চ্যালেঞ্জার তাঁর সারা জীবনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা লাভ করলেন
শিকারের সব ব্যবস্থাই করা হলো। ফাঁদ বা জাল পাতা হলো। নীচে গর্ত খনন করা হলো। উৎকৃষ্ট শিকারের পশু যাতে সেই গর্তের মধ্যে পড়ে সেজন্য শিকারীরা সব প্রস্তুত হয়ে রইল।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, এই যে শিকার শিকারীদের দ্বারা ঠিক মতো তাড়িত হয়ে এই দিকে আসবে কি না? যদি চ্যালেঞ্জারকে বলা হয় যে একটি অনুষ্ঠান করা হচ্ছে পরলোকবাসী প্রেতাত্মাদের যোগাযোগের বোধগম্য সাক্ষ্যপ্রমাণ তাঁর সামনে উপস্থাপিত করার জন্য তাহলে তাঁর বুকের মধ্যে ক্রোধ ও উপহাসের এক মিশ্রিত অনুভূতি জাগবে। কিন্তু চতুর ম্যালন এনিডের সহায়তায় চ্যালেঞ্জারের কাছে এই যুক্তি দেখাল যে তাঁর উপস্থিতি প্রেতচর্চার আসরে সম্ভাব্য প্রতারণার হাত থেকে দর্শকদের রক্ষা করবে। তিনি সেখানে নিজে উপস্থিত থেকে সবকিছু দেখে কীভাবে দর্শকরা মিডিয়াম ও কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রতারিত হয় তা দেখিয়ে দেবেন। এই কথা বুঝে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ম্যালনের প্রস্তাবে ঘৃণার সঙ্গে নিতান্ত অনুগ্রহ করার ভাব দেখিয়ে সম্মতি দিয়ে তাঁর এই উপস্থিতি দ্বারা অধিবেশনকে সম্মানিত করতে রাজি হলেন। তবে তাঁর মতে এই ধরনের সভা আদিকালের প্রস্তর যুগের বর্বর অধিবাসীদের মধ্যে কোনও পাথরের ঘরে অনুষ্ঠিত হলেই ভাল হত। তাঁর মতো একজন ব্যক্তি যার মধ্যে এই বৈজ্ঞানিক সভ্যতার যুগে জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিক্ষা-সংস্কৃতির সুফলগুলি দীর্ঘকাল ধরে সঞ্চিত হয়েছে তাঁর পক্ষে এই ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া মানায় না। অর্থাৎ তিনি নিজেকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধি হিসাবে মনে করেন।
এনিড তার বাবার সঙ্গে সভায় গেল। মি. চ্যালেঞ্জার তাঁর সঙ্গে আর একজন সঙ্গীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। একে ম্যালন ও অন্য সকলের অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছিল। এই সঙ্গীটি ছিল একজন স্কচ যুবক। তার চেহারাটা ছিল লম্বা ও মোটাসোটা, হাড় শক্ত ও বলিষ্ঠ। তার মুখখানা ছিল নিরেট গাম্ভীর্য ভরা। কোনও দিকেই তার দৃষ্টি ছিল না। এই পরলোকতত্ত্বের ঠিক কোন বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল তা তাকে দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তার কাছ থেকে জানা যায় তার নাম নিকল।
ম্যালন ও মেইলি হল্যান্ড পার্কে নির্দিষ্ট স্থানে চলে গেল। যেখানে ডেলিসিয়া আগে থেকে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। এছাড়া সেখানে আর যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন রেভারেন্ড চার্লস ম্যাসন, সাইকিক কলেজের মি. ও মিসেস অগিলিভি, হ্যামারস্মিথের মি. বলশোভার আর লর্ড রক্সটন যিনি পরলোকতত্ত্ব বিষয়ে খুবই আগ্রহী এবং এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই সব সমবেত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনও মতের মিল ছিল না। কোনও বিষয়ে তাঁরা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারতেন না।
অধিবেশনের হলঘরে টম লিনডেন প্রবেশ করে একটা আর্মচেয়ারে বসলেন। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে লিনডেনের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। তাদের মধ্যে অনেকেই আগের থেকেই তাঁর চেনা এবং তাঁর বন্ধু।
মি. চ্যালেঞ্জার এমন একটা ভাব দেখাতে লাগলেন যাতে মনে হয় তিনি কোনও বাজে জিনিস সহ্য করবেন না। তিনি অসন্তোষের সঙ্গে টম লিনডেনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনিই কি মিডিয়াম?
টম লিনডেন বললেন, হ্যাঁ।
চ্যালেঞ্জার আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ওঁকে কি সার্চ করে দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে আপত্তিকর কিছু আছে কিনা?
না, এখনও সার্চ করা হয়নি।
কে তাঁকে সার্চ করবেন।
দু’জন লোককে এই কাজের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জারের মনে সন্দেহের আভাস পাওয়া গেল।
সেই দু’জন লোক কে?
পরামর্শ করে ঠিক করা হয়েছে আপনি ও আপনার সঙ্গী নিকল এই কাজ করবেন। পাশের ঘরটাই হলো শোয়ার ঘর।
বেচারা লিনডেন দু’জনের মাঝখানে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে তিনি যেন তাঁর কারাকক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আগে থেকেই তাঁর ভয় করছিল। তার উপর এই সার্চের পরীক্ষা আর মি. চ্যালেঞ্জার-এর মতো উগ্র প্রকৃতির লোকের উপস্থিতি তাঁর ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি মেইলিকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে সকরুণভাবে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, আমার মনে হয় আজকের এই অধিবেশনে কোন সুফল পাওয়া যাবে না। আমার মতে আজকের অধিবেশন স্থগিত রাখা উচিৎ।
মেইলি লিনডেনের কাঁধের উপর হাত বোলাতে লাগল। আর মিসেস লিনডেন তার একটা হাত ধরল।
মেইলি বলল, সব ঠিক আছে টম, ভয়ের কিছু নেই। মনে রাখবে তোমার একদল বন্ধু তোমাকে ঘিরে আছে। যারা তোমার উপর কোনও দুর্ব্যবহার সহ্য করবে না। এরপর মেইলি চ্যালেঞ্জারকে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, একটা কথা মনে রাখার জন্য অনুরোধ করছি, স্যার। মনে রাখবেন মিডিয়াম হচ্ছে গবেষণাগারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মতেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম। খুবই সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। ওরা তিনজন ফিরে এলে মেইলি জিজ্ঞাসা করল, আমার মনে হয় এর কাছে আপনি আপত্তিকর কিছুই পাননি।
চ্যালেঞ্জার বললেন—না, কিছুই পাইনি স্যার আর উনি তো বলেই দিয়েছেন আজকের অধিবেশনে কোনও ফল পাওয়া যাবে না।
মেইলি বলল, উনি একথা বলছেন কারণ আপনার আচরণে উনি বিচলিত হয়ে পড়েন। আপনার ওর সঙ্গে আরও শান্তভাবে ব্যবহার করা উচিৎ ছিল।
চ্যালেঞ্জার তাঁর জীবনে এর আগে তাঁর কোনও কাজের সংশোধন করেছেন এরকম কোনও অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। এমন সময় তাঁর দৃষ্টি মিসেস লিনডেনের উপর পড়ল।
উনি হয়ত মিডিয়ামের স্ত্রী। সুতরাং ওঁকেও সার্চ করা উচিত।
মি. অগিলিভি বললেন, হ্যাঁ তা অবশ্যই করতে হবে। আমার স্ত্রী এবং আপনার কন্যা দু’জনে মিলে এই মহিলাকে সার্চ করে দেখবেন। আমার অনুরোধ স্যার আপনি একটু সহানুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে চলবেন। মনে রাখবেন আমরাও আপনার মতো এ বিষয়ে সমানভাবে আগ্রহী। যদি আপনি এই অধিবেশনে কোনও ব্যাঘাত সৃষ্টি করেন তাহলে এখানে সমবেত সকলেই দুঃখ পাবে।
বলশোভার এমন গাম্ভীর্য ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন, যাতে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন তাঁর বাড়িতে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন। তিনি বললেন, আমি প্রস্তাব করছি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে সার্চ করে দেখা হোক।
চ্যালেঞ্জারের দাড়িটা রাগে কাঁপতে লাগল।
আমাকে সার্চ! কী বলতে চান আপনি?
বলশোভার ভয় পাবার মতো লোক নয়। তিনি বললেন, আপনি এই সভায় শত্রুরূপে এসেছেন, বন্ধুরূপে নয়। আপনি যদি এই সভায় কারও কোনও প্রতারণা প্রমাণ করতে পারেন তবে সেটা হবে আপনার ব্যক্তিগত জয়ের কারণ।
চ্যালেঞ্জার ঢাকের মতো গর্জন করে বললেন, আপনি কি বলতে চান আমি প্রতারণা করতে পারি?
মেইলি মৃদু হেসে বলল, আমরা সকলেই স্যার এই অপরাধে অভিযুক্ত।
চ্যালেঞ্জার তাঁর চারদিকে ক্রুদ্ধ ও জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, এটা এক ভয়ঙ্কর প্রস্তাব।
অগিলভি ছিলেন একজন একগুঁয়ে স্কট। তিনি সহজে ছাড়বার পাত্র নন।
তিনি চ্যালেঞ্জারের কথার উত্তরে বলরেন, অবশ্য আপনি ইচ্ছা করলে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। তবে আপনি যদি এখানে বসে থাকতে চান তাহলে আমাদের শর্ত মেনে নিতে হবে। এটা কখনও বিজ্ঞানসম্মত হবে না যে, যে-ব্যক্তি আমাদের প্রতি তীব্রভাবে শত্রুভাবাপন্ন, তিনি এই ঘরে আমাদের মধ্যে অন্ধকারে বসে থাকবেন তাঁর পকেটে কী আছে, তা না দেখিয়েই।
ম্যালন চিৎকার করে বলল, শোন শোন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং তাঁর সেই সম্মানের উপর আমরা আস্থা স্থাপন করতে পারি।
বলশোভার বলল, খুব ভাল কথা। কিন্তু আমি তো মি. চ্যালেঞ্জারকে মি. ও মিসেস লিনডেনের সম্মানের উপর আস্থা স্থাপন করতে দেখিনি।
অগিলভি বললেন, আমাদের সতর্ক হবার যথেষ্ট কারণ আছে। আমি একথা জোর দিয়ে বলতে পারি অনেক মিডিয়াম যেমন প্রতারণামূলক আচরণ করে তেমনি অনেকে আবার মিডিয়ামদের উপরে প্রতারণামূলক আচরণ করে। আমি এ বিষয়ে বহু দৃষ্টান্তের উল্লেখ করতে পারি। না স্যার, আপনাকে অবশ্যই সার্চ করতে দিতে হবে।
লর্ড রক্সটন বললেন, এতে এক মিনিটও সময় লাগবে না।
ম্যালন বলল, ঠিক আছে, চলে আসুন।
স্ফীত নাসারন্ধ্রদ্বয়সহ লাল চক্ষু, এক ক্রুদ্ধ ষাঁড়ের মতো চ্যালেঞ্জারকে পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাথমিক কাজকর্ম সব শেষ হয়ে গেল। এবার প্রেতচর্চার আসর শুরু হলো।
কিন্তু তার আগেই আসরের অনুকূল আবহাওয়াটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনেক সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন গবেষকরা কোনও মিডিয়ামকে প্রতিটি খুঁটিনাটিসহ পরীক্ষা করতে গিয়ে তার অবস্থাকে বলির মুরগির মতো করে তোলে। তাঁরা মিডিয়ামের উপর সব সময় সন্দিগ্ধদৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখেন, তার ফলে মিডিয়াম ক্রমাগত ব্রিত ও বিপন্ন বোধ করতে করতে আসল কাজটাই মাটি করে ফেলে। কিন্তু ছিদ্রান্বেষী গবেষকরা একথা বুঝতে পারেন না যে তাঁদের সহানুভূতি ও মানুষের প্রতি স্বাভাবিক মমতার অভাবেই কোনও আকাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গেল না।
এর ফলে সারা দেশের মধ্যে ছোটখাট যে সব প্রেতচর্চার আসর বসে সেগুলিতে একটা সহানুভূতি ও শ্রদ্ধার আবহাওয়া থাকে। সেখানে মিডিয়ামরা মুক্ত মনে অবাধে কাজ করতে পারে। কিন্তু নীরস হৃদয়হীন বিজ্ঞানীদের পক্ষে সেইসব আসর দেখা সম্ভব হয় না।
উপবিষ্ট সকলে দেখল প্রাথমিক তর্কবিতর্কের আঘাতে তাদের মন মথিত হয়েছে। কিন্তু সংবেদনশীল ব্যক্তিদের কাছে এইসব তর্কবিতর্কের কোনও অর্থ ছিল না। তাদের শুধু মনে হচ্ছিল পরলোক থেকে আসা যাওয়া করছে। তারা এদিক-ওদিক করছে। কিন্তু নায়াগ্রার জলপ্রপাতের নীচে খরস্রোতা নদীতে যেমন কোনও নৌকা স্থির হতে পারে না, তেমনি এই আসরের বিক্ষুব্ধ পরিবেশে প্রেতাত্মারা স্থির হয়ে কোথাও দাঁড়াতে পারছিল না।
মিডিয়াম হতাশায় আর্তনাদ করে উঠল। ঘরের অবস্থাটা ছিল গোলমালে ভরা। মিডিয়াম ধ্যানাবিষ্ট হয়ে পরলোকের উপর তার মনকে নিবিষ্ট করল। তবে তার মুখ দিয়ে যে সব কথা বেরিয়ে আসছিল তা বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না। মিডিয়ামের মুখে জন কথাটা বেরিয়ে আসছিল। একসময় সে জিজ্ঞাসা করল, জন নামে কারও কোনও মৃত আত্মীয় আছে?
সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জারের মুখ থেকে হাসির শব্দ বেরিয়ে এল। কেউ কোনও উত্তর দিল না। এরপর মিডিয়াম নামের শেষে চ্যাপমান এই উপাধিটা জুড়ে দিল। ‘মেইলি চ্যাপম্যান নামে এক বন্ধুকে হারায়। মেইলির চ্যাপম্যান নামে এক বন্ধুর মৃত্যু হয়।’ মিডিয়ামের মুখ থেকে পরলোক থেকে আসা কিছু বাণী বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু উপস্থিত শ্রোতাদের কারও জীবনের সঙ্গে সে সব বাণী খাপ খেল না। সবকিছুই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। ম্যালনের সব উৎসাহ-উদ্যমের বেলুনটা একেবারে চুপসে গেল। চ্যালেঞ্জার একবার জোর উপহাসের হাসি হাসলেন যে অগলিভি তার প্রতিবাদ করল। তিনি বললেন, আপনার আচরণই ব্যাপারটাকে খারাপ করে তুলছে স্যার। আমি আমার দশ বছরের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনও মিডিয়ামকে এতখানি হতবুদ্ধি হয়ে পড়তে দেখিনি। আপনার আচরণই এর কারণ বলে আমি মনে করি।
চ্যালেঞ্জার সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তা তো বটেই।
মিসেস লিনডেন তার স্বামীকে বলল, আমার মনে হয় এ সবের কোনও দরকার নেই। এখন তুমি কেমন বোধ করছ প্রিয়তম? তুমি কি এখন কাজ বন্ধ করে দিতে চাও?
কিন্তু তার বহিরঙ্গটা শান্ত দেখালেও টম লিনডেন’ ছিল একজন যোদ্ধা। সে কোনও প্রতিকূল পরিবেশে হার মানে না। সে তার স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলল, কাজ বন্ধ করব না। আমার মনটা একটু বিচলিত হয়ে পড়েছিল এই যা। আমি ধ্যানে বসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার শরীরটাও ঠিক হয়ে উঠবে। আলোটা কমিয়ে দেওয়া হলো এবং তা এক ক্ষীণ লাল আভায় পরিণত হলো। মিডিয়ামের ছোট বসার ঘরের পর্দাটা উঠে গেল। দেখা গেল টম লিনডেন ধ্যানে আবিষ্ট হয়ে জোর নিঃশ্বাস ফেলছে। সে কাঠের চেয়ারের উপর হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আছে। তার স্ত্রী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রহরীর মতো। কিন্তু কিছুই ঘটল না। দেখতে দেখতে আধঘণ্টা কেটে গেল, তবু সমবেত দর্শকবৃন্দ ধৈর্য ধারণ করে রইল। একমাত্র চ্যালেঞ্জারই শুধু অধৈর্যভাবে নড়াচড়া করতে লাগলেন। ঘরখানার মধ্যে সবকিছুই মৃত্যুর মতো স্তব্ধ ও শীতল হয়ে গেল যেন। কোনও কিছু ঘটার সব প্রত্যাশা নিঃশেষিত হয়ে গেল।
অবশেষে মেইলি বলল, এর আর দরকার নেই।
আমি তা মনে করি না, ম্যালন বলল।
মিডিয়াম নড়াচড়া করতে লাগল। তার মুখ থেকে আর্তনাদের মতে ধ্বনি বেরিয়ে এল। তারপর উঠে বসে সে ধীরে ধীরে জেগে উঠল।
চ্যালেঞ্জার বিজ্ঞের মতো হাই তুলে বললেন, এটা বৃথা সময়ের অপচয় নয়? মিসেস লিনডেন মিডিয়ামের মাথায় ও ভুরুতে হাত বোলাতেই মিডিয়াম চোখ খুলল। মিসেস লিনডেন তখন তাকে বললেন, এর আর দরকার নেই টম। এ কাজ আজকের মতো স্থগিত রাখতে হবে।
মেইলি বলল, আমিও তাই মনে করি।
চ্যালেঞ্জারের দিকে ক্রুদ্ধভাবে তাকিয়ে সে বলল, এই প্রতিকূল পরিবেশ মিডিয়ামের উপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করছে। তার ফলে ওর পক্ষে কোনও কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
মিসেস লিনডেন আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বললেন, আমিও তাই মনে করি। আপনি ঠিক বলেছেন।
টম লিনডেন কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়। সে বলল, অবস্থা ও পরিবেশটা খারাপ। যে সব স্পন্দন আসছে তা সঠিক নয়। যাই হোক একবার আমার ঘরে গিয়ে চেষ্টা করি। তাতে শক্তি সংহত হতে পারে।
মেইলি বলল, এটা হলো শেষ সুযোগ, আমাদেরও চেষ্টা করতে হবে।
মিডিয়ামের আর্মচেয়ারটা তাঁর ছোট ঘরটাতে ঢোকান হলো। মিডিয়াম সে ঘরে ঢুকে পর্দাটা টেনে দিলেন।
অগিলভি মিডিয়ামের এই কাজের ব্যাখ্যা করে বললেন, ওর এই চেষ্টার ফলে পরলোক থেকে আগত প্রেতাত্মা মুক্তি লাভ করতে পারে।
চ্যালেঞ্জার বললেন—তা হয়ত হতে পারে, তবে সত্যের খাতিরে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি কাজ করতে করতে মিডিয়ামের দর্শকদের দৃষ্টিপথ থেকে সরে যাওয়াটা দুঃখজনক ব্যাপার।
মেইলি কিছুটা অধৈর্যের সঙ্গে বলল, দয়া করে আবার বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি করবেন না। এখন ওর কাজের ফল কিছু পেতে দিন। পরে বিচার করে দেখার অনেক সময় পাওয়া যাবে।
তারপর আবার সেই ক্লান্তিকর প্রতীক্ষা। এরপর মিডিয়ামের সেই ঘর থেকে একটা ফাঁপা আর্তনাদের শব্দ হলো। তার সঙ্গে পরলোকবাদীরা কিছু একটার আশায় খাড়া হয়ে বসল।
অগিলভি বলল, একেই বলে প্রেতাত্মাদের আকর্ষণ। এটা মিডিয়ামদের পক্ষে বিশেষ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অগিলভির মুখের কথা শেষ হতে না হতেই কে যেন জোর করে মিডিয়ামের ঘরের পর্দাগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে লাগল। পর্দাটা সরে যেতে অন্ধকারে অস্পষ্ট সাদা একটা মূর্তি দেখা গেল। মূর্তিটা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে তখন ক্ষীণ লাল আলোটা জ্বলছিল। তাই অন্ধকারে মূর্তিটাকে ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল চলমান একতাল সাদা কি একটা বস্তু। ক্রমে মূর্তিটা কিছুটা কুণ্ঠা ও ত্রাসের সঙ্গে প্রফেসরের বিপরীত দিকে এসে দাঁড়াল। তারপর একটা গর্জন শোনা গেল। এরপরই সভায় ভয়বিহ্বল চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। দর্শকদের মধ্যে একজন বলে উঠল, আমি তাকে পেয়েছি। আর একজন বলল, আগে হলুদ আলোটা জ্বেলে নাও। খুব সাবধান। দর্শকদের মধ্যে আর একজন বলে উঠল, খুব সাবধান। মিডিয়ামের মৃত্যু হতে পারে। চক্রটা ভেঙে গেল। চক্রাকারে উপবিষ্ট দর্শকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এখানে সেখানে চলে গেল। চ্যালেঞ্জার নিজে উঠে গিয়ে আলো জ্বেলে দিলেন। সমস্ত ঘরখানা আলোয় আলোকিত হলো। দর্শকরা হতবুদ্ধি হয়ে গেল। ব্যাপারটা ভাল করে বুঝতেই পারল না।
আলোয় পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে দর্শকরা ভাল করে সবিকিছু খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে এক শোচনীয় দৃশ্য। সকলে দেখল মিডিয়াম টম লিনডেন মেঝের উপর কাতরভাবে পড়ে আছে।
সাদা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তার মুখখানা। তার পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল বিশালাকার সেই স্কচ যুবক, যে তাকে চেয়ার থেকে তুলে এনে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। মিসেস লিনডেন তার স্বামীর পাশে এসে নতজানু হয়ে বসে সেই আঘাতকারী স্কচ যুবকের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘরখানা একেবারে স্তব্ধ হয়ে ছিল। সহসা প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথায় নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হলো।
চ্যালেঞ্জার বলতে লাগলেন, হে ভদ্রমহোদয়গণ, মিডিয়ামের প্রতারণা ফাঁস হয়ে গেছে। আমরা এবার তোমাদের প্রেতের প্রকৃতি স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। যুবক নিকল তাকে ধরে এনে মেঝের উপর বসিয়ে দেয়। এরপর তাকে আইনে সোপর্দ করা হবে। নিকল খুব তাড়াতাড়ি নির্দেশ মতো কাজ করেছে।
লম্বা যুবকটা বলল, আমি তার জামার কলার ধরে নামিয়ে এনেছি। ওর দেহটা খুব হাল্কা।
চ্যালেঞ্জার তাকে বললেন, তুমি একজনন ভণ্ড প্রতারককে লোকসমক্ষে ধরিয়ে দিয়ে জনসাধারণের উপকার করেছ।
মেইলি এবার এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এল যে চ্যালেঞ্জার তার কথা শুনতে বাধ্য হলো।
মেইলি বলতে লাগল, আপনার ভুলটা অস্বভাবিক নয়। তবে আপনি অজ্ঞতাবশত যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তা মিডিয়ামের পক্ষে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারত।
চ্যালেঞ্জার বললেন, আমার অজ্ঞতাই বটে! তুমি যদি আমাকে এ কথা বল তাহলে আমি বলে দিচ্ছি আমি তোমাদের প্রতারণার শিকার হয়ে থাকব না।
আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই এবং এই প্রশ্নের উত্তরটা সরাসরি পেতে চাই। আপনি আলো জ্বালার আগে আমরা যে সাদা মূর্তিটা দেখেছিলাম এবং যেটা মিডিয়ামের ঘর থেকে এসে আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সেটা কী তা ভেবে দেখেছেন?
হ্যাঁ, একটা সাদা মূর্তি ছিল।
আপনি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন মিডিয়ামের পরনে রয়েছে কালো পোশাক। তাহলে সাদা পোশাকটা এল কোথা থেকে?
সাদা পোশাক কোথা থেকে এল সেটা আমার কাছে অবাস্তব কথা। হয়ত মিডিয়াম ও তার স্ত্রী এ ব্যবস্থা করে রেখেছিল। এসব ব্যবস্থা তাদের আগে থাকতে করা। যাই হোক কোথা থেকে কি পোশাক এল এ প্রশ্নের উত্তর ওরা আদালতে দেবে।
ঘরটা খুঁজে দেখুন কোথায় সাদা পোশাক আছে।
আমি ঘরের কোথায় কি আছে জানি না। আমি আমার সাধারণ জ্ঞান থেকে একথা বললাম। তোমাদের এই মিডিয়াম লোকটাই সাদা পোশাক পরে প্রেতরূপ ধারণ করেছিল। এখন সে তার ছদ্মবেশটা কোথায় কোন গহ্বরে ফেলে রেখেছে, আমার কাছে তার কোনও গুরুত্ব নেই। সে ধরা পড়ে গেছে এটাই যথেষ্ট।
গুরুত্বহীন তো নয়ই বরং এটা একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, আপনি স্বচক্ষে যে সাদা মূর্তিটা দেখেছেন সেটা কোনও প্রতারণা বা ছলনার ব্যাপার নয়। এক বাস্তব ঘটনা।
চ্যালেঞ্জার জোরে হেসে উঠলেন, তারপর বললেন, বাস্তব ঘটনাই বটে। তোমরা যেটা প্রেতাত্মাকে মূর্তিদান বল, সেটা পোশাক পালটিয়ে এক বেশ থেকে অন্য বেশ ধারণ করা ছাড়া কিছুই নয়। একটা কথা বোঝার চেষ্টা করবে, এই ধরনের আসরে যারা প্রেতচর্চার কাজ পরিচালনা করে তারা মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে যে-সব সন্দেহ বা সংশয় জাগতে পারে তা গ্রাহ্য করে না। তারা শুধু এই সব আসরে কিছু একটা ফল পেতে চায় অর্থাৎ কোনও না কোনও ভাবে দর্শকদের সামনে একটা প্রেতমূর্তি খাড়া করতে চায়। এক্ষেত্রে যা হয়েছে শোন। এই আসরে প্রতিকূল পরিবেশের জন্য কোনও প্রেতমূর্তির আসা সম্ভব হয়নি। তাই ক্যাবিনেট বা ছোট্ট ঘরটার মধ্যে অচেতন মিডিয়ামের উপর একটা সাদা পোশাক দিয়ে ঢেকে তাকে ভূতের মতো করে তাকে ঘরের মাঝখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতারণাটা হয়েছে অন্য দিক থেকে।
টম লিনডেন বলল, আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি আমি আমার ঘরে প্রবেশ করার পর থেকে মেঝেতে পড়ে যাওয়া পর্যন্ত কী ঘটেছে না ঘটেছে তা কিছুই জানি না।
এই বলে সে উঠে দাঁড়াল। তার সর্বাঙ্গ কাঁপছিল। সে হাঁটতে পারছিল না। তার স্ত্রী তাকে এক গ্লাস জল দিলে সেই জলের গ্লাসটাও সে ধরতে পারছিল না।
চ্যালেঞ্জার টমকে বললেন, তুমি যে অজুহাত দেখাচ্ছ তা আবার নতুন করে বিশ্বাসের মধ্যে ফাটল ধরাচ্ছে। আমার কর্তব্য আমি বুঝে নিয়েছি এবং তা ঠিকমতোই পালন করব। তোমার যা বলার আছে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বলবে। তিনি যা করার করবেন। এই বলে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বিজয় গৌরবে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। অর্থাৎ তিনি যে কাজের জন্য এখানে এসেছিলেন সে কাজ করতে পারার জন্য সাফল্যের গৌরব বোধ করছিলেন।
এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। ঘটনাটা এমনই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত ও নাটকীয় যে দর্শকরা কি করে কি হলো বুঝতেই পারল না।
চ্যালেঞ্জাররের কথার উপর কেউ কিছু বলার সাহস করল না। দর্শকরা সকলে উঠে দাঁড়াল। একমাত্র এনিডই চেয়ারে বসে রইল। সে একদিকে ঝুঁকে পড়েছিল।
চ্যালেঞ্জার বললেন, ও ঘুমুচ্ছে, ওকে জাগিয়ে দাও। এনিড আমি যাচ্ছি।
এনিডের কাছ থেকে কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। মেইলি এনিডের উপর ঝুঁকে কি দেখতে লাগল।
তারপর মেইলি বলল, চুপ, সব চুপ করো, উনি ধ্যান করছেন। উনি ধ্যানস্থ।
চ্যালেঞ্জার এনিডের কাছে ছুটে গেলেন। বললেন, তোমরা সব কি নারকীয় ব্যাপার করে তুলেছ, ও তা দেখে মূর্ছিত হয়ে পড়েছে।
মেইলি তার চোখের পাতাটা তুলে ধরল। তারপর চ্যালেঞ্জারকে বলল, না, না, ও সত্যি ধ্যানস্থ। ওর চোখের দৃষ্টি ভিতরের দিকে ঘোরানো। মি. চ্যালেঞ্জার আপনার মেয়ে শক্তিশালী মিডিয়াম।
চ্যালেঞ্জার আশ্চর্য হয়ে বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। ওঠ এনিড, জেগে ওঠ।
মেইলি বলল, ঈশ্বরের নামে বলছি, ওকে ছেড়ে দিন। যদি তা না করেন তাহলে সারা জীবন আপনাকে অনুশোচনা করতে হতে পারে। কোনও মিডিয়ামের ধ্যান হঠাৎ জোর করে ভঙ্গ করা মোটেই নিরাপদ নয়।
চ্যালেঞ্জার হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। আজ জীবনে এই প্রথম উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেললেন। এটা কি সম্ভব যে তাঁর সন্তান এক রহস্যময় খাড়াই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং তিনি একটু ঠেলা দিলেই সে এক অতল গহ্বরে পড়ে যাবে।
তিনি অসহায়ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন আমি কি করব?
কোনও ভয় করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি বসুন।
মেইলি এবার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা এবার সকলেই বসে পড়ুন। হ্যাঁ, এবার মিডিয়াম কথা বলবেন।
এনিড এতক্ষণ চেয়ারে খাড়া হয়ে বসে ধ্যানস্থ হয়ে ছিল। এবার তার দেহটা নড়েচড়ে উঠল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। তার একটা হাত চ্যালেঞ্জারের দিকে বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বলতে লাগল, আমি তাকে বলছি তিনি যেন আমার মেডিকে কোনওভাবে আঘাত না দেন। তার জন্য একটা বাণী আছে।
দর্শকদের মধ্যে যারা এনিডের চারদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে এক শ্বাসরুদ্ধ নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল।
মেইলি এনিডের দিকে তাকিয়ে বলল, কে কথা বলছে?
এনিড ধ্যানাবিষ্ট অবস্থাতেই বলর, ভিক্টর কথা বলছে, সে আমার মেডিকে আঘাত করবে না। তার জন্য বাণী আছে।
কি সেই বাণী?
তার স্ত্রী এখানে এসেছেন।
তাই নাকি!
ধ্যানস্থ এনিড বলে যেতে লাগল, ওর স্ত্রী বলছেন, তিনি আগে একবার এসেছিলেন এক বালিকার রূপ ধরে। তিনি দরজায় কড়া নেড়েছিলেন কিন্তু তাঁর স্বামী সে শব্দ শুনেও বুঝতে পারেননি। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর তিনি এক বালিকারূপে এসেছিলেন।
এসব কথা ও এই ঘটনার কি কোনও অর্থ আছে আপনার কাছে, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার?
চ্যালেঞ্জারের জিজ্ঞাসু ও সন্দিগ্ধ চোখ দুটোর উপর বড় ভ্রূ দুটো কুঞ্চিত ও জড়োসড়ো হয়ে উঠল। তিনি তাঁর চারদিকে সমবেত সকলের দিকে বেকায়দায় পড়া পশুর মতো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। তাঁর দৃষ্টি একে এক সকলের উপর পড়ছিল। তিনি ভাবলেন এ এক ছলনা, শয়তানসুলভ জঘন্য ছলনা। ওরা তাঁর মেয়েকে বশীভূত করে হাত করেছে। এটা জঘন্য কাজ। তিনি ওদের প্রত্যেকের ছলনা প্রকাশ করে দেবেন। এ বিষয়ে ওদের কোনও প্রশ্ন তিনি করবেন না। তার কোনও অর্থও হয় না। তিনি সব কিছুই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছেন। তাঁর মেয়েকে ওরা বশ করেছে। তিনি এটা বিশ্বাস করতেই পারছেন না। তবু ব্যাপারটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনিড এ কাজ ম্যালনের খাতিরেই করছে। একজন নারী তার প্রেমিকের জন্য যে-কোনও কাজ করতে পারে। তবে কাজটা খুবই খারাপ। এই ঘটনার আঘাতে চ্যালেঞ্জার কিছুমাত্র নরম না হয়ে আগের থেকে আরও কঠোরভাবে প্রতিশোধাত্মক হয়ে উঠলেন। প্রচণ্ডভাবে রাগান্বিত মুখ আর তাঁর ভাঙা ভাঙা কথা, তাঁর মনের দৃঢ় প্রত্যয়কে প্রকাশ করছিল।
তবু এনিডের একটা হাত তার সামনে মি. চ্যালেঞ্জারের দিকেই বাড়ানো ছিল।
আর একটা বাণী আছে।
কার জন্য সে বাণী?
এ বাণী তার জন্য, যে-ব্যক্তি আমার মেডির মনে আঘাত দিয়েছে এ বাণী তারই জন্য। আমার মেডিকে আঘাত করা তার কখনই উচিৎ নয়। এ কাজ যেন তিনি কখনও আর না করেন। একটি লোক—দুটি লোক—এই বাণী তাকে দিতে চায়।
ঠিক আছে ভিক্টর, সে বাণী আমাদের শোনাও।
প্রথম লোকটি নাম…এই কথা বলেই এনিডের মাথাটা একদিকে ঘুরে গেল। তার একটা কান খাড়া হয়ে উঠল। মনে হলো সে যেন কারও কথা শুনছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি পেয়েছি। তা নাম হলো অল…অল…অলড্রিজ।
একথার কি কোনও অর্থ আছে আপনার কাছে? কিছু বুঝতে পারছেন?
চ্যালেঞ্জার টলতে লাগলেন, তাঁর সারা দেহটা টলে উঠল। এক পরম বিস্ময় স্পষ্ট ফুটে উটল তাঁর চোখে-মুখে।
চ্যালেঞ্জার জিজ্ঞাসা করলেন, দ্বিতীয় লোকটার নাম কী?
ওয়্যার, হ্যাঁ ঠিক তাই—ওয়্যার।
চ্যালেঞ্জার দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বসে পড়লেন। তিনি তাঁর হাত দুটো তুলে ভ্রূ-যুগলের উপর রাখলেন। তাঁর সমস্ত মুখখানা ম্লান হয়ে উঠল ভয়ঙ্করভাবে। ঘামে তাঁর কপাল ও মুখ ভিজে উঠল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি তাকে চেন?
আমি এই নামের দু’জনকে চিনতাম।
তারা আপনার জন্য কিছু বাণী রেখে গেছে।
মনে হলো চ্যালেঞ্জার কোনও এক আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল
ঠিক আছে, কী সেই বাণী?
সে বাণী খুবই গোপন। এত লোকের কাছে বলা যাবে না।
মেইলি সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমরা সকলে বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করব। বন্ধুগণ, আপনারা সকলে বাইরে চলুন। প্রফেসরকে সে বাণী শুনতে দিন।
ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে গেল। চ্যালেঞ্জার তাঁর মেয়ের সামনে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন। এক অবাঞ্ছিত আশঙ্কা চ্যালেঞ্জারের শক্ত মনটাকে ধরে তার উপর চাপ দিতে লাগল।
তিনি ম্যালনকে ডেকে বললেন, তুমি আমার কাছে থাক।
এরপর ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেই ঘরের মধ্যে কেবল তিনজন পাশাপাশি বসে রইল।
বাণীটা কী?
বাণীটা হচ্ছে একটা পাউডার সম্বন্ধে।
চ্যালেঞ্জার স্বীকার করে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ধূসর রঙের পাউডার?
হ্যাঁ। সে দুটি প্রেতাত্মা যে বাণী আপনার জন্য রেখে গেছেন তা হলো এই যে আপনি তাদের হত্যা করেননি।
চ্যালেঞ্জারের গোটা দেহটা উত্তেজনার এক প্রবল আবেগে কাঁপছিল। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ওদের জিজ্ঞাসা করো ওরা কীভাবে মরেছে।
ওরা অসুখে মরেছে।
কি রোগ? নিউ, নিউ…
রোগটা কি?
নিউমোনিয়া।
চ্যালেঞ্জার এবার হাঁপ ছেড়ে এক পরম স্বস্তির সঙ্গে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। তারপর কপালের ঘাম মুছে বলে উঠলেন, হে ঈশ্বর!
এরপর তিনি ম্যালনকে বললেন, এবার ওদের বাইরে থেকে ডেকে আন।
এতক্ষণ ধরে দর্শকরা ঘরের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করছিল; ম্যালনের কথায় ব্যস্ত হয়ে তারা সবাই ঘরে এসে ঢুকল। চ্যালেঞ্জার চেয়ার থেকে উঠে তাদের অভ্যর্থনা করার জন্য এগিয়ে গেলেন। তিনি প্রথমে টম লিনডেনের সঙ্গে কথা বললেন। তখন তাঁর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর সব দর্প চূর্ণ হয়ে গেছে। তাঁর কণ্ঠস্বরটা তখন কাঁপছিল।
আমি আপনাকে একটা কথা বলছি স্যার। আমি আপনাকে আর বিচার করতে চাই না। যে সব ঘটনা ঘটে গেল সে ঘটনা যেমন অদ্ভুত তেমই নিশ্চিত আমার যুক্তিসিদ্ধ বিচারবুদ্ধি পরীক্ষা করে দেখেছেন। আপনার আগেকার কাজকর্ম ব্যাখ্যা করে আমাকে যা বলা হয়েছিল এখন তা আমি অস্বীকার করছি না। আমি আপনার মনে আঘাত দিয়ে যে সব কথা বলেছি তা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
টম লিনডেন প্রকৃতিগতভাবে ছিলেন এক সৎ খ্রীস্টান। ক্ষমাগুণ তাঁর সব সময়ই ছিল। তাঁর এই ক্ষমাগুণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং তার মধ্যে কোনও নিষ্ঠার অভাব ছিল না।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বলতে লাগলেন, আমার কন্যা এক অদ্ভুত ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে যা মিডিয়াম হিসাবে আপনার ক্ষমতার সমতুল্য। এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। মেইলি প্রথম আমার মেয়ের এই ক্ষমতার কথা বলে। বিজ্ঞানী হিসাবে ন্যায়সঙ্গতভাবেই পরলোক সম্বন্ধে সংশয়বাদী ছিলাম। কিন্তু আজ আপনারা পরলোক সম্বন্ধে এক অবিসংবাদিত সাক্ষ্যপ্রমাণ আমার সামনে তুলে ধরলেন।
মেইলি বলল, আমরা সবাই এক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, প্রফেসর। অনেক বিষয়ে আমরা অপরের কাজকর্মকে সন্দেহ করি। তেমনি আমাদের কাজেও অনেকে সন্দেহ করে।
মি. চ্যালেঞ্জার আত্মমর্যাদাবোধের সঙ্গে বললেন, আমার ধারণা এ বিষয়ে আমি যা বললাম, সে কথা কেউ সন্দেহ করবে না। আমি সমস্ত দায়িত্বের সঙ্গে সত্যিই বলছি, আজকের এই রাতে এমন একটা জ্ঞাতব্য বিষয় জানতে পেরেছি যে বিষয়ের কথা এই পৃথিবীর কোনও মানুষের পক্ষে আমাকে জানানো সম্ভব নয়। মর্ত্যের কোনও জীবিত মানুষ এ খবর আমাকে দিতে পারত না। সুতরাং এটা হচ্ছে সকল প্রশ্নের অতীত।
মিসেস লিনডেন বললেন, তরুণী এখন অনেকটা ভাল।
এনিড তখন তার ধ্যান থেকে জেগে উঠেছে। সে চেয়ারে বসে চারদিকে তাকাচ্ছিল। সে বলল, কি হয়েছে বাবা, আমার মনে হচ্ছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
চ্যালেঞ্জার বললেন, সব ঠিক আছে বাছা। পরে এ বিষয়ে কথা হবে। এখন আমার সঙ্গে বাড়ি চল। এখন আমার অনেক কিছু চিন্তা করার আছে। আশা করি তুমিও আমাদের সঙ্গে আসবে ম্যালন।
চ্যালেঞ্জার এবার তাঁর মেয়েকে বললেন, এ ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলার আছে। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ব্যাখ্যা করে তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে।
চ্যালেঞ্জার তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকেই ভৃত্য অস্টিনকে বললেন, তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে।
এই বলে তিনি সোজা ম্যালন ও এনিডকে নিয়ে তাঁর লাইব্রেরি ঘরে ঢুকলেন। তাঁর বড় আর্মচেয়ারটার বাঁদিকে ম্যালন ও ডানদিকে এনিড বসল। তিনি তাঁর ডান হাতটা বাড়িয়ে এনিডের একটা হাত ধরলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, আজ প্রথম জানলাম তুমি এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারিণী। আজ রাতে তার পূর্ণ পরিচয় আমি পেয়েছি। এ বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই। যেহেতু তোমার এই শক্তি আছে সেহেতু এ শক্তি যে অপরের থাকতে পারে এ কথা আমি অস্বীকার করতে পারি না। এই সূত্রে মিডিয়ামের কাজ সম্বন্ধে একটা ধারণা আমার চিন্তার মধ্যে প্রবেশ করেছে। এখন বুঝতে পারছি এটা সম্ভব। এখন এ বিষয়ে আর কিছু আলোচনা করব না, কারণ এখন আমার সব চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার এ বিষয়ে ধারণাটা আরও স্পষ্ট হলে আমি তোমার ও তোমার বন্ধুদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলব। এখন এ বিষয়ে আমি একটি কথাই বলব যে, আমার মন আজ একটা জোর ধাক্কা খেয়েছে এবং জ্ঞানের একটা নতুন পথ আমার সামনে খুলে গেছে।
আমরা যদি কোনও প্রকারে আপনাকে সাহায্য করতে পারি তাহলে নিজেদের গর্বিত বোধ করব।
চ্যালেঞ্জার এক নীরস হাসি হেসে বললেন, আমার মনে হয় তোমার কাগজে বড় বড় অক্ষরে ‘প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের ভাবান্তর’, এই মর্মে একটা খবর বার হবে। তরে আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি এ খবর এখন প্রকাশ করো না, কারণ এখনও আমি এতদূর অগ্রসর হইনি।
চ্যালেঞ্জার আরও বললেন, তুমি আগে থেকে কিছু করবে না এবং এ বিষয়ে · তোমার ব্যক্তিগত মতামত গোপন রাখবে।
যখন আমার মনের মধ্যে কোনও মত গড়ে ওঠে তখন সে মত বাইরে .ঘোষণা করার মতো নৈতিক সাহসের কোনও অভাব হয় না আমার। কিন্তু এখন সে সময় আসেনি। যাই হোক আমি আজ রাতে দুটি বাণী পেয়েছি এবং এই বাণী যারা দিয়েছে তারা হলো দুটি বিদেহী আত্মা এবং আমি তা মেনে নিয়েছি। এনিড তুমি তখন অচেতন হয়ে ছিলে।
এনিড বলল, সত্যি বলছি বাবা, আমি এ সব কিছুই জানি না।
হ্যাঁ, তোমার মধ্যে প্রতারণার কিছু ছিল না। তোমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রথমে তোমার মার কাছ থেকে এক বাণী আসে। তিনি আমাকে বলেন, একদিন যে শব্দ এবং যার কথা তোমাকে বলেছিলাম সে শব্দ তিনিই সৃষ্টি করেন। এটা এখন পরিষ্কার যে তুমি ছিলে মিডিয়াম এবং তোমার মাধ্যমেই সে বাণী আসে আমার কাছে। তুমি তখন ঘুমিয়ে ছিলে না, ধ্যানস্থ ছিলো। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় এবং অদ্ভুতভাবে আশ্চর্যজনক। তবু এটা সত্যিই মনে হয়।
ম্যালন বলল, ক্রকস্ এসব কথাগুলোই ব্যবহার করেছেন, তিনি লিখেছেন ‘ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অসম্ভব হলেও সম্পূর্ণরূপে সত্য।”
চ্যালেঞ্জার বললেন, তার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। আরও অনেক সদাশয় ব্যক্তির কাছে আমাকে ক্ষমা চাইতে হবে।
ম্যালন বলল, এই সব লোকেরা কখনই আপনার ক্ষমা প্রার্থনার দাবি করবে না। তারা সে প্রকৃতির লোকই নয়।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার অস্বস্তির সঙ্গে নড়াচড়া করে বললেন, এরপর আমি দ্বিতীয় বাণীটি ব্যাখ্যা করব। তবে ব্যাপারটা খুবই গোপন। এটা হচ্ছে এমনই ব্যাপার যার কথা আমি কাউকে কোনওদিন বলিনি এবং যা এ পৃথিবীর কোনও লোক জানে না। যেহেতু তুমি অনেক কিছু শুনেছ সেহেতু এটাও তোমার শোনা উচিৎ।
প্রফেসর বলতে লাগলেন, ব্যাপারটা ঘটেছিল যখন আমি ছিলাম এক যুবক চিকিৎসক। এটা বলা বাহুল্য যে ব্যাপারটা আমার মনকে সেই থেকে মেঘাচ্ছন্ন করে রাখে। সে মেঘ আজ রাতে অপসারিত হয় আমার মন থেকে। অনেকে এই ঘটনাটাকে অন্তরের সঙ্গে অন্তরের যোগাযোগ বা অবচেতন মনের ক্রিয়া হিসাবে
ব্যাখ্যা করতে পারে। তারা যেভাবে ব্যাখ্যা করে করুক। তবে আমার কোনও সন্দেহ নেই যে এই সব বাণী এসেছে পরলোকবাসী মৃত আত্মাদের কাছ থেকেই। একটা নতুন অসুখের কথা সেই সময় আমি শুনতে পাই। সেকালে একটা বংশের লোকেরা কিছু মারাত্মক বিষ ও শক্তিশালী ওষুধ সরবরাহ করত। এ বিষয়ে খুঁটিনাটি সব কথাগুলো বলার প্রয়োজন নেই, তোমরা তা বুঝতে পারবে না। শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে এই ধরনের একটা ওষুধ সর্বপ্রথম আমার হাতে আসে। আমি সেই ওষুধের প্রথম আবিষ্কারক হিসাবে আমার নামটা তার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলাম। আমি সেই ওষুধ ওয়্যার ও অলড্রিজ নামে দুই রোগীর উপর প্রয়োগ করি। ওষুধ আমি কম মাত্রাতেই প্রয়োগ করেছিলাম। ভেবেছিলাম এটা নিরাপদ। এরা দু’জনই তখন সরকারী হাসপাতালে আমার অধীনে ভর্তি ছিল। পরদিন সকালেই সেই দু’জন রোগীর মৃত্যু হয়।
আমি সেই ওষুধ ওই দু’জন রোগীকে গোপনে দিয়েছিলাম। কেউ তা জানত না। রোগী দু’জন গুরুতর রোগে পীড়িত ছিল তাই সকলে তাদের মৃত্যুটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করে। এই কারণে আমাকে কোনও নিন্দাবাদ সহ্য করতে হয়নি। তাদের মৃত্যুটা স্বাভাবিক বলে সকলে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমার নিজের অন্তরে একটা ভয় ছিল। আমার প্রায়ই মনে হত বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে আমি ওই দু’জনকে হত্যা করেছি। সমস্ত ব্যাপারটাই এক অন্ধকার পটভূমি হিসাবে বিরাজ করতে থাকে আমার জীবন জুড়ে। তোমরা আজ রাতে শুনেছ যে, রোগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে, ওষুধ থেকে নয়।
এনিড তার বাবার হাতখানার উপর হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, বাবা, আহা তুমি কত মনোকষ্ট ভোগ করেছ।
চ্যালেঞ্জার এমনই একজন লোক যিনি কারও কোনও দয়া বা করুণা সহ্য করতে পারেন না, এমন কি নিজের মেয়েরও নয়। তিনি তাঁর হাতটা টেনে সরিয়ে নিলেন তাঁর মেয়ে এনিডের কাছ থেকে।
এরপর তিনি বললেন, আমি বিজ্ঞানের জন্য কাজ করেছি। বিজ্ঞানীদের ঝুঁকি নিতেই হবে। আমি জানতাম, আমি দোষের কিছু করিনি। সে যাই হোক আজ রাতে আমার ভারী অন্তরটা খুবই হাল্কা হলো।
