(১৯)
“আপনার কি মনে হয় না যে আজকের যে মারাত্মক ব্লান্ডারটা করেছেন, তারপর আপনার এই কেস থেকে সরে যাওয়া উচিত?”
“স্যার… আপনি হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের ট্যাঙ্কারের ওপর কী ভেবে র্যান্ডম ফায়ার করছিলেন? বারোহাজার লিটারের তেলের কন্টেনার ছিল ওটা। বুলেটের ঘর্ষণের ফলে অনেক সময় স্পার্ক হয়। আপনার ধারণাও আছে ঐ সামান্য স্পার্কেই কী ঘটতে পারত?”
“অফিসার সরকার, আজ আপনার হিরোইজমের ধাক্কায় কয়েকশো মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছিল। এই হঠকারিতাকে কীভাবে জাস্টিফাই করবেন? এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?”
“আপনি কি রিজাইন দেবেন?”
একের পর এক বাক্যবাণ ছুটে আসছে। সি.আই.ডি. ব্যুরোর সামনে আবার ভিড় জমিয়ে ফেলেছে রিপোর্টাররা। ট্র্যাফিক সিগন্যালের সিসিটিভি ফুটেজে, উপস্থিত জনতার মোবাইলে ধরা পড়া অর্ণবের হঠকারি ফায়ারিঙের ভিডিও এইমুহূর্তে সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। জনগণ হাঁ করে দেখছে এক অফিসারের নির্বুদ্ধিতার মাশুল কীভাবে আর একটু হলেই গোটা শহরকে গুনতে হত। এক লিটার, দু-লিটার নয়, বারোহাজার লিটার তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর ফায়ারিং করার অর্থ প্রায় অবশ্যম্ভাবী বিস্ফোরণ! ভিডিও ফুটেজে এটাও দেখা যাচ্ছে যে কীভাবে অধিরাজের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় ট্যাঙ্কারটাকে থামানো গিয়েছিল, এবং কীভাবে সে প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে ঐ জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারটার গতিমুখ ঘুরিয়ে দিয়ে পুরো গাড়িটাকেই জলে ফেলে দিয়েছে। মাত্র এক কি দেড় মিনিটের ফুটেজ। বাস্তবেও যা ঘটেছিল তা ঐ সময়ের মধ্যেই হয়েছে! ঐ এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারত। ঘটেনি, এটাই মিরাকল! কিন্তু এই গোটা ব্লান্ডারটার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে একজনই অপরাধী, যাকে তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর মুর্খের মতো ফায়ারিং করতে দেখা যাচ্ছে! অফিসার অর্ণব সরকার।
অর্ণব কী বলবে বুঝতে পারছিল না। এমনিতেই সে মরমে মরে আছে। বারবার নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করে চলেছে। পবিত্রও তাকে ছাড়েনি। অধিরাজের বারণ করা সত্ত্বেও সে আপাদমস্তক ঝেড়েছে অর্ণবকে। বলেছে, “আমাদের মাথায় কি গাধা লেখা আছে? আমরাও ঐ গাড়ির পেছন পেছন দৌড়চ্ছিলাম, অথচ বার্নিং শিখকে সামনে পেয়েও একবারও ফায়ার করিনি। সেটা কি এমনি এমনিই, না আমাদের গানগুলোয় জং পড়েছিল? টুইঙ্কল অরোরার মতো মারকুটে অফিসার, যিনি কথায় কথায় ঘুষি মেরে, তোড়ফোড় করে বসে থাকেন, সেই লেডি সিংঘমও যখন তোমাকে চিৎকার করে বারণ করছিলেন, তখনও তোমার মাথায় ঢোকেনি যে এই ‘অ্যাকশন লেডি’ শ্যুট করতে বারণ করছেন কেন? হোয়াটস গটেন ইন টু ইউ অর্ণব? কী প্রমাণ করতে চাও?”
অর্ণবের কাছে কোনো জবাব নেই। কী জবাব দিত সে? কী বলত? টুইঙ্কল অরোরার দিদিগিরিকে যে সে ঐ মুহূর্তে চরম ঘৃণা করছিল, তা কি আদৌ বলা যায়? অর্ণব যে ঐ মহিলাকে একটুও বিশ্বাস করছে না, কিংবা তার মেল ইগো একজন মহিলার বসিং মেনে নিতে পারেনি, এই কথা সে মরে গেলেও কাউকে বলতে পারবে না। অর্ণব জানে যে সে চূড়ান্ত বোকামি করেছে, কিন্তু তার পেছনের পাহাড়প্রমাণ অবিশ্বাস কাকে দেখাবে। কেউ বুঝবে না, যে প্রতি মুহূর্তে কী প্রচণ্ড সন্দেহে ও নিরাপত্তাহীনতায় সে পেন্ডুলামের মতো দুলছে। নিজেরই কলিগ কিংবা খবরিদের মধ্যে শিখ প্রজাতির নাম শুনলেই যে আঁতকে উঠছে, তা কি আদৌ প্রকাশ করা যায়।
তাই নিজের মধ্যে নিজেই আত্মগ্লানিতে গুমরে গুমরে মরছিল সে। ইতিমধ্যেই খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে গিয়েছে সর্বত্র। কানে গিয়েছে এডিজি শিশির সেনেরও। তিনি ঘটনার পনেরো মিনিটের মাথাতেই অধিরাজকে ফোন করে রীতিমতো উত্তেজিত গলায় বলছিলেন, “ব্যানার্জি, এটা কী হল। হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের ফুয়েল ট্যাঙ্কের ওপর অর্ণব সরকার কোন্ বুদ্ধিতে ফায়ার করছিল? কিছু হয়ে গেলে আমি ওপরমহলকে কী জবাব দিতাম। আর একটু হলেই আমায় রিজাইন করতে হত, তোমাকেও। হোয়াটস গোয়িং অন?”
অধিরাজ খুব শান্তস্বরেই জবাব দিয়েছিল, “স্যার, বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি।”
“হয়নি, কিন্তু হতে পারত!” তাঁর ধমক ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল, “অন্তত নাইন্টি পার্সেন্ট চান্স ছিল। বার্নিং শিখের চেয়েও তো বেশি ডেঞ্জারাস সরকারের বুদ্ধি দেখছি! ও কি নিজেকে ডেমোলিশন ম্যান প্রুভ করতে চায়? বার্নিং শিখ শুধু নিজের টার্গেটদেরই ওড়ায়, অর্ণব তো গোটা শহরকেই উড়িয়ে দেওয়ার তাল করছে।”
“স্যরি স্যার।” অধিরাজ একটু বিষণ্ণ কণ্ঠেই বলে, “ওটা জাস্ট একটা ভুল ছিল।”
“তুমি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা কোর না ব্যানার্জি।” আবার একটা মোক্ষম ধমক, “ওটা ভুল নয়, ক্রাইম। আরে প্রকাশ্য রাস্তায় অয়েল কন্টেনারের ওপর ওর র্যান্ডম ফায়ারিঙের স্টুপিড ভিডিও সর্বত্র ছড়িয়ে গিয়েছে। আমাকেও তো কাউকে না কাউকে জবাব দিতে হয়। ঐ ঘটনার পর থেকে ওপরমহল আমার গর্দান নেওয়ার তাল করছে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফোন ঢুকছে। প্রত্যেকেরই বক্তব্য যে ওটা মেইন রোডের ওপর একটা বিরাট পেট্রোলপাম্পের একদম কাছে ছিল। বার্নিং শিখ যদি নিজেই কন্টেনারটাকে আগুন লাগিয়ে দিত তবে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু ও নিজে আদৌ সে চেষ্টা করেনি, বরং সরকার এই স্কোপটা ওকে জাস্ট রসোগোল্লার মতো প্লেটে তুলে দিয়েছে। এই ইডিয়টিক কার্যকলাপকে তুমি ‘ভুল’ বলে জাস্টিফাই করছ! বাচ্চা ছেলে নাকি যে ভুল করে তেলের শিশি ভেঙে ফেলেছে।”
“আই অ্যাম স্যরি স্যার।”
এবার যেন এডিজি সেন একটু শান্ত হলেন। তাঁর গলা সামান্য খাদে নামল, “তুমি নিজে যদি এই ব্লান্ডারটাকে সামাল না দিতে তবে আমি জানি না কী হত। মাথায় রেখো, তোমার আন্ডারে যারা আছে তাদের উলটোপালটা স্টেপের দায় কিছুটা হলেও তোমার ওপরও বর্তায়। তেমন বুঝলে সরকারকে বসিয়ে দাও। কিন্তু এরকম ব্লান্ডার আমি দ্বিতীয়বার দেখতে বা শুনতে চাই না।”
অধিরাজ ফের শাস্তভাবেই বলল, “ওকে স্যার…!”
শিশির সেন প্রায় দড়াম করেই ফোনটা কেটে দিলেন। যেভাবে উঁচু স্বরে তিনি কথা বলছিলেন, তাতে অর্ণবের ওঁর প্রত্যেকটা কথা শুনতে বা বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি। তার ফর্সামুখ কালো হয়ে গিয়েছে। একেই মরমে মরে আছে, তার ওপর শিশির সেনের ভর্ৎসনা! অর্ণব যতবার সেই মুহূর্তটাকে মনে করেছে, বারবার নিজেই শিউরে উঠেছে। নির্বোধের মতো কী মারাত্মক ভুলটাই না সে করেছিল। তার মনে হচ্ছিল, ঐ এক্সপ্লোশনটা যদি সত্যি সত্যিই হত, আর সেই আগুনে শুধু সে একাই ছারখার হয়ে যেত, তবে বোধহয় সবচেয়ে ভালো হত। অন্তত প্রতিমুহূর্তে এমন তিলে তিলে মরতে হত না।
বার্নিং শিখের সঙ্গে এনকাউন্টারে পবিত্র এবং টুইঙ্কল, দু-জনেই সামান্য ইনজিওর্ড হয়েছিল। টুইঙ্কল আপাতত ফরেনসিক ল্যাবে চলে গিয়েছে। আহেলিই তাকে মেরামত করে দিতে পারবে। পবিত্র এতটাই বিরক্ত যে সে প্রথমে নিজের ইনজুরির কেয়ারই করছিল না। তাকে ধরে বেঁধে একটা হসপিটালের ওপিডিতে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক শুশ্রূষা করে ছেড়ে দিয়েছে ওরা। আপাতত সে ফের মিস্ বোস এবং পি সি চৌধুরীর পরিবারকে পাহারা দিতে নিজের ঘাঁটিতে ফিরেছে। পি সি চৌধুরী এবং ওঁর পরিবার এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে ঐ বুড়ি থুরথুরে কমলার পেটে পেটে এত।
শয়তানিও ছিল। বার্নিং শিখের প্রস্থেটিক মেক-আপের নমুনা দেখে ওঁরা প্রত্যেকেই ভয়াবহ আতঙ্কে আছেন। ওঁদের অবস্থা দেখে অ্যাটম বম্বের দাপটে বিধ্বস্ত হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা মনে পড়ে যায়। একটা গোটা বাড়িতে শুধু নিস্তব্ধতাই বিরাজ করছে। প্রত্যেকেই বুঝি কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। কে জানে, কোথায় ওঁত পেতে আছে আততায়ী। দেওয়ালেরও কান আছে। এমনকি নিজেদেরই ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছেন ওঁরা। অধিরাজ নির্দেশ দিয়েছে, কোনোমতেই যেন চৌধুরী পরিবার আজ কমলার রান্না করা খাবার না খায়। মিস্ বোস জানিয়েছেন, অসুবিধে নেই। তিনি কাজ চালানোর মতো রান্না করে ফেলতে পারবেন। তবে বাড়ির লোকেরা আদৌ আজ কিছু মুখে তুলতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।
“পবিত্র।” অধিরাজ একটু অন্যমনস্ক, “আমার মনে হয়, যতক্ষণ না সবাই খাওয়ার পাট চুকিয়ে বেডরুমে ঢুকবেন, ততক্ষণ কিছু হওয়ার চান্স নেই। মিস্ বোস তোমায় যে মুহূর্তে সিগন্যাল দেবেন যে ওঁরা ঘুমোতে যাচ্ছেন, সেই মুহূর্ত থেকে তুমি একদম বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। দেখবে কেউ ঐ বাড়ির ধারেকাছে আসে কিনা। আর মিস্ বোসের জামায় লাগানো স্পাইক্যামটাকে নিজের মোবাইলেও কানেক্ট করে নেবে। ভেতরের দৃশ্য ও বাইরের পরিস্থিতি, দুটোই লাগাতার মনিটর করতে থাকবে। বাড়িটার আশেপাশে রাউন্ড দিতে থাকবে। আজকে আমিও ওখানে যাব। যতক্ষণ না পৌঁছচ্ছি, ততক্ষণ হেতালের লাঠি নিয়ে চাঁদ সদাগরের মতো সতর্ক পাহারায় থাকবে। আজকের রাতটা ভীষণ বিপজ্জনক।”
“তোমার মনে হয় এখান থেকে তাড়া খাওয়ার পরও ও মাল আবার ফিরবে?” পবিত্র চোখ কপালে তুলে ফেলে, “আমার তো মনে হয়েছিল, ও আর এদিকে আসবেই না!”
“ভুল ভাবছ।” অধিরাজ মাথা নাড়ে, “ওর হাসিটা আমাকে এখনও হন্ট করছে। যদি কোনোক্রমে প্ল্যান ‘এ’ বানচাল হয়েও যায়, ও পাবলিক নির্ঘাত প্ল্যান বি‘র বন্দোবস্তও করে রেখেছে। আজ রাতে কোথাও-না কোথাও অ্যাটাক হবেই। কারণ যত ওর হাতে সময় কমবে ও তত বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। সুতরাং যতক্ষণ না আমি পৌঁছচ্ছি, ও বাড়ির ওপর থেকে নজর সরাবে না। আর কোনোরকম গোলমাল দেখলেই স্ট্রেট ভেতরে ঢুকে যাবে। আমার অপেক্ষা করবে না। ক্লিয়ার?”
“ওকে বস।”
পবিত্র আর কথা না বাড়িয়ে ফিরে গিয়েছে নিজের ঘাঁটিতে। তারপরই মিস্ দত্তকে ফোন করে আপডেট নিল অধিরাজ। আত্রেয়ী প্রথমেই একটু উদ্বিগ্ন হয়ে ওদের সবার খবর নিল। জ্বলন্ত ট্যাঙ্কারের ফুটেজ সে-ও দেখেছে। ভূপেন্দ্র দত্তা’র বাড়িতেও মোটামুটি সবই ঠিকঠাক চলছে। ওঁদের কাছেও অর্ণবের গুলি চালানোর ভিডিও এবং বার্নিং শিখের কীর্তির খবর পৌঁছে গিয়েছে। সকাল থেকেই সবার মানসিক পরিস্থিতি খারাপ ছিল, এখন আরও শোচনীয় দশা!
“আপনার মিশন ফিঙ্গারপ্রিন্টের কোনো আপডেট?”
আত্রেয়ী সপ্রতিভভাবে জানায়, “ইয়েস স্যার। চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুরোপুরি সাকসেসফুল হইনি। শ্রীদর্শিনীর হাতের ছাপ পাওয়াই যায়নি। তার কারণ সে দুই হাতে ভয়াবহ মেহেন্দি করে বসে আছে। ওদের শ্যুটিং এ হয়তো কোনো বিয়ের দৃশ্য বা এপিসোড আছে। সেইজন্যই একদম তাজা তাজা মেহেন্দি লাগিয়েছে। ওদের বাড়িতে একটু মধুর খোঁজে গিয়েছিলাম। আমি শুনেছি শ্রী’র রোজ সকালে মধু আর লেবুজল খাওয়ার অভ্যাস আছে। কিন্তু শুনেই সে মুখ হাঁড়ি করে নিজের দুই হাত দেখাল। ঐ অবস্থাতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুই দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমিও চাপাচাপি না করে ফিরে এলাম। তবে তার কিছুক্ষণ পরেই দেখি প্রিয়দর্শিনী মিঃ দত্তার বাড়িতে এসে উপস্থিত। ভদ্রমহিলা দেখলাম একটা কাচের বাটিতে করে অনেকখানি মধু নিয়ে এসেছেন। আমিও সুযোগ পেয়ে বাটিটা নিয়ে কিচেনে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট খুঁজে দেখেছি স্যার। প্রিয়দর্শিনীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে। স্যাম্পলও তুলে নিয়েছি।”
“গ্রেট জব মিস্ দত্ত!” সে বলল, “আর কারোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেলেন?”
“তিতলিরও পেয়েছি। প্রিয়দর্শিনী আর তিতলির ফিঙ্গারপ্রিন্ট আপাতদৃষ্টিতে নৰ্মাল। কিন্তু গুরশীলের কেসটা গোলমেলে।”
“মানে?”
“গুরশীলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেয়েওছি আবার পাইওনি।”
“সে কী!” অধিরাজ চোখ কপালে তুলে ফেলেছে, “একইসঙ্গে দুটো কী করে হয়?”
“জানি না স্যার। তবে ওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট একদম ফাঁকা! আঙুলের কোনো রেখাই নেই। সব রেখা বেমালুম হাপিশ!”
অধিরাজের মুখ গম্ভীর, “হুম। বুঝলাম। আর?”
‘কোকিলার কাছে একগ্লাস জল চেয়েছিলাম। সে আবার তখন বাসন-কোসন নিয়ে ভারি ব্যস্ত। জলের গ্লাস দিল ঠিকই, কিন্তু হাতভরতি ডিটারজেন্ট সাবানের ফেনা।”
“বুঝলাম। তার মানে তার ফিঙ্গারপ্রিন্টও আসেনি।” সে হতাশ, “যাকগে, ছেড়ে দিন। বেশি জোর করলে আবার সন্দেহ করবে। বাট স্টিল, গ্রেট অ্যাটেম্পট। ওঁদের সবার ছবি পাঠাতে বলেছিলাম, পাঠিয়েছেন কি?”
“হ্যাঁ স্যার, অনেক আগেই হোয়াটসঅ্যাপ করে দিয়েছি। দেখেননি?”
“সুযোগ পাইনি মিস্ দত্ত। ব্যুরোয় ঢুকে ভালো করে দেখব।” অধিরাজ বলল, “থ্যাংকস এগেইন।”
ব্যুরোয় ঢোকার আগে বিশ্বজিতের কাছেও আপডেট চাইল সে। বিশ্বজিৎ জানায় যে যে গুলশন সিং ধিলোঁর নম্বরটা আপাতত আর অ্যাকটিভ নেই। তার নম্বরটা দিল্লির হলেও লাস্ট লোকেশন কলকাতাই দেখাচ্ছে। কলেজ স্কোয়ারে লাস্ট ঐ নম্বরের ট্রেন্স পাওয়া গিয়েছে। তারপর থেকেই সুইচড অফ। প্রি-পেইড সিম। ঐ নম্বর থেকে মাত্র একটাই কল গিয়েছে। সেটা জগদীপ সিং ভাট্টিকে করা হয়েছে। এরপর ইউজার ঐ নম্বরটিকে আর ইউজ করেনি। তাই ওটাকে ট্রেস করা অসম্ভব। “আর দ্বিতীয় নম্বরটা?”
বিশ্বজিৎ হাসল, “ওটা অলরেডি হ্যাকড। ওঁর কল ডিটেইলস রেকর্ডে বিশেষ কোনো সন্দেহজনক নম্বর বা সন্দেহজনক অ্যাকটিভিটি নেই। একটু আগেও উনি হানি সিং এর গান শুনছিলেন। আপাতত ডেন্টিস্টের চেম্বারে গ্যারাজ হয়েছেন। এখন ওঁর মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে ডেন্টিস্ট কিছু করছেন, এইটুকুই দেখতে পাচ্ছি।”
“ফাইন। গুডওয়ার্ক বিশ্ব। সন্দেহজনক কিছু পেলে জানিও।”
“ডেফিনিটলি।”
ততক্ষণে ব্যুরোর কাছে ওদের গাড়ি চলে এসেছে। রিপোর্টারদের ভিড় দেখে অর্ণব নিজেই কুঁকড়ে যাচ্ছিল। অধিরাজ বিরক্ত হয়ে বলে, “এদের একটা করে তাঁবু কিনে দেওয়া উচিত। ব্যুরোর সামনেই পেতে বসে থাকলে পারে! সবসময়ই ভিড় লাগিয়েই রেখেছে।”
রিপোর্টাররা ওরা গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের এবারের টার্গেট অর্ণব সরকার। তাকে দেখেই একরকম ধেয়ে এল ওরা। সঙ্গে চোখা চোখা বাক্যবাণ। অর্ণব মাথা হেঁট করে চুপ করে সব শুনছে। কোনোমতে মাথা বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রিপোর্টাররা তার রিজাইন চাইছে, হঠকারিতার পেছনের কারণ জানতে চাইছে, বলছে যে এই কেস থেকে তার সরে যাওয়া উচিত। অধিরাজ তার হাত ধরে টান মারল। একটু রুক্ষ স্বরেই বলল, “চলো অর্ণব। এখানে দাঁড়িয়ে প্রলাপ শোনার কোনো মানে হয় না!”
“প্রলাপ!” একজন রিপোর্টার উত্তেজিত হয়ে ওঠে, “আপনি এই চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে সাপোর্ট করছেন? একটা আস্ত তেলের ট্যাঙ্কারকে কি উনি বেলুন পেয়েছেন যে দুমদাম গুলি মারবেন? এরপরও কি আপনার মনে হয় না যে ওঁকে সাসপেন্ড করা উচিত?”
এইবার অর্ণবকে পেছনে রেখে, তাকে একরকম গার্ড করে উদ্ধতভঙ্গিতে দাঁড়াল অধিরাজ, “অফকোর্স মনে হয়। আপনারা চাইলে এখনই অফিসার সরকারকে সাসপেন্ড করতে পারি। কিন্তু একটা শর্তে। আপনাদের মধ্যে কোনো একজনকে ওঁর জায়গা নিতে হবে। কারণ বার্নিং শিখের পেছনে এখন গোটা সি.আই.ডি. হোমিসাইডই দৌড়চ্ছে। সে অফিসারদের, খবরিদের এমনকি ফরেনসিক এক্সপার্টদের বাড়ির লোককেও ধরে ধরে কচুকাটা করছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, অফিসার কম পড়ছে। তারাও সবাই এখন সাহস পাচ্ছেন না। একজনকে বসিয়ে দিলে অন্য একজনকে তার জায়গা নিতে হবে। সেটা আপনাদের মধ্যে কে নেবেন? কেউ ভলান্টিয়ার হতে ইচ্ছুক? বার্নিং শিখের সঙ্গে সরাসরি পাঙ্গা নেওয়ার সাহস আছে আপনাদের কারোর?”
রিপোর্টাররা এবার চুপ। প্রত্যেকেই এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কথাটা এভাবে ঘুরে যাবে তা বোধহয় কেউই আশা করেনি। তাদের প্রত্যেককে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে অধিরাজ এবার অর্ণবকে টেনে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, “যাকে ভিলেন বানাচ্ছেন তাকে একবার ভালো করে দেখুন। আপনারা আদৌ জানেন গত চুয়াল্লিশ ঘণ্টায় ওঁর সঙ্গে ঠিক কী কী ঘটেছে? বার্নিং শিখ ওঁকে তিনটে হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড বাল্ব ছুড়ে মেরেছিল। স্রেফ বরাতজোরে রক্ষা পেয়ে গিয়েছেন। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি সে, ওঁর গাড়ির সমস্ত সিস্টেম বরবাদ করে একটা বম্বও ফিট করে দিয়েছিল। অলমোস্ট মরতেই বসেছিলেন উনি। কীভাবে বেঁচেছেন তা শুধু আমরাই জানি। বার্নিং শিখের আবির্ভাবের আনন্দে এক রাতও ঘুমোতে পারেননি, ঠিকমতো একবেলা খাবারও জোটেনি। ওঁর মুখে যে লাল রংটা লেগে আছে, সেটা দোলের আবীরের নয়। উনি মনের আনন্দে মুখে পেইন্টও করেননি। বার্নিং শিখ আমাদের গরম তেল ছুড়ে মেরেছিল, তার সঙ্গে কয়েক মুঠো লঙ্কাগুঁড়োও ওঁর মুখে ছুড়ে মেরেছে। এখনও ওঁর চোখ, মুখ জ্বালা করছে, ঠিকমতো চোখ খুলেও রাখতে পারছেন না! এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও উনি এখনও লড়ে চলেছেন। হ্যাঁ, মানছি যে ভুল হয়েছে। কিন্তু ঐ ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডে যদি কিছুক্ষণের জন্য ওঁর একটা ভুল হয়ে গিয়ে থাকে তবে সেটা কি খুব অন্যায়? ওঁকে বসিয়ে আমি দিতেই পারি, কিন্তু ওঁর জায়গা কি আপনারা নেবেন? নিদেনপক্ষে ভলান্টিয়ারগিরি করার সাহসও আছে আপনার? মনে রাখবেন, যে মুহূর্তে আপনি মাঠে নামবেন সেই মুহূর্তেই একটা অ্যাসিড বাল্ব, একটা বম্ব, কেরোসিন আর আগুন কিংবা একটা তরোয়াল-কৃপাণ আপনার কপালে নাচছে।
আমাদের মধ্যে একজনও অফিসার নেই যে অক্ষত আছে। প্রত্যেকেই ইনজিওর্ড। সুতরাং বুঝে নিন, যে কোনো মুহূর্তে, যে কোনো সময়ে আপনার প্রাণটাই যেতে পারে। এখনও আজকের রাত এবং কালকের রাতটা বাকি আছে। তার মধ্যে সবকিছু হতে পারে। বুকের পাটা যদি থাকে তো এগিয়ে আসুন। আমি অফিসার সরকারকে বসিয়ে দিচ্ছি।”
রিপোর্টাররা সবাই নীরব। একজন এবার তুলনামূলক নরম সুরে বলল, “ওটা আপনাদের কাজ স্যার, আমাদের নয়।”
“তাহলে আপনারা আপনাদের কাজটাই করুন। আর আমাদের কাজটা আমাদেরই বুঝে নিতে দিন।”
কথা শেষ করে সে পেছনে তাকাল, “চলো অর্ণব…!”
“কিন্তু যে ঝিলে আপনারা তেলের ট্যাঙ্কারটাকে ফেলেছেন, ঐ ঝিলে প্রচুর মাছ আছে।” একজন গোঁয়ার গোবিন্দ সাংবাদিক বলে উঠল, “এখন ঐ তেল খেয়ে কতগুলো মাছ মারা যাবে, তাদের কী? যিনি ঐ ঝিলে মাছ চাষ করছিলেন, প্রত্যেকটা মাছ তাঁর সন্তানসম। বারোহাজার লিটার তেল তো নষ্ট হলই তার সঙ্গে কতগুলো নিরীহ মাছ মরবে, এটাকে কীভাবে জাস্টিফাই করবেন?”
অধিরাজ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায়, “যিনি মাছ চাষ করছিলেন, অবশ্যই তাঁর কাছে মাছ সন্তানসম। এমনই তাঁর সন্তানস্নেহ যে কিছুদিন পরেই ঐ তথাকথিত সন্তানদের জালে তুলে, কেটেকুটে সাইজ করে তিনি বাজারে পাঠিয়ে দিতেন। মাছেরা অকালে শহীদ হয়ে আপনাদের ও তাঁর উদরপূর্তি করতে পারল না বলে দুঃখিত। বাই দ্য ওয়ে, বিষ মদ খেয়ে মরে যাওয়ার রেট এখন কী চলছে?”
“প্রব্যাবলি তিনলাখ টাকা।”
ভিড় থেকেই নারীকণ্ঠে উত্তর এল। অধিরাজ সেটা শুনে উত্তরদাতার দিকে না তাকিয়েই মাথা ঝাঁকায়, “বেশ। আমরা মাছেদের গার্জিয়ানকে বিষাক্ত তেল খেয়ে তাঁর সন্তানদের অকালমৃত্যুর জন্য ঐ রেটই দিয়ে আসব। সরিও বলে আসব। প্রয়োজনে কচি মাছের বায়োলজিক্যাল মা-বাবারা যদি বেঁচে থাকেন, তবে তাদের কাছেও হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে আসব। দরকার পড়লে সি.আই.ডি. হোমিসাইড খেসারত হিসাবে বাবা মাছ ও মা মাছকে ব্যুরোর অ্যাকোয়ারিয়ামে সাঁতার কাটার চাকরি দেবে। ওকে? হ্যাপি?”
রিপোর্টাররা কে কী বলবে আর বুঝে পায় না। অধিরাজ কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে ফের পেছনে ঘুরতেই যাচ্ছিল হঠাৎই পেছন থেকে সেই নারীকণ্ঠ ডেকে উঠল, “স্যার…. এক মিনিট…!”
সে একটু বিরক্ত হলেও ফের দাঁড়িয়ে পড়েছে, “ইয়েস? আর কোনো প্রশ্ন বা ডাউট?”
রিপোর্টারদের ভিড়কে ঠেলেঠুলে প্রায় বুলডোজারের মতোই এক কমবয়েসি তরুণী সামনে এগিয়ে এল। পোষাক-আষাকে রিপোর্টার বলে মেনে নেওয়াটা একটু কষ্টসাধ্য। তবে চলনে-বলনে স্মার্ট ও বোল্ডনেসের ছোঁয়া। এক ঝলকে বখে যাওয়া কোনো কলেজ-পড়ুয়া মনে হতে পারে। অধিরাজ তার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই মেয়েটি ধপাৎ করে তার সামনে নতজানু হয়ে বসে পড়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবেগকম্পিত কণ্ঠে বলল, “উইল ইউ প্লিজ, ম্যারি মি?”
“হো-য়া-ট!”
এরকম ভয়াবহ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তা অধিরাজ স্বপ্নেও ভাবেনি। সে প্রায় আঁতকে উঠেছে। কয়েকমুহূর্তের জন্য থতোমতোও খেয়ে গেল। অর্ণব ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখল, সাংবাদিকদের পেছনে আরও অনেক তরুণী, যুবতী ভিড় জমিয়েছে। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড। কোনোটায় লেখা ‘অফিসার ব্যানার্জি, টেক মি টু ইয়োর হার্ট”, আবার কোনোটায় ‘ম্যারি মি মিঃ আই জি’, ‘রাজা, আই লাভ ইউ’ টাইপেরও গোটা কয়েক বিপজ্জনক পোস্টার। এতক্ষণ সাংবাদিকদের নাচানাচিতে এবং টেনশনে প্রমীলাবাহিনীর পোস্টার বা প্ল্যাকার্ডগুলো ওদের কারোর নজরে পড়েনি। এতক্ষণে লক্ষ্য করে অর্ণব প্রমাদ গুণল। অধিরাজ তার সামনের নতজানু মেয়েটিকে কিছু বলার আগেই, বা অন্যদের ভালো করে দেখার আগেই সে তাকে একরকম হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে অকুস্থল থেকে কেটে পড়ল। মৃদু স্বরে বলল, “চলুন স্যার।”
ঘটনার আকস্মিকতায় অধিরাজ নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে! কোনোমতে বলল, “অর্ণব। এটা সি.আই.ডি. ব্যুরো না আমরা ভুল করে কোনো ম্যাট্রিমোনিয়াল অফিসে চলে এসেছি! এ সব কী ভুলভাল বকছে!”
“ছাড়ুন না।” অর্ণব তাঁকে টানতে টানতেই ব্যুরোর ভেতরে নিয়ে আসে,
“যত্তসব ফালতু ব্যাপার।”
অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তার পেটেন্ট উদ্ধতভঙ্গিতে গটগট করে হেঁটে চলে গেল। অর্ণবও দ্রুতগতিতে তার পাশে পাশে যাচ্ছিল। যদিও এখনও সে স্বাভাবিক হতে পারেনি। হাতের আঙুল আর পা এখনও অল্প অল্প কাঁপছে। তবু মেয়েগুলোর কীর্তি দেখে গা জ্বলে গিয়েছে তার। আশ্চর্য আবদার ওদের। সবাইকেই কি এখন ধরে ধরে স্যার বিয়ে করবেন! কী ভয়াবহ দুঃসাহস যে বলে ‘টেক মি টু ইয়োর হার্ট।’ বার্নিং শিখের কৃপাণটা হাতের কাছে পেলে নির্ঘাৎ ছুড়ে মারত সে! কতগুলো পাজির পাঝাড়া মেয়ে!
ব্যুরোয় নিজের চেম্বারে ঢুকে শরীরটাকে নিজের চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে আরাম করে বসল অধিরাজ। তারপর অর্ণবকে বলল, “তুমি তোমার মুখের ঐ চিলি পাউডারের মেক-আপ ধুয়ে এসো প্লিজ। দেখো ওয়াশরুমে সাবান, লিকুইড সোপ সবই পেয়ে যাবে। ভালো করে মুখটা ধুয়ে নাও। নয়তো অনেকক্ষণ জ্বালাবে।”
অধিরাজের স্বাভাবিক ও সহজ ব্যবহার দেখে ফের প্রচণ্ড অপরাধবোধ গ্রাস করেছে অর্ণবকে। তার একটা গাড়োলের মতো কীর্তির জন্য কত কথাই না শুনতে হচ্ছে লোকটাকে। আর এখনও সে কী অদ্ভুত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে অর্ণবের সঙ্গে। যেন কিছুই হয়নি। কখনও পবিত্রর সামনে, কখনও এডিজি সেনের কাছে, কখনও মিডিয়ার কড়া প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েও আশ্চর্যভাবে গার্ড করে চলেছে তাকে। সারা রাস্তায় একটিও কড়া কথা বলেনি। একবারও অসন্তোষ প্রকাশ করেনি। তার ক্ষমাসুন্দর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে অর্ণবের মনে হল, এর চেয়ে অধিরাজ তেড়ে তাকে গালাগালি দিলেই বোধহয় সে খুশি হত!
অর্ণব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। কিছু বলাও সম্ভব ছিল না। আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে। চোখে বাষ্প জমছে। অধিরাজের ক্ষমার বোঝা বুঝি তার অপরাধের বোঝার চেয়েও বেশি ভারি। ঠান্ডা জলের ঝাপটা মুখে দিতে-দিতেই সে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে আজ যেন নিজেই চোখ মেলাতে পারছে না। নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হল, এ কোন অর্ণব সরকারকে দেখছে! পবিত্র আচার্য ও শিশির সেনের কথা সম্পূর্ণ সত্যি। তার মধ্যে বোধহয় সত্যিই কোনো অশুভ শক্তি ঢুকে পড়েছে। যে হয়তো বার্নিং শিখে চেয়েও বিপজ্জনক। রিপোর্টাররাও ঠিকই বলেছে। তার রিজাইন দেওয়াই উচিত। ব্যুরোয় ঢোকার সময়ে তার মনে হচ্ছিল, সবাই বুঝি ব্যঙ্গমাখা দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মনে মনে বিদ্রূপও করছে। ভাবছে, অর্ণব সরকারের হিরো হওয়ার শখ হয়েছিল, কিন্তু জিরো হয়ে ফিরে এল। জুনিয়রদের মুখে চাপা বাঁকা হাসিটাও যেন অনুভব করতে পারছিল সে! কিন্তু কাকে বোঝাবে যে কী অদ্ভুত দোলাচলে রয়েছে তার মন। ওরা কেউ বুঝবে না।
বেশ খানিকক্ষণ ধরে নিজের সঙ্গেই একটা অসম লড়াই লড়তে লড়তে শেষে বিধ্বস্ত হয়ে অবশেষে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল অর্ণব। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, অধিরাজ ফের আর একটা সিগারেট ধরিয়েছে। এই কেস উপলক্ষ্যে যে হারে সে স্মোক করতে শুরু করেছে তাতে দিনে হয়তো এবার কম সে কম পাঁচ প্যাকেট সিগারেট লাগবে! কিন্তু কিছু বলারও উপায় নেই। লোকটার মাথার ওপর যে কী ভয়াবহ চাপ আর স্ট্রেসের পাহাড় তা সে উপলব্ধি করতে পারে। তাই মুখে কিছু না বলে চুপচাপ তার সামনের চেয়ারে এসে বসল। অধিরাজও কোনো কথা না বলে তার হাতের ধূমায়িত সিগারেটটা অর্ণবের দিকে এগিয়ে দেয়, “নাও, কাউন্টার টানো।” অর্ণব সবিস্ময়ে তার দিকে তাকায়। সে যে নন স্মোকার তা অধিরাজের অজানা নয়।
তা সত্ত্বেও এভাবে কাউন্টার অফার করার মানে কী!
হালকা লাগছে! তার এতক্ষণের ডিস্টার্বড।
আড়ষ্ট নার্ভগুলোও যেন মুহূর্তের মধ্যে কিছুটা হলেও শান্তি পেল। নিকোটিনের বহু দোষের মধ্যে এই একটাই গুণ। ম্যাজিকের মতো আরাম দিতে পারে!
তার দিকে একদৃষ্টে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অধিরাজ। একটু যেন সময় দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “ইউ নো ডিয়ার, আমি ভালো করে বেঙ্গালুরুর কেস ফাইলটা দেখছিলাম। দিল্লি আর কানপুরের পুলিশকে কিছু বলার নেই। কারণ ওরা “আই নো, তুমি সিগারেটের ভক্ত নও।” আস্তে আস্তে বলল, “তার সঙ্গে এটাও জানি, ওয়ান্স ইন আ ব্লু মুন তোমারও ফোঁকাফুঁকির শখ হয়। বছরে কি দু-বছরে একটা কি দুটো স্টিক এনজয় করে থাকো। বিলিভ মি, আজ এই ধোঁয়াটা তোমার খুব দরকার। আমি লক্ষ্য করেছি, টেনশনে, স্ট্রেসে তোমার হাতের আঙুলগুলো অল্প অল্প হলেও কাঁপছে। বি স্টেডি অর্ণব। নিজের মধ্যে ‘ট্রেমর’ আসতে দিও না। এই মুহূর্তে এটাই তোমার নার্ভকে রিলিফ দিতে পারে। সো এনজয়৷ নাও…!”
সে অধিরাজ সিগারেটটা এগিয়ে দেয়। অর্ণব বিনা বাক্যব্যয়ে কিংসাইজ সিগারেটটা নিয়ে নেয়। গোটা দুয়েক লম্বা টান মারতেই মনে হল, সত্যিই বুঝি মাথাটা অনেক ভালোভাবে কিছু বোঝার আগেই বার্নিং শিখ বাজি মাত করে দিয়ে গিয়েছিল। দিল্লির অফিসাররা তো কিছু করার সময়ই পায়নি। ওরা ঠিক মতো ঘটনাটা বোঝার আগেই টপাটপ লাশ ফেলে দিয়েছিল সে। কানপুরের পুলিশেরও প্রায় একই অবস্থা। এই আপদটি ওদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। তাই ওদেরও দোষ দেওয়া যায় না। বাট বেঙ্গালুরুর কেসটা একদম আলাদা। ওদের কাছে বার্নিং শিখ মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। ওরা রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে, কোমর বেঁধে রেডি হয়েই নেমেছিল। তা সত্ত্বেও সফল হয়নি। কেন জানো?”
অর্ণব ভীরু দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকায়। তার চোখে ফুটে উঠেছে একটা নীরব প্রশ্ন। সেটা বুঝতে পেরেই অধিরাজ উত্তর দেয়, “কারণটা খুব ইন্টারেস্টিং। যা যা স্টেপ নেওয়ার দরকার ছিল, ওরা তা নিয়েছিল। ফ্যামিলিগুলোকে সেফ হাউসে সরিয়েও নিয়েছিল। ওদের ইনফর্মার নেটওয়ার্কও সতর্ক করে দিয়েছিল, ঠিকঠাক খবরও যথাসময়ে দিয়েছিল। তবু শেষরক্ষা হল না। এর পেছনে এক ও অদ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ইনভিজিবল ম্যানিপুলেশন!”
“ইনভিজিবল ম্যানিপুলেশন?”
“হ্যাঁ অর্ণব।” সে উস্কোখুশকো চুলের মধ্যে ক্লান্তভাবে আঙুল চালাল, “শুনতে অদ্ভুত লাগছে। কিন্তু এটাই বাস্তব। ১৯৮৪ সালের শিখ জেনোসাইডের পেছনেও কিছুটা এই ইনভিজিবল ম্যানিপুলেশনও ছিল। সবার চোখের সামনে এই দেশের শিখ বীর, কয়েকশো ফ্রিডম ফাইটার, হাজার হাজার আর্মি অফিসার এমনকি রাজা রণজিৎ সিং এর মতো নিদর্শনও ছিলেন। সবাই জানত শিখরা দেশপ্রেমী ও বীরের জাত। অথচ কী মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি দেখো! একটা জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালে, একটা বেয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং এর জন্য মানুষের মনে সেই শিখরাই ‘বেইমান’ বা ‘গদ্দার’ হয়ে দাঁড়াল। কয়েকশো বছরের ইতিহাস এক নিমেষে মিথ্যে হয়ে গেল। কেউ এটা ভাবলও না যে, যে বডিগার্ডরা বেয়ন্ত সিংকে স্পটেই মেরেছিল ও সতবন্ত সিংকে ধরেছিল তাদের মধ্যেও কোনো শিখ থাকতে পারে! তাদের চোখের সামনে একজনই ছিল, বেয়ন্ত সিং। আর তাকে দিয়েই সবাই গোটা শিখ প্রজাতিকে জাজ করেছিল। কিছু লোক সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল ঠিকই, আবার কারোর বা পলিটিক্যাল এজেন্ডাও ছিল। তার সঙ্গে ঐ ‘মবে’ এমন কিছু মানুষও ছিল, যারা হয়তো আদৌ ক্রিমিনাল মাইন্ডেড নয়, কিন্তু এই অদৃশ্য ম্যানিপুলেশন তাদেরও রাক্ষস বানিয়ে ছেড়েছিল! আর এত বছর পরে ঠিক সেই ইনভিজিবল ম্যানিপুলেশনকেই কাজে লাগাচ্ছে বার্নিং শিখ।”
অধিরাজ একটু চুপ করে থাকল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “বেঙ্গালুরুর পুলিশেরা সব কাজই ঠিকঠাক করেছিল। কিন্তু একটা জিনিসই সব পরিশ্রমকে ব্যর্থ করে দিল। অবিশ্বাস! আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি। আর্মি আর পুলিশের মধ্যে, এমনকি খবরির ক্ষেত্রেও তুমি শিখদের সর্বত্র পাবে। ওরা সবচেয়ে বড়ো ভুল এইখানেই করেছিল। ওদের মধ্যে এমন সব সাহসী অফিসাররা ছিলেন যারা শিখ এবং তারা বার্নিং শিখের চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্ট করতে পারতেন! ওরা তাদের কাউকে বিশ্বাস করেনি। এমনকি এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটাকে বার্নিং শিখ এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে অফিসাররা নিজেরাই নিজেদের কলিগকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এর ফলটা কী হয়েছে, তা তুমি নিশ্চয়ই জানো। স্পষ্ট করে কেসফাইলেই লেখা আছে। পড়তে চাও?”
অর্ণব ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নীচু করে ফেলেছে। স্তিমিত স্বরে বলল, “নো স্যার। আমি বুঝেছি আপনি কী বলতে চাইছেন। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে।”
“ইটস ওকে অর্ণব। ভুল হওয়াটা লজ্জার কিছু নয়।” অধিরাজ তার কাঁধে হাত রেখে আন্তরিকভাবে বলে, “ভুল সবাই করে। আমি করিনি? ‘সার্জিক্যাল স’ কিলারের কেসটায় আমি নিজেই প্রচুর ভুলভাল কাজ করেছি, তোমার সঙ্গে ভীষণ রুড ব্যবহার করেছি, পবিত্র আর স্বয়ং ডককে তো প্রায় মারতেই গিয়েছিলাম! আশেপাশের কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আফটার অল, আমরা সবাই মানুষ! আজকে যে এডিজি সেন রেগেমেগে চেঁচাচ্ছিলেন, তিনি কি কখনও ব্লান্ডার করেননি? রথীন দাশগুপ্তর সম্পর্কে একটা মারাত্মক তথ্য উনি জানতেন, যেটা ঐ কেসটাকে বত্রিশ বছর আগেই সলভ করে দিতে পারত। ঐ একটি লিঙ্ক গোটা কেসের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু সিনিয়রের প্রতি ভালোবাসায় আর আবেগে ভদ্রলোক বেমালুম সেই প্রয়োজনীয় ইনফর্মেশনগুলো চেপে গিয়েছিলেন যার আফটার এফেক্ট বত্রিশ বছর পরে আমরা সবাই ভুগেছি। এটা তো তোমার তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর গুলি চালানোর থেকেও অনেক বড়ো ব্লান্ডার! অথচ আজ সেই এডিজি সেনই তোমার ওপর চটেছেন। আসলে মানুষ শিশির সেন চেঁচাচ্ছেন না, ওঁর এডিজির চেয়ারটা চেঁচাচ্ছে। কারণ ওঁকেও প্রচুর জবাবদিহি করতে হয়। তাই ওঁর রাগটাকে তুমি ইগনোর করতেই পারো। পবিত্রর লাফালাফিটাকেও বাদ দাও কারণ এ কেসে সর্বপ্রথম গোলমালটা ও নিজেই করেছে। সেদিন যদি ব্যাটা বাইকে তেল ভরাতে ভুলে না যেত, তবে বার্নিং শিখকে ঐ ডাম্পিং গ্রাউন্ডেই ধরে ফেলার একটা ফেয়ার চান্স ছিল। মিডিয়াকেও ইগনোর করো, কারণ মিডিয়া যে কোনো ইস্যু পেলেই নাচতে শুরু করে। কিন্তু ওদের এবং জনগণের স্মৃতিশক্তি খুব খারাপ। বড়োজোর তিনদিন ওরা লাফাবে,
তারপর ফের অন্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। পাবলিকও তাই। কোনো ঘটনাই ঐ বার্নিং শিখের ডেডলাইনের মতো ‘বাহাত্তর ঘণ্টা’র বেশি টেকে না। তাই এদেরও পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। যদি এদের মধ্যে সত্যিই কিছু ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে থাকে, সেটা হচ্ছে তোমার নিজের মনোভাব। একটা ভুল আমরা অ্যাফোর্ড করতেই পারি অর্ণব। আমি, তুমি, পবিত্র, এডিজি সেন, সকলেই ভুল করতে পারি। কিন্তু একটা ভুল একবারই করো। তুমি প্রত্যেকবার নতুন নতুন ভুল করো, তাতে আমার আপত্তি নেই। বাট, একই ভুল বারবার রিপিট করবে কিনা, এটা সম্পূর্ণ তোমার নিজের ওপর নির্ভর করে। আর এটাই এইমুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।”
অর্ণব নার্ভাসভাবে হাতের সিগারেটটায় আর একটা লম্বা টান মারে। সে বুঝেছে, অধিরাজের তার মনের কথা অজানা নেই। তাই সে চুপ করেই থাকে।
“বার্নিং শিখের কাজ করার এটাও একটা প্যাটার্ন। সে ফিজিক্যাল প্রেশারের সঙ্গে সঙ্গে একটা হিউজ মেন্টাল প্রেশারও সবার ওপর চাপিয়ে দেয়। যুদ্ধটা যতটা শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলে, “আমি যে ইনভিসিবল ম্যানিপুলেশনের কথা বলছিলাম, সেটা সচরাচর প্রোডাক্টের মার্কেটিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অমিতাভ বচ্চন বা শাহরুখ খান যখন কোনো ব্র্যান্ডের অ্যাডে দেখা দেন, তখন কাস্টমাররা ভাবে ঐ ব্র্যান্ডটাই বেস্ট। তারা ঐ প্রোডাক্টটাই কিনতে দৌড়য়। কেউ তোমায় গান পয়েন্টে রেখে বলবে না, ওই প্রোডাক্টটাই কেনো। কিংবা হিপনোটাইজও করবে না। অথচ তুমি নিজেরই অজান্তে একটা অদৃশ্য শক্তির দ্বারা ম্যানিপুলেটেড ও হিপনোটাইজড হয়ে যাচ্ছ। এগজ্যাক্টলি সেম মেথড নিয়েছে বার্নিং শিখ। সে জানে, পুলিশ গর্দভ নয়। তারা ঠিকই ধরতে পারবে যে কোনো-না কোনোভাবে খবর লিক হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের এই জানা বা আন্দাজ করার শক্তিটাকেই সে নেগেটিভ ভাবে তাদেরই বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছে। ওর প্রত্যেকটা মুভমেন্ট ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলে বুঝবে, একবারের জন্যও লোকটা গোপন করার চেষ্টা করছে না যে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ভেতর থেকেই ও খবরগুলো জোগাড় করেছে বা করছে। বরং এটাই প্রুভ করার চেষ্টা করছে যে, দেখো, তোমাদের মধ্যেই এক বা একাধিক মীরজাফর বা বিভীষণ বসে আছে। এটা ও এত সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল যে বেঙ্গালুরুর ডাকসাইটে অফিসাররা পর্যন্ত নির্বোধের মতো একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছিলেন। আর কোনো টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রে যদি এই জাতীয় সন্দেহ একবার ঢুকে যায়, তবে ওখানেই তাদের বারোটা বাজল। এইক্ষেত্রেও সে ঐ একই টেকনিক ইউজ করছে। বার্নিং শিখ জানে, টিমে কোনো না কোনো অফিসার নিশ্চয়ই আছে যে ..
তুলনামূলক সফট টার্গেট। আর ওর এই অদৃশ্য ম্যানিপুলেশন, সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কারোর না কারোর ওপর কাজ করবেই। স্বাভাবিকভাবেই ঐ অফিসার পুলিশের হয়ে কাজ করলেও সুবিধাটা দেবে বার্নিং শিখকেই। কপাল দেখো, আমরা ওর হাতিয়ার খুঁজে বেড়াচ্ছি, অথচ আমাদের টিমের মধ্যেই একটা মারাত্মক হাতিয়ার ও ফিট করে রেখেছে। সেটা তুমি! তুমি যে ওর হিপনোসিস ও ম্যানিপুলেশনের ফাঁদে পড়ে গিয়েছ তা আমিও তখন বুঝতে পারিনি। ভুলটা কিছুটা আমারও বটে।”
“ইন দ্যাট কেস, আমার বোধহয় সত্যিই এই কেসটা থেকে সরে যাওয়া উচিত স্যার।” অর্ণবের চোখটা কড়কড় করে উঠল। সে কাঁপা স্বরে বলে, “আপনার প্রত্যেকটা কথা সত্যি। আমি সত্যিই সবাইকে সন্দেহ করছি। মিস্ টুইঙ্কল অরোরাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। সবক্ষেত্রেই ওর দুমদাম করে এগিয়ে যাওয়াটা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। গুল্লুর নাম শুনলে আমার বুক কাঁপছে। ওর খবরের ওপরও বিশ্বাস রাখতে পারছি না। আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না যে কোমল কৌর আমাদের আসার খবর আগে থেকেই জানতেন, ও তিনি একগাদা বন্ধ নিয়ে আমাদের ওড়াবার জন্য ফাঁদ পেতে বসেছিলেন। কোমল কৌরের লিডটা গুল্লুই দিয়েছিল…!”
বহুক্ষণ ধরে বুকের ভেতর চেপে বসে থাকা পাষাণভারটাকে শেষ পর্যন্ত অর্ণব উগরেই দিল। অধিরাজও চাইছিল যে অবিশ্বাস ও সংশয়ের কথা সে নিজের মুখেই বলুক। তার স্বীকারোক্তি শুনে হেসে ফেলল সে, “হায় ভগবান। তুমি এখনও কোমল কৌরকে পাকড়েই বসে আছ। কে বলেছে যে উনি জানতেন যে আমরা সেদিনই ওঁর কাছে যাব? উনি শুধু এইটুকু জানতেন যে কোনো-না কোনো সময় পুলিশ ওঁর কাছে ঠিকই পৌঁছবে। কোমল অসম্ভব বুদ্ধিমতী, তাই শুরু থেকেই এটুকু আন্দাজ করে নেওয়া ওঁর পক্ষে কঠিন ছিল না। সেজন্যই ভদ্রমহিলা অনেক আগে থেকেই রেডি হয়ে বসেছিলেন। আমরা গুল্লুর খবর শুনে সেদিন না গিয়ে যদি একমাস পরেও যেতাম, তাহলেও একই ঘটনা ঘটত।”
অর্ণব এবার সত্যিই আকাশ থেকে পড়ল, “মানে? উনি জানতেন না যে ঐদিনই সি.আই.ডি. হোমিসাইড ওঁর বাড়ি যাবে? কিন্তু উনি তো বলেছিলেন সকালেই ওঁর কাছে খবর ছিল…!”
অধিরাজ কুলকুল করে হেসে উঠেছে, “ঈশ্বর তোমায় রক্ষা করুন অর্ণব। কোমল কৌর বললেন, আর অমনি তুমিও বিশ্বাস করে ফেললে! নিজেই একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো, যদি সত্যিই ওঁর আমাদের যাওয়ার কথা আগেই জানা থাকত, তবে কি উনি হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিডের বারোখানা কন্টেনার, একগাদা বম্বের মালমশলা ও কিছু অর্ধসমাপ্ত বম্ব আমাদের নাকের সামনেই রেখে দিতেন? যে মহিলা এতখানি বুদ্ধি ধরেন, তিনি জানেন না যে সি.আই.ডি. ওঁর ঘর সার্চ করে সমস্ত মালমশলা বাজেয়াপ্ত করবে? উনি তো বার্নিং শিখের হাতে অস্ত্রগুলো তুলে দেওয়ার অপেক্ষা করছিলেন। কোমল জানতেন ঐ মুহূর্তে তাঁর স্নেহভাজন খুনিটির হাতে উপরোক্ত একটি অস্ত্রও নেই। বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও যদি ওঁর মনে থাকত তবে কি বার্নিং শিখকে অন্তত ওর অস্ত্রগুলো পাচার করে দিতেন না? পুলিশ কতক্ষণে এসে সব মাল তুলে নিয়ে যাবে সেই অপেক্ষায় বসে থাকতেন?”
“কিন্তু ঐ ব্লাস্টটা!” অর্ণব বেয়াকুবের মত জানতে চায়, “ওই ফাঁদটা তো উনি আমাদের জন্যই পেতেছিলেন।”
“একেবারেই না।” সে একটা বাচ্চা ছেলেকে যেভাবে বোঝায়, তেমনভাবেই বলল, “যুক্তিতে এসো অর্ণব। আমি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে আগের দিন ভোররাতে যে মুহূর্তে গুল্লুকে ঐ প্রোফাইলের মানুষজনকে খুঁজতে বলেছিলাম, সেই মুহূর্তেই কোমল খবর পেয়েছিলেন যে সি.আই.ডি. হোমিসাইডের পদধুলি তাঁর বাড়িতে পড়তে চলেছে, তাহলেও ঐ শেষ রাত থেকে পরের দিন অবধি ওঁর হাতে মাত্র কয়েকঘণ্টাই সময় ছিল। ওঁর বাড়িতে যে ব্লাস্টটা হয়েছিল সেটা কোনো ছোটোখাটো ব্লাস্ট নয়। একাধিক শক্তিশালী বম্ব উনি সারা বাড়িতে ফিট করে রেখেছিলেন। এমনকি আস্ত একটা রিমোটও ডিটোনেটর হিসাবে সেখানে উপস্থিত ছিল। অতগুলো বন্ধ তৈরি করা, রিমোট তৈরি করা, রিমোটের সঙ্গে প্রত্যেকটা বম্বকে কানেক্ট করা, এতকিছু কি আদৌ ঐ হাতে গোণা কয়েকঘণ্টার মধ্যে সম্ভব? কোমল উঠবেন, হেঁটে মালমশলা অবধি যাবেন, একটা একটা করে পিস সংগ্রহ করবেন, ওঁর যা বহর আর স্পিড, তাতে শুধু এইটুকু করতেই দু-তিন ঘণ্টা চলে যাবে! সেই তিনিই কী করে অলৌকিক স্পিডে পরোটা ভাজার মতো অতগুলো বন্ধ তৈরি করে, সেগুলোকে প্ল্যান্ট করে, রিমোট বানিয়ে কানেক্টও করে ফেললেন! এত স্পিড যদি সত্যিই থাকত তবে কি পুলিশকে দেখানোর জন্য বম্ব আর সিলড অ্যাসিডের কন্টেনার নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন? তোমার পুরো ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হচ্ছে না?”
এতক্ষণে যেন অর্ণবের মাথা কাজ করতে শুরু করল। সত্যিই তো! অতগুলো বন্ধ তৈরি করে, গোপন জায়গায় প্ল্যান্ট করে, রিমোটের মতো আস্ত ডিটোনেটর ডিভাইস তৈরি করে অ্যাক্টিভেট করে দেওয়া অত কম সময়ে আদৌ সম্ভবই নয়! তাছাড়া স্যারের যুক্তি অকাট্য। সত্যিই যদি কোমলের কাছে ওদের যাওয়ার খবর থাকত, তবে তিনি বোকার মতো সব প্রমাণ ফেলে ছড়িয়ে রাখতেন না। অন্তত কোনো গোপন জায়গায় পাচার করতেন যাতে পুলিশ খুঁজে না পায়। যুক্তিগুলো শোনার পর নিজেকে একটা আস্ত গর্দভ বলে মনে হচ্ছিল তার। তবু সে আমতা আমতা করে বলে, “তবে কোমল বললেন কেন যে উনি আগেই জানতেন?”
“কারণ উনি বার্নিং শিখের সুযোগ্য দিদি।” অধিরাজ মুচকি হাসল, “একা তুমি নও, আমিও একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম ঐ মুহূর্তে। কোমল জানতেন যে এমন একটা দিন ওঁকে দেখতেই হবে। বহুদিন আগে থেকেই এই সুইসাইড মিশনের প্রস্তুতি নিয়েও বসে ছিলেন। এ-ও জানতেন, আর কয়েক মিনিট পরেই ওঁর মৃত্যু অবধারিত। ভেরি ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। তা সত্ত্বেও ভ্রাতৃপ্রেমে অন্ধ মানুষটি জীবনের শেষ মুহূর্তেও আমাদের ঘেঁটে ‘ঘ’ করার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবেই মিথ্যে কথাটা বলেছিলেন। যাতে বার্নিং শিখের তৈরি করা অবিশ্বাসের ফাঁদটা আরও পোক্ত হয়। একমুহূর্তের জন্য হলেও আমিও ঐ ফাঁদেই পা রাখতে যাচ্ছিলাম। পরে যখন ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ভেবে দেখলাম, তখনই লাস্ট মোমেন্টের মাস্টারস্ট্রোকটা বুঝতে পারলাম। তখন থেকেই ঠিক করেছিলাম, পৃথিবী উলটে গেলেও ঐ ভয়াবহ ম্যানিপুলেশনের জালে কিছুতেই জড়াচ্ছি না। একজন মীরজাফরের জন্য মীরমদন, মোহনলালদের ওপর সন্দেহ করার কোনো মানে হয় না। তাতে যদি সিরাজের মতো অবস্থাও হয়-তাই সই।”
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। নিজেকে নিজেই মনে মনে গালাগালি দিচ্ছিল সে। আরও একবার লজ্জিত কণ্ঠে বলল, “এক্সট্রিমলি স্যরি। এডিজি সেন ঠিকই বলেছেন। আমি একটা গাধা…।”
অধিরাজ মিষ্টি হাসছে, “ওরকম না ভেবে তুমি নেগেটিভ ব্যাপারটাকেও পজিটিভলি নিতে পারো। যেমন ধরো, তুমি সদ্য পাটভাঙা একটা চমৎকার বহুমূল্য শেরওয়ানি পরে সবে ঘর থেকে বেরিয়েছ। ঠিক তখনই একটা কাক বা পায়রার পেট হালকা করার শখ হল! সে তোমার বিন্দুমাত্রও অনুমতি না নিয়ে তোমার গায়ে…ইয়ে করে দিল। স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো লোক দাঁত কিড়মিড় করে কাক বা পায়রার গুষ্টির তুষ্টি করবে। তাই না?” ‘
“সেটাই তো নর্মাল রি-অ্যাকশন।”
“হ্যাঁ।” তার চোখে ও ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলা করছে, “কিন্তু তুমি ব্যাপারটাকে অন্যরকমভাবেও ভাবতে পারো। কাকের বা পায়রার কীর্তি দেখার পর তুমি ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাতে পারো, ভাগ্যিস গরু বা হাতি আকাশে উড়তে পারে না। যদি একটা উড়ন্ত গোরু বা হাতির পেট খালি করার শখ হত, তবে ভেবে দেখো তুমি আর তোমার পেয়ারের শেরওয়ানি কোথায় থাকতে। তেমনই যে লোকেরা তোমায় সাধারণ সার্ভিস গান ফায়ার করতে দেখে লম্ফ মারছে, তাদের উদ্দেশ্যে তুমি বলতেই পারো যে, ভাগ্যিস, আমার হাতে সাধারণ রিভলবার ছিল। তার বদলে যদি রকেট লঞ্চার থাকত তবে কী হত তা একবার ভেবে দ্যাখ।” বলতে বলতেই সে চোখ টেপে, “এই পয়েন্টটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না ডার্লিং।”
এবার অর্ণব সজোরে হেসে উঠল। তার মনের ভেতরের সমস্ত গ্লানি বুঝি একলহমায় মুছে গিয়েছে। হাতের সিগারেটটাও ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছে। সে টেবিলের ওপরে রাখা অ্যাশট্রেতে সমাপ্ত সিগারেটের বাটটা গুঁজে দিল দেখে অধিরাজ একটু হতাশ হয়ে বলে, “যাঃ! তুমি তো পুরোটাই শেষ করে ফেললে। আমি সবে একটাই সুখটান মেরেছিলাম…..”
“আপনি অনেকগুলো অলরেডি খেয়ে ফেলেছেন স্যার।” অর্ণব এতক্ষণে হালকা হয়েছে। সে এবার একটু হেসে বলল, “তার ওপর আবার স্মোকিং প্রোমোট ও করছেন।”
“প্রোমোট করছি না ডিয়ার।” সে হাসল, “তবে চতুর্দিকটা এতটাই বিষাক্ত যে শরীরে অল্পস্বল্প বিষ মজুত রাখাও কখনো-কখনো ভালো রেমিডি। কিন্তু তোমার মনে আরও একটা ‘কিন্তু’ আছে অর্ণব যেটা নিকোটিনের চেয়েও বিষাক্ত। সেটা বললে না তো?”
এবার অর্ণব একটু বিস্মিত হয়। আর কোন ‘কিন্তু’র কথা বলছেন স্যার? যা বলার ছিল, তা তো সে বলেই দিয়েছে। এরপরও কিছু বাকি আছে কি?
“তোমায় মিস্ অরোরা চিৎকার করে শ্যুট করতে বারণ করেছিলেন। তারপরও তুমি থামলে না কেন? শুধুই কি অবিশ্বাস? না একজন লেডি অফিসার বারণ করছেন বলে তোমার ইগো হার্ট হয়েছিল?”
সে রীতিমতো শিউরে ওঠে। মনের অন্দরের এত বড়ো গোপন কথাটা কোন মন্ত্রবলে জেনে ফেললেন স্যার। টুইঙ্কল অরোরাকে যে অর্ণব পছন্দ করছে না, একজন মেয়ের এতখানি গুরুত্ব দেখে সে যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তা উনি কী করে বুঝে ফেললেন! অদ্ভুত মানুষ একটা! সত্যিই কি ওঁর মধ্যে কোনো সুপার পাওয়ার আছে?
অধিরাজ তার নীরবতার পেছনের অর্থ খুব সহজেই বুঝে নিল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “সর্বনাশিনীর কেসটাতেও দেখেছিলাম তুমি অ্যাডেলিন বাজাজের কাছে হেরে গিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে গিয়েছিলে। এখন মিস্ অরোরা তোমার ফ্রাস্ট্রেশন আরও বাড়াচ্ছেন। কেন অর্ণব? এই ছোট্ট একটা ‘মেল ইগো’কে কেন তুমি অতিক্রম করতে পারছ না? মিস্ অরোরা, মিস্ দত্ত কিংবা মিস্ বোসকে আমি নিতান্তই আই.পি.সি.-র ল’ মেনে ‘লেডি অফিসার’ বলতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু ওঁরা আমার চোখে প্রত্যেকেই অত্যন্ত প্রতিভাবান ও পোটেনশিয়াল অফিসার, যেমন তুমি, পবিত্র কিংবা প্রণবেশদা। একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখো, লেডি অফিসারদের থেকে কিন্তু আমরা আদৌ বেটার নই। বরং ওঁরা আমাদের থেকে অনেক বেশি সুপিরিয়র। যে মুহূর্তে তুমি এটা বুঝবে, সেই মুহূর্ত থেকেই ওদের ‘বসিং’ তোমার খারাপ লাগবে না।”
“সুপিরিয়র ইন হোয়াট সেন্স?” অর্ণব এবার একটু রেগে গিয়েই বলে, “বসের সামনে ফুঁকফুঁক করে চুরুট ফোঁকায় না কথায় কথায় হাতা গুটিয়ে ফেলায়?”
“সামনে যদি কোমল কৌর কিংবা জগদীপ সিং ভাট্টির মতো নমুনা থাকে তবে হাতা গোটানোয় তো আমি কোনো দোষ দেখছি না। আর আমি ফুঁকতে পারি, পবিত্র ফুঁকতে পারে, তবে উনি কী দোষ করেছেন?” অধিরাজ স্মিত হাসল, “তবে ও কাজগুলো প্রণবেশদাও পারেন। আমি সেদিক দিয়ে সুপিরিয়র বলছি না। একটা জিনিস তুমি কখনও ভেবেছ কি? মেয়েদের প্রকৃতি অনেকরকম লড়াইয়ের মধ্যে ফেলে। আমার সুপার-ওম্যান মা ও এককালে মাসের কয়েকটা দিন সম্পূর্ণ বিবর্ণ, বিধ্বস্ত হয়ে .যতেন। তুমি তো ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলে, আরও ভালো জানবে। প্রকৃতি প্রতিটি মেয়েকে একটা আলাদা লড়াইয়ের মধ্যেই ফেলে দিয়েছে। তাদের দেহের গঠনও পুরুষদের থেকে আলাদা, ঝামেলাও অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও ওঁরা আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অপরাধীদের চেজ করেন। সমানতালে দৌড়ে যান, মারপিট করেন, অন্যান্য কায়িক পরিশ্রমও করে থাকেন। অষ্টপ্রহর ঝুঁকি নেন। এই বাহাত্তর ঘণ্টায় ওঁরাও আমাদের মতো একফোঁটাও রেস্ট নিচ্ছেন না। আমাদের শুধু ক্রিমিনালদের সঙ্গে লড়তে হয়। আর ওঁরা একদিকে ক্রিমিনালদের সঙ্গে সমানতালে লড়ছেন, তার সঙ্গে নিজেদের ন্যাচারাল দৈহিক সমস্যাগুলোর সঙ্গেও নিরন্তর পাঞ্জা কষছেন। তাহলে তুমিই বলো, কে বেশি শক্তি রাখে? ওঁরা না আমরা?”
অর্ণব সম্পূর্ণ নীরব। সে বুঝতে পেরেছে, এখানে সত্যিই কিছু বলার নেই। অধিরাজ মেয়েদের সম্পর্কে উদাসীন হওয়া সত্ত্বেও যে সারসত্য উপলব্ধি করেছে, তা তার মোটা মাথায় কখনোই ঢোকেনি। সে মুখ নীচু করেই থাকে। অধিরাজ তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “শুধু এইটুকুই নয়। তুমি জানো, আমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো হিরো কে?”
“কে স্যার?”
অর্ণবের প্রশ্নে স্মিত হাসল সে, “আমার মা! তাঁর থেকে বড়ো হিরো আমি দেখিনি।
আমার বাবা একাই যা ইনকাম করেন তাতে বাড়িতে আম্বানির মতো পাঁচশো চাকর-বাকর না রাখতে পারলেও অন্তত দশ-বারোটা চাকর-দাসী রাখার ক্ষমতা তিনি রাখেন। তবে বাবা আবার কট্টর মার্কসবাদীও বটে। অন্য মানুষের শ্রম গ্রহণ করতে তাঁর বেজায় আপত্তি। তাই প্রথমে কোনো হেল্পিং হ্যান্ড রাখেননি। অথচ পরে মা যখন অ্যানিমিয়ায় প্রবল অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন, তখন ঠ্যালা খেয়ে আদর্শও মাথায় উঠেছিল। হিস্টো তখনই এন্ট্রি পায়। মানুষের ভালোবাসা সঙ্কটে পড়লে মার্কসবাদীও সোজা হয়। বাবাও বাধ্য হয়ে আরও বেশ কিছু লোক রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা কিছুতেই অ্যালাউ করবেন না। ওঁর বক্তব্য, প্রোফেশনাল সার্ভেন্ট ঠিক ততটুকুই করবে, যতটা করার জন্য তারা টাকা পায়। তাদের কাজে প্রোফেশনালিজম থাকবে কিন্তু ভালোবাসা, আদর, যত্ন থাকবে না। প্রিয় মানুষগুলোর প্রতি ডেডিকেশনও থাকবে না। ওরা জানে না যে বাবা ডিনারে কী খেতে পছন্দ করেন, কিংবা আমার অন্যতম ফেভারিট ডিশ কী। সবচেয়ে বড়ো কথা, এ বাড়িটা ওদের নিজেদের নয়। যা নিজের নয়, স্বাভাবিকভাবেই তাকে রক্ষা করার দায়ও ওদের নেই। মা, তাঁর নিজের রাজ্য নিজেই রক্ষা করে বেড়ান। সঙ্গে বহুবছরের সঙ্গী হিস্টো! ওঁকে কোনোমতেই দাসী ভেবো না, বরং উনিই এ রাজ্যের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। ওঁর কথাই আমাদের জীবনে শেষ কথা। ওঁর সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত। আমরা তো কোনো কন্মেরই নই। ভদ্রমহিলা সেই ভোর থেকে নিজের ডিউটি চালু করে দেন, মাঝরাতের আগে সে ডিউটি শেষই হয় না। আমরা তবু কালেভদ্রে ছুটি পাই, অথচ মায়ের কোনো ছুটি নেই। ওঁকে দেখেই আমি জেনেছি স্বনির্ভরতা কাকে বলে, ডেডিকেশন জিনিসটা ঠিক কী। মানুষের সামান্য একটা রাজ্য চালাতে একগাদা হেল্পিং হ্যান্ড লাগে, কিন্তু ঈশ্বর একাই তাঁর গোটা পৃথিবীটা সামলাতে পারেন। তাই ওঁর বসিং মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমি বা বাবা নিজেরাই নিজেদের কাজ করে নিতে পারি, তার জন্য কোনো বাটলার লাগে না। আমি নিজে যে পদে আছি, তাতে আমাদের আশেপাশে অন্তত একডজন গার্ড থাকার কথা। অথচ আমার পাশে একটাও থাকে না। তারা সবাই আমার বাড়ি পাহারা দেয়, ঐ পর্যন্তই। মা আমায় শিখিয়েছেন, নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে হয়। তাঁর শিক্ষাতেই আমি শিক্ষিত।” সে একটু থেমে ফের বলল, “সেই শিক্ষাই আমায় বলে দেয় যে এই লেডি অফিসাররা কী পরিমাণ পরিশ্রম করে থাকেন। এই মারাত্মক বাহাত্তর ঘণ্টার পর তুমি, আমি, পবিত্র বা প্রণবেশদা বাড়ি ফিরে হোমমেড খাবার গিলে স্রেফ বিছানায় উলটে পড়ে ঘুমোব। কিন্তু মিস্ দত্ত বা মিস্ বোসের ছুটি নেই। আমি যতদূর জানি ওঁরা কাজের সুবিধার জন্য পরিবারের থেকে আলাদা থাকেন। মিস্ মুখার্জিও তাই। এই বাহাত্তর ঘণ্টার পর হতক্লান্ত হয়ে ওঁরা নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরবেন, তিনদিনের অগোছালো ঘর পরিষ্কার করবেন, হয়তো বা রান্নাবান্না-ঝাড়াপৌঁছা, ডাস্টিং-ক্লিনিং, কাপড় কাচা, সবই করতে হবে ওঁদের। তারপর দু মুঠো খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে যাবেন। এতরকমের চ্যালেঞ্জ ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ওঁরা সবাই যান। যাদের তুমি চোখে দেখছ, শুধু তাঁরাই নন, আমার মোস্ট ফেভারিট কিরণ বেদী ও দময়ন্তী সেনকেও বোধহয় এইভাবেই ঘরেবাইরে খেটে মরতে হয়েছে। ওঁরা শুধু আই.পি.এস. নন, কারোর গৃহিনী, কারোর মা-ও বটে। আমরা একটা ডিউটির ঠ্যালায় চোখে অন্ধকার দেখি। ওঁরা তিনটে রীতিমতো হেকটিক ডিউটি নিশ্চুপে করে যান। আমরা ওঁদের খাটুনি না কমাতে পারি, কিন্তু সেই পরিশ্রমের যথাযোগ্য সম্মানটুকুও কি দিতে পারি না? কী বলো তুমি? মেয়ে বলে কি ওঁরা আমাদের কলিগ হওয়ার যোগ্য নন?”
অর্ণবের মনে হল অধিরাজের শান্ত, নম্র কথাগুলো তাকে একভাবে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় মেরে গেল। কেউ যেন তার মনটাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে তার সামনেই তুলে ধরল। কবীরের একটা বিখ্যাত দোঁহা মনে পড়ে যায়, ‘বুরা যো দেখন ম্যাঁয় চলা, বুরা ন মিলিয়া কোয় / যো দিল খোজা আপনা, মুঝসে বুরা ন কোয়।’ সে ধরা পড়া চোরের মতো অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “স্যরি স্যার।”
“বারবার স্যরি বোলো না অর্ণব। দোষটা তোমার একার নয়, গোটা পুরুষ প্রজাতিরই। আমরা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ঐশ্বর্য রাইয়ের মতো মেয়েদের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতালী-মধুমিতার মত ফিমেল ওয়ারিয়রদের স্বপ্নসুন্দরী বানাই না। বাড়ির মেয়ে মা লক্ষ্মীর প্রতীক হলে গর্বিত হই, কিন্তু নীরজা ভানোট কার্গিল গার্ল গুঞ্জন সাক্সেনার মত মেয়ে আমরা চাই না। এটা সোসাইটির প্রবলেম। বাট, তুমি বুঝদার।” অধিরাজ হাসল, “আমার ধারণা, একটু চেষ্টা করলেই তুমি এই ট্যাবুগুলো থেকে বেরিয়ে আসবে। একদিনে হবে না। কিন্তু রোজ চেষ্টা করলে একদিন নিশ্চয়ই হবে। আমিও একটা অদ্ভুত সমস্যার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রোজ লড়ছি, তুমিও লড়ো। মিস্ অরোরাকে ‘লেডি’ না ভেবে একজন জেনারেল কলিগ ভাবার চেষ্টা করো। দেখবে, খারাপ লাগবে না।”
এর উত্তরে অর্ণব কী বলবে ভাবছিল। তার আগেই কেবিনের দরজা সশব্দে খুলে গেল। ওরা দু-জনেই বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখল আহেলি ব্যুরোয় এসে উপস্থিত। সে রীতিমতো হন্তদন্ত হয়ে গটগট করে কেবিনে ঢুকছে। তার পেছন পেছন পোষা বিড়ালের মতো টুইঙ্কল অরোরা। আহেলির হাতে একটা নীল রঙের ফাইল। সে কোনোরকম ভূমিকা না করেই অধিরাজের নাকের সামনে সেটাকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনার মার্ডার ওয়েপনের প্রবলেম সলভড। এই নিন ফাইনাল রিপোর্ট। বলেছিলাম আজ রাতে দেব৷ ফোনে গোটা রিপোর্টটা বলা সম্ভব নয়, আর আপনারা ল্যাবে এলেন না। তাই নিজেই নিয়ে চলে এলাম।।”
অধিরাজ তার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নেয়, “ওয়েপন ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসই তো? না আরও কিছুর কম্বো আছে?”
“না। আর কোনো কম্বো নেই। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে দুটো গ্যাসের পরিমাণটা। পি পি এম আর পার্সেন্টেজটা দেখুন আমি রিপোর্টে মেনশন করে দিয়েছি।” আহেলি একটু চিন্তিত, “ঐ পার্সেন্টেজ বা পি পি এম যদি একচুলও এদিক ওদিক হত তবে গ্যাস দুটোর প্রভাব এতখানি মারাত্মক হত না। যাঁর মাথা থেকে এই দুর্বুদ্ধি বেরিয়েছে অফিসার, তিনি জিনিয়াস লেভেলের লোক নিঃসন্দেহে। রীতিমতো অঙ্ক কষে একদম নির্ভুল পরিমাণটি বের করেছেন।”
“জানি। তিনি যে কী পরিমাণের জিনিয়াস তার প্রমাণ হাতেনাতেই পেয়েছি।” অধিরাজ চিন্তান্বিত মুখে রিপোর্টগুলো দেখতে দেখতে বলল, “মার্ডার ওয়েপনের কেস অর্ধেক সলভ হল। বাকি অর্ধেক এখনও অন্ধকারে। গ্যাসদুটো যে কোথা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে তা এখনও বুঝতে পারছি না! বেডরুমের লাইট, ফ্যান, এসি খুলে, দেওয়াল ঘুষিয়ে টুষিয়ে দেখলাম, কোথাও কিচ্ছু নেই। কোনো ফাঁকা জায়গা, কোনো ভেন্টিলেটর নেই যা দিয়ে ওটা ইনসার্ট করা সম্ভব। আবার কেউ দু-দুটো গ্যাসের ক্যানিস্টার ঘাড়ে নিয়ে এসে এসব কীর্তি করছে, সেটাও ঠিক হজম হচ্ছে না। কিছু একটা প্যাঁচ আছে যা আমরা ধরতেই পারছি না। আপনার কী মনে হয়?”
“আমি জানি না অফিসার।” আহেলির মুখও চিন্তান্বিত, “আপনারা এয়ার পিউরিফায়ারগুলোকে তো এনেছেন। কিন্তু ওর মধ্যেও কোনো কারিকুরি নেই। সিম্পল এয়ারপিউরিফায়ার। ভেতরে কোনোরকম ভুলভাল জিনিস ফিট করা নেই। আমি সবকটাকেই খুলে টুলে দেখেছি। ইভেন, মেকানিককে দিয়েও চেক করিয়েছি। নিতান্তই নিরীহ জিনিস। তবে একটা জিনিস বুঝেছি। ওগুলো বিষাক্ত গ্যাস ছাড়তেই পারবে না কারণ কোনো এয়ারপিউরিফায়ারই কাজ করছে না। সম্প্রতি বোধহয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মেকানিককে দিয়ে ওগুলো ঠিকও করিয়েছি। আর একটা পয়েন্ট, আমি অন্যান্য ক্রাইমস্পটগুলোর ছবিও খুঁটিয়ে দেখলাম। প্রতিটা স্পটেই একটা অটোম্যাটিক এয়ার ফ্রেশনার ছিল। হয়তো তার গন্ধেই ফসজিনের মৃদু গন্ধ চাপা পড়ে গেছে৷ অন্তত এমন হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু এয়ার ফ্রেশনারগুলোর মধ্যেও কিছু নেই। টুইঙ্কল শুকে দেখেছে বলল।”
“তবে ভুলটা হচ্ছে কোথায়।…” বলতে বলতেই অধিরাজের চোখ পড়ল অর্ণবের দিকে। টুইঙ্কল অরোরা ওর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেচারি অর্ণব এমনিতেই মরমে মরে আছে। তার ওপর টুইঙ্কলের সামনে আরও বেশি যেন অপ্রস্তুত। সে হঠাৎই বলে উঠল, “আরে অর্ণব, তুমি যে বলছিলে মিস্ অরোরাকে বার্নিং শিখকে অমন মারাত্মক চেজ করার জন্য চকোলেট খাওয়াবে? তা এখনই খাইয়ে দাও না। এই তো সুযোগ।”
“আমি। চকোলেট…।” অর্ণব প্রায় আকাশ থেকে পড়তে পড়তেই শেষমুহূর্তে কোনোমতে বুদ্ধির প্যারাশ্যুট খুলে নিজেকে সামলে নেয়, “ও… হ্যাঁ…হ্যাঁ। তাই তো! ভুলেই গেছিলাম স্যার।”
অধিরাজ ঘড়ির দিকে তাকায়, “ব্যুরোর সামনের দোকানটা বোধহয় এখনও খোলা আছে। আর ওখানে ম্যাগনাম সাইজের খুব ভালো চকোলেটও পাওয়া যায়৷ কিন্তু মিস্ অরোরা চকোলেট খান কি? উনি যেভাবে বডি বিল্ডিং করে অভ্যস্ত তাতে তো…।” সে কথা শেষ করার আগেই টুইঙ্কল প্রায় লাফিয়ে উঠল, “স্যার, আমি একসঙ্গে পাঁচ, ছ-টা চকোলেট বার খেয়ে নিই। তারপর দরকার পড়লে আরও এক্সট্রা দু-তিন ঘণ্টা জিম করে নেব। বাট চকোলেট ছাড়ার কোনো চান্স নেই।”
আহেলি মুখ টিপে হাসে, “পাঁচ-ছটা ম্যাগনাম সাইজের চকোলেট একসঙ্গে খেলে কিন্তু ভুঁড়ি অবধারিত। আর একটু আগেও তুমি খিদে পেয়েছে বলে দুটো বড়ো সাইজের পিৎজা খেয়েছ! তাও মিডিয়াম বা লার্জ নয়, দস্তুরমতো ফ্যামিলি প্যাক!” টুইঙ্কল উত্তেজিত, “ভুঁড়ি! ভুঁড়ি হোক আমার দুশমনের। আমার পেট একদম সলমন খানের মতো ঝাক্কাস। এই দেখুন…।”
সে তেড়েফুঁড়ে নিজের ‘ঝাক্কাস’ পেট দেখানোর জন্য শার্ট খুলতেই যাচ্ছিল তার আগেই দুই পুরুষ অফিসার হাঁ হাঁ করে ওঠে। অধিরাজ সভয়ে বলল, “আরে….করেন কী! আমরা বিশ্বাস করি আপনার পেট ভীষণ সলিড ও স্বাস্থ্যবান। পিৎজা, চকোলেট, কারোর বাপ বা জ্যেঠাও কিছু করতে পারবে না। প্লিজ, দেখানোর দরকার নেই। আমরা জানি আপনার বডি অবিকল সলমন খানের মতো, তার জন্য শার্ট খোলার প্রয়োজন নেই।”
“আচ্ছা।”
টুইঙ্কল তার পেটের পেশী দেখাতে না পেরে হতাশ সলমন খানের মতোই মুখ করেছে। অধিরাজ ঢোঁক গিলে বলল, “ইয়ে… অর্ণব, ওঁকে এই ফাঁকেই চকোলেট খাইয়ে দাও। এরপর আমাদের তো আবার বেরোতেও হবে। পাঁচটা, দশটা যতগুলো পারো সেনোরিটাকে দিয়ে দাও। আমার মনে হচ্ছে উনি আবার ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছেন। পিৎজাও বোধহয় এতক্ষণে হজম হয়ে গেছে। তাই না…!”
“ইয়েস স্যার।” অর্ণব এতক্ষণে টুইঙ্কলের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাসল, “চলুন মিস্ অরোরা। আপনার চকোলেটের ট্রিট অপেক্ষা করছে।”
টুইঙ্কল বড়ো বড়ো চোখ করে অর্ণবকে দেখছে, “ইউ আর সো সুইট স্যার! আমি চকোলেট খেতে ভালোবাসি আপনি কী করে জানলেন?”
“চলুন, যেতে যেতে আপনাকে বলছি।” সে তাড়া দেয়, “নয়তো দোকানটা বন্ধ হয়ে যাবে।”
“নো নো… চলুন প্লিজ…!”
চকোলেটের তাড়ায় টুইঙ্কল তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। পেছন পেছন অর্ণবও। আহেলি লক্ষ্য করল অধিরাজ থামস আপ দেখিয়ে তাকে ‘বেস্ট অব লাক’ জানাচ্ছে। মিস্ মুখার্জির মুখেও এবার একটা বদমায়েশি হাসি ফুটে ওঠে, “চকোলেটের প্যাঁচটা নিশ্চয়ই মিঃ সরকারের মাথা থেকে বেরোয়নি। যদি আমি ভুল না করি তবে এটা আপনারই দুর্বুদ্ধি।”
“দুর্বুদ্ধি কী সুবুদ্ধি জানি না।” অধিরাজ মৃদু হেসে বলল, “তবে কলিগে-কলিগে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে সেটা মিটমাট করার জন্য চকোলেটের থেকে বেটার জিনিস আর কিছু নেই। একটু চকোলেট, একটু একান্তে সময় কাটানো অনেক কেমিস্ট্রিকে চেঞ্জ করে দিতে পারে। হোপ ফর দ্য বেস্ট।”
আহেলি বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন যেন একটু একটু করে লোকটাকে সে বুঝতে পারছে। ওর মনের তলও পাচ্ছে। অধিরাজ সবসময়ই তাকে বিস্মিত করে। সে আস্তে আস্তে বলল, “সত্যি বলতে কী, আমার সশরীরে ব্যুরোয় এসে হাজিরা দেওয়ারও অন্যতম কারণ এটাই। টুইঙ্কল এতক্ষণ মুখ গোমড়া করে বসেছিল। ওর ধারণা হয়েছে যে মিঃ সরকার ওকে একেবারেই পছন্দ করছেন না কিংবা বিশ্বাস করছেন না। ওঁর বিরক্তি টুইঙ্কলও ধরতে পেরে খুব মনমরা হয়ে বসেছিল। আপনাদের কাউকে বলতে পারেনি, কিন্তু আমাকে ওর দুঃখের কথা বলেছে। কলিগদের মধ্যে এরকম ব্যাপার হওয়া উচিত নয়। তাও এইরকম অ্যালার্মিং পজিশনে। অথচ এসব কথা ওভার ফোনেও বলা সম্ভব নয়। তাই নিজেই আপনাকে বলতে এসেছিলাম। এখন দেখছি, আমার আসাটাই বৃথা। আপনি অলরেডি রোগ ডিটেক্ট করে চকোলেট প্রেসক্রাইব করে বসে আছেন।”
“নো মিস্ মুখার্জি। আপনার আসাটা একেবারেই বৃথা হয়নি।” অধিরাজ মোলায়েম স্বরে বলে, “আপনি না এলে মিস্ অরোরাও আসতেন না। তাহলে এই মেডিসিনট প্রয়োগ করার স্কোপও পেতাম না। মিস্ অরোরা আসলে আদ্যোপান্ত ছেলেমানুষ। য হুমহাম করার তা বাইরেই করেন। ওর মনের ভেতরে কিছু থাকে না। মনটা একদ জলের মতো স্বচ্ছ, নিষ্পাপ। অর্ণবও বুঝদার, স্নেহশীল। যার মনে এত স্নেহ, তার ভাগ টুইঙ্কলের মতো সহজ, সরল মানুষ পাবেন না তা কি হয়? দু-জনে কিছুক্ষণ সময় কাটালেই দেখবেন অর্ণব মিস্ অরোরার লাভিং চকোলেট পাজি হয়ে গেছে, আর উনি অর্ণবের ফেভারিট বোনু।
আহেলি এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে, “আপনি পারেনও বটে। তবে আপনার এই ফিমেল বাহুবলীটিকে আমার কিন্তু ভারি পছন্দ হয়েছে।”
“পছন্দ তো আমারও হয়েছে।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “ভাবছি, প্রণবেশদাকে বলে ওঁকে পার্মানেন্টলি আমার টিমেই রেখে দেব। টিমটা একদম কমপ্লিট আর ব্যালান্সড হয় তাহলে।” বলতে বলতেই সে আহেলির দিকে ঝুঁকে পড়ে, “আচ্ছা মিস মুখার্জি আপনাকে যতবার আমি সালোয়ার বা শার্ট-প্যান্টে দেখেছি, প্রতিবারই লক্ষ্য করেছি যে আপনি অবিকল ছেলেদের মতো একদম স্ট্রেট গটগট, খটখট করে হাঁটেন। প্লিজ অপরাধ নেবেন না, বাট এটাই সত্যি যে মিস্ দত্ত, মিস্ বোস বা মিস্ ভট্টাচার্যের হাঁট যথেষ্টই মেয়েলি। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ মেয়েদের স্ট্রাকচার অন্যরকম বলে ওঁদের হাঁটার ধরণও আলাদা। অথচ আপনি একেবারে আমাদের মতোই গটগটিয়ে হাঁটেন এটা কি আপনার ছোটোবেলা থেকেই অভ্যাস?”
আহেলি একটু বিব্রত, “হ্যাঁ। আসলে আমার হাঁটাটা এরকমই কাঠ কাঠ। মা অনেক বলে কয়েও শুধরোতে পারেননি। আমি অন্যদের মতো ক্যাট ওয়াক করতে পারি না ছেলেদের মতোই চলি। ডঃ চ্যাটার্জির ভাষায়, ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট!”
“থ্যাঙ্কস টু ইওর ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট!” সে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে “আপনাকে যদি শাড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়, তবে কি অবিকল এই ম্যানলি হাঁটার ছন্দট বজায় রাখতে পারবেন? হোঁচট খেয়ে পড়ে টড়ে যাবেন না তো? কিংবা শাড়ির কোঁচ খুলে পড়ে যাওয়ার চান্স আছে কি?”
“শাড়ির কোঁচা হয় না অফিসার ব্যানার্জি!” আহেলি এবার রাগত দৃষ্টিতে তাকায় “কুঁচি হয়। কোঁচাটা ধুতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শাড়িও আমি ভালোই ক্যারি করতে পারি এবং কুঁচি খুলে পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।”
তার বড়ো বড়ো চোখের জ্বলন্ত চাউনি দেখে অধিরাজ প্রায় লাফিয়েই ওঠে, “হোল্ড দ্যাট লুক!…হোল্ড দ্যাট লুক….!”
আহেলি এবার ঘাবড়ে গেল। আজ তো সবই উলটো হচ্ছে। অফিসার ব্যানার্জি তার হাঁটার ধরন লক্ষ্য করছেন। এমনকি চোখ গোল গোল করে তাকালেও সেটাই ‘হোল্ড’ করতে বলছেন। এ তো ভূতের মুখে রামনাম। সে সবিস্ময়ে দেখল অধিরাজ তার ফটোসেশন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। টকাটক মোবাইলে তার মুখের বিভিন্ন প্রোফাইলের ছবি নিতে ব্যস্ত। তার বিস্ময়ের অবধি থাকে না। কোনোমতে বলল, “এটা কী হচ্ছে।”
“বিশেষ কিছুই না।” সে নিরীহস্বরে বলল, “ছোটোবেলায় একজনকে দেখে আমি বড়োই ভয় পেতাম। এতদিনে আবিষ্কার করলাম আপনার চোখটা অবিকল তাঁর মতোই, মুখের আদলটাও অনেকটা একইরকম। তাই নিজেকে হরর ড্রিম দেখাব বলে ছবি তুলছি। বাই দ্য বাই, এই যে অ্যাংরি বার্ড মার্কা হাড় হিম করে দেওয়া লুকটা আপনি দিয়ে থাকেন, এটা কি শুধুমাত্র আমার জন্যই কাস্টমাইজড না অন্যদেরও বিতরণ করতে পারবেন?”
‘হরর ড্রিমের’ কথা শুনে আহেলি মর্মান্তিক চটেছে। সে গরগর করে, “এটা কোনো কাস্টমাইজড প্রোডাক্ট নয়। রেগে গেলে আমি এমন করেই তাকাই।”
” ‘গ্রেট।” অধিরাজ দু-হাত জোড় করে ফেলেছে, “ঈশ্বরকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ ফর ইওর জ্বালাময়ী দৃষ্টি।”
আহেলি মুখ লম্বা করে, “আপনার মাথাটা কি এবার একেবারেই গেছে?”
“আজ্ঞে না। কিঞ্চিৎ বাকি আছে।” সে প্রসঙ্গান্তরে গেল, “একটা প্রশ্ন করার ছিল। মিস্ দত্ত একজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেয়েছেন, আবার পানওনি! মানে, আঙুলের ছাপ তো আছে কিন্তু আঙুলের কোনো রেখার ছাপই নেই! আপনি কি এর কোনো এক্সপ্ল্যানেশন দিতে পারেন?”
আহেলি একটু ভাবল, “হ্যাঁ। হতে পারে অফিসার। অনেক এক্সপ্ল্যানেশন হতে পারে। যেমন কারোর যদি হাতই না থাকে এবং তিনি রোবোটিক হ্যান্ড ইউজ করেন সেক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ এলেও রেখাগুলো থাকবে না। খুব রেয়ার ক্ষেত্রে কিছু কেসে মানুষের হাত জন্ম থেকেই রেখাহীন হয়। সেটা কয়েক হাজার কোটিতে হয়তো একটা। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা হতে পারে তা হল, যাঁর হাতের রেখার ছাপ আত্রেয়ী পায়নি, কোনো না কোনো সময়ে সেই ব্যক্তির হাতদুটো কোনোভাবে পুড়ে গিয়েছিল। হাত যদি আঙুলসমেত পোড়ে, তবে পরবর্তীকালে নানারকম অপারেশন করে, কসমেটিক সার্জারি করে হাতটাকে স্বাভাবিক রূপ দেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু আঙুলের রেখা আর ফেরত পাওয়া যায় না। বার্ন কেসের ক্ষেত্রে সমস্ত আঙুলের রেখা চামড়াসমেতই উড়ে যায়। ওটাকে আর রি-ক্রিয়েট করা যায় না। তাই ফিঙ্গারপ্রিন্ট আসবে, আবার আসবেও না। অর্থাৎ আঙুলের ছাপ আসবে, রেখা আসবে না!”
অধিরাজের চোখ যেন জ্বলে ওঠে। সে গম্ভীরমুখেই বিড়বিড় করল, “আই সি।” কথাটা উচ্চারণ করেই অন্যমনস্কভাবে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা হলুদ রঙের প্যাকেট বের করে এনেছে অধিরাজ। আহেলি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল তার ভেতরে এভিডেন্স ব্যাগে কিছু একটা সন্তর্পণে র্যাপ করা আছে। সে আত্মমগ্নভাবেই বলল, “আপনি যখন স্বয়ং এসেই পড়েছেন, তখন এটা একটু দেখবেন তো। দুটো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেয়ে যাবেন। একটা আপনার চেনা, অন্যটা অচেনা। আজ অর্ণব রাতে মিস্ দত্ত’র কাছে স্পেশাল চা খেতে যাবে। কাল ভোরে আরও বেশ কিছু ফিঙ্গারপ্রিন্টের নমুনা ও আপনাকে দিয়ে আসবে। আপনি শুধু এইটুকু জানাবেন যে তাদের কারোর ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে এই অচেনা ফিঙ্গারপ্রিন্টটি মিলছে কিনা।”
“ওকে।” আহেলি কৌতূহলী, “কিন্তু এটা কী? কোনো স্পট থেকে তুলে এনেছেন?”
“উঁ!” অধিরাজ যেন ফের আস্তে আস্তে একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। সে আত্রেয়ী দত্ত’র পাঠানো ছবিগুলো এবার ল্যাপটপে ফেলে খুব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখছে। তার আঙুল খুব ধীরে ধীরে কি বোর্ডের ওপর নড়াচড়া করছিল। গভীর মনোসংযোগে একটা একটা করে ছবি দেখতে-দেখতেই আচমকা একটা ছবিতে তার চোখ আটকে গেল। সে তড়িৎস্পৃষ্টের মতো সোজা হয়ে বসে। স্খলিত স্বরে বলল, “মা-ই গ-ড! এটা মিস্ দত্তর চোখে পড়েনি কেন!”
কী চোখে পড়েনি। আহেলির পেট গুড়গুড় করলেও সে কোনো প্রশ্ন করল না। জানে, এখন জবাব আসবে না। এই লোকটা ক্রমাগতই এখন চিন্তায় ডুবছে। তাই বিরক্ত না করাই শ্রেয়। সে আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কেবিনের বাইরে বেরিয়ে আসে। অধিরাজ তার প্রস্থানও লক্ষ্য করেনি। সে তখনও ল্যাপটপের ওপরই হুমড়ি খেয়ে বসে আছে। তার এই তন্ময়তা ভেঙে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই আহেলির। তাই একটাও শব্দ না করে, আলগোছে হলুদ প্যাকেটটা তুলে নিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে অর্ণব ও টুইঙ্কল চকোলেট কিনে ফিরে এসেছে। আহেলি বাইরে বেরিয়েই দেখতে পেল দু-জন খোশমেজাজে গল্প করতে ব্যস্ত। টুইঙ্কলের বক্তব্য হল তাদের বাড়িতে নাকি বাঘের মতো মশা পাওয়া যায়, আর ডাইনোসরের মতো টিকটিকি। বহুবার পেস্ট কন্ট্রোল টিম সাফাই করার পরেও সে আপদ যাওয়ার নাম নিচ্ছে না।
আর অর্ণব তাকে কিছু ঘরোয়া টোটকা বাতলে দিচ্ছে। যেমন দেওয়ালে খালি ডিমের খোসা ঝুলিয়ে রাখা কিংবা ময়ূরের পালক মজুত রাখা, অথবা টিকটিকির জন্য বাড়িতে বিড়াল পোষা ইত্যাদি ইত্যাদি। দু-জনেই এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে এবং হাসতে হাসতেই গল্প জুড়ে দিয়েছে।
“মিস্ অরোরা…।” অর্ণব একটু মাথা চুলকিয়ে বলল, “গাড়ির ভেতরে আপনি যে ফটোটা তুলেছিলেন না, ওটা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করবেন প্লিজ? ইফ ইউ ডোন্ট মাইল্ড…!”
“শিওর।” একহাতে চকোলেটের প্যাকেট ধরে অন্য হাতে মোবাইলটা নিয়েছে টুইঙ্কল, “আপনার নম্বরটা বলুন। এখনই করে দিচ্ছি।”
আহেলি দেখল অর্ণব খুব সহজভঙ্গিতেই নিজের নম্বরটা দিয়ে দিয়েছে তাকে। সে হোয়াটসঅ্যাপে অর্ণবকে অ্যাড করে নিয়ে কিছু একটা পাঠিয়ে দিল। বলল, “দেখুন, চলে গেছে।”
“ইয়েস, পেয়ে গেছি।” অর্ণব হাসল, “থ্যাঙ্কস।”
“অলওয়েজ ওয়েলকাম।”
“সব চকোলেট কি মিস্ অরোরার পেটেই যাবে?” আহেলি এবার ওদের দু-জনের নাকের সামনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “নাকি আমিও একটা দুটো পাবো?” টুইঙ্কল তাকে উত্তরে একজোড়া চকোলেট ধরিয়ে দেয়, “এ দুটো তোমার। বাকি পাঁচটা আমার।”
“তুমি পাঁচটা চকোলেট একসঙ্গে খাবে!” আহেলি হাঁ, “মানে ঐটুকু পেটে আঁটবে?” এর উত্তর অর্ণবই দিয়ে দিল, “মিস্ মুখার্জি, চকোলেটগুলো উনি এখন খাবেন। তবে তার আগে ঢকঢক করে একটা আস্ত এক লিটারের ‘মাজার বোতল শেষ করেছেন। ওটা ওয়ার্ম আপ ছিল। শুধু তাই নয়, চকোলেটের নাম শুনে এতই উত্তেজিত হয়েছেন যে দু-বার আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন। তাও আবার ইনজিওর্ড পা টাই!”
“সে কী!” আহেলি উদ্বিগ্ন, “আপনার সেই নখ উড়ে যাওয়া পা-টা? বেশি লাগেনি তো?”
“নাঃ।” অর্ণব হাসল, “একচুলের জন্য বেঁচে গিয়েছি। আপনার স্যারের সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছে?”
“হ্যাঁ।” সে মৃদু স্বরে উত্তর দেয়, “তিনি যথারীতি বোধিবৃক্ষের তলায় বসে পড়েছেন দেখে আমি আর বিরক্ত করিনি। আমাকেও এবার ল্যাবে ফিরতে হবে। ডঃ চ্যাটার্জিকে আপডেট দিয়ে দেব। উনি বাড়িতে বসেই টেনশন করছেন আর অজস্রবার ফোন করছেন। পারলে আপনারাও ওঁর সঙ্গে একবার কথা বলে নেবেন। খুব চিন্তায় আছেন উনি। বলছিলেন মিস্টার ব্যানার্জিকে আর আপনাকেও নাকি অনেকবার ফোন করেছেন। কিন্তু আপনারা কেউ তোলেননি।
অর্ণব এবার প্রমাদ গুণল। আসলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এত ফোন আসছে যে ওদের জবাবদিহি করতে করতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। রিপোর্টারদের ফোন তো বটেই, তার সঙ্গে বাবা-মা, অন্যান্য আত্মীয়দের ফোনও এসেই চলেছে। অধিরাজ নিজে বিরক্ত হয়ে ফোন তুলছে না। তাই তার বাবা-মাও অর্ণবের ফোনেই কল করছেন। কাকু কাকিমা প্রায় প্রতি ঘণ্টায় ফোন করে জানতে চাইছেন, “অর্ণব, রাজা ঠিক আছে তো? তোমরা সবাই? ছেলেটা ফোনই তুলছে না। নির্ঘাৎ মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছে। তুমি প্লিজ বলো, ও সুস্থ আছে তো?” শুধু কাকু-কাকিমাই নন, অর্ণবের বাবা-মায়েরও এই একই প্রশ্ন। আসলে ওঁরা প্রত্যেকেই টিভিতে নানারকম ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আতঙ্কে ও আশঙ্কায় কাঠ হয়ে আছেন। বারবার ফোন করার একটাই কারণ। ওঁরা জানতে চাইছেন, তাঁদের সন্তান বেঁচে আছে কিনা! পুলিশ অফিসারের বাবা মা হলেও আদতে তো ওঁরাও রক্তমাংসের মানুষ। সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় যে দিশাহারা হবেন তাতে আশ্চর্য কী!
কিন্তু এর মধ্যে ডঃ চ্যাটার্জির ফোনটা মিস্ করে ফেলেছে অর্ণব। সেটাই আরও বেশি চিন্তার বিষয়। ফোন না ধরলে অসীম চ্যাটার্জি তুমুল খেপে যান। তার ওপর সকালেই অত বড়ো ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হয়েছেন। কে জানে, দুর্বাসা ক্রোধের ঠিক কোন স্তরে আছেন। সে আহেলির দিকে সভয়ে তাকায়, “সেরেছে। আমি কি এখন ওঁকে রিংব্যাক করব?”
“না। আপনি করবেন না। তাহলে আপনার কপালে অশেষ দুঃখ আছে।” সে মৃদু হাসল, “ফোনটা আপনার স্যারকে দিয়েই বরং করাবেন। ওটাই বেস্ট।”
“ওকে।”
আহেলি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মৃদু হেসে চলে গেল। টুইঙ্কল তখন খুব মনোযোগ দিয়ে চুকুম-চাকুম করে চকোলেট খাচ্ছিল। তাকে একরকম গুঁতো মেরেই নিয়ে গেল। অর্ণব অনেকটাই হালকা মনে অধিরাজের কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। তার বুক থেকে যেন একটা যন্ত্রণাদায়ক পাষাণভার নেমে গিয়েছে। এখন আর মনের মধ্যে আত্মগ্লানির কামড় টের পাচ্ছে না। তবে বর্তমানে আরও একটা চিন্তা তার মাথায় ঘাঁই মারছে। কে জানে ডঃ চ্যাটার্জি বারবার ফোন করছেন কেন! তাছাড়া কাকু-কাকিমাকেও অন্তত একবার রিংব্যাক করার কথা বলতে হবে। ওঁরা অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় আছেন।
“কিউরি-অ-সার অ্যান্ড কিউরি-অ-সার।”
কেবিনে ঢুকতে-না ঢুকতেই পরিচিত লজ্জটা শুনে থমকে গেল সে। দেখল অধিরাজ ল্যাপটপে প্রায় নাক ঠেকিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলছে, “এটা তো হওয়ার কথা নয় গুরু।…কেসটা কী হল?”
অর্ণব কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে যায়। অধিরাজের ল্যাপটপে এক মহিলার ছবি! বেশ বড়োসড় বেবিবাম্প দেখলেই বোঝা যায় গর্ভবতী। কিন্তু তাঁর রূপ দেখে অর্ণব বিশেষণ খুঁজে পায় না। সব ঠিক আছে, কিন্তু মেয়েলি কমনীয়তার ছিটেফোঁটাও নেই। সে অবাক হয়ে বলে, “ইনি কে?”
“ইনি হচ্ছেন মিস্ দত্ত বর্ণিত শ্রীমতি গুরশীল কৌর। যাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট উনি পেয়েও পাননি।” অধিরাজ বিড়বিড় করে বলে, “ইনিই শ্রীযুক্ত আমনদীপের সঙ্গে আর্বানায় লিভ-টুগেদার করছেন, এবং ওঁর বর এসে দু-জনকেই ধমকাচ্ছে, চমকাচ্ছে!”
“ও! ইনিই!” অর্ণব এবার ভালো করে মহিলাকে দেখল, “পাঞ্জাবি মেয়েরা কি এরকমই কাঠ কাঠ হয়? মিস্ দত্ত ঠিকই বলেছেন। উনি প্রেগন্যান্ট।”
“সে তো বুঝলাম। কিন্তু মিস্ দত্ত’র প্রশ্নটাও সঠিক।” অধিরাজ ফের দীর্ঘদেহটাকে চেয়ারে এলিয়ে দেয়, “আমনদীপ ওর মধ্যে কী দেখেছে!”
“মানে?”
অধিরাজ চিন্তিত, “এটাই তো সমস্যা অর্ণব। শ্রীমতি গুরশীলের স্বামী থাকতে পারে না, উনি প্রেগন্যান্টও হতে পারেন না! কারণ উনি মহিলাই নন, পুরুষ!”
“অ্যাঁ!”
অর্ণব বিষম খেতে গিয়েও সামলে নিল, “বলেন কী?”
“নিজেই দেখে নাও।”
অধিরাজ গুরশীলের ছবিটা জুম করল। এমনিতে সবই ঠিকই আছে। কিন্তু সে মহিলার গালের ওপর আঙুল রেখে বলল, “এই দ্যাখো, এই লাল দাগড়া দাগড়া চিহ্নটা দেখতে পাচ্ছ? একদম ডানগালে জ্বলজ্বল করছে? এটা মিস্ দত্ত নাও চিনতে পারেন, কারণ উনি শেভ করেন না। কিন্তু আমরা দু-জনেই নিয়মিত শেভ করি। তাই বুঝতে একটুও কষ্ট হচ্ছে না যে ওটা রেজোর বার্ন বা রেজোর বাম্প! যেটা অনেকসময় প্রেশার দিয়ে, কিংবা ঘনঘন দাড়ি কাটতে গেলেই বেশি হয়। আমার বাবাও অনেকসময় তাড়াহুড়োতে এই কাণ্ডটি বাঁধান। এখন এই মহিলা রেজোর দিয়ে এত বেশি দাড়ি কাটছেন কেন, সেটাই আমার চিন্তার বিষয়!”
অর্ণব কিছুক্ষণের জন্য বাকশক্তিহীন হয়ে যায়। স্যার মিথ্যে বলেননি। মহিলার মুখে সত্যিই রেজোর বার্নের দাগ স্পষ্ট। এ দাগ চিনতে ভুল হওয়ার কথাই নয়। যে কোনো পুরুষের চোখেই এটা ধরা পড়বে। তবে গুরশীল মেয়ের ছদ্মবেশে আর্বানায় কী করছে! তার গর্ভবতী হওয়াও সম্ভব নয়। তবে নকল বেবি বাম্পটি কি প্রস্থেটিক মেক-আপের নিদর্শন? না গর্ভবতী হওয়ার আড়ালে সে এমন কিছু বয়ে বেড়াচ্ছে যা মেটাল ডিটেক্টরের তলা দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। তার সঙ্গী আমনদীপ কিছু জানে না তাও সম্ভব নয়! তাছাড়া গুরশীলের স্বামী পরিচয় দিয়ে যে লোকটি মাঝেমাঝেই এসে উপস্থিত হয়, সে তবে কে?
অর্ণবের মাথার মধ্যে সবটাই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। তার মস্তিষ্ক শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করল, “বার্নিং শিখ!”
“মে বি।” অধিরাজ আপনমনেই বলে, “গুরশীল যদি বার্নিং শিখ হয় তবে আমনদীপ কে? আর তার ফেক স্বামীটিই বা কে? বার্নিং শিখ গোটা টিম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে নাকি!”
“স্যার!” অর্ণব উত্তেজিত, “তাহলে এডিজি সেন ঠিকই বলেছিলেন। বার্নিং শিখ একটা লোক নয়, একাধিক লোকের টিম।”
“পার্শিয়ালি কারেক্ট।” সে ফের অন্যমনস্ক, “বার্নিং শিখ একটা কিংবা দুটো-কোনো লোকই নয়। আসলে সে একটা সত্ত্বা! একটা ডার্ক পার্সোনালিটি যে একজনের ভেতরে ঢুকে বসে আছে। যদি তুমি কনজ্যুরিং সিরিজে বা ভূতে বিশ্বাসী হও তবে তাকে ‘ডেমন’-ও বলতে পারো যে একটা মানুষকে এতটাই পজেজ করে রেখেছে যে মানুষটা চেয়েও নিজেই তাকে থামাতে পারছে না। মনস্তত্বের ভাষায় ও একটা আগুনমুখো ট্রমা! আই পিটি হিম!”
“পিটি!” অর্ণব বিস্মিত, “স্যার, ঐ রাক্ষসটা আমাদের অলমোস্ট জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে পিটি করিয়ে ছাড়ছে। আর আপনি ওর জন্য দুঃখবোধ করছেন?”
“কারণ ট্রমা শব্দটার অর্থ আমি বুঝি অর্ণব।” অধিরাজ আত্মমগ্ন, “জগদীপ কী বলেছিলেন মনে আছে? অ্যাকর্ডিং টু মিঃ ভাট্টি, লোকটা এক্সপ্রেশনলেস। না ওর মুখে হাসি আছে, না কান্না। কোমল কৌরের কথা মনে করো। তিনিও শেষমুহূর্ত ছাড়া কখনও হাসেননি, কখনও কাঁদেননি। যারা কাঁদতে পারে, নিজের কষ্ট এক্সপ্রেস করতে পারে, তাদের কষ্ট অনেক কম। চোখের জল বুকের জ্বালা নিভিয়ে দেয়। কিন্তু কতখানি কষ্ট পেলে একটা মানুষ পাথরের মতো অনুভূতিহীন হয় সেটা কি বুঝতে পারো অর্ণব? কতখানি যন্ত্রণা পেলে একটা মানুষ বুলেটের ক্ষতের প্রবল কষ্টও টের পায় না! আমি এখনই গিয়ে গুরশীলকে গ্রেফতার করতে পারি। কিন্তু তাতে বার্নিং শিখ মরবে না, হারবেও না। তার জ্বালাও কমবে না। আমি যদি ঠিক আন্দাজ করে থাকি, তবে বার্নিং শিখের মৃত্যু তখনই হবে যখন ও এত বছরের চেপে রাখা বুকফাটা কান্নাটা কাঁদতে পারবে। সেখানেই ঐ রাক্ষসের অন্ত।”
“মানে?”
গোটাটাই অর্ণবের মাথার ওপর দিয়ে গেল। স্যার ঠিক কোন ভাষায় কথা বলছেন! যে লোকটা ওদের সবাইকে কেটে, উড়িয়ে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে, তাকে মারার জন্য একটা বুলেটই যথেষ্ট। একটা বুলেটে ওর মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে পারলেই অর্ণব বেশি খুশি হবে। কিন্তু স্যার যে কী বোঝাতে চাইছেন তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
“তুমি বুঝবে না। আবারও বলছি, যুদ্ধটা অনেকখানি মনস্তাত্ত্বিকও বটে।” সে মাথা নাড়ল, “মহিষাসুরের অন্ত একমাত্র দেবী দূর্গাই করতে পারতেন। বৃত্রাসুরকে মারার জন্য দধীচির হাড়ই একমাত্র বজ্র তৈরি করতে পারত। রক্তবীজকে ধ্বংস মহাকালীই করতে পেরেছিলেন, যতবার পৃথিবীতে নেগেটিভ শক্তি এসেছে, তাকে শেষ করার জন্য কোনো একটি পজিটিভ শক্তি বা অস্ত্রও বারবার এসেছে। বার্নিং শিখ যদি তাদের দলভুক্ত হয় তবে তাকে আমরা বুলেট, ছুরি, বেয়নেট, এমনকি বোফর্স কামান ছুড়েও মারতে পারব না। তার জন্য অন্য স্পেশাল অস্ত্র লাগবে।”
“কী অস্ত্র স্যার?”
অর্ণব কনফিউজড। এতক্ষণে অধিরাজের মুখে হাসি ফুটল। সে সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে, “এখন শুধু ঐ রিপোর্টার ভদ্রলোকের ফোনের অপেক্ষা। মিঃ রমানাথ চক্রবর্তী যদি আসল কাজটা করতে পারেন তবে বার্নিং শিখও মরবে। অর্থাৎ দধীচির হাড় উনি সংগ্রহ করতে পেরেছেন কিনা সেটাই জানার। কী অস্ত্র সেটা এখন না জানলেও চলবে। তবে বোধহয় অস্ত্রটা আমরা পেয়ে গেছি।”
অর্ণব আরও বেশি ঘেঁটে গিয়ে বলল, “তবে গুরশীলের, আই মিন, বার্নিং শিখের কী হবে?”
“এখন কিচ্ছু না।” সে রহস্যময় হাসি হাসছে, “এখন আমাদের একটাই কাজ। কিছুই না করা। বুঝেছ?”
“ওকে স্যার।”
