(১০)
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরি
লড়াইটা ক্রমশ বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে! অন্যান্য শহরের পুলিশেরা আমায় এতটা ভোগাতে পারেনি, যতটা কলকাতার সি.আই.ডি., হোমিসাইড প্রতি পদে বাধা দিচ্ছে। ওদের জন্য চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় নষ্ট হল। প্রত্যেকটা ঘণ্টা আমার কাছে অমূল্য। প্রতিটা মুহূর্ত দামি। অথচ কোন্ ম্যাজিকে জানি না, তদন্তকারী অফিসারটি আমার সমস্ত পরিকল্পনা বরবাদ করে ছাড়ছে। এখনও বুঝতে পারিনি যে, রাতে ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে আমি যাব, গেলেও কোথায় যাব, সেটা লোকটা আন্দাজ করল কী করে। ওর চোখে বুলেটপ্রুফ ভেস্টটাও এড়ায়নি। সঙ্গীটি ঘাবড়ে গিয়েছিল, কিন্তু ও শেষপর্যন্ত দমেনি। যার জন্য একটা গুলি খেতেই হল আমায়। নিতান্তই ‘ওয়াহেগুরু’ সহায় ছিলেন বলে কোনোমতে পালিয়ে আসতে পেরেছি। অ্যসিড বাল্বগুলো কোমর থেকে খুলে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। ওটা একটা চরম ভুল! আফসোস, যে সেগুলোও ওদের হাতে চলে গেল। কৃপাণটা ছিল বলে শেষরক্ষা হয়েছে। নয়তো কপালে অশেষ দুঃখ ছিল।
প্রত্যেকবারই যে শহরে গিয়েছি, সেইসব শহরের সুপার-কপদের ইতিহাস খুব ভালোভাবেই জেনে নিয়েছিলাম। কলকাতার এই সুপার-কপটির কীর্তিও অজানা ছিল না। অন্যান্যদের মাত দিতে কোনো অসুবিধে হয়নি। ওকেও আমি খরচের খাতায় লিখেই রেখেছিলাম। এখন দেখছি, ভুল করেছিলাম! প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ওর প্রতি আমার সম্মান ক্রমাগতই বাড়ছে। বাকিরা সুপার-কপের থেকে বেশি সুপার ফ্লপ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এই বিশেষ অফিসারটিকে রীতিমতো ভয় পাচ্ছি। ‘সুপার-কপ’ শব্দটা ওর জন্য সার্থক। প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় অ্যাটেম্টা নিয়েছিলাম গোটা পুলিশবাহিনীকে ভয়ে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য। অথচ যা হল তাতে নিজেই ঘাবড়ে গেলাম। আমার ফুলপ্রুফ প্ল্যান স্রেফ একটা লোকের দক্ষতায় ভেস্তে গেল! নিজেকে ধিক্কার দেওয়া উচিত, না অফিসারটির প্রশংসা করা, তা বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকু বুঝেছি, ও এবার ছায়ার মতো প্রতি পদক্ষেপে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলবে। যদি ওকে না হারাতে পারি, তবে ও আমায় হারাবে। কিন্তু আমি হারতে রাজি নই! যুদ্ধটা এবার সেয়ানে সেয়ানে।
গুলিটা লাগার পর থেকেই বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। তবুও কোনো হসপিটালে যাইনি। কারণ যে লোক এভাবে অপ্রত্যাশিত ফাঁদ পেতে আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল, সে শহরের সবক-টা হাসপাতালেও নির্ঘাৎ জাল পেতে বসে থাকবে। আমি গুলিটা বের করতে গেলেই ওরা আমায় ধরে ফেলবে। তা হতে দিই কী করে? অগত্যা অতি কষ্টে গুলিটা নিজেই কেটেকুটে বের করেছি। একটু বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে ঠিকই। তা সত্ত্বেও আমাকে তা সহ্য করতে হবে। একটুও খোঁড়ানো চলবে না, কোনোরকম আঘাতের আভাস দেওয়া চলবে না। এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি যন্ত্রণা তুমি আমার কপালে লিখেছিলে ঈশ্বর। এইটুকু যন্ত্রণা সইয়ে নেওয়ার শক্তি দেবে না? আমি পারব। পারতেই হবে যে।
মিথ্যে বলব না, এই অফিসারটিকে দেখলেই আমার একটা অদ্ভুত আফশোশ হয়। মনে হয়, ১৯৮৪ সালে এই মানুষটা কেন দিল্লিতে ছিল না! এরকম একজন পুলিশ অফিসারও যদি সেদিন দিল্লিতে থাকত তবে হয়তো অনেক নিরীহ মানুষের জীবন বেঁচে যেত। ওকে যত দেখছি, ততই আমার সরতাজের কথা মনে পড়ছে। সেই সরতাজ সিং! আমার জীবনের দ্বিতীয় নায়ক! আর সরতাজের কথা মনে পড়লেই অতীতের সেই কালান্তক দিনের স্মৃতি আমায় ঘিরে ধরে…!
৩১ অক্টোবরের রাত থেকেই গোটা দিল্লি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন যে তাঁর প্রতিটি রক্তবিন্দু দেশের ঐক্যকে বহাল রাখবে, ভারতবর্ষকে মজবুত করবে। কিন্তু বাস্তবেই যখন ওঁর রক্তবিন্দু ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেই ‘খুন কা এক এক কতরা’ ভারতবর্ষকে ভেঙে খণ্ড খণ্ড করে দিল। এইমস্ আর সফদরজঙ্গ হসপিটালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চান, শিখ—সকলেই ছিল। প্রত্যেকেই নিজের নিজের ঈশ্বরের কাছে প্রধানমন্ত্রীর প্রাণ ভিক্ষা করছিল। কিন্তু সে প্রার্থনা যখন ব্যর্থ হল, তখন দেখা গেল সেই ভিড় থেকে কখন যেন শিখেরা আলাদা হয়ে গিয়েছে। যে বেইমান শিখ দুটো গুলি চালিয়েছিল, তাদের মধ্যে বেয়ন্ত সিংকে ওখানেই গুলি করে মেরেছিল ইন্দিরা গান্ধীর বাকি বডিগার্ডরা। সতবন্ত সিংকে গ্রেফতার করা হল। মজার কথা, ওদের পরিবারের গায়ে কিন্তু সামান্য আঁচড়টুকুও পড়েনি। উলটে বেয়ন্ত সিং-এর বিধবা বিমল কৌর উগ্রবাদীদের দলে নাম লিখিয়ে জেলে গেলেও পরে ‘রোপার’ থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছিল এবং জিতেওছিল। ওর বাবা সূচা সিং ভাটিল্ডা থেকে ‘চুনাও’লড়ে এম.পি. হয়েছিলেন! ওর মা-কে স্বর্ণমন্দিরের জ্ঞানী ও গ্রন্থীরা মিলে সম্মানিত করল, অন্যান্য পার্টির নেতারাও তাঁকে ‘শহীদের মা’ হিসাবে সম্মান জানাল। সতবন্ত সিং এর পরিবারেরও এমনই কাহিনি। ঘটনার পরেই তারা প্রচারে এল এবং দিব্যি ‘এম.পি.ও হয়ে গেল। সতবন্ত এবং কেহর সিং এর ফাঁসি হলেও গোটা পাঞ্জাবে তারা বিপ্লবী ও শহীদের সম্মান পেল! বেয়ন্ত সিং এবং সতবন্ত সিং-এর মৃত্যুতে সেই ‘অকাল তখতে’ ‘ভোগ’ও হল। ওদের পরিবারের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি দিল্লির বীরপুরুষেরা। পার্লামেন্টে ওদের স্থান নিয়ে কেউ প্রশ্নই তোলেনি। কেউ ওদের দিকে আঙুল তুলে বলেনি, “গদ্দারের বাপ-মা!”
অথচ আমরা কী পেলাম! যারা ষড়যন্ত্রের ত্রিসীমানায়ও ছিল না, সেই ‘মাসুম’ লোকগুলোর কী হল? যারা গুলি চালাল, তারা শহীদ। আর আমরা গদ্দার? ঐ বাহাত্তর ঘণ্টাতেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল যে ঐক্য নয়, ভারতবর্ষ ভেঙে আবার টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আর এবার দিল্লির মাটিতে বেঁচে থাকার অধিকার খোয়াল শিখেরা। এ কেমন দ্বিচারিতা! এ কেমন বিচার?
পয়লা নভেম্বরের ভোরে যখন ঘুম ভাঙল তখন চতুর্দিকটা কেমন যেন গুম্ মেরে রয়েছে। অসম্ভব একটা ভয়াবহ থমথমে পরিবেশ! কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। এমনকি অন্যান্যদিনের মতো আকাশবাণীর সেই মিষ্টি সুরটাও শোনা যাচ্ছিল না। শোনা যাচ্ছিল না সরবজিত আর আমনপ্রীতের নিত্যনৈমিত্তিক ‘তু তু ম্যায় ম্যায়।’ স্টোভের কেরোসিন তেল পোড়ার মনমাতানো গন্ধটা অবশ্য অন্যান্যদিনের মতোই ভেসে আসছিল, কিন্তু বেবের চুড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম না! মঙ্গলপুরীর শিখ কলোনিতে তখন থেকেই যেন মহাশ্মশানের নীরবতা কায়েম ছিল। ‘এমন নিস্তব্ধতা দমবন্ধ করে দেয়। একটা আট বছরের বালকও বুঝেছিল, এই নৈঃশব্দ একেবারেই স্বাভাবিক নয়। তবে সে এটা তখনও বোঝেনি যে এই নীরবতা মহাপ্রলয় আসার আগের ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা মাত্র!
বাপু সেদিন ঘরেই ছিলেন। আগের দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিল বলে আর বাইরে বেরোননি। আর বেরোতেনই বা কী করে? তাঁর অটো যে জ্বালিয়ে দিয়েছিল তথাকথিত দেশপ্রেমীদের ‘ভিড়’। বাপুর চিন্তিত, ফ্যাকাশে মুখে ভয়ের ছাপ দেখেছিলাম। কাল অনেক রাত অবধি তাওজির সঙ্গে নানারকম আলোচনা করছিলেন। গরীবের সংসারে একমাত্র রোজগেরে ‘বান্দা’র রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বড়োই বিপদ হয়। অটোটা কিনতে বেবের গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। তার সঙ্গে কিছু ধার-কর্জও ছিল। বেশিরভাগটাই চুকিয়ে দিলেও কিছু টাকা তখনও বাকি। তার ওপর যস্যিদিদির বিয়ের জন্যও প্রচুর খরচ হয়ে গিয়েছে। তার জন্য জমানো পুঁজি অনেকটাই খরচ হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে ধারও করেছিলেন বাপু। কিন্তু মাঝখান দিয়ে অটোটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেল, যস্যিদিদির বিয়েতেও বাধা পড়ল! তাঁর তো একুল, ওকূল-দুকূলই গেল। এখন কী করবেন তা তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কীভাবে দেনা শোধ করবেন, কীভাবে বাচ্চাদের মুখে দুটো রুটি তুলে দেবেন তা ভেবেই কূল পাননি। নতুন অটো কেনার মতো যথেষ্ট টাকাও নেই! আর তাওজি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বারবার বলছিলেন, “কোই না! সব ঠিক হয়ে যাবে। কয়েকটা দিন সময় দে। আমি তো আছি।”
যে যা-ই বলুক, গরীব অটোওয়ালার অটোটাই চলে গেলে যে সংসারের কী অবস্থা হয় তা একমাত্র বাপুই বুঝতে পারছিলেন। তাঁর প্রশান্ত মুখে চিন্তার রেখাগুলো দৃঢ় হয়ে বসে যাচ্ছিল। আমি জানি, তিনি সারারাত ঘুমোননি। খালি ঘরের মধ্যে ওঁর অশান্ত পদক্ষেপের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা গোটা রাত বাপু ছটফট করতে-করতে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলেন। যতবারই ঘুম ভেঙেছে, তাঁর ছায়া দেখতে পেয়েছি। হয়তো বা তিনি আরও বড়ো সঙ্কটের অশনিসঙ্কেত পেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা কেউ তা বুঝিনি। তিনি বুঝতেও দেননি।
কিন্তু তখন কে জানত যে পরের দিনই সেই মহাপ্রলয় মার মার করতে করতে ধেয়ে আসবে! ‘গুমসুম’ ভোর আস্তে আস্তে বেলার দিকে চলল। কলোনির প্রত্যেকের মুখেই চিন্তার ছাপ। কেউই ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। কালকের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছে যে এই পরিস্থিতিতে বাইরে বেরোনো বিপজ্জনক। অন্যান্যদিন বাড়ির পুরুষেরা নিজেদের কাজে বেরিয়ে যায়। আজ বেশিরভাগই যায়নি। তারা নিজেদের মধ্যেই চাপা গলায় আলোচনা চালাচ্ছে। কংগ্রেস সমর্থক ও ইন্দিরা গান্ধীর অন্ধভক্তদের রাগ এখনও কমেনি। যতক্ষণ না তাঁর পার্থিব শরীরের অন্ত্যেষ্টি হচ্ছে, ততক্ষণ হয়তো এই জনরোষ কমবেও না। এই কয়েকঘণ্টার মধ্যেই তাঁর শূন্য আসনে ইন্দিরারই সুপুত্র রাজীব গান্ধী বসেছেন। এখন তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী। গতকালই মায়ের মৃত্যুর পরই শপথ গ্রহণ করেছেন। রাজীবের শান্তিপ্রিয় ও ঠান্ডা মেজাজের ওপর ভরসা ছিল সবারই। অনেকেই বলাবলি করছিল, আজ যদি সঞ্জয় গান্ধী জীবিত থাকতেন তবে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত। সঞ্জয় অত্যন্ত প্রতিহিংসাপ্রবণ, বেপরোয়া ও গরম ‘দিমাগের’ মানুষ ছিলেন। কিন্তু রাজীব তেমন নন্। নয়তো এতক্ষণে দাঙ্গা লেগে যেত।
আমি সব টুকরো টুকরো কথাই শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে তখনও বিশেষ কিছু বুঝিনি। কে রাজীব, কে সঞ্জয় তাতে এক বালকের কিচ্ছু আসে যায় না। সে নিজের পরিবারের সঙ্গে আদরে, ভালোবাসায়, সুখাদ্য আর খেলায় মেতে থাকতে পারলেই খুশি। তার ‘ছুট্টি’ মঞ্জুর হলেও যস্যি দিদির বিয়েটা হল না, সেই দুঃখটা একটু ছিল।
কিন্তু বিয়ে শাদির আর কী! আজ হয়নি, কাল হবে। নভজ্যোত কিংবা যসমিত দিদি, কেউই পালিয়ে যাচ্ছে না। এই ইন্দিরাজি না কে একটা, তাঁর শেষকৃত্যের পরই সুযোগ সুবিধামতো বিয়েটাও হয়ে যাবে। তখন আমি নেচে নেচে ‘ঢোলকি’ বাজাব।
বেলা একটু গড়াতে-না গড়াতেই মঙ্গলপুরীর চরম নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ জাগ্রত হয়ে উঠল অনেক মানুষের কোলাহল। এমন শোরগোলের জন্য বোধহয় কেউই প্রস্তুত ছিল না। আমি নাশতা করে নিজের ঘরে বসে আপনমনেই ‘কঞ্চে’ খেলছিলাম। এই নানারঙের মার্বেলগুলো বড়ো প্রিয়। সরবজিত ওর মার্বেলের শিশিতে হাতই দিতে দিত না। ‘কঞ্চেতে ও ওস্তাদ। প্রচুর রং বেরঙের মার্বেল জমিয়েছিল ও। তবে আমনপ্রীত প্ৰাজি সেদিক দিয়ে দরাজ মনের। সে তার মার্বেল আমাকে দিত। নিজেও খেলে খেলে কিছু জমিয়েছিলাম। সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। গভীর মনোসংযোগে একটা মার্বেলকে সবে তাক করেছি এমন সময়ই আকস্মিক চিৎকার চেঁচামেচিতে চমকে উঠলাম। এখন কারা এমন চেঁচাচ্ছে। কেনই বা চেঁচাচ্ছে!
ঘরের জানলা খোলাই ছিল। সেদিকে চোখ পড়তেই একরাশ বিস্ময় ও ভয় আমাকে ঘিরে ধরল। এত ধোঁয়া কোথা থেকে আসছে! আর সে কী কটু গন্ধ! নাকে এসে ঝাপটা মারতেই যেন দমবন্ধ হয়ে এল। এ তো স্বাভাবিক কাঠ-পাতা বা আবর্জনা পোড়ার গন্ধ নয়! কী পুড়ছে তবে?
“বাঁ-চা-ও…বাঁ-চা-ও।” একজন নয়, দু-জন নয়, হঠাৎই একরাশ কণ্ঠের আর্তচিৎকার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে কাঁপিয়ে দিল গোটা মঙ্গলপুরী, “সানু বাঁ-চা-ও!”
এ কলোনির প্রত্যেকেই কৌতূহলে ও সভয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখল একদল শিখ নর-নারী প্রাণপণে দৌড়োতে দৌড়োতে আসছে এদিকেই। তাদের মধ্যে কেউ রক্তাক্ত, কেউ আহত! কারোর আবার হাতে পায়ে পুড়ে যাওয়ার দাগ। ভয়ে, নিঃসীম আতঙ্কে সবার চোখ বিস্ফারিত। মুখ কান্নাবিকৃত! চেঁচাতে চেঁচাতে, কাঁদতে কাঁদতেই চেঁচাচ্ছে, “আমাদের বাঁচাও…!”
“কী হৈয়া!…কী হয়েছে হ্যাঁ?”
সবার মধ্য থেকে সরতাজই এগিয়ে গেল তাদের দিকে। বাপুজিও দৌড়ে গেলেন ক্ষতবিক্ষত মানুষগুলোর কাছে। জানতে চাইলেন, “এ কী অবস্থা! কী করে হল?” উত্তরে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে তাদের এই অবস্থার কারণ বলতে শুরু করল। সেই শোরগোলের মধ্য থেকেই টুকরো টুকরো বাক্য ভেসে আসল কানে। শুনলাম, ওরা বলছে, “ওরা চারদিকের সবক’টা গুরুদ্বারায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে পা-জি। আগুন লাগিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। যে শিখেরা ভেতরে ছিল, তারা ‘জিন্দা’ পুড়ে মরেছে। গ্রন্থীজিকেও ধরে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমরা বাইরে ছিলাম। আমাদেরও মেরে ফেলত। কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছি!”
ওদের মধ্যেই এক নারী কখনও অঝোরে কাঁদছে, কখনও থেকে থেকে ফিট পড়ছে আবার কখনও বা কপালে করাঘাত করতে করতে বিলাপ করছে, “আমার মরদ আর পুত্তরটা চোখের সামনে জিন্দা জ্বলে গেল ঈশ্বর… আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না। ‘রবজি’ এ তোমার কেমন বিচার?… তোমার সামনে ওদের পুড়িয়ে মারল শয়তানরা! আমি শুধু ওদের চিৎকার শুনতে পেলাম… ওরা প্রাণপণে দরজা ধাক্কাচ্ছিল আর চেঁচাচ্ছিল! ওরা… আরও শয়ে শয়ে মানুষ… বাঁচার জন্য আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছিল… বেরোনোর জন্য দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিল… কিন্তু কিচ্ছু হল না!…আমি এখনও সেই চিৎকার শুনতে পাচ্ছি… এখনও সেই চিৎকার… হায় রব্বা!”
বলতে বলতেই সে অবশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কলোনির মেয়েরা তাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ততক্ষণে উগ্র কটু গন্ধ আর ধুমকুণ্ডলীতে ঢেকে গিয়েছে মঙ্গলপুরীর আকাশ! দিনের বেলাতেই বুঝি রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে! ধোঁয়ার মধ্যে নিঃশ্বাস নেওয়াও দায়। পরিস্থিতি বুঝে গোটা এলাকা উত্তেজিত ও ভয়বিহ্বল হয়ে উঠল। এই শিখের দল একদম অচেনা নয়। ওরা পাশের কলোনিরই মানুষ। ৩১ নম্বর ব্লকে থাকে সবাই। তবে এতটাই আহত ও রক্তাক্ত যে ঠিকমতো চেনা যাচ্ছিল না। ওদের মধ্যেই একজন ক্ষতবিক্ষত সর্দারজি মাথার জখম চেপে ধরে কোনোমতে বলল, “লোহার রড, চাকু, তরোয়াল আর কেরোসিন-গ্যাসোলিন-ডিজেল, ‘সফেদ পাউডার’ নিয়ে নেমে পড়েছে ওরা! হাতে জ্বলন্ত মশাল। যে সর্দারজিকে হাতের কাছে পাচ্ছে, তারই লাশ ফেলে দিচ্ছে। জগদীশ টাইটলার আর এইচ কে এল ভগতের পেটোয়া আদমি ওরা। শুনেছি, গান্ধীনগরেও শিখদের বস্তি ধরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সুলতানপুরীকেও ঘিরে ধরেছে। পুরো কলোনিকে ঘিরে পাহারা দিচ্ছে, যাতে কেউ পালাতে না পারে। সুলতানপুরী থেকে যাতে কেউ ঢুকতে বা বেরোতে না পারে সেজন্য তরোয়াল হাতে ‘নাকাবন্দি’ করেছে। নারা দিচ্ছে, ‘খুন কা বদলা খুনসে লেঙ্গে…!’ ওরা আমাদেরও মারবে… আমাদের ঘরের দিকেও আসবে। ইন্দিরাজির ‘মওতের’ বদলা আমাদের থেকে নেবে। আমাদের বাঁচাও!”
এই পরিস্থিতিতে কে কাকে বাঁচায়। সেদিন উপস্থিত সব শিখ নারী-পুরুষের মুখ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তারা নিজেরাই কী করবে, কীভাবে নিজেদের বাঁচাবে সেটাই বড়ো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার আশ্রয়প্রার্থীদেরও ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা মানুষ বুঝেছিল যে ‘দাঙ্গাই’রা যে-কোনোমুহূর্তে এখানেও এসে পৌঁছবে। এবং তাদের নিষ্ঠুরতার যা বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে তাতে প্রায় সবারই রক্তহিম হয়ে যায়। কিন্তু সরতাজের ‘ফৌজি খুন’ টগবগিয়ে উঠল। সে বলল, “খুন কা বদলা খুন! বললেই হল। দেশে পুলিশ আছে, ফৌজি আছে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংই একজন শিখ। তিনি এয়ারফোর্স, নেভি ও আর্মিবাহিনীর প্রধান ও সর্বোচ্চ কম্যান্ডার। তিনি কিছু করবেন না?”
“তাঁর কিচ্ছু করার নেই পাজি।” একজন আহত মানুষ ক্ষুব্ধস্বরে বলে উঠল, “তুমি কি রেডিওতে সমাচার শোনোনি? ত্রিলোকপুরীতে কী হয়েছে জানো না? ওখানে আজ সকাল দশটা থেকেই তাণ্ডব হচ্ছে। তিনশো-চারশো লোকের ভিড় ব্লক নম্বর ছত্রিশের সামনে গুরুদ্বারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। যারা গুরুদ্বারা জ্বালিয়েছে তাদের মধ্যে তোমার পুলিশও ছিল। ওরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ত্রিলোকপুরীর অবস্থা খুব খারাপ। ঈশ্বরই জানেন ওখানে আর কী কী হচ্ছে আর এখানে কী হবে!”
“আর জ্ঞানী জৈল সিংই বা কী করবেন?” এবার বাপুজিই মুখ খুললেন, “কাল তো তাঁরই ‘কাফিলা’র ওপরে দু-বার হামলা করেছিল দাঙ্গাইরা। ‘কমল’ সিনেমার সামনে তাঁরই কনভয়ের ওপর মশাল ছুড়েছে। এইমসের সামনে পাথরও ছুড়েছে।
অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছেন তিনি। ওদের একটাই কথা, ‘সর্দার গদ্দার হ্যায়।” কিন্তু সরতাজ কিছুতেই হার মানবে না। চিরকালই তার ‘জোশ’ অন্যান্যদের থেকে বেশি। সে বলল, “এত সহজ! আমরাও এ দেশেরই বান্দা। এতদিন ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আছি। ভারতীয় আর্মির গর্ব শিখ রেজিমেন্ট। আমরা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছি, গুলি খেয়েছি, সে কি গদ্দার বলে? এক্ষুনি চলো তো থানায়। আমিও দেখে নেব, কোন্ শালার তরোয়ালে কত জোর।”
“একদম না পা’জি।” আক্রান্তদের মধ্যেই আর একজন মুখ খুলল, “পুলিশকেও বিশ্বাস নেই। সুলতানপুরীর ব্লক বি টু’র পার্কে আন্দাজ পাঁচশো-ছশো লোকের জমায়েত হয়েছিল সকালেই। আমি নিজের কানে শুনেছি, স্বচক্ষে দেখেছি। ওখানে কংগ্রেস নেতা সজ্জনকুমার একেবারে গরমাগরম স্লোগান দিয়েছে, “সিখোঁ কো কাটো, মারো, আগ লগা দো…!” এমনকি এ কথাও বলেছে যে রওশন সিং আর ভাগ সিংকে যে মারবে তাদের সবাইকে নাকি একহাজার টাকা করে বকশিশ দেবে। অন্যান্য শিখদের মারলে পাঁচশো টাকা দেওয়া হবে। শিখদের মাথার বকশিস স্বয়ং সরকারই দিচ্ছে। তবু তুমি পুলিশের কাছে যাবে?”
“নয়তো কি চুপচাপ বসে থাকব?” সরতাজ গর্জে ওঠে, “অপেক্ষা করব যে কখন ওই পাঁচশো-ছশো লোক এখানে এসে আমাদের মারবে কাটবে-জ্বালাবে? তাছাড়া কয়েকজন কংগ্রেসি নেতার জন্য গোটা সরকারকেই সন্দেহ করা উচিত নয়। আমি এক ‘টপ লেভেলের’ আর্মি অফিসারকে চিনি। তিনি জ্ঞানী জৈল সিং-এর ‘করিবি’, ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। চলো, আমরা তাঁকেই গিয়ে ধরি। তার সঙ্গে পুলিশেও ‘রপট’ লেখাব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই রায়ট বেশিক্ষণ চলবে না। জ্ঞানীজি বা রাজীবজি মিলিটারি নামিয়ে দিলেই দাঙ্গাইরা সরে পড়বে। চলো, চেষ্টা তো করি।”
তখনও শিখদের মনে বিশ্বাস ছিল যে রাজীব গান্ধীর সরকার তাদের বাঁচাবে। তাদের ধারণা ছিল, এটা নিতান্তই একটা ছোটোখাটো দাঙ্গা। দেশের আইন-প্রশাসনের ওপর ভরসাও ছিল। সকলেই বিশ্বাস করতে চাইছিল যে এসব বেশিক্ষণ চলবে না। একটু পরেই রাস্তায় নামবে আর্মি। গোটা শহর স্তব্ধ হয়ে যাবে। তার সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যাবে এই হত্যালীলাও। সরতাজ নিজেই আর্মির লোক হওয়ার দরুণ ভারতীয় আর্মির প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা দুই-ই তার মনে ছিল। তারই নেতৃত্বে মঙ্গলপুরীর সমস্ত শিখেরা চলল নিকটবর্তী পুলিশ চৌকির দিকে। আমিও চুপচাপ বাপুর পেছন পেছন যাচ্ছিলাম। সরতাজ আমায় দেখে ভুরু কোঁচকালো, “ক্কাকে, তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
আমার পক্ষে তখন দাঙ্গা শব্দটার অর্থ বোঝা সম্ভব ছিল না। শুধু বুঝেছিলাম বিভিন্ন জায়গায় শয়ে শ’য়ে লোকের জমায়েত হচ্ছে। ওই যেমন বৈশাখীর মেলায় হয়। কিন্তু তার সঙ্গে গুরুদ্বারা পুড়ে যাওয়া বা এইসব আহত মানুষদের সম্পর্ক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওদের কথোপকথন শুনেও নির্বোধ বালক বুঝে উঠতে পারেনি যে এটা ‘বৈশাখী’র মেলা নয়। ঐ আট বছরের শিশুর স্বপ্ন ছিল সরতাজের মতো জওয়ান অথবা পুলিশ হওয়ার। সে দেশসেবা করতেই চাইত যেমন ভগৎ সিং করেছেন, সর্দার উধম করেছেন। কিংবা সারাগঢ়ির সিপাইরা করেছে। সিপাই বা পুলিশ তার চোখে নায়কের সমান। সেজন্য সবাই পুলিশ চৌকি যাচ্ছে শুনে সেই শিশুরও সাধ হয়েছিল পুলিশ স্টেশন দেখার! আমি সহজভাবেই বললাম, “আমিও তোমাদের সঙ্গে পুলিশ চৌকি যাব। বড়ো হয়ে আমিও পুলিশ হব, দেশের ফৌজি হব। দেশের জন্য জান দেব।”
সরতাজ নির্ঘাৎ সেদিনও মনে মনে বলেছিল, ‘গবেট!’ কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। পুলিশ আর ফৌজি দুটোই যে একসঙ্গে হওয়া যায় না সেটাও অপদার্থ শিশু জানত না। সে সস্নেহে আমার পাগড়িতে টোকা মেরে বলল, “নিশ্চয়ই হবি ক্কাকে। কিন্তু তার জন্য যে সাহসী হতে হবে। তুই সাহসী? হিম্মত আছে তোর?” আমি বুক ফুলিয়ে বললাম, “আলবাৎ আছে।”
“তাহলে প্রমাণ কর।” সে ঝুঁকে পড়ে নীচু গলায় বলল, “দ্যাখ, কতগুলো দুষ্টু লোক আমাদের আর আমাদের ভাই-বোনদের মারতে আসছে। আমরা তাই থানায় যাচ্ছি। কিন্তু এই কলোনি আর তোদের ঘর, দিদি, বেবে আর বাকি মেয়েদের পাহারা দেবে কে? তাদেরও তো রক্ষা করতে হবে, তাই না?”
“বিলকুল।”
“তাহলে এই ছোটা সর্দার কি কলোনি রক্ষা করতে পারবে? আমরা যতক্ষণ না ফিরে আসছি, এই গড়ের সিপাহী হতে পারবে? হিম্মত আছে? তাকত আছে?” “হাঁ জি। আছে।” আমি কাঠি কাঠি হাতের মাসল্ ফোলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম, “রোজ আমি ইয়াব্বড় গ্লাসে দুধ খাই যে! তোমরা যাও, আমি কলোনি পাহারা দেব। কোনো দুশমনকে ঢুকতে দেব না।”
“সাব্বাশ। এই না হলে শিখের বাচ্চা।” সে আমার পিঠ থপথপিয়ে বলল, “যতক্ষণ না আমরা ফিরে আসছি, ততক্ষণ বীর নান্না সিপাহীরা সবাই বেবে আর দিদিদের পাহারা দেবে। তাদের একা ছেড়ে নড়বে না। তুই একজন সাচ্চা শিখ। শিখেরা সবসময় মেয়েদের যত্ন করে, সম্মান করে আর তাদের রক্ষা করে। তুই-ও করবি। কোই শ-ক্?”
“না জি!”
বাপু আর সরতাজ গোটা ভিড়কে নিয়ে পুলিশের সাহায্যপ্রার্থনা করতে গেল। আমি, সরবজিৎ আর আমনপ্রীত বাড়িতেই পাহারায় রইলাম। আমাদের হাতে কোনো তরোয়াল ছিল না। খঞ্জর, কৃপাণ, চাকু—এসব চালানোর অভিজ্ঞতাও নেই। থাকার মধ্যে ছিল শুধু কয়েকটা লাঠি। সেগুলোই হাতে নিয়ে শিশুবাহিনী কলোনি পাহারা দিতে শুরু করল। ওখানে যে ক-জন ছেলেপুলে ছিল তাদের প্রায় সবারই আদর্শ ছিল সরতাজ। তাই তার কথাকেই আদেশ হিসাবে মেনে নিয়ে বাচ্চারা সবাই নিজেদের পরিবারের মেয়েদের আগলে বসে রইল।
তখন মেয়েদের চোখে অসম্ভব ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা ফুটে উঠেছে। কলোনির গরীব মানুষদের সবার বাড়িতে রেডিওই ছিল না, টিভি তো দূর। একমাত্র নভজ্যোতদের বাড়িতে একটা সাদাকালো টিভি ছিল। গোটা কলোনিই প্রায় উপছে পড়ল ওদের বাড়িতে পরিস্থিতি দেখা বা শোনার জন্য। কিন্তু যত শুনছে, দেখছে এবং বুঝছে ততই আতঙ্কে কাঁপছে। আমিও শুনতে পাচ্ছিলাম সে খবর। টিভির পর্দায় দেখছিলামও। মোটামুটি চতুর্দিকে দৃশ্য একই। আচমকাই কোথা থেকে শ’য়ে শ’য়ে লোক এসে হাজির হচ্ছে। শিখ পুরুষদের কচুকাটা তো করছেই। তাদের গলায় জ্বলন্ত টায়ার পরিয়ে দিচ্ছে। এমনকি মেয়েদেরও ছাড়ছে না। তাদের ধরে ধরে গণহারে ‘বলাৎকার’ করা হচ্ছে। বাধা দিতে গেলে তরোয়াল দিয়ে পেট কেটে নাড়ি-ভুঁড়ি সব বের করে, তারপর গ্যাংরেপ করছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ত্রিলোকপুরীর। ওখানে এই হিংস্র ভিড় শিখদের কেটে টুকরো টুকরো করে তাদের মৃতদেহের ওপর কেরোসিন তেল ছড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বিধবারা তাদের প্রিয় মানুষদের মৃতদেহ তো দূর, ছাইটুকুও খুঁজে পাচ্ছে না! সঙ্গে সঙ্গে জ্বলছে তাদের ঘরও! হুড়হুড়িয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। একশো… দেড়শো…দুশো…!
সুলতানপুরীর মতো ত্রিলোকপুরীকেও শত্রুপক্ষ বেড় দিয়ে ঘিরে রেখেছে। ওই জ্বলন্ত শ্মশানভূমি থেকে বেরোনোর কোনো উপায়ই নেই। আর দাঙ্গাইরা একসঙ্গে সবাইকে মারছে না। একটু একটু করে, এক একটা ঘর ধরে ধরে, শিখদের বেছে বেছে মারছে। মেরে মেরে যখন নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন সাময়িক বিরতি দিচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসেই ফের ‘কতল-এ-আম্’ চালাচ্ছে। ভয়ার্ত, হতভাগ্য মানুষগুলো বুঝতে পারছিল যে তাদের রক্ষা নেই। কিন্তু পালাবার পথ কই! যে রাস্তা দিয়েই পালাতে যাচ্ছে, সে রাস্তাতেই যমদূতরা অস্ত্র-শস্ত্র, জ্বালানি তেল, জ্বলন্ত টায়ার নিয়ে উপস্থিত। খুল্লা সড়কে কত শিখকে এমন দৌড় করিয়ে করিয়ে মারল তার হিসেব নেই। এমন নয় যে ত্রিলোকপুরীর বাসিন্দারা সবাই শিখ। ওদের মধ্যে কয়েকঘর হিন্দু কিংবা মুসলিমও ছিল। অথচ তাদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি। ভিড় কোনো হিন্দু বা মুসলিমের ঘরে ঢোকেনি পর্যন্ত। তখনও বুঝিনি কোন্ যাদুতে ওরা অতবড়ো জনবহুল এলাকায় শুধুমাত্র শিখদেরই বেছে নিচ্ছিল। কী করেই বা জানছিল যে ঠিক কোথায়, কোন্ শিখ পরিবার বাস করে!
বেবে আর দিদির অবস্থা দেখে এই প্রথম আমিও ভয় পেয়ে গেলাম! বেবে উচ্চস্বরে কাঁদছিল আর বলছিল, “ওরা আমাদেরও মারবে! কেউ বাঁচবে না! আমার ছোটো ছোটো তিনটে ছেলে, জীবনের কতটুকুই বা দেখেছে। মেয়েটা বিয়ের স্বপ্ন দেখছিল, ওর সামনে গোটা জীবন-যৌবন। সবাইকে ওরা মেরে ফেলবে? তার চেয়ে রবজি, আমায় মেরে ফেলো, ওদের ‘বখশ’ দাও।”
যস্যিদিদি উচ্চস্বরে না কাঁদলেও তার চোখ বেয়েও জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছিল। বাকি মেয়েদেরও অবস্থা শোচনীয়! আট বছরের জীবনে এই প্রথম আমিও জানলাম যে ভয় কাকে বলে! একটু আগেই যে বালক সাহসী ফৌজি হওয়ার দাবি করছিল, সে নিঃসন্দেহে সাহসী ছিল। শুধু একটা জিনিসই জীবনে কখনো টের পায়নি। মৃত্যুভয়! না, ঠিক মৃত্যুভয়ও নয়। তার চেয়েও বড়ো একটা আতঙ্কের মুখোমুখি সেদিন আমি হয়েছিলাম। তা হল নিজের অবধারিত মৃত্যুকে দেখতে পাওয়া! একটা মানুষের সামনে যদি আকস্মিকভাবে মৃত্যু এসে দাঁড়ায়, তবে সে আতঙ্কিত হওয়ার বিশেষ সময় বা সুযোগও পায় না। মরণযন্ত্রণাও তুলনামুলকভাবে সংক্ষিপ্ত। কিন্তু আমরা সবাই জানতাম আমাদের ‘কাল’ ঠিক কোথা দিয়ে আসবে বা আসছে। ওই তিনশো মিটার লম্বা গলি দিয়ে ওরা আসবে! এ-ও জানতাম এই মৃত্যুফাঁদ থেকে বেরোনোর উপায় নেই। কোথায় যাব? কোথায়ই বা যেতে পারতাম? গোটা দিল্লিই যে জ্বলছে। গোটা শহরে এমন কোনো জায়গা ছিল না যেটা শিখদের জন্য নিরাপদ। তার সঙ্গে ঘিরে ছিল প্রবল অনিশ্চয়তা। শিয়রে শমন ঘনিয়ে আসছে তা জানা ছিল, তবে তা কখন এসে পড়বে তা জানতাম না। ফলস্বরূপ আমরা প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে মরছিলাম! এক একটা অনিশ্চিত লহমা আমাদের গায়ে জ্বলন্ত মশালের মতো ছ্যাঁকা দিয়ে যাচ্ছিল। হলফ করে বলতে পারি, ওই মুহূর্তে আমাদের প্রত্যেকের সবক-টা ইন্দ্রিয় আরও অনেক বেশি প্রখর, অনেক বেশি ‘চৌকন্না’ হয়ে গিয়েছিল। সামান্য শব্দ পেলেও সবাই আতঙ্কে নীল হয়ে যাচ্ছে! কোনোরকম পদধ্বনি শুনলে মনে হচ্ছে, ‘ওই… ওরা আসছে।’ একটু একটু করে ধোঁয়া আর পোড়া দুর্গন্ধ বাড়ছে! বুঝতে পারছি আশেপাশেই কোনো ঘর বা গুরুদ্বারা পুড়ছে। কোথাও শোরগোলের আওয়াজ শুনতে পেলেও সবাই ভাবছে, তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল বুঝি!
ওই এক-একটা সেকেন্ড আমার বয়েস একটু একটু করে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমার ভাবনাচিন্তার গণ্ডি আস্তে আস্তে প্রসারিত হচ্ছিল। আমি টেলিভিশনে দাঙ্গার বীভৎস রূপ দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—একই সময়ে,; একই সঙ্গে এতগুলো জায়গায় আলাদা আলাদা লোকের ভিড় কীভাবে উপস্থিত হচ্ছে? এত শয়ে শয়ে, হাজার হাজার ‘খুংখার’ লোক আদতে আসছে কোথা থেকে! তারা এত অস্ত্রশস্ত্রই বা পায় কী করে? এটা কি আদৌ কিছু ক্রুদ্ধ দেশবাসীর হামলা হতে পারে? সাধারণ দেশবাসী কি ঘরে তরোয়াল, জ্বলন্ত টায়ার, লোহার রড মজুত করে রাখে। যদি না রাখে, তবে এরা কারা? তাহলে কি গোটা দেশের মানুষই একজোটে শিখ প্রজাতিকে ধ্বংস করতে চায়? নাকি এ কারোর সুচিন্তিত পরিকল্পনা। একদম ঠান্ডা ও পাকা মাথার ষড়যন্ত্র!
তখন অবিকল এভাবেই ভাবিনি। কিন্তু এমনই কিছু একটা ভেবেছিলাম। মেয়েদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল। হিমশীতল আতঙ্ক ওদের গ্রাস করে নিচ্ছিল। আর আমার রক্ত গরম হয়ে উঠছিল। হাতে ধরা লাঠিটা আরও শক্ত করে কষে ধরেছিলাম। আমার চোখের সামনে বেবে, যস্যিদিদি, আমনপ্রীত, সরবজিৎ সহ সকলেই তখন থেকেই একটু একটু করে মরতে শুরু করেছিল। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয়ের নিষ্ঠুর ছুরি ওদের বুকের ভেতরটা কুপিয়ে যাচ্ছিল। সে যন্ত্রণা বলার নয়, সে রক্তক্ষরণ দেখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায় যে ওরা সশরীরে মরার আগেই বীভৎস মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে।
আমার বুকের মধ্যে জোরে জোরে কে যেন নাগাড়া বাজাচ্ছিল। না, এ খুশির বা উৎসবের নাগাড়া নয়। বরং যুদ্ধের সরব ঘোষণা। ঠিক করেছিলাম, এখনই যদি ওরা এসে পড়ে, তবে মরার আগে কয়েকটাকে মেরেই মরব। আর কিছু না পারি মাথা ফাটিয়ে দেব। বাবা বলেছেন, আমিও ‘জিদ্দি শিখ।’ জিদ্দি শিখের বাচ্চা কী করতে পারে তা দেখিয়ে তবেই ছাড়ব। আবার পাশাপাশি ভীষণ কান্নাও পাচ্ছিল। বেবে, দুই প্রাজি, দিদি, ওদের কি তবে এই শেষবারের মতো দেখছি? জীবন ছোটো আর অনিশ্চয়তায় ভরা তা বাপু বলতেন ঠিকই। কিন্তু এত ছোটো? মাত্র আটবছর? “পরজাইজি… পরজাইজি…!”
