অধ্যায় ৫ ॥ স্মৃতির মাকুগুলি
আজও মনে পড়ে আমরা সকলেই চেয়ারে বসে হাঁপাচ্ছিলাম। সমুদ্র থেকে উঠে- আসা একটা মিষ্টি, জলীয় বাতাসে মসলিনের পর্দাগুলি উড়ছিল; তার শীতল ছোঁয়ায় আমাদের ঝলসানো মুখগুলিও স্বস্তিবোধ করছিল। অবাক হয়ে ভাবি, কতক্ষণ আমরা সেইভাবে বসে ছিলাম। পরবর্তী কালে আমরা কেউই সে বিষয়ে একমত হতে পারিনি। আমরা হয়ে গিয়েছিলাম বিহ্বল, অভিভূত, অর্ধচেতন। আমরা সকলেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলাম, কিন্তু এই আকস্মিক ও ভয়ংকর নতুন ঘটনাটা—অর্থাৎ যে জীব-জগতের আমরা শরিক ছিলাম তার সার্বিক মৃত্যুর পরেও আমাদের বেঁচে থাকা—এটা যেন একটা প্রচণ্ড শারীরিক আঘাত হয়ে আমাদের একেবারে ধরাশায়ী করে দিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে অচল দেহ- যন্ত্রটা আবার চলতে শুরু করল; স্মৃতির মাকুগুলি আগেকার মতোই কাজ করতে লাগল; মনের চিন্তা-ভাবনাগুলো আপনা থেকেই নিজেদের একসাথে বুনতে লাগল। নিমর্ম স্পষ্টতার সঙ্গে আমরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পর্কটা বুঝতে পারলাম—চোখের সামনে দেখতে পেলাম আমাদের অতীত জীবন এবং যে জীবন নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।
যন্ত্রণা-ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মহিলাটি বললেন, “এ যে ভয়ংকর জর্জ, বড় ভয়ংকর। অন্য সকলের সঙ্গে আমরাও যদি চলে যেতে পারতাম! কেন তুমি আমাদের বাঁচালে? মনে হচ্ছে যেন আমরাই মরে গেছি, আর অন্য সবাই বেঁচে আছে।”
চ্যালেঞ্জারের মোটা ভুরুযুগল গভীর চিন্তায় ঝুলে পড়ছিল। তিনি শুধু বললেন, “চরম ভাগ্যবাদী না হলেও আমি সব ক্ষেত্রেই দেখেছি যে বাস্তবকে মেনে নেওয়াটাই পরম জ্ঞানের পরিচায়ক।” ধীরে ধীরে তিনি কথাগুলি বললেন; তাঁর কণ্ঠস্বরে বাজতে লাগল গভীর অনুভূতির অনুরণন।
সামারলী দৃঢ়স্বরে বলে উঠলেন, “আমি মেনে নিচ্ছি না।”
লর্ড জন টিপ্পনি কাটলেন, “আপনি মেনে নিচ্ছেন বা মেনে নিচ্ছেন না—তাতে কার কি যায়-আসে সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। ঘটনাটাকে তো আপনাদের মেনে নিতেই হবে, তা সেটার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই হোক, আর নিঃশব্দে মাথা পেতেই হোক; সুতরাং এ ব্যাপারে আপনাদের মেনে নেওয়া আর না-নেওয়ায় কী যায়-আসে? আর দুটোর মধ্যে তফাৎটাই বা কি?”
স্ত্রীর হাতটাকে মৃদুমন্দভাবে আঘাত করতে করতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “সুখ আর দুঃখের মধ্যে যে তফাৎ এটাও ঠিক তাই। জোয়ারের জলে সাঁতরে আপনি মনে ও আত্মার শান্তি পেতে পারেন, অথবা তার সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্ষত-বিক্ষত ও ক্লান্ত হতে পারেন। এ ব্যাপারটা আমাদের হাতের বাইরে; কাজেই দ্বিরুক্তি না করে আসুন আমরা সকলেই এটাকে মেনে নিই।”
বেপরোয়া ভঙ্গিতে ফাঁকা, নীল আকাশের কাছে আর্জি জানাতে আমি প্রশ্ন করলাম, “কিন্তু এই জগতে জীবনটাকে নিয়ে আমরা কী করব? দৃষ্টান্তস্বরূপ বলছি, আমি কি করব? সংবাদপত্রই যখন নেই, তখন আমার চাকরিটাও তো ফুরিয়েছে।”
লর্ড জন বললেন, “আর শিকারই যখন নেই তখন আমারও কোনও কাজ নেই।”
সামারলী চড়াগলায় বলে উঠলেন, “আর যেহেতু ছাত্র নেই, তাই আমার কাজও শেষ হয়ে গেছে।”
মহিলাটি বলে উঠলেন, “কিন্তু আমার তো স্বামী আছে, সংসার আছে, সুতরাং আমি উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ দিতে পারি যে আমার কাজের শেষ নেই।”
চ্যালেঞ্জার বললেন, “আমার কাজেরও শেষ নেই, কারণ বিজ্ঞানের মৃত্যু নেই, আর এই সমূহ বিপদপাত এমন কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছে যা নিয়ে গবেষণা চালানো দরকার।”
ততক্ষণে তিনি জানালাগুলোকে সপাটে খুলে দিয়েছেন, আর আমরা সবাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম নিথর নিস্তব্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর দিকে।
আগেকার কথার রেশ টেনে তিনি আরও বললেন, “একটু ভেবে দেখতে হচ্ছে। গত পরশু বিকেল তিনটে নাগাদ, বা তারও কিছু পরে, জগৎটা এতটাই বিষাক্ত ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল যে সেই অঞ্চলটা প্রায় ডুবেই গিয়েছিল। এখন ন’টা বাজে। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, ঠিক ক’টার সময় আমরা সেই বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম?”
“দিনের শুরুতে বাতাসটা কুবই খারাপ ছিল”, আমি বললাম।
মিসেস চ্যালেঞ্জার বললেন, “সেটা আরও পরে। অন্তত আটটা পর্যন্ত সেই একই রকম দম আটকে আসার অনুভূতিটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যেটা একেবারে গোড়াতেই ছিল।”
“তাহলে আমাদের বলতে হবে যে সেই অবস্থাটা কেটে গিয়েছিল ঠিক আটটার পরে। সতেরোটা ঘণ্টা ধরে জগৎটা বিষাক্ত ইথারে ডুবে ছিল! আর ঠিক ততটা সময়ই আমাদের মহান উদ্যানকার মানুষের ছাঁচটাকে জীবাণুহীন করে রেখেছিলেন। এটাও কি সম্ভব যে তাঁর মহান হাতের কাজটা অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল—মানে, আমরা ছাড়া আরও অনেকেই হয়তো বেঁচে আছে?”
লর্ড জন বলে উঠলেন, “আমিও তো অবাক হয়ে গিয়েছি। আমরাই বা সাগর-সৈকতের একমাত্র উপলখণ্ড হলাম কেন?”
সামারলীও দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, “আমরা ছাড়া আরও কেউ কেউ হয়তো বেঁচে থাকতে পারে এটা ধরে নেওয়াই তো একটা অবাস্তব ব্যাপার। ভেবে দেখুন, বিষটা এতই তীব্র ছিল যে একটা মানুষ যদি ষাঁড়ের মতো বলবান হয় এবং তার শরীরে স্নায়ুনামক বস্তুটি না থাকে, যেমন আমাদের ম্যালোনের মতো, সেও কিন্তু অচেতন হয়ে পড়ে যাবার আগে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে পারত না। তাহলে এটা কি সম্ভব যে ঘণ্টার হিসাব ছেড়ে দিলেও মাত্র সতেরোটা মিনিটও কেউ কি সেই বিষ-ক্রিয়া সহ্য করতে পারে?”
“পারে, যদি আমাদের পুরনো বন্ধু চ্যালেঞ্জারের মতো অন্য কোনও মানুষ বুঝতে পারে যে একটা মহাবিপদ আসছে এবং তার জন্য প্রস্তুত হয়।”
দাড়িটা বাড়িয়ে এবং চোখের পাতা দুটি নামিয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, “আমার তো মনে হয় যে সেটা সব সম্ভাবনার বাইরে। পর্যবেক্ষণ, অনুমান ও আগাম কল্পনা—এই তিন শক্তির মিলনের ফলে আমি আগে থেকেই বিপদটাকে দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা একই পুরুষে দু’বার ঘটবে সে আশাটা দূর অস্ত্।”
“তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত হচ্ছে বাকি সব মানুষেরই নিশ্চিত মৃত্যু ঘটেছে?” “সে বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ নেই। অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হবে যে বিষক্রিয়াটা ঘটেছে নিচ থেকে উপরের দিকে, আর সম্ভবত বায়ুমণ্ডলের উচ্চতর স্তরে ক্রমেই তার তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে। সুতরাং এর থেকে সহজেই কল্পনা করা যায় যে যারা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে তাদের খোঁজ পেতে হলে আমাদের চোখ দুটোকে ফেরাতে হবে সমুদ্র-বলয় থেকে কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত কোনও তিব্বতী গ্রামে অথবা আল্পস পর্বতের কোনও খামার-বাড়িতে।”
সামারলী বকের মতো গলাটা বাড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকালেন।
চ্যালেঞ্জার তাঁর দুটি কাঁধ উঁচু করলেন।
লর্ড জন কিন্তু একটা কাজের কথা বললেন। “আমার তো মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রথম কর্তব্য হবে পা দুটোকে একটু টান-টান করা এবং একটু বায়ুসেবন করা। যেহেতু আমাদের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছে, এখন তো আমাদের কাছে ভিতর-বাহির একাকার হয়ে গেছে।”
খুবই আশ্চর্যের কথা যে এরই মধ্যে আমরা সকলেই যেন একান্তই আলস্যপরায়ণ হয়ে উঠেছিলাম। একটু নড়েচড়ে বসতেও ইচ্ছা করছিল না। যাই হোক, কোনও রকমে একবার যখন আমাদের সেই ছোট্ট পাখির বাসার আরাম ছেড়ে আমরা দৈনন্দিক জীবনের বৃহত্তর পরিবেশের মধ্যে পা ফেলতে পেরেছি, তখন ধীরে ধীরে আবার ফিরে ফেলাম আমাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা।
কিন্তু—কাজটা কি করব? প্রথমেই আমরা রান্নাঘরে নেমে গেলাম। দুটি কাজের মানুষই হতচেতন হয়ে যার যার বিছানায় পড়ে ছিল। তারপর বেচারি অস্টিনকে উঠোন থেকে তুলে আনলাম। তারপর?
প্রস্তাবটা চ্যালেঞ্জারই করলেন, “লর্ড জন, দয়া করে আপনি বলুন, আমাদের এখন কি করা উচিত?”
“একটু চলা-ফেরা করা এবং ঘটনাগুলো চাক্ষুষ করা।”
“আমি নিজেও সেই প্রস্তাবই করতাম।”
“কিন্তু এই ছোট গ্রামে গিয়ে নয়।”
“তাহলে আমাদের কোথায় যেতে হবে?”
“লন্ডনে!”
“খুব ভাল কথা” সামারলী বললেন। “কিন্তু কি ভাবে যাব? হেঁটে?” লর্ড জন বললেন, “কেন? হাঁটতে যাব কেন?”
“আপনি কি তা হলে ট্রেনের কথা বলছেন?” চ্যালেঞ্জার প্রশ্ন করলেন। “মোটর-গাড়িটার কি হলো? সেটাতে চড়ে কি যাওয়া যাবে না?”
দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “গাড়ি চালানোর কাজে আমি খুব দক্ষ নেই। তবু আপনি প্রস্তাবটা খাসা করেছেন লর্ড জন। আমিই গাড়ি চালিয়ে আপনাদের লন্ডনে নিয়ে যাব।”
সামারলী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, “ও কাজটা আপনাকে করতে হবে না।”
মহিলাটিও চিৎকার করে বলে উঠলেন, “তুমি সত্যি ও কাজটা করো না। তুমি একবার ও চেষ্টাটা করেছিলে। মনে করে দেখ, সেবার তুমি গ্যারেজের ফটকটাই ভেঙে দিয়েছিলে।”
চ্যালেঞ্জার অকাতরে বললেন, “সেটা তো ঘটেছিল এক মুহূর্তের অন্যমনস্কতার জন্য। তুমি ধরেই নাও যে ও ব্যাপারটা পাক্কা হয়ে গেছে।”
লর্ড জন প্রশ্ন করলেন, “কোন গাড়িটা যাবে?”
“কুড়ি হর্স-পাওয়ারের ‘হাম্বার’।”
“আরে, সে-গাড়িটা তো আমি কত বছর ধরে চালিয়ে আসছি। যতদূর মনে আছে, সে গাড়িটাতে তো পাঁচ জন বসতে পারে। আপনাদের মালপত্র সব তুলে দিন, ঠিক দশটায় আমি দরজায় হাজির থাকব।”
ঠিক নির্দিষ্ট সময়েই ঘড়-ঘড় ঝড়-ঝড় শব্দ করতে করতে গাড়িটা যথাস্থানে এসে হাজির হলো। চালকের আসনে লর্ড জন সমাসীন। আমি তাঁর পাশেই বসে পড়লাম; আর মহিলাটি বসলেন পিছনের আসনে—দুটি রাগী মানুষের মাঝখানে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে। লর্ড জন ব্রেকটা ঠিক করলেন, লেভারটাকে এক থেকে তিনের ঘরে ঠেলে দিলেন। আমাদের যাত্রা শুরু হলো পৃথিবীর আদিমতম কাল থেকে মানুষের পথ-চলার সব চাইতে বিস্ময়কর অভিযানে।
আপনারাই কল্পনায় এঁকে নিন অগাস্ট মাসের যে কোনও একটি দিনের এক মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। সকাল বেলাকার মুদৃমন্দ বাতাস, গ্রীষ্মঋতুর সূর্যের সোনালি আলো, সাসেক্স অরণ্যের ঘন সবুজ আভা, দিগন্ত-বিস্তৃত হরিৎ ক্ষেত্র, আর সেই সব সৌন্দর্যকে ঘিরে আছে এক গম্ভীর, সর্বব্যাপী নীরবতা। সে মারাত্মক নীরবতা বড়ই মর্মবিদারী। আমাদের চারদিকে এক বিষণ্ন, ঝিম-ধরা প্রকৃতি; দূর থেকে দূরে চোখে পড়ছে অনেকগুলি ভেঙে গুঁড়িয়ে-যাওয়া অট্টালিকা থেকে কুণ্ডুলি পাকিয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে কালো ধোঁয়া। সেদিকে তাকিয়ে সেই একই দৃশ্য দেখে দেখে আমাদের বুকের ভিতরটা হিম-শীতল হয়ে উঠল
তারপরেও ছিল মৃত্যুর মিছিল। পথের দুই ধারে অগণিত মৃতদেহের স্তূপ, আতঙ্ক-বিস্ফারিত উৎকট, বিকৃত সব মুখ। “স্টেশন হিল” থেকে নামবার পথে দেখতে পেলাম দুটি শিশুসহ নার্স-মেয়েটিকে; দুটি শকট-দণ্ডের মাঝখানে হাঁটু ভেঙে পড়ে আছে একটা বুড়ো ঘোড়া; কোচোয়ানটি তার আসনেই দলা- মোচড়া হয়ে পড়ে আছে; গাড়ির ভিতরে দেখতে পেলাম যুবক যাত্রীটি দরজায় হাত রেখে উল্লম্ফনের ভঙ্গিতে স্থির হয়ে আছে। আরও নিচে দেখতে পেলাম ছ’টি ফসল-কাটা মানুষ ঘাসের উপর পাশাপাশি শুয়ে আছে—তাদের পলকহীন চোখ তাকিয়ে আছে রৌদ্রদগ্ধ আকাশের দিকে। মনে হচ্ছিল যেন কতকগুলি ফটোগ্রাফ দেখছি।…
কিন্তু—সেদিন বোধ হয় এই মৃত্যু-মিছিলের কোনও শেষ ছিল না। অতএব সে বিবরণ এখানেই শেষ হোক। অনেক বুক-কাঁপানো ও চোখ-ভেজানো দৃশ্যের ভিতর দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। যতই আমরা টেম্স্ নদীর কাছাকাছি পৌঁছতে লাগলাম ততই যেন পথের বিঘ্ন-বাধাও বাড়তে লাগল। অনেক কষ্টে লন্ডন ব্রীজও পার হলাম। কিন্তু তারপরেও আর এগোবে সাধ্য কার। মিডসেক্সের দিকটা একেবারে জমাটা-বাঁধা ভিড়। যান-জটের এ-পার ও-পার দৃষ্টির অগোচর। ব্রীজের একদিকে জাহাজ-ঘাটায় একটা জাহাজ তখনও আগুনে জ্বলছিল। পার্লামেন্ট হাউসের দিকে চোখে পড়ল একটা ঘন কালো ধোঁয়ার মেঘ। ঘটনাস্থলটা যে ঠিক কোথায় ছিল সেটা বোঝাও সম্ভব ছিল না।
গাড়ির ইঞ্জিনটা থামিয়ে লর্ড জন বলে উঠলেন, “আপনাদের কেমন লাগছে জানি না, কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে পল্লী-অঞ্চলটা শহরের চাইতে সুখে আছে। মরে যাওয়া লন্ডনকে আমি যেন সহ্য করতে পারছি না। ইচ্ছে করছে গাড়িটা ঘুরিয়ে রদারফিল্ডেই ফিরে যাই।”
প্রস্তাবটা চ্যালেঞ্জারের মনঃপূত হলো না। মহিলাটিও স্বামীর সঙ্গে একমত হলেন। সকলেই গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। গাড়িটাকে এক পাশে রেখে আমরা কিং উইলিয়াম স্ট্রীটের প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে বেশ কষ্ট করে হাঁটতে শুরু করলাম।
একটা জায়গায় রাস্তার ঠিক মাঝখানে আলোর বেদীটার উপর একটি মোটাসোটা পুলিশ এমন স্বাভাবিকভাবে আলোক-দণ্ডটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল যে লোকটা যে মৃত সেটা বুঝবার কোনও উপায় ছিল না; তার পায়ের কাছে শুয়ে ছিল উস্কোখুস্কো চেহারার একটি সংবাদপত্র বিক্রেতা ছেলে, আর তার পাশেই পড়ে ছিল এক বান্ডিল খবরের কাগজ। একটা সংবাদপত্রবাহী শকট যান- জটে আটকে পড়েছিল। শকটটার গায়ে ঝোলানো হলুদের উপর কালো অক্ষরে লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো আমরা দূর থেকেই বেশ পড়তে পেরেছিলাম—”এটাই কি শেষ পরিণতি? এক বড় বিজ্ঞানীর সতর্ক-বাণী?” এবং “চ্যালেঞ্জার কি এমন কথা বলার হকদার? অমঙ্গলসূচক গুজব?”
চ্যালেঞ্জার আঙুল বাড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে প্ল্যাকার্ডটা দেখালেন। গর্বে তাঁর বুকটা যে ফুলে উঠেছে, তিনি যে মনের সুখে দাড়িতে হাত বুলোচ্ছেন সেটাও আমার দৃষ্টিকে এড়ায়নি। লন্ডন শহরটা যে মরতে মরতেও তাঁর নামটাকে স্মরণ করেছে তাতেই তাঁর খুশির অন্ত ছিল না।
পথ চলতে চলতেই সামারলী টিপ্পনি কাটলেন, “শেষ পর্যন্ত আপনিও আলোর বৃত্তে স্থান করে নিলেন, কি বলেন চ্যালেঞ্জার?”
খুশি-খুশি গলায় চ্যালেঞ্জার জবাব দিলেন, “তাই তো মনে হচ্ছে।” যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই নীরবতা; মৃত্যু এসে সকলেরই গলা টিপে ধরেছে। সেদিকে তাকিয়ে তিনি আরও বললেন, “আরও কিছু সময় লন্ডনে কাটিয়ে কোনওই লাভ হবে না। তাই আমি বলি কি এখনই আমরা রদারফিল্ডে ফিরে যাই, আর ভাল করে চিন্তা ভাবনা করে দেখি আগামী বছরগুলিকে কি ভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি।”
সেই মৃত মহানগর থেকে যে সব স্মৃতি নিয়ে আমরা ফিরে এসেছিলাম তার আরও একটা ছবি আমি আপনাদের দেখাতে চাই। আমাদের গাড়িটা যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল ঠিক তার অদূরেই দাঁড়িয়েছিল পুরনো সেন্ট মেরির গির্জাটা। মৃতদেহ ছড়ানো সিঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে পা ফেলে কিছুটা এগিয়ে আমরা সুইং-ডোরটাকে খুলে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। গির্জার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত থিকথিক করছে নানা ভঙ্গিতে নতজানু হয়ে থাকা মৃত মানুষের দল। সে এক দুঃস্বপ্ন! ধূলিমলিন ধূসর গির্জা, সারি সারি বিকৃত মৃত মানুষ। চারদিক অস্পষ্ট, নিঃশব্দ।
হঠাৎই আমার মনে একটা ধারণা জন্মাল। গির্জার এক কোণে দরজাটার কাছে ঘণ্টা বাজার দড়িগুলো ঝোলানো ছিল। কেন আমরা সারা লন্ডনের কাছে এমন একটা বার্তা পাঠাব না যেটা এখনও এখানে জীবিত আছে এমন একটি মানুষের কাছেও পৌঁছে যাবে? এক দৌড়ে আমি সেখানে ছুটে গেলাম। একটা দড়ি ধরে টানতে গিয়ে সবিস্ময়ে বুঝতে পারলাম যে ওই ঘণ্টাটা বাজানো বড়ই কঠিন কাজ।
লর্ড জন আমার পিছনেই ছিলেন। গায়ের কোটটা খুলে ফেলে তিনি বলে উঠলেন, “জর্জের দোহাই বাবাজি। আচ্ছা মতলবটা মাথায় খেলেছে। আমাকেও একবার দড়িটা ধরতে দাও। দু’জন মিলে টানলে অচিরেই ঘণ্টাটা নড়বে।”
কিন্তু ঘণ্টাটা এতই ভারী ছিল যে চ্যালেঞ্জার ও সামারলীও যখন আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মেলালেন একমাত্র তখনই আমাদের মাথার উপরে সগর্জনে ঢং- ঢং করে ঘণ্টাটা অবিরাম বাজতে লাগল। নিষ্প্রাণ লন্ডনের দূর হতে দূরান্তরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমাদের সৌভ্রাত্রের বার্তা। সেখানে যদি একটি প্রাণীও জীবিত থাকে তো সেই বার্তা তার প্রাণেও জাগাবে নতুন জীবনের আশ্বাস।
আধা ঘণ্টা ধরে আমরা ঐ একটি কাজই করে যেতে লাগলাম। আমাদের মুখ থেকে ঘাম ঝরতে লাগল। দুটো হাত ও পিঠ ব্যথায় টনটন করতে লাগল। এক সময় আমরা গির্জার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সাগ্রহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ভিড়ঠাসা নিঃশব্দ পথের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত। আমাদের ডাকে কেউ সাড়া দিল না। একটি শব্দও কানে এল না। একটি মানুষও এগিয়ে এল না।
আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, “সব বৃথা। কেউ নেই। কেউ বেঁচে নেই।” মিসেস চ্যালেঞ্জার বলে উঠলেন, “এর চাইতে বেশি কিছু তো আমরা করতে পারব না। ঈশ্বরের দোহাই জর্জ, চল আমরা রদারফিল্ডেই ফিরে যাই। এই ভয়ংকর নিস্তব্ধ মহানগরে আর একটা ঘণ্টা থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব।”
আর একটা কথাও না বলে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম। লর্ড জন গাড়িটাকে পিছিয়ে নিয়ে দক্ষিণ দিকে মোড় নিলেন। আমাদের কাছে সে অধ্যায়টা শেষ হলো। যে বিচিত্র নতুন অধ্যায়টি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল তার আভাসমাত্রও তখন আমরা পাইনি।
