(১৪)
একের পর এক দুঃসংবাদগুলো শুনতেই যাদব আর ঘন্টুর মুখ আর বুক দুই-ই শুকিয়ে গেল। ওরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে ঠিকই, কিন্তু এরকম বীভৎস মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়। অর্ণব ওদের দিকে তাকিয়েই নিশ্চিত হয়ে গেল, এই কেসে ওদের সাহায্যও আর পাওয়া যাবে না।
ওদিকে সি.আই.ডি. ব্যুরোর সামনে দমবন্ধ করা ভিড়। অধিরাজ আর অর্ণব যতক্ষণে আহেলিকে নিরাপদে ল্যাবে পৌঁছে দিয়ে ব্যুরোয় ঢুকল, ততক্ষণে গোটা কলকাতার মিডিয়া প্রায় ছেঁকে ধরেছে বিল্ডিংটাকে। সানগ্লাস পরা অধিরাজকে ঢুকতে দেখেই প্রায় সকলেই বুম আর ক্যামেরা নিয়ে তার ওপর লাফিয়ে পড়ল। অর্ণব ভিড়টাকে সরানোর চেষ্টা করতে করতে হিমশিম খাচ্ছে। চতুর্দিক দিয়ে ধেয়ে আসছে প্রশ্নের বাণ, “স্যার… আজ সকালেই নাকি বার্নিং শিখ আরও দুটো খুন করেছে।… তারা কারা?…শুনেছি ফরেনসিক এক্সপার্টের বাড়িতেও নাকি হামলা হয়েছে?… কাল রাতে অফিসার সরকারের গাড়ির অ্যাক্সিডেন্টও হয়েছিল কি?…এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কী?…কী স্টেপ নিচ্ছেন আপনারা?… একটা লোক কিলোদরে খুন করে বেড়াচ্ছে আর আপনারা এখনও তাকে ধরতে পারছেন না?… প্রব্যাবল ভিকটিম কারা?…তাদের সিকিউরিটির কী ব্যবস্থা করেছেন?… স্যার, প্লিজ, একটা বাই….!”
যথারীতি অধিরাজ উদ্ধত ভঙ্গিতে গটগট করে কোনো দিকে না তাকিয়েই চলে যাচ্ছিল। ভিড়ও তার পেছন পেছন দৌড়চ্ছে। সে বিশেষ পাত্তাও দেয়নি। আচমকাই ভিড়ের মধ্য থেকে একটা চাপা কাতরোক্তি ভেসে আসতেই তার দৃষ্টি প্রেসের দিকে ফিরল। এক বয়স্ক ভদ্রলোক, সম্ভবত কোনো চ্যানেলের রিপোর্টারই হবেন, ধাক্কাধাক্কির চোটে পড়ে গিয়েছেন। অন্যান্য রিপোর্টারদের সেদিকে কোনো হুঁশই নেই। তারা এখনও একে অপরকে ঠ্যালা মেরে চলেছে। ভূপতিত মানুষটিকে দিব্যি পদপিষ্টও করে চলেছে। খেয়ালই নেই যে একজন প্রৌঢ় তাদের পায়ের নীচে পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।
“স্ট-প ই-ট।”
আচমকাই থমকে দাঁড়াল সে। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে সজোরে ধমকে উঠল, “কী শুরু করেছেন। একটা বাইট নেওয়ার জন্য মানুষ খুন করবেন? এখান থেকে সরুন… স-রু-ন বলছি।”
ধমক খেয়ে ভিড় যেন একটু তটস্থ হয়ে সরে দাঁড়ায়। অর্ণব এবং অধিরাজ দু-জনেই প্রায় ছুটে গেল বয়স্ক সাংবাদিকটির দিকে। তিনি তখনও ভূ-লুণ্ঠিত। হাত-পা কেটে ছড়ে গিয়েছে। চোখের চশমাটা ভিড়ের পায়ের চাপে ভেঙে টুকরো টুকরো। আস্তে আস্তে উঠে বসার চেষ্টা করছেন ভদ্রলোক। মুখে একটা অপ্রস্তুত হাসি। অধিরাজ তাঁকে সযত্নে হাত ধরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। নরম স্বরে জানতে চায়, “আপনি ঠিক আছেন? আপনার তো চোট লেগেছে দেখছি! চশমাটাও ভেঙে গেল…।”
“না না! ঠিক আছে…।” ভদ্রলোক একটু হাসার চেষ্টা করেন, “আসলে সকাল থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি তো! ধাক্কা সামলাতে পারিনি।”
“অর্ণব।” সে অর্ণবের দিকে ফিরল, “ওঁকে ব্যুরোর ভেতরে নিয়ে যাও। ফার্স্ট-এইড দেওয়ার বন্দোবস্ত করো।”
অর্ণব মাথা ঝাঁকিয়ে আহত মানুষটিকে নিয়ে চলে গেল। এবার অধিরাজ প্রেসের লোকজনদের দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি করেছে, “একটা স্কুপ বা নিউজের জন্য একে অপরকে খুন করবেন আপনারা! শেম অন ইউ! কী জানতে চান? হ্যাঁ, আজ ভোরে বার্নিং শিখ আরও দুটো খুন করেছে। ভিকটিম দু-জন আমাদের ইনফর্মার। তাদের ফ্যামিলির প্রাইভেসির জন্য তাদের নাম বলতে পারব না। আমাদের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের বাড়িতেও সে হামলা করেছে। আপাতত আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে পার্টিকুলার এই কেসটা যতক্ষণ না সলভ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইনফর্মার নেটওয়ার্ক ও ফরেনসিক টিম এই তদন্তে কাজ করবে না। ওদের সাহায্য ছাড়াই আমাদের এগোতে হবে।”
“কেসটা কি আদৌ সলভ হবে? তাও ফরেনসিক ও ইনফর্মারদের সাপোর্ট ছাড়া!” একজন বলে উঠল, “দিল্লি, কানপুর বা ব্যাঙ্গালোরের পুলিশ তো সবরকম সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও পারেনি। আপনারা পারবেন কি? তাছাড়া অফিসারদের নিজেদের জীবনই যেখানে বিপন্ন সেখানে তাঁরা অন্যদের নিরাপত্তা দেবেন কী করে?”
“নো কমেন্টস।” কঠিন স্বরে উত্তরটা ছুড়ে দিয়ে ফের গটগট করে এগিয়ে গেল অধিরাজ। পেছন থেকে ক্যামেরার ঝলসানি ভেসে আসছে। অজস্র ভিডিও ক্যামেরা তার ফুটেজ তুলতে ব্যস্ত। রিপোর্টাররা চেঁচাচ্ছে, “স্যার… আর একটা প্রশ্ন…।”
অধিরাজ থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে অদ্ভুত সুন্দর অথচ উদ্ধত গ্রীবাভঙ্গি করে বলল, “নো মোর কোয়েশ্চেন্স প্লিজ।”
শুধু ঐ কয়েক সেকেন্ডের পোজ, ঐ একটা মুহূর্তকেই তোলার জন্য ব্যস্ত ক্যামেরার শাটারের শব্দে আর ফ্ল্যাশের চোখ ধাঁধানো আলোয় গোটা চত্ত্বর সরগরম হয়ে ওঠে।
অধিরাজ কয়েক সেকেন্ড তাদের ফ্রেমবন্দি করে নেওয়ার সময় দিল। পরক্ষণেই ফের লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল ভেতরের দিকে। তার এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না।
অর্ণব ততক্ষণে আহত রিপোর্টারটিকে ফার্স্ট এইড দিয়ে দিয়েছে। ভদ্রলোক অধিরাজকে দেখে একটু হতাশ ভঙ্গিতেই বললেন, “আমিই শুধু আপনার বাইট পেলাম না।”
সে রোদচশমা খুলে নিয়ে মানুষটিকে আপাদমস্তক ভালো করে দেখল। তিনি তার বাবার সমবয়েসীই হবেন। হয়তো বা সামান্য বড়োও হতে পারেন। বয়েস আন্দাজ পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন’র মধ্যে। একমাথা কাঁচা পাকা চুল। ছোটোখাটো চেহারা। কিন্তু চোখের ধারালো দৃষ্টি বলে দেয়, ইনি রীতিমতো অভিজ্ঞ ক্রাইম রিপোর্টার। অধিরাজ সহৃদয় স্বরে জানতে চায়, “আপনার নাম কী স্যার?”
ভদ্রলোক একটু কুণ্ঠিত হয়ে বলেন, “আমায় স্যার বলবেন না। আমি নিতান্তই সামান্য একজন ক্রাইম রিপোর্টার। আমার নাম রমানাথ চক্রবর্তী। ইন্ডিয়ান ডেইলি মেল, কলকাতার ক্রাইম বিট আমিই দেখি।”
“ওকে মিঃ চক্রবর্তী।” সে মৃদু হাসল, “আপাতত আপনাকে খালি হাতেই ফেরাতে হচ্ছে। তবে এই কেসটা শেষ হলে আমি আপনাকে এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দেব। চলবে?”
রমানাথ প্রায় লাফিয়ে ওঠেন, “চলবে মানে? উড়বে।”
“ওকে ফাইন।” সে ফের অর্ণবের দিকে তাকায়, “ওঁর কন্ট্যাক্ট নম্বরটা নিয়ে নাও। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। দেখো, যদি কিছু জলখাবার…!”
তিনি মাথা নাড়েন, “না স্যার। আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই। এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ’র আনন্দেই আমার পেট ভরে গেছে।”
“কিন্তু আমার প্রয়োজন আছে।” অধিরাজ আন্তরিক স্বরে বলে, “ইন্ডিয়ান ডেইলি
মেলের ব্রাঞ্চ আমি যতদূর জানি গোটা ভারতবর্ষেই ছড়িয়ে আছে, রাইট?”
“ইয়েস স্যার।” ভদ্রলোক বললেন, “কলকাতায় লিড করতে না পারলেও অন্যান্য জায়গায় আমাদের রেপুটেশন ভালো।”
“ইন দ্যাট কেস, আপনাকে আমার একটা উপকার করতে হবে।” সে বলল, “অ্যাকচুয়ালি এটা কোনো অভিজ্ঞ মিডিয়া পার্সনের দ্বারাই সম্ভব। কিন্তু এখনকার ছেলে ছোকরাদের দিয়ে হবে না। আমার এমন একটি লোককে দরকার যিনি ইন্দিরা গান্ধীর ওপর পুরোপুরি অবসেসড! ওঁর জীবনের ফুল লেংথের ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন বা যাঁর কাছে ওঁর সব ভাষণ, মিটিং বা র্যালির সমস্ত ফুটেজ এখনও সযত্নে রক্ষিত আছে। অন্তত শেষ কয়েকবছরে উনি যত ভাষণ দিয়েছেন, তার রেকর্ডিং, অডিও ফাইল জাতীয় কিছু যদি পাওয়া যায় তবে সোনায় সোহাগা। পুলিশ কিংবা ইনফর্মাররা এই জাতীয় লোকদের খবর রাখে না। একমাত্র মিডিয়া পার্সনরাই এমন মানুষদের চেনেন। আপনি কি কোনোভাবে আমায় সাহায্য করতে পারেন?”
“নিশ্চয়ই।” রমানাথ সপ্রতিভভাবে বলেন, “কিন্তু সে তো স্যার আপনারা ইউটিউব থেকেই পেয়ে যাবেন। বিবিসি থেকে শুরু করে এখনকার সমস্ত টপ চ্যানেলগুলোর কাছেই সেসব রাখা আছে। এবিপি নিউজ, আজতকেও পাবেন।”
“না।” সে বলে, “ইউটিউবের সাউন্ড কোয়ালিটি একদমই ভালো নয়। তাছাড়া ওঁদের কাছে ঠিক ততটুকু ফুটেজই পাবো, যতটুকু ওঁদের নিজেদের প্রয়োজন। বেশিরভাগই ইন্টারভিউ। আমি ইন্টারভিউর অডিও বা ভিডিও ফুটেজ চাইছি না। ইন্দিরা গান্ধীর স্পিচ বা ভাষণ চাইছি। আপনি জানেনই, আমাদের হাতে সময় খুব কম। এর মধ্যে বিবিসি, এবিপি নিউজ, আজতক, টাইমস নাও বা অন্যান্য চ্যানেলকে এক এক করে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। যদি সম্ভবও হয়, তবে সি.আই.ডি. হোমিসাইড, কলকাতা যে এই জাতীয় অডিও বা ভিডিও ফাইল খুঁজছে, সেটা নিয়েই ওঁরা ব্রেকিং নিউজ বানিয়ে ফেলবেন। কারণ গোটা দেশ জানে যে বার্নিং শিখ এখন কলকাতায়। আমি একেবারেই চাই না যে, আজ রাতেই সুমন দে, অর্ণব গোস্বামী কিংবা শামস তাহির খান এটা নিয়ে আলোচনায় বসে যান। আমরা যে এগুলো খুঁজছি, সেটা কাকপক্ষীতেও জানবে না। দূরদর্শনের কাছে চাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজকের ডেটে চাইলে বছর খানেকের আগে সে জিনিস পাওয়া যাবে না। অথচ একসঙ্গেই মোটামুটি সব স্পিচগুলোই ইমিডিয়েটলি হাতের কাছে পাওয়া প্রয়োজন। একটা একটা করে জোগাড় করার সময় একদমই নেই।
“উঁ।” রমানাথ একটু চিন্তা করে খুব ধীরে ধীরে বললেন, “স্যার, এরকম একটা লোককে আমি অল্পবিস্তর চিনি। ইনফ্যাক্ট দিল্লিতেই একটা কনফারেন্সের সময় ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়। আপনি যেমন বলছেন, অবিকল তেমনই। ইন্দিরা গান্ধীর ওপরে ওঁর অসম্ভব অবসেশন। দু-চারটে বইও লিখেছেন ইন্দিরার জীবন নিয়ে। চিরঞ্জীব জয়সওয়াল। সিনিয়র মানুষ। এখন ওঁর বয়েস প্রায় আশির ওপরে তো হবেই৷ নাম শুনেছেন কি?”
অধিরাজ নেতিবাচক মাথা নাড়ল, “নাঃ। বললাম তো, এরকম মানুষদের খবর পুলিশেরা রাখে না।”
“তাও বটে।” তিনি হেসে ফেললেন, “ইনি একবার গল্প করেছিলেন, যে যৌবনে ইন্দিরার এমনই পাগল ভক্ত ছিলেন যে রীতিমতো ওঁকে আবেগে ভরা শের ও শায়েরি সমেত আস্ত প্রেমপত্রই লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কপাল ভালো যে প্রধানমন্ত্রী তার জন্য ওঁকে জেলে না ভরে স্রেফ পালটা চিঠিতে দুটো বাক্য লিখেছিলেন, “ইউ আর ভেরি নটি। থ্যাঙ্কস ফর দ্য পোয়েট্রি।” কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা ও সলিড। উনি দাবি করেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইন্দিরা যত র্যালি করেছেন, যত স্পিচ দিয়েছেন, হিন্দি, ইংরেজি ভাষায় যত ইন্টারভিউ দিয়েছেন, সব অরিজিনাল এবং ফুল রেকর্ডিং তাঁর লাইব্রেরিতে আছে। এমন অনেক স্পিচের রেকর্ডিংও আছে যা এককথায় দুষ্প্রাপ্য। কোনো চ্যানেলের কাছেই নেই। ইনফ্যাক্ট, ইন্দিরা গান্ধীর ওপর একটা বিরাট লাইব্রেরিও আছে ওঁর। সবাইকে অ্যালাউ করেন না, আমাকেও করেননি। তবে আপনি যদি বলেন, তবে ভদ্রলোককে বলে দেখতে পারি। ওঁর সঙ্গে আমার এখনও মাঝেমধ্যে কথা হয়। কপাল আর ওঁর মেজাজ ভালো থাকলে যা চাইছেন তা পেয়ে যেতেও পারেন।” রমানাথ একটু ডিফেন্সিভ খেললেন, “তবে আমি শিওর শট কিছু বলতে পারছি না। পুরোটাই ওঁর বলা কথা। যেমন বলছিলাম, লাইব্রেরিটা আমি নিজেও দেখিনি। তাই কনফার্ম নই। তবে চিঠিটার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। ইন্দিরার সেই বহু পুরোনো চিঠিতে দুটো লাইন, এবং হস্তাক্ষর স্বচক্ষে দেখেছি। মিঃ জয়সওয়াল আবার গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সাজিয়ে চিঠিটাকে রুপোর ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছেন।”
“চিঠিটা যদি সত্যি হয়, তবে বাকি দাবিটাও সত্যি হওয়ার চান্স আছে। আপনি একবার ওঁকে রিকোয়েস্ট করে দেখুন। তবে স্পেসিফিক্যালি আমার ইন্দিরা গান্ধীর স্পিচগুলোই চাই। ইন্টারভিউর প্রয়োজন নেই। আর একথা যেন কোনোভাবেই…!”
“কেউ জানবে না স্যার।” রমানাথ অধিরাজকে প্রায় থামিয়ে দিয়েই বললেন, “মিঃ জয়সওয়াল নিজে ভীষণ প্রচার বিমুখ লোক। আমি তো বলবই না। এই কেসটা শেষ হলে বরং আপনি এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউতে ‘বার্নিং শিখ’ কেসের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন। ডিল?”
“জেন্টলম্যানস ডিল।” সে বলল, “কত তাড়াতাড়ি পেতে পারি ওগুলো?”
“কালকের আগে পাবেন না। মিনিমাম একটা দিন তো লাগবেই ওঁকে ভজাতে।” তিনি জানালেন, “একবার রেকর্ডিংগুলো পেয়ে গেলে আমাদের দিল্লি অফিসের এক ছোঁড়াকে বলে দেব। সে কালেক্ট করে সমস্ত অডিও, ভিডিও মেইল করে পাঠিয়ে দেবে। আজকাল টেকনোলজি এগুলো অনেক সহজ করে দিয়েছে।”
“কাল সকালে বা দুপুরে পেলেও চলবে। তার বেশি দেরি হলে সমস্যা হবে। প্রতি মুহূর্তই এখন আমাদের কাছে ইম্পর্ট্যান্ট।”
“আপনার ইন্টারভিউ’র সওয়াল স্যার। আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট।”
“ইন্টারভিউ’র থেকেও বেশি, অনেকগুলো মানুষের প্রাণের সওয়াল।” সে মিষ্টি হাসল, “থ্যাংকস। কিপিং মাই ফিঙ্গারস ক্রসড।”
ভদ্রলোক হেসে সেখান থেকে চলে গেলেন। অর্ণব গোটা ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ নিয়ে ঠিক কী হবে? তাছাড়া শুধু ভাষণই বা কেন? ইন্টারভিউ হলে তবু বোঝা যেত যে তার মধ্যে কিছু ইনফর্মেশন থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর আগে ইন্দিরা জানবেনই বা কী করে যে তাঁর মৃত্যুর পরে এতবড়ো একটা হত্যাকাণ্ড হবে! তবে তাঁর স্পিচে কী খুঁজছে অধিরাজ? প্রশ্নটা করতেই অধিরাজ একটু চুপ করে থেকে বলল, “দেখি, যা খুঁজছি তা পাই কিনা। তারপর সব বুঝিয়ে বলব।”
“স্পিচই কেন? ইন্টারভিউ হলেও তো চলত।”
“কারণ ইন্টারভিউতে কেউ উত্তেজিত হয়ে হাঁউমাউ করে বা চড়া সুরে কথা বলে না। সেজন্যই স্পিচই প্রয়োজন, ইন্টারভিউ নয়।”
বলতে বলতেই সে দ্রুত কনফারেন্স রুমের দিকে এগিয়ে গেল। যাদব আর ঘন্টু ওখানেই অপেক্ষা করছে। বলাই বাহুল্য যে অধিরাজের বক্তব্য অর্ণবের মাথায় কিছুই ঢুকল না। কিন্তু তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সে তার পেছন পেছন গেল। দেখা যাক, খবরিরা কোনো প্রয়োজনীয় খবর দিতে পারে কিনা।
তবে খবরের আগেই নাকের সামনে হাজির হল আস্ত একটা জমকালো লাল টুকটুকে কার্ড। ঘন্টুর ছেলে পুপুল, তথা সত্যজিৎ দাসের বিয়ের কার্ড! অধিরাজ কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটু বুঝি নিজেকে স্বাভাবিক করার জন্য সময়ও নিল। সামনেই ঘন্টুর ছেলের বিয়ে। কী সুন্দর বিয়ের কার্ড করেছে! একটাই সন্তান, তাই বড়ো আদরেরও বটে। ওদের স্বামী-স্ত্রীয়ের মধ্যে সম্পর্কও খুব ভালো। যদিও অন্যদের মুখে শুনেছে যে রতি বউদি আসলে হিন্দু নন, মুসলিম। ওঁর আসল নাম আয়েশা। ঘন্টেশ্বরবাবুর সঙ্গে আয়েশা খাতুনের প্রেমের গল্প সি.আই.ডি. ব্যুরোয় বেশ জনপ্রিয়। ঘন্টুর মায়ের এ বিয়েতে প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু পরিবার, সমাজ, ধর্ম সবার বিরুদ্ধে গিয়ে ওরা বিয়ে করেছে। বিয়ের পর শুধু হিন্দু নামই নয়, হিন্দু ধর্মটাকেই আপন করে নিয়েছেন আয়েশা। এখন তিনি সকলের রতি বউদি। তাঁর মাথার চওড়া সিঁদুর, শাঁখা-পলা পরা হাত আর সাবেকি ঢঙে শাড়িপরা দেবীমূর্তিটি দেখলে কেউ বলবে না যে তিনি কোনোকালে অন্য কোনো ধর্মের ছিলেন। ভালোবাসা এমনই জিনিস যা ধর্মের রক্তচক্ষুকেও মাত দেয়। আবার ধর্ম এমনই বস্তু যা ভালোবাসা, বিশ্বাস, সবকিছুই পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ১৯৮৪ সালের রক্তাক্ত ইতিহাস, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা থেকে শিখ জেনোসাইড পর্যন্ত পুরোটাই তার সাক্ষ্য বহন করে।
অধিরাজ বিয়ের কার্ডটা অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করছিল। যে এত সাধ করে, হয়তো ক্ষমতারও বাইরে গিয়ে ছেলের বিয়ে দিচ্ছে, তাকে কি আদৌ এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে সামিল করা যায়? কাল যদি ইসমাইল বা রকির মতো ঘন্টুরও ভয়াবহ কোনো পরিণতি হয় তবে পুপুল বা রতির সামনে কোন মুখে দাঁড়াবে ওরা! সে ঘন্টুর হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে বেদনার্ত দৃষ্টিতে তাকায়। তার মুখের অবস্থা দেখে বোধহয় ঘন্টুও কিছু আঁচ করেছে। সে বলল, “স্যার? কী হল?”
“অনেক কিছু হয়ে গেছে ঘন্টু। যাদব, তুই-ও মন দিয়ে শোন।”
কোনো কিছুই বিন্দুমাত্রও গোপন না করে সে সব কিছুই ওদের খুলে বলে। কাল রাত থেকে আজ ভোর পর্যন্ত যা যা হয়েছে, সবই সবিস্তারে বলল। ইসমাইল, রকি এবং সনতের করুণ পরিণতির কথাও জানাল। খুব গম্ভীর ও বিষণ্ণ গলায় বলে সে, “আমি আর মৃত্যুর দায় নিতে পারব না। অলরেডি দু-জন ইনফর্মার মারা গিয়েছে। ফরেনসিক ল্যাব আপাতত বন্ধ। আমার মনে হয়, এ কেস থেকে তোদেরও সরে যাওয়া উচিত। অন্তত পার্টিকুলার এই কেসটায় কিছু করতে যাওয়া মানেই অলমোস্ট মরতে যাওয়া। আমাদের উপায় নেই, তাই প্রাণ হাতে নিয়ে ডিউটি করতেই হবে। কিন্তু তাও ভাবছি প্রত্যেকের বাড়ির লোকদের জন্য সিকিউরিটির বন্দোবস্ত করব। সরি টু সে, তোদের জন্য সেটা করা যাবে না। কারণ যে মুহূর্তে পুলিশগার্ডরা তোদের বাড়িতে সিকিউরিটির জন্য যাবে, সে মুহূর্তেই সবাই জানতে পারবে যে তোরা সাধারণ লোক না। ঘন্টু যে আসলে চায়ের দোকানি নয় বা যাদব যে সব্জিবিক্রেতা নয়, পুলিশের খবরি, সেটা তোদের প্রতিবেশী থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোক অবধি সবাই বুঝবে। তাতে রিস্ক বাড়বে বৈ কমবে না। ইন মাই ওপিনিয়ন, তোদের এই কেস থেকে সরে যাওয়াই ভালো। বাকিটা তোদের মর্জি।”
কথা শেষ করে সে দু-জনের দিকেই তাকায়। যাদবের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছে। ঘন্টুর চোখে মুখেও ভয় স্পষ্ট। দু-জনেই নীরবে একে অপরকে দেখছে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। অধিরাজ আর অর্ণবও নীরবে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। যে সিদ্ধান্তই ওরা নিক, মেনে নেবে। এখানে কোনো ‘ব্লেম গেম’ এর জায়গাই নেই।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষপর্যন্ত নীরবতা ভাঙল যাদবই। মুখ নীচু করে খুব মৃদুস্বরে বলল, “স্যার… আমার ছোটো ছোটো দুটো বাচ্চা আছে। ছেলেটার বয়েস মাত্র দুই বছর, আর মেয়েটা ছ-মাসের…। ভাইরাও সবাই ঠিকঠাক মতো কামায় না। মাধব আর কেশব উলটোপালটা ব্যাবসার স্কিম বানায় আর প্রতিবারই ফেল পড়ে। উদ্ধব একটা ওষুধের দোকানে কাজ করে। আমদানি বেশি নয়…। আমিই একমাত্র ঠিকঠাক কামানেওয়ালা…!”
এইটুকু বলেই ফের চুপ করে গিয়েছে সে। বাকিটা বলার আর প্রয়োজন নেই। ইঙ্গিত স্পষ্ট। সে সরে দাঁড়াল। এটাও আর একটা জোর ধাক্কা। কিন্তু তার জন্য ওকে দায়ী করা যায় না। অধিরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝেছি। নো প্রবলেম।”
“সরি স্যার!” যাদব আত্মগ্লানিভরা কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল, “কিছু মনে করবেন না।”
“মনে করার কোনো গল্পই নেই যাদব। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তোর জায়গায় আমি থাকলে এই সিদ্ধান্তটাই নিতাম।” বলতে বলতেই তার দৃষ্টি ফিরল ঘন্টুর দিকে, “তুই কী ঠিক করলি?”
“জানি না স্যার।” ঘন্টু দ্বিধাগ্রস্ত, “একবার মনে হচ্ছে এই বিপদের সময়ে আপনাদের হাত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। আবার বউ আর ছেলের কথাও মনে পড়ছে। আমার মরতে ভয় নেই। কিন্তু রতি অগাধ জলে পড়বে। পুপুল সবে চাকরিতে ঢুকেছে। ওর বিয়েটাও যতটা সম্ভব জাঁকজমক করে দিতে চাই!”
‘সেক্ষেত্রে. তোরও যাদবের মতোই সরে যাওয়া উচিত। সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। পরের মাসেই পুপুলের বিয়ে। সেটা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না।”
ঘন্টু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিষণ্ণভাবে বলল, “ঠিক। তাই হবে স্যার।”
অধিরাজ একটা শ্বাস টানে। সেটা স্বস্তির না উৎকণ্ঠার তা বলা মুশকিল। একদিকে যেমন খবরিদের প্রাণের আশঙ্কা কমল, অন্যদিকে সি.আই.ডি. হোমিসাইড আরও কিছুটা শক্তিহীন হয়ে পড়ল। কিন্তু মনোভাব যা-ই হোক, আপাতত প্রকাশ করল না সে। শান্তভাবেই বলল, “লাস্ট খবর কিছু পেয়েছিস? থাকলে দিয়ে যা।”
এবারও যাদবই প্রথমে মুখ খুলল, “স্যার, কেরোসিন ব্ল্যাক মার্কেট থেকে আর কেউ তোলেনি। তবে কাল শেষরাতে কেউ বে-আইনি পেট্রোল তুলেছে। তাও আবার পনেরো বোতল।”
“বে-আইনি পেট্রোল।” অধিরাজ বিড়বিড় করে বলল, “ফের ওয়েপন চেঞ্জ। যদিও এটার আশঙ্কা আমিও করছিলাম। কারণ ১৯৮৪ সালেও শিখদের জ্যান্ত জ্বালাতে কেরোসিনের পাশাপাশি পেট্রোলও ইউজ করেছিল মব। কোনো না কোনোদিন এটা সে করতই। সেই সময়ে যে মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেগুলোই ব্যবহার করছে। তাছাড়া এখন ও জানে কেরোসিনের ব্ল্যাক মার্কেটগুলোয় সাদা পোষাকের পুলিশ কিংবা খবরিরা ঘুরছে। তাই ওদিকে আর যাবে না, যেমন নেকলেসিং করার জন্য টায়ার তুলতেও যাবে না। যা-ই হোক, পেট্রোল কোথা থেকে কিনেছে?”
উত্তরে যাদব জানাল যে আজকাল রাস্তার পাশে অনেক ছোটোখাটো দোকানেই এক লিটারের বোতলে খুচরো ইল-লিগ্যাল পেট্রোল বা ডিজেল কিনতে পাওয়া যায়। অনেকেই প্রয়োজন মতো গাড়িতে দু-এক বোতল পেট্রোল বা ডিজেল রাখে। যশোর রোডের ধারে তেমনই একটি দোকান থেকে কাল শেষ রাতে পনেরো বোতল পেট্রোল নিয়েছে কেউ। বিক্রেতার নাম রবি কুণ্ডু। মোটামুটি শেষরাত থেকেই সে খুচরো বে-আইনি পেট্রোল বা ডিজেলের পসরা সাজিয়ে বসে। এক দু-বোতল বেচাকেনা হলে দোকানি ক্রেতাকে মনেও রাখে না। কিন্তু এই বিশেষ মানুষটি রবিকে বলেছিল, “একটা দুটোয় আমার কিস্যু হবে না। তোমার কাছে যতগুলো বোতল আছে, আমায় দাও।”
রবির কাছে তখন পেট্রোলের মাত্র পনেরোটা বোতলই ছিল। অর্থাৎ পনেরো লিটার। সে এমন আবদার শুনে অবাক; “এত লিটার তেল নিয়ে কী করবেন? এমার্জেন্সির জন্য এক্সট্রা পেট্রোল রাখতে হলে দু-লিটার বা পাঁচ-লিটারই তো যথেষ্ট! পনেরো লিটার তেল নিতে হলে পেট্রোল পাম্পে যান না!”
“আমি দু-লিটার নিই বা পনেরো লিটার, তাতে তোমার কী?” ক্রেতাটি ধমকে উঠেছিল, “তেল নিয়ে কী করব তা নিয়ে মাথাব্যথাই বা কীসের? আমি গাড়িকে খাওয়াব, দরকার হলে ঢকঢক করে নিজেই খাব। তুমি দেবে কিনা বলো৷”
এই অবধি শুনেই অধিরাজ গম্ভীর স্বরে বলে, “আর রবিও এককথায় পনেরো লিটার পেট্রোল দিয়ে দিল! বার্নিং শিখের মাস মার্ডারের খবর এখন একটা বাচ্চা ছেলেও জানে! সেক্ষেত্রে ক্রেতা যখন এতটা পেট্রোল চাইছে, তখন লোকটার একটুও সন্দেহ হল না?”
“সন্দেহ হয়েছিল বলেই তো খবরটা পেলাম স্যার।” যাদব জানায়, “তবে তখনই সন্দেহ হয়নি। কারণ খবরের কাগজে বার্নিং শিখকে একজন মাঝবয়েসী পুরুষ বলা হয়েছে। কিন্তু কাল যিনি পনেরো লিটার পেট্রোল কিনেছেন, তিনি একজন সুন্দরী মহিলা। তাই তখনই কিছু মনে হয়নি। পরে অবশ্য খটকা লেগেছে যে শেষরাতে কোন ভদ্রঘরের সুন্দরী মহিলা রাস্তায় বেরোয় ও পনেরো লিটার পেট্রোল, পেট্রোল পাম্পে না গিয়ে বে-আইনি দোকান থেকে তোলে।”
অধিরাজের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে যায়, “আই সি! আর কিছু?”
যাদব বলল, “হ্যাঁ। আরও আছে। রবি অত্যন্ত শয়তান পাবলিক। তার ওপর এইসব বিজনেসের আগে মালটা হিস্ট্রিশিটার ছিল। আমাদেরই পুরোনো ইয়ার। তাই বুকের পাটা আছে। মহিলা যেই গাড়ি করে পেট্রোল নিয়ে চলে গেল, অমনি পেছন পেছন রবিও ওর স্কুটার নিয়ে মহিলাকে ফলো করেছিল। একে শাঁসালো খদ্দের, তার ওপর ওরকম সুন্দরী! আর মেয়েছেলে দেখলেই ও কাত। সঙ্গে কিছুটা সন্দেহ তো ছিলই। তাই ও মেয়েটার পেছন পেছন গিয়ে ওর ঘাঁটিটাও দেখে এসেছে।” সে বুক পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করল, “এই হল মালটার ঠিকানা!”
“জ্যাকপট!” অধিরাজ উত্তেজিত ভঙ্গিতে চিরকুটটা নিয়ে নেয়, “৪৫, যশোর রোড, ইটালগাছা, মোতিলাল কলোনি। এই লোকেশন তো দমদম এয়ারপোর্টের কাছে।” “মোতিলাল কলোনি, রাজবাড়ি!”
ঘন্টু প্রায় লাফিয়েই ওঠে, “স্যার, আমার কাছেও একটা খবর আছে। সেটাও প্রায় এই লোকেশনেই।”
“বলে ফ্যাল।”
“মোতিলাল কলোনিতে নাকি বেশ কিছুদিন ধরেই লোকেরা একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করছে! ওখানেই আশেপাশে বেশ কয়েকটা গুরুদ্বারাও আছে। মোতিলাল কলোনি, ইটালগাছাতেই গুরুদ্বারা শিখ সঙ্গত আছে। ঐ অঞ্চলে প্রচুর শিখও থাকে স্যার। আমি কেরোসিন মার্কেট ছাড়াও কলকাতার শিখ কলোনিগুলোয় ফিল্ডিং দিচ্ছিলাম। কারণ আমার মন বলছিল, বার্নিং শিখ সম্পর্কে এখানকার শিখেরা কিছুই জানবে না, তা অসম্ভব। শিখ কমিউনিটির আবার ‘বিরাদরির ওপর খুব টান। তাই লোকাল শিখদের আলাপ আলোচনা শুনছিলাম। যদি কিছু শোনা যায়। বা যদি নতুন কারোর আসার খবর পাওয়া যায়। নিজে তো ঘুরছিলামই, ছেলেপুলেদেরও নামিয়ে দিয়েছিলাম।”
“ব্রিলিয়ান্ট।” অধিরাজের চোখে প্রশংসা, “এইজন্যই তোকে খবরিদের সুপারস্টার বলে। বলার আগেই কাজ নামিয়ে দিস। কোনো খবর পেলি?”
“নিশ্চয়ই।” ঘন্টু কান এঁটো করা হাসি হাসল, “আমি ঠিকানাটা বলতে পারব না। তবে ইটালগাছা, রাজবাড়ির শিখেরা বলছিল, ঐ এলাকারই এক বড়োলোক মহিলা কোমল কৌরের বাড়িতে নাকি নতুন ‘মেহমান’ এসেছে। কোমল কৌরের ম্যালা পয়সা। আশেপাশের গরীব লোকদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলে না। তবে কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে যে ও বাড়ির রাঁধুনিকে নাকি এখন আরও একজনের রান্না এক্সট্রা করতে হচ্ছে। রাঁধুনি ছাড়া কোমল কৌরের বাকি চাকর বাকরদের সাতদিনের জন্য ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের!”
“কেন?”
“গত দশবছরে ও মহিলা কখনও চাকর-বাকরদের মাসে-দু মাসে একদিনের বেশি ছুটি মঞ্জুর করেনি। বহুত বজ্জাত মেয়েছেলে। একদিন ছুটি দিলেও টাকা কেটে নেয়৷ ও নিজে নাক উঁচু হলেও ওর চাকর-দাসীরা লোকালিটির সঙ্গে মেশে। তারাই বলে বেরিয়েছে যে, মালকিন এমনই হোঁৎকা যে কুটোটিও নাড়তে পারেন না। বিয়ে থা ও করেননি। তাদের ভাষায় ‘কুচ্ছিত, মোটা-আইবুড়ি।’ তিনকূলে কেউ নেই! অথচ তিনিই নাকি সব চাকর-বাকরদের মোটা টাকা দিয়ে লম্বা ছুটিতে পাঠিয়েছেন। নেহাৎ পেটের দায়ে কুকটি রয়ে গেছে। কুক না থাকলে উনি না খেয়ে মরবেন। রাঁধুনীর রীতিমতো সন্দেহ, যে ও বাড়িতে আরও কেউ আছে। নয়তো যেখানে আগে মালকিন তিনটে পরোটার বেশি রাতে খেতেনই না, এখন কিনা আটটা পরোটা খাচ্ছেন। কিন্তু কোমল কুক-মহিলাকে কিচেন ছাড়া অন্য কোথাও যেতেই দেন না। বিশেষ করে বাড়ির দোতলায়।”
“এক্সট্রা পাঁচটা পরোটার হিসাব বেশ গোলমেলে। কোমল কৌরের ডায়েট চার্টটার খবর নেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না।”
“শুধু তাই নয়। কখনও ভোরে, কখনও রাতে ওখানকার লোকেরা প্রায়ই সেই বিখ্যাত শিস শুনতে পাচ্ছে। অনেকেই বলেছে যে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রাতের বেলায় বা ভোর রাতে কেউ ‘গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই’ গানটা শিস দিয়ে ভাঁজতে-ভাঁজতে চলে যায়। অনেকে আবার বেরিয়ে এসে দেখার চেষ্টাও করেছে যে কোন্ ব্যাটা পাগল, কিংবা মাতাল মদ-গাঁজা ফুঁকে ভন্ড হয়ে অসময়ে সিটি বাজাচ্ছে। কিন্তু কাউকে দেখতে পায়নি।”
“এই কোমল কৌর ঠিক কী করেন?”
ঘন্টু মাথা নাড়ল, “স্যার, সে বিষয়ে কোনো খবর পাইনি। শুধু এইটুকু শুনেছি যে মহিলার বিজনেস আছে। আরও একটু সময় পেলে ডিটেলস বের করে ফেলতাম। কিন্তু…।”
“ঠিক আছে। ছাড়।” অধিরাজ তাকে সান্ত্বনা দেয়, “আমরা না-হয় বাকিটা খুঁজে নেব। মহিলার ঠিকানা জানিস?”
“না। একেই আমি অপরিচিত বলে লোকে একটু নজর করছিল। তার ওপরে একজন মহিলার ঠিকানা চাইতে গেলে হয়তো মেরে টেরেই দিত। শিখদের আমি ভীষণ ভয় পাই। ওদের মেয়েদের সম্পর্কে বেশি কৌতূহল দেখালে আবার তেড়ে আসে ব্যাটারা। তবে যাদবের দেওয়া ঠিকানার আশেপাশেই হতে পারে।”
“রাইট।” অধিরাজ স্মিত হাসছে, “মেয়েদের ব্যাপারে ওরা একটু কনজার্ভেটিভ। হওয়াও উচিত। প্রত্যেকেরই উচিত মেয়েদের সম্মান রক্ষা করা। দুঃখের বিষয়, সবাই এটা বোঝে না। শিখরা অন্তত বোঝে।”
ঘন্টু প্রত্যুত্তরে একটু বিষণ্ণ হাসল। তাকে যে এভাবে সরে যেতে হচ্ছে সেটাই হয়তো তার মনখারাপের কারণ। যাদবের মুখও একই কারণে ম্লান। ওরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দক্ষ ইনফর্মার। লম্বা রেকর্ড এক-একজনের। অত্যন্ত অভিজ্ঞও। কেউ কুড়ি বছর ধরে সার্ভিস দিচ্ছে, কারোর বা পঁচিশ বছর হয়ে গেল। কখনও প্রয়োজনের সময় এভাবে সরে দাঁড়াতে হয়নি। অথচ এইবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অধিরাজ ওদের দু-জনের হাতেই টাকার অনেকগুলো নোট ধরিয়ে দিয়েছে, “চল। আপাতত গুডবাই। নেক্সট কেসে ফের দেখা হবে। যাদব আর ঘন্টু, তোরা দু-জনেই সলিড খবর দিয়েছিস। গ্রেট ওয়ার্ক। আর হ্যাঁ, পেছনের দরজা দিয়ে বেরোবি। সামনে এখনও প্রেস ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
দু-জনেই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে স্যালুট করে চলে গেল। অধিরাজের মুখে ফের চিন্তার ছায়া ঘনায়, “দুটো ইনফর্মেশনই মারাত্মক। এবং আশ্চর্যভাবে লোকেশনটাও প্রায় একই। আমি আশ্চর্য হব না যদি ৪৫, যশোর রোড, ইটালগাছা, মোতিলাল কলোনির অ্যাড্রেসটা কোমল কৌরের হয়। ভদ্রমহিলার পরোটার গল্পটা কী সেটা না-জানলেও বুঝতে পারছি, ও বাড়ির দোতলায় কোনো খিচুড়ি আছে!”
“কিন্তু স্যার…।” অর্ণব সংশয়ান্বিত স্বরে বলল, “অ্যাকর্ডিং টু রবি যে মেয়েটি পেট্রোল কিনেছে সে সুন্দরী। আবার ঘন্টুর ইনফর্মেশন অনুযায়ী কোমল কৌর মোটা এবং বিচ্ছিরি। রবির চোখে যদি কোনোরকম প্রবলেম না থাকে তবে সেই সুন্দরী আর যেই হোক স্বয়ং কোমল হতে পারেন না!”
“তিনি না-হলেও তাঁর গেস্ট হতে পারেন।”
“তা হতে পারেন।” সে আমতা আমতা করে বলে, “কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সুন্দরী মহিলাকে পাঁচটা পরোটা খেতে দেখেছেন আপনি? তার ওপর কোমল কৌর আবার শিখ। মেডিক্যাল কলেজে আমার এক পাঞ্জাবি বন্ধু ছিল। একবার ওদের বাড়িতে লাঞ্চে গিয়েছিলাম। পরোটায় যে কী পরিমাণ ঘি দেয় ওরা তা আপনি ভাবতেও পারবেন না! সেই পাঞ্জাবি পরোটা দুটো খেতেই আমার ঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই ভীম-পরোটা কোনো সুন্দরী গপগপ করে পাঁচটা খেয়ে নিচ্ছেন এটা ভাবতে পারেন আপনি?”
“ওয়েল…!” অধিরাজ হেসে ফেলল, “ইন দ্যাট কেস সেই মহিলাকে মেরি কম, করনাম মালেশ্বরী বা গীতা ফোগাতের মতো হেভিওয়েট সুন্দরী হতে হবে। তবে আমারও মনে হয় না যে গীতা ফোগাতও পাঁচটা পরোটা একসঙ্গে ডিনারে বা লাঞ্চে খেয়ে থাকেন। গীতার বাবা অবশ্য খেতেই পারেন। পরোটা তো ছাড়ো, পাঞ্জাবিরা রুটিতেও একগাদা ঘি দেয়।”
“তবে কোমল কৌরের বাড়িতে ক-জন আছেন? অথবা সেই সুন্দরী মহিলা কি আদৌ মহিলা!”
“ব্রিলিয়ান্ট।” অধিরাজ অর্ণবের পিঠ চাপড়ে দেয়, “হান্ড্রেড পার্সেন্ট চান্স আছে যে তিনি আদৌ মহিলা নন। তার ওপর একটা জিনিস লক্ষ্য করলে? ঘন্টু বলল যে কোমলের এক্সট্রা ডায়েটটা রাতেই হয়। লাঞ্চে বা ব্রেকফাস্টে নয়, শুধু ডিনারে। যে গেস্টই এসে থাকুন, তিনি শুধু রাতেই ও বাড়িতে ভোজন করেন। শিসটাও রাতে কিংবা ভোরের দিকে শুনতে পাওয়া যায়। তাহলে সেই বিখ্যাত অতিথি সকাল ও দুপুরের ভোজনটা কোথায় সারছেন?”
আরও একটা খটকা! অধিরাজের কথাতেই স্পষ্ট যে কোমল কৌরের অতিথি দিনে অন্য কোথাও থাকেন। তিনি হয়তো নারীও নন। অর্ণবের যুক্তি সম্পূর্ণ সঠিক। পাঞ্জাবিদের ঘি দেওয়া প্রমাণ সাইজের পরোটা পাঁচটা খেয়ে নেওয়া কোনো সুন্দরীর পক্ষে সম্ভব নয়। যদি খেতেও পারেন, সেক্ষেত্রেও মহিলা তথাকথিত ‘সুন্দরী’ থাকবেন না, বরং ঘন্টুর বর্ণনা অনুযায়ী ‘হোঁৎকা’ হয়ে যাবেন। পরোটা তো দূর, এই পরিমাণে পাঞ্জাবি ঘি-মাখন দেওয়া ফুলকা খেতে থাকলেও তিনি নিজেই কিছুদিন বাদে ফুলকাতে পরিণত হবেন।
“আমরা কি এখন কোমল কৌরের পরোটার খবর নিতে যাব স্যার?”
অর্ণবের প্রশ্নে সামান্য আত্মমগ্নভাবে বলল সে, “সে তো যেতেই হবে। তবে তার আগে নিজেরাই দুমুঠো ভাত সাঁটিয়ে নিই। উনি তো আমাদের আর লাঞ্চ অফার করবেন না। কাল রাতের পর থেকে শুধু ধাক্কার পর ধাক্কা ছাড়া আর কিছুই খাইনি। ওদিকে বারোটা বাজতে আর দশ মিনিট বাকি। গুল্লুও এসে পড়বে। দশ মিনিট হাতে আছে। চলো, ক্যান্টিন থেকেই ভাত আর মাংসের ঝোল গিলে নিই। আজ সারাদিন আর কিছু জুটবে বলে মনে হয় না।”
“ওকে স্যার।”
ক্যান্টিনের খাবার মোটামুটি ভালোই। অর্ণব আবার এখানকার মা খুব পছন্দ করে। তাই তার অনারে অধিরাজ ভাত আর মাটন কারিই অর্ডার করল। কিন্তু অন্যান্যদিনের মতো রসিয়ে খাওয়ার সময় নেই। অধিরাজ বুকপকেট থেকে একটা নোটবুক বের করে বলে, “যতক্ষণে লাঞ্চ এসে পৌঁছয়, ততক্ষণে আমরা বার্নিং শিখ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তার একটা সাম আপ করে ফেলি। প্রথমে তুমিই পয়েন্টগুলো একে একে বলো। এখনও পর্যন্ত কী কী নোটিস করেছ?”
অর্ণব একটু ভেবে বলে, “লোকটার বয়েস পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কাছাকাছি। চেহারা একেবারেই সাদামাটা। টিপিক্যাল শিখদের মতো একেবারেই নয়। বরং ছোটোখাটো আর বৈশিষ্ট্যহীন। এতটাই সাধারণ যে অনায়াসেই নিজেকে হাইড করতে পারে।” সে একটু থেমে বলল, “স্যার, আমাদের কোনো ভুল হচ্ছে না তো? পাঞ্জাবি, বিশেষ করে শিখদের চেহারা কিন্তু একটু অন্যরকম হয়। এত সাদামাটা একেবারেই হয় না!”
“এখানেই তো ভুল করছ ডার্লিং।” সে প্রথম পয়েন্টটা নোট ডাউন করতে করতে বলে, “শিখ বললেই তোমাদের চোখের সামনে দারা সিং-এর চেহারাটা ভেসে ওঠে। কিন্তু তোমরা ভুলেই যাও আমাদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-ও একজন শিখ। ওঁর চেহারাটা একবার ভেবে দেখো! যদি ভদ্রলোকের মাথার পাগড়িটা সরিয়ে নেওয়া হয় আর গোঁফ দাড়ি, চুল সব কেটে দেওয়া হয়, তবে কোনো অ্যাঙ্গেল থেকে কি ওঁকে শিখ বলে মনে হবে? একদম নরম সরম, মিতভাষী, ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। হাঁটার ধরণ বা কথা বলার স্টাইল, কোনোটাই অ্যাগ্রেসিভ নয়। ইনফ্যাক্ট সঞ্জয় বারুর মতে, ভদ্রলোক ভাষণ দিতে গেলেও তোতলাতেন। যতই উত্তেজক স্পিচ লিখে দেওয়া হোক না কেন, ওঁর মিনমিনে কথা বলার স্টাইলে সেটা প্রায় এক্সপ্রেশনলেস হয়ে যেত। বাট স্টিল হি ইজ আ শিখ। তাই চেহারায় বৈশিষ্ট্য খুঁজো না। নেক্সট?”
“লোকটা মেক-আপে ওস্তাদ। যে কোনো রূপে, যে কোনো মূর্তিতে থাকতে পারে। আদতে পুরুষ হলেও সেক্স চেঞ্জ করলেও করতে পারে।”
“রাইট। এর সঙ্গে আরও একটা অল্টারনেটিভ অ্যাড করছি।” সে লিখতে লিখতেই বলল, “পুরুষের পাশাপাশি সে মেয়েদের রূপও ধরতে পারে। এই প্রব্যাবিলিটিটাও আছে। কারণ কেউ তাকে পুরুষের রূপে দেখেছে, কেউ আবার সুন্দরী নারী হিসাবে দেখেছে। প্রস্থেটিক মেক-আপে অলমোস্ট মাস্টার লোক, যে মেক-আপের সাহায্যে অনায়াসেই নিজের বয়স বাড়ায় বা কমায়, জেন্ডারও পালটে ফেলে। তবে ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার চান্সটাও ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। কন্ট্রাডিক্টরি পয়েন্ট। থার্ড?”
“লোকটা লেফটি।”
“না অর্ণব।” এবার অধিরাজ সখেদে মাথা নাড়ল, “আজ ভোরেও আমার ধারণা ছিল লোকটা লেফটহ্যান্ডার। কিন্তু সনতের লাশ দেখে ডঃ চ্যাটার্জি কী বলেছিলেন মনে আছে?”
এবার অর্ণবের ডঃ চ্যাটার্জির কথাগুলো মনে পড়ল। কথাগুলো মাথার মধ্যে ফ্ল্যাশ করামাত্রই সে বলল, “এগেইন কন্ট্রাডিকশন স্যার! সনতের মাথায় হাতুড়ির বাড়ি বাঁ হাত দিয়েই মারা হয়েছে। কিন্তু তরোয়াল দিয়ে যখন কেটেছে তখন খুনি তরোয়ালটা ডানহাতেই ধরেছিল। কারণ সনতের হেড ইনজুরিটা রাইট সাইডে, কিন্তু ডেডবডির কাট বা স্ল্যাশগুলো লেফট টু রাইট!”
‘এককথায় তিনি অ্যাম্বিডেক্সট্রাস, তথা সব্যসাচী। দু-হাতই সমানভাবে ব্যবহার করতে পারেন। আর আমরা খামোখাই লেফ্টটি খুঁজে মরছি।” অধিরাজ হতাশ, “এই লিডটাও গেল।”
“বার্নিং শিখ দিল্লিরই লোক। মদন বলছিল, তার হিন্দিটা দিল্লির কলোকিয়াল স্টাইল। কয়েনেজগুলোও খাস দিল্লির। কিন্তু এখানেও ফের কন্ট্রাডিকশন। কোথাও সে হিন্দিতে কথা বলেছে, কোথাও বাংলায়। লোকটা বাংলাও বলতে পারে। ইনফ্যাক্ট একাধিক ভাষা তার আয়ত্তে।”
“এক্সেলেন্ট পয়েন্ট অর্ণব।” সে মাথা ঝাঁকাল, “নোটেড।”
“খুনি অন্যান্য সিরিয়াল কিলারদের মতো নয়। দরকারে সে প্যাটার্নও পালটায়।”
“প্যাটার্ন নয়, ওয়েপন পালটায়।” অধিরাজ আত্মমগ্ন, “এমন সব ওয়েপন সে চুজ করছে যেগুলো হয় মানুষকে কেটে টুকরো টুকরো করে, নয় মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সেটা কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল হতে পারে, বম্ব হতে পারে, অ্যাসিড হতে পারে, এমনকি ফসজিন বা মাস্টার্ড গ্যাসের মতো জিনিসও হতে পারে। প্যাটার্নটা সেই উনিশশো চুরাশির মাস কিলিং এরই। সেখান থেকে নড়চড় হয়নি।”
“ওকে। খুনির শিস দেওয়ার অভ্যাস আছে। আর একটা গানই সে গায় বা সেটার সুরেই শিস দেয়।”
“গুমনাম হ্যায় কোই, বদনাম হ্যায় কোই। এটা সে জেনেশুনে করে না অর্ণব।” অধিরাজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, “এই গানটা তার অবচেতনে ঢুকে গেছে। বার্নিং শিখ এতবড়ো মূর্খ নয় যে জোরে জোরে শিস দিয়ে সবার দৃষ্টি বা মনোযোগ, তার নিজের দিকে আকর্ষণ করবে। তা সত্ত্বেও সে শিস দিচ্ছে। সবসময় নয়, যখনই সে মার্ডার বা মার্ডার অ্যাটেম্পট করছে, তার আগে বা পরে। তার চোখদুটো নিবিড় ভাবনায় ডুবে যাচ্ছে, এবং বেছে বেছে এই শিসটাই দিচ্ছে। এটা তার ফেভারিট গান হতে পারে। আবার তার থেকেও বেশি কিছু হতে পারে।”
“মানে?”
“গুমনাম ফিল্মটা রিলিজ হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। তার উনিশ বছর বাদে শিখ জেনোসাইড হয়। কিন্তু লতা মঙ্গেশকরের এই গানটা এতটাই বিখ্যাত ছিল যে তার বহুযুগ পরেও লোকের মুখে মুখে ঘুরত।” অধিরাজ আস্তে আস্তে বলে, “এমন নয়তো, যে ঐ তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই গানটার কোনো যোগ আছে? লতা মঙ্গেশকর আজীবন এমন ক্রিপি গান আরও অনেক গেয়েছেন। একটা সময়ে তো হন্টিং গান থাকলেই সুরকাররা লতা মঙ্গেশকরকেই পাকড়াও করতেন। আয়েগা আনেওয়ালা, গুমনাম, মেরা সায়া, কহি দীপ জলে কহি দিল, ঝুম ঝুম ঢলতি রাত, উয়ো ভুলি দাস্তাঁ, ন্যায়না বরসে রিমঝিম কিংবা জরা সি আহট। আমার মনে হয়, যখন বার্নিং শিখের সঙ্গে ট্র্যাজেডিটা ঘটছিল, তখন তার আততায়ীদের মধ্যে কেউ হয় এই পার্টিকুলার গানটা গাইছিল, অথবা শিস দিচ্ছিল। এই গানটা তার শৈশব থেকেই সর্বনাশের সুর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। যখনই সে ধ্বংসাত্মক মূর্তি ধরে, তখনই তার অবচেতন মন এই গানটাকেই বেছে নেয়। সেজন্যই সে নিজেরই অজ্ঞাতে শিসটা দিয়ে ফেলে। ইনফ্যাক্ট ও সবদিক দিয়েই ১৯৮৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসের ঐ ক-টা দিনকেই রিক্রিয়েট করছে। সেই অ্যাসিড অ্যাটাক, নেকলেসিং, কেটে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। সেই মোক্ষম বাহাত্তর ঘণ্টা, যে বাহাত্তর ঘণ্টায় দিল্লির শিখ পরিবারগুলো কোথায় পালাবে, কীভাবে নিজেকে বাঁচাবে ভেবে পাচ্ছিল না! কী প্রচণ্ড আতঙ্কে তারা ভুগেছিল, তা একবার কল্পনা করে দেখো। সেই আতঙ্ককেই ফিরিয়ে আনার জন্য তার কী ভয়াবহ প্রচেষ্টা! আমাদের ভিকটিমরা কেউ শান্তিতে আছে বলে তোমার মনে হয়? তাদের ছাড়ো, আমরাই সর্বক্ষণ আতঙ্কে কাঁটা হয়ে আছি। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে, আবার বুঝি আঘাত এল! আর এই গানটার সঙ্গে তার ঐ ব্যক্তিগত বাহাত্তর ঘণ্টার অভিজ্ঞতার কোনো একটা সম্পর্ক থাকা অসম্ভব নয়।”
অর্ণবের মনে হল, খুনি সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এই মুহূর্তে কলকাতার রাস্তার গোটা ভিড়কেই অ্যারেস্ট করলে হয়তো রিস্ক ফ্যাক্টর কমবে। সে কাজটাও অবশ্য দিল্লি পুলিশ করেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। কথাটা মনে পড়তেই ‘সে বলে ওঠে, “বার্নিং শিখ প্রয়োজন ছাড়া শিখের মূর্তি ধরে না। লাল পাগড়ি, চোলা বা অন্যান্য জিনিসগুলো সে শুধু ছদ্মবেশেই ধারণ করে। অন্য সময় এর একটাও তার গায়ে থাকে না।”
“এর থেকে ভালো নিউজ আর হতেই পারে না।” অধিরাজ করুণ হাসল, “শিখকে যদি শিখ হিসাবে চেনাই না যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সে সব ধর্মের মানুষের ছদ্মবেশ সেইজন্যই নিতে পারে। তবে আমার একটা প্রশ্ন তুমি খেয়াল করোনি। গ্যাসটা সে বদ্ধ ঘরে কোন উপায়ে ঢোকায়? নকল চাবি না-হয় বুঝলাম, কিন্তু ডোর ল্যাচ খুলে বেডরুমগুলোয় ঢোকে কী করে?”
অর্ণবের মাথায় একটা আইডিয়া খেলে যায়, “স্যার, পুলিশেরা বা আমরা দরজায় ফোর্সড এন্ট্রির ছাপ খুঁজেছি। জানলার দিকে কেউ লক্ষ্যই করেনি কারণ সব জানলাই হাট করে খোলা ছিল। ইন এনি কেস, সে জানলা দিয়ে ঢোকেনি তো? ফোর্সড এন্ট্রিটা হয়তো দরজা দিয়ে নয়, জানলা দিয়েই হয়েছিল!”
“ভ্যালিড পয়েন্ট।” সে একটু চিন্তা করে বলল, “কিন্তু তবে জানলার কাচ তো ভাঙতে হত। গ্রিলই বা খুলল কী করে?”
“আজকাল লোকে আর গ্রিলওয়ালা জানলা লাগায় না স্যার। বেশিরভাগই স্লাইডিং কাচওয়ালা জানলা লাগায়। বাইরে থেকে গোটা কাঠামোটাই যদি স্ক্রুসুদ্ধ খুলে নেওয়া যায়, তাহলে একদম ফাঁকা মাঠ। আর যদি নিদেনপক্ষে গ্রিলও যদি থাকে, তবে এখন আর সেই আগের মতো লোহার শিকওয়ালা গ্রিল থাকে না। ওটাকেও পুরো প্যানেলসুদ্ধ খোলা যায়।”
“সেক্ষেত্রে তাকে প্রতিটা বেডরুমের জানলা একটা একটা করে খুলে একের পর এক বেডরুমে ঢুকতে হবে।” অধিরাজ হেসে ফেলল, “কারণ বেডরুমগুলো একটাও একটার সঙ্গে আর একটা ইন্টারকানেক্টেড ছিল না। যদি ধরেও নিই যে কোনো একটার জানলা দিয়ে সে ঢুকেছে, তবে একটা রুমের অ্যাক্সেস অন্তত পাবে। ঐ বিশেষ ঘরের দরজা খুলে ভেতর থেকে বাইরেও সে বেরোল কিন্তু অন্য বেডরুমগুলোয় ঢুকতে গেলে আবার সেই একই ল্যাচ বা ছিটকিনির প্রবলেম। তবে কি সে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আবার অন্য বেডরুমের জানলাগুলো একটা একটা করে খুলে ঢুকেছে? শুধু তাই নয়, কাজ শেষ করার পর আবার গ্রিল, জানলা, সবই একটা একটা করে লাগিয়েছে! পুলিশ জানলার পাল্লা খোলা পেয়েছে, পুরো জানলাটাই খোলা পায়নি। উইন্ডো অক্ষত ছিল। উইন্ডোর লকে একটিও আঁচড় ছিল না। অর্ণব, একটা প্যানেলসুদ্ধ জানলা খুলতে কত সময় লাগে তোমার আন্দাজ আছে? যদি অত্যন্ত দক্ষ মিস্ত্রিও হয়, তবু কমসে কম পুরো জিনিসটা খুলতে তার মিনিমাম একঘণ্টা লাগবে। একাধিক জানলা হলে আরও দু-তিনগুণ টাইম প্রয়োজন। এবার কাজ শেষ করে ফের একটা একটা করে জানলা লাগাতে হবে তাকে। যদি দুটো বেডরুমেও সে ঢুকে থাকে, তবে শুধু জানলা খোলা, আর ফের লাগানো, এইটুকু কাজ করতেই তার মিনিমাম চারঘণ্টা লাগার কথা! এই চারঘণ্টা ধরে সে জানলা নিয়ে লড়ে যাচ্ছিল, অথচ কেউ তাকে দেখল না!” সে থেমে যোগ করল, “আর সব ক-টা ক্রাইমস্পটই কিন্তু গ্রাউণ্ড ফ্লোরে ছিল না। বরং বেশিরভাগই সেকেন্ড কিংবা থার্ডফ্লোরে ছিল। দু-তিনটে কেসে তো সাত-আটতলাতেও ছিল। বার্নিং শিখ মুখে একটা পেল্লায় গ্যাস মাস্ক পরে, দু-দুটো গ্যাসের ক্যানিস্টার সঙ্গে নিয়ে, আস্ত একটা টুলবক্স হাতে সাত-আটতলার পাইপ চড়ে অতবড়ো পেল্লায় জানলাগুলো খুলে ভেতরে ঢুকেছিল বলছ?”
অধিরাজ বলতে-বলতেই এবার সজোরে হেসে উঠল, “দেন কনগ্র্যাচুলেশনস। বার্নিং শিখ হয় স্পাইডারম্যান, নয় রজনীকান্ত। নয়তো এ অসম্ভব কাজ আর কারোর দ্বারা সম্ভব নয়! হ্যাঁ, জেমস বন্ডও অবশ্য পারেন। তার কাছে প্রচুর অদ্ভুত সব গ্যাজেট থাকত। তিনি গাড়ি অদৃশ্য করতে পারতেন, বুলেটপ্রুফ কাচ আংটি দিয়ে ভাঙতে পারতেন, ইভেন পেনের মধ্যে বম্ব নিয়েও ঘুরতেন শুনেছি। এবার তুমিই বলো, কাকে গ্রেফতার করি? স্পাইডারম্যান, রজনীকান্ত না জেমসবন্ডকে?”
অর্ণব তার বোকামি বুঝতে পেরে নিজেই হেসে ফেলল। তারপর বলল, “তাহলে আর কী উপায় হতে পারে স্যার?”
“তোমার কি একবারও মনে হল না যে বার্নিং শিখের ব্যাকগ্রাউণ্ডে তালাচাবিওয়ালার পেশা থাকলেও থাকতে পারে? সে একজন লকস্মিথ হতে পারে? যদি তার কাছে লকস্মিথের টুলবক্স থাকে তবে নকল চাবি তৈরি করা, বন্ধ ঘরের ল্যাচ, ছিটকিনি অক্ষতভাবে খুলে ফেলা জাস্ট বাঁ হাতের কাজ। একজন পেশাদার লকস্মিথের টুলবক্সে ভারি মজাদার কিছু জিনিস আছে যেগুলোকে ল্যাচ বাইপাসিং টুল বলে। সেগুলো এতই উন্নত যে বন্ধ ঘরের ল্যাচ বা ছিটকিনির লোকেশন যদি জানা থাকে তবে একটা আঁচড়ও না কেটে মাত্র কুড়ি থেকে ত্রিশ সেকেন্ডেই বাইরে থেকে সে যে কোনো ল্যাচ, লক বা ছিটকিনি খুলে ফেলতে পারবে। চারঘণ্টা ধরে জানলায় ঝোলার চেয়ে এটা বেটার অপশন নয়? ও পাবলিক যেভাবে বাড়িতেই ঘাঁটি গেড়ে ফেলে, তাতে দরজার ল্যাচ, ছিটকিনি কোথায় তা তার অজানা থাকার কথা নয়। তুমি কী বলো?” অর্ণব অপ্রতিভ হয়ে মাথা চুলকোচ্ছে, “মোস্ট প্রব্যাবলি দ্য ইজিয়েস্ট ওয়ে স্যার।
একদম সহজ। সেক্ষেত্রে এটা আর একটা ক্লু।”
“সহজ কথা ঠিক অতটা সহজ নয়।” তার চোখে ফের উদ্বেগ, “ইনি নিজেই হয় হাইটেক চাবিওয়ালা, অথবা কোনো লকস্মিথের সঙ্গে কানেকশন আছে, যার কাছ থেকে টুলবক্সটা নিয়েছেন। যাই হোক না কেন, লকস্মিথের ব্যাকগ্রাউণ্ড এখানে আছেই। সঙ্গে চেরি-অন-টপ এনার পুলিশ কানেকশনও আছে।”
“হোয়াট।”
অর্ণবের মাথায় এবার যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ল! বার্নিং শিখের সঙ্গে পুলিশের আঁতাত! মানে সর্ষের মধ্যেই ভূত?
“এটা তো তোমার আগেই বোঝা উচিত ছিল ডার্লিং।”
ততক্ষণে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর গরম গরম পাঁঠার মাংসের ঝোল চলে এসেছে। অধিরাজ আঙুল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল, “নয়তো বেঙ্গালুরুতে কোন্ ‘সেফ হাউসে’ কোন্ ফ্যামিলিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সেটা সে জানল কী করে? সেফ হাউসের তথ্য পুলিশের টিম ছাড়া আর কেউ জানত না। কোন্ পুলিশ অফিসারের কোথায় দুর্বলতা, কে কখন অফিসে আসে বা যায়, কোন্ গাড়িটা কার, এসব তথ্য তার কাছে যায় কী করে? বাকিদের কথা বাদ দাও, আমাদের খবরও ওর কাছে আছে। তোমার আমার খবর শুধু নয়, খবরিদের ডিটেলস, ব্যুরোর লোকেশন, ফরেনসিকের লোকেশন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের বাড়িতে কে কে আছে, কোন্ অফিসার কেমন চরিত্রের, তার স্ট্রেংথ, উইকনেস, সব রিসার্চ করে মাঠে নেমেছে। শুধু এখানেই নয়, দিল্লি, কানপুর আর বেঙ্গালুরুতেও তার রিসার্চ মারাত্মক লেভেলের ছিল। যদি টানা একবছর ধরে সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তথ্য সংগ্রহ করেও থাকে, তবুও এই ডিপার্টমেন্টের ভেতরের লোকের সাহায্য ছাড়া এ কাজ সম্ভবই নয়।”
“কিন্তু… ডিপার্টমেন্টের লোক…!” অর্ণবের মাথা ঘুরছে। তার বিশ্বাসের গোড়ায় একেবারে মোক্ষম কুঠারাঘাত পড়েছে, “তা কী করে হয় স্যার।”
“পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আর আর্মিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কারা থাকে জানো?” সে বলে, “শিখেরা। কারণ ওদের থেকে সাহসী, শক্তিশালী আর ডেডিকেটেড প্রজাতি খুব কমই হয়। আর শিখেরা সর্বত্র আছে। এই তো দেখো, কলকাতাতেই টুইঙ্কল অরোরা নামক এক অফিসার প্রণবেশদার টিমেই বসে আছেন। এমন খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। তাছাড়া ডিপার্টমেন্টের লোক বলতে শুধু অফিসাররাই নয়, কনস্টেবল, ক্লার্ক, আন্ডারকভার এজেন্টস, দরোয়ান, ড্রাইভার সমেত ক্যান্টিনের লোকও ইনক্লুডেড। সাইবার ক্রাইম বা মোবাইল ট্র্যাকিং এক্সপার্ট, ডেস্কে যারা অষ্টপ্রহর কাজ করে, এমনকি যে চা-ওয়ালা রোজ আমাদের চা দিয়ে যায়, সে-ও আমাদের সব ডিটেলস জানে। ইনফ্যাক্ট ইনফর্মাররাও আছে। আর ইনফর্মার তো একজন দু-জন নয়। মেইন লিডার একজন থাকলেও তার আন্ডারে গোটা একটা নেটওয়ার্ক থাকে। জালের মতো গোটা শহরেই ছড়িয়ে আছে। অর্ধেককে তো আমরা চিনিই না। কতজনকে ট্র্যাক করবে তুমি। নিশ্চিন্ত থাকো, বাইরে থেকে নয়, ডিপার্টমেন্টের ভেতর থেকেই তার কাছে ইনফর্মেশন যাচ্ছে। হয় ব্রেনওয়াশের মাধ্যমে, নয়তো অজ্ঞাতেই। কারণ ১৯৮৪ এর দাঙ্গাটা শুধু দিল্লিতে নয়, গোটা দেশেই হয়েছিল। তাই ভুক্তভোগীরাও গোটা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা ওকে সাপোর্ট করতেই পারে। আবার বিরাদরির প্রেমে, পরম বিশ্বাসে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে তথ্য দিয়েও দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা নিজেরাই জানে না যে কপালদোষে যাকে ‘ব্রাদারহুডে’র অন্ধবিশ্বাসে সব কথা বলছে সে-ই আসলে মূর্তিমান সর্বনাশ।”
অর্ণবের মাথায় তখন একটা নামই ঘুরছে। গুলাব সিং, তথা গুল্লু। জাতে শিখ। ঘন্টু ও যাদবের মতোই সি.আই.ডি.-র অন্যতম শ্রেষ্ঠ খবরি। শুধু তাই নয়, টুইঙ্কল অরোরাকে টিমে নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? তার মনে হল গোটা দুনিয়াটাই বুঝি এক মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। তার বিশ্বাসের ভিতের ওপর যেন কেউ অ্যাটমবম্ব ফেলে দিয়েছে। সে নিজের অজান্তেই ক্যান্টিনের অল্পবয়েসী বয়দের মেপে নিতে শুরু করল। এই মুখগুলো সবই কি চেনা? কখনও তো এদের ওপর তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কবে এসেছে ওরা। কোন্ জাতের? হিন্দু, মুসলিম, না শিখ?
“কী ভাবছ?” অধিরাজ তাকে তাড়া দেয়, “তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। গুল্প এখনই এসে পড়বে।”
গুল্লুর নাম শুনেই অদ্ভুত একটা আতঙ্ক তাকে ঘিরে ধরল। এই ইনফর্মারটি অসংখ্যবার ব্যুরোয় এসেছে বা অন্য কোনো জায়গায় দেখা করেছে। ইনফ্যাক্ট, ঘন্টু, যাদব আর গুল্লু তখন থেকে সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সঙ্গে আছে, যখন অধিরাজ কিংবা অর্ণব নিতান্তই বাচ্চা! অনেক বড়ো বড়ো সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে ওরা যখন কাজ করছিল তখন হয়তো অধিরাজ, অর্ণবরা স্কুলব্যাগ, ওয়াটারবটল নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। এত পুরোনো খবরিদের সন্দেহ করার কোনো মানেই হয় না। তবু গুল্পর নাম শুনলেই কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে!
সে আর কোনো কথা না-বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। নামেই খাওয়া, আসলে কোনোমতে নাকে মুখে গোঁজা! কিন্তু এখন আর তার কোনোদিকে খেয়ালই নেই।
ভীষণ অবিশ্বাস, নীরবতা ঘিরে ধরেছে তাকে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যখন ফের কেবিনের দিকে ফিরছে, তখন সারা রাস্তায় অর্ণবের মনে হচ্ছিল একজোড়া অনভিপ্রেত চোখ ওদের ওপর সতর্ক নজর রাখছে। নিজেদেরই ডিপার্টমেন্টের লোক, জুনিয়র অফিসাররা যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, তখনই বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠছে। কেউ তার দিকে তাকিয়ে হাসলে, মনে হচ্ছে, এই মুখ টিপে হাসির পেছনে কি কোনো অর্থ আছে? কোনোদিন অফিসের সবার মুখ ঠিকমতো দেখে না৷ আজ প্রত্যেকটা মুখ ভালো করে দেখছিল সে। সব ক-জন অফিসারকে কি চেনে? ওদের মধ্যে অনেক নতুন মুখও তো আছে। এরা কবে জয়েন করেছে? দরোয়ান কিংবা পিওনদেরও তো ঠিকমতো চেনে না! এর মধ্যে যে কোনো অচেনা মুখই বিশ্বাসঘাতকের মুখ হতে পারে! অফিসারদেরই সবার ধর্মই তো জানত না ওরা। টুইঙ্কল অরোরার ব্যাপারে প্রণবেশ না বললে তো জানাই যেত না যে একজন শিখ অফিসারও ওদের অফিসে আছে! এমন হয়তো আরও অনেকে আছে। তাদের মধ্যে কার সঙ্গে বার্নিং শিখের লিঙ্ক আছে? কার সঙ্গে থাকতে পারে?
ভাবতে ভাবতেই শীতের মধ্যেও ফোঁটা ফোঁটা ঘামের বিন্দু জমা হল তার কপালে। এ কী অদ্ভুত পরিস্থিতির শিকার হয়েছে সে। কাউকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না! প্রত্যেকটা মুখ বড়ো বেশি যেন অপরিচিত! মনে হচ্ছে একটা মুখের মধ্যেই হয়তো আরও অনেক মুখ লুকিয়ে আছে, যারা কোনোদিন প্রকাশ্যে আসেনি। এটা সি.আই.ডি. ব্যুরো নয়, শত্রুশিবির হলে বুঝি হাঁফ ছেড়ে বাঁচত অর্ণব। অন্তত সেক্ষেত্রে জানা থাকত, ওরা সবাই শত্রু। কিন্তু এখানে বন্ধুবেশে শত্রু কোথায় লুকিয়ে আছে তা বোঝা অসম্ভব।
নিজের কেবিনে ঢুকে প্রথমেই পি সি চৌধুরী এবং ভূপেন্দ্র দত্তা’র বাড়ির আপডেট নিল অধিরাজ। মিস্ দত্ত এবং মিস্ বোস দু-জনেই ঠিকঠাক আছেন। এখনও পর্যন্ত কোনো আক্রমণ তো দূর, ভয় বা আশঙ্কার কারণ দেখা যায়নি। তবে একটু আগেই টিভিতে বার্নিং শিখের নিষ্ঠুর খুনগুলোর খবর শোনা পর্যন্ত দুটো পরিবারই চরম আতঙ্কে ভুগছে। চ্যানেলওয়ালারা দায়িত্ব নিয়ে জানিয়েছে একের পর এক সাপোর্ট হারিয়ে ক্রমাগতই শক্তিহীন হয়ে পড়ছে সি.আই.ডি. হোমিসাইড। সেটা জানার পর থেকেই বাড়ির মহিলারা কান্নাকাটি করছেন। পুরুষদের মধ্যেও এতটাই ভয় ঢুকে গিয়েছে যে কেউ ঘর থেকে বাইরে বেরোননি। এমনকি ভূপেন্দ্র দত্তা’র মতো ‘খড়ুস’ লোকও একদম নীরবতা পালন করছেন। তিনি নিজের ঘরে নিজেকেই ঘরবন্দি করেছেন। শালিনী চোখের জল ফেলছেন আর বলছেন, “আমাদের তো তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। পা তো বাড়িয়েই আছি। কিন্তু তানিশা আর আয়ানের কী অপরাধ? সোনালি আর বিরূপাক্ষই বা কী দোষ করেছে? তখন তো মেয়েটার জন্মই হয়নি। ‘বাপের দোষে শেষে কি ওর প্রাণটা যাবে। সে তো কাউকেই ছাড়বে না। আমরা সবাই মরব।…সবাইকে সে মারবে।” সোনালি তার বাপের কাণ্ডকীর্তি জানত না। কন্যারত্নের কাছে সবটাই চেপে গিয়েছিলেন ওঁরা। এতদিনে সে মায়ের মুখ থেকে জানতে পেরেছে যে আই.পি.এস. দত্তা ঠিক কী কী কাণ্ড করেছিলেন। তারপর থেকেই গুম্ মেরে বসে আছে। এ বাড়ির কেউ এখনও পর্যন্ত মুখে কুটোটিও কাটেনি। বাচ্চাগুলোকে আত্রেয়ী কায়দা করে খাইয়ে দিয়েছে, তবে বড়োরা সকলেই অনশনে আছেন। সর্বক্ষণই ভয় পাচ্ছেন। ব্যতিক্রম একমাত্র জুজুৎসু। সে বলেছে যে বার্নিং শিখকে হাতের কাছে পেলে জুজুৎসুর প্যাঁচে ওকে নাকানি-চোবানি খাইয়েই ছাড়বে।
“এই আর এক সাহসী প্রজাতি! গোর্খা!” অধিরাজ মন্তব্য করল, “অসম্ভব বিশ্বস্ত ও দুঃসাহসী। মিস্ দত্ত, আপনি জুজুৎসুর সঙ্গে সঙ্গে থাকুন। ওর কাছে কুকরি আছে?”
“আছে স্যার।” আত্রেয়ীর সপ্রতিভ জবাব, “আমাকে ও দেখিয়েও রেখেছে।”
“বেশ।”
অন্যদিকে প্রচণ্ড সন্ত্রাসে কাঁপছে পি সি চৌধুরীর পরিবারও। সোমলতা ইতিমধ্যেই মড়াকান্না জুড়ে দিয়েছেন। পি সি চৌধুরী-ও শান্তিতে নেই। শুধু ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছেন, “এর চেয়ে আমাকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দাও প্রভু। আমার ছেলে-ছেলের বউটা অন্তত বাঁচে।” বাড়ির তিনজন চাকর ও দাসী এখনও এসে পৌঁছয়নি। শিবু মোবাইলে জানিয়েছে, তার নাকি অসুখ করেছে। সে আপাতত ক-দিন আর আসবে না। শিখা আর কমলা এখনও আসেনি। শিখার নাকি কোন কুটুম এসেছে। সে দেরি করে আসবে ও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে। কমলার লেট হওয়া নিয়ে অবশ্য কেউ বিশেষ চিন্তিত নয়। তার ঝোলানোর অভ্যাস চিরকালীন। হয়তো এক-দু ঘণ্টা পর হেলতে দুলতে আসবে। যদিও তার আসার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ দত্তা পরিবারের মতো চৌধুরী পরিবারের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নেই। পরিমল ও মেঘনা নিজেদের ঘরে বসে কী গুজগুজ করছে কে জানে! কিন্তু সব মিলিয়ে মিস্ বোসের ভাষায়, “টেরর লুমড লার্জ।”
“এগজ্যাক্টলি এটাই বার্নিং শিখ চেয়েছিল!” অধিরাজ ফোনটা কেটে দিয়ে বলল, “কী অদ্ভুত কো-ইনসিডেন্স দেখো! ১৯৮৪ সালের পয়লা নভেম্বর থেকে তেসরা নভেম্বর অবধি প্রত্যেকটা শিখ পরিবারই ঠিক একথাই হয়তো ভেবেছিল। আমি একবার একটা ডকুমেন্টারিতে দেখেছিলাম এক শিখ মহিলা কাঁদতে কাঁদতে এই কথাগুলোই বলেছিলেন, যা আজ ওঁরা বলছেন। এখনও মনে পড়ছে ওঁর ডায়লগ, —উয়ো বোল রহে থে, ইয়ে লোগ কিসিকো নেহি ছোড়েঙ্গে…বচ্চোঁ কো ভি নেহি। … সব কো মারেঙ্গে… সব মরেঙ্গে। ক্যায়া গুনাহ কিয়া হামলোগোনে?’ মনে হচ্ছে, অবিকল ঐ বাহাত্তর ঘণ্টারই রি-ক্যাপ দেখছি। বার্নিং শিখের মিশন অন্তত এইট্টি পার্সেন্ট সাকসেসফুল।”
“এইটি পার্সেন্ট?”
“হ্যাঁ অর্ণব।” তার মুখে চিন্তার ছায়া, “খুনি শুধু ফিজিক্যালি অ্যাগ্রেসিভ নয়, অদ্ভুত একটা সাইকোলজিক্যাল গেমও খেলছে। বিড়াল যেমন খেলিয়ে খেলিয়ে ইঁদুরকে শিকার করে! ঐ বাহাত্তর ঘণ্টায় শিখ পরিবাররা মরার আগেই মরছিল। তারা পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। প্রতি মুহূর্তে ভাবছিল, কখন তাদেরও ভিড় এসে মারবে। এটা মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। এখন সেই একই চরম সাইকোলজিক্যাল প্রেশার সে তার ভিকটিমদের ওপরও চাপিয়ে দিতে পেরেছে। একই সঙ্গে আমাদের সঙ্গেও স্নায়ুযুদ্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে, অন্যদিকে তার শিকারদেরও আধমরা করে ফেলেছে। লোকটার জয়ের পাল্লা ক্রমাগতই ভারি হচ্ছে।”
“আসব স্যার?”
পরিচিত গলার স্বর শুনে অধিরাজ ভাসাভাসা চোখে উদ্ভাসিত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকায়। গুল্লু, তথা গুলাব সিং এর শরীরের অর্ধেকটা খোলা দরজা দিয়ে ভেতরের দিকে উঁকি মারছে। সে ইতিবাচক ইশারা করে, “ভেতরে আয়।”
গুল্লুকে দেখেই ফের অর্ণবের বুকের ভেতরটা গুড়গুড়িয়ে ওঠে। তার মনের মধ্যে সন্দেহের মেঘ জমছে। ও কতক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে? এই এল? নাকি আগেই এসেছে! এতক্ষণ আড়ি পেতে ওদের কথাবার্তা শুনছিল কি? গুল্লু জাতে শিখ! প্রয়োজনের সময় সে কি জাতভাইকে সাহায্য করবে না? ও ঠিক কতটা বিশ্বাসযোগ্য? নাকি বার্নিং শিখের সঙ্গে মিলে সে-ও কোনো ফাঁদ পাতছে!
অধিরাজ যাদব আর ঘন্টুকে যা বলেছিল গুল্লুকেও তাই বলল। যাদব আর ঘন্টু নির্বিবাদে তার কথা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল গুল্লু অনেক বেশি জেদি। সে কোনো কথা, কোনো যুক্তি শুনতেই রাজি নয়। বরং উলটে বেশ জোরের সঙ্গে বলল, “না সাহেব। সে যতই ভয় দেখাক, আমি নিজের জায়গা থেকে এক পা-ও নড়ছি না। বার্নিং শিখ যদি ‘ঢিঠ শিখ” হয় তবে আমিও হেতপাল কৌর আর জর্নেল সিং সোটির ‘বাচ্চা।’ খাঁটি শিখের খুন আমার রক্তেও আছে। যদি ওর হিম্মত থাকে তো একবার আমার সামনে এসে দাঁড়াক। ওয়াহেগুরুর ওয়াস্তা, মরার আগে ওকেও মেরেই মরব। খবরি, তাই পাগড়ি, কড়া পরি না। চুল, দাড়ি রাখি না। কিন্তু কৃপাণ তো আমার কাছেও আছে। তরোয়াল আমিও চালাতে জানি।”
সে তার শার্টটা তুলে কোমরে গোঁজা কৃপাণটা দেখায়। অর্ণব সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে কৃপাণটাকে দেখে নেয়। এটা অবিকল বার্নিং শিখের কৃপাণটার মতোই না? যদিও রাতের আলো-আঁধারিতে সেটা খুব স্পষ্ট দেখতে পায়নি। তবু ওর মনে হল, সেটাও অবিকল গুল্লুর কৃপাণের মতোই দেখতে। তার কপালের চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হয়।
“তোর বউ আর ছেলের কথাও ভাববি না?”
অধিরাজ শেষবারের মতো তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়। স্পষ্ট বলল, “হলিনও শিখের বেটি। আমার ‘পুত্তর’ গোল্ডিও বাঘের বাচ্চা। ওরা জানে আমি পুলিশের খবরি। এ-ও জানে যে কাজটায় প্রাণের ঝুঁকি আছে। আমার কিছু হয়ে গেলে ওরা জলে পড়বে না। আমার নাম গুলাব সিঞা হতে পারে, কিন্তু ‘কাঁটে কা টক্কর’ আমিও দিতে পারি সাব। ও হারামজাদার বাপকেও ভয় পাই না। এভাবে আমায় সরাতে পারবে না। যতক্ষণ না মরছি, ‘আখরি সাঁস তক’ আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। যা করার করে নিক।”
অধিরাজ কতটা স্বস্তি পেল জানা নেই, কিন্তু অর্ণবের মনের আশঙ্কা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। গুল্লু একটু বেশিই কনফিডেন্ট নয়? বার্নিং শিখের সঙ্গে হাতাহাতি করতেও তার আপত্তি নেই। এটা দুঃসাহস না অন্য কিছু?
“বেশ।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “বল, কী খবর এনেছিস?”
“সারা কলকাতা চষে বেরিয়ে সব ছোটোবড়ো গুরুদ্বারায় খবর নিয়েছি সাব।” সে জানাল, “সবাই বলে কলকাতায় নাকি মাত্র পাঁচটা গুরুদ্বারা আছে! ‘মুরখ’দের গোটা শহরের ট্যুর করানো উচিত! ছোটো বড়ো মিলিয়ে যে কত গুরুদ্বারা আছে তার হিসাব নেই। আমি মোটামুটি সবগুলোতেই ঢুঁ মেরেছি। ওখানে সব নিজেদেরই লোক আছে। গ্রন্থীজিদেরও চিনি। ওঁরা বললেন, তেমন কোনো নতুন মুখ গত একবছরে ওখানে আসেনি। কোভিডের পর থেকে কোনো নতুন সর্দারের দেখা পাওয়া যায়নি। যারা আসে, সব পুরোনো মুখ। আমি আপনার দেওয়া বার্নিং শিখের সবক-টা চেহারার ফটো ওঁদের দেখিয়েছি। শুধু ওঁরাই নয়, আমার কিছু ছেলেপুলেও সবখানেই ফিট করা আছে যারা ছোটোখাটো দোকান দিয়েছে গুরুদ্বারার আশেপাশেই। কেউ ওকে চিনতে পারেনি সাব।” গুল্লু একটু থেমে বলে, “কিন্তু মহাত্মা গান্ধী রোডের এক গুরুদ্বারার সামনে এক ভিখারি দিন রাত থাকে। গুরুদ্বারা মুনি লাল শিখ সঙ্গতের ঠিক সামনেই ও ব্যাটা অষ্টপ্রহর থাকে। ও বলছিল যে কিছুদিন যাবৎ এক সর্দারজি শেষরাতের দিকে গুরুদ্বারার সামনে আসে৷ কিন্তু ভেতরে ঢোকে না। চুপ করে শুধু তাকিয়ে থাকে। দু-হাতজোড় করে বলে, ‘মৈনু মাফ করো ওয়াহেগুরু।’ তারপর চলে যায়। ওকে ফটো দেখানোর কোনো মানেই নেই। কারণ লোকটা রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যেই আসে। অন্ধকারে কোনোদিনই ওর মুখ দেখতে পায়নি সে। কিন্তু রোজ ঐ সময়ের মধ্যেই সে আসে, এটা একদম ঠিক খবর। সে বার্নিং শিখ হতেও পারে, নাও হতে পারে। এটার কোনো গ্যারান্টি নেই।”
“ফাইন।” অধিরাজ অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছে, “সেকেন্ড খবরটা নিয়েছিস?”
“হ্যাঁ সাব। সে খবরও নিয়েছি বলেই দেরি হল।” সে বলল, “পেট্রোল পাম্পের মালিক কয়েকজন শিখ আছে বটে, কিন্তু তারা কয়েকপুরুষ ধরে কলকাতাতেই আছে। দিল্লিতে ওদের বাপ-দাদা-নানা কেউই কোনোদিন থাকত না। ব্যাকগ্রাউণ্ডে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংও নেই। সাদাসিধা ব্যবসায়ী লোক। এক ‘বান্দা’র খবর পেয়েছি অবশ্য। জগদীপ সিং ভাট্টি। ছোটোখাট ফার্মাসিউটিকলস কোম্পানির মালিক। আপনার দেওয়া প্রোফাইলের সঙ্গে বসছে। মালটার বয়েস আন্দাজ পঞ্চাশ। ওর পরিবার ১৯৮৪, সালের আগে দিল্লিতেই থাকত। পরে চলে এসেছে। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিগ্রিও আছে।”
“ইন্টারেস্টিং।” অধিরাজ একটু উত্তেজিত, “ঠিকানা এনেছিস? লোকটাকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?”
“ওর কোম্পানির অফিসেই পাবেন।” গুল্লুও একটা চিরকুট এগিয়ে দেয়, “এই রইল ঠিকানা।”
সে চিরকুটের ঠিকানাটা দেখে বলল, “মিন্টো পার্কের অ্যাড্রেস। অর্ণব, লোকাল পুলিশকে বলো ইমিডিয়েটলি এই লোকটাকে তুলে নিতে। গ্রেফতার যেন না করে। জাস্ট জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যেন তোলে। তারপর দেখছি।”
“ওকে স্যার।”
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গেই নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনে ফোন করে তাদের ইমিডিয়েটলি অ্যাকশন নিতে বলে দেয়। যদিও গুল্লুকে সে এই মুহূর্তে একটুও বিশ্বাস করছে না। তবু অধিরাজের আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা তার নেই।
“এই এক বান্দা আছে।” গুল্লু কন্টিনিউ করে, “আর একজনও আছে স্যার। তবে বান্দা নয়, ‘বান্দি।’ এই মহিলা একটু ডেঞ্জার। অনেকে বলে তিনি নাকি একসময়ে উগ্রবাদীদের খুব সাপোর্ট করতেন। পরে অবশ্য বুঝেছেন যে খালিস্তানি সাপোর্টারদের সঙ্গে ওর নীতি মেলে না। এখন অবশ্য বয়েস হয়েছে। ওর পুরো ফ্যামিলি ১৯৮৪ সালের দাঙ্গাতেই খতম হয়ে গিয়েছিল। কলকাতাতেই ওর এক ‘ফুফু-ফুফা’ থাকত। সে-ই অনাথ মেয়েটাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে মানুষ করে। ফুফার পয়সা ছিল। ওদের নিজেদের কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। তাই ওই মেয়েটাকেই নিজেদের ‘ঔলাদের’ মতো মানুষ করেছে। মহিলা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মহারথ! ওর ফার্মাসিউটিকলস আর ইলেক্ট্রিকাল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি দুটোই আছে। নাম কোমল সিং ভল্লা।”
অধিরাজ নামটা শুনে একটুও বিস্মিত হল না। বরং সে যেন এটার প্রত্যাশাই করছিল। খুব ঠান্ডা স্বরে জানতে চাইল, “ঠিকানা?”
“৪৫, যশোর রোড, ইটালগাছা, মোতিলাল কলোনি, রাজবাড়ি।”
অধিরাজ আর অর্ণব পরস্পরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে। এটাও ওরা অনেক আগেই আন্দাজ করেছিল। শুধু কনফার্মেশনের অপেক্ষাতেই ছিল। অধিরাজ আস্তে আস্তে বলল, “থ্যাংকস গুল্লু। কিপ ইন টাচ। চোখ কান খোলা রাখ। আর পারলে আজ রাত তিনটে নাগাদ মহাত্মা গান্ধী রোডের গুরুদ্বারার সামনে ফিল্ডিং দিবি। কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু ঐ সর্দারজিকে দেখতে পেলেই আমায় ফোন করবি। ব্যস।”
অর্ণবের হৃৎস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এটা কি আদৌ ইনফর্মেশন, না কোনোরকম ট্র্যাপ? স্যার কেন গুল্লুর ওপর এতটা আস্থা রাখছেন? বিশ্বাস নেই, কাউকে বিশ্বাস নেই!
