একু কুখ্যাত অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি লাভ
আমাদের এই কাহিনির নায়ক-নায়িকা তাদের গবেষণার কাজে কতটুকু এগোলো সেটা দেখার আগে আমরা দেখব দুষ্ট প্রকৃতির অপরাধী টম লিনডেনের উপর ব্রিটিশ আইনে কি শাস্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
সেই দুই নারী-পুলিশ লিনডেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিজয়গর্বে সোজা বার্ডলে স্কোয়ার স্টেশনে চলে গেল। সেখানে পুলিশ ইনস্পেক্টর মার্ফি তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সেই তাদের এ কাজে পাঠায়। মার্ফির মুখখানা ছিল লাল। নাকের নিচে কালো মোঁচ। তাকে আনন্দচঞ্চল বলে মনে হয়। নারীদের প্রতি আচরণে তার একটা পিতৃত্বসুলভ ভাব ছিল যেটা তার বয়সের সঙ্গে খাপ খায় না। সে তার অফিস ঘরে টেবিলের ধারে বসে ছিল। টেবিলের উপর অনেক কাগজপত্র ছড়ানো ছিল।
নারী-পুলিশ দু’জন ঘরে ঢুকতেই সে আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, কী খবর মেয়েরা? তোমাদের ভাগ্য কেমন?
বয়স্ক মহিলাটি বলল, খবরটা ভালই। আপনি যে খবর চেয়েছিলেন তা পেয়ে গেছি।
ইনস্পেক্টর তার ডেস্ক থেকে একটি লিখিত প্রশ্নের তালিকা তুলে নিল তারপর প্রশ্ন করল, তোমরা তাহলে আমার নির্দেশ মতো এগিয়েছ।
মহিলা বলল, হ্যাঁ আমি বলেছিলাম আমার স্বামী আপগ্রেসের যুদ্ধে মারা গেছে।
ইনস্পেক্টর আবার প্রশ্ন করল, তখন সে কি করল?
সে তখন আমার জন্য দুঃখিত হয়েছে বলে মনে হলো।
ইনস্পেক্টর বলল, এবার সে নিজের জন্য দুঃখিত হবে। আচ্ছা সে তোমাকে বলেনি যে তুমি একজন নিঃসঙ্গ মহিলা এবং তোমার কোনও স্বামী নেই?
না।
এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। আর কি খবর আছে?
মহিলা আরও বলল, সে আমার স্বামীর কতগুলো নাম করল একের পর এক। কিন্তু সেগুলো সব ভুল।
মহিলা আবার বলল, আমি যখন বললাম, এই বেলিংগার আমার মেয়ে, সে তখন আমার কথা বিশ্বাস করল।
ইনস্পেক্টর বলল, তুমি তাকে পেড্রোর কথাটা বলে চমকে দেবার চেষ্টা করনি?
হ্যাঁ, কিন্তু এর থেকে আমি কিছু পাইনি। তবে নামটা আমি বলেছিলাম আর সে নামটা মন দিয়ে শুনেছিল।
ইনস্পেক্টর মার্ফি বলল, এটা দুঃখের বিষয়, পেড্রো যে তোমার অ্যালসেশিয়ান কুকুরের নাম, ও জানত না। নামটা তার মনে রেখাপাত করেছে, এটাই যথেষ্ট। জুরিরা হাসবে এবং তুমি ভালই রায় পাবে। এবার তোমার ভাগ্যগণনার কথা বল। তুমি কি আমার নির্দেশ মতো করেছিলে?
হ্যাঁ, করেছিলাম। আমি অ্যামির যুবকের কথা বলেছিলাম। কিন্তু সে যা বলল, তাতে স্পষ্ট করে কিছু বোঝা গেল না।
সুচতুর শয়তান। সে তার ব্যবসা ঠিক বোঝে
কিন্তু সে বলেছিল যে অ্যামি ছেলেটিকে বিয়ে করে সুখী হবে না।
তাই নাকি? আমরা যা চেয়েছিলাম তার কিছুটা পেয়েছি। যাইহোক তোমার রিপোটর্টা ভাল করে লিখে একবার পড়ে শুনিয়ে দাও। তারপর দু’জনে বেরিয়ে গিয়ে দেখ কী করে কী করা যায়। অ্যামিও একটা রিপোর্ট লিখবে।
মহিলা বলল, খুব ভাল কথা মার্ফি।
মার্ফি বলল, এবার তাহলে আমরা কোর্টে গ্রেপ্তারী পরোয়ানার জন্য আবেদন করব। তবে সেটা নির্ভর করছে কোন ম্যাজিস্ট্রেটের উপর এই মামলার ভার পড়ে। গত মাসে মি. ড্যালারেট নামে এক ম্যাজিস্ট্রেট একজন মিডিয়ামকে ছেড়ে দেয়। সুতরাং তাকে দিয়ে আমাদের কাজ হবে না। ল্যানসিং আবার পরলোকবাদীদের সঙ্গে মেলামেশা করেন। তিনি ওদের দলেই। সুতরাং তাকে দিয়েও কিছু হবে না। একমাত্র মি. মেলরোজ কড়া বস্তুবাদী। আমরা কেবল তারই উপর নির্ভর করতে পারি। সুতরাং আমরা টম লিনডেনের জন্য গ্রেপ্তারী পরওয়ানা বার করতে সময় পাব। একবার গ্রেপ্তার করতে পারলে তার দণ্ড অনিবার্য।
মহিলা বলল, এ বিষয়ে জনসমর্থন পাওয়া যাবে না।
ইনস্পেক্টর হেসে বলল, আমাদের কাজ দেখে মনে হবে আমরা জনগণের স্বার্থই রক্ষা করছি। অর্থাৎ জনগণ যাতে বিভ্রান্ত হয়ে ওদের খপ্পরে না পড়ে। কিন্তু জনগণ তো এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ করেনি। তারা তো আমাদের কাছে এসে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে বলেনি। সুতরাং আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। এ বিষয়ে যে আইন আছে সে আইন যথারীতি কার্যকরী করতে হবে। যতদিন এই সব প্রেতচর্চার কাজ চলবে ততদিন আমাদেরও আইন রক্ষা করে চলতে হবে। ঠিক আছে, তোমরা এখন যাও। বেলা চারটের মধ্যে রিপোর্টটা আমাকে দিও।
বয়স্ক মহিলাটি মৃদু হেসে বলল, তার জন্য ভাববার কিছু নেই।
নারী পুলিশ দু’জন উঠে দাঁড়াতেই ইনস্পেক্টর আবার তাদের বলল, এতে যদি পঁচিশ পাউন্ড জরিমানা হয় তাহলে সে টাকাটা সরকারি তহবিলে যাবে। আবার অন্য কিছুও হতে পারে। যাইহোক তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও।
পরদিন সকালে মি. লিনডেন যখন তাঁর সাজানো গোছানো পড়ার ঘরে বসেছিলেন তখন তাদের নারী ভৃত্ত বিরক্তির সঙ্গে ঘরে ঢুকে বলল, একজন অফিসার এসেছেন।
মেয়েটির পিছনেই নীল পোশাক পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মি. লিনডেন? এই বলে সে লিনডেনের হাতে একটা কাগজ দিয়ে চলে গেল।
বিপদাপন্ন যে দম্পতি অজস্র লোকের দুঃখে সান্ত্বনা দান করার কাজেই জীবন যাপন করেন আজ তাদের নিজেদের দুঃখতেই সান্ত্বনা প্রয়োজন। কিন্তু সে সান্ত্বনা আজ কে তাদের দেবে? মিসেস লিনডেন একটা হাত দিয়ে স্বামীর গলাটা জড়িয়ে ধরলেন। মি. লিনডেন কাগজটা পড়তে লাগলেন :
৪০, টিউলিস স্ট্রীট-এর বাসিন্দা টমাস লিনডেনের কাছে আজ এই মর্মে একটি পত্র পাঠান হচ্ছে যে, আপনি আপনার উপরিউক্ত বাসভবনে গত ১০ই নভেম্বর হেনরিয়াটা ড্রেসার ও অ্যামি বোলঞ্জলারের কাছে স্বীকার করেছেন আপনি তাদের ভাগ্য গণনা করে দিতে পারেন। এইভাবে আপনি দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এই কারণে আগামী ১৭ তারিখে বেলা এগারোটার সময় পুলিশ কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আপনার উপস্থিতির জন্য সমন জারি করা হলো।
(স্বাক্ষর) বি. জে. উইথারস্
১০ নভেম্বর।
ওইদিন বিকালেই মেইলি ম্যালনের সঙ্গে দেখা করে এই সমন নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। তারপর তারা দু’জনে পরলোক-তত্ত্বের নতুন ছাত্র ও একজন দক্ষ সলিসিটার বা কৌঁসুলি সামারওয়ে জোস্-এর সঙ্গে দেখা করতে গেল। সামারওয়ে জোনস্ সমনটা পড়েই ভ্রূ-কুঞ্চন করে বলল বেচারাকে সমন দেওয়া হয়েছে, এটা তার সৌভাগ্য। এই সব ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হাজতে সারারাত আটক রাখা হয়। পরদিন সকালে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে সওয়াল করার কেউ থাকে না। এই সব মেনে পুলিশ সুচতুর হওয়ায় বেছে বেছে কোনও রোমান ক্যাথলিক বা বস্তুবাদী ম্যাজিস্ট্রেটকে ধরবে। কারণ এরা পরলোক বা প্রেতচর্চার বিরোধী। তারপর হয়ত প্রধান বিচারপতি রায় দেবে মিডিয়ামের কাজ আইনের দিক থেকে অপরাধ। মিডিয়ামের সততা এখানে বড় কথা নয়। সুতরাং বিচারে কোনও ভাল ফল পাওয়া যাবে না। পরলোকতত্ত্ব বা প্রেতচর্চা নিয়ে যারা কাজ করে তারা ধর্মবোধ থেকেই এটা করে। কিন্তু পুলিশ আইনের সুযোগ নিয়ে তাদের উপর পীড়ন চালায়। জনগণ এ বিষয়ে উদাসীন। তারা এই আইন নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা শুধু তাদের ভাগ্য গণনার জন্য আগ্রহী। তারা শুধু তাদের ভাগ্য সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী শোনার জন্য প্রেতচর্চার আসরে যায়। সব মিলিয়ে ব্যাপারটার মধ্যে কোনও সার বস্তু নেই।
এ নিয়ে আইন প্রণয়ন করা মানে আইন-এর সম্মান হানি করা।
ম্যালনের ভিতরটা চাপা আগুনে জ্বলছিল। সেই আগুনের তাপে মুখখানা লাল হয়ে গেল। আমি এ নিয়ে কাগজে লিখব।
সলিসিটার জোন্স বলল, এ বিষয়ে দুটো আইন আছে। দুটো আইনের কোনওটাই ভাল নয়। এই আইন তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই যখন পরলোক তত্ত্বের কথা শোনাই যায়নি। দ্বিতীয় জর্জের আমল থেকে ডাইনী সম্বন্ধে একটা আইন আছে। এখন সে আইন অবান্তর হয়ে পড়েছে। এরপর আছে ১৮২৮ সালের ভবঘুরে আইন। এই আইন তৈরি হয়েছিল পথের ধারে ধারে ঘুরে বেড়ান ভ্রাম্যমাণ জিপসী বা বেদেদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কোনও লোক যদি ভাগ্য গণনার নামে সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে দেশের মানুষকে প্রতারিত করে তাহলে তাকে দুর্বৃত্ত বা ভবঘুরে বলে ধরে নেওয়া হয়।
মেইলি জিজ্ঞাসা করল, এক্ষেত্রে তাহলে আমাদের কি করণীয়?
সলিসিটার মাথা চুলকে বলল, আমি কী বলব কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। আমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়েছি।
ম্যালন বলল, এত সহজে তো আমরা আশা ছাড়তে পারি না। আমরা জানি লোকটি সৎ। আমরা জানি উনি একজন প্রকৃত সৎ লোক।
সঙ্গে সঙ্গে মেইলি আবেগে ম্যালনের একটা হাত জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, এখনও আমরা তোমাকে ঠিক পরলোকবাদী বলতে পারি না। কিন্তু তোমার মতো লোকই আমরা চাই। এমন অনেক লোক আছে যারা ভাল সময়ে মিডিয়ামের সামনে ভীড় জমায়। কিন্তু এই ধরনের বিপদের অভাস পেলেই তাকে ছেড়ে চলে যায়। তবে ব্রুকস্, ব্যাডউইন এবং জোনস্-এর মতো কিছু বড় মাপের মানুষও আছেন যাঁরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেন। আমাদের মধ্য থেকেই এই ধরনের এক শ’ দুশো লোক জোগাড় করতে পারি।
আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সলিসিটার বলল, তাই নাকি। তাহলে আমি টাকা নিয়ে তোমাদের কাজ করব।
একজন কে. সি-র ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?
হ্যাঁ, তবে ওরা পুলিশ কোর্টে ওকালতি করে না। আপনারা যদি আমার হাতে এই কেসটা ছেড়ে দেন তাহলে আমি অন্য যে কোনও উকিলের মতোই কাজ চালিয়ে যাব। তাতে খরচও কম হবে।
মেইলি বলল, হ্যাঁ আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আশা করছি আরও কিছু ভাল লোক আমাদের দলে পাব।
ম্যালন বলল, আমরা কিছু না পারলেও ব্যাপারটা প্রচার করতে পারব। কাজের মাধ্যামে জনগণকে জানাতে পারব। দেখতে বোকা ও মন্দগতি হলেও আসলে তারা ঠিক আছে, তারা কোনও অন্যায় সহ্য করবে না। তবে এ বিষয়ে যেটা সত্য সেটা তাদের মাথায় একবার ঢুকিয়ে দিতে হবে।
সলিসিটার বলল, যাইহোক আপনারা আপনাদের কাজ করে যাবেন। আর আমি আমার কাজ করে যাব। তারপর দেখা যাবে কি হয়।
সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনটি এসে গেল। মিডিয়াম মি. লিনডেনকে পুলিশ কোর্টে নিয়ে গিয়ে হাজির করাল। তিনি মধ্যবয়সী পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট মেলরোজের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন। মিসেস লিনডেন কাঠগড়ার তলায় একদিকে দাঁড়িয়ে নিজের একটা হাত স্বামীর একটা হাতের উপর মাঝে মাঝে রাখছিলেন।
পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট মি. মেলরোজের ভাগ্যগণকদের প্রতি কঠোরতার একটা খ্যাতি ছিল। যদিও তিনি নিজে কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই ভাগ্যগণনার বই পড়তেন।
কোর্ট ঘরটা জনতার ভীড়ে ভরে গিয়েছিল। মি. লিনডেনের অনেক মক্কেল ও শুভার্থী তার প্রতি সহানুভূতি জানাবার জন্য কোর্ট ঘরে হাজির হয়েছিল।
ম্যাজিস্ট্রেট মেলরোজ জিজ্ঞাসা করলেন এই মামলায় বিবাদী পক্ষের কেউ দাঁড়াচ্ছে কিনা।
বিবাদীপক্ষের উকিল সামারওয়ে জোন্স উঠে দাঁড়িয়ে বলল, হ্যাঁ হুজুর মামলা শুরু হবার আগে আমি কি একটা আপত্তি তুলতে পারি?
মেলরোজ বললেন, আপনি যদি এক্ষেত্রে তা সময়োপযোগী মনে করেন তাহলে তা অবশ্যই তুলতে পারেন।
জোন্স বলল, মামলাটি বিধিবদ্ধভাবে সাজানোর আগে হুজুরের কাছে যথাবিহিত সম্মানের সঙ্গে এই অনুরোধ করতে চাই যে, তিনি যেন মামলা রুজু করার আগে আমার মক্কেলের কথাটা একবার ভেবে দেখেন। আমার মক্কেল একজন ভবঘুরে নয়। তিনি সমাজের একজন সম্মানিত সদস্য যিনি তাঁর নিজস্ব বাড়িতে নিয়মিত কর দিয়ে বাস করেন। দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতো তিনিও সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। আজ তিনি ১৮২৪ সালে প্রণীত ‘ভবঘুরে আইন’-এর চতুর্থ ধারায় অভিযুক্ত। এই আইন যতসব অলস, ভবঘুরে ও দুর্বৃত্তদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। সেই সময় বেআইনীভাবে চলাফেরা করতে থাকা যে সব বেদে ভবঘুরে ও দুর্বৃত্তদের দ্বারা সারা দেশ ভরে গিয়েছিল তাদের নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এই আইনের উৎপত্তির কারণ। মহামান্য হুজুরের কাছে আমার নিবেদন এই যে, আমার মক্কেল এই আইনের আওতায় পড়েন না এবং তিনি এই আইনের বিধিবদ্ধ কোনও শাস্তির যোগ্য নন।
ম্যাজিস্ট্রেট ঘাড় নেড়ে বললেন, এই আইন প্রয়োগের বহু নজির আছে। এক্ষেত্রে সেগুলির ব্যাখ্যা করে দেখতে হবে। পুলিশ কমিশনারের পক্ষে যে সলিসিটার আসামীকে এই মামলায় অভিযুক্ত করেছেন তাঁকে সাক্ষী দেবার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
ষাঁড়ের মতো মোটাসোটা ও দাঁড়কাকের মতো কণ্ঠবিশিষ্ট একজন ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন, আমি হেনরিয়াটা ড্রেসারকে ডাকছি।
বয়স্কা একজন নারী পুলিশ হাতে খোলা নোট-বই নিয়ে তৎপরতার সঙ্গে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
সলিসিটার তাকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি তো একজন নারী পুলিশ। তাই নয় কি?
নারী-পুলিশ উত্তর করল, হ্যাঁ স্যার।
সলিসিটার আবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আপনি কি আসামীর বাড়িতে যাবার আগের দিন তার বাড়িটি লক্ষ্য করেছিলেন?
হ্যাঁ স্যার।
কতজন লোক সেই বাড়ির ভিতরে গিয়েছিল?
চোদ্দজন, স্যার।
সলিসিটার বলল, চোদ্দজন এবং আসামীর গড়পড়তা ফী হলো ষোলো পেনি।
সাক্ষী মহিলা পুলিশ বলল, হ্যাঁ।
তাহলে একদিনে সাত পাউন্ড ভালই পারিশ্রমিক। ভাল রোজগার। অথচ কত সৎ লোককে দিনে পাঁচ শিলিং পেয়ে খুশি থাকতে হয়।
মি. লিনডেন চিৎকার করে বললেন, ওরা ব্যবসায়ী।
এবার সাক্ষী মহিলা পুলিশ হেনরিয়াটা ড্রেসারকে অভিযোগকারী সলিসিটার জিজ্ঞাসা করল, যখন সে ও অ্যামি বেলিঞ্জার লিনডেনের বাড়িতে গিয়েছিল তখন কী কী ঘটেছিল?
মহিলা পুলিশ তার নোট-বই থেকে ঘটনার যে বিবরণ পড়ে শোনাল তা মোটামুটি সত্যি। সে বিবাহিতা মহিলা ছিল না। কিন্তু মিডিয়ামকে বলেছিল সে একজন বিবাহিতা মহিলা এবং তার সঙ্গে যে মেয়েটি ছিল সে তার নিজের মেয়ে। মি. লিনডেন এ ব্যাপারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। মহিলা পুলিশ তার বিবরণে যে সব নামের উল্লেখ করল তাদের তিনি চেনেন না। তিনি শুধু তার মেয়ের ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সে সুখী হবে না। এখন বুঝলেন সে অবিবাহিত এবং তার সঙ্গের মেয়েটির সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।
ম্যাজিস্ট্রেট এবার আসামী পক্ষের উকিলকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি কোনও প্রশ্ন করবেন মি. জোন্স?
মি. জোন্স মহিলা পুলিশকে প্রশ্ন করল, আপনি তাহলে আসামীর কাছে কোনও দুঃখের সান্ত্বনা পাবার জন্য গিয়েছিলেন এবং আসামী তা দেবার চেষ্টা করেছিলেন।
সাক্ষী মহিলা পুলিশ উত্তর দিল, আপনি তা অবশ্য মনে করতে পারেন।
আমার মনে হচ্ছে আপনি তার কাছে কোনও বিষয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
হ্যাঁ, আমি তার মনে ঐ ভাবই জাগাতে চেয়েছিলাম।
এটা কি আপনি ভণ্ডামি বলে মনে করেন না?
যা আমার কর্তব্য আমি তাই করেছিলাম।
সলিসিটার এবার সাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি তখন আসামীর পরলোক বা প্রেততত্ত্ব অথবা তার কোনও অস্বাভাবিক আচরণ দেখেননি?
না, তাকে দেখে একজন ভদ্র সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।
অ্যামি বিলিঞ্জার ছিল পরের সাক্ষী। সে তার নোট-বই হাতে নিয়ে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
মি. জোন্স ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা হুজুর, এই সাক্ষীর কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ দেওয়ার কি কোনও বৈধ অধিকার আছে?
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, কেন নেই? প্রকৃত তথ্য কি আপনি চান না?
অভিযোগকারী সলিসটিার বলল, হয়ত মি. জোন্স তা চান না।
মি. জোন্স বলল, এই দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রমাণ এমনভাবে সাজান হয়েছে যাতে এদের কথার সঙ্গে অপরের মিল থাকে।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, পুলিশ এইভাবেই তাদের কেস সাজায়। এটাই স্বাভাবিক। আশার করি এ বিষয়ে আপনার বলার কিছুই নেই, মি. জোন্স। এবার এই সাক্ষীর কাজ শুরু হোক।
এই সাক্ষীর কাজ আগের সাক্ষীর মতোই চলল। মি. জোন্স জিজ্ঞাসা করল, আপনি আপনার প্রেমিকের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিন্তু আপনার কোনও প্ৰেমিক নেই।
হ্যাঁ, তাই।
তাহলে আপনারা দু’জনেই এক দীর্ঘ মিথ্যা কাহিনি বলেছিলেন।
হ্যাঁ বলেছিলাম এক ভাল উদ্দেশ্য সাধনের জন্য।
আপনি তাহলে উদ্দেশ্যের কথা ভেবেছিলেন। ভেবেছিলেন উদ্দেশ্য ভাল হলে উপায় যাই হোক না কেন ক্ষতি নেই।
আমাদের এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল। এবং আমরা সেই মতোই কাজ করেছি।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, মহিলা পুলিশ সাক্ষী দু’জন ভালই সাক্ষ্য দিয়েছে। মি. জোন্স, বিবাদী পক্ষের কোনও সাক্ষী আছে?
এরপর মি. জোন্স বলল, এই কোর্টঘরে এমন অনেক লোক আছেন যাঁরা আসামীর মিডিয়াম সংক্রান্ত কাজকর্মের দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছেন। আমি একজন মহিলার নিজস্ব বিবরণ থেকে জেনেছি আসামী কথা শুনে তিনি আত্মহত্যার সংকল্প ত্যাগ করেন, এবং এইভাবে তাঁর জীবন রক্ষা হয়। আমি আর একজন ব্যক্তিকে চিনি যিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নাস্তিক এবং যিনি তাঁর ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে সমস্ত আশা ও বিশ্বাস হারিয়েছিলেন। কিন্তু এই আসামীর পরলোক বিষয়ের অভিজ্ঞতা ও কাজকর্ম দেখে তাঁর মত পরিবর্তন করেন। আমি বিজ্ঞান ও সাহিত্য জগতের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিকেও সাক্ষী হিসাবে দাঁড় করাতে পারি যারা আসামীর পরলোক তত্ত্ব বিষয়ে সঠিক মতামত দেবে।
ম্যাজিস্ট্রেট মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন—আপনি অবশ্যই জানেন মি. জোন্স, এই ধরনের সাক্ষীর কোনও প্রয়োজন নেই এই মামলায়।
মহামান্য প্রধান বিচারপতি এই আইন প্রসঙ্গে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন কোনও রকমের অতিপ্রাকৃত শক্তি কোনও ব্যক্তি দ্বারা পরিচালনা করার ক্ষমতা কিছুতেই স্বীকৃত হবে না আইনে। এই ক্ষমতা থাকার ভান করে যদি কেউ কারও কাছ থেকে কোনও টাকাপয়সা নেয় তাহেেল তা অবশ্যই অপরাধ বলে গণ্য হবে। সুতরাং আপনি যে-সব সাক্ষীদের আনার কথা বললেন তাদের দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ালে তাতে কোনও ফলই হবে না। কেবল আদালতের বেশ কিছু সময় নষ্ট হবে। তবে অবশ্য অভিযোগকারী সলিসিটার সওয়াল করার পর আপনি যা বলবেন আমি তা শুনব।
মি. জোন্স এবার বলল, আমি কি এ বিষয়ে একটা কথা বলতে পারি হুজুর? এই আইন তাহলে সমস্ত ধর্মীয় ও পবিত্রচিত্ত ব্যক্তিদের একই সঙ্গে অস্বীকার করছে ও ধিক্কার জানাচ্ছে। তাই নয় কি? এই সব ধর্মীয় ব্যক্তিদেরও বাঁচতে হবে এবং বাঁচতে হলেই কিছু টাকা-পয়সা পেতেই হবে।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, আপনি কি ধর্মগুরুর ভবিষ্যৎ বক্তাদের কথা উল্লেখ করছেন! যদি তা করেন তাহলে আপনাকে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সে-যুগ গত হয়েছে এবং রাণী এ্যানিও আর বেঁচে নেই। এই যুক্তি আপনার বুদ্ধির উপযুক্ত নয়। আচ্ছা আর আপনার কিছু বলার আছে?
অভিযোগকারী সলিসিটার ম্যাজিস্ট্রেটের এই কথায় উৎসাহিত হয়ে অল্পকথায় তার বক্তব্য শেষ করল। সে বলল, আসামীর মতো এই ধরনের কাজ যারা করে তারা হচ্ছে সমাজের পরগাছা। তারা কাজের কাজ কিছু করে না। মহিলা পুলিশ দু’জন আসামীকে টাকা দিয়ে কী পেয়েছিল? আসামীর গতি- প্রকৃতিকে লোক সমক্ষ্যে তুলে ধরার জন্য মিথ্যা কথা বলে তার মন জয় করেছিল। এটা তাদের বাহাদুরি বলতে হবে। আসামীর মতো অনেকে মৃত্যু- শোকগ্রস্ত পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনকে ঠকিয়ে জীবিকা অর্জন করে। এটা তাদের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই আসামীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিৎ যাতে এই সব অসাধু লোকেরা এই কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনও সৎ ব্যবসায়ে মন দিতে পারে।
এবার জোন্স তার কথা বলতে শুরু করল, সে প্রথমেই বলল, এই আইন এমন সব ব্যাপারে প্রয়োগ করা হচ্ছে যা এই আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের আওতায় পড়ে না।
মি. জোন্স-এর কথা শেষ না হতেই তার মাঝখানে ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, এ কথা আগেই আপনি উত্থাপন করেছেন। এ ব্যাপারে তো যে কেউ সমালোচনা করতে পারত। পুলিশ যা সাক্ষী দিয়েছে তাতে শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপরাধ নিবারণই পুলিশের কাজ। কারণ একজনের অপরাধ অন্যদের প্ররোচিত করে। এইভাবে অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যায়। সুতরাং পুলিশ যেখানেই অপরাধ দেখবে সেখানেই তা দমন করার চেষ্টা করবে। আপনি নিশ্চয় পুলিশের সততার উপর নিন্দা আরোপ করতে চান, মি. জোন্স।
মি. জোন্স বলল, পুলিশরাও মানুষ, সুতরাং যেখানে তাদের স্বার্থ সেখানেই তারা নাক গলাবার চেষ্টা করবে। এই সব মামলাই কৃত্রিমভাবে সাজানো। এইসব মামলার কোনও ক্ষেত্রে জনগণের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি অথবা কেউ তাদের রক্ষা করার জন্য আবেদন জানায়নি। সব পেশাতেই প্রেতারণার ব্যাপার কিছুটা জড়িয়ে থাকে। কেউ যদি কোনও ভণ্ড মিডিয়ামকে স্বেচ্ছায় এক পেনি দিয়ে কিছু জানতে চায় তাহলে তার বলার কিছু থাকে না, যেমন কোনও লোক ফাটকা বাজারে ভুল করে কোনও কোম্পানিতে টাকা লগ্নি করলে তার বলার কিছু থাকে না। পুলিশ যখন এই সব মামলায় মিথ্যা সময় নষ্ট করছে এবং অযাচিতভাবে কল্পিত প্রতারিতদের জন্য কুম্ভীরাশ্রুপাত করছে, তখন এমন সব অপরাধ ঘটে চলেছে যেগুলোতে তাদের মনোযোগ দেওয়া একান্ত দরকার। আইন এখানে স্বেচ্ছাচারিতার কাজ করে চলেছে। পুলিশরা নিজেরাও তাদের ভাগ্যগণনা বা হস্তরেখা বিচার না করে থাকতে পারে না।
কয়েক বছর আগে ‘ডেইলি মেল’ পত্রিকা ভাগ্যগণনকারীদের বিরুদ্ধে সোরগোল তোলে। মহান লর্ড ভূতপূর্ব নর্থক্লাইফ বিবাদীপক্ষের হয়ে সাক্ষী দিতে ওঠেন। তখন দেখা যায় যে তাঁর অপর একটি পত্রিকায় নিয়মিতভাবে ভাগ্যগণনার একটি কলাম ছাপা হয়। এমনকি লর্ড নিজেও এই সব গণনায় বিশ্বাস করতেন। আমি তার নাম উল্লেখ করে তাঁর আত্মার কোনও অবমাননা করতে চাইনি। আজকাল কি অবান্তরভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। তা দেখানোর জন্যই এই দৃষ্টান্তের উল্লেখ করলাম।
এই আদালতের বিচারকমণ্ডলীর সদস্যদের ব্যক্তিগত মতবাদ যাই হোক না কেন, এ কথা অবিসম্বাদিত যে, সমাজের একটা বড় অংশ অর্থাৎ বহু বুদ্ধিমান ব্যক্তি ও কৃতি নাগরিক মিডিয়ামদের এই শক্তিকে পরলোকগত আত্মার শক্তির উল্লেখযোগ্য প্রকাশ বলে মনে করে। পরলোকগত আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার যে ক্ষমতার পরিচয় মিডিয়ামরা দেয় তা মানবজাতির একটি বিশেষ দিকের উন্নতিকে সূচিত করে। আত্মার যে শক্তির উন্নততর প্রকাশ মানবজাতির এক নবজন্ম ঘটাতে পারত, আজকের বস্তুবাদ সেই শক্তিকে আইন দ্বারা নিষ্পেষিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতি কি আত্মঘাতী ও মারাত্মক রীতি নয়? নারীপুলিশ দু’জন যে তথ্য দান করেছে তা নিঃসন্দেহে ভ্রান্ত। তাদের মিথ্যা উক্তিগুলি বিচার করে দেখার বা তার সত্যাসত্য সম্বন্ধে মন্তব্য করার কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরলোক-তত্ত্বের এই নিয়ম যে, কোনও বিষয়ে সঠিক ফল পেতে হলে উভয় পক্ষকে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কোনও এক পক্ষ যদি প্রতারণা করে অর্থাৎ মিডিয়ামের কাছে যে ব্যক্তি আসে সে যদি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে মিথ্যা কথা বলে তাহলে মিডিয়াম কি করতে পারে? সঠিক ফল কি ভাবে পাওয়া যেতে পারে? এক মুহূর্তের জন্য মাননীয় আদালত যদি পরলোকবাদীদের কথাটা ভেবে দেখেন তাহলে বুঝবেন, দু’জন ভাড়া করা মিথ্যাচারীর প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য পরলোকগত কোনও আত্মা স্বর্গের দেবদূতের মতো নেমে এসে মিডিয়ামের মাধ্যমে কথা বলবে, একথা মনে করা কত অবান্তর।
এইভাবে সংক্ষেপে বিবাদীপক্ষের জবাব দিলেন জোন্স। তাঁর কথায় আসামী লিনডেনের চোখে জল এল। ম্যাজিস্ট্রেটের কেরাণী ঘুমিয়ে পড়ল। ম্যাজিস্ট্রেট এবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত টানার জন্য সচেষ্ট হলেন।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, আইনের সঙ্গে আপনার যে বিবাদ তার মীমাংসা করা আমার ক্ষমতার বাইরে। আমি যা দেখছি বা বুঝছি সেই মতোই আইনের প্রয়োগ করছি। তবে আমি এতে সম্পূর্ণ একমত। বিবাদীপক্ষের লোকের ঘৃণ্য পরজীবী যারা সমাজে দুর্নীতিকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে চায়। তাদের নোংরা কাজগুলোকে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের কাজের সঙ্গে তুলনা করতে চায়। তাদের এই অভিপ্রায়কে সকল সৎ ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের তীব্র ভাষায় নিন্দা করা উচিৎ। ম্যাজিস্ট্রেট মি. লিনডেনের দিকে কড়াভাবে তাকিয়ে বললেন, আপনি একজন পাকা অপরাধী, যেহেতু আগে একবার আপনাকে সতর্ক করা হলেও আপনি আপনার জীবনের পথ পরিবর্তন করতে পারেননি, সেহেতু আমি আপনাকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করছি। জরিমানা দিয়ে এই দণ্ড হতে অব্যাহতি পাবার কোনও অবকাশ থাকবে না।
ম্যাজিস্ট্রেট এই রায় ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে মিসেস লিনডেনের মুখ থেকে এক আর্ত চিৎকারের ধ্বনি বেরিয়ে এল।
মি. লিনডেন কাঠগড়ার পাশে একবার তাকিয়ে বললেন, বিদায়। দুঃখে কাতর হয়ো না। এরপর একমুহূর্তের মধ্যে তাকে দ্রুত কারাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
জোন্স, মেইলী ও ম্যালন আদালত ঘরের মাঝখানে একসঙ্গে মিলিত হলো। তারা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা বলল, তারপর মেইলি দুঃখে কাতর মিসেস লিনডেনকে বাড়ি পৌঁছে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করল।
মিসেস লিনডেন আর্তনাদের সুরে বললেন, সকলকে তাদের দুঃখে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া তিনি কী এমন করেছেন। এই বিরাট শহরে তার থেকে ভাল লোক আর কে আছে?
মেইলি তখন বলল, আমি মনে করি না তার মতো জনগণের উপকারী বন্ধু আর একজনও আছে। আমি সাহস করে একথা বলতে পারি যে, ক্রাকফোর্ড-এর আর্চ বিশপের নেতৃত্বে সমস্ত চার্চের যাজকগণ মি. লিনডেনের মতো ধর্মকথা প্ৰমাণ করতে পারেনি। লিনডেন যেভাবে কত নাস্তিককে ধর্মান্তরিত করেছে তেমন আর কেউ পারেনি। আমি নিজে তা দেখেছি।
ম্যালন উত্তপ্ত কণ্ঠে বলল, লজ্জার কথা! এক জঘন্য লজ্জার কথা।
এক্ষেত্রে নোংরামি উল্লেখ করা হাস্যকর ব্যাপার। যাইহোক আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। এমন যে হবে তা আগে থেকেই জানতাম। যা ভেবেছিলাম তাই হলো। বৃথা সময় নষ্ট হলো।
ম্যালন জোর দিয়ে বলল, মোটেই নয়। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে সমাজের মধ্যে যে একটা অশুভ শক্তি গোপনে কাজ করে চলেছে সেটার কথা প্রকাশ হলো। এই আদালতে অনেক সাংবাদিক আছে। তারা নিশ্চয় এই অন্যায় সমর্থন করবে না।
মেইলি বলল, তাদের কথা বলবেন না। তাদের কাছ থেকে কোনও আশা করবেন না। সংবাদপত্র তার দায়িত্ব পালন করে না। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি।
আমি ব্যক্তিগত দায়িত্বে এটা প্রকাশ করব। অন্যান্য সংবাদপত্রও এটা প্ৰকাশ করবে। তুমি যতটা মনে কর, সংবাদ তার থেকে অনেক বেশি স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও বুদ্ধিমান।
মেইলিও মিসেস লিনডেনকে ম্যালন তার নির্জন বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফ্লীট স্ট্রীটে ‘প্ল্যানেট’ নামে একটা সংবাদপত্র কিনল। সংবাদপত্রটা খুলতেই বড় হরফে ছাপা একটা সংবাদ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল :
পুলিশ আদালতে প্রতারক
কুকুরকে মানুষ বলে ভুল
কে ছিল পেড্রো?
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
ম্যালন কাগজটা দুমড়ে মুচড়ে হাতের মধ্যে ধরে ভাবল যে পরলোকবাদীরা এই ঘটনায় বিরক্তি বোধ করবেই, তারা কিছুতেই এটাকে ভালভাবে নেবে না।
বেচারা টম লিনডেন কিন্তু সংবাদপত্রের কোনও সমর্থন পেলেন না। ব্যাপক নিন্দার মধ্যে দিয়ে তাঁর কারাবাস শুরু হলো। প্ল্যানেট হচ্ছে এমন এক সান্ধ্য পত্রিকা যা খেলার খবরের উপর নির্ভর করে। খেলার ফলাফল সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী করলেও ভাগ্যগণনার ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী অবান্তর বলে তারা মন্তব্য করতে লাগল। ‘অনেস্ট জন’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা মন্তব্য করল যে টম লিনডেনের অসততা জনগণের নিন্দার বিষয়। গ্রামাঞ্চল থেকে একজন ‘দি টাইম্স্’ পত্রিকায় তার ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ প্রকাশ করে লিখলেন, যে আত্মার দাম টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করা অন্যায়। ধর্ম সম্বন্ধীয় পত্রিকা ‘চার্চম্যান’ মন্তব্য করল যে ধর্ম সম্বন্ধে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বস্ততাই এই ঘটনার কারণ। ‘ফ্রীথিংকার’ পত্রিকা এই মত প্রকাশ করল যে, এই ঘটনায় জানা যায়, বোঝা যায় যে মানুষ আবার অন্ধ কুসংস্কার-রাজ্যে ফিরে যাচ্ছে। এই ভাবে সংবাদপত্র জগতে যেন এক তুমুল ঝড় বয়ে গেল। এইভাবে ভাগ্য এগিয়ে চলল আর টম লিনডেন তাঁর দুর্ভাগ্যের বোঝা বয়ে যেতে লাগলেন।
