কালরাত্রি – ৩২

(৩২)

অধিরাজের ডিডাকশন একদম সঠিক ছিল। সূর্যাস্তের পর থেকেই আসল খেলা শুরু হল। আর সে খেলা একদম অপ্রত্যাশিত ও অভিনব। অর্ণবের মনে হচ্ছিল ওরা বুঝি একখানা দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটু এদিক ওদিক হলেই শেষ! পুলিশ ও প্রশাসন বুঝে উঠতে পারছিল না যে কী করবে, কী করা উচিত কিংবা কোনদিকে দৌড়বে। মিডিয়া ফের ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে যত্রতত্র দৌড়োতে শুরু করল। গোটা কলকাতা স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল এই অদ্ভুত লড়াই। কেউ বুঝতেই পারছিল না, আদতে হচ্ছেটা কী! কেনই বা হচ্ছে!

সারাদিন মোটামুটি সব ঠিকই ছিল। অধিরাজ মিস্ চাউমিন তথা দৃষ্টি দত্ত-কে আর বার্নিং শিখের পেছনে পাঠায়নি। তাকে ফোনে নির্দেশ দিয়েছিল, “আপনি বরং ভালো করে লাঞ্চ টাঞ্চ সেরে বিড়ালঘুম দিয়ে নিন। আমিই আপনার জন্য লাঞ্চ পাঠিয়ে দিচ্ছি অ্যাজ গ্র্যাটিটিউড, আরাম করে খান। আপনি তো অন্যদের মতো টাকা নিতে চান না, তাই গিফটই সই। আপাতত আপনার কাজ শেষ। ওকে ট্র্যাক না করলেও অসুবিধে নেই।”

“ক্‌…ক্…কিন্তু ব…ব…ব…বস্।” দৃষ্টি তোতলাতে তোতলাতে বলল, “যদি ও ব্যাটা ফ্…ফ্…ফের কিছু গোলমাল করে!”

“সূর্যাস্তের আগে ও আর তেমন কিছু করবে বলে মনে হয় না। যে তীরটা মারার ছিল সেটা ফস্কে গেছে।” সে একটু হাসল, “আপাতত ওর কাছে নতুন তির নেই। ও নিজের ঘাঁটিতেই ফিরবে। ওখানেই চুপ করে বসে থাকবে। ও ‘মঞ্জা হুয়া খিলাড়ি’ সেনোরিটা। ঠিক বুঝেছে কোনো-না কোনো ইনফর্মার ওকে স্টক করছে। সেটা বুঝতে পেরে এবার ও ফেরোশাস হয়ে উঠতে পারে। আপনাকে হয়তো স্পট করতে পারবে না, কিন্তু যাকেই সন্দেহজনক মনে হবে তাকেই মারবে। এমনিতেই অনেক নির্দোষ প্রাণ গেছে। আরও যাক, আমরা চাই না। কোনো লুজ বল আর দেব না। তবে স্লগ ওভারে ও পেটাবেই। বাউন্সার পেলেও মারবে। সেটাও ওকে ফলো করে ঠেকানো যাবে না। তাই ছেড়ে দেওয়াই ভালো।”

“তা ঠিক!” চাউমিন সায় জানাল, “বাট্ ব…ব…বস্, যদি বড়ো কোনো হাঙ্গামা করে?”

“তার থেকেও বড়ো হাঙ্গামা হবে যদি আপনি এখন রেস্ট না নিয়ে চোখে ডার্ক সার্কেল ফেলেন মাদমোয়াজেল। সেই ভোর থেকে লেগে আছেন। শরীরটাকে তো ঠিক রাখতে হবে।” অধিরাজের চোখে দুষ্টুমি, মুখে সেই পেটেন্ট দুষ্টু হাসি, “কিংবা উত্তেজনার চোটে আরও গোটা কয়েক আছাড় খেয়ে কালশিটে বাঁধান। সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সুন্দরী ইনফর্মারের কোনো ক্ষতি হলে আমরা বড়োই দুঃখ পাবো।”

“হো…হো…হোমিসাইডের ই…ইনফর্মার!” দৃষ্টির বুঝি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে, “আ…আপনি কি আমার সঙ্গে ঠাখঠাট্টা করছেন ব…ব….বস্?”

“বিন্দুমাত্রও নয়।” সে হাসছে, “ওয়েলকাম টু দ্য ডিপার্টমেন্ট মিস্ বন্ড। তবে আপনাকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে।”

“সব শিখ… শিখ… শিখ…।”

অর্ণব কপাল চাপড়ায়, “ব্যস্, শি-তেই আটকে গেলেন। হয়তো এবার লাফাতে লাফাতে দুটো আছাড়ও খাবেন!”

“সব শিখে নেব…!” ওদিক থেকে জলতরঙ্গের মতো কণ্ঠস্বর কলকল করে ওঠে, “দ্যাখো ব্রো, এই হাঁড়িমুখো কাকতাড়ুয়া অ্যাটিটিউড ছাড়ো। ওরকম নিপাট ভালোমানুষ পাপ্পু বেটা মার্কা মুখে গোগা কাপুর টাইপ এক্সপ্রেশন একটুও মানায় না। আর রইল আছাড়ের কথা? এখন থেকে আমি সগর্বে আছাড় খাব। বল্লে বলে…শাবা শাবা…।”

অর্ণব জ্বলে গিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকায়, “স্যার। আমায় পাপ্পু বেটা বলল! আর দেখেছেন? এখন কিন্তু একটুও তোতলাচ্ছে না!”

অধিরাজ সজোরে হেসে ওঠে, “ওকে মিস্ বন্ড। আছাড়ের সঙ্গে আর কী খেতে পছন্দ করেন আপনি?”

“যে-কোনো পাঞ্জাবি কুইজিন। ‘অওধিও চলে।”

“ঠিক আছে। তবে মহারাজা থালি পাঠিয়ে দিচ্ছি।” সে হাসতে হাসতেই বলে, “সঙ্গে আইসক্রিম ট্রিট। ছাড়ছি। সি ইউ সুন।”

“ওকে ব…ব…বস্।”

লাইন কাটার সঙ্গে সঙ্গেই ফের অর্ণবের নালিশ, “সঙ্গে হাঁড়িমুখো কাকতাড়ুয়া আর গোগা কাপুরও বলেছে।”

সে হাসিমাখা সস্নেহ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়, “তাতে কী হল? আমাদের তথাকথিত পাপ্পু বেটা কিন্তু রীতিমতো সুদর্শন। যেমন রূপ, তেমন রং। ঘুরিয়ে তো তোমায় হ্যান্ডসামই বলেছেন।”

অর্ণব চোখ সরু করেছে, “কাকতাড়ুয়া আর গোগা কাপুরও হ্যান্ডসাম?”

“না। তবে কাকতাড়ুয়া খুব কাজের জিনিস। আর গোগা কাপুর অলটাইম লিজেন্ড। শুনেছি ফিল্মে যতই ভিলেন বা মহাভারতের কংস হোন না কেন, বাস্তব জীবনে অত্যন্ত ভদ্র ও ভালোমানুষ ছিলেন। আমি এর মধ্যে আপত্তিকর কিছু দেখছি না।” অধিরাজ একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, “তোমার কমপ্লেইনের কোটা যদি কমপ্লিট হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আমরা বার্নিং শিখ কেসে ফিরে আসতে পারি?”

