অধ্যায় ৪ ॥ মৃত্যুপথযাত্রীর দিনপঞ্জী

অধ্যায় ৪ ॥ মৃত্যুপথযাত্রীর দিনপঞ্জী

আমার খাতার ফাঁকা পাতার উপরের দিকে লেখা শব্দগুলোকে কেমন বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। তার চাইতেও অধিক বিস্ময়ের কথা যে-আমি এডোয়ার্ড ম্যালোন শব্দগুলো লিখেছি, বারো ঘণ্টা আগে সেই-আমি যখন আমার স্ট্রেথাম-এর বাড়ি থেকে যাত্রা করেছিলাম তখন কিন্তু ভাবতেও পারিনি যে সেই দিনটিতে এত সব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটবে! মনের পটে ভেসে উঠছে একটার পর একটা ঘটনা—ম্যাক আর্ডলের সঙ্গে দেখা, ‘দি টাইমস’-এ চ্যালেঞ্জারের প্রথম সতর্ক-বাণী, ট্রেনের মধ্যে যুক্তিহীন কথাবার্তা, সুস্বাদু লাঞ্চ, মহাবিপর্যয়, আর এই পরিণতি—একটা শূন্য গ্রহে কেবল আমরাই বেঁচে আছি, আর আমাদের পরিণাম এতই নিশ্চিত যে আমার এই বৃত্তিগত যান্ত্রিক লেখাগুলো হয়তো কোনওদিনই মানুষের চোখেও পড়বে না, কারণ ততদিনে সেও মরে ভূত হয়ে যাবে। এখন বুঝতে পারছি চ্যালেঞ্জারের কথাগুলি কত জ্ঞানগর্ভ ও সত্য ছিল। তিনি সেদিন বলেছিলেন, পৃথিবীতে যা কিছু মহৎ, সৎ ও সুন্দর সে সব কিছু শেষ হয়ে যাবার পরেও আমরা যদি বেঁচে থাকি তো সেটাই হবে আসল ট্র্যাজিডি। তবে সে বিপদটা ঘটবে না। এর মধ্যেই আমাদের অক্সিজেনের দ্বিতীয় টিউবটিও শেষ হবার মুখে। আমাদের জীবনটাই তো একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

চ্যালেঞ্জার এইমাত্র আমাদের উদ্দেশে একটা পনেরো মিনিটের দীর্ঘ বক্তৃতা ঝেড়েছেন। মনে হচ্ছিল প্রচণ্ড উত্তেজনায় তিনি ষাঁড়ের মতো গর্জন করছিলেন। সেন্টার টেবিলটার পাশে তিনি বসেছিলেন। যে মাইক্রোস্কোপটাকে তিনি ড্রেসিং- রুম থেকে নিয়ে এসেছিলেন তার স্লাইডটা বৈদ্যুাতিক আলোয় ঝলমল করছিল। সেদিকে আঙুলটা বাড়িয়ে তিনি বললেন, “ঠিক কেন্দ্রস্থলে যে ছোট পিনের মতো বস্তুগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি ডায়াটোম, ওগুলো তেমন কিছু নয়। কিন্তু ঠিক ডান দিকে আপনারা দেখতে পাবেন একটা ‘এমিবা’ মন্থরগতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই এসে নিজের চোখেই দেখুন না।”

ইশারায় তিনি আমাদের ডাকলেন। সামারলী উঠে গিয়ে ভাল করে সব কিছু দেখলেন। আমিও তাই করলাম। তবে লর্ড জন চেয়ার থেকে উঠলেন না। বললেন, “দেখার আর কি দরকার। আপনার কথাই যথেষ্ট। তাছাড়া, ওটা বেঁচে আছে, না মরে গেছে তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই।”

লর্ড জনের কথা শুনে আমি হেসে ফেলালাম। তাতেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জার খাপ্পা হয়ে গেলেন। রুষ্ট চোখে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর স্ত্রী মাইক্রোস্কোপটার উপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রিয় জর্জ, অল্পেতেই এত চটে যাও কেন? এমিবাটা বেঁচে আছে না মরে গেছে, তাতে কি যায়-আসে?”

“অনেক কিছু যায়-আসে”, চ্যালেঞ্জার কঠিন কণ্ঠে বললেন।

ভাল মানুষটির মতো ঈষৎ হেসে লর্ড জন বলে উঠলেন, “বেশ তো, উনি কী বলতে চান সেটা শোনাই যাক না। আমার কথায় যদি উনি আঘাত পেয়ে থাকেন তো আমি মাপ চাইছি।”

সামারলী কিন্তু নাছোড়বান্দার মতো গলায় টিপ্পনি কেটে বললেন, “আমি কিন্তু বুঝতেই পারছি না একটা জীবাণু বেঁচে আছে কি না সেটার উপর আপনিই বা এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন। ওটা তো আমাদের মতো একই বায়ুমণ্ডলের মধ্যে আছে, অতএব স্বাভাবিক ভাবেই বিষয়টা ওর উপর কার্যকরী হচ্ছে না। ওটা যদি এই ঘরের বাইরে থাকত তাহলে হয়তো ওটাও অন্যসব জীবন্ত প্রাণীর মতোই মরে যেত।”

এবার কিন্তু চ্যালেঞ্জার একটু মাতব্বরি চালেই বলে উঠলেন, “আমার প্রিয় বন্ধু সামারলী, আপনার কথাগুলি শুনে মনে হচ্ছে যে পরিস্থিতিটাকে আপনি সঠিক ভাবে বুঝতেই পারেননি। এই জীবাণুটিকে মাত্র গতকালই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং রসায়ন-বিদ্যাসম্মতভাবেই সেটাকে সিল করে রাখা হয়েছিল। ফলে আমরা যে অক্সিজেনটা পেয়েছি সেটা ওর ধারেকাছেও যেতে পারেনি।। কিন্তু জগতের অন্য যে কোনও স্থানের মতোই তার কাছেও ইথার ঠিকই পৌঁছেছে। সেই জন্যই সেটা বিষ-ক্রিয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছে। সুতরাং আমরা এ কথাটা বলতে পারি যে এই ঘরটার বাইরে প্রতিটি জীবাণুই এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, অথচ আপনি ভুল করে ধরেই নিয়েছেন যে অন্য সব জীবাণুই মারা গেছে।”

“বেশ তো, তাই যদি হয় তা নিয়েই বা এত হৈ-চৈ করবার কী আছে?” লর্ড জন প্রশ্ন করলেন।

“অনেক কিছু আছে। আসলে জগৎটা মরে যায়নি; সেটা বেঁচে আছে; আর বেঁচে থাকবেও। আপনার যদি বিজ্ঞানসুলভ কল্পনাশক্তি থাকত, আজ থেকে কয়েক লক্ষ বছর ভবিষ্যতের দিকে আপনার দৃষ্টিটাকে যদি প্রসারিত করতে পারতেন তাহলে দেখতে পেতেন যে এই ছোট্ট জীবাণুটা থেকে জন্ম নেওয়া জীবিত জন্তু ও মানুষের ভিড়ে সমগ্র জগৎটাই পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে দাবানল জ্বলতে আপনি নিশ্চয় দেখেছেন। লেলিহান অগ্নিশিখা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেয় ঘাসের প্রতিটি শিষ, প্রতিটি বৃক্ষের সবুজ কিশলয়, পিছনে পড়ে থাকে শুধুমাত্র কালো ভগ্নস্তূপ। দেখে আপনার মনে হবে গোটা বনাঞ্চল চিরদিনের মতো একটা মরুভূমিতে পরিণত হবে। কিন্তু সেই দগ্ধ তৃণভূমিতে ও কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে জীবনের অদৃশ্য অঙ্কুর। আর মাত্র কয়েকটা বছর পরে আবার যদি আপনি সেই দগ্ধ তৃণভূমিতে গিয়ে হাজির হন, তখন কিন্তু সেই ভগ্নস্ত পের কালো দাগটাকে আপনি খুঁজেই পাবেন না। এখানেও এই ক্ষুদ্র জীবাণুটির মধ্যেও রয়েছে নবজন্মের অঙ্কুর। বিবর্তনের পথ ধরে এই অঙ্কুরই একদিন আজকের এই তুলনাবিহীন মহাসংকটের সব চিহ্নকে নিঃশেষে মুছে দেবে।”

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ও প্রফেসর সামারলীর এই কূট-তর্ক অনেকক্ষণ ধরে চলল। দু’জনের মুখে বড় বড় সব বৈজ্ঞানিক কথাবার্তার খৈ ফুটতে লাগল। তার প্রতিটি শব্দ আমি সাধ্যমতো টুকে নিয়েছি, কিন্তু বুঝতে পেরেছি নামমাত্র। লর্ড জনের অবস্থাও তথৈবচ। একসময় লর্ড জন আমার পাশেই এসে দাঁড়ালেন। আমরা দু’জনই বাইরের রাতের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম।

আকাশে একটি বিবর্ণ বাঁকা চাঁদ—মানুষের দৃষ্টি-গোচরে আসা শেষ চাঁদ—আর তারাগুলি জ্বলজ্বল করছে। দক্ষিণ আমেরিকার পরিষ্কার আকাশেও আমি কখনও এর চাইতে উজ্জ্বলতর নক্ষত্র দেখতে পাইনি। হয়তো ইথারের পরিবর্তনের জন্যই আলোর এই পরিবর্তন ঘটেছে। ব্রাইটনের চিতার আগুন তখনও জ্বলছে। পশ্চিম আকাশে দূরে দেখা যাচ্ছে আগুনের আভা, তার অর্থ অরুন্ডেল বা চিচেস্টারেও বিপদ দেখা দিয়েছে, এমন কি পোর্টসমাউথেও। আমি বসে বসে ভাবি আর মাঝে মাঝে কলম চালাই। বাতাসে একটি মিষ্টি বিষাদের ঘ্রাণ। যৌবন, সৌন্দর্য, রসিকতা, ভালবাসা—সব কিছুই কি এখানেই শেষ হবে? তারার আলোয় উজ্জ্বল পৃথিবীটাকে একটা স্বপ্নের দেশ বলে মনে হচ্ছে। কে ভাবতে পারে যে এটাই মানুষের মৃতদেহে আকীর্ণ একটা ভয়ংকর গলগোথা? হঠাৎই আমি হো-হো করে হেসে উঠলাম।

কিন্তু—এ সব ছাইপাঁশ কী লিখছি আমি? মিসেস চ্যালেঞ্জার ভিতরে ড্রেসিং- রুমে চলে গেছেন। প্রফেসর বললেন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি স্বয়ং সেন্টার-টেবিলে বসে নানান বই দেখে-দেখে কী সব লিখে নিচ্ছেন। যে পালকের কলমটা দিয়ে তিনি লেখেন সেটাতে এমন একটা খস্ খস্ আওয়াজ হয় কানে এলে মনে হয় তিনি কাউকে বকুনি দিচ্ছেন।

সামারলী চেয়ারেই মাথাটা এলিয়ে দিয়েছেন। মাঝে মাঝেই তাঁর নাকও ডাকছে। লর্ড জন পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। এই পরিস্থিতিতে কোনও মানুষ ঘুমাতে পারে সেটা তো আমি কল্পনাও করতে পারি না।

তিনটে তিরিশ এ. এম.। আচমকা আমি জেগে উঠলাম। এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিটের সময় আমি ঘড়িটা দেখেছিলাম। সুতরাং জীবনের অবশিষ্ট যে সংক্ষিপ্ত সময়টুকু হাতে আছে তার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় আমি বৃথাই নষ্ট করেছি। তবু নিজেকে কেমন যেন তরতাজা মনে হচ্ছে। ভাগ্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে আমি প্রস্তুত।

মিসেস চ্যালেঞ্জার এখনও ড্রেসিং-রুমেই আছেন। চ্যালেঞ্জার তাঁর চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকার সঙ্গে তাল রেখে তিনি কাঁপছেন। ওদিক থেকে সামারলীর নাসিকা-গর্জনও সঙ্গত করে চলেছে। একটা বাস্কেট-চেয়ারে বসে লর্ড জনও অঘোরে ঘুমোচ্ছেন।

ভোরের ঠাণ্ডা আলোর প্রথম রশ্মিটা সবে ঘরে ঢুকেছে। সব কিছুই কেমন যেন ধূসর ও শোকমগ্ন দেখাচ্ছে।

সূর্যোদয় দেখতে বাইরে চোখ রাখলাম—এ যে সেই মারাত্মক সূর্যোদয় যার আলো ছড়িয়ে পড়বে একটা জন-মনুষ্যবিহীন জগতের উপর। একদিনে মানবজাতিটাই নিঃশেষ হয়ে গেছে, কিন্তু গ্রহগুলি ঘুরেই চলেছে, জোয়ার-ভাঁটা খেলছে, বাতাস চুপি চুপি কথা বলছে। নিচের উঠোনে অস্টিন হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার মুখের উপর ভোরের আলো পড়ে চিক-চিক করছে। সে যেন গোটা মানবজাতিরই এ বিধ্বস্ত প্রতীক। যে যন্ত্রটিকে সে চালাত তার পাশেই সে অসহায়ের মতো পড়ে আছে।

সেই সময়ে যা কিছু লিখেছিলাম এখানেই তার সমাপ্তি ঘটল। তার পর থেকেই ঘটনাগুলি ছিল এতই তীব্র ও দ্রুতগতি যে সে-সব লিখে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না; কিন্তু সে-সব ঘটনা আমার স্মৃতিতে এতই সুস্পষ্ট হয়ে আছে যে তার কোনও বিবরণই বাদ পড়তে পারে না।

আমার গলাটা ধরে আসায় অক্সিজেন সিলিন্ডারটার দিকে তাকালাম, আর যা দেখলাম তাতে আমি চমকে উঠলাম। আমাদের জীবনের বালুকা-রেখাটা খুবই নিচে নেমে যাচ্ছিল। সেই রাতের কোনও এক সময়ে চ্যালেঞ্জার টিউবের সুইচটা তৃতীয় থেকে চতুর্থ সিলিন্ডারে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এখন পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে সেটাও প্রায় খালি হয়ে আসছে। গলাটা আটকে আসায় একটা ভয়ংকর অনুভূতি ক্রমেই আমাকে চেপে ধরতে লাগল। ছুটে গিয়ে নলের মুখটা খুলে নিয়ে সেটাকে সর্বশেষ সিলিন্ডারে লাগিয়ে দিলাম। আর ঠিক তখনই ভিতরের ঘর থেকে ভেসে এল মহিলাটির আর্ত চিৎকার :

“জর্জ, জর্জ, আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।”

অন্য সবাই উঠে দাঁড়ালেন। আমি বলে উঠলাম, “সব ঠিক আছে মিসেস চ্যালেঞ্জার। এইমাত্র আমি একটা নতুন সিলিন্ডার চালু করে দিয়েছি।”

টিউবটার দিকে তাকিয়ে লর্ড জন বলে উঠলেন, “পঞ্চম এবং শেষটি। আচ্ছা, তরুণ বন্ধুটি, তুমি নিশ্চয়ই বলবে না যে সারাক্ষণই তুমি হাঁটুর উপর খাতাটা রেখে লিখেই যাচ্ছিলে।”

“সময় কাটাবার জন্য কয়েকটা মাত্র কথা লিখেছি।”

চ্যালেঞ্জার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, ভোরের কুয়াশা প্রবল বেগে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। পেঁজা তুলোর মতো সমুদ্রের বুক থেকে একটা-দুটো গাছ- পাছালির পাহাড় মাথা তুলতে শুরু করেছে।

ড্রেসিং-গাউনটা গায়ে জড়িয়ে মিসেস চ্যালেঞ্জার ঘরে ঢুকে বললেন, “এটা একটা শবাচ্ছাদন-বস্ত্রও হতে পারত। কিন্তু—আপনারা সকলেই তো কাঁপছেন। আমি তো সারা রাত বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বেশ গরমেই কাটিয়েছি, কিন্তু আপনারা সকলেই তো চেয়ারে বসে ঠাণ্ডা হয়ে গেছেন। ঠিক আছে। এখনই ব্যবস্থা করছি।”

সাহসিকা মহিলাটি দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অচিরেই কেটলির হিস্-হিস্ শব্দ শুনতে পেলাম। ট্রের উপরে ধূমায়িত কোকোর পাঁচটা কাপ সাজিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন।

বললেন, “চুমুক দিন। অনেকটা ভাল বোধ করবেন।”

সকলেই তাঁর হুকুম তামিল করলাম। সামারলী জানতে চাইলেন, তাঁর পাইপটা ধরানো চলবে কি না। আমাদের সকলের সঙ্গেই ছিল সিগারেট। মনে হলো, এতক্ষণে আমাদের স্নায়ুগুলো যথাযথ শক্তি পেল। কিন্তু আমরা হয়তো একটা ভুল কাজই করে বসলাম। বন্ধ ঘরের আবহাওয়াটা ভয়ংকর হয়ে উঠল। চ্যালেঞ্জার ঘরের জানালাগুলো খুলে দিলেন।

লর্ড জন শুধালেন, “কতক্ষণ চলবে চ্যালেঞ্জার?”

কাঁধ নাচিয়ে তিনি জবাব দিলেন, “সম্ভবত ঘণ্টা তিনেক।”

তাঁর স্ত্রী বলে উঠলেন, “আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু বিপদ যতই কাছে আসছে ততই যেন সেটাকে সহজতর মনে হচ্ছে। জর্জ, তুমি কি ভাবছ না যে আমাদের প্রার্থনা করা উচিত?”

বৃহত্বপু লোকটি শান্ত গলায় জবাব দিলেন, “তোমার যদি ইচ্ছা হয় তো প্রার্থনা করবে। আমাদের সকলেরই প্রার্থনার নিজস্ব পথ আছে। ভাগ্য আমাকে যা পাঠাবে সেটাকে একান্তভাবে মেনে নেওয়াই আমার প্রার্থনার রীতি—আর তাকে মেনে নিতে হবে আনন্দিত চিত্তে। আমার তো মনে হয় পরমতম ধর্ম এবং পরমতম বিজ্ঞান সেখানেই এক হয়ে যায়।”

এই বিষয়টিকে নিয়ে আবার একপ্রস্থ বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল। একসময় মিসেস চ্যালেঞ্জার মহা উৎসাহে বলে উঠলেন, “আপনারা যে যাই বলুন, ভোরের এই তরতাজা বাতাসে যদি আমরা সকলে মিলে এই সুন্দর প্রকৃতির বুকে একবার বেড়িয়ে আসতে পারি, তো তাকে ফেলে আর কিছুই আমি চাই না!”

আমাদের সকলেরই অন্তরে তাঁর কথাগুলি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কুয়াশার আবরণ সরিয়ে বেরিয়ে এল ভোরের সূর্য। তার সোনালি আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল সমুখের দিগন্তবিস্তৃত বনভূমি। তখনকার সেই অন্ধকার বিষাক্ত আবহাওয়ায় বসে বহুদুর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিচ্ছন্ন, গৌরবমাখা, বাতাসে আন্দোলিত পল্লী-পরিবেশটি আমাদের কাছে একটা স্বপ্নের দেশ হয়ে দেখা দিল। মনের আনন্দে মিসেস চ্যালেঞ্জার সেই দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। চেয়ারগুলো তুলে নিয়ে আমরা অর্ধবৃত্তাকারে জানালাটাকে ঘিরে বসে পড়লাম। তখন পরিবেশের আবহাওয়াটা আমাদের খুবই কাছে এসে গেল। আমার তো মনে হলো, মৃত্যুর ছায়া যেন আমাদের উপর নেমে আসছে—আর আমরাই তো মানবজাতির শেষ প্রতিনিধি। মনে হতে লাগল যেন একটা অদৃশ্য যবনিকা চারদিক থেকে আমাদের উপর নেমে আসছে।

একসময় লর্ড হন হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “এই সিলিন্ডারটা মোটেই বেশি সময় চলল না।”

চ্যালেঞ্জার বললেন, “একটা সিলিন্ডারে ভর্তি করা অক্সিজেনের পরিমাণটা কম-বেশি হতেই পারে, আর সেটা নির্ভর করে গ্যাসটা ভর্তি করার সময় কতটা চাপ ও সতর্কতা ছিল তার উপরে। আমার ধারণা এই সিলিন্ডারটার কিছু খামতি ছিল।”

সামারলী তিক্ত কণ্ঠে মন্তব্য করলেন, “তাহলে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের জীবনের শেষ ঘণ্টাটা পর্যন্ত আমরা প্রতারিত হয়েছি। কী এক জঘন্য যুগে যে আমরা বাস করছি এটা তো তারই একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত।”

চ্যালেঞ্জার স্ত্রীকে বললেন, “আমার হাঁটুর কাছে টুলটার উপর বসে তোমার হাতটা ধর। আর প্রিয় বন্ধুগণ, আমি মনে করি এই দুঃসহ আবাহাওয়ার মধ্যে আর মুহূর্তমাত্রও কাটানো আমাদের পক্ষে উচিত হবে না। আর তুমিও নিশ্চয় সেটা চাও না?”

তাঁর স্ত্রী ঈষৎ আর্তনাদ করে মুখটা স্বামীর পায়ের উপর ডুবিয়ে দিলেন।

লর্ড জনের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জার প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি জানালাটা খুলে দিয়ে ইথারের মুখোমুখি দাঁড়াতে চান?”

“দম বন্ধ হয়ে মরার চাইতে বিষের ক্রিয়া অনেক ভাল।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি জানিয়ে সামারলী চ্যালেঞ্জারের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।

মুখে বললেন, “অনেক ঝগড়া-ঝাটি করেছি, এবার সে পালার অবসান হোক। আমরা পরস্পরের প্রিয় বন্ধুই ছিলাম। একে অন্যকে শ্রদ্ধা করেই চলেছি। এবার বিদায় বন্ধু!”

লর্ড জন বললেন, “বিদায়। জানালাটা পলস্তারা করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ওটা খোলা যাবে না।”

চ্যালেঞ্জার উবু হয়ে স্ত্রীকে তুলে বুকে চেপে ধরলেন। স্ত্রী দুই হাতে তাঁর গলাটা জড়িয়ে ধরলেন।

চ্যালেঞ্জার গম্ভীর গলায় বললেন, “ফিল্ড-গ্লাসটা আমাকে দিন ম্যালোন।”

আমি যন্ত্রটা তাঁর হাতে দিলাম।

যে মহাশক্তি আমাদের সৃষ্টিকর্তা তার হাতেই আবার নিজেদের সঁপে দিলাম”, বজ্রকণ্ঠে কথাগুলি উচ্চারণ করে তিনি ফিল্ড-গ্লাসটাকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

যন্ত্রটার ভাঙা অংশগুলির শেষ টুকরোটার টুং-টাং শব্দটা মিলিয়ে যাবার আগেই কোথা থেকে একটা মিষ্টি ঝড়ো হাওয়া এসে আমাদের মুখ-চোখের উপর ছড়িয়ে পড়ল।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমরা যে কতক্ষণ নীরবে বসে ছিলাম জানি না। তারপরেই বুঝি-বা স্বপ্নের মধ্যেই আর একবার কানে এল চ্যালেঞ্জারের কণ্ঠস্বর

তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “আবার আমরা স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে ফিরে এসেছি। জগতের বিষাক্ত ভূখণ্ডটি মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু গোটা মানবজাতির মধ্যে কেবলমাত্র আমরাই রক্ষা পেয়েছি।”