(২৮)
“একটা ব্যাড নিউজ আছে সরকার।”
ফোনের ওপ্রান্তে এডিজি সেনের বিধ্বস্ত কণ্ঠস্বর! যেন ওঁর মাথার ওপরই কোনো অ্যাটম বম্ব পড়েছে। কিংবা কেউ বুঝি হিমালয় সুদ্ধ গোটা ভারতবর্ষকেই উড়িয়ে দিয়েছে। এই কেসটায় এত অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটেছে, এত রক্তের গঙ্গা বয়েছে যে ‘ব্যাড নিউজ’শব্দটা শুনলেই মনে হয় আবার কার সর্বনাশ হল! অন্তত শিশির সেনের গলার স্বরে মনে হল, বুঝি ওঁরই চরম সর্বনাশ হয়েছে।
এই মুহূর্তে অধিরাজ ও অর্ণব আবার ফরেনসিক ল্যাবের পথে। অধিরাজের নাকি আহেলির সঙ্গে কী দরকার আছে। প্রয়োজনটা এতটাই বিশেষ যে আর কাউকে বলা যাবে না। তার মাথায় যে কী ঘুরছে তা একমাত্র সে-ই জানে। অর্ণবকে যখন বলার তখন ঠিকই বলবে। তাই সে আর ও নিয়ে বিশেষ ভাবনা চিন্তা করেনি। তার ডিউটি সে নিশ্চুপে করতেই অভ্যস্ত। বেশি কৌতূহল কোনোদিনই প্রকাশ করে না। একটাই উদ্বেগ। এর আগের বার টাওয়েল ছোঁড়াছুড়ির ওপর দিয়েই ফাঁড়া গিয়েছে। এবার ল্যাব ভাঙাভাঙিই না হয়ে যায়!
ওদের গাড়ি যখন প্রায় ফরেনসিক ল্যাবের কাছাকাছি, ঠিক তখনই অধিরাজ একটা চাইনিজ রেস্টোর্যান্টের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একগাদা খাবার প্যাক করিয়ে আনতে গিয়েছিল। নিজে থেকেই বলল, “তুমিও লাস্ট কখন খেয়েছ মনে নেই। আমারও মনে পড়ছে না। আর মিস মুখার্জি এরপর বারো ঘণ্টা কিছু খেতে পারবেন না। একেই বার্নিং শিখ মাথার ওপর লাফাচ্ছে, তার ওপর খামোখা কানের কাছে কমপ্লেইনের রেকারিং ডেসিমালের ধ্যা র্যা র্যা র্যা শুনতে আমি একটুও রাজি নই। যদিও আগেই ওঁকে লাঞ্চ করে রেডি হয়ে থাকতে বলেছি, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস উনি সেটা মোটেও করবেন না। অগত্যা ওঁর মুখ বন্ধ রাখার জন্যও চাইনিজ জরুরি। তোমারও ফেভারিট। তাই ওটাই নিয়ে আসি।”
কথাটা বলেই সে নেমে রেস্টোর্যান্টের দিকে চলে গিয়েছিল। অর্ণব সবে ভাবছিল যে এই বারোঘণ্টার চক্করটা কী! আহেলি মুখার্জি আগামী বারোঘণ্টায় কিছু খেতে পারবে না কেন! এমন কী হতে চলেছে এই বারো ঘণ্টায়? ভাবা তখনও শেষ হয়নি, ঠিক তখনই তার ফোন বেজে ওঠে। ডিসপ্লেতে এডিজি সেনের নাম দেখে অবাক হয়েছিল সে। সচরাচর উনি অধিরাজের সঙ্গেই কন্ট্যাক্টে থাকেন। বিশেষ প্রয়োজন না পড়লে অর্ণবকে ফোন করেন না। অথচ আজ তাকেই ফোন করছেন। সে একটু চিন্তান্বিতভাবে ফোনটা তুলতে না তুলতেই উলটোদিক থেকে দুঃসংবাদের আভাস এল। অর্ণব সভয়ে বলে, “কী হয়েছে স্যার? আবার কোনো খুন…?”
“না। বার্নিং শিখ কেস রিলেটেড কিছু নয়। বাট স্টিল, ব্যাড নিউজ।”
রহস্যের পর রহস্য। এডিজি সেন নিজেই মাঝেমধ্যে অ্যালফ্রেড হিচকক হয়ে যান। বার্নিং শিখ রিলেটেড কিছু নয়, অথচ খারাপ খবর। সে আবার কী। এই তাণ্ডবের মধ্যেই আবার কোনো হাই প্রোফাইল কেস?
“আজ সকালেই প্রিয়া বাজাজ অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ার দরুন তাকে জেল থেকে হসপিটালে ট্রান্সফার করা হচ্ছিল। কিন্তু হসপিটালের পথেই সে পুলিশি হেপাজত থেকে, খোদ পুলিশের চোখেই ধুলো দিয়ে পালিয়েছে। এ কাজ তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। সে যেমন ম্যানিপুলেশনে এক্সপার্ট, তাতে সন্দেহ হচ্ছে এর পেছনে আরও বড়োসড়ো হাত আছে। ইনফ্যাক্ট সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।”
ভগ্নদূত নয়, শিশির সেনের অবস্থা অবিকল কাটা সিপাহীর মতো। যেভাবে উত্তেজনার সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে গড়গড়িয়ে সংবাদটা পেশ করলেন, তাতে এই মুহূর্তেই তাঁকে আজ তক বা এবিপি আনন্দের লুফে নেওয়া উচিত। ‘সর্বনাশিনী’-র পুলিশ হেপাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার খবর যে সর্বনেশে তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। খবরটা শুনে অর্ণবেরই হৃৎপিণ্ডটা বিশাল হাইজাম্প দিয়ে উঠল। প্রিয়া বাজাজ ফেরার! তার মানে ‘সর্বনাশিনী’ আবার ফিরবে! এবার কী মূর্তি নিয়ে ফিরবে কে জানে! আগেরবার অ্যামাটক্সিন এক্স ছিল। এবার কী আসছে?
“শুধু তাই নয়, জেলে থাকাকালীনই তার কাছে একটা মোবাইলও ছিল। সঙ্গে একগাদা সিম। সেগুলো কে তাকে দিয়েছিল, কীভাবে দিয়েছিল, কিছুই জানা নেই। তবে মোবাইলটা পুলিশ খুঁজে পেয়েছে। সিমগুলোও। সবকটা সিমে একটাই নম্বর সেভড। ব্যানার্জির। ব্যানার্জির ফোনে একাধিক কলও গিয়েছে ওগুলো থেকে। ক্যান ইউ বিলিভ ইট! জেলের মধ্যে কে তাকে ফোন বা সিম এনে দেবে? কে ব্যানার্জির নম্বর ওকে দেবে? পুলিশের ভেতরের লোক ছাড়া সম্ভবই নয়।”
আপনমনেই একগঙ্গা কথা বলে অবশেষে থামলেন এডিজি সেন। ততক্ষণে অবশ্য অর্ণবের যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গিয়েছে। স্যার বলছিলেন ওঁর ফোনে অজানা নম্বর থেকে একটা ফোন আসছে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। সে স্বকর্ণেও সেই কলটা শুনেছে। ওপ্রান্তে নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। টুইঙ্কল ধমক দেওয়ায় ফোনটা কেটেও গিয়েছিল। মিলে যাচ্ছে। সবটাই মিলে যাচ্ছে। এখন অর্ণব নিশ্চিতভাবে জানে যে ওই ফোনটা কার ছিল। সে মৃদুস্বরে বলল, “স্যার।”
“এ বিষয়ে জেল অথরিটিকে জবাবদিহি তো করতেই হবে। তদন্তও হবে। সে আমি পরে দেখে নিচ্ছি। কিন্তু ভুললে চলবে না যে প্রিয়াকে ব্যানার্জিই ধরেছিল। ও টক্সিক মহিলা রিভেঞ্জ নেওয়ার চেষ্টা করবেই। সেজন্যই হয়তো ব্যানার্জিকে ফোনে ট্রাই করছিল। কিছু তো ওর উদ্দেশ্য আছেই। তবে এখনই ওকে এই নিউজটা দেওয়ার দরকার নেই। বার্নিং শিখ এই মুহূর্তে বার্নিং প্রবলেম। ও ওকে নিয়ে ব্যস্ত আছে থাকুক। আজকের রাতটা ভাইটাল, ব্যানার্জিকে ডিস্টার্ব করে লাভ নেই। তুমি এই খবরটা জেনে রাখো। সতর্ক থেকো। সুযোগ বুঝে সময়মতো ব্যানার্জিকেও জানিয়ে দিও।”
“ওকে স্যার।”
অর্ণব কথাটা বলামাত্রই এডিজি সেন লাইন কেটে দিলেন। এটাই ওঁর স্টাইল। উনি বিশেষ কিছু শুনতেও চান না, প্রয়োজনের বাইরে একটি শব্দও বলতে চান না। কিন্তু অর্ণবের মনের মধ্যে অনেক আশঙ্কা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর কেউ না জানুক, সে জানে প্রিয়া রিভেঞ্জ নিতে আসছে না। তার উদ্দেশ্য আলাদাই। এবং যতদূর তাকে চেনা আছে, নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সে যে কোনো পর্যায়ে যেতে পারে। বিষাক্ত সে বটেই। তার থেকেও বেশি বিষাক্ত ও ভয়াবহ তার ভালোবাসা। “হ্যালেলুয়া। রাইট হ্যান্ড টাইম।”
অধিরাজের কণ্ঠস্বরে অর্ণবের চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল। সে তাকিয়ে দেখে অধিরাজ একগাদা খাবারের প্যাকেট গাড়ির ভেতরে রাখছে। দুটো প্যাকেট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “চিকেন মোমো আর সেজওয়ান মিক্সড হাক্কা নুডলস উইথ ফিশ সুইট অ্যান্ড সাওয়ার। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। নয়তো মিস মুখার্জি নিজের প্যাকেটটা শেষ করে তোমার হাতও খামচে দিতে পারেন।”
অর্ণব একরকম জোর করেই মুখ থেকে চিন্তার ছাপ সরিয়ে ফেলে একটু হাসে। প্রিয়ার ফেরার হওয়ার কথা এখন অধিরাজকে বলা যাবে না। অপরপক্ষে চিকেন মোমোর সুগন্ধও তার নাকে এসে ঝাপটা মারল। পেটের ভেতর খিদেটাও চনমনিয়ে উঠেছে। সে একটু চুপ করে থেকে জানতে চাইল, “আপনি খেয়েছেন স্যার? সকালের স্যান্ডউইচ আর ডিমসেদ্ধ তো ফেরতই গেল।”
“আমিও খাবার নিয়ে এসেছি। যেতে যেতেই গিলে নেবো।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “ডোন্ট ওরি।”
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যখন ওরা ফরেনসিক ল্যাবে পৌঁছোল, ততক্ষণে আহেলি তার সব কাজ শেষ করে একটা ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে অধৈর্য ভঙ্গিতে ঘড়ি দেখছে। তার পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো মিস মণীষা চক্রবর্তী। প্রণবেশ লাহিড়ীর টিমের দ্বিতীয় লেডি অফিসার। দুই মূর্তি গুটিগুটি পায়ে তার কাছে যেতেই একটু অনুযোগ মাখানো স্বরে বলল, “আপনারা পাঁচ মিনিট লেট! আমি এতক্ষণ ধরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সব দেখে টেখে রিপোর্ট তৈরি করে বসে আছি। আর আপনারা মনের সুখে মোমো খেয়ে বেড়াচ্ছেন।”
এই রে! সেরেছে। অর্ণব মনে মনে জিভ কাটে। মোমোর সসের গন্ধটা এতটাই তীব্র যে সহজে ঢাকা পড়ে না। সেইটা ঠিক মহিলার নাকে গেছে। অধিরাজের ভুরু কুঁচকে যায়, “শুধু মোমো কেন, আমরা এতক্ষণ মনের সুখে বার্নিং শিখের সঙ্গে হাডুডুও খেলে বেড়াচ্ছিলাম। আপনি খেলবেন? যদিও আপনার দ্বারা কোনো পয়েন্টই স্কোর হবে না। হামাগুড়ি দেওয়াই সার।”
আহেলি গুগলি খেয়ে একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমি কি তাই বলেছি নাকি? আমার বুঝি খিদে পায় না?”
“কেন?” সে ফের গম্ভীরভাবেই বলে, “আমি তো আপনাকে আগেই লাঞ্চ কমপ্লিট করে নিতে বলেছিলাম। বলিনি?”
“তার সঙ্গে একগাদা এভিডেন্সও তো ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেগুলো দেখতেও সময় লাগে৷ আমার দশটা মাথা আর কুড়িটা হাত নেই।” আহেলি মুখভঙ্গি করেছে, “তার সঙ্গে তো হিটলার-মুসোলিনী মার্কা হুকুমও করে গেলেন যে বারোটার মধ্যে সব সেরে রাখতে হবে। রেখেছি, কিন্তু খাওয়ার সময় পাইনি।”
“বুঝলাম। ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট কী বলছে?”
“আপনার সন্দেহই সঠিক। প্রথম যে দুটো স্যাম্পল দিয়েছিলেন, দুটোই নিঃসন্দেহে এক লোকের। আর আত্রেয়ী মিঃ সরকারের হাতে যে ক-টা ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাঠিয়েছে, তার মধ্যে একটার সঙ্গে আগের দুটো ফিঙ্গারপ্রিন্ট হুবহু মেলে। মানে ওই তিনটে আঙুলের ছাপই একজনের। শুধু তাই নয়, কৃপাণেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে। সেটা বার্নিং শিখ ছাড়া আর কারোর হওয়া সম্ভব নয়। সেটাও আগের স্যাম্পগুলোর সঙ্গে হান্ড্রেড পার্সেন্ট মিলছে। আমি অনেকবার চেক করেছি। সবক-টা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেম। সেক্ষেত্রে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে সবকটা আঙুলের ছাপই বার্নিং শিখের।”
সে থেমে যোগ করে, “কৃপাণ আর তরোয়ালগুলোতে ব্লাড ট্রেস আছে। ডি.এন.এ.-ও পেয়েছি। ওগুলোই নিঃসন্দেহে মার্ডার ওয়েপন। তবে ডি.এন.এ. অ্যানালিসিস এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়…।”
“ওসব পরে হলেও চলবে।” অধিরাজ হাত বাড়িয়ে তার হাতের ফাইলটা নিয়ে একঝলক চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বেশ সন্তুষ্ট ভঙ্গিতেই বলল, “ফাইন। ভেরি গুড ওয়ার্ক ইনডিড। আসুন!”
বলতে-বলতেই সে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিয়ে সসম্মানে দীর্ঘদেহটা ঝুঁকিয়ে ‘বাও’ করে বলল, “প্লিজ, অ্যাবোর্ড।”
আহেলি তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল। এই লোকটা যতই ট্যারাব্যাঁকা হোক না কেন, এই ভদ্রতাগুলো তার ভারি ভালো লাগে। সচরাচর খুব কম লোকই এগুলো করে। কোনো রেস্টোর্যান্টে গেলে সঙ্গের নারীটির জন্য সিট টেনে ঠিকঠাক করে দেওয়া, লিফটের, ব্যুরোর বা যে কোনো জায়গার দরজা খুলে দিয়ে ঝুঁকে পড়ে সসম্মানে ‘আফটার ইউ’ বলা, মহিলা অফিসার চুরুট ধরানোর জন্য লাইটার খুঁজে না পেলে স্বহস্তে তার চুরুটটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়তো এগুলো কিছুই নয়। তবে এগুলো অধিরাজের অভ্যাস। তার সঙ্গের লেডি অফিসাররাও এই ভদ্রতার কথা সবসময়ই বলে। আত্রেয়ীর মুখে তো শোনেই। এখন টুইঙ্কলও এগুলো বলে বলে তার কান মাথা খেয়ে ফেলেছে। তার বক্তব্য, “সি.আই.ডি. হোমিসাইডে এমন একখানা পারফেক্ট জেন্টলম্যান আছে তা জানাই ছিল না! যতদিন ধরে কাজ করছি, ততদিন শুধু ‘ধুর-ছাই’-ই শুনে এলাম। লাহিড়ী স্যার তো মনে করেন লেডি অফিসাররা নাকি ‘আই ক্যান্ডি’। দাঁড়িয়ে থাকলে দেখতে ভালো লাগে ঐ পর্যন্তই। কোনো কাজেরই না। আর বাকিরা স্মোক করলে ট্যারা চোখে তাকায়, বাঁকা হাসি হাসে। দিদি, এই প্রথম জিন্দগিতে জানলাম, মেয়েদেরও কিছু সম্মান আর ইচ্ছে আছে। তারাও আজাদ। আজ পর্যন্ত সবাই আমার এই