সে আর মিস্ চাউমিনের বিষয়ে কথা বাড়ায় না। স্যারের পেয়ারের খবরি হয়ে মেয়েটা সাপের সাত পা দেখেছে। আবার বলে কিনা সগর্বে আছাড় খাবে! আহ্লাদ দেখো! যদিও অর্ণব মনে মনে বেজায় চটেছে। কিন্তু এখন ওসব আলোচনার সময় নয়। একটু উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “আপনি শিওর যে সন্ধেবেলা বার্নিং শিখ কিছু করবে?”

“আলবাত করবে।” অধিরাজের মুখে চিন্তার মেঘ, “আজই শেষ রাত। মরণ-কামড় দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ও করবেই। কিন্তু ঠিক কী করবে সেটা জানি না। সেটা জানার জন্য সূর্যাস্তের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। লেটস সি।”

কথা শেষ করেই সে প্রথমে বিশ্বকে ফোন করল। জানতে চাইল যে তার কাজ কতদূর। বিশ্বজিৎ জানায়, “অলমোস্ট ডান বস্। একটুখানি বাকি আছে। ওটা কমপ্লিট করেই তোমায় পাঠাচ্ছি।”

“ওকে।”

রমানাথ চক্রবর্তীকেও ধন্যবাদ জানাতে চাইছিল অধিরাজ। কিন্তু তাঁর ফোন সুইচড অফ! কে জানে কোথায় আছেন! সচরাচর ক্রাইম রিপোর্টারদের ফোন বন্ধ থাকে না। অথচ এই হাই টাইমে ভদ্রলোক ফোন-টোন অফ করে হাওয়া। অধিরাজ বিস্মিত হলেও বিশেষ মাথা ঘামাল না। বরং মিস চাউমিনের জন্য প্রচুর খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করে তারপর প্রীতমকে ফোন করে আহেলির খবর নেয়। প্রীতম জানাল, “এমনিতে উনি খুবই সুইট। কিন্তু নাকটা নিয়ে বড়োই ঝামেলায় পড়েছেন। আর চুল কেটে ছোট করেছি বলে একটুখানি আর্গুমেন্টও করেছেন। উইগও নাকি কুটকুট করছে…!”

“তোর কাছে তুলো আছে?”

“আছে। কেন?”

“কানে দিয়ে বসে থাক্। নয়তো কান আর মাথা দুই-ই খেয়ে ফেলবেন।” অধিরাজ বিরাট একটা হাই তুলে বলে, “আর বলে দিস যে ওঁর কপাল ভালো যে চুল শুধু ছোট করে কেটে দেওয়া হয়েছে, ওঁর টপ বসের মতো ‘টাকশ্রী’ করে দেওয়া হয়নি। বেশি খ্যাচখ্যাচ করলে পুরোটাই উড়িয়ে দিস্।”

প্রীতম অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে, “তুই শুধরোবি না রাজা। শি ইজ ভেরি প্রিটি ওম্যান। চুলও খুব সুন্দর। একটু আপত্তি করতেই পারেন।”

“প্রিটি ওম্যান তো কী? আমি কি শাহরুখ খান হয়ে, আমেরিকান ফ্ল্যাগ উড়িয়ে, মাঝরাস্তায় নাচতে নাচতে গান গাইবো?” সে মাথা নাড়ে, “আমার কাজ না হলে প্রিটি, সুইটি, প্রীতি জিন্টা, মাথার সুন্দর চুল, সবই গোল্লায় যাক।”

“কাজ হয়ে যাবে। ডোন্ট ওরি।”

প্রীতমের ফোনটা ডিসকানেক্টেড হতে না হতেই টুইঙ্কল এসে রিপোর্ট করল ও কারেন্ট স্টেটাস জানাল। মিস্ বোস আপাতত আত্রেয়ীকে ব্যাক-আপ দিতে গিয়েছে। ওর কাছে এখন আগ্নেয়াস্ত্র আছে। আর্বানায় এই মুহূর্তে একমাত্র শুরশীল ছাড়া বাকি সব নারীরাই উপস্থিত। গুরশীলের কেসটা দেখে ও জেনে সবারই চোখ ছানাবড়া। যদিও তার গ্রেফতারির পরই শ্রীদর্শিনী ও তার মা শপিং মলে গিয়েছিল। তিতলিও নাকি কীসব কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিল। কোকিলাও মাঝখানে বেশ কিছুক্ষণের জন্য হাপিশ হয়েছিল। তবে সে কোথায় গিয়েছিল তা মিস্ দত্ত-র জানা নেই। হয়তো এই মুখরোচক ঘটনাটি অন্য কাউকে পেশ করার শখ হয়েছে তার। তবে সকলেই একটু আগেই ফিরে এসেছে।

প্রণবেশ লাহিড়ী সদলবলে হসপিটালে মোতায়েন আছেন। যথারীতি হাঁক-ডাক করে টিমমেটদের ধমকে চমকে রেখেছেন। তবে তাঁর কড়া নজর ও সতর্ক প্রহরার ফাঁক গলে একটি মাছিও হসপিটালে ঢুকতে পারবে না এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়াই যায়। অফিসার লাহিড়ীর এসব ক্ষেত্রে রেকর্ড অত্যন্ত ভালো। এছাড়া আর কোথাও কোনোরকম ঘটনা ঘটেনি। শহরবাসীরা যদিও খুব নিশ্চিন্তে নেই। তবু জনজীবন আটকে যায়নি।

“হুঁ।”

অন্যমনস্কভাবেই বলল অধিরাজ। তারপর নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল এবং অভ্যাশবশত সেটাকে ঠিক করতে-করতে বলল, “অর্ণব, তুমি এই ফাঁকে একটু রেস্ট নিয়ে নাও। সেনোরিটা, আপনিও। আপাতত বেশ কিছুক্ষণ আর কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই। এই ক-দিন কারোরই কোনো রেস্ট হয়নি। অর্ণব, তুমি আমার কেবিনের সোফাটায় লম্বা হতে পারো। আর মিস্ অরোরা, আপনি চাইলে কনফারেন্স রুমের সোফাতে একটু গড়িয়ে নিতে পারেন। একা একা যদি ভয় লাগে তবে আপনার সিকিউরিটির জন্য…!”

“ভয় লাগবে! আ-মা-র!” টুইঙ্কল চোখ কপালে তুলে ফেলে, “বরং কেউ যদি আমাকে খোঁচানোর তাল করে তবে তারই ভয় পাওয়া উচিত। আপনি জানেন না স্যার। অনেক আচ্ছা আচ্ছা বদমায়েশ, লুচ্চা, লফঙ্গাকে আমি পিটিয়ে সিধা করেছি। অনেক রেপিস্টের হাড় ভেঙেছি। আমার হাত আর পেট…!”

“একদম সলমন খানের মতো সলিড।” তার কথাটাকে সম্পূর্ণ করে দিয়েছে অধিরাজ, “স্যরি, মাই ব্যাড। ভুলেই গিয়েছিলাম মাই লেডি। আপনার সিকিউরিটির সত্যিই প্রয়োজন নেই। তবে আমি একটু ভীতু মানুষ তো। কনফারেন্স রুমে আমারও একটু দরকার আছে। একা একা যাব কিনা ভাবছিলাম। একটু ফাঁকা ফাঁকা কিনা৷ আপনি যদি আমায় একটু সিকিউরিটি প্রোভাইড করেন তাহলে ভালোই হয়। আফটার অল, আপনি একজন সাহসী কপ্। এবং বদমায়েশদের দাঁত আর হাড় ভাঙার অভিজ্ঞতা আপনার আছে।”

টুইঙ্কল সরল হলেও বুদ্ধিহীন নয়। কথাটার পেছনের আসল অভিসন্ধি বুঝতে তার বাকি নেই। সে হেসে ফেলেছে, “ওকে স্যার। আপনার সিকিউরিটির দায়িত্ব আমার। ভেরি সুইট অব ইউ।”

কেবিনের দরজা খুলে মৃদু ঝুঁকে ‘বাও’ করল অধিরাজ, “আফটার ইউ।”

তারপর থেকেই সময় বড়ো আস্তে আস্তে কাটছিল। অর্ণব প্রথমে অধিরাজের কেবিনের সোফায় শুতে রাজি হচ্ছিল না। সে জানে, স্যার নিজেই প্রয়োজন হলে ওই সোফায় একটু রেস্ট নিয়ে নেন। আজ যদি অর্ণব সেটা দখল করে তবে তিনি যাবেন কোথায়! কিন্তু অধিরাজের সহাস্য মন্তব্য, “আমি এমনিতেই আজ মড়ার ট্রলিতে বডি ফেলে দিয়েছিলাম। ‘রেস্ট ইন পিস’ না হলেও কিছুটা রেস্ট পেয়ে গেছি। কিন্তু তোমরা তো দু-চোখের পাতা এক করার সামান্য সুযোগও পাওনি। পবিত্র আজ বাড়ি গেছে। মিস্ দত্তও আজ দুপুরে একটু রেস্ট নিতে পারবেন। মিস্ বোসও গাঁজার কল্যাণে কিছুটা ঘুমিয়ে নিয়েছেন। প্রণবেশদার এখন ঘুমোনোর উপায় নেই। তবে ওঁকে যতটুকু চিনি গত দু-দিনে নিশ্চয়ই ফাঁক বুঝে নিজেকে চার্জ দিয়ে নিয়েছেন। মিস মুখার্জিও সাজুগুজুর মধ্যে বেশ এসিরুমে, আরামদায়ক নরম কাউচে ঘুমোনোর সুযোগ পাবেন। বাকি রইলে তুমি আর মিস্ অরোরা। মিস্ অরোরা অলরেডি শয়নে পদ্মলাভ করেছেন। উনি আপত্তি করলেও বাইরে গার্ড দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি। ওই দিকটা ফাঁকা, আর মানুষকে বিশ্বাস নেই। এবার তুমিও রেস্ট নিয়েই ফেলো!” “কিন্তু স্যার… আপনি….?”

অর্ণব তখনও ইতস্ততঃ করছে দেখে সে মৃদু হাসল, “মানুষ যে কোনো অবস্থায় ঘুমের সঙ্গে চুক্তি করে নেয় ডার্লিং। নেপোলিয়ন চলন্ত ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুমোতে পারতেন, আর আমি একটা রিভলভিং চেয়ারে কেৎরে পড়ে রেস্ট নিতে পারব না? তবে হ্যাঁ, পুরো ডিপ স্লিপে চলে যেও না। আমার মন বলছে, ঠিক সন্ধে নামার পরই কিছু একটা হবে। তার আগেই উঠে পড়বে।”

অর্ণব আর কী করে! স্যারের প্রবল যুক্তির সামনে কিছু বলাই মুশকিল। অগত্যা সে চুপচাপ সোফায় লম্বা হয়ে শুয়েই পড়ল। নিদ্রাহীন রাত্রিগুলোর ধকলের ক্লান্তিতে গোটা দেহ অবসন্ন ছিল। কিন্তু ঘুম অত সহজে এল না। আধো তন্দ্রা, আধো জাগরণের মধ্যেই শুনছিল যে অধিরাজ একের পর এক ফোনে নির্দেশ দিয়ে চলেছে। গোটা কলকাতার পুলিশকে বলা হল হাই অ্যালার্টে থাকতে। ট্র্যাফিকের ডিউটি যাদের, তাদেরও সাবধান করে দেওয়া হল। বলা হল প্রত্যেকটা সিসিটিভি ফুটেজ যেন তারা সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে। রাস্তার ওপর কোনো সন্দেহজনক বেওয়ারিশ বস্তু বা ভেহিক্‌ল্স দেখলেই যেন সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেয়। রেলপুলিশের কাছেও ‘চেতাবনি’ গেল। ডগ স্কোয়াড নির্দেশ পেল স্নিফার ডগ নিয়ে রেলস্টেশন, বাস ডিপো, শপিং মলের মতো জনবহুল জায়গায় রাউন্ড মারার। অর্ণবের কানে এল যে বম্ব স্কোয়াডকেও চেতিয়ে দিল অধিরাজ। কোনোরকম প্রয়োজন পড়লেই যাতে সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তাদের সাহায্য পাওয়া যায়। ফায়ার ব্রিগেড থেকে শুরু করে সমস্ত এমার্জেন্সি সার্ভিসের ঘোড়ায় জিন দিয়ে রাখল সে। জানে, বার্নিং শিখের হাতে এখন বম্ব নেই। কিন্তু ওদের ডাইভার্ট করার জন্য কিছু-না কিছু কাণ্ড তো করবেই লোকটা! কোমলের তৈরি করা সেই ভয়াবহ বম্ব স্টকে না থাকলেও তার যা পরিচিতির লেভেল, তাতে শেষমুহূর্তে একটা দুটো বম্বের মশলাপাতি সে আনিয়েও নিতে পারে। আজকাল ছোটখাটো বন্ধ বানানো খুব কষ্টকর নয়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও লোকে লিকুইড সোপ বা সাবান দিয়েও বিস্ফোরক বানাতে পারে! প্রাণঘাতী না হলেও দৌড় করানোর জন্য যথেষ্ট। প্যানিকও তৈরি করতে পারে। অথবা তার অন্য কোনো বিপজ্জনক প্ল্যানিং থাকলেও অবাক হবে না। এই মুহূর্তে বার্নিং শিখকে বিন্দুমাত্রও আন্ডার এস্টিমেট করতে চায় না। লোকটা সব কিছু করতে পারে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। ঠিক কী করবে সেটা যদি জানা থাকত…।

প্রথম চমকটা এল ঠিক সন্ধে সাড়ে ছ-টা নাগাদ। ততক্ষণে ফের চাঙ্গা হয়ে উঠেছে হোমিসাইড টিম। পবিত্র বউয়ের সঙ্গে বহুদিন পর প্রেমালাপ সেরে টেরে একেবারে ফুল চার্জড হয়ে ফিরে এসেছে। যদিও মুখ কাঁচুমাচু করে অধিরাজের কানে কানে বলেছে, “খুড়ো, ওই রেডিও-অ্যাকটিভ মেসেজটা যে তোমার কাছে এসেছিল তা বউয়ের কাছে ফাঁস করে দিও না। তবে আমি কিন্তু ফুলটু গেছি।”

অধিরাজ তার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়, “কোন্ মেসেজ? তুমি আমায় কোনো মেসেজ করেছিলে? আসলে আজকাল আমারও শর্ট টাইম মেমোরি লস্ হয়ে যাচ্ছে। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো!”

পবিত্র একগাল হাসে, “থ্যাংকস বস্। আন্ডারস্টুড।”

টুইঙ্কল অরোরা দিব্যি ঘুমিয়ে টুমিয়ে নেওয়ার পরে খানকতক কুলচা আর ডাল মাখানি, চিকেনভর্তা দিয়ে নামমাত্র আর্লি ডিনার করে যথারীতি ফুলফর্মে। এখন সে আয়েশ করে চুরুট টানছিল। আজ সবাইকেই আর্লি ডিনার করার নির্দেশ দেওয়া আছে। অধিরাজ আগেই অনলাইন খাবার অর্ডার দিয়ে রেখেছিল। পবিত্র লেট লাঞ্চ করেছে বলে আর কিছু খায়নি। অর্ণব আর অধিরাজ ছ-টার আগেই স্যুপ, স্যান্ডুইচ, বেকড ফিশ স্টিক আর স্যালাড দিয়ে নমো নমো করে ডান হাতের কাজ সেরে রেখেছে। এই মুহূর্তে পেট যেমন খালি না রাখাই ভালো, তেমনই একদম পেট ঠেসে খাওয়াও উচিত নয়। অন্যদিকে আহেলির চিন্তাও অবশ্য তার মাথায় আছে। প্রীতমকে বলেই রেখেছে সে যেন সময়মতো ওকে একটু সুইট কর্ন চিকেন স্যুপ, মিষ্টি, শরবত বা সম্ভব হলে নরম কোনো খাবার পেটপুরে খাইয়ে দেয়। অধিরাজের হাঞ্চ বলছে, আজ বেজায় দৌড়োতে হবে। টুইঙ্কলের ব্যাপার অবশ্য আলাদা। সে একেবারে অগস্ত্য মুনির নাতনি। ইল্বল-বাতাপি তো দূর, বোধহয় আস্ত মহিষাসুরকেও খেয়ে মেরে দেবে। কয়েকটা নিরীহ কুলচা তার আর কী ক্ষতি করবে!

অর্ণবের একটু রেস্ট নিয়ে বেশ তরতাজা লাগছিল। অধিরাজ অবশ্য ঘুমোয়নি। সে টিভিটাকে মিউট করে অনেকক্ষণ ধরেই চ্যানেল বদলে বদলে নিউজ দেখে যাচ্ছে আর ধূমপান চালিয়ে যাচ্ছে। হাবেভাবেই স্পষ্ট, সে উত্তেজিত। কোথাও কোনো তুচ্ছ, অথচ অদ্ভুত ঘটনা ঘটল কিনা সেটাই জানা উদ্দেশ্য। পুলিশের হট লাইন, এমার্জেন্সি নম্বর, ওয়েবসাইটগুলোকে বারবার মনিটর করার জন্য কন্ট্রোল রুমের পুলিশকর্মীরা একদম টানটান উত্তেজনায় সতর্ক হয়ে বসে। সমস্ত কলকাতার পুলিশও তৎপর। ট্রেনের প্রত্যেকটি কামরায় আর পি এফ মোতায়েন রয়েছে। রেলস্টেশন, বাস ডিপো, শপিং মল বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল জায়গায় রাউন্ড মারছে পুলিশ কুকুর। কিন্তু এখনও পর্যন্ত হাত শূন্য। কোনোদিক দিয়েই আক্রমণের আভাস নেই।

অর্ণব বাইরের দিকে তাকায়। যতক্ষণ বাইরে আলো ছিল ততক্ষণও এত ভয় লাগেনি, যতটা অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই শীতের অন্ধকারের মধ্যেই কোথাও ওঁত পেতে আছে এক মারাত্মক ষড়যন্ত্র। এখনই বুঝি একটা কুৎসিত কদাকার দানবীয় রূপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে বাইরে আসবে। কী ঘটবে। কী ঘটতে চলেছে? বিস্ফোরণ? খুন? অগ্নিকাণ্ড? বার্নিং শিখের স্টাইলই তো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারা বা কেটেকুটে একসা করা। এই মুহূর্তে তরোয়াল বা কৃপাণ নেই ঠিকই। কিন্তু ফুয়েল তো কিছুটা আছেই। ছুরি-ছোরাও থাকতেই পারে। তার থেকেও বড়ো অস্ত্র তার শাণিত মস্তিষ্ক। সেটাকেই সবচেয়ে বেশি ভয়। পুলিশকে ডাইভার্ট করার জন্য সে আবার কোনো নিরীহ মানুষের হত্যা করবে না তো।

ঘড়িতে ঢংঢং করে ছ-টা বাজা মাত্রই ওদের সবারই বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে উঠেছিল। অধিরাজের মুখ চিরকালই ভাবলেশহীন। দেখে বোঝা মুশকিল। কিন্তু জ্বলন্ত সিগারেট আর ঘন ঘন ধোঁয়ার রিং বলে দিচ্ছিল যে সে ঠিক কতটা চাপে আছে। একদিকে মিস্ বোস আর আত্রেয়ীর কাছ থেকে রেগুলার আপডেট নিয়ে চলেছে। অন্যদিকে প্রণবেশ লাহিড়ীর কাছ থেকে। দু-দিকই আপাতত নিস্তরঙ্গ। অর্ণবের বোধহয় ব্লাডপ্রেশারই বেড়ে গিয়েছে। তার মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে গিয়ে থমথম করছে। পবিত্র অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। এমনকি মিস্ অরোরাও অতৃপ্ত প্রেতাত্মার মতো ছটফট করে বেড়াচ্ছে। সবার মনেই একটা প্রশ্ন। এবার কী? এই নীরবতা মোটেই সুখকর নয়। ঝড়টা ঠিক কোন্ দিক দিয়ে ধেয়ে আসছে?

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সন্ধে সাড়ে ছ-টায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ফোনগুলো যেন একসঙ্গে ত্রাহি ত্রাহি করে বেজে উঠল। হট্‌ লাইনও ক্রমাগত বেজে চলেছে। কর্মীরা তৈরিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল মানুষের চেঁচামেচি আর উত্তেজিত স্বর, “হ্যালো, কন্ট্রোল রুম?”

“বলছি।”

“তাড়াতাড়ি আসুন আপনারা।” এক নিঃশ্বাসে গড়গড়িয়ে কে যেন বলে গেল, “বার্নিং শিখকে এখানে দেখা গেছে। সে এখনও রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আর শিস দিচ্ছে…।” লোকটি কথা শেষ করার আগেই হেডসেটে হুইলের সুর শুনতে পেল পুলিশকর্মীটি,

“গুমনাম হ্যায় কোই/ বদনাম হ্যায় কোই…।”

“আপনি লোকেশনটা বলুন।”

লোকেশন পার্কস্ট্রিটের কাছেই। পার্কস্ট্রিট পুলিশ স্টেশন থেকে পুলিশের গাড়ি তৎক্ষণাৎ তড়িঘড়ি পৌঁছোল স্পটে। তারা ভেবেছিল, বার্নিং শিখ বোধহয় ততক্ষণে ওখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, যেমন দিল্লির রাজপথ থেকে হুটহাট করে চোখের পলক ফেলতে-না ফেলতেই কুয়াশায় মিলিয়ে যেত। কিন্তু তাদের বিস্ময়ের অবধি রইল না যখন দেখল লোকটা তখনও ওখানেই আছে! এবং আলো-আঁধারি ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শিস দিয়ে চলেছে তার পেটেন্ট সুরে। গুমনাম হ্যায় কোই। জনতা ভয়ে তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাচ্ছে। চতুর্দিকে ভয়ার্ত কোলাহল। বার্নিং শিখ ডাইনে-বাঁয়ে কোনোদিকেই তাকাচ্ছে না। স্রেফ হেঁটে যাচ্ছে আর হুইসল দিচ্ছে।

লোকটাকে সামনা-সামনি দেখে পুলিশেরও আক্কেল গুড়ুম! এতদিন শুধু ছবিতে, ফুটেজে দেখেছিল বা মিডিয়ায় বিবরণ শুনেছিল। এবার স্বচক্ষে দেখে তাদেরও রক্ত হিম হয়ে যায়। এ কি আদৌ মানুষের চেহারা! এইমাত্রই বুঝি চিতা থেকে পুড়তে পুড়তে আধপোড়া হয়ে নেমে এসেছে ও! পরনে সেই ট্র্যাডিশনাল শিখের পোষাক। চোলা, পাগড়ি! তবে হাতে কোনো তরোয়াল নেই। নিস্পৃহ এক চোখের জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে পুলিশদের দিকে তাকিয়ে ফের শিস্ দিতে দিতে এগিয়ে গেল। কোনো তাপ-উত্তাপই নেই! নেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও!

লোকটার দুঃসাহস দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারও হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। পরক্ষণেই গুছিয়ে নিয়ে সবাইকে নির্দেশ দিলেন, “টেক পজিশন্‌স্‌।” পুলিশকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরতে ভয় পাচ্ছিল। বার্নিং শিখের যা নিষ্ঠুরতার রেকর্ড আর পুলিশদের কেটেকুটে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে যে কীর্তি করেছে তাতে ভয় পাওয়ারই কথা। অথচ এদিকে ডিউটির দায়। তাছাড়া লোকটাকে এখন তেমন বিপজ্জনক বলেও মনে হচ্ছে না। আপাতদৃষ্টিতে কোনো অস্ত্রও নেই। তাই একরকম বাঁশ গিলেই বার্নিং শিখকে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে ধরল পুলিশ। অফিসার চেঁচিয়ে বললেন, “হ-ল্ট!”

এই অবধি সব ঠিকই ছিল। পুলিশ অফিসারের কথা শুনে সে একটু থমকেও দাঁড়াল। পরক্ষণেই ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল তার চোখ। কেউ কিছু বোঝার আগেই সে টেনে দৌড় মেরেছে উলটোদিকের রেস্টোর‍্যান্ট ও দোকানগুলোর দিকে। সেখানে তখন ভয়ার্ত মানুষেরা একটু কভার নিয়েছিল। বার্নিং শিখকে ছুটে আসতে দেখে উচ্চকিত শোরগোল ফেলে দিল। অফিসার বিন্দুমাত্রও দেরি না করে সার্ভিস রিভলভার তাক করেছেন। এই বিপজ্জনক লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানেই হয় না! ওদিকে দৌড়োচ্ছে যখন তখন নিশ্চয়ই কোনো মারাত্মক প্ল্যানিং আছে…। “ফা-য়া-র।”

পরপর গানশটের শব্দে কেঁপে উঠল পার্কস্ট্রিট। বারুদের গন্ধে ভরপুর। এর আগে দেখা গিয়েছে যে লোকটা গুলিতেও মরে না। তাই যতগুলো বুলেট পেরেছিল ওর শরীরে ভরে দিয়েছিল পুলিশ। একরকম প্রায় ঝাঁঝরাই করে দিল দেহটাকে।

জনতা ও পুলিশ, দু-জনকেই স্তম্ভিত করে দিয়ে রাস্তার ওপরে লুটিয়ে পড়েছে বার্নিং শিখ। একবার তার গোটা দেহ কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই নিথর। পুলিশেরা এ ওর দিকে তাকাচ্ছে। যে লোকটা এত ঘণ্টা ধরে শহরে ‘কোরাম’ লাগিয়ে রেখেছিল, সে কিনা কয়েকটা গুলিতেই শেষ। এত সহজ? কোনোরকম প্রত্যাঘাত তো দূর, বাধা দেওয়ার চেষ্টাও নেই। ঘটনাটা কি সত্যিই ঘটল? না স্বপ্ন দেখছে!

অফিসার নিজেই এবার সম্পূর্ণ কনফিউজ হয়ে এগিয়ে গেলেন পড়ে যাওয়া দেহটার দিকে। ভালো করে পরীক্ষা করে বিহ্বল কণ্ঠে বললেন, “অ্যাঃ। মরে গেল!” “হো-য়া-ট! বার্নিং শিখ ইজ ডেড!”

ওভার ফোন এই সংবাদটা পেয়ে অধিরাজের এটাই প্রথম প্রতিক্রিয়া। আর একটু হলেই বোধহয় বিস্ময়ের আঘাতে তার হাত থেকে ফোনটাই পড়ে যাচ্ছিল। অপ্রত্যাশিত ধাক্কাটা কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল, “ইম্পসিব্‌ল্! এটা কী করে সম্ভব? ওটা বার্নিং শিখ, মহাত্মা গান্ধী নয়। ভালোমানুষের মতো স্রেফ গুলি খেয়ে মরার লোকই নয়। আপনারা ঠিক দেখেছেন তো?”

“হ্যাঁ স্যার।” ওপ্রান্ত থেকে উত্তর আসে, “নিঃসন্দেহে বার্নিং শিখই। হুলিয়া হুবহু এক।”

“ওকে।”

অধিরাজ কথা না বাড়ালেও তার মুখ থমথম করছে। টিভিতেও তখন এই খবরটাই ব্রেকিং নিউজ হিসাবে চলছে। মিডিয়া বার্নিং শিখের উপস্থিতির খবর পেয়েই ছুটে গিয়েছিল ওদিকেই। তারা এখন মৃতদেহটাকে লাইভ দেখাতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে জোরদার খবর, পার্কস্ট্রিট পুলিশের গুলিতে নিহত বার্নিং শিখ! পবিত্র বেশ কিছুক্ষণ হাঁ করে খবরটা শুনে উদ্ভট বিমূঢ় এক্সপ্রেশন দিয়ে বলল, “এটা কী হল রাজা! লোকটার কি হঠাৎ করে মরার শখ হয়েছিল? নাকি ভেবেছিল, পুলিশের গুলি তো কখনও খাইনি, একটু চেখে দেখি।”

অধিরাজ মাথা নাড়ল, “না পবিত্র। আমার বিশ্বাস হয় না! বড়োসড়ো ঝোল আছে… ঝোল আছেই…!”

পার্কস্ট্রিটে বার্নিং শিখের মৃত্যুর খবর টিভিতে বোধহয় দশ মিনিটও চলেনি, তার মধ্যেই আর একবার পুলিশ কন্ট্রোলরুম ফোনের শব্দে কেঁপে উঠল। এবার শিয়ালদার মৌলালি চত্বরে বার্নিং শিখকে দেখা গিয়েছে। সে ওখানেই আছে। এবং ঘুরতে ঘুরতে শিস দিয়ে বেড়াচ্ছে।

পুলিশের চক্ষু চড়কগাছ। তারা কিছু করার আগেই মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ল জীবন্ত বার্নিং শিখের ভিডিও। পার্কস্ট্রিট নয়, সে এখন মৌলালিতে। সেই একই হুলিয়া! পোড়া মুখ, সেলাই করা ঠোঁট, খোবলানো চোখ, বিন্দুমাত্রও পার্থক্য নেই। অথচ কোথায় পার্কস্ট্রিট, কোথায় মৌলালি! এক জায়গায় যার গুলিতে ঝাঁঝরা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে, অন্যদিকে সেই লোকটাই দিব্যি সশরীরে ইভনিং ওয়াক করে বেড়ায় কী করে। এ কী জাতীয় ভুতুড়ে কাণ্ড! বার্নিং শিখ কি চলমান অশরীরী? ফ্যান্টম!

এবার এন্টালি থানা থেকে পুলিশবাহিনী শশব্যস্তে দৌড়োল। কিন্তু তারা পৌঁছোনোর আগেই এবার উলটো ট্র্যাজেডি ঘটেছে। এমনিতেই বার্নিং শিখকে নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক ছিলই। সমস্যা হল, আতঙ্ক মানুষকে অনেক সময় মরিয়া করে দেয় যার বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে জনরোষ। পার্কস্ট্রিটের জনতা ভয় পেয়েছিল। কিন্তু মৌলালিতে দেখা গেল অন্য চিত্র। পাবলিক সেখানে বার্নিং শিখকে ঘিরে ধরে তাকে গণধোলাই দিতে ব্যস্ত ছিল। সেই ‘মর্’ হাতের কাছে যা পেয়েছে, লাঠি, ইট, পাথর, রড, সব নিয়ে চড়াও হয়েছে তার ওপর। সঙ্গে লাথি-ঘুষি তো আছেই। পুলিশ যখন গিয়ে পৌঁছোল ততক্ষণে প্রায় শ’খানেক মানুষ ওকে পিটিয়ে চলেছে। জনগণ লোকটাকে এমনভাবে ছেঁকে ধরেছিল যে পুলিশ ওকে দেখতেই পাচ্ছিল না। অবশেষে যখন ভিড় হঠিয়ে তাকে উদ্ধার করা হল, তার আগেই সে পার্মানেন্টলি উদ্ধার হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ মরেই গিয়েছে। ভয়ার্ত ও ক্রুদ্ধ জনতার মার খেয়েই মরে গেল বার্নিং শিখ।

একটা লোকই মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে দু-জায়গায় দু-বার মারা গেল! একবার পুলিশের গুলি খেয়ে, পরের বার গণধোলাইয়ে। পুলিশ বুঝতেই পারছিল না যে এটা কী করে সম্ভব। যে অপরাধীর পেছনে সি.আই.ডি. হোমিসাইড দিনরাত এক করে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, অফিসারদের হাতে মরতে মরতে, ধরা পড়তে পড়তেও সে মারাত্মক চাতুর্যে পালিয়ে গিয়েছে, সেই ভয়াবহ খুনি এত সহজেই দুই জায়গায় দু-ভাবে মরল এই ঘটনার পেছনের তাৎপর্য বুঝে ওঠার আগেই ফের হটলাইন আর কন্ট্রোলরুমের ফোন মিনিটে মিনিটে বেজে উঠতে শুরু করল। এবার আর পরপর নয়। একসঙ্গে, একইসময়ে বার্নিং শিখকে নানা জায়গায় দেখা যাচ্ছে। কখনও বালিগঞ্জে, কখনও ঢাকুরিয়া, কখনও তারাতলায় ঘুরছে। কখনও আউটরাম ঘাটের কাছে শিস্ দিতে দিতে চলে যাচ্ছে সে। এমনকি শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের সামনেও তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। হাতিবাগানের লোকেরা ত্রস্তব্যস্ত, ভয়ার্ত হয়ে দেখল তাদের নাকের সামনে দিয়েই চলে যাচ্ছে ‘কুখ্যাত’ বার্নিং শিখ। মুখে সেই ভয়ানক শিস্—“গুমনাম হ্যায় কোই….!”

পুলিশ কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। একটা বার্নিং শিখ কি কম আপদ ছিল যে এবার এতগুলো এসে জুটেছে! কার পেছনে দৌড়বে, কাকে ধরবে, কাকে মারবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না তারা। যেটা সবচেয়ে চিন্তার বিষয় ছিল যে আগে যে দু-জন পুলিশের গুলি আর জনতার মার খেয়ে মরে গেল তারা তবে কে। তাদের মধ্যেই যদি বার্নিং শিখ থাকে, তবে এরা কারা! সবাইকেই একরকম দেখতে। পোষাক এক, চলনবলন এক। এমনকি শিস্টাও একই। কোনো ফারাক নেই।

অধিরাজ, অর্ণব ও পবিত্র-র ফোন মুহুর্মুহু বেজে চলেছে। দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ। নিঃশ্বাস ফেলার সময়টুকুও নেই। হোমিসাইডের ল্যান্ডলাইনগুলোও রক্ষা পায়নি। সব জায়গা থেকেই একটাই খবর। গোটা শহরে বার্নিং শিখের অজস্র ক্লোন প্রকট হয়েছে। তারা স্থান ও সময়ের নীতিকে অগ্রাহ্য করে একই টাইমিঙে, একাধিক জায়গায় ঘুরছে। পুলিশ কী করবে বুঝতে না পেরে আরও একজনকে বোকার মতো গুলি মেরে উড়িয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর যে এই আকস্মিক শ্যুট আউটের মাঝখানে পড়ে একটি দশ বছরের শিশু প্রাণ হারিয়েছে, ও তিনজন পথচারী গুরুতরভাবে জখম! অন্যদিকে গণরোষের শিকার হয়েছে আরও দু-জন। উন্মত্ত মানুষ তাদের মেরে পাটপাট করে দিয়েছে। তবে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ সেখানেও আছে। ভিড়ের নীচে চাপা পড়ে পদপিষ্ট হয়ে এক বৃদ্ধও মারা গিয়েছেন। আরও একজন আহত। সব মিলিয়ে মোট পাঁচবার মারা গিয়েছে বার্নিং শিখ। কিন্তু তারপরও সে অক্ষত শরীরে সর্বত্র ঘুরছে। ক্রমাগতই যেন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে তার ছায়া। এক জায়গায় তার মৃত্যু হলেই রক্তবীজের মতো আরও একাধিক জায়গায় ওই একটা লোকেরই আবির্ভাব হচ্ছে। এসব আদতে হচ্ছেটা কী!

“মাই গড।…মা-ই গ-ড।”

অধিরাজ বজ্রাহতের মতো বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে এবার অবশেষে মুখ খুলল। তার চোখদুটো জ্বলছে। ওষ্ঠাধরের ফাঁক দিয়ে ধারালো দাঁতের রেখা দেখা গেল। সে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে, “ওদের মধ্যে একটাও বার্নিং শিখ নয়। যে ক-জন লোক গুলিতে বা পাবলিকের হাতে মারা গেল, তারা সবাই ইনোসেন্ট! ইশশশ! সঙ্গে আরও দু-জন মানুষ স্পটডেড, কয়েকজন ইনজিওর্ড। তাদের কী হবে কে জানে! …ওঃ ভগবান!”

অর্ণব, টুইঙ্কল ও পবিত্র দেখল আফশোশে অধিরাজের মুখ বিবর্ণ। সে বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েছে, “পুলিশ আর পাবলিকের হাতে সাতটা নির্দোষ প্রাণ গেল। সাত সাতটা তাজা প্রাণ। এর থেকে খারাপ আর কী হতে পারত। পাঁচজন ছদ্মবেশীর সঙ্গে আরও দু-জন নিরপরাধের খুন করে ফেললাম আমরা আর আমাদের সিস্টেম। মব্… সেই খুনিদের মবকে সে ইচ্ছাকৃতভাবেই আবার ফিরিয়ে আনছে… তাদের হাতে, পুলিশের হাতে কতগুলো ইনোসেন্ট লোকের প্রাণ নিচ্ছে… ও আবার পুলিশ, প্রশাসন আর রাক্ষুসে মবকে কাঠগড়ায় তুলছে, কলঙ্কিত করছে। ফের সেই অদৃশ্য ম্যানিপুলেশন। আমরা কিচ্ছু করতে পারছি না!…কিচ্ছু না…।” বলতে-বলতেই টেবিলের ওপর প্রচণ্ড হতাশায়, রাগে দুমদুম করে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিল, “শি-ট! শি-ট!”

অর্ণব সভয়ে দেখল ঘুষি খেয়ে কাচের টেবিলটায় ইতিমধ্যেই সামান্য চিড় ধরেছে। অধিরাজের এই ঘুষি মারার অভ্যাস আজকের নয়। ভাগ্যিস টেবিলের কাচটা ভীষণ মোটা। নয়তো এতক্ষণে ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়ত আর অধিরাজের হাত কেটেকুটে একসা হত। সে অস্ফুটে বলল, “স্যার!”

পবিত্র এতক্ষণ সংশয়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়েছিল, “কিন্তু যদি এরা ইনোসেন্ট হয়, তবে এতগুলো বার্নিং শিখ আমদানি হল কোথা থেকে? এরা জানে না যে বার্নিং শিখের হুলিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়ালে পুলিশ কিংবা জনতা পেটাবেই? গত দু-দিন ধরে কী চলছে জানে না? না এটাকে ফ্যান্সি ড্রেস পার্টি ভেবেছে! তুমি বলছিলে না, একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই একগুচ্ছ ক্লোন নিয়ে রাস-ডান্স করতেন? এ তো তাঁকেও হার মানাল!”

“সেটাই তো আফশোশ পবিত্র।” অধিরাজ চোখ বুজে ফেলে, “নির্ঘাত এ লোকগুলো জানে না। কেন জানে না তা বুঝতে পারছি না। তবে এইটুকু বুঝি, জেনে বুঝে কেউ নিজের এই সর্বনাশ করে না! বাইরে থেকে মেক-আপ আর গেট-আপ বার্নিং শিখের। কিন্তু ভেতরের লোকগুলো আদৌ সে-ই নয়। মানুষ জানেই না যে লোকটাকে আসলে কেমন দেখতে। তারা ওই হুবহু এক প্রস্থেটিক মেক-আপ দেখে মাসমার্ডার করে বসে আছে! সঙ্গে পুলিশ দোসর। কিন্তু বাজি ধরে বলতে পারি, এদের মধ্যে একজনও বার্নিং শিখ নয়। সে এখনও মাঠে নামেইনি। বরং লুকিয়ে থেকে মজা দেখছে আর আমাদের ব্যর্থতায় হাসছে। তার ম্যানিপুলেশন সার্থক! সে একটা সন্দেহ আর ভয়কে নিজের অস্ত্র বানিয়ে আমাদেরই দিয়ে খুনগুলো করাচ্ছে। মাঝখান দিয়ে কতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণ গেল। মারাত্মক ট্র্যাজেডি। ঠেকাতে না পারলে আরও যাবে… আরও…নাঃ…নাঃ!”

বলতে বলতেই সে তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। আর একটাও কথা না বলে ফোনে তড়িঘড়ি এডিজি সেনের নম্বর ডায়াল করছে। তার হাত উত্তেজনায় কাঁপছিল। এডিজি সেনও বোধহয় এইসব কাণ্ড দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। একবার রিং হতে-না হতেই ব্যগ্রভাবে রিসিভ করলেন ফোনটা। প্রায় হাহাকার করেই উঠলেন, “এসব কী হচ্ছে ব্যানার্জি। এতগুলো বার্নিং শিখ কোথা থেকে এল! আর মরার সঙ্গে সঙ্গেই ফের পটাপট গজাচ্ছে কী করে?”

“স্যার, এরা কেউ বার্নিং শিখই নয়। শুধুমাত্র ওর গেট-আপে থাকা কতগুলো ইনোসেন্ট লোক। কেন এই ছদ্মবেশ ধরেছে তা এখনও জানি না। কিন্তু এটা কনফার্ম, এর ফলে কতগুলো নিষ্পাপ লোক মরল। আমরাই মারলাম!” অধিরাজের মুখ কঠিন, “নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ও হারামজাদা এত সহজে মরার লোকই নয়। যে লোক আপাদমস্তক বুলেটপ্রুফ হয়ে বসে থাকে, সে কয়েকটা গুলিতে কিছুতেই মরবে না। এই সর্বনাশটা আমিই করেছি। কিছু একটা ঘটবে বুঝতে পেরে আমি নিজেই পুরো শহরের পুলিশকে অ্যালার্ট করেছিলাম। কিন্তু এই কাণ্ড ঘটবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। সেই সতর্কবাণীর ফলাফল হিসেবেই পুলিশ এখন জিরো টলারেন্সের রাস্তা নিয়েছে। আর জনসাধারণও প্যানিকে রেসিপ্রোকেট করছে। ‘মব্’ চিরকালই একটা স্টুপিড কিন্তু ভয়াবহ অস্ত্র। মানুষকে বোঝানো যায়, ভিড়কে বোঝানো যায় না। তারা ধ্বংসই করে। আমি নিজের জালে নিজেই আটকে গেছি। ও আমাকে দিয়ে এটাই করাতে চেয়েছিল, যেটার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। নিরপরাধ মানুষের খুন!”

“এখন তবে কী করণীয়?” এডিজি সেন অসহায়ের মতো বললেন, “পুলিশ তো ওকে দেখলেই শ্যুট করবে। তেমনই অর্ডার আছে। ওকে বাঁচিয়ে রাখার রিস্ক নেবেই না। আবার তুমি বলছ যে এরা কেউ বার্নিং শিখই নয়। ভেতরে কে আছে তা কে দেখতে যাবে? বাইরের চেহারা তো সেম। তাছাড়া যদি কোনোভাবে মেক-আপ সরানোও যায়, তবু তার আসল চেহারাও আমরা চিনি না। ওদিকে পুলিশের হাতে ইনোসেন্ট লোকের এনকাউন্টারের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকবে। কো-ল্যাটারাল ড্যামেজই বা থামাবো কী করে? ইমিডিয়েটলি অর্ডার দিলেও সেটা সর্বত্র পৌঁছোতে সময় লাগবে। তার মধ্যেই কত লাশ পড়বে তার ঠিক নেই।”

“খুব তাড়াতাড়ি কার্ফিউ কিংবা এমার্জেন্সি জারি করার বন্দোবস্ত করা যায় কি স্যার? স্টেট অব এমার্জেন্সির ভিত্তিতে গভর্নমেন্ট কিন্তু এটা করতে পারে। জনসাধারণকে যদি ঘরবন্দি করে ফেলা যায় তবে আর কোনো ড্যামেজ হবে না।” সে কাতরভাবে জানায়, “আমি থানাগুলোকে অ্যালার্ট করার চেষ্টা করছি যাতে তারা বার্নিং শিখের পোষাক পরা লোকগুলোকে শ্যুট না করে অ্যারেস্ট করে। পুলিশ যেরকম খেপে আছে তাতে তাদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ করাও সমস্যা হবে। তবু আমি যত দ্রুত সম্ভব আবার জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি একবার ওপরমহল আর মিনিস্টারদের সঙ্গে কথা বলবেন? মিনিস্টাররা যদি আপনাদের সঙ্গে ইমিডিয়েটলি প্রেস কনফারেন্স করে জনগণকে একটু শান্ত থাকার অনুরোধ করেন, আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে বারণ করেন, তবে কাজ হলেও হতে পারে।”

“সেটা হতে পারে। আমি চেষ্টা করছি ব্যানার্জি।” তিনি বলেন, “কিন্তু তার জন্যও একটা মিনিমাম টাইম লাগবে। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে যে যে মুহূর্তে পুলিশ এই নকল ফ্যান্টম শিখের দলকে শ্যুট করা থামাবে, ঠিক তখনই এদের মধ্য দিয়ে আসল লোক ফাঁড়া কেটে গিয়েছে বুঝে স্বমহিমায় এই ভিড়ের মধ্য দিয়েই হেঁটে চলে যাবে।”

“হতে পারে না।” অধিরাজের কণ্ঠস্বর দৃঢ়, “সেটাই হবে। যে মুহূর্তে ও বুঝবে যে পুলিশ আর পাবলিক নিজেদের ভুলটাকে আইডেন্টিফাই করেছে, সেই মুহূর্তেই ও একই ছদ্মবেশে নকল লোকগুলোর ভিড়ে ঢুকে যাবে। ও জানে তখন বার্নিং শিখের অবতারকে দেখলেও পুলিশ ফায়ার করবে না বা ভিড় তেড়ে আসবে না। ওর যে ছদ্মবেশ ওর মৃত্যুর কারণ হত, সেই ছদ্মবেশই এখন ওকে সেফ জোনে রাখবে।”

“তাহলে?”

এডিজি সেন বোধহয় চোখে একসঙ্গে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা-রামধনু আর ব্ল্যাকহোল দেখছিলেন। স্খলিত স্বরে বললেন, “পুলিশ অ্যাকশন নিলেও বিপদ, না নিলেও বিপদ। এ কী প্যারাডক্স।”

“না।” সে আত্মবিশ্বাসী, “কোনো বিপদ নেই। ও লোকটা আমাদের যতই ডাইভার্ট করুক, আমরা জানি ওর আল্টিমেট গোল কোনটা। সেই জায়গাতে ওকে কোনোভাবেই ঢুকতে দেব না স্যার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। শুধু যেভাবেই হোক্, এই খুনগুলো ঠেকান। কতগুলো নির্দোষ লোক ফালতু ফালতু মরছে!”

“আই অ্যাম ট্রাইং মাই বেস্ট।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রত্যেকটি থানাকে ইনফর্ম করা হল। বার্নিং শিখ দেখা দিলেও তাকে মারা চলবে না। শ্যুট করাই চলবে না। হোমিসাইড টিম উন্মাদের মতো প্রত্যেকটি থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসারকে ফোন করে চলেছে। প্রতিটা থানায় ফ্যাক্স যাচ্ছে। একটাই নির্দেশ, ‘ডোন্ট শ্যুট বার্নিং শিখ। বরং অ্যারেস্ট করুন।’ কয়েক মিনিটের মধ্যেই মোবাইলে মোবাইলে, ওয়াকিটকিতে, টু-ওয়ে রেডিও, এমার্জেন্সি নম্বরের মাধ্যমে আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল একটাই বার্তা, ‘ডোন্ট শ্যুট বার্নিং শিখ।’ তড়িঘড়ি আবার প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন এডিজি সেন। সেখানে নগরবাসীদের কাছে অনুরোধ করা হল, তারা যেন দয়া করে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়। বার্নিং শিখকে দেখলে শুধু যেন পুলিশকে ইনফর্ম করে। এর থেকে বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। সবাইকে এ-ও বলা হল যে পারলে তারা যেন অবিলম্বে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যায় ও নিজেকে আপাতত গৃহবন্দি রাখে। জনগণের সুরক্ষার স্বার্থেই এমন আবেদন।

অধিরাজের অস্থিরতা ক্রমাগতই বাড়ছিল। তাকে দেখলে মনে হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বুঝি শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখের চিন্তার ভাঁজেই স্পষ্ট এই সম্ভাবনার কথা সে ভেবেই দেখেনি। অর্ণব মনে মনে অবাক হচ্ছিল। এই বার্নিং শিখের হাতে আর কী কী তুরুপের তাস আছে! লড়াইটা শুরু হয়েছিল বর্ণাঢ্য অস্ত্র দিয়ে। এখন সম্পূর্ণ হাতাহাতিতে এসে ঠেকেছে। অথচ কী অদ্ভুত লোকটার ম্যানিপুলেট করার শক্তি। মানুষের মনকেই সে অস্ত্র বানিয়ে নেমে পড়েছে রণক্ষেত্রে। লোকটা সাইকায়াট্রিস্ট নয়তো? আতঙ্কবাদীরাও এরকম মগজধোলাই করে। তবে সেটা সরাসরি। সেই ভাষণ শোনা যায়, বক্তাকে দেখা যায়। এখানে সবই অদৃশ্য। ইনডাইরেক্ট অথচ অব্যর্থ। সে সবার নজরের আড়ালে থেকে দিব্যি অন্যদের দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এডিজি সেন ঠিকই বলেছেন। বার্নিং শিখের মুখোশের পেছনে নিরীহ মানুষগুলোকে খুন করার ভয়ে পুলিশ গুলি চালাবে না। আবার সেই সুযোগ নিয়েই আসল বার্নিং শিখ বাজি মাত করে বেরিয়ে যেতে পারে। পুলিশের পুরো শাঁখের করাতের মতো দশা। যেতেও কাটছে, আসতেও কাটছে।

পবিত্র এতক্ষণ উত্তেজিত ভঙ্গিতে ফোনে কথা বলছিল। এবার দ্রুত এসে বলল, “রাজা, বার্নিং শিখের এক অবতারকে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা অ্যারেস্ট করেছে। লোকটা পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ওকে পুলিশ তুলে নিয়েছে। কিন্তু প্রবলেম হল, ব্যাটা কী বলছে তা কেউ বুঝতেই পারছে না!”

“অ্যাঃ!” অধিরাজ নিজেই যেন কথাটা বুঝতেই পারল না, “কী বলছে কেউ বুঝতে পারছে না মানে? পশ্চিমবঙ্গের লোক যখন বাংলাতেই তো কথা বলবে। থোড়াই অ্যালিয়েনদের ভাষায় ডায়লগ মারবে!”

“ভাষাটা জুলু থেকে শুরু করে হিব্রুও হতে পারে।” পবিত্র মাথা নাড়ছে, “কিন্তু কিছুতেই বাংলা নয়। তার বক্তব্য পুলিশ একবর্ণও বুঝতে পারছে না, কিছু জানতে চাওয়া তো দূর। আমাকেও ওভার ফোন শোনাল। কীসব ফি ফু, শিঙ্গু-মিঙ্গু-পিঙ্গু বলেই চলেছে গড়গড়িয়ে।”

“ক্কীঃ! শিঙ্গু, মিঙ্গু, পিঙ্গু মানে?”

সে আর কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই হুড়মুড়িয়ে এসে ঢুকল টুইঙ্কল অরোরা, “স্যার, যাদবপুর থানাও একজন বার্নিং শিখকে তুলেছে। ও ব্যাটা ঢাকুরিয়ার কাছাকাছিই ঘুরছিল। পাবলিক ওকে পেটায়নি। তবে যাদবপুর পুলিশও তার কথা কিস্যু বোঝেনি। ও মাল যে কোন দুনিয়ার ‘জাদু’, নিয়ানডারথ্যাল না এনসিনো ম্যান তা বুঝতেই হিমশিম খাচ্ছে।”

“কিউরিঅ-সা-র অ্যান্ড কিউরিঅ-সা-র!”

অধিরাজ দু-জনের দিকে তাকিয়েই বলল, “দুই থানাতেই বলে দাও যে প্রেমালাপ যেন পরে করে। আগে ব্যাটাদের কয়েক কেজি’র মেক-আপ যেন তাড়াতাড়ি সরায়। কী কথা বলছে সেটা পরে বোঝা যাবে। কিন্তু ওই হরর মেক-আপের পেছনের মানুষটাকে বের করা আগে জরুরি। সেনোরিটা, আপনিও ইনফর্ম করে দিন। এটাও বলে দিন, আমরা আসছি। যতক্ষণ না যাচ্ছি, ততক্ষণ যেন কিচ্ছু না করে।”

“ওকে স্যার।”

টুইঙ্কল ও পবিত্র মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *