কালরাত্রি – ৭

(৭)

শীতের রাতে যদি দুর্ভাগ্যক্রমে একপশলা বৃষ্টি হয় তবে উত্তুরে হাওয়ার দাঁত নখ আরও বেশি ধারালো হয়ে ওঠে। মাংস-পেশী ভেদ করে তার মোক্ষম কামড় একেবারে হাড় অবধি পৌঁছে যায়। তখন গোটা কঙ্কালটাই বড়ো বেশি কাঁপাকাঁপি শুরু করে দেয়। মনে হয় গুচ্ছ গুচ্ছ বরফের সূচ সারা শরীরে বিঁধছে। সব চেয়ে বিপদ হয় নাকটাকে নিয়ে। গোটা শরীরে ঢাকা দিলেও নাক চাপা দেওয়া খুব মুশকিল। অনেকে অবশ্য নাক-কান মাফলার দিয়ে জড়িয়ে রাখেন কিংবা মাঙ্কি টুপি পরে বসে থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই নাক ঢাকতে চান না। তার প্রথম কারণ মাঙ্কি টুপি পরলে মানুষকে মানুষের পূর্বপুরুষের মতোই লাগে—ওটা একদমই আউট অব স্টাইল। আর মাফলার জড়ালে দমবন্ধ হয়ে আসতে চায়। ফ্যাশন ডিজাইনাররা অনেক রকমের স্টাইলিশ কার্ডিগান, ফারের জ্যাকেট বা গরম আউটফিট, হুডি তৈরি করলেও কেউ বেচারি নাককে বিশেষ পাত্তা দেননি। তাই নাক ঢাকার কোনো ভদ্র সভ্য ফ্যাশনেবল উপায়ও তথা নাসিকাত্রাণও পাওয়া যায়নি।

একটু আগেই এখানে অল্পস্বল্প বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তারপর থেকেই শীত একেবারে বরফ শীতল হাওয়া নিয়ে তেড়ে মেড়ে আসছে। অর্ণবের মাঝেমধ্যেই একটু কাঁপুনি উঠছে। সেটা কতটা শীতের জন্য, আর কতটা উত্তেজনায় তা বলা মুশকিল। একটা একটা করে প্রতীক্ষার প্রহর খসছে, আর তার হৃৎস্পন্দন একটু একটু করে বাড়ছে। কিছুটা আশঙ্কায়, কিছুটা উত্তেজনায় আবার কিছুটা সন্দেহেও থেকে থেকে সে দোদুল্যমান। যার জন্য এত তোড়জোড়, এত শবরীর প্রতীক্ষা, সেই ব্যক্তির পদধূলি এখানে আদৌ পড়বে কি? না পুরোটাই ‘ওয়াইল্ড গুজ চেজিং’?

সেই দুপুর থেকেই তারা কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে সতর্ক প্রহরায় আছে। এদিকে অধিরাজ আর অর্ণব। আর একটু দূরের আর একটা ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে পবিত্র প্রতীক্ষারত। প্রত্যেকের কানেই ব্লুটুথ ইয়ারসেট। সারাদিন ধরেই ওরা কনফারেন্স কলে সবক-টা স্পটের আপডেট নিয়ে চলেছে। আর্বানার কাছের ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে প্রণবেশ লাহিড়ী কোনোক্রমে ধৈর্য ধরে এখনও টিকে আছেন। যদিও সারা দুপুর অপেক্ষা করতে করতে এখন একটু বিরক্ত হয়েই উঠেছেন। মাঝখানে খেপে উঠেছিলেন, হাত পা ছাড়াবার জন্য পায়চারি করবেন! অধিরাজ আর পবিত্র প্রায় হাঁ হাঁ করে উঠে তাঁকে থামিয়েছে।

অবুঝ ছোট্ট ছেলেকে বোঝানোর মতো বুঝিয়েছে, ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের মধ্যে কোনোরকম মুভমেন্ট করা চলবে না। পাখি যদি এসে দেখে স্বয়ং এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট গোটা গ্রাউণ্ড জুড়ে বাঘের মতো হুমহাম করে রাউন্ড লাগাচ্ছেন, তাহলে সে ওখান থেকেই সবার অলক্ষ্যে কেটে পড়বে!

জনবহুল শহরের মধ্যেই অনেকখানি জায়গা জুড়ে এই ডাম্পিং গ্রাউণ্ড৷ অথচ এখানে কলরবমুখর শহরের কোনো আওয়াজই এসে পৌঁছোয় না! যেন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। গোটা দুপুরে একমাত্র দু-চারটে ছোটোখাটো পাখির কিচির মিচির আর বেশ কিছু কাকের কর্কশ ‘কা কা’ ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়নি। অধিরাজ আর অর্ণব নিজেদের উপস্থিতি গোপন রাখবার জন্য গ্রাউণ্ডের কেন্দ্রে একটা চাকাছাড়া রংচটা ভাঙাচোরা আদ্যিকালের অ্যাম্বাসাডরের ভেতরে ঢুকে বসে আছে। এখান থেকে গোটা গ্রাউণ্ডটাই স্পষ্ট দেখা যায়। একদম ক্লিয়ার ভিউ। সবচেয়ে সুখের কথা, গাড়িটার একটাও দরজা নেই! বেবাক ফাঁকা। সামনের কাচটাও হাওয়া। শুধু সামনের আর পেছনের ধুলোমাখা ছাতাপড়া লম্বা সিটদুটো যে কী করে বেঁচে গেল সেটাই আশ্চর্যের। অধিরাজ সেটার অবস্থা দেখে মৃদু স্বরে বলল, “চোর যে ড্রাইভিং সিট আর ছাতটাও ভেঙে খুলে নিয়ে যায়নি এই মহানুভবতার জন্য তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।”

অর্ণব এক ঝলক চোখ বুলিয়ে বাকি গাড়িগুলোর অবস্থা দেখে নিল। ওগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। প্রথমে প্ল্যান ছিল যে ওরা দু-জনে দুটো গাড়ির ভেতরে কভার নেবে। গাড়িগুলোর পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে বসে থাকা বেশি পরিশ্রমসাধ্য ও ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু অনেক খুঁজেও আর একটা ঠিকঠাক আশ্রয় খুঁজে পাওয়া গেল না। বেশিরভাগ গাড়িরই ছাত নেই! ওদিকে আকাশে আবার মেঘ! বৃষ্টি হলে বিপদে পড়তে হবে। কয়েকটার ছাত থাকলেও ব্যাকসিট নেই। ফ্রন্টসিটে বসলে যে কেউ দেখতে পাবে। কোনোটার কাচে এমনই পুরু ময়লার স্তর জমে আছে যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না! ওখান থেকে নজর রাখা সম্ভব নয়। কোনোটার শুধু স্টিয়ারিং আর কাঠামোটাই বাকি রয়েছে। লুকোনোর জায়গাই নেই। বেশিরভাগই দোমড়ানো মোচড়ানো। ওর ভেতরে একমাত্র অষ্টাবক্রমুনিই নিজেকে সাইজ করে নিয়ে ফিট হতে পারেন! একটা গাড়ির ব্যাকসিটের দিকে তাকিয়েই তার চক্ষু চড়কগাছ। কতগুলো হৃষ্টপুষ্ট ধেড়ে ইঁদুর রীতিমতো ফাঁকা জায়গা পেয়ে ফুটবল খেলতে শুরু করে দিয়েছে! তাদের তীক্ষ্ণ দাঁতে সিটের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে এসেছে।

“থ্যাংক গড।” অধিরাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, “এটা শীতকাল। অন্য কোনো সময় হলে গোটা কয়েক সাপও ফ্রিতে পাওয়া যেত। কে জানে, এর মধ্যে কোনোটারই ভেতরে ঢুকে তালগোল পাকিয়ে শীতঘুম দিচ্ছে কিনা!”

শুধু সাপ কেন, এখানে কাঁকড়াবিছে থেকে শুরু করে বুনিপ অবধি সবই বোধহয় থাকতে পারে। অন্তত তেমনই মনে হচ্ছিল অর্ণবের। তবে অধিরাজের সন্দেহ সম্ভবত সঠিক। কারণ যত গাড়ির কঙ্কাল এখানে পড়ে আছে তার থেকেও বেশি টায়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোথাও একগাদা টায়ারের স্তূপ পড়ে রয়েছে। আবার কোথাও বা একটার ওপর আর একটাকে সাজিয়ে কেউ পাহাড় বানিয়ে দিয়েছে। একদম বেওয়ারিশ! এখান থেকে প্রয়োজন মতো তুলে নিয়ে গেলেও কেউ এই টায়ারের দুঃখে মরবে না।

“উপায় নেই! একটাতেই দু-জনকে ফিট হতে হবে! আর কোনো অপশন দেখছি না।”

অধিরাজ অ্যাম্বাসাডরের পেছনের সিটে নিজের দীর্ঘদেহটাকে যতটা সম্ভব ঝুঁকিয়ে বসল। তারপরই একটা মাস্ক এগিয়ে দিয়েছে অর্ণবের দিকে, “এটা দয়া করে পরে নাও।”

“মাস্ক স্যার?” অর্ণব একটু অবাক হয়ে বলে, “কিন্তু এখন তো কোভিড নেই।” “কোভিড গেছে ঠিকই, কিন্তু তোমার ডাস্ট অ্যালার্জি এখনও যায়নি।” সে এবার নিজেই হাত বাড়িয়ে সযত্নে অর্ণবের মুখে মাস্কটা পরিয়ে দিতে দিতে বলল, “তুমি যদি ধুলো গিলে নাক মুখ লাল করে ফ্যাঁচর ফ্যাঁচর করে হাঁচতে থাকো তবে কাকু-কাকিমা কি আমায় আস্ত রাখবেন ডার্লিং? তাছাড়া আমারও সেটা বিশেষ ভালো লাগবে না! নাও, এবার চুপচাপ এসে বসে পড়ো। অত্যন্ত খারাপ অ্যাকোমোডেশন৷ কিন্তু কিছু করার নেই।”

অর্ণব অসহায় চোখে দেখল সিটটার অর্ধেকটা ভেঙে নিম্নগামী! অধিরাজ যথেষ্ট বেঁকেচুরে হাত পা গুটিয়ে বসেছে বলে তবু একটু জায়গা আছে। নয়তো সেটুকুও থাকত না। আর যতটুকু আছে, তাতে একটা বাচ্চা ছেলেও ঠিকমতো বসতে পারবে না। সে অসহায় স্বরে বলল, “কিন্তু স্যার বসব কোথায়?”

অধিরাজ মুচকি হাসল, “কেন? কমলাকান্তের গানটা শোনোনি? ‘এসো এসো, বঁধু এসো, আধ আঁচরে বসো।’ একটু হাত-পা গুঁজে বেঁকেঝুঁকে বসতে পারো কিনা চেষ্টা করে দেখো। নয়তো আমার কোল তো ফাঁকাই আছে। তুমি সেখানেও বসতে পারো।

এই পরিস্থিতিতে আমি তোমার চরিত্র নিয়ে একটুও সন্দেহ করব না। কাম্ অন। কুইক!”

অর্ণব নিজের শরীরটাকে জিমন্যাস্টিক শিল্পীদের মতো নানারকমভাবে বেঁকিয়ে শেষপর্যন্ত ভাঙা সিটটায় বসতে পারল ঠিকই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল ঠাসাঠাসির চোটে তার দেহের অর্ধেকটা প্রায় অধিরাজের কোলেই উঠে গিয়েছে। দুই অফিসার প্রায় জাপটাজাপটি করেই কোনোমতে ওইটুকু অংশে সেট হয়ে গেল। অধিরাজের বুকের কাছে অর্ণবের মাথা। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে অর্ণবের মুখ। সে মুখ নামিয়ে এনে অর্ণবের কানে ফিশফিশ করে বলে, “তোমার গার্লফ্রেন্ডকে ডেটে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটা কিন্তু একেবারে পারফেক্ট ডেটিং স্পট! ইনফ্যাক্ট হনিমুনও এখানেই করতে পারো। অবস্থা দেখতেই পাচ্ছ। একেবারে ‘অঙ্গ লগা দে রে, মোহে রঙ্গ লগা দে রে’ হওয়ার উপক্রম! বলো তো অ্যাডভান্স বুকিং করে রাখি?”

অর্ণব লজ্জায় কানদুটো লাল করে ফেলল, “আমার এখনও কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই স্যার!”

“সেকী! এখনও নেই! তবে!”

তার চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে যায়, “এখনও শুধু আপনিই আছেন!”

অধিরাজ সজোরে হেসে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। আস্তে আস্তে বলে, “কেলো করেছে! তোমার কী হবে অর্ণব!”

সেই প্রতীক্ষার শুরু। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে বসে থাকতে-থাকতে এখন হাত-পা এবং কোমরের পেশীগুলো টাটাচ্ছে। এমন নয় যে এর মধ্যে কেউ আসেনি। দু-জন ভিখিরি গোছের লোক এসেছিল। তাদের আদ্যিকালের পুরোনো টায়ারের ওপর বিশেষ লোভ নেই। বরং গাড়িগুলোর ধ্বংসস্তূপ খুঁজে টুজে দেখল যদি দামি জিনিস কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু এই কঙ্কালগুলোয় বিশেষ কিছুই আর বাকি নেই। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে শুরু করে পার্টস পর্যন্ত সবই গিয়েছে। ওদের আশঙ্কা ছিল যে ব্যাটারা অ্যাম্বাসাডরটার কাছেও না আসে! শেষ পর্যন্ত হয়তো অ্যাম্বাসাডরটার হতশ্রী ভগ্নস্তূপ দেখে হতাশ হয়ে আর এগোল না। একরকম নিরাশ হয়েই চলে গেল।

আবার অধীর প্রতীক্ষায় প্রহর গোণা। এর মধ্যেই পবিত্র আর প্রণবেশ লাহিড়ীর সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা চলছে ফোনে। পবিত্র জানায়, তার ওখানেও একটি ভবঘুরে লোক ঘুরঘুর করছিল। কিন্তু এ সেই লোক নয়। নিতান্তই ফালতু পাবলিক। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে গিয়েছে। হয়তো তারও কিছু চুরি করার তাল ছিল। তেমন কিছু না-পেয়ে শূন্য হাতেই ফিরে গিয়েছে। প্রণবেশ অবশ্য তেমন কাউকে দেখতে পাননি। একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, “ভগবানই জানেন কেন বসে আছি। কতগুলো নেড়ি কুত্তা এসে মহা ঝামেলা শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল ওদেরই শ্যুট করে দিই। হাতে পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে গেছে বলে আর চেষ্টা করলাম না।” অধিরাজ মৃদু স্বরে বলল, “রক্ষা করেছেন।”

পবিত্র এর মাঝখানেই বলে উঠল, “কুঞ্জবনে এসে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাঁকা শ্যাম হয়ে বসে আছি রাজা। রাধিকার তো দেখাই নেই! মরার পর স্বর্গে ত্রিভঙ্গমুরারির সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করব এই পোজে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তাঁর স্পন্ডেলাইসিস বা স্লিপড ডিস্ক হয় না কেন!”

“তুমি কি দাঁড়িয়ে আছ?”

“না না।” সে হাসল, “আমি একটা মারুতির ব্যাকসিটে অলমোস্ট চার হাত পায়ে ভর দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি। কিন্তু রাধা কই? তাঁকে কি হাতে পায়ে ধরে মানভঞ্জন করে নিয়ে আসতে হবে? তুমি শিয়োর যে তিনি আসবেন?”

“তিনিও আসবেন। অপেক্ষা করো। এখনও গোটা রাত পড়ে আছে।”

পবিত্র বেজায় রেগে বলে, “গোটা রাতটাও স্ট্যাচু হয়ে কাটাতে হবে! মাইরি, পুলিশ ট্রেনিঙে দৌড়, ঝাঁপ, ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার সবই শেখায়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এরকম আনকমফর্টেব্ল পজিশনে বসে থাকারও একটা কোর্স করায় না কেন? তোমার কাছে ভোলিনি বা মুভ আছে?”

“ব্যুরোয় আছে।” অধিরাজ গম্ভীর স্বরে জানায়, “এখন একদম চুপ করে বসে থাকো। একটু পরেই অন্ধকার হবে…!”

বলতে বলতেই মাথার ওপরে জলবিন্দু পড়ার টপটপ শব্দ! পবিত্র শ্বাস ছেড়ে বলল, “লাও ঠ্যালা! এটাই বাকি ছিল!”

একেই জব্বর শীত। তার ওপর অসময়ের বৃষ্টি! অ্যাম্বাসাডরটার আবার দরজাও নেই। মাথার ওপরে ছাত আছে এই অনেক! অর্ণব আর অধিরাজ একেই যথেষ্ট ঘন হয়ে বসেছিল। তার ওপর খোলা দরজা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসছে দেখে দু-জনেরই সরতে সরতে প্রায় একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম! অর্ণবের অসম্ভব শীত করছিল। উত্তুরে হাওয়াটা এবার যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। তার সঙ্গে বৃষ্টির দাপট। হু হু করে হিমেল ভেজা হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছিল তার চোখে মুখে। ওরা দু-জনেই এমনভাবে বসে আছে যে একজনের দেহে কোনোরকম চাঞ্চল্য হলে অন্যজন ঠিকই অনুভব করতে পারবে। অধিরাজ অর্ণবের অবস্থা বুঝতে পেরে নিজের জ্যাকেটটা খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দিল, “বি কমফর্টেবল। তুমি তো রীতিমতো কাঁপছ!”

“কিন্তু স্যার…।” অর্ণব অবাক, “আপনি…?”

“আমি আয়রন ম্যান।” সে হেসে ফেলল, “ডোন্ট ওরি। আমি যে জিনিসটা পরে আছি সেটা দেখতে নিরীহ হলেও এইটুকু ঠান্ডা সয়ে নেবে। ভুলে যেও না, আমি মাইনাস ডিগ্রিতেও মাউন্টেনিয়ারিং করি। বরফ ঝড় দেখে অভ্যস্ত। কলকাতার শীত আমার কেশ কর্তনও করতে পারবে না।”

অর্ণব কথা না বাড়ালেও অস্বস্তিতে পড়ল। কে জানে, বীরত্ব দেখাতে গিয়ে লোকটা নিজেই না উলটে পড়ে! এই ভেজা ঠান্ডাটা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু জেদি মানুষটাকে কিছু বলাই বৃথা। সে অবশ্য অধিরাজের দেহের উষ্ণতা টের পাচ্ছিল। মজবুত পেশল দেহটার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে উত্থান পতনের আভাসও টের পাওয়া যায়। এমনকি তার উত্তেজিত হৃৎস্পন্দনও শুনতে পাচ্ছে অর্ণব। চতুর্দিকের অসীম নীরবতার মধ্যে একমাত্র বাঙ্ময় অধিরাজের হৃদয়।

আস্তে আস্তে রাতের ঘন অন্ধকার নেমে আসল প্রেক্ষাপটে। বৃষ্টি তখনও থামার নাম নিচ্ছে না। এখন আশঙ্কা হচ্ছে এই অকাল বর্ষণই না মাটি করে! এত শীতে মানুষ পারতপক্ষে বাড়ি থেকে বেরোয় না। যারা ঘরে আছে তারা হয়তো চাদর, বালাপোষ মুড়ি দিয়ে গরম চা আর ভাজাভুজি সহযোগে শীত উপভোগ করছে। বাচ্চারা হয়তো লেপের ভেতর ঢুকে ভূতের গল্প শুনছে। ভোজনরসিকদের বাড়িতে হয়তো টগবগ করে ফুটছে ফুলকপির খিচুড়ি। যারা বাইরে আছে, তারাও এই শীতের রাতে তাড়াতাড়ি বাড়িমুখো হবে। ভেজা পিচের রাস্তা দিয়ে যানবাহন এখন ক্লান্ত মানুষগুলোকে নিয়ে ঘরের পথে উষ্ণতার খোঁজে ছুটছে। আর ঘণ্টাখানেক পরেই রাস্তা শুনশান হয়ে যাবে। আজ হয়তো ফুটপাথবাসীরাও বাস স্টপে বা অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবে। কতগুলো পথবাসী কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে নিজেদের দেহে উষ্ণতার সঞ্চার করবে। কেউ জানবে না, এই শীতের নিস্তব্ধ শহরের নিশ্চিন্ত ছবির উলটোদিকে কী ভয়াবহ একটা জীবন-পণ যুদ্ধ চলছে! কোনো ইতিহাসে লেখা থাকবে না এই চার হতভাগ্য অফিসারের কথা যারা নিশ্চিন্ত ছাত, চার দেওয়ালের উষ্ণতা আর বিছানার আরাম উপেক্ষা করে চুপচাপ বসে শীতের কামড় সহ্য করে চলেছে। পুলিশ বলতে সাধারণ জনগণ ভুঁড়িওয়ালা, ঘুষখোর কতগুলো মানুষকেই চেনে। তার বাইরেও একদল মানুষ যে নীরবে অনেক কষ্ট সহ্য করে, অসীম ধৈর্য ধরে, ঝড়-তুফান-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নিজের ডিউটি করে চলেছে, তার খবর কোনো সংবাদপত্র রাখে না!

বেশ কিছুক্ষণ একটানা ঘ্যান ঘ্যান করে বৃষ্টি অবশেষে ক্ষান্ত দিল। অবিশ্রান্ত বর্ষণ থামলেও ততক্ষণে কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের মাটি প্যাচপ্যাচে কাদায় পরিণত হয়েছে। আশেপাশের ছোটো বড়ো গর্ত জলে ভরে গিয়েছে। স্ট্রিটল্যাম্পের আলোর কাঁপা কাঁপা প্রতিবিম্ব মাঝেমধ্যেই ঝিকিয়ে উঠছে জলের বুকে। এখন এই মুহূর্তে কোথাও কোনো শব্দ নেই! একেবারে যাকে বলে পিন পতনের নিস্তব্ধতা! অর্ণবের মনে হচ্ছিল সে বুঝি কোনো কবরস্থানে এসে পড়েছে। সামনে সারি সারি ভাঙাচোরা গাড়ির অন্ধকার সমাধি। কোনোটা মুণ্ডহীন কবন্ধের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনোটা আবার হাত-পা কাটা লাশ হয়ে পড়ে আছে। শূন্য কোটর গাড়িগুলোর মধ্যে অন্তহীন তমিস্রা যেন প্রেতাত্মার মতো ওঁত পেতে বসে আছে। সবটাই বড়ো বিষণ্ণ, বড়ো ছায়াময়।

অধিরাজের উষ্ণ সংস্পর্শে না-থাকলে অর্ণব বোধহয় ভুলে যেত তার সঙ্গে আরও কেউ বসে আছে। এতখানি বডি কন্ট্যাক্ট অধিরাজ একদমই পছন্দ করে না। হয়তো পাশের মানুষটা অর্ণব বলেই কোনো আপত্তি করছে না। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে ছিটকে সরে যেত। আজও ‘সার্জিক্যাল স কিলার’-এর আতঙ্ক তাকে পুরোপুরি ছাড়েনি। তার যে অস্বস্তি হচ্ছে তা সে না বললেও অর্ণব বুঝতে পারে। তবুও একটুও নড়াচড়া করছে না অধিরাজ। সে একদম পুতুলের মতো স্থির। তীক্ষ্ণ চোখদুটো নিবদ্ধ কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের গেটের দিকে। তার উত্তেজিত শ্বাস-প্রশ্বাস খুব হালকা সিগারেটের সুগন্ধ নিয়ে আছড়ে পড়ছে অর্ণবের মুখে চোখে। তবু অর্ণবও একচুল নড়ল না।

আচমকাই সব নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ওদের ইয়ার পিস কড়কড় করে ওঠে, “মেরা দিল ইয়ে পুকারে আজা, মেরে গম কে সাহারে আজা, ভিগা ভিগা হ্যায় সামা, অ্যায়সে মে হ্যায় তু কহাঁ, মেরা দিল ইয়ে পুকারে আ-জা-আ-আ!”

অর্ণব প্রায় চমকেই উঠেছিল। অধিরাজ একটু রেগে গিয়েই বলল, “এখনই তোমায় গানে পেল!”

পবিত্র-র হাসি ভেসে এল, “নির্ঘাত অর্ণব চমকে গেছে। ওকে মঞ্জুলিকার কেসটাতেও জব্বর ভয় দেখিয়েছিলাম। আসলে ভাবলাম অভিমানিনী রাধা বলে কথা। পায়ে ধরে একটু জোরাজুরি না করলে আসবে কেন!”

“ফের এরকম বেসুরো গান গাইলে আমিই তোমার গলায় টায়ার পরিয়ে জ্বালিয়ে দেব…!” অধিরাজ সরোষে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎই বাকি কথাগুলো গিলে নিয়ে নীচু স্বরে ফিশফিশ করে বলল, “ওয়েট, পবিত্র, আমাদের এদিকে কেউ আসছে। আমি ছায়া দেখতে পেয়েছি।”

পবিত্র উত্তেজিত, “ঠাট্টা করছ? না সত্যিই কেউ আসছে!”

ওদের আর একটা শব্দও খরচ করতে হল না। গাড়ির কবরস্থানের মধ্যে হঠাৎ‍ই জাগ্রত হয়ে উঠল সেই বিখ্যাত সুরেলা শিস। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে এল হাড় হিম করা সুর, “গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই, কিসকো খবর কৌন হ্যায় উয়োহ, অনজান হ্যায় কোই…!”

“শুনতে পেয়েছি রাজা। কপি দ্যাট।”

পবিত্র-র লাইনটা কেটে গেল। সে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এদিকেই আসবে। দুটো কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়। পবিত্র-র সঙ্গে বাইক আছে। ফুল স্পিডে চালালে পাঁচ মিনিটেই চলে আসবে। যদি লোকটা পবিত্র-র এলাকায় আসত তবে ওরা দুই মূর্তি সঙ্গে সঙ্গেই চলে যেত ওকে ব্যাক-আপ দিতে। প্রণবেশ লাহিড়ীর তো কথাই নেই। তিনি মারপিটে নয়, গুলি চালাতে বিশ্বাসী। একাই পুরো ব্যাটেলিয়ন। তবু তাঁকেও সাপোর্ট দেওয়ার জন্য অনতিদূরেই অপেক্ষা করছিল পুলিশের বাইক বাহিনী। আজ ওরা কেউই ফোর হুইলার সঙ্গে নিয়ে আসেনি। প্রত্যেকেরই বাহন বাইক। নাকের সামনে আস্ত চকচকে চারচাকা দাঁড়িয়ে আছে দেখলে হয়তো চতুর অপরাধী ফাঁদে পা দেবে না। বাইককে তুলনামূলকভাবে লুকিয়ে রাখা সহজ। তাই এই ব্যবস্থা।

এখানে তখনও শোনা যাচ্ছে সেই তীব্র শিস। অধিরাজের নিশ্বাস টানার শব্দ ও আর শোনা যাচ্ছে না। তার প্রত্যেকটা স্নায়ু টানটান। অর্ণব কৌতূহলে সামনের সিটের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তার মাথাটায় একটু চাপ দিয়ে নীচের দিকে নামিয়ে দিল অধিরাজ। ইশারা স্পষ্ট। সামনের ব্যক্তিটি যেন তাদের ভুলক্রমেও দেখতে না পায়। দু-জোড়া চোখ আড়াল থেকে চরম উত্তেজনায় সামনের দিকে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শিসটা শোনা গেলেও শিসের মালিককে এখনও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল লোকটা!

কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের চারদিকেই আলোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বড়োই বিবর্ণ, নিষ্প্রভ আলো। সেই স্তিমিত পিঙ্গল আভায় আস্তে আস্তে ধরা দিল একটি ছায়ামূর্তি। তার হাবভাব নিশ্চিন্ত। হাতে একটা ঠ্যালাগাড়ি। সম্ভবত টায়ার নিয়ে যাবার জন্যই ওটা নিয়ে আসতে হয়েছে। এই গাড়ির শবের মধ্যে জ্যান্ত মানুষ কোথাও থাকতে পারে এমন কোনো ধারণা তার নেই। না থাকারই কথা। কারণ একেই শীতের রাত, তার ওপর আবার বৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোন পাগলে এখানে এসে বসে থাকবে। সুতরাং সে অন্য কোনো মানুষের উপস্থিতি আশা করেনি। বরং খুব সহজ ভঙ্গিতে শিস দিতে দিতে এগিয়ে আসছে।

হুইস্লটার সুরের মধ্যে এমন কিছু ছিল যা অর্ণবের গায়ের সব রোম একঝটকায় খাড়া করে দিল। বহুবার এই গানটা লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে সে শুনেছে। তখন এটা শুনে এত ভয় লাগত না। কিন্তু এবার সেই অভিশপ্ত সুর শুনে বুকের ভেতরটা শিরশিয়ে উঠছে। তার থেকে কয়েক কদম দূরত্বেই দাঁড়িয়ে আছে ‘বার্নিং শিখ।’ হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে সে-ই বটে। তার লাল উঁচু পাগড়িটা হলদে আলোয় আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। মুখ চোখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও গালের একদিকের দাড়ি জঙ্গলের আভাস বেশ বোঝা যায়। নাতিদীর্ঘ চেহারা। শক্ত কাঠামো। পরনের চোলাও স্পষ্ট। সত্যিই! যেন টাইম মেশিনে চড়ে অতীত থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে সে। এ ধরনের পোষাক শিখেরা এখন আর পরে না। তাকে দেখে অবিকল ইতিহাসের পাতার শিখ যোদ্ধাই মনে হয়।

লোকটাকে স্বচক্ষে দেখে কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল অর্ণব। সংবিৎ ফিরল অধিরাজের খোঁচা খেয়ে, “গেট রেডি অর্ণব।”

তার হাতে অলরেডি ফণা তুলেছে আগ্নেয়াস্ত্র। খুব সন্তর্পণে একটুও শব্দ না করে যেভাবে ক্ষিপ্র কায়দায় সে অবলীলায় ছ-ফুট চার ইঞ্চির দীর্ঘদেহটাকে সামলে নিয়ে গাড়ির বাইরে বের করল তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এতক্ষণ এভাবে বসে থেকেও আড়ষ্ট হয়নি নমনীয় শরীরটা। অর্ণবের তো রীতিমতো হাতে পায়ে খিল ধরে গিয়েছে। তবু সে-ও দাঁতে দাঁত চেপে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নামল। ওরা দু-জনেই গাড়িগুলোর অন্ধকার ছায়ার কভার নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগোলো শিকারের দিকে।

“পল্ দো পল্ কী মস্তি হ্যায়, বস্ দো দিন কী বসতি হ্যায়, চ্যায়ন ইয়াহাঁ পে মেহঙ্গা হ্যায়, ঔর মওত ইয়াহাঁ পে সস্তি হ্যায়…!”

লোকটা খুব চাপা স্বরেই কলিগুলো গাইতে গাইতেই আপনমনে একটা একটা করে টায়ার তুলে ঠ্যালায় রাখছিল। এই মুহূর্তে অধিরাজদের দিকে সে পেছন ফিরেই আছে। ঠিক আর চার কদম দূরত্বে! আর এক দু-পা এগোলেই চেপে ধরা যাবে ওকে…!

“গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায়…।”

গাইতে গাইতে হঠাৎ থমকে গেল বার্নিং শিখ। পরক্ষণেই বিদ্যুৎবেগে পেছনে ফিরল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শিকারীদের ছায়া দেখতে পেয়েছে। অধিরাজ সভয়ে দেখল তার হাতটা চোলার নীচ থেকে কিছু একটা বের করে এনেছে। অর্ণব একদম তার মুখোমুখি। সে বন্দুক তাক করে এক পা এগিয়ে গেল, “হল্ট।”

“অ-ৰ্ণ-ব!”

একটা বিদ্যুতের রেখা যেন ঝলসে উঠল। অধিরাজ শূন্যে শরীরটা ছুড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্ণবের ওপরে। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়েই গড়িয়ে একপাশে সরে গেল। তার মধ্যেই হাতের জিনিসটা ছুড়ে দিয়েছে বার্নিং শিখ! অর্ণব বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল একটু আগেই যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল সেখানে কাচের একটা কী যেন এসে আছড়ে পড়ল। সজোরে কাচ ভাঙার শব্দ। ভেজা মাটি যেন রাগে ফোঁস করে উঠেছে। সে স্পষ্ট দেখল মাটি থেকে তেজি ধোঁয়া উঠছে! অ্যাসিড বালব!

তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার আক্রমণ! আকস্মিক আক্রমণে অর্ণব হতভম্ব হয়ে গিয়েছে দেখে অধিরাজ তাকে তখনও ছাড়েনি। অর্ণবকে একরকম বগলদাবা করেই সে পায়ে ভর দিয়ে ফের একটা ভল্ট খেল। দ্বিতীয় অ্যাসিড বাল্বটা এবারও ব্যর্থ হয়ে ফোঁস করে রাগী ধোঁয়া উগরে দিয়েছে।

খণ্ডমুহূর্তের জন্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও এবার নিজেকে ফিরে পেল অর্ণব। তার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে দু-বার প্রায় অব্যর্থ অ্যাসিড অ্যাটাকের হাত থেকে একচুলের জন্য বেঁচে গিয়েছে! ওদিকে কাদাভরতি মাটিতে পড়ে যাওয়ার দরুণ সারা গায়ে চোখে মুখে কাদা লেগে গিয়েছে। সে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই লোকটার পায়ের দিকে টিপ করে ট্রিগার টিপল। কিন্তু চোখের পাতার নীচে কাদা লেগে থাকায় নিশানাটা নিখুঁত হল না! চরম মুহূর্তে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করল। নিস্তব্ধ কার ডাম্পিং গ্রাউণ্ড কেঁপে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র-র গর্জনে! তবে বুলেটটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। বার্নিং শিখ এবার অসম্ভব আক্রোশে তার দিকে আরও এক পা এগিয়ে আসে। অর্ণব এবার নিশ্চিত ছিল যে আরও একটা অ্যাসিড বাল্ব এসে পড়বে। তাই তৃতীয় আক্রমণটাকে সে নিজেই ডজ করে লাফিয়ে উঠে লোকটার থুতনি লক্ষ্য করে একটা মোক্ষম ঘুঁষি বসিয়ে দিল।

অদ্ভুত ব্যাপার! অত জোরাল পাঞ্চ খেয়েও সে পড়ে গেল না। হয়তো অর্ণবের ওপর ফের ঝাঁপিয়ে পড়ত। তার আগেই পেছন থেকে এক হাতে বজ্রকঠিন আলিঙ্গনে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে অন্যহাতে চোলার তলা থেকে একটা দড়ি টেনে বের করে আনল অধিরাজ। এই দড়িটা ওর কোমরে বাঁধা ছিল। তাতে আরও চারটে অ্যাসিড বাল্ব ঝুলছে! সে বজ্রকণ্ঠে বলল, “সরি। অ্যাসিড বাল্বগুলো আমি একটু ধার নিচ্ছি।” বার্নিং শিখের মুখটা এবার একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কী ভয়ংকর আক্রোশ সে মুখে! একদিকের মুখ যেন ঈশ্বর তৈরি করেও লেপে-পুঁছে দিয়েছেন। ঠোঁটের ওপরের সেলাইগুলো দেখলে মর্গের লাশের সেলাই করা দেহ মনে পড়ে। অধিরাজ এমন বেকায়দায় তাকে ধরেছে যে সেই বজ্রমুষ্টি থেকে নিজেকে ছাড়াতেও পারছে না। পালটা আক্রমণও করা অসম্ভব। তার ওপর তার বিষ-দাঁত, তথা অ্যাসিড বাল্বগুলোও হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। একটা আহত সাপের মতো সে অসম্ভব প্রতিহিংসায় ফুঁসছে। “নাইস মেক-আপ! আপনার কল্যাণে আমরাও কাদা মেখে কিছুটা হ্যালোউইন

মেক-আপ করে নিয়েছি।” অধিরাজ ঠান্ডা স্বরে বলল, “বাট একটা টেকনিক্যাল ফল্ট আছে। যার ঠোঁট সেলাই করা সে শিস দিতে বা গান গাইতে পারে না। আপত্তি না থাকলে একটু আপনার আসল মুখটা দেখতে পারি?”

সে আর কিছু করার আগেই বার্নিং শিখের বাঁ-হাতটা ক্ষিপ্রবেগে নিজের পাগড়ি ছুঁল। ওই স্বল্প আলোতেই তার হাতে ধাতব কিছু একটা ঝিকিয়ে উঠল। অর্ণব দেখল তার হাতটা অধিরাজের গলা লক্ষ্য করে সবেগে ছুটে যাচ্ছে। সে চেঁচিয়ে ওঠে, “স্যা-র!”

লোকটার উষ্ণীষের ভেতরে একটা ছোট্ট অথচ মারাত্মক ধারালো কৃপাণ লুকোনো ছিল। এটার সম্ভাবনা ওদের কারোর মাথাতেই ছিল না। অধিরাজের কণ্ঠ তার লক্ষ্য হলেও শেষমুহূর্তে সে আত্মরক্ষার্থে একটু পিছিয়ে যাওয়ার ফলে কৃপাণটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গলার বদলে কাঁধে আমূল বসে গেল। অধিরাজ কাতরোক্তি করে ওঠে। অর্ণব দেখল তার পরনের কাদামাখা কটস উলের জামাটা আস্তে আস্তে রক্তে লাল হয়ে উঠছে! হাত থেকে অ্যাসিড বাল্বগুলো খসে পড়ল। অপ্রত্যাশিত আঘাতের ধাক্কায় ও যন্ত্রণায় তার লৌহবেষ্টনী আলগা হয়ে গিয়েছে। সেই মুহূর্তের ভগ্নাংশের সুযোগ নিয়েই বার্নিং শিখ ফের এগিয়ে গেল। অধিরাজের কাঁধে তখনও ছুরিটা গভীরে চেপে বসেছিল। লোকটা এক ঝটকায় সেটাকে খুলে নিয়েছে। ছুরিটা ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে মাসতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে শুরু করল। গোটাটাই এত দ্রুত ঘটে গেল প্রত্যাঘাত করার সময় প্রায় ছিলই না। তবু অধিরাজের এক জোরাল লাথি খেয়ে লোকটা ছিটকে পড়ে। অর্ণব দেখল এই সুযোগ। সে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই একের পর এক ফায়ার করতে শুরু করল ওর মাথা, পেট আর বুক লক্ষ্য করে। কান ফাটানো ফায়ারিং-এর আওয়াজে গোটা এলাকা সচকিত হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ হলে হয়তো এতক্ষণে ঝাঁঝরা হয়ে যেত। অথচ বার্নিং শিখ স্রেফ গুলির ধাক্কায় কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। প্রত্যেকটা বুলেটের আঘাতে সে কেঁপে কেঁপে উঠছে ঠিকই, কিন্তু এক ফোঁটা রক্তও বেরোচ্ছে না! সামান্য ঝাঁকুনি ছাড়া বুলেটগুলো আর কোনো ক্ষতি করতে পারছে না! এমনকি তার পাগড়িতেও বুলেট লেগেছে। অথচ কোনোরকম আঘাতের লক্ষণই নেই। এর মধ্যে একটা গুলিই ওর প্রাণ নিয়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট! কিন্তু লোকটা অক্ষত। তার ভয়াবহ মুখে একটা শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।

অর্ণবের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। কম-সে কম ছ-টা বুলেট সে ফায়ার করেছে। তারপরও শিকার বহাল তবিয়তে আছে! এ কীভাবে সম্ভব। সত্যিই এ লোকটা মানুষ তো! এতগুলো গুলির একটাও লাগল না! কোনো ক্ষত বা রক্তের চিহ্নই নেই। সে বিস্ময় বিহ্বল অবস্থায় কী করবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু অধিরাজ এবার তার পা লক্ষ্য করে ফায়ার করল। সি.আই.ডি.র সবচেয়ে দক্ষ শার্প শ্যুটারের গুলি এবার গিয়ে লাগল বার্নিং শিখের উরুতে। এই প্রথম কাজ হল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল আততায়ী। এই প্রথম তার পাজামা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। অধিরাজ এবার রিভলভারটা তার চোখের দিকে তাক করে বলল, “তুই বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরেছিস ঠিকই, আমি নিশ্চিত পাগড়িটাও বুলেটপ্রুফ! কিন্তু এবার আর কোনো চালাকি করলে তোর চোখ লক্ষ্য করে ফায়ার করব!”

এইবার কাজ হল। বার্নিং শিখ নামক লোকটি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার একটাই চোখ দেখা যাচ্ছিল। সেই চোখে এবার গভীর আতঙ্ক। প্রতিদ্বন্দ্বী যে তার চালাকি এত সহজে ধরে ফেলবে তা ওর কল্পনারও বাইরে। সে আস্তে আস্তে হাত দুটো আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুলে দেয়।

অর্ণব একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অধিরাজ এখনও সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে লোকটাকে মাপছে। চোখে ভয় থাকলেও ওর মুখ এখনও এত নিশ্চিন্ত কেন! নিশ্চয়ই মস্তিষ্কে অন্য কোনো বুদ্ধি এসেছে। তার সতর্ক দৃষ্টি ওর জখম পায়ের দিকে গেল। ওর পা ততক্ষণে ঠ্যালা গাড়ির উঁচু অংশটা ছুঁয়েছে….!

“অর্ণব… নো!”

শুধু এইটুকুই বলতে পেরেছিল সে। তার মধ্যেই বার্নিং শিখ পায়ের ধাক্কায় ঠ্যালাগাড়িটাকে পুরো উলটে দিয়েছে। যতগুলো টায়ার তার ওপরে ছিল এক ধাক্কায় শূন্যে উঠে গিয়েছে। বড়ো বড়ো জগদ্দল টায়ারগুলো ধুপধাপ করে দুই অফিসারের ওপরে এসে প্রায় বুমেরাং এর মতো ছিটকে পড়ল। অর্ণবের বুকে একটা টায়ার এসে ধাক্কা মেরেছে। সে তার ধাক্কা সামলাতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আগ্নেয়াস্ত্রটা হাত থেকে কোথায় ছিটকে পড়ল কে জানে। অধিরাজ নিজেকে সামলে নিলেও দেখল লোকটা তাদের এই অবিন্যস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে সবেগে পালিয়ে যাচ্ছে। “এ-ই! দাঁ-ড়া!”

অর্ণব ততক্ষণেও নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারেনি। জমা জল ভরা গর্তে পা স্লিপ করে পড়ে গিয়ে ভিজে গিয়েছে। তার সারা গায়ে প্যাচপ্যাচে কাদা! যেভাবে এই কাদার মধ্যে দু-জনে মিলে গড়াগড়ি খেয়েছে, তাতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাদার প্রলেপ লেগে একসা! তবু হাত দিয়ে চোখের ওপর থেকে মাটি পরিষ্কার করে দেখল বার্নিং শিখের পেছন পেছন তীরবেগে দৌড়চ্ছে অধিরাজ। অপরাধীর পক্ষেও কাজটা সহজ নয়। পিচ্ছিল মাটিতে সে-ও একবার আছাড় খেল। তবু হাল ছাড়বে না। ফের উঠে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎবেগে দৌড় মারল। অধিরাজের পা-ও স্লিপ করছে। জুতোর গ্রিপ ফস্কাচ্ছে। কাঁধ থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। তাও হাল ছাড়ল না। গোঁয়ার জেদে লোকটাকে চেজ করছে সে! লোকটার উরুতে গুলি লেগেছে। তাও এত জোরে দৌড়চ্ছে কী করে ও? বিন্দুমাত্রও খোঁড়াচ্ছে না!

দু-জনেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেল। কিন্তু প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই কানে এল একাধিক ফায়ারিং এর শব্দ! গুলি চলছে। কে কাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে! সে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায়। হয়তো বাইরের দিকে ছুটেও যেত। তবে তার আর দরকার পড়ল না। দূর থেকেই একটা কাদামাখা মূর্তিকে ফের এদিকেই দৌড়ে আসতে দেখল সে। দীর্ঘ চেহারাটা দেখে বুঝতে অসুবিধে হল না, ওটা অধিরাজ! সে অর্ণবের কাছে ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ধরতে পারলাম না! শয়তানটা একটু দূরেই একটা টেম্পো দাঁড় করিয়ে এসেছিল। ওতে চড়েই পালিয়ে গেল। আমাদের বাইকগুলো আবার উলটোদিকে। ফিরে গিয়েও কোনো লাভ হত না! ফস্কে গেল! একটুর জন্য…!” তার কণ্ঠস্বরে আফসোসের পাশাপাশি এবার উদ্বেগ, “তুমি ঠিক আছ? বুকে খুব জোর লেগেছিল টায়ারটা…!”

অর্ণব কী বলবে ভেবে পায় না! এই লোকটার কাঁধ থেকে অবিরত রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। কৃপাণটা একদম পুরোটাই গেঁথে গিয়েছিল। আপাদমস্তক কাদায় আর রক্তে মাখামাখি। সে আবার জিজ্ঞাসা করছে অর্ণব ঠিক আছে কিনা! এই মানুষটা ঠিক কোন্ ধাতুতে গড়া।

“আরে একী!”

অফিসার আচার্য এতক্ষণে এসে পৌঁছেছে! অধিরাজদের দেখে সবিস্ময়ে বলল, “লোকটা কোথায়! আর তোমরা এতক্ষণ কি কাদামাটিতে কুস্তি করছিলে! এ কী অবস্থা বানিয়েছ!”

অধিরাজ একটা প্রচণ্ড রাগকে সম্বরণ করে বলল, “হ্যাঁ, আমরা এতক্ষণ মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বার্নিং শিখের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভৌতিক মেক-আপ করছিলাম। আমাদের তো কাদা মেখে ভূত সাজার খুব শখ! তুমি এত তাড়াতাড়ি এসে পড়লে যে? আর একটু দেরিতে এলে কী ক্ষতি হত!”

“আরে আমার বাইকে আজ তেল ভরতে ভুলে গিয়েছিলাম।” পবিত্র অপ্রস্তুত, “মাঝপথেই থেমে গেল। এমনিতে ওটা ইউজ হয় না। তাই তেল ভরার কথা মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল…!”

অধিরাজ আর থাকতে না পেরে প্রায় গর্জন করে ওঠে, “ইউ স্টুপিড! তোমার জন্য লোকটা আজ আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে গেল! তুমি জানো এর ফলাফল কী হবে? এরপর আর ও টায়ার আর কেরোসিন ইউজ করবেই না। প্যাটার্নকে গুলি মারো! এবার এমনি এমনিই লোকগুলোকে মারবে। আর আমাদের কোনো ধারণাই নেই যে অ্যাকচুয়াল মার্ডার ওয়েপনটা কী! এবার ওকে আটকাবে কী করে তুমি?” পবিত্র-র মাথা আত্মগ্লানিতে নীচু হয়ে গেল। ও বেচারিরও দোষ নেই। টেনশনে বাইকে তেল ভরার কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছে। মাঝপথে ওর বাইকটা থেমে না গেলে হয়তো লোকটাকে ধরা যেত। কিন্তু সেকথা অধিরাজ এখন বুঝবে না। ওর মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছে।

“ড্যা-ম্!” প্রচণ্ড রাগে অধিরাজ কী করবে ভেবে পায় না, “আজ ওর প্ল্যান বানচাল হয়ে যাওয়ায় আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টায় ও সবকিছু করবে! লোকটাকে তুমি দেখোনি, আমরা দেখেছি। কোনোরকম যন্ত্রণা ওকে হারাতে পারে না! এত স্পিডি যে তুমি ভাবতেও পারবে না। আজ তিন তিনবার অর্ণব অ্যাসিড অ্যাটাক থেকে বেঁচেছে। আমি আর একটু হলেই শহীদ হয়ে যাচ্ছিলাম। ও মরে যাবে, কিন্তু হার মানবে না আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টায় আরও ডেসপারেট হয়ে উঠবে। তার ওপর ওর চোখে আমি প্রতিহিংসা দেখেছি। আজকের সাময়িক ব্যর্থতার বদলা আমাদের থেকে নেবেই। এবার ও রিভেঞ্জ নেবে। এর অর্থ কী বুঝতে পারছ? আমাকে তো ছেড়েই দাও, মিস্ বোস, মিস্ দত্ত, তুমি নিজে, অর্ণব, প্রণবেশদা সমেত গোটা টিমই ওর হিটলিস্টে থাকবে। খবরিরাও হয়তো বাদ যাবে না। কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ হিসাবে এতগুলো প্রাণের দায় কে নেবে? তুমি নেবে? বু-ল্ শিট!”

“রাজা।” এবার পবিত্র তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, “তুমি প্লিজ কোনো হসপিটালে চলো। তোমার উন্ড থেকে ভীষণ ব্লিডিং হচ্ছে।”

“হোক।” সে আরও উত্তেজিত, “আমাদের মতো অপদার্থের এটাই হওয়া উচিত। নাকের সামনে দিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। আমরা স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। উই রিয়েলি ডিজার্ভ দিস!”

“স্যার।” এবার অর্ণব তাকে বোঝানোর প্রয়াস করল, “যা হয়ে গিয়েছে তা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আপনার উন্ডটা মারাত্মক। ওটার পরিচর্যা না করলে প্রবলেম হবে।” অধিরাজ অশান্ত, “তুমি বুঝছ না অর্ণব। এখন আমি কোনো হসপিটালে যেতে পারব না। তাহলেই আমাকে অ্যাডমিট হতে বলবে। আর আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টায় আমার মরার সময়ও নেই। যা করার তা তার পরেই করব।”

“ওকে।” অর্ণব শান্ত স্বরে বলে, “তবে অন্তত ফরেনসিক ল্যাবে চলুন। অ্যাট লিস্ট ডঃ চ্যাটার্জি কিছু-না কিছু করে আপাতত সামাল দেবেন। তারপর দেখা যাবে। ও লোকটারও তো থাইয়ে গুলি লেগেছে। সে-ও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো হসপিটালে যাবে। আমি বরং সমস্ত হসপিটালকে অ্যালার্ট করে দিচ্ছি…!”

“প্রসিডিওর অনুযায়ী তাই করা উচিত।” সে এবার একটু শান্ত হল, “অ্যালার্ট করে দাও। কিন্তু পণ্ডশ্রম। ও পাবলিক কোনো ডাক্তারের কাছে যাবে না। বরং নিজেই হয়তো বুলেট বের করার চেষ্টা করবে। আমার মতো আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা ওরও ছুটি নেই অর্ণব। আমাদের হাতে যেমন সময় কমছে, তেমন ওর হাতেও বেশি সময় নেই। ও জীবনে অনেক যন্ত্রণা সয়ে সয়ে ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। একটা বুলেট ওর কিস্যু করতে পারবে না!” বলতে বলতেই অধিরাজ ফিরল পবিত্রর দিকে। রাগত গলায় বলল, “বাইক তো কোনো কম্মের নয়। মোবাইলটা কি ঠিক আছে? না ওটারও চার্জ শেষ?”

তার কথার মধ্যেই ব্যঙ্গ ও রাগ প্রকট। অফিসার আচার্য মাথা নীচু করেই বলল, “না। ওটা ঠিক আছে।”

“দেন, এখনই মিস্ বোস আর মিস্ দত্তকে ফোন করো। দেখো, ওদিকে সব ঠিকঠাক আছে কিনা!”

সৌভাগ্যক্রমে কৌশানী আর আত্রেয়ীর কাছ থেকে কোনোরকম দুঃসংবাদ এল না।

দুই লেডি অফিসারই রাতে চুপচাপ রাউন্ড দিয়ে বেড়াচ্ছে। ওদের চোখেও ঘুম নেই। প্রতিটা মুহূর্ত দু-জনেই সদাসতর্ক হয়ে কাটাচ্ছে। কৌশানী জানাল, পি সি চৌধুরীর বাড়িতে কোনোরকম অঘটন কিছু ঘটেনি। গোটা দিনটাই খুব নর্মাল গিয়েছে। আত্রেয়ী অবশ্য কথায় কথায় একটা কথা জানায়। সে বলল, “স্যার, এদের বেডরুমের ঘরের লাইটগুলো পিকিউলিয়ার।”

“পিকিউলিয়ার মানে?”

অধিরাজের প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে বলল মিস দত্ত, “জানি না। আই মিন, হয়তো এটাই নর্মাল। কিন্তু এইরকম লাইট আমি গ্রীনহাউসে দেখেছি। আমার এক বন্ধু বটানিতে এক্সপার্ট। ও অনেকরকম উদ্ভট প্ল্যান্ট গ্রীনহাউসে লাগায়। ওর গ্রীনহাউসে প্ল্যান্টগুলোর মাথায় মাথায় এরকম ভিবজিওর এল ই ডি লাইট আছে। ও বলেছিল ওই লাইটগুলো একদম সানলাইটের এফেক্ট দেয়। গাছগুলো গ্রীনহাউসের মধ্যে থাকলে সানলাইট পায় না। তাই যাতে ওরা সালোকসংশ্লেষ চালিয়ে যেতে পারে তাই ভিবজিওর আলট্রা ভায়োলেট লাইট লাগাতে হয়। এদের বেডরুমেও ঠিক সেই ভিবজিওর আলট্রা ভায়োলেট লাইট আছে স্যার।”

“স্ট্রেঞ্জ!” অধিরাজের মুখ থেকে চির পরিচিত শব্দটা বেরিয়ে আসে, “ওই বিশেষ লাইটের কোনো ক্ষতিকর প্রভাব আছে? জানেন আপনি?”

“না স্যার।” আত্রেয়ী হাসে, “ওই লাইটের তলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আমার বন্ধু প্রায় তিন চার বছর ধরে কাজ করে চলেছে। ওটা শুধু খাঁটি সানলাইটের পুরো এফেক্টটা দেয়। আর কোনো সাইড এফেক্ট নেই।”

“হুঁ।” তার চোখ অন্যমনস্ক, “ওদের বেডরুমে কোনো প্ল্যান্ট আছে?”

“সব বেডরুমে নেই স্যার। তবে ভূপেন্দ্র স্যার আর ওঁর ওয়াইফের ঘরে আছে।” “কতদিন ধরে ওই লাইট আছে? জিজ্ঞাসা করেছেন?”

“হ্যাঁ।” আত্রেয়ীর সপ্রতিভ উত্তর, “মাস ছয়েক ধরেই আছে।”

“হুম।” অধিরাজ আর কথা বাড়ায় না। শুধু বলল, “মিস্ দত্ত, হাই অ্যালার্টে থাকুন। খুব সাবধান। প্রত্যেকটা পদক্ষেপ খুব সন্তর্পণে রাখবেন।”

“ওকে স্যার।”

আত্রেয়ী ফোন কেটে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *