(২০)
শীতের সময়ে একটু বেশি রাত হতে না হতেই আজকাল রাস্তাঘাট শুনশান হয়ে যায়। মানুষ একেই আচমকা বেড়ে যাওয়া শীতের কামড় নিতে পারছে না। তার ওপর বার্নি শিখের কল্যাণে এখন সকলেই একটা আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে রয়েছে। টিভি চ্যানেলে ঐ একটা খবর ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রতি ঘণ্টায় বুলেটিন আসছে৷ কী হল, না হল, আবার কোথা থেকে আক্রমণ আসবে, আগামীতে কী হতে পারে, কী কী হওয়ার সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে সাংবাদিকদের মাথাব্যথা ও ডিসকাশনের শেষ নেই। অধিরাজের মনে হয়, বার্নিং শিখকে নিয়ে এরা যত মাথা ঘামাচ্ছে, স্বয়ং বার্নিং শিখও বোধহয় অত ঘামায়নি। মিডিয়া চিরকালই মানুষের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করতে ওস্তাদ। মানুষ কোমল কৌরের বাড়ির বিস্ফোরণ এবং ঐ জ্বলন্ত তেলের ট্যাঙ্কারের ফুটেজ দেখে এখন রাস্তাতেও বেরোতে ভয় পাচ্ছে। মনে আশঙ্কা, সি.আই.ডি. হোমিসাইড আর বার্নিং শিখের যুদ্ধে উলুখাগড়া হয়ে সাধারণ মানুষই না কাটা পড়ে৷ তার ওপর নিউজ চ্যানেল ব্যাপারটাকে এমনভাবে হাইলাইট করছে যেন যখন তখন, যেখানে সেখানে এক বা একাধিক বম্ব ব্লাস্ট হতে পারে। বার্নিং শিখকে ‘খালিস্তানি’ বানিয়ে মুম্বাই সিরিয়াল ব্লাস্টের মতোই ‘কলকাতা ব্লাস্টের’ সম্ভাবনার কথাও ঘোষণা করে বসে আছে। এগুলো আতঙ্ক তৈরি করা ছাড়া আর কি? সবসময়ই ব্যুরোর সামনে ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্রেকিং নিউজের জন্য। তাকে দেখলেই বুম-ক্যামেরা নিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়েই পড়ে, “স্যার…স্যার… একটা প্রশ্ন… একটা ছোট্ট বাইট।” বিরক্তিকর। এইজন্যই সে সবসময়ই মিডিয়ার লোকদের এড়িয়ে চলে।
তবে যতই বিরক্তি প্রকাশ করুক, এবার হয়তো এই মিডিয়াই তার কাজে লাগবে। অফিস থেকে বেরোনোর আগেই রমানাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি প্রথমে উদ্বিগ্নভাবে ওদের কুশল সংবাদ নেওয়ার পর জানিয়েছেন, “আপনার কাজ হয়ে যাবে অফিসার। আমি জাস্ট কিছুক্ষণ আগেই মিঃ চিরঞ্জীব জয়সওয়ালের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রথমে একটু নিমরাজি ছিলেন ঠিকই, তবে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলার পর রাজি হয়ে গেলেন। বলেছেন, সবরকম হেল্প করবেন। তবে ইন্দিরাজির স্পিচের কালেকশন বেশ বড়ো। ওঁর বয়েসও হয়েছে। তাই আজ রাতে কিছু করা সম্ভব হবে না। কাল আমাদের দিল্লির অফিসের এক ছোকরা গিয়ে ফাইলগুলো নিয়ে আসবে। একটু সময় লাগবে স্যার।”
“সময়ই তো হাতে নেই স্যার।” অধিরাজ একটু চিন্তিতস্বরে বলে, “কাল দুপুরের মধ্যে পেতে পারি কি? তার চেয়ে বেশি টাইম অ্যাফোর্ড করতে পারব না বোধহয়।”
“আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব দুপুরের আগেই দেওয়ার।” তিনি জানালেন, “আপনাদের মেইল অ্যাড্রেসটা…!”
“হ্যাঁ। এখনই হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।”
সে আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত রমানাথকে বিশ্বজিতের ই-মেইল আইডি দিয়ে দেয়। অর্ণব একটু অবাক হয়েই বলে, “বিশ্বজিতের মেইল অ্যাড্রেস কেন স্যার? আপনার মেইলেই তো পাঠাতে পারেন।”
“আল্টিমেটলি সব ফাইল বিশ্বজিতের কাছেই যাবে ডার্লিং।” ছেলেমানুষি হাসিটা তার ঠোঁটে ভেসে ওঠে, “আসল কাজ তো বিশ্বই করবে। উনি আমাকে পাঠাবেন, আমি মেইল খুলব, ডাউনলোড করব বা ফরোয়ার্ড করব, তাতে কয়েক সেকেন্ড হলেও তো যাবে। আমি এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চাই না। তাই ফাইলগুলো বিশ্ব-র কাছেই ডাইরেক্ট আসুক। দাঁড়াও, ওকে জানিয়ে দিই। ভাট্টিসাহেব কী করছেন সেটাও জেনে নিই।”
বিশ্বজিৎ সমস্ত কথা শুনে বলল, “কিন্তু স্যার, ফাইলগুলো নিয়ে আমি কী করব?”
“ছোট্ট, কিন্তু পরিশ্রমসাধ্য একটা কাজ।” অধিরাজ বলল, “সেটা ফাইলগুলো এলে আমি তোমায় বলে দেব। আপাতত বলো, ভাট্টিসাহেব কী করছেন?”
“ও পাবলিক ডেন্টিস্টের চেম্বার থেকে সোজা বাড়ি গিয়ে ঢুকেছে। বেশ কিছুক্ষণ অনলাইনে দাঁত ব্যথা ইনস্ট্যান্ট কমানোর রেমিডি খুঁজলেন। তারপর হতাশ হয়ে মিকা সিং-এর চিৎকার শুনলেন। তাতে ওঁর দাঁত ব্যথা কমল কিনা জানা নেই, কিন্তু আমার মাথা আর কান দুটোই ব্যথা হয়ে গিয়েছে। এখন শুয়ে পড়েছেন। আমি চুপচাপ ওঁর বাড়ির সিলিং দেখছি।”
“দেখতে থাকো বিশ্ব। আগামীকাল রাতের আগে তোমার ছুটি নেই।”
কথা বলতে বলতেই সে টের পেল একের পর এক হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ঢুকছে। স্ক্রিনে ডঃ চ্যাটার্জির নাম শো করছে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “ওকে বিশ্ব, পরে কথা বলছি।”
“শিওর।”
অধিরাজ ফোন তৎক্ষণাৎ কেটে দিয়ে তাড়াতাড়ি মেসেজগুলো খুলে কিছুক্ষণের জন্য টেনসড হয়ে গেল। বারোটা মেসেজ পাঠিয়েছেন ডঃ চ্যাটার্জি। কিন্তু একটাতেও কিছু লেখা নেই। সবগুলোই ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ। সে সভয়ে অর্ণবের দিকে তাকায়, “এ কী। ডক ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ পাঠাচ্ছেন কেন? আবার কারোর কিছু হল না তো?”
“ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ।” অর্ণব ভয়ে কাঁটা হয়ে যায়। তার হৃৎপিণ্ড ফের লাফ মারল। সচরাচর কারোর মৃত্যুর খবর বা সেরকমই কোনো দুঃসংবাদ দিতে অনেক সময় মানুষ ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ পাঠিয়ে থাকে। ডঃ চ্যাটার্জি এই ব্ল্যাঙ্ক মেসেজের মাধ্যমে কী বলতে চাইছেন? একেই সকালবেলায় ঐ গ্রুসাম কাণ্ড! এখন আবার কী হল? অন্য কোনো ট্র্যাজেডি নয়তো? বারবার উনি ফোনই বা করছিলেন কেন? অধিরাজের ফোনে প্রায় বারোবার আর অর্ণবের ফোনে সাতবার ট্রাই করেছিলেন। আহেলির কথা শুনে ওরা ভেবেছিল হয়তো খবর নেওয়ার জন্য ফোন করছিলেন। অধিরাজ একটু ফ্রি হয়েই তাঁকে রিংব্যাক করবে ভেবেছিল। কিন্তু এখন একটা শীতল ভয় তাকে চেপে বসল। এই ফোনের পেছনে অন্য কোনো দুঃসংবাদ থাকে যদি!
অধিরাজ তাড়াতাড়ি ডঃ চ্যাটার্জির নম্বর ডায়াল করে। তার বুকের ভেতরে প্রচণ্ড তোলপাড়। ওদিকে সব ঠিক আছে কি? অসিত চ্যাটার্জি, কুক্কু, ওরা সব সুস্থ আছে তো। কুক্কু তো একেবারেই বাচ্চা ছেলে। স্বভাবের দিক দিয়ে আরও বেশি ছেলেমানুষ, নিষ্পাপ। বার্নিং শিখ শিশুদেরও ছাড়ে না! আগেই সে হুমকি দিয়েছিল। ওর কিংবা ডঃ চ্যাটার্জির কিছু হয়ে গেলে…!
“কাম অন ডক, পিক আপ! পিক আপ দ্য ফোন।”
ফোনটা প্রথমবার বেজে বেজে কেটেই গেল। সে অর্ণবের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়েছে, “মনে হয় ইমিডিয়েটলি ওঁর কাছে যাওয়া দরকার। ফোন তুলছেন না!” অর্ণব বিনাবাক্যব্যয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। সে মাথা ঝাঁকিয়ে দরজার দিকে প্রায় দৌড়েইছিল। কিন্তু তার আগেই অধিরাজের ফোন বেজে উঠেছে। ডঃ চ্যাটার্জি। “হ্যাঁ। হ্যালো ডক! আপনি ঠিক আছেন? ইজ এভরিথিং অলরাইট? আপনি কোথায়? অসিতবাবুর ফ্ল্যাটেই তো?”
প্রচণ্ড উদ্বেগে সে প্রায় নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছে। একনিশ্বাসে প্রশ্নগুলো করে গেল। আরও হয়তো কিছু জিজ্ঞাসা করত তার আগেই ও প্রান্ত থেকে ডঃ চ্যাটার্জির বিরক্তিমাখা কণ্ঠ ভেসে এল, “এই প্রশ্নগুলো তো আমার করার কথা! টিভিতে যা সব দেখছি তাতে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জো! আর তুমি ফোন তোলো না কেন? কখন থেকে ভয়ে যন্তরমন্তর হয়ে ফোন করছি, তুলছই না।”
“বিজি ছিলাম।” অধিরাজের ভয় তখনও কাটেনি। কোনোমতে বলল, “আপনি বারবার ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ পাঠাচ্ছেন কেন? কোনো অঘটন ঘটেনি তো?”
“ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ!” তিনি স্যাটেলাইট থেকে পড়লেন, “লেঃ হালুয়া। আমি ব্ল্যাঙ্ক
মেসেজ পাঠাব কোন্ দুঃখে? আমি তো স্রেফ ভিডিও কলিং করার চেষ্টা করছিলাম। কিছুতেই গেল না!”
এবার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ওদের। ভদ্রলোক এমনিতেই হোয়াটসঅ্যাপে সড়গড় নন। তার ওপর কায়দা মেরে ভিডিও কল করতে গিয়েছিলেন। আদতে উনি জানেনই না যে ভিডিও কল কীভাবে করতে হয়। নির্ঘাত কিছু উলটোপালটা আইকন টিপে দিয়েছিলেন, যার ফলে অতগুলো ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ চলে এসেছে। অধিরাজ সন্দিগ্ধ স্বরে জানতে চায়, “আর ভিডিও কল করার জন্য ঠিক কোন আইকনটা প্রেস করেছিলেন আপনি?”
“কেন? নীচে ডানদিকে যে ক্যামেরার ছবিটা থাকে…।”
“বুঝেছি।” সে এবার লঘুস্বরে বলল, “ক্যামেরা আপনার অপূর্বকান্তি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে এবং লজ্জা পেয়ে ছবিই তোলেনি। বেচারি কী পাঠাবে বুঝতে না পেরে ব্ল্যাঙ্ক মেসেজই পাঠিয়ে দিয়েছে! আর আমরা আপনার ব্ল্যাঙ্ক মেসেজের ভাব সম্প্রসারণ করতে হিমশিম খাচ্ছি। ভেবে মরছি, পুতিন বুঝি আপনার ওপরেই বোম ফেলেছেন!”
“দেখো মিঃ সাইবেরিয়ান হাস্কি, সবসময় তোমার এই টকেটিভ ‘আঁউ আঁউ’ মার্কা আর্গুমেন্ট ভালো লাগে না!” ডঃ চ্যাটার্জি চূড়ান্ত চটে গিয়েছেন, “কাঁধের সেলাইটা কি আছে, না ফের ছিঁড়েছ? কপালে কী হল? আর তাছাড়া তুমি ঐ গন্ধমাদনের মতো তেলের গাড়িটার সঙ্গে মারপিটই বা করতে গেছ কোন্ সাহসে? ওটা রীতিমতো জ্বলছিল। ব্লাস্ট করলে কোথায় থাকতে শুনি? নাকি ওটাকে টাইটানিক ভেবে ওটার সঙ্গেই সলিলসমাধি নেওয়ার প্ল্যান ছিল। বেশি হিরোগিরির শখ হয়েছে না তোমার? কী ভাবো নিজেকে? কথা নেই বার্তা নেই, যখন তখন শক্তিমানের মতো চরকিপাক মারতে শুরু করো! আমায় না মেরে তোমার শান্তি নেই না? সবসময় কিছু না কিছু ঘোটালা পাকাতেই থাকো। কারোর কেয়ার করো না, কারোর ভালোবাসার মূল্য দাও না। বুঝবে! যেদিন এই বুড়োটা হার্টফেল করে মরবে, সেদিন বুঝবে। লোকে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে না…!”
বলতে বলতেই তাঁর কণ্ঠস্বরে যেন একটা কান্নার ভাব ভেসে এল। পরিস্থিতি গম্ভীর দেখে অধিরাজ কোনোমতে বলল, “স্যরি ডক। আমি আপনাকে ফোন করতামই। চিন্তা করবেন না। কাঁধের সেলাই এখনও ঠিক আছে। কপালেরটা নিউ এডিশন। আপাতত আমি আপনার বেবি মোস্তাফার সেলাই প্রোজেক্টে পরিণত হয়েছি। এই কেসটা ক্লোজ হতে হতে আশা করছি আস্ত নকশিকাঁথা হয়ে যাব।”
“একদম ফিচলেমি করবে না। যতসব অলুক্ষুণে কথাবার্তা…!” এবার সত্যিই কেঁদে ফেললেন তিনি, “কী শুরু করেছ তোমরা? যতবার ফুটেজগুলো দেখছি, ততবার রক্তহিম হয়ে আসছে। সকালে সনৎ! তারপর তোমরা অলমোস্ট দু-বার ব্লাস্টের হাত থেকে বেঁচেছ! একবারও ভেবেছ এই বুড়োটার কী অবস্থা হচ্ছে? এমনই অসহায় অবস্থা যে তোমাদের কোনো সাহায্যও করতে পারছি না। এক সন্তানকে সদ্য হারিয়েছি। অন্য দু-জনের খবর নেই। ফোন করছি, তুমি-অর্ণব, কেউ তুলছ না। আমার জায়গায় থাকলে বুঝতে…!”
ওঁর অবস্থা দেখে অধিরাজ এবার নরম স্বরে বলল, “কিচ্ছু হবে না ডক৷ আপনি আপাতত টিভিটা অফ করুন। আর একদম পরশু সকালে খুলবেন। এর মধ্যে সব কিছু হতে পারে, কিন্তু আমরা কেউ মরছি না। আপনি বরং অন্য কিছু করুন। গান শুনুন। কিংবা কুক্কুর সঙ্গে খেলুন।” সে জানতে চায়, “কুক্কুসাহেব আর অসিতবাবু কি ফিরেছেন?”
“হ্যাঁ।” এবার একটু শান্ত শোনাল তাঁর কণ্ঠস্বর, “ওরা কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। ডিনার করেছি আমরা। তবে কেউ ঘুমোতে যাইনি। অসিত আর কুক্কুও আমার সামনেই বসে আছে। বার্নিং শিখের খবর ওরাও জানে। আমরা সবাই তোমাদের খবর নিয়ে তবেই ভাবছি ঘুমোতে যাব।”
“এতবড়ো ফ্যামিলি থাকতে আমাদের কিছু হতে পারে? কুক্কুসোনা-কে আমার আদর জানাবেন। খুব তাড়াতাড়িই দেখা করতে আসব।” অধিরাজ হাসল, “যান, এখন আর কথা না বাড়িয়ে লেপের তলায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ুন। কাল আবার কথা হবে। ফোন করব।”
“শিওর? তুমি ফের ভুলে যাবে না তো?”
“না।”
ডঃ চ্যাটার্জি কতখানি আশ্বস্ত হলেন কে জানে। কিন্তু তার স্নেহশীল পিতৃহৃদয়ের হাহাকারে দুই অফিসারই একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েছিল। অধিরাজ মনে মনে ভাবছিল, সত্যিই তো! ডঃ চ্যাটার্জিকে অনেক আগেই ফোন করা উচিত ছিল ওদের। এই পুলিশের ডিউটি মানুষকে বড়ো অসামাজিক, স্বার্থপর করে দেয়। নয়তো এই বয়স্ক মানুষটার কথা আগে মনে পড়েনি কেন। আজ সকালেই কত বড়ো আঘাত পেয়েছেন তিনি! অথচ তাঁর খবর নেওয়ার কথা একবারও মনে হয়নি। অথচ শোকার্ত, বিধ্বস্ত লোকটা বারবার ফোন করে খবর নেওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছে!
অনেকক্ষণ ধরে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করার পর মিস্ দত্তের ফোনটা ঠিক রাত সাড়ে এগারোটায় এল। আত্রেয়ী জানাল যে মিঃ দত্তার বাড়ির সবাই এতক্ষণ জেগেই বসেছিলেন। কেউই ঘুমোতে যাচ্ছিলেন না। মনে প্রবল আতঙ্ক যে আদৌ পরদিনের সূর্যোদয় দেখবেন কিনা। সারাদিন ধরেই সবাই অভুক্ত। রাতে সে জোরজার করে সবাইকেই কিছু-না কিছু খাইয়ে দিয়েছে। এখন সারাদিনের টেনশনে, আতঙ্কে ভোগা মানুষগুলো অসম্ভব ক্লান্তি অনুভব করছে। আশা করা যায় দশ মিনিটের মধ্যেই হয়তো সকলেই বেডরুমে অন্তত একটু গা এলিয়ে দেওয়ার জন্য ঢুকে যাবেন।
“ওকে মিস্ দত্ত। অর্ণব পৌঁছে যাবে।”
অধিরাজ ফোনটা কেটে দিয়েই অর্ণবকে তাড়া দেয়, “চলো, চলো। স্পেশাল চা অপেক্ষা করছে।”
অর্ণব একটু বিব্রত হয়, “কিন্তু মিস্ বোস তো এখনও ফোন করেননি।”
“অন দ্য ওয়ে ঠিকই করবেন।” অধিরাজ ব্যস্ত হয়ে ঘড়ি দেখছে, “আর সময় নেই অর্ণব। কাঁটায় কাঁটায় আটচল্লিশ ঘণ্টা হতে চলল। অ্যাটাক এবার আসবেই। একদম চোখ-কান খোলা রাখবে। দরকার পড়লে রাউন্ড দেবে। সারা রাত নিজের পজিশন থেকে নড়বে না। আর একটাও মৃত্যু যেন না হয়। মনে রেখো, তোমাদের তিনজনের ওপরে একটা গোটা পরিবারের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করছে। প্রণবেশদাকেও বলবে ব্যাক-আপের জন্য একদম রেডি থাকতে। যে কোনো মুহূর্তে যা কিছু ঘটতে পারে, মাইণ্ড ইট।”
“কিন্তু স্যার। গুরশীল…।”
অর্ণব কিছু বলতেই যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়েছে সে, “আপাতত শুরশীলে গুলি মারো। ওকে আর আমনদীপকে কাল সকালে দেখে নেবো। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের সমস্ত ফোকাস এই রাতটার ওপরে। আজ রাতে কিচ্ছু হতে দেবে না অর্ণব। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুঁজেও আসতে দেবে না। দরকার পড়লে মিস দত্তকে বলে গোটা জলের ট্যাঙ্কটাতেই স্পেশাল চা ভরিয়ে নাও। তুমি কত গ্যালন চা বা কফি খেয়েছ, আমি জানতে যাব না! কিন্তু ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডের জন্যও তোমার অ্যাটেনশন যেন একচুলও না নড়ে। হাই অ্যালার্টে থেকো।”
“ইয়েস স্যার।”
ওরা আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। অর্ণবকে আর্বানায় ছেড়ে দিয়ে সে নিজে এই মুহূর্তে পি সি চৌধুরীর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। ড্রাইভ করতে-করতেই দ্রুতবেগে কয়েকটা কাজ সেরে নিয়েছে অধিরাজ। প্রথমত, তার এক বন্ধু প্রীতমকে দুটো ছবির সেট পাঠিয়ে দিয়েছে। তার দশ মিনিটের মধ্যেই প্রীতম কল করল, “এ কী রে! এত সিমিলার ফেস কাটিং আর চোখ আমি জীবনে দেখিনি! চোখের শেপ আর চাউনি তো অবিকল এক। ইভেন চোয়াল আর মুখের আদলটাও।”
“কাজটা করে দিতে পারবি?”
“বাঁ হাতের খেল। নাকটা একটু ছোটো। কিন্তু সেটাও ম্যানেজ হয়ে যাবে। নাইন্টি পার্সেন্ট অথেন্টিক জিনিস দাঁড় করিয়ে দেব। চট করে দেখলে বা একটু কম আলোতে পুরো অরিজিনালই লাগবে। তবে দিনের বেলা কেউ যদি খুঁটিয়ে দেখে, তবে ধরা পড়বি।”
“দিনের বেলায় খুটিয়ে দেখার গল্পই নেই। তুই রেট বল।”
“তুই যা দিবি। না দিলেও চলবে বস।” প্রীতম হাসল, “তবে ঘোড়ায় জিন চড়িয়ে আসিস না। মিনিমাম আট থেকে দশ ঘণ্টা সময় লাগবে কিন্তু। কারণ ডোপলগ্যাঙ্গার বানাতে সময় লাগে। ছোটো ছোটো ডিটেলিংগুলোও মিস করা যাবে না। অনেক কাজ করতে হবে।”
“বুঝেছি। সময় নিয়েই যাব। রেডি থাকিস।”
“ওকে।”
তার ফোন কেটে দিয়েই গুল্লুর খবর নিল সে। গুল্লু নির্ধারিত গুরুদ্বারার আশেপাশেই ঘুরঘুর করছিল। যদিও এখনও সেই সর্দারজির আসার সময় হয়নি। কিন্তু প্রত্যেকবার সে একই টাইমিং-এ আসবে এমন কোনো কথা নেই। তাই রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে পজিশন নিয়ে নিয়েছে। জানতে চাইল, “লোকটা এলে কি ধরব স্যার?”
“একদম না।” অধিরাজ বলল, “ধরার চেষ্টাও করবি না। স্রেফ ছায়ার মতো ফলো করবি। দেখবি সর্দারজি ঠিক কোথায় যাচ্ছেন বা তার ঘাঁটিটা কোথায়। কোমল কৌরের বাড়িতে আমরা পেট্রোলের একফোঁটাও পাইনি। গ্যাসের কন্টেনার কিংবা তরোয়াল বা কোনোরকম কাটারও ছিল না। তার মানে ভদ্রলোকের আরও একটা ঘাঁটি আছে যেখানে এগুলো তিনি রেখে থাকেন। আমার শুধু সেই ঘাঁটির ঠিকানাটা চাই। বাকিটা আমরা বুঝে নেব। তুই লোকটা কোথায় ঢুকেছে দেখে নিয়েই ওখান থেকে সরে পড়বি।”
“হো যায়েগা স্যার।”
গুল্লু যথারীতি আত্মবিশ্বাসী। তার আপডেট শেষ হওয়ার পর কাঁটায় কাঁটায় বারোটায় মিস্ বোসের মেসেজ ঢুকল। পি সি চৌধুরীর পরিবারও আস্তে আস্তে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পবিত্র-ও জানতে পেরে একদম বাড়ির সামনে পৌঁছে গিয়েছে। তার সতর্ক নজর প্রতিটা মুহূর্ত মেপে নিচ্ছে। অস্থির পায়ে মাঝেমধ্যেই রাউন্ডও দিচ্ছে। তার সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে ভেতরের পরিস্থিতি মনিটরিংও করে চলেছে। তার চোখ এড়িয়ে কিছু হওয়ার সম্ভাবনাই নেই। এ বাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ এলেই ধরা পড়বে। এককথায় পবিত্র-র ভাষায় ‘বজ্র আঁটুনি।’
কিন্তু তারপরও অধিরাজের মনে শান্তি নেই। যেখানে ‘বজ্র আঁটুনি’, সেখানেই ‘ফস্কা গেরো” হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বার্নিং শিখ এত সহজে চুপচাপ বসে থাকার লোক নয়। তাছাড়া কমলার ঐ রহস্যময় হাসি বারবার তাকে ভাবাচ্ছে। নিশ্চয়ই ওর অন্য কোনো প্ল্যান আছে, যেটার হদিশ অধিরাজরা এখনও পায়নি। তার মুখে চিন্তার ছায়া ফের ফিরে এসেছে। কিছু গোলমাল তো আছেই। তাকে যত তাড়াতাড়ি হোক, পি সি চৌধুরীর বাড়িতে পৌঁছতেই হবে। পবিত্র আর কৌশানী ওখানে উপস্থিত আছে ঠিকই, তবুও মনে স্বস্তি নেই। সবসময়ই মনে হচ্ছে, কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। ঐ আনক্যানি হাসিটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। ভোলা যায় না! ওর মধ্যে যেন একটা প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ ছিল। সে আর কিছু না ভেবে গাড়িতে স্পিড তুলল।
আজকের রাতের পরিবেশটাও বড়ো বেশি থমথমে। এখন আবার সেই ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার স্তর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বাধ্য হয়েই ডিপার জ্বালাল অধিরাজ। রাস্তার আলোগুলোও যেন বড়ো নিষ্প্রভ। যেন আগে থেকেই কোনো বিপদের আশঙ্কাতে ওদের আলোও ভয়ার্ত, বিবর্ণ। এমনকি আকাশে চাঁদটাও যেন ভয়ে ভয়ে উকি মারছে। কোনো অশনিসঙ্কেতে সে-ও বুঝি সাবধানে তাকিয়ে দেখছে চতুর্দিকটা। এমন রাত যে কোনো মানুষকেই আশঙ্কিত করে তোলে।
অধিরাজ ড্রাইভ করতে-করতেই টের পাচ্ছিল, ক্লান্তিতে, ঘুমে তার চোখ বুজে’ আসছে। সে একা নয়, মোটামুটি টিমের সকলেরই এক অবস্থা। এইভাবে একটানা দৌড় আগে কখনও করতে হয়েছে বলে বিশেষ মনে পড়ে না। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। এখনও শেষ কিছু ঘণ্টা বাকি আছে। বাকি আছে অন্তিম একটা দিন। তার আগে তার ঘুমোনো তো দূর, মরারও উপায় নেই।
সে একহাতে স্টিয়ারিং সামলে, অন্যহাতে তুলে নেয় ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেটটা। বেশিরভাগ সময়ই অধিরাজ ডানহাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে প্যাকেটের ঢাকনা খুলে ঠোঁট দিয়ে সিগারেটের বাট চেপে ধরে একটা স্টিক টেনে বের করে আনে। হাত কম ইউজ করে। এটাই তার স্টাইল। আজও তেমনভাবেই একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালাল। স্মোকিংটা একটু বেশিই হচ্ছে। অথচ উপায় নেই। এই মুহূর্তে নিকোটিনের ভয়ের চেয়েও চোখে ঘুম আসার ভয়টা অনেক বড়ো। সারা শহর ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির কোলে শুয়ে পড়লেও টিম অধিরাজের ছুটি নেই। তাদের জেগে থাকতেই হবে। পরিস্থিতিটাই এমন।
সিগারেটের কড়া ধোঁয়াটা গলায় লাগতেই তন্দ্রাভাব অনেকটাই কাটল। সে ঘুম ঘুম ভাব তাড়ানোর জন্য কিছুটা ধোঁয়া গিলেই নিল। এখন গন্তব্য আর বিশেষ দূরেও নেই। এই স্পিডে চলতে থাকলে আর মিনিট পাঁচেকের রাস্তা মাত্র। তবু যতক্ষণ না পৌঁছচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি নেই অধিরাজের। একেকটা মুহূর্ত খসছে, ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা সরছে, তার সঙ্গে যেন তাল মিলিয়ে তার হৃৎস্পন্দনও বাড়ছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে পি সি চৌধুরীর পরিবার ঘুমোতে গিয়েছে। কে জানে, কী ঘটতে চলেছে তাদের সঙ্গে! তবে অধিরাজ নিশ্চিত, যা ঘটার তা রাতের এই কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ঘটবে। কে জানে পবিত্র ঠিকঠাক নজর রাখছে কিনা…!
ভাবতে-ভাবতেই পি সি চৌধুরীর বাড়ির গলিটা এল। অধিরাজ রাইট টার্ন নিয়ে গলির ভেতরে গাড়িটাকে ঢুকিয়ে নিয়েছে। আর মিনিটখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে…!
ঠিক তখনই আচমকা তার মোবাইল ফোন সশব্দে বেজে উঠল। অধিরাজ চমকে তাকায় ফোনের দিকে। স্ক্রিনে বড়ো বড়ো করে পবিত্র-র নাম ও ছবি ভাসছে। দুশ্চিন্তায় তার কপালে ভাঁজ পড়ে। পবিত্র এখন ফোন করছে কেন? একটু আগেই তো কথা হল। তখনও তো সব ঠিক ছিল। সে জানে অধিরাজ রাস্তায় আছে। বিনা প্রয়োজনে তাড়া দেওয়ার মতো লোক অফিসার আচার্য নয়। এখন কি তবে কিছু ঘটেছে! কোনো দুর্ঘটনা….!
সে ধূমায়িত সিগারেট ধরা হাত দিয়ে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে ফোনটা বিদ্যুৎবেগে তুলে নেয়, “হ্যালো!”
ওদিক থেকে ভেসে এল পবিত্র-র বিপন্ন ও উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, “কোথায় তুমি?” “এই তো। জাস্ট গলিতে এন্ট্রি নিয়েছি।”
“তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ…। সামথিং ইজ ভেরি রং…!”
অধিরাজের হৃৎপিণ্ড যেন গলায় এসে আটকে গিয়েছে, “কী হয়েছে? পি সি চৌধুরীর ফ্যামিলি ঠিক আছেন?”
পবিত্র হাঁউমাউ করে ওঠে, “ওঁদের খবর জানি না। তবে আমি ঠিক নেই। মিস্ বোস আরও ঠিক নেই। কাম শার্প!”
অধিরাজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ির স্পিড বাড়ায়। এই লম্বা গলিটার শেষপ্রান্তেই মিঃ চৌধুরীর বাড়ি। প্রায় ঝড়ের বেগেই কয়েক সেকেন্ডে সে পৌঁছে গেল গেটের বাইরে। সিগারেটটায় উত্তেজিত শেষ টানটা মেরেই ছুড়ে ফেলে দিয়ে পড়িমরি করে দৌড়োল লোহার গেটের দিকে। গেট খোলাই ছিল। এমনকি ওঁদের বাড়ির দরজাও খোলা। সে ডাইনে-বাঁয়ে না তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে। বুকের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা তাণ্ডব করছে। কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে। কী হল মিস্ বোসের। সে বেঁচে আছে তো! না বার্নিং শিখ তাকেও সরিয়ে দিয়েছে এ পৃথিবী থেকে…।
“হাম তো ফনা হো গয়ে উনকি আঁখে দেখ কর গালিব, না জানে উয়োহ আইনা ক্যায়সে দেখতে হোঙ্গে…!”
অধিরাজ প্রায় দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। হলের কাছে আসতেই শুনতে পেল একটা নেশাজড়িত উষ্ণ নারীকণ্ঠ। মিস কৌশানী বোস! কিন্তু সে হঠাৎ গালিবের শায়রি আওড়াচ্ছে কেন? এই কি শের-শায়রি করার সময়! মহিলার মাথাটা কি একেবারেই গেছে!
ভেতরে তখন আধো আলো, আধো অন্ধকার। স্রেফ কম পাওয়ারের একটা নাইটবাল্ব জ্বলছে। কিন্তু তাতেই সামনের দৃশ্যটা দেখে অধিরাজের চক্ষু চড়কগাছ। সে কোনোমতে বিস্মিত গলায় বলল, “এ কী!”
ঐ স্বল্প আলোতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে মিস্ বোস পবিত্রকে একেবারে সজোরে ঠেসে ধরেছে দেওয়ালের সঙ্গে। তার পুরুষালি দেহের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর খাজুরাহোর নরম পেলব সৌন্দর্য। তার একটি মৃণালভুজ পবিত্র-র কোমরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। অন্য হাতটি গলায় নাগপাশ দিয়ে রেখেছে। তার বুকে উন্মত্তের মতো মাথা, মুখ ঘষতে ঘষতে কৌশানী নেশাস্খলিত স্বরে বলছে, “যখন তোমায় দেখিনি, তখন থেকেই আমি পৃথ্বীরাজের সংযুক্তা হয়ে বসে আছি। কেস ডিসকাশনে যখন তোমার অ্যাসাইলাম মার্ডার কেসটার রেফারেন্স শুনেছিলাম, পুরো কেসফাইল স্টাডি করেছিলাম, তখন থেকেই আমি আলাউদ্দিন খিলজির মতো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। লাইফে রতনসিং থাকুক কি না থাকুক, তোমাকে আমি ছিনিয়ে নিয়েই ছাড়ব। তুমি যদি ছ-ফুট চার ইঞ্চির না হয়ে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চিরও হতে, তাহলেও আমি তোমাকেই চাইতাম। আই জি না হয়ে কনস্টেবল হলেও কিচ্ছু আসত যেত না। তোমার জন্য বাড়ি-ঘর-পরিবার সব কিছু ছেড়েছুড়ে এখানে চলে এসেছি। তারপর তোমার বাদামি চোখ, ঐ অদ্ভুত নিষ্পাপ মুখ, বাচ্চাদের মতো হাসি, বিশ্বাস করো, আমি সব ভুলে গেছি। এত অপদার্থ হয়ে গেছি যে সোসাইটির দরোয়ানটার মধ্যেও শুধু তোমাকেই দেখতে পাই। আর তুমি আমাকে পাত্তাই দাও না! প্লিজ, টেক মি টু ইওর হার্ট। আর কষ্ট দিও না। প্লিজ, টেক মি …”
অধিরাজ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। এসব কী প্রলাপ বকছে মেয়েটা!
কেনই বা বকছে? পবিত্র-র অবস্থা করুণ। সে দু-হাত তুলে ‘ভজ গৌরাঙ্গ’ স্টাইলে কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিল। অধিরাজের দিকে চোখ পড়তেই ভয়ার্ত স্বরে বলল, “আমি কিছু করিনি রাজা!..বিলিভ মি… আমি ওঁকে ছুঁইনি! তুমি সাক্ষী!”
মিস্ বোস কিছুক্ষণ তার বুকে মুখ ঘষে এবার পবিত্র-র মুখের দিকে তাকায়। তার চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। মুখে স্পষ্ট জেদের লক্ষণ। সে আরও জড়ানো স্বরে বলে, “কিন্তু এই হতচ্ছাড়া গোঁফ আমাদের মাঝখানে কবে এল! একটু আগেও তো ছিল না। এইটুকু সময়ের মধ্যেই কেন এমন ঝাঁটার মতো গোঁফ রেখেছ তুমি?”
“ওরে আমার আলাউদ্দিন খিলজি!” পবিত্র ঐ অবস্থাতেই কেঁউমেউ করে ওঠে, “গোঁফ এইজন্য আছে কারণ আমি তোর ছ-ফুট চার ইঞ্চির পদ্মাবতী নই। আমি নেহাতই পদ্মিনীর বুড়ো বাবা ‘গন্ধর্বসেন’। ওঁর ঠাকুর্দা হতেও আপত্তি নেই। আমার বাড়িতে একজন ললিতা পাওয়ার বসে আছে! সে যদি জানতে পারে এখানে আমায় ‘লোলিটা’ চেপে ধরেছে তো লাইফের পুরো ‘পাওয়ারকাট’ করে ছেড়ে দেবে। প্লিজ, ছাড় আমায় মা।”
“উঁহু।” সে মাথা নাড়ছে, “তুমি গোঁফ গজাও, দাড়ি গজাও, মোটা হয়ে যাও, বেঁটে হয়ে যাও, হিরো আলমের মতো দেখতেও হয়ে যেতে পারো, তবু আমি তোমায় কিছুতেই ছাড়ব না। যখন তুমি ঠোঁট দিয়ে সিগারেটের বাট কামড়ে ধরো, রিং বানাও তখন আমারও সিগারেট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। কামন অন—কিস মি! কিস মি নাও লাইক আ সিগারেট। বার্ন মি লাইক ইন্ডিয়া কিং…!”
বলতে বলতেই কৌশানী তার চুম্বনোদ্যত মুখ পবিত্র-র ঠোঁটের কাছে নিয়ে গিয়েছে। পবিত্র মুখ সরিয়ে নিয়ে কোনোমতে উদ্যত চুমুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচায়। পরক্ষণেই মুখ বিকৃত করে বলল, “এ কী! ইনি তো গাঁজা খেয়েছেন! গন্ধে আমার গা গুলোচ্ছে। ইশশশ!”
অধিরাজ স্তম্ভিত। মিস্ বোস গাঁজা খেয়েছে! এ কী করে সম্ভব? সে যথেষ্ট সতর্ক মেয়ে। অত্যন্ত দায়িত্ব সচেতনও বটে। এই পরিস্থিতিতে এই জাতীয় মাদকের সেবন ও কিছুতেই করবে না। সর্বোপরি সে নিজেও জানে, কৌশানীর গাঁজা খাওয়ার কোনোরকম অভ্যেসই নেই। এতদিন ধরে একসঙ্গে রাত-দিন কাজ করছে। গঞ্জিকা সেবন করলে কখনো-না কখনো ঠিক আভাস পেত। বরং সে স্মোক করে। কেউ তার সিগারেটের স্টিকে গাঁজা মিশিয়ে দেয়নি তো! সে শঙ্কিত দৃষ্টিতে ঘটনাটা একবার দেখল। পরক্ষণেই উৎকর্ণ হয়ে কিছু যেন শুনল। কোনো একটা বেডরুম থেকে ভারি নিঃশ্বাস ও চাপা কাশির শব্দ ভেসে আসছে না! ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট। অধিরাজ প্রমাদ গুনল। কোনোমতে ফিশফিশ করে বলল, “সর্বনাশ। সর্বনাশ।”
“প্লিজ সেভ মি রাজা।” পবিত্র কাতরস্বরে বলে, “এ পাবলিক আমার সাড়ে তেরোটা বাজিয়েই ছাড়বে! আমি মি-টু কেস খাব…।”
“সরি বস…।” অধিরাজ আর একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে সোজা টেনে দৌড়োল বেডরুমের দিকে, “তার থেকেও বড়ো বিপদ আমার সামনে আছে। ওঁকে পরে দেখছি…!”
সে সরু করিডর দিয়ে একটু এগোতেই শুনতে পেল কাশির আওয়াজটা। বেডরুমের ভেতর থেকেই আসছে। এই শীতে এমন কাশির শব্দ একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অধিরাজ খুব ভালোভাবেই জানে এর অর্থ কী। সে মরিয়া হয়ে আপ্রাণ ধাক্কাধাক্কি করে বেডরুমের দরজা খোলার চেষ্টা করে। অথচ দরজা ভেতর থেকে বন্ধ! খুব সম্ভবত ল্যাচ টানা আছে। ওদিকে কাশির আওয়াজটা ক্রমাগতই বাড়ছে। তার মাথার মধ্যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল আহেলির বলা শব্দগুলো! …দশ থেকে পনেরো মিনিট… তার বেশি সময় হাতে নেই…! এর মধ্যে যদি এই রুদ্ধদ্বার না খোলে, তবে কাউকে বাঁচানো যাবে না! ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। …. ওদিকে উলটোদিকের বেডরুম থেকেও সেই কালান্তক কাশির শব্দ আসছে। মিসেস চৌধুরীও বিপন্ন!
অধিরাজ প্রথমে কোন্ন্দিকে দৌড়বে বুঝতে পারল না! পরিস্থিতি চরম বিপজ্জনক। এখনই ওঁদের প্রত্যেককে বাইরে বের করে আনা দরকার। এদিকে পরিমল আর মেঘনার জীবন বিপন্ন। ওদিকে সোমলতার মতো একজন অসুস্থ বৃদ্ধা! কোনদিকে যাবে সে? কোথায় যাওয়া উচিত! অথচ ওঁদের হাতে সময় ক্রমশ কমছে। ঐ বিষাক্ত গ্যাস যত ফুসফুসের ভেতরে ঢুকবে, ততই কালান্তক মৃত্যু কাছে ঘনিয়ে আসবে। একমুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল সে। কিছুটা হেল্পলেসও বটে। একা কতজনকে বাঁচাবে? ওদিকে পবিত্র আর মিস্ বোসের অবস্থাও তথৈবচ। ওদের সাহায্য এখন পাওয়া যাবে না। অথচ সময় নেই…! সময় নেই…। শিয়রে শমন।
একটা গভীর শ্বাস টেনে সে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করে। এখন বিচলিত হলে চলবে না। এই দরজা ভাঙতেই হবে তাকে। এখানে বন্দুক ইউজ করা যাবে না। ভেতরে দু-দুটো বিপজ্জনক গ্যাসের অস্তিত্ব! তার মধ্যে ফায়ার করলে কোনোরকম উলটোপালটা কিছু হবে কিনা জানা নেই। তাই ম্যানুয়ালি ভাঙাই ভালো। ট্রেনিঙের সময় দরজা ভাঙার পদ্ধতিটা তাদের সবাইকেই শেখানো হয়েছিল। তার জন্য দয়ানন্দ শেঠির মতো হেভিওয়েট হওয়ার প্রয়োজন নেই। ওটা স্রেফ একটা টেকনিক। অধিরাজ
একটু পিছিয়ে গিয়ে দরজার ল্যাচের অবস্থান আন্দাজ করে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে একটা সজোর কিক মারল। একটু পুরোনো কাঠের দরজা সেই আঘাতে কেঁপে উঠলেও একচুলও নড়েনি। সে আফসোসে ঠোঁট কামড়ায়। এগুলো এখনকার ফ্যান্সি দরজা নয় রীতিমতো শাল বা সেগুনের শক্তপোক্ত কাঠের দরজা। একবারে হবে না! “কাম অন…কাম… অন!”
সে পাগলের মতো দরজার গায়ে একের পর এক লাথি মারতেই থাকে। জোরে.. আরও জোরে… আপ্রাণ জোরে! দরজাও ভাঙার নাম নিচ্ছে না। অধিরাজও হা ছাড়ছে না। এখন তাকে সম্পূর্ণ উন্মাদের মতো লাগছে। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা টপটপ করে পড়ছে। শক্ত কাঠের দরজা বারবার তার আঘাতকে প্রতিহত করছে। তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা ক্রমশই সরছে… কাশির শব্দ ক্রমাগতই বাড়ছে…. শব্দটা এমন, যেন কেউ ওঁদের গলা টিপে ধরেছে… চোকিং সাউন্ড… একটু পরে এটাও শোনা যাবে না… ভোক্যাল কর্ডটাই পুড়ে যাবে! মারতেই হবে…! ভাঙতেই হবে…। সময় হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে…!
বারংবার প্রচণ্ড আঘাত অনাহতভাবে আছড়ে পড়ার ফলে শেষপর্যন্ত মানুষের দুরন্ত জেদের কাছে হার মানল কাঠের দরজা। একটা ধাতব ঝনঝন শব্দ! ল্যাচটা ভেঙে খুলে পড়েছে। অধিরাজ বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট না করে এক লাথি মেরে এবার দরজাটা খুলে দিল। ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ তার নাকে এসে ধাক্কা মারে। রুম ফ্রেশনারের সৌরভের মতো মিষ্টি নয়, কেমন যেন অদ্ভুত! অধিরাজের মনে হল তারও বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই সেই ফসজিনের গন্ধ! ঠিক তখনই আর একটা মারাত্মক ভুল আবিষ্কার করল সে। প্রচণ্ড আফসোসে নিজেকেই মনে মনে বলল, ‘স্টুপিড।’তাড়াহুড়োয় গ্যাসমাস্কটা ও গাড়িতেই ফেলে এসেছে! অসম্ভব বড়ো একটা ব্লান্ডার। তবে দরজা খুলতে পেরেছে এই রক্ষে। খোলা দরজা দিয়ে গ্যাসটা কিছুটা হলেও বাইরে বেরিয়ে আসবে।
অধিরাজ অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে প্যান্টের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে নাকে মুখে বেঁধে নেয়। তারপর আর দেরি না করে ঢুকে পড়ল বেডরুমের ভেতরে এখন ফের গাড়ি অবধি দৌড়ে যাওয়ার সময় নেই। যা হবে দেখা যাবে। ফসজিন যদি আজ তাকে মেরেও ফেলে তবু মানুষগুলোকে উদ্ধার করেই ছাড়বে। আর একটা মৃত্যুও হতে দেবে না! তাতে যা লেখা থাকে কপালে!
পরিমল আর মেঘনার জীবনীশক্তি ততক্ষণে প্রায় জবাব দেওয়ার পথে। কাশতে কাশতে দু-জনেরই মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। কাশার মতো শক্তিও বুঝি আর অবশিষ্ট নেই। দু-জনেই প্রায় অচেতন, অবিন্যস্ত, বিস্রস্ত! যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তবু মেঘনার জ্ঞান তখনও সামান্য ছিল। সে কোনোমতে তাকিয়ে বলল, “অ-ফি-সা-র।”
“স্যরি ম্যাডাম। বাট আই হ্যাভ টু টাচ ইউ।”
শুধু এইটুকু বলেই সে প্রায় এক হ্যাঁচকায় টান মেরে মেঘনাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছে। মেঘনা নারী বলেই পরিমলের চেয়ে অনেক বেশি ভালনারেবল। ওকেই আগে বাইরে বের করে নেওয়া দরকার। তার মাথায় তখনও আহেলির নির্দেশ ঘুরছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের বাইরের খোলা হাওয়ায় নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। সে সবেগে মেঘনাকে নিয়ে দৌড়োল বাইরের দিকে। ততক্ষণে পবিত্রও নিজেকে মিস্ বোসের আলিঙ্গন থেকে কোনোমতে মুক্ত করতে পেরেছে। সে অধিরাজকে বাইরের দিকে মেঘনাকে নিয়ে পাগলের মতো ছুটতে দেখে একমুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। ঘটনাটা কী ঘটেছে তা বুঝতে তার একটুও কষ্ট হয়নি। বিদ্যুৎবেগে অধিরাজের দেখাদেখি পবিত্রও মুখে রুমাল বেঁধে দৌড়োল ঐ বেডরুমের দিকেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অজ্ঞান পরিমলকে তুলে নিয়ে সে-ও তড়িৎবেগে বেরিয়ে এসেছে ঐ প্ৰাণঘাতী গ্যাস চেম্বার থেকে। পরিমলের দেহ অত্যন্ত ভারি। পবিত্র-র রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু মাঝপথেই দেখা হয়ে গেল অধিরাজের সঙ্গে। সে আবার ভেতরের দিকেই দৌড়চ্ছিল। পবিত্রকে গলদঘর্ম হতে দেখে বলল, “আমায় দাও।”
পবিত্র বিনাবাক্যব্যয়ে পরিমলের ভারি দেহটা অধিরাজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে সে অনায়াসেই ঐ লম্বা চওড়া যুবককে নিয়ে বাইরের দিকে ছোটে। ওরা কোনোদিকে না তাকিয়ে, সোজা বাড়ির বাইরে গিয়ে একদম খোলা আকাশের তলায়, প্রাকৃতিক হাওয়ার মধ্যে শুইয়ে দিয়েছে দু-জনকে। অধিরাজ আর পবিত্র-র দৃষ্টি বিনিময় হতেই সে বলল, “সোমলতা! কুইক!”
সোমলতার দরজা ভাঙতে অবশ্য খুব বেশি বেগ পেতে হল না। দু-জন শক্তিশালী বলিষ্ঠ যুবকের পদাঘাত তাঁর বেডরুমের প্রাচীন ছিটকিনি বেশিক্ষণ প্রতিরোধ করতে পারেনি। ফসজিন ও মাস্টার্ড গ্যাসের যুগ্ম আক্রমণে তিনিও তখন জীবনের শেষ প্রান্তে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিলেন। অধিরাজ তাঁর ভারি শরীরটাকে কাঁধে ফেলে বলল, “পবিত্র, দুটো ঘরের সব জানলা খুলে দিয়ে ফ্যান চালিয়ে দাও ইমিডিয়েটলি …!”
“ইয়েস স্কিপি।”
সোমলতাকে নিয়ে অধিরাজ চলে যেতেই পবিত্র তাড়াতাড়ি দুটো বেডরুমের ভেতরে ঢুকে দ্রুতবেগে সমস্ত জানলা খুলে দেয়। সেই দম বন্ধ করা পরিস্থিতি এখনও কায়েম আছে। কিন্তু বাইরের ঠান্ডা হাওয়া বদ্ধ ঘরে ঢোকামাত্রই একটু যেন পরিবেশটা হালকা হল। সে প্রথমে ফ্যানের সুইচ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই যে ক-টা সুইচ ছিল সবগুলোকেই অন করে দিয়েছে। রেগুলেটরে হায়েস্ট স্পিডের সঙ্কেত পেয়েই পাখা একেবারে ঝড়ের গতিতে ঘুরতে শুরু করল। পবিত্র টের পেল, দম বন্ধ ভাবটা এবার আস্তে আস্তে কমছে। আহেলি সঠিকই বলেছিল। ফসজিন ভারি গ্যাস হলেও ক্লোরিনের মতো গোঁয়ার গোবিন্দ নয়। গ্যাসটা পাখার ধাক্কায় ও খোলা জানলার মাধ্যমে সত্যিই বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে এখন লুটোপুটি খাচ্ছে ঠান্ডা তাজা বাতাস।
নিজের কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে ফের বাইরে বেরিয়ে এল পবিত্র। অধিরাজ ততক্ষণে কোথা থেকে যেন লম্বা একটা পাইপ এনে বাইরের কলের সঙ্গে কানেক্ট করে ঝঝপ করে জল ফেলছে ভিকটিমদের ওপর। এই পাইপটা বোধহয় বাগানে জল দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। পরিমল, মেঘনা ও সোমলতা, তিনজনেই আপাদমস্তক ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু জলে স্নান করার ফলও পাওয়া গিয়েছে হাতেনাতে। তিনজনেরই হুঁশ আস্তে আস্তে ফিরছে। সোমলতা ও মেঘনা নড়াচড়া করছেন। পরিমলও ক্লান্ত চোখ খুলে তাকায়। অধিরাজ ঝুঁকে পড়ে তিনজনেরই শ্বাস চেক করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “নর্মাল ব্রিদিং! ফাঁড়াটা এবারের মতো বোধহয় কেটে গেল পবিত্র। অ্যাম্বুলেন্স ডাকো। ওঁদের তিনজনকেই হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।”
পরিমল আস্তে আস্তে বলল, “বা-বা!”
“আশা করছি ওঁর কিছু হয়নি।” অধিরাজ তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে, “আপনি ঠিক আছেন? শ্বাস নিতে এখনও কষ্ট হচ্ছে?”
পরিমল কোনোমতে মাথা নেড়ে জানায় যে এখন আর শ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে না। বাইরের তাজা অক্সিজেন আর জল, ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের মারাত্মক প্রভাব অনেকটাই দূর করতে পেরেছে। যদি আভ্যন্তরীণ অঙ্গে কোনোরকম ক্ষতি হয়ে থাকে তবে তা হসপিটালে পৌঁছোনো অবধি বোঝা যাবে না। পবিত্র আর কথা না বাড়িয়ে নিকটবর্তী হসপিটালের সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্সের বন্দোবস্ত করে ফেলে। হসপিটাল থেকে ওদের জানানো হল, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।
“চোখে, নাকে ভীষণ জ্বালা…!” এবার মেঘনা অতিকষ্টে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।” “ওয়েলকাম ম্যাডাম।” বলেই অধিরাজ পবিত্র-র দিকে তাকিয়েছে। সে তখন উত্তেজনায়, পরিশ্রমে রীতিমতো হাঁফাচ্ছে। কোনোমতে বলল, “মিঃ চৌধুরীকে খবর দাও। ওঁকে ইনফর্ম করো। আর দেখো, মিস্ বোসের কী হল।”
“কী।” পবিত্র আঁতকে ওঠে, “আবার ঐ লুচ্চি আলাউদ্দিন খিলজির খপ্পরে পড়ব। আর একটু হলেই আমি অফ হয়ে যাচ্ছিলাম রাজা। থ্যাংক গড তার আগেই উনি নিজেই অফ হয়ে গিয়েছিলেন! আবার যদি চেপে ধরেন, তবে কপালে জওহরব্রতই নাচছে। আমি না, আমার বউ করবে। আমি নেই। তুমি ওঁকে দেখো। আমি বরং পি সি চৌধুরীকে ডেকে আনছি।”
“ওকে।”
পি সি চৌধুরীর অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। অধিরাজরা ঠিকই আন্দাজ করেছিল। বয়স্ক মানুষটিকে বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়া স্পর্শও করেনি। তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিলেন। পবিত্র-র ডাকাডাকিতে সভয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন। নিদ্রাজড়িত আড়ষ্ট অবস্থায় প্রথমেই কী হয়েছে তা বুঝতে পারেননি। পরক্ষণে দুঃসংবাদটা শুনেই প্রায় চেঁচিয়ে ওঠেন, “সে কী! ওরা… ওরা সবাই…!”
“বেঁচে আছেন এবং সুরক্ষিতও আছেন।” পবিত্র তাঁকে আশ্বস্ত করে, “আপনি চলুন। অ্যাম্বুলেন্স অন দ্য ওয়ে। পেশেন্টদের গার্জিয়ান হিসাবে আপনাকে থাকতে হবে। অবিলম্বে ট্রিটমেন্ট দরকার ওঁদের।”
ভদ্রলোকের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ!…থ্যাঙ্ক ইউ…!”
অন্যদিকে অধিরাজ মিস্ কৌশানী বোসকে অতি সন্তর্পণে পরীক্ষা করছিল। সে এখন সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। নট নড়ন চড়ন, নট কিচ্ছু! সৌভাগ্যক্রমে আরও বেশি কিছু অঘটন ঘটার আগেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। অধিরাজ ঝুঁকে পড়ে অতি সাবধানে তার মুখ শুঁকে দেখল। হ্যাঁ, পবিত্র ঠিকই বলেছে। অকৃত্রিম গাঁজার গন্ধই বটে। তবে তার অভ্যস্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয় হালকা মার্লবোরোর গন্ধটাও পেল। সে কথা না বাড়িয়ে কৌশানীর ব্যাগ খুঁজে বের করে ভেতর থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে আনে। তার মধ্যে এখন মাত্র দুটো স্টিকই পড়ে আছে। সে একটা স্টিককে ভেঙে ভেতরের ঘ্রাণটা নেয়। উঃ! ভয়াবহ!
অধিরাজ আফসোসে মাথা নাড়ে। তার সন্দেহই সঠিক। কৌশানী নিজে গাঁজা খায়নি। সে মার্লবোরোই স্মোক করছিল। হয়তো রাত জাগার ক্লান্তি দূর করার জন্যই একাধিক সিগারেট টেনেছিল। সেটাই স্মোকারদের পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বুঝতে পারেনি যে ঐ স্টিকগুলোর মধ্যে কেউ গাঁজাও মিশিয়ে দিয়েছে। সন্দেহে অধিরাজের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু মেশাল কখন। কমলাকে তো তার অনেক আগেই ওরা এ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। তার আগেই কি সে সুযোগ পেয়ে সিগারেটের বাক্সে হেরফের করে রেখেছিল? নাকি অন্য কেউ তাকে সাহায্য করেছে? তাছাড়া কৌশানী টুইঙ্কলের মতো সকলের সামনেই বেপরোয়াভাবে হুশহুশ করে স্মোক করে না। সে লুকিয়ে চুরিয়ে ধূমপান করে থাকে। কেউ জানলই বা কী করে ওর এই দুর্বলতাটার কথা! এ বাড়ির মানুষেরা যে পরিমাণ সাত্ত্বিক তাতে নার্স সিগারেট ফুঁকছে দেখলে আগেই হার্টফেল করতেন ওঁরা। সুতরাং ফ্যামিলির কেউ জানতেই পারে না। তবে? কৌশানীকে প্যাকেটটাই বা এনে দিল কে?
অধিরাজের মুখে দুশ্চিন্তা। বার্নিং শিখকে কিছুতেই জব্দ করা যাচ্ছে না। সেডেটিভ, স্ট্রেস ফ্রি ড্রাগের যোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে এখন গাঁজার মতো নেশার বস্তুর আশ্রয় নিয়েছে। কৌশানী বোসের স্মোকিং হ্যাবিটের কথা ও আগেই জেনে গিয়েছিল। আশ্চর্য! এই টিমের প্রত্যেকটি অফিসার এবং তাদের সব অভ্যেসের খবর কি সে মুখস্থ করে রেখেছে! পবিত্র এখানে এসে না পড়লে, আর অধিরাজ সময়মতো উপস্থিত না হলে কৌশানীর টুকরো টুকরো করা দেহটা কাল পাওয়া যেত! সঙ্গে আরও তিনটে মানুষের লাশ! এত সাবধানতা, সতর্কতা, এত আপ্রাণ প্রচেষ্টা আর একটু হলেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছিল। কী ভয়ংকর খুনি! কী ভয়াবহ আর নিখুঁত তার প্ল্যানিং। সশরীরে সে আশেপাশে কোথাও উপস্থিত নেই। অথচ কী অব্যর্থ তার মারণাস্ত্র।
জুতোর খটখট শব্দে সে সচকিত হয়ে ওঠে। পবিত্র মিঃ পি সি চৌধুরীকে নিয়ে আসছে। ভদ্রলোকের মুখে বিহ্বলতা, ভয়, গ্লানি, সব মিলিয়ে মিশিয়ে ছড়িয়ে আছে। অঝোরে কেঁদেই চলেছেন। তিনি অধিরাজের দিকে শুধু একটি নীরব কৃতজ্ঞতাপূর্ণ নমস্কার জানিয়ে সোজা চলে গেলেন বাইরে শায়িত তাঁর পরিবারের কাছে। পবিত্রকে এই সুযোগে একান্তে ডেকে নিল অধিরাজ, “তুমি কি জানতে যে মিস্ বোসের স্মোকিং হ্যাবিট আছে?”
“হ্যাঁ।” পবিত্র উত্তর দেয়, “আগে জানতাম না। কিন্তু কাল ওঁর ড্রেসে লাগানো স্পাইক্যামেরার সামনে আস্ত মার্লবোরোর প্যাকেট ও উড়ন্ত ধোঁয়া দেখে বুঝেছিলাম যে উনিও আমাদেরই প্রজাতিভুক্ত।”
“তাহলে ওকে খাবার আর জলের সঙ্গে সিগারেটের সাপ্লাইও কি তুমিই দিয়েছিলে?”
“না।” পবিত্র এবার যেন একটু বিস্মিত হয়, “এক মিনিট… এক মিনিট…। তাই তো! উনি তো একবারও বলেননি যে ওঁর সিগারেটের প্রয়োজন আছে! বরং এখন মনে হচ্ছে, বোধহয় শিখাকে এ বিষয়ে কিছু বলেছিলেন। শিখাকে আমি অন ক্যামেরা বিড়ি খেতে দেখেছি। তারপরই আজ সন্ধের পর মিস্ বোস শিখাকে কিছু টাকা ধরিয়ে কিছু একটা বলেছিলেন। কী বলেছিলেন, অতটা স্পষ্ট শুনতে পাইনি। তারপর প্রায় একঘণ্টা পরে শিখা ওকে একটা কালো কাগজে মোড়া প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। আমি অত রাখঢাক দেখে গুরুত্ব দিইনি। জানোই তো মেয়েদের অনেক কিছু লাগে। অনেকরকম প্রাইভেসি থাকে… |
“আই নো!” সে মাথা ঝাঁকায়, “স্বাভাবিকভাবেই তুমি সন্দেহ করোনি। আর মিস্ বোসও তোমায় সিগারেটের কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করেছেন। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ অনেক পুরুষই মেয়েদের স্মোক করা পছন্দ করে না। সেক্ষেত্রে উনি শিখাকেই বলবেন। নিজে যেতে পারছিলেন না, ওঁর ওপর সর্বক্ষণ ওখানে উপস্থিত থাকার অর্ডার ছিল। ওদিকে সিগারেট শেষ। যেহেতু শিখা নিজেই বিড়ি ফোঁকে তাই তাকেই একমাত্র এই গোপন কথাটা বলা যায়। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শিখাও এই প্যাকেটটা আনেনি। কমলা এনেছে।”
“অ্যাঁ। কিন্তু আমি যে শিখাকেই দেখলাম।”
“তুমি যা দেখেছ সেটাও সত্যি। আবার মিস্ বোস যা বলেছিলেন সেটাও। উনি বলেছিলেন শিখা একনম্বরের ফাঁকিবাজ। সে টিপিক্যাল পটের বিবি। নিজের কাজটাও কমলার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। এবার তুমিই ভেবে দেখো, এখান থেকে সবচেয়ে কাছের সিগারেটের দোকানটা মাত্র দু-মিনিটের দূরত্বে। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে সেখানে মার্লবোরোর মতো অভিজাত ব্র্যান্ড পাওয়া যায় না, তবু গলি থেকে বেরিয়েই একটা বড়ো টোব্যাকো প্রোডাক্টের দোকান দেখেছি আমি। ওখানে ট্রিপল ফাইভ, বেনসন অ্যান্ড হেজেস, ইন্ডিয়া কিং সমেত সব দামি ব্র্যান্ডই পাওয়া যায়। শিখা যদি ওখান থেকেও নিয়ে আসত, তবে হার্ডলি দশ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু তুমি নিজেই দেখেছ, সে প্যাকেটটা ডেলিভারি দিয়েছিল এক ঘণ্টা পরে। এখন প্রশ্ন হল, এত সময় লাগল কেন!”
“কেন?”
“কারণ শিখা আদৌ নিজে সিগারেট আনতে যায়নি। যে পটের বিবি ও ফাঁকিবাজ সে নিজের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়েই চাপাবে, সেটাই স্বাভাবিক। শিখাকে ইন্টারোগেট করলে দেখো সে বলবে যে সিগারেট আনার দায়িত্ব সে কমলাকে দিয়েছিল। বার্নিং শিখ নিজে স্পিডি হতে পারে, কিন্তু কমলার ছদ্মবেশে সে অত্যন্ত শ্লথ। অ্যাক্টিং স্কিল এতটাই মারাত্মক যে ওর অস্কার পাওয়া উচিত। কমলাকে স্পিডে কাজ করতে দেখলে সকলেই সন্দেহ করবে। তাই টুকটুক করে নিজের কাজ সেরে সে ধীর গতিতে দোকান অবধি গিয়েছিল। আজই প্রথম নয়, নির্ঘাৎ কালও সে-ই মিস্ বোসের জন্য শিখার হুকুমে মার্লবোরোর প্যাকেট এনেছিল, তাই তার জানা ছিল যে এই লেডি অফিসার ধূমপান অভ্যস্ত। আজ মিঃ কমলা তাই একদম প্রস্তুত হয়েই এসেছিল। সে যেহেতু চরম স্লো, তাই সিগারেটের স্টিকের মধ্যে গাঁজা মেশাতে যে এক্সট্রা টাইম লেগেছে, সেটা জাস্টিফাই করতে কোনো অসুবিধেই হয়নি। যে ওরকম কচ্ছপের গতিতে কাজ করে, সে দশ মিনিটের কাজ করতে একঘণ্টাই নেবে। মিস্ বোসের ধারণা ছিল না যে সিগারেটটা শিখা আনেনি, কমলা এনেছে। তাই চোখের সামনে কমলার আসল রূপ দেখার পরও ওঁর বিন্দুমাত্রও সন্দেহ হয়নি যে মার্লবোরোর স্টিকে কোনো প্যাঁচ-পয়জার থাকতে পারে। কারণ উনি শিখাকে বলেছিলেন, এবং সে-ই ওঁকে প্যাকেটটা ডেলিভারি করেছিল। শিখা যেহেতু ক্লিন, তাই তার দেওয়া প্রোডাক্ট নিয়েও সন্দেহ করার কোনো মানে হয় না। আর তুমি নিজেই দেখেছ, প্যাকেটটা এসে পৌঁছেছে সন্ধ্যার কিছু পরে। বার্নিং শিখ জানত, প্রকাশ্যে সবার সামনে উনি স্মোক করবেন না। হাই প্রব্যাবিলিটি আছে যে সবাই শুয়ে পড়ার পরেই একান্তেই মৌতাতে মনোনিবেশ করবেন। সেই চান্সটাই সে নিয়েছে। ফলাফল তোমার সামনে। তুমি আর আমি যদি আর একটুও দেরি করতাম, তবে চারজনই এতক্ষণে স্বর্গে ট্রান্সফার হয়ে যেতেন।”
পবিত্র এবার চটে লাল হয়ে গিয়েছে, “ফলাফল! আরে ইনি তো বিষফল। ওঁর স্পাই ক্যামের ওপর নজর রাখতে রাখতেই হঠাৎ দেখি ক্যামেরা ছাতের দিকে একবার ঘুরছে, পরক্ষণেই পালটি খাচ্ছে। তুমি বলেছিলে কোনোরকম সন্দেহ হলেই যেন সোজা ভেতরে ঢুকে যাই। ক্যামেরার জগঝম্প দেখে যেই এসে ঢুকেছি, অমনি উনিও আমায় এইসান ভীম আলিঙ্গনে চেপে ধরলেন যে অলমোস্ট আমি পটল তুলতেই যাচ্ছিলাম। তুমি স্বচক্ষে দেখেছ কী অবস্থা হয়েছিল। ম্যাডাম নিজেই যদি পতন ও মূর্ছা না যেতেন তবে আজ আমার হার্ট অ্যাটাক কেউ আটকাতে পারত না। ওঃ, ইনি আলাউদ্দিন খিলজির চেয়েও ডেঞ্জারাস! আর যা-ই হোক, ও লোকটা পদ্মিনীকে এইভাবে জাপ্টে ধরেনি।”
বাইরে থেকে ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্সের হুটারের তীব্র আওয়াজ ভেসে এল। অ্যাম্বুলেন্স এসে পড়েছে। একটা নয়, একাধিক। অধিরাজ আর কথা না বাড়িয়ে বাইরে চলে এল। তার মধ্যেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে লেগে পড়েছে স্বাস্থ্যকর্মী ও ওয়ার্ডবয়ের দল। তিনজন পেশেন্টকেই দ্রুতগতিতে তারা তুলে নিল অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আরও একজন আছেন ভাই। ঘরের ভেতরে আনকনশাস অবস্থায় আছেন। ওঁকেও নিয়ে যাও। ওনারও ট্রিটমেন্ট দরকার।”
“ওনার ট্রিটমেন্ট নয়, ঝাড় দরকার।” পবিত্র ক্ষেপচুরিয়াস, “ঝাড় দিয়ে ওঁকে খণ্ড খণ্ড করে ঝাড়খণ্ডে ট্রান্সফার করা দরকার। এই মহিলাকে অবিলম্বে বসিয়ে দাও রাজা।
এ নিজেও ডুববে আমাদেরও ডোবাবে। একনম্বরের ক্যারেক্টারলেস টাইটানিক।” “আপাতত চুপ থাকো।” অধিরাজ হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলে, “এখন রাগারাগি করার সময় নয়। প্রত্যেককেই প্রপার ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সময়। তুমি কি পি সি চৌধুরীর সঙ্গে হসপিটালে যাবে? না আমি যাব? কারণ একজনকে ওখানে যেতেই হবে। ডাক্তারদের বলতে হবে যে এই দুর্ঘটনার পেছনে ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের লেথাল এক্সপোজার আছে। যত তাড়াতাড়ি ওঁরা রোগের কারণ জানবেন, তত তাড়াতাড়ি ট্রিটমেন্টও চালু হয়ে যাবে।”
“আমি একা কোথাও যাচ্ছি না।” সে গরগর করে, “তুমি গেলে যেতে পারি।” “বেশ। চলো।”
সারা রাস্তা পবিত্র আর একটি কথাও বলল না। সে একদম চুপ মেরে গিয়েছে। এরমধ্যেই অধিরাজ লোক্যাল পুলিশকে ইনফর্ম করেছে। পুলিশ আপাতত মিঃ চৌধুরীর বাড়িটাকে একবার ভালো করে সার্চ করে দেখবে। তারপর বাড়িটাকে পুরোপুরি ক্রাইম সিন হিসাবে সিল করে দিয়ে ওখানে পাহারা বসিয়ে দেবে। অর্ণবকে ফোন করে আর্বানার পরিস্থিতিও জানতে চাইল। ওখানে সবই স্বাভাবিক। কোনোরকম অঘটন এখনও ঘটেনি। আত্রেয়ী ও অর্ণব দু-জনেই অতন্দ্র প্রহরায় আছে। এখানকার অ্যাটাকের কথা শুনে অর্ণব উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায়, “আপনারা সব ঠিক আছেন? আমি কি ওখানে আসব?”
“না।” অধিরাজ বারণ করে, “তুমি ওখানে একদম থাবা গেড়ে সকাল অবধি বসে থাকো। একচুলও নড়বে না। এখানে অ্যাটাক হয়েছে তার মানে এই নয় যে ওখানে হবে না। আমি যতদূর বুঝেছি, এই খুনগুলো করার জন্য বোধহয় খুনির সশরীরে উপস্থিত থাকার দরকার নেই। সেটা কোন্ পথে, কীভাবে সম্ভব তা জানি না। তবু সূর্যোদয় হওয়া অবধি সাবধানে থেকো। আপডেট দিও।”
“ওকে।”
পি সি চৌধুরীর বাড়ি থেকে হসপিটালটির দূরত্ব খুব বেশি নয়। রাস্তাতেও কোনো সমস্যা হয়নি। তিনটে অ্যাম্বুলেন্স পরপর রোগীদের নিয়ে হাসপাতালের চত্বরে ঢুকল। চৌধুরী সাহেব অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই ছিলেন। আর ওদের পেছন পেছন অধিরাজ ও পবিত্র গাড়িতে যাচ্ছিল। এমার্জেন্সিতে ঢোকামাত্রই উপস্থিত ডাক্তারদের সব ব্রিফ করে দিল ওরা। অধিরাজ জানাল যে ফসজিন ও মাস্টার্ড গ্যাসের এক্সপোজারে ছিলেন পেশেন্টরা। একজন তরুণ ডাক্তার কৌশানীকে দেখিয়ে বলল, “উনিও কি ফসজিনের কন্ট্যাক্টে এসেছিলেন?”
“না। উনি গঞ্জিকাসেবন করে বর্তমানে হাওয়ায় ওড়াউড়ি করছেন। মাটিতে নামিয়ে আনার দায়িত্ব আপনাদের। আর ওনার তেজষ্ক্রিয় কন্ট্যাক্টে আমি এসেছি। কী বলেন আপনারা? ঠিক হয়ে যাব, না আই সি ইউতে ঢুকে পড়তে হবে?”
অধিরাজ কিছু বলার আগেই পবিত্র রাগতস্বরে জানিয়ে দিল। তরুণ ডাক্তারটি কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে একটু অপ্রস্তুত হেসে চলে গেল। অধিরাজ তার দিকে তাকিয়ে শুধু বলে, “সবসময়ই ওভার-রিঅ্যাক্ট করা জরুরি?”
পবিত্র একটু চুপ করে থেকে করুণস্বরে বলল, “উনি এত বড়ো একটা ব্লান্ডার করতে পারেন, বেতালের মতো আমার ঘাড়ে চড়তে পারেন, আর আমি একটু রাগতেও পারব না? মানছি, শুরুতেই আমি নিজেই কেলো করে বসে আছি। তার জন্য তোমার যথেষ্ট ঝাড়ও খেয়েছি। কিন্তু তারপর অর্ণব যা করল, আর ইনি যা করেছেন সেটা কম কী! তার জন্য তো ওদেরও ঝেড়ে লাট করে দেওয়ার কথা! কিন্তু তোমার সব ঝাড় আমার ওপরই পড়ে কেন? আমি কি একাই ঝাড়খণ্ডি হওয়ার ঠেকা নিয়ে বসে আছি। বাকিদের তো তুমি কিছু বলো না।”
অধিরাজ স্মিত হাসল, “তার কারণ বাকিদের ঝাড়ার দায়িত্ব তুমিই নিয়েছ। দেখো, গোটা টিম এখন এমনিতেই ট্রিমেন্ডাস প্রেশারে আছে। তাই বকাবকির প্রেশারটা এখানে শুধু একজনই দিতে পারে। যেহেতু তুমি টিমের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র, সেহেতু অন্য কেউ তোমায় কিছু বলতে পারবে না। তাই তোমায় ডোজ দেওয়ার দায়িত্ব বা অধিকার একমাত্র আমারই আছে। কিন্তু অর্ণবকে তুমি প্রায় পাট পাট করে ছেড়েছ। তার ওপর শিশির সেনও ছেড়ে কথা বলেননি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মিস্ বোসকেও তুমিই একহাত নেবে। কোনো ক্ষেত্রেই আমি তোমায় বাধা দেব না। ঐ বকাটা ওরা ডিজার্ভ করে। কিন্তু তোমার দেখাদেখি আমিও যদি শুরু হয়ে যাই, তবে অফিসারদের মনের ওপর আর একটা এক্সট্রা চাপ পড়বে যেটা একেবারেই কাম্য নয়। শাসন বা আদর কোনোটাই অতিরিক্ত হওয়া ঠিক নয়। যখন একজন সিনিয়র জুনিয়রদের ভর্ৎসনা করে, তখন অন্যদের চুপ থাকাই উচিত। সবাই মিলে বকতে শুরু করলে জুনিয়রদের সেলফ কনফিডেন্স ভেঙে যায়। ওটা একেবারেই সঠিক কাজ নয়। তাই যেহেতু তুমি অ্যাকটিভ, তাই আমি প্যাসিভ মোডেই আছি।”
“বুঝলাম।” পবিত্র একটা শ্বাস টানল, “কিন্তু তুমি কি বুঝেছ মিস্ বোস নামক আলাউদ্দিন খিলজির পদ্মাবতীটি আসলে কে? অবভিয়াসলি আমি নই। ইনফ্যাক্ট আমার জায়গায় ঐ বুড়ো পি সি চৌধুরী থাকলেও উনি তাঁকেও একইভাবে চুমু খেতে যেতেন। কারণ একজনের মূর্তিই ওঁর চোখের সামনে ছিল।”
“জানি।” এতক্ষণে তার মুখে ফের চিন্তার ছাপ, “উনি আমার কথা বলছিলেন।” “আরে বাঃ।” পবিত্র তার দিকে বড়ো বড়ো চোখে তাকায়, “তুমি সেটা বুঝেছ। শেষপর্যন্ত বুঝতে পারলে? আই মিন, মাথায় ঢুকল তোমার মামা? থ্যাঙ্ক গড! সূর্যটা ঠিক কোন্ দিকে উঠেছিল আজকে?”
“না বোঝার কিছু নেই।” সে গম্ভীর স্বরে বলে, “কমন সেন্স পবিত্র। ওঁর বক্তৃতার মধ্যেই সব ক্লু ছিল। এখানে পুরো সি.আই.ডি. হোমিসাইডটাই সাসপেক্ট হতে পারত। কিন্তু ছ-ফুট চার ইঞ্চির ক্লিনশেভড স্মোকার একজনই আছে। মেন্টাল অ্যাসাইলামের কেসও তাঁর আন্ডারেই ছিল। ঐ একটি লোকই ইন্ডিয়া কিংস ব্র্যান্ড ইউজ করে, ঠোঁট দিয়ে টেনে সিগারেট প্যাকেট থেকে বের করে কিংবা ধোঁয়ার রিং বানাতে পারে। উনি যে টিমের সদস্য সেখানেও আই জি একপিসই আছে। বাকিটা জলবৎ তরলং। একটা পাঁচবছরের ছেলেও ক্রিমিনালকে খুঁজে বের করতে পারবে, সেখানে তো আমি পেশাদার ইনভেস্টিগেটর।”
“তারপরও তুমি চুপ করে আছ! তোমার মনে হয় না, এখনই ওঁকে এই টিম থেকে কান ধরে বের করে দেওয়া উচিত?”
‘ট্রেনিং-এর সময়ে তুমি নিজেও তো একবার হোলির পার্টিতে নাক অবধি টেনে অ্যাকাডেমির গুঁফো বিহারী দরোয়ানকে চুমু খেতে গিয়েছিলে। তাই বলে কি তোমায় অ্যাকাডেমি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে? একটু ঝাড় পড়েছিল, সেটা আলাদা কথা।” অধিরাজ বলল, “মানুষ নেশা করলে প্রচুর ভুলভাল বকে। প্রলাপকে একদমই সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত নয়, ইগনোর করাটাই বেটার। কাল সকালে ওঁরও কিছু মনে থাকবে না। আমাদেরও ভুলে যাওয়াই ভালো। রাতে উনি স্রেফ ভুল করে গাঁজা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন, এর বেশি আমরা কিছু জানি না, শুনিনি, দেখিনি। গল্প শেষ, চ্যাপ্টার ক্লোজড।”
“চ্যাপ্টার ক্লোজড? শিওর?” পবিত্র এবার খুব সিরিয়াস, “নেশায় মানুষ সবসময় ভুল বলে না রাজা। অনেকসময় পেটের কথা মুখেও চলে আসে। ঘোরের মধ্যে থাকা লোক বেশিরভাগ সময়ই সত্যি কথাটা বলে ফেলে। এটা তোমারও জানা৷ এইজন্যই অনেক ঘুঘু ক্রিমিনালের ‘নার্কো টেস্ট” হয়। তাই আমার মনে হয় না যে এটাকে আদৌ হালকা ভাবে নেওয়া উচিত।”
“রিয়েলি?” অধিরাজ মৃদু হাসল, “তা হলে বলো, মাধবী কে?”
“হোয়াট?” সে চোখ কপালে তুলে ফেলল, “মাধবী! সে আবার কে। অভিনেত্রী মাধবী?”
“ওয়েল, ফর ইওর কাইন্ড ইনফর্মেশন….।” অধিরাজ ঠোঁট টিপে হাসছে, “তুমি সেদিন বিহারী দরোয়ানকে জাপ্টে ধরে কোনো মাধবীর বিরহেই কাতর হয়ে পড়েছিলে ও ভেউ ভেউ করে কেঁদেছিলে। ওদিকে আমরা শুরু থেকেই জানতাম যে তোমার ছোটোবেলার প্রেম রীতিমতো সফল। বাল্যবয়েস থেকেই তুমি একজনের প্রেমেই হাবুডুবু খেয়েছ। তিনি অধুনা আমাদের সবার বউদি। তখনও তিনিই তোমার স্টেডি গার্লফ্রেন্ড ছিলেন, দ্বিতীয় কোনো নারী ছিল না। তাঁর নাম মাধবীও নয়। তাই কোনো মাধবী বা করবীর হাফসোল খেয়ে দেবদাস হওয়ার কোনো চান্সই ছিল না তোমার। অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় তো হতেই পারেন না, কারণ তোমার ড্রিম গার্ল মাধবী মুখোপাধ্যায় ছিলেনই না। মেরিলিন মনরো আজীবনের স্বপ্নসুন্দরী। ক্লাসিক থেকে আধুনিক সব ডাকসাইটে সুন্দরী নায়িকারাও তাঁকে রিপ্লেস করতে পারেননি। এখন অবশ্য দেখছি সানি লিওনি যুক্ত হয়েছেন। মেরিলিন মেরিলিন বললে তবু বুঝতাম, কিন্তু যেভাবে তুমি টান্টু খেয়ে ‘মাধবী, মাধবী’ বলে কান্নাকাটি জুড়েছিলে তাতে মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি তোমার জন্ম জন্মান্তরের প্রেমিকা!”
“অ্যাঁ।” পবিত্র হাঁ। সে ভয়াবহ কনফিউজ হয়ে বলে, “আমি তাই করেছিলাম? কিন্তু মাধবীটা কে। বউয়ের দিব্যি, আমি কোনো মাধবী, মালতীকে চিনি না! ঐ নামের কোনো মেয়েবন্ধু ছিল বলেও তো মনে পড়ছে না।”
“ছিল না।” সে হেসে ফেলেছে, “সে রহস্য তখন ভেদ হয়নি। কিন্তু পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”
“কী বুঝেছিলে? মাধবী কে?”
“তিনি সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কালবেলা’র নায়িকা মাধবীলতা।” অধিরাজ হাসছে, “ঐ ঘটনার ঠিক আগেই তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কালবেলা পড়ছিলে। আর মাধবীলতার অসামান্য ক্যারেক্টারের ওপর অবসেসড হয়ে গিয়েছিলে। সেদিন রাতে তুমি যে কাণ্ডটি করেছিলে সেটা অন্য কিছু নয়, একটি কাল্পনিক চরিত্রের ওপর ইনফ্যাচুয়েশন। আর এই ইনফ্যাচুয়েশন জিনিসটি একেবারেই দীর্ঘস্থায়ী নয়। নিজেকে দিয়েই দেখো। যে মাধবীলতার জন্য মজনুর মতো কেঁদে ভাসিয়েছিলে, তাকে পরেরদিনই আর মনে করতে পারোনি। মিস্ বোসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ওটা ইনফ্যাচুয়েশন। কালই কেটে যাবে। পাগলকে শুধু সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিও না। আদারওয়াইজ, শি ইজ আ ভেরি গুড অফিসার। এইটুকুই আমার সঙ্গে ওঁর বিজনেস।”
পবিত্র-র মুখে দুশ্চিন্তা। অধিরাজ ব্যাপারটাকে যত সহজভাবে নিচ্ছে ব্যাপারটা আদৌ অত সহজ নয়। মিস্ বোস তাকে চেপে ধরলেও ওর আকুলতাকে বুঝতে কষ্ট হয়নি পবিত্র-র। কৌশানী যখন অধিরাজকে দেখেওনি, তখন থেকেই তার জন্য পাগল হয়ে বসেছিল। এখন তার ব্যক্তিত্বকে ডিঙিয়ে যেতে পারছে না বলে কিছু প্রকাশ করছে না। কিন্তু একটু আগেই সে যেভাবে বেসামাল জগন্নাথের রথের মতো ঘাড়ে এসে পড়েছিল তাতেই হাড় হিম হয়ে গিয়েছে পবিত্র-র। আস্ত মঞ্জুলিকার ভূত এসে পড়লেও বোধহয় এত ভয় পেত না। বিষয়টা বোধহয় এতটাও হালকা নয়।
সে ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য অবশ্য ফের লঘু চালে বলল, “বাট ইউ রাজা। ইউ আর মির্জাফর। ট্রেইটর। বিশ্বাসঘাতক। যখন অলমোস্ট আমি গঙ্গায় ডুবছিলাম, হেল্প হেল্প করে চেঁচাচ্ছিলাম, তুমি তখন স্রেফ সুড়ুৎ করে কেটে পড়লে! এ কী জাতীয় বন্ধুত্ব। ফিলিং সো মাচ দুক্কু!”
“সরি বাডি।” অধিরাজ বলল, “কিন্তু আমার ফার্স্ট প্রেফারেন্স কতগুলো মানুষের প্রাণ ছিল। তোমাকে বাঁচাতে গেলে তাঁদের বাঁচানো যেত না। আমি নিজের ডিউটিটাই করছিলাম।” তার মুখে ফের চিন্তার রেখা, “বাই দ্য ওয়ে, তুমি যে ওখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিলে, ঐ গোটা সময়ে কাউকে আসতে যেতে দেখেছ?”
“বিলিভ ইট অর নট, একটা কুকুর, বিড়ালও বাড়ির ত্রিসীমানায় আসেনি, মানুষ তো দূর।” পবিত্র বলে, “ইনফ্যাক্ট আমি ওখানে ফেরার পর থেকেই সমানতালে মনিটরিং করে গেছি। মিস্ বোসও ছিলেন। উনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কোনো বাইরের লোক ও বাড়িতে ঢোকেনি। আমি নিজেও ক্যামেরার মাধ্যমে দেখছিলাম। ঘরে পরিবারের লোকজন ছাড়া আর কেউ ছিলেনই না। মিঃ অ্যান্ড মিসেস চৌধুরী, পরিমল আর মেঘনা। ওঁদের সঙ্গে কৌশানী বোস। এই পাঁচজনই ছিলেন। যেহেতু তোমার মক্কেল স্পাইডারম্যানের আত্মীয় তাই ছাতের দিকেও নজর রেখেছিলাম। মিস্ বোস নিজেও তন্নতন্ন করে ছাতটা দেখে এসেছিলেন। সেখানেও কেউ ছিল না। তারপর তো আমি একদম বাড়ির চতুর্দিকেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। কারোর আসা-যাওয়ার গল্পই নেই।”
“কেউ আসেনি, কেউ যায়নি। বার্নিং শিখ সিন থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল। বেডরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানলাও সব বন্ধ। কয়েকঘণ্টা আগেই আমরা দুটো ঘরই ভালো করে খুঁজেছি। কোথাও সন্দেহজনক কিছু পাইনি। সব নর্মাল। কোনো হিডন চেম্বার নেই, কোনো এক্সট্রা পাইপ নেই, এসিতেও গোলমাল নেই। একদম বদ্ধ ঘর।” অধিরাজের কপালে ভাঁজ, “স্ট্রেঞ্জ। তবে ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস এল কোথা থেকে! এই ক্লোজড ডোর মিস্ট্রির তো কোনো হদিশই পাচ্ছি না। কীভাবে? কোন্ পথে? কী মিস্ করছি আমরা। কোথায় ভুল হচ্ছে?”
অধিরাজ ফের চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে। পবিত্রও তাকে বিরক্ত করল না। সে আপাতত কৌশানী বোসকে নিয়ে চিন্তিত। মেয়েটা বড়ো ডেসপারেট। কিছু মানুষ জগতে আছে যারা ধৈর্য ধরে ভালোবাসার মানুষকে জয় করে নিতে পারে। আহেলি তাদের মধ্যে পড়ে। কেউ আবার বিনা উচ্চারণে, নিঃশব্দে শুধু একতরফা ভালোবেসে যায়, প্রতিদানের তোয়াক্কা করে না, ঘৃণারও নয়। প্রিয়া বাজাজ তাদের মধ্যে অন্যতম। কেউ কাঙ্খিত মানুষকে দেখলে এত নার্ভাস হয়ে যায় যে কোনো কিছু প্রকাশই করতে পারে না। আইভি তেমনই। কিন্তু কৌশানী তা নয়। সে যেন নিজের ইপ্সিত মানুষকে যেন তেন প্রকারেণ ছিনিয়ে নিতেই এসেছে। আহেলি যদি দখিনা বাতাস হয় তবে কৌশানী কালবৈশাখী। অন্তত যেটুকু অভিজ্ঞতা তার নিজের হয়েছে, তার মাধ্যমেই সে বুঝতে পেরেছে। এ-ও বুঝতে পেরেছে যে এ কথা কাউকে বলা চলবে না। অধিরাজ ব্যাপারটাকে ইনফ্যাচুয়েশন হিসাবে নিয়েছে, তার জন্য ওটাই মঙ্গল। কিন্তু প্রিয়াকে ছেড়ে দিলে, তিন ফুল-এক মালির কম্বিনেশনটা বড়োই বিপজ্জনক পথে যাচ্ছে। সে মনে মনে ঠিক করল, ডঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করবে। বয়েসে একটু বড়ো এবং অভিজ্ঞ হওয়ার দরুণ পবিত্র অশনি সঙ্কেত টের পাচ্ছে যা অন্য কেউ বুঝবে না। একমাত্র ডঃ অসীম চ্যাটার্জিই বুঝতে পারেন।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। সময় একটু একটু করে এগোচ্ছে। অধিরাজ হসপিটালের বেঞ্চে এলিয়ে পড়ে কী যেন ভাবছে। পি সি চৌধুরী ওদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখেই বসেছেন। তিনি ক্রমাগতই কাঁদছেন। পরিবারের এমন অবস্থা হলে কান্না আসাই স্বাভাবিক। তবু তো ওঁরা এখনও বেঁচে আছেন। বাকিটা ডাক্তার ও ঈশ্বরের হাতে।
একটু পরেই ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটের সময় নির্দেশ করল। যত সময় যাচ্ছে, ততই যেন চিন্তা আরও বাড়ছে। বার্নিং শিখের দেওয়া বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে আটচল্লিশ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। এর মধ্যে চেষ্টা করেও সে এখনও পর্যন্ত নিজের প্রতিশোধ নিয়ে উঠতে পারেনি। অধিরাজ ও তার টিম তার প্রত্যেকটি চাল সফলভাবে ব্যর্থ করেছে। হাতে আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা! সে কি আর আদৌ চুপ করে বসে থাকবে! তার নিজের ইগোও নির্ঘাৎ ধাক্কা খেয়েছে। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় একটিও লাশ পড়েনি। বলা ভালো, সি.আই.ডি. হোমিসাইড পড়তে দেয়নি। উলটে নিজেই বেশ কয়েকবার ধরা পড়তে পড়তে বেঁচেছে। এর শোধ সে নির্ঘাত তুলবে। সামনে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক শেষ চব্বিশ ঘণ্টা!
আরও মিনিট পনেরো পরে অবশেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এলেন। ইনি সিনিয়র মানুষ। জুনিয়রদের কর্তব্য বুঝিয়ে দিতে দিতেই করিডরে এসে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। শান্ত দৃষ্টিতে চতুর্দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, “পেশেন্টদের বাড়ির লোকেরা কোথায়?”
পি সি চৌধুরী প্রায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ওঁর দিকে ছুটে যান। পেছন পেছন অধিরাজ এবং পবিত্রও। চৌধুরীসাহেব ভেজা গলায় জানতে চাইলেন, “কেমন আছে ওরা ডক্টর?”
ডাক্তারবাবুর গম্ভীর মুখে একটু হাসি ফুটল, “চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস কিছুটা ইনহেল করলেও ফ্যাটাল হওয়ার মতো গ্যাসদুটো ওদের লাংসে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। তার আগেই ওদের বের করে নেওয়া হয়েছিল বলে একচুলের জন্য বেঁচে গিয়েছেন। আর ওদের ওপর গ্যালন গ্যালন জল কে ঢেলেছিলেন?”
অধিরাজ একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকোচ্ছে, “আজ্ঞে, আমি।”
“খুব ভালো করেছেন।” ডাক্তারবাবুর চোখে প্রশংসা, “আপনি জল ঢেলে ওঁদের স্কিন থেকে, কিছুটা নাক মুখ থেকেও গ্যাসের লেয়ারটা সরিয়ে দিয়েছেন। যার জন্য কোনোরকম বার্ন হয়নি। ফসজিন বা মাস্টার্ড গ্যাস এক্সপোজার ক্ষতিকর হলেও তার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই ডিউরেশনটা ঐ গ্যাস দুটোর কোনোটাই পায়নি বলে খুব বেশি ক্ষতিও হয়নি। শুধু গলায় আর নাকে সামান্য কিছু ইরিটেশন আছে, সেগুলো ঠিক হয়ে যাবে। আর মিসেস সোমলতা চৌধুরীর বয়েসটা একটু বেশি বলে ওঁর লাংসে সামান্য ফ্লুইড জমেছিল। কিন্তু সেটাও কিওরেবল। ইন শর্ট, তিনজনেই ঠিক আছেন। আটচল্লিশ ঘণ্টা অবজার্ভেশনে রেখে আর ছোটোখাটো কিছু ট্রিটমেন্ট দেওয়ার পর সবাইকেই ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে।” বলতে বলতেই তিনি সকৌতূহলে অধিরাজের দিকে তাকালেন, “আপনাকে ভীষণ চেনা চেনা মনে হচ্ছে। বাই এনি চান্স আপনি মিঃ আই জি…!”
“আজ্ঞে!” অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ঠিকই ধরেছেন। আমিই।”
ডাক্তারবাবু এতক্ষণে একগাল হাসলেন, “আরে, আমার কন্যারত্নটি আপনার একনিষ্ঠ ভক্ত। সে জেদ ধরে বসে আছে আই.পি.এস.-ই হবে, এবং আপনার সঙ্গেই কাজ করবে। তাকে যতই বোঝাই, ডাক্তারের মেয়ে ডাক্তার হওয়াই উচিত, নয়তো সোসাইটিতে মুখ দেখানো যাবে না, সে আমার পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করে! ইন ফ্যাক্ট আপনি এখন থেকেই তারও স্যার! একটা সেলফি দেবেন?”
সে ম্লান হাসল, “শিওর। তবে তার আগে পেশেন্টদের কন্ডিশন আরও একটু জেনে নিই। কোনোভাবে ওঁদের ডিটোরিয়েট করার চান্স নেই তো? আমরা কি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারি?”
“একদম নিশ্চিন্ত থাকুন। তেমন কিছুই ঘটেনি।” তিনি মাথা নাড়লেন, “তবে হ্যাঁ, অনেক কিছুই হতে পারত যা অত্যন্ত ডেঞ্জারাস। আপনারা দ্রুত ওঁদের রেসকিউ করেছেন বলে একেবারেই অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। কিন্তু ওঁরা যদি আরও মিনিট পাঁচ বা দশ গ্যাসগুলোর কন্ট্যাক্টে থাকতেন, তবে লাইফ থ্রেট ছিল। ত্রিশ কি চল্লিশ মিনিট থাকলে তো বাঁচানোই যেত না। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ওসব কিছুই হয়নি। ওঁরা দ্রুত ঠিক হয়ে যাবেন। ডিটোরিয়েট করার কোনো চান্স নেই।”
“আর আমাদের এক লেডি অফিসার…?”
“ধুর!” ভদ্রলোক ফের হাসলেন, “ওঁর তো কিছুই হয়নি। স্রেফ নেশা করার ফল। তা-ও বোধহয় জীবনে এই প্রথমবার এই জাতীয় কিছু ফুঁকেছেন, সেইজন্যই একেবারে কাটা সৈনিক হয়ে গিয়েছেন। যে কোয়ান্টিটি ওঁর ব্লাডে আছে, তা নিতান্তই কম। যারা গাঁজা ফুঁকে অভ্যস্ত তারা এত কম কোয়ান্টিটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে। ওঁর অভ্যাস নেই বলেই ফেইন্ট হয়েছেন। হসপিটালে আনার দরকারই ছিল না। আপনারা যদি একটু লেবুজল, বা অ্যাসিডিক কিছু, নিদেনপক্ষে সর্ষের তেলও নাকে আর কানে ঢেলে দিতেন বা গিলিয়ে দিতেন তবে এতক্ষণে সেন্সও কিছুটা ফিরত। নেশার ঘোরটা কেটে গেলেই চাঙ্গা হয়ে যাবেন। তখন ছেড়ে দেব।”
পি সি চৌধুরী ডাক্তারের হাতদুটো আঁকড়ে ধরে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ… থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর…!”
ডাক্তারবাবু ইশারায় পবিত্র ও অধিরাজকে দেখালেন, “থ্যাঙ্ক দেম! ঐ মানুষগুলো যদি আর পাঁচ মিনিটও দেরি করতেন তবে অন্তত আপনার মিসেসের প্রাণ যাওয়ার হাই প্রব্যাবিলিটি ছিল। ওঁর লাংসে ফ্লুইড জমা সবে শুরু হয়েছিল। সেটা আরও কিছুক্ষণ থাকলে ডেডলি হত। তা হয়নি সেটা ওঁদের কৃতিত্ব।”
অধিরাজ এবার নীচুস্বরে পবিত্রকে বলে, “কিছুটা কৃতিত্ব কিন্তু মিস্ বোসেরও আছে খুড়ো।”
“মিস্ বোসের কৃতিত্ব।” পবিত্র উদ্ভট মুখভঙ্গী করেছে, “কীভাবে তিনি হেল্প করলেন? গাঁজা খেয়ে?”
“শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ঠিক তাই।” সে মুচকি হাসে, “তিনি যদি গাঁজা খেয়ে স্রেফ হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতেন, তবে ক্যামেরা স্টিল থাকত। তুমি ফুটেজ দেখে ভাবতে উনি চুপচাপ বসে আছেন। তার মানে কোনো সমস্যা নেই। তুমি বাইরে দাড়িঁয়ে বার্নিং শিখের অপেক্ষা করতে, ওদিকে ততক্ষণে ভেতরে ফসজিন আর মস্টার্ড গ্যাসের আবির্ভাব হয়ে যেত। জানলা দরজা সব বন্ধ, হালকা কাশির জাওয়াজও শুনতে পেতে না। ওদিকে যা হওয়ার হয়ে যেত। কিন্তু বাদ সাধলেন মিস্ বেস। তিনি অতৃপ্ত আত্মার মতো লাট খাচ্ছিলেন বলেই ক্যামেরার নাচানাচি দেখে তোমার সন্দেহ হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই এন্ট্রি নিলে এবং ওঁর ঐ অ্যানাকোণ্ডা মার্কা পীচে পড়ে খাবি খেতে খেতে আমায় ফোন করলে। আমার হয়তো আরও কয়েকমিনিট সময় লাগত। তোমার ঐ হাঁসফাঁস অবস্থা দেখে কয়েক মিনিটের পথ কয়েক সেকেন্ডে অতিক্রম করে হাঁউমাউ করতে করতে পৌঁছলাম। মিস্ বোসের অবস্থা দেখেই সন্দেহ হয়েছিল, অ্যাটাক হয়েছে। ভেবে দেখো, এতগুলো কাণ্ড যদি না ঘটত, সময় থাকতে থাকতেই যদি না ওঁদের বের করে নেওয়া যেত, তবে কপালে অবধারিত মৃত্যু নাচছিল।” অধিরাজের মুখে দুষ্টু হাসি, “আর এই সব কিছুর কেন্দ্রেই কিন্তু মিস্ বোস আর ওঁর গঞ্জিকামিশ্রিত মার্লবোরো। তাই কিছুটা ক্রেডিট উনি পেতেই পারেন।”
“হুঃ।” পবিত্র বিষণ্ণ স্বরে বলে, “ইনসাল্টের শেষ নেই। একেই আমার ভার্জিনিটি সঙ্কটে ছিল। তার ওপর ম্যাডাম বলেন কিনা আমার নাকি ঝাঁটার মতো গোঁফ! হাউ ডেয়ার ইজ শি। আরে মুছে হো তো মেরা জ্যায়সা, মুছ নেহি তো কুছ নেহি! সেই সাধের গোঁফ কিনা ঝাঁটা? এরজন্য এক্সট্রা আর এক ডোজ খিস্তি ওঁর কপালে নাচছে, ফর ইনসাল্টিং মাই গোঁফ।”
“বেশ। দিও। আমি বারণ করব না। কিন্তু ওঁর অবদানটাও ফেলে দেওয়া যায় না, এটাও মাথায় রেখো।” বলতে বলতেই তার ভুরু কৌতুকে একটু উঠে গেল, “বাই দ্য ওয়ে, তুমি ভার্জিন কবে হলে?”
উত্তরে পবিত্র আরও কিছু বলতেই যাচ্ছিল। তার আগেই পি সি চৌধুরী আর্দ্র চোখে, নত মস্তকে ওদের সামনে এসে হাজির হয়েছেন। তিনি হাতজোড় করে বললেন, “আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। আপনারা আমার পরিবারকে বাঁচিয়েছেন। সারাজীবনেও আমি এই ঋণশোধ করতে পারব না…।”
“এতে কৃতজ্ঞতার কিছু নেই। আমরা স্রেফ নিজেদের ডিউটি করছি। এটাই আমাদের প্যাশন ও প্রোফেশন।” অধিরাজ একটু সহৃদয়ভাবে বলে, “কিন্তু মিঃ চৌধুরী, আপনার ঘরে যে বিষ বসে আছে, তাকে তো আমরা তাড়াতে পারব না। ওটা আপনাকেই করতে হবে।”
পি সি চৌধুরী একটু বিস্মিত। কথাটার মর্মার্থ তাঁর মাথায় ঢোকেনি। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “বিষ?”
“পরিমল কি জানে যে সে আসলে একজন শিখের সন্তান? এবং তার পালক-পিতা সেই বায়োলজিক্যাল বাবা-মায়ের খুনি?”
কথাটা শুনে চোয়াল ঝুলে পড়ল তাঁর। কোনোমতে বললেন, “পরিমল এসব জানে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।” অধিরাজ তাঁকে বুঝিয়ে বলে, “আমার ধারণা সে সম্প্রতিই জেনেছে। এবং জানার পর প্রচণ্ড শকড়ও হয়েছে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। একমাত্র সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে প্রয়োজনে যে কোনো লকস্মিথকে ল্যাচ বাইপাসিং টুল অনায়াসেই প্রোভাইড করতে পারে। সে নিজমুখে স্বীকারও করেছে সবার সামনে তালাচাবির ব্যাপারে পরিমল মাস্টার লোক কারণ ওটাই ওর ব্যবসার একটা পার্ট। আমার মনে হয়, গুল্লু নামক চাবিওয়ালাটিকে ল্যাচ বাইপাসিং টুলটি সে শুধু গিফটই করেনি, ওটার সদ্ব্যবহার করতেও শিখিয়েছে। গুল্লুর আসল পরিচয় পরিমল জানে, নয়তো কোনো ব্যাবসায়ী এত উদার নয় যে সামান্য চাবিওয়ালাকে দামি কিট উপহার দেবে। গুলশন সিংই সেই ব্যক্তি যে ওকে ওর আসল ইতিহাস জানিয়েছে ও ব্রেইনওয়াশ করেছে। এই গুল্লু বা বার্নিং শিখ ম্যানিপুলেশনে পি.এইচ.ডি. করেছে। পরিমলও ওর হিপনোটিজমের জালে পড়ে ওকে সম্পূর্ণ সাহায্য করেছে। তবে সে এটা ভাবেনি যে গুল্লু ওর তীর ওর ওপরেই চালাবে। ওর ধারণা ছিল, বার্নিং শিখ আপনাকে মারবে, আর এটা ও নিজেও চাইছিল।”
“কিন্তু আপনি সব বুঝলেন কী করে?”
“যে মুহূর্তে আমি ‘বোলে সো নিহাল’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, তখন আমার দুটোই এজেন্ডা ছিল। প্রথমত, উত্তরটা কে দেয় সেটা দেখা। দ্বিতীয়ত আপনার সুপুত্রের এক্সপ্রেশন লক্ষ্য করা। পরিমল ঐ ওয়ারক্রাইয়ের উত্তর দেয়নি ঠিকই, কিন্তু সবার অলক্ষ্যে ওর চোখে দপ করে আগুন জ্বলে উঠেছিল। ঐ আগুনে দৃষ্টি আমার চোখ এড়ায়নি। সেই মুহূর্তে ও আপনার দিকেই দেখছিল। ফ্রম দ্যাট ভেরি মোমেন্ট আমি জানি যে পরিমলও নিজের আসল পরিচয় জানে ও বার্নিং শিখকে ও সাহায্য ও করেছে।”
পি সি চৌধুরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। তিনি ধপ করে বসে পড়েছেন। কয়েক মিনিট কোনো কথাই বলতে পারলেন না ভদ্রলোক। শেষে অতিকষ্টে বললেন, “সব আমার পাপ! আমারই দোষ। যৌবনের ভুল আদর্শে যে কাজ করেছি তার মাশুল তো দিতেই হত…!”
অধিরাজ স্থির দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সে মিঃ চৌধুরীকে দিয়ে কথা বলাতেই চায়। তিনি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিড়বিড় করে বললেন, “আমি সজ্জনকুমারের চোখে পড়তে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন, নিজের হাতে কোনো শিখকে মারিনি। অত সাহসও ছিল না। তবে সজ্জনকুমারের বক্তৃতায় আমারও তখন মনে হয়েছিল যে বেয়ন্ত সিং এর মতো বেইমানের জাতদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই! গরম রক্ত অনেক ভুলভ্রান্তি করে। সজ্জনকুমার সেই আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীকে আমরা দেবী ভাবতাম। তাই আবেশে এসে রীতিমতো ঘোষণা করে দিয়েছিলাম যে পাগড়িসুদ্ধ প্রতিটা মাথার জন্য টাকা দেব। তখনও বুঝিনি কী সর্বনাশ হতে চলেছে। তখনও বুঝতে পারিনি, গোটা দিল্লির রাস্তা চাপা পড়ে যাবে রক্তাক্ত পাগড়ির স্তূপে! কী ভয়াবহ ভুল করেছিলাম আমি…. বিরাট পাপ করেছিলাম।…’
“পরিমলকে কোথায় পেলেন?”
তাঁর চোখ বেয়ে জল পড়ল। মুখ তুলে বললেন, “একটা অনাথ আশ্রমে। নিজের পাপের শাস্তি পেয়েছিলাম হাতে নাতেই। পরের বছরই সোমলতার মিস্ ক্যারেজ হয়। ডাক্তার বলেছিলেন, ও আর কখনও মা হতে পারবে না। সোমলতা প্রায় পাগলই হতে বসেছিল। অবস্থা দেখে ঠিক করলাম বাচ্চা অ্যাডপ্ট করব। দিল্লির একটি নামকরা অনাথ আশ্রমে প্রায় দেড়-বছরের একটা ছোট্ট মিষ্টি শিশুকে ভারি পছন্দ হল। কিন্তু তার ইতিহাস জানতে গিয়ে জানলাম, চুরাশির দাঙ্গায় বাচ্চাটার গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিন তারিখ দুপুরে যখন আর্মি নামল, তখন সেই পোড়া, কাটা লাশের ভিড় থেকে একটা সদ্যোজাত শিশুকে উদ্ধার করেছিল ওরা। সে-ই পরিমল। হ্যাঁ, ও শিখেরই সন্তান। আমি ভাবলাম, ঈশ্বর হয়তো আমায় প্রায়শ্চিত্তের একটা সুযোগ দিতে চান।” বলতে বলতেই অনুতাপে, দুঃখে কেঁদে ফেলেন তিনি, “কিন্তু বুঝিনি, এটা পে-ব্যাক ছিল। যে বাচ্চাটাকে আমি পরিবার, স্নেহ-ভালোবাসা, নাম, পরিচয় দিলাম, বুকের পাঁজরের মতো আগলে রেখে বড়ো করলাম, সারাজীবন সামান্য আঁচও ওর গায়ে লাগতে দিইনি, সবসময়ই ভয়ে ভয়ে থাকতাম কেউ যদি আসল পরিচয় ফাঁস করে দেয়, সেইজন্যই দিল্লি থেকে সপরিবারে এখানে চলে আসা, নিজের জীবনের সব সুখ-আয়েশ আরাম বিসর্জন দেওয়া, আজ সেই সন্তান আমায় খুনি ভেবে ঘেন্না করছে। আজ সেই প্রাণের থেকেও প্রিয় মানুষ আমার রক্তদর্শন করতে চায়! এর থেকে বড়ো শাস্তি কি আর আছে? এর চেয়ে তো মৃত্যুও ভালো ছিল।”
তিনি অসম্ভব কান্নায় ভেঙে পড়েন। অধিরাজ চুপ করে থাকে। এখানে তার বলার কিছুই নেই। সে জানে, এই দুঃখের কোনো স্বান্ত্বনা হয় না। পি সি চৌধুরীকে আজীবন এই যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খেয়ে যাবে। পরিমলের চোখে নিজের ‘খুনি’ রূপ দেখতে-দেখতেই শেষ হবেন তিনি। পিতা-পুত্রের মাঝখানের এই ভাঙন আর কোনোদিন জুড়বে না। জোড়েও না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেখান থেকে নীরবে সরে যায়। তার ডিউটি সে করেছে, মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচিয়েছে। কিন্তু আর করণীয় কিছু নেই। আসল বিচার করার ক্ষমতা তার নেই। ঈশ্বরের লাঠির কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু যখন পড়ে…!
“রাজা?”
সে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। পবিত্রর ডাকে সচকিত হয়ে বলল, “উ?”
“তোমার মনে হয় হসপিটালে ওঁরা সবাই সুরক্ষিত?” পবিত্র আচার্য আস্তে আস্তে বলে, “বার্নিং শিখ যখন জানতে পারবে যে ওর প্ল্যান ফ্লপ করেছে, তখন কি সে আবার অ্যাটাক করবে না? তার যা মেক-আপ স্কিল তাতে সে ডাক্তার, নার্স বা ওয়ার্ডবয়ের ছদ্মবেশেই হয়তো হসপিটালের ভেতর এন্ট্রি নেবে এবং লোকগুলোকে খুন করবে। ওঁদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা কি করা উচিত নয়?”
অধিরাজ মাথা নাড়ল, “না পবিত্র। ওঁদের প্রোটেকশন দিয়েও কিছু করা যাবে না। কারণ পুলিশ প্রহরী এখানে দাঁড়িয়ে থাকতেই পারে, কিন্তু তারা গোটা হসপিটালের সব নার্স, ডাক্তার বা ওয়ার্ডবয়কে চেনে না। ওরা বহিরাগতদের আটকাতে পারে, ওষুধ দিতে আসা কর্মচারী বা ডাক্তারকে আটকাবে না। আর বার্নিং শিখ ঐ রাস্তাটাই যে নেবে তা তুমিও জানো, আমিও জানি।”
“তবে?”
অধিরাজ একটু আত্মমগ্নভাবেই বলল, “নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে/ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।”
“মানে?”
“যারা খুন হবেন তাদের প্রোটেকশন না দিয়ে খোদ খুনিকেই প্রোটেকশন দাও।” সে রহস্যমাখা হাসি হাসল, “একটাও খুন আর হবে না!”
“মানে?”
পবিত্র আর কিছু বলার আগেই অধিরাজের ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে গুল্লুর নাম ভেসে উঠেছে। সে সেই অজ্ঞাত রাতচরা সর্দারজির দেখা পেয়ে গিয়েছে। অধিরাজ মৃদুস্বরে বলল, “মানেটা তো এবার গুল্লু বলবে।”
