অধ্যায় ৪
সবে দরজাটা বন্ধ হয়েছে এমন সময় খাবার-ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। ছোটখাট মানুষটি তখন রাগে উগ্রচণ্ডী। ডালকুত্তার সামনে ক্রুদ্ধা মুরগীর বাচ্চার মতো তিনি স্বামীর পথরোধ করে দাঁড়ালেন। স্পষ্ট বোঝা গেল, তিনি বাড়ি থেকে আমার প্রস্থানটা দেখেছেন, কিন্তু পুনঃপ্রবেশটা দেখেননি।
চিৎকার করে বললেন, “তুমি একটা জানোয়ার জর্জ! ঐ সুন্দর যুবকটিকে তুমি মারলে!”
স্বামী বুড়ো আঙুল পিছন দিকে ঘুরিয়ে বললেন, “ওই তো নিরাপদে, বহাল তবিয়তে তিনি আমার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছেন।”
ভদ্রমহিলা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, “আমি দুঃখিত, আপনাকে দেখতে পাইনি।”
“আমি বলছি ম্যাডাম, সব ঠিক আছে।”
“ও আপনার মুখে কালসিটে ফেলে দিয়েছে। ওঃ জর্জ, তুমি কী জানোয়ার! সারা সপ্তাহ ধরে খালি কেলেংকারি আর কেলেংকারি। সকলেই তোমাকে ঘৃণা করছে, তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। তুমি আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছ। এবার তাও শেষ হলো।”
“যত জঞ্জাল!” স্বামী বললেন।
মহিলাটি গর্জে উঠলেন, “কারও কাছে আর গোপন নেই। তুমি কি মনে কর যে গোটা রাস্তার লোক—তার মানে গোটা লন্ডনের মানুষ—অস্টিন, চলে যাও এখান থেকে, এখানে তোমার কোনও কাজ নেই। তুমি কি মনে কর তারা তোমার কথা নিয়ে আলোচনা করছে না? কোথায় রইল তোমার মান-মর্যাদা? তোমার তো এতদিনে একটা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেজিয়াস প্রফেসর’ হবার কথা—হাজার হাজার ছাত্র এসে তোমাকে সম্মান দেখাবে। কোথায় গেল তোমার সে শ্রদ্ধা- সম্মান?”
“আর তোমার মান-সম্মান?”
“সব তো গেছে তোমার দোষে। তুমি একটা গুণ্ডা—কুঁদুলে গুণ্ডা—এখন তো তাই হয়ে দাঁড়িয়েছ।”
“শান্ত হও জেসি!”
আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রফেসর তাঁর স্ত্রীকে ধরে হলের এক কোণের কালো পাথরের উঁচু বেদীটার উপর বসিয়ে দিলেন। মহিলার মুখটা রাগে লাল, ছোটখাট পা দুটো ঝুলছে উঁচু বেদীর উপর থেকে। তিনি চেঁচিয়ে বলছেন, “আমাকে নামিয়ে দাও।”
“আগে বল ‘দয়া কর’।”
“তুমি একটা জানোয়ার জর্জ। এই মুহূর্তে আমাকে নামিয়ে দাও।”
“মি. ম্যালোন, পড়ার ঘরে চলুন।”
“সত্যি বলতে কি স্যার!” মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম।
“এই দেখ, মি. ম্যালোনও তোমার হয়ে বলছেন জেসি। একবার শুধু বল ‘দয়া কর’ তাহলেই ‘নিচে’ নামতে পারছ।”
“তুমি একটা জানোয়ার। দয়া কর! দয়া কর!”
একটা পাখির ছানার মতো তুলে প্রফেসর স্ত্রীকে বেদী থেকে নামিয়ে দিলেন।
“ঠিকঠাক মতো চলবে লক্ষ্মীটি। মি. ম্যালোন প্রেসের লোক। কাল সকালে সব কথা কাগজে বের করে দেবেন। আর আমাদের প্রতিবেশীদের কাছে বাড়তি ডজন খানেক কাগজ বিক্রি হবে। কি বলেন মি. ম্যালোন?”
রেগে বললাম, “সত্যি, আপনি অসহ্য!”
তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন।
বললেন, “অবলিম্বেই সন্ধি হয়ে যাবে।” তারপর হঠাৎ গলার স্বর পাল্টে বলে উঠলেন, “আমাদের দাম্পত্য কলহকে ক্ষমা করবেন মি. ম্যালোন। আরও গুরুতর কাজের জন্য আপনাকে ডেকে এনেছি। ছোট্ট মেয়েটি, পালাও এখান থেকে, বাজে খিচ-খিচ করো না।” অধ্যাপক স্ত্রীর দুই কাঁধে হাত রাখলেন। “তুমি যা বল সব খাঁটি কথা। তোমার কথামতো চললে আমি ভালমানুষ হয়ে যাব, কিন্তু ঠিক-ঠিক জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার হতে পারব না। ভাল মানুষ তো অনেক আছে, কিন্তু সোনা, জি. ই. সি. আছে শুধু একজন। সুতরাং তাকে বেড়ে উঠতে দাও।”
হঠাৎ তিনি সশব্দে স্ত্রীকে একটি চুমো খেলেন। তার আঘাতের চাইতে এই চুম্বন আমাকে বেশি বিস্মিত করল। মর্যাদাপূর্ণ স্বরে তিনি এবার বললেন, “মি. ম্যালোন, দয়া করে এদিকে আসুন।”
যে ঘর থেকে দশ মিনিট আগে লড়াই করতে করতে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, সেই ঘরেই আবার ঢুকলাম। অধ্যাপক সাবধানে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন, আমাকে একটা হাতল-চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে চুরুটের বাক্সটা আমার নাকের ডগায় ঠেলে দিলেন।
তারপর বললেন, “একজন সত্যিকারের স্যান জুয়ান কলোরাডো। আপনার মতো উত্তেজনাপ্রবণ লোকদেরই মাদকদ্রব্যের প্রয়োজন। হা ঈশ্বর! ওভাবে ওটাতে কামড় বসাবেন না! কেটে নিন—শ্রদ্ধা সহকারে কেটে নিন! এবার হেলান দিয়ে বসুন, আমি যা যা বলি মন দিয়ে শুনুন। যদি কোনও প্রশ্ন মনে জাগে, উপযুক্ত সময়ের জন্য সেটাকে মনের মধ্যেই রেখে দিন।
“প্রথমেই বলি, পুলিশের লোকটির কাছে আপনি যে জবাবটি দিলেন তার জন্যই আবার আপনাকে এখানে ডেকে এনেছি। দুর্ভাগ্যবশত যে মানব উপজাতির আপনি একজন সদস্য তারা চিরদিনই আমার মানস-দিগন্তের অনেক নিচের বাসিন্দা। আপনার কথাগুলিই হঠাৎ আপনাকে তার অনেক উপরে তুলে দিয়েছে। আপনি যেন ভেসে উঠলেন আমার দৃষ্টির সামনে। আপনার বাম কনুইয়ের কাছে বাঁশের টেবিলে যে জাপানী ছাইদানিটা রয়েছে দয়া করে তাতেই ছাইটা ফেলুন।”
তাঁর বলার ধরন যেন অধ্যাপক ক্লাসের ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা করছেন। ঘোরা-চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে তিনি বসেছেন আমার একেবারে মুখোমুখি, মাথাটা পিছনে হেলানো, চোখ দুটো মোটা ভুরুতে আধ-ঢাকা। হঠাৎ একটু ঘুরে বসে টেবিলের স্তূপীকৃত কাগজপত্রের মধ্যে কী যেন খুঁজতে লাগলেন। তারপর একটা পুরনো, অত্যন্ত জীর্ণ স্কেচ-বুক হাতে নিয়ে আবার আমার দিকে ঘুরে বসলেন।
বললেন, “আপনার সঙ্গে এবার কথা বলব দক্ষিণ আমেরিকা নিয়ে। দয়া করে কোনও মন্তব্য করবেন না। প্রথমেই বলে রাখি, আমার পরিষ্কার অনুমতি ব্যতিরেকে আপনাকে এখন যা কিছু বলব তার কোনও কথাই আপনি জনসাধারণকে বলতে পারবেন না। এটাই আমার ইচ্ছা। যতদূর মনে হয়, সে অনুমতি দেবার কোনও সম্ভাবনা নেই। পরিষ্কার?”
“খুবই শক্ত কথা”, আমি বললাম। “নিশ্চয়ই কোনও সুবিবেচিত বিবরণ—‘
নোট-বইটাকে তিনি টেবিলের উপর রেখে দিলেন।”
বললেন, “এখানেই সমাপ্ত। আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনার সকালটা শুভ হোক।”
চেঁচিয়ে বললাম, “না, না। যে কোনও শর্তই আমি মেনে নিচ্ছি। যতদূর বুঝতে পারছি, আমি অনন্যোপায়।”
“কোনও উপায় নেই।”
“বেশ, কথা দিলাম।”
তাঁর দুটি উদ্ধত চোখে সন্দেহের ঝিলিক।
“যাই বলুন, আপনার সম্পর্কে আমি কতটুকুই বা জানি?”
রেগে বললাম, “আপনি বড় বেশি সুযোগ নিচ্ছেন স্যার। জীবনে এত অপমানিত আমি কখনও হইনি।”
আমার কথায় রাগের বদলে তার আগ্রহ বাড়ল।
বিড় বিড় করে বলতে লাগলেন, “গোল মাথা, হ্রস্ব করোটি, ধূসর চক্ষু, কৃষ্ণ কেশ, নিগ্রোজাতীয়। আপনি নিশ্চয় সেল্টিক?”
“আমি আইরিশম্যান স্যার।”
“আইরিশ আইরিশ?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“হতেই হবে। তাহলে শুনুন। প্রথমত, আপনি হয়তো জানেন যে দু’বছর আগে আমি দক্ষিণ আমেরিকা পরিভ্রমণে গিয়েছিলাম। ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম, কিন্তু সেখানে এমন একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটল যাতে অনুসন্ধানের একটা সম্পূর্ণ নতুন পথ আমার সামনে খুলে গেল।
“আপনি তো জানেন—হয়তো এই অর্ধশিক্ষিতের যুগে নাও জানতে পারেন—যে আমাজন নদীর আশপাশের অনেক অঞ্চল এখনও আংশিকভাবে অনাবিষ্কৃত রয়েছে, আর এমন অসংখ্য উপনদী এসে মূল নদীতে পড়েছে যাদের গতি-পথের কোনও খবরই কেউ জানে না। আমার প্রধান কাজ ছিল সেই স্বল্পজ্ঞাত অনগ্রসর দেশটাকে দেখা এবং তার জীবজন্তুর খোঁজ-খবর করা। তারই ফলে এত সব উপাদান আমি সংগ্রহ করেছিলাম যাতে জীববিজ্ঞান সম্পর্কে আমার জীবনের কীর্তিস্বরূপ মহাগ্রন্থখানির বেশ কয়েকটি অধ্যায় ভরে উঠেছে। কাজ শেষ করে ফিরে আসছিলাম, পথে একটা ছোট গ্রামে একটা রাত কাটাতে হলো। গ্রামটা যেখানে অবস্থিত একটা উপনদী এসে সেখানেই মূল নদীতে পড়েছে। সেখানকার অধিবাসীরা কুকামা ইন্ডিয়ান, ভদ্র অথচ অনুন্নত জাতি, মানসিক ক্ষমতা গড় লন্ডনবাসীর চাইতে বেশি নয়। নদীর উজানে যাবার সময় তাদের কয়েকজনের রোগ সারিয়ে দিয়েছিলাম; ফলে আমার প্রতি তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধাও বেড়ে গিয়েছিল। তাই আমি কবে আবার ঐ পথে ফিরব তার জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ছিল। তাদের কিছু কিছু লক্ষণ দেখে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম যে তাদের চিকিৎসা হওয়া দরকার। গ্রাম-প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে একটা কুঁড়েঘরে গেলাম। ঘরে ঢুকেই দেখলাম, রোগীটি সবেমাত্র মারা গেছে। আরও অবাক হলাম, লোকটি ইন্ডিয়ান নয়, একজন শ্বেতকায়। পরনে ছেঁড়া পোশাক, কঙ্কালসার চেহারা, দীর্ঘ পরিশ্রমের ছাপ সারা দেহে। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে যতদূর জানতে পারলাম, লোকটি তাদের সম্পূর্ণ অপরিচিত, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে তাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছিল একাকি আর তখন তার একেবারে শেষ অবস্থা।
“লোকটির ঝোলাটা কোচের পাশেই পড়ে ছিল। তার ভিতরে কী আছে ভাল করে দেখলাম। একটুকরো কাগজে তার নাম লেখা ছিল—ম্যাল্ হোয়াইট, লেক অ্যাভেনিউ, ডেট্রয়েট, মিশিগান। এটি এমন একটি নাম যার প্রতি মাথার টুপি তুলে ধরতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত।
“ঝোলার জিনিসপত্র দেখে বোঝা গেল, লোকটি শিল্পী ও কবি, বিষয়বস্তুর সন্ধানে ফিরছিল। টুকরো টুকরো কবিতাও পাওয়া গেল। নিজেকে কাব্যের বিচারক বলে মনে করি না, তবু মনে হলো সেগুলি নেহাৎই বাজে। আর ছিল কিছু অতিসাধারণ নদীর দৃশ্যের ছবি, একটা রংয়ের বাক্স, এক বাক্স রঙিন চক, কয়েকটা বুরুশ, আমার দোয়াত-দানির উপর রাখা ঐ বাঁকানো হাড়ের টুকরো, বাক্সটার উপর লেখা ‘পতঙ্গ ও প্রজাপতি’ এক খণ্ড, একটা সস্তা রিভলবার, আর কয়েকটা কার্তুজ। নিজস্ব জিনিসপত্র কিছুই ছিল না, কিংবা পথ চলতে হারিয়ে গিয়েছিল। অপরিচিত মার্কিন ভবঘুরে লোকটির এই ছিল মোট সম্পত্তি।
“ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, এমন সময় চোখে পড়ল তার ছেঁড়া কুর্তার সামনের দিকে কি যেন বেরিয়ে আছে। এই স্কেচ-বইটা; আজকের মতোই সেদিনও ছিল জরাজীর্ণ। সত্যি বলছি, এই অভিজ্ঞানটি হাতে আসার পর থেকেই এটাকে আমি শেক্সপীয়রের প্রথম ফোলিওর চাইতেও অধিকতর শ্রদ্ধার সঙ্গে রক্ষা করে এসেছি। এটা আপনার হাতে দিলাম; আমি চাই, এর প্রত্যেকটি পাতা উল্টে সব কিছু ভাল করে দেখুন।”
একটা চুরুট মুখে দিয়ে তিনি চেয়ারে হেলান দিলেন; দুই চোখে অনুসন্ধিৎসার তীব্র ঝলক।
অনেক প্রত্যাশা নিয়ে খাতাটা খুললাম। প্রথম পাতাটা হতাশাব্যঞ্জক; আঁটা কুর্তা-পরা একটি খুব মোটা লোকের ছবি ছাড়া আর কিছু নেই; নিচে লেখা ‘ডাক- নৌকোয় জিমি কলভার।’ পরের কয়েকটা পাতায় শুধু ইন্ডিয়ানদের জীবনযাত্রার ছবি। কিছু নারী ও শিশুর ছবি। তারপর পর পর অনেকগুলি জীবজন্তুর ছবি, নিচে লেখা “বালুবেলায় মানাতী”, “কচ্ছপ ও তাদের ডিম”, “মিরিতি গাছের নিচে কালো আজেতি।” এমনি আরও অনেক ছবি।
চোখ তুলে তাকালাম। তিনি গম্ভীর মুখে হাসছেন।
বললেন, “পরের পাতাটা দেখুন।”
একটা রঙিন নিসর্গ দৃশ্য। খাড়া পাহাড়। তার মাথায় একটা প্রকাণ্ড গাছ। পিছনে নীল আকাশ। সবুজ বন-রেখা।
“তারপরের পাতা।”
পাতা উল্টেই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলাম। একটি অসাধারণ জন্তুর পূর্ণ- পৃষ্ঠা ছবি। এ রকম জন্তু কখনও দেখিনি। বুঝি কোনও আফিম-খোরের উদ্ভট স্বপ্ন, অথবা কোনও বিকারগ্রস্তের কাল্পনিক দৃশ্য। মাথাটা মোরগের মতো, স্ফীতকায় গিরগিটির মতো শরীর, আঁকাবাঁকা লেজ বরাবর উঁচু উঁচু শিক, বাঁকানো পিঠটা করাতের দাঁতের মতো দেখতে। জন্তুটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি অবাস্তব খুদে মানুষ, অথবা মনুষ্যাকৃতির একটি বামন; সে হাঁ করে জন্তুটার দিকে তাকিয়ে আছে।
জয়গৌরবে দুই হাত ঘষতে ঘষতে অধ্যাপক বলে উঠলেন, “এটা সম্পর্কে কি মনে করেন?”
“ছবিটা দানবীয়—কিম্ভুত।”
“কিন্তু এ রকম একটা ছবি লোকটি আঁকল কেন?”
“আমার তো মনে হয় একটা ব্যবসায়ী চাল।”
“তাই বুঝি! এটাই আপনার মনে সেরা ব্যাখ্যা বলে মনে হলো?”
“আপনি কি ব্যাখ্যা দেবেন স্যার?”
“একটা কথা স্পষ্ট যে এরকম জীবরে অস্তিত্ব আছে। একটি জীবন্ত প্রাণীর ছবিই এখানে আঁকা হয়েছে।”
বারান্দায় ক্যাথরিন চাকার মতো গড়ানের ছবিটা তখনও আমার চোখের সামনে ভাসছিল, অন্যথায় আমি হয়তো হো-হো করেই হেসে উঠতাম।
বুড়ো মানুষটিকে খুশি করার মতো করে বললাম, “কোনও সন্দেহ নেই, কোনও সন্দেহ নেই। তবে ঐ মানবের মূর্তিটাই আমাকে কেমন যেন ধাঁধায় ফেলেছে। ওটা যদি কোনও ইন্ডিয়ান হত তাহলেও না হয় আমেরিকার কোনও বামন-গোষ্ঠীর লোক বলে ভাবতে পারতাম। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে ওটি রোদ-টুপি মাথায় জনৈক ইওরোপীয়।”
অধ্যাপক ক্রুদ্ধ ষাঁড়ের মতো গর্জে উঠলেন। বললেন, “সত্যি, আপনি সীমানার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। সম্ভাবনা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিকেই আপনি প্রসারিত করে দিয়েছেন। মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত! মানসিক অসারতা! আশ্চর্য!”
এ লোকের উপর রাগ করা বৃথা। ক্লান্ত হাসির সঙ্গে শুধু বললাম, “আমার কেবল মনে হয়েছে যে লোকটি ক্ষুদ্রকায়।”
ছবিটার দিকে লোমশ আঙুল বাড়িয়ে তিনি বলে উঠলেন, “এদিকে দেখুন! জন্তুটার পিছনে একটা গাছ দেখছেন, আপনি হয়তো ভেবেছেন ওটা কোনও স্কুলের গাছ অথবা ব্রাসেল্স্ অংকুর—তাই না? আসলে ওটা একটা তালগাছ; এ ধরনের তালগাছ প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ফুট উঁচু হয়। লোকটিকে যে ইচ্ছা করেই ছবিতে রাখা হয়েছে তাও কি বুঝতে পারছেন না? নিশ্চয়ই শিল্পী স্বয়ং ওই জন্তুটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবিটা আঁকেনি। নিজেকে এঁকেছে শুধু উচ্চতা বোঝাবার জন্য। যদি বলি যে লোকটির উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি, তাহলে নিশ্চয় আশা করব যে গাছটা তার চাইতে দশগুণ বড়।”
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী আশ্চর্য! তাহলে আপনি মনে করেন যে জন্তুটা—আরে, তাহলে তো চেরিংক্রশ স্টেশনটাও এ জন্তুর উপযুক্ত খাঁচার কাজ করতে পারবে না।”
অধ্যাপক শান্ত গলায় বললেন, “বাড়াবাড়ির কথা ছেড়ে দিলেও ওটা নিশ্চয়ই খুব বৃহৎ আকারের একটি জন্তু।”
আমি চেঁচিয়ে বললাম, “একটিমাত্র ছবির জন্যও তো আর মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে নস্যাৎ করা যায় না। একজন বাউণ্ডুলে মার্কিন শিল্পী হ্যাশীশের নেশায়, বা জ্বর-বিকার ঘোরে, অথবা খেয়ালি কল্পনার খোরাক যোগাতে একটা ছবি এঁকেছে। বিজ্ঞানের লোক হয়ে আপনি তো তাকে সমর্থন করতে পারেন না।”
উত্তর হিসাবে অধ্যাপক তাকের উপর থেকে একটা বই নামিয়ে আনলেন। বললেন, “আমার পণ্ডিত বন্ধু রে ল্যাংকেস্টারের লেখা একখানা চমৎকার বই। একটা ছবি আছে যা দেখতে আপনার ভাল লাগবে। এই যে ছবিটা। নিচে লেখা রয়েছে : ‘জুরাসিক ডাইনোসর স্টেগোসরাস-এর সম্ভাবিত জীবন্ত মূর্তি।’ পিছনের পাটাই তো যে কোনও মানুষের দ্বিগুণ উঁচু। এ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন?”
তিনি খোলা বইটা আমার হাতে দিলেন। লুপ্ত জগতের এই কল্পিত প্রাণীটি দেখতে অনেকটাই অজ্ঞাত শিল্পীর আঁকা রেখাচিত্রটির অনুরূপ।
“এটা খুবই উল্লেখযোগ্য”, আমি বললাম।
“তবু আপনি এটাকে চূড়ান্ত বলে স্বীকার করছেন না?”
“অবশ্যই মিলটা আকস্মিকও হতে পারে, অথবা এই মার্কিন লোকটি হয়তো এ রকম কোনও ছবি দেখে সেটাকে মনে করে রেখেছিল। পরে জ্বর-বিকারের মধ্যে সেই স্মৃতি জেগে ওঠা খুবই স্বাভাবিক।”
অধ্যাপক যেন আমার বক্তব্যকে মেনে নিয়েই বললেন, ‘খুব ভাল কথা। এ আলোচনা থাক। এবার এই হাড়টা একবার দেখুন তো।” মৃত লোকটির জিনিসপত্রের মধ্যে পাওয়া হাড়টা তিনি আমার হাতে দিলেন। হাড়টি প্রায় ছ’ইঞ্চি লম্বা, আমার বুড়ো আঙুলের চাইতে মোটা, একদিকে শুকনো উপাস্থির চিহ্ন রয়েছে।
“এই হাড়টি কোন পরিচিত প্রাণীর হতে পারে?” অধ্যাপক শুধালেন।
হাড়টাকে ভাল করে দেখলাম; অর্ধ-বিস্মৃত কিছু তথ্য মনে করতে চেষ্টা করলাম।
বললাম, “এটা কোনও মানুষের অত্যন্ত ঘনবদ্ধ কণ্ঠাস্থি হতে পারে।”
আমার সঙ্গীটি একান্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাতটা নাড়তে লাগলেন।
“মানুষের কণ্ঠাস্থি হয় বাঁকানো। এটা সোজা। এটার উপরে একটা খাঁজ কাটা আছে। তা দেখে মনে হয় এটার উপরে একটা শিস ছিল। কণ্ঠাস্থির বেলায় সেটা থাকে না।”
“তাহলে তো আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে এটা কি তা আমি জানি না।” “এ অজ্ঞতা প্রকাশে আপনার লজ্জিত হবার কোনও কারণ নেই, কারণ গোটা দক্ষিণ কেসিংটনের কোনও মানুষ এটার নাম বলতে পারবে বলে আমি মনে করি না।” ছোট ওষুধের বাক্স থেকে মটরশুঁটির আকারের একটা ছোট হাড় তিনি বের করলেন। “আমি যতদূর বুঝি মানুষের এই হাড়টি আপনার হাতের হাড়টির অনুরূপ। এ থেকেই জন্তুটির আকৃতির একটা ধারণা আপনি করতে পারবেন। উপাস্থিটি দেখেই বুঝতে পারছেন এটা কোনও জীবাশ্ম নয়, সাম্প্রতিক কালের হাড়। এ বিষয়ে আপনার কি বক্তব্য?”
“নিশ্চয় কোনও হাতির—”
তার মুখ যে যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল।
“না, না! দক্ষিণ আমেরিকায় হাতি আছে এমন কথা বলবেন না।”
বাধা দিয়ে বললাম, “তাহলে দক্ষিণ আমেরিকার কোনও বৃহদাকার প্রাণী—যেমন ধরা যাক তাপির।”
“না, এটা তাপির অথবা জীববিজ্ঞানে স্বীকৃত অন্য কোনও প্রাণীর হাড় নয়। অত্যন্ত বৃহৎ, অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বভাবতই অত্যন্ত হিংস্র এমন কোনও প্রাণীর হাড় এটা যা এই পৃথিবীর বুকেই আছে, অথচ এখনও বিজ্ঞান তার কোনও হদিস পায়নি। এখনও আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“আমার আগ্রহ কিন্তু খুবই বেড়েছে।”
“যাক, তাহলে এখনও নিরাশ হবার কারণ দেখা দেয়নি। কিন্তু লোকটির কথা থাক, এবার আমার বিবরণে ফিরে যাই। ব্যাপারটাকে ভাল করে না জেনে আমাজন-অঞ্চল থেকে ফিরতে পারলাম না। মৃত পথিকটি কোন দিক থেকে এসেছিল তার কিছু কিছু হদিস মিলল। ইন্ডিয়ানদের গল্প-কথাকেই পথ-প্রদর্শক রূপে মেনে নিলাম, কারণ এই নদীপ্রধান অঞ্চলের সব উপজাতিগুলির মধ্যেই একটা বিচিত্র দেশের গুজব শোনা গেল। কুরুপুরির কথা নিশ্চয় শুনেছেন?”
“কখনও শুনিনি।”
“কুরুপুরি হচ্ছে জঙ্গলের দেবতা, নৃশংস ও বিদ্বেষপরায়ণ; তার থেকে দূরে থাকাই ভাল। কেউ তার আকৃতি বা স্বভাবের কোনও বর্ণনা দিতে পারে না, কিন্তু আমাজনের দুই তীরের লোকজনদের কাছে সে এক আতঙ্কস্বরূপ। কুরুপুরি কোন দিকে বাস করে সে বিষয়ে সকলেই একমত। আর মার্কিন পথিকটিও এসেছিল সেই দিক থেকেই। সে দিকটাতে অবশ্যই ভয়ঙ্কর কিছু আছে। সেটা কী তা আমাকে জানতেই হবে।”
“আপনি কি করেছিলেন?” আমার আগ্রহ বেড়েই চলেছে।
“স্থানীয় অধিবাসীদের তীব্র অনিচ্ছা ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও একদিন সেই পথে যাত্রা করলাম। উপহারের লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে পথ-প্রদর্শক হিসাবে তাদের দুজনকে দলেও নিলাম। অনেক বিপদ-আপদের ভিতর দিয়ে অনেক পথ পার হয়ে অবশেষে এমন একটা অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলাম যার বিবরণ কোথাও নেই, এবং আমার হতভাগ্য পূর্বসূরী ছাড়া আর কেউ সেখানে পা ফেলেনি। দয়া করে এটা দেখবেন কি?”
হাফ-প্লেট আকারের একটা ফটোগ্রাফ তিনি আমার হাতে দিলেন।
বললেন, “ফটোটা এত খারাপ হবার কারণ ভাঁটিতে যাবার সময় নৌকো উল্টে গিয়ে ডেভালপ না-করা ফিল্মগুলো যে বাক্সে ছিল সেটা ভেঙে এই দুর্ঘটনা ঘটায়। প্রায় সবগুলো ফিল্মই নষ্ট হয়ে যায়—সে ক্ষতি অপূরণীয়। কয়েকটিমাত্র রক্ষা পায়। ছবি খারাপ হবার এই কৈফিয়ৎটা দয়া করে মেনে নেবেন। কারণ কথা উঠেছে যে এগুলো নকল। তা নিয়ে কোনও বিতর্কে যাবার ইচ্ছা আমার নেই।”
ফটোটা সত্যি খুব অস্পষ্ট। ভুল ব্যাখ্যা করা কিছু অসম্ভব নয়। একটি নিসর্গ দৃশ্যের ছবি।
বললাম, “ছবিতে যে জায়গাটা আঁকা হয়েছে ফটোটাও সেই জায়গার বলেই আমার বিশ্বাস।
অধ্যাপক বললেন, “ঠিক সেই জায়গা। লোকটির তাঁবুর চিহ্নও আমি দেখেছি। এবার এটা দেখুন।”
ফটোগ্রাফটা খুব বাজে হলেও ঐ একই দৃশ্যের অনেক কাছে থেকে নেওয়া ছবি।
“এটা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই”, আমি বললাম।
“যাহোক, আমরা তাহলে ভালই চলছি। এবার ঐ খাড়া পাহাড়ের মাথাটা লক্ষ্য করুন। কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি?”
“একটা প্রকাণ্ড গাছ।”
“কিন্তু গাছের উপরে?”
“একটা বড় পাখি।” আমি বললাম।
তিনি আমার হাতে একটা ছোট দূরবীন দিলেন। সেটার ভিতর দিয়ে তাকিয়ে বললাম, “ঠিক, একটা বড় পাখি গাছের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটটা বেশ বড়। মনে হয় একটা পেলিক্যান।”
অধ্যাপক বললেন, “আপনার দৃষ্টিশক্তির জন্য অভিনন্দন জানাতে পারছি না। তবে ওটা পেলিক্যান নয়, কোনও পাখিই নয়। জেনে খুশি হবেন যে ঐ প্রাণীটিকে আমি শিকার করেছিলাম। আমার অভিজ্ঞতার একমাত্র এই প্রমাণটিই আমি সঙ্গে করে আনতে পেরেছিলাম।”
“সেটা আপনার কাছে আছে?” শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠোয় একটা প্রমাণ পাওয়া গেল।
“ছিল। দুর্ভাগ্যবশত যে নৌকো-দুর্ঘটনায় আমার ফটোগ্রাফগুলি নষ্ট হয়েছিল তাতে ওটাও হারিয়েছিলাম। জলের ঘূর্ণিতে পাখিটা অদৃশ্য হয়ে যাবার মুখে আমি সেটাকে জাপটে ধরেছিলাম; ডানার কিছুটা আমার হাতেই ছিল। স্রোতের টানে যখন তীরে এলাম তখন আমি অজ্ঞান, কিন্ত সেই চমৎকার প্রাণীর দেহাবশেষটুকু তখনও আমার হাতেই ছিল; সেটা আপনাকে এবার দেখাব।”
টানার ভিতর থেকে বের করে যে বস্তুটি তিনি দেখালেন সেটাকে একটা বড় বাদুড়ের ডানার উপরের অংশ বলে মনে হলো; অন্তত দু’ফুট লম্বা একটা বাঁকা হাড়, নিচে একটা ঝিল্লির আবরণ।
“একটা দানবীয় বাদুড়!” আমি বললাম।
প্রফেসর কঠিন কণ্ঠে বললেন, “মোটেই তা নয়। একটা শিক্ষিত, বৈজ্ঞানিক পরিবেশে বাস করে আমি এ কথা ভাবতেই পারি না সে জীববিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বগুলিও আমাদের কাছে এত অজানা থাকতে পারে। এটা কি কখনও সম্ভব হতে পারে যে তুলনামূলক শরীর-সংস্থান বিদ্যার প্রাথমিক কথাগুলিও আপনি জানবেন না? পাখির ডানা আসলে তার বাহুর ঊর্ধ্বাংশ, আর বাদুড়ের ডানায় থাকে মাঝখানে ঝিল্লি দিয়ে যুক্ত তিনটে লম্বা আঙুল। অথচ এক্ষেত্রে এই হাড়টা বাহুর ঊর্ধ্বাংশও নয়, আবার দেখতেই তো পাচ্ছেন যে এখানে একটিমাত্র হাড়ের উপর একটিমাত্র আবরণ ঝুলে আছে; কাজেই এ হাড় কোনও বাদুড়ের হতে পারে না। কিন্তু এটা যদি পাখিও না হয়, আবার বাদুড়ও না হয়, তাহলে এটা কি?”
আমার যৎসামান্য জ্ঞান-ভাণ্ডার ততক্ষণে নিঃশেষিত।
বললাম, “সত্যি আমি জানি না।”
প্রফেসর পূর্বে উল্লেখিত গ্রন্থের পাতা খুললেন। একটা অসাধারণ উড়ন্ত দানবের ছবি দেখিয়ে বললেন, “এই ছবিটা জুরাসিক যুগের উড়ন্ত সরীসৃপ ডাইমোরফডেন অথবা টেরোড্যাক্টিল-এর একটি চমৎকার প্রতিকৃতি। পরের পাতাতেই তার ডানার গঠন-ভঙ্গির একটা ছবি আছে। দয়া করে আপনার হাতের বস্তুটির সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে দেখুন।”
দুটোকে মিলিয়ে দেখতেই আমার মনের মধ্যে বিস্ময়ের একটা ঢেউ খেলে গেল। আমি বিশ্বাস করলাম। তাছাড়া উপায় নেই। রেখাচিত্র, ফটোগ্রাফ, বিবরণ এবং সর্বশেষ একটি সত্যিকারের নিদর্শন—সব কিছু মিলিয়ে একেবারে অভ্রান্ত প্রমাণ। মহা উৎসাহে সেই কথাই তাঁকে বললাম।
“আজ পর্যন্ত যত প্রাণীর কথা শুনেছি এটাই তার মধ্যে বৃহত্তম। প্রচণ্ড বড়। আপনি তো বিজ্ঞানের এক নতুন কলম্বাস; একটি লুপ্ত জগৎ আপনি আবিষ্কার করেছেন। আপনাকে সন্দেহ করেছিলাম বলে আমি সত্যই ভীষণ দুঃখিত। এ সবই অচিন্ত্যনীয় ছিল। কিন্তু প্রমাণ পেলে আমি তা বুঝতে পারি, আর এ প্রমাণ তো যে কোনও লোকের পক্ষেই যথেষ্ট।”
প্রফেসর খুশিতে ঘড় ঘড় শব্দ করে উঠলেন।
“তারপর স্যার, তারপর আপনি কি করলেন?”
“মি. ম্যালোন, সেটা ছিল বর্ষাকাল, আর আমার খাবারদাবারও ফুরিয়ে গিয়েছিল। সেই বড় পাহাড়টার কিছু অংশ আবিষ্কার করেছিলাম, কিন্তু সেটাকে পার হবার কোনও পথ খুঁজে পেলাম না। যেখানে দাঁড়িয়ে টেরোড্যাক্টিলটাকে গুলি করেছিলাম, সেটা তবু অনেক সুগম ছিল। পাহাড়ে ওঠার অভ্যাস ছিল তাই অর্ধেকটা উঠতে পেরেছিলাম। সেখান থেকে নিচের উপত্যকাটাকে আরও ভালভাবে দেখতে পেলাম। প্রকাণ্ড উপত্যকা; পূর্বে বা পশ্চিমে কোথাও তার সীমারেখা নেই। নিচে একটা স্যাৎসেঁতে জঙ্গল-ঢাকা অঞ্চল—সাপ, পোকা-মাকড় ও জ্বরে পরিপূর্ণ। প্রকৃতিই যেন সেই অপূর্ব দেশটাকে সব কিছু থেকে রক্ষা করছে।”
“জীবনের আর কোনও চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন কি?”
“না, তা পাইনি; কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে শিবির ফেলে যে সপ্তাহটা কাটিয়েছিলাম তখন উপর থেকে আসা খুব বিচিত্র সব শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। “কিন্তু মার্কিন শিল্পী যে ছবিটা এঁকেছিল, তার সম্পর্কে কিছু বলুন।”
“আমরা শুধু এটাই অনুমান করতে পারি যে সে পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিল এবং সেখানেই প্রাণীটিকে দেখেছিল। কাজেই বোঝা যাচ্ছে যে উপরে উঠবার একটা পথ আছে। আরও বোঝা যাচ্ছে যে সে পথটা খুবই দুর্গম; তা না হলে সেই প্রাণীগুলো নিচে নেমে এসে সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ত। এবার নিশ্চয় ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে?”
“কিন্তু সে প্রাণীগুলো সেখানে এল কেমন করে?”
প্রফেসর বললেন, “এটাও খুব শক্ত সমস্যা কিছু নয়। ব্যাখ্যা তো একটাই হতে পারে। আপনি অবশ্যই শুনেছেন যে দক্ষিণ আমেরিকা গ্র্যানিট পাথরের দেশ। সুদূর অতীতে এই বিশেষ স্থানটির অভ্যন্তরে কোনও আকস্মিক ভূকম্পন ঘটেছিল। তাই এই সব পাহাড় কালো পাথরে গড়া, আর সেটা অন্তর্নিহিত তাপের ফল। প্রায় সাসেক্সের মতো সমপরিমাণ একটি অঞ্চল তার সব কিছু জীবজন্তুসহ ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়েছিল, আর চারদিকে কঠিন খাড়া পাহাড় মহাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে এটাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তার ফল কী হতে পারে? প্রকৃতির সাধারণ আইন-কানুনগুলি এর বেলায় ঘটেনি। অন্য পরিবেশে যে সব প্রাণীর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কথা তারাই বেঁচে রইল। লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন যে টেরোড্যাক্টিল ও স্টেগোসরাস এই উভয় শ্রেণীই জুরাসিক, আর তাই জীবনযাত্রার পর্যায়ে অনেক বেশি প্রাচীন। কতকগুলি আকস্মিক পরিবেশই তাদের কৃত্রিম উপায়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল।”
“আপনার প্রমাণ যে চূড়ান্ত সেটা নিশ্চিত। এবার আপনার একমাত্র কাজ হবে সব কিছুকে যোগ্য কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা।”
প্রফেসর তিক্তেস্বরে বললেন, “সরল বুদ্ধিতে আমি তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু অজ্ঞতা ও ঈর্ষাবশত সকলেই আমাকে অবিশ্বাস করেছে। ফলে সাধারণের সামনে এ সব প্রমাণ উপস্থিত করিনি। অবশ্য আজ রাতে আবেগের উপর ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতার একটা চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। আজ সেই প্রদর্শনীতে আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।” তিনি ডেস্ক থেকে একটা কার্ড বের করে আমাকে দিলেন, “খ্যাতনামা প্রকৃতিবিজ্ঞানী মি. পার্সিভাল ওয়ার্ল্ডন আজ সাড়ে আটটায় জুলজিক্যাল ইন্সটিট্যুটে একটা বক্তৃতা দেবেন। বিষয় : “কালের স্বাক্ষর’। বক্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য আমাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।”
আমি সাগ্রহে বলে উঠলাম, “আমি যেতে পারব।”
তিনি সাদরে বললেন, “নিশ্চয়। অবশ্যই আসবেন। এটা ভেবে আমি সান্ত্বনা পাব যে বিষয়বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞ অক্ষম হলেও আমার একটা বন্ধু অন্তত হলে আছেন। আসলে কথার জাহাজ হলেও ওয়ালড্রনের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট, আর তাই তার বক্তৃতা শুনতে জনসমাবেশও হবে প্রচুর। দেখুন মি. ম্যালোন, অনেক বেশি সময় আপনাকে দিয়েছি, কিন্তু আর নয়। আজ রাতে আপনাকে বক্তৃতায় হাজির থাকতে দেখলে খুশি হব। ইতিমধ্যে মনে থাকে যেন, আপনাকে যা কিছু বললাম তার কিছুই জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা চলবে না।
“কিন্তু মি. ম্যাক্আর্ডল—আমার বার্তা-সম্পাদক তো জানতে চাইবেন আমি এতদিন কি করেছি।”
“তাকে যা খুশি তাই বলবেন। দরকার হলে বলতে পারেন যে ভবিষ্যতে তিনি যদি আর কাউকে আমার কাছে পাঠান তাহলে একটা ঘোড়ার চাবুক নিয়ে আমিই গিয়ে তার কাছে হাজির হব। কিন্তু এসব কথা যেন ছাপা না হয় সে দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার। ঠিক আছে। আজ রাত সাড়ে আটটায় জুলজিক্যাল ইন্সটিট্যুট হলে দেখা হবে।” হাতের ইঙ্গিতে তিনি আমাকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। শেষ বারের মতো তার রক্তিম গাল, নীল ঢেউ-খেলানো দাড়ি আর দুটি অসহিষ্ণু চোখ আমার নজরে পড়ল।
