কালরাত্রি – ২১

(২১)

শেষ রাতের ঝাপসা অন্ধকারের রহস্যময়তাই আলাদা। সূর্যোদয় হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। তাই আঁধারের কালিমাও খানিকটা আবছা হয়ে এসেছে। নক্ষত্ররা টিম টিম করে জ্বললেও তাদের রশ্মি এখন ক্লান্ত। চাঁদও অস্তাচলের পথে ঢলে পড়ছে। জ্যোৎস্নার উচ্ছ্বাস চলে গিয়ে এখন মনমরা একটা ম্লান আলো ছেয়ে আছে। মাঝেমধ্যে হিমেল বাতাস চুপিচুপি এসে স্পর্শ করে যায় গাছেদের শরীর। গাছগুলো একমুহূর্তের জন্য বুঝি শিউরে ওঠে। পরক্ষণেই আবার সব শান্ত। যেন হাওয়ার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।

এই পরিবেশে একটা পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে বেশ কিছুটা দূরে, একটা বড়োসড়ো গাছের পেছনে কভার নিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরা তিনজন। অধিরাজ, পবিত্র ও গুল্লু। অধিরাজ গুল্লুকে ফিশফিশ করে জিজ্ঞাসা করে, “ঠিক দেখেছিস? ও পাবলিক এখানেই এসে ঢুকেছে তো? বাড়িটা দেখে তো মনে হয় না কেউ এখানে থাকে!”

গুল্লুও চাপাস্বরে জানায়, “কেউ থাকে না সাব। আমি একটু খোঁজখবর নিয়ে নিয়েছি আমার ছেলেপুলেদের কাছ থেকে। থাকা সম্ভবও নয়। এটা ‘কালী বুড়ির বাড়ি নামে কুখ্যাত। রাত তো ছাড়ুন, দিনের বেলায়ও এর ধারে কাছে কেউ আসে না।”

“কালী বুড়ি আবার কে!”

“সবাই বলে সে নাকি ভৈরবী ছিল, অনেকে অবশ্য ডাইনিও বলে। লোকজনের মধ্যে থাকা তার পছন্দ ছিল না। তাই এখানে বাড়ি বানিয়েছিল। এই লোকেশনের দুটো ফায়দা। একদিকে গেলে শ্মশান পাবেন। অন্যদিকে গেলে কবরখানা৷ এই বাড়িটা তার মাঝখানেই। এতে নাকি কালী বুড়ির সাধনায় খুব সুবিধা হত।” গুল্লু নীচুস্বরে জানায়, “বুড়িকে সবাই খুব ভয় পেত বলে সে জিন্দা থাকতেই ধারে কাছে কেউ আসত না। কী করত, কী খেত কেউ জানত না। একদিন এ রাস্তা দিয়ে কিছু লোক যাচ্ছিল, তারা বেজায় ‘বদবু’ পেল। ঢুকে দেখল বুড়ি মরে পড়ে আছে। কতদিনের বাসি মড়া ভগবান জানে! তার সামনে একটা আস্ত কঙ্কালও পড়েছিল। ওটা কার কঙ্কাল তা জানা যায়নি। ব্যস্, এটুকুই। ভূত-প্রেত কেউ দেখেনি ঠিকই, বুড়ি কোনোদিন কারোর ক্ষতিও করেনি। কিন্তু তবু লোক ভয় পায়। ভাবে কালী বুড়ি বুঝি ভূত হয়ে এই ‘খণ্ডহর’ পাহারা দিচ্ছে!”

অধিরাজ সখেদে মাথা নাড়ল, “লোক এইজন্য ভয় পায়, কারণ ভয় পেতে তারা ভালোবাসে। কালী বুড়ির খেয়ে কাজ নেই এই আধভাঙা, ছাত খসে পড়া বাড়ি পাহারা দিতে আসবে। সে এখন আত্মা। দরকার পড়লে মুকেশ আম্বানির বাড়িতে ঢুকেও মহা আরামে বসে থাকতে পারে, নীতা আম্বানির চল্লিশ কোটির শাড়ি পরে সাজতেও পারে। কেউ বাধা দেবে না। খামোখা ভাঙা বাড়ি আগলে রেখে লাভ কী! ভূতেরও মিনিমাম প্রেস্টিজ আছে। কথায় কথায় দরোয়ানের ডিউটি তারা করে না। এই বাড়ি ভূতের নয়, ক্রিমিনালদের জন্য আদর্শ জায়গা।”

পবিত্র আরও চাপা স্বরে বলে, “কিন্তু লোকেশনটা কী চমৎকার ভেবে দেখো রাজা। একদিকে শ্মশান, অন্যদিকে কবরখানা! ভাবতেই গুজ বাম্প হচ্ছে। তার ওপর কী রূপ! আহা! হ্যারি পটার থেকে একটা দুটো ডিমেন্টর, মানে তমপিশাচকে এনে ছেড়ে দিলে জমে যেত কিন্তু।”

পবিত্র কথাটা শেষ করার আগেই কোথা থেকে একটা কাকের কর্কশ স্বর শোনা গেল। এমনভাবে ডেকে উঠল যে ক্ষণকালের জন্য ওরা তিনজনেই চমকে উঠেছিল। আচমকা ডেকে উঠেই পাখিটা মাথার ওপর দিয়ে ঝটপট করে উড়ে গেল। অধিরাজ বিড়বিড় করে, “নাও, তোমার তমপিশাচের বাঙালি ভার্সন চলে এসেছে। গুল্লু, পাবলিকটা এখনও এখানেই আছে তো? না বেরিয়ে গেছে?”

“না স্যার।” গুল্লু জানাল, “ও এখানে ঢোকামাত্রই আমি একদম চোখ কান খাড়া করে বসেছিলাম। এখনও কোথাও যায়নি। এখানেই আছে।”

“ফাইন।” সে কয়েকটা নোট ধরিয়ে দিল তাকে, “এবার এখান থেকে মানে মানে পাতলা হয়ে যা। কী হল বা কী হবে দেখার জন্য ভুলেও দাঁড়াবি না।”

“জি সাব।” গুল্লু সেলাম ঠোকে, “আর কোনো কাজ থাকলে বলবেন।”

“আছে। একজনকে একটু স্টক করতে হবে। ফটো আর ডিটেইলস তোকে কাল পাঠাব। আপাতত ভাগ।”

গুলাব সিঞাঁ আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত স্থানত্যাগ করে। বিষণ্ণ আলোয় ছায়ামাখা ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল অধিরাজ। তারপর আপনমনেই একটু ক্লান্তভাবে বলল, “চলো, ফের মোলাকাতের সময় হয়েছে। আবার কোস্তাকুস্তি করার জন্য তৈরি হও। যেভাবে আমরা সবাই, রাঞ্ঝা, মাহিওয়াল, মজনু কিংবা রোমিওর মতো খাওয়া, ঘুম লাটে তুলে গোঁয়ার ‘দিওয়ানা মস্তানার’ মতো লোকটার পেছনে দৌড়চ্ছি, বউদির প্রতি যদি তুমি এর এক পার্সেন্ট এনার্জিও ডেডিকেট করতে তবে তোমার ছানা তোমায় ‘মামা’ বলত না!”

“আমি ভাবছি, এখানে দাঁড়িয়ে ইন্ট্রো হিসাবে গোবিন্দার ডান্সের সঙ্গে গানও গেয়ে ফেলি। ম্যায় লায়লা লায়লা চিল্লাউঙ্গা, কুর্তা ফাড়কে। মাইরি বলছি, লায়লার জ্বালায় কুর্তা তো দূর, নিজেরাই ফেঁড়েফুঁড়ে অস্থির হচ্ছি, তবু তার দয়া হচ্ছে না!” পবিত্র মুখ লম্বা করেছে, “কিন্তু তুমি শিওর যে রাতের বেলায় যে সর্দারজি গুরুদ্বারায় এসে ক্ষমা চায়, তিনিই বার্নিং শিখ?”

“নো ডাউট তিনিই।” সে মাথা ঝাঁকায়, “টাইমিংটা দেখো। প্রত্যেকবার হয় খুনের আগে অথবা পরে তার আবির্ভাব হয়েছে। সে জানে, ওয়াহেগুরু এই পাপ ক্ষমা করবেন না। তাই গুরুদ্বারার মধ্যে ঢোকে না। ও নিজের কাজের জন্যই সে অধিকার হারিয়েছে। আমার ধারণা, যখন সে খুনগুলো করার প্রস্তুতি করে নেয়, অথবা খুন করে তারপরই ক্ষমা চাইতে আসে। তাছাড়া যে বাড়িতে এসে তিনি ঢুকেছেন, তোমার মনে হয় কোনো সাধারণ সর্দারজি এখানে ঘাঁটি গাড়বে? এখানে কোনো মানুষ থাকতেই পারে না!”

সত্যিই তাই। যে কোনো বাড়িতে মানুষ থাকার জন্য নিদেনপক্ষে চারটে দেওয়াল ও একটা আস্ত ছাদ লাগে। কিন্তু এ বাড়ির দেওয়াল জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়েছে। শুধু তাই নয়, চারপাশের আগাছার জঙ্গল দেওয়াল ফাটিয়ে দিব্যি ঢুকে গিয়েছে ভেতরের দিকে। অর্থাৎ মেঝে নামক বস্তুটিও নেই। সেখানে শুধুই গুচ্ছ লতাপাতা ও আগাছার ভিড়! যতখানি দৃশ্যমান তার মধ্যেই বেশ বোঝা যাচ্ছে যে ধ্বংসস্তূপের বাইরেই নয়, ভেতরেও গুল্ম-ঝোপঝাড়ের অভাব নেই। বেশ কিছু খোঁচা খোঁচা গাছের ডাল ভেতর থেকেই ভাঙা জানলার কোটর দিয়ে বাইরের দিকে শাখা-প্রশাখা বাড়িয়ে দিয়েছে সূর্যালোকের আশায়। তার ওপর ছাতও বিভিন্ন জায়গা থেকে খসে খসে পড়েছে। এই হতচ্ছাড়া বাড়িতে মানুষ তো দূর, প্রেস্টিজ জ্ঞানওয়ালা ভূতও থাকবে না। অথচ লোকটা ত্রিভুবনে আর জায়গা পেল না ঘাঁটি গাড়ার?

“এখানে একমাত্র তমপিশাচই থাকতে পারে রাজা।” পবিত্র আস্তে আস্তে বলল, “এগোব?”

“এগোও, তবে তমপিশাচকে মাথা থেকে নামিয়ে।” অধিরাজের হাতে সার্ভিস রিভলবার উঠে আসে, “নয়তো বার্নিং শিখকে দেখে যদি এক্সপেক্টো প্যাট্রোনাম বা পিক্রদেব সংরক্ষণম বলেই লাফিয়ে ওঠো তাহলেই গেছি।”

পবিত্র জিভ কেটে মাথা নাড়ল। তারপর খুব সন্তর্পণে গুটিগুটি এগিয়ে গেল অধিরাজের পেছন পেছন। চাঁদের মরা আলোয় এই ধ্বংসস্তূপটাকে দেখলেই কেমন যেন অস্বস্তি হয়। মনে হয়, এই ভগ্নস্তূপ কোনোদিনই বোধহয় সূর্যালোক দেখেনি। দিনের বেলায়ও বুঝি কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে নিজেকে অন্ধকারেই জড়িয়ে রাখে। কোথাও শুভশক্তির লেশমাত্র নেই। ভীষণ নৈর্ব্যক্তিক অশুভ উদাসীনতার নীরবে বসে আছে। আর তার থেকেও বেশি অশুভ সঙ্কেত দেয় আশেপাশে ওঁত পেতে বসে থাকা অন্ধকার। আশ্চর্য বিষয়, বাড়িটার মূল দরজা অবধি পৌঁছোনোর জন্য কোনো পথ, এমনকি মানুষের পেড়ে ফেলা পায়ে হাঁটা রাস্তাও নেই। চতুর্দিকে শুধু ঝোপঝাড়, গাছপালা আর আগাছার স্তূপ। থাকার মধ্যে আছে শুধু কিছু লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল। তার সঙ্গে কিছু অজানা লতা। এগোতে গেলেই পায়ে জড়িয়ে টড়িয়ে একসা হচ্ছে।

“মামা! সাবধানে।” পবিত্র তার সহজাত ভঙ্গিতে সতর্ক করে, “এখানে বাঘ কেন, বুনিপও লুকিয়ে থাকতে পারে।”

হাতে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র। গুটি গুটি পায়ে সন্তর্পণে এগিয়ে যেতে যেতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল অধিরাজ! একদম পুতুলের মতো স্থির! এক বিন্দুও নড়াচড়া করছে না। নিঃশ্বাসও যেন নিতে ভুলে গিয়েছে সে। তার অবস্থা দেখে পবিত্ৰও থমকে যায়, “কী হল?”

খুব আস্তে আস্তে একটা আঙুল তুলে ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলল সে। সারা দেহ যেন পাথরের স্ট্যাচু। শুধু তর্জনী দিয়ে পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে কিছু বোঝাতে চাইছে। তার তর্জনীর দিকনির্দেশ লক্ষ্য করে পায়ের দিকে তাকাতেই রক্তহিম হয়ে গেল পবিত্র-র। এখানে জোরালো আলোর কোনো উৎস নেই। চাঁদের হিমশীতল আবছা আলোতেই যা দেখা গেল, তা-ই ভয় পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। অধিরাজের ডান পায়ে একটা কিছু মোটা দড়ির মতো জিনিস খুব স্লথ অথচ মসৃণভঙ্গিতে নড়াচড়া করছে। কালো নয়, বরং পিঙ্গল এবং সোনালি। চাঁদের আলো তার তৈলাক্ত পিচ্ছিল শরীরে পড়ে চিকচিকিয়ে ওঠে। ভারি রিরংসাময় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছে চরণপ্রান্ত। তবে এখনও সেই মসৃণ প্রাণীটির মধ্যে হিংস্র হয়ে ওঠার বিশেষ লক্ষণ নেই। সে যেন পরম আরামে এবং মহা আহ্লাদে উষ্ণ একটা আশ্রয় পেয়ে শান্তিতে ওম নিচ্ছে। তবুও কারুকার্যময় ফণাটি দৃষ্টি এড়ায় না। পবিত্র প্রায় লাফিয়ে উঠে উত্তেজিত চাপা স্বরে বলল, “গোখরো!”

“আস্তে। লাফাবে না।” অসম্ভব চাপা স্বরে উত্তর দিল অধিরাজ, “যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেখানেই থাকো। কোনোরকম ভাইব্রেশন যেন টের না পায়!”

“গুলি মেরে উড়িয়ে দিলে হয় না।”

পবিত্র-র কথা শুনে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে, “গুলি কেন? তোপ মেরে আমাকে-ই উড়িয়ে দাও! ঝামেলাই শেষ।”

পবিত্রও কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার বুকের মধ্যে গুড়গুড় করছে। গোখরো জাতসাপ। ওকে বিশ্বাস নেই। তবে আপাতদৃষ্টিতে সাপটার মধ্যে কিন্তু কোনোরকম আক্রমণাত্মক ভাব নেই। বরং বেশ কিছুক্ষণ সে তার বরফশীতল দেহটাকে অধিরাজের পায়ে গোল করে জড়াল। কুন্ডলী পাকাল। অধিরাজ একদম স্থির। তাকে দেখে মনেও হয় না যে সে শ্বাস নিচ্ছে। বরং বুকের ওঠানামা এতই ক্ষীণ যে সন্দেহ হয় বুঝি দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সাপটা মহা আরামে, নিশ্চিন্তে কিছুক্ষণ যেন উষ্ণতা শুষে নিল। তারপর আস্তে আস্তে সরসর করে আপনমনেই নেমে গেল তার পা বেয়ে। চেহারাটা অবশ্য দেখার মতো। রীতিমতো মোটাসোটা ও লম্বা। নাগরাজ বাসুকির আত্মীয় বটে! দেখলেই ভয় করে। কিন্তু আজ বোধহয় তার দংশন করার মুড একেবারেই নেই। সে একদম ধীরে সুস্থে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। অধিরাজ টের পেল একটা শীতল, মসৃণ কিছু তার পা থেকে আস্তে আস্তে নামল। লম্বা লম্বা ঘাস ক্ষণিকের জন্য নড়ে উঠল। একটা দীর্ঘ চকচকে সরীসৃপ তার মধ্য দিয়েই ধীরগতিতে অন্যদিকে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। তারপরই চতুর্দিক আবার ছবির মতো স্থির।

“উঃ!” এতক্ষণে পবিত্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, “গেছে মনে হয়। তুমি যেভাবে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে, আর ও যেরকমভাবে জড়িয়ে ধরেছিল তাতে আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমায় দেখে তো মনে হয় না বিশেষ ভয় পেয়েছ। ছোবল মেরে দিলে কী হত!”

“ও যাতে ছোবল মারে তার জন্য তোমার অন্তত চেষ্টার ত্রুটি কিছু ছিল না। আরও দুটো লাফ মারলে সেটাই হত।” সে গরগর করে, “তবে ব্যাটা মানুষ নয়-সাপ! কথায় কথায় ছোবল মারে না। যতক্ষণ না বিপদ বুঝছে বা ভয় পাচ্ছে, ততক্ষণ ও কিচ্ছু করবে না। তাছাড়া এখন ওর ঘুমের সময়। আশেপাশেই কোনো গর্তে, ফোঁকরে—কোথাও হয়তো শীতঘুম দিচ্ছিল, বাই এনি চান্স চলে এসেছে। বা পায়ে জড়িয়ে গেছে। মানুষও ঘুমের মধ্যে মারপিট করে না, ও বেচারি তো সাপ। ঝিমোতে ঝিমোতে এসেছিল, আবার ঢুলতে ঢুলতেই চলে গেছে। কোনো থ্রেটের ইশারা পায়নি, তাই কিছু করেওনি। তবে হ্যাঁ, ওর লেজে যদি পা পড়ত বা তুমি আরও লম্ফঝম্প করে ওকে চেতিয়ে দিতে, তবে নির্ঘাত বিষদাঁত বের করত।”

“আরে, সাপ দেখে ভয় পাব না।” পবিত্র বলল, “তার ওপর গোখরো।”

“মাউন্টেনিয়ারিং বা পাহাড়ি অরণ্যে হাইকিং করে দেখো কখনও।” অধিরাজ পা টিপে টিপে ফের এগোয়, “হিমালয়ান পিট ভাইপার, হিমালয়ান কিলব্যাক আর কিং কোবরা তোমার জন্য সেখানে মালা নিয়ে বসে থাকবে। এসব পাহাড়ে যারা নিয়মিতো চড়ে তাদের কাছে জলভাত।”

“হুঃ। পাহাড়ে চড়ে কাজ নেই আমার। আজকে কলকাতাতেই যে গাঁজাখোর ব্ল্যাক মাম্বা জড়িয়ে ধরেছিল, তাতেই আমি ফর্সা হয়ে যাচ্ছিলাম।” সে ফিশফিশ করে, “তবে সাবধান। এখানে একটাই গোখরো থাকবে এমন কোনো কথা নেই।” “হুঁ।” অধিরাজের কপালে চিন্তার রেখা প্রকট, “সেটা আমি জানি। তুমিও যে জানো তাতেই কৃতার্থ হলাম।”

পবিত্র আর কথা না বাড়িয়ে অধিরাজের পেছন পেছন চলল। এখন সাধারণ লতাপাতাও তার পায়ে জড়িয়ে গেলে খণ্ডমুহূর্তের জন্য হলেও আঁতকে উঠছে সে। ওরকম পেল্লায় গোখরো আগে কখনও দেখেনি। তাই বুকের মধ্যে চাপা ভয়ও আছে। এখনও হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস করছে। তার ওপর পায়ের তলায় ঘাস সরসর করে উঠছে। কখনও কখনও শুকনো পাতার মর্মরধ্বনিও শোনা যাচ্ছে। এখানে টর্চ বা মোবাইলের আলো ব্যবহার করা যাবে না। আলো দেখে গৃহস্বামী পালিয়ে যেতে পারেন। নয়তো মোবাইলের টর্চটা জ্বালতে পারলে খুশিই হত পবিত্র। কে জানে, গোখরোটা হাই টাই তুলে বেডরুমে গিয়েছে, না এখানেই ল্যাজ নাচিয়ে ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’ স্টাইলে ফের পায়ে পড়ার তাল করছে।

“এত ঝোপঝাড়ের মধ্যে লোকে বাড়ি করে কেন!” সে ভয়াবহ অসন্তুষ্ট, “শুধু সাপ কেন, আস্ত ডাইনোসরও থাকলেও অবাক হব না।”

“যিনি শ্মশান সাধনায় এক্সপার্ট ছিলেন, তিনি আর্বানায় থাকবেন বলে তোমার মনে হয়।” বিরক্তিমাখা গলায় উত্তর এল, “নাও শা-ট আ-প!”

“শাট আপ’ শুনে সাময়িক চুপ করে গেল পবিত্র। আসলে সে বলতেও পারছে না যে তার রীতিমতো ভয় লাগছে। ভয়টা বার্নিং শিখকে নয়। তাকে হাতের কাছে পেলে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দিতে পারবে। ভূতকে নিয়েও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সাপ নামক বস্তুটি দেখলেই তার গা ঘিনঘিন করে। অধিরাজ ওরকম শান্ত হয়ে কী করে দাঁড়িয়েছিল, সেটাই আশ্চর্যের। ওটা যদি পবিত্র-র পায়ে জড়াত, তাহলে চেঁচিয়ে মেচিয়ে এই ভগ্নস্তূপকেই মাথায় তুলে ফেলত সে। আর জঙ্গলের যা বাহার, তাতে ঐ একটিই কিং সাইজের আপদ থাকবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কে জানে তার ছানাপোনারাও আশেপাশে কিলবিল করছে কিনা! তার ওপর জঙ্গলের এই বুনো গন্ধটা কিছুতেই নিতে পারে না। কেমন যেন একটা বিটকেল গন্ধ। ভাঙা বাড়িটা যতই কাছে আসছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটা চিমসে দুর্গন্ধের প্রভাবও বাড়ছে। এই বাড়ির মধ্যে ইঁদুর, বাদুড়, চামচিকে, ছুঁচো সবই থাকতে পারে। হয়তো এসব তাদেরই সম্মিলিত দেহসৌরভ!

“ব-ল হ-রি, হ-রি-বো-ল। ব-ল হ-রি, হ-রি-বো-ল!”

হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে একদল মানুষের শোরগোল ভেসে এল। একমুহূর্তের জন্য পবিত্র কেঁপে ওঠে। এটা অনভিপ্রেত কিছু নয়। গুল্লু বলেছিল, কাছেই শ্মশান। সুতরাং হরিধ্বনি ভেসে আসাটাই স্বাভাবিক। মানুষও দিন, কাল, সময় কিংবা তিথি, নক্ষত্ৰ দেখে মরবে, তেমন কোনো কথাও নেই। শ্মশান থাকলে যে কোনোসময়েই হরিধ্বনি শোনা যাবে। কিন্তু ঐ মুহূর্তে, ঐ ভাঙা ‘খণ্ডহরের’ অন্ধকার ঝোপঝাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই চিৎকারটা কেমন যেন একটা অশুভ বার্তা বয়ে আনল তার মনে। সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নয়। তবু ওই মিটমিটে আলোর মধ্যে, ছায়া ছায়া শম্পগুল্মের ভিড়ে একটি প্রাচীন ভাঙা বাড়ির শবদেহের সামনে হরিধ্বনির আওয়াজ বিপদসঙ্কেতের মতো ঠেকল তার। নিজের এই আশঙ্কিত চিন্তাভাবনাকে অতিক্রম করার জন্য পবিত্র ফের আস্তে আস্তে বলে, “রাজা, তুমি কি কখনও রামসে ব্রাদার্সের ‘ভিরানা’ ফিল্মটা দেখেছ?” অধিরাজ একটু বিরক্ত হয়েই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়, “হুঁ।”

“তোমার মনে হয় না এই স্পটটা অবিকল ভিরানার পেত্নীটার বাড়িটার মতো? ব্যস, এখন শুধু সুন্দরী জ্যাসমিনকে লাগবে…!”

অধিরাজ এবার একরকম হাল ছেড়ে দিয়ে ফের থমকে দাঁড়াল। তারপর তার দিকে ফিরে বিরক্তিমাখা রাগ রাগ দৃষ্টিতে গম্ভীরমুখে তাকায়। দুই হাত কোমরে রেখে একদৃষ্টে ওকে দেখছে। পবিত্র তাকে থেমে যেতে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে, “কী হল? আবার গোখরো?”

“না। তোমার এক্সপেক্টেশন।” সে হতাশভাবে দু-হাত ছড়িয়ে বলে, “শুরুটা কী করেছ? এক্সপেক্টেশনেরও একটা লিমিট আছে! তোমার অ্যাকচুয়াল চাহিদাটা কী? প্রথমেই তুমি তমপিশাচের অর্ডার করলে। নেক্সট বাঘ আর বুনিপও এল। তারপর ডাইনোসরের প্রত্যাশাও হল। এখন দেখছি সুন্দরী পেত্নী জ্যাসমিনের আবদার করছ। আগে ক্লিয়ার করো যে এগজ্যাক্টলি তুমি চাও টা কী! এবার প্লিজ একদম ফাইনালি বলবে। তারপর না-হয় ভেতরে ঢুকে দেখব যে আদতে কী আছে!” পবিত্র অপ্রতিভ হয়ে বলে, “স্যরি… এক্সট্রিমলি স্যরি…!”

“ব্যাপারটা স্যরি বলার মতো সিরিয়াস কিছু নয়।” অধিরাজ এবার একটু নরম স্বরে বলে, “আমি জানি, তুমি স্ট্রেস কমানোর জন্যই বেশিরভাগ সময় এই জাতীয় ফিচলেমি করে থাকো। বিলিভ মি, আমরা প্রত্যেকেই ট্রিমেন্ডাস প্রেশারে আছি। এখানে জোরদার একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে প্লিজ, নিজেকে সামলানোর চেষ্টাটা অ্যাট লিস্ট করো। একটু আগেই একটা অ্যাটাক হয়েছে, মিস্ বোস হসপিটালে, বার্নিং শিখ সামনের ভগ্নস্তূপে ঢুকে বসে আছে, এই ঘাসের মধ্যে কোথায় গোখরো, কোথায় লাউডগা ঠিক নেই। এখন আমি ওকে ধরার চেষ্টা করব? না তোমার বায়নাক্কা সামলাব?”

পবিত্র এবার সিরিয়াস হয়ে বলল, “ওকে। প্লিজ, লেট্স্ গো।”

অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে পরিচিত ভঙ্গিতেই এগিয়ে গেল। গাছপালার ঝোপঝাড়ের মধ্যে বেশ কিছু ক্যাকটাসও আছে। হাতে, পায়ে কাঁটার খোঁচাও খাচ্ছে অবিরত। কাঁটার খোঁচায় বা ঘষা খেয়ে চুনী চুনী রক্তবিন্দু ফুটেও উঠছে। তা সত্ত্বেও যেভাবে একটাও শব্দ না করে অতি সন্তর্পণে এগোচ্ছে সে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পবিত্রও এবার একদম বাধ্যভঙ্গিতে তাকে অনুসরণ করছে। সচরাচর যে লিড করে, রাস্তা বানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তারই। বাকিরা তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তাই অধিরাজকে যতখানি শ্রম দিতে হচ্ছিল, পবিত্রকে অতটা দিতে হয়নি। তবুও ক্যাকটাসের কাঁটা তাকেও রেয়াত করছে না। মনে মনে বার্নিং শিখের চোদ্দপুরুষকে উদ্ধার করছিল পবিত্র। লোকটা থাকার জন্য আর জায়গা পায়নি! কেন? একটা ভদ্রস্থ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাড়িতে ঢুকলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? কিন্তু এটা অধিরাজকে বলা যাবে না। বললেই সে চোখ কপালে তুলে বলবে, “এখন তোমার ফাইভস্টার অ্যাকোমোডেশনও চাই! চাহিদার তো শেষ নেই দেখছি।”

বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখতে যতটা ভয়ানক, ভেতর থেকে আরও বেশি। কোনায় কোনায় কালো অন্ধকার শিকার ধরার অপেক্ষায় বসে আছে। হিমশীতল হাওয়া মাঝেমধ্যেই ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কোনোরকমে বন-বাদাড় পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই যেন গোটা শরীর ছ্যাঁৎ করে উঠল। এটা শীতকালের স্বাভাবিক শৈত্য নয়, উত্তুরে হাওয়ার হিমস্পর্শও নয়। এ বুঝি মর্গে রাখা মৃতদেহের মতো হিমশীতল। যেন বহুদিনের একটা প্রাচীন ও অনড় মৃত বাতাস এখানে পড়ে থেকে থেকেই পচে গিয়েছে। তার ভ্যাপসা গন্ধ, স্থির শীতলতা বড়োই অস্বস্তিদায়ক। এখন শীতের মরশুম হলেও তাপমাত্রা এতক্ষণ স্থির ছিল। কিন্তু এই প্রথম মনে হল, আশেপাশের টেম্পারেচার বুঝি আচমকাই ড্রপ করেছে। ভুলবশত হয়তো নেমে গিয়েছে হিমাঙ্কের নীচে। দুই অফিসারই শার্টের নীচে মোটা কটস্ উলের জামা পরেছিল। সোয়েটার বা কার্ডিগান আজকাল আউট অব ফ্যাশন। তাই কটস্ উল কিংবা গরম কোট, জ্যাকেটই ভরসা। তা সত্ত্বেও দু-জনেরই দেহে সামান্য হলেও কাঁপুনি ধরল।

অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। নিঃসন্দেহে এখানে সূর্যালোক ঢোকে। কারণ মাথার ওপরের ছাত অধিকাংশটাই ভেঙে গিয়েছে। ঘরের ভেতরেও যেভাবে স্বাস্থ্যবান ঘাস ও ঝোপের সমাহার, তাতেই স্পষ্ট ওরা সালোকসংশ্লেষের জন্য প্রয়োজনীয় আলোও পায়। এখন বাইরের চাঁদের ম্লান আভাও দিব্যি এসে পড়েছে ভেতরে। তা সত্ত্বেও হাওয়ায় এত প্রাচীন শীতলতা কেন। পুরো পরিবেশটাই অস্বাভাবিক!

অধিরাজের চোখের সামনে হঠাৎই আরও একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। অবিকল এমন না হলেও সেই ভয়াবহ স্লটারহাউজের কথা এক সেকেন্ডের জন্য হলেও মনে পড়ে যায়। এই কেসটা আসার পরে নিজের মস্তিষ্কও তার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই একটা বিপজ্জনক খেলা শুরু করেছে। বারবার ‘সার্জিক্যাল স’ কিলারের সেই কলঙ্কিত অধ্যায় মনে করিয়ে দিচ্ছে, যা সে আপ্রাণ ভুলতে চায়। কখনও ক্রাইম সিনে, কখনও গুপ্ত আড্ডায় বারবার সেই টুকরো টুকরো পুরোনো দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। ক্ষণিকের জন্য প্রচণ্ড একটা ভয় তাকে গ্রাস করে নেয়। মনে হয়, সেই লোকটা বুঝি বিকৃত ঝাঁঝরা দেহ নিয়ে ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়েই শীতল নিঃশ্বাস ফেলছে!

কী কষ্টে যে অধিরাজ নিজেকে সামলে নিল তা শুধু তার অন্তর্যামীই জানলেন। তার কপালে ফের বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে। তবু আপ্রাণ নিজেকে স্বাভাবিক রেখে অতি সাবধানে চতুর্দিকটা মেপে নিল। অনভিপ্রেত দৃশ্য আর অভিজ্ঞতাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখছে। আশেপাশে কি কেউ আছে? কিংবা কোথাও কোনো শব্দ? কোনো ছায়া? অন্ধকারের সঙ্গেও কেউ মিশে থাকতে পারে। গুল্লু লোকটাকে বেরোতে দেখেনি। সুতরাং নির্ঘাত সে এখানেই আছে। কিন্তু তার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না কেন!

ভেতরে পা দেওয়া মাত্রই দুই অফিসার ওই ঝোপের মধ্যেই নিজেদের লুকিয়ে ফেলেছিল। কয়েক মিনিট সেভাবেই থাকার পর ও ভালোভাবে চতুর্দিকটা মেপে নেওয়ার পরে অধিরাজ নিজের দীর্ঘদেহটাকে গুটিয়ে, ওই গুল্মের ঝাড়ের মধ্য দিয়েই গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেল। পবিত্রকে হাতের ইশারায় ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে সে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। এখানেও যথারীতি ক্যাকটাসের ঝোপ রয়েছে। তবে অতিকষ্টে কিছুটা এগোনোর পরই দেখা গেল ঘরের একদিকটায় কোনোরকম ঝোপ বা আগাছা নেই। ঘরটা বাইরে থেকে যতটা ছোটো মনে হয়েছিল, আদতে তাও নয়। বরং বেশ বড়ো। অন্তত একটা বিশাল প্রাকৃতিক গুহার সাইজের। তার একদিক জঙ্গলে আচ্ছন্ন হলেও অন্যদিকটা কে যেন সযত্নে কেটে, আগাছা মুড়িয়ে দিব্যি পরিষ্কার করে রেখেছে। মেঝে বলে বিশেষ কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না। তবু কিছু ইট চাপিয়ে, সিমেন্টের প্রলেপ লাগিয়ে মোটামুটি চলনসই করে নিয়েছে কেউ। তার ওপর কিছু ইটের পাঁজার ওপরে বিরাট বিরাট পাথরের স্ল্যাব চাপিয়ে তৈরি করে ফেলেছে আস্ত টেবিল। টেবিলের ওপরে কিছু জিনিসপত্র, প্রচুর শিশি বোতল রাখা আছে। নীচেও অনেক কিছুই আছে, তবে এই আবছায়া পরিবেশে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।

অধিরাজ দু-তিন মিনিট স্থির হয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল যে আশেপাশে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা। কিন্তু চতুর্দিকের খাঁ খাঁ শূন্যতা প্রমাণ করে দিল যে এখানে আপাতত কেউ নেই। এই ঘরটার সংলগ্ন আরও কিছু ছোটো ছোটো ঘর আছে। সেখানে থাকলেও থাকতে পারে। তবে আপাতদৃষ্টিতে কারোর উপস্থিতির লক্ষণ নেই। সে এবার হাতের ইশারায় পবিত্রকে এগিয়ে আসতে বলল। নিজে একদম নিঃশব্দে এগিয়ে গেল টেবিলটার দিকে। তার হাতের মোবাইলের টর্চটা জ্বলে উঠল ঠিকই। তবে অধিরাজ টর্চের মুখের সামনে হাত রেখে সেটার আলোটাকে যথাসম্ভব স্তিমিত করেছে। এবার পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে প্রকট হল।

টেবিলের ওপরে বেশ কয়েকটা শিশিতে নানারকম তরল রয়েছে। কিছু তুলো, সার্জিক্যাল স্পিরিট, ড্রেসিং গজ—ইত্যাদি। কয়েকটা দেশলাই বাক্স ও সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট। এক সাইডে প্রমাণ সাইজের তিনটে তরোয়াল। তার পাশেই সেই মোক্ষম কৃপাণ! আলোয় তাদের শাণিত দেহ চকচক করে ওঠে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এগুলোর প্রত্যেকটাতেই ভয়াবহ ধার আছে। পবিত্র বিনাবাক্যব্যয়ে গ্লাভস পরে নেয়। তারপর অস্ত্রের একটাকে তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে। একদম পরিষ্কার, ঝকঝকে ইস্পাতের ফলা। সে ফিশফিশ করল, “মার্ডার ওয়েপন?”

“হ্যাঁ।” অধিরাজের স্বর তার চেয়েও নীচু, “ধুয়ে মুছে সাফ করে রেখেছে। তবে ল্যাবে নিয়ে গেলে ব্লাড ট্রেস আর ডি.এন.এ. পাওয়া গেলেও যেতে পারে।” বলতে-বলতেই সে-ও আগ্নেয়াস্ত্রটা কোমরে গুঁজে পকেট থেকে গ্লাভস বের করে পরে নেয়, “এভিডেন্স হিসেবে তুলে নাও। ইনি তো তৈরি লোক। এই দ্যাখো, আমার গিফট করা বুলেটটাও আছে। বলেছিলাম না, উনি নিজেই বের করবেন? সেটাই করেছেন। এটাকেও নাও, বিগ এভিডেন্স।”

পবিত্র সবিস্ময়ে দেখল স্পিরিটের বোতলের একপাশে একটা বুলেট পরে রয়েছে। কয়েকটা সার্জিক্যাল নাইফ আর স্কিন স্টেপলারও চোখ এড়াল না। সত্যিই তৈরি লোক! নিজের সার্জারি নিজেই করেছে। স্টেপলার দিয়ে স্টিচও মেরেছে! অথচ নড়াচড়া, লাফঝাপ দেখলে কেউ বলবে।

টেবিলের নীচে তিনটে পাঁচ লিটারের বড়ো বড়ো তেলের জেরিক্যান। কোমল কৌরের বাড়ি খুঁজে ওরা যা পায়নি, সম্ভবত এটাই সেই বস্তু। সেই পনেরো লিটার পেট্রোল এখানেই মজুত করা আছে। তবে একটা জেরিক্যান বেশ কিছুটা খালি। সেটা লক্ষ্য করেই একটু চিন্তায় পড়ল অধিরাজ। কিছু পেট্রোল এখান থেকে গায়েব! বিষয়টা মোটেই খুব স্বস্তির নয়। তবে ওটার প্রয়োগ এখনও হয়নি। তাই কিছু বলা বা আন্দাজ করা মুশকিল। এছাড়া কোনোরকম গ্যাসের কন্টেনারও চোখে পড়ল না। ওগুলো কি তবে অন্য ঘরে রাখা আছে? বা অন্য কোথাও?

“ডক্টরস্ ব্র্যান্ডি।”

পবিত্র টেবিলের ওপরে রাখা শিশিগুলো খুলে খুলে শুঁকে দেখছিল। সবগুলোর মধ্যেই কিছু না কিছু লিকুইড আছে। একটার মধ্যে নিরীহ স্পিরিট আছে। একটা ডক্টরস্ ব্র্যান্ডির, তার পাশেরটা টার্পেন্টাইন অয়েলের। একটা জলের মতো স্বচ্ছ তরল। গন্ধও সামান্য ঝাঁঝালো হলেও তেমন কিছু সন্দেহজনক নয়। ওষুধ-বিষুধ কিছু হবে হয়তো। আর একটা বোতল খুলে নিঃশ্বাস টানতেই কেমন যেন মাথা ঘুরে যাচ্ছিল তার। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “রাজা, ক্লোরোফর্ম।”

“শুধু ক্লোরোফর্ম নয়…।” অধিরাজ ততক্ষণে ওই বিরাট টেবিলের অন্য প্রান্তে চলে গিয়েছিল। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতরে গুঁড়ো গুঁড়ো বিজাতীয় পাউডার দেখে কৌতূহলী হয়ে খুলে পরীক্ষা করছিল। এবার শুঁকে দেখে প্যাকেটটা পবিত্রর দিকে এগিয়ে দিয়েছে, “গঞ্জিকাও স্টক করে রেখেছেন। এর কিছুটাই মিস্ বোসের মার্লবোরোর প্যাকেটে গেছে। মহা ত্যাঁদড় লোক। সেডেটিভ, ড্রাগের আমদানি বন্ধ করে দিয়েছি বলে এখন গাঁজা, ক্লোরোফর্ম, এইসব জুটিয়ে বসে আছে।”

“গাঁজা তো মিস্ বোসের জন্য।” পবিত্র চিন্তায় পড়েছে, “ক্লোরোফর্ম কি তবে মিস্ দত্তের জন্য রেডি হচ্ছিল? উনি স্মোক করেন না। কিন্তু চা, কফি তো খেয়েই থাকেন। লিকুইড ক্লোরোফর্ম পরিমাণ মতো মিশিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে।”

“হতে পারে।” সে মাথা নাড়ে, “অসম্ভব কিছুই নয়। ক্লোরোফর্ম ঘুমের ওষুধের সাবস্টিউট হতেই পারে। আমি আশ্চর্য হব না যদি ইতিমধ্যেই ও ক্লোরোফর্ম দিয়ে একাধিক অ্যাটেম্পট করে থাকে। কিন্তু মিস্ দত্ত ফাঁদে পা দেননি। যা যা হাতের কাছে পাচ্ছ, সব তুলে নাও। গাঁজা, ক্লোরোফর্ম, টার্পেনটাইন, স্পিরিট, বুলেট থেকে শুরু করে পেট্রোলের জেরিক্যান পর্যন্ত। তরোয়ালগুলো আমি নিয়ে নিচ্ছি। কৃপাণ আর ছুরিগুলোও। সব এভিডেন্স হিসাবে গাড়িতে রাখব। ওর হাতে আক্রমণের জন্য কোনো অস্ত্রই থাকবে না।” বলতে বলতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, “তারপর দেখি, ও শেষ কয়েকঘণ্টায় কী করে বাজিমাত করে।”

পবিত্র জিনিসগুলো তুলে নেওয়ার জন্য এগিয়েই যাচ্ছিল। তার আগেই গোটা ঘরের ছাত কেঁপে উঠল সুরেলা হুইস্লে। কে যেন খুব সুরে, মিষ্টি শিস দিয়ে সুর ভাঁজছে, “গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই…!”

পবিত্র শিউরে ওঠে। তার গায়ের রোম একধাক্কায় খাড়া হয়ে গিয়েছে। অধিরাজ চমকে উঠল। কী সর্বনাশ! তার মানে লোকটা আগাগোড়া এখানেই উপস্থিত। গুল্লু ভুল বলেনি। সে এতক্ষণ এখানেই ছিল। হয়তো অন্য কোনো অন্ধকার ঘরে লুকিয়েছিল বলে তার অস্তিত্বের টের পায়নি। লোকটা আড়াল থেকে তাদের দেখেছে, হয়তো বা সব শুনেওছে! তবে সে নিজে এখানে সশরীরে উপস্থিত নেই। কারণ এই মুহূর্তে শব্দটা ভেসে আসছে অন্য কোনো ঘর থেকেই। এই সুরের উৎস বড়ো ঘরটা নয়। অথচ উঁচু ছাতের প্রতিটা ইটে ধাক্কা খেয়ে এমন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তাতে মনে হয় বুঝি একদম সামনে দাঁড়িয়ে শিস দিয়ে চলেছে কেউ!

“রাজা। ইটস আ ট্র্যাপ।” পবিত্র দাঁতে দাঁত পিষল, “হারামজাদাটা জানত আমরা এখানে আসব। ও আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। গুল্লু কিংবা ওর টিমের কেউ বেইমানি করেছে!”

শিস্ থেমে গিয়ে এবার জোরালো হাসির শব্দে কাঁপতে শুরু করেছে গোটা ঘরটা। পাগলের মতো কে যেন ব্যঙ্গমিশ্রিত অট্টহাসি হাসছে। তার হাসিতে এত কৌতুক যে শুনলেই বোঝা যায় যে এই দুই অফিসারের অসহায়তা সে ভীষণভাবে উপভোগ করছে। তার সেই উন্মত্ত হাসি প্রমাণ করে দিল যে পবিত্র-র আশঙ্কাই একশো শতাংশ সত্যি! সরষের মধ্যেই ভূত আছে!

অধিরাজের হাতে আবার বিদ্যুৎবেগে ফণা তুলেছে আগ্নেয়াস্ত্র। যদিও এখনও স্পষ্ট নয় যে আওয়াজটা আসলে আসছে কোথা থেকে। তবু সে তার স্বভাববিরুদ্ধ উচ্চস্বরে যেন খানিকটা শুনিয়ে শুনিয়েই বলল, “না পবিত্র। ও কিচ্ছু জানত না। যদি জানত তবে তেলের জেরিক্যান, তরোয়াল, কৃপাণ আর ছুরি এখানেই রেখে দিত না। এটা ওর বহু পুরোনো, ক্লিশে হয়ে যাওয়া বাবা আদমের জমানার স্ট্র্যাটেজি! ওর জাতভাই বেয়ন্ত সিংও গোটা শিখজাতিকে বেইমান প্রুভ করেছিল, ইনিও অবিকল তাই করছেন। ও স্রেফ তোমায় নাচানোর চেষ্টা করছে, আর তুমিও ওর তালে তালে নাচছ।

বাট, আই অ্যাম নট আ ডান্সিং এক্সপার্ট। তাই নাচতে আমার প্রবল আপত্তি আছে।”

তার বলা শব্দগুলো গমগম করে উঠল গোটা ঘরে। যে ব্যক্তি এতক্ষণ হাসছিল, এবার হঠাৎই ফের চুপ করে গেল। প্রতিপক্ষ যে তার চাল ধরতে পেরেছে সেটা বুঝতে পেরে হয়তো থতোমতো খেয়ে গিয়েছে সে। এটা একেবারেই ‘আশাতীত! পুলিশের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলে খেলে অভ্যস্ত দুষ্কৃতী আবার যেন জোরদার একটা ধাক্কা খেল। আসল লোকটাই তার ফাঁদে পা দেয়নি। অথচ একটু আগের তেলের ট্যাঙ্কারে র‍্যান্ডম শ্যুটিং এর ঘটনায় মনে হয়েছিল, সে সফল হয়েছে। মনে মনে বীভৎস মজা অনুভব করেছিল। কিন্তু নাঃ। আবার ব্যর্থতা। সবটাই এই লোকটা বুঝে ফেলেছে। তার ওপর কিনা তার তুলনা বেয়ন্ত সিং-এর সঙ্গে করছে। ঠান্ডা মস্তিষ্কের খুনির মাথায় এবার রক্ত চড়ে যায়। শেষে তাকে আর বেয়ন্ত সিংকে এক করে দিল। এত বড়ো দুঃসাহস!

হঠাৎ নেমে আসা নৈঃশব্দের পেছনে অপরাধীর হতবিহ্বল অবস্থা আন্দাজ করে মনে মনে হাসল অধিরাজ। বেয়ন্ত সিং নামক ‘দুখতি রগে’ হাত পড়েছে। দাওয়াইও কাজ করেছে। ওভার কনফিডেন্ট ক্রিমিনালদের এটাই স্বভাব। প্রতিপক্ষকে তারা আন্ডার এস্টিমেট করে। সে এবার ব্যঙ্গমিশ্রিত ঠান্ডা স্বরে বলে, “যাঃ মিঃ লাফিং বুদ্ধ। আপনি যে গৌতম গম্ভীর হয়ে গেলেন! আপনার নিজেকে সবজান্তা গেঞ্জিওয়ালা প্রমাণ করার চেষ্টা বিফলে গেল বলে দুঃখ করবেন না। নতুন কিছু ভাবুন। লেটস্ স্টার্ট ইট অ্যাফ্রেশ। ট্রাই মি। পুলিশ হয়ে বাতেল্লা দিতে ভালো লাগে না। কৃপা করে দেখা দেবেন কি? না আমাদেরই খুঁজতে হবে?”

কথাগুলো সে মুখে বললেও তার সন্ধানী চোখ লোকটাকে খুঁজছিল। পবিত্র-র বুঝতে অসুবিধে হল না যে অধিরাজ বার্নিং শিখকে ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রোভোক করছে। নয়তো সে সি.আই.ডি. সিরিয়ালের এসিপি প্রদ্যুম্নের মতো অপরাধীর সামনে দাঁড়িয়ে বিরাট জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেওয়ায় একেবারেই বিশ্বাসী নয়। নিজের ক্ষণিকের সন্দেহ ঝেড়ে ফেলে সে-ও রিভলবার তাক করে পূর্ণদৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে নির্দেশের অপেক্ষায় তাকায়। অধিরাজ তাকে চোখের ইশারায় একটি অন্ধকার ঘরের দিকে যেতে বলল। সে নিজেও গুটিগুটি পায়ে উলটোদিকের ঘরটার দিকে নিঃশব্দে এগোল। শিস এবং হাসির শব্দ এখান থেকেই হয়তো আসছিল। মুখে কিন্তু বক্তৃতা থামাল না, “আপনি তো দেখছি ভিন্দ্রানয়ালের চেয়েও লাজুক। সে স্বর্ণমন্দিরে লেজ গুটিয়ে লুকিয়ে বসেছিল, আপনিও অন্ধকারে লুকিয়ে বসে আছেন। বিশেষ পার্থক্য নেই। বাই দ্য বাই, আপনারা সবাই কি এরকমই কাওয়ার্ড?”

বেয়ন্ত সিং-এর নাম শুনেই গায়ে জ্বালা ধরেছিল। এবার ভিন্দ্রানয়ালের নামটা আর নিতে পারল না দুষ্কৃতী। সে থাকতে না পেরে গর্জন করে উঠল, “বেয়ন্ত আমার কেউ না। ভিন্দ্রানয়ালেও নয়। আমি ওদের মতো কাপুরুষ, নামর্দ, বেইমান নই।” কথাটা শুধু বলার অপেক্ষা। তার কণ্ঠস্বর এবার ভেসে আসতেই অধিরাজ নিঃসন্দেহভাবে বুঝতে পারল যে লোকটা ঠিক কোথায় আছে। এখন শব্দভেদী বাণের জমানা নয়। কিন্তু তার মতো একজন সর্বগুণসম্পন্ন শাপশ্যুটার শুধু আওয়াজ শুনেই নিশানা লাগাতে সক্ষম। টার্গেট স্থির ও রেঞ্জের মধ্যে থাকলে অধিরাজ চোখ বুজেও শ্যুট করতে পারে। সে বিদ্যুৎগতিতে একদম পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে স্ট্রেট ফায়ার করল। আগ্নেয়াস্ত্র’র গর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই একটা দেহ পড়ে যাওয়ার ভারি শব্দ। লেগেছে।

যে ঘরটা থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ এল, ঠিক সেদিকেই গুটি গুটি পায়ে এগোল দুই অফিসার। গুলি লাগলেও আঘাতটা হয়তো বিপজ্জনক হয়নি। অধিরাজ একটা চাপা অথচ ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। লোকটা জখম, তবে মরেনি। তাই তাড়াহুড়ো করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যেখানে সে আছে, বাড়ির ওই দিকের ছাতটা এখনও টিকে আছে। তাই ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে রয়েছে।

ওরা দু-জনেই সেই অন্ধকারের দিকে সবে পা বাড়িয়েছিল, তার আগেই কানের কাছে অদ্ভুত একটা গড়গড় শব্দ। একাধিক ভারি জিনিস যেন গড়াতে গড়াতে এদিকেই আসছে। পবিত্র থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। অধিরাজও সন্দিগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছে যে আওয়াজটা ঠিক কীসের। তবে বুঝতে খুব বেশি দেরিও হল না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সামনে প্রকট হল একজোড়া এল পি জি গ্যাস সিলিন্ডার। তার সঙ্গে গ্যাসের ভয়াবহ দমবন্ধ করা গন্ধ। বার্নিং শিখ সিলিন্ডারদুটোর মুখ খুলে দিয়েছে। এখন সামান্যতম স্পার্ক হলেই বিস্ফোরণ অবধারিত!

পবিত্র প্রমাদ গুনল। এই পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা যাবে না। গ্যাস একদম হুড়হুড় করে বাতাসে মিশছে। শয়তানটা যদি একটা দেশলাই বা লাইটারও জ্বালে, তবে ওরা তিনজনেই উড়ে যাবে। বাঁচার সম্ভাবনা একদমই নেই। অধিরাজের কানে হালকা একটা শব্দ আসে। ও পক্ষ কি লাইটার জ্বালানোর চেষ্টা করছে?… কী সৰ্বনাশ!

সে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই দৌড়োল সেই জমা অন্ধকারের মধ্যেই। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পবিত্র শুনতে পেল দুটো ভারি দেহের সংঘর্ষের আওয়াজ। একটা ধাতব জিনিস সশব্দে মাটিতে ছিটকে পড়ল। বোধহয় লাইটারটা। তার বিস্মিত দৃষ্টি অন্ধকার একটু সইয়ে নিতেই দেখতে পেল যুযুধান দুইপক্ষকে। কিছুক্ষণের জন্য সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবছিল কী করবে। তার আগেই অধিরাজ লোকটার প্রায় টুটি টিপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে বের করে আনল সেই ঘর থেকে। চোখের সামনে জলজ্যান্ত বার্নিং শিখকে দেখে হাড় হিম হয়ে যায় পবিত্র-র। এত কাছ থেকে এই তয়াবহ রূপ সে কখনও প্রত্যক্ষ করেনি। কমলার ছদ্মবেশেও ওকে এতটা ডেঞ্জারাস মনে হয়নি। কী বীভৎস ওর মুখের পোড়া জায়গাটা! একটা চোখ নেই। অন্য চোখটায় কী ভয়াবহ রাগ আর প্রতিশোধস্পৃহা। এক মুহূর্তের জন্য তারও মনে হল, এ মানুষ নয়। হতেই পারে না!

“স্যরি পবিত্র।” অধিরাজ দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “সুন্দরী জ্যাসমিনকে না পেলেও তোমার তমপিশাচকে পেয়েছি। প্রাণ ভরে দেখে নাও ওঁর হ্যালোউইন মেক-আপ৷” এ চেহারা তমপিশাচকেও ভয়াবহতায় হার মানাবে। পবিত্র দেখল লোকটার হাত বেয়ে রক্ত পড়ছে। গুলিটা হাতের মাংস চিরে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। বুলেটপ্রুফ ভেস্ট বুক, পেট, কাঁধকে রক্ষা করলেও হাতকে সুরক্ষা দেয় না। তাই সেও আহত হয়েছে। অধিরাজ আরও কিছু বলার আগেই লোকটার হাত গিয়ে ছোবল মারল তার জখম কাঁধে। যেখানে সে কৃপাণ বসিয়েছিল, ঠিক সেই পয়েন্টটাতেই আঘাতটা পড়েছে। অধিরাজ যন্ত্রণায় কাতরে ওঠে। তার হাতও শিথিল হয়ে গেল কয়েকমুহূর্তের জন্য। সেই সুযোগেই খুনি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। সে দৌড়োল পাথরের টেবিলের দিকে। পবিত্র-র মনে পড়ে যায়, ওখানে এককোণে কয়েকটা দেশলাইবাক্সও দেখেছিল! লাইটারটা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে বলে এখন দেশলাইয়ের প্যাকেটের দিকেই দৌড়চ্ছে! একদিকে গ্যাসের সিলিন্ডার নির্বিবাদে গ্যাস ছড়িয়ে চলেছে। তার ওপর তিনটে পেট্রোলের জেরিক্যান এখানে উপস্থিত। যদিও আধভাঙা ছাতের দৌলতে কিছুটা হলেও গ্যাস বেরিয়ে যাবে, কিন্তু তবুও বিপদের সম্ভাবনা কম নয়। কারণ এই গ্যাসগুলোও ওপর দিকে ওঠে না, বাতাসের চেয়ে ভারি হওয়ার দরুণ মাটির দিকে থিতিয়ে পড়ে। যার জন্য ওকে তাড়ানোর জন্য ফ্যান বা ওই জাতীয় ফোর্স লাগে। এখানে সেসব কিছুই নেই! একটু স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষামাত্র। তারপর এই গোটা বাড়ি সবই বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে!

সে লোকটার দিকে বন্দুক তাক করেছে, “হ-ল্ট! ওখানেই দাঁড়া। নয়তো এনকাউন্টার করে দেব।”

বার্নিং শিখ তার দিকে তাকিয়েছে। নিষ্প্রভ আলোয় তার মুখটা অবিকল একটা বীভৎস লাশের মতো দেখাল। অদ্ভুত একটা হাসি হেসে বলল, “গুলি করবি? কর!”

এবার পবিত্র রীতিমতো ঘামছে। সে জানে যে এই পরিস্থিতিতে ফায়ার করা যাবে না। স্রেফ ওকে থামানোর জন্যই আলপটকা বলে দিয়েছিল। কিন্তু এ লোকও সেয়ানা। ও জানে যে এই মুহূর্তে দুই অফিসারের অবস্থাই নির্বীর্য বিষদাঁতহীন সাপের মতো। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আছে ঠিকই, অথচ কাজে লাগবে না। এতটাই কনফিডেন্ট যে গান পয়েন্টে থাকা সত্ত্বেও থামেনি। বরং সবেগে এগিয়ে যাচ্ছে দেশলাই বাক্সগুলোর দিকে…!

সে আর কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক সজোর লাথি মেরে তাকে ছিটকে ফেলল একদম ওই ঝোপঝাড়ের মধ্যে। পবিত্র কয়েক কদম এগিয়ে যেতে না যেতেই সে স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো পালটা লাফ মেরে উঠে দাঁড়িয়ে পবিত্র-র তলপেটে এক ঘুষি বসিয়ে দেয়। আঘাতটা এতটাই তীব্র যে তার মতো অভিজ্ঞ অফিসারও ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছে। অদ্ভুত লোক তো! কিছুতেই হার মানবে না। পবিত্র প্রথম আঘাতটা সামলে ওঠার আগেই পরপর দুটো ঘুষি এসে পড়ল তার মুখে। একটা চোখের ওপর, আর একটা ঠোঁট ঘেঁষে। দুটোই তুলনামূলক নরম জায়গা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পবিত্র-র মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হল, চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। ঠোঁটের কষ বেয়ে উষ্ণ কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে। সে তবুও হাল ছাড়ে না। বরং এবার নাছোড়বান্দার মতো বার্নিং শিখকে পেছন দিক দিয়ে প্রাণপণে চেপে ধরল। কিন্তু তাও মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য। লোকটা হাতাহাতিতে রীতিমতো ওস্তাদ লোক। সে বিদ্যুৎবেগে কনুই দিয়ে তার নাকে গুঁতো মেরেছে। এত জোরদার তার মার যে পবিত্রর মনে হল, তার নাকের হাড়ই বুঝি ভেঙে গিয়েছে। চেহারায় ছোটখাটো হওয়ার দরুণ মানুষটার স্পিড বেশি। এবং নাতিদীর্ঘ চেহারার সুবিধা সে দীর্ঘদেহী অফিসারদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ সফলভাবে নিচ্ছে। পবিত্র প্রত্যাঘাত করার আগেই আবার একটা জোরালো পাঞ্চ তার কানের ঠিক নীচে! বেকায়দায় পড়েছে। সে সামলে উঠে আর কিছু করার আগেই বার্নিং শিখ একলাফে পৌঁছে গিয়েছে টেবিলের দিকে। সবেগে ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছে দেশলাইয়ের বাক্স…! অসম্ভব দ্রুতবেগে একখানা কাঠিও বের করে এনেছে বাক্স থেকে…। পবিত্র দেখল তার ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি…। চতুর্দিকে গ্যাসের গন্ধ…। কয়েক লিটার পেট্রোল…. সে আফশোশে চোখ বুজল!

“পবিত্র… রান্!”

বার্নিং শিখ দেশলাইটা ধরানোর আগেই চিতার ক্ষিপ্রতায় তার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়েছে অধিরাজ। পবিত্র-র সঙ্গে তার হাতাহাতি পর্ব এতটাই দ্রুত ছিল যে তখন সে কিছু করার সুযোগ পায়নি। কাঁধের তীব্র যন্ত্রণায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও অবশ হয়ে গিয়েছিল। বেশি সময়ের জন্য নয়, মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তার মধ্যেই পবিত্র আর বার্নিং শিখের মধ্যে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চলছিল। সেলাইটা এই নিয়ে তৃতীয়বার কাটল। অধিরাজ টের পাচ্ছিল তার শরীর বেয়ে উষ্ণ একটা তরল ক্রমাগত বেরিয়ে যাচ্ছে। কটস উলের গরমজামাটা ছাপিয়ে তাজা রক্তের দাগ দেখা দিল শার্টেও। তাও সে সর্বশক্তি দিয়ে লাফিয়ে পড়েছে আততায়ীর ওপরে। তার আঘাতের আকস্মিকতায় দেশলাইটা বার্নিং শিখের হাত থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়ে। সে কোনোমতে লোকটাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই সপাটে একটা আছাড় মেরে মাটিতে পেড়ে ফেলে চেঁচিয়ে বলল, “এই মুহূর্তেই এখান থেকে বেরিয়ে যাও…। সঙ্গে মার্ডার ওয়েপনগুলোও নিয়ে নাও।… জাস্ট রান…! ওকে আমি দেখছি….!”

‘রান’ মানে! পবিত্র স্তম্ভিত। অধিরাজ কি তাকে পালিয়ে যেতে বলছে! এইরকম জটিল পরিস্থিতিতে পশ্চাদপসরণ করার নির্দেশ দিচ্ছে? দু-দুটো গ্যাসের সিলিন্ডার খোলা অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, ওদিকে বদ্ধ উন্মাদ সাইকোটা লাইটার, দেশলাই যা পাচ্ছে জ্বালানোর চেষ্টা করছে! আগ্নেয়াস্ত্র থেকেও কোনো লাভ নেই। লোকটা কম্ব্যাটে ওস্তাদ। অধিরাজের ক্ষত ফের তাজা হয়ে গিয়েছে। ফের শুরু হয়ে গিয়েছে রক্তক্ষরণ। এই অবস্থায় তাকে একা ফেলে পবিত্র পালিয়ে গিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাবে!

তার জেদ চেপে যায়। কখনও না! সে গোঁয়ারের মতো ফের আক্রমণে গেল। ততক্ষণে বার্নিং শিখকে মেঝের ওপরে ফেলে তার সঙ্গে আপ্রাণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে অধিরাজ। হিংস্র খুনি কোনোমতে দেশলাই বাক্স অবধি পৌঁছোতে চাইছে, আর তাকে অসীম শক্তিতে আটকে রেখেছে সে। কিন্তু লোকটা তার জখম কাঁধটাকেই টার্গেট করে নিয়েছে। বারবার ওই দুর্বলতম জায়গাটিতেই ঘুষির পর ঘুষি বসিয়ে চলেছে। পবিত্র এগিয়ে গিয়ে তাকে নিরস্ত করতে যায়। কিন্তু দুষ্কৃতী তাকে লক্ষ্য করেই অধিরাজকে উলটে ফেলে, পবিত্রকে ঐ অবস্থাতেই জোরালো কিকে ছিটকে ফেলল! ওইটুকু চেহারা, অথচ তার গায়ে কী অসম্ভব শক্তি! এরকম অমানুষিক গায়ের জোর একমাত্র কোনো বন্য হিংস্র জানোয়ারের হতে পারে, অথবা কোনো উন্মাদের। পবিত্র-র মনে হল, বার্নিং শিখ বুঝি দুটোই।

লোকটা পবিত্রকে অ্যাটাক করতে যে খণ্ড মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকেই আবার তাকে মেঝেতে চিত করে ফেলে তার ওপর উঠে বসেছে অধিরাজ। পাগলের মতো তাকে একের পর এক ঘুষি মারতে মারতে ফের চেঁচিয়ে বলল, “পবিত্র, পালাও। ডাইনে-বাঁয়ে তাকাবে না। সোজা এখান থেকে বেরিয়ে যাও…। গো… গো!”

“তোমাকে একা ফেলে?” পবিত্র সজোরে প্রতিবাদ করে, “হারগিস না!”

“যা বলছি তাই করো।….” অধিরাজ এবার গর্জন করে ওঠে, “একসঙ্গে দু-জনের মরাটা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তুমি ওর কৃপাণ, ছুরি আর তরোয়ালগুলো নিয়ে স্রেফ কেটে পড়ো। পারলে আমার ছোঁড়া বুলেটটাও নাও। ওগুলোই ওর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। কৃপাণে ওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে, বুলেটে ডি.এন.এ. স্যাম্পলও হয়তো…!”

বার্নিং শিখ এই কথাটা শোনামাত্রই একেবারে মত্ত হাতির বলে অধিরাজকে নিজের ওপর থেকে সরাতে চাইল। সে নিজেও প্রতিপক্ষের বুদ্ধির মারটা বুঝেছে। ওই তরোয়াল থেকেই ফরেনসিক অনেক মারাত্মক এভিডেন্স বের করে ফেলবে। তরোয়ালটা যতই ধুয়ে মুছে রাখুক, উন্নত ফরেনসিক সায়েন্স তার মধ্যে থেকেই ঠিক অব্যর্থ প্রমাণ বের করবেই। ওগুলো তার অন্যতম মার্ডার ওয়েপন! সবচেয়ে বড়ো কথা, তরোয়াল আর ছুরির ওপর যদি তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নাও পাওয়া যায়, কৃপাণের ওপর পাওয়া যাবেই। কারণ কৃপাণটা সবসময়ই তার দেহের সঙ্গে লেগে থাকে। এটা তার দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই অবিচ্ছেদ্য। তাই এটার ওপর থেকে হাতের ছাপ মুছে ফেলার কথা কখনও ভাবেনি সে। তার ওপর আর কোথাও না থাক, কৃপাণ বা বুলেটটা থেকে তার ডি.এন.এ.-ও পেয়ে যেতে পারে। এতগুলো জায়গায় কোথাও সামান্যতম ক্লুও ছাড়েনি এই চতুর অপরাধী। এবার মনে হল, অধিরাজ ব্যানার্জি ঠান্ডা মাথায় তার জন্য ফাঁসির দড়ি তৈরি করছে। মার্ডার ওয়েপন আইনের জন্য সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ! সেই প্রমাণটাই ওদের হাতে চলে গিয়েছে।

সে এবার আফসোসে, নিজের মূর্খামির ওপর রাগে একেবারে চরম নির্মম, নৃশংস হয়ে উঠল। অধিরাজের কপালে, কাঁধে দুমদুম করে একের পর এক আঘাত করেই চলেছে। অধিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছিল। কিন্তু মুহুর্মুহু আঘাতে তারও যন্ত্রণা বাড়ছে। একটু কাতর শব্দ করে উঠল, “ওঃ।”

“রাজা।”

পবিত্র এগিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ফের নিরস্ত করেছে সে। সর্বশক্তি দিয়ে লোকটাকে ফের মেঝের ওপর চেপে ধরে বলল, “যা বলছি তাই করো। সমস্ত এভিডেন্স নিয়ে এখান থেকে কেটে পড়ো। ভুল করেও পেছনদিকে তাকাবে না। একটা অধিরাজ ব্যানার্জি শেষ হতে পারে, কিন্তু সি.আই.ডি. হোমিসাইড হারবে না। রান্‌ন… পবিত্র! অ্যান্ড ইটস মাই অর্ডার। মাইন্ড ইট!”

সে তবুও কিছুক্ষণ অসহায় ও বিহ্বলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের সামনে যেন দুই মহারথীর লড়াই চলছে! দু-জনেই সমান শক্তিশালী, দু-জনেই আহত। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়ছে না। কখনও অধিরাজের পাল্লা ভারি হচ্ছে, কখনও বার্নিং শিখের। বার্নিং শিখ হাত-পায়ের আঘাতে অধিরাজকে পরাহত করতে চাইছে। সাময়িক সফলও হচ্ছে। তার টার্গেট এখন দেশলাইয়ের বাক্স অবধি পৌঁছোনো। কিন্তু অধিরাজ আহত হচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, তবু কিছুতেই তাকে বাক্সটা তুলে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। কখনও লাথি মেরে উলটে ফেলে দিচ্ছে, কখনও বা চেপে ধরে টেনে সরিয়ে নিচ্ছে অন্যদিকে। দুই পক্ষের মধ্যে সমান রোষে হাতাহাতি ও খণ্ডযুদ্ধ হয়েই চলেছে। একজন বিস্ফোরণ করার জন্য মরিয়া, অন্যজন তাকে প্রাণপণ শক্তিতে প্রতিহত করছে। অথচ পবিত্র-র কিছুই করার নেই!

“দেখছ কী!” এবার অধিরাজ হাঁপাতে হাঁপাতেই গর্জন করে ওঠে, “যা বলছি তাই করো। এই সুযোগ। সমস্ত এভিডেন্স নিয়ে পালিয়ে যাও। আই রিপিট…. ইটস মাই অর্ডার, অ্যান্ড আই অ্যাম ইওর বস্!”

এতক্ষণে পবিত্র যেন সংবিৎ ফিরে পেল। সে আর কথা না বাড়িয়ে এক ছুটে টেবিলটার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। বার্নিং শিখ তাকে আটকাবার চেষ্টা করার আগেই অধিরাজ তাকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়েছে পবিত্র-র সামনে থেকে। হিংস্র গলায় বলল, “নট্‌ দিস টাইম। এই বাজিটা আমরা জিতবই। কেউ আটকাতে পারবে না! আর তরোয়াল, পেট্রোল তোর আর কোনো কাজের নয় মিঃ গুলশন সিং! ফর ইওর কাইন্ড ইনফর্মেশন, পি সি চৌধুরীর গোটা পরিবার দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। তুই তাদের কিস্যু ছিঁড়তে পারিসনি। একটা চুলও না!”

বার্নিং শিখ এতক্ষণ আপ্রাণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অধিরাজের এই তথ্যটা শুনে তার চোয়াল যেন ঝুলে পড়েছে। তার নিজের আসল নাম শুনে সে চমকে গিয়েছিলই। তার ওপর যখন শুনল পি সি চৌধুরীর পরিবার জীবিত, তখন একটা অদ্ভুত হতাশা তাকে ঘিরে ধরল। এতদিনের এত পরিশ্রম, এত উত্তেজনা, এত প্রচেষ্টার ফলাফল যখন শূন্য হয়, তখন হতাশা ও সাময়িক ক্লান্তি আসাই স্বাভাবিক। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ছিল যে পি সি চৌধুরীর পরিবারকে স্বয়ং ভগবানও বাঁচাতে পারবে না। অথচ সে গর্ব, সে আত্মবিশ্বাস এক নিমেষে ধূলিসাৎ! পরাজয় তার সহ্য হয় না। সে এই দুঃসংবাদটা আদৌ প্রত্যাশা করেনি। তাই সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য একটু স্থির হয়ে গেল। যেন মারপিট করতেও ভুলে গেল।

পবিত্র-র ওই বনবাদাড় ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিল। তবুও সে প্রাণপণে নিজেকে কাঁটার হাত থেকে মুক্ত করে আপ্রাণ ছুটল বাইরের দিকে। গ্লাভস পরা দুই হাতে সযত্নে ধরে রেখেছে সব এভিডেন্স। গাড়িতে এভিডেন্সব্যাগ আছে। ওখানে রেখে দিয়ে সিল করে দিতে হবে! আজ যদি পবিত্র মরেও যায় তবু এগুলো আহেলির কাছে পৌঁছে দিয়েই মরবে। সে ঝোপঝাড় ভেঙে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে। উদ্ধত গোখরোর ফণার থেকেও বড়ো ভয়, যদি কোনোমতে বার্নিং শিখ দেশলাই অবধি পৌঁছে যায়। যদি অধিরাজের কিছু হয়। সে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ক্লান্ত, আহত ও ক্ষতবিক্ষত। এই অবস্থায় কতক্ষণ পাগলটার সঙ্গে লড়বে?

পবিত্র সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে সমস্ত মার্ডার ওয়েপন, কৃপাণ ও বের করে আনা বুলেট নিয়ে সোজা দৌড়ে বেরিয়ে গেল লোকটার সামনে থেকে। দৃশ্যটা দেখেই ফের জ্বলে উঠল বার্নিং শিখ, অথবা গুলশন সিং। সে হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে একটা ইটের টুকরোই তুলে বসিয়ে দিয়েছে অধিরাজের মাথায়। কোনোমতে তাকে ছাড়িয়ে ফের দেশলাইয়ের বাক্সটা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সব বাজিই ওরা জিতবে। পি সি চৌধুরীকে ও তার পরিবারকেও বাঁচাবে, বার্নিং শিখের আসল নামও জেনে ফেলবে আবার কোর্টে সাবমিট করার জন্য এভিডেন্সও জোগাড় করে ফেলবে? অধিরাজ ব্যানার্জি নিজেকে সুপারম্যান ভাবে? দ্বিতীয় অফিসারটি সব কিছু নিয়ে হাপিশ হওয়ার আগেই সে সবাইকে সুদ্ধ এই জায়গাটাকেই উড়িয়ে দেবে। সবই যদি জ্বলে যায় তবে প্রমাণও থাকবে না, প্রমাণ করার লোকও নয়।

অধিরাজের মাথা ইটের আঘাতে ঝনঝন করছিল। কিন্তু সে দেখল পবিত্র এখান থেকে বেরিয়ে গেলেও ঝোপের মধ্যে আটকে গিয়েছে। বিশেষ করে ওই ক্যাকটাসগুলোকে এড়িয়ে এত অল্প সময়ে ওখান থেকে বেরোনো একেবারেই সহজ নয়। তার ওপর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তার শার্ট, প্যান্ট আটকে যাচ্ছে কাঁটায়, ঝোপে। ওকে আরও একটু সময় দিতে হবে। আর কিছু না ভেবে সে দাঁতে দাঁত পিষে ফের লোকটাকে পাকড়াও করেছে। ওকে শ্বাস নেওয়ার সময়টুকু না দিয়েই একের পর এক পাঞ্চ আর কিক মেরে ফের সরিয়ে নিয়ে গেল কিছুটা তফাতে। গুলশন কিছু বোঝার আগেই ওর মুখে, বুকে র‍্যান্ডম অ্যাটাক এসে পড়ছে। সে দু-হাত মুখের কাছে তুলে নিয়ে বক্সারদের মতো নিজেকে সেভ করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু অধিরাজ একেবারে রুদ্রমূর্তি ধরেছে। সে তাকে সামলে নেওয়ার সময়টুকুও দিচ্ছে না!

অধিরাজ তাকে ফিরে তাকাতে বারণ করেছিল। তবু দরজার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে পবিত্র করুণ, অসহায় চোখে তাকাল পেছন দিকে। অধিরাজের আক্রমণে বিধ্বস্ত বার্নিং শিখ কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়েই টেবিলের ওপর থেকে একটা শিশি তড়িৎগতিতে নিয়ে তার ভেতরের সমস্ত তরল ছুড়ে দিল প্রতিপক্ষের মুখে। অধিরাজ এই অদ্ভুত আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না। সে চোখ বুঁজে ফেলে হাত দিয়ে মুখের তরলটাকে সাফ করার চেষ্টা করছে। লোকটা সেই ফাঁকেই ফের দৌড়ে ঢুকে গিয়েছে সেই অন্ধকার ঘরে! এবার তার পেছন পেছন অধিরাজও দৌড়োল। পবিত্র-র বুকের মধ্যে ধড়াস করে ওঠে। কী ছিল লিকুইডটা? অ্যাসিড নয়তো! ও ওই ঘরে দৌড়চ্ছে। বুঝতে পেরেছে কিছুতেই দেশলাই উদ্ধার করতে পারবে না। জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে কিছুতেই ওদিকে যেতে দেবে না। তাই উলটোদিকেই ছুটেছে। ঐ অন্ধকার ঘরেরই কোনো কোণে পড়ে আছে সেই মারাত্মক লাইটার। ওটা যদি কোনোমতে ওর হাতে পড়ে…!

পবিত্র আর কিছু চিন্তা না করে সোজা ছুটল গাড়ির দিকে। বাড়ির সামনের ঝোপ, ঘাস, লতাপাতা এখনও তাকে বাধা দিচ্ছে, পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবু সব বাধা পেরিয়েই সে নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেল গাড়ির কাছে। উত্তেজনায়, উদ্বেগে তার হাত কাঁপছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এভিডেন্স ব্যাগে চটপট সব রেখে পবিত্র আবার দ্রুতবেগে পোড়োবাড়ির দিকে ফিরে গেল। তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। কে জানে, দু-জনের মধ্যে এখন কী হচ্ছে। বার্নিং শিখ কিছুতেই হারবে না, আর অধিরাজ মরে গেলেও তাকে ছাড়বে না। ওখানে শুধু পেট্রোলই নয়, স্পিরিট, টার্পেন্টাইনের মতো দাহ্য বস্তুও আছে। একবার যদি আগুন জ্বলে ওঠে, তবে সর্বনাশ হবে। অধিরাজ যদি একা লোকটাকে সামলাতে না পারে! হয়তো তার সাহায্যের প্রয়োজন। হয়তো পবিত্রকে এখনই দরকার…!

সে মাত্র কয়েক পা-ই এগোতে পেরেছিল। হঠাৎই তার চোখের সামনের অন্ধকারে নীলাভ আগুনের রশ্মি ঝলসে উঠল। পরক্ষণেই একটা প্রচণ্ড আওয়াজ। ত্রিভুবন যেন কেঁপে উঠেছে। একটা দুরন্ত আগুনের হলকা একরাশ জ্বালা উগরে দেয় ফাঁকা দরজা দিয়ে। পবিত্র ভয়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল সশব্দে খণ্ডহরের বাকি ছাতটাও হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়ছে অবশিষ্ট দেওয়াল। ছাতহীন বাড়িটার মাথায় লাফিয়ে উঠেছে লেলিহান আগুনের লকলকে জিহ্বা। যেটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে বার্নিং শিখ। লাইটার সে পেয়েছে! আগুনও জ্বালিয়েছে। গ্যাস, পেট্রোল এবং অন্যান্য দাহ্য বস্তুও নিজেদের কাজ করেছে। অধিরাজ তবে…!

পবিত্র আচার্য-র দেহটা বুঝি অবশ হয়ে আসে। তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না। সে জানত, এটাই হতে চলেছে। তবু মনে ক্ষীণ আশা ছিল। অধিরাজ বুঝি বার্নিং শিখকে পরাস্ত করতে পারে… অথবা কোনো দুর্ঘটনায় লাইটারটা নাও জ্বলতে পারে… কিংবা কোনো মিরাকল্… 1

তার চোখের সামনে হু হু করে জ্বলছে বহ্নিশিখা। সশব্দে পুড়ে যাচ্ছে আগাছা, ঝোপ-ঝাড়। তার পোড়া দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগছে। আগুন সেই ঝোপ বেয়ে কিছুটা বাইরের দিকেও বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কিছুই যেন টের পাচ্ছে না পবিত্র। তার পায়ের ওপর দিয়ে হঠাৎ দ্রুতগামী কী যেন একটা চলে গেল। আগে হলে লাফিয়ে উঠত সে। অথচ এখন যেন অনুভূতই হল না। বরং গোখরোটা এখন তাকে কামড়ে দিলেই কৃতজ্ঞ থাকত। তার চোখের সামনে গোটা বাড়িটা দাউদাউ করে জ্বলছে, গোটা ধ্বংসস্তূপ খসে খসে পড়ছে, ও শুধু স্থির একটা পুতুলের মতো দেখছে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে কোনোমতে ভেজা ও ভাঙা স্বরে উচ্চারণ করল, “রা-জা।”

পবিত্র-র সারা দেহ অবশ হয়ে আসে। সে আস্তে আস্তে পরাজিত মানুষের মতো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সেই জ্বলন্ত খণ্ডহরের সামনে। চোখের জলে যদি এই আগুন নেভানো যেত, তবে নিভিয়ে দিত। জীবনে এই প্রথম হাসিখুশি, চটুল ও চঞ্চল প্রকৃতির অফিসারের চোখ জলে ভরে এল। একটা প্রচণ্ড কান্না গোটা দেহকে ঝাঁকিয়ে উঠে আসছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে চেপে রাখার। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক চোখ মনের কথা শুনতেই রাজি নয়। বারবার প্রচণ্ড কান্নাকে প্রতিহত করছে, তবুও তাকে হারাতে পারছে না! শেষপর্যন্ত অসহ্য কষ্টে, অপরাধবোধে অশ্রুর কাছে হার মানল পবিত্র। ঘাস-মাটির ওপর একটা বিফল ঘুষি মেরে সে বোবাকান্নায় ভেঙে পড়ল। কান্নার ধাক্কায় লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপরেই। কিচ্ছু করার নেই। ওই বাড়ির ভেতরে যারা ছিল, তাদের বাঁচার কোনো চান্সই নেই। নিজেকে এসকেপিস্ট, ভীরু, কাপুরুষ বলে মনে হচ্ছিল তার। আজ যদি সেও অধিরাজকে সাপোর্ট দিত, তবে এমন কাণ্ড হত না। অথচ সে পালিয়ে এল। ক্লান্ত, রক্তাক্ত অধিরাজকে ওই রাক্ষসের সামনে একা ছেড়ে দিয়ে পবিত্র স্রেফ পালিয়ে এসেছে। কোনোদিন কেউ ক্ষমা করবে না তাকে। সে নিজেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

মাটিতে মুখ গুঁজে বাচ্চা ছেলের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল পবিত্র। বারবার মাটিতে ঘুষি মারতে মারতেই বলছিল, “রাজা!… রাজা!..হোয়াই? হোয়াই…।” তার দেহ ক্রমাগতই ক্রন্দনোচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে। ততক্ষণে পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। রক্তিম আগুনের ছ-টার সঙ্গে মিলে মিশে যাচ্ছে আকাশের রং। সূর্যোদয় হওয়ার সময় আসন্ন। তবু যেন এ রাত কাটল না। গোটা দুনিয়াটাই বুঝি চির অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে। সে পাগলের মতো শুধু মাটিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত ও কপাল ঠুকতে ঠুকতে আর্ত হাহাকার করে বলছিল, “হোয়াই….রাজা, হোয়াই….ওঃ!”

তার এ শোকের সান্ত্বনা বুঝি প্রকৃতির কাছেও ছিল না। তাই উতলা হাওয়াও অকস্মাৎ থমকে গিয়েছে। একটু দূর থেকে ফের ভেসে এল সেই অলুক্ষুণে হরিধ্বনি, ‘বলো হরি, হরিবোল! বলো হরি, হরিবোল!…’ ওদিকে কোনো মৃতদেহ অগ্নিসংস্কারের পথে চলেছে। এদিকে জ্যান্ত মানুষগুলো জ্বলন্ত চিতায় ছারখার হয়ে গেল। আগুন যা ভয়াবহ রূপ ধরেছে, তাতে পোড়া হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। পবিত্র-র সামনে যেন শুধু অন্ধকার… কেউ নেই… কিছু নেই…!

“কাঁদছ কেন? কে মরে গেল মামা?”

পবিত্র অসাড় হয়ে মাটির ওপর পড়েছিল। একটা অপ্রত্যাশিত ও পরিচিত ঠান্ডা স্বরের কৌতুকমাখা বাক্য শুনে তড়িদাহতের মতো মুখ তুলে তাকাল। সামনের দৃশ্যটা দেখে মনে হল, এবার সে সত্যিই মরে যাবে। তার সামনে জলজ্যান্ত, ছ-ফুট চার ইঞ্চির দীর্ঘদেহটাকে একটু ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং অধিরাজ। রক্তাক্ত, ক্লান্ত, একটু বুঝি টলমলও করছে। তবু নিঃসন্দেহে সশরীরে রক্তমাংসের অধিরাজ ব্যানার্জিই বটে! সে তার চিরপরিচিত ঠাট্টার সুরে বলল, “বার্নিং শিখের জন্য কান্নাকাটি করছ? চিন্তা নেই, ও ব্যাটা মরেনি। মিহির ভিরানির থেকেও ওর আয়ুর জোর বেশি…।”

কথাগুলো স্বাভাবিক, কিন্তু ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক। কেমন যেন নেশাজড়িত ভাবে কথাগুলো বলছিল সে। পবিত্র এক লাফে উঠে আনন্দের চোটে তাকে জড়িয়ে ধরতেই যাচ্ছিল, তার আগেই বাধা দিল, “এখন ভুলেও ছোঁবে না! দূরে থাকো।”

“রাজা!” পবিত্র আহত, “এটা আমি!”

“ওটা তুমি বলেই বলছি।” সে রীতিমতো টলছে, “ওই হারামজাদা পুরো ক্লোরোফর্মের শিশিটাই আমার মুখে ঢেলেছে। আমি তো অফ হবই, তুমিও না অফ হয়ে যাও! জানতাম, নিজের মিশন কমপ্লিট না করে ও কিছুতেই মরবে না। তাই ওকে চেজ করছিলাম… এস্কেপ রুট একমাত্র ও-ই জানত! যে অন্ধকার ঘরে আমরা ঢুকেছিলাম, ওটাকে ও কিচেন হিসাবে ব্যবহার করে। সেখানে একটা বিশাল জানলা ছিল… একদম ভোঁ ভাঁ। অ্যাজ ইউজুয়াল কোনো শিক নেই। একমাত্র ওটারই পাল্লা আছে। আগের বার বন্ধ ছিল বলে দেখতে পাইনি। লাইটারটা ও কপালগুণে পেয়ে গিয়ে নিজেকে সিকিওর করার জন্য যেই জানলাটা খুলল, আমিও এস্কেপরুট দেখতে পেলাম। ও জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে লাইটারটা জ্বালিয়ে যেই ভেতরে আগুন ধরাতে গেছে, তার আগেই আমিও ওই জানলা দিয়েই লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে কোনোমতে বেঁচেছি। তবে ব্যাটা এবারও পালিয়ে গেল…!”

বলতে-বলতেই অধিরাজ বেসামাল হয়ে ধড়াস করে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। পবিত্র দেখল সে আস্তে আস্তে জ্ঞান হারাচ্ছে। সারা মুখে এক বোতল ক্লোরোফর্ম ছুড়ে মারার ফল! ওই তরলটা তবে অ্যাসিড নয়, ক্লোরোফর্ম ছিল। সে তাড়াতাড়ি তাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতেই ক্লোরোফর্মের গন্ধটা পেল। ভগবানই জানে কতখানি তার সিস্টেমে গিয়েছে! ঢেলেছিল তো পুরোটাই। পবিত্র ব্যাকুলস্বরে বলল, “রাজা। সামলাও নিজেকে। কিচ্ছু হবে না।”

“এতক্ষণ ধরে কী করে সামলাচ্ছি তা শুধু আমিই জানি। অনেক কষ্টে এই অবধি হেঁটে এলাম… আর পারছি না।” অধিরাজ নির্জীব স্বরে বলে। ক্লোরোফর্মের প্রভাবে সে ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। কোনোমতে টেনে টেনে বলল, “বিলিভ মি, আমি নিজের হাত-পা কিচ্ছু ফিল করতে পারছি না। টেক মি টু বেবি মোস্তাফা। বার্নিং শিখ এখনও বেঁচে আছে… আমি অফ হতে চাই না… কিছুতেই অফ হতে চাই না… টেক মি টু মিস্‌ মুখার্জি… প্লিজ!”

বলতে-বলতেই সে জ্ঞান হারিয়েছে। পবিত্র আর কথা না বাড়িয়ে তার রক্তাক্ত দেহটাকে সযত্নে তুলে নিয়ে গাড়ির ব্যাকসিটে সাবধানে শুইয়ে দিল। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এভিডেন্স ও বেহুঁশ অধিরাজকে নিয়ে রওনা দিল ফরেনসিক ল্যাবের দিকে। নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই। আর একটা দিনের সূত্রপাত ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। আজ অন্তিম দিন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আহেলি মুখার্জির কাছে পৌঁছোতেই হবে তাকে।

এতদিনে এই প্রথম বোধহয় অধিরাজ স্বেচ্ছায় আহেলির কাছেই যেতে চাইল। তাও সজ্ঞানে! তার দৃঢ় বিশ্বাস, মিস্ মুখার্জি ঠিক তাকে দাঁড় করিয়ে দেবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *