কালরাত্রি – ২৩

(২৩)

“বার্নিং শিখ ওঁর মুখে এক বোতল ক্লোরোফর্ম ছুড়ে মারল, আর আপনি কিছু করতে পারলেন না স্যার? ওটা ক্লোরোফর্ম না হয়ে যদি কোনোরকম অ্যাসিড হত? অথবা ব্লাস্টে যদি কিছু হয়ে যেত।”

অর্ণবের শান্ত অথচ সামান্য অনুযোগমিশ্রিত কথাটা শুনেও চুপ করে রইল পবিত্ৰ। সে নিজেই নিজেকে বারবার কাঠগড়ায় তুলছিল। অর্ণব তো একথা বলতেই পারে। ওকে কিছু বলার মুখ তার নেই। সত্যিই তো, ওটা অ্যাসিডও হতে পারত। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা কাউকেই বোঝানো যাবে না। সে নিজেই অধিরাজকে ছেড়ে আসতে চায়নি। অথচ সম্পূর্ণ নিরূপায় ছিল! সে কথা কেউ শুনবে না। তাই নিজের দায়ভার নিজেকেই বইতেই হবে।

আহেলি আড়চোখে একবার অর্ণব আর পবিত্রকে একঝলক দেখে নিয়ে ফের অধিরাজের মাথায় আর মুখে জল ঢালতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্লোরোফর্ম এমনিতে খুব মারাত্মক কোনো বস্তু না হলেও অতিরিক্ত মাত্রায় গেলে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সেইজন্যই সে ডঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে ফোনে পরামর্শ করে নিয়েছে। তিনিই বলেছেন, “বিশেষ ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুধু কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর মাথায় আর মুখে চোখে জল ঢালতে থাকো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের পাবলিক চালু হয়ে যাবে। তবে যতক্ষণ পড়ে আছে তার মধ্যেই স্টিচটা ফের মেরে দাও আহেলি। পারলে এবার একটু জোরদার মারো। নয়তো ব্যক্তিটি যেরকম শান্ত মানুষ তাতে বেশিক্ষণ টিকবে না। আর যতক্ষণ মহাকাশে চাঁদ-তারা দেখতে ব্যস্ত আছেন, তার মধ্যেই কর্ণবধ করে ফেলো। নয়তো পৃথিবীতে পা রেখেই তিনি ফের লাফাবেন কিন্তু।”

ইঙ্গিতটা বুঝতে আহেলির কোনো কষ্ট হয়নি। ততক্ষণে অর্ণবও আত্রেয়ীর কাছ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্যাম্পল্ নিয়ে ফরেনসিক ল্যাবে ঢুকে গিয়েছে। স্যারের খবর সে আগেই শুনেছিল। তাই সূর্যোদয় হওয়ামাত্রই একরকম দৌড়োতে দৌড়োতে চলে এসেছে। পবিত্র আর অর্ণব দু-জনের দিকেই সে তাকিয়ে বলল, “আপনারা কাইন্ডলি ওঁর শার্টটা রিমুভ করুন। স্টিচ করতে হবে।”

“আপনিই খুলে নিন না।” পবিত্র বলল, “আমি তুলে ধরছি ওকে।”

“আমি! পাগল নাকি?” আহেলি চোখ কপালে তুলে ফেলল, “জানতে পারলে উনি আমার নামে বস্ত্রহরণের চার্জ আনবেন! অন্য কিছুরও আনতে পারেন। আপনাদের মধ্যেই একজন একটু তুলে ধরুন, অন্যজন শার্ট-কটস উল, সব রিমুভ করুন প্লিজ। এত কিছুর ওপর দিয়ে সেলাই করা সম্ভব নয়।”

“আমি ধরছি।” পবিত্র অর্ণবের দিকে তাকায়, “তুমিই খোলো।”

অর্ণব শান্তভঙ্গিতেই কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে। অধিরাজকে পবিত্র কোনোমতে তুলে ধরতেই সে দ্রুতগতিতে শার্টটা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সমস্যার ফেলল ভেতরের কটস উল! ওটা বুক দিয়ে নয়, মাথা দিয়ে গলিয়ে খুলতে হবে। অথচ অর্ণব যতবারই টান মেরে খুলতে যাচ্ছে ততবারই গ্রিপ হারাচ্ছে পবিত্র। আর অধিরাজের দেহটা ফের এলিয়ে পড়ে যাচ্ছে। সেটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের বডি গ্রিপিং পোশাক, যা মাথা দিয়ে খোলে সেটা যে লোকটা পরে থাকে, তার পক্ষেই টান মেরে খোলা সবচেয়ে সহজ। অন্য কেউ খুলতে গেলে নানারকমের সমস্যা দেখা দেয়। তার ওপর ছ-ফুট চার ইঞ্চির বলিষ্ঠ দেহের লোককে ওভাবে তুলে ধরে রাখাও সহজ কাজ নয়।

বেশ কিছুক্ষণ টানাটানির পর দুই অফিসারই গলদঘর্ম হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। অর্ণব মাথা নাড়ল, “এভাবে খোলা যাবে না মিস মুখার্জি। দুই হাতে, পিঠে, ঘাড়ে আটকে যাচ্ছে। স্যারও ধরতে পারছেন না ঠিক করে। উনি পড়ে যেতে পারেন। আপনি বরং কাঁচিটা দিন। কেটে খুলে নিই।”

আহেলি ঢকঢক করে মাথা নাড়ে, “একদম না! অফিসার আচার্য ওঁকে তুলুন বা আপনি ওঁর সাধের কটস উল কেটে খুলুন, আলটিমেটলি চাঙ্গা হওয়া মাত্রই খাতা উনি আমার নামেই খুলবেন! তার ওপর যদি শোনেন কাঁচিটা আমি দিয়েছি, তবে আমার পেছনেই কাঁচি নিয়ে পড়ে যাবেন। বাবা মোস্তাফা হতে রাজি আছি, কিন্তু দুঃশাসন হতে বেজায় আপত্তি আছে।”

এতক্ষণ টুইঙ্কল অরোরা বসে মিটমিট করে সব দেখছিল। এবার দুই অফিসারের অবস্থা দেখে বলল, “স্যার, দু-জনে মিলে পারবেন না। তিনজন লাগবে। দু-জন যদি দু-দিক দিয়ে ধরে তুলে ওঁর হাত দুটো লিফ্ট করে দেন, আর একজন উলিকটটা ধরে ওপরের দিকে টান মারেন ওটা তবেই খুলবে।”

অর্ণব আর পবিত্র দু-জনেই অসহায় দৃষ্টিপাত করে। অর্ণব বলল, “তবে আমি আর আচার্য স্যার ধরছি। আপনি খুলুন মিস মুখার্জি।”

আহেলি আঁতকে উঠল, “আমি নেই। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার অভিজ্ঞতা খুব খারাপ।”

অবস্থা বেগতিক দেখে টুইঙ্কলই এবার হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসে,

“অর্ণব পা-জি, আপনি খুলুন। আমি আর আচার্য স্যার ধরছি।”

কথাটা শুনে পবিত্র ব্যোমকে গেল, “আ-প-নি….মানে ধরতে পারবেন? ভারি আছে কিন্তু…।”

টুইঙ্কল তার দিকে অবিকল অর্ধনিদ্রিত বিড়ালের মতো আধখানা চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকাল। তারপর দমাস্ করে কথা নেই বার্তা নেই পবিত্রকেই টক্ করে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে অনায়াসে তুলে নিল। সে বেচারি আঁতকে উঠে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, “হোয়াট দ্য হেল! আমাকে কেন!….।”

“আমার দাদির ওজন একশো দশ কেজি।” সে পবিত্রকে শূন্যে লটকে রেখেই বলল, “কিন্তু আমি তাঁকেও কোলে নিয়ে ঘুরি। ওঁকে পারব না বলছেন?”

“ওরে বাবা!” পবিত্র হাঁউমাউ করে ওঠে, “আমি আপনার দাদির মতো হেভিওয়েট নই। রাজাও ওঁর তুলনায় একেবারেই হালকা। ফর গড় সেক! আপনি সব পারেন। ইনফ্যাক্ট খোদ হারকিউলিস যা যা পারতেন না, আপনি তাও পারবেন। প্লিজ, পুট মি ডাউন… প্লিজ। আমার বউ জানতে পারলে…!”

আহেলি আর অর্ণব তখন অতিকষ্টে হাসি চাপছে। এই মেয়েটাকে চ্যালেঞ্জ করা আর খ্যাপা ষাঁড়কে লাল রুমাল দেখানো প্রায় একই। টুইঙ্কল আর কথা না বাড়িয়ে পবিত্রকে সযত্নে নীচে নামিয়ে রেখেছে। পবিত্র বিড়বিড় করে, “রক্ষাকালী। মেয়েগুলো সব ডাকাত। সবাই প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন দেওয়ার জন্য আমাকেই পেয়েছে! এবার আমার ডিভোর্স কেউ ঠেকাতে পারবে না। হোয়াই মি গড়। …হোয়াই মি!”

সে যা-ই বলুক, পরের কাজটা কিন্তু খুব সহজেই হয়ে গেল। মিস্ অরোরা সত্যিই কাজের মেয়ে। সে বেহুঁশ বসের মাথাটা সযত্নে নিজের কাঁধের ওপর রেখে অনায়াসেই ওকে তুলে ধরল। অন্য দিক দিয়ে পবিত্রও সাপোর্ট দিয়েছে। এবার একবারের চেষ্টাতেই সহজেই বেরিয়ে এল কটস্উল। কিন্তু বসের অনাবৃত দেহ দেখেই টুইঙ্কল লাফিয়ে ওঠে, “হিঃ। কী সর্বনাশ! মতি মারি গয়ি থি মেরি। আমি ওঁর সামনে নিজের পেটের গর্ব করছিলাম। ইনি তো অল্পবয়েসের সিলভেস্টার স্ট্যালোনকেও হার মানাবেন, সলমন খান তো নস্যি! তার ওপর কী গ্লেজি স্কিন! যারা জিম করে তাদের এত গ্ল্যামারাস স্কিন হয় না, প্রচুর স্ট্রেচ মার্কস থাকে। ইনি একদম ফ্ল লেস। ভাগ্যিস, নিজের পেট দেখাইনি…!”

আহেলি একটু ভয়ার্ত দৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকায়। কিন্তু অর্ণব এবার একটুও রাগেনি। বরং হেসে ফেলেছে। এই লেডি অফিসারটি যে-কোনো কিছুই ভেবেচিন্তে বলে না তা সে এতক্ষণে বুঝে গিয়েছে। মুচকি হেসে বলল, “ডোন্ট ওরি। ওঁর ডায়েট চার্টটা আমি দিয়ে দেব আপনাকে। আপনিও সিলভেস্টার স্ট্যালোন হয়ে যাবেন। তবে চকোলেট একটু কম খেতে হবে।”

“নাঃ।” সে মাথা নাড়ে, “এগুলো ওভাবে বানানো যায় না পা-জি। গড গিফটেড। রবজি-র হাতে প্রচুর সময় ছিল মানতেই হবে। আমাদের সময় যে ভদ্রলোক কী করেছেন কে জানে!”

“লাও ঠ্যালা।” পবিত্র ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, “আরও একজন বোল্ড আউট হলেন। রাজার স্পয়েল করার ক্ষমতা কী মারাত্মক দেখেছ?”

টুইঙ্কল নির্বিবাদে জানায়, “ওয়ে পা-জি, আপনি আছেন কোন্ দুনিয়ায়? আমি স্পয়েলড্ মানছি। কিন্তু একা আমি নই, গোটা অফিসের নিরানব্বই পার্সেন্ট বুড়ি আর ছুঁড়ি স্পয়েল হয়ে বসে আছে। অফিসের সামনের চায়ের দোকানটাকে কখনও ঠিকমতো লক্ষ্য করেছেন? রোজ দুপুর দুটো আর রাত ন-টাতেই ওই দোকানটায় সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। ভিড়ের ঠ্যালায় বেচারি দোকানি হিমশিম খেতে থাকে। আর সেই ভিড়ে আপনি মেয়েদেরই সবচেয়ে বেশি পাবেন।”

“রাজার সঙ্গে চায়ের দোকানের কী সম্পর্ক? কী জ্বালা!”

পবিত্র ফের কনফ্যুসিয়াস হয়ে গিয়েছে। অর্ণব তাকে বুঝিয়ে বলে, “নর্মাল রুটিন হলে স্যার রোজ ওই চায়ের দোকানটা থেকেই এগজ্যাক্ট ওই টাইমিঙেই চা খেয়ে থাকেন। ঠিক ডট্ দুপুর দুটো আর রাত ন-টা। ওঁর ওই সময়ে খোলা হাওয়ায় রাউন্ড দেওয়ার শখ হয়। ওখানে দাঁড়িয়ে চা আর সিগারেট খেতে খেতে আমার সঙ্গেই আড্ডা মারেন। ব্যাপারটা আমিও লক্ষ্য করেছি। অন্য সময় দোকান শুনশানই থাকে, শুধু ওই বিশেষ সময় দুটো ছাড়া।”

“ওই দেখুন। অর্ণব পা-জি একদমই ঠিক ধরেছেন।” টুইঙ্কল বলল, “উনি তো চা-সিগারেটের মজা নেন। এদিকও তাকান না, ওদিকও তাকান না। বাকিরা ওঁকে দেখে মজা নেয়। স্বাভাবিক। এরকম অসহ্য টাইপের মারকাটারি সুন্দর জোয়ান লোক, ওরকম পার্সোনালিটি হলে মেয়েরা চোখের সুখ করবে না তো কি ভজন-কীর্তন গাইবে? বুঝেছেন এবার?” সে যোগ করল, “তবে হ্যাঁ, স্পয়েলড হলেও আমার ওই লাইনে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছেই নেই। ইনফ্যাক্ট কোনো লাইনেই দাঁড়ানোর শখ নেই। প্রভু শ্রীরামের সীতা হওয়ার জন্য স্বয়ম্বর চলুক, কিন্তু আমার ও ইনটেনশন নেই। আমি তো শ্রীরামের চরণের দাস, সেবক, ভক্ত হনুমান হতে পারলেই ধন্য হয়ে যাই।” এবার পবিত্রও মজা পেয়েছে, “সেরেছে। আপনি রামভক্ত হনুমান হলে অর্ণবের কী হবে? ও বেচারির তো ছুটি হয়ে গেল!”

কথাটা শুনে অর্ণব তুমুল চটার আগেই মিস্ অরোরা জিভ কাটছে, “এ রাম! অর্ণব পা-জি হনুমান হতে যাবেন কোন্ দুঃখে? উনি তো শ্রীরামের লক্ষ্মণ, শ্রীকৃষ্ণের বলরাম আর বিষ্ণু ভগবানের শেষনাগ। যার কোলে তিনি পরম সুখে অনন্ত নিদ্ৰায় ডুবে থাকেন। ওঁকে ছাড়া চলবে কেন? আমি হনুমান হয়েই ঠিক আছি। অবশ্য যদি উনি চরণে আশ্রয় দেন…!”

কথাগুলো শুনে অর্ণবের মনে হল, সত্যিই এমন মিষ্টি মেয়ে সে আগে কখনও দেখেনি। ওকে বেলজিয়াম চকোলেটের গোটা কন্টেনারই গিফট করা উচিত। বড়ো সুন্দর মানুষ এই টুইঙ্কল অরোরা। মেয়েটাকে এই টিমে রাখার জন্য স্যারের কাছে দরবার করতে হবে।

আহেলি ওদের কথা শুনতে-শুনতেই মনে মনে হাসছিল। কাজও চলছে সমানতালে। প্রাথমিক কাজ শেষ হতেই অত্যন্ত দক্ষ হাতে ফের ক্ষতস্থান সেলাই করে দেয়। তার সবসময়ই মনে ভয়, এই বুঝি লোকটা নড়েচড়ে উঠল। এমনিতেই রথীন দাশগুপ্ত-র ঘটনাটার পর অধিরাজকে চড়া দাগের সেডেটিভ এবং অন্যান্য ড্রাগ দিতে হয়েছিল। আহেলি জানে, এখনও সে নাইট ডিউটি না থাকলে সেডেটিভ নেয়। সুতরাং ক্লোরোফর্ম বেশিক্ষণ কাত করে রাখতে পারবে না। যে-কোনো মুহূর্তে তিনি চোখ খুলতে পারেন, এবং উঠেই আহেলির নাকে নাকে ঝগড়া শুরু করে দেবেন। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারা যায় ততই ভালো।

“মিস্ মুখার্জি।” এবার অর্ণব গুটিগুটি পায়ে ফের এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। চিন্তিত স্বরে বলে, “এখনও তো হুঁশ ফিরছে না! কতক্ষণে রিকভার করবেন বলে মনে হয়?” “আর মিনিট কুড়ি কী ত্রিশ লাগবে।” সে কাজ করতে করতেই বলে, “এক কাজ করুন তো। কাঁধটুকু ছাড়া বাকিটা চাদর দিয়ে ঢেকে দিন। কারণ এখনই ড্রেস পরানো যাবে না। সেলাইটা করে দিয়েই মুখে মাথায় জল ঢেলে ক্লোরোফর্মের এফেক্টটা কমাতে হবে। জলের ঝাপটায় জামা ভিজে যাবে। চোখ খুলে যদি দেখেন, ওঁর গায়ে জামা নেই তবে আমার খবর আছে।”

“আপনার? কেন?”