ঘণ্টায় ঘণ্টায় খিদে পাওয়া নিয়ে স্রেফ মজাক্ উড়িয়েছে। এই প্রথম কাউকে দেখলাম যে আমার ওপর না হেসে একগাদা খাবারের বন্দোবস্ত করে রাখল। যারা স্যারের সঙ্গে কাজ করে তারা খুব লাকি।” এগুলো যে আহেলির অজানা তা নয়। শুধু এইটুকুই নয়, এক অসুস্থ, মৃত্যুপথযাত্রী নারীকে অধিরাজ গিটার বাজিয়ে এলভিসের গানও শোনাতে পারে সে সাসপেক্ট হওয়া সত্ত্বেও। এক বৃদ্ধা অপরাধীর শেষ সময়ের আরামের জন্য নিজেই দায়িত্ব নিয়ে হাউজ অ্যারেস্টের বন্দোবস্ত করে। এসবই তার জানা। সেজন্যই লোকটাকে আরও ভালো লাগে। কিন্তু ব্যাটা বুঝলে তো। সবসময়ই যে কেন যুদ্ধং দেহী মোডে থাকে কে জানে!
“নট ব্যাড!”
আহেলি গায়ের শালটা ভালো করে পেঁচিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অধিরাজ ফের সেই সবুজ কাশ্মীরী শালটা দেখে মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। একঝটকায় যেন সারা পৃথিবী দুলে উঠল। মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমঝিম করছে। তার চোখের সামনে হুট করে ভেসে উঠল অদ্ভুত কিছু দৃশ্য। এমনই একটা সবুজ রঙের শাল… একটা আবছা অবয়ব… একটা নিরাপত্তা ঘেরা উষ্ণ আলিঙ্গন… স্নেহমাখা কয়েকটা শব্দ…কী ছিল?…কী যেন ছিল…. …. আলতো পারফিউমের গন্ধ…। এসব কী! কবে হল। কখন…?
সে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আহেলির গায়ের শালটার দিকে তাকিয়ে থাকে। পরিচিত ঠেকছে। ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “মিস্ মুখার্জি, এই শালটা আপনার?”
আহেলি ও অর্ণবের মধ্যে শঙ্কিত দৃষ্টি বিনিময় হয়। এই সবুজ রঙের দামি শালটার কথা কি মনে পড়ছে অধিরাজের? কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে যে একটা যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসও জুড়ে রয়েছে। শালটার কথা মনে করিয়ে দিলে আবার সেই ট্রমা ফিরে আসবে না তো! এখনও সে দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতার কথা ভুলে উঠতে পারেনি। ক্ষত এখনও তাজা! আবার যদি তার ওপর আঘাত পড়ে?
“আজ্ঞে না।” আহেলি মাথা নাড়ল, “এটা আমি ‘শোলে’ ফিল্মের সঞ্জীবকুমারের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। ইয়ে শাল মুঝে দে দে ঠাকুর।”
অধিরাজের দৃষ্টি একটু বিহ্বল আর দুর্বল হয়ে এসেছিল। এবার খোঁচা খেয়ে প্রখর হয়ে উঠল। তেলেবেগুনে জ্বলে বলল, “আপনি সোজা কথার সোজা উত্তর দিতে পারেন না? সবসময়ই জলেবি বাঈ হয়ে আছেন!”
“এটা কোন্ দিক দিয়ে সোজা কথা?” আহেলি নাকের পাটা ফুলিয়েছে, “আমিই যখন গায়ে দিয়েছি তখন আমার শালই তো হবে। থোড়াই প্রতিবেশীর শাল গায়ে দিয়ে আসব! আর এই শীতে শাল পরব না তো কি বিকিনি পরব?”
“এর মধ্যে বিকিনি কোথা দিয়ে টপকে পড়ল?” সে বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করাই ঝকমারি দেখছি। প্লিজ উঠুন।” বলতে-বলতেই লেডি অফিসারটির দিকে তাকিয়েছে, “আপনিও সেনোরিটা। প্লিজ অ্যাবোর্ড।”
মিস্ চক্রবর্তী গাড়িতে উঠতে উঠতেই স্বপ্নালু দৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকিয়ে আহেলির কানে ফুসুর ফুসুর করে, “হাউ সুইট! উনি কী ভদ্র তাই না? আর কী মিষ্টি করে ডাকেন সেনোরিটা!”
লেডি অফিসারের আদিখ্যেতা দেখে চিড়বিড়িয়ে ওঠে আহেলি। তার মনের ভেতরটা যথারীতি কুটকুট করে উঠেছে। সে একটু কঠিন স্বরে জানায়, “সুইটের কিছু নেই। নির্ঘাত আপনার নাম ভুলে গিয়েছেন। তাই ওইসব সেনোরিটা, মাদমোয়াজেল দিয়ে মেক-আপ করছেন। উনি সবসময়ই লেডি অফিসারদের নাম ভুলে মেরে দেন। তাই ওইসব ভুজুং ভাজুং!”
মিস চক্রবর্তী একটু অপ্রস্তুত হাসল। কিন্তু তার চোখের স্বপ্নালু ভাব যায়নি। অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছে। তার পাশের সিটে অর্ণব সিটবেল্ট বাঁধতে ব্যস্ত। সে একটু উচ্চস্বরেই বলে, “মিস মুখার্জি, আপনার পেছনের সিটটাতে দেখুন চাইনিজের প্যাকেট আছে। মোমো, নুডলস্, ব্লা ব্লা। আপনার আর সেনোরিটার, দু-জনের জন্যই আছে। আর অর্ণব আর আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি। আপনার খাবারের দিকে তাকানো তো দূর, গন্ধও শুঁকবো না। তাই কারোর হাত খামচে, আঁচড়ে বা কামড়ে দেওয়ার দরকার নেই। আপনি নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।”
বেচারা অর্ণব সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতেই অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে একবার পেছন দিকে তাকিয়েছিল। অধিরাজের কথাটা কানে আসতেই সঙ্গে সঙ্গে তৎক্ষণাৎ টুই করে দ্রুতবেগে মুণ্ডু ঘুরিয়েও নিয়েছে। কিন্তু আহেলির শ্যেন দৃষ্টিতে তা এড়ায়নি। এমনিই খামচা মারার কথা শুনে সে চটেইছিল। তার ওপর অর্ণবকে তাকাতে দেখে আঙুল তুলে বলে উঠল, “ওই যে, উনি তাকাচ্ছেন!”
অধিরাজ আড়চোখে অর্ণবের দিকে তাকায়। অর্ণব অপ্রস্তুত। মিউমিউ করে বলল, “স্যার, আমি তো এমনিই…!”
“অর্ণব! ভেরি ব্যাড!”
তার মুখ গম্ভীর। সে আহেলির দিকে না তাকিয়েই বলে, “এখন তো তাকাচ্ছেন না। এখন আপনি নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।”
“আগে তো তাকিয়েছেন। নজরও দিয়েছেন।” আহেলি নাছোড়বান্দা, “এখন যদি আমার পেট খারাপ হয় তবে তার দায় কে নেবে?”
এ তো মহা জ্বালা! এইবার অধিরাজ বিরক্ত হয়ে প্রায় পঁচাত্তর ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “আপনার পেট খারাপের জন্য অর্ণব, অর্ণবের চোদ্দোপুরুষ, আমি এবং আমার সাড়ে চোদ্দশো পুরুষ, গোটা পশ্চিমবঙ্গ, গোটা ভারতবর্ষ, চায়না ও তাদের ক্যুইজিন, চাইনিজ শেফদের বাপ-ঠাকুর্দা, গোটা বিশ্ব ও ব্রহ্মাণ্ড, আমীর খানের ‘পিকে’ আর হৃত্বিক রোশনের ‘যাদু’, স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইটি’ আর জুরাসিক পার্কের ডাইনোসররা, সবাই দায়ী থাকবে। স্যাটিসফায়েড? এখন দয়া করে ঠুসুন। কারণ এরপর দশ-বারো ঘণ্টা আর কিছু খেতে পাবেন না। জলও নয়। এখন থেকেই বলে রাখলাম। কোনো কমপ্লেইন শুনতে চাই না।”
“দশ-বারো ঘণ্টা!” সে ব্রহ্মতালুতে চোখ তুলে ফেলেছে, “কেন? কেন খেতে পাব না শুনি? আমার কি খিদে পেতে পারে না? কী এমন রাজকার্যে যাচ্ছি আমরা?” “আমরা নই, আপনি যাচ্ছেন। আমার বন্ধু প্রীতমের পার্লারে। কিঞ্চিৎ সাজুগুজু করতে।” সে দায়সারা ভাবে জবাব দেয়, “পার্লার বলছি বটে। তবে ওটা আস্ত একটা মেক-ওভার স্টুডিও। আর প্রীতম নামকরা মেক-আপ আর্টিস্ট। বহুবছর মুম্বাইয়ে কাজ করেছে। এখন কলকাতায় আছে। আপনার ওপর ও-ই একটু ডিজাইন করবে।”
“অ্যাঁ!”
আহেলি আর অর্ণব দু-জনেই শব্দটা একসঙ্গে উচ্চারণ করে। অর্ণব ব্যোমকে ব্যোমকেশ হয়ে গিয়েছে। আহেলি বিস্ময়ে প্রথমে কোনো শব্দই খুঁজে পায় না। তারপর কোনোমতে বলল, “আমি একটা কথা বলব?”
অধিরাজ ঠোঁট টিপে হাসল, “তাহলে এতক্ষণ ধরে কে বকছিল? শামস্ তাহির খানের ভূত?”
“এত কিছু থাকতে মেক-আপ করব কেন? তাছাড়া দশঘণ্টা ধরে তো বিয়ের কনেরাও বোধহয় মেক-আপ করে না।”
“না। কনেরা করে না।” সে রহস্যময় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে, “কিন্তু ভূতেরা করে। বার্নিং শিখের ভূতকে ভয় দেখাতে একমাত্র আপনিই পারবেন। বিশেষ কিছু করতে হবে না। ওই বড়ো বড়ো জায়ান্ট স্কুইডের মতো চোখ পাকিয়ে তাকালে ও বেচারিরও কালঘাম ছুটে যাবে।”
“মানে?”
সে যথারীতি ফের অ্যাংরি বার্ডের মতোই ভয়াবহ মুখ করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই অধিরাজের ফোন ঝনঝনিয়ে বেজে উঠেছে। বিশ্বজিৎ ফোন করছে। এই ফোনটার প্রতীক্ষাতেই সে এতক্ষণ অধীর আগ্রহে বসেছিল। তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করে বলল, “হ্যাঁ বিশ্ব…!”
বিশ্বজিৎ ওপ্রান্ত থেকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে, “ভাইয়োঁ ঔর প্যায়ারি বেহনোঁ, আপনে যো ইতনা প্রেম ঔর উৎসাহ ভরা সোয়াগত্ কিয়া উসকে লিয়া ম্যায় আভারি হুঁ, ঔর আপকো ধন্যওয়াদ দেতি হুঁ। অব বতাইয়ে আপকে লিয়ে ম্যায় ক্যায়া কর সকতি হুঁ?”
তার বলার ভঙ্গিতেই অধিরাজ বুঝে গেল যে প্রয়োজনীয় অডিও ফাইলগুলো বিশ্ব-র কাছে এসে পৌঁছেছে। ও ইন্দিরা গান্ধীর বিখ্যাত স্পিচ থেকেই ডায়লগ দিচ্ছে। সে খুব উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, “ইয়ে ক্যায়া কর রহে হো?”
“হেঁ!” বিশ্বজিৎ-ও অবাক, “ম্যায়নে ক্যায়া কিয়া?”
“কুছ নেহি কিয়া। পর করনা তো পড়েগা না? ইসি লিয়ে তো পুঁছ রহা হুঁ। ইয়ে ক্যায়া কর রহে হো?”
বিশ্ব খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে হেসেই ফেলল। সে জিনিয়াস টেক এক্সপার্ট। ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেছে। হাসতে হাসতেই বলল, “ওকে বস্। গট্ ইট। কর রহা হুঁ।”
“গুড।”
সে ফোনটা নামিয়ে রেখে ড্রাইভিংয়ে মন দেয়। উপস্থিত তিনজন নারী-পুরুষ পরস্পরের মুখ দেখছে। কেউই কিছু বোঝেনি যে ওদের মধ্যে কোন্ কথার আদানপ্রদান হল। কেনই বা হল! এই কনভার্সেশনের ভেতরের ইঙ্গিত বিশ্বজিৎ নিশ্চয়ই বুঝেছে। কিন্তু আহেলি বা অর্ণব কিছুই বোঝেনি। মিস মণীষা চক্রবর্তীও অবশ্য বোঝেননি। তবে তিনি বিশেষ বোঝার চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয় না। আপাতত লেডি অফিসার মোমো নিয়ে মহাব্যস্ত।
“লিসন ভেরি কেয়ারফুলি।” অধিরাজ এবার ড্রাইভ করতে-করতেই বলল, “বার্নিং শিখ আসলে ১৯৮৪ সালের ভূত। ভূত বলতে আমি ‘ঘোস্ট’ নয়, ‘পাস্ট’কে বোঝাচ্ছি। ভূতকাল। সে ১৯৮৪ সালের ইতিহাস থেকে উঠে এসেছে। তাই তাকে শেষ করার জন্য সেই ১৯৮৪ সাল থেকেই আর এক ইতিহাসকে তুলে আনতে যাচ্ছি আমরা। বলা যায়, আর একজন ভূতকে আমদানি করছি। এই ভূতের সামনেই একমাত্র হার মানতে পারে বার্নিং শিখ। আমরা তাকে হারাতে পারব না। কিন্তু মিস্ মুখার্জি…।” বলতে বলতেই সে গভীর দৃষ্টিতে ফের আহেলির দিকে তাকায়। সবুজ রঙের শালটা চোখে পড়তেই আবার যেন একটু অস্থিরতা ছুঁয়ে গেল তাকে৷ আজকাল কী যে হচ্ছে কে জানে! তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আজ এই গল্পের শেষ আপনাকেই করতে হবে। আপনিই আজকের হিরো। শো স্টপার। যদি সামান্যতম ভুলও করেন তবে সব কিছু জলে যাবে। আপনার কাঁধের ওপরই এখন গোটা সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দায়ভার।”
আহেলির চোখের রং বুঝি একটু গাঢ় হয়ে আসে। এরকম অপ্রত্যাশিত সংবাদে একটু নার্ভাসও। তবু দুরন্ত সাহসে বুক বেঁধে দৃঢ়ভাবে বলল, “আমাকে কী করতে হবে?”
“সব বলে দেব। বুঝিয়েও দেব। শুধু ভয় পাবেন না।”
মিস মুখার্জি মৃদু হাসল, “নাঃ। ভয় পাবো না।”
“সাউন্ডস গ্রেট।” বলতে-বলতেই সে ফের চোখ কুঁচকেছে, “বাই দ্য ওয়ে, আপনার এই শালটার ডানকোণে কি কোনো ইনিশিয়াল আছে? স্টিচ বা ট্যাটু করা? কবে কিনেছেন এটা?”
অধিরাজ আবার শাল নিয়ে পড়েছে দেখে আহেলি মনে মনে প্রমাদ গোণে। এখনই সব কিছু তাকে বলা উচিত হবে না। এখনও সে ডঃ মনোহর চৌধুরীর ট্রিটমেন্টে আছে। যা অবচেতনে আছে তাকে বাইরে এনে কাজ নেই। হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই চেপে যাওয়াই ভালো। সে মৃদু স্বরে বলে, “দশ-বারোদিন আগেই কিনেছি। ইনিশিয়াল বা ট্যাটু জাতীয় কিছুই নেই। এরকম শাল তো রাস্তাঘাটে আকছার দেখা যায়। খুবই কমন। কেন বলুন তো?”
অধিরাজ একটু যেন হতাশ ভাবে মাথা নাড়ল। কেন জিজ্ঞাসা করছে, কী জিজ্ঞাসা করছে তা নিজেও বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে এই শালটাকে সে ভীষণ কাছ থেকে চেনে। দেখেছে, অনুভবও করেছে। আর চকিতে একবার মনে হল, একটা ইনিশিয়ালও বোধহয় ওর গায়ে থাকার কথা। অক্ষরগুলো ঝাপসা। তবু কিছু বুঝি ছিল…!
সে ড্রাইভিং করতে করতেই বলল, “নাঃ। কিছু না। আমারই ভুল।”
