হারানো জগৎ – ২

অধ্যায় ২

গোল পিঠ, লাল মাথা, খিট্‌খিটে বুড়ো বার্তা-সম্পাদক ম্যাআর্ডলকে আমার আগাগোড়াই খুব পছন্দ, আর আশা করি তিনিও আমাকে পছন্দ করেন। অবশ্য আমাদের আসল বড়কর্তা বিউমন্ট, কিন্তু সুদূর স্বর্গলোকের এমন এক দূরধিগম্য বাতাবরণের মধ্যে তিনি বাস করেন যে সেখানে থেকে আন্তর্জাতিক সংকট অথবা মন্ত্রসভার ভাঙন ছাড়া ছোটখাট কোনও বিষয়ই তার চোখে পড়ে না। কখনও সখনও তাকে দেখেছি নির্জন গাম্ভীযের সঙ্গে তার অন্দরমহলে চলাফেরা করতে; চোখের দৃষ্টি অস্পষ্ট, মনটা ঘুরে বেড়াচ্ছে বল্‌কান অঞ্চলে অথবা পারস্য উপসাগরে। তিনি আমাদের সকলের উপরে, সব রকম ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু ম্যাকআর্ডল তার প্রধান সহকারী, আর তাকেই আমরা চিনি। ঘরে ঢুকতেই বুড়ো মাথা নেড়ে স্বাগত জানালেন; চশমাজোড়াকে ঠেলে তুলে দিলেন একেবারে টাক- পড়া কপাল পর্যন্ত।

সদয় স্কচ উচ্চারণে বললেন, “আরে মি. ম্যালোন, যতদূর যা শুনেছি তাতে তো মনে হয় কাজকর্ম আপনি বেশ ভালই করছেন।”

ধন্যবাদ জানালাম।

“কয়লা-খনির বিস্ফোরণের বিবরণটা বেশ ভালোই হয়েছিল। সাউথওয়ার্কের অগ্নিকাণ্ডও ভাল হয়েছে। আপনার বিবরণে বেশ প্রাণের ছোঁয়া থাকে। তারপর, আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন কেন?”

“একটা অনুগ্রহ চাইতে।”

লোকটি ভয় পেলেন, আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন।

“বটে! বটে! তা ব্যাপারটা কি?”

“আচ্ছা, কাগজের কোনও কাজে আমাকে কি বাইরে পাঠাতে পারেন? কাজটা ভালভাবে করতে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব, আপনাকে ভাল ভাল ‘কপি’ পাঠাব।”

“কি ধরনের কাজের কথা আপনি ভাবছেন মি. ম্যালোন?”

“দেখুন, কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার থাকে, কিছুটা বিপদ থাকে, এমন কোনও কাজ। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব। কাজটা যত শক্ত হবে ততই আমার মন বসবে।”

“মনে হচ্ছে জীবনটাকে খোয়াতে আপনি খুব ব্যগ্র হয়ে পড়েছেন।”

“আমি যে বেঁচে আছি সেটাকেই প্রমাণ করতে চাই স্যার।”

“দেখুন মি. ম্যালোন, কথাটা খুব—খুব উঁচু দরের। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, সে সব দিনকাল চলে গেছে। মানচিত্রের বড় বড় ফাঁকগুলো ক্রমেই ভরে যাচ্ছে, কোথাও আর রোমান্সের তিলমাত্র অবশিষ্ট নেই।” হঠাৎ মুখের উপর হাসি টেনে বলে উঠলেন, “আরে, দাঁড়ান—দাঁড়ান! মানচিত্রের ফাঁকা জায়গার কথায় একটা কথা মনে পড়ে গেল। একটা জোচ্চুরিকে ফাঁস করে দিলে—একজন আধুনিক মুন্তৌসেনকে লোকের চোখে হাস্যাস্পদ করলে কেমন হয়? লোকটা যে মিথ্যেবাদী সেটাই আপনাকে প্রমাণ করতে হবে! আরে, সেটা বেশ মজার ব্যাপার হবে। আপনার কেমন লাগছে বলুন?”

“যে কোনও কাজ—যে কোনও দেশে—আমি বেপরোয়া।”

ম্যাকআর্ডল কয়েক মিনিট চিন্তায় ডুবে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি শুধু ভাবছি আপনি লোকটির সঙ্গে ভাব জমাতে পারবেন কি না। লোকের সঙ্গে মেলামেশা করার একটা বিশেষ ক্ষমতা তো আপনার রয়েইছে। আমি নিজেও তো সেটা বুঝি।”

“আপনার অনুগ্রহ স্যার।”

“অতএব এমোর পার্ক-এর প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে একবার কপাল ঠুকেই দেখুন না।”

বলতে দ্বিধা নেই, একটু চমকে উঠলাম।

চেঁচিয়ে বললাম “চ্যালেঞ্জার! বিখ্যাত প্রাণীতত্ত্ববিদ্ প্রফেসর চ্যালেঞ্জার! সেই লোকটাই তো ‘টেলিগ্রাফ’-এর ব্লুন্ডেলের মাথার খুলি ফাটিয়ে দিয়েছিলেন না?”

বার্তা-সম্পাদকের মুখে বাঁকা হাসি।

“আপত্তি আছে? আপনিই বললেন না, অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বেড়াচ্ছেন?”

“কিন্তু সেটা আমার কাজের ব্যাপারে হওয়া চাই”, আমি জবাব দিলাম।

“ঠিক কথা। তিনি যে সব সময়ই অতটা সহিংস্র হবেন তা আমি মনে করি না। আপনার কপাল খুলেও যেতে পারে, অথবা আপনি তাঁর সঙ্গে আরও ভাল ব্যবহার করতে পারবেন। আমি জানি, সেখানে আপনার নিজের লাইনেরই কিছু করবার আছে, আর ‘গেজেট’ সেটাই আপনার কাছে আশা করে।”

বললাম, “সত্যি তাঁর সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। ব্লুন্ডেলকে আঘাত করার ব্যাপারে পুলিশ-আদালতের মামলা প্রসঙ্গে শুধু তাঁর নামটাই মনে আছে।”

“আপনার কাজের সুবিধা হতে পারে এমন কিছু কিছু তথ্য আমার কাছে আছে মি. ম্যালোন। কিছুদিন যাবৎই আমি নিজে প্রফেসরের উপর চোখ রেখেছি।” টানা থেকে একটা কাগজ বের করলেন, “এই তাঁর কাজকর্মের একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ।” খুবই সংক্ষেপে লেখা :

‘চ্যালেঞ্জার, জর্জ এডওয়ার্ড। জন্ম : লাস্‌, এন. বি. ১৮৬৩। শিক্ষা : লাস্‌ অ্যাকাডেমি, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সহকারী, ১৮৯২। তুলনামূলক নৃতত্ত্ববিভাগের সহকারী-রক্ষক, ১৮৯৩। সেই বছরই কিছু কটু চিঠি- চালাচালির ফলে পদত্যাগ। প্রাণী-বিজ্ঞানে গবেষণার জন্য ক্রেন্টন পদক লাভ। সোসাইটিতে বেজে, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস, লা প্লাতা, ইত্যাদি ইত্যাদি নানান প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক সদস্য’—ছোট হরফে ছাপা প্রায় দু’ইঞ্চি বিবরণ—‘প্রকাশিত গ্রন্থ : “কমাক করোটির উপর কিছু কথা”; “মেরুদণ্ডী প্রাণীর বিবর্তনের রূপরেখা”; তাছাড়া অসংখ্য প্রবন্ধ, যেমন “উইজ্‌ম্যানবাদের অন্তর্নিহিত হেত্বাভাস”, যেটা নিয়ে ভিয়েনা প্রাণী-বিজ্ঞান কংগ্রেসে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। অবসর-বিনোদন : পদযাত্রা, আসে আরোহণ। ঠিকানা : এমোর পার্ক, কেসিংটন, ডব্লু।”

“এটা রেখে দিন। আজ রাতে এর বেশি কিছু আপনাকে দিতে পারছি না।”

কাগজটা পকেটস্থ করলাম।

আমার সম্মুখে রয়েছেন লাল মুখের বদলে একটি গোলাপি টাক মাথা—এটা বুঝতে পেরে বললাম, “এক মিনিট স্যার। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কেন দেখা করতে হবে সেটা কিন্তু এখনও ভাল বুঝতে পারছি না। তিনি কি করেছেন?”

মুখটা আবার লাল হয়ে উঠল।

“দু’বছর আগে একটি একক অভিযানে দক্ষিণ আমেরিকা অভিযানে গিয়েছিলেন। গত বছর ফিরে এসেছেন। দক্ষিণ আমেরিকায় যে গিয়েছিলেন সেটা নিঃসন্দেহ, কিন্তু ঠিক কোথায় গিয়েছিলেন সেটা কিছুতেই বলছেন না। তাঁর অভিযানের কথা ভাসা-ভাসা ভাবে কিছু বলতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু কে একজন খুঁত ধরতেই শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে ফেললেন। আশ্চর্য কিছু ঘটেছিল—অন্যথায় লোকটি এক নম্বরের মিথ্যুক, আর সেই সম্ভাবনাটাই বেশি সঙ্গে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত ফটোগ্রাফও ছিল—লোকে বলে সেগুলো জাল। লোকটি এমন চটে গেলেন যে কেউ প্রশ্ন করলেই তেড়ে মারতে যান, প্রতিবেদকদের সিঁড়ি দিয়ে ঠেলে ফেলে দেন। আমার মতে, লোকটি বিজ্ঞানের পানমোড়া-দেওয়া একটি আত্মম্ভরী নরঘাতক। এই হচ্ছে লোকটির পরিচয়। মি. ম্যালোন, ছুটে চলে যান তাঁর কাছে, দেখুন কতদূর কি জানতে পারেন। আত্মরক্ষা করবার মতো যথেষ্ট বয়স আপনার হয়েছে। যে কোনও অবস্থাতেই আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ‘নিয়োগকর্তার দায় আইন’-এর কথা তো আপনার জানাই আছে।”

সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ হলো।

হাঁটতে হাঁটতে ‘স্যাভেজ ক্লাব’-এ গেলাম। ভিতরে না ঢুকে এডেফি টেরেসের রেলিং-এ ভর দিয়ে নিচের বাদামী রংয়ের তৈলাক্ত নদীটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কাজের তালিকাটি বের করে বৈদ্যুতিক আলোয় আর একবার সবটা পড়লাম। একটা কথা বুঝতে পারলাম, বিজ্ঞানের ব্যাপারে লোকটির কিছুটা ক্ষ্যাপামি আছে। দেখা যাক চেষ্টা করে, কতদূর কি হয়।

ক্লাবে ঢুকলাম। সবে এগারোটা বেজেছে; বড় ঘরটা মোটামুটি ভরে গেলেও এখন ভিড় শুরু হয়নি। একটি ঢ্যাঙা, শুঁকো লোক অগ্নিকুণ্ডের পাশে হাতল- চেয়ারে বসে আছেন। ‘নেচার’ পত্রিকার টার্প হেরি; এঁকেই খুঁজছিলাম। সোজাসুজি নিজের কথাটাই পাড়লাম।

“অধ্যাপক চ্যালেঞ্জার সম্পর্কে আপনি কি জানেন?”

ভুরু কুঁচকে তিনি বললেন, “চ্যালেঞ্জার? চ্যালেঞ্জার তো সেই লোক যে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একটা গাঁজাখুরি গল্প নিয়ে এসেছিল।”

“গল্পটা কি?”

“আরে, সে তো তার আবিষ্কার-করা কতকগুলি অদ্ভুত জন্তু সম্পর্কে ডাহা বাজে কথা। যাই হোক, সে সবই সে চেপে দিয়েছে। রয়টারের সঙ্গে তার একটা সাক্ষাৎকার হয়েছিল, কিন্তু তা নিয়ে এমন হৈ-চৈ দেখা দিল যে সে বুঝল এটা চলবে না। ঘটনাটা দুর্ভাগ্যজনক। দু’একজন তার কথাগুলিকে গুরুত্ব দিতেও চাইল, কিন্তু অচিরেই সে তাদেরও ঠাণ্ডা করে দিল।”

“কেমন করে?”

“অকারণ রূঢ়তা ও অসম্ভব আচরণের দ্বারা। জুলজিক্যাল ইন্সটিট্যুটের বেচারি ওয়ালি বুড়ো। ওয়ালি লিখলেন : ‘জুলজিক্যাল ইন্সটিট্যুটের সভাপতি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে; তাদের পরবর্তী সভায় তিনি যদি উপস্থিত থাকেন তাহলে সভাপতি সেটাকে তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বলে মনে করবেন।’ তাঁর যে জবাব গেল সেটা ছাপার অযোগ্য।”

“কি বলছেন?”

“ভদ্র ভাষায় জবাবটা ছিল এই রকম : ‘প্রফেসর চ্যালেঞ্জার জুলজিক্যাল ইন্সটিটুটের সভাপতিকে সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে; নরকে যেতে হলে সেটাকে সে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বলেই মনে করবে।”

“হা ভগবান!”

“হ্যাঁ, বুড়ো ওয়ালি এই কথাগুলিই বলেছিলেন। সভার শুরুতে তার আর্ত কণ্ঠস্বর এখনও আমার মনে আছে : ‘বৈজ্ঞানিক আলোচনার পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতায়—বুড়ো মানুষটি একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন।”

“চ্যালেঞ্জার সম্পর্কে আর কোনও খবর?”

“সে তাদেরই একজন যাদের মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না। লোকটি বুদ্ধিমান, উদ্দীপনা ও জীবনীশক্তির একটি মূর্তিমান ব্যাটারি; কিন্তু ঝগড়াটে, বদখেয়ালি, আর নীতিজ্ঞানবর্জিত।”

“আপনি বলছেন লোকটি খেয়ালি। তার বিশেষ খেয়ালটি কি?”

“তার খেয়াল তো হাজারটা, তবে সর্বশেষ খেয়ালটা হচ্ছে ‘উইজম্যান ও বিবর্তনবাদ’ নিয়ে। যতদূর জানি, ভিয়েনাতে সেটা নিয়ে খুব হৈ-চৈ হয়েছিল।”

“সে বিষয়ে আমাকে কিছু বলতে পারবেন?”

“এই মুহূর্তে তো পারছি না, তবে সভার বিবরণীর একটা ভাষান্তর আপনাকে দিতে পারি। সেটা আপিসের ফাইলে আছে। যাবেন আমার সঙ্গে?”

“ওটাই তো আমার চাই। লোকটির একটা সাক্ষাৎকার নিতে হবে, কাজেই একটু তৈরি হয়ে যেতে চাই। চলুন, আপনার সঙ্গেই যাচ্ছি।”

আধ ঘণ্টা পরে। সংবাদপত্রের আপিসে বসে ছিলাম। সামনে একটা ভারী ফাইল। খোলা পাতায় ছিল একটা প্রবন্ধ “উইজম্যান বনাম বিবর্তনবাদ”, ছোট শিরোনামে লেখা “ভিয়েনায় প্রচণ্ড প্রতিবাদ। প্রাণবন্ত আলোচনা।” আমার বিজ্ঞানের জ্ঞান খুবই সীমিত। সব কিছু ভাল বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটা বুঝলাম যে ইংরেজ অধ্যাপকের বক্তব্য খুবই আক্রমণাত্মক; ফলে তাঁর ইওরোপীয় সহকর্মীগণ খুবই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। “প্রতিবাদ”, “গণ্ডগোল”, “সভাপতির কাছে সাধারণ আবেদন”–তিনটি প্রথম বন্ধনীতে আবদ্ধ কথাগুলি আমার চোখে পড়ল। বিবরণীর অনেকটাই চীনা ভাষায় লেখা।

বন্ধুটিকে করুণ স্বরে বললাম, “আপনি যদি এটাকে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত করে দিতেন—”

“আরে, এটাই তো ভাষান্তর।”

“তাহলে মূল প্রবন্ধটাই একবার দেখা যাক।”

“সেটা তো সাধারণ পাঠকের পক্ষে খুবই গভীর ব্যাপার।”

“ঠিক আছে। এটাতেই চলে যাবে। ভয়ংকর অধ্যাপকের সঙ্গে এটাই হবে আমার প্রথম যোগসূত্র।”

“আপনার জন্য আর কিছু করতে পারি কি?”

“তা পারেন বৈকি। তাঁকে একটা চিঠি লিখতে চাই। চিঠির খসড়াটা যদি এখানে বসে করতে পারি, আর আপনার ঠিকানাটা ব্যবহার করি, তাহলে একটা ভাল পরিবেশ সৃষ্টি হবে।”

“আর তার ফলং—লোকটি এখানে এসে হৈ-চৈ বাধাবে আর আসবাবপত্র ভাঙবে।”

“না, না; চিঠিটা আপনাকে দেখাব—বিতর্কিত কোনও কথা থাকবে না।” “বেশ, ঐ আপনার চেয়ার ও ডেস্ক। কাগজও ওখানেই পাবেন। চিঠি পাঠাবার আগে আমি ‘সেন্সর’ করে দেব।”

চিঠি লেখা শেষ হলো। খুব খারাপ লিখিনি। নিজের লেখা সম্পর্কে গর্বভরে বন্ধুকে চিঠিটা পড়ে শোনালাম।

“প্রিয় প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, বিশ্বপ্রকৃতির একজন বিনীত ছাত্র হিসাবে ডারুইন ও উইজম্যানের পার্থক্যের ব্যাপারে আপনার মতামতের প্রতি আমি সর্বদাই গভীর আগ্রহ পোষণ করে থাকি। সম্প্রতি ভিয়েনায় প্রদত্ত আপনার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণটি নতুন করে পড়বার সৌভাগ্য আমার হয়েছে—”

“কী জঘন্য মিথ্যাবাদী!” টার্প হেনরি বিড়বিড় করে বললেন।

“—সেই প্রাঞ্জল ও আশ্চর্য বিবৃতিটিকেই এ বিষয়ে শেষ কথা বলে আমি মনে করি। অবশ্য তাতে একটি পঙ্ক্তি আছে—যেমন : ‘প্রতিটি স্বতন্ত্র “ইড়” একটি ক্ষুদ্র জগৎ সদৃশ; বংশ-পরম্পরার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে তার একটি ঐতিহাসিক স্বরূপ গড়ে উঠেছে—এই মর্মে যে অপ্রমাণিত সদম্ভ উক্তি করা হয়ে থাকে আমি তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।” সাম্প্রতিক গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিবৃতির কোনও সংশোধনের ইচ্ছা কি আপনার আছে? আপনি কি মনে করেন না যে বিবৃতিটা একটু কড়া হয়ে গেছে? যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে আমি গভীর আগ্রহ পোষণ করে থাকি, এবং ব্যক্তিগত আলোচনা প্রসঙ্গে আপনার কাছে কয়েকটি প্রস্ত বি রাখতে চাই, তাই আপনার অনুমতি নিয়ে একবার আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। আপনার সম্মতি পাব এই আশা নিয়ে আগামী পরশু (বুধবার) সকাল এগারোটায় আপনার বাড়িতে হাজির হব।

গভীর শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতিসহ

একান্তভাবে আপনার এডওয়ার্ড ডি. ম্যালোন।”

বিজয়গর্বে শুধালাম, “কেমন হয়েছে?”

“দেখুন আপনার বিবেকে যদি না বাধে—”

“বিবেকের অভাব আমার কখনও হয়নি।

“কিন্তু আপনি কি করতে চান?”

“সেখানে যেতে চাই। একবার তাঁর ঘরে ঢুকতে পারলে একটা না একটা পথ পেয়েই যাব। খোলাখুলি সব কথা বলতেও পারব। খেলোয়াড়ী মনোবৃত্তি থাকলে তিনি খুশিই হবেন।”

“খুশিই বটে! আরও অনেক কিছুই হতে পারে। লোহার বক্ষস্ত্রাণ, বা মার্কিন ফুটবল খেলার পোশাক—এ সবই আপনার দরকার হবে। ঠিক আছে, বিদায়। তার যদি জবাব দেবার ইচ্ছা হয় তো বুধবার সকালে এখানেই জবাবটা পেয়ে যাবেন। লোকটি উচ্ছৃংখল, বিপজ্জনক ও রুক্ষ প্রকৃতির; যে দেখে সেই তাকে ঘৃণা করে; ছাত্ররা তো সর্বদাই তার পিছনে লাগে। লোকটি যদি মোটেই কোনও চিঠি না লেখে হয়তো সেটাই আপনার পক্ষে সবচাইতে ভাল।”