“কারণ হনোলুলুতে বম্ব পড়ুক কী সাইবেরিয়ায় ভূমিকম্প, দোষ সবসময়ই আমারই হয়।” সে নির্লিপ্ত মুখে জানায়, “ওইদিকে দেখুন বেশ কয়েকটা সাদা চাদর আছে। একটা নিয়ে আসুন।”

অর্ণব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, “কিন্তু ওগুলো তো মড়ার চাদর।…মানে, ওগুলো দিয়ে ডেডবডি ঢাকা থাকে যে। স্যারের গায়ে লাশের চাদর…!”

‘আমি আহেলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “গুড পয়েন্ট। এরপর উনি ডায়লগ দেবেন, এখনও মরিনি মিস্ মুখার্জি।’ ছাড়ুন।”

বলতে বলতেই সে নিজের গায়ের শালটা দিয়েই অধিরাজকে সযত্নে ঢেকে দেয়। অর্ণব আড়চোখে দেখল, এই সেই বিখ্যাত শালটাই! এটা দিয়েই আহেলি কোনোসময়ে বিপন্ন, ঘোরে আচ্ছন্ন অধিরাজকে ঢেকে দিয়েছিল। এই শালটা গায়ে দিয়ে সে বাচ্চাদের মতো শান্তিতে ঘুমোত। একটু ঠিক হওয়ার পরেই অবশ্য এটাকে ওয়াশ করে কাকিমা অর্ণবের হাত দিয়ে আহেলিকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। স্যারের অবশ্য সেসব কথা মনেও নেই৷

“ওয়াশরুম থেকে একবালতি জল নিয়ে আসুন প্লিজ। জলের ঝাপটা না খেলে উনি উঠবেন না।”

তারপর থেকেই কেটে গিয়েছে আরও পনেরো মিনিট। আহেলি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে অধিরাজের মাথায় আর মুখে জল ঢালছে। নরম হাত দিয়ে সাবধানে মুখ ও মাথার চুল পরিষ্কার করছে। তিন অফিসার সামনেই দাঁড়িয়ে চতুর্দিকের আপডেট নিচ্ছিল। মিস্ দত্ত এবং ভূপেন্দ্র দত্তার পরিবার সুরক্ষিত। ওদিকে এখনও কোনো সমস্যার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। পি সি চৌধুরীর পরিবারও নিরাপদেই আছে। মিস্‌ বোসের জ্ঞান বেশ কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। এখন সে ঠিকই আছে। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ কিছুক্ষণ বাদেই তাকে ডিসচার্জ করবে। পবিত্র-র উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল আহেলি। সে কৌশানীকে ঝেড়ে কাপড় পরাতে ব্যস্ত! রীতিমতো ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, “আপনার কোনো দায়িত্বজ্ঞান নেই মিস্ বোস? এতগুলো লোকের বাঁচা-মরা আপনার ওপর নির্ভর করছিল। বারবার আপনাদের সবাইকে বলা হয়েছে যে বাইরের খাবার খাবেন না, বাইরের প্রোডাক্ট ইউজ করবেন না, কাউকে বিশ্বাস করবেন না। যা চাই, আমাকে বলবেন। আপনার স্মোক করার ইচ্ছে হয়েছিল, সেটা আমাকে বলা যেত না? বেছে বেছে ও বাড়ির সবচেয়ে বিপজ্জনক লোকটাকেই আপনি পেয়েছিলেন সিগারেট আনানোর জন্য?”

কৌশানী বোধহয় আমতা আমতা করে বলছিল, “আপনাকে বলতাম। আপনি কী মনে করতেন স্যার…!”

“আমি মনে করতাম? আমি?” সে ধমকে ওঠে, “এইটাই হচ্ছে আপনার প্রবলেম। টিমের লোকদের সঙ্গে ঠিকমতো মেশেন না, তাই কিছুই জানেনও না। আরে, আমার বউ রীতিমতো স্মোকার। তিনি মাঝেমধ্যেই আমার কাউন্টার ডিমান্ড করেন। আমি বাড়ির কিছুই দেখতে পারি না, কোনো কর্তব্য করি না, সব তিনিই করেন বলে স্ট্রেসের শেষ নেই। সেই স্ট্রেসের জ্বালায় আমাকেই তাঁর সুখটানের কোটা কিনে দিয়ে আসতে হয়। আর আপনি বলছেন, আমি মাইন্ড করব? আপনি সিগারেট টানবেন, খামোখা আমি মাইন্ড করতে যাব কেন? তাছাড়া যদি মাইন্ড করার গল্পও থাকত, তবে কোন্‌টা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট? আমার মাইন্ড খাওয়া, না লোকগুলোর মরা? আপনি জানেন, আমি আর রাজা সঠিক সময়ে না পৌঁছোলে ঠিক কী হত? তিনটে লোকই পুড়ে ঝুরে মরে পড়ে থাকত। আর আপনাকে আমাদের রীতিমতো টুকরোয় কিলোদরে কালেক্ট করতে হত। বার্নিং শিখ এমন চমৎকার কিমা বানিয়ে দিত যে জোড়া লাগাতে লাগাতে ফরেনসিক এক্সপার্টরাও বুড়ো হয়ে যেতেন। আপনার বাড়ির লোকদের কী জবাব দিতাম? এডিজি স্যারকেই বা কী বলতাম?…আপনার একটা স্টুপিডিটির জন্য সবার সমস্ত পরিশ্রম জলে যাচ্ছিল। কাণ্ডজ্ঞানহীন, ওয়ার্থলেস…!”

বেশ কিছুক্ষণ বকে ঝকে একটু দম নেওয়ার জন্য থামল সে। তারপরই বলল, “তাছাড়া আপনি কী জাতীয় স্মোকার? টান মেরেও বুঝলেন না যে ওটা তামাক নয়, গাঁজা! গন্ধেই তো টনক নড়া উচিত ছিল! তার বদলে হুশহুশ করে মেরে দিলেন। এতদিন ধরেও মার্লবোরোর টেস্ট চেনেননি? আপনি যেমন অপদার্থ অফিসার, তেমন অপদার্থ স্মোকারও বটে! এডিজি সেন জানতে পারলে আপনাকে টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দিতেন। রাজা পুরো ব্যাপারটাই চেপে গেছে বলে আমরাও কিছু বলিনি। ওর জায়গায় আমি থাকলে, শুধু গাঁজা চিনতে না পারার জন্যই আপনাকে ইনকম্পিটেন্ট ঘোষণা করতাম…।”

তার বকাঝকা চলতেই থাকল। অন্যদিকে টুইঙ্কল একগাদা কলা তুলে নিয়ে বেছে বেছে খেতে ব্যস্ত। তার আবার খিদে পেয়েছে। অর্ণবের মুখে চিন্তার ছায়া। বারবার তার একটাই কথা মনে হচ্ছে। স্যারকে একা ছাড়লেই কিছু না কিছু অঘটন ঘটেই। ‘সর্বনাশিনী’র ক্ষেত্রে কিছুক্ষণের জন্য একলা ছেড়েছিল। সেবারই গুলি লাগল! ‘সার্জিক্যাল স’ কিলার কেসেও অভিমানে কিছুক্ষণের জন্য ছেড়ে গিয়েছিল তাকে। সেদিন যদি মাঝপথ থেকে ফের ফিরে না আসত, তবে তো পুরোপুরিই হারাতে হত অধিরাজকে! তার মৃতদেহটাই শুধু লাঞ্ছিত, লুণ্ঠিত অবস্থায় পড়ে থাকত। সেদিনটার কথা মনে পড়লে আজও আতঙ্ক গ্রাস করে। আর আজ! ভাগ্যিস ক্লোরোফর্ম। তার বদলে হাইড্রোফ্লুওরিক, সালফিউরিক বা যে কোনো অ্যাসিড থাকলে….! তার ওপর ওরকম মারাত্মক ব্লাস্ট। অধিরাজ যদি জানলা দিয়ে সঠিক সময়ে লাফিয়ে না বেরোতে পারত।

ভাবতেই শিউরে ওঠে সে। প্রত্যেকবার লোকটার ওপর কোনো-না-কোনো ফাঁড়া আসবেই। একমুহূর্তও দৃষ্টির বাইরে গেলেই আজকাল চিন্তা হয়, কিছু হয়ে গেল না তো! অর্ণব পাশে থাকলে অন্তত লড়তে তো পারত। পবিত্র স্যার ওঁকে একা ফেলে চলেই বা এলেন কী করে। অর্ণব হলে মরে গেলেও সঙ্গ ছাড়ত না… 1

“উঃ!”

একটা অস্ফুট কাতরোক্তির শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে ওঠে। আহেলি দেখল, অধিরাজের মুখে একটু একটু করে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছে। সে একটু নড়েচড়ে উঠে ফের বলল, “আঃ…!”

আহেলি এবার খানিকটা জল আঁজলা ভরে তুলে নিয়ে তার মুখে সজোরে ছিটিয়ে দেয়। একটু চিন্তিত স্বরে বলল, “অফিসার…! অফিসার ব্যানার্জি?”

অধিরাজের ভুরু একটু বিরক্তিতে আর যন্ত্রণায় কুঁচকে যায়। সে একবার আলগোছে চোখ খুলেও ফের বুজে ফেলেছে। খুব মৃদু অথচ জড়ানো গলায় বলল,

“আমার মুখটা ওয়াংখেড়ের ক্রিকেট পিচ নয় যে এত জোরে জলের ঝাপটা দিতে হবে!”

তিন অফিসারই এবার তাড়াতাড়ি চলে আসে তার কাছে। অর্ণব টেনসড্-“ওসব ওয়াংখেড়ের পিচ টিচ কীসব বলছিলেন যেন! আবার ডেলিরিয়াম হল নাকি?”

“কোনো রিয়ামই হয়নি!” আহেলির মুখ হাঁড়ি, “গোমড়াথেরিয়াম হয়েছেন উনি। একদম টনটনে জ্ঞানে আছেন। ডেমো দেখতে চান?” বলতে বলতেই সে একটু জোরে বলে, “অফিসার ব্যানার্জি, আমার গলা শুনতে পাচ্ছেন আপনি?”

অধিরাজ চোখ বুজেই ফের বিড়বিড় করল, “চাঁদ থেকেও চীনের প্রাচীর স্পষ্ট দেখা যায়। আর শুধু একটা জিনিসই স্পষ্ট শোনা যায়। আপনার অ্যাংরি বার্ড মার্কা ধমক মিস মুখার্জি! আমি তো পৃথিবীতেই আছি! অল্ ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউড!”

“দেখেছেন?” আহেলি মুখভঙ্গি করে, “বলেছিলাম না, সব দোষ আমারই হয়। আপনি এবার দয়া করে চোখ খুলুন। আপনার ভক্তরা অনেকক্ষণ ধরে শুভদৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছে!”

সে মিনমিন করে বলে, “আপনার নাকের সামনে একখানা জাঁদরেল ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে রাখলে চোখ খুলতে পারবেন আপনি? মনে তো হচ্ছে আস্ত সূর্যটাই চোখের সামনে টাঙিয়ে রেখেছেন!”

এইবার নিজের ভুলটা বুঝতে পারল মিস্ মুখার্জি। ফরেনসিক ল্যাবের ছাতে একটা অসম্ভব জোরালো আলো জ্বলে। পোস্টমর্টেমের ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দেখতে সুবিধা হয়। ওই লাইটটা সত্যিই চোখ ধাঁধানো। মৃতদেহের কোনো অসুবিধা হয় না, হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু জ্যান্ত মানুষেরা সেদিকে তাকাতেও পারবে না। সন্তর্পণে স্টিচ মারার জন্যই বড়ো আলোটা জ্বেলে দিয়েছিল বেচারি। নেভাতে ভুলে গিয়েছে। সে এবার পটাস করে আলোটা নিভিয়ে দিয়েছে। এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে চোখ খুলে তাকাতে পারল অধিরাজ। সজ্ঞানে আসামাত্রই দুর্বলস্বরে প্রশ্ন করল, “ওদিককার খবর কী? অল্ সেট?”

“হ্যাঁ।”

পবিত্র আর অর্ণব তাকে সঙ্গে সঙ্গেই আপডেট দিয়ে দেয়। ওদের কথা মন দিয়ে শুনতে শুনতেই সে সটান উঠে বসার চেষ্টা করছে। কিন্তু যেই গায়ের জোরে ভর দিয়ে উঠতে গেল, অমনিই যেন তার নীচের মাটিটা খানিকটা গড়গড়িয়ে সরে গেল। পৃথিবীটাই বুঝি নড়ে উঠল। অধিরাজ ঘাবড়ে যায়, “এ কী! আমি শুয়ে শুয়ে হাঁটছি কী করে? মানে আমি হাঁটার আগেই আমার পিঠের নীচে এটা কী হাঁটাহাঁটি করছে!” অর্ণব একটু ভয়ে ভয়েই বলে, “অ্যাকচুয়ালি স্যার, আপনি ল্যাবের ট্রলির ওপরে শুয়ে আছেন৷ ওটার চাকাগুলোই নড়াচড়া করছে।”

“হোয়াট। ট্রলি? মানে ডেডবডি ক্যারি করার ট্রলি!”

সে প্রায় তড়াক করে লাফ মেরে নীচে নামল। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আহেলির দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস্ মুখার্জি! আপনি এতক্ষণ ধরে আমায় মড়ার ট্রলিতে ফেলে রেখেছেন!”

“কী করব?” সে নিস্পৃহভাবে বলে, “আপনি এতটাই ছোটখাটো মানুষ যে আমার টেবিলে রাখা যাচ্ছিল না। ইনফ্যাক্ট মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজতে হচ্ছিল আপনাকে। অন্য অপশন পেলাম না বলে…!”

“তাই বলে ডেডবডির ট্রলি!” অধিরাজ আহতস্বরে বলে, “আপনি জ্যান্ত মানুষকে স্রেফ মেরে ফেলে দিলেন?”

আহেলি কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। তারপর গরগর করে উঠে বলল, “তাহলে কি পোস্টমর্টেম টেবিলে ফেলে রাখতাম? সেটা বেশি ভালো লাগত আপনার? এখানে ওটা ছাড়া আর কোনো কিং সাইজ বেডের অপশন নেই।”

একে বলে বডিলাইন বোলিং। অধিরাজ উত্তর খুঁজে না পেয়ে চেপে গিয়ে বলল, “ধুত্তোর। ক-টা বাজে এখন? আরে, আমার ঘড়ি কোথায়?”

যথারীতি নিজের কব্জিতে ঘড়ি দেখতে না পেয়ে সে বিরক্ত হয়ে উঠেছে। অর্ণব নীরবে তার দিকে রিস্টওয়াচ আর ফোনটা এগিয়ে দেয়। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটার নির্দেশ একঝলক দেখে নিয়ে আবার অস্থির হয়ে বলল, “আমার মাথায় কি তোমরা মা গঙ্গাকে চাপিয়ে দিয়েছ? মাথা থেকে খালি জল গড়াচ্ছে কেন? আমি কি গঙ্গাধর শিব যে জটায় আস্ত নদী ধরে রেখেছি? একটু অফ হয়ে গিয়েছিলাম বলে যা খুশি তাই করবে। একেই মড়ার ট্রলি, তার ওপর ওঁ গঙ্গা। হচ্ছেটা কী? চোখের ওপর তুলসীপাতাও চাপিয়ে দাওনি তো? ধূপ-টুপ…? ট্রলি থেকে কি চিতায় শুইয়ে দেওয়ারও প্ল্যানিং ছিল?”

অসহ্য বদমায়েশ লোক। যা খুশি তাই বলে চলেছে! আহেলির মনে হল, এ ব্যাটাকে চেপে ধরে ফের ক্লোরোফর্ম শুকিয়ে দেয়। যতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল, ততক্ষণ কী সুন্দর নিষ্পাপ শান্ত শিশুর মতো ছিল। যেই চোখ খুলেছে, তারপর থেকেই সবার হাড় ভাজা ভাজা করতে শুরু করেছে। অনেকসময় ক্লোরোফর্মের এফেক্টে এরকম অস্থির লাগে। মাথা টলমল করে, বমি বমি লাগে, শরীরটা অবসন্ন মনে হয়। সে জানে, হয়তো ভেতরের সেই অসুস্থতাটাই এরকম মুড সুইং আর খিটখিট করার কারণ। তার ওপর ব্যথা তো আছেই। সেটা মুখে বললেই তো হয়। লাফালাফি করার দরকার কী? ভাঙবে তবু মচকাবে না। সে দাঁত কিড়মিড় করে একটা টাওয়েল ছুড়ে মারে, “দয়া করে মাথা মুছে নিয়ে আমায় উদ্ধার করুন। আর অত মাথা গরম করার দরকার নেই। এই এফেক্টটা ঘণ্টা দুয়েক থাকবে। এর মধ্যে কিছু খাবেন না এবং লাফালাফি করবেন না।” তার কথাটা অগ্রাহ্য করেই তোয়ালে দিয়ে ভেজা মাথা, মুখ ভালো করে মুছে নেয় অধিরাজ। তারপর অর্ণবের দিকে তাকায়, “তোমায় মিস্ দত্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছেন? বার্নিং শিখের আর কোনোরকম মুভমেন্ট?”

“হ্যাঁ স্যার।” সে বলল, “আমি মিস্ মুখার্জিকে দিয়েও দিয়েছি। কালকের পর থেকে এখনও পর্যন্ত বার্নিং শিখের কোনোরকম সাড়াশব্দ নেই। সব চুপচাপ।”

“সাড়াশব্দ খুব শীগগিরিই পাওয়া যাবে অর্ণব।” অধিরাজ ঘড়িটা দ্রুত নিজের কব্জিতে পরতে পরতে বলল, “আজ স্লগ ওভার। হয় এস্পার-নয়-ওস্পার। কোনো-না-কোনো ঘোটালা উনি করবেনই। নষ্ট করার মতো সময় নেই। মিস্ বোসের কী অবস্থা?”

“উনি ফর্মে ফিরেছেন।” পবিত্র জানাল, “আমি দায়িত্ব নিয়ে আচ্ছা করে ঝেড়ে দিয়েছি। একটু পরেই ওঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে…।”

“উঁহু…উহু…!” সে এবার মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, “এখনই না। বরং হসপিটালে ফোন করে বলো, ওঁকে যেন এখনই ডিসচার্জ না করে। আর পারলে চৌধুরী পরিবারের সঙ্গেই আই.সি.ইউ.-তে শিফট করে দেয়।”

“আই.সি.ইউ.-তে?” পবিত্র একটু অবাক, “কিন্তু ওঁর তো হার্ট অ্যাটাক হয়নি, বরং উনি নিজেই মূর্তিমান হার্ট অ্যাটাক! মিস্ বোস আই.সি.ইউ.-তে গেলে খোদ আই.সি.ইউ.-কেই আই.সি.ইউ.-তে রাখতে হবে।”

তার ডায়লগ শুনে অধিরাজ কটমট করে তার দিকে তাকাল। সে নিজেকে সামলে নেয়, “আরে, চটছ কেন? বলে দিচ্ছি তো। হঠাৎ করে এত রেগে যাচ্ছ কেন?”

“কারণ আমার হাতে সময় নেই।” সে জলে ভেজা অবিন্যস্ত চুলগুলোকে আঙুল দিয়ে ভদ্রস্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। টাওয়েলটা বিদ্যুৎগতিতে প্রায় আহেলির মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলল, “আমি এখনও ভুলতে পারছি না যে অকুস্থলে তুমি উপস্থিত ছিলে, আমিও ছিলাম। মিস্ বোস আগে থেকেই ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। লোকটা ওখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, আর ত্রিসীমানায়ও আসেনি। অথচ গ্যাসটার আবির্ভাব একেবারে মোক্ষম সময়েই ঘটল। কীভাবে? কেউ ওটাকে ইনসার্ট করেনি, ওখানে কোনো লুপহোল ছিল না, তবে আমাদের সবাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে এল কোথা থেকে? যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি, ততক্ষণ আমার শান্তি নেই। চলো, ক্রাইমসিনে আর একবার যেতে হবে। ভালো করে দেখা দরকার….!”

বলতে বলতেই সে গটগট করে এগিয়ে যায়। বাকি তিন অফিসার সভয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। উত্তেজনার চোটে স্যার খেয়ালই করেননি যে এই মুহূর্তে তিনি ঠিক কী পরে আছেন। কেউ মনে করিয়ে দেওয়ার সাহসও পাচ্ছে না। অধিরাজ কিছুটা এগিয়ে গিয়েই খেয়াল করল যে বাকি তিনমূর্তি তখনও পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে একটু অবাক হয়েই বলে, “তোমাদের আবার কী হল?”

টুইঙ্কল এবার মিউমিউ করে ওঠে, “স্যার, আপনি ড্রেসটা তো আগে পরে নিন। তারপর না হয় যাওয়া যাবে।”

“ড্রেস পরে নেব মানে!” সে চোখ কপালে তুলেছে, “আমার গায়ে তো গরম কিছু একটা আছে। এটা তবে কী..!”

বলতে বলতেই অধিরাজ গায়ে হাত রেখে আহেলির শালটা আবিষ্কার করেছে। বলাই বাহুল্য তার সঙ্গে নিজের শোচনীয় অবস্থাটাও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। ক্রোধ, বিস্ময় ও বিরক্তিতে সে কিছু বলতেই যাচ্ছিল। তার আগেই মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। চোখটা কয়েকমুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে হঠাৎই যেন কাটা কাটা কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি সরে সরে গেল! ফের মস্তিষ্ক তার সঙ্গে কোনো উদ্ভট খেলায় মেতেছে। শালটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। এটাকে এত চেনা চেনা লাগছে কেন? মনে হচ্ছে কোথাও বুঝি দেখেছে। ঠিক স্পষ্ট নয়… কিন্তু এটাই নিঃসন্দেহে।… কোথায়?…কখন?…

অধিরাজকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে শালটা জরিপ করতে দেখে অর্ণবের সন্দেহ হল। উনি কি কিছু বুঝতে পেরেছেন? সে একটু গলা খাঁকারি দেয়, “স্যার?”

“উ?” অর্ণবের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেয়ে সে ফের রেগে গেল। এবার তার দৃষ্টি আহেলির দিকে ফিরেছে। রীতিমতো জুলিয়াস সিজারের এক্সপ্রেশন দিয়ে বলল, “মিস্‌ মুখার্জি। হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস? আনবিলিভেল!”

আহেলি তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অর্ণবের উদ্দেশ্যে বলল, “সি। আপনাকে আমি আগেই বলেছিলাম। মার্ডারটা অ্যালিয়েন এসে করলেও এফ.আই.আর-টা উনি ঠিক আমার নামেই লিখবেন। দেখেছেন? প্রমাণিত সত্য!”

বেগতিক দেখে অর্ণবই এবার দুই যুযুধান পক্ষের মাঝখানে সাদা পতাকা দেখাল, “স্যার, উনি কিছু করেননি। আপনার শার্ট আর কটস উল একেই রক্তে ভিজে গিয়েছিল। তার ওপর ও দুটো থাকলে স্টিচটা দেওয়া যাচ্ছিল না। ব্লাড লস হচ্ছে দেখে আমরাই সব রিমুভ করেছি। আবার পরিয়েও দিতাম। কিন্তু তার আগেই…!”

“ওকে। ফাইন।” সে আর কথা বাড়াল না। শুধু জিজ্ঞাসা করল, “জামার সেট কোথায়?”

“আমি আসার সময়ই ব্যুরো থেকে নিয়ে এসেছি। আমার ব্যাগে আছে। আপনি চেঞ্জ করে নিন।”

অধিরাজ বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট না করে চেঞ্জ করার জন্য চলে গেল। অর্ণব হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। জামাকাপড় নিয়ে লোকটার খুঁতখুঁতানি এমনই বাতিকের পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মাঝেমধ্যে অবুঝের মতো কাজ করেন। তাও ভালো, তাড়া আছে বলে বিশেষ কথা বাড়াননি। বাধ্য ছেলের মতোই ওয়াশরুমে ঢুকে গিয়েছেন।

অর্ণবের সাত খুন মাফ! আহেলি মনে মনে গরম হলেও মুখে কিছু বলল না। বরং যে টাওয়েলটা অধিরাজ তার দিকে ছুড়ে মেরেছিল সেটাকে নিয়েই চলে গেল নিজের লকারের দিকে। তোয়ালেটা থেকে এখনও হালকা সিগারেট, পারফিউম আর কোনো নাম-না-জানা বিদেশি শ্যাম্পুর গন্ধ আসছে। সঙ্গে কিছুটা ঘামের সৌরভ। এই সম্মিলিত গন্ধটা অধিরাজের কাছে দাঁড়ালেই পাওয়া যায়। অদ্ভুত মাদকতা আছে এই সুবাসে। ভীষণ পুরুষালিও। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে তোয়ালেটাকে সযত্নে ভাঁজ করে নিজের পার্সোনাল লকারে চালান করে দিল। এটা এখন আর কোনো কাজে ব্যবহৃত হবে না!

বাকিরা কেউ লক্ষ্য না করলেও অর্ণবের সতর্ক চোখ পুরোটাই লক্ষ করেছে। সে মনে মনে একটু হাসলেও গোটা ঘটনাটাই চেপে যায়। এখন যা অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তাতে এ হিসেব আপাতত তোলাই থাক। যত সময় শেষের পথে যাচ্ছে, ততই খেলাটা বিপজ্জনক থেকে বিপজ্জনকতর হয়ে উঠছে। তবু বার্নিং শিখের কাজের প্যাটার্ন দেখে বোঝা যায় যে সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত অবধি তার অ্যাকটিভিটি তুলনামূলক কম। আজ শেষ দিন। এই ক-ঘণ্টায় সে কী করবে জানা নেই। দিনের বেলায় অতটা ভয়ও লাগছে না। কিন্তু সূর্যাস্তের পর ঠিক কী হবে সেটাই ভেবে বেশি চিন্তা হচ্ছে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে কোনো কথা খরচ না করে অধিরাজ স্ট্রেট বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই থমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আহেলির দিকে তাকাল সে। একটু কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “মিস্ মুখার্জি, আমি যে ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্যাম্পল্‌ আপনাকে দিয়েছিলাম, পবিত্র-র আনা ওয়েপনে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে আর অর্ণব যে স্যাম্পল্‌ এইমাত্র দিল, সেগুলো মিলিয়ে দেখতে আপনার কতক্ষণ লাগবে?”

“দশটা এগারোটা নাগাদই রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।” আহেলি গোমড়া মুখে বলে, “ডি.এন.এ.-টা টাইম লাগবে।”

“ডি.এন.এ.-র থেকেও আপাতত একটা অন্য কাজ বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।” অধিরাজ তার দিকে আঙুল তুলে বলল, “আপাতত আমি মিস অরোরাকে নিয়ে যাচ্ছি কারণ আপনার সঙ্গে আরও একজন রয়েছেন। তিনি সম্ভবত বাইরে। তাঁকে ভেতরে ডেকে নিন। ডি.এন.এ. ছাড়ুন, জাস্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর ব্লাডট্রেসটা দেখুন। এগারোটার মধ্যে সব কাজ শেষ করে পেট ভরে লাঞ্চ করে নেবেন। কারণ তারপর কখন আপনার খাওয়া জুটবে তা বলতে পারব না। ঠিক বারোটায় আমি আসব আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রেডি থাকবেন।”

“অ্যাঁ? কী।”

আহেলির চোয়াল ঝুলে পড়ল। সে আবার কী! বারোটায় কোথায় নিয়ে যেতে আসবেন উনি? আর খাওয়াই বা জুটবে না কেন? কিন্তু তার প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই পেটেন্ট উদ্ধতভঙ্গিতে গটগটিয়ে চলে গিয়েছে অধিরাজ। একেবারে আঙুল তুলে হুকুম করে গেলেন নবাবজাদা! কোনোরকম অনুমতি বা উত্তরের জন্য অপেক্ষাও করেননি। অ্যাটিটিউড দেখো! যেনো জাঁহাপনা বাদশা আকবর চলেছেন। মগের মুলুক।

সে নিজের মনেই গরগর করতে করতে শালটা এবার নিজের গায়ে পেঁচিয়ে নেয়। এটা থেকেও এখন অধিরাজের দেহের সৌরভই আসছে। সেই সুগন্ধের উষ্ণ ওম নিতে নিতেই আপনমনেই বলল, “টেরা হ্যায়, পর…!” বাকিটা সকলেই জানে। মেরা হ্যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *