(৯)
রাতের শুনশান সড়কে গাড়িটা তীব্র বেগে এগিয়ে চলেছিল গন্তব্যের দিকে। এখন রাস্তা একদম ফাঁকা। আশেপাশে আর কোনো যানবাহন দেখা যাচ্ছে না। দূর দূরান্ত অবধি অন্য কোনো গাড়ি কিংবা কোনো মানুষের দেখা নেই। শুধু কখনও কখনও একটা বা দুটো মালবাহী ট্রাক রাতের রাস্তা বেয়ে হুশহাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া কোথাও আর কোনো আওয়াজ নেই।
এখন ঘড়িতে প্রায় তিনটে বাজতে যায়। রাত্রি এখন শেষপ্রহরের দিকে। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে একটু বেশিই স্পিড তুলেছিল অর্ণব। এখন অধিরাজের মা-বাবা হয়তো জেগে থাকবেন না। সে অবশ্য ওঁদের যোগাযোগ করেনি। এসব বিষয়ে অধিরাজের ফেভারিট ভৃত্য ‘হিস্টো’ ওস্তাদ। তাকে দিনের যে-কোনো সময়েই পাওয়া যায়। এখনও অর্ণব তাকেই ফোন করেছিল। যথারীতি হিস্টো জেগে আছে। সে বলেছে দাদার পোষাক রেডি করে রাখবে। কিন্তু সমস্যা একটাই। কাজ হবে ঠিকই, তবে হিস্টোর বকা শোনাটা মাস্ট। তার ‘দাদা’টি যে পয়লা নম্বরের অপদার্থ ও কাণ্ডজ্ঞানহীন, বাচ্চাদের মতো তারও পেছনে কীভাবে সর্বক্ষণ ট্যাঁক ট্যাঁক করতে হয়, কোনোদিকেই তার খেয়াল নেই, এসব বিষয়ে হিস্টোর দশ মিনিটের সংক্ষিপ্ত ভাষণ শোনাটা বাধ্যতামূলক। কোনো উপায় নেই। স্বয়ং অধিরাজ তো বটেই, এমনকি তার বাবা-মা-ও এই লোকটিকে সমঝে চলেন। এ বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যই হিস্টোর প্রাইভেট প্রপার্টি। তার অধিকারবোধও তেমনই প্রখর। সুতরাং সি.আই.ডি. হোমিসাইডের অফিসাররাও তার মেজাজ বুঝে চলেন। এমনকি এডিজি শিশির সেন একবার ভুল করে জুতো পরেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন বলে হিস্টো তাঁকেও পাঁচকথা শুনিয়ে দিয়েছিল। প্রায় ধমক দিয়েই বলেছিল, “আপনার লজ্জা করে না, বাড়ির ভেতরে জুতো পরে ঢুকে পড়েছেন? আপনি কোথাকার লাটসাহেব যে জুতো খুলে ঢুকতে পারেন না!” বেচারি শিশির সেনের প্রায় ‘সসেমিরা’ অবস্থা। রীতিমতো লজ্জিত ও কুণ্ঠিত হয়ে বলেছিলেন, “স্যরি!”
উত্তরে আরও একটা ধমক, “এই হল সাহেবসুবোর বদমায়েশি বুদ্ধি! পোথমে ভুলভাল কাজ করবেন, তারপর সরি বলে হাত কচলাবেন!”
শিশির সেন ভয়ের চোটে আর কোনো কথাই বলেননি। পরে শুধু অধিরাজকে বলেছিলেন, “ব্যানার্জি, তোমাদের বাড়িতে যে কাং ফু প্যান্ডা থাকেন সেটা তো বলোনি!”
অর্ণব জানে তাকেও একগাদা কথা শুনতে হবে। তবে সেটা ধর্তব্য নয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিরাজের জামা-কাপড়গুলো। বেচারি স্যার আর কাঁহাতক ‘মোগলি’র ড্রেসে পোজ মেরে আহেলি আর আইভি-র উৎসুক চারচোখের সামনে বসে থাকবেন। লোকটাকে ভগবান রূপ ঢেলে দিয়েও বড়ো বিপদে ফেলেছেন। এখনও সে ওটাকেই নিজের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ মনে করে। সর্বনাশিনী কেসের অপমানের থেকেও বড়ো ক্ষত সার্জিক্যাল-স কিলারের মলেস্টেশন। একজন নারীর ক্ষেত্রে সহানুভূতি দেওয়ার জন্য গোটা সমাজ আছে। কিন্তু একজন পুরুষের মর্মযন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার জন্য কেউ নেই। অধিরাজ ব্যানার্জি মেয়েদের চোখে ইপ্সিত পুরুষ। তার পেছনে রূপগুণমুগ্ধ মেয়েদের বিরাট লাইন। শহরের হিরোও বটে। তার প্রত্যেকটা কেস মিডিয়া হাইলাইট করে। অধিরাজের পেছনে রিপোর্টাররা বুম এবং ক্যামেরা নিয়ে ভিড় করে দৌড়োতে থাকে। সে যে একটাও কথা না বলে তার স্বভাবজাত রাজকীয় ভঙ্গিতেই লম্বা পা ফেলে গটগটিয়ে হেঁটে ভিড়কে উপেক্ষা করে চলে যাবে, এটা তারাও জানে। তবু দৌড়োয়। আশপাশ থেকে ভেসে আসতে থাকে আবদার, “স্যার, একটা ফটো… একটা বাইট… একটা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ…!” তার নামের পাশে ‘সুপারকপ’, ‘সি.আই.ডি.-র হিরো’, ‘মোস্ট হ্যান্ডসাম কপ’, ‘হিরো ইন ইউনিফর্ম’ ইত্যাদি বিশেষণ বসে ঠিকই। কিন্তু কেউ জানে না, মানুষটা আদৌ ভালো আছে কিনা! কেউ খবর রাখে না, লাইমলাইটের বাইরে অন্ধকারে এই পুরুষটিই ঠিক কতটা একা ও ক্লান্ত! ,
আর কেউ না জানুক, অর্ণব জানে। সে চোখের সামনে দেখছে অধিরাজের মানসিক লড়াইটা। কীভাবে সে নিজের বিরুদ্ধেই প্রত্যেকদিন লড়ে চলেছে! আগের সেই ভয় থেকে অনেকটা বেরোতে পারলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি। হয়তো গোটা জীবনেও এই রাহুর হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই তার। এখনও সে মাঝেমধ্যেই দুঃস্বপ্ন দেখে। অনেক সময়েই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ঘর্মাক্ত কলেবরে উঠে বসে। তারপর ভোর অবধি একটার পর একটা সিগারেট খেতেই থাকে। যতক্ষণ না ফের ক্লান্তি এসে তাকে অবশ করে দিচ্ছে ততক্ষণ এটাই চলতে থাকে। অনেক সময়ই হিস্টো ভোরে দেখতে পায় ঘুমন্ত অধিরাজের হাতটা খাট থেকে নীচের দিকে ঝুলছে। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট!
এসব কথা হিস্টোর কাছেই শুনেছে অর্ণব। স্বচক্ষেও দেখেছে। আজ যে দু-জনে মিলে প্রায় জড়াজড়ি করে গাড়ির ভেতরে বসেছিল তখনও তার অস্বস্তি অনুভব করেছে। সে তার হাবভাবে প্রকাশ করেনি। কিন্তু তার দ্রুত হৃৎস্পন্দন বলে দিচ্ছিল এই নৈকট্য আবার তাকে তিক্ত অতীতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আজকাল কিছু বিষয়ে অধিরাজ বড়ো বেশিই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে প্রথম জিনিসটাই হল পোষাক। ভুলবশত বুকের কাছে কোনো বোতাম খোলা আছে কিনা সেটা বারবার চেক করাটা বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। অচেনা কোনো পুরুষ বা নারীর দৃষ্টির সামনে এখনও কুঁকড়ে থাকে। সেই লোকটা এই শীতে দেহের অনেকটা অংশ অনাবৃত করে দুই মহিলার সামনে বসে আছে, এটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু অর্ণব জানে এটা অধিরাজের কাছে কতবড়ো শাস্তি! এমনিতেই মানুষটা যথেষ্ট সমস্যাতেই আছে। তার মানসিক যন্ত্রণা আর বাড়তে দেওয়া যায় না। সেজন্যই টুক করে বেরিয়ে পড়েছে। জানে এই পরিস্থিতিতে একা রাস্তায় বেরিয়ে পড়াটা বেশ রিস্কি। বার্নিং শিখ শুধু তার ভিকটিমদের নয়, তাদের সুরক্ষা যারা করছে তাদেরও আক্রমণ করে। কানপুরে আর বেঙ্গালুরুতেই তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। স্যার জানতে পারলে তাকে আসতেই দিতেন না। কিন্তু এছাড়া আর উপায় কী! কী করলে মানুষটাকে একটু রিলিফ দেওয়া যাবে সবসময়ই ভেবে চলেছে সে। সবটা তার হাতে নেই। যেটুকু আছে সেটুকু করার জন্য সবরকম রিস্ক নেবে অর্ণব।
ড্রাইভ করতে-করতেই ঘড়ির দিকে আর একবার অধৈর্য দৃষ্টিতে দেখল সে। গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা আরও একটু এগোল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পোষাকের সেটটা নিয়ে ফিরে যেতে হবে তাকে। নষ্ট করার জন্য হাতে অঢেল সময় এখন কারোরই নেই। সুতরাং গতিবেগ আরও একটু বাড়ানো যেতেই পারে।
কিন্তু স্পিড আরও বাড়াতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। স্পিডোমিটারের কাঁটা ঘণ্টায় আশি কিলোমিটার ক্রস করতেই একটা মৃদু অথচ স্পষ্ট বিপিং সাউন্ড পেল সে। ক্ষণিকের বিস্ময়ে একমুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটতে-না কাটতেই লেফট টার্নের মাথায় আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল অর্ণবের। রাস্তাটা যেখানে গিয়ে বাঁ-দিকে বাঁক নিয়েছে ঠিক তার উলটোদিক থেকেই ভীমবেগে ছুটে আসছিল একটা ট্রাক! তার আলোটা এসে পড়েছে চোখে! ট্রাকটা সম্পূর্ণ রং সাইড দিয়ে আসছে। আর একটু হলেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হত। ড্রাইভার সময়মতো বুঝতে পেরে শেষমুহূর্তে কাটিয়ে দিয়েছে তাই রক্ষে! ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণবও গাড়িটাকে আপ্রাণ থামাবার চেষ্টা করেছিল। অথচ আশ্চর্য! গাড়ি থামল না! বরং কেমন যেন মাতাল মানুষের মতো বেসামাল হয়ে গেল। কিছু বোঝার আগেই এদিকে ওদিকে বেঁকে যেতে শুরু করল!
ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম হতেই অর্ণবের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ঝট করে মাথা, কান উত্তেজনায় গরম হয়ে গিয়েছে। তার গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না! সে পাগলের মতো প্রাণপণে বারবার ব্রেক মারার চেষ্টা করছে! বারবার প্রেস করছে ব্রেকটাকে। কিন্তু এবারও কোনো ফল হল না। অর্ণব নিশ্চিত হল, ব্রেক ফেল হয়েছে। এবার এই দ্রুতগামী চারচাকাকে থামানো কষ্টকর হবে। নিরূপায় হয়ে এবার এমার্জেন্সি ব্রেক মারার চেষ্টাও করল। আশ্চর্যজনকভাবে সেটাও এখন কাজ করছে না। গাড়ি ক্রমাগতই তার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রথমেই যেটা করণীয় তা হল নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা। অর্ণব নিজেও তা জানে। সে যথেষ্ট ঠান্ডা মাথার মানুষও বটে। অথচ যে মুহূর্তে বুঝতে পারল যে গাড়ি আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই, ব্রেক ফেল হয়ে গিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা প্রচণ্ড ভয় তাকে জাপটে ধরল। হয়তো এতটা ভয় সে পেত না যদি না কানপুরের অ্যাক্সিডেন্ট কেসটার ডিটেলস না জানা থাকত। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করেছিলেন, ওটা আসলে অ্যাক্সিডেন্টই ছিল না। এবং ব্লাস্টটা কোনো বম্বের কারণে হয়েছে। অর্ণবের বুকের ভেতরে কে যেন হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল! কে বলতে পারে, তার গাড়ির নীচের অংশেও কোনো বম্ব টিক টিক করছে না! গাড়ির গতিবেগ আশি কিলোমিটার ক্রস করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা অস্বাভাবিক বিপের শব্দ শুনতে পেয়েছিল না? সেটা কীসের ছিল? তবে কি স্পিডোমিটারের সঙ্গেই জুড়ে আছে বিস্ফোরণের রহস্য!
চোখে দেখতে না পেলেও পুলিশের জাগ্রত ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলে দিল, গাড়ির গতিবেগ একশো কিলোমিটার ক্রস করার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির কোনো অংশে লুকিয়ে রাখা অপ্রত্যাশিত ডিভাইস চালু হয়ে গিয়েছে। ওদিকে ব্রেক কাজ করছে না। কাজ করলেও কোনো লাভ হত না। সে বম্ব স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও এইটুকু জ্ঞান আছে যে কাঁটা আশি কিমির নীচে নামলেই প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণ অবধারিত! কোনোমতেই স্পিড কমানো যাবে না! আর স্পিড না কমালে ব্রেকহীন বেসামাল গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করবেই। ব্রেক ফেল করলেই গাড়ির স্পিড কমিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু সেই উপায়ও নেই অর্ণবের। যা-ই করুক তার কপালে মৃত্যু নাচছেই। একটা ভয়াবহ বীভৎস মৃত্যু! দুইদিকেই মরণ তার অপেক্ষায় বসে আছে। কোনোভাবে গাড়ির স্পিড নীচে নামলেও মৃত্যু। আবার ব্রেক না কাজ করার দরুণ এত স্পিডে গাড়ি চালালে সামনে সেই একমেবাদ্বিতীয় মৃত্যুই!
গাড়িটা এখন প্রচণ্ড স্পিডে মারমার করতে-করতে এদিকে ওদিকে বেঁকে যাচ্ছে। অর্ণব ভেতরে কুলকুল করে ঘামছে। তার কপালের রগ বেয়ে টপটপ করে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ে। স্টিয়ারিং ধরা হাতের পাতা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তবু শেষ চেষ্টা করল। কোনোভাবে যদি গাড়ি থেকে বাইরে বেরোনো যায়। ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাটা খোলার আকুলি-বিকুলি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এ কী! দরজার লক এভাবে জ্যাম হয়ে গেল কখন! দু-হাতে স্টিয়ারিং সামলে পাগলের মতো পা দিয়ে দুমদুম করে লাথি মারছে দরজায়। বাইরে শীত বলে সব কাচ তুলে দিয়েছিল। সে মরিয়া হয়ে এবার কাচ খোলার চেষ্টা করে। খুলছে না তো। অর্ণব অসহায়ের মতো, উন্মাদের মতো একের পর এক লাথি মারছে দরজায়, দরজার কাছে। কিন্তু গাড়িটা বুঝি আপাদমস্তকই ইস্পাত দিয়ে গড়া। হবে নাই বা কেন সি.আই.ডি. অফিসারের গাড়ি, যথেষ্টই মজবুত। অত লাথি খেয়েও দরজা খুলছে না, কাচও ভাঙছে না। যদিও গাড়ির স্টিয়ারিং আর এক্সলেটর সামলে গায়ের সর্বশক্তি প্রয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত স্পেস সে পাচ্ছিল না। ওদিকে গাড়ির ম্যালফাংশন লাইট দানবের চোখের মতো দপদপিয়ে জ্বলছে। কাজ হচ্ছে না, কিছুতেই কাজ হচ্ছে না!
অর্ণব আফশোশে চোখ বুজে ফেলে। আজ আর রক্ষা নেই। মস্তিষ্কও কাজ করছে না। এইটুকু বুঝতে পারছে এই ফাঁদ থেকে আর বেরোনোর উপায় নেই! সে যে চক্রব্যুহে ঢুকে পড়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো রাস্তাই রাখেনি সেই অজ্ঞাত আততায়ী। সব রাস্তাই ডেড-এন্ডে গিয়ে শেষ হচ্ছে। অর্ণবের চোখ আকস্মিকভাবেই ঝাপসা হয়ে আসে। কেউ জানবে না এখানে কী হয়েছিল! পড়ে থাকবে শুধু একটা টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া গাড়ি। কানপুরের পুলিশ অফিসারের তবু দেহাংশ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে তাও পাওয়া যাবে না। স্যার জানতেও পারবেন না, তার ‘স্পেশাল ওয়ান’ কীভাবে ধোঁয়া হয়ে গেল। তাঁর জন্যই রিস্ক নিয়ে এত রাতে বাইরে বেরিয়েছিল সে। আর ফেরা হবে না! আর কখনও সেই হাসিমুখের প্রিয়তম মানুষটির কাছে ফিরে যাওয়া হবে না। আর কাউকে অতিরিক্ত স্মোকিং-এর জন্য বকা দেবে না সে! তার মৃতদেহ শেষ স্পর্শটুকুও পাবে না তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার! এই গাড়িটাই তার কবর হতে চলেছে। এখানেই ছাই হয়ে যাবে অর্ণবের গোটা অস্তিত্ব।
“আই কার্স ইউ… বাস্টার্ড!”
অক্ষম ক্ষোভে চিৎকার করে আততায়ীকে শাপশাপান্ত করল সে। তার হাতদুটো অসহায়ের মতো স্টিয়ারিংটা সজোরে আঁকড়ে ধরল। নিজেও জানে না এখন ঠিক কী করা উচিত! গাড়িটাকে শুধু সোজা রাখা আর স্পিড কমতে না দেওয়ার চেষ্টা করাই ভালো। হয়তো সেই প্রচেষ্টাই তার আয়ু আরও কয়েকটা মুহূর্ত বাড়াতে পারে।
বেশিক্ষণের জন্য না-হলেও আরও অন্তত কয়েক মিনিট! যাতে অন্তত কয়েকটা প্রিয় মুখ সে শেষমুহূর্তে একবার মনে করতে পারে। এ জন্মে আর কখনও তাদের সঙ্গে দেখা হবে না! অর্ণব কখন যে ওদের অজান্তেই নিরুদ্দেশের পথে চলে যাবে, তা তারা জানতে পারবে না! অন্তিম দর্শনের জন্য তার দেহও কেউ খুঁজে পাবে না। এই অন্তিম যাত্রায় সে একা। ভীষণ… ভীষণ একা। তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে নিঃসঙ্গ বীভৎস মৃত্যুর দিকে…!
গোটা জীবনের স্মৃতি অন্তিম মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল অর্ণবের। মায়ের হাসিমুখ, বাবার আদর, প্রথম সমুদ্র দেখার রোমাঞ্চ, প্রথম পাহাড়ের বিস্ময়, সি.আই.ডি. হোমিসাইডে জয়েন করার মুহূর্ত, প্রথম ব্যর্থতা, প্রথম এডিজি সেনের ভর্ৎসনা, প্ৰথম সাফল্য, ডঃ চ্যাটার্জির দাঁতখিঁচুনি। তারপর…. তারপর…!
টুকরো টুকরো সমস্ত স্মৃতি একসঙ্গে মিলে মিশে গিয়ে গোটা মন জুড়ে ফুটে উঠল শুধু একটাই ছবি! এক রূপবান যুবকের দেবশিশুর মতো অপূর্ব নিষ্পাপ হাসি। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, ঘণ্টার পর ঘন্টা, মিনিটের পর মিনিট একজনেরই সঙ্গ পেয়েছে সে! মানুষটা জানেও না অবচেতনে বড়ো সত্যি কথাটা তাঁকে বলে দিয়েছিল অর্ণব, ‘আমার তো শুধু আপনিই আছেন স্যার!’ সত্যি তো! অর্ণবের হৃদয়ে আর কে আছে! সেখানে একটা মানুষেরই তো একচ্ছত্র অধিকার। অথচ কত কথা আজও তাঁকে বলা হয়নি। কত কথা তাঁর কাছে এখনও প্রকাশ করা হয়নি। আর কোনোদিনই প্রকাশ করা হবে না!
রাতের অন্ধকারে গাড়িটা এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছিল। প্রচণ্ড আতঙ্কে সর্বশক্তি দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে তাকে সোজা রাখার চেষ্টা করছে অর্ণব। দরজা খুলে বাইরে লাফ মারারও উপায় নেই! দরজা খুলছে না, কাচও নামছে না। তদুপরি যে গতিতে গাড়ি চলছে, তাতে এই স্পিডে বাইরে লাফিয়ে পড়লেও সে মরবে! এত জোরে মাটিতে আছড়ে পড়বে যে তার মাথাটা স্রেফ দু-ফাঁক হয়ে যাবে। ডিভাইডারে পড়লে তো কথাই নেই। বাঁচার কোনো রাস্তাই নেই!
এই পরিস্থিতিতেই সে সভয়ে দেখল আবার একটা বিশালদেহী ট্রাক হাঁ হাঁ করে ছুটে আসছে তারই দিকে। এবার ট্রাক ড্রাইভারের কোনো ভুল নেই। সে রাস্তার সঠিক দিকেই আছে। বরং অর্ণবই বেসামাল হয়ে ভুল দিকে গিয়ে পড়েছে। তীরবেগে দুটো গাড়ি পরস্পরের দিকে একেবারে মুখোমুখি ছুটে যাচ্ছে। ট্রাক ড্রাইভার ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছে, “এ-ই! সামাল… সামাল…!” অর্ণবের বুকের ভেতর থেকেও কে যেন পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল, “গেল!… গেল…!”
সে অতলান্তিক আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলল। স্টিয়ারিংটাকে সর্বশক্তি দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে উলটোদিকে। গাড়িটা আচমকা একটা গোঁত্তা খেয়ে ঠিক শেষমুহূর্তে সাঁৎ করে সরে গেল ট্রাকটার সাইড ঘেঁষে! ড্রাইভার তেড়ে খিস্তি দিয়ে উঠল, “মরার শখ হয়েছে… বোকা…।”
এ যাত্রা রক্ষা পেল অর্ণব। কিন্তু আর কতক্ষণ! শীতের রাতেও তার সারা দেহ ঘামে ভিজে গিয়েছে। হাতের পেশিগুলো টনটন করছে। গাড়ির স্পিড একচুলও কমানো যাবে না। ওদিকে গাড়িটাও যেন চরম শত্রুতা শুরু করেছে। কিছুতেই সে বাগ মানাতে পারছে না! কখনও এমনভাবে ডানদিকে বেঁকছে যেন এখনই ডিভাইডারে আছড়ে পড়বে। নিরূপায় অর্ণব আবার কোনোমতে বাঁ-দিকে নিয়ে এলেই ফের রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে বা ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ধাক্কা খেতে যাচ্ছে। তার মধ্যেই একের পর এক আসছে স্পিড ব্রেকার। তার ধাক্কায় বেশ কয়েকবার সিট থেকে শূন্যে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে সে। কিচ্ছু করার নেই। হয়তো এরপর আরও বড়ো একটা স্পিডব্রেকারের ধাক্কায় গোটা গাড়িটাই উলটে যাবে। এতক্ষণের অসম যুদ্ধ নিমেষেই শেষ।
আর একটা তেমনই বড়োসড়ো স্পিডব্রেকারের ধাক্কায় এবার আচমকা একটু কাত হয়ে গেল গাড়িটা! তার মধ্যেই একটা টায়ার বার্স্ট করার আওয়াজ পেল সে। অর্ণবের মনে হচ্ছিল তাকে হাত-পা বেঁধে কেউ একটা অ্যাটমবম্বের ওপর বসিয়ে দিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বম্বটা ফাটতে পারে। অসহায়ভাবে মৃত্যুকে নিজের দিকে ধেয়ে আসতে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার।
তার চোখ ফের বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর দেখা হবে না! আর কথা হবে না। সেই মানুষটার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ আর হবে না! তার মস্তিষ্কে একটাই বাক্য অনুরণন তুলেছে—‘আমার তো শুধু আপনিই আছেন স্যার!’ এ বাক্যটা যতটাই অসতর্ক ঠিক ততটাই বাস্তব! এই অন্তিম মুহূর্তে আরও কয়েকটা বাক্য বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের ভেতর থেকে! মরে গেলেও হয়তো সেগুলো অনুচ্চারিতই থাকবে। কিন্তু হৃদয়টা এবার প্রগলভ হয়ে অনেক কিছুই বলে উঠল। অনেক কিছু প্রকট করে বুঝিয়েও দিল। তাকে ছাড়া অর্ণবের জীবনই অর্থহীন। তার জীবন, মরণ, আনুগত্য সবই সেই মানুষটার। তার বিশ্বাস, ভালোবাসা, মনোযোগ, যত্ন, শাসন- গোটা দুনিয়াটাই ওই একটি লোককেই ঘিরে ছিল। আমৃত্যু তাই থাকবে। আজ মৃত্যুও যদি অধিরাজের ওই অপরূপমূর্তি নিয়ে আসে, তবে হয়তো সানন্দে জীবনের হাত ছেড়ে দিতে রাজি আছে অর্ণব। তাঁর জন্য একবার কেন, সহস্রবারও মরতে রাজি আছে সে। কোনোমতে বিড়বিড় করে যেন কার উদ্দেশ্যে বলল অর্ণব, “লাভ ইউ… আই লাভ ইউ সো মাচ…
ইউ আর মাই বেস্ট ম্যান… অ্যান্ড অলওয়েজ উইল বি!”
আবেগে তার চোখ বেয়ে একফোঁটা অশ্রুবিন্দু টপ্ করে হাতের ওপর পড়ল। এখন শুধু নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির লাফিয়ে লাফিয়ে চলা, গতি, ঝাঁকুনি, সাঁৎ সাঁৎ করে সরে যাওয়া পৃথিবীর দৃশ্যগুলো ছাড়া আর কিছু অনুভব করতে পারছে না। কানে শুধু কতগুলো যান্ত্রিক শব্দ। কী যেন একটা বিপ বিপ করে উঠে বিপদের সঙ্কেত দিচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই! এখানেই সব শেষ…!
আচমকা পেছন থেকেই একটা জোরাল বাইকের হর্ণ শুনতে পেয়ে সংবিৎ ফিরে পেল অর্ণব। তার চোখ পড়ল সাইড গ্লাসে। একটা স্পোর্টস বাইক তুমুল বেগে হাওয়ার সঙ্গে টক্কর নিয়ে তার গাড়ির পেছনেই আসছে। শুধু আসছে বললে ভুল হবে৷ প্ৰায় বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে আসছে। অত উত্তেজনার মুহূর্তেও বাইকটাকে চিনতে ভুল হল না তার! এই স্পোর্টস বাইক ও বাইক আরোহীকে সে কয়েক লক্ষ লোকের ভিড়ের মধ্যেও চিনে নেবে। তার হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠল। স্যার! উনি এসেছেন! কিন্তু জানলেন কী করে!
আরও কিছু বোঝার আগে অর্ণবের ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। কানে এখনও ব্লুটুথ ওয়ারলেস ইয়ার সেট পরা রয়েছে। কোনোমতে সে কলটা নিয়ে নিল। কাঁপা স্বরে বলল, “স্যা-র!”
“ই-উ ফু-ল!”
ওপাশ থেকে ভেসে এল অধিরাজের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর, “বারণ করেছিলাম আমি! সতর্ক থাকতে বলেছিলাম!”
একটা প্রচণ্ড কান্না অর্ণবের বুকের পাঁজরে ধাক্কা মারছিল। সে আর্দ্র কণ্ঠস্বরে বলল, “স্যরি স্যার!”
“হোয়াট স্যরি!”
আবার ধমক। এবার অধিরাজকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে অর্ণব। তার বাইক হাওয়ার বেগে এসে পড়েছে ঠিক চলন্ত গাড়ির পাশে। এই হাড়কাঁপানো শীতে এরকম অনাবৃত অবস্থায় বাইক চালিয়ে চলে এসেছে সে! কাঁধের রক্তক্ষরণ এখনও থামেনি। বরং আরও যেন বেড়েছে। অবস্থা দেখে অর্ণব নিজেই আঁতকে ওঠে। এ কী অবস্থা! অধিরাজের কানেও ব্লু টুথ ইয়ারসেট কাম স্পিকার। ওই অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করল, “স্টেটাস কী? ব্রেক ফেইল করেছে?”
“ব্রেক কাজ করছে না স্যার।” সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলে, “বোধহয় মাল্টিপ্ল ম্যালফাংশন। কাচ নামছে না। ডোর লক কাজ করছে না। একটা টায়ার গেছে। ওয়ার্নিং লাইট দেখাচ্ছে। আর বোধহয়…!”
“বোধহয় কী?”
“যখন স্পিডোমিটারের কাঁটা এইটটি ক্রস করছিল তখন একটা বিপের আওয়াজ শুনেছি। বম্ব থাকলেও থাকতে পারে।”
অধিরাজ এবার নিজেই অসহায়বোধ করছিল। এই বিপিং সাউন্ডটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। এর অর্থ সে-ও বোঝে। অর্ণব চাইলেও এখন গাড়ির স্পিড কমাতে পারবে না। ওদিকে গাড়িটা স্থিরও থাকছে না। বারবার পাগলের মতো এদিক ওদিক যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই বাইক নিয়ে চেজ করতে অসুবিধে হচ্ছে। তাকেও এলোপাথাড়ি একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে যেতে হচ্ছে। এভাবে কিছু করা প্রায় অসম্ভব। আর হাতে সময়ও নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অর্ণবকে গাড়ির বাইরে বের করে আনতে হবে। একটা চাকা বসে গিয়েছে মানে গাড়িটা তিনটে চাকায় প্রচণ্ড স্পিডে চলছে। এই প্রেশার হয় চারচাকাটা নিতে পারবে না। নয়তো স্পিড একটু পরেই ধরধর করে কমতে থাকবে। তখন আর কিছু করার নেই!
“ঠিক আছে।” সে নিজেকে অদ্ভুতরকম শান্ত রাখল, “ডোন্ট ওরি অর্ণব। জাস্ট চেষ্টা করো যে গাড়িটাকে স্টেডি রাখতে পারো কিনা।
অধিরাজের শান্ত স্বর বুঝি অর্ণবকে কিছুটা সাহস জোগাল। সে এবার প্রাণপণে হুকুম তামিল করার চেষ্টা করে। গাড়িটা মাঝেমধ্যেই বেয়াদবি করে চলেছে। অধিরাজ সেটাকে চেজ করতে-করতে তাল মিলিয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে। অর্ণবের পাশের জানলাটাই তার লক্ষ্য। কিন্তু বারবার দিক বদল করার ফলে সেখানে পৌঁছোতেই পারছে না! যতবার হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে, ততবারই ফস্কে ফস্কে যাচ্ছে। ওদিকে অদূরেই ফের একটা ট্রাক দেখা দিয়েছে। শহরের যত ট্রাক সব কি আজ রাতেই পথে নেমেছে…!
“স্যা-র!”
অর্ণব আর্তনাদ করে ওঠে। অধিরাজ শান্ত স্বরে বলল, “ডোন্ট প্যানিক। স্টিয়ারিং যখন কাজ করছে তখন ওটাকেই ঘোরাও। যতক্ষণ না আমি বলব, স্টিয়ারিং-এর ওপর থেকে হাত সরাবে না।”
সে কোনোমতে বলল, “ওকে।”
এই ট্রাকটা মূর্তিমান ভীমভবাণীর মতোই প্রায় সামনেই এসে পড়েছিল। অর্ণব সারা দেহের শক্তি দিয়ে স্টিয়ারিংটাকে ঘুরিয়ে চেপে ধরল। আবার সেই একই বিপজ্জনক কয়েকটা মুহূর্ত। ঈশ্বরের অসীম কৃপা, এবারও গাড়িটা রক্ষা পেয়ে গিয়েছে। কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেলেও ট্রাকটা সামান্য হলেও ঠুকে দিল তার ডিপারটাকে। ডিপারটা ভেঙে যাওয়ার প্রচণ্ড শব্দে গোটা পরিবেশ সচকিত হয়ে ওঠে। ডিপারের কাচ ছিটকে পড়ল রাস্তার ওপরে।
“অর্ণব… প্লিজ।”
অধিরাজ একরকম বাইক সমেত নিজেকেও অনেকটা হেলিয়ে দিয়ে ট্রাকটাকে কাটায়। কিন্তু ওটাকে কাটাতে গিয়ে আবার সে দূরে সরে গিয়েছে। এবার একটু অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলল, “প্লিজ… হোল্ড!”
অর্ণব আঁকপাক করে গাড়িটাকে সোজা রাখার চেষ্টা করে। তার চেষ্টার ত্রুটি নেই। অথচ ভগবান জানে এখানে এতগুলো স্পিড ব্রেকার কী করছে। একসঙ্গে অতগুলো স্পিডব্রেকারের ধাক্কায় ফের টালমাটাল হয়ে গেছে গাড়ি। সে অসহায়ের মতো দেখছে কখনও কাত হয়ে যাচ্ছে, কখনও লাফিয়ে উঠছে তার চতুষ্পদ বাহন। ওদিকে স্পিড কমানোও যাচ্ছে না। বুলেটের গতিতে তার পাশে পাশে ছুটছে অধিরাজের বাইক। কখনও কাছে ঘনিয়ে আসছে, কখনও আবার দূরে সরে যাচ্ছে। দুটো গাড়িই সমানতালে দুরন্তবেগে ছুটে চলেছে। শুধু একটা নিয়ন্ত্রণহীন, অন্যটা চালকের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যেই বাইকটার সঙ্গে গাড়িটার আলতো ঠোকাঠুকি হচ্ছে। অধিরাজ প্রমাদ গোণে। এভাবে বারবার গুঁতো খেলে বিপদের সম্ভাবনা বাড়বে বই কমবে না। অর্ণব আপ্রাণ হোল্ড করার চেষ্টা চালাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতি একেবারেই অনুকূল নয়। সে ভীষণ জেদে দাঁতে দাঁত পিষল। আজ মৃত্যুকেও হার মানতে হবে তার কাছে। অর্ণবকে স্পর্শ করার আগে অধিরাজের সঙ্গে তাকে পাঞ্জা কষতে হবে! এত সহজে সে হার মানতে রাজি নয়!
আবার বাইকে স্পিড তুলে ফের অর্ণবের পাশে ঘনিয়ে এল অধিরাজ। অর্ণব দেখল তার হাতে একটা ধারালো অথচ ভারি কিছু! তার পার্সোনাল টুল বক্স থেকে বোধহয় কিছু বের করে এনেছে। আরও কিছু বোঝার আগেই কাচের ওপর এসে পড়ল বস্তুটা! এবার জিনিসটাকে স্পষ্ট দেখা গেল। একটা ক হ্যামার! তার তীক্ষ্ণদিকটা দিয়ে অধিরাজ এক হাতে আপ্রাণ এলোপাথাড়ি আঘাত করে চলেছে জানলার সাইডের দিকে। অন্যহাতটা কন্ট্রোল করছে বাইক। দৃশ্যটা দেখেই ভয়ে কেঁপে উঠল অর্ণব। অত স্পিডে একহাতে বাইক চালাচ্ছে অধিরাজ! তার দৃষ্টিও এখন এই গাড়ির দিকে। সামনে যদি কিছু এসে পড়ে! যদি বিপদ কিছু হয়ে যায়।
অধিরাজ বেশ কয়েকবার ক্ল হ্যামার দিয়ে জানলাটাকে পিটিয়ে আবার একটু তফাতে চলে গেল। দুটো চলন্ত গাড়িকে পাশাপাশি রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ!
এদিকে অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করে চলেছে। অন্যদিকে অধিরাজও ছাড়ার পাত্র নয়। সে একহাতে বাইকটাকে ধরে রেখেই বলল, “স্টেডি অর্ণব! হোল্ড দ্যাট পজিশন…।”
অর্ণবের প্রাণপণ চেষ্টায় এবার কিছুটা ফল হল। গাড়িটা আবার অধিরাজের বাইকের দিকে সরে গিয়েছে। বেসামাল গাড়িটা বাইককে বারবার ঠ্যালা মারছে। কিন্তু অধিরাজ একটুও নার্ভাস না হয়ে ঐ পরিস্থিতিতেই এবার বাইকটা সামলায়। সে এবার কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে, বাইকটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে ফের প্রচণ্ড শক্তিতে হাতুড়িটা চালায় জানলার কাচের ঠিক সেন্টারে! তার হিসাব একদম সঠিক। এতক্ষণ বুঝে শুনেই ক্ল হ্যামার দিয়ে জানলার প্রান্তরেখাকে বারবার আঘাত করছিল, কারণ ওটাই জানলাগুলোর দুর্বলতম অংশ। যখন ক্রমাগত আঘাতের পর আঘাত খেয়ে কাচটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছে তখনই সুযোগ বুঝে ঠিক মাঝখানের অংশে প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মারল। প্রথম বাড়িটা খেয়েই কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে না পড়লেও রীতিমতো ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বাড়িটা মারলেই পুরো জানলাটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়বে। কিন্তু তাতেও বিপদের সম্ভাবনা। হাতুড়ির ফোর্সে কাচ ছিটকে গিয়ে অর্ণবের গায়ে লাগতে পারে।
অধিরাজ এবার একটু সজোরে শ্বাস টানল। যেন আরও কিছুটা শক্তি জড়ো করল নিজের মধ্যে। তারপরই মৃদু স্বরে বলল, “স্যরি অর্ণব।”
অর্ণব কথাটার কোনোরকম অর্থ বোঝার আগেই হ্যামার রেখে দিয়ে দুর্বল ভঙ্গুর
কাচের ওপরে সবলে ঘুষি মারল অধিরাজ। একবার, দুবার, তিনবার…! পরপর… জানলার দুর্বল কাচ আর আঘাত প্রতিহত না করতে পেরে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। হাতুড়ি দিয়ে মারলে কাচের টুকরো যতখানি বেগে অর্ণবের দিকে ছিটকে পড়ত, হাত দিয়ে ভাঙার ফলে অতটা গেল না। তবু বেশ কিছু ধারালো টুকরো ছুঁয়ে গেল তাকে। একটা টুকরো ডান হাতেও বসে গেল। অর্ণব ব্যথা পেলেও সবিস্ময়ে দেখল তার থেকে অধিরাজের হাত আহত হয়েছে অনেক বেশি। সেই রক্তাক্ত হাতেই জানলার বাকি কাচের টুকরোগুলোকে সরিয়ে দিয়ে বলল সে, “এবার লকটাকে ভাঙা ছাড়া উপায় নেই। এগেইন স্যরি অর্ণব। তোমায় হার্ডওয়্যার স্টোরে গিয়ে একটা নতুন হ্যান্ডল কিনতেই হবে!”
অর্ণব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কী বলবে ভেবে পায় না। এখন কি হ্যান্ডলের জন্য দুঃখপ্রকাশ করার সময়!
অধিরাজ অবশ্য তার দিকে মন দেয়নি। কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই সে হাতুড়ির তীক্ষ্ণ দিক দিয়ে ফের আক্রমণ চালাল ডোর লকের ওপর। ব্লান্ট আঘাতের চেয়ে শার্প ব্লো-ই এক্ষেত্রে বেশি কাজ দেয়। অর্ণবও স্টিয়ারিং থেকে একটা হাত সরিয়ে গাড়ির ভিতর থেকে দরজায় ধাক্কা মারতে যাচ্ছিল। অধিরাজের ধমক খেয়ে সিটিয়ে গেল, “স্টিয়ারিং সামলাও ইউ ফুল। ওভাবে ধাক্কা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। লক জ্যাম হয়ে রয়েছে। তুমি বরং স্টিয়ারিং আর এক্সলেটরে মন দাও।”
ততক্ষণে অধিরাজ বাইকটাকে গাড়ির একদম কাছে নিয়ে এসে কাচ শূন্য জানলা দিয়ে নিজের হাত গলিয়ে দিয়েছে ভেতরে। তার দেহটাও বাইকে ভর দিয়ে চলন্ত বাইক আর গাড়ির মাঝখানে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে। পরপর কয়েকটা মোক্ষম ব্লো। ভেতরে ও বাইরে আঘাত খেয়ে হ্যান্ডল সমেত গোটা সিস্টেমটাই খুলে পড়ে গেল৷ অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ তার ও জীবনের মধ্যে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে দরজা, সেটা অবশেষে খুলেছে! আর একটুও সময় নষ্ট না করে হ্যাঁচকা টান মেরে দরজাটাকে বাইরের দিকে খুলে দিয়েছে অধিরাজ। তারপর বাইকটাকে ফের সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে নিরাপদ দূরত্বে। দূরন্ত বেগে অর্ণবের গাড়ির একেবারে সমান্তরালে চলেছে সে। অর্ণবের ইয়ারসেট ফের কড়কড়িয়ে ওঠে, “স্পিড আপ অর্ণব। গাড়িটাকে একদম জোরদার স্পিডে টানো। মিনিমাম একশো কুড়ি কিমি পার আওয়ারে নিয়ে যাও। চিন্তা কোর না… আমি আছি!”
শুনেই অর্ণবের মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। জীবনেও এত স্পিডে সে গাড়ি চালায়নি। চিরকালই সাবধানী ড্রাইভার। অধিরাজেরই বরং র্যাশ ড্রাইভিং করার রেকর্ড আছে। স্পিড সে ভালোবাসে, সে বাইকই হোক কী চারচাকা। কিন্তু অর্ণব ড্রাইভার হিসাবে অত্যন্ত সতর্ক। আর এই পরিস্থিতিতে এত দ্রুতবেগে গাড়ি চালাতে হবে! “ভেবো না!” ওদিক থেকে অধিরাজের ধমক ভেসে এল, “যা বলছি করো। স্পিড আপ।”
অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই অ্যাক্সিলেটরের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়াতে লাগল অর্ণব। অধিরাজ মাথা ঝাঁকায়। অর্থাৎ ঠিক আছে। সে-ও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল তার বাইকের গতিবেগও। একে অপরকে নয়, মৃত্যুর কাউন্টডাউনকে টক্কর দিতেই বিদ্যুৎগতিতে ছুটছে দুই বাহন। অধিরাজ জানে অর্ণবের এই স্পিড খুব বেশিক্ষণ নিতে পারবে না তার গাড়ির জখম টায়ার। বেশিক্ষণ টানলে অন্য চাকাগুলোও কোলাপ্স করতে পারে। তাই যা করার তা দ্রুতই করতে হবে।
“অর্ণব, যা বলছি মন দিয়ে শোনো।” সে তাকে বুঝিয়ে বলে, “স্পিডটা এমন লেভেলে তুলবে যাতে তুমি স্টিয়ারিং থেকে সরে গেলেও ওটা নিজে থেকেই বেশ
খানিকটা এগিয়ে যায়। তুমি অ্যাক্সিলেটর ছেড়ে দিলেও ওর স্পিড আশির নীচে নামতে যেন কিছুটা সময় নেয়। আর যে মুহূর্তে একদম টপ স্পিডে উঠবে, তুমি একটুও না দেরি করে এক দুই তিন কাউন্ট করে খোলা দরজা দিয়ে সোজা বাইরে লাফিয়ে পড়বে। যতটা সম্ভব জোরে জাম্প করবে।”
এই চরম স্পিডে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লে তো অর্ণব এমনিই বাঁচবে না। সে ভয়ে ভয়ে বলে, “কিন্তু…!”
“আমার ওপর বিশ্বাস আছে?”
যে প্রশ্নটা ভেসে এল তার উত্তর দেওয়াই বাহুল্য। তবু কাঁপা গলায় জবাব দেয় সে, “নিজের চেয়েও বেশি।”
“তাহলে ফুল স্পিডে গিয়ে ওয়ান টু থ্রি কাউন্ট করে লাফিয়ে পড়বে।” তার মন্ত্র কণ্ঠস্বরে আদেশ, “কোনোকিছু ভাববে না। সামনে পেছনে ওপরে নীচে, কোনোদিকে তাকাবে না। বুঝেছ?”
“কপি দ্যাট।”
অর্ণব বিনাবাক্যব্যয়ে অ্যাকসিলেটরটাকে সজোরে চেপে ধরে। গাড়িটা গোঁ গোঁ করে উঠেছে। গিয়ার চেঞ্জ হচ্ছে। গতি ক্রমশ বাড়ছে। খোলা দরজা দিয়ে হিম শীতল হাওয়া হু হু করে ঢুকে পড়ছে ভেতরে। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপ্টায় চোখ খোলা রাখাই মুশকিল। যেন শত শত বরফের ছুরি তার খোলা মুখ চোখে আঘাত করছে। বেচারি স্যারের অবস্থা সহজেই অনুমান করতে পারে অর্ণব। তাঁর হেলমেটটাও মাথায় নেই। স্পোর্টস বাইক হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পড়ি মরি করে ছুটছে রাতের রাস্তা দিয়ে। অধিরাজের মুখ সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন। সে জানে সময় আর মৃত্যুকে টক্কর দিতেই হবে তাকে। অর্ণবের জন্য!
অর্ণবের গাড়ি কখনও কাত হতে হতে, কখনও লাফাতে লাফাতে রাতের অন্ধকার চিরে ফালাফালা করে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা এখন সর্বোচ্চ গতিবেগের অঙ্ক ছুঁয়েছে। বাইরের হাওয়া হা হা করে আছড়ে পড়ে বিপরীত দিকে ধাক্কা মারছে। অর্ণব টের পেল হাওয়ার প্রেশার এখন সম্পূর্ণ তার প্রতিকূলে। এই জোরদার এয়ার প্রেশারকে অগ্রাহ্য করে তাকে সিট থেকে লাফিয়ে পড়তে হবে! সে গাড়ির স্পিড বজায় রেখে একটা পা গেটের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। ড্রাইভিং সিটে বসলে দুটো পা-ই সামনের দিকে থাকে। কিন্তু ওভাবে রাখলে চলবে না। একেই বাতাস তাকে সমস্ত জোর দিয়ে পেছন দিকে ঠেলছে, তার ওপর পা যদি অসুবিধাজনক পজিশনে থাকে তবে বাইরের দিকে লাফিয়ে পড়া অসম্ভব। ভুলবশত যদি বুট, পা আটকে যায়, তবে সব প্রচেষ্টাই মাঠে মারা যাবে।
“ঠিক আছে।” আবার ভেসে এল অধিরাজের স্বর, “গেট রেডি।”
অর্ণব একটা বড়ো শ্বাস টানল। যতটা অক্সিজেন সারা শরীরে সঞ্চার করে নেওয়া যায় ততটাই নিল। এখনও তার একটা হাত স্টিয়ারিং ধরে আছে। একটা পা অ্যাকসিলেটরে। বেশ কয়েক মিনিট ধরেই গাড়িটা চরম গতিবেগে চলছে। স্পোর্টস বাইকটাও সমানতালে লড়ে যাচ্ছে। এবার অধিরাজ বাইকটাকে নিয়ে এল গাড়ির দরজার কাছে। চেঁচিয়ে বলল, “নাও…!”
অর্ণব বিদ্যুৎবেগে হাত আর পা মুক্ত করে নিল অ্যাক্সিলেটর আর স্টিয়ারিং থেকে। বাতাস তাকে পেছন দিকে আছড়ে ফেলার চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু সেসব কিছুর তোয়াক্কা না করেই সে অন্ধের মতো লাফ দিল শূন্যে। সেই মুহূর্তটা বুঝি স্থির হয়ে গেল। অর্ণবের দেহটা শূন্যে ভাসছে! বাতাস তার বুকের ওপর পালটা চাপ তৈরি করছে। উলটোদিকে ঠেলছে। সে টের পেল এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ তার মস্তিষ্কে ছেয়ে গেল। হাত দুটো শূন্যেই আশ্রয় খুঁজছে। এখনই সবেগে মাটিতে আছড়ে পড়বে। অথবা ডিভাইডারে। দু-টুকরো হয়ে যাবে খুলিটা! মেরুদণ্ডটা ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হবে। একটা প্রাণান্তকর যন্ত্রণার জন্য সে ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল। তার দেহটা এবার সজোরে মাধ্যাকর্ষণের প্রবল টানে নিম্নমুখী হচ্ছে…! পড়ছে… পড়ছে… পড়ল…!
“গট ইউ!” তার কানের কাছে অতি প্রিয় কণ্ঠস্বর বেজে উঠল, “আই গট ইউ!… অর্ণব!”
অর্ণব এবার একটু সাহস পেয়ে চোখ খুলল। কই! সে তো রাস্তায় আছড়ে পড়েনি! বরং দুটো শক্তিশালী হাতের বন্ধনের মধ্যে ঝুলছে! দুটো বলিষ্ঠ হাত পরম যত্নে, আশ্বাসে তাকে টেনে নিল অবধারিত মৃত্যুর মুখ থেকে। অর্ণব সবিস্ময়ে দেখল অধিরাজ তাকে দু-হাতে ধরে রেখেছে। অথচ বাইক তখনও তুমুল বেগে চলছে!
সে সভয়ে বলে, “স্যার… বাইকটা কে চালাচ্ছে?”
“আমিই চালাচ্ছি।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “যদি সবসময় হাতের সাপোর্টেই বাইক চালাতে হয় তাহলে আর র্যালিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মানে কী! এসব সিক্রেট স্টান্ট। তুমি ঠিক আছ?”
এবার আস্তে আস্তে বাইকের স্পিড কমছে। ওদিকে ড্রাইভারহীন গাড়িটা এঁকেবেঁকে স্পিডের ধাক্কায় বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল। অধিরাজ অর্ণবকে অবলীলায় টেনে তুলে বাইকের সামনের অংশে বসিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে সামলে বোসো। আর এবার যদি আমার চরিত্রে তোমার কোনো সন্দেহ না থাকে তবে অতিরিক্ত সেফটির জন্য আমায় জড়িয়েও ধরতে পারো।”
অর্ণব আর কোনোরকম দ্বিরুক্তি না করে অধিরাজকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরল। যেমন জলে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, তেমনভাবেই সে একেবারে সাপটে ধরেছে তাকে। বাইকটা এবার সামনের চাকায় ভর দিয়ে পেছন দিকটা শূন্যে তুলে দিয়ে স্কিড করল। ওকে অদ্ভুত কৌশলে মন্থর থেকে মন্থরতর করতে করতে ইচ্ছে করেই পিছিয়ে পড়ছে অধিরাজ। অর্ণবের ফাঁকা গাড়িটা টলমল করতে করতেই এখন নিরাপদ দূরত্বে চলে গিয়েছে। ওদের চোখের সামনেই সেটা টাল খেতে খেতে দূরে চলে যাচ্ছিল। আচমকা যেন একটা স্ফুলিঙ্গ দেখা গেল। পরক্ষণেই জোরদার ব্লাস্টের আওয়াজ। অর্ণব বিস্ফারিত দৃষ্টিতেই দেখল নিমেষে তার ধাতব চতুষ্পদ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে। প্রচণ্ড শব্দে আগুন গ্রাস করে নিচ্ছে সেই ভগ্নস্তূপকে! অধিরাজের আলিঙ্গনে সে তখন বাঁশপাতার মতো হি হি করে কাঁপছে। কী ভয়ংকর এই দৃশ্য। সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ছুঁয়ে এসেছে অর্ণব। একদিনে দু-বার নিশ্চিত যমের মরণ কামড় থেকে বেঁচে ফিরল! ওঃ।
অর্ণব যেন একরকম অবশ হয়ে গিয়েই মুখ গুঁজে দিয়েছে অধিরাজের প্রশস্ত বুকে। একটা অদম্য কান্না আর কাঁপুনিকে চেপে রাখার চেষ্টা করতে করতেই বলল, “থ্যাংক ইউ… থ্যাংক ইউ স্যার…!”
“এক্সট্রিমলি স্যরি অর্ণব।” অর্ণবকে সস্নেহে একহাতে আলগোছে জড়িয়ে ধরে বলল অধিরাজ, “এবার আর হ্যান্ড্ল নয়, তোমায় একটা আস্ত নতুন গাড়িই কিনতে হবে। তবে থ্যাংকসটা আমায় না দিয়ে আমার মাউন্টেনিয়ারিং-এর অভ্যেস আর ফিজিক্সের ডিগ্রিটাকে তুমি দিতেই পারো। ওই ক্ল হ্যামারটা আমার হাইকিং বা মাউন্টেনিয়ারিং-এর সঙ্গী। বরফ ভাঙতে বা তাঁবুর পেরেক ঠুকতে খুব কাজে লাগে। সবসময়ই আমার বাইকের টুলবক্সে থাকে। আজ এমনভাবে কাজে লাগবে তা ভাবিনি। ভাগ্যিস সঙ্গে ছিল।”
অর্ণব যেমন পুলিশে আসার আগে ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিল, ঠিক তেমনই অধিরাজ এ পেশায় আসার আগে ফিজিক্সে এম.এস.সি কমপ্লিট করেছে। সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সকলেই জানে যে সে ফিজিক্সের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া তুখোড় স্টুডেন্ট। ডক্টরেট করার সুযোগ পেলেও তার ইন্টারেস্ট অন্যদিকেই ছিল। তাই পি.এইচ.ডি. করেনি। কিন্তু ফিজিক্সের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হওয়ার দরুণ স্পিড, ভর, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, হাওয়ার গতিবেগ কিংবা ফোর্স ক্যালকুলেট করা তার কাছে অন্যদের তুলনায় অনেকটাই সোজা। তাই তার চেজিং সবসময়ই নিখুঁত হয়। অন্যান্য বাইকারদের মতো আনতাবড়ি স্পিডেও সে চলে না। তার কাছে স্পিড জিনিসটা পুরোটাই একটা অঙ্ক যেটা চেজিং-এর ক্ষেত্রে ভীষণভাবে কাজে লাগে। আজও অর্ণবের প্রাণ বাঁচিয়েছে সেই ফিজিক্সই।
“চলো, ফেরা যাক।” অধিরাজ বাইকটাকে ঘুরিয়ে নিয়েছে, “এবার তুমি পেছনে এসে আরাম করে বসতে পারো। ফাঁড়া আপাতত কেটেছে।”
অর্ণবের গায়ে যেন একবিন্দুও শক্তি নেই। সে তখনও এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে অধিরাজকে যেন এখনই কেউ তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে! অবস্থা দেখে অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে একটা ছোট্ট শিশুর মতো পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। হাসতে হাসতে সহজ গলাতেই বলল, “তোমার কপালই খারাপ অর্ণব। সমস্ত রোম্যান্টিক মুহূর্তগুলো স্রেফ জলেই যাচ্ছে। কোথায় তুমি প্রেমিকাকে কোলে নিয়ে ঘুরবে, তার বদলে আমার মতো বেরসিকের কোলে ঝুলছ!”
অর্ণব কোনো উত্তর দেয় না। সে তখনও অধিরাজের কপাট বুকে মুখ গুঁজে নিজেকে আপ্রাণ সামলানোর চেষ্টা করছে। তাকে যখন তুলে নিয়ে বাইকের পেছনের সিটে বসিয়ে দিল সে, তখনও ছেলেটা স্বাভাবিক হতে পারেনি। শুধু কোনোমতে বলল, “স্যার, আপনার স্টিচটা কেটে গেছে, ফের ব্লিডিং হচ্ছে।”
“ওটা বড়ো ইস্যু নয় ডার্লিং।” অধিরাজ বাইকে স্টার্ট দিয়ে বলল, “রক্তপাত, ক্ষত, ব্যথা তবু সহ্য হয়। কিন্তু আমাদের ফরেনসিকের অ্যাংরি বার্ড মহাশয়া ফের সুঁচ-সুতো নিয়ে তেড়ে আসছেন ভাবলেই হৃৎকম্প হচ্ছে। এর থেকে তো বার্নিং শিখও ভালো। অ্যাট লিস্ট সে ধমক দেয় না।”
এতক্ষণে অর্ণব একটু হাসার চেষ্টা করল, “এবার কি আমরা ফের ল্যাবে ফিরব?”
“হ্যাঁ।” অধিরাজ ক্লান্তস্বরে বলে, “ক্ষতস্থান স্টিচ না করলে লড়াইয়ে টিকে থাকব কী করে? বুঝতেই পারছ এ লোকটা ঠিক কতটা হিংস্র। একটু আগেই পায়ে একটা বুলেট খেয়েছে। তারপরও সে থামছে না। যন্ত্রণাকে যেমন সে অগ্রাহ্য করছে, তেমনই আমাদেরও অগ্রাহ্য করতে হবে। এ ক-দিন সে ঘুমোবে না, বিশ্রাম নেবে না। আমাদেরও ঘুমোনোর বা বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই। ল্যাবে গিয়ে নিজেদের মেরামত করে ফের কাজে লেগে পড়তে হবে।” “এখন কী কাজ?”
সে বাইকে স্পিড তুলতে তুলতেই জবাব দেয়, “নিজেদের একটু পরিচর্যা করেই আমাদের চলে যেতে হবে পি সি চৌধুরী আর ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে। মিস্ বোস আর মিস্ দত্ত অ্যালার্ট আছেন। ফোন করলেই দরজা খুলে দেবেন ওঁরা। যদিও আমার মনে হয় না ওখানে আজ কিছু ঘটবে। আজকের মতো লোকটার প্ল্যান বানচাল করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু ও ব্যাটা এখানেই থামবে না। অ্যাকশন আর রি-অ্যাকশনের সাইকেলটা চলতেই থাকবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ও খুব তাড়াতাড়িই জানবে যে ওর দ্বিতীয় হামলাটাও ব্যর্থ হয়েছে। তখন ও আরও একটা আঘাত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে। জানি না, এবার সেটা কোন্ দিক দিয়ে আসবে। সেইজন্যই এই সাবধানতা।” অর্ণবের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। এ কীরকম কিলার যে সবসময়ই আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। যুদ্ধে বিরতি দেওয়ার নামও করে না! সে কি থামতেই জানে না?
“শিখ প্রজাতিটা অসম্ভব ডেয়ার ডেভিল অর্ণব।” অধিরাজ জানায়, “ওরা ভালো হলে চূড়ান্ত ভালো৷ একেবারে শান্তিপ্রিয়, দরাজ মনের মানুষ। দিলদরিয়া যাকে বলে আর কী। কিন্তু মাথায় রক্ত চড়ে গেলে ওদের থামানো মুশকিল। একজন জেদি শিখ যে কী করতে পারে, আর কী পারে না, তার কোনো হিসাব নেই। আমরা ওদের পাঁইয়া, বাঁধাকপি বলে ঠাট্টা করি ঠিকই, বাট্ জেনে রেখো, শিখ জাতটার মতো বীর আর লড়াকু গোষ্ঠী খুব কমই আছে। ওরা হার মানতে জানে না। আর্মিতেও দেখবে শিখ ব্যাটেলিয়নকে ‘ব্রেভেস্ট’ বলা হয়। শিখ বীরেরা মোগল, আফগান থেকে শুরু করে ইংরেজদের পর্যন্ত নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছেড়েছে। ভাবতে পারো? জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ সর্দার উধম সিং কীভাবে নিয়েছিল! সে রীতিমতো লন্ডন অবধি চেজ করে মাইকেল ও’ডায়ারকে ক্যাক্সটন হলে প্রকাশ্যে গুলি করে মেরেছিল। কতখানি নির্ভীক, ডেসপারেট আর রিভেঞ্জফুল হলে এটা সম্ভব। শিখ প্রজাতিকে একদম আন্ডার এস্টিমেট কোর না। ওরা মারতে কিংবা মরতে ভয় পায় না।” বলতে বলতেই সে চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ে, “তার ওপর আমাদের মক্কেলকে যতদূর বুঝেছি, সে অন্যদের কবর খোঁড়ার আগেই নিজের কবরটাও খুঁড়ে রেখেই যুদ্ধে নেমেছে। তার কিচ্ছু হারানোর ভয় নেই। তাই সহজে থামবে না। বুলেটপ্রুফ ভেস্টটা সে পরেছে, তার কারণ এই নয় যে মরতে সে ভয় পায়। ওটা এইজন্য পরে থাকে, যাতে প্রতিশোধ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে আমরা তাকে মারতে না পারি। এবার দেখবে, বুলেটপ্রুফ প্যান্টও পরবে।”
“কিন্তু স্যার…!” অর্ণব একটু বিস্মিতভাবেই প্রশ্ন করে, “এসব তাকে দিচ্ছে কে? আই মিন, যত সাপোর্ট নিয়ে সে মাঠে নেমেছে, আমরাও সবসময় তা পাই না! এগুলো লাখ লাখ টাকার ইকুইপমেন্ট। লোকটা কি কোটিপতি?”
“উঁহু।” অধিরাজ বলে, “একেবারেই নয়। কোনো কোটিপতি আর যাই সাজুক, চাকর-বাকর-ড্রাইভার সাজবে না। সাইকোলজিতেই আটকে যাবে। যে অন্যকে হুকুম দিয়ে অভ্যস্ত, সে কিছুতেই অন্যের হুকুমে ‘আজ্ঞে হুজুর’ গোছের অ্যাটিটিউড রাখতেই পারবে না। তার মধ্যে একটা কম্যান্ডিং টোন থাকবেই, যেটা কোনো চাকর বা ড্রাইভারের থাকে না। এ কোনো কোটিপতি নয়। অত্যন্ত সাধারণ কোনো মানুষ।”
“তবে? আধুনিক বুলেটপ্রুফ ভেস্ট বা পাগড়ি, হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড, বিষাক্ত গ্যাস-কিংবা যাই হোক, প্রায় আনডিটেক্টেড্ একটা মার্ডার ওয়েপন, ইললিগ্যাল ঘুমের ওষুধ, ট্রিগার বম্ব-এগুলোর কোনোটাই কেরোসিন বা টায়ারের মতো সহজলভ্য নয়।” সে জানতে চায়, “এত সহজে সে এগুলোর অ্যাক্সেস পায় কী করে? আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে কেনে? না সত্যিই খালিস্তানি আতঙ্কবাদীদের সঙ্গে যুক্ত?”
“এখানেই তাকে বুঝতে সবচেয়ে বড়ো ভুল করছ তোমরা।” অধিরাজ আস্তে আস্তে বলল, “ও লোকটা মার্ডারার ঠিকই, কিন্তু সে শুধু রিভেঞ্জ নিচ্ছে। ভেবে দেখো, যাদের ও টার্গেট করছে তারা নিজেরাই ক্রিমিনাল। তাদের সে ঘৃণা করে। লোকটা যদি আতঙ্কবাদী বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কেউ হত, তবে পুলিশ অফিসারদের গাড়ি না উড়িয়ে গোটা থানা বা ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টটাকেই উড়িয়ে দিত। কিংবা আরও কোনো বড়ো কিছু, ট্রেন, বাস জাতীয় কিছুকে টার্গেট করত। টেররিস্ট বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওটাই স্টাইল। তা সে করছে না। তার অ্যাক্টিভিটি সজ্জনকুমারের যাবজ্জীবন হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে। তার আগে সে কিচ্ছু করেনি। অর্থাৎ ভারতীয় আইনের ওপর কয়েকবছর আগেও তার ভরসা ও বিশ্বাস দুই-ই ছিল। কতগুলো ক্রিমিনালের অ্যাকশনের রি-অ্যাকশনে ইনিও দায়ে পড়ে ক্রিমিনাল হয়েছেন। তাও বহুবছর পরে। কিন্তু লোকটা জাত ক্রিমিনাল নয়। তারও কিছু নীতি আছে। তাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো ডন বা কোনো আতঙ্কবাদী সংগঠনের কাছে সে যাবে না। কারণ আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং টেররিস্ট— দুই পক্ষই দেশের জন্য ক্ষতিকর। ওরা বিনা কারণে মানুষ মারে। যে লোক সজ্জনকুমার বা জগদীশ টাইটলারের মতো লোককে ঘৃণা করে, সে দাউদ কিংবা ওসামার জাতের মানুষের শরণাপন্ন হবে এটা প্রায় অসম্ভব। আমি যদি ভুল না করি, তবে সে দেশের ক্ষতি কোনোমতেই চায় না। এই দুই মক্কেলই তাকে ইকুইপমেন্টের বদলে এমনকিছু করতে বলবে যা সম্পূর্ণ ওর নীতিবিরুদ্ধ। শিখরা ক্রিমিনাল হলেও কিছু আদর্শ মেনে চলে। তাই এদের সঙ্গে হাতও মেলাবে না।”
“তবে?”
“মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন অর্ণব। এর উত্তর তো একমাত্র আমাদের ‘গুলাবোঁ’-ই দিতে পারবে। মারো তো ব্যাটাকে একটা ফোন।”
‘গুলাবোঁ’ তথা খবরি গুল্লু। অর্ণব এক হাতে অধিরাজের কোমর চেপে ধরে অন্য হাতে গুল্লুর নম্বর ডায়াল করে। গুল্লু এখনও সম্ভবত জেগেই ছিল। একবার রিং হতেই ফোনটা ধরল, “জি সাহেব।”
অধিরাজ হাত বাড়িয়ে অর্ণবের ফোনটা নিয়ে বলল, “গুলাব মিঞাঁ, আপনার জন্য আরও একটি গোপন কাজ আছে। একটু কষ্টকর। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর তুই ছাড়া এটা আর কেউ পারবে না।”
“হুকুম করুন স্যার।” গুল্লু আত্মবিশ্বাসী, “হয়ে যাবে।”
“আগে কাজটা শোন।” সে গলার স্বর নামিয়েছে, “খবর নে, শহরে এমন ক-টা ফার্মাসিউটিকলস্ কোম্পানি, ক-টা পেট্রল পাম্প আর লোক্যাল ইলেক্ট্রিকাল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আছে যার মালিক একজন এমন শিখ যার পরিবার ১৯৮৪ সালের আগে দিল্লিতে থাকত। এবং এদের কারোর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যাকগ্রাউন্ড আছে কিনা। কাল দুপুর বারোটার আগে লিস্টটা আমার চাই। পারবি?”
“বললাম তো স্যার।” গুল্লু খবরি জোর দিয়ে বলে, “হয়ে যাবে।”
“গ্রেট।”
অধিরাজ লাইন কেটে দিয়ে ফোনটা অর্ণবকে ফেরত দেয়। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে নিজে থেকেই বলল, “দেখো, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট সে কোথা থেকে নিয়ে আসে তা ট্র্যাক করা মুশকিল। হয়তো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট লোকটা দিল্লিতেই আমদানি করেছে। কিন্তু দুটো জিনিস আছে যেটা নিজে তৈরি করা মোটেই হালুয়া-পুরী নয়। থালায় কিনতে পাওয়া যায় না। সঙ্গে কিলোদরে ক্যারি করা যায় না। বা বাইরে থেকে অর্ডার দিয়ে আনানো যায় না। দ্যাটস্ হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড অ্যান্ড বম্ব। কারণ এর আগে সে সালফিউরিক অ্যাসিডই ইউজ করেছিল। কলকাতায় এসে হাইড্রোফ্লুওরিক ইউজ করছে। মানেটা একদম স্পষ্ট। এখান থেকেই জিনিসটা সে জোগাড় করেছে, বাইরে থেকে ক্যারি করে আনেনি।”
এবার অর্ণবের মনে পড়ল ডঃ চ্যাটার্জির কথাটা। হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড জোগাড় করা খুব মুশকিল। তিনি বলেছিলেন ও জিনিসটা একমাত্র ফার্মাসিউটিকলস্, হাই অক্ট্যান গ্যাসোলিন, ফ্লুওরিসেন্ট লাইট বাল্ব আর ইলেক্ট্রিকাল কিছু জিনিসে ব্যবহৃত হয়। এবার গোটা ব্যাপারটা তার মাথায় ঢুকল। অধিরাজ হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিডের মাধ্যমে বার্নিং শিখকে চেজ করবে। সঙ্গে একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকেও খুঁজবে যাদের বিশেষ করে অয়েল মেকিং ইন্ডাস্ট্রি ও ফার্মাসিউটিক্ কোম্পানিতে থাকার
সম্ভাবনা প্রবল। কারণ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররাই বম্ব বানাতে ওস্তাদ। “লোকটা নিশ্চয়ই গুচ্ছ গুচ্ছ হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিড আর এক ডজন বম্ব পকেটে নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায় না। তাতে তার নিজেরই বিপদে পড়ার চান্স প্রবল। সুতরাং দুটোই লোক্যালি আমদানি হয়। উপরোক্ত তিনটে জায়গা থেকেই সে একমাত্র অ্যাসিডটা পেতে পারে। কিন্তু সবজায়গায় পাবে না। এমনকি প্রচুর টাকা দিলেও পাবে না। সেক্ষেত্রে একটাই রাস্তা আছে। এমন কিছু কন্ট্যাক্টের সঙ্গে ডিল করা যারা তার সমব্যথী। অর্থাৎ যারা সেই একই জ্বালায় জ্বলছে, অথচ নিজেরা কিছু করতে পারছে না। শিখপ্রজাতির আরও একটি বৈশিষ্ট্য যে ওরা প্রচণ্ড ঐক্যবদ্ধ। তার ওপর সেই শিখটি যদি নিজেই কোনোভাবে অ্যান্টি শিখ রায়টের শিকার হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। টাকার গল্পও নেই। বিনামূল্যেই সে বার্নিং শিখকে অ্যাসিড আর বম্বের জোগান দিয়ে যাবে। যদি ধরাও পড়ে, তবু মরে গেলেও মুখ খুলবে না। আন্ডারওয়ার্ল্ডের হিস্ট্রিশিটারকে থার্ড ডিগ্রির দাওয়াই দিলেই সে সব বলে দেবে। কিন্তু এক্ষেত্রে একজনও মুখ খুলবে না।” অধিরাজ একটু অন্যমনস্ক স্বরে বলে, “কারণ জিহাদিদের মাথায় যেমন ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে ‘কৌম’ তথা জাত ও জাতভাইদের জন্যই তারা বলিপ্রদত্ত, তেমনই শিখও মরে যাবে, তবু জাতভাইয়ের সঙ্গে বেইমানি করবে না। এটাই ওদের ধর্ম অর্ণব। তার ওপর যদি সমব্যথী হয় তবে তাদের চোখে বার্নিং শিখ যেটা করছে, সেটাই জাস্টিস। ওরা নিজেদের প্রাণ দিয়েও ওকে সাপোর্ট করবে। হয়তো এটাই তোমার প্রশ্নের উত্তর। ঠিক এভাবেই সে কখনও দিল্লিতে, কখনও কানপুরে, কখনও বেঙ্গালুরুতে বা কখনও কলকাতায় সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনায়াসেই কালেক্ট করছে। গোটা ভারতবর্ষে বিভিন্ন পেশায় শিখেরা ছড়িয়ে আছে। বার্নিং শিখ ‘কৌম’ বা জাতীয়তাবাদের ভোক্যাল টনিক দিয়েই তাদের কাছ থেকে সব আমদানি করছে। দেখবে, গুলাবোঁ কাল যখন ডিটেইলস নিয়ে এসে হাজির হবে তখন কোনো এক পেট্রল পাম্প বা ফার্মাসিউটিক্ কোম্পানির মালিক হিসাবে অবধারিতভাবে অন্তত একজন শিখকে পাওয়া যাবেই। একাধিক থাকলেও আশ্চর্য হব না। এবং তাদের মধ্যে কারোর-না কারোর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে বাধ্য। মিলিয়ে নিও। আর গুল্লু এই কাজের জন্য পারফেক্ট চয়েস কারণ সে নিজেই একজন শিখ। জাতভাইরা মোটামুটি সব জাতভাইদের খবরই রাখতে পারে। তারা কমিউনিটির ই লোক। তাই খবর বের করা সহজ হয়।”
অর্ণব স্তম্ভিত দৃষ্টিতে অধিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটার কি কোনো অলৌকিক শক্তি আছে! এক্স-মেন নামের ফিল্মসিরিজে ‘প্রোফেসর-এক্স’ বা
‘জেভিয়ার’ নামের একটি চরিত্রের প্রত্যেকের মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল। স্যারেরও কি তেমনই কোনো ক্ষমতা আছে? নয়তো যে প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে প্রায় প্রহেলিকার সমান, তা তিনি এত দ্রুত বুঝছেন কী করে? বার্নিং শিখের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ, প্রত্যেকটি ভাবনা চিন্তা কী করে এত সহজে মেপে নিচ্ছেন।
“বার্নিং শিখ কোনো ক্লু ছাড়ে না।” অধিরাজ ধীর স্বরে বলল, “কিন্তু ওর মোডাস অপারেন্ডিই আমাদের ওর কাছে নিয়ে যাবে অর্ণব। তুমি বরং বলো আজ শেষরাতে কোথায় পাহারা দিতে যেতে চাও! পি সি চৌধুরীর বাড়ি না আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তার ফ্ল্যাট? তোমায় আমি নিজেই সেখানে ড্রপ করে দেব। এই মুহূর্তে কোনো মূল্যেই তোমাকে একা ছাড়তে রাজি নই।”
“আজ পি সি চৌধুরীর বাড়িতেই যাই।” অর্ণব একটু ভেবে বলল, “ওখানে আচার্য স্যার আছেন। ওঁর আর মিস বোসের কাছ থেকে আপডেট নেওয়াও হয়ে যাবে।”
“ফাইন।” সে কাঁধ ঝাঁকায়, “অ্যাজ ইউ উইশ। আজ তবে আমি প্রণবেশদা আর মিস্ দত্তের কাছেই ডিউটি দিই। তবে যা-ই ঘটুক ফোনে ক্রমাগত আপডেট দিয়ে যাবে। মিস্ বোসকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে আর বাইরে ক্রমাগত রাউন্ড লাগাবে। অপরিচিত কাউকে দেখলেই অ্যালার্ট হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে জরুরি কথা, বি অ্যালার্ট অ্যান্ড কেয়ারফুল। কারণ পরবর্তী আঘাত কখন ও কোথা দিয়ে আসবে তা আমরা জানি না।”
অর্ণবকে বোধহয় এই সাবধানবাণীটা না দিলেও চলত। একটু আগেই যা ঘটেছে তারপর থেকে যে-কোনো মানুষ আর কোনোরকম চান্স নেবে না! এখন থেকে তো সে নিজের ছায়া দেখলেও সতর্ক ও সন্দিগ্ধ হয়ে উঠবে। সে নিবিড় স্বরে কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল। তার আগেই অধিরাজ তাকে বাধা দিয়ে ফের বলে ওঠে, “হিস্টোকে বলো তো তাড়াতাড়ি কয়েক সেট জামাকাপড় ফরেনসিক ল্যাবে নিয়ে আসতে। আমি আর কতক্ষণ পর্দা, কার্পেট, কলাপাতা জড়িয়ে বসে থাকব?”
তার কণ্ঠে অসহায়তা প্রকট। অর্ণব আগের বাক্যটা চেপে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল, “ওকে স্যার…!”
যে বাক্যটা আটকে গিয়েছিল সেটা আর তার মুখে এল না। আবেগের বশে বলে ফেলতে যাচ্ছিল। সে নিজেকে সামলে নেয়। কে জানে, স্যার কী মনে করবেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে মনে বলল, “আপনার অনুমতি ছাড়া আমি কিছুতেই মরব না…!”