এতক্ষণ ঘরের মধ্যে মেয়েদের চাপা কান্নাকাটির আওয়াজই শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎই কলোনির এক বাসিন্দা, কর্তার সিং সব ছাপিয়ে উচ্চস্বরে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে দৌড়ে এল। সে প্রচণ্ড উত্তেজিত। উত্তেজনায় প্রায় কথাই বলতে পারছিল না। মেয়েরা সবাই, বিশেষ করে বেবে আর নভজ্যোতের মা জানতে চাইল, “কী হয়েছে?”
কর্তার সিং রেলস্টেশনে ‘সামোসা’ আর লস্যির একটা ছোট্ট স্টল লাগায়। আজও হয়তো লাগিয়েছিল। কোনোমতে বলল, “এইমাত্র রোক্ থেকে একটা ট্রেন এসেছে ভাবি! সেটা থেকে হাজার হাজার দাঙ্গাই লোহার রড, তরোয়াল আর সাদা পাউডার নিয়ে নামছে। ট্রেনের ভেতর থেকে একের পর এক সর্দারদের লাশ বের করছে ওরা। আমার চোখের সামনেই তিনটে বীভৎস কাটা লাশ ট্রলিতে চাপিয়ে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে ‘ছুপছুপাকে’ পালিয়ে এসেছি, কিন্তু আমার স্টলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।”
আমার অপরিণত মস্তিষ্কও সেদিন বুঝতে পেরেছিল যে এই ভিড় শুধু সাধারণ জনতার নয়। যারা প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে শোকার্ত তারা এমন ‘দরিন্দগি’ কীভাবে করতে পারে! এ শোকার্ত মানুষের রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে দুষ্কৃতীরা একইভাবে আক্রমণ চালাচ্ছিল, তা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ভিড়ের পক্ষে সম্ভব নয়। কর্তার সিং সেই সন্দেহকেই বাস্তব রূপ দিল। সে জানাল, “এদের স্পেশাল ট্রেন করে নিয়ে এসেছে দিল্লি সরকার। শুধু ট্রেন নয় পরজাইজি, স্টেট বাসে করেও নাকি সব আসছে। দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের সবক-টা বাসকে দাঙ্গাইদের জন্য নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুনলাম, জেলের পেশাদার খুনি আর রেপিস্টদের ও নাকি এই কাজের জন্য বহাল করা হয়েছে। স্পেশাল ট্রেন আর বাসে ভরে ‘হাথিয়ার’ সমেত ওদের আমদানি করা হচ্ছে। আর সবকিছুর নেপথ্যে খোদ আমাদেরই সরকার!”
“কী বলছ।” বেবে কাতরস্বরে বলল, “এ অসম্ভব। রাজীব গান্ধী এমন করতেই পারেন না। তাছাড়া খোদ জ্ঞানী জৈল সিং এ দেশের রাষ্ট্রপতি। একজন শিখ হয়ে উনি শিখদের বাঁচাবেন না?”
বেবের তখনও ভারতবর্ষের সরকার ও জনগণের ওপর অটুট বিশ্বাস। কিন্তু তিনি তখনও অনেক কিছুই জানতেন না। আমরাও জানতাম না। জানলাম, যখন বাপু, সরতাজ সহ গোটা সর্দারদের দল হতাশভাবে, শূন্য হাতে ফিরে এল। ওদের ঘর্মাক্ত, ভয়ার্ত, হতাশায় ফ্যাকাশে মুখই বলে দিচ্ছিল যে পুলিশরা কোনো সাহায্যই করেনি। বাপু কোনো কথা না-বলে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। সর্দাররা ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু কারোর মুখে কোনো কথা নেই। মেয়েরা বারবার উদ্বেগে প্রশ্ন করছে, “কী বলল পুলিশ? ওরা কি আমাদের বাঁচাতে আসছে?…জ্ঞানীজির সঙ্গে কথা কিছু হল? কী বললেন উনি?…সব ঠিক হয়ে যাবে, তাই না?…আমি কখন নামবে…?”
সরতাজ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষ পর্যন্ত বলল, “আর্মি নামবে না পরজাইজি। কেউ আমাদের বাঁচাতে আসবে না।”
“মতলব?” বেবের মাথায় কিছুই ঢোকেনি, “কেন আসবে না?”
সরতাজ কিছু বলার আগে নিজেকেই বোধহয় একটু গুছিয়ে নেয়। সে নিজেই অটুট বিশ্বাসে পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিল। চেষ্টা করেছিল আর্মির এক বড়ো শিখ অফিসারের মাধ্যমে জ্ঞানীজির সঙ্গে যোগাযোগ করার। কিন্তু এখন তার ‘হুলিয়া’ দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে সে বিশ্বাস তার চুরমার হয়ে ভেঙে গিয়েছে। কোনোমতে আঘাতটা সামলে নিয়ে সে যা জানাল তাতে উপস্থিত ভিড়ের শেষ আশাটুকুও বুঝি ধুক করে নিভে গেল!
প্রথমেই সরতাজরা গিয়ে পৌঁছেছিল পুলিশ চৌকিতে। সেখানে কয়েকজন ‘হাবলদার’ আর অফিসার বসে নিজেদের কাজ করছিল। সমবেত শিখদের দেখেও তারা কোনোরকম উচ্চবাচ্য করেনি। গোটা কলোনিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সরতাজ আর আমার বাপু। ওঁরা যখন দিল্লির এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কথা বলে সাহায্যপ্রার্থনা করলেন তখন থানার ‘দারোগাজি’ শান্তস্বরে বললেন, “এসব ‘আফওয়া’, গুজব কে রটাচ্ছে? এখানে কোনো অশান্তি নেই পা’’জি। সব আন্ডার-কন্ট্রোল। তোমরা বাড়ি যাও-লস্যি টস্যি খাও। চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
বলাই বাহুল্য ওদের সঙ্গে আক্রান্ত শিখরাও ছিল। তারা যখন সমস্বরে প্রতিবাদ করতে শুরু করল, তখন দারোগাসাহেব যেন একটু রেগেই গেলেন, “আরে, দাঙ্গা হচ্ছে বললেই হবে? কই, আমরা তো কিছু শুনিনি। তেমন কিছু চোখেও পড়েনি। তোমরা নিজেরা মাথাগরম পাবলিক, অল্পেপ্পতেই লাঠিসোঁটা নিয়ে মারামারি শুরু করে দাও। এসব তোমাদের নিজেদেরই ‘কর্তৃত।’ এখন দাঙ্গাইদের দোষ দিলে হবে?”
সরতাজের মাথায় ফের রক্ত চড়ে যায়, “আপনি স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন ওরা আহত! কীভাবে হাত পা পুড়ে গিয়েছে। তারপরও এফ.আই.আর. লিখবেন না? মঙ্গলপুরীর চারপাশের সবকটা গুরুদ্বারা জ্বলছে। সেখানে লুটপাট, খুন সব হচ্ছে। সেগুলোও কি আমরাই জ্বালিয়েছি? নিজেরাই নিজেদের গ্রন্থীকে মেরে নিজেদেরই ঈশ্বরের ঘর লুট করেছি? আমাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা আপনাদের ডিউটি! অথচ আপনি বলছেন, সব আন্ডার-কন্ট্রোল…!”
অফিসার তার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “তুই আমাদের ডিউটি শেখাচ্ছিস? যাঃ! লিখব না এফ.আই.আর.। কী করবি? ক্যায়া উখাড় লেগা মেরা? তাছাড়া কীসের এফ.আই.আর.? যখন কোথাও কিছু হয়ইনি, শহরে শান্তি কায়েম আছে, তখন খামোখা এফ.আই.আর. লিখতেই বা যাব কেন? দু-চারটে গুরুদ্বারা জ্বলেছে তো কী হয়েছে! কত মন্দির, মসজিদ রোজ ভাঙছে, জ্বলছে তার ঠিক নেই, আমরা সব কাজ ফেলে কি এখন থেকে মন্দির, মসজিদ, চার্চ, গুরুদ্বারার সামনে ডিউটি, দেব! ওসব কোনো রিপোর্ট-টিপোর্ট, এফ.আই.আর. লেখা হবে না। চলতা বন্!” সে আরও কিছু বলতেই যাচ্ছিল। নিয়ন্ত্রণহীন রাগে, ক্ষোভে নির্ঘাত তেড়েফুঁড়ে গালাগালিই দিয়ে দিত। তার আগেই আহত শিখদের মধ্যে একজন তার কানে ফিশফিশ করে বলল, “পাজি, একটু তফাতে চলো। কথা আছে।”
সরতাজ তার আক্রোশ তখনকার মতো সামলে নিয়ে সেই লোকটির সঙ্গে একটু নিভৃত কোণে সরে গেল, “কী গল্ হ্যায়? দস্যো….!”
“পাজি, এই দরোগাসাবকে আমি চিনতে পেরেছি।” লোকটি সন্তর্পণে জানায়, “যখন গুরুদ্বারা জ্বালানো হচ্ছিল, সেই ভিড়ে এই লোকটাও ছিল!”
সরতাজের পায়ের তলা থেকে বুঝি মাটি সরে যায়। কোনোমতে বলল, “তুমি ঠিক দেখেছ? কোনো ভুল হচ্ছে না তো?”
“কোনো ভুল হয়নি।” সে বলে, “ও প্রথমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। তারপর শিখরা যখন জ্বলন্ত গুরুদ্বারা থেকে বেরিয়ে আসার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছিল, তখন এই কুত্তার পিল্লা দলবল নিয়ে তাদের লাঠিপেটা করে, গুলি মারার ভয় দেখিয়ে ফের গুরুদ্বারার ভেতরে যেতে বাধ্য করেছিল। যারা আগুনে জ্বলতে জ্বলতে বাঁচার আশায় বাইরে ছুটে আসছিল, তাদের শ্যুট করেছে। আমরা বাধা দিতে গিয়েছিলাম। তখনও এই শালাই আমাদের পুলিশি ডান্ডা দিয়ে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আমি নিজের নাম ভুলে যেতে পারি, কিন্তু এই মুখ কোনোদিন ভুলব না। এই সেই শয়তান। আর ওর সঙ্গে ‘হাবলদারগুলোও ছিল।”
সরতাজের মনে হল, এই মুহূর্তে তার গোটা বিশ্বটা যেন কোনো বাস্তবের পাথরের ধাক্কায় কাচের ঘরের মতো ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়ল। যে দেশের আইন-কানুনের ওপর তার ভরসা ছিল, আজ সেই দেশই প্রতিহিংসায় মত্ত হয়ে উঠেছে। যে রক্ষকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা, সে যদি নিজেই ভক্ষক হয় তবে অসহায় মানুষ নিরাপত্তা কোথায় খুঁজবে! তার চতুর্দিকটা তখন কাঁপছে! রণক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হয়েও সে এত বিচলিত হয়নি, যতখানি আজ হচ্ছে।
বাপু তখনও দারোগাসাহেবের কাছে নম্র কণ্ঠে অনুনয় বিনয় করছিলেন। কিন্তু লোকটার সেই একই কথা, “কোথাও কিছু নেই, খামোখা এফ.আই.আর. করব কেন? প্রোটেকশনই বা কীসের? এখানে কোনো দাঙ্গা হচ্ছে না। তোমরা বাড়ি যাও।”
সরতাজ এবং বাপু স্পষ্ট বুঝেছিলেন, পুলিশ তাদের এফ.আই.আর. নেবে না! রাষ্ট্র যখন নিজেই হত্যালীলায় নেমেছে, তখন আইনও তাদের হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁরা তখনও জানতেন না যে আগের রাতেই সবক-টা থানায় পৌঁছে গিয়েছিল নির্দেশ, “তোমরা কোনো অ্যাকশন নেবে না। কোনো থানায় কোনো এফ.আই.আর. নেওয়া হবে না।” এ তথ্যটা তখন কারোরই জানা ছিল না। আমিও অনেক পরে জেনেছিলাম। আন্দাজ বিশ বছর লেগেছিল এই ঘটনার বাস্তবতা জানতে।
কিন্তু বাস্তবচিত্র তখনও ওঁদের চোখের সামনে ছিল। বিফল মনোরথ হয়ে যখন সর্দারের দল থানার বাইরে বেরিয়ে আসছিল, তখনই থানার চৌহদ্দির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বড়ো প্রিজন ভ্যান চোখে পড়ল সবার। কিন্তু প্রিজন ভ্যানের মধ্যে কোনো বন্দি নেই। বরং গোটা ভ্যানটাতেই ঠাসাঠাসি করে রাখা আছে ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। সর্দারদের লাশ। সেদিকে চোখ পড়তেই ভয়ে আঁতকে উঠলেন বাবা। অনেক সর্দার ‘উলটি’ও করে ফেলল। সে কী বীভৎস দৃশ্য। কারোর মাথা নেই, মুণ্ডহীন ধড় থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। কেউ এমন পুড়ে গিয়েছে যে তাকে মানুষ বলে শনাক্ত করাই দায়! তার মধ্যে আছে এক নারীরও দেহ, যার দেহের গোপনাঙ্গ দিয়ে আভ্যন্তরীণ অঙ্গ, কিডনি, ক্ষুদ্রান্ত, বৃহদান্ত্র, সব বাইরে বেরিয়ে এসে ঝুলছে। কোনোটার আবার চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছে, কারোর দুটো হাতই কাটা, কারোর পা নেই। থানার বাইরে ছড়িয়ে আছে শিখদের অজস্র বিকৃত মৃতদেহ। অথচ থানার বক্তব্য, “কোনো দাঙ্গাই হয়নি। এখানে শান্তি বজায় আছে।”
ওদের সবার মধ্যে একমাত্র সরতাজই শক্ত মনের মানুষ। সে ওই মুণ্ডহীন কবন্ধ, জ্বলে-ভুনে যাওয়া শব আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভিড়ের মধ্য থেকেই একটা কাতরোক্তি শুনতে পেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল প্রিজন ভ্যানটার দিকে। যুদ্ধক্ষেত্রে সে নিঃসন্দেহে অনেক ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যা দেখল তাতে তার ‘রুহ’ কেঁপে গেল! সার সার রক্তাক্ত, বীভৎস, কর্তিত শবের মধ্যে একটি দেহ তখনও নড়াচড়া করছিল। তার কাতর কণ্ঠ শুনতে না পেলে হয়তো তাকেও লাশই ভাবত সবাই। কিন্তু তখনও দেহটার ভেতরে প্রাণ আর হুঁশ—দুই-ই ছিল! সরতাজ বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে দেখল তার সামনে, ভ্যানের মধ্যে বড়ো অযত্নে পড়ে আছে এক পনেরো কি ষোল বছরের ছেলে! তার গলার অনেকটাই কাটা! শুধু কয়েকটা শিরা আর নার্ভ তখনও একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি বলে দেহ থেকে মাথাটা খসে পড়েনি, ঝুলছে। বুক আর পেটের মাংস, পেশি কেটে একেবারে হাট করে খুলে দিয়েছে হত্যাকারীরা। যেমন বায়োলজি ক্লাসের ছাত্ররা ব্যাঙ কেটে তার আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রদর্শন করে, ঠিক তেমনই যেন ওকেও জ্যান্ত ডিসেকশন টেবিলে শুইয়ে কেটেছে কিছু মানুষ। সরতাজ তার ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী সব দেখতে পাচ্ছিল। একটা রক্তের মোটা স্রোত তার শরীর থেকে বেরিয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কিশোরটির তখনও জ্ঞান ছিল। সে সরতাজকে দেখতে পেয়ে ফিশফিশ করে নিস্তেজ স্বরে বলল, “পানি…পানি….!”
পুলিশ চৌকির ভেতরেই জলের কল ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে এক আঁজলা জল ভরে এনে মৃত্যুপথযাত্রী ছেলেটির মুখে দিল। তার কণ্ঠস্বর ক্রন্দনবিকৃত হয়ে আসছিল। এ তো একটা বাচ্চা ছেলে! সবে মুখে নরম নরম গোঁফদাড়ি দেখা দিতে শুরু করেছে। ওইটুকু কিশোরকে এরকম নারকীয় মৃত্যু দিতে চেয়েছে আততায়ীরা! তাছাড়া এখনও তো ছেলেটা বেঁচে আছে। এখনও হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো অকালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে না সে। পুলিশরা কি এটাও দেখেনি যে ছেলেটার মধ্যে এখনও ‘জান’ বাকি আছে?
“ক্কাকে, তুই এখানে কী করছিস? পুলিশদের বল্, তোকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।”
সরতাজের ব্যাকুল আর্দ্র কণ্ঠস্বর শুনে ছেলেটার চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ল। অতিকষ্টে বলল, “গত তিনঘণ্টা ধরে বলছি জনাব… চিৎকার করে করে বলেছি…! কিন্তু কেউ শুনছে না….তিনঘণ্টা ধরে আমাকে এখানেই ফেলে রেখেছে…. এখন আর পারছি না… আর পারছি না… ওরা সবাইকে মেরেছে… বাপু, তায়া, ফুফা, মামা—সবার লাশ এখানেই… আমিও…আমিও…।”
বলতে বলতেই প্রবল একটা হেঁচকি ওর বাক্যরোধ করল। গত তিনঘণ্টা ধরে ও কোনোমতে প্রাণটাকে ধরে রেখেছিল। এমনকি সাহায্যের আশায় চিৎকারও করেছে। কিন্তু আর যুদ্ধ করতে পারল না। হয়তো এই জলটুকুর জন্যই ওর প্রাণটা আকুলি-বিকুলি করতে করতে অপেক্ষা করছিল। তৃষ্ণা মিটতেই সে-ও দেহ ছেড়ে যাত্রা করল মৃত্যুর দিকে। ষোল বছরের কিশোরের সমস্ত সংঘর্ষ শেষ হল।
সরতাজের চোখে জল আর রক্ত দুই-ই জমছিল। সে স্পষ্ট দেখতে পেল ছেলেটার দেহের দৃশ্যমান হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফুসফুসও নড়াচড়া বন্ধ করেছে। শুধু একজোড়া করুণ জলভরা চোখ তখনও অনেক প্রশ্ন নিয়ে নিষ্ঠুর পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছিল। হয়তো জিজ্ঞাসা করছিল-আমি কী অপরাধ করেছিলাম? কেন তিনঘণ্টা ধরে আমায় এখানেই ফেলে রাখা হল। কেন চিকিৎসার সামান্য সুযোগটুকুও পেলাম না? কেন…?
সরতাজ ছেলেটার চোখ দুটো হাত দিয়ে বন্ধ করে দিল। তারপর ফিরে এল নিজের দলের কাছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকিরা সবটাই হৃদয়ঙ্গম করেছিল। বাপু জিজ্ঞাসা করেন, “ওরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল না কেন? ও তো বেঁচে ছিল!”
“তিনঘণ্টা সময় যথেষ্ট ছিল। এখান থেকে হাসপাতাল মাত্র পাঁচমিনিটের দূরত্বে। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখবে না বলেই নিয়ে যায়নি।” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “এরা যেমন বলেছে দাঙ্গা হয়নি, তেমন এটাও বলবে যে ছেলেটা আগেই মরে গিয়েছিল। তোমরা ঠিকই বলেছিলে। পুলিশ অন্ধ ও বধির হয়ে বসে আছে। ওদের দিয়ে কিছু হবে না।” “তবে?”
এই প্রশ্নটার উত্তর সরতাজেরও জানা ছিল না। সে শুধু দেখছিল অগুনতি অসহায়, কাতর চোখ ওর দিকেই অনিমেষে তাকিয়ে আছে। তাদের সপ্রশ্ন দৃষ্টি জানতে চাইছে, তবে কি বাঁচার কোনো উপায়ই নেই? সে মনে মনে অসহায়বোধ করলেও হাল ছাড়ল না। দলের সবাইকে বলল, “তোমাদের কাছে টাকা আছে? তাহলে চলো, এক আর্মি অফিসারকে ফোন করি।”
তখন সদ্য সদ্যই পি.সি.ও. বস্তুটি ভারতবর্ষে এসেছে। তাও সর্বত্র নয়। তবে দেশের রাজধানী হওয়ার দরুণ দিল্লিতে হাতে গোণা কয়েকটা ফোন বুথ ছিল। ফোন করাটাও সাধারণ মানুষের কাছে বিলাসিতা। পথেঘাটে এমন মুড়ি-মুড়কির মতো ফোনবুথও পাওয়া যেত না। তা সত্ত্বেও কপালগুণে অনেক খুঁজে পেতে একটা বুথ পাওয়া গেল। সেখান থেকেই সরতাজ আর্মির এক রিটায়ার্ড কর্নেল অমৃতপাল সিংকে ফোন করল। অমৃতপাল যা জানালেন, তাতে তাদের সবার হাতে বোধহয় শেষ সম্বল খড়কুটোটুকুও রইল না। তিনি নিজেই ব্যাকুলস্বরে বললেন, “সরতাজ, আমি সকাল থেকেই জ্ঞানীজিকে ফোন করছি। একা আমিই নই, রাষ্ট্রপতিভবনে মিনিটে মিনিটে হাজার হাজার ফোন ঢুকছে। গোটা দেশে যত শিখ আছে, সবাই ওঁর কাছে দরবার করছে, বাঁচানোর আর্জি পেশ করছে। উনিও আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন রাজীবজির সঙ্গে আলোচনা করার। সকাল থেকে অগুনতিবার জ্ঞানীজি রাজীব গান্ধীকে ফোন করেছেন।”
“রাজীবজি কী বলছেন? আর্মি নামবে?”
সরতাজের প্রশ্ন শুনে করুণ হাসলেন অমৃতপাল, “না। রাজীবজি জানিয়েছেন যে এখনই আর্মি নামানোর মতো এমার্জেন্সি কিছু হয়নি। পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণেই আছে। পুলিশই সামাল দিতে পারবে। এগুলো নিতান্তই বিক্ষিপ্ত ঘটনা। সামান্য জনরোষ মাত্র। এর জন্য আর্মি নামানোর কোনো মানে হয় না।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল সে। অমৃতপাল সিং-এর কথা যেন শুনতে পাচ্ছিল না! অথবা শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না। রাজীব গান্ধী বলেছেন, পুলিশই সামাল দিতে পারবে! পুলিশ কেমন সামাল দিচ্ছে তা স্বচক্ষেই দেখেছে! কোনোমতে স্খলিত স্বরে বলে, “জ্ঞানীজি কিছু বলেননি এর উত্তরে?”
“জ্ঞানীজি বলবেন কী? তিনি তো তখনই বলতে পারবেন যখন রাজীবজি ওঁর ফোন ধরবেন! এই কয়েকটা কথা বলেই উনি ফোন কেটে দিয়েছেন। তারপর থেকেই জ্ঞানীজি পাগলের মতো ওঁকে বিস্তারিত অবস্থা বলার জন্য ফোন করছেন। কিন্তু ফোন বারবার কেটে যাচ্ছে। ওপ্রান্ত থেকে কোনো উত্তরই নেই। ফোনই ধরছে না কেউ!” “তাহলে উপায়?”
“জানি না সরতাজ।” তিনি অসহায়ভাবে বলেন, “আমার বাড়ির সামনেও ‘মক্’ অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পাথর ছুড়ে জানলার কাচ ভাঙছে। স্লোগান দিচ্ছে, ‘গদ্দারকো মারো।’ আমি নিজেই কী করব বুঝতে পারছি না। হাজারবার পুলিশ স্টেশনে ফোন করেছি। ওরা স্রেফ বলছে, ‘দেখছি।’ এখনও পর্যন্ত দেখার সময় করে উঠতে পারেনি। আমাকে তো ছাড়ো। শুনেছি, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মনমোহনবীর সিং তলোয়ারের প্যাটেল নগরের বাংলোয়ও ‘মব’ ঢুকেছে। ওঁর বাড়ি ভাঙচুর করেছে। এমনকি ফ্রন্ট লনে ঢুকে পড়ে বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টাও করেছে। গ্রুপ ক্যাপ্টেন তলোয়ার অবশ্য ছাড়ার পাত্র নন। উনি টুয়েলভ বোরের লাইসেন্সড গান হাতে রেখেছেন। আর ওঁর ছেলেরা হকি স্টিক নিয়ে বসে আছে। দরকার পড়লে ফায়ারও করবেন।” বলতে বলতেই তাঁর স্বর কেঁপে গেল, “আমিও রাইফেল নিয়ে বসে আছি। মরতে ভয় পাই না। দরকার হলে শালাদের লাশ ফেলে দেব। কিন্তু তোমার ‘ভাবি’র জন্যই ভয় লাগে। তোমার আশেপাশে কোনো হিন্দুদের ঘর আছে? তবে সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারো। অন্তত প্রাণটা বাঁচবে। এইটুকু পরামর্শই দিতে পারি।”
সরতাজ ফোনের লাইনটা কেটে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অমৃতপাল সিং এর মতো একজন আপাদমস্তক দেশভক্ত মানুষ, আর্মির রিটায়ার্ড কর্নেলকে ওরা ‘গদ্দার’ বলছে! লোকটা জীবনের প্রায় সব কিছুই দিয়ে দিয়েছে ইন্ডিয়ান আর্মিকে। জীবন-যৌবন-খুন-পাসিনা, এমনকি সন্তানও! ওঁর বড়ো ছেলে কয়েক মাস আগেই সিয়াচেনের যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। কুড়ি বছরের জোয়ান ছেলে ছিল সে। তা সত্ত্বেও অমৃতপাল এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলেননি। উলটে বলেছেন, “আমার আফসোস যে রবজি আমায় মাত্র দুটো ছেলে দিয়েছেন। দেশ একজনের সেবা গ্রহণ করেছে। আর একজনকেও আমি দেশের নামেই উৎসর্গ করব। যদি আরও একশোটা ছেলে থাকত, তারাও দেশের জন্যই শহীদ হত।”
অমৃতপাল কথা রেখেছেন। মাসখানেকের মধ্যেই তাঁর ছোটো ছেলেও আর্মিতে জয়েন করল। সেই মানুষ কিনা আজ ‘বেইমান!’ আর মনমোহনবীর সিং তলোয়ারের বাড়িতেও ঢুকে পড়েছে এই নির্লজ্জ জনতা। উইং কম্যান্ডার তলোয়ার ‘সরগোঢ়া’ বম্বিং-এর জন্য বিখ্যাত। ইন্দো-পাকিস্তান ওয়ারের বীর যোদ্ধাকে এই দেশই তাঁর বীরত্বের জন্য ‘মহাবীরচক্র’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীই তাঁকে ‘বীরের’ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। অথচ আজ কতগুলো শয়তান তাঁরই ঘরে হামলা চালাচ্ছে। তাঁকে দেগে দিচ্ছে ‘গদ্দার’ বলে। মহাবীরচক্র পাওয়া বীর যোদ্ধা আজ সবার চোখে দেশদ্রোহী! এ কী জাতীয় বিচার?
সরতাজের অভিজ্ঞতা শোনার পর কলোনির বাসিন্দাদের অবস্থা আরও খারাপ হল। যেটুকু আশা নিয়ে বসেছিল সবাই, তাও রইল না। ওদিকে ততক্ষণে মঙ্গলপুরীর বাইরের দিকের শিখ-বসতিতে সম্ভবত আগুন লাগানো হয়েছে। অসহায় মানুষগুলোর চিৎকার, মরণ আর্তনাদ ও ভিড়ের নৃশংস উল্লাসধ্বনি এখান থেকেই স্পষ্ট শোনা যায়। ক্রমাগতই সে আওয়াজ বাড়ছে। ওরা আসবে… ওরা এদিকেও আসবে। কানে এল ওদের স্লোগান, “খুন কা বদলা খুন! এক ভি গদ্দার বচনা নেহি চাহিয়ে…!” আমার ছোট্ট বুকের ভেতরটা যেন তখনই পুড়ে যাচ্ছিল। মাত্র আটবছরেই সব কিছু বুঝতে পারছিলাম। এক ধাক্কায় অতখানি সমঝদার কী করে হয়ে গেলাম, তা নিজেই জানি না। ওইদিনই কালান্তক দুটো নাম— ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী, আমার মাথায় একদম আঠার মতো সেঁটে গেল। এই দুটো নামের ভার আমি এখনও বয়ে চলেছি। হয়তো আমৃত্যু এই দুটো নাম আমায় ছাড়বে না। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, ক্রমাগতই একটা হিংস্র মাংসাশী প্রাণী একটু একটু করে আমায় জ্যান্তই কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে! যন্ত্রণায় ছটফট করছি, তবু কিছু করার নেই!
“কোই না!” সরতাজের মুখ কঠিন হয়ে আছে, “কেউ যদি সাহায্য না-করে তবে আমরা নিজেরাই লড়ব। আমরাও টিট্ শিখ। একশো, দুশো, পাঁচশো-হাজার, কত আসবে আসুক। দেখে নেব। আমি যাচ্ছি আমার ঘর থেকে রাইফেল নিয়ে আসতে। বাকি পুরুষেরাও হাতের কাছে যা পাও, লাঠি, চাকু, খঞ্জর, তরোয়াল, কৃপাণ, সব নিয়ে এসে হাজির হও। এত সহজে মরব না। আমরাও লড়ব।”
তার কথার মধ্যে এমনকিছু ছিল যা উপস্থিত সবার রক্ত গরম করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যে যার বাড়িতে যত অস্ত্র পেল, সব নিয়ে এসে হাজির। শিখ জাতিরা নিরীহ হলেও সবসময়ই ঘরে ছোটোখাটো কিছু অস্ত্র রাখে। আমাদের মধ্যে দু-তিনজন মাংসের দোকানেও কাজ করত। তারাও তাদের মাংস কাটার বড়ো বড়ো ‘চপার’ নিয়ে এল। কেউ কেউ ‘কুলহারি’ অর্থাৎ কুড়ুলও নিয়ে এসে হাজির। সঙ্গে কৃপাণ, লাঠি, তরোয়াল তো ছিলই। আর ছিল সরতাজের বিশ্বস্ত রাইফেল!
বাপু এতক্ষণ বাড়ির ভেতরেই ছিলেন। এবার তিনি আর তাওজি তরোয়াল আর লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সরতাজ বাচ্চা ছেলে ও মেয়েদের দিকে তাকিয়েছে, “তোমরা সবাই যে যার ঘরে চলে যাও। ভেতর থেকে একদম কুন্ডি লাগিয়ে দাও। যতক্ষণ না আমরা বলব, কেউ বেরোবে না।”
“আমিও লড়ব!”
আমার কথা শুনে সে ওই পরিস্থিতিতেও হেসে ফেলল। বলল, “লড়বি বৈ কি! তুই বাঘের বাচ্চা। লড়বি না তা কি হয়? তাই সবচেয়ে শক্ত লড়াইটাই লড়তে হবে তোকে। আমরা গড়ের বাইরে পাহারা দিচ্ছি। তোরা ভেতরে পাহারা দিবি। শত্রু বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই মারবি। কিন্তু এখন ভেতরে যা ছোটোা জওয়ান। এখানে যা-ই ঘটুক বেরোবি না। দরজা খুলবি না। ডটকে সর্দারা!”
কথাটা আমার পছন্দ না হলেও সরতাজের আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা ছিল না। সময়ও খুব কম। তাই বেবে, যস্যিদিদি, সরবজিত, আমনপ্রীত, তাইজি— সবাই বিনাবাক্যব্যয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বাকিরাও তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘরে চলে গিয়েছে।
বেবে ভেতর থেকে দরজায় কুম্ভি লাগিয়ে দিল। কিন্তু আমিও বড়ো জিদ্দি’ ছিলাম। ওরা যখন বাড়ির ভেতরে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, তখন সবাইকে লুকিয়ে চুপচাপ ছাতে উঠে গেলাম। সেখান থেকে চতুর্দিকটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমি সেখান থেকেই দেখতে পেলাম শয়ে শয়ে খ্যাপা কুকুরের মতো লোক এদিকেই ছুটে আসছে। তাদের হাতে মশাল জ্বলছে। জ্বালানি তেলের ডিব্বা হাতে। আরও কত অস্ত্র-শস্ত্র। চতুর্দিকে শুধু ‘ধুঁয়া’ আর ‘ধুঁয়া’। হু হু করে জ্বলছে শিখ কলোনির সব বাড়ির ছাত! কলোনির রাস্তার দিকে তাকিয়ে প্রথমে বুঝতেই পারলাম না, আচমকা রাস্তাটা অমন লাল হয়ে গেল কী করে। যেদিকেই তাকাই, শুধুই লাল রঙের স্রোত! পরমুহূর্তেই ব্যাপারটা বুঝে আমার হৃৎপিণ্ড প্রায় স্তব্ধই হয়ে গেল। ওটা রক্ত! রাস্তাটা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে! শুধু তাই নয়, তার মধ্যে ঠাসাঠাসি করে পড়ে আছে অগুনতি মৃতদেহ। গলিতে পা রাখার জায়গাই নেই। ওরা শিখদের কাটতে কাটতে, মারতে মারতে, তাদের মৃতদেহ পায়ের তলায় পিষতে পিষতে আসছে!
আমার মনে হল, এখনই মাথা ঘুরে ছাত থেকে পড়ে যাব। এ কী দেখছি! এর চেয়ে বোধহয় নরকের দৃশ্যও ভালো। সরতাজের মুখে যখন বিবরণ শুনছিলাম, তখন আন্দাজ করেছিলাম যে ঠিক কী পরিমাণ বীভৎসতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন বুঝলাম, আমার কল্পনা বাস্তবের এক শতাংশও ছিল না! ছাতে ওঠার দরুণ যেমন মৃতদেহ দেখতে পাচ্ছিলাম, তেমন মঙ্গলপুরীর অন্যান্য ব্লকের ওপর ওদের আক্রমণও আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। দাঙ্গাইয়ের দল গোটা মঙ্গলপুরীকে চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে এগিয়ে আসছে। ওরা এক সর্দারজির ওপর সাদা পাউডার ছুড়ে মেরে আগুন ধরিয়ে দিল। সেই সর্দারের অন্তিম আর্তনাদও আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম আগুন হিংস্র, পৈশাচিক নাচ নাচতে নাচতে লোকটাকে গ্রাস করছে। জ্বলন্ত মানুষটা পুড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে! আপ্রাণ মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর প্রয়াস চালাচ্ছে দেখে আততায়ীর দল এবার পাউডারের ওপরে পুরো কেরোসিনের ডিব্বাই উলটে দিল। মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়ার ফলে আগুনের আক্রোশ যেটুকু কমেছিল, নতুনভাবে আরও ইন্ধন পেয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল! আর বাঁচার রাস্তাই নেই!
জ্বলন্ত মানুষটার গলা দিয়ে যে চিৎকারটা বেরোলো, বোধহয় সে আওয়াজ কোনো মানুষের গলা দিয়ে বেরোবে না। বাপু বলত নরকের পিশাচদের যখন গরম তেলে ফোটানো হয় তখন তাদের আর্তনাদে ত্রিভুবন কাঁপতে থাকে। সে চিৎকার যে শোনে সে হয় মারা যায়, নয় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যায়। আজ এই আর্তনাদ শুনে মনে হল, সেই পিশাচেরাও বোধহয় এত যন্ত্রণা পায় না, যা এই জ্বলন্ত শিখ পাচ্ছে। হয়তো আমিও মারা যাবো, নয়তো পাগল! ওর চিৎকার শুনলে ভয় হয়, গোটা ফুসফুসটাই বুঝি এবার বেরিয়ে আসবে ওর মুখ দিয়ে। অথবা ওর গলার সব ক-টা শিরা একসঙ্গেই ছিঁড়ে যাবে!
এমনই ভয়াবহ দৃশ্য ক্রমশই চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। যেদিকেই তাকাই, আগুন-রক্ত-শবদেহ! এক অন্তঃসত্ত্বা নারী একজন আক্রমণকারীর পা আঁকড়ে ধরে হয়তো স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা করছিল। কিন্তু তারা তখন নারীটির স্বামীর গলায় টায়ার পরিয়ে দিতেই ব্যস্ত। অন্যদিকে তাকানোর সময়ই নেই। শিখটিও তখন বারবার হাতজোড় করে কী যেন বলছে। তার ভরা পোয়াতি স্ত্রী ওদের পায়ের ওপর গড়াগড়িই খাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপই নেই। ওরা টায়ারের ওপরে ভালো করে তেল ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল! আগুন একেবারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠে তার বুক, মুখ সাপটে ধরেছে। লোকটা আপ্রাণ চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে দু-হাত দিয়ে টায়ারটা খোলার শেষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দেখে ভিড়ের মধ্য থেকে এক তরোয়ালধারী এসে মুহুর্তের মধ্যে দু-কোপে তার দুটো হাতই কেটে নিল। হাত না থাকলে টায়ার খোলার সম্ভাবনাই নেই। তবু মানুষটা বাঁচার জন্য ছটফট করে এলোপাথাড়ি দৌড়োদৌড়ি করছিল। হাত কেটে গেলেও পা তো আছে! দাঙ্গাইরা তার এই প্রচেষ্টায় বড়োই বিরক্ত হয়ে উঠে প্রথমে আগুন নেভাল। তারপর তাকে শুইয়ে ফেলে একে একে পা দুটোও কেটে নিল এবং ফের টায়ারে আগুন ধরিয়ে দিল। আর তার কিছু করারই নেই! আগুন প্রথমে উর্ধ্বমুখী হয়েছিল, এবার কোনোরকম বাধা না পেয়ে দুরন্ত গতিতে ছড়িয়ে পড়ল।
গর্ভবতী নারীটি এখন আর কোনোরকম প্রচেষ্টা করছে না। গড়াগড়িও খাচ্ছে না। তাকে দেখলে মনে হয়, বুঝি সে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তো তখনই তার আত্মা মরে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে দেহ থেকেও মুক্ত করার তাড়া হামলাকারীদের ছিল। তারা বিন্দুমাত্রও দেরি না করে হতভাগিনীর পেটে চালিয়ে দিল তরোয়াল। একের পর এক আঘাতে ফালাফালা করে দিল তার গর্ভ! আমি ভয়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখলাম, গর্ভবতীর কাটা পেট থেকে বেরিয়ে এল একটা ছোট্ট মাংসপিণ্ড! রক্তে মাখামাখি একটা ভ্রূণ। একজন খচ্ করে সেই শিশুভ্রূণকে তরোয়ালে গেঁথে নিল। হিংস্র তরোয়াল তখন এক ভ্রূণের রক্তে স্নান করছে। এক নবজাতকের রক্ত, যার কোনো ধর্ম নেই, কোনো পাপ নেই, কোনো নাম নেই! সেই অবস্থাতেই নগ্নশিশুদেহ সমেত তরবারি আকাশের দিকে তুলে সে চেঁচিয়ে উঠল, “ইন্দিরা গান্ধী অমর রহে।”
ইন্দিরা গান্ধী অমর রহে। আজকের দিনটাই ইন্দিরা গান্ধীকে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যাঁকে ‘অমর’ করে রাখার জন্য এই বাহিনী নেমেছে, তাঁকে কী করে ভুলতে পারি? প্রচণ্ড একটা কান্না একরাশ কাঁপুনির সঙ্গে এসে আমার বুকে ধাক্কা মারছে। আমার পরিবারেরও তবে এই অবস্থাই হবে। নিজে মরতে মানুষ অত ভয় পায় না, যতটা নিজের ভালোবাসার মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনাকে পায়। আমি ভয়ে শিউরে উঠে চোখ বুজে ফেলি। আমারও শরীরে যেন লেলিহান আগুনের জ্বালা, কয়েকশো তরোয়ালের ক্ষত! বিকট ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে চাইছি, পারছি না। গোটা দেহে ভয়ের অদম্য কাঁপুনি। আসছে… ওরা আসছে …! অন্যদিকে সরতাজ আর বাপুর ইশারায় এবার শিখের দলও হাতা গোটাল। আমার
শান্ত স্বভাবের নরম বাপু, যিনি কখনও সামান্য ঝগড়াও করেননি কারোর সঙ্গে, সেই তিনিই তরোয়াল তুলে বাঘের মতো গর্জন করে উঠলেন, “বোলে-এ-এ সো নিহা-আ-আ-ল!”
সরতাজ সমেত সমস্ত শিখও গর্জে ওঠে, “সৎ শ্রী অ-কা-ল!”
আমিও ওদের সঙ্গে চোখ বুজে বুকের ওপর হাত রেখে শব্দটা উচ্চারণ করলাম। বাপুর গল্পে যতবার এই ‘নারা’ শুনেছি, ততবারই গরম রক্ত টগবগিয়ে ফুটে উঠেছে! আজ তো বাস্তবেই এই গর্জন শুনলাম। ওইটুকু বয়েসেই বুঝে নিলাম—চমকৌর বা সারাগঢ়ির মতো এখানেও এবার মরার আর মারার পালা শুরু হবে! আজ ওরা সবাই ঈশর সিং, ওরাই গুর্মুখ সিং। অসম যুদ্ধ হলেও আমৃত্যু লড়ে যেতে শিখরা জানে। বোলে সো নিহাল, সৎ শ্ৰী অকাল!…
আজ আমার সামনেও যুদ্ধ কঠিন হচ্ছে! গুলিতে পা-টা জখম হয়েছে। রক্তপাত হয়েছে। কিন্তু তবু আমায় সহ্য করতে হবে। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। তাদের লোকবল আছে। আমি একা! আহত, রক্তাক্ত, ক্লান্ত। তবুও লড়ে যেতে হবে। তাই… ‘ডটকে সর্দারা!’
