কালরাত্রি – ৩০

(৩০)

“বেবে, আমাদের ওরা মারবে কেন? আমরা কী করেছি?”

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমনপ্রীত প্রা-জিই প্রথম মুখ খুলেছিল। এতক্ষণ নীরবতা পালনের পর যদি বা সে কথা বলল, তাও এমন প্রশ্ন করে বসল যার উত্তর কেউ জানত না। হিন্দিতে প্রবাদ আছে ‘করতা কোই, ভরতা কোই।’ আমার এখন বয়েস হয়েছে বলে প্রবাদটা জানি। কিন্তু আমনপ্রীত এই ‘মুহাবড়া’ জানার সুযোগই কোনোদিন পায়নি। এই প্রশ্নটা হয়তো শুরু থেকেই তার মনের ভেতরে ‘খলবলি’ তৈরি করছিল। এতক্ষণ প্রকাশ করতে পারেনি। এতক্ষণে তার অব্যক্ত জিজ্ঞাসা শব্দের রূপ পেল।

সেই অন্ধকারের মধ্যে আমনের মুখ দেখা যাচ্ছিল না। বাইরে ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। তবু ভয়ের চোটে কোনো ঘরে আলো জ্বলেনি। বেবেও আলো জ্বালায়নি। সরতাজের মৃত্যু ও কলোনির মানুষের বিশ্বাসভঙ্গের পর কেটে গিয়েছে আরও কয়েক ঘণ্টা। এখনও আশ্চর্যজনকভাবে কোনো ভিড় এসে উপস্থিত হয়নি আমাদের শেষ করতে। তবে হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার ভারি ভারি বুটের আওয়াজ আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করেছে। তার সঙ্গে আরও কিছু চাপা পায়ের শব্দ। বুটগুলো পুলিশদের ছিল তা জানতাম। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে ‘অনজান্’ সতর্ক পায়ের শব্দগুলো ছিল, তারা কারা তা জানা নেই। শুধু এইটুকু বুঝেছিলাম, তারা আর যে-ই হোক, এই কলোনির লোক হতেই পারে না। সমস্ত বাসিন্দারাই এখন গৃহবন্দি হয়ে ওয়াহেগুরুর নাম নিচ্ছে। এখন তো কান্নার শব্দও আর শোনা যায় না। একেবারে পিনপতনের নিস্তব্ধতা। যেন কোনো গোরস্থানে, অথবা মৃত্যুপুরীতে এসে গিয়েছি। কলোনির বাড়িগুলো বাড়ি নয়, কবর। যার মধ্যে জিন্দা লাশেরা পাকাপাকিভাবে ‘দফন’ হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে। এক এক করে মুহূর্ত খসছে আর তারা গুণে চলেছে ‘অনসুনি’ মৃত্যুর পদক্ষেপ। এই ‘লাচারি’, নিরূপায় অবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা কোনো শব্দে বোঝানো সম্ভব নয়। এই চূড়ান্ত শ্বাসরোধকারী বিপন্নতার গুরুভার কান্নাও লাঘব করতে পারে না। তাই কেউ কেঁদে সময় নষ্টও করছে না। বরং প্রত্যেকটা শ্বাস টানার সঙ্গে সঙ্গে ভাবছে, এটাই ‘আখরি সাঁস’ নয়তো? পরের বার ভাবছে, আরও একটু বেশি হাওয়া ফুসফুসে ভরে নিই। কে জানে, আর কতক্ষণ, কত সেকেন্ড, কত মিনিট বা ক-ঘণ্টা এই নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সুযোগটুকু থাকবে।

প্রাণ ভরে ‘সাঁস’ নিলেও যে দম ‘ঘুটতে’ পারে তা ওই মুহূর্তগুলোই শিখিয়ে দিচ্ছিল। যতটা হাওয়া ‘ফেফরায়’ যাচ্ছিল, তার অর্ধেকটাই আতঙ্ক কুরে কুরে খেয়ে নিচ্ছিল। ছোট্ট বুকের ফুসফুসের আর কতটাই বা ক্ষমতা। কেউ আমার নাক চেপে ধরেনি, গলা বা মুখ টিপে ধরেনি, তবু যেন শ্বাস নিতে পারছিলাম না। টের পাচ্ছিলাম বুকের ওপর একটা অসহ্য ভার চেপে বসে আছে। যার ওজন নেওয়ার ক্ষমতা তখনও আমার হয়নি। পায়ের শব্দগুলো যতবারই আমাদের বাড়ি ঘেঁষে চলে যাচ্ছিল, ততবারই মনে হচ্ছিল বাইরে কারা যেন নীচুস্বরে হাওয়ার মতো ফিশফিশ করছে। বোধহয় চাপা গলায় ষড়যন্ত্র করছে। হয়তো কীভাবে আমাদের মারবে সেই চক্রান্ত করতেই ব্যস্ত।

আমনপ্রীতের মুখে কতটা ভয় ছিল তা দেখতে পাইনি। কিন্তু গলার ফ্যাঁসফ্যাঁসে ভাঙা স্বর জানিয়ে দিল তার ঐ আপাত সরল প্রশ্নের পেছনে যে কতটা মারাত্মক বাস্তব লুকিয়ে আছে তা সে খুব ভালোই বুঝতে পেরেছে। একটু থেমে সে অধৈর্যভাবে তীক্ষ্ণ ও উঁচুস্বরে যোগ করল, “আমরা কেউ বাঁচব না, তাই না? ওরা এখনও আসছে না কেন? ওদের আসতে বলো। অব কিস্ কা ইন্তেজার কর রিয়া হৈ?”

বাপু কথাটা শুনেই যেন কেঁপে উঠলেন। আমনের মুখ সজোরে চেপে ধরেছেন তিনি, “চুপ কর। চুপ কর পুত্তর। এমন বলতে নেই। কে জানে, হয়তো আশেপাশেই সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। চুহা-বিল্লির খেল খেলছে। অ্যায়সে উনকো লঙ্কার মৎ। এমনও তো হতে পারে যে ওরা কিছু করার আগেই রাজীবজি আর্মি নামাবেন, আর আমরা বেঁচে যাব।”

“হায় রব্বা!” এবার বেবে নীচুস্বরে ফুঁপিয়ে উঠেছে, “কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হওয়ার নয়। কোই নেহি বচেগা। হাম ভি নেহি। বাচ্চাদের এই মুহূর্তে আর ঝুটি দিলাসা দিও না। অনেক ঝুঠ শুনেছে ওরা। মরার আগে অন্তত সত্যিটার সামনে দাঁড়াতে দাও।” চুহা-ি [-বিল্লির খেল যে চলছে তা আমিও বুঝতে পেরেছিলাম। পুলিশি বুটের নিজের আওয়াজ লুকোনোর কোনো চেষ্টাই ছিল না। বরং সে নিজের অস্তিত্ব সরবে ঘোষণা করছিল। তার সঙ্গে যে অন্যপক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল তা চাপা এবং সতর্ক হলেও নিজেকে গোপন করার কোনো ইচ্ছে তাদেরও ছিল না। এমনকি একাধিক গলার স্বরের ফিশফিশে কথা অস্পষ্ট ঠিকই, তবে সহজেই কানে আসে। বাসিন্দারা যাতে শুনতে পারে সেভাবেই ওরা কথা বলছিল। শুধু কী বলছে সেটা বুঝতে না পারলেই হল। পুলিশের যে ‘রওয়াইয়া’ আর তৎপরতার প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম তাতে ওদের উপস্থিতিতে নিশ্চিন্ত হওয়ার বদলে যে সবাই ভয়ই পাবে তা ওরাও খুব ভালো করেই জানত। সবাই বুঝেছিল যে উর্দিধারীরাও এই যড়যন্ত্রে সামিল রয়েছে। তাই তাদের পদশব্দ আর মৃত্যুর ‘আহট’ একই।

তার সঙ্গে এই অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ বিরতি! অদ্ভুত এক যতি বা বিলম্ব আমাদের হাল আরও খারাপ করছিল। বিল্লি কখনও চুহাকে এক লপ্তে মারে না। শেরও এক ঝটকায় শিকার করে না। বরং শিকারকে খেলাতে থাকে। শিকার বাঁচতে বাঁচতে, লড়তে লড়তে অবশেষে পালাতে পালাতে একসময় ‘থকে-হেরে’ ভাবতে থাকে কতক্ষণে এবার যম এসে তার প্রাণটা নেবে। তখন আর সে বাঁচার জন্য নয়, মরার জন্য আকুলি-বিকুলি করতে থাকে। তবু মৃত্যু তখনই আসে না। বরং তাকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। চক্কর দিতে দিতে সীমারেখা ছোটো করে আনে। তার হতাশার, হাল ছেড়ে দেওয়ার আর মরণ প্রার্থনার ‘লুৎফ’ নেয়। ভয়ে আধমরা, ক্লান্ত শিকারের চোখে ভয়ানক ‘খওফ’ দেখে আনন্দের আমেজ চেটেপুটে খায়৷

অবিকল সেটাই আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটছিল। তখন সেই জুতোর শব্দ, ফিশফিশে চাপা গলার স্বর আমাদের সবার মধ্যেই এমন ‘খওফ’জারি করেছিল যে আমনপ্রীতের মতো একজন নাবালকও অধৈর্য হয়ে উঠে চেঁচাচ্ছিল, “ওদের আসতে বলো… ওরা কীসের অপেক্ষা করছে?” সে আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে স্বয়ং মৃত্যুকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। একা সে নয়, গোটা কলোনি জানত, সরতাজ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেই, ভিড়ের সঙ্গে লড়তে গিয়ে কলোনির অনেক পুরুষই ইতোমধ্যে মারা গিয়েছে, তাদের লাশগুলো এখনও পড়ে আছে, অন্তিম সংস্কারের সুযোগ কেউ পায়নি। লড়ার জন্য কৃপাণটাও নেই। এমনকী বুজুর্গদের হাতের মজবুত লাঠিগুলোও ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে নিয়েছে পুলিশ। এখন যা ঘটবে তার গোটাটাই একতরফা। ওরা আসবে। আমরা মরব। প্রতিরোধ, প্রতিবাদের সুযোগ নেই। তাই সেই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে নিতে, বধ্যভূমিতে শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষায় বসে থাকতে থাকতে হয়তো আমনের মতোই পাগল হয়ে যাচ্ছিল বাকি মানুষগুলোও মানসিক ভারসাম্যহীন লোকগুলো ভাবছিল, এবার সব শেষ হোক। শেষটা যতই যন্ত্রণাদায়ক হোক, এর থেকে বেশি অসহ্য বোধহয় হবে না।

আমাদের শিকারীরাও ঠিক এটাই চাইছিল। ওদের ইঙ্গিত স্পষ্ট। আমাদের নিজেদেরও ইচ্ছেমতো মরার কোনো অধিকার নেই। ওই পায়ের আওয়াজ আর কণ্ঠস্বরই বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে আততায়ীদের একটা অংশ আমাদের পাহারা দিচ্ছে। তবু আক্রমণ করছে না। যেন বলতে চাইছে, এ কঁহানির শেষ তোদের হাতে নেই। তোরা শত গিরগিরালেও মওত আসবে না। মওত তখনই আসবে যখন আমরা চাইব। তোদের মরতে মরতে বেঁচে থাকা আমাদের হাতে। শেষ পরিণতিও আমাদের হাতে। যখন খুশি তখন মারব।

যখন ইচ্ছে হবে তখন জ্বালাব, কাটব। যা পারিস কর। একঝটকায় নয়, তিলে তিলে মর।

অনেক বছর পরে ব্যাপারটা আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পেরেছিলাম। আমাদের আয়ু আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা স্রেফ ‘এক্সটেনশনে’ বাঁচছিলাম। নোকরিতে যারা এক্সটেনশনে থাকে তারা সবসময়ই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে, এই বুঝি মেয়াদ শেষ হল। আমাদেরও অবস্থা তাই। আমরাও মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসেছিলাম। কিন্তু যতই মেয়াদ অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘ হচ্ছিল, ততই বাঁচার ইচ্ছে কমে আসছিল। আর ভাবছিলাম, বাইরে ও কাদের ফিশফিশ শোনা যায়! যদি ওরা এসেই থাকে তবে এখনও আমাদের খতম করছে না কেন। ওরা কারা!

কে জানে আমাদের ‘কাতিল’ অন্তর্যামী ছিল কিনা। যখনই এসব ভাবছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে সেই তীব্র শিস্ ভেসে এল, ‘গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই, কিসকো খবর কৌন হ্যায় উয়োহ, অনজান হ্যায় কোই…!’

দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে জানতে পেরেছিলাম, ওই চাপা স্বরের কথাবার্তা আদতে ঠিক কী ছিল। আততায়ীরা ভোটার লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিল, কোন্ বাড়িটা পবনজ্যোত সিং বা গুরশরণ সিং-এর, কোন্টা কুলদীপের কিংবা কোন্‌টা রশ্মি কৌরের। তারা বুঝে নিতে চেয়েছিল, শিখদের ভিড়ের মধ্যে কোনো হিন্দু বা অন্য ধর্মের পরিবারের ঘরও নেই তো! তার কারণ প্রথমত, অন্য ধর্মের লোকগুলো তাদের টার্গেট ছিল না। দ্বিতীয়ত, হিন্দু, মুসলিম বা ক্রিশ্চানদের ঘর থাকলে শিখরা সেখানেও আশ্রয় চাইতে যেতে পারে। ওরা আগেই খুঁজে খুঁজে আশেপাশের কলোনির হিন্দু, মুসলিম বাসিন্দাদের বের করে ধমকি দিয়েছিল যেন তারা কোনোমতেই শিখদের ঘরে লুকিয়ে না রাখে। তাতে শিখদের মৃত্যু তো নিশ্চিতই, বেইমান স্বজাতিকেও রেয়াত করবে না তারা। এর প্রমাণও দিয়েছিল সেই হিংস্র মব্। শিখদের বাঁচানোর জন্য এক হিন্দু ব্যক্তি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। বাধা দিয়েছিলেন। শিখদের সঙ্গে তাঁকেও পুড়িয়ে মেরেছিল ওরা। তার চেয়েও মজার কথা ‘দাঙ্গাইদের’ হাতে ওই বিরাট ভোটার লিস্ট তুলে দিয়েছিলেন খোদ কালেক্টর সাহেব! সেই আই.এ.এস. অফিসার, যাঁর হাতে আইন ও অনুশাসন রক্ষার ভার।

“ওই ধুন বন্ধ করতে বলো বাপু!”

আমনপ্রীতের পর এবার সরবজিতও খেপল। ‘গুমনামের’ তীব্র শিস আমরাও কেউ নিতে পারছিলাম না। মাথার, কানের সব নস্ যেন ফেটে যাচ্ছিল। স্পষ্ট বোঝা যায় যে ওরা আমাদের আতঙ্কেই রাখতে চাইছে। চাইছে ভয়েই যেন আমরা পাগল হয়ে যাই। তবু দাঁতে দাঁত চেপে বসেছিলাম। কিন্তু সরবজিতের আর সহ্য হল না। সে দু-হাতে কান চেপে ধরেছে। চিৎকার করে বলল, “উসে রোকো। এই সুর বন্ধ করো। আমার মাথা ফেটে যাবে। সর ফট্ রিয়া হৈ মেরা। চুপ করতে বলো ওকে। নেহি তো…. নেহি তো…!”

বলতে বলতেই সে বেবের বাহুপাশ থেকে নিজেকে একঝটকায় ছাড়িয়ে নেয়। পরক্ষণেই দৌড়ে গিয়েছে এক কোণের দেওয়ালের দিকে। পাগলের মতো আমার নাবালক দাদা তার কচি মাথাটাকে দমাদ্দম ঠুকতে শুরু করল ওই কঠিন দেওয়ালে। তার সঙ্গে মানসিক রোগীর মতো চেঁচানি, “সর ফট্ যায়েগা মেরা… রুকতা হি নেহি… তোড় দুঙ্গা… খুদ হি সর ফোঁড় দুঙ্গা…।”

বাপু পড়ি কি মরি করে দৌড়লেন সরবজিতের দিকে। সে খ্যাপা ‘সান্ডের’ মতো দেওয়ালে মাথা ঠুকেই যাচ্ছিল। বাপু কোনোমতে টেনে হিঁচড়ে তাকে সরিয়ে আনলেন। অত জোরে মাথা ঠুকলে যে কোনো শক্তিশালী মানুষেরও কপাল ফাটবে। সরবজিত তো ছেলেমানুষ। বাপু অন্ধকারের মধ্যেই তার মাথা স্পর্শ করে অনুভব করলেন উষ্ণ ও চটচটে তরল! খুন!

“ইয়ে ক্যায়া কর দিয়া তুনে পুত্তর!” তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “সরবের বেবে, তাড়াতাড়ি রুমাল বা কাপড় কিছু দাও। সরবের কপাল কেটে রক্ত পড়ছে যে!”

বেবে কিছু বলার বা করার আগেই সজোরে খিলখিল করে হেসে উঠল যস্যিদিদি। তার হাসির অপ্রকৃতিস্থ খলখল শব্দ শুনলে আরও ভয় লাগে। এমন হাসি তো ডাইনি বুড়িরা হাসে জানতাম। কী বুঝে সে এত মজা পেয়েছে কে জানে। হাসতে হাসতেই বলল, “কত খুন তোমরা থামাবে বাপু। কত রক্তের ওপর মরম-পট্টি করবি বেবে? তোরা তো জানিসই না, টুকরো টুকরো হতে কেমন লাগে! মাথা ফুঁড়ে বুলেট চলে গেলে কেমন লাগে। পিঠ, পেট কেটে ফালাফালা হয়ে গেলে যত রক্ত ঝরে তা কেমন করে থামাবি?” বলতে বলতেই তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বিকৃত হয়ে ওঠে, “না জানি নভজ্যোত কত কষ্ট পেয়ে চলে গেল। না জানি সরতাজের কত খুন পানির মতো বয়ে গেল। কত ‘দর্দ’, ব্যথা সয়ে রাস্তার ওপরেই এমন ঘুমিয়ে পড়ল যে আর উঠলই না। আমি সালি ‘খসমানু খানি’ কারোর খুন থামাতে পারলাম না! যাকে বিয়ে করতে গেলাম, সে রইল না। যাকে স্বামী ভেবে আজীবন ভালোবাসলাম সে-ও গেল! আমিই সবাইকে খেলাম! এখন নিজেকেও খেতে পারলে বাঁচি।”

‘খসমানু খানি’ শব্দটার অর্থ নিজের স্বামীকে যে নারী খেয়ে ফেলে। অর্থাৎ মরদখাগী। দিদি নভজ্যোতের দায় এড়ায়নি। কিন্তু সঙ্গে সরতাজের মৃত্যুর জন্যও সে নিজেকে প্রকাশ্যে বিধবা ও ‘খসমানু খানি’ ঘোষণা করেছিল। বেবে এবার সভয়ে বলল, “চুপ কর যস্যি। কীসব বলছিস্?”

“তোমরা কেউ জানো না!” দিদি বিড়বিড় করে, “আমি নভজ্যোতের সঙ্গে আগকে সাক্ষী করে সাত চক্কর লাগাতাম। কিন্তু সরতাজের সঙ্গে যে মনে মনে কতবার ‘লাওয়ার ফেরে নিয়েছি। আগ নয়, গুরু গ্রন্থসাহিবকে সাক্ষী মেনে চার চক্কর লাগিয়েছি স্বপ্নে। ও কী করে আমায় একা ফেলে রেখে যেতে পারে? একসঙ্গে বেঁচেছি, একসঙ্গে মরব না? লাওয়ার ফেরে নেওয়া মানে সির্ফ পতি-পত্নী নয়, এক “জান।” একজন মরলে অন্যজনও মরবে। কত খুন রুকবি তুই বেবে?”

“পুত্তর….!”

“যস্যি, পুত্তর!” বাপু অসহায়ভাবে বললেন, “এমন পাগলামি করিস না। চুপ রেহ।” আমরা সবাই নিজেদের ‘রোনাধোনা’ ছেড়ে যস্যিদিদির ছায়ামূর্তির দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, শোকে দুঃখে ওর মাথাটাই গেছে! কীসব বলছে! আরও কিছু ভাবার আগেই ফের শুনতে পেলাম ওর থিক থিক হাসির শব্দ। বীভৎস হাসিতে ফেটে পড়ে সে-ও প্রেতগ্রস্তের মতো গাইতে শুরু করে দিল ওই ভয়াবহ পংক্তিগুলো—

‘কৌন্ বলা তুফানি হ্যায়,/ মওত কো খুদ হ্যায়রানি হ্যায়/ আয়ে সদা ভিরানোঁ সে যো প্যায়দা হুয়া উয়ো ফানি হ্যায়!/ গুমনাম হ্যায় কোই…!”

মৃত্যুও যেন এই ধ্বংসাত্মক মৃত্যুমিছিল দেখে হয়রান হয়ে গিয়েছে। নির্জনতার বুক চিরে কার যেন ডাক ভেসে আসছে। সে বলছে, যার জন্ম হয়েছে, সে ‘ফানি’, অর্থাৎ নশ্বর। তার মৃত্যু অবধারিত। আগেই বলেছি, গানটার ওই ভুতুড়ে সুর শুনে এতই ভয় পেতাম যে কোনোদিন মন দিয়ে কথাগুলো শুনিনি। বোঝার চেষ্টাও করিনি। ওই বয়েসে দ্রুত সুর বা গানের তালে তালে নেচে মৌজ করতাম। কোনো গানেরই কথা বোঝার মতো ধৈর্য বা গভীরতা তেমন ছিল না।

অথচ আজ প্রথমে ওই পুলিশের মুখে, তারপর দিদির মুখে গানটার মর্মার্থ বুঝে সিঁটিয়ে গেলাম। কত বছর আগে এই গানটা লেখা হয়েছিল। তখন কি গীতিকার জানতেন যে প্রায় উনিশ কুড়ি বছর পর, ভবিষ্যতে কখনও এই গানটার একেবারে যথাযথ প্রয়োগ হাজার হাজার মানুষের ওপর হবে? একটা পুরোনো সিনেমার গান যে আমাদের জীবনের ‘মাতম্’ হয়ে দাঁড়াবে তা কেউ জানত না! অর্থ বোঝামাত্রই সর্ব শরীর শিরশির করে উঠল। বুঝলাম, দিদি নয়, আমাদের নিয়তিই এই গানের মাধ্যমে ইশারা করছে। ছায়া ছায়া শরীর নিয়ে ক্রমশই কাল ঘনিয়ে আসছে। যে-কোনো সময়েই হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আমাদের ওপর।

দিদি হাসতে-হাসতে, কাঁদতে-কাঁদতেই আবার একসময়ে চুপ করে গেল। বাইরে এখন আর শিসের শব্দটা শোনা যাচ্ছে না। ঘরের ভেতরে আমনপ্রীত বা সরবজিতের সিসকিয়াঁও থেমে গিয়েছে। বোধহয় ভয়ের চোটে আওয়াজও বেরোচ্ছে না মুখ থেকে। ঠিকমতো কিছু দেখতে না পেলেও বাপু আর বেবের ছায়াশরীর দেখে বুঝতে পারছিলাম বাপু বেবেকে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছে। বেবে বাপুর বুকে মুখ গুঁজে রেখেছে। কাঁদছে কিনা বুঝতে পারছি না। তবে জোরে জোরে ঘন শ্বাস ফেলছে। বেবে আর বাপুর কোল ঘেঁষে বসে আছি আমরা তিনজন। সরবজিত প্রা’জির কনকনে বরফ ঠান্ডা হাত আমার একটা হাত ছুঁয়ে আছে। অন্য হাতটা আমনপ্রীতের মুঠোর মধ্যে। আমনের হাত দরদরিয়ে ঘামছিল। ওই অন্ধকারে ভূতের মতো সবাই সবার হাত ধরে বসে চুপ করে ‘অহোনি’র প্রতীক্ষারত। মৃত্যু প্রত্যেককে আলাদা করে দেওয়ার আগে শেষবারের জন্য গোটা পরিবার পরস্পরকে লতার মতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

টিক টিক করে ঘড়ির কাঁটা নড়ছে। গোটা কলোনির একই অবস্থা। খওফ আর সন্নাটা ছেয়ে ছিল চারিদিকে। আমরা বুঝতে পারছি একটু একটু করে রাত বাড়ছে। বাইরের দৃশ্য দেখা সম্ভব ছিল না। তবু কখনও কখনও ‘পঞ্জি ेদের সন্ত্রস্ত ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর যখন পাখিরাও নিস্তব্ধ হয়ে গেল তখন বুঝতে পারলাম রাত আস্তে আস্তে আরও গভীর কালো হচ্ছে। পরিবেশ এতটাই গুমোট যে বাড়ির ভেতরটাই বিনা আগুনেই জতুগৃহ মনে হয়। বাইরেও হাওয়া বইছিল না। বোধহয় ‘মন্জর’ দেখে পবনদেবও থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। রোজ রাতে ঘুমোবার সময় খিড়কি দিয়ে মিষ্টি ফুরফুরে একটা ঠান্ডা বাতাস রোজ ঘুমপাড়ানি স্পর্শ দিয়ে যেত। তার সঙ্গে একটা বুড়ো গাছের পাতার খসখস শব্দও শুনতে পেতাম। আজ না সেই ঠান্ডা হাওয়া আছে, না সেই পাতার মর্মরধ্বনি। গাছের পাতাগুলোও যেন স্তম্ভিত! তারা একটুও নড়ছিল না। অব্যক্ত আশঙ্কায় তারাও যেন স্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল ‘আনেওয়ালা’ তুফানের। ওরাও বুঝেছিল যে এই নিস্তব্ধতা স্বাভাবিক নয়, ঝড়ের পূর্বাভাস।

আমাদের ব্লকের চারদিকে তখনও ধোঁয়া, মাংস পোড়ার উৎকট গন্ধ। দাঙ্গাইরা মাঝেমধ্যেই কোনো-না কোনোদিকে তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে তার প্রমাণ ওই ‘বদবু’তেই পাওয়া যাচ্ছিল। তারা শান্ত হয়নি, বসেও নেই তা বুঝতে পারছিলাম। এর মাঝখানে আমাদের এলাকার এই নিরবচ্ছিন্ন শান্তিই সবচেয়ে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় তো আমিও ভাবতে শুরু করলাম, এখনও ওরা আসছে না কেন! শুনলে মনে হবে পাগলের প্রলাপ, কিন্তু তখন ওই আট বছরের শিশুর মাথায় একটাই চিন্তা কাজ করছিল। অনেক তো হাঙ্গামা হল। লড়াই হল। প্রতিরোধও হল। আর কেন? এবার সব খতম্ হলে হয় না?

দেওয়ালে আবছা অন্ধকারে ওয়াহেগুরুর ছবিটা ঝুলছিল। হঠাৎই সেদিকে চোখ যেতেই মনে হল, সেটা বুঝি একটু কাত হয়ে গিয়েছে। কেমন যেন উদ্ভট একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো মাথায় খেলে গেল। ছবিটা যখন সোজা থাকে, ওয়াহেগুরু তখন শাস্ত দৃষ্টিতে আমাদের দিকেই তাকিয়ে থাকেন। ওটা কোনোদিন ওখান থেকে একচুলও নড়ে না। আজ তবে এই বদ্ধ ঘরের মধ্যে নিজের জায়গা থেকে সরে গেল কী করে? ছবি কাত হয়ে গেলে তো তিনি আর আমাদের দিকে তাকাবেন না! তবে কি তিনিও আমাদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছেন! তাঁর কৃপাদৃষ্টিও তবে এই অন্তিম মুহূর্তে সরে গেল…!

“খু-উ-উ-ন কা বদলা খু-উ-উ-ন! গ-দ্দা-র সা-ফ ক-রো।”

কানের কাছে আচমকাই বুঝি সহস্র তোপ গর্জন করে উঠল। উন্মত্ত জনতার হিংস্র চিৎকারে গোটা কলোনিটাই কাঁপছে। আমার বুকের পাঁজরগুলো হাড় নয়, কাচের মতো ঝনঝন করে ওঠে তার ধাক্কায়। আর একটু হলেই বুঝি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যেত। সরবজিত প্রা-জি ওই অন্ধকারেই অস্ফুটে ‘আঁ-ক’ করে উঠল। আমনপ্রীত বুঝি স্তব্ধ হয়ে তখনও ভাবছিল, গদ্দার কাকে বলছে ওরা? আমাদের কেউ মারতে কেন চায়? সে তো শুধু অ্যাম্বুলেন্স চালাতে চেয়েছিল। আমাদের গরীব বাপুর ছোটখাটো নিরীহ অটো তার পছন্দ নয়। সেজন্যই বড়োসড়ো অ্যাম্বুলেন্স গাড়িকে বেছে নেওয়া। আর সরবজিতের একমাত্র স্বপ্ন ছিল গোলগল্পে বেচা বা মেয়েদের নরম হাত চেপে ধরে রেশমি কাচের চুড়ি পরিয়ে দেওয়া। সরব প্রা জির কাচের চুড়ির ঠুঠুন, রিনরিন ঝঙ্কার বড়ো পছন্দের! মেয়েদের নরম ফর্সা হাত আরও বেশি। সবচেয়ে ছোটো ভাই গুল্লু তো আবার সিপাহী বা ফৌজি হতে চায়। এর মধ্যে কোন্টা পাপ? কোল্টা গদ্দারি? অ্যাম্বুলেন্সওয়ালা, অটোওয়ালা দেশদ্রোহী, চুড়িওয়ালা না সিপাহী? এই প্রশ্নের উত্তর সে শুধু খুঁজেই মরল। এ জীবনে সে জবাব আর পাওয়া হয়নি তার…!

জনতার গর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এল বিপন্ন মানুষের পরিত্রাহী চিৎকার। নর-নারী যুগ্মকণ্ঠের আর্তনাদ ও কান্না। তার সঙ্গে সমস্বরে কোলাহল, “ব-চা-ও! ব-চা-ও! ঘর মেঁ আগ লগা দিয়া! কোই বচাও মৈনু।”

ব্যাপারটা বুঝতে খুব বেশি দেরি হল না। দিদি হেসে কেঁদে সাময়িক বিরতি নিয়েছিল। এবার ফের সেই খলখলে হাসি হেসে বলল, “আ গয়া রে! আ গয়ি মেরি বারাত!”

বারাত। ওর কথা শুনে বেবের কান্না আরও বেড়ে গেল। সত্যিই তো। ওর বাড়িতে তো ‘বারাতি’দেরই আসার কথা ছিল। সেই প্রস্তুতিই তো চলছিল। কয়েকঘণ্টা আগেও ঢোলকি, সঙ্গীত আর রিশতেদারের সমাগমে আনন্দ উপছে পড়ছিল এই বাড়িতে। আজও চোখ বুজলে ওর হাতের গাঢ় রঙের মেহেন্দির কারুকাজ স্পষ্ট দেখতে পাই। তখনও সমস্ত ‘জেবর’, কনের পোষাক, লেহেঙ্গা পড়ে ছিল কাঠের আলমারিতে। গলার ভারি রানিহার-জুগনি হার-মোতি হার, পিপলপত্তি কানের বালি, কঙ্গন, সগগি ফুল, নথনি, চুড়িয়াঁ, অঙ্গুঠি, মেহঙ্গা পাজেব, মাঙ্গটিক্কা, আরও কত কী! পাজেব ছাড়া সব সোনার। মেয়েকে রাজকন্যার মতো সাজিয়ে নভজ্যোতের কাছে পাঠাতে চেয়েছিলেন বাপু। তার জন্য নিজেকেও নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন। যত জমা পুঁজি ছিল সবকিছু ‘দাঁও’ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কী চেয়েছিলেন তিনি, অথচ কী হল! বারাত এল ঠিকই, তবে মৃত্যুর।

বাইরের উন্মত্ত ভয়াবহ চিৎকার ক্রমাগতই বাড়ছে। একদল চেঁচাচ্ছে, “মারো…

মারো…!” আর একদল কাঁদছে, “বচাও…বচাও…।” তার সঙ্গে চড়চড় করে একটা অদ্ভুত শব্দ। দিদি ফের আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, “আতশবাজি হচ্ছে বুঝি?” তারপরই সে ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ছুটে গিয়ে একখানা জানলা সজোরে দড়াম করে খুলে দিয়েছে। জানলা খোলা মাত্রই উৎকট ধূমকুণ্ডলী আর পোড়া গন্ধের ঝাপটা ভেতরে এসে দম বন্ধ করে দিল। অদম্য কাশিতে ভেঙে পড়ল সরব আর আমন। চোখ, নাক সব জ্বলছে! এমনকি জ্বালার চোটে চোখ জলে ভরে যাচ্ছে, তাকাতেও কষ্ট হচ্ছে। আমি কাশতে কাশতেই অতিকষ্টে ঝাপসা চোখে বাইরের দৃশ্যটা দেখলাম। ধোঁয়ার আড়াল একটু সরতেই বুঝলাম সর্বনাশের ‘ঘড়ি’ এসে গিয়েছে। যে ‘আফতে’র অপেক্ষায় ছিলাম, সে দুড়দাড় মারমার করে এসে উপস্থিত। আমাদের কলোনির বাড়িগুলো এবার ধূ ধূ করে জ্বলছে। এতক্ষণ এই এলাকার আশেপাশে এই ছবিই দেখছিলাম। এখন সেই আগুনই মাত্র ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আমাদের পরিচিত জনের বাড়িগুলোকে সাপটে ধরেছে! ‘আগ কি লপ্টে’ একেবারে শেষনাগের মতো লাল লাল সহস্র ফণা তুলে লকলক করে উঠছে। তার সঙ্গে বদবুদার কালো ধোঁয়ার মোটা কুণ্ডলী জড়িয়ে জড়িয়ে, পাকিয়ে পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। চতুর্দিকে শুধু গাঢ় রক্তবর্ণের আগুন। আর তার মধ্য দিয়েই আততায়ীরা সগর্বে হাতে জ্বলন্ত মশাল, তরোয়াল নিয়ে ‘রে রে’ করে ছুটে আসছে এদিকেই! আমি সেদিকে তাকিয়ে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। আকাশের তারাও বুঝি গুণে শেষ করা যায়। কিন্তু মশালের যে শেষ নেই। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত কলোনির এ মাথা থেকে ও মাথা গিজগিজ করছে অগুণতি ক্রুদ্ধ মশালের গনগনে জ্বলন্ত চোখ। তার ‘তাদাত’ গোটা মঙ্গলপুরী ছাড়িয়ে কতদূর চলে গিয়েছে তার ঠিক নেই। এই একটা ব্লকের কয়েক ঘর শিখ পরিবারকে মারার জন্য কি গোটা ভারতবর্ষই চলে এসেছে।

হতভাগ্য শিখেরা জানত যে এই দুর্বল বাড়ি তাদের বাঁচাতে পারবে না। যতই খিল, হুড়কো দিক না কেন, কয়েকটা লাথি মারলেই ভেঙে পড়বে দরজা। তারপর জুহ্লাদদের আটকানোর আর কোনো উপায়ই থাকবে না। পরিণতি তাদের জানাই ছিল। কিন্তু যেতই বা কোথায়? ‘দাঙ্গাইরা’ এক তারিখ থেকেই গোটা মঙ্গলপুরীকে ঘিরে রেখেছে। যখন খুশি যে কোনো গলিতে ঢুকছে, কাটছে, মারছে, চলে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পরেই দ্বিগুণ উৎসাহ আর শক্তি নিয়ে ফিরে এসে পাশের গলির লোকগুলোকে মারছে, জ্বালাচ্ছে, ফের ফেরত যাচ্ছে। এত কাটাকুটির পর বোধহয় ক্লান্ত হয়ে নাশতা-পানি করছে। খুনে ভরা হাত, আঙুল, কবজি ডুবিয়ে খানা খেয়ে নিজেদের চাঙ্গা করেই আবার নিধনযজ্ঞে নেমে পড়ছে। দলে দলে পালা করে পাহারা দিচ্ছে, তবু জমি ছেড়ে নড়ছে না!

এর মধ্যে এতটুকুও বিরাম ছিল না যে কেউ ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচবে। যারা চেষ্টা করেছে, তাদের ওরা আগেই মেরেছে। শুনেছি কিছু সৌভাগ্যবান শিখদের তাদের হিন্দু, মুসলিম বন্ধু বা প্রতিবেশীরা লুকিয়ে রেখেছিল। কেউ আবার খোদ এইমস্ হসপিটালে গিয়েই আশ্রয় নিয়েছিল। তবে কয়েক ঘণ্টা পর দাঙ্গা এমন উগ্র হয়ে উঠেছিল যে এইস কর্তৃপক্ষও সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে শিখ পরিবাররা হসপিটালের ভেতরেও সুরক্ষিত নয়। ‘মর্’ যে কোনো মুহূর্তে এসে হসপিটালেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। কয়েকজন শিখের জন্য গোটা হাসপাতাল পুড়িয়ে দিতেও তারা কসুর করবে না। প্রভাবশালী ও ধনবান শিখেরা নিজেদের ঘাম-রক্ত দিয়ে গড়া সম্পদ, গাড়ি-বাড়ির মোহ মায়া ছেড়ে একবস্ত্রে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দাঙ্গাইরা তাঁদের না পেয়ে ঘর ভাঙচুর করেছিল। দামি জিনিসপত্র-অলঙ্কার, টাকা-পয়সা লুটপাট করে শেষে বড়ো বড়ো বাড়ি, বাংলো, দামি গাড়ি—সব জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হতভাগ্য মানুষগুলোদের মধ্যে যে ক-জন একটু প্রভাব খাটিয়ে বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন, তাঁরা প্রাণে বেঁচেছিলেন। আর যা-ই হোক, ফরেন এম্ব্যাসিতে গিয়ে মারপিট করার দুঃসাহস ‘দাঙ্গাই দের ছিল না। বৈদেশিক সম্পর্ক নষ্ট করতে গেলে ওদের নিজেদেরই কপালে দুঃখ ছিল। কিন্তু তাও বা ক-জন পারত? যেখানে স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং বিপন্ন, সেখানে সাধারণ-গরীব মানুষগুলো কোথায় যেত? খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে থাকত না দিল্লির রাস্তায়?

অগত্যা তারা ঘরেই আশ্রয় নিয়েছিল। ঘর শব্দটা তখন কবর বা চিতারই সমার্থক। আগেও বলেছি, এখনও বলছি-আসলে মানুষগুলো নিজেরাই নিজেদের কবরে বা চিতায় উঠে তৈরি হয়েই বসেছিল। ওই গোটা দেশে কোথাও শিখদের কোনো ‘ঘর’ ছিল না। তবু জেদি মানুষগুলো প্রথমেই হার মানতে চায়নি। কেউ দরজা বন্ধ করে ভেতর থেকে তালা এঁটেছে। কেউ দরজার ওপরে আলমারি, খাট, টেবিল, আরও যা যা সামান্য আসবাব ছিল তা চাপিয়ে, ঠেকা দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছিল। কী করুণ আর অবুঝ আশা! যেন ওইটুকু বাধাতেই ভঙ্গুর দরজা হয়ে উঠবে গড়ের লৌহপ্রাচীর। হয়তো আততায়ীরা তা অতিক্রম করে ঢুকতে পারবে না!

দাঙ্গাইরা শিখদের এত কাণ্ড দেখে বোধহয় মনে মনে হেসেছিল। প্রথমে বেশ কয়েকবার লাথি মেরে দেখল। আরও একটু জোর ‘আজমালে’ঠিক ভেঙে যেত। কিন্তু এতঘণ্টা ধরে একনাগাড়ে ভাঙাভাঙি করে তারাও বুঝি বিরক্ত আর অধৈর্য হয়ে গিয়েছিল। তারপর আর দরজা ভেঙে ঢোকার চেষ্টাই করল না। বরং দোর বন্ধ দেখে বিনাবাক্যব্যয়ে হাতের মশালগুলো ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে শুরু করল বাড়ির ছাতে। নারকীয় উল্লাসে তার ওপর তেলের জেরিকেনও উলটে দিতে ভুলল না। ফলস্বরূপ চিঙ্গারি নয়, একলপ্তেই দাবানলের মতো আগুন জ্বলে উঠেছে। কী ভয়াবহ তার ব্যাপ্তি। কী আগ্রাসী সে শিখা!

যারা দরজা ভেতর থেকে এঁটে বসেছিল, তাদের যে কী হাল হয়েছিল তা বলার নয়। ওদিকে মাথার ওপর আগুনের শিখা ভলকে ভলকে উল্কা উগরে দিচ্ছে। হা হা করে গ্রাস করার জন্য বিরাট দানবের মতো দ্রুত ধেয়ে আসছে তাদের পেছন পেছন। খিড়কি, ছাত সব জ্বলছে। বাইরে না বেরোলে ঘরের ভেতরই পুড়ে মরবে। আবার বাইরে যমদুতেরা টায়ার, তরোয়াল, আগুন—সব নিয়ে ‘সোয়াগতের’ জন্য দাঁড়িয়ে আছে। যেদিকেই যাক, মরা নিশ্চিত। কোনদিকে যাবে বুঝতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাচ্ছিল তারা। তাদের মনের অবস্থা শুধু ‘ওয়াহেগুরু’-ই বুঝেছিলেন!

কথায় আছে ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’। যারা দরওয়াজা পোক্ত করার জন্য ভারি ভারি আসবাবপত্র এনে চাপিয়েছিল, তারা এবার আগুনের ছ্যাঁকা খেয়ে চিৎকার করতে করতে বেরোনোর পথ খুঁজছে। কিন্তু কপালই এমন যে একমাত্র বাইরে বেরোনোর রাস্তাটা একটু আগেই নিজেদের হাতে বন্ধ করেছে যে! বেরোবে কোন্ পথে। ‘আগ’ তো মানুষ নয় যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে। সে জ্বালানির ইন্ধন পেয়ে দ্রুত তেড়ে এসে মানুষগুলোকে পোড়াতে শুরু করেছে। জ্বলন্ত মানুষগুলো পরিত্রাহি চিৎকার করে বাইরে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। অথচ যে খাট, টেবিল, আলমারি দিয়ে তারা দরজায় ঠেস দিয়ে রেখেছিল, সেই অতি বিশ্বস্ত আসবাবই এবার দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়াল। ওগুলোকে সরানোর জন্যও তো নির্দিষ্ট সময় লাগে। ভারি ভারি ফার্নিচারগুলো সরানো যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। যতক্ষণে ওরা ওগুলোকে হটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, ততক্ষণেই আগ ওদের ধরে ফেলেছে। দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে চামড়া চড়চড় করে পোড়াতে পোড়াতে ক্রমাগতই মাংস পেশীর মধ্যে ঢুকছে। তখন কে কাকে দেখে, কারই বা দরজা খুলে বেরোনোর মতো জ্ঞান থাকে।

দাঙ্গাইরা বাইরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল। অত্যন্ত উল্লসিত তারা। ভেতর থেকে যে পরিমাণ মরণ-আর্তনাদ ভেসে আসছিল তাতে বুঝেছে যে হতভাগা নির্বোধ শিকার এবার নিজের জালে নিজেই ফেঁসেছে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যে ভুল করেছে তা এখন ওদেরই মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা তবু হাল ছাড়বে না। একদল খোলা তরবারি, চপার নিয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এক দল সোৎসাহে একের পর এক জ্বালানি তেলের ডিব্বা শেষ করছে বাড়িগুলোকে ঘিরে ধরে। আর চরম আক্রোশে বলছে, “কী ভেবেছিস? এভাবে রক্ষা পাবি? এবার ভেতরেই পুড়ে মর! অররে ঔর পেট্রোল, ডিজেল, ঘাসলেট লাও রে! ঘর মেঁ ছিপকে বৈঠা হ্যায় চুহা! ঘর মেঁ হি ইনকি চিতা জলাতে হ্যায়!”

যস্যিদিদি চুপ করে খিড়কি দিয়ে আতশবাজি দেখছিল। সেই ফাঁকে আমি একঝলক দেখতে পেয়েছিলাম, জ্বলন্ত একটা বাড়ির খিড়কি আচকা খুলে গেল। সেই খিড়কিতে ‘অফ্রা-তরি’ করতে করতে এসে আছড়ে পড়েছে অজস্র মুখ! তাদের মুখগুলো শনাক্ত করার উপায়ও ছিল না। ততক্ষণে পুড়ে ঝামা হয়ে গিয়েছে। এরাও সেই হতভাগ্যদের মধ্যেই ছিল যারা দরজার ওপর পৃথিবীর সব ভার চাপিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ভারেই চাপা পড়ে কাল হল। ওরা চেঁচাতে পারছিল না। কারণ চেঁচানোর জন্য গলাটা অক্ষত থাকতে হয়! ওদের কারোর মাথার চুলে, কারোর পাগড়িতে ঝলসে ঝলসে উঠছিল আগুন। আমি শুধু কয়েকটা বিস্ফারিত চোখ দেখেছিলাম, আর পোড়া কাঠের মতো বাড়ানো হাত! ওরা হাত বাড়িয়ে নিজেদের আততায়ীদেরই বোধহয় কিছু বলতে চাইছিল। হয়তো অনুরোধ করতে চাইছিল, ‘বাঁচাও, আর পুড়তে পারছি না… আর সহ্য হয় না…।”

দাঙ্গাইরা তাদের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তাদের মৃত্যুযন্ত্রণার মজা নিল। তারপর বিদ্যুৎবেগে এক প্যাকেট সেই জ্বালাময়ী ‘সফেদ পাউডার’ ছড়িয়ে দিল ওদের সবার মুখের ওপরে। মানুষগুলো এতক্ষণ আগুনকে দেখে জ্বলছিল, এবার না দেখেই পুড়বে। আমি নিশ্চিত, মুখের চামড়া, মাংস কীভাবে গলে গলে খসে পড়ছে

তা দেখার জন্য ওদের একটাও চোখ আর আস্ত থাকবে না।

যারা অতটা বাড়াবাড়ি করেনি, তারা আগুনের আঁচ পেয়েই ছুটে বাইরের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু যেই দরজা খুলেছে, অমনি তাদের ওপর সবলে ঝাঁপিয়ে পড়ল জহ্লাদের দল। কৌরের দল বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদছিল। তাদের মুখের ওপর ধুঁয়াদার অ্যাসিড চলকে পড়ল! মুহূর্তের মধ্যে কান্না বদলে গেল প্রাণান্তকর ‘চিঁখে’। সর্দারদের গলায় তরোয়াল, চপারের কোপ! কলোনির জমিন কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই ‘রাখে’, রক্তে ভরে গিয়েছিল। আর আসমা মানুষের মরণ-আর্তনাদে। শুনেছি দেবতারা নাকি আকাশে থাকে। সেদিন বোধহয় ঈশ্বরও আর সইতে না পেরে কানে আঙুল দিয়েছিলেন। অথবা কে জানে, হয়তো বা বধিরই হয়ে গিয়েছিলেন।

“সালে মাদারচৌদ। বহার নিকল!”

এবার আমাদের বাড়ির দরজায় প্রবল আঘাত। হালকা দরজাটা থরথর করে কেঁপে উঠল। আমরা কিছু বোঝার আগেই অনেকগুলো ভারি পদাঘাতে তালাসুদ্ধই ধড়াম করে ভেঙে পড়ল কাঠের দুর্বল দরজা। কতগুলো ভয়ংকর দর্শন মানুষ দুড়দাড় করে দুর্দান্ত তুফানের মতো ঢুকে এসে আমাদের সবাইকে হিঁচড়ে-ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে বাইরের দিকে চলল। বাপুর কুর্তা তাদের টানেই ফড়ফড়িয়ে ছিঁড়ে গিয়েছে। ওরা ওঁর টুটি চেপে ধরে নিয়ে গেল। বেবে আর দিদির লম্বা চুল ধরে টানছিল ওরা। বেবের ভয়ার্ত চিৎকার আর কান্না শুনতে পাচ্ছি। দিদি ওদের সঙ্গে ‘হাতাপাই’ করছিল। কিছুতেই বাইরে যাবে না সে! প্রচণ্ড আক্রোশে হাত-পা চালাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে, “তোদের সবাইকে শেষ করব শয়তান… আমার সরতাজকে ধোঁখে সে মেরেছিস তোরা!…এবার হয় তোরা মরবি, নয় আমি মরব!”

কিন্তু তা সত্ত্বেও দুষ্কৃতীরা তাকে মাটিতে ফেলে মাটির ওপর দিয়েই চুল ধরে হিড়হিড় করে নিষ্ঠুরভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। ওর কোমল মাখনের মতো ত্বক রুক্ষ মেঝে, মাটির ঘষা খেয়ে কেটেছড়ে যাচ্ছিল। তবু যস্যিদিদি পাগলের মতো লড়ে যাচ্ছে। কয়েকজন আমাদের ছোটো ছোটো পাগড়ির ওপরে এত জোর ফলাচ্ছিল যে মনে হল পাগড়ি সুদ্ধ মুণ্ডুটাই উপড়ে আসবে। আমাদের পাগড়ি আর ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। সরব আর আমন তখন বলিপ্রদত্ত পশুর মতো আর্তচিৎকার করছে। আমি চিৎকার করতে চাইছি, তবু গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না!

ওই অবস্থাতেই শুনতে পেলাম গুরশরণ তাওজির কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর। ওঁকে আর তাইজিকেও একদল লোক টানতে টানতে নিয়ে আসছে। নিঃসীম আতঙ্কে তাওজির গলা থরথরিয়ে কাঁপছে। তা সত্ত্বেও উচ্চকণ্ঠে ‘সুখমণি সাহিব’ আওড়াচ্ছেন। মৃত্যুর আগের পবিত্র মন্ত্রজপ। কম্পিত অথচ তেজি স্বরে উচ্চারিত হচ্ছে –

“জিসু মনি বসৈ সুনৈ লায় প্রীতি,
তিসু জন আওয়ৈ হরি প্রভু চীতি।
জনম মরণ তা কা দুখু নিবারৈ,
দুলভ দেহ তৎকাল উধারৈ।
নিরমল সোভা অমৃত তা কী বাণী,
একু নামু মন মাহি সমানি।
দুখ রোগ বিনসে ভয় ভরম,
সাধ নাম নিরমল তা কে করম…!”

বাইরে তখন ক্রুদ্ধ, খুনি জনতার ভিড়। তারা রাগে, আক্রোশে ফুঁসছে। হাতে লাল রক্তে স্নান করা তরোয়াল, রড, চপার, চাকু—আরও কত অস্ত্র। তাদের কাউকে আমি চিনি না। এখন সবাইকে চাইলেও মনে করা সম্ভব নয়। কারণ ভিড়ের কখনোই নির্দিষ্ট কোনো মুখ থাকে না। তাদের সবাইকে দেখতে একরকম। ভেড়িয়ারা ভেড়িয়াই, তাদের আলাদা আলাদা চেহারা থাকে না। তবু তাদের মধ্যে কয়েকটা মুখকে চাইলেও এ জীবনে ভুলতে পারব না। ওই বয়েসেই সেই কয়েকটা মুখ আমার চোখে, মস্তিষ্কে আর আত্মায় বসে গিয়েছিল।

আশেপাশে যা ঘটছিল তা দেখে সেই আট বছরের শিশু ‘হালাল’ হওয়ার আগের ‘বক্রা’–র মতো কাঁপছিল। তার আজন্ম পরিচিত কলোনির মানুষগুলোকে ওরা কাটছিল, জ্বালাচ্ছিল। চারদিকে শুধু মৃত্যু আর লাশ। কেউ সারা গায়ে আগুন নিয়ে দাপাচ্ছে। কেউ সফেদ পাউডারে জ্বলছে। মানুষ বলে ওদের কাউকে চেনাই যাচ্ছিল না। এক ধারে সারি সারি পোড়া কাঠের মতো শবদেহ। তাদের ঘরে তখনও আগুন জ্বলছে। কিন্তু একদল সেই জ্বলন্ত বাড়ির মধ্যে ঢুকেই ভাঙচুর আর লুটপাট করতে ব্যস্ত। আর একদল কৌরদের কাপড় আর ইজ্জত ‘ফাঁড়তে’ নেমে পড়েছে! জন্তুর মতো তাদের উলঙ্গ করে সর্বসমক্ষেই গণহারে চড়াও হচ্ছে নির্লজ্জের দল! বয়েসের কোনো বাছবিচার নেই। সেই মেয়েদের ভিড়ে পাঁচ ছ-বছরের শিশুকন্যা থেকে শুরু করে বয়স্কা মহিলারাও ছিলেন। তাদের মধ্যে আমার তাইজিও অন্যতম। ওঁর, ওদের হাত পা সব অনেকগুলো লোক চেপে ধরে রেখেছে। পা দুটোকে দু-দিকে টেনে এমন ফাঁক করে ধরে আছে যে যোনিপথটাও সবার চোখের সামনে একদম স্পষ্ট! তারপর রাক্ষসেরা সব সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ওদের ওপর। একসঙ্গে একাধিক লোক যে যেভাবে পারে সর্বশক্তি দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে ব্যস্ত কারণ এক এক করে বলাৎকার করার মতো প্রয়োজনীয় সময় বা ধৈর্য কোনোটাই নেই। মেয়েগুলো সেই পৈশাচিক অত্যাচারের যন্ত্রণায় চিৎকার বা প্রতিবাদ করলে মুখে অ্যাসিডের শিশি উলটে দিচ্ছে! তাইজির মুখে অ্যাসিডের ধোঁয়া। এই নারীরা কেউ আমার দিদির মতো, কেউ বোনের মতো। কাউকে আবার শৈশব থেকেই বেবে-বুয়ার মতো দেখে এসেছি। তাইজির বুকে মাথা রেখে ‘লোরি’ শুনেছি।

ওঁর পবিত্র বুক থেকে ধূপের গন্ধ আসত। এখন শুধু রক্তমাংসের নাঙ্গা দুটো গোলক। চেঁচানোর সঙ্গে সঙ্গে সে দুটো থরথর করে কেঁপে উঠছে। ওরা সেটা দেখে মজা পাচ্ছে, গরম হচ্ছে। কেউ সেগুলোকে দাঁতে ছিঁড়ছে, কেউ নখে! ঐ পবিত্র বুককে দলিত-মথিত, মর্দিত করছে একাধিক মানুষের হাত। ওঃ ভগবান…৷

আট বছরের মাসুম চোখ লজ্জায়, ঘেন্নায় বুজে আসতে চায়। আজ পর্যন্ত নারীদেহ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। কৌতূহল বা লোভও নয়। কলোনির কৌররা সবাই আমার আত্মীয় সমান। আজ তাদের সবার রক্তাক্ত নগ্ন দেহ দেখে চোখ বুজে ফেললাম। প্রচণ্ড একটা ‘উলটি’ আসছিল! এ আমার চোখের সামনে কী হচ্ছে। ওদের গায়ে তো একটা সুতোও নেই! কতগুলো উলঙ্গ কুৎসিত মানুষ ওদের ওপর চড়াও হয়ে এসব কী নোংরা, বিকৃত কাজ করছে। আমার কলোনির মেয়েরা… আমার তাইজি…। ওয়াহেগুরু! এ কী দৃশ্য দেখছি! এ যে স্বচক্ষে দেখাও মহাপাপ।

যে উর্দিধারী সিপাইরা আমাদের ‘রক্ষা’ করার জন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা এখনও সেখানেই পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। চোখ, মুখ নির্বিকার। হাতে রাইফেল! অথচ ওটা কোনো কাজেই লাগবে না। ওর বদলে একটা কাঠের টুকরো ধরিয়ে দিলেও বিশেষ ক্ষতি হত না। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল, আদৌ এখানে কিছু হচ্ছে না। গান্ধীজির তিন বাঁদরের মতো ওরাও অন্ধ, বধির ও মূক। উলটে তারিয়ে তারিয়ে শিখ নারীদের বলাৎকার দেখে উষ্ণ আমেজ নিচ্ছে। দু-চোখে তাদের যৌনাঙ্গ চাটছে। কেউ কেউ অস্ফুটে ‘সি সি’ করে শীৎকারও করছে! এই পুলিশ। এই আইন ও কানুনের রক্ষী।

কয়েকজন দাঙ্গাই হরি সিং-এর বেবে রশ্মি কৌরের কাপড় ধরে টানাটানি করছিল। হরি সিং তার মাকে বাঁচানোর জন্য ছোটো ছোটো হাত পা ক-টা সম্বল করে লড়াই করছে আর সেই ‘নালায়ক’ পুলিশদের উদ্দেশ্যে চেঁচাচ্ছে, ‘ছোড়…ছোড় বেবে কো!…কোই বচাও…ব, চা, ও! ও থানেদার সাব! ব-চা-ও হ-মেঁ!”

“সুয়ার কি ঔলাদ!”

ওই পরিস্থিতিতে কে কাকে বাঁচায়? থানেদার সাবরা তো নিজেই ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। হরির কাতর প্রার্থনা কেউ শুনল না। খাঁকি উর্দি যথারীতি নিস্পৃহ, ভ্রূক্ষেপই নেই। উলটে দুটো লোহার রডের বাড়ি একসঙ্গে সপাটে হরির মাথায় পড়ল। আমি আঁতকে উঠলাম। ওর খুলিটা ভেঙেই গেল বুঝি। মাথা ফেটে গিয়ে গলগল করে রক্তের ‘ফুহার’ ছুটল। সে অর্ধ অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তাজা রক্তে মাটি ভাসছে! রশ্মি মা হাতজোড় করে কেঁদে বলল, “ওকে মেরো না! রহম্ করো। ও আমার একমাত্র ঔলাদ। তোমরা যা চাও, নিয়ে নাও। আমার ইজ্জতও নাও। কিন্তু জানটা বখশ দাও।

এই ছেলে ছাড়া আমার আর কেউ নেই। ও আমার বংশের শেষ চিরাগ।” “চিরাগ!”

এই কণ্ঠস্বরটা শুনে চমকে উঠলাম। এই মোলায়েম আওয়াজ কোনোদিন ভুলবো না। এইবার খুনিদের ভিড়কে একসাইডে ঠেলে যে লোকটা এসে দাঁড়াল তার মুখ আমি আজও ভুলিনি। মশালের আলোয় নিষ্ঠুর চোখদুটো চকচক করছিল। চৌকো চোয়ালে নৃশংসতা। দিনের আলোতেও এই লোকটাকে দেখেছি। তখন ও উর্দিতে ছিল। এখন উর্দি নেই কিন্তু অমানুষটা একই। এই লোকটাই আমাদের ধোকা দিয়েছে। এ-ই সরতাজকে খুন করেছে! আ.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা!

লোকটা মৃদু হেসে সেই একই ঠান্ডা স্বরে বলল, “বংশের একমাত্র প্রদীপ বলছিস্? তাহলে চিরাগকে ‘লও’ ছাড়া রেখেছিস কেন? বলিস্ তো জ্বালিয়েই দিই।” বলতে বলতেই সে ভিড়ের দিকে ফিরল, “চলো ভাইলোগ, চিরাগ কো থোড়া জলা দো। প্রদীপে আগুন লাগিয়ে দাও। দেশ অন্ধকার হয়ে আছে, একটু রওশন হোক।”

“দ-ত্তা-সা-ব!”

লোকটাকে চিনতে পেরে ও তার কথার অর্থ বুঝে রশ্মি মা কেঁপে ওঠে। সজল চোখে নিরূপায় দুই হাত জুড়ে ফেলেছে, “এমন জুলুম কোরো না! তুমিই আমাদের জান-অসমত-ইজ্জতের রক্ষক। যে রক্ষা করে তাদের আমরা দেবতা বলেই মানি। এমন কথা তোমার মুখে মানায় না। রহম্ করো। মেরি জান লে লো। আমার পুত্তরকে বখশ্ দাও!”

“সাপের বংশকে দুধ কলা দিয়ে পালতে নেই। সাপোলা যত ছোটোই হোক, ফণা কুচলে দিতে হয়।” দত্তাসাব বিরক্ত হয়ে ফের জনতার দিকে তাকাল, “ ক্যায়া হুয়া আও ভাইলোগ, এখানে শিখদের যত চিরাগ আছে, সবকো একসাথ জলা দো। দিওয়ালি ভি মনা লেতে হ্যায়।”

খুনিদের ভিড় নেকড়ের উল্লাসে ফেটে পড়ল। শুধু এই কথাগুলোরই বুঝি প্রতীক্ষা ছিল। আমার চোখের সামনেই হরি সিং, আমনপ্রীত, সরবজিত এবং আরও কিছু শিশু, কিশোর ও নাবালকের ওপর লাফিয়ে পড়ল ওরা। মুহূর্তের মধ্যে ওদের গলা দিয়ে বুক অবধি নেমে গেল কতগুলো কালান্তক মোটা টায়ার! হরি সিং-এর চোখ দুটো আতঙ্কে ফেটে যেন বাইরের দিকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো আতঙ্ক এবার বাস্তবের রূপ ধারণ করতে চলেছে। সরবজিৎ আকাশ পাতাল ফাটিয়ে আর্তনাদ করছিল। কখনও উন্মত্ত পশুর মতো ঝটপটিয়ে নিজেকে ছাড়াতে চাইছে, কখনও হাউহাউ করে কেঁদে প্রাণভিক্ষা করছে। আমনপ্রীত বিহ্বল। ওর শরীরের যা ওজন তার থেকে টায়ারটা বুঝি বেশি ভারি। সে বেচারি মৃত্যুর ভার নিতে না পেরে টলমল করছে দেখে একজন সজোরে এক লাঠির বাড়ি মেরে বলল, “হিলনা-ডুলনা নে-হি! সিধা খড়া রেহ!”

আমনপ্রীত এখন যেন মূক হয়ে গিয়েছে। তার মুখ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রত্যেকটা শিশুই অবুঝের মতো, পাগলের মতো ছটফট করে নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অথচ ওদের বুক থেকে শুরু করে ‘বাজু’র ওপর এঁটে বসে আছে শক্ত ও টাইট টায়ার। হাত-পা ছোঁড়ার সুযোগটুকুও নেই, ঝটপটানিই সার। শত্রুর দল ওদের জোরে চেপে ধরে আছে। দৌড়ে যে পালাবে, তারই বা উপায় কই?

ওরা আমাকেও টায়ার পরাতে আসছিল। ভূপেন্দ্র দত্তা হাত তুলে থামাল। বলল, “আরে গাধা, সবগুলোকে একভাবে মারবি? মজা নেহি হ্যায় উসমেঁ। বোর নেহি হোতে তুম লোগ? বোর হো গয়া ম্যায় তো! এ তো ভয়ে অর্ধেক মরেই আছে। বাকিটা পরে হবে। যেগুলো আধমরা, সেগুলোকে ছাড়। অন্য প্ল্যান আছে। বাকিগুলোর গলায় আলোর নেকলেস পরা। একটু পাপ দূর হোক।”

বাপু এতক্ষণ কোনো কথা বলেননি। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে কোনো লাভ হবে না তা ওঁর আগেই জানা ছিল। তাঁর ঘাড় ধরে নতজানু করে বসিয়ে দিয়েছে ‘মর্।’ হাত পেছন থেকে কষে ধরে রেখেছে। মাথাটাও নড়াতে পারছিলেন না। তবু এবার কোনোমতে হাহাকার করে উঠে বললেন, “এ কেমন কথা সাব! ওরা নিষ্পাপ শিশু। ওদের ছেড়ে দাও। ইন্দিরাজির মৃত্যুর সঙ্গে ওদের কী সম্পর্ক? বদলে আমাদের জ্বালিয়ে দাও। কিন্তু ওরা মাসুম!”

“এগুলো সব বড়ো হয়ে বদলা নেওয়ার জন্য সেই ভিন্দ্রানয়ালে, বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিংই তো হবে। শুনেছি পাঞ্জাবে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর উৎসব হচ্ছে। আমরা একটু উৎসব করব না?” দত্তাসাহেবের ইস্পাতের মতো ঠান্ডা কণ্ঠস্বরের মসৃণ উত্তর, “গদ্দারের খুন আছে তো! রিস্ক কিওঁ লেনা? চিন্তা করিস না। তোদের সপরিবারে নরকে পাঠাবো। ওখানে গিয়েই একসঙ্গে উৎসব করবি।” “স্যার!”

এবার ভিড় থেকে আর একটা লোক এগিয়ে এল। এখন সাদা পোষাক পরা থাকলেও তাকে চিনতে অসুবিধে হল না। এ-ও আর একজন পুলিশওয়ালা, ‘আলা অস।’ আই.পি.এস.। সকালে ভূপেন্দ্র দত্তার সঙ্গেই এসেছিল। এখনও পেছন পেছনই ঘুরছে। দত্তা তার দিকে ঘাড় ঘোরাল, “দেওধর চৌবে সাহাব। কী সমাচার?”

আই.পি.এস. দেবধর চৌবে আঙুল তুলে বাপু আর কম্পমান তাওজিকে দেখিয়ে বলল, “এই দুটোর খুব চর্বি চড়েছিল স্যার। একটা তরোয়াল নিয়ে হাতে মাথা কাটছিল। আর ওই বুডটা লাঠি ঘুরিয়ে কত মানুষের মাথা ফাটিয়েছে তার ঠিক নেই। ওই ফৌজির সঙ্গে মিলে ‘বোলে সো নিহাল’-এর নারা লাগাচ্ছিল, আর বহুত লাফাচ্ছিল। ওই বুড়ো শুয়োর বহুত নাচতে পারে।”

“বটে?” ভূপেন্দ্র-র ভুরু কুঁচকে গেল, “আমাদেরও একটু নাচ দেখাক তবে। দেখি কত লাফাতে পারে। বুঢ়াটাকে দিয়েই শুরু কর।”

“ও-য়া-হে-গু-রু।…ও-য়া-হে-গু-রু।”

তাওজির সারা শরীর তুফানের সামনে বুজুর্গ ‘পেড়’ এর মতো কাঁপছিল। তিনি ঠিকমতো নিজের পায়েই দাঁড়াতে পারছিলেন না। দুর্বৃত্তরা তাঁকে টানতে টানতে একপাশে নিয়ে গেল। তারা ওঁর মাথা দিয়ে টায়ার গলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি কাঁপতে কাঁপতে মাথা এদিক ওদিক ঝাঁকিয়ে বাধা দিয়ে চলেছেন। কিছুতেই গলায় টায়ার পরবেন না। বয়স্ক মানুষটি বারবার মাথা ঝাঁকিয়ে আগুনের নেকলেস প্ৰত্যাখ্যান করছেন আর সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করছেন, “ও-য়া-হে-গু-রু। ও-য়া-হে-গু-রু!” “সর কো

পকড়!”

ভূপেন্দ্র দত্তা আর তার পুলিশবাহিনী চুপচাপ সব দেখছিল। এবার ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বেশ ষন্ডামার্কা মুরুব্বি লোক বেরিয়ে এসে নির্দেশ দিল, “কী রে! একটা বুডঢাকে সামলাতে পারছিস না? আরে, গলার পাশের একটা দুটো হাড্ডি ভেঙে দে না সালার! আবার পুরো মটকেই দিস্ না। শুধু একটু ভেঙে দিবি, মারবি না। তবে মাথা নাড়াতেই পারবে না। ইয়ে জিন্দা জনা চাহিয়ে।”

এই বুদ্ধিটা সবারই মনে ধরল। আরও একজন কালো, মুষকো চেহারার গুন্ডা ছুটে এসে ‘তুরন্ত’ তাওজির মাথাটা সজোরে চেপে ধরে সবেগে একটু ঘুরিয়ে দিল। ঐ চিল্লম-চিল্লি, অফরা-তফরির মধ্যেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম হাড় ভাঙার শব্দ, “মট্!” এবার তাওজির মাথা একটু ঝুঁকে গেল। পাগড়িসুদ্ধ মাথাটা এলিয়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু তিনি তখনও বেঁচে আছেন। শুধু ‘সর’বুঝি অসাড় হয়ে গেল। অসহ্য যন্ত্রণায় সজোরে কেঁদে উঠলেন, “ওয়াহেগুরু!”

সেই কান্নায় পাথরের বুক ফাটতে পারত। কিন্তু খুনিদের আত্মায় চিড়ও ধরল না। তাওজির মাথাটাকে ঝুলে পড়তে দেখে তারা আর দেরি করল না। ভূপেন্দ্র দত্তাও তাড়া দিচ্ছিল, “জলদি কর। কত সময় লাগাবি? টাইম বেশি নেই আর।” তাই দাঙ্গাইদের একটা অংশ ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ঝটপট জোর করে টায়ারটা পরিয়ে দিয়েছে তাওজিকে। হাত ওরা আগেই চেপে রেখেছিল, তাই হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নিরুপদ্রবে ওটাকে গুরশরণ তাওজির বুক অবধি আটকে দিয়ে ভালো করে কেরোসিন ছিটিয়ে দিল ওটার ওপরে। তাঁর পাগড়ি, লম্বা দাড়ি সুদ্ধ চামড়ার টায়ারও কেরোসিনে চপচপে হয়ে ভিজে গিয়েছে। আমার নাকে উগ্র তেলের গন্ধ এসে ঝাপটা মারল। আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখছিলাম, একা তাওজি নয়, ওদের দল অন্যদিকে আরও অনেক সর্দারকে ধরে জবরদস্তি টায়ার পরাচ্ছে আর কেরোসিন ঢালছে। তার মধ্যে নভজ্যোতের দাদা পবনজ্যোত আর ওর বুড়ো বাপও আছে। পবনজ্যোত প্রাণপণে শত্রুদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। সে হট্টাট্টা চেহারার লোক। চার পাঁচজন মিলেও তাকে সামলাতে পারছিল না। কিছুতেই টায়ার পরবে না। বারবার ঝটকা মেরে ছিটকে দিচ্ছে সবাইকে। একটা শিখের বাচ্চাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সব বীরপুরুষ।

বেজন্মার বাচ্চা দেশের দেওয়া অমন জমকালো নেকলেস কিনা প্রত্যাখ্যান করে! এত বড়ো দুঃসাহস! এতক্ষণ তথাকথিত ‘দেশসেবকরা’ নরমে গরমে তাকে টায়ার পরানোর চেষ্টা করছিল। এবার তাদেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। একজন কোনো কথা না-বাড়িয়ে একটা তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল তার পেটে। পবনজ্যোত ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠার আগেই আরও কয়েকটা তরোয়াল আর ছুরি আমূল তার বুক আর পেটে ঢুকে গিয়েছে। লোকগুলো সেখানেই থামল না। তারা সরোষে ঘপাঘপ কোপাতে শুরু করল তাকে পবনজ্যোতের অন্তিম আর্তনাদ তাদের উল্লসিত চিৎকারের মধ্যেই ডুবে গেল, “ইন্দিরা গান্ধী অ-ম-র র-হে! জান কা বদলা জান!”

চোখের সামনে আমি পবনজ্যোতকে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে দেখলাম। ওর পেট দু-ফাঁক হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র তরোয়ালের ঘায়ে আগেই বেরিয়ে এসেছিল। এতদিন শুধু আস্ত মানুষ দেখে এসেছি। মানুষের গুর্দা, যকৃত, পাকস্থলী কেমন হয়, তাও আজ দেখা হয়ে গেল। উলটিটা আর আটকে রাখতে পারিনি। ঐ বীভৎস অঙ্গ, আঁশটে গন্ধে হড়হড় করে বমি করে ফেলেছিলাম। পেটে কিছু ছিল না, তাই একরাশ তেতো জলই উঠল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ওরা পবনজ্যোতের পুরো বুক, পেট চিরে ফাঁক করে দিয়েছিল। তবু ও মরেনি। খুনিরা ওর পূর্ণাঙ্গ অপারেশন করে যখন রক্তমাখা হৃৎপিণ্ডটাকে শিরা ধমনী সুদ্ধ বাইরে বের করে আনল, তখনও সেটা ধুকপুক করছে। আমি স্বচক্ষে তার স্পন্দন দেখছিলাম। পবনজ্যোতের নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে, তবু সে ধড়ফড় করতে করতে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।

দাঙ্গাইদের ষন্ডা নেতা পুরো কাণ্ডটা দেখে বেজায় বিরক্ত হয়ে উঠেছে। বলল, “এ বেহেনচোদ মরে না কেন! কলেজাটা কেটে টুকরো কর তাড়াতাড়ি। শালার বড়ো শক্ত জান।”

এতক্ষণ পবনজ্যোতের ওপর অপারেশন চলছিল। এবার ওর হৃৎপিণ্ডটার ওপর চলল। ওই ছোট্ট ধুকপুক করা অঙ্গটাকে যে কত অগুণতি ছোরা এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঝাঁঝরা করে দিল তার হিসেব নেই। কলজেটাও বুঝি ভলকে ভলকে রক্তবমি করতে করতে অবশেষে একসময় টুকরো টুকরো হয়ে স্থির হল। তার লড়াইও খতম! পবনজ্যোতেরও।

“ও-য়া-হে-গু-রু। ও-য়া-হে-গু-রু।”

আট বছরের শিশু স্তম্ভিত হয়ে পবনজ্যোতের টুকরো টুকরো লাশটার দিকে তাকিয়েছিল। তাওজির বিকৃত কান্নায় সংবিৎ ফিরল। সে তাকিয়ে দেখল, গুরশরণ তাওজি জ্বলছেন! তাঁর সফেদ দাড়ি, পাগড়ি লেলিহান আগুন গিলে নিয়েছে। অসহায়ভাবে হাত দুটোকে বের করার চেষ্টা করছেন। টায়ার থেকে বহ্নিশিখা লাফিয়ে লাফিয়ে মুখের দিকে উঠছে, আবার পেটের দিকেও যাচ্ছে। অনেক ছটফট করেও ঐ শক্ত টায়ারের নাগপাশ থেকে যখন নিজেকে ছাড়াতে পারলেন না, তখন এলোপাথাড়ি এদিক ওদিক দৌড়োতে শুরু করলেন। দেখলাম, একটা উল্কাপিণ্ড, যে কখনও আমার তাওজি ছিল, সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক ওদিক দৌড়চ্ছে আর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ঝুলন্ত মাথা লগবগ করে নড়ছে বলে যন্ত্রণা সামলানোর জন্য কখনও থেমে যাচ্ছেন। আর গলার শিরা ছিঁড়ে বলেই যাচ্ছেন, “ও-য়া-হে-গু-রু।

ও, য়া-হে, গু-রু-উ-উ-উ-উ!”

“অজীব মুসিবত হ্যায়।” মুরুব্বি ব্যাজার মুখে বলল,

“হাত আটকা, ঘাড় ভাঙা, কিন্তু পা দিয়েই বাজিমাত করবে দেখছি। চিল্লমচিল্লি করে কান ফাটিয়ে দিল।”

ভূপেন্দ্র দত্তা ফিক করে হেসে ফেলে, “দেওধর চৌবে ঠিকই বলেছিল। এ বুডটা ভালো নাচতে পারে। লাফাতেও পারে। কেরোসিন আছে তো আরও। যতবার গড়াগড়ি দেবে, থামবে, ততবার গায়ে কেরোসিন ঢালবি। তেলে স্নান করিয়ে দে। জমিতে পড়লে বা থামলেই তেল ‘ডাল।’ আরও দৌড় করা। দেখি, কত মণ তেল পোড়া অবধি রাধা নাচতে পারে।”

‘মব্’ ঠিক তাই-ই করল। গুরশরণ তাওজি যতবার গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেন বা থামলেন, ততবারই তাঁর ওপরে জ্বালানি তেল ঢালা শুরু হল। আগুন চড়চড় পড়পড় করে আরও জোরদার বেগ ধরল। তিনিও ওই জ্বলন্ত অবস্থাতেই বুঝেছিলেন যে মাটিতে পড়লেই কিংবা থমকে দাঁড়ালেই এরা স্তিমিত আগুনকে তেল ঢেলে ‘বঢ়াওয়াহ’ দেবে। কিন্তু দৌড়োতে থাকলে হয়তো আর কেরোসিন দিতে পারবে না। তাই নিরূপায় হয়ে শুধু দৌড়ে গেলেন… দৌড়ে গেলেন… দৌড়েই গেলেন! কখনও ইখে, কখনও উত্থে! মাথা লটরপটর করতে থাকল, তবু থামলেন না। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও বাঁচবার কী আপ্রাণ চেষ্টা! তবে সবটাই বিফল। ক্রমাগত জোর বাড়ছিল আগুনের, আর শক্তি কমছিল তাঁর। কণ্ঠস্বর বিকৃত থেকে বিকৃততর, বিকৃততম হতে থাকল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু বলেই গেলেন, “ওয়াহেগুরু। ওয়াহেগুরু! ওয়াহেগুরু!” তারপরই নিষ্প্রাণ, নির্বাক জ্বলন্ত দেহটা আছড়ে পড়ল মাটির ওপরে। প্রাণ ছাড়ল, আগুন ছাড়ল না।

আমি যে ওখানে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিলাম, তা আর মনে নেই। শুধু এইটুকু জানি, না আমার কান্না পাচ্ছিল, না ভয় লাগছিল, না কষ্ট হচ্ছিল, না যন্ত্রণা! একেবারে পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখের সামনে আমার প্রিয় মানুষগুলো এক এক করে মরছিল। জন্ম থেকে যাদের দেখে আসছি, সেই চাচা, তাও, মামা, দাদাদের জ্বালাচ্ছে কাটছে ওরা। নভজ্যোত, সরতাজরা আগেই গিয়েছিল। এবার পবনজ্যোতকে বীভৎসভাবে খণ্ড খণ্ড হতে দেখলাম। গুরশরণ তাওজি, যাঁর বুকে, পিঠে খেলেছি, যাঁর হাত থেকে বাদাম খেয়ে অভ্যস্ত, সেই মানুষটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমার দুই প্রাজি সরবজিত আর আমনপ্রীত বুকে টায়ার নিয়ে জ্বলবার অপেক্ষা করছে। হরি সমেত সমস্ত কলোনির বন্ধুরাও এখন আগুনের প্রতীক্ষায়। ওদের ওপর এখন গ্যালন গ্যালন তেল ঢালা হচ্ছে। ওরা সবাই পাগলের মতো চিল্লাচ্ছে! যে কোনো মুহূর্তে একটা দেশলাই জ্বলবে। আর সব শেষ। ওরা আকাশ ফাটিয়ে কান্নাকাটি করে পুলিশের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করছে। কিন্তু কেউ কিছু করছে না। কেউ ওদের বাঁচাবে না।

শুধু পুরুষরা নয়। মেয়েদেরও মরতে দেখছি। যেদিকে তাকাই, খালি মৃত্যুর দৃশ্য। কিছু দাঙ্গাই মেয়েদের ছেড়েছিল। এরা ছাড়ল না। স্বচক্ষে মাসি, পিসি, দিদি, বোনদের ‘সামূহিক বলাৎকার’ দেখছি! নিজের মা সমান ‘তাইজির’ ওয়াহিয়াত’ মৃত্যুও দেখেছি। আশ মিটিয়ে অত্যাচার করে যখন মন ভরে যাচ্ছে, তখন কারোর স্তন কেটে নিচ্ছে। কারোর যোনিতে ছুরা ঢুকিয়ে খোঁচাচ্ছে। অনেকের মুখে ঢেলে দিয়েছে অ্যাসিড। অ্যাসিডের জ্বালায় চিৎকার করছে, দাপাচ্ছে মেয়েগুলো। সেই অবস্থাতেই তাদের ওপর পাশবিক গণধর্ষণ করে চলেছে। কারোর আবার গোপনাঙ্গের রক্তক্ষরণে ভেসে যাচ্ছে কলোনির মাটি। এমনকি ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও চলে এসেছে বাইরে।

একেকজনকে দশ-বারোজন মিলে রাক্ষসের মতো ‘বলাৎকার’ করলে তার ‘আঁতরি’ তো বাইরে আসবেই। তাইজিরও পেটের ভেতরের মালমশলা সব বেরিয়ে এসেছিল। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে ওঁর মুখ চেপে ধরে হাঁ করিয়ে অ্যাসিড খাইয়ে দিল। ঠোঁট, মুখ, জিভ থেকে শুরু করে পেট অবধি পুড়িয়ে ঝামা করে দিল সেই শক্তিশালী অ্যাসিড। আমি শুধু দেখলাম… শুধু দেখলাম!

আমার চোখের সামনেই দানবগুলো বলাৎকারের শেষে পরিচিত একজন দিদির দুটো পা নব্বই ডিগ্রিতে নিয়ে গিয়ে পুরো ছিঁড়ে ফেলল! তার কোমরের হাড্ডি ভাঙার আওয়াজটা পর্যন্ত পেয়েছি। দেখেছি নাভি অবধি ফট্ করে চিরে গেল। কিন্তু কী করব। কী করার ছিল? শুধু ভাবছিলাম, এরা আমার আপনার জন। আমার পরিচিত মানুষ। এদের উঠোনে কঞ্চে খেলেছি, এদের হাত থেকে কত যে দাল মাখনি, সর্ষো দা সাগ আর পরাঠা খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। এইমাত্র যে দিদিটার পা ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলল, সে প্রতি বৈশাখিতে ‘মিঠে পিলে চাওয়ল’ আর ‘অমৃতসরি ছোলে’ নিয়ে আমাদের খাওয়াতে আসত। যে তাইজি আদর করে লস্যি খাওয়াতেন, তাঁকে অ্যাসিড খাওয়াল। যে বুয়াদের বলাৎকার করে মারল, স্তন কেটে নিল, তাদের স্নেহচ্ছায়ায় কখনও আদর, কখনও ডাঁট খেয়েছি। দস্যিপনা করে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ওরাই সস্নেহে জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়েছে। উৎসবে, অনুষ্ঠানে এরাই হাতে নানারকমের ‘পকোয়ান’ নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসত। ‘লোহরিতে’ রাতে আগুন জ্বালিয়ে নাচাগানা করত। যস্যদিদির বিয়ে উপলক্ষ্যে এরাই ঢোলকি বাজিয়ে গান গাইছিল, নাচছিল। তাইজি তো সবচেয়ে বেশি নেচেছিলেন। দিদির হাতেও অমন চমৎকার মেহেন্দি ওরাই লাগিয়েছে।

অথচ আজ সবাই শেষ। নিথর দেহগুলো সাক্ষী দিচ্ছিল, এ কলোনির নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মরেছে। যাদের প্রাণটুকু এখনও ধুকপুক করছে তারাও খুব শীগগিরিই মরবে। আমার বাপু, দিদি, বেবে, আমিও বাঁচব না। দিদি তখনও ধস্তাধস্তি চালিয়ে যাচ্ছে। আঁচড়ে, কামড়ে একসা করছে। অপরপক্ষ তাকে মেরেধরে একসা করছে, তবু হাল ছাড়বে না। বেবের ওপর এখনও অত্যাচার শুরু হয়নি। হয়তো অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে। তাও কান্না পাচ্ছিল না। কোনো কিছু অনুভব করতে পারছিলাম না আমি। শুধু শূন্যতা। চতুর্দিকে স্রেফ লাশ আর শূন্যতা! আমি যেন আমি নই। অনুভূতিহীন একটা পাথর, যে কীভাবে কাঁদতে হয় তাও ভুলে গিয়েছে। অথবা জিন্দা লাশ!

“মা…মা!…মা-আ-আ-আ।…বে-বে…বে-বে-এ-এ-এ!”

সমবেত তীক্ষ্ণ কচি গলার হাহাকারে চমকে উঠে দেখলাম, এবার শিশু-কিশোরদের অগ্নিপরীক্ষাও শুরু হয়েছে। হরি, সরবজিত, আমনপ্রীত সহ সবার গায়ে আগুন উল্লাসে নাচছে! নরম মাংস পেয়ে যেন আরও ধেয়ে উঠেছে তার ‘লালচ।” সরবজিতের চিখ সবার কান্নাকে ঢেকে দিচ্ছিল। সে চিৎকার করছে আর বলছে, “মা… ওয়াহেগুরু, জ্বলে গেলাম, পুড়ে গেলাম!”

নাবালক নিজের যন্ত্রণা আর অভিযোগ জানানোর জন্য ওই দু-জনকেই পেয়েছিল। জানত না, তার দুই আশ্রয়ই আজ নিরূপায়। হরি তখন প্রদীপ নয়, জ্যান্ত মশালের মতো ধু ধু করে জ্বলছে। সেই অবস্থাতেই হয়তো একটু ‘রাহতের’ আশায় নিজের মা রশ্মি কৌরের দিকে দৌড়চ্ছিল। হরি দুর্ভাগ্যক্রমে জানতে পেরেছিল যে আগুনে জ্বলতে বা পুড়তে কেমন লাগে। তার বিভীষিকা সাক্ষাৎ এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে এটা রুটির ছ্যাঁকা নয় যে মা ফুঁ দিয়ে জ্বালা কমিয়ে দেবে! ছেলেমানুষটা ওই যমজ্বালা, বিষ-যন্ত্রণা নিতে পারেনি। তাই মুখে রক্ত তুলে সে-ও চেঁচাচ্ছিল, “বে-বে।…আগুন নিভিয়ে দে মা! জ্বালা…জ্বা-লা! ভীষণ জ্বা-লা-আ-আ-আ! ও মা…মা-গো… মা-আ-আ-আ!”

রশ্মি কৌর একমাত্র সন্তানের ওই অবস্থা দেখে বুক চাপড়ে প্রাণ কাঁপানো হাহাকারে ভেঙে পড়ল। সে কোনোমতে হাঁকপাক করে, নিজের শরীরটাকে ঐ শয়তানগুলোর ‘চঙ্গুল’ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জ্বলন্ত মৃত্যুপথযাত্রী ছেলের কাছে যেতে চাইছিল। হয়তো নিজেকেও ছেলের আগুনে আলিঙ্গনেই সঁপে দিত। শেষমুহূর্তে আগুনে পোড়া কপালে একটা অশ্রুভেজা শীতল চুমো এঁকে দিত। চোখের জলে একটু ‘ঠন্ডক’ দিতে পারত। কিন্তু সে সুযোগও পেল না হতভাগিনী। কতগুলো জানোয়ার তার আগেই হরির মাথায় ফের দমাদম লোহার রডের বাড়ি মেরে তার ঘিলুই বের করে দিল। শেষে মাটিতে ফেলে দিল পুড়ে মরবার জন্য। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে লোহার ‘সলাখে’ দিয়ে তার পেট বেশ কয়েকবার ফুঁড়েও দিয়েছে। শেষবারের জন্য মায়ের স্নেহস্পর্শ পাওয়ার জন্য মরণাপন্ন হরি কোনোমতে নিস্তেজ হাত বাড়াল। কিন্তু ছেলের দিকে তাকিয়ে একবার শুধু চিৎকার করতে পেরেছিলেন রশ্মি মা।

“পু-ত্ত-র! মেরি পু-ও-র! র-ব জি! ওঃ!”

ওটাই তার বলা অন্তিম বাক্য। তারপরই একদল নরপশু তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল আমাদের নজরের আড়ালে। কানে আসতে লাগল শুধু ওর প্রাণান্তকর চিখে। এমনভাবে বুক, গলা ফাটাচ্ছিল রশ্মি মা যেন কতগুলো বন্যজন্তু ওকে জ্যান্ত ছিঁড়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ সেই একটানা আর্তনাদে মাটি কাঁপল। একটু পরেই সেটা গোঙানিতে রূপান্তরিত হল। শেষপর্যন্ত সব থেমে গেল। সব চুপ।

বাপু নিজের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়ে এতক্ষণ নিজের অন্তিম প্রহরের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে বসেছিলেন। কিন্তু চোখের সামনে নিজের সন্তানকে জ্বলতে, ছটফটাতে দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না। আমার অমন শান্ত বাবা দুর্দান্ত শক্তিতে সব দুষ্কৃতীকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “ক-ঞ্জা-র। ছো-ড়!”

লোকগুলো ওই একধাক্কাতেই সব উলটে পড়ল। বাপু নিজেকে সামলে নিয়ে সবেগে ছুটলেন জ্বলন্ত আমনপ্রীত আর সরবজিতের কাছে। কয়েক কদম এগোতে-না এগোতেই একটা শাণিত তরোয়াল সপাটে ছুঁয়ে গেল তাঁর গলা। বাপু বোধহয় টেরও পাননি যে কখন ধড় থেকে মাথাটা খসে পড়ে গিয়েছে। ওঁর মুণ্ডহীন কবন্ধ তারপরও কয়েক পা ছুটে গেল নিজের ছেলেদের উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে। তারপর আচমকা ঝাঁকুনি খেয়ে, ধড়ফড় করতে করতে পড়ে গেল। এক দাঙ্গাই তাঁর পাগড়িসুদ্ধ মাথাটাকে নিয়ে সোল্লাসে ছুড়ে দিল নিজেদের দলের দিকে। দেখলাম, ওরা বাপুর কর্তিত, রক্তাক্ত মাথাটা নিয়ে লোফালুফি করছে আর বলছে, “পাঁচশো টাকা। পাঁচশো টাকা!”

সর্দারদের মাথার মূল্য পাঁচশো টাকাই নির্ধারিত করেছিল ওদের শ্রদ্ধেয় নেতারা। একজন স্নেহশীল পিতা, এক প্রেমপূর্ণ দায়িত্ববান স্বামী, এক নিরীহ ছাপোষা অটোওয়ালা জীবনের দাম পাঁচশো টাকা! আমার বাপু কি জানতেন তাঁর এত দাম? তিনি গোটা জীবনে একসঙ্গে পাঁচশো টাকা কতবার দেখেছেন কে জানে। মৃত্যুর সময়েও জানতেন না যে একসঙ্গে অতগুলো টাকা হাতে পেলে কী করবেন। তাঁর খুনিরা নিশ্চয়ই জানতে পেরেছিল। তারা তো পাগড়ি পরা মাথা সংগ্রহ করতেই নেমেছে।

ওঁর দেহটা তখনও অল্প অল্প নড়ছে। সেটাও ওদের পছন্দ হল না। ওরা মশাল দিয়ে ওই নিস্তেজ হয়ে আসা লাশটাকেও জ্বালিয়ে দিল। বিন্দুমাত্রও প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে দেবে না। দেহটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠতেই পরম তৃপ্তিতে কাজ শেষ করে বাকিদের দিকে মনোনিবেশ করল।

“আরে! এই কুত্তার পিল্লা তো কান-মাথা খেয়ে নিল।”

জ্বলন্ত শিশুদের ‘শোর-শরাবা’ পছন্দ হচ্ছিল না ওদের। ভূপেন্দ্র দত্তা অবশ্য এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন চিৎকার নয়, সঙ্গীত শুনছেন। শিখদের মরণ-আর্তনাদ, হাহাকার ওর কাছে বুঝি স্বর্গীয় সুর। তাদের রক্তের গন্ধ, পোড়া মাংসের ব ওর কাছে ‘ইত্তরের’ খুশবু ছিল। কিন্তু ওই ষন্ডামার্কা ঘাড়ে গর্দানে মুরুব্বির সেটা সহ্য হল না। সে চেঁচিয়ে নিজের দলবলকে বলল, “আগুন নেভা তো! এদের চিল্লানো বন্ধ করা প্রয়োজন। একদম সুয়ার কা মাফিক চিল্লাচ্ছে।”

হরি সিং সহ আরও কিছু শিশু-কিশোর ততক্ষণে মারা গিয়েছে। যে ক-জন তখনও প্রাণপণ গলা ফাটাচ্ছিল, তাদের ওপর জল ঢেলে তাৎক্ষণিক আগুন নেভানো হল। পরক্ষণেই হুকুম হল, “যা! শক্ত দেখে সুই-ধাগা লে আ।”

এতক্ষণ আমিও নিস্পন্দ, নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, ওটা অন্য কেউ। যে শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। আর আমার আত্মা শূন্য থেকে সব শুনছে, কিন্তু কোনো কিছুই বুঝি দাগ কাটছে না। আমার পরিবার ধ্বংস হচ্ছে, কাছের মানুষগুলো ভয়াবহ মওত মরছে। অথচ আমি শোক, দুঃখ, রাগ, ক্ষোভ, কান্না, চিৎকার-কিচ্ছু টের পাচ্ছি না! শুধু বুকের ভেতরে ইস্পাত কঠিন কিছু একটা জমা হচ্ছে। হয়তো লোহা, হয়তো পাথর! মানুষপোড়ার গন্ধে আর বমি আসছে না। ধোঁয়ায় চোখ কড়কড় করছে, এক বিন্দুও জল আসছে না!

কিন্তু এবার যা হল তাতে এই পাথর কিংবা লোহারও বুকও ফেটে চৌচির হল। আট বছরের শৈশব মর্মান্তিক দৃষ্টিতে দেখল আর এক ভয়াবহ দৃশ্য। লোকগুলো বুঝি তৈরিই ছিল। আদেশ পাওয়া মাত্রই কতগুলো তার আর মোটা মোটা সুঁচ নিয়ে এসেছে। শিশুগুলো আধপোড়া অবস্থাতেই গোঙাচ্ছিল। মরণের আসতে বেশি বাকি ছিল না। কিন্তু ওই অবস্থাতেই ওরা সূঁচ সুতো নিয়ে সবলে ওদের ঠোঁট সেলাই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মুখ বন্ধ করতে হবে যে! চিৎকার করে যন্ত্রণা প্রকাশের অবকাশও দেবে না! ওইটুকু করতে পারলেও বোধহয় একটু আরাম হয়। সেটুকুও ওদের নসিবে ছিল না!

সরবজিতের কচি নরম ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল নিষ্ঠুর মোটা সূঁচ, সঙ্গে ধাতুর তার সে নির্জীব হয়ে পড়ে কাতরাচ্ছিল। কিন্তু এবার ওর গলা দিয়ে যে আওয়াজটা আকাশ, বাতাস কাঁপিয়ে দিল, সেটা শুনলে মনে হয় ওর আত্মাটাও ওই ‘চিখ’ এর সঙ্গেই বেরিয়ে যাবে। ঠোঁটের নরম, কচি মাংস ফুটো হয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। একা সরবজিত নয়, আমনপ্রীত সহ অন্যান্য শিশুদেরও ঠোঁট আর থুতনি বেয়ে গলগল করে রক্তের ধারা ছুটছে। ওদের জীবনীশক্তি প্রায় খেয়ে ফেলেছিল আগুন। যেটুকু বাকি ছিল সেইটুকু জড়ো করেই ‘ভেড়’ বকরিদের মতো ‘হাহাকার’, আর্তচিৎকার করছিল ওরা। ততক্ষণ ওদের আর্তস্বর শোনা যাচ্ছিল, যতক্ষণ না পুরো ঠোঁটই এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সেলাই হয়ে গেল। আধপোড়া শিশুগুলোর কচি ঠোঁট ‘সুই’-এর আক্রমণে ফালাফালা হয়ে খুনে ভাসল। কিন্তু আর চিৎকার করার পথ রইল না।

“বড়িয়া হ্যায়।”

‘মর্’ এর নেতা মাথা নাড়িয়ে বলল, “অব্ ফির সে জলা দে মেরে ভাই!”

আবার সেই উগ্র কেরোসিনের গন্ধ। টায়ারগুলো আবার নতুন করে ভিজল। আমি দমবন্ধ করে দেখছিলাম। জানতাম, এখনই ফের আগুন লাগবে। তবে সরবজিত, আমনদীপ বা ওরা কেউ আর চেঁচাতে পারবে না। বোবা হয়ে মরাই নিয়তি। কিছু লোক ওদের দিকে এগিয়েও গেল। অথচ হঠাৎই অজানা কারণে থমকে গিয়েছে তারা। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “আরে, মাচিসের তিলি খতম হয়ে গেছে। মাচি দাও কেউ, মাচিস….!” এত মানুষকে জ্বালাতে-জ্বালাতে দেশলাইও শেষ হয়ে গিয়েছে। তবু এদের জ্বালানোর আশ মেটেনি। এখন ভাবি, দরকার কী ছিল! ওই শিশুরা আর কতক্ষণই বা বাঁচত? তার আগেই জীবন্ত চিতায় তুলে দেওয়া কি খুব জরুরি ছিল?

“মাচিস্ দে ভাই। মাচিস কীধর হ্যায়?… তিলি খতম হো গয়া রে। দেশলাই ফুরিয়ে গেছে…।”

দাঙ্গাইরা মহাব্যস্ত হয়ে পড়েছে একটা দেশলাই কাঠির জন্য। তাদের শশব্যস্ত শোরগোল কানে এল। দোকান পাটও তো বেশিরভাগই ভাঙা, নয় বন্ধ। কিনে যে নিয়ে আসবে তার রাস্তাও নেই। যখন এই কাজে নেমেছিল, তখন নিশ্চয়ই গুচ্ছ গুচ্ছ দেশলাই বাক্সের প্যাকেট কিনেছিল। অথচ এইমুহূর্তে সেটাও কম পড়ল। ওরা কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না, তার আগেই ভূপেন্দ্র দত্তা নিজের দামি লাইটারটাই এগিয়ে দিয়ে বলল, “নালায়কের দল। এক্সট্রা মাচিস রাখিসনি? এটা নে। চলবে?”

রীতিমতো চলল। এবার যেন দেশলাইয়ের চেয়েও দ্রুত প্রকাণ্ড আগুন জ্বলল। আমার ভাইয়েরা আমার চোখের সামনে পুড়ছে। অন্তিম আর্তনাদ করার অধিকারও নেই। মৃদু ‘কররানো’র জন্যও একটু ঠোঁট ফাঁকা করতে হয়। রর্ দি কসম, সেটুকুও ছিল না। তবু আমনপ্রীতের ঘাড়ে কী ভূত চেপেছিল কে জানে। কোথায় অন্যান্যদের মতো শান্তশিষ্ট হয়ে মরবে তা নয়, উলটে অদ্ভুত জেদে সে অন্তিম ‘ঘড়ি’তেও দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে পড়েছে কলোনির পাশ দিয়ে যাওয়া কাঁচা নালার মধ্যে। নোংরা কালো ঘোলা জলের মধ্যে গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। এখনও তার দেহে লড়াইয়ের ক্ষমতা বাকি আছে। এখনও জান বাকি আছে। এখনও প্রাণ বাঁচানোর কী আকুলি-বিকুলি চেষ্টা!

তার সেই মরণান্তিক আপ্রাণ লড়াই দেখে বুঝি এবার মৃত্যুরও দয়া হল। স্বয়ং যমও তাকে আরও দশ মিনিট অতিরিক্ত আয়ু দিয়ে দিলেন। নালার জলে গড়ানোর ফলে আগুন নিভে গেছে দেখে যমদূতরা আবার তাকে টেনে এনে ফের সযত্নে জ্বালিয়ে দিল। আমনপ্রীত এখনও নাছোড়বান্দা। সে ফের নালার দিকেই দৌড়চ্ছে দেখে তার পায়ের ওপর আক্রমণ চালাল কাতিলরা। মোটা মোটা রডের আঘাতে পায়ের নরম হাড় ভাঙছিল নিঃসন্দেহে। তবু আমন থামবে না। সে ফের ঝাঁপিয়ে পড়ল নালায়। এবারও আগুন নিভল। আর এবারও তাকে দাঙ্গাইরা ফের টেনে হিঁচড়ে এনেছে। আবার জ্বালাল। কিন্তু আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি!

একবার নয়, বারবার তিনবার। তিন তিনবার আমন জ্বলল, আর তিনবারই নালার নোংরা জলে লাফ মেরে নিজেকে বাঁচাল। অর্ধদগ্ধ শিশু কিছুতেই মৃত্যুর কাছে হার মানবে না। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কী প্রচণ্ড বাঁচার আকাঙ্খা থাকলে আমনের মতো ছোটো একজন মানুষ এভাবে লড়ে যেতে পারে। সরবজিত সহ বাকিরা ততক্ষণে প্রায় কয়লা! কেউ বেঁচে নেই। আর এই একটা বাচ্চা কিনা দাঙ্গাইদের এমন ঘোল খাওয়াচ্ছে!

“এ, মিলখা সিং!”

খুনিদের মধ্যে একজন আমনের ধৃষ্টতায় রীতিমতো গলদঘর্ম হয়ে কড়কে উঠল, “কিতনা বেশরম হ্যায় রে তু? মরতেই চাইছিস্ না শালা! আগুনে মরবি না তুই। তোর জন্য স্পেশাল জিনিস আছে। দাঁড়া!”

‘স্পেশাল জিনিস’ শুনেই অন্তরাত্মা একটা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল। দেখলাম, সে আশঙ্কা ভুল নয়। আমনকে জ্বালানোর জন্য এবার আগুন নয়, সাদা পাউডার এল। ওইটুকু ছোট্ট কলেবরে গোটা প্যাকেটটাই ঢেলে দিয়ে বাঁকা হাসল খুনি, “নে, এবার যত খুশি জলে গড়াগড়ি দে। তু ভি ক্যায়া ইয়াদ রকখেগা। যা খুশি কর। যাঃ, ভাগ। তোকে পালাতে দিলাম। জান বাঁচাতে পারলে বাঁচা।”

আমন জানত না যে এটা কী জিনিস! তার জানা ছিল না যে এটাও ‘আগ’ এবং এ আগুন আর শত চেষ্টাতেও থামবে না। সরল বিশ্বাসে ভেবেছিল, সত্যিই বুঝি ওরা তাকে এবারের মতো ছেড়ে দিল। সে প্রথমে হুড়মুড় করে ওই ভাঙা পায়ের ওপর ভর করেই দৌড়ে ওখান থেকে পালিয়েই যাচ্ছিল। কেউ তাকে বাধা দেয়নি। আমন ভেবেছিল, এ যাত্রায় রক্ষা পেল। কিন্তু যত জোরে ও ছুটতে লাগল সাদা পাউডার তত বেশি হাওয়ার সংস্পর্শে এসে ধ্বক ধ্বক করে জ্বলে উঠতে শুরু করল। গায়ে জ্বালা ধরতেই প্রা’জি ভাবল আগুন বুঝি। যথারীতি সঙ্গে সঙ্গেই নালার জলে লাফিয়েও পড়ে সে। কিন্তু এবার নালার ওই একচিলতে জল যথেষ্ট ছিল না তাকে রক্ষা করার জন্য। বরং উলটে জলও ধোঁয়া হতে শুরু করেছে। আমন অনেক চেষ্টা করল। অনেক ছটফট করে মরল। তার ‘জি-তোড় কোশিশে’ সফেদ পাউডারের ‘আগ’ একটু কমলেও যেই সে উঠে পালাতে যায়, অমনিই আবার দ্বিগুণ বেগে জ্বলে ওঠে! তার হাড্ডি-পালি কুরে কুরে খেতে শুরু করে। ওর কাঁদার, চিৎকার করার উপায়ও ছিল না। শুধু মরার আগেও দাপাচ্ছিল। দাঙ্গাইরা তার অবস্থা দেখে হেসে খুন হচ্ছে। এবার আর কিছুতেই কিছু হল না। নালার মধ্যে তার রক্ত, খসে পড়া চামড়া, হাড় আর হাড়ের ছাই-ই পরে থাকল শেষপর্যন্ত! সফেদ পাউডার নিজের কাজ করে দিয়েছে। ছোট্ট মানুষের দেহটাও খেয়ে ফেলেছে সে জিনিস। কী রাক্ষুসে জিনিসই না আমদানি করেছিল! “আ-ম-ন!”

বেবে অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছিল। এবার আমনের ‘দর্শনাক’ শেষমুহূর্তগুলো দেখে হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল, “আ-ম-ন! বে-টা!”

আমি কোনদিক ছেড়ে কোনদিকে তাকাব বুঝতে পারছিলাম না। ওদিকে একে একে আমার তাওজি, তাইজি, বাপু, দাদারা মরছে। এদিকে বেবের বন্দিদশা। অন্যদিকে দিদির জামা-কাপড় ছিঁড়ছে ওরা! আমি শুধু মূর্খ আর মন্দবুদ্ধির মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর ভাবছি আমার মৃত্যুটা ঠিক কোথা দিয়ে আসবে। এরমধ্যেই চোখে পড়ল একদল লোক আমাদের ঘরে লুটপাট চালিয়ে দিদির বিয়ের সোনার গয়নাগুলো নিয়ে বেরিয়ে আসছে। লুটপাট চলছিল নভজ্যোত, পবনজ্যোতদের বাড়িতেও। শাদি উপলক্ষ্যে দুই ঘরেই যথেষ্ট গয়না মজুত ছিল। ওরা সেগুলো বের করেছে। অনেকগুলো চকচকে লোভী চোখ সেগুলোকে দেখতে দেখতে বলল, “দেখো গুরু, সব সোনার! কী ভারি! ইয়াহাঁ তো লটারি লগ গয়ি ইয়ার!”

বাপুর অনেক কষ্টের খুন-পাসিনা এক করা ধন তাঁরই খুনির হাতে! ওরা আগেই কৌরদের গায়ে কাপড়ের সঙ্গে যে অলঙ্কার ছিল সেগুলো ছিনিয়ে নিয়েছে। গরীবের ঘরে কতটুকুই বা সোনাদানা থাকে! অথচ যস্যিদিদির শাদি উপলক্ষ্যে লুটেরাদের জ্যাকপট লেগে গেল। ওরা দিদির হার, বালি, কঙ্গন সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল। হঠাৎই যস্যিদিদি মারপিট করতে করতেই চেঁচিয়ে উঠল, “ও আমার গয়না! খবর্দার! ছুবি না। কা-ট ডা-লু-সি….।”

দাঙ্গাইদের সর্দারের এক চ্যালা ভারি মজা পেল। হেসে বলল, “কীসের গয়না ছোড়ি! তোর শাদি নাকি?”

“হাঃ!” এবার ওদের নেতা স্বয়ং অবাক হওয়ার ভান করেছে, “এই কচ্চি কলি উর্বশী শিখদের ঘরে কী করছে! তাও আবার কিনা মাত্র একজনকে শাদি করবে। একটা লোক এই পরমসুন্দরীকে ভোগ করবে? এ কেমন না-ইনসাফি! শাদি হয়নি, হয়নি, ছোড়ো। কিন্তু এর তো গণহারে সুহাগরাত হওয়া উচিত। কলি কে সবাই মিলে ফুল বানাও ভাই। এর সুগন্ধ নেওয়ার অধিকার পাবলিকের। অভি ভি কপড়া উতরা নেহি হ্যায় ইসকি? তোরা কী করছিস ভায়া?”

যারা দিদির সঙ্গে হাতাহাতি করছিল তারাই উত্তর দিল, “জংলি বিল্লি হ্যায়। বাগই মানছে না। হাথ-পৈর সব চালাচ্ছে।”

“জংলি বিল্লি তো ভালো।” সে কুৎসিত হাসল, “তিখি মির্চি। যত তেজ, তত ঝাঁঝ, তত সুখ।”

যস্যিদিদি তখন বোধহয় পুরো পাগল হয়ে গিয়েছে। থুঃ করে একদলা থুতু ছিটিয়ে বলল, “তোরা মর্দ? আমার সরতাজকে পেছন থেকে মেরেছিস তোরা। আমনে সামনে লড়ারও ক্ষমতা নেই, আর নিজেকে মর্দ বলিস? ধোঁকা দিয়ে, মিথ্যে বলে আমার সরতাজকে খুন করেছিস। উয়ো থা আসলি মর্দ। তোরা তো সব নামর্দের পিল্লা। আমাকেও মারবি? আয়…আ-য়!”

বলতে বলতেই উন্মাদিনী তার ওপর ঝুঁকে পড়া একটা গুণ্ডাকে লাথি মেরে সরাল পরক্ষণেই বিদ্যুৎবেগে উঠে বসেছে। ওর পরনের যেটুকু কামিজ তখনও অক্ষত থেকে সামান্য হলেও লজ্জা রক্ষা করছিল, ফড়ফড় করে একটানে নিজেই ছিঁড়ে ফেলল। সবার চোখের সামনে প্রকট হল ওর সাদা শঙ্খের মতো অপূর্ব স্তন, কোমরের ভাঁজ, সুগভীর নাভি, ফর্সা ধবধবে মখমলি নগ্ন ‘বদন’ আর তার অপূর্ব বাঁক-কারুকার্য। ভেড়িয়াদের চোখে ‘হওয়সের আগ’ নেচে উঠছে। যমিত কৌরের চোখেও আগুন। তবে অন্যরকমের। সে নিজের নগ্ন ছাতি পেটাতে পেটাতে বলল, “আমাকে মারবি? আমিও শিখী। সরতাজ লড়েছিল। আমিও লড়ব। ও মরেছে। আমিও মরব। নপুংসক কোথাকার! আ-য়! আঃ …আঃ…!

দিদি এমনভাবে ফুঁসছিল আর গর্জন করছিল যে আমিও স্তম্ভিত। তজনী তুলে এমনভাবে “আঃ!…আঃ!” বলে ডাকল, যেন কুত্তাকে ডাকছে! এই আমার যসমিত দিদি, যে জীবনেও কোনোদিন উঁচু স্বরে কথা বলেনি! এই তার চোখ, যে চোখ লজ্জায় সবসময় অবনত থাকত! শরম-হায়া ওর ‘লিবাস’ ছিল। আজ সেই আব্রুও নিজেই টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে একরাশ ঘৃণা উগরে দেয় সে, “আরে আমায় নাঙ্গা করবি তোদের ঔকাত কী সালোঁ। তোরা নিজেরাই নিজেদের ঘরের মেয়েদের আক্র-ইজ্জতে হাত দিস। কাপড় খুলতে জানিস, পরাতে শিখিসনি। সাচ্চা মর্দ আব্রু রক্ষা করে, ছিনিয়ে নেয় না৷ তোরা তো মজাতের নামে কলঙ্ক! আমার আব্রু, আমার ভালোবাসাকে তো মেরেইছিস। এবার আমায় মার! তোরা আমার জামা খুলবি? আমি নিজেই নাঙ্গা হচ্ছি। এই দেশ আমার বেঁচে থাকার, আমার ইজ্জত রক্ষা করার লায়কই নয়। এ দেশে বাঁচতেও চাই না। বলাৎকার করবি? কর। আর কী-ই বা করতে পারিস তোরা। আয়…. আয়… মার আমাকে! মা-র! বুঝদিল! জা-নো-য়া-র। কা-য়-র। না-ম-দ!”

বলতে বলতেই সে সালোয়ারের দড়িও টান মেরে খুলে ফেলে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে উঠে দাঁড়াল। উন্মাদিনী উলঙ্গিনী। তার সে রূপ দেখে দাঙ্গাইরাও বুঝি কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সেদিন ওর দুঃসাহস দেখে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি, ওদের আসল ‘ঔকাত’ সেদিন যমিত কৌর মুখের ওপরই বলেছিল। জানোয়ার, বুঝদিল, কায়র এবং নামর্দই বটে। ওদের ‘মর্দানগির’ গর্বিত ফানুসে পিন ফুটিয়ে দিয়েছিল। আয়না দেখিয়ে দেওয়ার জ্বালা ওরা সহ্য করতে পারেনি। খ্যাপা কুত্তার মতো লাফিয়ে পড়েছিল দিদির ওপরে। দিদিও ওদের সঙ্গে সমান বিক্রমে যুদ্ধ করে চলেছে। একজন যেই তার হাত চেপে ধরতে গেছে, সে ফুঁসে ওঠে তার চোখে খচ্ করে আঙুল ঢুকিয়ে দিল। লোকটা কেঁউ কেঁউ করে চোখে হাত চাপা দিয়ে লাফাতে শুরু করেছে, “সালি… আখে ফোঁড় দিয়া… আখেঁ ফোড় দিয়া… মেরি আখে….।”

“মর্দানগি দেখেগি? দেখ্‌ কমিনি!”

এবার পুরো ভিড়টাই হুড়মুড়িয়ে ওর ওপরে গিয়ে পড়ল। কয়েকজন দিদির আঁচড়-কামড় খেয়ে ‘দুম্ দবাকে’ পালিয়েও গেল। কিন্তু একটা মেয়ে কতক্ষণই বা একদল পিশাচের সঙ্গে লড়বে। যাতে ও মারামারি করতে না পারে সেজন্য ওরা এবার অন্য পদ্ধতি নিয়েছে। দিদির হাত, পা, বুক, পেট-সারা শরীরের হাড় একটা একটা করে মুচড়ে মুচড়ে, লোহার রডের বাড়ি মেরে মেরে ভাঙতে শুরু করল। আমি আর বেবে প্রত্যেকটা হাড় ভাঙার মট্ মট্ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। মড়াৎ মড়াৎ করে আওয়াজ আসছিল, আর কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। দিদির মুখে একটা শব্দও নেই। কিন্তু আমার ভেতর থেকে কে যেন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। বেবে পাগলের মতো কপালে করাঘাত করছে। আর কাতরাচ্ছে। যেন দিদির নয়, বেবেরই হাড় কেউ ভাঙছে। চিৎকার করে বলল, ‘রহম্ করো৷ ও আমার লাডো। শোকে, দুঃখে মাথার ঠিক নেই। কী বলতে কী বলেছে। মাফ করে দাও।”

ষন্ডা লোকটা এবার থমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল, “এটা তোর মেয়ে?”

“হাঁ জি!”

“অচ্ছি বাত হ্যায়।” সে ফের সেই কুৎসিত হাসিটা হাসল, “মা-মেয়ে দু-জনেই তো রসগুল্লা দেখছি। একজন সতরা কি খতরা, অন্যজন চালিসের চিজ। ভালো ভালো। তোর তো খুশি হওয়া উচিত। তোর মেয়ের সারা দেশ দিওয়ানা! সেও তো মর্দানগি দেখতে চাইছে। দেখাচ্ছি। তোকেও দেখাব। দাঁড়া।”

ততক্ষণে ভিড় দিদির সারা শরীরের ওপর প্রায় বুলডোজার চালিয়েছে। ওর মুখ, নাক, হাত, পা, কোনো জায়গা অক্ষত নেই। ভেঙে ভুঙে হাড্ডি-পালি এক করে দিয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও নেই। হাড় ভেঙে গেলে কতগুলো থলথলে মাংসপিণ্ডই থাকে। হাড়ের ‘চাঁচা’ ছাড়া তার পক্ষে নিজে খাড়া হওয়াই সম্ভব নয়। আর ওরা তো দিদির আঙুলও ভেঙে দিয়েছিল। ভালো করে দেহের প্রত্যেকটা হাড় ভেঙে সেই মাংসের দলাকে উল্লসিত হয়ে ঘাড়ে তুলে নিল ওরা। কতগুলো দরিন্দার পিঠে ঝুলতে ঝুলতে চলল বাপুর আদরের নাঙ্গা রাজকুমারী। আমি দেখলাম, দিদির চোখ বেয়ে জল পড়ছে, মুখ বেয়ে রক্ত! দাঁতগুলোও সব ভেঙেছে একটা একটা করে। নাক, ঠোঁট থেঁতলে গিয়েছে। কথা বলার শক্তিও নেই। হাতের মেহেন্দির ওপর নিজেরই টকটকে তাজা রক্ত লেগে আছে। তবু সে হাসছে! ওর তো মৃত্যুই আকাঙ্ক্ষিত ছিল। সেই মুহূর্তেই বুঝে গেলাম, দিদি আর বাঁচবে না! ওর আর বাঁচার ইচ্ছেও নেই।

“এটাকে নিয়ে যা। তোদের আরও যত দোস্ত ইধার উধার আছে, সবাইকে নেওতা দে। এখানে না, দিল্লির রাজপথে খুল্লমখুল্লা সবার সামনে ‘সামূহিক সুহাগরাত” হবে।” সে আঙুল তুলে নির্দেশ দেয়, “লেকিন কোই রহম্ নেহি! ইসকি চিখে সারি দিল্লি সে সুনাই দেনা চাহিয়ে। আর এখন এটাকে ফেলে রেখে দেখে মজা নিতে পারিস। কিন্তু এটার ‘অকড়’ আর ‘নথ’ আমি ছাড়া আর কেউ ভাঙবে না। আমিই প্রথমে সালির চর্বি-গর্মি সব উৎরে দেব। তারপর যত লোকের আগুনে হাত সেঁকার আছে সবাই সুযোগ পাবে। কিন্তু তার আগে কিচ্ছু নয়। এদিকটা সাল্টেই আসছি। বুঝেছিস?”

ভিড়ের একটা অংশ মাথা নেড়ে হুকুম তামিল করল। দিদিকে নিয়ে চলে গেল ওরা। তখন বোঝার মতো অবস্থা ছিল না। ভাবছিলাম, এরা এই দেশের জনতা। এরা কি আদৌ প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ মানুষ? এখন বুঝেছি, না ওরা মানুষ ছিল না। জাত ক্রিমিনাল ছিল। কতগুলো খুনি আর ধর্ষক যাদের রাজনীতি, নেত্রী তো দূর মানবিকতার সঙ্গেও ‘দূর দূর তক্’ কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমাদের কপালদোষে এরাই বেশি সংখ্যায় এই ব্লকে এসেছিল। ওরা মানুষ ছিল না, দরিন্দা ছিল। যাদের দরিন্দগির কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না!

মানুষের জাত হতে পারে, রং হতে পারে, দল, পার্টি, আদর্শও হতে পারে। কিন্তু দরিন্দাদের কি আদৌ এসব কিছু থাকে? উয়োহ আখরি ঘন্টে…!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *