(৩৪)
শতচেষ্টাতেও কিছুতেই শহরে আর্মি নামানো গেল না!
একটা বদ্ধ পাগল লোকের জন্য গোটা শহরকে স্তব্ধ করে দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রবল আপত্তি। তাতে জনতার হেনস্থা হবে। মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হবে। বিরোধীরা এমনিতেই ইস্যু তৈরি করার জন্য বসে আছে। তারাও চেঁচাতে শুরু করতে পারে। তাছাড়া বার্নিং শিখ-এর আগে আরও তিনটে শহরে ভিজিট মেরে এসেছে। কোথাও তো তার জন্য আর্মি নামানো হয়নি বা কার্ফিউ জারিও করা হয়নি। তবে খামোখা কলকাতায় কার্ফিউ জারি করার মানে কী! এই সাইকোকে কোন আনন্দে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দিতে হবে? এ কী উদ্ভট আবদার! এরপর তো সে রেডকার্পেট আর একুশ তোপের সেলামির বায়নাও করে বসতে পারে।
বার্নিং শিখ কতবড়ো বদ্ধ পাগল জানা নেই। তবে মাঝেমধ্যে এই রাজনীতিবিদদেরই মানসিক ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়। যে জনগণের ভোটের কথা ভেবে তাঁরা চিন্তিত, তারা বাঁচবে তবে তো ভোট দেবে। যেখানে পুরো শহরটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, জনমানস বল্গাহীন আক্রোশে ফুঁসছে, সেখানে লাগাম লাগানো জরুরি। প্রয়োজনে জবরদস্তি রাশও টানতেই হয়। কিন্তু সে কথা ওঁদের কে বোঝাবে! ওঁরা সর্বক্ষণই মাথা নেড়ে বলে গেলেন, “নাঃ। এটা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আপনারাই বরং নিজেদের কাজটা ঠিকভাবে করুন। অপরাধীকে ধরুন। তারপর চিফ মিনিস্টার ভাষণ দিয়ে জনগণকে শান্ত থাকার অনুরোধ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অবস্থা দেখে ও শুনে অধিরাজ ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে বলেছিল, “এভাবে হবে না স্যার। আপনিই বরং অর্ডার দিন। আর্মির দরকার নেই। পুলিশই যেখানে মবলিঞ্চিং-এর আশঙ্কা দেখবে সেখানেই একদম পিটিয়ে সবাইকে পেটাই পরোটা বানাক। ডান্ডা না মারলে এরা ঠান্ডা হবে না। কোনোদিকে তাকানোর দরকার নেই। ঠেঙিয়েই বাজিমাত করব। দশ-বারোটাকে পটাপট গ্রেফতার করলে বাকিরা এমনিতেই পিছু হটবে। আমাদের হাত খুলে দিন স্যার। আমরা পাবলিক সার্ভেন্ট। তাদের সুরক্ষা আগে। নেতা-নেত্রী বা সরকারের হাতের পুতুল হয়ে এখন নাচার সময় নেই। আপনি জাস্ট ইশারা করুন। তারপর দেখছি এই পেঁয়াজি কতক্ষণ চলে।”
এডিজি সেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, “গভর্নমেন্ট কিন্তু আমাকেই চেপে ধরবে। কী জবাব দেব? তুমি এর দায় নিতে রাজি আছ?”
“আপনি নিশ্চিন্তে গান্ধীজির তিন বাঁদর হয়ে যান। দরকার পড়লে আমার দিকেই আঙুল তুলবেন।” তার নিখুঁত, অপূর্ব মুখ রাগে কঠিন হয়ে ওঠে। চোয়ালের কাটা জায়গাটায় আঙুল ঘষে সে বলল, “শহরে একসঙ্গে এতগুলো গুন্ডা থাকতে পারে না স্যার। আর এখানকার গুন্ডার নাম বার্নিং শিখও নয়—আই জি, অধিরাজ ব্যানার্জি। বাকি গুন্ডাদের সরিয়ে নিই। তারপর যা উত্তর দেওয়ার আমিই দেব। আপনি শুধু কাল সকাল অবধি কিচ্ছু শুনবেন না, কিচ্ছু দেখবেন না, কিচ্ছু বলবেনও না। ব্যস্।”
“অ্যাজ ইউ উইশ।”
অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে সি.আই.ডি. আর পুলিশই লজ্জা, ঘেন্না, দ্বিধা—সব শিকেয় তুলে দুমদাম একগাদা লোককে গ্রেফতার করে, পিটিয়ে পাটিয়ে উন্মত্ত ভিড়কে তাড়ায়। প্রাথমিক কিছুক্ষণ একতরফা হিংসা চলার পর যখন পুলিশও সমালোচনা, নিন্দার কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই পালটা পেটাতে শুরু করল তখন ‘মব’ও একসময়ে ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দিতে বাধ্য হল। মিডিয়া পুলিশের গুন্ডাগিরিতে ‘ছি ছি’ করলেও আসল কাজের কাজটা ওই র্যাম্পার্ট ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ দেওয়াতেই হয়েছে। জলকামান, কাঁদানে গ্যাস আর ‘কিলিয়ে কাঁঠাল’ বানানোর প্রক্রিয়ায় শেষপর্যন্ত হিংসা থামল। কতগুলো নিরীহ লোক মরল। তাদের যারা মারল, তারা কেউ মার খেয়ে ঘরমুখো হল, কেউ হাজতে গেল। সময় লাগল, অযথা শ্রম নষ্ট হল, ঘাম রক্ত ঝরল, অনেক কিছু ভেঙেচুরে গেল, কিছু সাধারণ মানুষ ক্রিমিনাল হয়ে গেল, তবু শেষমেষ জনগণকে বলপূর্বক হলেও থামানো গেল।
এখন রাত প্রায় তিনটে বাজে। রাস্তাঘাটও একদম শুনশান। সন্ধে নামার পর থেকে পরিবেশ যেরকম উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তাতে ভাবাই যায়নি যে কোনো একসময় এমন অদ্ভুত শীতলতা আর শান্তিও নেমে আসবে। আপাতত চতুর্দিকে আদর্শ শীতের রাত্রির নীরবতা, শূন্যতা ও শৈত্য বজায় রয়েছে। মাঝেমধ্যেই ঠান্ডা কনকনে হাওয়া গাছের পাতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে। পিচের রাস্তার ওপর এখনও অশান্তির চিহ্ন হিসাবে কোথাও কোথাও রক্তের ছিটে, রক্তমাখা লাঠি, ছেঁড়া চপ্পল, শূন্য ওয়ালেট, ইট-পাথরের টুকরো, জল, গ্যাসের ক্যানিস্টার—ইত্যাদি পড়ে রয়েছে। আশা করা যায় কাল ভোরে সাফাইকর্মীরা ঝাঁট-জল দিয়ে পুরোটাই সাফ করে দেবে। রাস্তার মনের মধ্যে বহু ক্ষত, বহু ইতিহাস জমা হয়ে থাকলেও তার দেহে কোনোরকম স্মৃতি বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। রাজপথ আজ পর্যন্ত অনেক লাশ দেখেছে। তাদের বুকে করে শুয়েও রয়েছে। কিন্তু কয়েকঘণ্টা পরেই শোকের বিহ্বলতা কাটিয়ে তাকে আবার সব কিছু মুছে ফেলে নগরসুন্দরী হয়ে উঠতে হয়েছে। কে বলতে পারে, ওই মসৃণ দেহের নীচে কোথাও চিড় বা ফাটল ধরেছে কিনা। হয়তো পাথরেরও বুক গোপনে ফাটে, মানুষের ফাটে না।
এতক্ষণের উত্তপ্ত শহর এই শীতল রাতে শাস্তির ঘুম ঘুমোচ্ছে। যথারীতি কুয়াশার মোটা চাদর ঢেকে দিচ্ছিল সমস্ত প্রেক্ষাপট। এখন রাতচরা পাখির ঝটপট আর বেওয়ারিশ কুকুরের কেঁউ কেঁউ ছাড়া কোনো অতিরিক্ত শব্দ নেই। কুকুরেরা মাঝেমধ্যেই শীতের কামড় সহ্য করতে না পেরে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। তারপর আবার কী মনে করে একেবারে কুণ্ডলী পাকিয়ে, গোল হয়ে শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ে। মাঝখান দিয়ে তাদের উচ্চকিত কান্নায় কিছু মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। অমঙ্গল আশঙ্কায় কারোর কারোর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কেউ বা আবার সুখের নিদ্রা ভঙ্গ হওয়ায় সারমেয়কুলের গুষ্টির তুষ্টি করতে করতে পাশ ফিরে শোয়। পৃথিবীতে যেখানে যত বড়ো অশান্তিই হোক না কেন, যত কষ্ট, যন্ত্রণা, বিক্ষোভ, আতঙ্ক থাক না কেন, দিনের শেষে সকলেই শান্তিতে একটু ঘুমের দেশে যেতে চায়। স্বপ্ন দেখতে চায়৷
একমাত্র গোটা শহরে বুঝি তারই চোখে ঘুম ছিল না। অনেকদিন ধরেই ঘুম নেই বিনিদ্র রাত্রির অভ্যাস এমন হয়ে গিয়েছে যে এখন আর ক্লান্তিও আসে না। বরং কখনও যদি ভুলবশতঃ ঘুমিয়েও পড়ে, তবে পাপবোধ হয়। মনে হয়, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! এখনও তার বিশ্রাম নেওয়ার সময় আসেনি। আজও সে চিরঘুমের ডাকের প্রতীক্ষায় বসে আছে। দিদি আজকাল বড়ো বেশি দেখা দিচ্ছে। ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে যে সময় হয়ে এসেছে। তবু আজও ইঙ্গিত চিরনিদ্রা তার অস্থিরতাকে শান্ত করতে পারেনি। বরং ক্রমাগত যেন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে মস্তিষ্ক। বুঝতে পারছে, যুদ্ধে বারবার পশ্চাদপসরণ করতে করতে নিজের ওপর ক্রমাগতই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সে। তার ভেতরের দানব ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, কোনো কিছুরই আর তোয়াক্কা করছে না। যেন তেন প্রকারেণ তার শুধু প্রতিশোধ চাই। তার জন্য গোটা পৃথিবীতেও আগুন জ্বালাতে সে কসুর করবে না।
লোকটা অভ্যস্ত হাতে পাগড়ি বাঁধতে বাঁধতেই আয়নার দিকে তাকায়। সামনের কাচে ওটা কার প্রতিবিম্ব! না, সে কোনোমতেই গুলশন সিং নয়। আট বছরের সেই ছোট্ট নিষ্পাপ ‘গুল্লু’ ও হতে পারে না। ও বার্নিং শিখ। যে এতদিন ধরে শুধু তিলে তিলে জ্বলে এসেছে। মানুষ নয়, একজন দরিন্দা। যে আজ প্রয়োজনে নিরীহ মানুষদের রক্তে নিজের হাত রক্তাক্ত করতেও দু-বার ভাববে না। এত বছরের জ্বালার প্রতিশোধ নিতে সে নীচতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করতে পারে। ছাইভস্ম মাখা এক প্রেত, যার মধ্যে আজ তিলমাত্রও মানবিকতা নেই।
আয়নার প্রতিবিম্বের মুখ কঠিন। আজ ভীষণ ব্যর্থ আর ক্লান্তও লাগছে। এত তোড়জোড়, এত চেষ্টা, অর্থনষ্ট, লোকবল, এত শয়তানি—সব বিফলে গেল। খুঁজে খুঁজে এগারোটা লোককে সে শেষমুহূর্তের ব্যাক-আপের জন্য তৈরিও রেখেছিল। কোমলদিদি মরার আগেই গুচ্ছ টাকা তাকে দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল-“গুরু, যদি সবকিছু মিটে যাওয়ার পর বেঁচে থাকিস, তবে টাকাগুলোকে কাজে লাগাস। নতুন কিছু করিস।”
কিন্তু সে শুরু থেকেই জানত, এ টাকা তার ভোগে কোনোদিনও লাগবে না। কাজ যদি শেষ হয়ে যায়, তবে ইহজগতে তারও আর কোনো কাজ নেই। বার্নিং শিখ যতদিন বেঁচে থাকবে, তার কাজ শেষ হবে না। সে মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে-যতক্ষণ না স্বয়ং মৃত্যু এসে তাকে শান্ত করছে। এক অদ্ভুত অটোম্যাটিক কিলিং মেশিন, যার বিশ্রাম নেই, বিরাম নেই। অগত্যা নিজের প্ল্যানের জন্যই সে টাকাগুলোর সদ্ব্যবহার করেছিল। কতগুলো হাঘরে, হাভাতে মানুষকে পুলিশের বন্দুকের সামনে এগিয়ে দিয়ে পেছন থেকে তামাশা দেখছিল।
প্রাথমিকভাবে তার পরিকল্পনা সফলও হয়েছে। গোটা শহরে আতঙ্ক, অবিশ্বাস, অরাজকতা নামিয়ে আনতে সম্পূর্ণ সফল। এমনকি ওই মাথামোটা অ্যাকশন কুমারকেও হসপিটালের মেইন গেট থেকে সরাতে পেরেছিল তার তৈরি করা নকল ‘মোহরা’। সকালে লেডি অফিসারের তাড়া খাওয়ার আগেই ওয়ার্ডবয়ের ছদ্মবেশে সে হসপিটালের ইলেক্ট্রিকরুমের তালার ছাপ নিয়ে নিয়েছিল। চাবি তৈরি করা এরপর জলভাত। প্ল্যান ‘এ’ ফ্লপ করলে সবসময়ই প্ল্যান ‘বি’ তৈরি করে রাখতে হয়, তা নিজের জীবন দিয়েই শিখেছে। তাই ইলেক্ট্রিক রুমে ঢুকে শর্টসার্কিটের বন্দোবস্ত করতেও কোনো অসুবিধা হয়নি। যখন এনকাউন্টার এক্সপার্ট নকল বার্নিং শিখকে তাড়া করছিল, সেই ফাঁকেই নিজের কাজ সেরে সে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে চলে গিয়েছিল। জানত, এবার আর কেউ পি সি চৌধুরীর পরিবারকে বাঁচাতে পারবে না। অধিরাজ ব্যানার্জি গোটা শহরের মারদাঙ্গা থামাবে, জবাবদিহি করবে না হসপিটালে দৌড়োবে?
অথচ আবার ব্যর্থ! সাত কাণ্ড রামায়ণ লেখার পরেও রাবণবধ হল না! সে ভেবেছিল ওই আগুনেই বুঝি শেষ হয়ে যাবে পি সি চৌধুরীর গোটা পরিবার। বাকি পেশেন্টরা গোল্লায় যাক। বার্নিং শিখ নিধনযজ্ঞে নেমেছে। তার আগুনে কিছু নিরীহ মানুষ পুড়লেও কিচ্ছু আসে যায় না। যে লোকটা বারবার চীনের প্রাচীর হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে সে তো এই অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে বেসামাল হয়ে শহরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তেমনই তো প্ল্যানিং ছিল।
কিন্তু কে জানত ঠিক সময়ে মানুষটা ওখানেও পৌঁছে যাবে। এ কী অদ্ভুত সুপারম্যান। কিছুতেই ওকে হারানো যাচ্ছে না। মারা তো দূর, মাত দেওয়াও এখন অসম্ভব ঠেকছে। সে বুঝেছিল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর্মি নামাবে না। যে সরকার কোভিডের প্যান্ডেমিকের মধ্যেও মিষ্টি আর মদের দোকান খোলা রাখে, তারা এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতেও কিছুতেই কার্ফিউ ডাকবে না। রাজীব গান্ধীও ১৯৮৪ সালে যথাসময়ে আর্মি নামাননি। এরাও নামাবে না। এটাই তো সুবর্ণ সুযোগ ছিল।
আফশোশে মাথা ঝাঁকায় বার্নিং শিখ। তার মাস্টারপ্ল্যানে কোনো খুঁত ছিল না! তবু ফের ফ্লপ। একটু আগেই লাইভ খবরে দেখেছে যে একজন পেশেন্টও মারা যায়নি ওই অগ্নিকাণ্ডে। এমনকী কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুও হয়নি। যারা তুলনামূলক সুস্থ হয়ে এসেছিল ও ডিসচার্জের অপেক্ষা করছিল, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের অন্য হসপিটালে নিরাপদে শিফট করা হয়েছে। সমস্ত নিউজ চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে একই খবর পঞ্চাশবার দেখল। সকলেই তোতাপাখির মতো একই কথা বলে চলেছে, আসল কথাটা ছাড়া। কেউ জানাচ্ছেই না যে কোন্ হসপিটালে শিফট হয়েছে পেশেন্টরা। পি সি চৌধুরীর পরিবারকেও সেখানেই রাখা হয়েছে না ডিসচার্জ করে দেওয়া হয়েছে কে জানে। বাহাত্তর ঘণ্টার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র আধঘণ্টা বাকি। এর মধ্যে গোটা কলকাতা ঘুরে ঘুরে একটা বা একাধিক নির্দিষ্ট হসপিটালকে খুঁজে বের করা আদৌ কি সম্ভব? আর যদি ওদের ডিসচার্জও করা হয়, তবু নিশ্চয়ই নিজেদের ওই পুড়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরবে না। এত বড়ো শহরে ওদের কোথায় খুঁজে বেড়াবে সে?
তার একদিকের চোখ জ্বলে ওঠে। নাঃ, স্বীকার করতেই হচ্ছে যে এই গেমটা সে হেরেছে। জেতার আর কোনো রাস্তাই নেই। বাহাত্তর ঘণ্টা পরে এমনিতেই তার ডেস্টিনেশন চেঞ্জ করার কথা। সেই মতোন ট্রেনের টিকিটও আগে থেকেই কেটে রেখেছে। তার অন্যথা কোনোদিন হয়নি, আজও হবে না। তাই পি সি চৌধুরীর হিসেবটা অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যেতে হবে তাকে। আবার অন্য শহর, অন্য টার্গেট ওরা না হয় আরও কিছুদিন বেঁচে থাকুক। তারপর দেখা যাবে।
ভাবতেই তার ঠোঁটে একটা তীক্ষ্ণ নিষ্ঠুর হাসি ভেসে ওঠে। সামনে এখন আই পি এস ভূপেন্দ্ৰ দত্তা! একটা শিকার হাতছাড়া হয়েছে, কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। এই মহাভারতের দুর্যোধনের পরিবার একটু আগেও হয়তো বেঁচে ছিল। তবে এখন নিশ্চয়ই আর নেই। অধিরাজ ব্যানার্জি সব পেরেছে, শুধু এই বাহাত্তর ঘণ্টায় মাছের চোখের নিশানায় লক্ষ্যভেদটা করতে পারেনি। ওস্তাদের মার শেষ রাতে, এই আপ্তবাক্যটা চিরদিনই খাটে। আজও খাটবে!
ওদের ঘরে যে লেডি অফিসার সতর্ক পাহারায় আছে তা আগেই জানা ছিল। কিছুক্ষণ আগেই মেয়েটি শুনতে পেয়েছিল, আশেপাশে কোথাও কে যেন একটানা শিস্ দিয়ে চলেছে—‘গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই…।’ এই অফিসারটি বড়োই জেদি আর অনড়। সহজে নড়তেই চায় না। নিজের জায়গা থেকে দু-ইঞ্চি সরাতেও প্রাণ যায়। সেইজন্যই বার্নিং শিখের উপস্থিতির ইশারা দেওয়া খুব প্রয়োজন ছিল। জানা ছিল, এই সুর তাকে উত্তেজিত করে তুলবে। অত্যন্ত সাহসী মেয়েটি এবার উত্তেজনার মুহূর্তে কোনো-না কোনো ভুল করবেই। ওর আত্মবিশ্বাস আর দুঃসাহসই ওকে দিয়ে ভুল করাবে।
ঠিক যেমন গুল্লু ভেবেছিল, তেমনই হল। অফিসারটি বাইরে বেরিয়ে বার্নিং শিখের খোঁজ করছিল। কিন্তু সুরের উৎস আর কিছুতেই খুঁজে পায় না। পাওয়ার কথাও নয়, কারণ শিসটা একদম বাইরে বাজছিল। একটি ছোট্ট অথচ শক্তিশালী রেকর্ডারে। তা তার জানার কথা নয়। ওদিকে আওয়াজ শুনেও চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। সে মরিয়া হয়ে একেবারে খুঁজতে খুঁজতে বিল্ডিঙের বাইরে চলে যাওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল গুল্লু। ভূপেন্দ্র দত্তাদের ফ্যামিলিকে একটু আগেই বাইরে যেতে দেখেছে। জুজুৎসুও সঙ্গে গিয়েছে। শুধু এই মেয়েটাই ঘরে ছিল। ওদের বিল্ডিঙে আজ এক দম্পতির বিরাট অ্যানিভার্সারি পার্টি। সেখানেই এই ফ্লোরের সবাই ডিনার করতে গিয়েছে। অদ্ভুত এই উঁচুতলার মানুষগুলো! বাইরে ধরপাকড় চলছে, খুনোখুনি হচ্ছে, আর এরা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে চিলড বিয়ার, শ্যাম্পেনের বোতল খুলছে! বিরিয়ানি, মাংস, মদ খাচ্ছে, মহানন্দে পার্টিও করছে। তারও নেমন্তন্ন ছিল। তবে অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে আগেই এড়িয়ে গিয়েছে। এখন ডিনার পার্টিতে আনন্দ করে বেড়ানোর সময় নয়। যারা আনন্দ করতে গিয়েছে, তাদের সর্বনাশেই তার আনন্দ
তাই সে একেবারে তৈরি হয়েই বসেছিল। লেডি অফিসার ভুল পদক্ষেপ নেওয়া মাত্রই ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে যা যা করার করে এসেছে। ওর উপস্থিতিতেও করা যেত। শুধু আজ এই সুযোগটা পেয়ে কোনোরকম ঝুঁকিই নিতে চায়নি। আর একজন লেডি অফিসারের সিগারেটে গাঁজা মেশানো তুলনামূলক সহজ ছিল। ইনি আবার কোনো ফাঁদেই পা দেন না। মিষ্টি হেসে এড়িয়ে যান। তাই ব্যাকপ্যাকের জিনিসপত্রেও ভালো করে ক্লোরোফর্ম মিশিয়ে এসেছে। ও মেয়ে কখনও না কখনও চা, বিস্কুট, কফি, কুকি, স্যান্ডউইচ, স্ন্যাকস কিংবা জল, কিছু তো খাবেই খাবে। তারপর ঘুমোবে। আর কোনোদিন সে ঘুম ভাঙবে না! একটা মেয়ে বেঘোরে মারা যাবে এই যা দুঃখ। কিন্তু এখন সে তার তোয়াক্কাও করে না। ,
সে আপনমনেই হিংস্র হাসল। অধিরাজ ব্যানার্জি নেকলেসিং-এর স্টাইলটা আটকে দিয়ে বড়োই খারাপ কাজ করেছে। ওটা তার প্রিয় স্টাইল ছিল। চোখের সামনে কত মানুষকে ওভাবে মরতে দেখেছে। জবাবে ওই টায়ারগুলো ফেরত দেবে না? কয়েকশো জ্বলন্ত টায়ারের হিসাব নিয়ে সে বসে আছে। অথচ সেই অস্ত্রটাও কেড়ে নিল। অত্যন্ত অন্যায়। তবে টায়ার না থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণ পেট্রোল আর আগুন তো আছে। আর আছে সেই মোক্ষম মারণাস্ত্র। আজ ঘুম থেকে উঠে ভূপেন্দ্র দত্তা দেখবে, তার প্রিয়জনের শবদেহগুলো সব পুড়ে ছাই! অন্তিম সংস্কার করার জন্য কিচ্ছু বাকি নেই…কিচ্ছু না! লাইটার এগিয়ে দেওয়া, অ্যাঁ? সরতাজকে খুন…! দ্যাখ, কেমন লাগে! নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর মর্মান্তিক, অভিশপ্ত মৃত্যু দেখেও বেঁচে থাকা কতখানি ভয়াবহ, এবার নিজেই উপলব্ধি কর। ভোগ শুয়োরের বাচ্চা। তুইও ভোগ।
সে একটা শ্বাস টেনে টানটান হয়ে উঠে দাঁড়াল। হাতের কাছেই পেট্রোলের জেরিকেন রয়েছে। দেশলাই বাক্সও। এখন সময় হয়েছে। ওই ফ্ল্যাটে তার হিসেবমত একমাত্র ভূপেন্দ্র দত্তা ছাড়া এতক্ষণে আর কারোর বাঁচার কথা নয়। সবাই নিশ্চয়ই শেষ। আর দেরি করা উচিত হবে না। কাজ শেষ করেই এই শহর ছাড়তে হবে তাকে। হাতে আর বিশেষ সময় নেই। তাছাড়া মৃতদেহে অগ্নিসংযোগ করলেই আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকেরাও টের পেয়ে যাবে। ফায়ার অ্যালার্মও বাজবে। টাইট সিকিউরিটি জোন। তাই খবরও চাপা থাকবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরে পড়াই ভালো।
বার্নিং শিখ চোরের মতো তার ফ্ল্যাট থেকে বেরোল। এক হাতে পেট্রোলের জেরিকেন, অন্য হাতে চাবির গোছা। আই.পি.এস ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটেরই ডুপ্লিকেট চাবি। এ ব্যাটা আবার একাধিক লক সিস্টেম লাগিয়ে রেখেছে সব দরজায়। অন্যান্যদের মতো ল্যাচ ফিট করেনি। তাই ওর ঘরগুলোর দরজা খুলতে একগাদা চাবি লাগে৷ সে আপনমনেই হেসে ফেলে। লোকটার মুখেই যত হম্বিতম্বি আর ধমক চমক। আসলে পয়লা নম্বরের ভীতু। দুনিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করে না! নিজের প্রাণের এতই ভয় যে যতরকম তালা আছে সব আমদানি করে রেখেছে। কিন্তু গুলশন সিংকে ও চেনে না। অনেক ধৈর্য ধরে, একটু একটু করে সে ঠিক নিজের পথ খুঁজে নেয়। সারা দুনিয়ার তালাও ওকে আটকাতে পারবে না। ওয়াহেগুরু তাকে মাফও করবেন না, তবে বাধাও দিতে পারবেন না। মানুষের জেদের সামনে ঈশ্বরও অসহায়।
অত্যন্ত সতর্ক ও নীরব পায়ে গুটিগুটি সে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। বিড়ালের মতো নিঃশব্দ তার চলার ভঙ্গি। ছায়াটাও বুঝি নিজেকে গোপন করে রেখেছে। এতটাই সাবধানী যে বাইরের ক্ষীণ আলোতে তাকে রক্তমাংসের মানুষের চেয়েও বেশি ছায়ামূর্তি বলেই মনে হয়। জেরিকেনটা সে খুব সাবধানে, একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর ধীরেসুস্থে ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটের মেইন ডোরের তালা খুলতে মন দিল। আশেপাশের সব প্রতিবেশী এখন গলা অবধি মদ্যপান করে, নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। এখন এদিকে কারোর আসারও সম্ভাবনা নেই। এতদিন তো দেখল। সবার দৌড় বোঝা আছে। রাত হলেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ঢুকুঢুকু করতে বসে যায়। তারপর ঘণ্টাখানেক মাতলামি করার পরে সব মড়ার মতো পড়ে পড়ে ঘুমোবে! কানের কাছে কামান দাগলেও সহজে চোখ খোলে না এদের। খোঁয়ারিও কাটে না।
খুট্ করে কয়েকটা চাপা ধাতব শব্দ। তারপরই নির্বিবাদে খুলে গেল ফ্ল্যাটের মেইন ডোর। সে ভেতরে ঢুকে পড়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। এগুলো সব অটোম্যাটিক লক। দরজা বন্ধ হওয়া মাত্রই নিজে থেকেই ফের লকড্ হয়ে যায়। এখন চাইলেও কেউ বাইরে থেকে এখানে এসে ঢুকতে পারবে না। মনে মনেই ফের একচোট হেসে নেয় বার্নিং শিখ। একটা মারাত্মক উত্তেজনা ও ভয়াবহ মজা টের পাচ্ছে সে। বেডরুমগুলোয় এখন প্রতীক্ষা করছে সার সার লাশ! শেষকৃত্যের জন্য অপেক্ষা করছে তারা। প্রত্যেকবারই বীভৎস, রক্তাক্ত মৃতদেহগুলো তাকে বড়ো সুখ দেয়। আজ তারও আনন্দের দিন। আই পি এস হওয়ার বড়ো গর্ব ছিল হারামখোর দত্তার! স্পর্ধায় ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিল লোকটা। আজ ওর নিজের রক্ত তার হিসাব দেবে! খুন কা বদলা খুন। তুমহারা খুন কা এক এক কত্রা…!
নৈঃশব্দ বজায় রেখেই আস্তে আস্তে আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল সে। তার প্রত্যাশামতই শুধু নীরবতাই ছেয়ে আছে। কারোর সামান্য শ্বাস টানা, বা নাসিকা গর্জনও শোনা যায় না। মৃত মানুষেরা এর কোনোটাই করে না। সামনেই বিলাসবহুল বিরাট হলঘর। রাতেও সিলিঙে হালকা আলো জ্বলছে। রোজই জ্বলে। এই আলোগুলো চোখকে আরাম দেয়। তার ওপর অদ্ভুত একটা আলো আঁধারি পরিবেশও তৈরি করে। কিছু জিনিস দেখা যায়, আবার কিছু দেখা যায় না। সব মিলিয়ে রাতের নিরবিচ্ছিন্ন শান্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নরম আলো ছায়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে। আর কয়েক মুহূর্ত তারপরই এই আলো-ছায়ার মধ্যেই আগুনের তীব্র আলো জ্বলে উঠবে…।
“খট… খট… খট…!”
অদ্ভুত একটা জোরালো শব্দে ঘাবড়ে গেল সে। এ কী! এখনও এ ঘরের বাসিন্দারা জীবিত। তা কী করে হয়? এ অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া এ তো জুতোর জোরদার শব্দ। ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাটে এত রাতে এরকম জুতোয় খটখট শব্দ তুলে কে ঘুরে বেড়ায়?
লেডি অফিসার নাকি? সে-ই বা ঘরের মধ্যে জুতো পরবে কেন? ভূপেন্দ্র আবার ঘরের ভেতরে জুতো পরার কট্টর বিরোধী। স্লিপার অবধি ঠিক আছে। কিন্তু এ তো কোনো স্লিপারের আওয়াজও নয়। এ বাড়ির প্রত্যেকটি নারী-পুরুষকে সে চেনে। এরকম শক্ত জুতো তারা কেউ ঘরের মধ্যে পরে না। সবাই ঘরে ঘাসের তৈরি নরম চটি পরে যার কোনো আওয়াজই হয় না। তার অভিজ্ঞ কান বলে দিল, এটা পুরুষদের ভারি জুতোর খটখটানিও নয়। নিঃসন্দেহে মেয়েদের জুতো। সোনালি বা শালিনী বাইরে আধুনিক হিলওয়ালা জুতো পরেন ঠিকই, তবে এটা তাদেরও পদধ্বনি নয়। ওদের চলন খুব কমনীয়, পদক্ষেপও নম্র। দু-জনেই রীতিমতো আলতো চরণে ক্যাটওয়াক করেন। এমন উদ্ধত খটখট্ আওয়াজও হয় না। আসলে এই ধ্বনি হিলের সাইজের ওপর নয়, বরং চলনের ওপর নির্ভর করে। মেয়েদের পায়ের সামান্য হিলতোলা জুতো পরে যদি কেউ ছেলেদের মতো গটগট করে হাঁটে তবেই এরকম শব্দ হয়…!
মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে অন্ধকার ঘরের এক কোণে লুকিয়ে ফেলল গুলশন সিং। সতর্ক চোখে তাকায় সামনের দিকে। কিন্তু তার মস্তিষ্কের ভেতরটা যেন জোরদার ঝটকা দিয়ে ওঠে। আচমকাই চোখের সামনে ভেসে উঠল একজোড়া শক্ত, কালো রঙের চকচকে খুব সামান্য হিলতোলা জুতো। অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ। ব্যক্তিত্বময়ী এবং তেজি বিচরণ। দুটো কোমল পায়ের পুরুষের মতো কঠিন ঔদ্ধত্যে সোজা গটগটিয়ে হেঁটে যাওয়া…! এই জুতোর খট্ খট্ শব্দ তার অত্যন্ত পরিচিত। বহুবার কানের কাছে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে এই পদধ্বনি…! এই আওয়াজ সে এজন্মে কোনোদিন ভুলবে না…! অজস্রবার শুনে শুনে তার মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছে …। চোখ খুঁজেও এ জুতোর মালকিনকে চিনে নেবে। কিন্তু…কিন্তু…এ অসম্ভব! অবিশ্বাস্য।… কিছুতেই হতে পারে না… নিশ্চয়ই তার ভ্রান্তি…। তার অসুস্থ মন ও মস্তিষ্কের বিভ্রম…! সে শ্বাসরোধ করে তাকিয়ে থাকে আগন্তুকের অপেক্ষায়। কে আসে?…কে?…
বার্নিং শিখ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল, সামনের অন্ধকার ঘর থেকে হলের দিকেই কে যেন হেঁটে আসছে! হালকা হালকা আলোতে তার অবয়বও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ক্রমশই কাছে আসছে জুতোর খট্ খট্ শব্দটাও। পরনের হালকা গেরুয়া রঙের শাড়িটা চিনতে ভুল হল না। খোঁপার ওপর আলতো করে ঘোমটা। হাতের লাল রঙের ঝোলানো ব্যাগটাও বহু পরিচিত। হাঁটার ধরনটা। যেন পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির ছোটোখাটো নারীদেহে গোটা বিশ্বের ‘শাহেনশাহ’ টানটান হয়ে হাঁটছে। নম্র আলো পড়ে মাথার রুপোলি তারগুলো যেন ঝলসে উঠছে। কে এই নারী। বড্ড চেনা যে! এই মুখ…!
এই ধারালো অপূর্ব তীক্ষ্ণ তরোয়ালের মুখ সে কী করে ভুলবে…। বাস্তবে, স্বপ্নে লক্ষবার দেখেছে…। সেই বড়ো বড়ো টানা টানা চোখদুটোয় আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও ঈষৎ উষ্মা মাখানো… দীঘল ও টিকলো নাক… সেই কাশ্মীরী আর্য সৌন্দর্য…! অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী নিখুঁত মুখের আদল… কিন্তু… নামুমকিন। কী করে হয়….! কী করে সম্ভব…। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে বিহ্বল অবস্থায় ঝুলছিল সে। তবু হেঁটে আসা মানুষটার চেহারা বুঝি তার বুক আর চোখ দুই-ই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল। না আগুন নয়। দু-চোখ চিকচিকিয়ে উঠছে ঠিকই। তবে অশ্রুতে। যে চোখটা প্রস্থেটিক মেক-আপের পেছনে ঢাকা ছিল, নিজের অজান্তেই সে টান মেরে ওই অংশটাও খুলে ফেলে। মেক-আপটা অক্ষতই রয়েছে। শুধু এখন দুটো চোখই দেখা যাচ্ছে তার। আর সে চোখ জ্বালা করে জলে ভেসে যাচ্ছে! আপ্রাণ নিজেকে সামলাতে চাইছে, পারছে না। মুখের প্রত্যেকটা পেশী উচ্ছ্বাসে থরথর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিন্তু কিছুতেই কাঁদতে চায় না ও। কখনও অসহ্য যন্ত্রণাতেও কেঁদে-কঁকিয়ে ওঠেনি। সে জানে চোখের জলে বুকের সমস্ত আগুন নিভে যায়। সমুদ্রের জলে জ্বলন্ত লাভাও শীতল হয়। তার তো বুকে এখন লাভা জমিয়ে রাখার কথা। অথচ আজ বুঝি সেই আট বছরের গুল্লুর নিদারুণ অভিমান-অভিযোগ-নালিশ, সমস্ত দুঃখ, সব জ্বালা মেঘ হয়ে নেমে এসেছে তার চোখে। বার্নিং শিখ নয়, এক নিষ্পাপ আটবছরের শিশু অভিমানী স্ফুরিতাধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শুধু আর্দ্র স্বরে অস্ফুটে বলল, “মা!”
সামনের দৃশ্যটা ঝাপসা দেখছিল গুলশন সিং। কিন্তু তার মধ্যেও ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখল ওই নারীমূর্তির সামনে আলো-আঁধারিতেই যেন মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হল দুই পাগড়িধারী সর্দার! তারা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদের হাতের উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র দুটো নজর এড়াল না। নজর এড়াল না নারীমূর্তির টানা টানা বড়ো বড়ো চোখের বিস্ময়। তিনি প্রথমে মৃদু হেসে হাতজোড় করে দু-জনকেই নমস্কার জানিয়েছিলেন। তার জবাবে বিদ্যুৎবেগে উঠে এল পয়েন্ট থ্রি এইট বা নাইন পয়েন্ট সেভেন এম এম-এর রিভলভার আর স্টার্লিং সাব-মেশিনগান। কানে ভেসে এল সেই উত্তেজিত অন্তিম ও চরম বিপজ্জনক শব্দগুলো। সেই কণ্ঠই বটে! আর কোনো সন্দেহ নেই। সংশয় নেই, ভুল নেই। সেই শেষ কথাগুলো গমগমিয়ে উঠল গোটা হলঘরে। নিজেরই নিরাপত্তারক্ষীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে সবিস্ময়ে বলে উঠলেন তিনি, “ইয়ে ক্যায়া কর রহে হো!”
“নেহি! নে-হি!…নে-হি! সা-লা! হ-রা-ম কে পি-ল্লোঁ। গ-দ্দা-র। রু-ক্।” সব কিছু ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মানুষটা। বাস্তব-অবাস্তব, লৌকিক-অলৌকিকের সমস্ত সীমারেখাকে ভেঙে দিয়ে তীর বেগে বর্তমানের আড়াল থেকে উনিশশো চুরাশির সেই অভিশপ্ত ও কলঙ্কিত মুহূর্তটার দিকে মরতে মরতে পড়তে পড়তে দৌড়োল গুলশন সিং। যা উনিশশো চুরাশিতে হয়নি তা আজ হবে। যা তখন করা উচিত ছিল, তা আজ করবে। আটবছরের গুল্লু প্রতিক্ষণ যে সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে জ্বলে গিয়েছে, আজ তাতে ওয়াহেগুরু মলম লাগানোর সুযোগ দিয়েছেন। আজ সে মরে যাবে, তবু সেই সুযোগ নিয়েই ছাড়বে।
“বে-ই-মা-ন! ন-ম-ক-হা-রা-ম!”
দুই সর্দার আর কিছু করার আগেই তাদের একজনের মাথা লক্ষ করে তেলের জেরিকেনটা সপাটে বসিয়ে দিয়েছে সে। মাথায় জোরে আঘাত লাগার দরুণ একটু বেসামাল হতেই তাদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে কেড়ে নিল বার্নিং শিখ।
চেঁচিয়ে বলল, “হারাম কি ঔলাদ! বদজাত্। খালিস্তান চাইয়ে ত্যায়? এ-লে। এলে।” বলতে বলতেই হাতের সাব-মেশিনগানের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি দুমদাম মারতে শুরু করেছে দুই পাগড়িধারীকে। পাগলের মতো মারছে, কাঁদছে, আর চিৎকার করে হিন্দি আর পাঞ্জাবিতে খিস্তি খেউড় করে বলছে, “ভোঁসড়ি কে….! শুধু তোদের জন্য পুরো শিখজাতির সর্বনাশ হয়েছে কঞ্জারোঁ! তোরা গোটা শিখজাতির কলঙ্ক। আমাদের গুরুরা এই ভারতবর্ষের জন্য লড়ে মরেছেন। সেই ভারতবর্ষকে তোরা টুকরো করতে চাস্। জালিয়ানওয়ালাবাগ ভারতবাসীদের রক্তে লাল হয়েছিল, খালিস্তানিদের রক্তে নয়। ভগৎ সিং, উধম সিং ভারতমাতার জন্য মরেছে, খালিস্তান সালা কোন্ ক্ষেতের মূলি? আর তোদের মতো কতগুলো বেজন্মার জন্য গোটা দিল্লি লাল হয়ে গেল। ভারত টুকরো টুকরো হয়ে গেল। মর। মরিস না কেন তোরা! একেবারে মরে যা পাঞ্জাবে তোরা আবার শহীদের সম্মান পেয়েছিস! অমন শহীদির মুখে লাথ মারি আমি। মর সা-লা! ম-র!”
বলতে বলতেই সাব-মেশিনগান ফায়ার করল সে। প্রচণ্ড কান ফাটানো ‘অন্ধাধুন’ ফায়ারিং-এর শব্দে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল। দুই সর্দারের দেহ ঝাঁঝরা করে দিতে দিতে পাগলের মতো চিৎকার করে বলল, “পাগল কুত্তাকে এভাবেই মারা উচিত। ম-র।”
একগাদা গুলি খেয়ে দুই শিখ বডিগার্ডই ওখানে উলটে পড়েছে। গুলশন সিং তাদের ওপরেই সমস্ত রাউন্ড শেষ করে দিয়ে মেশিনগানটাকে অবহেলায় ছুড়ে ফেলল। সামনের নারী বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টিতে গোটা ঘটনাটা দেখছিলেন। তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। তিনি ঘাবড়ে গিয়ে এবার আবার ওই একই বাক্য উচ্চারণ করলেন, “ইয়ে ক্যায়া কর রহে হো!”
বার্নিং শিখ এবার ওঁর দিকে জলভরা দৃষ্টিতে তাকায়। এটাই তো সে আজীবন চেয়েছিল। উনিশশো চুরাশি সালের একত্রিশে অক্টোবরের ওই ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার ‘জুনুন’ তার মাথায় সওয়ার ছিল। কতবার ভেবেছে, যদি কোনোভাবে আটকে দেওয়া যেত ওই হত্যাকাণ্ডকে। ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনা যায় না। অতীত কখনও বর্তমান হয় না। ক্ষণিকের জন্য বোধহয় সে সব কিছু ভুলে গেল। পৃথিবী আর সময়ের বাঁধাবন্ধন রইল না। মানুষটা ধীরে ধীরে নতজানু হয়ে বসে পড়েছে ভারতবর্ষের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, তথাকথিত ‘আয়রন লেডি’র পায়ের কাছে। ব্যাকুল স্বরে বলল, “কুছ নেহি… কুছ নেহি ইন্দিরা মা… ডর মত্। তু ঠিক হ্যায় না? তুঝে কুছ হুয়া তো নেহি? হাঁ?”
উত্তরে আর কোনো বাক্য এল না। কিন্তু সেই নারীর হাত আলতো করে স্পর্শ করল গুলশন সিং-এর মাথা। যেন সস্নেহ আশীর্বাদ এঁকে দিল বার্নিং শিখ নামক ভয়াবহ রাক্ষসের কপালে। বুলেট তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারেনি, আগুন তাকে জ্বালাতে পারেনি, আঘাত তাকে ব্যথা দিতে ব্যর্থ, কতগুলো নিষ্ঠুর বুট তার ডান হাত ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল, তবু তাকে কাঁদাতে পারেনি, কেউ তাকে শেষ করতে পারেনি। কিন্তু ওই নরম স্নেহস্পর্শ, সেই স্পর্শের পেছনের গভীর আস্থা, আদর আর বিশ্বাসের উষ্ণতা বুঝি আজ তার পাথর হয়ে যাওয়া সব অনুভূতিকে গলিয়ে বাঁধ ভেঙে দিল। ওই সম্রাজ্ঞীর পা দুটো আকুলভাবে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে হা হা করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সেই বিধ্বংসী দানব! না, দানব নয়, এক আটবছরের শিশু!
“মৈনু মাফ করা বেবে…আমায় মাফ করে দে ইন্দিরা মা!” সে কান্নাজড়ানো অভিমানী কণ্ঠে তাঁর পায়ে মাথা ঘষতে ঘষতে বলল, “আমরা কেউ খুনি ছিলাম না। আমরা কেউ গদ্দার ছিলাম না। বিশ্বাস কর। হামনে তুঝে নেহি মারা। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিলাম ওদের ‘ম্যায়নে ইন্দিরা গান্ধী কো নেহি মারা!” কেউ বিশ্বাস করেনি। তুই তো জানিস, বিশ্বাসও করিস, তাই না? তোর এ কেমন ভুল মা! সবাই বলেছিল, অপারেশন ব্লু স্টারের পর বেয়ন্তের মতো সমস্ত শিখ বডিগার্ডকে সরিয়ে দিতে। সরিয়েও দিয়েছিল। তুই জানতি যে এই গদ্দারগুলো তোকে মারার ষড়যন্ত্র করছে। তারপরও বলে দিলি, “যতক্ষণ বেয়ন্তের মতো ‘ওয়াফাদার’ শিখেরা আমায় রক্ষা করছে, ততক্ষণ আমার প্রাণের কোনো ভয় নেই!” ওই গদ্দারকে আবার ডেকে নিয়ে কোলে বসালি! এত বিশ্বাস তোর শিখদের ওপর যে বলেই দিলি, “আমি আমার সমস্ত শিখ রক্ষীদের বিশ্বাস করি। ওদের কাউকে সরাতে দেব না।” এত অন্ধ হয়ে গেলি যে সও’বার বলার পরেও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরলি না। শিখদের ইমানদারি’, ‘ওয়াফাদারির ওপর তোর বিশ্বাস ভুল ছিল না। কিন্তু যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করলি, উয়ো বন্দা হি গলত থা। তোর একটা গলতি, দুটো বেইমানের জন্য গোটা প্রজাতির প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, সব ধ্বংস হয়ে গেল। দুটো বজাতের জন্য সব শিখ মরল। আমরা সবাই শেষ হলাম। কত আগুন জ্বলল, কত মুণ্ডু কাটল ওরা। তোকে অনর করার জন্য আমরা পুড়লাম। অথচ মা, আমি তো তখন তোকে চিনতামই না! আমার গরীব বাপু অটো চালাত। সরবজিত চুড়িওয়ালা হতে চেয়েছিল, আর আমনপ্রীত অ্যাম্বুলেন্স চালাতে চাইত। আমি সিপাহী হতে চাইতাম। কলোনির গরীব লোকদের সঙ্গে দূর দূর তক্ বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিং-এর কোনো সম্পর্কই ছিল না! আমরা রাইফেল তো দূর, ক্যাপ বন্দুকও চোখে দেখিনি। পটকার শব্দে ভয় পেতাম। ভিন্দ্রানয়ালে কোন্ সালার ব্যাটা, খালিস্তান কী, কিচ্ছু জানতাম না। আমরা কী দোষ করেছিলাম মা! আমাদের মেয়েরা, যস্যিদিদির মতো অজস্র দিদি, ছোটো ছোটো বোন, বুয়া, মামী, মাসি, তাইজি, বেবেরা কী গুনাহ করেছিল? হরি সিং, সরবজিত, আমনপ্রীতের মতো ছোটো ছোটো বাচ্চারা, কিংবা যে শিশু তখনও জাত-পাত-ধর্ম তো দূর, পৃথিবীর আলোই দেখেনি, সেই গর্ভজাত ভ্রূণ কেন শাস্তি পেল? তুই তো ভারতবর্ষের রানি। সমস্ত ভারতীয় তোকে ‘দুর্গা’ মানত, যে অসুরের বিনাশ করে। যে দেবী সন্তানদের রক্ষা করে, আশ্রয় দেয়। তবে তোর নামে নারা দিয়ে কতগুলো অসুর কেন দিল্লির রাস্তায় নামল? এ কেমন অবিচার তোর? বল্ মা… কী অন্যায় করেছিল ওই আটবছরের মাসুম গুল্লু? তোকে অমর করার জন্য কেন তাকে সব কিছু হারাতে হল? বল্ না ইন্দিরা মা!…জবাব দে…! তবে কি আমরা তোর সন্তান নই? ভারতবাসী নই…?”
আট বছরের গুল্লু তার সমস্ত জীবনের অনুযোগ ক্রন্দনবিকৃত কণ্ঠস্বরে গলগলিয়ে উগরে দিচ্ছিল তার ‘ইন্দিরা’ মায়ের কাছে। তার পায়ে পড়ে হু হু করে কাঁদছিল। বেরিয়ে যাচ্ছে! এতদিনের পাহাড়প্রমাণ জমানো ব্যথা সব চোখের এ কূল ও কূল ছাপিয়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে। সে বিকৃত উচ্চারণে কাঁদতে কাঁদতেই বড়ো করুণ, বড়ো অবুঝ নালিশ জানিয়েই চলেছে, “তুই বলেছিলি যে যদি তোকে কেউ খুন করে, তবে হিংসা খুনির মনে থাকতে পারে, তোর মৃত্যুতে থাকবে না। জ্ঞানী জৈল সিংকে গোটা ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রপিতা তুই-ই করেছিলি। ভারতবর্ষের প্রথম শিখ রাষ্ট্রপতি জ্ঞানীজি। তুই-ই বলেছিলি, তোর খুনের ‘কতরা’ ভারতবর্ষের একতাকে মজবুত করবে, বেঁধে রাখবে। কই? তেমন কিছু তো হল না। ঐক্য তো ছাড়, দাঙ্গা হল। হিংসার চরম! সবাই মিলে ভারতবর্ষ থেকে শিখকে কেটে ফেলে দিতে চাইল। দমদমি টাকশালের কটা পাগলের সঙ্গে আমাদের সবাইকে এক করে দেওয়া কেন হল? সরতাজের মতো সিপাই, যে ভারতমায়ের জন্য জান দিতে চাইত, তার কপালে অমন বেইজ্জতির মওত কেন? ওরা কারা ছিল যারা তোর স্বজন হওয়ার দাবি করছিল? তোর কথা তো কেউ রাখল না মা-গো? তোর নিজের ছেলেও না। সে তো চুপ করেই রইল। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতিও অসহায়ভাবে দেখেছিলেন তাঁর সন্তানরা তাঁরই সন্তানদের খুন করছে। গোটা জাতিটাকে ভরসা করে তুই একটা নালায়ককে ভালোবাসলি। আর ওই একটা নালায়কের জন্য গোটা জাতই গদ্দার হল। আঠেরো হাজার। মা, আঠেরো হাজার নিষ্পাপ প্রাণ নিল তোর অন্ধ বিশ্বাস! আজ তোর জন্য আমার এই অবস্থা… তোর জন্যই আজ আমি দরিন্দা… তুই দায়ী… আমার গুনাহগার তুই ইন্দিরা মা। হ্যাঁ, তুই। জবাব দে… আমায় আজ তোকে জবাব দিতেই হবে… কেন এমন হল?…কেন?… সব জেনেশুনেও বেয়ন্ত সিংকে ‘ভরোসাত করতে তোকে কে বলেছিল? এক সর্দার বেইমান হলে সব সর্দার গদ্দার কোন নিয়মে হয়? …বল্…বল্ না।…”
বলতে বলতেই সে সজোরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পাগড়িসুদ্ধ কপাল ঠুকছে তার ইন্দিরা মায়ের পায়ে। তার সেই আকুলি-বিকুলি কান্না রোধ করা অসম্ভব। সেই বুকফাটা হাহাকার, অভিমানমাখা অনুযোগের সামনে বুঝি আয়রন লেডিও অসহায়। সেই নারী নিশ্চুপে এক রাক্ষসের মাথায় হাত বোলাচ্ছে। যেন তাকে সস্নেহে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু উন্মত্ত কান্না থামার নামই নেয় না। চতুর্দিকে শুধু নীরবতা। তার মধ্যে উজাগর স্রেফ এক শয়তানের দমফাটা যন্ত্রণাকাতর ক্রন্দন!
কতক্ষণ যে সে অমন করে ডুকরে ডুকরে, ফুলে ফুলে কেঁদেছিল তা নিজেও জানে না। সমস্ত বিষ, জ্বালা উগরে দেওয়ার পর অবশেষে একসময় শান্ত হল। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলেও নিল। এতক্ষণ বুঝি বাহ্যচেতনা লোপ পেয়েছিল। এবার সমস্ত বোধ ফিরে পেতেই গুলশন সিং বুঝল, পুরো ঘটনাটাই অসম্ভব! আবেগের বশে একটা ভ্রান্তিকে সত্য বলে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু গোটাটাই মরীচিকা। একটা ভ্রম মাত্র। তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সব মিথ্যে!
নিজের ভুল বোঝামাত্রই তার ফুঁসে ওঠার কথা। আবার দপ করে জ্বলে ওঠার কথা। অথচ আশ্চর্য! তার মধ্যে আর কোনো আগুনই নেই! কোনো জ্বালা আর বোধ করছে না। ভেতরটা কেমন যেন শান্ত, শীতল হয়ে গিয়েছে। এখন বহুদিন পর তার বড়ো ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। হয়তো এখন সত্যিই সময় হয়েছে। কারণ সে মর্মে মর্মে বুঝল, তার ভেতরের ‘বার্নিং শিখ’ নামের পিশাচের এইমাত্রই মৃত্যু হয়ে গেল। আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই…। আর কোনো অজুহাত নেই প্রাণটাকে রক্ষা করার… | “নেহি… ইয়ে হো নেহি সকতা।”
সে সজল চোখদুটো তুলে সেই নারীর দিকে তাকিয়ে খুব শাস্তভাবেই বলল, “ধোঁকা দিয়ে আপনে। …ইয়ে সারা নাটক থা…হ্যায় না?”
“অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট। কিন্তু তুই নিজে কোথাকার ধোয়া তুলসীপাতা?”
একটা গমগমে মোলায়েম স্বর ভেসে এল। তার সঙ্গে ভারি পুরুষালি বুট জুতোর শব্দ। সে অনাবিল বিস্ময়ে দেখল এক দীর্ঘ চেহারার পুরুষ লম্বা লম্বা পা ফেলে সিংহের মতো চলনে হেঁটে আসছে তার দিকে। সে আবার ভুল করে। ফের অস্ফুটে বলেই ফেলল, “সরতাজ!”
“নাটক কি তুই একাই করতে পারিস গুল্লু?”
এবার ছ-ফুট চার ইঞ্চির টানটান দীর্ঘ দেহটা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দেবশিশুর মতো মুখে মৃদু হাসি, “আজকাল অনুপ্রেরণার যুগ চলছে। আমরাও তোকে দেখে ইন্সপায়ার্ড হয়েছি। তাই প্রস্থেটিক মেক-আপ, আর একটু ছদ্মবেশ দিয়ে আমরাও অল্পস্বল্প নাটক করে নিলাম। তুই একাই উনিশশো চুরাশিকে ফিরিয়ে আনবি কেন? আমরাও এনেছি। কাম অন্ বয়েজ। গেট আপ!”
এতক্ষণ যে সর্দারজিরা গুলি খেয়ে উলটে পড়েছিল, তারা এবার দিব্যি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অধিরাজ কৌতুকমাখা দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়েছে, “রাবার বুলেট খেয়ে বিশেষ কষ্ট হয়নি তো?”
“কষ্ট?” বেয়ন্ত সিং-এর ভূমিকায় থাকা পবিত্র একটানে পাগড়ি আর চাপদাড়ি খুলতে খুলতে বলল, “রাবার বুলেট ছাড়ো, আসল বুলেটেও এত কষ্ট হত না যতটা এই নকল দাড়িতে হচ্ছে। কোথা থেকে এই হতচ্ছাড়া দাড়ি তুলে এনেছ? ক-টা উকুন আছে এর মধ্যে কে জানে! কুটকুট করে, চুলকিয়ে আধমরা করে ফেলেছে। কী কষ্টে যে এতক্ষণ সামলে ছিলাম তা আমিই জানি। আর জানে অর্ণব।”
অর্ণবও ততক্ষণে সতবন্ত সিং-এর ছদ্মবেশ খুলে ফেলেছে। কপালদোষে তার কপালেই পড়েছিল জেরিকেনটা। তবে পাগড়ির জন্য বেঁচে গিয়েছে। শিখেরা এতবড়ো ঢাউস পাগড়ি পরে ঘুরে বেড়ায় কী করে। সে তো পাগড়ির ভারেই গলদঘর্ম হয়েছে। গালদুটোও অনেকক্ষণ ধরেই বেজায় চুলকোচ্ছিল। গোঁফটাও সমানতালে নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে শত্রুতা করে চলেছে। আর একটু হলেই চূড়ান্ত মুহূর্তে হেঁচে ফেলত। ভাগ্য ভালো, যে শেষ রক্ষা হয়েছে। এতক্ষণে সব ঝুলমি-ঝালমি খুলতে পেরে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বেঁচে থাক তার ক্লিন শেভড মুখ
বার্নিং শিখ এবার অনাবিল বিস্ময়ে দেখল, সি আই ডি হোমিসাইডের গোটা টিমই কখন যেন নিঃশব্দে এসে তার চারপাশে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অধিরাজ, অর্ণব, পবিত্র তো ছিলই। এখন নিঃসাড়ে আত্রেয়ী দত্ত, কৌশানী বোস, টুইঙ্কল অরোরা এমনকি প্রণবেশ লাহিড়ীও তাকে ঘিরে ধরেছে। শুধু তারাই নয়, উপস্থিত স্বয়ং ভূপেন্দ্র দত্তা, তাঁর স্ত্রী শালিনী, মেয়ে সোনালি, জামাই বিরূপাক্ষ এবং জুজুৎসুও। আয়ান আর তানিশা এখানে না থাকলেও নিশ্চয়ই তারাও নিরাপদেই আছে। ওরা কেউ মরেনি। আশ্চর্য। এতক্ষণে তো সবার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা!
তার অনুচ্চারিত প্রশ্নটা ধরতে পেরে বলল অধিরাজ, “আয়ান আর তানিশাও বহাল তবিয়তে আছে। বাচ্চাদের এসব গোলাগুলি থেকে দূরে রাখাই ভালো। তাই ওরা আপাতত মিস্ বোসের ফ্ল্যাটে শুয়ে আরামসে ঘুমোচ্ছে। এই ফ্ল্যাটের ঘরগুলো সব পার্শিয়ালি সাউন্ডপ্রুফ। বাইরের শব্দ ভেতর থেকে শোনা যায় ঠিকই। তবে ভেতরের সাধারণ আওয়াজ বাইরে যায় না। তাই গোলাগুলির শব্দ বাইরে গেলেও প্রচণ্ড জোরে যায়নি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি। তোর এই প্ল্যানটাও মাঠে মারা গেল। মিস্ দত্ত যে মুহূর্তে বার্নিং শিখের সিগনেচার টিউন শুনতে পেয়েছিলেন, সেই মুহূর্তেই আমায় ফোন করেছিলেন। আমিই ওঁকে চুপচাপ ফ্ল্যাট থেকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলি। তুই আগে যা খেল দেখিয়েছিস তাতে বুঝতে বাকি ছিল না যে সাউন্ডটা ফের রেকর্ডেড। যেরকম খেপেছিলি, তাতে মিস্ দত্ত যদি না বেরোতেন, তাহলে হয়তো আরও ভয়ানক কিছু করে ওঁকে খুনই করতি। তাই চান্সই নিইনি। তুই যা চাস্, সেটাই করতে বললাম। মা মনসাকে বেশি ধুনোর ধোঁয়া না দেওয়াই ভালো। তাই উনি তোর তালেই তাল মেলালেন। শুধু দুটি কাজের কাজ করেছিলেন। ফিরে আসার পর ভূপেন্দ্র দত্তা ছাড়া বাকি সকলের বেডরুমের মসকুইটো লিকুইডেটরগুলো সরিয়ে ফেলে অন্য লিকুইডেটর লাগিয়ে দিয়েছিলেন। যেগুলোর কথা ভাবছিস, ওগুলো নেই। আমরা সরিয়ে দিয়েছি। আপাতত আমাদেরই হেফাজতে আছে। আর ভুলেও নিজের ব্যাকপ্যাকের কোনো ফুড বা লিকুইডে হাতও লাগাননি। তুই নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই আমরা চুপচাপ এখানে এসে বসে আছি। বাকিটা বুঝতেই পারছিস। পালাবার আর পথ নেই গুল্লু। হাতে নাতে ক্যাচ কট কট৷” আত্রেয়ী অধিরাজের দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসে। যদিও কৃতিত্বটা স্যার ওর ঘাড়েই চাপিয়েছেন, কিন্তু এগুলো সবই সে প্রায় কিছুই না বুঝে করেছে। মসকুইটো লিকুইডেটর চেঞ্জ করে দেওয়ার অর্ডারও স্যারেরই দেওয়া। চাপা স্বরে বলেছিলেন, “এমন সপ্রেমে যখন বাঁশিতে, আই মিন শিস বাজিয়ে ডাকছে, তখন বাইরে থেকে ঘুরেই আসুন মাদমোয়াজেল। বেশ কিছুটা টাইম স্পেন্ড করেই ফিরবেন। তবে ফিরে এসেই ভূপেন্দ্র-র বেডরুম ছাড়া বাকি সবক-টা মাস্টার বেডরুমের মসকুইটো লিকুইডগুলো স্রেফ সরিয়ে দেবেন। কিংবা সিলড কন্টেনারের সঙ্গে পালটে দেবেন। আর নিজের ব্যাগের খাবার-দাবার, জল ভুলেও স্পর্শ করবেন না। ক্লিয়ার?”
“ক্রিস্টাল স্যার।”
তখন সপ্রতিভভাবে উত্তর দিলেও সে বুঝতে পারেনি যে মসকুইটো লিকুইডের সঙ্গে প্রাণঘাতী ফজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের সম্পর্ক কী। ব্যাকপ্যাকের খাবারে বার্নিং শিখ কিছু মেশাতে পারে। কিন্তু লিকুইডের শিশি থেকে গ্যাস আসবে কী করে। ওইটুকু শিশিতে এতখানি গ্যাস আঁটাও তো সম্ভব নয়।
পবিত্র কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে বলল, “কীঃ। মসকুইটো লিকুইড! আমরা তো ফজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস খুঁজছিলাম। এর মধ্যে মশা মারার তেল আবার কোথা থেকে এল। ওটায় তো মশা মরে। মানুষ মারার ফান্ডাটা কী?”
“ওকেই জিজ্ঞাসা করো।” সে বার্নিং শিখের দিকে নির্দেশ করে, “তবে মনে হয় না পুরো ফান্ডাটা ও জানে। যাঁর মাথা থেকে এই জিনিয়াস প্ল্যানিং বেরিয়েছিল সেই কোমল কৌর তো স্বর্গে গিয়েছেন। তাই পুরো গল্পটা না হয় আমিই পরে বুঝিয়ে বলব।”
বার্নিং শিখের ভয়াবহ মুখে এতক্ষণে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল, “ঠিকই ধরেছেন স্যার। আপনি শেষপর্যন্ত ধরেই ফেললেন। ওটার রহস্যটা আমিও সবটা জানি না। কোমলদিদি শুধু দেখিয়ে দিয়েছিল কী করে কী করতে হবে। এর বেশি আমারও জানা নেই। কিন্তু যে নেই, তাকে টানবেন না। আমিও বলতে পারব না। আপনিই বরং পরে বুঝিয়ে বলবেন খন। এরপর তো অনেক সময় পাবেন।”
“হ্যাঁ।” সে মাথা নাড়ল, “সময় তো অনেক পাবো। তবে তার আগে সবার সঙ্গে তোর পরিচয়টা করিয়ে দিই। এদের সবাইকেই তুই চিনিস। অর্ণব, পবিত্র, মিস্ দত্ত, প্রণবেশদা, মিস্ বোস—সবারই খবর রাখিস তুই। উনি নিউ রিক্রুট? মিস্ অরোরা। আর যিনি এইমুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধীর নিখুঁত মেক-আপে তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিও অচেনা নন। উনি মিস্ আহেলি মুখার্জি। ফরেনসিক এক্সপার্ট। ডঃ চ্যাটার্জিকে তো তুই হুমকি দিয়ে প্যাভিলিয়নে পাঠাতে পেরেছিলি। কিন্তু মিস্ মুখার্জি নট আউট ছিলেন। ব্রেভো মিস মুখার্জি, গ্রেট পারফরম্যান্স। গ্রেট ওয়ার্ক।”
পবিত্র এই তথ্যটা পেয়ে চমকে উঠল। ঢোঁক গিলে বিড়বিড় করে বলে, “মিস্ মুখার্জি শেষে ইন্দিরা গান্ধী টু পয়েন্ট জিরো!” মিস্ বোস, মিস্ অরোরাও বিস্মিত।
মিস্ দত্ত প্রায় আঁৎকে উঠেছে। প্রণবেশ লাহিড়ী ভিরমি খেয়ে বললেন, “এটা আহেলি। মাই গড়। আমি সত্যিই ইন্দিরা গান্ধীর ডুপ্লিকেট ভেবেছিলাম।”
“ডুপ্লিকেটটা বানাতে প্রায় দশ ঘণ্টা লেগেছে প্রণবেশদা। বিশেষ করে ওঁর মুখের রিঙ্কলগুলো। যা-ই হোক্।” অধিরাজ হাসি হাসি মুখে বার্নিং শিখের দিকে ফিরেছে, “পরিচয় জেনে স্যাটিসফায়েড?”
ওই ভয়ংকর মুখ সত্ত্বেও এতক্ষণে ওকে মানুষ বলেই মনে হচ্ছিল। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, “আপনি আমায় ব্যথা দিয়েছেন স্যার। আমার ‘দুখতি রগে’ হাত রেখে দিয়েছেন। আমায় বোকা বানিয়েছেন। তবু রাগ করতে পারছি না! জানতাম না, মিথ্যেও মানুষকে এত শান্তি দেয়। ব্যথাও এত সুখ দিতে পারে। আপ জিত গয়ে স্যার, ম্যায় হার গয়া! বার্নিং শিখ আজ মর গয়া। সে শেষ হয়ে গেল। তবু দুঃখ পাচ্ছি না।”
অধিরাজের মুখের হাসিটা এবার মিলিয়ে গিয়েছে। সে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওঁকে তো তোমরা সবাই চেনো। এমনিতে বার্নিং শিখ বা ফ্যান্টম শিখ নামেই ন্যাশনালি বিখ্যাত। এই রূপটাও ফেমাস। তবে অন্য অনেক নাম আর রূপও রয়েছে। একগাদা হুলিয়া, একগাদা নাম। সব কি আর মনে থাকে? তবু উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটা বলি। যেমন ফাদার স্টেফানো মাইনো, ড্রাইভার কেহর সিং, বিরজুর বন্ধু নাথুরাম, রাজেন্দ্র কুমার, মহম্মদ ইউনুস, পরমেশ্বর নারায়ণ রেড্ডি, রামেশ্বর রাও, সমা বিবি, বৌদ্ধ লামা বুদ্ধদত্ত, বুড়ি রাঁধুনী কমলা, ওয়ার্ডবয় স্যাম ত্রিবেদী। লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, এখানে, প্রিয়দর্শিনী।”
“প্রিয়দর্শিনী।”
প্রায় প্রত্যেকেই মূর্তিবৎ স্থির। আর কত বিস্ময় বাকি রয়েছে। এটা ওদের সবার চিন্তার বাইরে ছিল। আত্রেয়ী হাঁ, “অ্যাঁ। শ্রীদর্শিনীর মা? মা-ই-গ-ড। আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি!”
“আসল মা নন্। শ্রীদর্শিনী নিঃসন্দেহে আসল। কিন্তু এখানে মা-টি নকল। শ্রীদর্শিনীর আসল মা কোথায়? বেঁচে আছেন? না তাঁকেও খুন করে ফেলেছিস?”
বার্নিং শিখ মাথা নাড়ল, “না। প্রায় মরা মানুষকে আর কী মারব? তিনি ক্যান্সারে ভুগছেন। লাস্ট স্টেজ। শ্রীদর্শিনী অভিনয় করে ঠিকই, কিন্তু ওর আমদানি তেমন সাঙ্ঘাতিক নয়। যা পায়, তার চেয়ে বেশি গচ্চা দেয় নানারকম শখে। আইয়াশ লড়কি। কোমল দিদির সঙ্গে কী করে যেন ওর আলাপ হয়েছিল। দিদিই ওকে টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করেছে। আর্বানার দামি ফ্ল্যাট, গাড়ি, সব কোমল দিদিরই দেওয়া। ভূপেন্দ্ৰ দত্তার পাশে রাখার জন্যই এত তোড়জোড়। তার ওপর ওর মায়ের চিকিৎসাও মুম্বাইয়ে হচ্ছে। মুম্বাইয়ের হসপিটালই ওঁর বাড়িঘর। সে খরচও কোমল দিদিই দিত। এখন আমার কাছ থেকে টাকা নেয়। শর্ত একটাই ছিল। আমার পরিচয় গোপন করে, ওর মা বানিয়ে সঙ্গে রাখতে হবে। আমি পুরুষ বলে প্রথমে মানা করছিল। তারপর টাকার অঙ্ক শুনে রাজি হয়ে গেল।”
“শ্রীদর্শিনী তোর আসল পরিচয় জানে?”
“প্রথমে জানত না। ওর টাকার দরকার ছিল, তাই ভাবনা চিন্তা না করে কোমলদিদির কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল।” গুলশন সিং অধোবদনে বলে, “কিন্তু পরে সন্দেহ করেছিল। তখন ভয় দেখিয়েছিলাম, ওর মায়ের চিকিৎসা আর হবে না। যে মোটা টাকাটা এখন পাচ্ছে সেটাও পাবে না। তাই বাধ্য হয়ে…।”
“বুঝলাম।” সে আবার একঝলক উপস্থিত সকলকে দেখে নেয়, “উনি বহুনামে পরিচিত ঠিকই। তবে ওঁর আসল নাম গুলশন সিং ধিলোঁ ওরফে গুল্লু। অন্তত যতদিন উনি মঙ্গলপুরীতে ছিলেন, ১৯৮৪ সালের আগেও ওই নামই ছিল।”
“এটা সবাই জানে।
পবিত্র নিস্পৃহ মুখে বলল, “যার জন্য আমরা প্রায় প্রত্যেকেই ওকে খবরি গুল্লু, মানে গুলাব সিং-এর সঙ্গেই গুলিয়ে ফেলছিলাম। অর্ণব তো রীতিমতো সন্দেহই করেছিল যে ইনফর্মার গুল্লুই আসল বিশ্বাসঘাতক।”
“অর্ণবের সন্দেহ অর্ধেক ভুল, অর্ধেক ঠিক।” অধিরাজের কণ্ঠস্বরে এবার তিক্ততা, “ইনি ইনফর্মার গুলাব সিং নন্। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক তো বটেই। আমি ভাবতেই পারি না, এই লোকটা অর্ণবের দিকে অ্যাসিড ছুড়েছে, আমাকে তো অজস্রবার খুন করতে গিয়েছিল, অর্ণবকে ঠান্ডা মাথায় গাড়িতে বন্ধ রেখে আর একটু হলেই উড়িয়ে দিচ্ছিল, ইসমাইল, রকি, সনৎকে অমন বীভৎসভাবে শেষ করেছে, পুলিশগুলোকে কেটে কুচিকুচি করেছে। অথচ সবাই ওকে চোখ বুজে বিশ্বাস করেছিল। এত বড়ো বেইমানি। আবার বেয়ন্ত সিংকে গদ্দার বলে! তুই নিজে কী?”
গুলশন সিং একেবারে চুপ। ভর্ৎসনা শুনে তার মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছে। সে কোনো জবাব দিল না। তার নীরবতায় অস্থির হয়ে এবার ব্যথিত স্বরে ভীষণ আফসোসে অধিরাজ বলে ওঠে, “এটা তুই কী করলি? কারোর কথা একবারও ভাবলি না? ছেলেটার একমাস পরে বিয়ে। এত সাধ করে, ঘটা করে বিয়ে দিচ্ছিস, ছেলের বউয়ের মুখও তো দেখতে পাবি না। পুপুল আর রতি বউদির কথা একবারও তোর মনে পড়ল না ঘন্টু? ওদের কী হবে? তুই তো ফাঁসিতে চড়বি। আর সারাজীবন সাজা ওরা ভোগ করবে। কী করলি তুই। কেন করলি? এত বছরের বিশ্বাসের এই মূল্য দিলি?”
ঘন্টু! এটা খবরি ঘন্টু? বার্নিং শিখ ওরফে গুলশন সিং আদতে সি.আই.ডি. হোমিসাইডেরই অতি বিশ্বস্ত সুপারস্টার খবরি ঘন্টেশ্বর দাস। সকলের মাথাতেই যেন প্রচণ্ড কানফাটানো শব্দে বাজ পড়ল। শুধু বাজ নয়, তার সঙ্গে যতরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে, বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি, তুষারঝড়, অগ্ন্যুৎপাত সবই যেন হুড়মুড়িয়ে চলে গেল ওদের ওপর দিয়ে। অর্ণবের পায়ের তলার মাটি কাঁপছে। এটাই বোধহয় শোনা বাকি ছিল! তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ঘন্টুর সেই চিরপরিচিত সদাহাস্যময় মুখ, প্রশান্ত চোখ আর রহস্য করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলার ভঙ্গি। কুড়ি বছর ধরে একটানা কত কেসে সে হাসিমুখে সাহায্য করে গিয়েছে তার হিসেব নেই। সেই চেনামুখই কিনা এই বিকট দৈত্যের মুখোশের পেছনে লুকিয়ে ছিল! স্যার এসব কী বলছেন? এটা কি বাস্তবেই ঘটছে, না ভয়াল দুঃস্বপ্ন! ঘন্টু তাকে ওইভাবে খুন করতে চেয়েছিল? সি.আই.ডি.-র কুড়ি বছরের বিশ্বস্ত সঙ্গীর কিনা শেষে এই রূপ। এসব কি সত্যি!
“কেন করলাম স্যার সে তো আপনি জানেনই। যেদিন থেকে জয়েন করেছিলেন, সেদিন থেকেই তো দেখছি। আপনার অজানা কি কিছু থাকে?” বার্নিং শিখ তার পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলল না। কোনো প্রতিবাদও করল না। যেন জানতই যে ওর আসল নাম অধিরাজের অজানা থাকবে না। বরং খুব আস্তে আস্তে জানায়, “অনেকদিন নিজেকে আটকে রেখেছিলাম। বহুবছর…! উনিশশো চুরাশি থেকে দু-হাজার আঠেরো অবধি সময় লেগে গেল। তবু মানুষের মতোই অপেক্ষা করছিলাম। চৌত্রিশ বছর ধরে কেস চলল। বিচার আসার আগে সাক্ষীরাই মরে গেল, অর্ধেকের বেশি বিধবা, ধর্ষিতা, ভুক্তভোগীরা বুড়ো হয়ে স্বগগে গেল। চোখের সামনে একে একে রাক্ষসগুলো সব ছাড়া পেয়ে ঘুরতে লাগল। মৌজ করে জীবন কাটিয়ে কেউ ফৌত হল, তো কেউ বেকসুর খালাস। দু-চারটে চুনোপুঁটির স্রেফ ফাঁসি হয়েছিল। আর পাঞ্জাবের শিখরা দিল্লির প্রতিশোধ নিতে কয়েকটাকে খুন করেছিল। কিন্তু ওগুলো তো বোড়ে। আর কাউকে ছুঁতেই পারেনি আপনার আইন। অপরাধ করল ভিন্দ্রানয়ালে, বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিং। অথচ ওদের পরিবারকে কেউ ছোঁয়নি। উলটে আদর করে পার্লামেন্টে বসিয়েছে! মরল কারা? কাটা পড়ল কারা? তবু কানুনের ওপর ভরসা ছাড়িনি। কিন্তু তারপর আর সহ্য হল না! আশায় ছিলাম, রাক্ষসদের সবচেয়ে বড়ো সর্দার, সজ্জনকুমারটা অন্তত ফাঁসিতে ঝুলবে। কিন্তু শেষে কিনা যাবজ্জীবন? একা নির্ভয়ার বলাৎকার ও খুনের জন্য চারটে লোকের ফাঁসির সাজা ছাড়া গোটা দেশ, কোর্ট অন্য কিছু ভাবলই না! দু-হাজার কুড়িতে তাদের ফাঁসিও হল। আর যে লোকটা আঠেরো হাজার মানুষের রক্তে স্নান করে বসে আছে, তার স্রেফ যাবজ্জীবন। জীবন বাকি থাকলে তবে তো সাজা ভুগবে। এই একচোখামি সহ্য হয়?” এবার তার কণ্ঠস্বরে আগুনের আঁচ। সে আঙুল দিয়ে ভূপেন্দ্র দত্তাকে দেখায়, “এই হারামজাদাটাকে তো দেখছেনই। আমার তাওজিকে কীভাবে পুড়িয়ে মেরেছিল জানেন? ঘাড় ভেঙে, জ্বলন্ত টায়ার পরিয়ে দৌড় করিয়েছিল। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লে বা শুয়ে পড়লেই বোতল বোতল তেল ঢেলেছে তাঁর গায়ে। দাদাদের পোড়ানোর জন্য লাইটার এগিয়ে দিয়েছিল শুয়োরের বাচ্চাটা! মেয়েদের বলাৎকার বসে বসে দেখেছে মাদারচোদ। আমরা আর্মির জওয়ান সরতাজ সিং-এর নেতৃত্বে দাঙ্গাইদের ঠেকিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিলাম। এই ‘বাঞ্চোত’টা ওখানে এসে মিটমাট করার ভাঁওতা দিয়ে, ভালোমানুষির অ্যাকটিং মেরে আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে চলে গেল। শুধু এখানে নয়, আরও বহু জায়গায় ওর মতো শয়তান পুলিশেরা এই একই রাস্তা নিয়েছিল। সরতাজকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে শ্যুট করে দিল। শ্লা, এখনও দেখুন কেমন ভাঁজ মেরে ঘুরছে। হয়েছে কিছু? ঘন্টা করেছে আপনার আইন!”
“অ্যা-ই খানকির ছেলে!” ভূপেন্দ্র গর্জে উঠলেন, “একদম মিথ্যে কথা বলবি না। আমি কাউকে মারিনি। সরতাজ সিং আবার কে?”
“চো-ও-প্ শ্লা!” এই প্রথম হুঙ্কার দিয়ে ওঠে চিরদিনের শান্তশিষ্ট ঘন্টু। এবার ঘন্টেশ্বর দাসের জায়গা নিল ক্রুদ্ধ গুলশন সিং, “এখনও তোর বুড়ো কলজেতে এত জোর আছে যে ঝুট পে ঝুট বলছিস্! ক্যাপ্টেন সরতাজ সিংকে চিনিস না? দেশের রিভলবার দিয়ে দেশেরই ‘ওয়াফাদার’ যোদ্ধার মাথা ফুঁড়ে দিয়েছিলি? ভুলে গেছিস? তা তো ভুলবিই। সরতাজ সাচ্চা সিপাহী ছিল, আর তুই একটা বজ্জাত! বজ্জাত লোকেরা সব ভুলতে পারে। নিজেদের দুষ্কর্মও।”
“কিন্তু সজ্জনকুমারের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হলেও তো তুই লোকগুলোকে মারতি।” অধিরাজ জানতে চায়, “খুনগুলো তুই পরদিন থেকে করলেও রেডি তো অনেক আগে থেকেই হয়ে গিয়েছিলি। মার্ডারের প্ল্যান আর ওয়েপন ও অনেক আগে থেকেই রেডি ছিল। প্রায় একবছর আগেই দিল্লিতে তুই তেল গরম করছিলি। সাজা হওয়ার আগেই তুই ওদের ঘরে ঢুকে বসেছিলি। ওরা এমনিও মরত, অমনি ও মরত। তবে সজ্জনকুমারের ভার্ডিক্ট আর আদালতের মিথ্যে দোহাই দিচ্ছিস কেন?”
সে নেতিবাচক মাথা নাড়ল, “মরত না। কেউ মরত না। আমি একবছর আগে থেকেই রেডি হয়েছিলাম কারণ আদালতের হাবভাব দেখে দিমাগ বলছিল, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে না। কিন্তু মন বলছিল, শেষমুহূর্তে সব পালটেও যেতে পারে। যদি মনের কথা ঠিক হত, শেষ মুহূর্তে ওর ফাঁসি হত, তবে ফাদার স্টেফানো মাইনো, কেহর সিং, নাথুরাম, সবাই যেমনভাবে এসেছিল, তেমনভাবেই হঠাৎই গায়েব হয়ে যেত। পরিবারগুলো কিছুদিন ওদের খোঁজাখুঁজি করে আবার নতুন লোক বহাল করত। বার্নিং শিখ দেখাই দিত না। একটা লোকও মরত না। আমার মরা পরিবারের কিরে।”
পবিত্র-র মতো বকিয়ে লোকও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এটা ঘন্টু! এবার কোনোমতে বলল, “কিন্তু তাই বলে আইন নিজের হাতে তুলে নিবি? খুন কা বদলা খুন, কান কে বদলে কান, আঁখ কে বদলে আঁখ! এমন করলে তো গোটা পৃথিবীই অন্ধ, বধির, মৃত হয়ে যাবে ঘন্টু।”
এতক্ষণে বার্নিং শিখের মুখে ঘন্টুর সেই বিখ্যাত রহস্যময় হাসিটা ঝলমল করে ওঠে। হ্যাঁ, এখন ওকে চেনা যাচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে ঘন্টুই বটে। সেই পেটেন্ট রহস্যমাখা কণ্ঠে বলল, “যে পৃথিবীতে আঠেরো হাজার মানুষের চিৎকার কেউ শুনতে পায় না, দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার শিখদের টুকরো টুকরো দেহ কেউ দেখে না, মৃতরা শিখ বলে অন্য ধর্মের লোকেরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে না, চৌত্রিশ বছর অপেক্ষা করার পরেও সুবিচার আসে না, বিচারের নামে হাস্যকর নৌটঙ্কি আর তামাশা হয়, সেই পৃথিবীতে কি আদৌ কেউ বেঁচে আছে আচায্যি স্যার? সেই পৃথিবীর চোখ, কানের দরকার কী?”
অদ্ভুত প্রশ্ন! কিন্তু মোক্ষম। এর জবাব দেওয়ার সাধ্য বোধহয় উপস্থিত কারোরই ছিল না। সকলেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কেউই কিছু বলতে পারছে না। একটা দীর্ঘসময় নিশ্চুপ থাকার পর অধিরাজই ফের স্তব্ধতা ভাঙল, “বেয়ন্ত সিং প্রায় দশ বছর ডিউটি করেছিল। তুই তো বেইমানিতে তাকেও মাত দিলি। কুড়ি বছরের রেকর্ড তোর! শুধু সি.আই.ডি. নয়, গোটা পুলিশ মহল তোকে চেনে, তোর দেওয়া খবরে চোখ বুজে বিশ্বাস করে। পি সি চৌধুরীর বাড়িতে যে পুলিশেরা পাহারা দিচ্ছিল, তাদের মধ্যেও নিশ্চয়ই কেউ কেউ তোকে চিনত। কী করে কেটেছিলি ওদের? চা খাইয়ে অজ্ঞান করে? ক্রাইম স্পটে চায়ের প্লাস্টিকের কাপ ছিল। তোর তো আবার চায়ের দোকান। চায়ের দোকানের আড়ালে একমাত্র তুই-ই পুলিশের টপ্ খবরির কাজ করিস। বাকিরা কেউ পানের দোকানি, কেউ সবজি বিক্রি করে, কেউ বাজারে ফলের ঠ্যালা লাগায়। চা-টা শুধু তোরই স্পেশ্যালিটি। গরম গরম খবর দেওয়ার বাহানায় ওদের সবাইকে ঘুমের ওষুধ মেশানো গরম চা খাইয়েছিলি, তাই না? তারপর ওদের কাটতে তোর হাত একবারও কাঁপল না! যেহেতু এত বছরের চেনা বিশ্বস্ত খবরি, তাই ওরা ভাবতেও পারেনি যে বন্ধুর রূপে যম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কী করে পারলি তুই?”
এবার অনুতাপে ফের ওর মাথা চিবুক ছুঁয়েছে। চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ল, “মানছি স্যার, আমি বেয়ন্তের চেয়েও বড়ো নেমকহারাম আর শয়তান। ঠিকই ধরেছেন আপনি। যারা ওখানে গার্ড দিচ্ছিল, তাদের মধ্যে তিনজন আমায় চিনত। ওদের ওপরওয়ালার সঙ্গেও কাজ করি আমি। ওরাই বাকিদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। আগে থেকেই সাবধান ছিল যে বাইরের কোনো খাবার বা জল খাবে না। কিন্তু যেহেতু আমার লম্বা রেকর্ডে কোনো দাগ নেই, সি.আই.ডি. হোমিসাইডের আই জি সাহেবেরও প্রিয় ইনফর্মার, তাই আমার হাত থেকে চা খেতে কোনো আপত্তি করেনি। আমাকে ওরা নিজেদের লোক বলেই ধরেছিল। আর আমিও সেই সুযোগটাই নিয়েছিলাম। প্রতিশোধের জ্বালায় অন্ধ হয়ে গেছিলাম স্যার…কিচ্ছু দেখিনি… কিছু ভাবিনি….কিচ্ছু না… শুধু নিজের ভয়টাকেই সবার মধ্যে কায়েম রাখতে চেয়েছিলাম …. ডিপার্টমেন্টের লোকেদের মধ্যেও…।”
“পুলিশের গার্ডদের ওই অবস্থা দেখেই আমার সন্দেহটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ওই মুহূর্তেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম যে বার্নিং শিখ ওদের অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। দিল্লি, কানপুর বা বেঙ্গালুরুকে যদি ছেড়েও দিই, কলকাতার পুলিশ অন্তত জানত যে বার্নিং শিখ সিকিউরিটি গার্ডদের কীভাবে কচুকাটা করে। তাই মরে গেলেও অপরিচিত ব্যক্তির হাত থেকে কিচ্ছু খাওয়া যাবে না।” অধিরাজ একটু থেমে বলল, “ক্রাইমসিনে চায়ের কাপ দেখেই বুঝেছিলাম কী হয়েছে। আর তোর দোকানে বসে তোর হাতের চা খায়নি, এমন কোনো পুলিশ অফিসার বা কনস্টেবল নেই। ওটা একমাত্র তোরই ব্যাকগ্রাউন্ড। তোর ওই চায়ের দোকানের কভারই তোকে ধরিয়ে দিয়েছিল ঘন্টু। বেয়ন্ত সিঙের বেইমানিতে তোদের মতো যেমন নিরীহ লোক মরেছিল, তেমন তোর কীর্তিতেও তো একগাদা ইনোসেন্ট লোক মারা পড়ল। কতজনকে ইচ্ছে করে এনকাউন্টার করালি। এমনকি তোর কাণ্ডকীর্তিতে গোটা শহরেই ফের মারপিট শুরু হয়ে গিয়েছিল। তোর জাতভাইরাও বিনা দোষে খুন হয়ে যেত যদি না আমরা ঠিকসময়ে গিয়ে পড়তাম। তোর আর বেয়ন্তের মধ্যে পার্থক্য কী রইল? এর জবাব কী দিবি?”
“এর জবাবও দিতে পারব না।” সে মাথা নাড়ল, “তবে আমার কাজে বড়োজোর কতজন নির্দোষ মরেছে? একশো, দুশো? আঠেরো হাজার সংখ্যাটার কাছে ওটা কিচ্ছু নয়৷ আমরা সকলেও তো নির্দোষ ছিলাম। সে কথা কেউ ভেবেছে? তবে আমি কেন ভাববো? হ্যাঁ, হয়েছি আমি একটা চরম শয়তান, রাক্ষস, পিশাচ। মেনে নিচ্ছি, আমি দরিন্দা। বেইমানও। তবু যা করেছি, বেশ করেছি। তার শাস্তিও ভোগ করতে আপত্তি নেই।”
“দিল্লির লাস্ট খুনটা করলি না কেন? দয়া হল?”
“দয়া!” সে আবার হাসল, “নাঃ। যেটাকে টার্গেট করেছিলাম, সেটা নিজে থেকেই শেষ মুহূর্তে যমের দোরে গেল। হারামজাদা এমনিতেই বয়েস আর অসুখ-বিসুখে আধমরা হয়ে গিয়েছিল। কিছু করার আগে নিজেই টপকে গেল। ভোগার জন্য যখন আসল লোকটাই বেঁচে নেই, তখন তার পরিবারকে মেরে কী করতাম? দরকার ছিল না।”
“ইসমাইল, রকি আর সনৎ-ওদেরই বা মারার দরকার কী ছিল? ইসমাইল আর রকি তো তোর মতোই ইনফর্মার। নিজের বন্ধু, সহকর্মীদেরও ছাড়িসনি তুই!”
একটু উত্তেজিত স্বরে বলে ঘন্টু, “আমি ওদের মারতে চাইনি। কিন্তু কী করতাম? আপনি ওদের পি সি চৌধুরী আর ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে যারা যারা আসে যায়, সবাইকে স্টক করতে বলেছিলেন। ওখানেই সত্যনাশ হয়েছিল। ওরা ভীষণ ধূর্ত খবরি আর মারাত্মক স্টকার। আর একটু হলেই ধরে ফেলছিল যে পি সি চৌধুরীর বাড়ির কমলা, আর আর্বানার প্রিয়দর্শিনী একই লোক! সন্দেহও করেছিল। আপনাদের বলার আগেই ওদের থামাতে হত। নয়তো আমি ধরা পড়তাম। তবে ওরা এটা জানত না যে দুটোই আমি। আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। তাই ওদের মারতে অসুবিধে হয়নি। সনৎকে মেরেছিলাম চ্যাটার্জি স্যারকে ভয় দেখাতে। কারণ ওঁর ক্ষমতাকেই আমি ভয় পাই। ভেবেছিলাম, ঠিক সব কারিকুরি ধরে ফেলবেন।”
“কারিকুরি তো এমনিই ধরা পড়ল। তোর বেইমানিও।”
“হ্যাঁ। মানছি বার্নিং শিখ অনেক ‘হাথকন্ডে’ করেছে।” ঘন্টু নিস্তেজভাবেই বলে, “কিন্তু স্যার, খবরি ঘন্টু কিন্তু শেষদিন পর্যন্ত নিজের ডিউটি ঠিক করে গেছে। আপ্তে শেঠের কাছে আপনাকে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম। কুড়ি লিটার কেরোসিনের কেসটাও বলেছি। কোমলদিদির বাড়িতে আপনারা গেলে কী হতে পারে তা জানা সত্ত্বেও ওর লিড আমিই দিয়েছিলাম। কোমলদিদি মরবে জেনেও বুকে পাথর রেখে আপনাদের ওর খবর দিয়ে গেছি। শত বেইমানির মধ্যেও এইটুকু ইমানদারি খবরি ঘন্টুর ছিল। সেখানে খাদ ছিল না।”
“হুঁ। অদ্ভুত ইমানদারি। ছাড়।” অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “গুলশন সিং থেকে খবরি ঘন্টেশ্বর দাস হলি কী করে?”
সে আবার করুণ হাসে। সেই পরিচিত স্বরেই বলল, “শেষবারের জন্য একটু মাখন মারুন। গলাটা শুকিয়ে গেছে। মাখনের সুখটানটা দিয়ে নিই। তারপর বলছি।”
বিনাবাক্যব্যয়ে অধিরাজ ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেট এগিয়ে দেয়। নিজের লাইটার দিয়ে সেটাতে অগ্নিসংযোগও করে দিল। খুব আয়েশ করে সিগারেটটা ধরিয়ে বুকে একরাশ ধোঁয়া ভরল ঘন্টু। আরামসূচক একটা শব্দ করে বলল, “আঃ। ব্র্যান্ডটা বড়ো ভালো আপনার স্যার! ধ্বকের কড়া মৌতাতটা হেবি। আর একটা হবে?” সে নির্বিবাদে আর একটা সিগারেট দিল, “কাজের কথায় আয়।”
অধিরাজের গলা কঠিন। ঘন্টু ফ্যাকাশে হেসে অন্য সিগারেটটা কানে গুঁজে বলে, “শ্রীদর্শিনীর ফ্ল্যাটে আমার একটা ডায়েরি আছে। একটু খুঁজলেই পাবেন। ওখানে আমার দিল্লির পরিবার আর তাদের গল্পও লেখা আছে। পড়লেই সব জানতে পারবেন। আমি বরং তারপরের কথা বলি।”
“বল্।”
“আমাকে যিনি বাঁচিয়েছিলেন তিনি বাঙালি ছিলেন। গৌরীদিদি ওরফে গৌরী বিশ্বাস। তিনিই আমার পাগড়ি খুলে, চুল কেটে, কড়া খুলে নিয়ে, শিখ হওয়ার সব চিহ্ন মুছে নিজের হিন্দু বোনপোর পরিচয়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওঁর বোন গায়ত্রী দাসও দিল্লিতেই থাকতেন। গৌরীদিদি ‘বিশ্বাস’ হলেও ওঁর বোন গায়ত্রী বিয়ে করে ‘দাস’ হয়েছিলেন। স্বামী থাকলেও সন্তান ছিল না। গৌরীদিদি সত্যিই আমাকে বোনপো বানিয়ে ফেললেন। গায়ত্রী দাস আর ওঁর স্বামী আমায় ‘গোদ’ নিয়েছিলেন। সেখানেই গুলশন সিং ধিলোঁর শেষ আর ঘন্টেশ্বর দাসের জীবন শুরু। গায়ত্ৰী মা বাবা ঘন্টেশ্বরের’ কাছে সন্তানের জন্য মানত করেছিলেন কিনা। তাই আমার নামও ঘন্টেশ্বরই হল। তারপরই আমরা দিল্লি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসি।” ঘন্টু আরাম করে গলগল করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল, “আমিও নতুন বাবা-মায়ের হাত ধরে কলকাতায় এলাম। বাংলা বলতে পারতাম না। তবে সেটা অস্বাভাবিক ছিল না। যেহেতু দিল্লি থেকে গোটা পরিবারটা এসেছিল, তাই পড়শিরা ভাবল, ছেলেমানুষটা বিদেশে বিভুঁইয়ে থেকে বাংলাই শেখেনি। মা-ও তাদের সঙ্গে তাল দিল। সবাই মিলে আমায় দিব্যি বাংলা শিখিয়ে দিল। বাঙালি হয়ে গেলাম আমি, কিন্তু পুরোনো স্মৃতি ভুলব করে? আমার নতুন বাবা-মা আমায় উচ্চমাধ্যমিক অবধি পড়িয়েছিলেন। তার বেশি সাধ থাকলেও আর সাধ্য ছিল না। তখন থেকেই ছোটোখাটো কাজ করতে চালু করলাম। যখন যে কাজ পেতাম করতাম। আমার পালক-পিতা চাবি বানাতেন। তাঁর সঙ্গে বহু বছর চাবিওয়ালার কাজও করেছি। তাই চাবি বানানোর বিদ্যে খুব ভালো জানি। কাজ করে কামানোর পাশাপাশি নিজের চেষ্টাতেই ইংরেজি পড়তে আর বুঝতে শিখেছিলাম। ১৯৮৪-তে অত ভালো বোঝার বা জানার বয়েস হয়নি। একটু বয়েস বাড়ার পর নিজের ইচ্ছের জোরে লাইব্রেরিতে গিয়ে একের পর এক অ্যান্টি শিখ রায়টের ওপর বই পড়তে শুরু করলাম। হিন্দি বা গুরুমুখী আগেই পড়তে পারতাম। ইংরেজিও চলনসই করে নিলাম। তখন সব কিছু বুঝলাম। আর যত বুঝলাম, ততই রক্ত গরম হতে শুরু করল। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হাত নিশপিশ করত। তবু দেশের আইনের ওপর ভরসা রেখেছিলাম। গুল্লুর স্বপ্ন ছিল উর্দি পরার। সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার যোগ্যতা তার বিশেষ ছিল না। কনস্টেবল হতে পারত, কিন্তু হাইট আর পরীক্ষায় আটকে গেল। তবে চালাক চতুর ঘন্টু একবার এক হাই র্যাঙ্কের পুলিশ অফিসারকে সাহায্য করেছিল। সেই অফিসারই তাকে একটু একটু করে ট্রেনিং দিয়ে নিজের খবরি বানিয়ে নিলেন। আমার দক্ষতা আর বুদ্ধি দেখে উনি এতটাই মোহিত হলেন যে নিজের ক্ষমতায় বেশ কিছুবছর আন্ডারগ্রাউন্ড ইনফর্মার আর এসপিওনেজও বানিয়ে দিয়েছিলেন। সে আমার একদম যৌবনকালের ঘটনা। তখন তো আপনারা স্কুলে যেতেন বোধহয়! ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় ঘুরতে হত। আর ভাষা শিখে ফেলা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। তামিল, কন্নড়, গুজরাটি, নেপালি এমনকি উপজাতিদের ভাষাও শিখে ফেলেছিলাম। তাই খাসি, গারো ভাষাও জানি।”
“হ্যাঁ। সে প্রমাণও আমরা পেয়েছি। তারপর?”
“গুলশন সিং পুলিশ হয়নি, কিন্তু ঘন্টু পুলিশের খবরি ঠিকই হল। বহুবছর প্রাণ হাতে নিয়ে আন্ডারগ্রাউণ্ডে কাজ করার পর কর্তারা খুশি হয়ে ঝুঁকির কাজ থেকে মুক্তি দিলেন। তখনও আইন-কানুন-আদালত -পুলিশের ওপর বিশ্বাস ছিল… কিন্তু…!”
“দু-হাজার আঠেরোতে আর রইল না।” অধিরাজ বলল, “গুলশন সিং থেকে ঘন্টেশ্বর দাস অবধি সব ঠিক ছিল। কিন্তু এরপর একেবারে বার্নিং শিখ। কী ছিলি! কী হলি!”
“বুঝবেন না স্যার।” ঘন্টু মাথা নাড়ে, “আমার জ্বালা আপনি কেন, কেউ বুঝবে না। নতুন পরিবার, নতুন জীবন সব হল, কিন্তু পুরোনো স্মৃতি যাবে কোথায়? তবু নিজের ঘর সংসার বসালাম। যখন রতিকে বিয়ে করলাম তখন বুঝতে পারলাম ভালোবাসার নারী কাকে বলে! পতি-পত্নীর সম্পর্ক কী। তাদের ইজ্জত নিয়ে যখন কতগুলো জানোয়ার চোখের সামনে খেলা করে, তবে কেমন লাগতে পারে! কত অসহায় পুরুষ যে নিজের বউকে চোখের সামনে বলাৎকার করতে দেখেছিল…!” তার চোখে বাষ্প, “তারপর যখন পুপুল এল, তখন বুঝলাম বাপ হওয়ার সুখ কী। পুপুল একটু পড়ে গেলে, ওর হাত পা ছড়ে গেলেই আমার বুকে বাজত। একবার ওকে মাস্টার থাপ্পড় মেরেছিল। মনে হয়েছিল আমারই বুঝি গাল জ্বালা করছে। আর আমার বাপু তার দুই ছেলের গায়ে আগুন লাগতে দেখেছিলেন। ওর চোখের সামনে দুই ছেলেকে পোড়ানো হচ্ছিল। তাঁর তখন কেমন লেগেছিল? ওঁর জ্বালা তখন বুঝেছি… আর সহ্য হল না। আর না…।”
“এখন রতিবৌদি আর পুপুলের কী হবে? যখন ওরা জানতে পারবে যে সবচেয়ে কাছের মানুষটাই আসলে একজন জঘন্য খুনি, তখন ওদের মনের অবস্থা কী হবে সেটা ভেবে দেখেছিস?”
সে সিগারেটটায় শেষ সুখটান দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল, “আপনার কী মনে হয়? ওরা জানে না?”
আবার বিস্ময়ের জোরদার ধাক্কা। অধিরাজ কিছু বলার আগেই অর্ণব বলে উঠল, “রতিবৌদি আর পুপুল সব জানে?”
“হ্যাঁ সরকার স্যার।” ঘন্টু মাথা নাড়ায়। বিধ্বস্ত কণ্ঠে বলল, “প্রথমে লুকিয়ে রেখেছিলাম। অন্য শহরে যখন ছিলাম তখন কিছু হয়নি। তারপর কলকাতায় যখন বার্নিং শিখ এল, তখন বার্নিং শিখের পোষাক আর প্রস্থেটিক মেক-আপগুলো ওরা হুট করেই একদিন দেখে ফেলেছিল। লুকিয়ে রেখেছিলাম, তবু ধরা পড়ে গেলাম। রতি তখনই আপনাদের ফোন করে সব জানিয়ে দিত। ওকে পুপুলের কসম দিয়ে কোনোমতে আটকেছি। কিন্তু ও বলল, আমার মতো শয়তান, জানোয়ার, খুনির সঙ্গে থাকতেও নাকি ঘেন্না করে। তাকিয়ে দেখলাম, পুপুলের চোখেও নফরত। ও বাবাকে নয়, একটা দরিন্দাকে দেখছিল। সেই থেকে বাঁচার একমাত্র কারণটাও চলে গেল স্যার। আমার আর কোনো ঘর রইল না! ওরা আমায় ত্যাগ করেছে। তারপর থেকেই কখনও কোমলদিদির বাড়ি, কখনও ওই পরিত্যক্ত খণ্ডহরই আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল। রোজ আমি এখানে থাকতাম না। যখন প্রয়োজন পড়ত বাইরে যেতেই হত। তখন ও দুটো জায়গাই আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই।” সে চোখ মুছল, “এইটুকু জানি, আমার লাশটা নিতেও ওরা আসবে না। ছেলের হাতের আগুন আমার কপালে নেই।”
ভূপেন্দ্র দত্তা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। এবার বললেন, “আর কতক্ষণ এ ভাষণ চলবে? বাকি ভাষণটা কোর্টে দিলে হয় না? ওর ফাঁসি তো কেউ আটকাতে পারবে না। ডেথ সেলে বসে নিজের জীবনী লেখার বা বলার অনেক সময় পাবে। তখন শুনে নেবেন। এখন হয় মালটাকে অ্যারেস্ট করুন, নয়তো ইমিডিয়েটলি ঠুকে দিন।”
“ফাঁসি?”
এবার কান থেকে দ্বিতীয় সিগারেটটা নামিয়ে এনে আগের শেষ হয়ে আসা সিগারেটের অবশিষ্টাংশের স্তিমিত আগুন দিয়ে দক্ষ ভঙ্গিতে সেটাকে ধরায় ঘন্টু। নতুন সিগারেটটায় জোরালো টান মেরে মনের সুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “ফাঁসিতে আমাকে চড়াতে পারবি না দত্তা। বার্নিং শিখ হেরে গেছে। সে থেমে গেছে। তার গল্প শেষ, মানছি। কিন্তু গুলশন সিং-এর গল্প যে এখনও শেষ হয়নি। যে আইন তাকে চৌত্রিশ বছরেও সুবিচার দিতে পারেনি, সেই আইন কিনা তাকে ফাঁসিতে চড়াবে? অসম্ভব।…. মরে গেলেও গুল্লু সেটা সহ্য করবে না! তোর আইনের সে ঔকাতই নেই।”
বলতে বলতেই সে একঝটকায় তুলে নিয়েছে পাশে রাখা তেলের জেরিকেনটা। অফিসাররা হাঁ হাঁ করে ওঠার আগেই কয়েক লিটার পেট্রোল নিজের গায়ে আর চতুর্দিকে ঢেলে দিয়ে বলল, “সব জ্বালার শেষ আমি নিজেই করে যাই। নিজের চেষ্টায় বেঁচেছি, নিজের চেষ্টাতেই মরব। অন্য কেউ মারবে কেন?”
সবাই হাঁ করে দেখল যে ঘন্টু নিজের গায়ে তেল তো ঢেলেছেই, তার সঙ্গে আশেপাশেও কিছুটা তেল ঢেলে একটা বাউন্ডারি তৈরি করে ফেলেছে। বেশ কিছুটা তেল সামনের কার্পেটেও পড়ল। পবিত্র ঘাবড়ে যায়, “আরে! কী করছিস্? দাঁড়া…!”
“বার্নিং শিখের আগুন শেষ। কিন্তু গুল্লুর প্রতিশোধ এখনও বাকি আছে।” কথাটা বলেই অসম্ভব শীতলভঙ্গিতে জ্বলন্ত সিগারেটটায় আরও একটা জোরদার টান দিয়ে, তার মুখের আগুনটাকে জোরদার করে এক টুসকিতে সেটাকে একদম নিখুঁত লক্ষ্যে পেট্রোলে ভেজা কার্পেটের ওপর ফেলল ঘন্টু। সে যদি সরাসরি তেলের ধারার মধ্যে জ্বলন্ত সিগারেট ফেলত তবে লিকুইড গ্যাসোলিনের সংস্পর্শে আগুন ধরার বদলে সিগারেটটাই নিভে যেত। কিন্তু তার বুদ্ধিই অন্য লেভেলের। সিগারেটটাকে ও কার্পেটের ওপর এমনভাবে ফেলল যে সিগারেটের জ্বলন্ত মুখের স্ফুলিঙ্গ থেকেই এক সেকেন্ডে চড়াৎ করে প্রথমে আগুন টেনে নিল সিন্থেটিক কার্পেটটা। পেট্রোল বাইরে ছড়িয়ে পড়লে স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই খুব দ্রুত গ্যাসোলিন ভেপার তৈরি করে। তাই সিগারেটের ছোট্ট আগুনও পেট্রোলের বাষ্পের সাহায্যেই মুহূর্তের মধ্যেই বড়ো হয়ে দাঁড়াল। সেটাকে নেভানোর আগেই জ্বালানি তেলের সংস্পর্শে এসেই হু হু করে জ্বলে উঠল দাবাগ্নি। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কারোর কিছু করারই ছিল না। দপ্ করে মুহূর্তের মধ্যে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল এক অগ্নিবলয়। এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে কেউ তার ধারে কাছে যেতেই পারবে না! বাঁচাবেই বা কেমন করে। আগুন এখন পেট্রোলের যথেষ্ট ইন্ধন পেয়ে সোজা ছুটে যাচ্ছে ঘন্টুর দিকে। একটা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে এত বড়ো অগ্নিকাণ্ড! তাও কয়েক সেকেন্ডও লাগেনি!
“ঘন্টু… না!”
অধিরাজের চোখের সামনেই ঘন্টুর পা দুটো জুতোসহ জ্বলে উঠেছে। আগুন পা বেয়ে নিমেষে চড়চড়িয়ে উর্ধ্বগামী। অথচ আশ্চর্য। তার মুখে যন্ত্রণার একটুও চিহ্ন নেই। আগুনও বুঝি তাকে আর জ্বালাতে পারে না। এ বিশ্বচরাচরের কোনো কিছুরই কি ক্ষমতা আছে গুলশন সিংকে কষ্ট দেওয়ার? সে আবার সেই রহস্যমাখা হাসি হাসল, “একটাই দুঃখ রইল স্যার। উনিশশো চুরাশিতে যদি আপনি থাকতেন, বা আপনার মতো কয়েকটা উর্দিওয়ালা থাকত, তবে এ ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন জন্মাতই না! পুপুলের বিয়ের দায়িত্ব এবার আপনার।”
বলতে বলতেই সে অসম্ভব নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে বিরূপাক্ষ-র দিকে তাকায়। অর্ণবের রক্তহিম হয়ে যায়। এখনও কী ভয়াবহ প্রতিশোধস্পৃহা সে চোখে। সারা গায়ে আগুন জ্বলছে। কিন্তু সব যন্ত্রণার উর্ধে উঠে গুল্লু বা ঘন্টু নিজের অটুট সংকল্পে স্থির। প্রতিশোধ সে বুঝে নেবেই। চিৎকার করে ডানহাতটাকে শূন্যে ছুড়ে দিয়ে বলল, “বো-লে সো-ও-ও নি-হা-ল!”
উদ্দেশ্যটা বুঝতে পেরেই অধিরাজ আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেছে একদম ওর কপাল লক্ষ্য করে, “না ঘন্টু! একদম না!”
আগুন এবার পরম আদরে ঘন্টুর কোমরকে সাপটে ধরে উঠে আসছে বুকের ওপর। জ্বালানি তেলে আদৃত তার শরীরকে নির্বিবাদে পুড়িয়ে চলেছে। চতুর্দিকে উৎকট ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ। পবিত্র দিশেহারার মতো বেডরুমের দিকে দৌড়োতে দৌড়োতেই চেঁচায়, “ব্ল্যাঙ্কেট… ব্ল্যাঙ্কেট কোথায়…।” মিস্ দত্ত ওয়াশরুমের দিকে গেল। হয়তো জলের খোঁজে। আহেলি এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। এতক্ষণ সাহসে নিজের স্নায়ুকে শক্ত করে রেখেছিল। এবার নিয়ন্ত্রণ হারাল। তার সামনে আস্ত একটা জ্যান্ত লোক দাউদাউ করে জ্বলছে! সে থরথর করে কাঁপছিল। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে অধিরাজকেই জাপটে ধরেছে। মিস্ অরোরার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না। প্রণবেশ লাহিড়ী আর অপেক্ষা না করেই প্রথম ফায়ারটা করলেন। বুলেটটা তার কাঁধে লাগল। ঘন্টু তার ইমপ্যাক্টে শুধু একটু কেঁপে উঠল। অথচ আর কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই! একটা কাতরোক্তিও না। বরং তার চোখ এবার ঘুরল সোনালির দিকে। চোখের ভেতরেও যেন আগুন! সোনালির দিকে খুনির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফের চেঁচিয়ে উঠেছে, “বো-লে-এ-এ সো-ও-ও নি, হা, ল৷”
“আই সেইড, নো! একদম না।”
অধিরাজ এখনও তার মাথা লক্ষ্য করে রিভলবার তাক্ করে আছে। আঙুল ট্রিগারে। এক পা এগোলেই সব ক-টা গুলি ভরে দেবে। ওই অস্তিম মুহূর্তেও ঘন্টু বুঝতে পারল যে এখানেও সে ব্যর্থ হতে চলেছে। সোনালির গায়ে আঁচড় কাটার আগেই তার মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে এই শাপশ্যুটারের গুলি। অধিরাজ ব্যানার্জি তাকে এক পা-ও এগোতে দেবে না!
আগুন এবার তার কণ্ঠলগ্না হয়েছে। পাগড়িটাও জ্বলছে। সারা শরীরে অগ্নিশিখা একদম সম্পূর্ণ আগ্রাসী জিহ্বা বের করে চেটে খাচ্ছে তার মাংস-পেশী। তবু মুখের একটা রেখাও নড়ছে না। তার চোখ ভয়ার্ত শালিনীকে একবার ছুঁয়ে গেল ঠিকই। তবে বড়ো অবহেলার সঙ্গে। যেন বুঝে নিল, এই মানুষটিকে দিয়ে তার কাজ হবে না। পরক্ষণেই স্থির প্রতিজ্ঞায় ন্যস্ত হল ভূপেন্দ্র দত্তার ওপর। দপদপে জিঘাংসা যেন দু-চোখ দিয়ে ফেটে পড়ছে। আগুন সমেত জ্বলন্ত হাতটাকে ছুড়ে দিয়ে সে ফের সেই বিখ্যাত রণহুঙ্কার দিল, “বো-লে-এ-এ-এ সো-ও-ও নি-হা-ল!”
অধিরাজ এবারও তার ওপর থেকে নিশানা একচুলও সরাল না। কিন্তু নীচু স্বরে বলল, “সৎ শ্রী অকাল!”
বোধহয় এই শব্দটারই অপেক্ষায় ছিল ঘন্টু। সমস্ত অফিসাররা উত্তরটা শুনে বিহ্বল বিস্ময়ে একমুহূর্তের জন্য অধিরাজের দিকে তাকায়। সেই ফাঁকেই জ্বলন্ত লোকটা সবার ক্ষণিক অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ‘মার মার’ করতে করতে গিয়ে লাফিয়ে পড়েছে ভূপেন্দ্র-র ওপরে। একটা আগুনপাখি যেন বিরাট দুই ডানা ছড়িয়ে জাপটে ধরল এক্স পুলিশকর্তাকে! অগ্নিদেব মুহূর্তের মধ্যে এবার ভূপেন্দ্র-র অগ্নিপরীক্ষা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি চেঁচিয়ে উঠেছেন। প্রণবেশ আর টুইঙ্কল অরোরা ফায়ার করতে গিয়েও থমকে গেল। ঘন্টু এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে ভূপেন্দ্র দত্তাকে যে তাকে গুলি মারতে গেলে দত্তাসাহেবের গায়েই লাগার প্রবল সম্ভাবনা! তবু প্রণবেশ মরিয়া হয়ে লোকটার দুই পা লক্ষ্য করে একাধিক ফায়ার করলেন। সে আবার কেঁপে উঠল। তবু তার লৌহকঠিন আলিঙ্গন একটুও আলগা হল না! পা বেয়ে রক্ত পড়ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই পায়ের ওপরই ভর দিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটুও টলছে না।
“অনেককে জ্বালিয়েছিস্! আমার দুই ভাই সুদ্ধ মহল্লার সব বাচ্চাকে …।” তীব্র প্রতিশোধস্পৃহায় ভূপেন্দ্র-র টুটি টিপে ধরে হিড়হিড় করে সেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে টেনে নিয়ে আসতে আসতে বলল ঘন্টু, “এবার নিজে একটু জ্বলে দ্যাখ… চেঁচা… কত চেঁচাবি চেঁচা…।”
“সে-ভ মি-ই-ই-ই। হেল্প…হেল্প। অ-ফি-সা-র।”
এই কয়েকটা শব্দই বোঝা গিয়েছিল। বাকিটা আর্তনাদ। এমনভাবে গলার শিরা ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছিলেন দত্তাসাহেব, যেন তিনি একা নন, তাঁর ভেতর থেকে উনিশশো চুরাশি সালের সেই সব জ্বলে যাওয়া, গলে যাওয়া, পুড়ে ছারখার হওয়া হাজার হাজার আত্মারা মরণযন্ত্রণায় বিকৃত হাহাকার করছে। শরীর প্রায় পুড়ে গিয়েছে। তাও কী আশ্চর্য জেদ ঘন্টুর। এখনও ওই জ্বলন্ত ক্ষীণ দেহে কী প্রচণ্ড আসুরিক শক্তি। ভূপেন্দ্র দত্তা নিজেকে তার জ্বালাময়ী আলিঙ্গন থেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ লড়ছেন। সর্বশক্তি দিয়ে ধস্তাধস্তি করছেন। চেষ্টা করছেন ওই অগ্নিবলয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু ঘন্টু তাঁকে কিছুতেই ছাড়ছে না। দু-জনের ধস্তাধস্তির মধ্যে কেউ ফায়ারও করতে পারছে না। দু-জনেই এমন পজিশনে যে ঘন্টুকে গুলি করলে বুলেটটা ফুল ভেলোসিটি নিয়ে তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে সোজা ভূপেন্দ্র-র গায়েই লাগবে। সেই ন্যূনতম চান্সটুকুও কেউ নিতেই পারছে না। কোনোরকম সাহায্য করবে কী।
“বা-বা!” সোনালি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, “প্লিজ… সামবডি সেভ হিম….. বা-বা!”
বিরূপাক্ষ ভয়ে বিবর্ণ। সে টলেই পড়ে যাচ্ছিল, জুজুৎসু তার পরিচর্যা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সোনালি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো কেঁদেই চলেছে আর সাহায্য চাইছে। অফিসাররা কী করবে, কীভাবে ভূপেন্দ্রকে বাঁচাবে বুঝতে পারছে না। তাঁর চতুর্দিকে এমন অপ্রতিরোধ্য আগুনের দেওয়াল যে তাকে টপকে যাওয়া অসম্ভব। তার চেয়েও অসম্ভব ঘন্টুকে ঠেকানো। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। শালিনী একদম শীতল দৃষ্টিতে, অবিচলিত ভঙ্গিতে গোটা ঘটনাটা দেখছেন। যে লোকটা পুড়ছে সে যে ওঁর স্বামী, জীবনসঙ্গী, সন্তানের পিতা, তা মনেই হয় না! ওঁর নিরাসক্ত মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, উনি জানতেন এটাই হতে চলেছে এবং এটাই বোধহয় হওয়া উচিত ছিল!
ইতিমধ্যেই ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে আতঙ্কিত হাঁকডাক শুরু হয়ে গিয়েছে। পার্শিয়াল সাউন্ডপ্রুফ রুমও ভেতরের এই মুহূর্মুহু ফায়ারিঙের কানফাটানো আওয়াজ, চিল চিৎকার, ধোঁয়া, পোড়া গন্ধকে ঠেকাতে পারেনি। আগেরবারের ফায়ারিঙের শব্দ পেলেও কেউ হয়তো অতটা মাথা ঘামায়নি বা গুরুত্ব দেয়নি। অনেকসময় পাশের বাড়ির টিভি থেকেও ওরকম আওয়াজ আসে। কিন্তু এবার সব মিলিয়ে শোরগোল, কোলাহল ডেসিবেলের সমস্ত মাত্রাকেই বোধহয় ছাপিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে তাল মিলিয়েছে ফায়ার অ্যালার্মের আওয়াজ। বাইরের ভয়ার্ত চিৎকারে বোঝা গেল দরজার বাইরে লোক জড়ো হয়েছে। অথচ দরজা ভেতর থেকে লকড্। কেউ ঢুকতেও পারছে না। শোনা গেল বাসিন্দাদের ও সিকিউরিটি গার্ডের ডাকাডাকি। তারা দরজায় অসহায়ভাবে ধাক্কা মারছে আর চেঁচাচ্ছে, “মিঃ দত্তা… দত্তাসাব… দরজা খুলুন… আগুন লেগেছে… তাড়াতাড়ি দরজা খুলুন স্যার…।”
দত্তাসাহেব আর দরজা খুলবেন কী। তিনি নিজেই তো জ্বলছেন। আগুন ঘন্টুর গা থেকে দু-হাত বাড়িয়ে চূড়ান্ত আশ্লেষে, ভয়াবহ উল্লাসে তাঁকেও আপাদমস্তক সাপটে ধরেছে। যেন দাবাগ্নির হাজার হাজার হাত আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ওঁকে। ভোক্যাল কর্ডও কালো ধোঁয়ায়, আগুনে পুড়ে প্রায় চোকড হয়ে এসেছে। তবু আপ্রাণ চেঁচিয়ে যাচ্ছেন। পবিত্র ততক্ষণে ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে ছুটে এসেছে। কিন্তু কার গায়ে জড়াবে! ঘন্টু আর ভূপেন্দ্র দত্তাকে বেড়ে ধরে আছে আগুনের গোল বাউন্ডারি। তাকে অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব। আত্রেয়ীও জল এনেছিল। সে মূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে দেখল যে এই ভয়াবহ আগুন নেভানো এই সামান্য একবালতি জলের কাজ নয়। গোটা ট্যাঙ্কটাই ঘাড়ে করে আনতে হত।
“রা-জা!” পবিত্র উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে ওঠে, “তুমি ঘন্টুর মাথায় বা ঘাড়ে শ্যুট করো। ওই পোর্শনটা একমাত্র তোমার রেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে…! কিল্ হিম রাইট নাও…!”
“না ব্রাদার! দু-জন একদম জড়িয়ে আছে। ওর মাথায় গুলি চালালে মিঃ দত্তারও মাথা ফুটো হবে। উনিও মরবেন। একজন সিনিয়র আই পি এস অফিসারের খুনের দায় নিতে পারব না আমি। স্যরি।”
অধিরাজ খুব শান্তস্বরে উত্তর দিয়ে এবার রিভলবারটা সরিয়ে নেয়। ভয়ার্ত আহেলিকে সযত্নে এক হাতে আলগোছে জড়িয়ে ধরে যেন আশ্রয় দিল। সে স্থির দৃষ্টিতে দেখছে ভূপেন্দ্র দত্তা প্রাণপণ আগুনের গণ্ডী পেরোনোর চেষ্টা করছেন, আর ঘন্টু বারবার তাকে টেনে হিঁচড়ে নিজের জ্বলন্ত আলিঙ্গনে ফিরিয়ে নিচ্ছে। ও মরে যাবে, তবু ছাড়বে না। দু-জনেরই জীবনীশক্তি শেষের পথে। যারা ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের বুঝতে বাকি রইল না যে দু-জনই মরবে! দু-জনেই আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। ভূপেন্দ্র দত্তার এখন আর আর্তনাদ করার শক্তিও নেই। তাঁর গোঙানি শোনা যাচ্ছে। চর্বি, মাংস সব পুড়ে ছারখার! ঘন্টুর পাগড়িসমেত চুল পুড়ে ছাই হয়েছে। সে তার ভয়াবহ মুখ তুলে কোনো এক অজানার দিকে তাকাচ্ছে। মুখে অদ্ভুত একটা উজ্জ্বল হাসি। যেন বহুদিন বাদে প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষের সঙ্গে মিলন হচ্ছে তার!
“টিম্ টিম্ করদে নিকে নিকে তারে, লগ্ দে সানু বহোত পিয়ারে, জি কর দা মৈ তোড়ি যাওয়া, অপনে ওয়াড়ি ভিচ্ বিছাওয়া…!”
ঘন্টুর কানে সবকিছু ছাপিয়ে ভেসে এল বেবের সুরেলা কণ্ঠের ‘লোরি’। তার চোখের সামনে এখন আর আগুন নেই। বরং আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে চতুর্দিক।
বেবে, বাপু, দিদি, তাওজি, তাইজি, সরবজিত, আমনপ্রীত, সবাই সাদা নক্ষত্রের ঝালর পরে এসে দাঁড়াল তার চারপাশে। ওরা হাসছে। বেবে শ্বেতপাথরের মতো হাতদুটো ছড়িয়ে বলল, “গুল্লু পুত্তর… অনেক হয়েছে… অব বস্ কর। আ যা! অনেক কষ্ট পেয়েছিস্, ঘুম যা বেটা… আমার কোলে ঘুমিয়ে পড়।”
ঘন্টু মনে মনে বলল, “আসছি মা… আসছি…। এই শরীরটা বড্ড বড়ো আর ভারি…। এটাকে ছেড়ে আমি সেই আট বছরের গুল্লু হয়ে আসছি… শুধু আর কয়েকটা মুহূর্ত দেখ!”
অর্ণব সবিস্ময়ে শুনল অধিরাজ খুব চাপা স্বরে বলল, “ডকে সর্দারা।”
আর মাত্র দু-মিনিট! মাত্র দু-মিনিট লেগেছিল। তার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। ঘন্টুর পুড়ে যাওয়া মৃতদেহটা যখন লুটিয়ে পড়ল মেঝের ওপরে তখনও সে মরণালিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে ভূপেন্দ্র দত্তার পার্থিব শরীরকে। মরে গিয়েও ছাড়ল না নিজের অপরাধীকে। আই পি এস দত্তা বহু প্রচেষ্টাতেও সেই মৃত্যুর হাত থেকে বেরোতে পারেননি। দুটো শরীরই যখন নিথর হয়ে গেল তখনও আগুন জ্বলছে। কিন্তু বুঝতে বাকি রইল না যে দু-জনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। আগুন এখন স্রেফ দুটো লাশকেই পুড়িয়ে যাচ্ছে। কোনো দেহেই প্রাণ নেই।
“রাজা!” পবিত্র সেদিকে একঝলক তাকিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “এটা কী হল। আমরা যেদিকে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে ঘন্টুর মাথায় শ্যুট করা যাচ্ছিল না। আর ওর গায়ে গুলি মেরেও কোনো লাভ হয়নি। একমাত্র তুমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলে সেখান থেকেই ওকে শেষ করে দেওয়া যেত। অথচ তুমি একবারও চেষ্টা করলে না। অ্যাট লিস্ট মিঃ দত্তাকে তো বাঁচানোর চেষ্টা করা যেত!”
“আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে আরও হত না পবিত্র।”
অধিরাজ রাতের বেলাতেই বুক পকেট থেকে গগলসটা বের করে চোখে চাপিয়েছে। আর কেউ না বুঝলেও অর্ণবের বুঝতে বাকি নেই যে চোখদুটোকে রাতের বেলায় রোদচশমার পেছনে সে কেন লুকোল। দিনের শেষে বিজয়ীপক্ষ কখনও কাঁদে না। হিরোদের কাঁদতে নেই। অথবা কাঁদলেও তার অশ্রুকে সাবধানে ঢেকে ফেলতে হয়। লুকিয়ে ফেলতে হয় ভেজা চোখ। তবে সামান্য কম্পন তার স্বরে ধরা পড়ল ঠিকই। খুব আস্তে আস্তে বলল, “তোমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলে, সেখানে ল’ অ্যান্ড অর্ডার ছিল। আর আমি যে স্ট্যান্ডে ছিলাম, সেখানে জাস্টিস। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।”
