হ্যামারস্মিথের কিছু আশ্চর্যজনক কাজকর্ম
এ বিষয়ে কাগজে যারা লেখালেখি করত তাদের কমিশনার বলা হতো। এ বিষয়ে ম্যালন ও এনিড এই দুই কমিশনারের যে যৌথ রচনাটি সাপ্তাহিক ডেইলিতে প্রকাশিত হয়—তা একই সঙ্গে আগ্রহ ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। সঙ্গে সঙ্গে কাগজের সহ সম্পাদক এক ভর্ৎসনামুলক সম্পাদকীয় লেখেন। যার উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম বিষয়ে গোঁড়া পাঠকদের সন্দেহ বাতিকটাকে শান্ত করা। তিনি তাঁর চিঠিতে লিখতেন—‘লক্ষ্য করে দেখলে হয়তো ব্যাপারটা সত্যিই মনে হবে। তবে এটা আমরা সবাই জানি যে এসব ব্যাপার মহামারী রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ে।’ ম্যালন অজস্র চিঠিপত্রের মধ্যে ডুবে গেল। এই ব্যাপারের সপক্ষে ও বিপক্ষে বহু চিঠি আসতে লাগল তার কাছে। এর থেকে বোঝা গেল এ বিষয়ে পাঠকদের মনে বহু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে তীব্রভাবে। আগে সে যে সব রচনা লিখেছিল সেগুলি কেবল শুধু কিছু ক্যাথলিক ও ইভাঞ্জেলিক্যাল সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রীস্টানদের মধ্যে অসন্তোষ জাগিয়ে তুলেছিল, কিন্তু এখন বিভিন্ন দিক থেকে এত বেশি চিঠি আসতে লাগল যে তার চিঠির বাক্স ভরে গেল। বেশির ভাগ চিঠিই মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে উপহাস করে লেখা। তাদের বক্তব্য ছিল এই যে, লোকেরা যাই বলুন এই মনের শক্তির কথা কেউ জানে না। ম্যালনের রচনা ঘটনার যথাযথ বিবরণ দান করলেও সেই ঘটনার হাস্যরসাত্মক দিকগুলোকেও তুলে ধরেছিল।
পরের সপ্তায় ম্যালন যখন তার অফিসের ঘরে বসে কাজ করছিল তখন তার বালক ভৃত্য একজন অতিথির কার্ড এনে দিল। তাতে গত সপ্তায় এক রাত্রিতে পরলোকবাদীদের যে সভায় সে গিয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বলসোভারের নাম লেখা ছিল।
বলসোভার ম্যালনকে বললেন, আমি আপনাকে বলেছিলাম এ ব্যাপারে কৌতুকজনক দিকটা আপনাদের ভাল লাগবে।
ম্যালন বলল, আমাদের লেখা বিবরণটা কি আপনি ভাল মনে করেন না?
বলসোভার বললেন, শুনুন মি. ম্যালন। আপনি আর আপনার সঙ্গে সেই তরুণীটা যথেষ্ট করেছেন। কিন্তু আসলে আপনারা বিষয়টার কিছুই জানেন না। সমস্ত ব্যাপারটাই আপনাদের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, পৃথিবী ছেড়ে যে সব বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা চলে গেছেন তারা যদি পুনরায় আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন তাহলে দুঃখজনক হবে।
ম্যালন বলল, কাজটা কিন্তু নীরস ও একঘেয়ে।
বলসোভার বললেন, বহু নির্বোধ ও বোকা লোকই পৃথিবী ছেড়ে পরলোকে যায়। তাদের তো আর পরিবর্তন হয় না। অনেকেই জানে না পরলোক থেকে আসতে কি ধরনের বাণীর প্রয়োজন। গতকাল আমাদের সভায় চার্চের এক পাদ্রি মিসেস ডেবস-এর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ভদ্রলোক তাঁর কন্যার মৃত্যুতে খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েছেন। মিসেস ডেবস পরলোকগত সেই মেয়েটির বাণী শুনতে পান। তার থেকে তিনি জানতে পারেন পাদ্রির মেয়েটি সুখেই আছে। তবে তার বাবার দুঃখ তার মনকে পীড়িত করে। কিন্তু পাদ্রি এ কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে বললেন, এসব কথায় আমার দরকার নেই। এ কথা যে কেউ বলতে পারে। ওটা আমার মেয়ে নয়।
মিসেস ডেবস বললেন, আপনার মেয়ে আরও বলেছে আপনি রঙিন শার্টের উপর রোমান কলার পরবেন না।
এই তুচ্ছ কথাটা শুনে পাদ্রি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, সে সবসময় আমাকে কলারের জন্য বকত।
পাদ্রির কথা শেষ করে বলসোভার বললেন, এ সব ঘরোয়া খুঁটিনাটি কথা ম্যালন।
ম্যালন ঘাড় নেড়ে বলল, শার্ট ও কলার সম্বন্ধে এই সব কথা যে কেউ বলতে পারে।
বলসোভার হাসতে হাসতে বললেন, এখন আমি যে জন্য এসেছি বলছি। আপনার মনটা খুব কড়া। এজন্য আমি অবশ্য আপনাকে দোষ দিচ্ছি না। আমি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। আপনি ব্যস্ত লোক এবং আমিও তাই। আমাদের মধ্যে যাদের কিছুটা বোধশক্তি আছে তারা সবাই রচনাটা পড়ে খুশি হয়েছে।
অ্যালপারনন মেইলী আমাকে লিখেছেন তিনি লেখাটা পড়ে খুশি হয়েছেন। তিনি খুশি হলেই আমরা খুশি।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ব্যারিস্টার মেইলীর কথা বলছেন?
বলসোভার বললেন, আমি বলছি ধর্মসংস্কারক মেইলীর কথা। এইভাবেই তিনি পরিচিত আমাদের কাছে।
আর কি বলার আছে।
আর বলার কথা একটাই আছে। সেটা হচ্ছে এই যে, যদি আপনি ও আপনার সঙ্গিনী এ বিষয়ে আরও কিছু জানতে চান এবং ব্যাপারে আরও অগ্রসর হতে চান তাহলে আমরা আপনাদের সাহায্য করতে পারি। আমরা প্রচার চাই না। আপনাদের ভালোর জন্যই আমরা সাহায্য করব আপনাদের। তবে আমরা একেবারে প্রচারবিমুখও নই। আমার নিজের বাড়িতে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার ব্যাপার আছে, তবে সেখানে কোনও পেশাদার মিডিয়াম নেই। আপনারা যদি চান…
বলসোভারের কথা শুনে ম্যালন বলল, এর থেকে আমার পছন্দসই ব্যাপার আর কিছু থাকতে পারে না।
বলসোভার বললেন, তাহলে আপনারা দু’জনেই চলে আসুন আমার বাড়িতে। বাইরের লোক বেশি থাকে না। মনস্তত্ত্ব নিয়ে যারা গবেষণা করে তাদের আমি চাই না। কেন তাদের সন্দেহভাজন হয়ে অপমানিত হব আমি? তারা ভাবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের কোনও বিচারবুদ্ধি বা অনুভূতি নেই। কিন্তু আপনারা তেমন নন। আপনাদের একটা কাণ্ডজ্ঞান আছে। আমরা এটাই চাই।
ম্যালন বলল, আমি কিন্তু এসব কথা বিশ্বাস করি না। এতে আপনাদের কাজে কিছু বাধা সৃষ্টি হচ্ছে না?
মোটেই না। কারণ আমরা সরল মনের মানুষ। মানুষের কোনও বিশ্বাস- অবিশ্বাসে বাধা দিতে চাই না। সব অবস্থাকেই আমরা সহজভাবে মেনে নিই। মানুষের আত্মা জীবিত দেহে থাকাকালে যেমন অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের পছন্দ করে না, তেমনি আত্মা দেহ ছেড়ে চলে গেলেও পরলোক থেকে এসে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের সহ্য করতে পারে না। আমরা যেমন ইহলোকের জীবিত মানুষদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করি তেমনি পরলোক থেকে আগত প্রেতাত্মাদের প্রতিও তেমনি ব্যবহার করা উচিত।
ম্যালন বলল, ভদ্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি আমি দিতে পারি।
বলসোভার বললেন, কিন্তু প্রেতাত্মাদের সঙ্গে অনেকেই খারাপ ব্যবহার করে। একজন মহাজন যাকে টাকা ধার দিয়েছিল সেই ঋণী ব্যক্তিকে তার ঋণ শোধ না করার জন্য আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে। সেই ঋণী ব্যক্তির প্রেতাত্মা মিডিয়ামে ধরা পড়ে। তখন সে তার ঋণদাতার গলাটা টিপে ধরে। তাতে তার জীবন বার হওয়ার উপক্রম হয়। যাই হোক, আমি যাচ্ছি মি. ম্যালন। আমরা প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রি আটটার সময় বসি। চার বছর ধরে একটানা এই সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। আপনি যাবার একদিন আগে জানিয়ে দেবেন, তাহলে মি. মেইলীকে আমি জানিয়ে রাখব, তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। তিনি আমার থেকে ভাল উত্তর দিতে পারেন। তাহলে পরের বৃহস্পতিবারই চলে আসুন।
এই বলে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন বলসোভার।
ম্যালন-এনিড দু’জনেই মনে করত আমাদের অর্থাৎ ইহলোকের মানুষদের জ্ঞানের সীমানাটাকে বাড়াতে হবে। সম্ভব-অসম্ভবের সীমারেখাটা অত সহজে টানা চলবে না। আমরা যা অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিই সেটাকেও জানার চেষ্টা করতে হবে। চিন্তাশীল প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের প্রখর বুদ্ধির উপর তাদের দু’জনেরই শ্রদ্ধা ছিল। তবে ম্যালন কোনও বিতর্কে জড়িয়ে গেল এটা বলতে বাধ্য হত যে কোনও বিষয়ে অভিজ্ঞতাহীন কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তির কথার থেকে সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা আছে এমন সাধারণ মানুষের কথার গুরুত্ব অনেক বেশি।
ডন পত্রিকার সম্পাদক মারভিনের সঙ্গে ম্যালনের পরিচয় ছিল। একদিন মারভিন কথা প্রসঙ্গে ম্যালনকে বললেন, শুনছি তুমি নাকি বলসোভারের বাড়িতে সাপ্তাহিক সভায় যাচ্ছ। ওখানে পরলোক থেকে প্রেতদের আনার অনুষ্ঠান হয়। বলসোভারেরা আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত। তবে আমাদের কাউকে ও বাড়িতে ঢুকতে দেয় না। খুব কম লোককেই ঢুকতে দেয়। সেজন্য তুমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতে পার। তোমার প্রতি ভদ্রলোকের যে একটা আসক্তি জন্মেছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ম্যালন বলল, উনি মনে করেন আমি ওদের সম্বন্ধে ভালই লিখেছি।
মারভিন বললেন, রচনাটা তেমন কিছুই হয়নি। একটা সাদামাটা নীরস রচনা যার মধ্যে অনেক কিছুরই অভাব আছে।
ম্যালন একটা সিগারেট ধরাল। মারভিন আবার বলতে লাগলেন, বলসোভারের বাড়ি ও অন্যান্য জায়গায় প্রেততত্ত্বের যে অনুষ্ঠান হয় তার সঙ্গে মনস্তত্ত্বের কোনও সম্পর্ক নেই। ওরা প্রেতাত্মা বলে যাদের দেখায় এবং মৃত ব্যক্তিদের বাণী বলে যা প্রচার করে তার কোনও ভিত্তি নেই। আসলে ওরা পরলোক থেকে কোন প্রেতকে সশরীরে আনতে পারে না। জনতার মধ্য থেকে এক-একটা মানুষকে বেছে নিয়ে তাদের প্রেত বলে চালায়। ওরা শুধু বলে, যারা এ বিষয়ে আরও জানতে চায় ওরা তাদের সাহায্য করবে।
ম্যালন বলল, হ্যাঁ, আমি আপনার কথা বুঝি। আমি এ বিষয়ে অজ্ঞেয়বাদী। ওরা প্রেত ও প্রেতদের বাণী বলে যা চালাতে চায় সেগুলোতে আমার বিশ্বাস হয় না।
মারভিন বললেন, সেন্ট পল ছিলেন একজন ভাল মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বহুক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্যে নিহিত গুহ্য কথাগুলোকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, যাতে অজ্ঞ লোকদেরও বুঝতে কোনও কষ্ট হয় না।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, আপনি তার কোনও কথা উদ্ধৃত করতে পারেন?
মারভিন বললেন, আমি নিউ টেস্টামেন্ট-এ কী আছে তা জানি; তবে অবশ্য তার সব কথা আক্ষরিকভাবে আমার জানা নেই। তার অনুচ্ছেদে আছে পরলোকবাদীদের মধ্যে যারা অনভিজ্ঞ তাদের কাছে বাক্চাতুর্যই বড় কথা। এই বাক্চাতুর্যের দ্বারাই তারা মানুষকে বশ করে। কিন্তু যারা ভবিষ্যৎ-বাণী করে তাদের সংখ্যা খুবই কম। আর এই ভবিষ্যৎবাণীই হলো প্রকৃতপক্ষে পরলোকের বাণী। এটা সবাই পারে না। অভিজ্ঞ পরলোকবাদীর কোনও ভূত-প্রেতের প্রয়োজন হয় না।
ম্যালন বলল, যে অনুচ্ছেদে একথা লেখা আছে আমি তা দেখে নেব।
মারভিন বললেন, তুমি এটা কোরিন থিয়ানের মধ্যে পাবে।
ম্যালন বলল, এ কথা সবাই স্বীকার করে নেয়। তাই নয় কি?
মারভিন বললেন, এটা একটা বাস্তব দৃষ্টান্ত। যাই হোক, আমি অন্য পথে চলে গিয়েছিলাম। তোমাকে যে আসল কথাটা বলতে চাই। তুমি বলসোভারদের ভূতপ্রেত নিয়ে সার্কাস খেলা দেখানোটাকে বেশি গুরুত্ব দিও না।
যতদূর দেখা গেছে ব্যাপারটার মধ্যে খারাপ কিছু নেই, কিন্তু ক্রমশই ব্যাপারটা একটা রোগে পরিণত হয়েছে। এ রোগ হচ্ছে প্রেতাত্মা খোঁজার রোগ। শিকারের রোগ। আমি এমন অনেক লোককে জানি—বিশেষ করে অনেক মহিলাকে—যারা পরলোক অনুষ্ঠানের চারদিকে ভিড় জমায়। বারবার তারা সেখানে যায় এবং একই জিনিস দেখে, কখনও আসল কখনও নকল।
ম্যালন বলল,আমি আপনার কথা বুঝেছি। আমি কিন্তু শক্ত জমির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছি।
মারভিন বললেন, শক্ত জমি মানে তোমার ভাগ্য ভালোই। তোমার লেখাটা প্রেসে চলে গেছে। আমি মুদ্রকের কাছে গিয়ে দশ হাজার ছাপার কথা বলব। ম্যালন বলল, আপনি কী-একটা সাবধান করার কথা বলছিলেন না? মারভিনের সরু মুখখানা সহসা গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ।
আমি তোমাকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলাম। যদি তোমার কোনও ধর্ম বিষয়ে গভীর বিশ্বাস থাকে তাহলে তোমার পরলোকতত্ত্বের বেশি গভীরে যাওয়া উচিত হবে না। পরে হয়তো তোমার সেই অন্তর্নিহিত ধর্মবিশ্বাসকে ছাড়তে হতে পারে এবং সেটা হবে খুবই বিপজ্জনক তোমার পক্ষে।
ম্যালন বলল, বিপজ্জনক বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?
মারভিন বললেন, ওরা সৎ সংশয় বা সৎ সমালোচনায় কিছু মনে করে না। তবে কেউ যদি ওদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে।
ওরা কে?
মারভিন বললেন, ওরা মানে ওই প্রতিষ্ঠান যারা চালায়। ওরা বড় প্রতিহিংসাপরায়ণ। ওদের কাছে ন্যায়বিচার বলে কোনও জিনিস নেই।
ম্যালন বলল, আপনি কি এ বিষয়ে নিশ্চিত?
মারভিন বললেন, যত সব বাজে ব্যাপার। এ যেন মধ্যযুগের কুসংস্কার—আচ্ছন্ন ধর্মচর্চা। তবে এটা আশ্চর্যের কথা যে তোমাদের মতো জ্ঞানবান লোক ওদের কথায় বিশ্বাস করে ওদের কাছে যাওয়া-আসা করে।
এরপর মারভিন যারা মিডিয়ামের কাজ করে আর যারা মিডিয়ামের সঙ্গে প্রেতদের নিয়ে খেলা করে, তাদের পরিণতি কী হয়েছিল, সেইসব লোকদের কথা পর পর বললেন, কিন্তু ম্যালন এ কথায় বিশেষ প্রভাবিত হলো বলে মনে হলো না।
ম্যারভিন আবার বললেন, আমার মূল কথা হলো এই যে—ওদের এসব পরলোক চর্চার ব্যাপারে ভাল করে খোঁজ-খবর নিয়ে যদি ওদের কেউ সমালোচনা করে তবে তার ফল বিপজ্জনক হবে। যেমন ধর, জোন্স একবার রাফেয়েলের কাজকে বাজে বলে সমালোচনা করেছিল, তার জন্য তাকে অ্যাঞ্জিনা পেকটোরিস রোগে ভুগে মরতে হয়।
ম্যালন বলল, কিন্তু এর উল্টো দিকটাও তো আছে। প্রফেসর মর্গেট একজন গোঁড়া বস্তুবাদী, পরলোকবাদীদের শত্রু বলা যেতে পারে। তিনি কোনও ভূত-প্ৰেত বা মিডিয়ামদের কাজকর্মকে বিশ্বাস করেন না। তবু তিনি জীবনে বেশ উন্নতি করেছেন এবং সুখেই আছেন।
মারভিন এর উত্তরে বললেন, তার কারণ এই যে প্রফেসর মর্গেট-এর সংশয় ও অবিশ্বাসটি সৎ। অর্থাৎ নিষ্ক্রিয়। তিনি ওদের বিষয়ে কাগজে লেখালেখি করে প্রত্যক্ষভাবে বিরোধিতা করেননি। তিনি ওদের শত্রু হলেও তাঁর শত্রুতাটা সক্রিয় নয়।
ম্যালন আরও বলল, তারপর দেখুন মরগ্যান মিডিয়ামদের কাজের অসারতা তুলে ধরে তাদের মুখোশ খুলে দেয়।
তাদের মিথ্যাচারের কথা বলে সে ভাল কাজই করেছে।
আরও দেখুন, ফ্যালকোনার ওদের বিষয়ে কড়া সমালোচনা করে অনেক কিছু লেখে।
ও! তুমি ফ্যালকোনারের কথা বলছ! কিন্তু তুমি তার ব্যক্তিজীবন সম্বন্ধে কিছু জান কি? আমি জানি। ফ্যালকোনার তার কাজের প্রতিফল ঠিকই পেয়েছিলেন। আর সে প্রতিফল ভাল হয়নি।
এবার মারভিন একটা ভয়ঙ্কর কাহিনির কথা উল্লেখ করল। কোনও এক ভদ্রলোক তার জ্ঞানবুদ্ধি ও প্রতিভার বেশির ভাগ পরলোকতত্ত্বের মুখোশটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেবার কাজে প্রয়োগ করত। কিন্তু তার জীবনে শেষ পরিণতি বড় ভয়ঙ্কর হয়। মারভিন এবার শেষবারের মতো বললেন, যতদূর সম্ভব আমি তোমাকে সাবধান করে দিলাম। এরপর তুমি যা ভাল বোঝা করবে। কোনও প্রয়োজনবোধ করলে “ডন” পত্রিকার অফিসে ফোন করবে।
ম্যালন বলল, আপনার কথাগুলোর মধ্যে একটা কুসংস্কারের পরিচয় পাওয়া যায়। যাই হোক আমি এ বিষয়ে বুঝে চলব।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ম্যালন এনিডকে আনার জন্য তাদের বাড়িতে গেল। এনিডকে নিয়ে সে বলসোভারের বাড়িতে প্রেতচর্চার আসরে যাবে।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তাদের নানা উপদেশ দিয়ে বিদায় দিলেন। তাঁর দাড়িটা সামনের দিকে খাড়া হয়ে ছিল, তাঁর চোখ দুটো বন্ধ ছিল। অথচ তাঁর ভ্রূ দুটো ওপরের দিকে তোলা ছিল। তার মেজাজটা যখন নরম থাকে এবং যখন কারও কোনও কাজে তার নীরব সমর্থন থাকে তখন তার মুখ-চোখের ভাবটা এরকম থাকে। তিনি এনিডকে বিদায় দেবার সময় বললেন, প্রেতচর্চার সময় যদি কোনও উল্লেখযোগ্য প্রেতকে দেখতে পাও তবে তোমার বাবার কথাকে যেন ভুলো না। আমার কাছে এক বিশেষ অণুবীক্ষণ যন্ত্র আছে যাতে রাসায়নিক দ্ৰব্য যুক্ত আছে। তাতে যে-কোনও ছায়ামূর্তি দেখা যাবে।
বলসোভার যে ঠিকানাটা দিয়েছিলেন তা আসলে হচ্ছে হ্যামারস্মিথের এক ঘিঞ্জি অঞ্চলের মধ্যে এক মুদির দোকান। অথচ তিনি বলেছিলেন সেটা এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং বাড়িয়ে বলা তার সুভাষণটা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। ম্যালন ও এনিড ট্যাক্সি থেকে নেমে দেখল সেই মুদির দোকানটা লোকে ভর্তি। তাই তারা বাইরে ফুটপাতের উপর ঘোরাফেরা করতে লাগল। এমন সময় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। সেই ট্যাক্সি থেকে অপরিচ্ছন্ন টুইডের পোশাক পরা লম্বা চওড়া একজন লোক এসে নামল, তার মুখে দাড়ি ছিল। লোকটি তার হাতঘড়িটা দেখে সেইখানে পায়চারি করতে করতে ম্যালনের কাছে এসে বলল, আমি কি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি? আপনি কি সেই সাংবাদিক যিনি আজকের এই অনুষ্ঠানে যোগদান করবেন?
ম্যালন সংক্ষেপে বলল, হ্যাঁ। আমি সেই সাংবাদিক।
লোকটি বলল, মি. বলসোভার এখন অতিশয় ব্যস্ত। সুতরাং আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে। ঈশ্বর তার মঙ্গল করুন। বলসোভারের কাজ দেখে মনে হয় তিনি যেন ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মি. অ্যালভার মেইলী?
মেইলী বলল, আমার পরিচয় অবশ্য বন্ধুদের একাংশের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
মেইলী আবার বলল, বিরোধীরা আমাদের সবাইকে এক মনে করে। আমাদের একই কলঙ্কের কালিমায় চিহ্নিত করে। জানি না আপনার ভাগ্যে কী ঘটবে।
এনিড মৃদু হেসে বলল, আমরা কিন্তু এখনও পর্যন্ত পরলোকবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠিনি।
মেইলী বলল, এ বিষয়ে বিশ্বাসী হতে সময় লাগবে। আমি যখন প্রথম এই ক্ষেত্রে আসি তখন আমারও ব্যাপারটা বুঝতে অনেক সময় লেগেছিল। তবে এতদিনে বুঝেছি এটা জগতের মধ্যে সবচেয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু আমি যখন এ বিষয়ে বক্তৃতা দিই তখন আমি দর্শকদের কাউকে আমার মতের আওতায় জোর করে আনতে চাই না। আমি শুধু তাদের সামনে সত্যটাকে তুলে ধরি। এরপর তারা যা ভাল বোঝে করে। আমি জানি বিশ্বাস আর জ্ঞান এক নয়। মানুষ পরের কথায় অনেক কিছু বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু নিজে ভাল করে জেনে বা বুঝে মানুষ যা বিশ্বাস করে সেই বিশ্বাসই স্থায়ী হয়। যদি তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি বলে কিছু থাকে তবে তারা সঠিক পথ বেছে নেবে।
এনিড বলল, আপনি যুক্তিসঙ্গত কথাই বলেছেন। মনে হলো নতুন পরিচিত এই লোকটির সরল ও খোলাখুলি কথায় সে কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিল।
বলসোভারদের ঘরের জানলায় কাচের ভিতর দিয়ে আসা পুরো আলোটা ওদের ওপরে এসে পড়ছিল। এনিড এবার নবাগত মেইলীর মুখখানা ভাল করে দেখতে পেল। দেখল তার দাড়িটা খড়ের মতো ধূসর রং-এর। তার চিবুকটা আক্রমণাত্মক বলে বেশ বোঝা যায়। সব মিলিয়ে মনে হয় যেন কঠোরতার ও কাঠিন্যের এক মূর্ত প্রতীক। এনিড ভেবেছিল লোকটা গোঁড়া কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, কিন্তু এখন দেখল লোকটা ঠিক তার উল্টো। এনিড জানত এই লোকটার নাম খবরের কাগজে প্রায়ই প্রকাশিত হয়। সবাই জানে পরলোকবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে মেইলী একজন প্রধান ও অনমনীয় যোদ্ধা।
এনিড এবার ম্যালনকে চুপি চুপি বলল, এই লোকটাকে যদি একটা ঘরের মধ্যে বাবার সাথে বন্দী করে রাখা যায় তাহলে কি হবে ভাবতে পারছ?
ম্যালন হেসে বলল, তোমার এই প্রশ্নটা একটা স্কুলবালকের প্রশ্নের মতোই অর্থহীন। যেমন মনে কর কেউ যদি প্রশ্ন করে যদি কোনও দুর্বার শক্তি এক অপরাজেয় বাধাকে আঘাত করে তাহলে কী হবে। তোমার প্রশ্নটা এইরকম।
মেইলী বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে বলল, আপনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কন্যা। বিজ্ঞান জগতে তিনি একটা নামকরা লোক। যথেষ্ট খ্যাতি আছে তাঁর। কিন্তু এই জগৎটা নিজেই নিজের কাছে সীমাবদ্ধ।
এনিড বলল, আমি আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।
মেইলী বলল, আসল বিজ্ঞানের মূলে আছে শুধু বস্তুবাদ। এই বস্তুবাদ আমাদের অনেক আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য দান করেছে। এর অভাবে আমাদের জীবনযাত্রা এত সহজ ও একইসাথে ভয়ঙ্কর হত না। আজকের মানুষ এটাকেই বলছে প্রগতি। কিন্তু আসলে আমরা দুর্বার বেগে পিছনের দিকে চলেছি। অথচ আমরা এই মিথ্যা ধারণায় আছি যে আমরা এগিয়ে চলেছি।
ম্যালন বলল, হতে পারে মি. মেইলী, কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হতে পারলাম না।
মেইলীর কথাটা গোঁড়ামিতে ভরা বলে মনে মনে চঞ্চল হয়ে উঠল ম্যালন। সে আবার বলল, একবার ভেবে দেখুন বেতার তরঙ্গের কথা অথবা সমুদ্রে ব্যবহৃত এস.ও.এস. কল। বিজ্ঞানের এই অবদানগুলোতে কি মানবজাতির উপকার হয়নি!
মেইলী বলল, এগুলোতে মানুষের উপকার হয় ঠিকই। আমি পড়ার জন্য যে বৈদ্যুতিক ল্যাম্প ব্যবহার করি তার মূল্য আমি বুঝি। এগুলো বিজ্ঞানেরই দান, আমি তো আগেই বলেছি। বিজ্ঞানের এই সব দান আরাম স্বাচ্ছন্দ্য ও সাময়িক নিরাপত্তা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে কেন আপনি তার অবমূল্যায়ন করছেন?
মেইলী বলল, করছি তার কারণ—এই বিজ্ঞান একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকে আড়াল করে রেখেছে। সেই বিষয়টি হলো জীবনের উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানের অবদানগুলো কেবল আমাদের জীবনের প্রান্তভাগগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে জীবনের বাইরের দিকটাকে নানাভাবে সাজিয়েছে। কিন্তু জীবনের কেন্দ্রস্থলে আমাদের প্রবেশ করতে দেয়নি। জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে আমাদের।
ম্যালন বলল, কথাটা বুঝলাম না।
মেইলী বলল, গতিটাই আসল কথা নয়। কত তাড়াতাড়ি আমরা কোথাও যেতে পারলাম সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো সেই যাওয়ার উদ্দেশ্যটা কি কত তাড়াতাড়ি এবং কত সহজে একটা বাণী বা বার্তা পাঠালাম সেটা বড় কথা নয়। দেখতে হবে সেই বাণী বা বার্তার মূল্যটা কি? এই ভাবে জীবনের প্রতিস্তরে তথাকথিত প্রগতি একটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এটা আসল প্রগতি নয়। অথচ আমরা মনে করি যে ঈশ্বর যে কাজের জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সেই কাজই করে চলেছি আমরা।
আর সেই কাজটা?
সে কাজ হলো, জীবনের পরের স্তরের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে তোলা। সে প্রস্তুতি হলো মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি। আমরা কিন্তু এই দুটি প্রস্তুতিকেই অবহেলা করে চলেছি। বৃদ্ধ বয়সে আমাদের আরও সুন্দর মানুষ হয়ে উঠতে হবে। আরও নিঃস্বার্থপর, সহিষ্ণু ও উদার মনের পরিচয় দিতে হবে। আমাদের এটাই হওয়া দরকার। এই মানবভাগ্য হচ্ছে আত্মার কারখানা। কিন্তু এই কারখানা থেকে কেবল যত সব বাজে জিনিস তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসছে।
এই কথা বলেই জোরে হেসে উঠল মেইলী। আস্তে আস্তে বলল, কি আশ্চর্য আমি রাস্তায় দাঁড়িয়েই বক্তৃতা দিতে শুরু করেছি। যাক তোমাকে উদ্ধার করবার জন্য মি. বলসোভার এসে গেছেন।
মি. বলসোভার জানলা দিয়ে হঠাৎ ওদের দেখতে পেয়ে সাদা অ্যাপ্রন পরা অবস্থায় ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে ওদের সান্ধ্য নমস্কার জানিয়ে বললেন, আপনাদের এই ঠাণ্ডায় এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত। তাছাড়া এখন সময় হয়ে গেছে। সময়ানুবর্তিতাই আমার জীবনের এক প্রধান নীতি। এখন চলুন। আমার ছেলেরা দোকান বন্ধ করবে।
তারা দোকানের ভিতর দিয়ে, নানা জিনিসপত্রের মাঝখান দিয়ে পথ করে দোকানের সন্নিহিত বাড়ির মধ্যে ঢুকল। মি. বলসোভার আগে আগে গিয়ে বাড়ির দরজা খুলতেই একটা সিঁড়ি পাওয়া গেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওরা দোতলায় একটা ঘরের সামনে দাঁড়াল। মি. বলসোভার দরজাটা খুলতেই ওরা ঘরে ঢুকে দেখল একটা বড় টেবিলে চারদিকে বেশ কিছু লোক বসে আছে। মিসেস বলসোভার তাঁর তিন মেয়েকে নিয়ে সেই ঘরেই ছিলেন। মিসেস বলসোভারের চেহারাটা বেশ লম্বা-চওড়া। মুখখানা হাসি-খুশিতে ভরা। মেয়েরাও বড় হয়েছে। তাদের মুখগুলো তাদের মায়ের মতো হাসি-খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মিসেস বলসোভারের কাছে একজন বয়স্কা মহিলাকে দেখা গেল। তাকে দেখে এই পরিবারের আত্মীয়া বলে মনে হলো। এছাড়া আরও দু’জন মহিলা প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে ছিল। একজন বেঁটেখাটো চেহারার মাথায় পাকা চুলওয়ালা ভদ্রলোক ঘরের এককোণে একটা হারমোনিয়ামের সামনে বসে ছিল। তার চোখদুটো মিটমিট করছিল।
মি. বলসোভার অতিথিদের সঙ্গে সেই ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ইনি হচ্ছেন মি. স্মাইলে, আমাদের সঙ্গীতজ্ঞ। ইনি না থাকলে আমাদের যে কী হতো তা বলা যায় না।
এরপর মি. বলসোভার ম্যলিন ও এনিডকে দেখিয়ে বললেন, এরা দু’জন সাংবাদিক বন্ধু। আমাদের কাজকর্ম বিষয়ে জানতে এসেছেন।
মি. বলসোভারের পরিবারের লোকেরা সমর্থনের হাসি হেসে নীরবে ওদের অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু একজন বয়স্কা মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে কড়াভাবে গম্ভীরমুখে ওদের দিকে তাকাল। তারপর বলল, হে বহিরাগত অতিথিদ্বয়, আপনাদের স্বাগত জানাই। তবে একটা কথা বলে দিচ্ছি এবং সেটা হলো এই যে আমরা বাইরের লোকদের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি অবশ্যই চাই। পরলোক থেকে যে সব আত্মারা দয়া করে এখানে আসেন আমরা তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। আমরা চাই না তারা কারও দ্বারা অপমানিত হোক।
ম্যালন সেই মহিলাকে আশ্বাস দিয়ে বলল, সেই বিষয়ে আপনারা চিন্তা করবেন না। এক বিশেষ আগ্রহ ও সরল মন নিয়ে আমরা এখানে এসেছি।
সেই পরলোকবাদী মহিলা বলসোভারদের প্রতিবেশিনী এবং সহযোগী। তিনি বললেন, কিন্তু আমরা এর আগে যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছি। আমরা সেই মেডোর ঘটনাটা আজও ভুলিনি।
মি. বলসোভার অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, না না মিসেস মেলডন সেরকম ঘটনা আর ঘটবে না। সে ঘটনায় আমরা বিশেষ বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম। এরপর ঘরের সব আলো নিভে গেলে মি. বলসোভার তাঁর হাতের আঙুল দিয়ে ঘরের মধ্যে উপবিষ্ট লোকদের গায়ে একটা করে এমনভাবে খোঁচা দিতে লাগলেন যে তারা যেন ভাবতে পারে অন্ধকারে কোনও প্রেতাত্মা এসে তাদের গাগুলোকে স্পর্শ করে তার আবির্ভাবের কথাগুলো জানিয়ে দিচ্ছে।
ম্যালন বুঝতে পারল মি. বলসোভার নিজেই প্রতারণার এক মূর্ত প্রতীক। তারপর সে মি. বলসোভারকে লক্ষ্য করে বলল, আমরা বাধ্য হয়ে বলছি আমরা এই ধরনের আচরণ সহ্য করতে অসমর্থ।
সেই বয়স্কা মহিলা বসে পড়লেন। কিন্তু তিনি আগের মতোই ম্যালনদের দিকে সন্দেহের সঙ্গে তাকাতে লাগলেন।
মি. বলসোভার বললেন, মি. মেইলী আপনি এখানে বসুন। মি. ম্যালন আপনি কি আমার স্ত্রী ও একজন মেয়ের মাঝখানে বসবেন? আপনার সঙ্গের যুবতীটি ওখানেই বসতে চান।
এনিড কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছিল। সে বলল, আমি মি. ম্যালনের কাছে বসতে চাই।
এই কথায় বলসোভার মুচকি হেসে তাঁর স্ত্রীর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, তারপর বললেন, তা তো বটেই, খুবই স্বাভাবিক। ঠিক আছে।
অতিথিরা সকলে যথাস্থানে বসলে মি. বলসোভার বৈদ্যুতিক আলোর সুইচ টিপে নিভেয়ে দিলেন। ঘরখানা অন্ধকার হয়ে উঠলেও বড় টেবিলটার মাঝখানে একটা বাতি জ্বলছিল। টেবিলের আলোটা বলসোভারের পরিবারের লোকজন ছাড়া আরও কয়েকজনের মুখের উপর পড়ছিল—যেমন মিসেস মেলডনের তীক্ষ্ণচোখ ও কঠোর মুখখানার উপর, মেইলীর কৌতূহলী চোখ ও হলুদ দাড়ির উপর, আর দু’জন পরলোকতত্ত্ববাদী ম্লান মহিলার উপর। ম্যালনের মনে হলো অন্ধকার ঘেরা এই স্বল্প আলোর বৃত্তের মধ্যে একটা জগৎ গড়ে উঠেছে। যে জগৎ বাইরের বাস্তব জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যে জগতের মধ্যে এই কয়েকটি মানুষের সমস্ত মনপ্রাণ কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠেছে একান্তভাবে। অথবা বাইরের বিশাল জগৎটা সংকীর্ণ হয়ে এই আলোক-বৃত্তের সীমানার মধ্যে বদ্ধ হয়ে আছে।
বড় টেবিলটার উপরে একটা পিতলের পেটা ঘড়ি, একটা তাম্বুরা আর একটা গান বাজানোর বক্স এবং আরও কতগুলো ছোটখাটো জিনিস ছড়ানো ছিল।
মি. বলসোভার বললেন, উই ওয়ান নামে এক বালিকা এ ব্যাপারে আমাদের পথপ্রদর্শক। সেই সবকিছু পরিচালনা করে। উই ওয়ান যদি কোনও জিনিস তার দরকার মতো না পায় তাহলে তা আমাদের জানিয়ে দেয়।
মিসেস বলসোভার বললেন, মেয়েটির এক নিজস্ব মেজাজ ও মানস প্ৰকৃতি আছে। যেমন আমাদের সকলেরই আছে।
সেই গম্ভীর ও কঠোর মুখওয়ালা মহিলাটি বলল, কেন থাকবে না? আমি মনে করি সে কষ্ট করে আসবে এবং গবেষকদের মুখোমুখি হতে চাইবে।
মি. বলসোভার বললেন, আমাদের ছোট্ট মেয়ে গাইড উই ওয়ান-এর কথা এখনি শুনতে পাবেন।
এনিড বলল, আশা করি সে আসবে।
মি. বলসোভার আরও বললেন, এতদিন পর্যন্ত কখনও সে আমাদের কাছে অনুপস্থিত হয়নি। একদিন শুধু মেডো নামে লোকটা পিতলের পেটা ঘড়িটা বৃত্তের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সে রেগে গিয়ে আসেনি।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, মিডিয়াম কে?
মি. বলসোভার বললেন, আমরা সেটা আগে থেকে জানতে পারি না। আমরা শুধু সহায়তা করি। আমাদের মধ্যে যে কেউ হতে পারে।
মিসেস বলসোভার বললেন, আমাদের পরিবারটি হলো এক সমবায় ভাণ্ডার।
এই কথায় সবাই হেসে উঠল।
ম্যালন আবার বলল, কিন্তু একজনকে তো মিডিয়াম হতেই হবে।
মেইলী গম্ভীর ও প্রভুত্বসুলভ গলায় বলল, সাধারণত তাই হয় কিন্তু সেটা আবশ্যিক নয়। ক্রফোর্ড এটা গ্যাল্লাঘড় প্রেতানুষ্ঠানে দর্শকদের চেয়ার সমেত ওজন করিয়ে দেখিয়েছেন প্রত্যেকের দেহের ওজন দুই থেকে আড়াই পাউন্ড পর্যন্ত কমে গেছে। মিডিয়াম ক্যাথিলিনের ওজন আবার দশ পাউন্ড কমে যায়। আপনাদের অধিবেশন পর পর হয়েই যাচ্ছে, আর কতদিন হবে মি. বলসোভার?
চার বছর একটানা। দীর্ঘ একটানা এই অধিবেশনের ফলে অনেকেরই উন্নতি হয়েছে। প্রত্যেকেই কিছু কিছু দান করেছেন। কোনও একজনের উপর মোটা অঙ্কের টাকা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, কি ধরনের উন্নতি হয়েছে?
প্রেতদের আহ্বান করার ক্ষমতা লাভ, চুম্বকের মতো এক জৈব আকর্ষণ শক্তি। প্রায়ই খ্রীস্ট বলতেন, আমার থেকে অনেক শক্তি চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ খ্রীস্ট হতে নির্গত সেই শক্তি কিছু কিছু লাভ করে। গ্রীক ভাষায় এটাকে বলা হয় ডুনামিশ। অর্থাৎ দৈব শক্তি। এটাই হলো উন্নতি। মি. বলসোভার বললেন, ঠিক তাই। কিন্তু মি. ম্যালন, আমরা কাজ শুরুর আগে আপনাকে দুটো জিনিস লক্ষ্য করতে বলব। আপনি টেবিলের উপর রাখা ওই পিতলের পেটা ঘড়িটা ও তাম্বুরার উপর একটা করে সাদা দাগ দেখতে পাচ্ছেন। ওটাই হলো ওদের আসার মাধ্যম। ওই সাদা দাগ দুটো সব সময় উজ্জ্বল থাকে। এই টেবিলটা আমাদের খাবারের টেবিল। এটা ব্রিটেনের ওক গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। আপনি এটা হাত দিয়ে দেখতে পারেন। এবার মি. স্মাইলি আলো নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনি “দি রক অফ এজেস্” গানটা বাজান।
ঘর অন্ধকার হয়ে গেলে মি. স্মাইলি হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে গান বাজাতে শুরু করলেন। বৃত্তাকারে যারা বসেছিল তারা সকলে সুর মিলিয়ে গাইতে শুরু করল। সমবেত সুরেলা কণ্ঠের গাওয়া গানের ছন্দ ও সুর সব মিলিয়ে এক ভাবময় পরিবেশ গড়ে তুলল ঘরের মধ্যে। গানে অংশগ্রহণকারী সকলেই টেবিলের কোণার উপর হাতগুলো রেখেছিল। সকলকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল কেউ যেন তাদের পাগুলো আড়াআড়িভাবে না রাখে। এমন সময় ম্যালন তার হাত দিয়ে এনিডের হাতটাকে স্পর্শ করে দেখল তার স্নায়ুগুলো যেন উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে, মনে হলো সে যেন ভয় পেয়ে গেছে। অবশ্য এই সময় মি. বলসোভার রসিকতার সুরে সাদাসিধেভাবে কী বলতে পরিবেশ কিছুটা হাল্কা হয়ে উঠল।
বলসোভার বললেন, আজকের রাতটা ভালোই মনে হচ্ছে, শুধু বাতাসে কিছু তুষার আছে। এখন আপনারা আমার সঙ্গে প্রার্থনায় যোগ দিন।
প্রার্থনা শুরু হলো, সকলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনায় যোগ দিল। সমবেত কণ্ঠস্বরে বলা হলো, হে আমাদের সকলের পরম পিতা, তুমি আমাদের চিন্তার অতীত হয়েও আমাদের জীবনকে পরিব্যাপ্ত করে আছ। আজ রাত্রিতে সমস্ত অশুভ শক্তির হাত থেকে আমাদের মুক্ত রাখ। আমাদের আরেকটি প্রার্থনা—আমরা যেন এই রাত্রিতে পরলোকের বাসিন্দা সেই সব আত্মাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারি যারা আমাদের থেকে অনেক দূরে ঊর্ধ্বলোকে বাস করে। যে-লোকে আমাদের একদিন যেতে হবে সেই অজানা জগতের সংবাদ তাদের মাধ্যমে পাওয়ার জন্যই আমরা প্রতীক্ষায় স্তব্ধ হয়ে আছি। তুমি শুধু আমাদের পিতা নও, সেই সব পরলোকবাসী আত্মাদেরও পিতা। সুতরাং তারা আমার ভাই।
প্রার্থনা শেষ হয়ে গেলে সকলে আবার আপন আপন আসনে বসে পড়ল। এক গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল অন্ধকার ঘরখানায়। মাঝে মাঝে বাইরের রাস্তা থেকে যানবাহন চলাচলের একটা চাপা গর্জন আসছিল।
ম্যালন ও এনিড নিস্তব্ধ ঘরখানার পানে একবার তাকাতে তাদের প্রতিটি স্নায়ু সচকিত হয়ে উঠল।
এমন সময় মি. বলসোভার বলে উঠলেন, কিছুই কাজ করছে না। মি. স্মাইলি আপনি হারমোনিয়ামে অন্য একটা সুর বাজান। সুরে কম্পন চাই, সকলে সেই সুরের সঙ্গে সুর মেলান।
এইভাবে কিছুক্ষণ চলতে সহসা এক নারী বলে উঠল—বাজনা থামাও, ওরা এসে গেছে। সকলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু কোনও ফল হলো না। তারপর সে বলে উঠল উই ওয়ান-এর কণ্ঠস্বর শুনেছি। সে এসে গেছে। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।
আবার সব নীরব হয়ে গেল। তারপর সে এল। উই ওয়ান নামে সেই বালিকা পরিচালিকা এসে গেল। এটা উপস্থিত সকলের পক্ষে বিস্ময়কর। সে সকলকে ক্ষীণ অথচ জোর উচ্চ কণ্ঠস্বরে সান্ধ্য নমস্কার জানাল।
তখন উপস্থিত সকলে একসঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ে সমস্বরে তাকে প্রতি- নমস্কার জানাল। ঘরে যেন উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনার ঝড় বয়ে গেল। সকলে বলতে লাগল, স্বাগত উই ওয়ান, আমরা জানতাম তুমি আসবে। আমাদের অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে।
সকলের নমস্কার নিয়ে উই ওয়ান বলল, আমার বাবা-মাকে দেখে সত্যিই আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু দাড়িওলা লম্বা-চওড়া ওই লোকটি কে? ও মি. মেইলী তোমাকে আগেই দেখেছি। দেখে খুশি হলাম।
এনিড ও ম্যালন চরম বিস্ময়ের সঙ্গে সবকিছু দেখতে লাগল। কিন্তু সকলেই যখন ব্যাপারটাকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নিল, এতে তাদের বিব্রতবোধ করার কিছু নেই—ওরা বুঝতে পারল, একটি ছোট মেয়ে কথা বলছে এবং সে টেবিলের মাঝখান থেকেই কথা বলছে। কিন্তু কি আশ্চর্যের কথা ঘরের মধ্যে যারা ছিল, তাদের কারও সঙ্গে তো ছোট মেয়ে ছিল না। তবে এই ছোট মেয়েটি কোথা থেকে এল?
মেয়েটি নিজেই উত্তর করল, আমি তো অতি সহজেই এখানে এসেছি। আমার বাবার গায়ে বেশ জোর আছে। বাবা তার মেয়ে উই ওয়ানকে এই টেবিলের উপর তুলে দিয়েছে।
আমি দেখলাম বাবা একটা কাজ পারেনি।
মি. বলসোভার চিৎকার করে বলে উঠলেন, উপরে ওঠ।
বাতির যে আলোটা টেবিল ও তার চারদিকে একটা উজ্জ্বল বৃত্ত রচনা করেছিল, সেই উজ্জ্বল বৃত্তটা আস্তে উপরে উঠে গেল এবং ওদের মাথার উপরে দুলতে লাগল।
বলসোভার চিৎকার করে বললেন, আরও উপরে উঠে শিলিংটাকে ছোঁও।
সেই আলোর বৃত্তটা শিলিংটাকে ছুঁতেই উপর থেকে এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সেই কণ্ঠস্বর বলল, এটা উই ওয়ানের উপহার।
হঠাৎ একটা কিছু এনিডের কোলের উপর পড়ল। সে সেটা হাত দিয়ে দেখল একটা ফুল, ক্রিসেনথিমাম ফুল। উই ওয়ানকে ধন্যবাদ।
মেইলী জিজ্ঞাসা করল, এটা কি বাইরে থেকে এল?
বলসোভার বললেন—না, না। এই ফুলটা ছিল হারমোনিয়ামের উপরে রাখা ফুলদানিতে। মিস চ্যালেঞ্জার আপনি উই ওয়ানকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন এ বিষয়ে। সুরের কম্পন চালিয়ে যাও।
এনিড উপরে কম্পমান আলোকবৃত্তটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে উই ওয়ান?
আমি আট বছরের এক কৃষ্ণাঙ্গ বালিকা।
মা আদরের ভঙ্গিতে বলল, ও আমার প্রিয় বাছাধন, এসো এসো। তুমি যখন প্রথম এসেছিলে খন তোমার বয়স আট ছিল এবং সেটা কয়েক বছর আগের কথা।
কয়েক বছর আগের ব্যাপারটা তোমাদের কাছে, উই ওয়ানের কাছে নয়। উই ওয়ান আট বছরের মেয়ে হিসাবে কাজ করতে এসেছে। তার কাজ শেষ হয়ে গেলে সে একদিনেই বড় হয়ে উঠবে। সব কালই আমার কাছে সমান। আমি চিরকালই আট বছরের। তোমাদের মতো এখানে কালের কোনও ভেদ নেই।
মেইলী বলল, সাধারণত পরলোকের বাসিন্দারা আমাদের মতোই ছোট থেকে বড় হয়। কারও বিশেষ কোনও কাজ থাকলে সেই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওদের বয়স বাড়ে না। ওদের বয়সবৃদ্ধির ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রিত।
উপর থেকে সেই কণ্ঠস্বর বলল, আসলে ব্যাপারটা তাই। উনি ঠিকই বলেছেন। সবাই হেসে উঠল
এনিড ম্যালনের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, এই সংস্থার কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে বেশ একটা আনন্দময় পরিবেশ গড়ে উঠছে।
অতিথিবৃন্দের মধ্যে থেকে কে একজন বলল, এডওয়ার্ড আমার গায়ে মাঝে মাঝে চিমটি কাটবে, যাতে আমি বুঝতে পারব আমি স্বপ্ন দেখছি না।
আমাকেও আমার গায়ে চিমটি কেটে দেখতে হবে।
বলসোভার উই ওয়ানকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার গান গাওয়ার কি হলো?
উই ওয়ান বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ। ঠিকই বলছ। উই ওয়ান তোমাদের গান শোনাচ্ছে।
উই ওয়ান সরলভাবে তার গান শুরু করল। কিন্তু সেই গানের সুরটা অল্পক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। যখন পেটা ঘড়িটাতে এটা শব্দ হলো।
মেইলী বলল, আমার মনে হয় আর একটা প্রার্থনার গান হলে আমাদের এই ঝিমিয়ে পড়া পরিবেশটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে। স্মাইলে, “জ্বালো, দয়ার আলো জ্বালো” গানটা বাজাও।
এবার ওরা সমবেত কণ্ঠে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে লাগল। গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। তবে বিস্ময়টা শুধু নবাগতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল, যারা নিয়মিত এখানে আসেন তাঁদের কাছে এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।
গানটা যখন চলছিল তখন উপর থেকে একজন নারী ও পুরুষ ওদের সুরে সুর মিলিয়ে গানটা গেয়ে যেতে লাগল।
আলোকবৃত্তটা তখন টেবিলের উপরেই সীমাবদ্ধ ছিল। গানটা শেষ হয়ে গেলে ঘরখানা আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। সবাই নীরবে বসে কিসের যেন প্রতীক্ষা করতে লাগল।
সহসা সেই ঘরখানার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে এক পুরুষ কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো।
সেই কণ্ঠস্বর থেকে বোঝা গেল এই কণ্ঠস্বর যার তিনি একজন শিক্ষিত ইংরেজ এবং তার কথা বলার ভঙ্গিমাটা এমনই যে বলসোভার সেই ভঙ্গিমা
কোনওদিন আয়ত্ত করতে পারবে না।
সেই অদৃশ্য পুরুষ সকলকে সান্ধ্য নমস্কার জানাল। সকলে প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলল, সান্ধ্য নমস্কার লিউক।
বলসোভার বললেন, ইনি হচ্ছেন আমাদের শিক্ষা দেবার গাইড। ইনি হচ্ছেন পরলোকের ষষ্ঠ মণ্ডল থেকে অবতীর্ণ এক আত্মা। উপর থেকে সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল, আমি তোমাদের থেকে অনেক উপরে আছি বলে মনে হচ্ছে। কী করব, আমাকে যেমন উপদেশ দেওয়া হয়েছে আমি তেমনি করছি। এতে আমার জ্ঞানের কিছু নেই। আমার প্রশংসা করার কিছু নেই।
সেই অদৃশ্য পুরুষের আত্মা এবার এনিডকে অভিবাদন করে বলল, হে যুবতী—আমার মনে হচ্ছে আপনি কিছু জানতে চান। আপনি আপনার শক্তি বা নিয়তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আপনি তা অবশ্যই জানতে পারবেন। এরপর সেই আত্মা ম্যালনকে অভিবাদন করে বলল, আপনি এক বিরাট জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বারপ্রান্তে এসে পড়েছেন। আপনি কি কোনও বিষয়ে কিছু জানতে চান? তাহলে আমি কিছু বলতে পারি।
ম্যালন সত্যি সত্যি একটা কাগজে ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণগুলি শর্টহ্যান্ডে লিখছিল।
প্রেতাত্মা এবার জিজ্ঞাসা করল, আমি কী বিষয়ে বলব?
মিসেস বলসোভার তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, প্রেম ও বিবাহ সম্পর্কে।
প্রেতাত্মা বলল, ঠিক আছে আমিও এ বিষয়ে দু’-চার কথা বলব। কারণ আরও অনেক প্রেতাত্মা কিছু না কিছু বলার জন্য অপেক্ষা করছে। বহু প্রেতাত্মায় এই ঘর ভরে গেছে। তাই আমি বেশি সময় নেব না। আমি চাই আপনারা এটা বুঝে দেখবেন যে এই পৃথিবীতে প্রতিটি পুরুষের জন্য একটি নারী এবং প্রতিটি নারীর জন্য একটি পুরুষ নির্দিষ্ট আছে। এই একজন নারীর সঙ্গে একজন পুরুষ মিলিত হয় অথবা একজন নারী একজন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। তখন তারা দু’জনে এক হয়ে তাদের সারা জীবনের অস্তিত্ব জুড়ে চলতে থাকে। অন্তহীনভাবে চলতে থাকে। অবশেষে তারা জানতে পারে তাদের এই সব মিলনের কোনও অর্থ নেই। তারা আরও বুঝতে পারে তাদের এই মিলন কেবল ইহলোকেই সীমাবদ্ধ নয়। এ মিলন পরলোকেও প্রসারিত হয়। মৃত্যুর পর পরলোকে গিয়ে তারা আবার মিলিত হবে পরস্পরের সঙ্গে এবং এই মর্ত্যলোকের মতো পরলোকেও তারা মিলনসুখ উপভোগ করবে। প্রতিটি নারী ও পুরুষ কার সঙ্গে তাদের মনের মিল হবে তা খুঁজে বেড়ায়। পৃথিবীতে যে সব বিয়ে হয় সেই সব বিয়ের প্রতি পাঁচটির একটি বিয়ে স্থায়ী ও সফল হয়। বাকি সব বিয়ে ঘটনাক্রমে ঘটে যায়। সেগুলো স্থায়ী হয় না। প্রকৃত বিয়ের অর্থ হলো আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন। যৌন ক্রিয়াকর্মগুলি হচ্ছে আত্মিক মিলনের বহিরঙ্গের প্রতীক মাত্র। যেখানে নরনারীর যৌনসংসর্গ তাদের আত্মিক মিলনকে আরও ঘনীভূত করতে পারে না অর্থাৎ যৌন মিলন আত্মিক মিলন থেকে সম্পর্কহীন, সেখানে যৌনসংসর্গের কোনও অর্থ হয় না। আমি ঠিক বলেছি?
মেইলী সমর্থনের সুরে বলল, আপনি খুব পরিষ্কার করেই বলেছেন।
সেই প্রেতাত্মা আরও বলল, এখানে যেসব নারী-পুরুষ আছেন তাদের কারও সাথী আছে কারও নেই। যাদের সাথী নেই তারা আরও ভাল। তারা ভবিষ্যতে একদিন না একদিন তাদের জীবনসঙ্গীকে পাবে। তবে এটা ভাববেন না যে মৃত্যুর পর আপনার পরলোকে গিয়ে ইহলোকের জীবনসঙ্গীকে পাবেন। পরলোকে গিয়ে আপনাদের আত্মা আরও ভাল সাথী পেতে পারেন।
হঠাৎ এক কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! ঈশ্বরের প্রশস্তি গান কর।
না, না, মিসেস মেলডার। এটা হচ্ছে প্রেম, প্রকৃত প্রেম যা আমাদের এখানে এক বন্ধনে আবদ্ধ করে। কিন্তু সে বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। আপনার প্রেমিক ও স্বামী এখন নিজের পথে চলছেন। আপনিও আপনার পথে চলুন। আপনারা এখন ভিন্ন স্তরে বাস করেন। আপনি অবশ্যই একদিন পরলোকে এক নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবেন এবং আপনি আপনার যৌবন ফিরে পাবেন। যৌবনে আপনার যে যৌন্দর্য ছিল তা আপনি আবার ফিরে পাবেন।
মেইলী বলল, আপনি প্রেম বলতে যৌন সংসর্গগত প্রেমের কথা বলতে চাইছেন?
মি. বলসোভার জিজ্ঞাসা করলেন, আসলে আপনি কী বলতে চাইছেন?
সেই পুরুষ প্রেতাত্মার কণ্ঠস্বর উত্তর করল, পরলোকে কোনও সন্তানের জন্ম হয় না। সন্তানের জন্ম হয় শুধু মর্ত্যলোকে। আমি যে প্রেমের কথা বলছি তাতে বিবাহ ও সন্তানজন্মের কোনও কথা নেই। পরলোকে নরনারীর আত্মার মধ্যে যে প্রেম সঞ্জাত হয় সে প্রেম আরও পবিত্র, আরও গভীর, আরও বিস্ময়কর। এ প্রেম হলো দুটো বিদেহী আত্মার মিলন। এখানে যে প্রেম সঞ্চার হয় তা একান্তভাবে দেহগত কিন্তু পরলোকের আত্মিক মিলনের মধ্যে কোনও দেহগত ব্যাপার নেই। তবে অবশ্য পরলোকের আত্মিক মিলন পরে মর্ত্যলোকে দেহধারণ করে বাস্তব রূপ ধারণ করে।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, কোনও নারী যদি দু’জন পুরুষকে সমানভাবে ভালবাসে তাহলে কি হবে।
সেটা খুব কমই হয়। তবে সত্যি যদি তা হয় তাহলে সে নারী দেখবে দু’জন পুরুষের মধ্যে কার সঙ্গে মনের মিলন বেশি। কে তার বেশি অন্তরঙ্গ।
এরপর কণ্ঠস্বর থেমে গেল। মনে হলো সেই পুরুষ প্রেতাত্মা ঘর থেকে চলে গেল। সেই আলোকবৃত্তটা মিলিয়ে গেল। অন্ধকার ঘরখানায় সব চুপচাপ।
বলসোভার বলে উঠলেন, দেবদূতরা সব ঘরের ভিতর ঘোরাফেরা করছে। স্মাইলি আপনি হারমোনিয়ামে সুর দিন। কিছুক্ষণ গান হলো। তারপরই এক ভয়ঙ্কর বিষাদ-করুণ কণ্ঠস্বরে কে এক সকরুণ প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে লাগল।
এনিড আশ্চর্য হয়ে গেল। এমন ভীষণ ও করুণ কণ্ঠস্বর সে কখনও শোনেনি। সেই গানের পর সবাই চুপচাপ হয়ে গেল। এক বিষাদময় নীরবতা বিরাজ করতে লাগল সমস্ত করখানায়।
ম্যালন বলে উঠল, এ কি হলো?
ঘরের উপস্থিত সকলেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল।
বলসোভার বললেন, আমার মনে হয়, এ হচ্ছে নিম্নস্তরের কোনও প্রেতাত্মা। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসীরা বলেন এদের পরিহার করে চলা উচিত আমাদের। আমি বলি এদের এড়িয়ে না গিয়ে এদের কথা শুনে এদের সাহায্য করা উচিত।
মেইলী আন্তরিকভাবে সমর্থন জানিয়ে বলল, ঠিক বলেছ বলসোভার, এবার ওর দিকে নজর দাও। তাড়াতাড়ি ওর দিকে নজর দাও। ও কি বলে তা শোন।
বলসোভার নবাগত প্রেতাত্মার উদ্দেশে বললেন, তোমার জন্য আমরা কি—করতে পারি বন্ধু?
কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
বলসোভার তখন বললেন, ও অবস্থাটা ঠিক বুঝতে পারছে না। ও কিছু জানে না। লিউক কোথায়? কি করতে হবে সে তা জানে।
পরিচালক প্রেতাত্মা লিউক বলল, কী হয়েছে বন্ধু?
বলসোভার বললেন, হয়ত কোনও হতভাগ্য প্রেতাত্মা কোনও কারণে এসেছে। তাকে আমাদের সাহায্য করা উচিত।
লিউক সহানুভূতির সুরে বলল, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। ও এসেছে বাইরের এক অন্ধকার জগৎ থেকে। ও এখানকার অবস্থা কিছু জানে না। ও কিছু বোঝে না। ওরা একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসে। কিন্তু যখন দেখে প্রকৃত অবস্থা ওদের উদ্দেশ্যের অনুকূল নয় তখন ওরা অসহায় হয়ে পড়ে। ওরা এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়। পূর্বজন্মের অজ্ঞতা আর দুঃখের মধ্যে ওদের দিন কাটে এবং মৃত্যুর পরও ওরা মনের মধ্যে সেই অজ্ঞতা ও দুঃখের বীজ বয়ে নিয়ে বেড়ায়।
ওর মধ্যে কি গুণের অভাব আছে? ও কি চায়?
লিউক বলল, ও জানে না যে ও মৃত। জীবন-মৃত্যু সম্বন্ধে ওর কোনও জ্ঞান নেই। ও কুয়াশার মধ্যে অশরীরীভাবে ঘুরে বেড়ায়। ইহলোক-পরলোকের সব কিছু এক বিরাট দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় ওর কাছে। এই ভাবে কয়েক বছর ধরে চলছে। কিন্তু তবুও কালজ্ঞান নেই বলে কয়েক বছরকেই অনন্তকাল বলে মনে করে ও।
কেন তুমি এ সব কথা বলে শিক্ষা দাও না। ওর কী করা উচিত সে ব্যাপারে নির্দেশ দাও না কেন।
লিউক উত্তর করল, আমরা তা পারি না।
পেটা ঘড়িটাতে একটা শব্দ হলো। বলসোভার স্মাইলিকে বললেন, সুর বাজাও। আরও কম্পন দরকার।
মেইলী বলল, পরলোকের আত্মারা মর্ত্যের মানুষদের কাছে আসতে পারে না। আসতে তাদের কষ্ট হয়। তাই সুরের কম্পন দিয়ে বাতাসকে স্পন্দনশীল করে তাদের আসতে সাহায্য করা উচিত আমাদের।
লিউক মেইলীকে বলল, তুমি ওকে চেন। ওর সঙ্গে কথা বল। এরপর সেই প্রেতাত্মা বিড়বিড় করে একটানা কী বলে যেতে লাগল।
বন্ধু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। মেইলী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সেই একটানা বিড়বিড় করে কথাগুলো থেমে গেল। সবাই বুঝতে পারল সেই অদৃশ্য প্রেতাত্মা বেশ কষ্ট করে মনোযোগ দিয়ে মেইলীর কথা শুনছে।
মেইলী তাতে আবার বলল, তোমার অবস্থা দেখে আমরা দুঃখিত। তুমি আমাদের দেখতে পাচ্ছ কিন্তু আমরা তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না বলে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ। তুমি বুঝতে পারছ না যে আমরা অন্য জগতে আছি। তুমি যে রকম কল্পনা করেছিলে সেরকম অভ্যর্থনা আমাদের কাছে পাওনি। কিন্তু আসলে তোমার কল্পনাটাই মিথ্যা ছিল। এটা মনে রাখবে এবং তোমার বোঝা উচিত যে ঈশ্বর সবসময় মঙ্গলময়। তুমি সব সুখই পাবে যদি তুমি তোমার মনকে বড় করতে পার এবং ঈশ্বরের কাছে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করতে পার। তবে শুধু নিজের জন্য প্রার্থনা করলে হবে না। তোমার চারদিকে আরও যে সব প্রেতাত্মা আছে তাদের উন্নতি ও মঙ্গলের জন্যও প্রার্থনা করতে হবে তোমাকে।
এরপর সব চুপ হয়ে গেল।
লিউক মেইলীকে বলল, ও তোমার কথা শুনেছে এবং বুঝতে পেরেছে। অন্ধকারের মাঝে ও এক আশার আলো খুঁজে পেয়েছে। জানতে চাইছে ও আবার আসবে কিনা। ও তোমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে। ও বলছে আজ যে আশার আলোটা খুঁজে পেয়েছে সে আলো ক্রমশই বাড়তে থাকবে ওর মধ্যে।
বলসোভার চিৎকার করে বলে উঠলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। অনেক প্রেতাত্মা আমাদের জানিয়েছে এইভাবে তাদের উন্নতি হয়েছে। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন বন্ধু। যখন পারবে তখনই আসবে।
প্রেতাত্মা তখন শান্ত হয়ে তার বিড়বিড় করে কথা বলাটা বন্ধ করল। ঘরের বাতাসটা বেশ শান্ত হয়ে উঠল। এমন সময় উই ওয়ানের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
সে বলল, আরও অনেক প্রেতাত্মা এখানে আছে। রেড ক্লাউডও এখানে আছে। ওকে কী করতে হবে তা বলে দাও।
রেড ক্লাউড কোনও অশরীরী প্রেতাত্মাকে বাস্তাব রূপ দান করতে পারে। রেড ক্লাউড তুমি এসেছ?
কাঠের উপর হাতুড়ির ঘায়ের মতো তিনটে শব্দ হলো অন্ধকারে।
লিউক বলল, শুভ সান্ধ্য নমস্কার রেড ক্লাউড।
সকলের মাথার উপর এক নতুন কণ্ঠস্বর অতি কষ্টে কী যেন অস্পষ্টভাবে বলার চেষ্টা করছে।
সেই কণ্ঠস্বর বলল, নমস্কার হে প্রধান। আজ এখানে কিছু নতুন মুখ দেখছি বলে মনে হচ্ছে।
লিউক আবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা রেড ক্লাউড তুমি কি করতে পার তা কিছুটা দেখাতে পার?
রেড ক্লাউড বলল, ঠিক আছে, কিছু একটা দেখানো চেষ্টা করছি।
সকলে তা দেখার জন্য সচকিত হয়ে উঠল এবং স্তব্ধ হয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল। নবাগত অতিথি ম্যালন ও এনিড আবার অলৌকিক ও রহস্যময় কিছু একটা দেখার অপেক্ষায় রইল। এমন সময় ঘরের উপর দিকে উজ্জ্বল বাষ্পে গড়া একটা বৃত্তাকার আলো দেখা গেল। সেই আলোকবৃত্তটা ঘরের উপর দিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া-আসা করতে লাগল। তারপর সেটা একটা থালার মতো হয়ে গেল। ক্রমে সেটা এনিডের মুখের সামনে নেমে এল। ম্যালন পাশ থেকে আশ্চর্য হয়ে দেখল একটা মানুষের হাত আলোকবৃত্তের একটা অংশ ধরে আছে। ম্যালন সন্দিগ্ধভাবে বলল, সত্যিই একটা হাত আলোকবৃত্তটাকে ধরে আছে।
মেইলী বলল, একটা অশরীরী প্রেতের একটা হাতকে শরীরী রূপ দেওয়া হয়েছে। আমি এটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
আচ্ছা আপনি কি ওই হাতটাকে স্পর্শ করতে চান ম্যালন?
ম্যালন বলল, হ্যাঁ, যদি ও চায়।
সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোকবৃত্তটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল এবং ম্যালন তার হাতের উপর একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করল। সে তখন তার একটা হাতের তালু দিয়ে হাতটাকে ধরতে গেলেই সেই হাতের আঙুলগুলো তার হাতের আঙুলের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। সেই আঙুলগুলোকে নরম ও উষ্ণ বলে মনে হলো তার। কিন্তু আঙুলসহ হাতটাকে চেপে ধরতে যেতেই সেটা শূন্যে মিলিয়ে গেল।
ম্যালন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হাতটা মিলিয়ে গেল।
লিউক বলল, রেড ক্লাউড আলোকবৃত্ত তৈরির কাজটা ভাল পারে। কিন্তু শরীরী রূপদানের কাজটা তেমন ভাল পারে না। এই সময় অন্ধকারে জোনাকির মতো কিছু অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উড়ে বেড়াতে লাগল।
ম্যালন ও এনিড তাদের মুখের উপর ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শ অনুভব করল। এনিড দেখল কোথাও এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া শুধু তাদের মুখের উপর বইছে। অথচ এটা কোনও ভ্রান্তিদর্শন নয়। কারণ সে দেখল সেই হাওয়ায় তার মাথার চুলগুলো উড়ছে। উড়তে উড়তে তার কপালে এসে পড়ল।
মেইলী বলল, পেন্টিকস্ট নামে এক প্রেতাত্মা এই ধরনের আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটাতে পারে। যদি তোমরা কোনও হাওয়ার বেগ অনুভব কর তাহলে দেখবে ঘরের আলোকগুলো আগুন হয়ে লেলিহান জিভ মেলে আছে। পেন্টিকস্টের পক্ষে এই সব কাজ করা অসম্ভব নয়।
হঠাৎ ঘরের উপর দিকে সেই আলোকবৃত্তটাকে দেখা গেল। আর সেই আলোর বৃত্তের মধ্যে একটা তম্বুরা (তানপুরার মতো এক বাদ্যযন্ত্র) ঘুরপাক খেতে লাগল। তার পর সেই তম্বুরাটা আপনা থেকে নিচে নেমে এসে এনিড ও ম্যালনের মাথা দুটোকে আলতোভাবে স্পর্শ করল। তার পর সেটা সশব্দে পড়ে গেল।
মেইলী বলল, এটা একটা বাদ্যযন্ত্র। এটা ওপরে উঠে তার শব্দ দ্বারা তার অস্তিত্ব ঘোষণা করল। আমি শুধু আর একটা জিনিসের কথা বলতে পারি। সেটা হচ্ছে একটা মিউজিক বক্স। মিসেস বলসোভার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ওই দেখুন ভারী মিউজিক বক্সটা ঘরের উপর দিকে আমাদের মাথার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বলসোভার বললেন, ওটার ওজন নয় পাউন্ড। আমার মনে হয় আজকের মতো এখানেই সব শেষ হয়ে গেল। আজকের অধিবেশনটা ভালই হলো। মনে হয় আজকের রাতে আর কিছু দেখা যাবে না, তবে সভা ভঙ্গ করার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আচ্ছা মি. ম্যালন আপনি কী মনে করেন? যদি কোনও আপত্তি থাকে তাহলে এখন তা বলতে পারেন। আপনারা সাংবাদিকরা মুখের সামনে ভাল কথাই বলেন। সব কিছুর প্রশংসা করেন। কিন্তু যত সব নিন্দার কথাগুলি মনের মধ্যে পুষে রাখেন। আর লেখার মধ্যে তা প্রকাশ করেন। আপনাদের সামনে আমরা বেশ ভাল, ভদ্র থাকি। কিন্তু আপনাদের রিপোর্টে দেখি আমরা সব অভদ্র ও জুয়াচোর হয়ে গেছি।
ম্যালনের মাথাটা কেমন যেন ঘুরছিল। সে তার একটা হাত দিয়ে উত্তপ্ত ভুরু দুটো আর কপালটাকে চেপে ধরল।
ম্যালন বলল, আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি কিন্তু সব কিছু দেখে মুগ্ধ হয়েছি, সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। সবচেয়ে যেটা আমার অদ্ভুত লেগেছে সেটা হলো এই যে এই সভা যারা পরিচালনা করেছে তাদের নিষ্ঠা এবং সততায় কোনও ফাঁক ছিল না। তবে এখানে যারা উপস্থিত ছিলেন না, যারা এসব কখনও দেখেননি, এসব কথা লিখলে তারা কিছু আপত্তি তুলতে পারেন। কিন্তু আমি তার উত্তরটা লেখার মধ্যে দিয়ে দেব।
প্রথম কথা হলো, এই সব অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। তাই এটা সকলের কাছে অদ্ভুত ঠেকবে। প্রেতাত্মাদের সম্বন্ধে আমাদের যে ধারণা ছিল তার সঙ্গে আজকের ঘটনাগুলো মেলে না।
মেইলী বলল, পূর্বে আমাদের ধারণা যাই থাক, এই সব ঘটনার সঙ্গে আমাদের ধারণাকে মেলাতে হবে। আজ আমরা যেসব প্রেতাত্মার পরিচয় পেলাম তারা প্রাচীন কালে মর্ত্যে ঘোরাফেরা করেছে প্রেতাত্মাদের মতোই। এবার লিউকের কথা ধরুন। সে একটু উচ্চস্তরের আত্মা। মি. ম্যালন আপনি তার কথা শুনেছেন। আর কী জানতে চান?
ম্যালন বলল, সব কাজই অন্ধকারে হয়। মিডিয়ামের কাজকর্ম অন্ধকারে অনুষ্ঠিত হয় কেন তা বুঝি না।
বলসোভার বললেন, ছবি তোলার ঘরটায় যেমন অন্ধকারের প্রয়োজন হয় তেমনি মিডিয়ামের কাজকর্মের জন্য অন্ধকারের প্রয়োজন হয়। প্রেত-তত্ত্বের ব্যাপারে এটা হচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এই অন্ধকারে রাসায়নিক প্রক্রিয়াটা ভাল চলে। মানবদেহ হতে যে সূক্ষ্ম রাসায়নিক বস্তু আকর্ষণ করে রাখা হয় সেই বস্তু দিয়েই এক বাষ্পীয় ছায়াকে ঘন করে মানুষের রূপ দেওয়া হয় এবং ওই বস্তুকে একটি খোলা আয়তক্ষেত্রাকার বাষ্পের মধ্যে রাখা হয়। আশা করি আমি ঠিক বোঝাতে পেরেছি।
ম্যালন বলল, বুঝলাম কিন্তু একই সঙ্গে এটা দুঃখের বিষয়ও বটে। সমস্ত কাজকর্ম অন্ধকারে অনুষ্ঠিত হয় বলে এক ভয়ঙ্কর প্রতারণার ভাব গড়ে তোলে। দর্শকদের মনে সন্দেহ জাগে।
বলসোভার বললেন, এবার আলোও দেখুন। এই বলে তিনি দেশলাই খুলে একটা বাতি জ্বাললেন। অন্ধকারের পর হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে সকলের চোখ মিটমিট করতে লাগল। বলসোভার আবার বললেন, জানি না উই ওয়ান চলে গেছে কিনা। দেখি কি করতে পারি।
টেবিলের উপর কাঠ দিয়ে ঘেরা একটা বৃত্ত ছিল। তার মধ্যে নানাবিধ খেলার বস্তু ছড়ানো ছিল। যাতে সমাগত প্রেতাত্মারা ইচ্ছা করলে তা দিয়ে খেলা করতে পার। টেবিলের চারদিকে দর্শকরা উঠে দাঁড়াল।
মিসেস বলসোভার বলে উঠলেন, উই ওয়ান এসো, দয়া করে এস উই ওয়ান। নিজের চোখকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না।
এমন সময় ওপর থেকে বৃত্তাকার সেই আলোর থালাটা নেমে এসে সশব্দে পড়ল।
তখন মিসেস বলসোভার আবার বললেন, এটা তোল উই ওয়ান, ওপরে তোল। সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল টেবির থেকে কাঠের বৃত্তটা আস্তে আস্তে উপরে উঠতে লাগল। তারপর এক জায়গায় স্থির হয়ে রইল।
বলসোভার বললেন, উই ওয়ান ওটাকে তিনবার নাড়া দাও। সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোর থলিটা কাঠের বৃত্তসহ তিনবার সামনে ও পিছনের দিকে কিছুটা আসা- যাওয়া করার পর নিচে পড়ে গেল।
ম্যালনের দিকে তাকিয়ে মেইলী বলে উঠল, আপনার এটা দেখায় আমি খুশি হলাম। এটাকে টেলিকেনেসিস বলে।
এনিড বলল, না দেখলে এটা বিশ্বাস করতেই পারতাম না। ম্যালন বলল, আমার জ্ঞানের সীমাটাকে বাড়িয়ে দিয়েও এ ধরনের ঘটনা যে-সম্ভব তা আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না।
মি. বলসোভার আপনি আমারও অভিজ্ঞতার সীমাটাকে বাড়িয়ে দিলেন।
ভাল কথা মি. ম্যালন।
ম্যালন বলল, এই ঘটনার পেছনে যে শক্তি কাজ করছে সেই বিষয়ে এখনও আমি অজ্ঞ। তবে আজ যে সব ঘটনা ঘটল সে বিষয়ে আমার আর কোনও সন্দেহ নেই। এ সবই সত্যনিষ্ঠ বলসোভার।
আজকের মতো বিদায় মি. বলসোভার। আজ আপনার বাড়িতে আমি ও মিস চ্যালেঞ্জার যে অভিজ্ঞতা লাভ করলাম তা আমরা কখনও ভুলব না মি. বলসোভার।
ম্যালন ও এনিড যখন বলসোভারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল তখন তাদের মনে হলো তারা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। বাতাসে তখন তুষারকণা ভেসে বেড়াচ্ছিল। ওরা দেখল থিয়েটার দেখে অনেক আমোদপ্রিয় লোক ট্যাক্সিতে করে বাড়ি ফিরছে। ওরা একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় মেইলী গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল।
মেইলী ওদের বলল, আপনারা কি অনুভব করছেন আমি তা জানি।
আপনারা রাস্তায় এ সব মানুষদের দেখে নিশ্চয়ই বিস্ময়ে আশ্চর্য হয়ে ভাবছেন জীবনের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা সম্বন্ধে ওরা কিছুই জানে না। ওই সব চলমান মানুষদের থামিয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতার কথাগুলোকে ওদের বলতে ইচ্ছে করছে না? অবশ্য ওদের বললেও ওরা ভাববে আপনারা মিথ্যাবাদী, আপনারা পাগল। এটা কি এক মজার ব্যাপার নয়! মেইলী আরও বলল, এই সব ঘটনার কথা অস্থায়ী। আপনাদের মনে হবে আপনারা স্বপ্ন দেখছিলেন। যাই হোক, বিদায়। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে যদি কোনও সাহায্য দরকার হয় তাহলে আমাকে জানাবেন।
এনিড ও ম্যালনের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের কেউ এখন প্রেমিক-প্রেমিকা বলবে না। ওরা যখন গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিল তখন এক গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল ওদের মন। ভিক্টোরিয়া গার্ডেন্স-এ নেমে ম্যালন এনিডকে তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল কিন্তু বাড়ির ভিতরে গেল না। অন্য সময় মি. চ্যালেঞ্জারের বক্র উক্তি বিদ্রূেপের কথাগুলোকে সহানুভূতির সঙ্গে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু এখন সে সব কথা তার স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করত। কিন্তু এখন চিন্তায় তার মাথাটা এমনিই গরম হয়ে আছে।
এরপর ম্যালন এনিডকে বলল, তোমার ব্যাগ থেকে যন্ত্রটা বার কর। তার সান্ধ্য অভিযান এখানেই শেষ।
