়ান সেনারা শেষপর্যন্ত জ্বলে পুড়ে মরলেও জার্মানদের হারিয়ে দিয়েছিল!”

“বলেন কী! সে কী করে সম্ভব!”

অধিরাজের বিস্ময় দেখে ডঃ চ্যাটার্জি একটু হাসলেন, “ওখানে তোমার মতো কিছু তেঁএটে পাজি রাশিয়ান সেনা তখনও টিকে ছিল। তারা ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে গলে গেলেও তখনও বেঁচে ছিল। ক্লোরিন ব্রোমিনের এফেক্টে তাদের চোখ, নাক, মুখ দিয়ে ভয়াবহ রক্তপাত হচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই তারা একেবারে রাইফেল নিয়ে হা রে রে রে করে লাফিয়ে পড়েছিল জার্মানদের ওপরে। জার্মানরা ভাবতেই পারেনি ওই কেমিক্যাল অ্যাটাকের পরও দূর্গের ভেতরে কেউ বেঁচে থাকতে পারে! ওদের ক্যালকুলেশনে এই ভুলটাই হয়েছিল। কতক্ষণে সবাই মরবে সেই টাইমিংটা ঠিকমতো হিসেব করেনি। তার ওপর ওই মূর্তি। চোখ, নাক থেকে রক্ত পড়ছে, মুখের মাংস গলে গিয়েছে, কীরকম খোলতাই রূপ একবার কল্পনা করো। জার্মানরা ভেবে বসল, এরা মানুষই নয়, বরং আনডেড আর্মি। আর্মিম্যানদের ভূত বা জম্বি! তখন জম্বি কনসেপ্টটা প্রথম এসেছে আর সদ্য ফেমাস হয়েছে। ফোর্ট জয় করবে কী! উলটে জম্বির ভয়ে নিজেরাই পালানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। আর পালাতে গিয়ে নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই উলটে আটকে গেল। সেই ফাঁকেই যতজন রাশিয়ান সেনা ছিল সবাই মিলে ওদের মারতে শুরু করল! যুদ্ধটা জার্মানি হেরেছিল। এটা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের ইতিহাসে ‘আনডেড আর্মি অ্যাটাক’ বা ‘অ্যাটাক অব দ্য ডেড মেন’ নামে বিখ্যাত। পারলে পড়ে নিও।”

“তার মানে ক্লোরিন-ব্রোমিন কেমিক্যাল অ্যাটাক হওয়ার পরও লোকগুলো নড়াচড়া করতে পারছিল। ইনফ্যাক্ট মারামারিও করার শক্তি ওদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল।”

“হ্যাঁ রাজা।” ডঃ চ্যাটার্জি বললেন, “শুধু তাই নয়, ওদের গোটা সর্বাঙ্গ পুড়ে গিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ওসব কিছুই হয়নি। আর ক্লোরিন-ব্রোমিন পাওয়ারফুল ওয়েপন হলেও ডিটেক্টেড্। সহজেই ধরা পড়ে যায়। জানলা খুলে দিয়েও তুমি ও মালটাকে পুরোপুরি বাইরে বের করতে পারবে না। তাছাড়া এই জাতীয় কেমিক্যাল ওয়েপনে ভিকটিমদের লাংস, ল্যারিংস ইনস্ট্যান্ট পোড়ে না। একটু একটু করে গোটা ঘটনাটা ঘটেছে। অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট থেকে একঘণ্টা ওরা বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে ছিলেন। ক্লোরিন-ব্রোমিনের ক্ষেত্রে নিতান্তই মরার শখ না হলে কেউ অতক্ষণ বসেই থাকবে না। ওই গ্যাসটা ডেঞ্জারাস হলেও ফাইট ব্যাক করার সুযোগ দেয়, মানুষকে অ্যালার্ট করে।” তিনি হতাশভাবে মাথা নাড়লেন, “এটা কী জিনিস এখনও বুঝতে পারছি না। কিন্তু এইটুকু বুঝতে পারছি যে ক্লোরিনের চেয়েও বিধ্বংসী। সার্ভাইভাল ফ্যাক্টর খুব কম। হয় এটার কোনো গন্ধই নেই, নয়তো এত স্বাভাবিক গন্ধ যে কেউ এটার অস্তিত্ব টেরই পাননি। যতক্ষণে টের পেয়েছেন, ততক্ষণে কিছু করার নেই! সাইলেন্ট কিলার। ক্লোরিনের মতো জানান দেয় না, অথচ আরও মারাত্মক। অ্যাসিডের ধোঁয়াও নয়।”

অধিরাজ একটু ভেবে বলল, “গ্যাস হওয়াও মুশকিল ডক্। গ্যাসের কন্টেনার, কেরোসিনের কন্টেনারের মতো স্বাভাবিক জিনিস নয়। সেটাকে ঘাড়ে চাপিয়ে কেউ খুন করতে যাচ্ছে, অথচ কেউ কিচ্ছু দেখল না, এটাও ইম্পসিব্‌ল্‌! যদি কোনোভাবে নিয়েও যায়, তবে ঘরের মধ্যে একেবারে নিঃশব্দে ঢুকিয়ে দিল কী করে? এই শীতে কেউ দরজা জানলা খুলে ঘুমোয় না যে জানলা দিয়ে গ্যাস ঢোকাবে! আর একটা অপশনও ছিল। এসি ডাক্টের মাধ্যমেও ঢোকানো সম্ভব। কিন্তু এখানেও সেই একই প্রবলেম। শীত! সে যতবার খুনগুলো করেছে হয় সবে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, নয় হাড় কাঁপানো শীত। এসি চলার চান্সই নেই। তবে গ্যাস ঘরের মধ্যে ঢুকল কোন্ পথে। যদি বা কোনো অলৌকিক উপায়ে ঢুকেও থাকে তবে বেছে বেছে বৃদ্ধ মানুষটিকেও অ্যাটাক করল না কেন? এটা গ্যাস। মিসাইল বা অন্য কোনো ট্রেইন্ড ওয়ে নয়, যে যার দিকে টার্গেট করা হবে তাকে গিয়েই হিট করবে!” সে মাথা নাড়ল, “নাঃ ডক্। মিলছে না।… কিছুতেই… আউচ!”

শেষ শব্দটা অবশ্য ডঃ চ্যাটার্জির উদ্দেশ্যে নয়। আহেলি মুখার্জি স্টিচ দিতে দিতেই বোধহয় একটু জোর দিয়ে ফেলেছিল। স্বাভাবিকভাবেই ব্যথা লেগেছে। সে মুখ কুঁচকে বলল, “মিস্ মুখার্জি আপনি ডিসেকশন টেবিলে মড়া সেলাই করছেন না! আমি এখনও বেঁচে আছি।”

আহেলিও এবার মেজাজের সঙ্গে বলল, “আমি কী করব? আপনি যদি এরকম ব্রেকডান্স করতে থাকেন তবে স্টিচটা দেব কী করে? আমরা মৃত মাইকেল জ্যাকসনের পোস্টমর্টেম করতে পারি। কিন্তু জ্যান্ত এবং নৃত্যরত মাইকেল জ্যাকসনকে স্টিচ মারার ম্যাজিক আমার অন্তত জানা নেই।”

বকা খেয়ে অধিরাজের মুখ বিষণ্ণ হয়ে যায়, “আপনি এমনিতে সবসময়ই পুতুলের মতো শান্ত ও সুইট থাকেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রেই সবসময় ‘অ্যাংরি বার্ডসের’ অবতার ধরেন কেন মিস মুখার্জি? আমার কী অপরাধ…!”

বলতে বলতেই সে হঠাৎ থেমে গেল। তার সতর্ক শ্রবণেন্দ্রিয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ ধরা পড়েছে। ঠিক আওয়াজ নয়, হালকা সুর! কেউ যেন ফরেনসিক ল্যাবের ঠিক সামনের গলিটা দিয়ে মিষ্টি সুরে শিস দিতে দিতে চলে যাচ্ছে। না, ভুল হল! চলে যাচ্ছে না। শিস দিতে দিতে এদিকেই আসছে। সুরটা এখনও অস্পষ্ট। তবু খুব চেনা চেনা ঠেকছে। অধিরাজ বিড়বিড় করে বলে, “এ কী!”

“কীসের কী!” আহেলি বিরক্ত হয়ে উঠেছে, “আপনি একটা মিনিটও কি স্থির হয়ে বসতে পারেন না…!”

“চুপ…!”

অধিরাজ এবার ডঃ চ্যাটার্জির দিকে মর্মান্তিক দৃষ্টিতে তাকায়, “ডক্, আমি যা শুনতে পাচ্ছি আপনিও কি তাই শুনছেন?”

উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ডঃ চ্যাটার্জিও তখন পাথরের মূর্তির মতো স্থির!

তাঁর মুখেও ভয়ের ছাপ প্রকট। যেন প্রাণহীন একটা পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টিতে ভয়। মুখটা ফ্যাকাশে। একদম দমবন্ধ করে আছেন। যেন শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। অভিব্যক্তিতেই স্পষ্ট যে সুরটা তিনিও শুনেছেন! আস্তে আস্তে সুরটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে এদিকেই। স্পষ্ট হচ্ছে তার চলন। অধিরাজ এবার নির্ভুলভাবে শুনতে পেল সেই সিগনেচার টোন, “গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই… কিসকো খবর কৌন হ্যায় উয়ো… অনজান হ্যায় কোই….।”

কাঁধের স্টিচটা তখনও শেষ হয়নি। কিন্তু অধিরাজ অবিকল একটা শিকারী লেপার্ডের মতো লাফিয়ে উঠে দৌড় মারল সিঁড়ির দিকে। ততক্ষণে সংবিত ফিরে পেয়েছেন ডঃ চ্যাটার্জিও। তিনিও একটিও শব্দ খরচ না-করে তার পেছন পেছন ছুটলেন! আহেলি আর আইভি একবার পরস্পরের দিকে তাকাল। তারপর তারাও একমুহূর্ত নষ্ট না করে দৌড়ে গেল লিফটের দিকে। পুরুষ দু-জন উত্তেজনার চোটে সিঁড়ি দিয়েই দৌড়ে নেমে গিয়েছে। তাই লিফটের দিকে ফিরেও তাকায়নি। মেয়েরা লিফটে উঠেই তাড়াতাড়ি গ্রাউণ্ড ফ্লোরের বোতাম টিপে দেয়। লিফট একটুও বিলম্ব না করে নীচের দিকে নামতে শুরু করল।

অধিরাজ প্রায় চিতার মতো ক্ষিপ্র লাফ মেরে তিনতলার সিঁড়ি মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই ভেঙে নীচে নেমে আসে। সে যে ইনজিওর্ড তা দেখলে এখন কেউ বলবে না। তার খেয়ালই নেই যে এখনও তার উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। ডঃ চ্যাটার্জি স্বাভাবিকভাবেই তার পেছনে দৌড়োতে দৌড়োতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন। ওঁর বয়েস হয়েছে। ফিটনেস ও চেহারার দিক দিয়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়েই দম বেরিয়ে গিয়েছে। কোনোমতে শ্বাস টানতে-টানতে বললেন, “রাজা! কাঁধ সামলে… কাঁধ সামলে…!”

তাঁর কথা অধিরাজের কান অবধি পৌঁছয়নি। সে জ্যা মুক্ত তীরের মতো সটান নেমে গিয়েছে রাস্তায়। ল্যাবের দ্বারপাল তাকে এই অবস্থায় দেখে হাঁ! এরকম ড্রেসকোডে কখনও অধিরাজ ব্যানার্জিকে দেখতে পাবে তা বোধহয় সে ভাবেনি। অধিরাজ পাগলের মতো একবার যেদিক দিয়ে সুর ভেসে এসেছিল সেদিকেই ছুটে গেল। কিন্তু তখন সেখানে কেউ নেই! শুধু শূন্য জনহীন রাস্তার ওপর দিয়ে কুয়াশার স্তর আস্তে আস্তে ভেসে যাচ্ছে। রাস্তার দু-পাশের গাছগুলো মৃদু হাওয়ায় শিরশির করে উঠছে। এছাড়া আর কিছু নেই, কেউ নেই। লোকটা যেন স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে কোথাও কাউকে খুঁজে না পেয়ে অধিরাজ ফের তীরবেগে দৌড়ে এল প্রহরীর কাছে। প্রায় উন্মত্তের মতো জিজ্ঞাসা করল, “ওই লোকটা কোথায় গেল? অ্যাঁ?…ওই লোকটা…?”

দ্বারপাল একবার আপাদমস্তক অধিরাজকে দেখে নেয়। সুগঠিত পেশল বুকের প্রতিটা ভাঁজে এই শীতেও চকচক করছে স্বেদবিন্দু। কোমর থেকে পা অবধি সাউথ ইন্ডিয়ানদের লুঙির মতো একটা পর্দা পেঁচানো। কাঁধের স্টিচটা লাফালাফির চোটে কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। মাথার চুল অবিন্যস্ত! সে সাহেবের এই মূর্তি দেখে কী বলবে বুঝে পায় না। ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কোন্ লোকটা স্যার?”

“আরে… একটু আগেই শিস দিতে দিতে গেল!” সে গর্জন করে ওঠে, “তুমি কি ঘুমোচ্ছিলে? দেখতে পাওনি?”

সে আরও নার্ভাস হয়ে যায়, “দেখব না কেন? ওই সর্দারজি তো? সরকার স্যার বেরিয়ে গেলেন তার আগে থেকেই তো এখানে ঘুরঘুর করছিল। বোধহয় গাড়ি ঠিক করতে এসেছিল।”

“গাড়ি ঠিক করতে এসেছিল মানে?” তার হৃৎপিণ্ড বুঝি একটা বিট মিস করল, “তুমি ওকে অ্যালাউ করলে কেন? কার গাড়ি ঠিক করছিল? পারমিশন ছিল? সরকার স্যার বেরিয়ে গেলেন! কখন বেরিয়েছেন? কোথায় গিয়েছেন?”

গেটকিপার এবার একটু অপরাধীর মতো জানায়, “স্যার, আমি কয়েক মিনিটের জন্য চা খেতে গিয়েছিলাম। তখনই লোকটা এসেছিল বোধহয়। আমি এসে দেখি ও সরকার স্যারের গাড়ি ঠিক করছে। আমি ভাবলাম স্যারই বোধহয় সর্দারজিকে ডেকেছেন। হয়তো ওঁর গাড়িতে কোনো কিছু প্রবলেম আছে। লোকটার হাতে মেকানিকের টুল বক্স ছিল। তারপরই সরকার স্যার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি ভেবেছি মেকানিক হয়তো…!”

আরও কিছু বলার আগেই তার গালে সপাটে এসে পড়ল জোরালো বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। অবর্ণনীয় রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল অধিরাজ, “ই-ডি-য়-ট!”

কথাটা শেষ না-করেই সে ফের দৌড়োল নিজের বাইকের দিকে। ততক্ষণে ডঃ চ্যাটার্জিও কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছেছেন পার্কিং লটে। সিঁড়ি ভাঙার পরিশ্রমে চোখ মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। হাঁপানির রোগীর মতো কোনোমতে হাঁসফাঁস করতে করতে বললেন, “রাজা, তোমার কাঁধ…!”

তাঁর দিকে প্রায় বাঘের দৃষ্টিতে তাকায় অধিরাজ। চাপা অথচ রাগী স্বরে জানতে চায়, “অর্ণব কখন বেরিয়ে গিয়েছে আপনি জানেন?”

“হ্যাঁ, দেখলাম তো।” তিনি জানালেন, “ও বোধহয় তোমার বাড়ির দিকেই গেছে। বেশিক্ষণ হয়নি। সম্ভবত এক্সট্রা জামা কাপড় আনতেই…।”

“শি-ট্… শি-ট্…!”

তার স্পোর্টস বাইক মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠল। সে নৃশংস চোখে দ্বারপালের দিকে তাকায়, “তোকে তো কাল দেখে নেব।”

আর একটা মুহূর্তও খরচ না করে প্রায় আলোকবিন্দুর গতিবেগে হুঁশ করে বেরিয়ে গেল লাল সাদা স্পোর্টস বাইকটা। অধিরাজের নগ্ন বুকে পিঠে শীতের হাওয়া কয়েকশো তীর মারছে! চুল এলোপাথাড়ি উড়ছে। সুগঠিত কাঁধ বেয়ে লাল রক্তের ধারা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বাইকের সিটে। কিছুটা হাত ছুঁইয়েও পড়ছে টপটপ করে। কিন্তু কোনোদিকেই তার খেয়াল নেই! যন্ত্রণাবোধও নেই বোধহয়। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে কানপুরের সেই হতভাগ্য পুলিশ অফিসারের ভেঙেচুরে, পুড়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গাড়িটার ছবি! গাড়িটার জোরদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তার সঙ্গে ব্লাস্টও করেছিল। অফিসারের দেহটাও প্রায় পাওয়াই যায়নি। স্রেফ পাওয়া গিয়েছিল কয়েকটা টুকরো…!

সে আফশোশে মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলল। নিজেকে ভয়াবহ মূর্খ মনে হচ্ছে! লোকটা বদলা নেবে সেটা বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি….!

দাঁতে দাঁত চেপে বাইকটায় সর্বোচ্চ স্পিড তুলল অধিরাজ। এই মুহূর্তে বাইকের স্পিড দুশো কিলোমিটার পার আওয়ার থেকে আরও উপরের দিকে চলেছে। প্রায় উড়ছে! কাঁধে প্রচণ্ড যন্ত্রণা! তবু অগ্রাহ্য করল। সে জানে এই যন্ত্রণা তার কাছে কিছুই নয় যে যন্ত্রণা বার্নিং শিখ তাকে দিতে চায়! কিছুতেই তাকে সফল হতে দেবে না অধিরাজ। আজ যদি মরেও যায়, তবু সময়মতো তাকে পৌঁছোতেই হবে অর্ণবের কাছে! বোকা ছেলেটা এভাবে না বলে একা বেরিয়ে গেল!

প্রায় সর্বহারার মতো সে উচ্চারণ করল, “অর্ণব!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *