আরও এক উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার কথা

আরও এক উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার কথা

সেদিন সন্ধ্যায় ম্যালন সাহিত্য ক্লাবের ধূমপানঘরে একপাশে এক টেবিলে বসে কি লিখেছিল। এনিডের মতামতগুলোকে নিজের মতামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছিল সে। ঘরের মধ্যে আরও কয়েকজন ধূমপান করছিল এবং কথাবার্তা বলছিল। কিন্তু তাতে ম্যালনের লেখার কোনও অসুবিধা হচ্ছিল না। বরং কিছুটা ভালই লাগছিল। কারণ তার মনে হচ্ছিল সে সাংবাদিক হলেও কর্মব্যস্ত এই সব মানবসমাজের সে একজন সদস্য। সে সমাজেরই একটি অংশ।

আগুনের ধারে বসে যারা কথা বলছিল তাদের মধ্যে একজন ম্যালনের দিকে তাকাচ্ছিল। সে একসময় মনস্তত্ত্বের কথা তুলতে ম্যালন আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে ওদের কথা শুনতে লাগল।

ম্যালন দেখল ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে যে সব আলোচনা হচ্ছিল তার প্রধান বিষয়বস্তু হলো বিজ্ঞান ও পরলোকতত্ত্ব। পোল্টার নামে এক খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক সেখানে ছিলেন। পোল্টার সাধারণ প্রত্যক্ষ বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করে তর্কের খাতিরেই তর্ক করেন। সদস্যদের অনেকেই তার কথার প্রতিবাদ করছিল। এ দলে সার্জেন অ্যাটকিনসনও ছিল। এ ছাড়া মিল ওয়াদি নামে এক সাংবাদিকও ছিল। পোল্টার একসময় বললেন, বিজ্ঞান মাকড়সার জালের মতো মানুষের মনে জড়িয়ে থাকা কুসংস্কারগুলোকে দূর করেছে। কিন্তু পৃথিবীটা একটা পুরনো আমলের বাড়ির মতো। যার জানলার ভিতর দিয়ে সূর্যের আলো পড়লেও সেই বাড়িটার ঘরগুলো মেঝের উপর ধুলো ঠিকই জমে আছে। এখন বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা মানে সময় ও উদ্যমের অপচয় করা, আমাদের চিন্তাকে এমন এক খাতে প্রবাহিত করানোর চেষ্টা করা যে খাত আমাদের কখনও প্রকৃত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবে না।

অ্যাটকিনসন বলল, এখন বিজ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে বেশি আলোচনা করা উচিত। পোল্টার বললেন, এ বিষয়ে আলোচনা যত কম হয় তত ভাল হয়। বাস্তব সত্যকে উপেক্ষা করে পরলোকের কাল্পনিক কথা নিয়ে আলোচনা করার কোনও অর্থ হয় না।

অ্যাটকিনসন বলল, প্রকৃতপক্ষে যা বিজ্ঞান নয় তা কি জান, তা হলো আমরা যে বিষয়ে কিছু জানি না সে বিষয়ের সত্যকে জোর করে অস্বীকার করা ও নস্যাৎ করা। সত্যকে গোঁড়ামির সঙ্গে অস্বীকার করার এক ব্যাপক প্রবণতাই আমাকে পরলোকতত্ত্বের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। আমি এমন বেশ কিছু বিশেষ পরলোকতাত্ত্বিককে জানি যারা কুড়ি বছর ধরে এই বিষয়ে চর্চা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

পোল্টার বললেন, আমি বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কাদামাটিতে ডুবে থাকতে পারি। কিন্তু পরলোকতত্ত্ববাদীদের সঙ্গে আকাশে উড়ে বেড়াতে পারি না আর তা চাইও না।

ম্যালন এতক্ষণ আগ্রহের সঙ্গে এসব শুনছিল। তার মধ্যে ঘৃণামিশ্রত একটা ক্রোধের আবেগ ক্রমশই জমে উঠছিল, এবার সেটা বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ল।

ম্যালন এবার তার চেয়ারটা ওদের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল, দেখ পোল্টার, তোমাদের মতো যারা নির্বোধ তারাই পিছন থেকে টান দিয়ে জগতের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে। তুমি নিজেই বলেছ তুমি এ বিষয়ে কিছু পড়নি এবং আমার মনে হয় কিছু শোনোও নি। তুমি অন্য এক বিষয়ে খ্যাতি অর্জন করেছ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এমন একদল নিষ্ঠাবান সৎ লোককে অবমাননা করবে যারা আর যাই হোক, যাদের একাগ্রতা, নিষ্ঠা এবং চিন্তায় কোনও ফাঁকি নেই।

পোল্টার বললেন, তুমি তো দেখছি এ বিষয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছ, কিন্তু তুমি তোমার রচনায় ও-কথা সাহস করে লেখনি। তুমি একজন পরলোকতত্ত্ববাদী হয়ে উঠেছ। আর তার প্রভাবে তোমার মত খণ্ডিত হয়ে উঠেছে। তাই নয় কি?

ম্যালন বলল, আমি একজন পরলোকতত্ত্ববাদী নই, শুধু এক সৎ গবেষক তুমি কিন্তু সততার সঙ্গে এ বিষয়ে কিছু জানতে চাওনি। আমি যতটুকু জানি তাতে আমি একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তুমি যাদের নির্বোধ দুরাত্মা বলেছে, তাদের জুতো পরিষ্কার করার ক্ষমতাও তোমাদের নেই।

ম্যালনের কথা শেষ হতেই দু’-একজন তাকে থামাবার জন্য বলে উঠল—ও ম্যালন, থাম্‌ থাম্।

পোল্টার ম্যালনের কথায় অপমানিত বোধ করলেন। তিনি ম্যালনকে রেগে বললেন, তোমার মতো লোক থাকলে এ ক্লাবে কেউ আসবে না। এই বলে তিনি বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, আমি এখানে অপমানিত হতে কখনও আসব না।

একজন বলল, তুমি ঠিকই করেছ ম্যালন।

ম্যালন বলল, আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমি ওকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিই। যাদের ও ভাল করে চেনে না, জানে না, তাদের বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কেন ও আজেবাজে কথা লিখবে! কেন ওদের দুর্বৃত্ত বলে অভিহিত করবে!

ম্যালনের কাঁধের উপর হাত বুলিয়ে অ্যাটকিনসন বলল, শান্ত হও, তুমি বিচলিত হয়ে পড়েছ। আমি তোমাকে একটা কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তোমার কাজে বাধা সৃষ্টি হবে বলে এতক্ষণ তা বলিনি।

ম্যালন উত্তপ্ত কণ্ঠে বলল, বাধা আমি অনেক-ই পেয়েছি। ওই হতভাগা বুড়ো গাধাটা আমার কানের কাছে ক্রমাগত চিৎকার করে অনেক বাধা সৃষ্টি করেছে আমার কাজে।

অ্যাটকিনসন বলল, আজ রাতে বিখ্যাত মিডিয়াম লিনডেনের অধিবেশনে যোগদান করার জন্য একটা বাড়তি টিকিট পেয়েছি আমি। তুমি কি সেখানে যেতে চাও? আমি তোমাকে যত মিডিয়ামের কথা বলেছি তাদের মধ্যে লিনডেন সবচেয়ে খ্যাতনামা। অধিবেশনটা হবে সাইকিক কলেজে।

ম্যালন বলল, মনে হয় যেতে পারব।

অ্যাটকিনসন বলল, আমার কাছে আরও একটা টিকিট আছে। লিনডেন সংশয়বাদীদের উপস্থিতিতে কিছু মনে করে না। শুধু অভদ্রভাবে যারা গোলমাল করে তাদের সম্পর্কে আপত্তি করে।

ম্যালন বলল, মি. চ্যালেঞ্জারের কন্যা এনিডকে নিয়ে যাওয়া উচিত। তুমি জান আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।

অ্যাটকিনসন বলল, আমি অবশ্যই তাকে নিয়ে যাব। তবে তুমি তাকে কথাটা জানিয়ে দিও।

নিশ্চয় তাকে জানাব।

মনে রাখবে সন্ধ্যা সাতটা। সাইকিক কলেজটা হল্যান্ড পার্কের কাছে।

ম্যালন বলল, ঠিক আছে, মিস চ্যালেঞ্জার ও আমি যথাসময়ে সেখানে যাব।

সন্ধ্যার সময় ম্যালন ও এনিড একটা গাড়িতে করে যাত্রা করল। যাওয়ার পথে উইমপুল স্ট্রীটে অ্যাটকিনসনকে তুলে নিল। ওদের ট্যাক্সিটা দ্রুত বেগে অক্সফোর্ড স্ট্রীট দিয়ে যেতে লাগল। নটিংহিলের পাশ দিয়ে হল্যান্ড পার্কের ভিক্টোরিয়া হাউসের কাছে থামল।

রাস্তার ধারে অনেকগুলো বাড়ির মাঝখানে একটা বড় বাড়ির সামনে গিয়ে ট্যাক্সিটা দাঁড়াল। এক চপটটে কুমারী মেয়ে ওদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরে নিয়ে গেল। এক প্রশস্ত হলঘরে স্তিমিত আলো। এক কোণে কয়েকটি মর্মর মূর্তির উপর পড়ে সেগুলিকে আলোকিত করছিল। সেই আলোতে মার্বেল পাথর ও পালিশ করা কাঠের কাজগুলো চকচক করছিল। একজন স্কটিশ মহিলা এগিয়ে এসে ওদের সঙ্গে দেখা করল এবং অ্যাটকিনসনকে এক পুরনো বন্ধু হিসাবে অভ্যর্থনা জানাল। অ্যাটকিনসন ওদের সঙ্গে সেই স্কটিশ মহিলার পরিচয় করিয়ে দিল। জানা গেল সেও একজন সাংবাদিক এবং তার নাম অগিলভি। ম্যালন আগেই শুনেছিল এই ভদ্রমহিলা ও তার স্বামী দু’জনে মিলে এই সুন্দর ও উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছে এবং তাতে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি সারা লন্ডন শহরের মধ্যে পরলোকচর্চা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।

মিসেস অগিলভি বললেন, লিনডেন ও তার স্ত্রী উপরে গেছেন। বাকি সব বসার ঘরে আছে। আপনারা কি কয়েক মিনিটের জন্য ওখানে গিয়ে বসে অপেক্ষা করবেন? লিনডেন বলেছেন আজকের কাজের পরিবেশটা ভালই আছে।

অ্যাটকিনসনের সঙ্গে ম্যালন ও এনিড বসার ঘরে দেখল সেখানে কিছু লোক প্রেতচর্চার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে। তাদের মধ্যে অনেকে নবাগত এবং কয়েকজন এ বিষয়ে আগ্রহী ও জিজ্ঞাসু ছাত্র ছিল। তারা সবাই আজকের অনুষ্ঠানে কি হয় তা দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ছিল।

দরজার কাছে লম্বা চেহারার খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা একজন ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়ে তার পরিচয় দিয়ে বলল, তার নাম অ্যালগার নন মেইলী। তিনি নবাগতদের সঙ্গে করমর্দন করলেন।

মেইলীর সঙ্গে ম্যালনের আগেই পরিচয় হয়েছিল। মেইলী এবার ম্যালনকে বললেন, আবার এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে এসেছি। আপনি এর আগের অনুষ্ঠানের বিবরণটা ভালই দিয়েছিলেন। তবু আমি বলব এ বিষয়ে নবাগত। মিস চ্যালেঞ্জার আপনি কি ভয় পেয়ে গেছেন?

এনিড উত্তর করল, আপনি কাছাকাছি থাকলে আমার ভয়ের কিছু নেই। আমি মোটেই ভয় পাই না।

মেইলী জোরে হেসে উঠল। তারপর বলতে লাগল, যে সব অনুষ্ঠানে প্রেতদের বাস্তব রূপ দান করা হয় সেইসব অনুষ্ঠান অন্যান্য অনুষ্ঠান থেকে পৃথক। এই সব অনুষ্ঠান বেশি মনোগ্রাহী ও আকর্ষণীয়। মিস্টার ম্যালন, আপনি এ বিষয়ে কতকগুলি ছবি তুলে রাখতে পারেন।

ম্যালন বলল, আমি আগে ভাবতাম এই গোটা ব্যাপারটা প্রতারণা।

মেইলী আবার বলল, প্রতারণা তো নয়ই বরং বলব অন্য সব বিষয় থেকে এ বিষয়টা সবচেয়ে যুক্তি ও প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ সব অনুষ্ঠানের মধ্যে কোনও প্রতারণার ভয় নেই, ভয়টা হলো একদল সাংবাদিকদের শয়তানি নিয়ে—যারা গভীরে প্রবেশ করে কিছু জানতে চায় না। যারা শুধু একটা উত্তেজনার জন্য এখানে আসে।

আচ্ছা আপনি এখানে পরিচিত কাউকে দেখতে পাচ্ছেন?

ম্যালন উত্তর করল, না, আমার পরিচতি কাউকে দেখছি না।

মেইলী ঘরখানার চারদিকে তাকিয়ে সমাগত অতিথিবর্গকে একবার দেখে নিল। তারপর বলতে লাগল, ওই লম্বা সুন্দরী ভদ্রমহিলা হচ্ছে রসল্যান্ডের ডাচেস অর্থাৎ ডিউক-পত্নী। আগুনের ধারে মধ্যবয়সী যে দম্পতি রয়েছেন তাঁরা হলেন লর্ড-লেডি মন্টনোয়ার। সত্যিই এঁরা সবাই অভিজাত সম্প্রদায়ের খুব ভাল লোক। যারা এ বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ও নৈতিক সাহসের পরিচয় দিয়েছে। ওই বাচাল মহিলাটি হলেন মিস ব্যাডলে। উনি ধনী পরিবারের মেয়ে, বিয়ে করেননি। উনি এইসব প্রেতচর্চার অনুষ্ঠানে যোগদান করতে খুবই ভালবাসেন। এছাড়া আর কিছু জানেন না। উনি চান প্রেতরার ছায়ামূর্তির রূপ ধারণ করে কথা বলবে। এবং তারপরই শূন্যে মিলিয়ে যাবে। এতে উনি দারুণ উত্তেজনা অনুভব করেন। আমি ওই দু’জন ভদ্রলোককে চিনি না তবে শুনেছি ওঁরা নাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার কাজের জন্য এখানে এসেছেন। ওই যে বলিষ্ঠ চেহারার ভদ্রলোক কালো পোশাক পরে তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বসে অছেন, উনি হচ্ছেন জেমস স্মিথ। এই স্মিথ দম্পতি তাঁদের দুই যুবক ছেলেকে যুদ্ধে হারিয়েছেন। ওই লম্বা ও কালো চেহারার অদ্ভুত দর্শন লোকটি দিনরাত একখানি ঘরের মধ্যে থাকেন। কেবল মাত্র সন্ধ্যার সময় প্রেতচর্চার অনুষ্ঠানে এসে যোগ দেন। একমাত্র এখানে আসা ছাড়া উনি ঘর থেকে বার হন না।

ম্যালন এবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা গ্লাস হাতে ওই ভদ্রলোকটি কে?

উত্তরে মেইলী বলল, উনি হচ্ছেন জাঁকজমকপূর্ণ এক গাধা, নাম ওয়েসারবি। উনি বড় বড় প্রাচীন পরিত্যক্ত অট্টালিকা বা প্রাসাদগুলোর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান এবং আপন মনে ফিসফিস করে রহস্যের কথা বলেন, আসলে যেখানে রহস্যের কিছুই নেই।

পরলোকতত্ত্ব বা প্রেততত্ত্বই হচ্ছে একমাত্র সত্যিকারের রহস্যময় বস্তু। যার মধ্যে আছে ভয়ঙ্কর রহস্যময়তা। কিন্তু উনি বলেন, প্রেতদের আহ্বান করে আনার ব্যাপারটা বাজে এবং নোংরা কাজ। কারণ সরলমনা সাধারণ শোকগ্রস্ত মানুষদের এক অলস অর্থহীন সান্ত্বনা দান করাই হলো এ কাজের উদ্দেশ্য।

এনিড বলল, আপনার ভদ্রলোকের কথাগুলো তো জ্ঞানবান লোকের কথা বলেই মনে হচ্ছে।

মেইলী বলল, কথাগুলো একেবারে অন্তরায়। তবু মতপার্থক্য সত্ত্বেও উনি এখানে আসেন এবং কবরের কাগজের এই সব অনুষ্ঠানের খবর পড়তে ভালবাসেন। তবে এ বিষয়ে উনি স্কটিশ রীতিই পছন্দ করেন এবং এলিফাস লেভি হচ্ছে ওরা কাছে যেন এক ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ।

এমন সময় বলসোভার দম্পতি ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন।

তাদের মুখ হাসি-খুশিতে ভরা ছিল। মি. বলসোভার ঘরে ঢুকেই বললেন, পরলোকতত্ত্ব চর্চার এই সব অনুষ্ঠান এমনই জিনিস যা মানুষে মানুষে সমস্ত শ্রেণীবৈষম্য লুপ্ত করে দেয়। প্রেততত্ত্বে অভিজ্ঞ কোনও মহিলা যিনি পরলোক থেকে প্রেতদের ডেকে আনার ক্ষমতা রাখেন তিনি সেই কোটিপতি ধনীর থেকেও বড়। বলসোভার এসেই অতিথিদের অনেককে আপন করে নিলেন। রসল্যান্ডের ডাচেস বা ডিউক-পত্নী বলসোভারকে তার বাড়িতে প্রেত অনুষ্ঠানের যে আসার বসে তাতে ভর্তি করে নিতে বললেন। এমন সময় মিসেস অগিলভি ঘরে ঢুকলেন। তিনি বললেন, আমার মনে হয় সকলে এখানে এসেছে গেছেন। সুতরাং আমরা উপরে উঠতে পারব।

নিচের তলার ঘরখানার ঠিক ওপরের ঘরখানাও বেশ বড় ছিল। ঘরটা বেশ আরামপ্রদ ও সারি দেওয়া চেয়ারে সাজানো। ঘরের একদিকে পরদা-ঘেরা একটা জায়গা ছিল। সেখানে সামনের দিকে মিডিয়াম মি. লিনডেন অনুষ্ঠান শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মি. লিনডেন-এর চেহারাটা বলিষ্ঠ ও সু-গঠিত ছিল। তাঁর মাথার কুঞ্চিত চুলগুলো চূড়ার আকারে বাঁধা ছিল। তিনি মধ্যবয়সী হলেও তাঁর স্ত্রীকে দেখে যুবতী মনে হচ্ছিল। তাঁর স্ত্রীকে দেখে মনে হচ্ছিল ক্লান্ত গৃহিণী। তাঁর চোখ দুটোর দৃষ্টি ছিল খুব তীক্ষ্ণ ও সন্ধানী। কিন্তু তিনি যখন তাঁর স্বামীর দিকে তাকাচ্ছিলেন তখন তাঁর সেই দৃষ্টি শ্রদ্ধায় মেদুর হয়ে উঠছিল। স্বামীর স্বার্থরক্ষা করাই তাঁর কাজ। স্বামীর কথা ও মনের ভাব তিনি বুঝিয়ে দেন। স্বামী মিডিয়াম হিসাবে অচেতন হয়ে পড়লে তিনি সব কিছু দেখাশোনা করেন।

মিডিয়াম বললেন, আপনারা সকলে আপন আপন আসন বেছে নিয়ে বসুন। যাঁদের সঙ্গে মহিলা আছেন তাঁরা তাঁদের পাশে নিয়ে বসতে পারেন। কেউ হাঁটুর উপর হাঁটু রেখে বসবেন না। সকলে পা নামিয়ে রেখে বসবেন। প্রেতের ছায়া- মূর্তি আকার ধারণ করলে তাকে কেউ ধরতে যাবেন না। তাকে ধরলে আমার ক্ষতি হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত দুই গবেষক পরস্পরের দিকে তাকাল। মেইলী তা লক্ষ্য করল।

মেইলী বলল, আমি দুটো ঘটনার কথা জানি যেখানে দর্শকদের মধ্যে কেউ প্রেতমূর্তিকে ধরতে গেলে মিডিয়ামের মধ্যে রক্তক্ষরণ হতে থাকে।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, কেন?

মেইলী উত্তর করল, মিডিয়াম নিজের দেহের অংশ দিয়ে প্রেতকে দৈহিক আকৃতি দান করে। এতে মিডিয়ামের খুব কষ্ট হয়। তার দেহটা হাল্কা হয়ে যায় এবং তার যন্ত্রণাবোধ হয়। কিন্তু প্রেতের দেহটা কিছুক্ষণের মধ্যে শূন্যে মিলিয়ে গেলে মিডিয়াম সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ সেই প্রেতমূর্তিটাকে ধরতে গেলে বা আটকাতে গেলে মিডিয়ামের গায়ের চামড়া ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে।

একজন গবেষক বলল, বুঝলাম না। মিডিয়ামের দেহ থেকে কোথায় টান পড়ে? এবং তার দেহ থেকে কি বেরিয়ে আসতে গিয়ে তার চামড়া ফাটিয়ে রক্তপাত ঘটায়?

দর্শকরা সকলে আসনে বসলে মিসেস অগলভি বললেন, আমি অল্প কথায় এর কর্মপদ্ধতিটা বুঝিয়ে দেব। মি. লিনডেন তাঁর ছোট ঘরখানায় এখনও ঢোকেননি।

মি. লিনডেন এখনও তার ঘরে ঢোকেননি, তিনি এখন বাইরে বসে আছেন। তিনি যতক্ষণ বাইরে লাল আলো জ্বেলে বসে থাকবেন, ততক্ষণের মধ্যে আপনাদের কেউ মিডিয়ামের ঘরটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

সেই ছোট ঘরটা ছিল পর্দা দিয়ে ঘেরা। তার মেঝেটায় ছিল কাঠের এক শক্ত পাটাতন, পর্দাগুলো ছিল ঘরের দেওয়াল থেকে দূরে। গবেষক দু’জন ঘরের ভিতরটা পরীক্ষা করে দেখল। দেখল সব ঠিক আছে।

ম্যালন এনিডের কানে কানে জিজ্ঞাসা করল, এ সবের কী প্রয়োজন?

উত্তর মেইলী দিয়ে দিল। ওই ঘরখানার প্রয়োজন আছে। প্রেতাত্মাকে আহ্বান করে এনে তাকে রূপ দেবার জন্য মিডিয়ামের ভেতর থেকে যে বাষ্পীয় বস্তু বার হয় সেই বস্তুকে ঘন ও সংগ্রহ করার জন্য ওই ঘরটার প্রয়োজন আছে। ওটা না থাকলে সেই বায়বীয় পদার্থটা বাতাসে মিশে গিয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষক দু’জনের মধ্যে একজন এসব কথাবার্তা শুনছিল। সে বলল, ওই ঘরটা অন্য উদ্দেশ্যও সাধন করতে পারে।

মেইলী বিজ্ঞের মতো বলল, ঠিকই বলেছেন। সর্ব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা পছন্দ করি।

গবেষকরা একমত হয়ে বলল, এর মধ্যে যে কোনও ছলনা নেই সেটা প্রমাণিত হলো।

এরপর দেখা গেল মিডিয়াম তার তাঁবুর ঘরের এককোণে গিয়ে বসলেন। তার স্ত্রী মিসেস লিনডেন ঘরের অন্যকোণে বসলেন। হলঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। তাঁবুর ঘরটার উপরে একটা লাল বাতি জ্বলতে লাগল। মিসেস লিনডেনের হাত দুটো তাঁর কোলের উপর রাখা ছিল। মিডিয়ামের কাজকর্ম ও কথাবার্তা তিনিই ব্যাখ্যা করে দেবেন। তাঁর হাবভাব দেখে মনে হলো তিনি যেন সব কিছুর মালিক ও কর্ত্রী। তার ভাব দেখে এনিডের হাসি পেল।

মিসেস লিনডেনকে দেখে জার্লির কথা মনে পড়ল এনিডের।

মিডিয়াম মি. লিনডেন তাঁর আসনে বসে ছিলেন। তিনি মগ্নচৈতন্য বা সমাধিস্থ না হয়েই কিছু পরলোকের বাণী শোনালেন। কিন্তু সেই বাণী শুনে ওরা সেই বাণীতে কার কথা বলা হচ্ছে তা বুঝতে পারল না। মি. লিনডেন তাঁর হাত দেখিয়ে বললেন, সভায় গোলমালের জন্যই সেই বাণী ঠিকমত কেউ শুনতে পায়নি।

কিন্তু ম্যালন আরও হতাশ হলো। তার মনে হলো সেই বাণীর যে অংশ বোঝা গেছে তা সত্যিই হতাশাজনক। সেই কৃত্রিম কথাগুলো কেউ যেন মিডিয়ামের মুখ দিয়ে বলিয়েছে।

মিডিয়াম একসময় বললেন, আমি এক যুবককে দেখছি যার চোখদুটো বাদামী রঙের আর মোচটার দুই প্রান্ত নুয়ে পড়েছে।

মিসেস ব্যাডলে চিৎকার করে বলে উঠল, ও প্রিয়তম তাহলে তুমি ফিরে এসেছ। এই বলে মিসেস ব্যাডলে মিডিয়ামকে জিজ্ঞাসা করল ওর কি কোনও বাণী আছে?

মিডিয়াম বললেন, সে শুধু তার প্রেম জানিয়েছে আর বলেছে সে তার প্রিয়তমাকে ভোলেনি।

মিসেস ব্যাডলে উৎসাহিত হয়ে বলল, একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে গেলাম। আমার প্রেমিক এই ভাবেই কথা বলতো।

মিসেস ব্যাডলে পাশাপাশি সবার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, তোমরা সবাই জান ও ছিল আমার প্রথম প্রেমিক। মি. লিনডেন ওকে পরলোক থেকে আনিয়েছেন। ওকে ডাকলেই আসে। আসতে কখনও ভুল করে না। মি. লিনডেন ওকে কয়েক বারই এনেছেন।

মিডিয়াম আবার বললেন, আমি আমার বাঁ দিকে খাকি পোশাক পরা এক যুবককে দেখছি। আমি তার মাথায় একটা প্রতীকচিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। ওটা গ্রীক ক্রশের চিহ্ন।

লেডি স্মিথ চিৎকার করে বলে উঠলেন, নিশ্চয় ও হলো জিন।

হ্যাঁ, ও সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ছে।

স্যার জেমস বলল, ওই গ্রীক ক্রশটা হলো বিমানের প্রপেলারের প্রতীক। আপনারা জানেন ও বিমান বাহিনীতে কাজ করত। ম্যালন ও এনিড দু’জনেই কেমন যেন একটা আঘাতে অভিভূত হয়ে গেল। মেইলী অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। সে চুপি চুপি এনিডকে বলল, এটা তেমন কিছু ভাল না। এরপর আরও ভাল কিছু দেখতে পাবে

মিডিয়ামের মুখ থেকে আর যে কয়েকটি বাণী বার হলো, তাতে অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে চিনতে পারল। তবু ম্যালনের মনে হলো মিডিয়াম হিসাবে মিসেস ডেবসের কাজ মি. লিনডেনের থেকে আরও মনোগ্রাহী এবং যুক্তিযুক্ত।

মেইলী বলল, একটু অপেক্ষা করুন।

মিডিয়াম এবার তার চেয়ারে শক্ত হয়ে বসলেন। তারপর চেয়ারের উপরেই দেহটা টানটান হয়ে গেল। তার মুখ থেকে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস পড়তে লাগল। তার শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। তারপর অচেতন অবস্থাতেই তার কণ্ঠস্বর শোনা যেতে লাগল।

তবে সে-কণ্ঠস্বর আগের থেকে পরিষ্কার ও আবেগময়।

মিসেস লিনডেন তখন বললেন, মিডিয়াম এবার বায়বীয় প্রেতদের মূর্তিদান করে দেখাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাবধান, দর্শকদের মধ্যে কেউ যেন সেই মূর্তিকে স্পর্শ না করে। স্পর্শ করার দরকার হলে ভিক্টের তা বলবে। ভিক্টর হচ্ছে মিডিয়ামের নিয়ন্ত্রণ-কর্তা।

মিডিয়ামের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—সকলকে শুভ সন্ধ্যা।

তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে এক গুঞ্জনধ্বনি শোনা গেল। সবাই একবাক্যে বলতে লাগল : শুভ সন্ধ্যা ভিক্টর।

মিসেস লিনডেন বললেন, আমাদের প্রার্থনার গানের মধ্যে ঐকতান ছিল না। সুর সংগতির অভাবে যে-প্রেতাত্মা উপস্থিত হয়েছে সে কোনও কাজ করতে পারছে না। মার্টিন লাইটফুড সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করছে।

মেইলী ফিসফিস করে বলল, মার্টিন হচ্ছে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণকর্তা।

মিসেস লিনডেন আবার বললেন, আমার মনে হয় গ্রামোফোনে গান বাজালে ভাল হবে। তবে, স্তোত্রগানই সব চেয়ে ভাল, যদিও ধর্মনিরপেক্ষ গানেও বিশেষ কোনও আপত্তি নেই। যা ভাল মনে করেন তাই করুন, মিসেস অগিলভি।

গ্রামোফোন চালানো হলো। গ্রামোফোনের পিনটা ঘূর্ণয়মান রেকর্ডের ডিস্কের উপর চলতে লাগল। গানটার নাম হলো—”জ্বালো, দয়ার আলো জ্বালো”। এই প্রার্থনা-গানটা বাজানো হচ্ছিল। ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলে যোগ দিয়ে চাপা গলায় গানটা গাইতে লাগল। মিসেস অগিলভি গানটা পরিবর্তন করে ‘হে ঈশ্বর যুগে যুগে তুমি একমাত্র সহায়’–এই গানটা বাজাতে লাগলেন। তারপর তিনি বললেন, তবে আজ রাতটা তেমন ভাল নয়।

এবার মিডিয়াম মি. লিনডেন বললেন, হ্যাঁ, আজকে রাতে আমরা যথেষ্ট শক্তি পেয়েছি। তবে সে শক্তিটা আমরা এখানে আগত আত্মাদের শরীরী রূপদানের জন্য সংরক্ষিত করতে চাই। মার্টিন বলছে সে আমাদের এ ব্যাপারে সাহায্য করবে। সে এ কাজ ভালোই পারে।

এমন সময় মিডিয়ামের ছোট ঘরের সামনের দিকের পর্দাটা দুলে উঠল। মনে হলো পিছন দিক থেকে আসা একটা দমকা হাওয়া পর্দাটাকে দোলালো। এরপর সামনের দিক থেকে পর্দাটা ফাঁক হয়ে গেল। তাতে দেখা গেল মি. লিনডেন ও মিসেস লিনডেন-এর মাঝখানে একটা কালো অদ্ভুত ধরনের মানুষের মূর্তি। মিসেস লিনডেন তাকে বললেন, ভয় করো না, বাছা। কেউ তোমাকে আঘাত করবে না। এই সময় ঘরের মাঝখানে টেবিলের চারপাশে চক্রাকারে যারা বসে ছিল তারা হঠাৎ একটা দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া অনুভব করল।

মিসেস লিনডেন সামনে দর্শকদের পানে চেয়ে বললেন, আত্মাটি এই প্রথম আমাদের জগতে এসেছে। তাই এখানকার সবকিছু তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। এটাই স্বাভাবিক। আমরাও যদি ওদের জগতে হঠাৎ গিয়ে পড়ি তাহলে সেখানকার সব কিছু আমাদের অদ্ভুত লাগবে। এই বলে মিসেস লিনডেন তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তাই নয় কি বাছা?

এইবার সেই নবাগত মূর্তিটি মিডিয়ামের ঘর থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল। সকলে হতবাক হয়ে ভীত সন্ত্রস্ত চোখে বসে রইল আপন আপন আসনে। মিসেস ব্যাডলে তাঁর আসনে বসে পাগলের মতো খিলখিল করে হেসে উঠলেন। ওয়েসারবি তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। ম্যালন ও এনিড কিন্তু ভয় পেল না। কিন্তু আমরা কৌতূহলপীড়িত হচ্ছি। কি আশ্চর্যের কথা! বাইরে যখন কত কর্মব্যস্ত জীবনে আলোড়ন চলছে তখন এই ঘরের ভিতর আমরা এক অতি অদ্ভুত প্রেতমূর্তিকে সামনাসামনি দেখছি।

মিডিয়ামের ঘর থেকে বেরিয়ে আসা সেই প্রেতমূর্তি ঘরের মাঝখানে ঘুরতে ঘুরতে এনিডের কাছে চলে এল। ঘরের মধ্যে যে মৃদু লাল আলো জ্বলছিল তাতে সে স্পষ্ট দেখতে পেল মূর্তিটা এক বয়স্কা বেঁটেখাটো চেহারার নারীর।

মিসেস বলসোভার চিৎকার করে বলে উঠলেন, এ তো সুশান! সুশান তুমি আমাকে চিনতে পারছ না!

সে নারীমূর্তিটি মুখ ঘুরিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

মি. বলসোভার বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ প্রিয়তমা, এ হচ্ছে তোমার বোন সুশী। আমি আগে তাকে সব সময় কালো পোশাক পরতে দেখেছি। সুশান, আমাদের সঙ্গে কথা বল।

সেই নারীমূর্তির মাথাটা কাঁপতে লাগল।

মিসেস লিনডেন বললেন, যারা পরলোক থেকে প্রথম আসে তারা প্রথম প্রথম কোনও কথা বলে না। ওরা এক জায়গায় এতগুলো জীবন্ত মানুষের আবেগপ্রবণ কৌতূহল দেখে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। ও এখন চলে যাবে।

সত্যিই দেখা গেল সেই নারীমূর্তিটি মিডিয়ামের ছোট ঘরখানার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু ঘরে ঢোকার আগেই মনে হলো সে মাটির মধ্যে ঢুকে গেল। যেন অদৃশ্য হয়ে গেল সেই প্রেতমূর্তি।

মিসেস লিনডেন বললেন, এবার গ্রামোফোন বাজাও। গ্রামোফোনে গান বাজানোর ফলে ঘরের গুরুগম্ভীর পরিবেশটা হালকা হয়ে উঠল। দর্শকরা আপন আপন চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করতে লাগল। সহসা মিডিয়ামের ঘরের সামনের দিকের পর্দাটা ফাঁক হয়ে গেল। ঘরের মধ্যে আবার দ্বিতীয় এক মূর্তি আবির্ভূত হলো।

সে মূর্তিটি হলো এক ছোট বালিকার। তার মাথার এলো চুলগুলো পিঠের উপর ঝুলছিল। সে তাড়াতাড়ি হলঘরের মাঝখানে এগিয়ে এল। মেয়েটিকে দেখে মিসেস লিনডেন সন্তুষ্ট হয়ে হাসতে লাগলেন। এবার আপনারা ভাল কিছু পাবেন।

হঠাৎ ডিউক-পত্নী বলে উঠলেন, শুভ সন্ধ্যা লুসিলি। তোমার সঙ্গে আমার গত মাসে দেখা হয়েছিল। যখন তোমার মিডিয়াম ম্যালটেভার টাওয়ারে আসে।

লুসিলি বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ লেডি। আমার মনে পড়েছে টমি নামে আপনার একটি ছোট ছেলে আমাদের জগতে বাস করে। কিন্তু মৃত নয়, আমরা আপনাদের থেকে বেশি জীবন্ত। সব রকমের আনন্দ, চঞ্চলতা ও চপলতা আমাদের মধ্যে আছে। সেই ছোট মেয়েটি উচ্চকণ্ঠে পরিষ্কারভাবে ইংরাজী ভাষায় কথাগুলো বলল।

লুসিলি বলল, আমি কি আপনারা যেমন করে নাচেন তেমনি করে নাচব? এই বলে সে পাখির মতো শিস দিয়ে নাচতে লাগল। সে আবার বলল, সুশান এমন করে নাচতে পারে না, সে নাচ শেখেনি।

মেইলী জিজ্ঞাসা করল, আমার কথা কি তোমার মনে আছে লুসিলি?

লুসিলি বলল, হ্যাঁ তোমার কথা আমার মনে আছে মি. মেইলী। লম্বা-চওড়া চেহারার এক হলুদ দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক।

এনিড এমনই স্বপ্নাবিষ্টের মতো হয়ে গিয়েছিল যে জীবনে প্রথম নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল সে জেগে আছে নাকি স্বপ্ন দেখছে। সে বুঝতে পারল না যে সুন্দর আনন্দ-উৎফুল্ল ছোট্ট মেয়েটি চক্রের মাঝখানে বসে আছে, সে কি সত্যি সত্যি পরলোক থেকে আগত মৃত বিদেহী আত্মার প্রকাশিত শরীরী রূপ অর্থাৎ এক্টোপ্লাজমের সফল কর্ম, নাকি ইন্দ্রিয়সমূহের ভ্রান্তি বা অর্থহীন মায়া নাকি এক প্রতারণা। সুতরাং এই তিনটি সম্ভাবনার মধ্যে কোনও একটি অবশ্যই হবে। এটাকে ঠিক ভ্রান্তি বলা যায় না। কারণ উপস্থিত দর্শকদের সকলেই এটাকে সত্যি বলে মেনে নিয়েছে। এবং কেউ এটাকে ভ্রান্তিদর্শন বলে ভাবছে না। আবার এটা প্রতারণাও হতে পারে না। মিডিয়ামের বসার ঘরটা আগেই ভাল করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়েছে। সুতরাং এটা সত্যি। যদি এটা সত্য হয় তাহলে এটা কি সমস্ত জগতের সামনে পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে না?

লুসিলি নামে পরলোক থেকে আগত মেয়েটিকে একেবারেই বাস্তব দেখাচ্ছিল। তাকে এ জগতের এক জীবন্ত মেয়ে বলে মনে হচ্ছিল। সে আনন্দের সঙ্গে এমনভাবে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল যে উপস্থিত সকলে তা উপভোগ করছিল।

একজন প্রশ্ন করল, আগে তোমার নিবাস কোথায় ছিল লুসিসি?

মিসেস লিনডেন তখন বললেন, ওর কষ্ট বাঁচাবার জন্য আমি এর উত্তরটা দিচ্ছি। পূর্বজন্মে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত দক্ষিণ ডাক্টায় ওদের বাড়ি ছিল। চোদ্দ বছর বয়সে ওর মৃত্যু হয়। এই উক্তিগুলো আমরা আগেই পরীক্ষা করে দেখেছি।

আবার তাকে প্রশ্ন করা হলো, তোমার মৃত্যুতে তুমি কি খুশি হয়েছ লুসিলি? আমার দিক থেকে আমি খুশি হয়েছি, কিন্তু আমার মার জন্য খুবই দুঃখিত। তোমার মৃত্যুর পর তোমার মার সঙ্গে কি তোমার দেখা হত?

লুসিলি বলল, আমার মা যেন একটা বন্ধ বাক্সের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে। সে বাক্সের ঢাকনা খোলার সাধ্য লুসিলির নেই।

তুমি কি সুখী?

লুসিলি বলল, হ্যাঁ সত্যিই আমি সুখী, খুশিতে উজ্জ্বল।

আবার প্রশ্ন করা হলো, তুমি কি আবার এ জগতে ফিরে আসতে পার? এটা কি সম্ভব?

ঈশ্বর যদি আসার অনুমতি দেন তবেই পারব। কিন্তু এ প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করাটাই এক দুষ্ট লোকের কাজ।

আবার তাকে প্রশ্ন করা হলো, তুমি কোন ধর্মের মানুষ ছিলে?

লুসিলি উত্তর করল, আমরা ছিলাম রোমান ক্যাথলিক।

এই ধর্ম কি ঠিক?

লুসিলি বলল, সব ধর্মই ঠিক যদি তার থেকে উন্নতি হয়।

তাহলে কে কোন ধর্মের লোক তাতে কিছু আসে যায় না। তবে কি মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে যা করে তা বিশ্বাস করে না? যা বিশ্বাস করে তা করে না? অর্থাৎ মানুষ তার বিশ্বাস অনুসারে কাজ করে না?

লুসিলি বলল, লুসিলির সময় খুব অল্প। তার মতো আরও অনেকে এখানে আসতে চায়। সে যদি সব ক্ষমতা খরচ করে ফেলে তাহলে অন্যদের ক্ষমতা কমে যাবে। ঈশ্বর অতিশয় ভাল। ঈশ্বর সব সময়ই পরম মঙ্গলময়, অতিশয় দয়ালু।

তোমরা মর্ত্যের মানুষেরা জান না তিনি কত দয়ালু ও মঙ্গলময়। তিনি তোমাদের মঙ্গলের কথাই চিন্তা করেন এবং তোমাদের সকলকেই আকাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জন করার সুযোগ দেন। তোমরা সেই সব বস্তু লাভ করতে পারলেই ঈশ্বরকে ভাল বল।

লুসিলিকে আবার একজন প্রশ্ন করল, আচ্ছা তুমি কি ঈশ্বরকে দেখেছ?

ঈশ্বরকে দেখেছ! ঈশ্বরকে কেমন করে দেখব? তিনি সবসময়ই আমাদের চারদিকে আছেন, আমাদের মধ্যে আছেন এবং সকল বস্তুমধ্যে বিরাজ করছেন। কিন্তু আমরা তাঁকে দেখতে পাই না। তবে আমি খ্রীস্টকে দেখেছি। তিনি গৌরবময়। এবার আমি বিদায় নেব।

এই বলে লুসিলি সকলের দিকে পিছন ফিরে মিডিয়ামের বসার ঘরে চলে গেল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।

এরপর ম্যালনের জীবনে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার ঘটনা ঘটল। এবার মিডিয়ামের বসার ঘর থেকে বেঁটে ও মোটাসোটা চেহারার কালো রঙের এক মহিলা বেরিয়ে এল। মিসেস লিনডেন তাকে উৎসাহ দিলেন। সেই মূর্তিটি সোজা সাংবাদিক ম্যালনের কাছে চলে এল। মূর্তিটি বলল, আমরা তোমার জন্য চক্র অতিক্রম করতে পারি। তুমিও আমার কাছে এস।

ম্যালন এগিয়ে গিয়ে উঁকি মেরে সেই প্রেতমূর্তির দিকে তাকিয়ে ভয়ে অভিভূত হয়ে গেল।

সেই মূর্তিটার কোনও হাত-পা নেই, আছে শুধু একটা বড় মাথা। মাথার আকারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ম্যালন আর একটু ঝুঁকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখল সেই মাথাটা সম্পূর্ণ নিরেট বা শক্ত নয়, মনে হলো একটা প্রায় তরল বস্তু ধীরে ধীরে শক্ত আকার ধারণ করছে। যেন কোনও অদৃশ্য হাত ছাঁচে ফেলে একটা নরম অথবা বায়বীয় বস্তু দিয়ে একটা মূর্তি গড়তে চাইছে।

ম্যালন এক নিবিড় বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল সেই ক্রমনির্মীয়মান মূর্তিটা হাত-পা সহ তার মৃত মার আকার ধারণ করল। সে চিৎকার করে উঠল, মা তুমি!

সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রেতমূর্তিটি উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে আনন্দের আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু আবেগের আতিশয্যে অতিশয় চঞ্চলতা প্রকাশ করার জন্য মূর্তিটি তার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারল না। তাই সেই মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

মিসেস লিনডেন এবার ম্যালনের দিকে তাকিয়ে তার স্বভাবসিদ্ধ নির্বিকার বঙ্গিতে বললেন—এই আত্মাটি পরলোক থেকে এর আগে কখনও আসেনি, তাই কথা বলতে পারল না। ইনিই আপনার মা।

ম্যালন এবার সেই চক্র পার হয়ে অর্ধ অভিভূত অবস্থায় তার আসনে ফিরে গেল। এই ধরনের ঘটনা যে তার নিজের জীবনে ঘটবে মোটেই ভাবতে পারেনি ম্যালন। আজ হতে দশ বছর আগে তার মার মৃত্যু হয়েছে অথচ তার সেই মৃত মা আজ তার সামনে দাঁড়াল। এর থেকে বিস্ময়ের ঘটনা আর কী হতে পারে! তবু যুক্তিবাদী ম্যালন নিজেকে নিজে প্রশ্ন না করে পারল না, তুমি কি শপথ করে বলতে পারবে ইনিই তোমার মা? সে নিজের মনেই বলল, না। কিন্তু সে নিজেকে নিজে আবার প্রশ্ন করল। যুক্তির কথা ছেড়ে দাও, যা তুমি নিজের চোখে এখনি দেখলে তাতে কি নীতিগত ভাবে নিশ্চিত হতে পারছ? মন থেকে তার উত্তর বেরিয়ে এল, ‘হ্যাঁ’।

ম্যালনের অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত কাঁপছিল। তার সমস্ত অস্তিত্বটাই ভিত্তিমূল পর্যন্ত কেঁপে উঠল

কিন্তু আর এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ম্যালনের দৃষ্টি ও মনোযোগটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। মুখ ফিরিয়ে দেখল মিডিয়ামের ঘর থেকে একটি যুবকের প্রেতমূর্তি বেরিয়ে সোজা মেইলীর সামনে এসে দাঁড়াল।

মেইলী সেই যুবককে বলল, হ্যালো জ্যাক, কেমন আছে প্রিয় বাছাধন?

এরপর মেইলী দর্শকদের পানে তাকিয়ে বলল, এ হচ্ছে আমার ভাইপো। আমি যখনই মিডিয়াম লিনডেনের কাছে আসি তখনই আমার এই ভাইপো পরলোক থেকে এখানে আসে।

যুবকটি বলল, আমি তোমাকে দেখে খুশি হয়েছি, কাকা। আমার শক্তি কমে আসছে, আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। তুমি তো আমাকে এই আলোতেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ।

মেইলী বলল, হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমার কথা তোমার মাকে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি বললেন, চার্চ তাঁকে বলেছে এ সব মিথ্যা।

যুবকটি বলল, আমি তা জানি। চার্চ বলেছে আমি নাকি এক দৈত্য। ওদের এই সব ধারণা, এই সব সংস্কার সব পচে গেছে। সব পচা, পচা। এইসব পচা পচা জিনিসের পতন হবে। এই বলে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠস্বর কান্নার মধ্যে ডুবে গেল।

তোমার মাকে দোষ দিও না, জ্যাক। এটা তাঁর বিশ্বাস।

যুবকটি বলল, না, না, আমি তাঁকে দোষ দিই না। ভবিষ্যতে একদিন তিনি সব কিছু জানতে পারবেন। সেদিন শীঘ্রই আসছে। সেদিন প্রকৃত সত্য আপনা থেকেই প্রকাশিত হবে এবং যতসব নিষ্ঠুর প্রথা ও বিধিনিষেধ ও ঈশ্বর সম্বন্ধে ভ্রান্ত ভাবধারা সহ সব চার্চগুলো পৃথিবী থেকে বিদূরিত হবে। সব নিঃশেষে অপসারিত হবে।

মেইলী বলল, একথা কেন বলছ জান? তুমি তো দেখছি ধর্মদ্রোহী হয়ে উঠছ।

যুবক জ্যাক বলল, ভালবাসা, হে খুল্লতাত, ভালবাসাই হচ্ছে আসল কথা। তুমি কী বিশ্বাস কর বা না কর, তাতে কিছু আসে যায় না, যদি তুমি সৎ সদাচারী দয়ালু ও সনাতন খ্রীস্টের মতো হও।

দর্শকদের মধ্যে একজন জ্যাককে জিজ্ঞাসা করল, তুমি খ্রীস্টকে দেখেছে?

জ্যাক উত্তর করল, এখনও দেখিনি, তবে হয়ত পরে একদিন না একদিন দেখতে পাব।

তাকে আবার প্রশ্ন করা হলো, তবে কি তিনি স্বর্গে নেই?

স্বর্গ অনেক আছে। স্বর্গ একটা নয়। আমি একটা ছোটখাট স্বর্গে থাকি। তবে সব স্বর্গই সমান গৌরবময়।

এই আলোচনা চলাকালে এনিড তার ঘাড় বাড়িয়ে দিয়ে শুনতে লাগল। সে আগের থেকে আরও স্পষ্ট করে সবকিছু দেখতে পেল। যে লোকটি তার থেকে কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে মর্ত্যের মানুষ নয়। মানুষের দেহ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সে কোনও মর্ত্যের মানুষ নয়। মানুষের দেহধারী এক প্রেতাত্মা। তবে হলুদ ও সাদায় মেশা তার মুখখানা ঘরের উপস্থিত জীবন্ত মানুষদের মতো নয়। তার সমস্ত চেহারাটার মধ্যে একটি কঠিন ভাব দেখা গেল। মনে হলো কাঠের মতো শক্ত, মানুষ খুব রেগে গেলে যেমন খুব কঠোর হয়ে ওঠে।

মেইলী এবার বলল, প্রিয় জ্যাক এবার তুমি কিছু বল। তোমার জীবন সম্বন্ধে কিছু কথা বল দর্শকদের সামনে। জ্যাক লাজুক যুবকের মতো মাথাটা নত করে বলল, না আমি বলতে পারব না।

মেইলী আবার বলল, এসো, এসো জ্যাক, আমরা তোমার কথা শুনতে ভালবাসি। আমরা তোমার জীবনের কথা শুনতে চাই।

যুবক জ্যাক তখন বলতে শুরু করল, জীবিতরা মৃতদের এই ভাবে প্রায়ই বিরক্ত করে। তারা ওদের কথা শুনতে চায়। আসলে জীবিত ও মৃতের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য দেখিনা। তোমরা যদি ঘর পরিবর্তন করে অন্য ঘরে যাও তাহলে কি তোমাদের কোনও পরিবর্তন হয়? আমি মৃত্যুর পর পরলোক থেকে মার কাছে এসেছিলাম। কিন্তু মা আমাকে কোনও অভ্যর্থনা জানায়নি।

মেইলী বলল, দুঃখ করো না। তোমার মাকে এ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে হবে।

জ্যাক বলল, হ্যাঁ তাদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। আসল সত্যকে জানতে হবে। অন্য যে কোনও বিষয়ে আলোচনা করার থেকে পরলোকের জ্ঞান চর্চা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খবরের কাগজগুলো ফুটবল খেলার দিকে যত নজর দেয় ততটা নজর এই পরলোকচর্চা নিয়ে দেয় না। ইহলোক ও পরলোকের মাঝখানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অজ্ঞতা। এই বাধা ঘুচিয়ে সকলকে আসল কথা জানাতে হবে।

হঠাৎ দর্শকরা মিডিয়ামের বসার ঘরে একটা আলোর ঝলকানি দেখল। সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক-এর চেহারাটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর সব চুপচাপ। এই সময় গ্রামোফোনে গানবাজনা হতে লাগল। এমন সময় মিডিয়ামের বসার ঘর অর্থাৎ ক্যাবিনেটের পর্দাটা নড়ে উঠল। হঠাৎ একটা প্রেতমূর্তির আবির্ভাব হতেই মিসেস লিনডেন হাত নেড়ে তাকে ঘর থেকে বার হতে নিষেধ করল। এই সময় দেখা গেল এই প্রথম মি. লিনডেন তার চেয়ারে বসা অবস্থায় কী একটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার কণ্ঠ থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে।

অনেকে প্রশ্ন করল কি ব্যাপার মিসেস লিনডেন? মিসেস লিনডেন সহজভাবে বললেন, যে প্রেতছায়াটাকে আবার মূর্তি দান করা হচ্ছিল তার নিচের দিকটা ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। তার আকারটা অর্ধেক রয়ে গেছে। এ বিষয়ে শক্তির অভাব দেখা গেছে বা ক্ষমতার অভাব দেখা গেছে। আজ আর এ কাজ হবে না। আজ রাতে আর যে কোনও কাজ হবে না তা প্রমাণ হয়ে গেল।

দেখা গেল মিডিয়াম মি. লিনডেন নিচে সটাং শুয়ে পড়েছেন। তাঁর মুখটাও সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, ভ্রূ দুটো উপরে উঠে গেছে। মিসেস লিনডেন এবার ব্যস্তভাবে তার স্বামীর কোটের বোতামগুলো খুলে দিয়ে পাশে রাখা কাঁচের গেলাস থেকে জল নিয়ে চোখেমুখে সেই জলের ঝাপটা দিতে লাগল।

দর্শকরা সকলে তাদের আসন থেকে উঠে পড়ল। ছত্রভঙ্গ হয়ে এক-একটি দলে বিভক্ত হয়ে এই ঘটনার ব্যাপারে আলোচনা করতে লাগল।

মিস ব্যাডলে বলল, কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার! তবে আমরা একটি প্রেতের পূর্ণ আকারটা দেখতে পেলাম না।

মি. অ্যাটকিনসন এক পরলোক-তত্ত্বের গবেষককে জিজ্ঞাসা করলেন, কী বুঝলেন?

সেই গবেষক উত্তর দিল, আমি মাস্কলিন হলে এর থেকে ভাল কাজ দেখেছি। অন্য একজন বলল, শোন স্কট, মিডিয়ামের বসার ঘরটা যে একেবারে ছলনা-মুক্ত ছিল, একথা বলার কোনও অধিকার তোমার নেই।

স্কট বলল, শুধু আমি নই একথা মাস্কলিন হলের কমিটির সদস্যরাও মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছে।

কিন্তু সেটা ছিল মাস্কলিনের নিজস্ব মঞ্চ, কিন্তু এখানে মি. লিনডেন-এর নিজস্ব মঞ্চ নেই।

এইভাবে তর্ক করতে করতে দু’জন যুক্তিবাদী পরলোক-তত্ত্বের গবেষক হলঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখন অ্যাটকিনসন বললেন, দেখলে ওদের কাণ্ড, পরলোক-তত্ত্বের বুদ্ধিমান গবেষক যারা, কোনও তথ্যপ্রমাণ স্বীকার করতে চায় না তারা। সোজা পথ থাকতে তাঁরা ঘোরান পথে চলতে চান। মানবজাতির সামনে যখন পরলোক নামে এক নতুন রাজ্যের দ্বার উদ্‌ঘাটিত হতে চলেছে, তখনই সব বুদ্ধিমানেরা সেটা মানতেই চাইছেন না। এই ভাবে তাঁরা তাঁদের বুদ্ধির অপচয় করে চলেছেন।

মেইলী হাসতে হাসতে বলল—না, না। বিশাই যেন সেই পরলোক- রাজ্যের দ্বাররক্ষীর কাজ করছেন। তারা যেন সেই দ্বাররক্ষীর কাজে ঈশ্বরের দ্বারা নিয়োজিত।

সেই দ্বার দিয়ে কাউকে ঢুকতে দেবে না। তারা কোনও দিনই পরলোক- তত্ত্বের প্রকৃত সত্যকে লাভ করতে পারবে না।

কিন্তু এনিড বলল, এটা কিন্তু বিশপদের সম্পর্কে শক্ত কথা বলা হচ্ছে। আসলে ওরা ভাল লোক।

মেইলী বলল, তা অবশ্য বটে। দর্শনের ব্যাপারে তারা হচ্ছে প্রবীণ ব্যক্তি, তাদের বুদ্ধি পাকা। সে বুদ্ধি দিয়ে তারা একটা তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে আছে। এটা তাদের দোষ নয়। কিন্তু ম্যালন, তুমি কথা বলছ না কেন?

ম্যালন তখন ভাবছিল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা এক ছোট প্রেতমূর্তির কথা যার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আনন্দের সঙ্গে সে হাত নাড়তে থাকে।

এই মূর্তির কথা ভাবতে ভাবতে এই হলঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ এক আশ্চর্যময় জগৎ ছেড়ে বাইরে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল সে।