(১১)
বাকি রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল।
মিস্ বোস আর পবিত্র-র জিম্মায় পি সি চৌধুরীর বাড়িতে অর্ণবকে রেখে অধিরাজ স্বয়ং চলে গিয়েছিল আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তার আর্বানার ফ্ল্যাটে। ওখানে মিস্ আত্রেয়ী দত্ত সদাজাগ্রত প্রহরায় ছিল। অধিরাজ তাকে ফোন করতেই সে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব না করে দরজা খুলে দিয়েছে। বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। কোথাও কোনো অঘটনের চিহ্ন নেই। সে সযত্নে তাকে লিভিংরুমেই বসাল। এমনিতে আর্বানা যথেষ্ট সুরক্ষিত। এখানে ঢুকে অনায়াসে গোটা ফ্যামিলিকে মেরে চলে যাওয়া কোনো বহিরাগতের পক্ষে অসম্ভব। সিকিউরিটি অত্যন্ত সতর্ক ও টাইট। এখানে সব ভি.আই.পি, মন্ত্রী-সান্ত্রী, ফিল্মস্টার ও সেলিব্রিটিদের বাস। তাই নিরাপত্তাব্যবস্থাও প্রায় নিশ্ছিদ্র। তা সত্ত্বেও অধিরাজের সতর্ক চোখ এই লোহার বাসরঘরে সামান্য একটা ছিদ্র, একটা লুপ হোল খুঁজে বেড়াচ্ছিল। বার্নিং শিখকে বিশ্বাস নেই। তার চাতুর্যের যেটুকু উদাহরণ পেয়েছে, তাতে হয়তো ওর পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। সে তার হুলিয়া সম্পূর্ণ বদলে নিয়ে এই সিকিউরিটি গার্ডদের মধ্যেই ভিড়ে যেতে পারে। অথবা হয়তো ভূপেন্দ্র দত্তার আশেপাশের কোনো ফ্ল্যাটেই ঘাপ্টি মেরে থাকতে পারে। এই দুটো ক্ষেত্রে সে নিরাপদে খুনগুলো করতে পারে। এছাড়া আরও একটা সহজ ও মোক্ষম রাস্তা আছে। একেবারে পরিবারের মধ্যেই চাকর বা অন্য কোনো পেশা নিয়ে ঢুকে যাওয়া। কিন্তু তৃতীয় সম্ভাবনাটা বাতিল করতেই হয়। কারণ মিস্ দত্ত ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন যে ও বাড়িতে একজন নেপালি চাকর ছাড়া কেউ নেই। এবং সে-ও চব্বিশ ঘণ্টা ঐ বাড়িতেই থাকে। ওঠা-বসা খাওয়া-দাওয়া শোওয়া সব ওখানেই। ভূপেন্দ্ৰ নিজে, জামাতা বিরূপাক্ষ ও মেয়ে সোনালি, প্রত্যেকেই ড্রাইভিং করতে পারেন। তাই আলাদা করে ড্রাইভার রাখার কোনো গল্প নেই। কাঁচা বাজার থেকে গ্রসারির বাকি জিনিসপত্র অনলাইনেই আসে। এমনকি তাজা মাছ-মাংসও আজকাল বাড়িতে অর্ডার দিয়ে আনানো যায়। সুতরাং কাঁচা বাজারের দায়িত্বও নেই। নেপালি চাকর ‘জুজুৎসু’ বাড়ি থেকে নিতান্তই দায়ে না পড়লে বেরোয়ই না। তাকে ফ্যামিলি মেম্বার হিসাবে ধরাই যায়। তাই তার ‘বার্নিং শিখ’ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
“কেন?” প্রণবেশ লাহিড়ী বেশ কনফিউজড, “বার্নিং শিখ চব্বিশঘণ্টা কারোর বাড়িতে থাকতে পারে না?”
“না।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলে, “সেক্ষেত্রে সে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে একাধিক মাস মার্ডার করতে পারবে না। ওর টেকনিকটা দেখুন। যাদের ও টার্গেট করে সে বাড়িগুলোয় হঠাৎই ঢোকে না। কোনো-না কোনোভাবে অনেক আগেই প্রবেশাধিকার নিয়ে নেয়। একটু একটু করে নিজের ইমেজ বানায়। দিল্লির কেসগুলোই দেখুন। ফাদার স্টেফানো মাইনো, ড্রাইভার কেহর সিং ও রাঁধুনী বিরজুর বন্ধু নাথুরাম—তিনজনই কিন্তু প্রায় একই সময়ে, একই টাইম পিরিয়ডে তিনটে ফ্যামিলিতে ঢুকেছিল কিংবা উপস্থিত ছিল। এবং কেউ হোল টাইমার নয়। প্রত্যেকের টাইমিং আলাদা আলাদা৷ কেহর সিং এর ডিউটি টাইমে ফাদারকে দেখা যায়নি। এবং ফাদার ও কেহর সিং এর টাইমিং-এ কখনও নাথুরামের উপস্থিতি ছিল না। অন্য দুই শহরেও একই টেকনিক। একসঙ্গেই একাধিক ফ্যামিলিতে তার যাওয়া আসা। কিন্তু প্রত্যেকবার টাইমিং আলাদা। কলকাতাতেও বৌদ্ধ ভিক্ষুকে তেনজিং এর সঙ্গে সর্বক্ষণ দেখা যেত না। অথচ তিনি প্রায়ই আসতেন। অর্থাৎ বাকি ফ্যামিলিগুলোতেও তিনি কোনো না কোনো রূপে ঢুকে বসে আছেন। কিন্তু একটা ফ্যামিলিতে চব্বিশ ঘণ্টাই যার ডিউটি, সে অন্যত্র হাজিরা দেবে কী করে? মিস্ দত্ত’র বয়ান অনুযায়ী, জুজুৎসু বাড়ি থেকে বেরোনোর নামই নেয় না। তবে সে অন্য দুটো ফ্যামিলিতে কীভাবে উপস্থিত থাকতে পারে? ও ‘বার্নিং শিখ, শ্রীকৃষ্ণ নয় যে একই সময়ে গোপিনীর বাড়িতেও মাখন চুরি করবে আবার যশোদার ঘরেও ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোবে। একই সময়ে রাধারানি সমেত গোপিনীদের সবার সঙ্গে ঐ একটি ব্যক্তিই একাধিক ক্লোন নিয়ে উপস্থিত থাকতে পারতেন। আর কেউ পেরেছে বলে জানা নেই।”
প্রণবেশ অধিরাজের থিয়োরি কতদূর বুঝলেন কে জানে। একটু অসন্তুষ্ট হয়েই বললেন, “কিন্তু চাকরের নাম জুজুৎসু কেন?”
এ প্রশ্নের উত্তর তখনও অধিরাজের কাছে ছিল না। কিন্তু শেষ রাতে মিস্ দত্ত’র কাছে যখন সে পৌঁছল তখন কথা প্রসঙ্গে আত্রেয়ীই জানায়, “আরে, ওর নাম জুজুৎসুই নয়। ও ব্যাটার আসল নাম সন্দেশ গুরুং। কিন্তু কথায় কথায় ‘জুজুৎসুর প্যাঁচের ডেমো দেখাতে চায় বলে ওর নামই ‘জুজুৎসু’ হয়ে গেছে। সন্দেশ দাবি করে যে ও নাকি জুজুৎসু জানে। এই অবসেশনের কারণেই ওটাই শেষপর্যন্ত নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“সন্দেশ।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “সুইট নেম। আর কিছু জানতে পারলেন? আশেপাশের বাসিন্দাদের কোনো বিশেষ খবর?”
আত্রেয়ী চাপা স্বরে বলে, “মোটামুটি সব প্রতিবেশীদেরই দেখেছি। ওদিকের ‘বি’ ফ্ল্যাটটায় দুই মহিলা থাকেন। মা ও মেয়ে। প্রিয়দর্শিনী ও শ্রীদর্শিনী বসু। মেয়ে শ্রীদর্শিনীর বয়েস খুবই কম। সুন্দরী, স্মার্ট। পড়াশোনা শেষ করে গ্ল্যামার জগতে ঢুকেছে। শুনেছি মডেলিং-এর পাশাপাশি সিরিয়ালে অভিনয়ও করে। ইনফ্যাক্ট শুধু শুনিনি, ওকে টিভির পর্দায় দু-একটা অ্যাড আর মেগাসিরিয়ালে দেখেওছি। একটা ওয়েবসিরিজেও লিড রোলে অভিনয় করেছে। ওর পরিচয় হান্ড্রেড পার্সেন্ট জেনুইন। শ্যুটিং এর টাইমের কোনো মাথামুণ্ডু নেই। কলটাইমের ওপর নির্ভর করে সে কখন বাড়ি থেকে বেরোবে। অনেকসময় তো রাতের পর রাত বাড়িও ফেরে না। মা প্রিয়দর্শিনী বহুবছর আগেই বিধবা হয়েছেন। মেয়ে অভিনেত্রী বলে টাকার বিশেষ অভাব নেই। তাও মহিলা সময় কাটানোর জন্য নানারকম পার্টি অর্গানাইজ করেন। ঐ আজকাল বেরিয়েছে না? শখের ইভেন্ট ম্যানেজার, ডেকোরেটর— হ্যান-ত্যান। ঐসবই। জাস্ট টাইমপাস। মধ্যবয়েসী, কিন্তু তিনিও বেশ সুন্দরী। মেয়ের এই উদ্ভট জীবনযাত্রায় বেশ আপত্তি। তবে মা এবং মেয়ে, দু-জনেই পি-এন-পি-সি তে এক্সপার্ট। শ্রীদর্শিনী অবসর সময়ে এসে ভূপেন্দ্র দত্তার সঙ্গে জমিয়ে দাবা খেলে আর গুজগুজ ফুসফুস করে। আর প্রিয়দর্শিনী প্রায় রোজই বিকেলে এসে এ বাড়ির গিন্নী শালিনীর সঙ্গে টপ্পা মারেন। একটু স্ক্যান্ডাল-প্রেমী হলেও হার্মফুল নন। ওদের বাড়িতে কোনো মেইড বা সার্ভেন্ট নেই। নেই বলা উচিত নয়—আসলে প্রিয়দর্শিনীর খুঁতখুঁতে স্বভাব আর শুচিবাইয়ের জ্বালায় টেকে না। অগত্যা দু-জনের সংসার মা-ই সামাল দেন।” অধিরাজের ভুরু আলতো উঠে যায়, “স্ক্যান্ডাল!”
আত্রেয়ী হাসছে, “সে প্রসঙ্গেই আসছি স্যার। এই ফ্লোরের প্রায় সবক-টা ফ্ল্যাটেই স্ক্যান্ডালের বীজ রয়েছে। ‘সি’ ফ্ল্যাটে এক বৃদ্ধ থাকেন। নাম বসন্ত কুমার মিত্র। বেশ শৌখিন স্বভাবের মানুষ। টাকার কুমীর বললে কম বলা হয়। সত্তর বছর বয়েসে আচমকা এক বাইশ বছরের মেয়েকে বিয়ে করে বসে আছেন। তিতলি নামের মেয়েটি দারুণ সুন্দরী। প্রথমে তো আমি ওকে বসন্তকুমারের নাতনি ভেবেছিলাম। পরে শুনি-বৌ! মজার কথা হল, কর্তা যখন বাড়িতে থাকেন না তখন গিন্নীর গাড়ির ড্রাইভার শোভন ওপরে উঠে আসে। ফ্ল্যাটেই থাকে। ঠিক সন্ধে ছটা নাগাদ সে নেমে যায়। সাতটায় কলিংবেলে ‘বসন্ত এসে গেছে’ ঘোষণা শুরু হয়। অর্থাৎ বসন্ত মিত্র ফিরে আসেন। তখন আবার গিন্নীর ইভনিং ওয়াকের সময় হয়। ইভনিং ওয়াকটাও অবশ্য শোভনের সঙ্গেই। মানে নিজেরই বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে।”
“চমৎকার!” সে একটু হাসল, “অকালে বসন্ত এলে এমনই অশোভন ব্যাপার স্যাপার ঘটে।”
আত্রেয়ী একটু দম নেওয়ার জন্যই থেমেছিল। এবার বলল, “দাঁড়ান স্যার। এরপর আরও গল্প আছে। যেই তিতলি বেরিয়ে যায়, অমনিই ও বাড়ির কুক কাম কাজের মেয়ে ‘কোকিলা’ আসে। তার আসা যাওয়ার টাইমিং খুব ইন্টারেস্টিং। সকাল সকাল এসে কর্তা-গিন্নীর ব্রেকফাস্ট বানিয়ে, লাঞ্চ রেডি করে, ঘরের সব কাজ সেরে সে চলে যায়। আবার রাত আটটায় এসে হাজির হয়। তখন বাবু-বিবিদের ‘ডিনার’ বানানোর জন্য আসে। ডিনারে কী বানায় জানি না, তবে কোনোদিনই রাত এগারোটার আগে ফ্ল্যাট থেকে বেরোয় না। এখানে গুজব, তার পে-প্যাকেজও নাকি রীতিমতো স্পেশাল। তার সঙ্গে দামি গয়না গাঁটি-হীরের ‘নোজপিন’ ইত্যাদি বোনাস। আমরা খামোখাই এত খেটে মরি স্যার। তার চেয়ে এখন দেখছি, এরকম কোনো বাড়িতে কুকের কাজ নিলেই ভালো হত। অন্তত হীরের নাকছাবি, দুল পেতাম।”
ছদ্ম হতাশায় আত্রেয়ীর দীর্ঘশ্বাস পড়ে। অধিরাজ তার নকল আফসোস দেখে ছদ্ম গাম্ভীর্যে বলে উঠল, “এখনও অপশন আছে কিন্তু মিস্ দত্ত। আপনি অলরেডি সেরকম চাকরিতেই জয়েন করেছেন। যদিও টেম্পোরারি, তবে পার্মানেন্ট হওয়ার সুযোগও আছে। এটাতে বেশি লাভ দেখলে সি.আই.ডি.-র চাকরিটা ছাড়তেও পারেন। আমার ধারণা কোকিলার থেকেও অনেক ভালো কুক আপনি। অন্তত অর্ণবের পেট ও জিভ তেমনই সাক্ষী দেয়। ভেবে দেখতে পারেন।”
“রক্ষে করুন।” তার মুখে একটু লাজুক হাসি, “আমি বাহাত্তর ঘণ্টার জন্যই ঠিক আছি।”
“বসন্তে কোকিলা ডাকবে এটাও তো স্বাভাবিকই।” অধিরাজ বলল, “কিন্তু কোকিলা নামটা ঠিক বাঙালি নয়।”
“মেয়েটাও বাঙালি নয় স্যার। বাংলা বলতে পারে ঠিকই, কিন্তু অবাঙালি টান আছে। দেখতে আহামরি সুন্দরী নয়, বরং বেশ কাঠ কাঠ। মানে মেয়েদের মতো সহজাত কোমলতা নেই। হুড়ুম দুড়ুম করে হাঁটে। গলার স্বর শুনলে হাঁড়িচাচাও অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু বসন্ত ঐ কোকিলেই মজেছেন। তাই নিয়ে কর্তা-গিন্নী মাঝেমধ্যেই নিজেদের মধ্যে ‘ক্যাটস্ অ্যান্ড ডগস্’ মারপিট করেন। গিন্নীর অভিযোগ কোকিলার পেছনে কর্তা কোটি কোটি টাকা উড়িয়েছেন। তিনি এ-ও দাবি করেন যে সুন্দরী অভিনেত্রী শ্রীদর্শিনীর সঙ্গেও নাকি তার অ্যাফেয়ার চলছে। যদিও সত্যতা জানা নেই। আর কর্তার বক্তব্য, তার সুন্দরী তরুণী স্ত্রী মদ ও সিগারেটের পেছনে তিনমাসে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা হাপিশ করেছেন! সর্বক্ষণ এই নিয়ে লেগেই আছে। তবে দু-জনেরই এ বাড়িতে অবাধ যাতায়াত। সুযোগ পেলেই হয় দেবা নয় দেবী এসে হাজির হয়। বসন্তের দাবা খেলার নেশা। ভূপেন্দ্র তার পার্টনার। আর তিতলির সঙ্গে সোনালির খুব জমেছে। সোনালিকে সে অনেক মনের, প্রাণের কথা বলে। এ-ও বলেছে যে বসন্তকুমার পুরুষ হিসেবে কোনো কম্মের নন। ঐ তো বুড়ো বর, তাকে নিয়েও এত সন্দেহ! কোকিলার আবার জুজুৎসুর সঙ্গে খুব ভাব। তাকেও এ বাড়িতে প্রায়ই দেখা যায়। সেজন্যই নোজপিনের রহস্য ফাঁস হয়ে গিয়েছে। কোকিলার দাবি বসন্তকুমার কোকিলে নন, আসলে ‘শ্রী’ তথা শ্রীদর্শিনীতে ফিদা। কোকিলার মোটা পে-প্যাকেজ আর দামি উপহার ‘নজরানা’ নয়, আসলে কর্তার অ্যাফেয়ার চেপে যাওয়ার ঘুষ!” “বড়োই গোলমেলে কেমিস্ট্রি দেখছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি গোলমেলে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার মদ ও সিগারেট!” সে কপালে চোখ তুলে ফেলেছে, “মহিলা কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খান? আমার ব্র্যান্ডের একটা প্যাকেটের দাম মাত্র তিনশো ষাট টাকা। যদি মাসে ম্যাক্সিমাম ত্রিশ প্যাকেটও লাগে তবে সর্বসাকুল্যে খরচ দশহাজার কী আর একটু বেশি। তিন মাসে ত্রিশ হাজার। পঞ্চাশ লক্ষ তো দূর, পঞ্চাশ হাজারও নয়৷ উনি তো তৈরি পাবলিক দেখছি! ইনফ্যাক্ট মিয়াঁ-বিবি দু-জনেই তৈরি পাবলিক।” “দাঁড়ান স্যার, এরপরের প্রতিবেশীর জন্যও কিছু বিশেষণ রাখুন।”
“আরও আছে?” অধিরাজ শ্বাস টানল, “প্লিজ প্রসিড।”
“ডি তে একজোড়া পাঞ্জাবি কাপল থাকে। আমনদীপ আর গুরশীল…। “
“ওয়েট… ওয়েট।” অধিরাজ তাকে থামিয়েছে, “কাপল মানে? দু-জনেই পুরুষ?” “না স্যার।” আত্রেয়ী ফিক করে হেসে ফেলে, “একজন পুরুষ, অন্যজন নারী।”
“কিন্তু আমনদীপ আর গুরশীল—দুটো নামই তো ছেলেদের! এরমধ্যে নারী কোনজন?” সে বিস্মিত—“কী কনফিউশন্!”
“শিখদের নামের এটাই প্রবলেম।” লেডি অফিসার বুঝিয়ে দেয়, “কে ছেলে, কে মেয়ে তা নাম শুনে বোঝাই যায় না। তবে আমনদীপ হল পুরুষটির নাম, আর গুরশীল মহিলা। প্রথমে আমি ওদের স্বামী স্ত্রী-ই ভেবেছিলাম। গুরশীল ছ’মাসের প্রেগন্যান্টও বটে। কিন্তু তারপর শুনলাম যে ওরা দু-জনে আদৌ স্বামী-স্ত্রীই নয়। আমনদীপ আর গুরশীল লিভ-ইনে আছে। শুধু তাই নয়—দু-জনেই বিবাহিত, তবে অন্য পুরুষ ও স্ত্রীয়ের সঙ্গে! আমনদীপের বউ আর গুরশীলের বর মাঝেমধ্যেই এখানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে যায়। এটা দু তরফ থেকেই পুরোপুরি পরকীয়া কেস। আগে বিবাহিতদের প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে লিভ ইন করার উপায় ছিল না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের দয়ায় এখন সম্ভব। ওরা দু-জনে এখন একসঙ্গে থাকে ও খুব তাড়াতাড়ি বাবা-মাও হতে চলেছে। এই কালের অন্য কোনো ত্রুটি থাকুক বা না থাকুক, এমনিতে খুব হাসিখুশি আর ফ্রেন্ডলি। এরাও ভূপেন্দ্র দত্তার ঘরে যাতায়াত করে। আমনদীপের বাঙালি মাছের ঝোলের ওপর খুব লোভ। ব্যাটা আজ লাঞ্চে এসে হানা দিয়েছিল, আর আমার আঙুলে চুমু খেতে চাইছিল! ওদিকে শালিনী দত্তাকে গুরশীল খুব তেল মারে। এবং শ্রীদর্শিনী ও প্রিয়দর্শিনীর ওপর দেখলাম দু-জনেরই খুব রাগ! গুরশীলের মতে, মা ও মেয়ে, দুটোই সমান চরিত্রহীন।”
“চমৎকার। প্রত্যেকেই এখানে চালুনি হয়ে সূঁচের পেছনে লাগে। এইজন্যই আমার মা ফ্ল্যাট কালচার একদমই পছন্দ করেন না।” অধিরাজ যেন একটু অন্যমনস্ক, “কিন্তু এই আমনদীপ এবং গুরশীল কোন ভাষায় কথা বলেন?”
“বাংলাতেই কথা বলে।” মিস দত্ত’র স্মার্ট উত্তর, “আমনদীপ তো পুরো খাঁটি বাঙালিদের মতো গড়গড়িয়ে বাংলা ভাষা বলে। তার চেহারা দেখলেও শিখ বলে চেনা যায় না। পাগড়ি পরে না। চুল ছোটো করে ছাঁটা, ক্লিন শেভড। শুধু হাতে একটা “কড়া’ পরে। এছাড়া আর কোনো চিহ্নই নেই। গুরশীলও যথেষ্টই আধুনিকা। হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি, পাঞ্জাবি, সবই ফ্লুয়েন্টলি বলে।”
“বুঝলাম।” সে একটু চিন্তিত, “কিন্তু মিস্ দত্ত, কোনো প্রেগন্যান্ট লেডির যদি দেহতল্লাশি, বা বডি চেকিং করতে হয়, সেক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?”
মিস্ দত্ত’র চোখে একটু বিপন্নতা, “স্যার, বাইরে থেকে যতখানি সাবধানে চেকিং করা যায়, করা যেতে পারে। কিন্তু প্রেগন্যান্ট লেডির ক্ষেত্রে তো খুব বেশি চেক করা সম্ভব নয়। মেটাল ডিটেক্টরে অবশ্য চেক করা যেতে পারে। বাট্, এখানে একটা খটকা আছে।”
“আমি এমনই কিছু আশা করছিলাম।” অধিরাজের দৃষ্টি চিন্তান্বিত, “বলুন।”
“গুরশীলের মেটাল ডিটেক্টরে খুব আপত্তি। যদিও মেটাল ডিটেক্টর তেমন ক্ষতিকর নয় বা আয়োনাইজিং রেডিয়েশন দেয় না, তবু সামান্য হলেও একটা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তো তৈরিই করে। গুরশীল এতটাই সতর্ক যে সেই সামান্য রিস্কটাও নেবে না। সে আর্বানার ম্যানেজমেন্টকে রীতিমতো চিঠি দিয়ে আবেদন করে রেখেছে যে ডিউরিং প্রেগনেন্সি তাকে যাতে মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে পাস না করতে হয়। আর্বানার ম্যানেজমেন্টও মেনে নিয়েছে। অথচ যে নিজের প্রেগনেন্সি নিয়ে এত খুঁতখুঁতে সে দিব্যি এই অবস্থাতেও গাড়ি চালিয়ে রোজ অফিসে যায়! এখনও প্রেগনেন্সি লিভ নেয়নি!”
“স্ট্রেঞ্জ! যদিও আমার প্রশ্নটা করা একেবারেই উচিত নয়, তবু ভদ্রতা সভ্যতার মাথা খেয়েই বলি, গুরশীলকে দেখতে কেমন?”
“ওটাও ভারি অদ্ভুত স্যার।” আত্রেয়ী জানায়, “আমার ধারণা ছিল পাঞ্জাবি মেয়েরা লম্বা-চওড়া আর সুন্দরী হয়। কিন্তু গুরশীল একদম উলটোটা! কোকিলা তবু ঠিক আছে। কিন্তু গুরশীল যদি প্রেগন্যান্ট না হত, তবে ওকে দেখে বুঝতেই পারতাম না যে ও ছেলে না মেয়ে! ও মাল প্রেগনেন্সির মধ্যেই আবার হুশহাশ করে সিগারেটও টানে। সে বেলায় কোনো দোষ নেই। আমনদীপ যে ওর মধ্যে কী দেখেছে ভগবানই জানেন। বাকি রইল একটাই ফ্ল্যাট। ‘ই।’ সেটাতে যিনি আছেন, তাঁকে আমরা সবাই চিনি। লাহিড়ী স্যার। একমাত্র ওখানেই কোনো স্ক্যান্ডাল নেই।”
“গুরশীলের মধ্যে কী আছে সেটা আমনদীপের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।” অধিরাজ সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা স্টিক ঠোঁট দিয়ে টেনে বের করে এনে বলল, “বাট, আই মাস্ট অ্যাডমিট মিস্ দত্ত, এজন্যই মহিলাদের আলাদা করে গোয়েন্দা হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইনফ্যাক্ট আমার মতে, যে কোনো দেশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হেড একজন মহিলা হলে কোনো কেসই আনসলভড় থাকবে না।”
আত্রেয়ী ফের হেসে ফেলল। হাসিটা তার একেবারে মধুক্ষরা, “কেন স্যার?”
“কারণ মহিলারা বর্ন ডিটেকটিভ। জন্ম থেকেই গোয়েন্দা। আলাদা করে কোনো ট্রেনিং এর দরকারই নেই। নিজেকেই দেখুন। এখানে এসেছেন এখনও চব্বিশ ঘণ্টা হয়নি। অথচ পুরো ঠিকুজি কুলুজি সহ সবার হাঁড়ির খবর একেবারে কালি সমেত বের করে ফেলেছেন। আমাদের এই সব সংবাদ বের করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত। তাও এত ডিটেইলসে বের করতে পারতাম কিনা সন্দেহ আছে। ইনফ্যাক্ট আমাদের টপ খবরিরাও এদের প্রত্যেকেরই পেছনে লেগে আছে, কিন্তু এত খবর এখনও বের করতে পারেনি।”
আত্রেয়ী প্রশংসা পেয়ে একটু লাজুক হাসল। যত দিন যাচ্ছে, টিম আর টিমের টপ বসকেও তার ক্রমাগত ভালো লাগছে। অধিরাজকে সে এমনি এমনিই শ্রদ্ধার চোখে দেখে না! মানুষটা সবাইকে সম্মান দিতে জানে। ভালো কাজ করলে বাহবা দিতে একটুও কুণ্ঠিত নয়। সচরাচর টপ বসরা বসিং বেশি করেন, প্রশংসা কম। কিন্তু এ লোকটার কোনো ইগো নেই। নিজে যেমন প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন, তেমনই অন্যের পরিশ্রমকেও মর্যাদা দেন। সে তবু একটু লাজুক স্বরে বলে, “কী যে বলেন স্যার! এ তো সবাই পারে।”
অধিরাজ সিগারেটটা ধরিয়ে মাথা নাড়ল, “ছেলেরা পারে না। আপনি একবার নিজের জায়গায় প্রণবেশদা বা পবিত্রকে বসিয়ে দেখুন। ওরা কেউ অ্যাডজাস্ট করতেই পারবে না। প্রণবেশদাকে যদি এক কাপ কফি বানাতে কেউ অর্ডার করে উনি তো তারই এনকাউন্টার করে দেবেন। পুরুষেরা মেয়েদের পি এন পি সি নিয়ে প্রচুর ঠাট্টা করে। কিন্তু আপনি যদি খুব মন দিয়ে মেয়েদের পরনিন্দা পরচর্চা শোনেন, তাহলে আলাদা করে তদন্ত করার প্রয়োজনই পড়ে না। পুরো তল্লাটের খবর পেয়ে যাবেন। আগাথা ক্রিস্টি মিস মার্পলকে হাওয়া থেকে আমদানি করেননি। পোয়ারো বা শার্লক হোমস ক্রাইম স্পটে গিয়ে যা তথ্য সংগ্রহ করতেন, মিস মার্পল ইজিচেয়ারে বসে উল বুনতে বুনতে তার থেকেও বেশি খবর পেয়ে যেতেন। হাউজ ম্যানেজমেন্টের কথা ছেড়েই দিলাম, ইনফ্যাক্ট গোয়েন্দাগিরিতেও নারী-দি-বস্। এখানে অস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”
আত্রেয়ী লাজুক হাসল, “থ্যাংকস স্যার। আপনি কিছু খাবেন? কুকের কাজ করলেও নিজের প্রয়োজনীয় খাবার, চা, কফি সব আমি একদম নিজের সঙ্গেই নিয়ে এসেছি। এ বাড়ির জলটুকুও খাই না, নিজেই বাইরে বেরিয়ে দোকান থেকে সিলড্ মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে আসি। আমার ব্যাগে সব মজুত থাকে আর তার আশেপাশে কাউকে ঘেঁষতে দিই না। তাই চা-কফি বা মিড নাইট স্ন্যাকস — সব সেফ!”
“সত্যিই আপনি অতুলনীয়া মিস্ দত্ত।” সে বলে, “আপনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কিন্তু আপনার স্পেশাল চায়ের ভক্তটিকে বঞ্চিত করে কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। ইনফ্যাক্ট আমি ভেবেছিলাম, অর্ণব হয়তো এখানেই আসতে চাইবে। আজ আপনার হাতের চা ওর দরকার ছিল। আমাদের সঙ্গে পরপর যা ঘটেছে….!”
অধিরাজ তাদের অভিজ্ঞতা সবটাই খুলে বলল। আত্রেয়ী কিছুটা শুনেছিল। কিন্তু অর্ণবের গাড়ির ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্টের কথা জানত না। সে প্রায় শিউরে উঠেছে, ভয়ংকর! অফিসার সরকার ঠিকঠাক আছেন তো? আপনি কাঁধের এই অবস্থা নিয়ে এখানে আসতে গেলেন কেন! তাই ভাবি, আপনার হাত এভাবে ব্যান্ডেজ করা কেন! এরকম একটা ইনসিডেন্টের পর তো একটু রেস্ট নেওয়া উচিত ছিল আপনাদের।”
“অর্ণবের ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা উড়ে গেছে, আর দুটো হাত ভাঙা কাচে একটু কেটে গেছে। এছাড়া শারীরিক কোনো জখম হয়নি।” অধিরাজ জানায়, “রেস্ট নেওয়ার সময় নেই মিস্ দত্ত। খুনি নিজে ইনজিওর্ড হয়েও রেস্ট নেওয়ার নাম করছে না, তবে আমরা কী করে বিশ্রাম নিই? আপনিও সবসময়ই হাই অ্যালার্টে থাকবেন। খুনি কতখানি ডেসপারেট সে তো বুঝতেই পারছেন। একটা সামান্য ভুলই কিন্তু মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আমরা ওকে চেজ করছি, কিন্তু আপনার আর মিস্ বোসের রোল কিন্তু এ কেসে সবচেয়ে ভাইটাল। আপনারা দু-জনেই সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আছেন। একদম সাইক্লোনের কেন্দ্রবিন্দুতে। আপনাদের রিস্ক আমাদের থেকেও কয়েকগুণ বেশি। তাই পদে পদে সাবধান।”
আত্রেয়ীর কপালে চিন্তার রেখা প্রকট হয়ে ওঠে। সে বলল, “ইয়েস স্যার।”
“এ বাড়ির সদস্যদের কেমন বুঝছেন?”.
“বাকিদের নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। শালিনী, সোনালি তো খুবই ভদ্র ও নম্র। সোনালির বর বিরূপাক্ষ বিজনেসের কাজে মাঝেমধ্যেই কলকাতার বাইরে যান শুনেছি। তবে উনি শ্বশুরের সঙ্গে থাকলেও একদমই টিপিক্যাল ঘরজামাই নন। ভদ্রলোকের ভীষণ পার্সোনালিটি। ঘরজামাই হওয়ার মেটিরিয়ালই নন। ওঁকে ভূপেন্দ্রও যথেষ্ট সমঝে চলেন। শালিনীর স্বাস্থ্য খুব ভালো নয়। আর ভূপেন্দ্র অসম্ভব স্বার্থপর লোক। স্ত্রীয়ের জন্য তাঁর সময়ই নেই। তাই অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করার জন্যই সোনালি আর বিরূপাক্ষ এখানে থাকেন। ওদের চারবছরের একটা ছেলে আছে, আয়ান। সে ভীষণ শান্ত আর কিউট। আর মেয়েটা একবছরের। একদম একটা পুতুলের মতো দেখতে। ওর নাম তানিশা। দু-জনেই শালিনীর প্রাণ। আয়ান তো ঠাকুমাকে ছেড়ে থাকতেই পারে না। সে শালিনীর গায়ে সর্বক্ষণ লেগে থাকে। তানিশাও ঠাকুমার কাছেই খায়, তাঁর কোলেই ঘুমোয়। এরা মোটামুটি নর্মাল। কিন্তু প্রবলেম চাইল্ড এখানে একজনই।”
“আই নো।” অধিরাজ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে মাথা ঝাঁকায়, “স্বয়ং আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা! কপুর মিত্তল কমিটির রিপোর্টে ওঁর চরিত্রের ব্যাখ্যান আগেই শুনেছিলাম। ইনফ্যাক্ট, যে পার্টিতে উনি ঢুকেছেন, সেই বিজেপির লোকেরাও ভদ্রলোকের অভদ্র স্বভাবের জন্য চরম বিরক্ত। এতটাই নেগেটিভ ইমেজ ওঁর যে পার্টি যে কোনোদিন ওঁকে কান ধরে বের করে দেবে। কথায় কথায় লোককে শাসিয়ে বেড়ান।”
“ভীষণ রুড টাইপের লোক উনি।” আত্রেয়ী বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলল, “এ বাড়িতে একমাত্র ভূপেন্দ্র-ই আমার আসল পরিচয় জানেন। তা সত্ত্বেও খাটিয়ে মারেন। দিনে অন্তত পঞ্চাশবার কফি খাবেন। এক সেকেন্ড দেরি হলেই মা-বাপ তুলে গালাগালি চালু হয়ে যায়। আমি নাকি সাজগোজ বেশি করি। ইনকমপিটেন্ট আর অলস! আর ভীষণ অপমানজনক কথাও বলেন। একা আমাকে নয়, জুজুৎসুকেও। জুজুৎসু ওঁর ওপর এতটাই চটা যে এর মধ্যেই আমায় বলেছে, মালিক না হলে জুজুৎসুর প্যাঁচ মেরে ওঁর ঠ্যাং ভেঙে দিত! নিজের বউকে তো মানুষ বলেই গণ্য করেন না। উনি যদি সত্যিই কাউকে ভালোবাসেন, তা হল মেয়ে সোনালি, আর দুই নাতি-নাতনি। লোকটার একমাত্র দুর্বলতা ওখানেই। দৈত্যের প্রাণভ্রমরা ওখানেই রয়েছে। তবে বার্নিং শিখের হুমকি শোনার পর থেকে নাকি আরও বেশি খিটখিটে আর ফেরোশাস হয়ে গিয়েছেন। মুখে প্রকাশ না করলেও রীতিমতো ভয় পেয়েছেন। সবসময়ই হাতের কাছে লাইসেন্সড গান রাখেন।”
“হুম।” অধিরাজের চোয়াল একমুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠল, “বাইরের আর কোনো লোক আসে? পার্টির লোক?”
“আসে। তবে তারা এ ফ্ল্যাটে ঢোকা তো দূর, ধারেকাছেই আসে না। ভূপেন্দ্র পার্টির মিটিং এর জন্য এখানেই একটা হল বুক করে রেখেছেন। তারা ওখানেই মিটিং করে, ওখান থেকেই ফিরে যায়। আর উনি নিজে পার্টির গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে বেরোন। সোনালি পলিটিক্স পছন্দ করে না তাই!”
“আচ্ছা।” তাকে থামিয়ে অধিরাজ বলল, “আপনি কী একটা লাইটের কথা বলছিলেন না? যেটা আপনার ফিশি লেগেছে? আমাকে একবার দেখানো যায় কি?”
“শিওর স্যার।”
এতক্ষণ এ ঘরে মৃদু আলো জ্বলছিল। আত্রেয়ী উঠে গিয়ে একটা সুইচ টিপে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই ঘর আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সাদা আলোর বিচ্ছুরণ এতই জোরদার যে রীতিমতো চোখে লাগে। অধিরাজ কয়েক সেকেন্ড দেখে নিয়েই চাপা স্বরে বলল, “এবার অফ করে দিন মিস্ দত্ত। নয়তো বাড়িসুদ্ধ সবার ঘুম ভেঙে যাবে।”
“এটা লিভিংরুমের বলে আলোটা বেশি পাওয়ারের।” আত্রেয়ী আলোটা নিভিয়ে দিয়েছে, “বেডরুমেরগুলো অনেক কম পাওয়ারের। কিন্তু জিনিস একই। এই আলোটা দুপুরের সানলাইটের মতো খটখটে। বেডরুমেরগুলো নরম, এইটুকুই পার্থক্য।”
“বুঝেছি।” অধিরাজ বলল, “নিজের চোখে দেখার পর বুঝতে পারছি যে এ জিনিস আমাদের বাড়িতেও আছে। শুধু এর বিশেষত্ব আর নামটা জানা ছিল না। আমার বাবার গার্ডেনিং এর খুব শখ। তিনি সম্প্রতি রুফ টপ গার্ডেন করেছেন। তাতেও ক্ষান্ত হননি৷ ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর ডেকে গোটা বাড়িতেই একেবারে ডিজাইন করে নানারকমের লতা পাতা, ফুলগাছ লাগিয়ে বসে আছেন। সেগুলো দেখতে এতই সুন্দর, আর ঘরের শোভা বাড়াতে এতটাই ওস্তাদ যে আমার বেডরুম অলমোস্ট মুঘল গার্ডেন হয়ে গেলেও আপত্তি করিনি। মা-ও ফুল ভালোবাসেন। তাই বাবা মহানন্দে ঘরের মধ্যেই নানারকম রং-বেরঙের অর্কিড, লিলি, গোলাপ চাষ করছেন। আর মজার কথা, এই আলোটা দেখার পর বুঝতে পারলাম, আমাদের বাড়ির সবকটা আলোই এই পদার্থ। পার্থক্য শুধু পাওয়ারের। কোনোটা জোরালো, কোনোটা মোলায়েম। তবে মাল একই। ইভেন এই ভিবজিওর আল্ট্রাভায়োলেট এল.ই.ডি. আমি জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠীর বাড়িতেও দেখেছি। কিন্তু এর কোনো ক্ষতিকর এফেক্ট দেখিনি। আমি বাড়িতে কম থাকলেও বাবা-মা তো ঐ আলোর নীচেই আছেন। বাবার অফিসেও এই লাইটগুলোই আছে।”
“এর কোনো ক্ষতিকর এফেক্ট নেই স্যার।” আত্রেয়ী সহমত, “শুধু সানলাইটের এফেক্টটুকু দেওয়া ছাড়া এর আর কোনো ফাংশনই নেই। যারা গ্রীনহাউজ রাখে, তারা অষ্টপ্রহর এর আলোতেই কাজ করে। দিন হোক কী রাত, গাছগুলো যে কোনোসময়ই সালোকসংশ্লেষ চালিয়ে যেতে পারে। ইভেন অনেক বাড়িতেও আজকাল এই লাইট থাকে। যত সময় যাচ্ছে, মানুষ সূর্যালোকের সংস্পর্শে কম আসছে। কোভিডের সময় তো একদমই গৃহবন্দি ছিল সবাই। হয়তো সেটাও এই ধরনের লাইটের জনপ্রিয়তার বিশেষ কারণ।”
“হতে পারে।” সে সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা কোথায় ফেলবে বুঝতে পারছিল না। আত্রেয়ী সেটা লক্ষ্য করেই বলল, “অ্যাশট্রেতেই গুঁজে দিন স্যার। এখানে কেউ লক্ষ্য করে না, অ্যাশট্রেতে ক-টা সিগারেটের বাট আছে। এ বাড়িতে শালিনীকে ছেড়ে দিলে কমবেশি সকলেই স্মোকার।”
“অ্যাজ ইউ উইশ মাই লেডি।” অধিরাজ অ্যাশট্রেতে সিগারেটটা গুঁজে দিতে দিতে বলে, “আর একটা কথা জিজ্ঞাস্য ছিল।”।”
“বলুন
“এখানে যারা যারা আসে তাদের মধ্যে কেউ কি লেফটি?”
প্রশ্নটা শুনে আত্রেয়ীর ভুরুতে ভাঁজ পড়ল, “অনেস্টলি স্পিকিং, এর মধ্যে অতখানি লক্ষ্য করার সুযোগ পাইনি। জুজুৎসু যে লেফটি সেটা আমি জানি। কিন্তু বাকিদের সঙ্গে এখনও অতটা কানেকশন গড়ে তোলার সুযোগ পাইনি। আমার কাজ বেশিরভাগ সময়ই কিচেনে থাকে। তবু যতদূর আবছাভাবে মনে পড়ছে, শ্রীদর্শিনীও বোধহয় লেফটি। ওকে দাবার চাল বাঁহাতে দিতে দেখেছি।”
“হুম।” সে একটু ভেবে বলল, “আপনি একটু গায়ে পড়ে বাকিদের সঙ্গেও ভাব জমান। যেহেতু আপনি কুক, সেহেতু গজল্লা করতে যারা আসেন, বা লাঞ্চের জন্য ছোঁক ছোঁক করেন, তারা কোন হাতে চায়ের কাপ, সিগারেট বা চামচ ধরেন সেটা একটু লক্ষ্য করবেন। দরকার পড়লে জুজুৎসুকে সার্ভ করতে দেবেন না, নিজেই সার্ভ করবেন। আর আবারও বলছি, বি অ্যালার্ট। কাল একটু কায়দা করে নজর রাখবেন ওদের মধ্যে কেউ খোঁড়াচ্ছে কিনা! যদিও সে সম্ভাবনা খুব কম। তবু খেয়াল করবেন।” বলতে বলতেই অধিরাজ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে, “এই ফ্ল্যাটটা ভালো করে একবার তল্লাশি করা দরকার। আজ রাতটা যদি নিরুপদ্রবে কাটে তবে কাল একেবারে দলবল নিয়ে এসে সার্চ করব। ডঃ চ্যাটার্জি মার্ডার ওয়েপনটা বের করতে না পারলেও সন্দেহ করছেন সেটা কোনো গ্যাস বা বিষাক্ত ধোঁয়া হতে পারে। তাই চোখ-কান খোলা রাখবেন। খুনি যে কোথা দিয়ে সেটা ইনসার্ট করে তাও বোঝা দরকার। একটা লুপ হোলই যথেষ্ট। তাই ভালো করে দেখতে হবে।”
বলতে বলতেই সে ঘড়ির দিকে তাকায়, “পাঁচটা প্রায় বাজতে যায়। এ বাড়িতে কে কখন ওঠে জানেন?”
“ছ-টার সময়ে জুজুৎসু ওঠে। তারপর শালিনী।” আত্রেয়ী বলল, “বাকিরা লেট রাইজার।”
“তার মানে আরও একঘণ্টা আমি এখানে থাকতে পারি। জুজুৎসু যদি এসে দেখে আপনার সঙ্গে আমি বসে গল্প করছি, তাহলে স্ক্যান্ডালের সংখ্যা আরও একটা বাড়বে। আমি সেটা একেবারেই চাই না।”
মিস্ দত্ত হাসল, “জুজুৎসুর নাক এখনও ডাকছে স্যার। আপনি নিশ্চিন্তে বসুন। ও এখন উঠবে না।”
সত্যি কথা বলতে কী আত্রেয়ীর এই নিভৃত আলাপচারিতা ভালোই লাগছিল। অর্ণবের সঙ্গে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কখনো কখনো সময় কাটিয়েছে সে। কিন্তু অধিরাজের নাগাল পাওয়া অত সহজ নয়। ওর সম্পর্কে একটা সম্ভ্রম মিশ্রিত কৌতূহল রয়েছে তার। অপরাধ ও অপরাধীর ব্যাপারে লোকটার যতটা কৌতূহল, বহির্জগত সম্পর্কে ততটাই উদাসীন! আত্রেয়ীর সঙ্গে খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক ও বোঝাপড়া তৈরি হওয়ার দরুণ মিস মুখার্জির অনুরাগ কোন দিকে তা বুঝতে কষ্ট হয়নি তার। এখন আবার আইভি ও কৌশানী এসে পড়ায় আহেলি একটু বিপন্নবোধও করছে। অন্য লেডি অফিসাররাও এই লোকটির ওপর ফিদা। কিন্তু তারা কেউই জোরদার কম্পিটিটর নয়। বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে তারা শুরু থেকেই যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট, কাছে যাওয়ার সাহস নেই। কিন্তু এই দু-জনকে তার বিপজ্জনক মনে হয়েছে। অথচ সবকিছুর কেন্দ্রে যে পুরুষ, তার মনের হদিশ পাওয়াই দায়! আত্রেয়ী এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না। খুব সহজভাবেই বলল, “বাই দ্য ওয়ে, কাঁধের স্টিচটা সামলে রাখবেন স্যার। অলরেডি দু-বার সেলাই পড়েছে। আবার যদি কেটে যায় তবে কিন্তু…!”
“ওরে বাবা!” অধিরাজ প্রায় আঁতকে ওঠে, “মিস্ দত্ত, ইউ আর স্কেয়ারিং মি! আমি মরে গেলেও এই স্টিচ কেটে যেতে দেব না! অলরেডি দু-বার মিস্ মুখার্জির অত্যাচার সহ্য করেছি। ভদ্রমহিলা ওয়ার্ক এডুকেশনে যতরকমের সেলাই করা শিখেছিলেন, রান, হেম—না কীসব যেন, মোটামুটি আমার ওপরেই সব প্র্যাকটিস করে ফেলেছেন! রক্ষে করুন, আমার কাঁধটা অত এম্ব্রয়ডারি নিতে পারবে না। শুধু সেলাই নয়, তার সঙ্গে আবার ঝাড় ফ্রি! এত বকা আমি স্কুলজীবনেও খাইনি।”
আত্রেয়ী কুলকুল করে হেসে ফেলল, “আপনি মিস্ মুখার্জিকে অত ভয় পান কেন?”
তার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়, “এটা বোঝানো একটু কষ্টকর। তবে উদাহরণ দিয়ে বললে বুঝবেন। সাপোজ, স্টিভেন স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্ক দেখে কোনো বিজ্ঞানী সত্যি সত্যিই ওরকম একটা ডাইনোসরের পার্ক তৈরি করে ফেললেন। আপনিও মহানন্দে সেখানে ট্যুর করতে গেলেন। দিব্যি স্টেগোসরাস, ব্রন্টোসরাস দেখে বেড়াচ্ছেন, ঠিক এমন সময়ই আপনার চোখ পড়ল, একটা টিরানোসরাস রেক্স পাশের এনক্লোজার দিয়ে চুপ করে আপনার দিকে কটমট করে তাকিয়ে দাঁত খিঁচোচ্ছে। আপনি কি ভয় পাবেন না?”
আত্রেয়ী হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না, “মিস মুখার্জি টিরানোসরাস রেক্স!” অধিরাজ কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, “নো। নট এগজ্যাক্টলি। আই মিন, ঈশ্বর না করেন, ঐ ট্যুরে যদি মিস্ মুখার্জিও আপনার সঙ্গে থাকেন, এবং ভুলবশত টি-রেক্সের এনক্লোজারে পড়ে যান, তবে হয় আপনাকেই দৌড়োতে হবে, নয়তো আমাদের এস.ও.এস. মেসেজ পাঠাতে হবে।”
“মিস্ মুখার্জিকে ডাইনোসরের হাত থেকে বাঁচাতে আসবেন আপনি?” এবার আত্রেয়ী মজা পেয়েছে।
“আমি আর অর্ণব দু-জনেই একেবারে এমার্জেন্সি মোডে পড়িমরি করে ছুটে আসব। তবে টি-রেক্সটাকে বাঁচাতে।” সে নির্বিকার, “ডাইনোসরটা প্রথমে তো খুদকুড়ি প্রাণীটাকে দেখতেই পাবে না। যদি বা ওঁর বকাঝকা খেয়ে দেখেও ফেলে, তবু প্রথমে দাঁত খিঁচিয়ে ভয় দেখাবে। নাক দিয়ে একবার শুঁকে দেখবে এটি কী পদার্থ! আদৌ পদার্থ না অপদার্থ! জিভ দিয়ে অল্প একটু চেটেও দেখবে। তারপর ওঁকে খাওয়ার জন্য পেল্লায় হাঁ করে তেড়ে আসবে। বিরাট চেহারার প্রাণী। নড়তে চড়তেও সময় লাগে৷ এত কাণ্ড করতে যেটুকু সময় লাগবে, তার মধ্যেই আমাদের মিস্ মুখার্জি সুঁচ-সুতো দিয়ে ও বেচারির মুখটাই কষে সেলাই করে দেবেন! ডাইনোসর যদি হাঁ-ই না করতে পারে, তবে খাবেটা কী? তাছাড়া ওর গোণাগুনতি কয়েকটা ধারালো দাঁতই আছে। যতদূর জানি, মেরে কেটে পঞ্চাশ কী ষাটটা। কিন্তু মিস্ মুখার্জির একেকটা বাক্যই ধারে -রেক্সের দাঁতের বাবা! ওঁর সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গেলে ডাইনোসরটারই ফসিল হয়ে যাওয়ার চান্স বেশি। সো, মিস্ মুখার্জি কোনোভাবেই টি-রেক্স নন! আমি বরং বেচারা টি-রেক্সের পক্ষ নিতেই রাজি আছি।”
আত্রেয়ী হাসি চাপতে গিয়েও পারল না। হেসে উঠে বলল, “আহেলি দিদিভাই এত ভয়ংকর সেটা আমার জানা ছিল না! আচার্য স্যার কিংবা অফিসার সরকারও তো ওঁকে এত ভয় পান না।”
“ভালো মনে করেছেন।” অধিরাজও মুচকি হেসে প্রসঙ্গান্তরে গেল, “অর্ণব আর পবিত্র-র কথা যখন উঠলই তখন একবার দেখেই নিই ওদিককার খবর কী।”
অর্ণব ততক্ষণে মিস্ বোসের সঙ্গে সেট হয়ে গিয়েছে। এখন অনেকটা চনমনে লাগল তাকে। সে ওখানকার পরিস্থিতি অধিরাজকে সবিস্তারেই জানায়। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, মেয়েদের পি এন পি সি নামক বস্তুটি সত্যিই খুব কাজের। কৌশানী ও ইতিমধ্যে অনেকরকম তথ্য জোগাড় করে ফেলেছে। অর্ণব জানাল, “এ বাড়িতে বাইরের লোক বিশেষ আসে না। এ বাড়ির লোকেরা নিজেরাই নিজেদের মতো থাকেন। আসার মধ্যে দুধ, ব্রেডওয়ালা, সব্জিওয়ালা, প্লাম্বার বা ইলেক্ট্রিশিয়ান, কেবলওয়ালা, এদেরই যাতায়াত বেশি। তবে স্যার, বাইরের কাউকে দরকার নেই। এ বাড়ির মেম্বাররাই এন্টারটেইনমেন্টের জন্য যথেষ্ট!”!”
“সে কী
“আপনি মিস্ বোসের কাছ থেকেই শুনে নিন।
মোবাইল ফোনটা হস্তান্তরিত হল। মিস্ বোস প্রথমেই ঝঙ্কার দেওয়া সুললিত কণ্ঠে উদ্বেগের সুরে জানতে চাইল, “আপনি ঠিক আছেন স্যার? এত বড়ো একটা ইনসিডেন্ট হয়ে গেল…!”
“আই অ্যাম পারফেক্টলি অলরাইট মিস্ বোস।” অধিরাজ মূল প্রসঙ্গে আসে,
“আপনি কী বুঝছেন? হাওয়ার গতিক কেমন?”
“হাওয়া মোটামুটি ঠিকঠাকই।” মিস্ বোস জানান, “তবে এরা অদ্ভুত টাইপের একটা ফ্যামিলি। সচরাচর বাঙালিরা মিশুকে হয়। কিন্তু এইরকম আনসোশ্যাল আর ইনকমিউনিকেটিভ ফ্যামিলি আমি জীবনে প্রথম দেখছি। স্বার্থ ছাড়া এরা একটি লোককেও অ্যালাউ করে না! যেমন অফিসার সরকার বললেন, দুধওয়ালা, রুটিওয়ালা, সব্জিওয়ালা, কেবলওয়ালা, আর নিতান্তই দরকার পড়লে ইলেক্ট্রিশিয়ান, প্লাম্বার কিংবা অন্য কেউ আসে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এরা কোনো কথাই বলে না। আমি পাশের বাড়ির মহিলার সঙ্গে একটু কথা বলেছি বলে সোমলতা চৌধুরী আমায় যা তা বলেছেন! মহিলা শয্যাশায়ী, কিন্তু মুখের কোনো আগল নেই। পৃথিবীসুদ্ধ সব লোকই সোমলতার মতে বদমায়েশ ও ধান্দাবাজ। ইনফ্যাক্ট আমাকেও তিনি এদের মধ্যেই ফেলেছেন। বিশ্বাস তো করেনই না, উপরন্তু মনে হয় একটু সন্দেহও করছেন। ভাবছেন, আমি বুঝি ওঁর বুড়ো বরকে নিয়ে পালিয়ে যাব!”
“সেরেছে!” অধিরাজ বিষম খেতে খেতে বাঁচল, “তেমন কোনো চান্স আছে কি?”
“মনে হয় না।” কৌশানী একটুও ইতস্তত না করে বলে, “বুড়ি যত খিটখিটে, বুড়ো তুলনায় নরমসরম! আমি বোধহয় ওকে একটু ভুল বুঝেছি। বডিমাসাজের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু সেটা অন্য অর্থে নয়। প্রথমে অনেক কিছুই ভেবেছিলাম। পরে শুনলাম লোকটা আথ্রাইটিসের ব্যথায় মাঝেমধ্যেই খুব ভোগে। কে যেন তাকে বলেছিল বডিমাসাজ করলে ব্যথা কমে। সেজন্যই আগুপিছু কিছু না ভেবে দুম করে বলে ফেলেছেন। নিজের জীবন ও পরিবারের প্রতি ওর খুব যত্ন। তার সঙ্গে শরীরের যত্ন নেওয়ার জন্য যে যা বলে, সেইসব টোটকা নিজের ওপরেই এক্সপেরিমেন্ট করেন। তার জন্য ভুলভাল কাজও করে ফেলেন। কে যেন ওকে বলেছিল চুনের জল খেলে হাড় শক্ত হয়। ব্যস, উনি গপাৎ করে হাফ কাপ চুনের জল খেয়ে নিয়েছিলেন। তার পরদিনই ওকে হসপিটালে অ্যাডমিট করতে হয়। ডাক্তাররা প্রায় মারতে বাকি রেখেছেন। অতখানি চুনের জল খেয়ে ওর যে পাকস্থলী বা অস্ত্র ফুটো হয়ে যায়নি এই অনেক! তবু ভদ্রলোকের শিক্ষা হয়নি। এখন যেন আবার কার পরামর্শে সকালে উঠে খালি পেটে কাঁচা হলুদ, রসুন আর কীসব কচকচ করে খান। এমনকি সর্ষের তেল থেরাপিও শুরু করেছেন। সর্ষের তেল মাখেন, নাকে টানেন, অয়েল পুলিং করেন এমনকি ডেইলি টু টি স্পুন কাঁচা তেল খেয়েও নেন। তাতে নাকি ওর সর্দি ও হজমের সমস্যা একদম হাওয়া হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি ইউটিউবের কোন ডাক্তারের অ্যাডভাইস শুনে রেইকি আর বডিমাসাজের পেছনে পড়েছেন। শুধু আমাকে নয়, শিবুকে, শিখাকে এমনকি বুড়ি থুড়থুড়ি কমলাকেও মাসাজ করার অনুরোধ করেছিলেন। অর্থাৎ, এটা ওর চারিত্রিক দোষ নয়, বাতিক!”
“যাক। আপনি তবে সেফ আছেন।” সে একটা শ্বাস ছাড়ল, “বাকিরা?”
“ছেলে পরিমল আর পুত্রবধূ মেঘনা, এরা আবার সত্যযুগের অবতার। পরিমলের কোনো বন্ধু নেই। তার হার্ডওয়্যারের বেশ বড়ো বিজনেস। পয়সার অভাব নেই। সে সকালবেলা বাবা-মাকে ঘটা করে প্রণাম করে অফিসে যায়। আবার অফিস থেকে ডাইরেক্ট বাড়িতেই ফিরে এসে আবার প্রণাম করে। পিতৃ-মাতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা। মেঘনাও তাই। দিনে কতবার শ্বশুর-শাশুড়ির পা ছোঁয় তার ঠিক নেই। আধুনিক শিক্ষিত মেয়ে। অথচ তার গোপালভক্তি বোধহয় মীরাবাঈকেও টেক্কা দেয়। বাবা-মা যখন উঠতে বলবে, তখন উঠবে, বসতে বললে বসবে! ওরা পার্টিতে যায় না, ডিস্কোতে যায় না, বার, নাইটক্লাব, রেস্টোর্যান্ট, নিদেনপক্ষে চায়ের ঠেকেও যায় না। বাইরের খাবার খায় না। সিনেমা, থিয়েটার দেখতেও যায় না। বাড়িতে টিভি আছে, কিন্তু ফিল্ম বা সিরিয়ালের তুলনায় ভক্তির চ্যানেলগুলোই বেশি চলে। সর্বক্ষণই ভজন, কোনো বাবার প্রবচন বা জ্যোতিষীর পরামর্শ চলছে! এত বেশি ভক্তি দেখলে মনে হয় সত্যযুগে ফিরে গেছি! একদম সুবোধ ছেলে। বাবার খুব প্রিয়ও বটে। বাবার অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করে না। এই একটি জায়গায় পি সি চৌধুরী সবচেয়ে দুর্বল। পরিমল ওঁর প্রাণ। শিখা গল্প করছিল যে ছেলে হেঁটে গেলেও বোধহয় বুড়োর প্রাণে লাগে। একবার শেভ করতে গিয়ে পরিমলের গাল অল্প একটু কেটে গিয়েছিল। এক-দু বিন্দু রক্ত পড়েছে কী পড়েনি, চৌধুরী সাহেব পুরো বাড়ি মাথায় তুলে, তিনজন ডাক্তারকে একসঙ্গে কল দিয়ে, নিজেই দৌড়ে গিয়ে টিটেনাস ইঞ্জেকশন এনে টেনে ধুন্ধুমার করে ছাড়লেন। লোকটা শয়তান, খুনি, সব কিছু হতে পারে। কিন্তু আদর্শ বাবা এবং শ্বশুরও বটে। কেউ বাবা-ছেলের কেমিস্ট্রি দেখলে বিশ্বাসই করবে না যে পরিমল মিঃ চৌধুরীর নিজের রক্ত নয়, অ্যাডপ্টেড। শাশুড়ি আর বউমা বাইরে যাই দেখাক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কেউ কাউকে দেখতে পারে না। অথচ মেঘনা শ্বশুরের ভীষণ ন্যাওটা। পুত্র ও পুত্রবধূর প্রতি ওর ভালোবাসা অকৃত্রিম। সোমলতা এতটাই শুচীবায়ুগ্রস্ত যে কিচেনে জুতো পরে ঘুরে বেড়ানো একদমই অ্যালাউ করতেন না। কিন্তু মেঘনার আবার সর্দির ধাত। মিঃ চৌধুরী নিজে তার জন্য শীতকাল হলেই ঘরে পড়ার জুতো আলাদা করে কিনে আনেন। সোমলতার সঙ্গে রীতিমতো মারপিট করে তার জুতো পরে কিচেনে ঢোকার পারমিশন আদায় করেই ছেড়েছেন। তবে কমলার ধারণা, মেঘনা যতটা ভালোমানুষি দেখায় আদতে ততটা নয়। শ্বশুরের চেয়ে শ্বশুরের সম্পত্তিই তার বেশি প্রিয়। তবে একটা বিষয়ে শাশুড়ি ও বউমা, দু-জনেই একমত। তাদের পরিবারের চারজন মানুষ ছাড়া বাইরের লোকজন সবাই শয়তান! মেঘনাও বাইরের কারোর সঙ্গে মেশে না। প্রচণ্ড দাম্ভিক এবং কাজের লোকদের মনুষ্যপ্রজাতি ভাবে না।”
“হুঁ।” অধিরাজ চিন্তান্বিত স্বরে বলল, “লাভিং ফাদার হওয়ার জন্যই উনি বার্নিং শিখের ফেভারিট টার্গেট! বাড়ির কাজের লোকদের সম্পর্কে কিছু জানা গেল?”
“শিবু এখানে বারো ঘণ্টা সার্ভিস দেয়। সকাল আটটা টু রাত আটটা। খুব পাংচুয়াল কাজেও চটপটে। কিন্তু মহিলা দেখলেই একটু গলে পড়ে। আমায় একটু বেশিই হেল্প করতে চাইছে। শিখা ভীষণ মেজাজি। এক্ষেত্রে মিসেস চৌধুরী একটুও বাড়িয়ে বলেননি। সে সত্যিই ফাঁকিবাজ। দেরি করে আসে আর তাড়াতাড়ি যেতে পারলে বাঁচে। তবে ওকে ‘এবিপি আনন্দের’ হিউম্যান ভার্সানও বলা যায়। এ তল্লাটের সব খবর রাখে। এ পরিবারের খবরও ওর নখদর্পণে। কোন্ জিনিসটা কোথায় থাকে, তা বোধহয় চোখ বুঁজে বলে দিতে পারবে। এ বাড়ির কেউ যদি কোনো জিনিস খুঁজে না পায়, শিখাকেই জিজ্ঞাসা করে নেয়। ওর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেই আমি অনেক কিছু জেনেছি। যেমন শিখা অদ্ভুত একটা কথা জানিয়েছে, যেটা আমার একটু মিস্টিরিয়াস লেগেছে স্যার।” ,
“পি সি চৌধুরী দশ বছর আগে কলকাতায় আসেন। পরিমলকে তিনি তার অনেক আগেই অ্যাডপ্ট করেছিলেন। পরিমলের বয়েস এখন আটত্রিশ কী উনচল্লিশ। কিন্তু শিখার সন্দেহ সে কোনোমতেই বাঙালির সন্তান নয়। চৌধুরী সাহেব দিল্লিতেই তাকে অ্যাডপ্ট করেছিলেন। তাকে দেখতেও ঠিক তথাকথিত বাঙালিদের মতো নয়। যথেষ্ট লম্বা-চওড়া, ফর্সা, কাটা কাটা মুখ, ক-টা চোখ আর বাদামি চুল। মুখের আদলটাও সাধারণ বাঙালির ছেলের সঙ্গে মেলে না। তার ওপর দিল্লি থেকে অ্যাডস্টেড। সুতরাং তার রক্তে অবাঙালি-মা বাবার জিন থাকার চান্স প্রবল।” মিস্ বোস বলল, “আর পরিমলের বয়েস যদি আটত্রিশ বা উনচল্লিশ হয়ে থাকে, তবে তার জন্ম উনিশশো চুরাশি সালে হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তার অ্যাডপশনের পেছনে যদি বিশেষ কোনো কাহিনি থাকে তবে আশ্চর্য হব না।”
“ব্রিলিয়ান্ট ডিডাকশন মিস্ বোস!” অধিরাজ খুশি হয়ে বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি ইমপ্রেসড। সেই কাহিনিটা আমরাই না-হয় খুঁজে বের করে নেব। বাট রিয়েলি গুড ওয়ার্ক। শিখার চশমার পাওয়ার কত?”
‘কমসে কম মাইনাস ফাইভ হবেই।” তার সপ্রতিভ জবাব, “বেশ ভারি পাওয়ারের চশমা। তবে মহিলা চূড়ান্ত অলস। সে নিজের কাজটাও পারলে কমলার ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়। এককথায় পটের বিবি।”
গ্রেট। এবার কমলা সুন্দরী সম্পর্কে একটু আলোকপাত করুন।”
“ও মহিলার প্রায় মরার বয়েস হয়েছে। বয়েস প্রায় আশির কাছাকাছি।” কৌশানী জানাল, “ধীরগতিতে কাজ করাটা ওর ইচ্ছাকৃত নয়৷ এই বয়েসে স্পিডে কাজও করা যায় না। তবে রান্নার হাত খাসা। ওর সম্পর্কে বলার মতো তেমন কিছুই নেই। সাতে পাঁচে থাকে না। মুখরোচক আলোচনা পেলে অবশ্য জমে যায়। তবে শিখার মতো অত কৌতূহলী স্বভাবের নয়। কানে একটু কম শোনে। বাদবাকি সব ঠিকঠাক।” সে একটু থেমে ফের যোগ করে, “ওঃ স্যার, মাই ফল্ট। আমি এটা মিস্ করে গেছি। আর একটা লোকও এ বাড়িতে কিন্তু আসে। আই মিন, শুনেছি তিনি সপ্তাহে দু-দিন করে আসেন। রোজ আসেন না। কাল তার আসার কথা আছে। এলে স্বচক্ষে দেখতে পাব।”
“কে তিনি?”
“মিসেস চৌধুরীর ফিজিওথেরাপিস্ট। মিঃ রাজীব চন্দ। তাঁর নামই শুনেছি শুধু। বিশেষ কিছু জানি না। খুব বেশি দিন হল রিক্রুটেড হননি। ভদ্রলোকের সম্পর্কে মিসেস চৌধুরী জানিয়েছেন যে তিনি খুব ভালো ফিজিওথেরাপিস্ট। আর মিঃ চৌধুরী একটু খার খেয়ে বসে আছেন। কারণ অ্যাজ ইউজুয়াল রাজীবকেও তিনি বডিমাসাজের অফার দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজীব জানিয়েছেন যে উনি ফিজিওথেরাপিস্ট, থাইমাসাজ গার্ল নন। তাতে ভদ্রলোক প্রচণ্ড চটেছেন!”
“এদের মধ্যে কেউ লেফটি?”
“না স্যার।” মিস্ বোস আত্মবিশ্বাসী, “আমি শুরুতেই সেটা নোটিস করেছি। এদের মধ্যে কেউ লেফটি নয়। শিখা মাঝেমধ্যে লুকিয়ে বিড়ি ফোঁকে, তবে সেটা ডানহাতে ও ঝাড়ুও ডানহাতেই ধরে। কমলা হাতা-খুন্তি সব ডানহাতে নাড়ে। শিবু ও সব কাজ ডানহাতেই করে। মিঃ আর মিসেস চৌধুরী, পরিমল ও মেঘনা, এরাও ডানহাতি। তবে মিঃ রাজীব চন্দ সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। এখনও দেখিনি তাঁকে।”
তথ্যটা জেনে একটু যেন হতাশ হল অধিরাজ, “আর যারা নিয়মিত বাড়িতে আসে? যাদের আসা-যাওয়া থাকলেও তাদের অস্তিত্বের তেমন গুরুত্ব নেই? যেমন দুধওয়ালা, ব্রেডওয়ালা, খবরের কাগজওয়ালা বা বাকিরা?”
“তাদের ঠিক লক্ষ্য করিনি স্যার। ওদের মধ্যে কেউ লেফটি হলেও হতে পারে।” “এবার থেকে ভালো করে লক্ষ্য করবেন।” সে দৃঢ় স্বরে বলল, “বার্নিং শিখ যে কোনো রূপে থাকতে পারে। প্রতিবেশীরা বা বাইরের লোক ওদের ঘরে আসে না, এটা একটা ভালো খবর। কিন্তু এমনও হতে পারে, সে ভেতরেই ঢুকে বসে আছে। ও বাড়ির একজন কাজের লোকও চব্বিশঘণ্টার নয়। সর্বোপরি যারা প্রত্যহ আসে, দুধ, ব্রেড, কাগজ, সবজির বিক্রেতা কিংবা প্লাম্বার, ইলেক্ট্রিশিয়ানের মতো এমার্জেন্সি সার্ভিস দেওয়ার লোক, তাদের ওপরও নজর রাখুন। তাদের মধ্যেও যে কেউ হতে পারে। প্রত্যেকটি অচেনা মুখকে জরিপ করে নেবেন। কাউকে বিশ্বাস নেই। আর কাল লক্ষ্য রাখবেন ওদের মধ্যে কেউ খুঁড়িয়ে চলছে কিনা।
“ওকে স্যার।”
“থ্যাংকস।” অধিরাজ একটু শ্বাস টানল, “অর্ণব কোথায়?”
মোবাইলটা ফের অর্ণবের কাছেই ফিরে গিয়েছে। অধিরাজ চিন্তিত স্বরে জানতে চায়, “তোমার পায়ের নখটার কী অবস্থা? হাতের ব্যথা কি একটু কমেছে?”
অর্ণব কী বলবে বুঝে পায় না। যে লোকটার কাঁধে চোট, হাতে চোট, সে কিনা তার ছোটোখাট জখম নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সে আস্তে আস্তে বলল, “ব্যথা এখন নেই স্যার। ডঃ চ্যাটার্জি পেইনকিলার দিয়ে দিয়েছেন। আপনি এর মধ্যে মনের সুখে আস্ত একটা প্যাকেটই ধোঁয়া করে দেননি তো?”
“না না…!” সে হাসছে, “মিস্ দত্ত সাক্ষী আছেন। মাত্র একটা সিগারেট খেয়েছি।
তবে গুরু, এবার একটু ঢিল দাও। আই মিন, এত স্ট্রেস, এত চাপ, রাত জাগা, একটু বেশি তো টানতেই পারি। অন্তত যতক্ষণ না বার্নিং শিখ নামের ফাঁড়াটা কাটছে…?” অর্ণব একটু চুপ করে থাকে। কথাটা ভুল নয়। যে পাহাড়প্রমাণ চাপ আর টেনশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তারা, তার মধ্যে যে কোনো স্মোকার একটু বেশিই স্মোক করবে। তার ওপর গত দু-রাত ওরা না ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। বার্নিং শিখও কম ঘোল খাওয়াচ্ছে না। ইন্ধন তো একটু লাগবেই। সে নিজেই তো কাপের পর কাপ চা-কফি খেয়ে চলেছে। স্যার আবার অত চা বা কফি খান না।
“ওকে। ডান।” সে সস্নেহ ভঙ্গিতে বলে, “কিন্তু তাই বলে দিনে চার পাঁচ প্যাকেট উড়িয়ে দেবেন না।”
“প্রশ্নই ওঠে না।” বলতে বলতেই অধিরাজ আবার অন্যমনস্ক, “তুমি হয়তো আমাকে পাগল ভাবতে পারো। কিন্তু একটা জিনিস আমার খুব আনক্যানি লাগছে।”
“কী জিনিস?”
“ওখানে তুমি আর মিস্ বোস ঠিকঠাক আছ। পি সি চৌধুরীর ফ্যামিলিও ঠিকঠাক আছে। এদিকেও নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি। পবিত্র আর প্রণবেশদাও চুপচাপ। চতুর্দিকে এত শাস্তি, সেটাই সবচেয়ে আনক্যানি।”
অর্ণব বিস্মিত, “এতে আশ্চর্যের কী আছে স্যার? বার্নিং শিখ হয়তো আজ আর অ্যাটাক করবে না। হয়তো দু-বার ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে।”
“উঁহু। ওখানেই ভুল করছ তোমরা।” সে মাথা নাড়ল, “ও পাবলিক হাল ছাড়ার লোকই নয়। ওর দেওয়া টাইম লিমিটের মধ্যে অলরেডি ও দু-বার অ্যাটাক করেছে। ওর প্ল্যানিং ছিল আজ রাতেই কোনো একটা ফ্যামিলিকে মারার। তার জন্যই টায়ার নিতে এসেছিল। কিন্তু সে প্ল্যানে আমরা জল ঢেলে দিয়েছি। তার রি-অ্যাকশনও দেখো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তোমার ওপর অ্যাটাকটা অলমোস্ট ফুলপ্রুফ ছিল। অথচ সেটাও ব্যর্থ। আজকাল ইন্টারনেট ও মিডিয়ার কল্যাণে সব খবরই ইনস্ট্যান্ট পাওয়া যায়। মাঝরাতেও যদি এনকাউন্টার হয়, তবে তার নিউজ রাত থেকেই ভাইরাল হতে থাকে। ইনফ্যাক্ট, এনকাউন্টার, অ্যাক্সিডেন্ট, মার্ডার তো ছাড়ো, আজমল কাসভ বা আফজল গুরুর ফাঁসি একদম চুপচাপ হয়েছিল। জেলের হাতে গোণা কয়েকজন অফিশিয়ালস ছাড়া কেউ জানতই না। আজমল কাসভকে তো প্রাইভেসির জন্য আর্থার রোড জেল থেকে ইয়েরওয়াড়া জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পর্যন্ত। কিন্তু কোনো না কোনো মিডিয়া, চ্যানেল ঠিক শুঁকে শুঁকে পৌঁছে গেছে ও ব্রেকিং নিউজ বানিয়ে ফেলেছে। আর একটা চ্যানেল যদি এক্সক্লুসিভ কোনো খবর দেয়, তবে বাকি
চ্যানেলগুলোও উঠে পড়ে সেই নিউজটাকেই কভার করে। কোনো বিশেষ ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও দেখবে তার দশ মিনিটের মধ্যেই ওয়েব পোর্টাল আর নিউজ চ্যানেলে খবরটা পৌঁছে গেছে। এই অবস্থায় যদি তার প্ল্যানিং সাকসেসফুল হত, আর আমাদের টাইমিং এ একটু এদিক ওদিক হত, তবে এতক্ষণে সেটা বিরাট খবর হয়ে যেত। কারণ সাংবাদিকরাও সবাই হাই অ্যালার্টেই আছে। যেহেতু বার্নিং শিখ: এখন গরমাগরম ইস্যু, এবং এখনও কোনো পুলিশ অফিসারের অ্যাক্সিডেন্টের খবর কোনো পোর্টাল বা চ্যানেল দেয়নি, সুতরাং সে নির্ঘাত বুঝেছে যে তার প্ল্যান ফের ফ্লপ হয়েছে। সেক্ষেত্রে ও আবার একটা অ্যাটাক করবেই। কারণ ওর হাতেও সময় কমছে। তার মধ্যেই ওকে পুলিশকে চাপে রাখতে হবে, ফ্যামিলিগুলোকে ভয় দেখাতে হবে, আতঙ্কের পরিবেশ কায়েম রাখতে হবে, তারপর একে একে ওদের মারতে হবে। হারতে সে জানেই না! বাধা পেলে বাধাকে গুঁড়িয়ে দেওয়াই তার সাইকোলজি। পুলিশকেও ছাড়ছে না। অথচ সেই লোকটা কিনা হাত পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে আছে!” অধিরাজের চোখে দুশ্চিন্তা, “এতটা শান্তিপ্রিয় সে আদৌ নয়। আমার মন কু গাইছে। আজকের রাতটা এত শান্তভাবে কাটার কথা নয়। অ্যাটাক আসবেই অর্ণব। কোনো না কোনোদিক থেকে সে আবার আক্রমণ করবে। এত সহজে থামবে না। এই নিরবচ্ছিন্ন শান্তি মোটেই স্বাভাবিক নয়..!”
অর্ণব ফোনে কথা শুনতে শুনতেই একটা বিপ্ বিপ্ শব্দে সচকিত হয়ে উঠল। একটা ফোন ঢুকছে। সে একঝলক ফোনের স্ক্রিনটা দেখে নেয়। অফিসার পবিত্র আচার্যের ফোন। অর্ণব সে কথা অধিরাজকে জানাতেই সে বলল, “কনফারেন্সে নিয়ে নাও।” অর্ণব পবিত্রকে কনফারেন্স কলে নিয়ে নিল। ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে তার অস্বাভাবিক গম্ভীর স্বর, “অর্ণব, রাজা আছে লাইনে?”
অধিরাজের চোখে আশঙ্কা, “আছি পবিত্র। এনি ব্যাড নিউজ?”
পবিত্র কোনোরকম ভূমিকা না করেই বলল, “এইমাত্র সি.আই.ডি. ব্যুরো থেকে ফোন এল। আমাদের অফিসের একটু সামনেই বস্তার মধ্যে একটা লাশ ফেলে গিয়েছে কেউ। লাশ বলা অবশ্য ভুল, লাশের একগাদা টুকরো বললে ঠিক হয়। তবে টুকরো করা ধড়ের সঙ্গে মাথাটাও আছে বলে শনাক্ত করতে কোনো অসুবিধে হয়নি। লাশটা খবরি ইসমাইলের!”
“হো-য়া-ট!”
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো খবরটা এসে আঘাত করল ওদের। পুরো বিলো দ্য বেল্ট অ্যাটাক! এতদিন বার্নিং শিখ পুলিশদের খুন করছিল। এবার খবরিও তার টার্গেটে। এই আশঙ্কাটা একদমই করেনি অধিরাজ। সে ভিকটিম ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিল। ইনফর্মারদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা একবার-দুবার মনে আসেনি যে তা নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনফর্মারদের আসল পরিচয় হাতে গোণা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানেই না। এমনকি সবসময় ওদের পরিবারও জানতে পারে না যে তাদের বাড়ির একজন সদস্য পুলিশের খবরি। পুলিশেরাই সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য খবরিদের টাকা দিয়ে একটা সাইড বিজনেসও খুলে দেয়। সাধারণ মানুষ ওদের কাউকে পানের দোকানি, হকার, চা-ওয়ালা কিংবা সব্জিওয়ালা হিসেবেই চেনে। ইসমাইলের পানের দোকান ছিল। এতটাই সে সতর্ক যে ওর বউও এই পেশার খবর রাখত না! শেষপর্যন্ত সেই ইসমাইল। অসম্ভব চতুর ও সতর্ক খবরি। সি.আই.ডি.-র অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইনফর্মার।
অধিরাজ বিস্ময়ের ধাক্কায় হতবাক হয়ে পড়েছিল। সে কিছু বলার আগেই পবিত্র ফের বলল, “শুধু তাই নয়, ঘণ্টাখানেক আগে রকির ডেডবডিও পাওয়া গিয়েছে। ওকে পুড়িয়ে মেরেছে। নেকলেসিং নয়। কেরোসিন গায়ে ঢেলে দিয়েছিল। লাশের এতটাই খারাপ অবস্থা যে চেনাই যাচ্ছিল না। নেকলেস, ব্রেসলেট আর পিঠের ট্যাটুটা কোনোমতে বেঁচে গিয়েছে বলে শনাক্ত করা গিয়েছে। দুটো লাশই ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিতে বলেছি।”
সি.আই.ডি.? অফিসারদের অতিবিশ্বস্ত পঞ্চপান্ডবের টিমের মধ্যে দু-জন শেষ। ওদের দু-জনকেই পি সি চৌধুরী আর ভূপেন্দ্র দত্তার বাড়িতে আসা সমস্ত অতিথি, চাকরবাকরদের স্টক করতে বলেছিল অধিরাজ। দুই পরিবারের সদস্যদের ইতিহাস, বন্ধু-শত্রুদের খবরও নিতে বলেছিল। আজ সকাল সাতটাতেই খবরিদের জড়ো হওয়ার কথা। অন্যতম অভিজ্ঞ ও দক্ষ খবরিরা নিশ্চয়ই কিছু জানাত। কিন্তু তার আগেই…
অধিরাজ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই দুই ফ্যামিলিতে আজ আর কিছু হবে না। ভোর হয়ে যাবে। অর্ণব, তুমি ওখান থেকে বেরিয়ে স্ট্রেট পবিত্র-র কাছে গিয়ে বসে থাকো। যতক্ষণ না আমি পৌঁছচ্ছি, কেউ কাউকে একা ছাড়বে না। আমি তোমাকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে ব্যুরোয় ফিরব। ততক্ষণ এক সেকেন্ডের জন্যও বাড়ির বাইরে বেরোবে না। গট ইট? পবিত্র, বি অ্যালার্ট!”
তার কণ্ঠস্বরে ভয় স্পষ্ট। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। পূর্বদিকে আলো দেখা দিয়েছে। আজকের রাতটা শেষ হল ঠিকই। কিন্তু কালরাত্রির অন্ধকার এখনও কাটেনি। কে জানে, আরও কত বলি নেবে এই কালান্তক বাহাত্তর ঘণ্টা!!
