কিছু অসহায় প্রেতাত্মার কাহিনি

কিছু অসহায় প্রেতাত্মার কাহিনি

ওরা যখন বসার ঘরে চা খাচ্ছিল তখন পাদ্রী চার্লস ম্যাসন ঘরে এসে ঢুকল। পরলোক তত্ত্বের অনুসন্ধানের মতো আর কোনও বিষয় পরস্পরকে এত কাছে টানে না। ম্যালন ও রক্সটন পাদ্রী ম্যাসনের সঙ্গে মাত্র একটি ঘটনায় পরিচিত হয়। তাকে একবারই দেখেছে। তবু কিন্তু যাদের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে মিশে আসছে তাদের সকলের থেকে ম্যাসনকে সব চেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে হলো। কোনও দুঃসাহসিক অভিযানে একসঙ্গে কাজ করতে পারাটাই এই ঘনিষ্ঠতা ও যোগাযোগের বৈশিষ্ট্য। পাদ্রী ম্যাসনের রোগা চেহারাটা যখন দেখা গেল তখন শীর্ণ মুখটা মৃদু হাসির দ্বারা আলোকিত ও তার আন্তরিক দৃষ্টির দ্বারা এক স্নিগ্ধগম্ভীর মাধুর্যে মণ্ডিত হয়ে উঠল। তখন তাকে উভয়েই ভাবল তাদের অনেক দিনের এক পুরনো বন্ধু এসেছে। ওরা তাকে অভিবাদন জানাতেই ম্যাসনও বিশেষ আন্তরিকতার সঙ্গেই অভিবাদন জানালেন।

ম্যাসন ওদের সকলের সঙ্গে করমর্দন করতে করতে বললেন, এখনও পর্যন্ত পরিকল্পনা চলছে। আশা করি, তোমাদের নতুন অভিযান আগেরটার মতো স্নায়ুপীড়ক হবে না।

রক্সটন বললেন, ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি পাদ্রী, সেই থেকে আমি আমার মাথার টুপীটা আপনার জন্য ধরে আছি।

মেইলি আগ্রহের সঙ্গে বলল, কেন উনি এমন কি করেছেন?

পাদ্রী ম্যাসন ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, এমন কিছু নয়। আমি আমার সাধ্যমতো অন্ধকারে নিমগ্ন এক আত্মাকে আলোর পথ দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম। ওসব কথা এখন আর বলে লাভ নেই। আজ আমরা ঐ ধরনের একটা কাজের জন্য সমবেত হয়েছি এখানে। আমার সব বন্ধুরা প্রতি সপ্তাহে এই ধরনের একটি করে কাজ করে থাকেন। আমি মি. মেইলির কাছ থেকেই এই কাজের প্রেরণা পাই এবং কীভাবে ওই সব অসহায় আত্মাদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয় তা শিখি।

মেইলি বলল, এই ধরনের কাজে প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে আমাদের।

ম্যাসন বলল, এ বিষয়ে আপনার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে।

ম্যালন বলল, আমি সেই সব আত্মাদের স্বচক্ষে দেখিনি। আপনারা কি আমার মনটাকে সংশয়মুক্ত করতে পারেন? এই মুহূর্তে আমি আপনাদের একটা কথা মেনে নিচ্ছি। আমরা সব সময় মর্ত্যগামী মৃত আত্মাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছি যারা এক অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে। তারা জীবিতদের কাছ থেকে পরামর্শ চায়, পথ খুঁজে পেতে চায়। তারা তাদের কষ্টের কথা কিছুটা ব্যক্ত করতে পারে, কিছুটা পারে না। তাই নয় কি?

মেইলি ও তার স্ত্রী ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানাল।

তাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনদের আত্মা বোধহয় পরলোকে আছে এবং তারাও তাদের অবস্থার কথা জানে। তারা প্রকৃত সত্য জানে। আর সেই জন্যই তারা কি আমাদের থেকে এই সব সমস্যা-জর্জরিত আত্মাদের দুঃখ আরো ভালভাবে দূর করতে পারে না?

মেইলি বলল, এটা সত্যিই এক স্বাভাবিক প্রশ্ন। আমরা প্রশ্ন করে তাদের কথা জেনে নিতে পারি। আমাদের কথার উত্তরে তারা যা বলে তা মেনে নিতে হবে। ওই সব মর্ত্যগামী আত্মারা এই পৃথিবীতে এসে কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না। এই বিশাল মর্ত্যভূমিটা ওদের কাছে ক্রমশই এক ভারী বস্তু যেটাকে তোলা বা যার রহস্য ভেদ করা ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাকী সব উন্নত আত্মারা যে স্তরে আছে সেখানে ওরা যেতে পারে না। এই মর্ত্যলোকের বহু ঊর্ধ্বে যে এক আধ্যাত্মিক জগৎ আছে সেখানে যাবার ক্ষমতা ওদের নেই। ওরা এই মর্ত্যভূমির আশেপাশে অদৃশ্য ও অশরীরী অবস্থায় আমাদের কাছে কাছে ঘোরাঘুরি করছে। ওরা আমাদের সব কিছু জানে। কিন্তু উচ্চতর আধ্যাত্মিক ব্যাপারে কিছু জানে না। সেই জন্য আমরাই তাদের জন্য কিছু করতে পারি। কারণ ওরা আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে।

মেইলি আরও বলল, এই ধরনের অনেক অসহায় নিম্নস্তরের আত্মাও আছে। আমার স্ত্রী ছোট বড় নির্বিশেষে সবাইকেই ভালবাসে। সে ওই মৃত আত্মাদের · মধ্যে যারা দুষ্ট প্রকৃতির তাদের সঙ্গেও কথা বলতে সমর্থ।

মেইলির স্ত্রী বলল, সত্যিই তারা করুণা ও ভালবাসার পাত্র। যে অসহায় আত্মাটির কথা একটু আগে আমার স্বামী বললেন, সে যেন অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে এসেছিল। একদিন সে আবেগের সঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার মা এসেছে। এখানেই আছে।’ আমরা তাকে বললাম, ‘তোমার মা আগে আসেনি?” সে বলল, ‘কি করে আসবে? আমি এমন এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে থাকতাম যার মধ্যে আমাকে কেউ দেখতে পেত না।”

ম্যালন বলল, খুব ভাল কথা। তবে যতদূর তোমাদের পদ্ধতির কথা শুনেছি ঊর্ধ্বে এক উচ্চস্তরের উন্নত আত্মা আছে যে সমস্ত ব্যাপারটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যে দুঃখভোগী নিম্নস্তরের আত্মাদের তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছে।

এমন সময় ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে জন টার্বেন আসাতেই ওদের আলোচনা থেমে গেল। এই স্টেশনেই তার কাজ ছিল। তার পরনে রেলকুলীর পোশাক ছিল না। তার চেহারাটা ছিল গোলগাল, তবে তার দাড়ি-কামানো মুখখানাকে ম্লান ও বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। তার চোখ দুটোতে এক স্বপ্নালু ভাব।

সে এসেই প্রশ্ন করল, আপনারা আমার রেকর্ডটা রেখেছেন?

মিসেস মেইলি তাকে একটা খাম দিয়ে বলল, খামটা আমরা তৈরি করেই রেখেছিলাম, কিন্তু তুমি ওটা বাড়িতে গিয়ে পড়বে।

মিসেস মেইলি এবার অন্যদের বুঝিয়ে বলল, মি. টার্বেন যখন ধ্যান-সমাহিত হয়ে মিডিয়ামের কাজ করে তখন জাগতিক কোন ব্যাপার দেখতে বা জানতে পারে না। তাই প্রতিটি অধিবেশনের শেষে সমস্ত ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা আমরা ওর জন্য লিখে রাখি।

মি. টার্বেন বলল, খামের ভিতরের লেখাটা যখন পড়ি তখন খুবই বিস্মিত হয়ে পড়ি।

পাদ্রী ম্যাসন বললেন, নিশ্চয় গর্বিতও হও।

টার্বেন বিনীতভাবে বলল, আমি তা বলতে পারি না। যেমন টুলের উপর বসে কেউ কাজ করলে টুলের সে ব্যাপারে গর্বিত হওয়ার কোন কারণ নেই। তবে এটা এক বিশেষ সুযোগের ও ভাগ্যের কথা।

পাদ্রী ম্যাসন রেলকর্মী টার্বেনের কাঁধের উপর হাত রেখে স্নেহের সঙ্গে বললেন, স্বাগত সদাশয় টার্বেন! মিডিয়াম যত ভাল হবে ততই সে নিঃস্বার্থ হবে। একজন ভাল মিডিয়াম পরের জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে। নিজেকে ক্ষয় করে পরকে আনন্দ দেবার চেষ্টা করে। এটাই আমার অভিজ্ঞতা। যারা খুব বেশি স্বার্থপর তারা কখনও ভাল মিডিয়াম হতে পারে না। আমি মনে করি এখনি আমাদের কাজ শুরু করা উচিৎ, তা না হলে চ্যাং আমাদের ভর্ৎসনা করবে।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, কে সে?

ম্যাসন বললেন, শীঘ্রই তার সঙ্গে তোমার পরিচয় হবে। টেবিলের চারধারে চক্রাকারে বসার প্রয়োজন নেই। বরং আগুনের ধারে অর্ধচক্রাকারে বসলেই হবে। আগুনের আলোতেই কাজ হবে টার্বেন। তুমি আসনে বস।

মিডিয়াম টার্বেন ঘরের এক কোণে একটা নরম সোফার উপর বসল। ম্যালন ও মেইলি তার কিছুদূরে নোট-বই নিয়ে নতজানু হয়ে বসে রইল। টার্বেন সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানস্থ হয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যানে নিবিষ্ট হয়ে পড়ল।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎ টার্বেন সোফার উপর খাড়া হয়ে বসল। তন্দ্ৰাচ্ছন্ন ভাবটা কাটিয়ে সে সচকিত হয়ে উঠল। তার ব্যক্তিত্ব সংযত ও শক্ত হয়ে উঠল।

সহসা এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা গেল টার্বেনের উপর। এক দ্ব্যর্থবোধক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। তার চোখ দুটো ভাল করে খোলা হয়নি। তার আধ-খোলা দৃষ্টিটাকে তির্যক দেখাচ্ছিল। তার হাত দুটো কোটের আস্তিনার মধ্যে ঢোকান ছিল। এবার মিডিয়াম কেমন যেন হেঁয়ালির সঙ্গে কাটা-কাটা ভাষায় বলতে লাগল, সান্ধ্য নমস্কার। নতুন মুখ দেখছি—এরা কারা?

এবার বাড়ির মালিক আগন্তুককে আহ্বান করে বলে উঠল, সান্ধ্য নমস্কার চ্যাং। এদের সঙ্গে তোমার পরিচয় করে দিচ্ছি। ইনি হচ্ছেন ম্যালন, একজন সাংবাদিক হিসাবে আমাদের কাজকর্ম নিরীক্ষণ করছেন। ইনি হচ্ছেন পাদ্রী ম্যাসন, তুমি তাঁকে চেন। ইনি হচ্ছেন লর্ড রক্সটন, আজ আমার একটা কাজে সাহায্য করেছেন।

প্রত্যেকটি নাম উল্লেখ করার সময় টার্বেন কপালে হাতটা ঠেকিয়ে ভারতীয় কায়দায় নমস্কার করছিল। তার সমস্ত চেহারাটা গম্ভীর ও সম্ভ্রমবোধে দৃঢ় হয়ে উঠল। মনে হতে লাগল একটু আগে বেঁটেখাটো যে মানুষটি সোফার উপর বসেছিল এ সে মানুষ নয়।

মিডিয়াম এবার কথা বলতে শুরু করল, লর্ড রক্সটন, আমি লর্ড ম্যাকটনিকে চিনতাম। আমি তাকে একজন বিদেশী শয়তান বলতাম। এখন দেখছি চ্যাঙেরও অনেক কিছু শেখার আছে।

মেইলি ব্যাখ্যা করে বলল, চ্যাং মিডিয়ামের মুখ দিয়ে লর্ড ম্যাকর্টনির কথা বলছে। সে আজ প্রায় একশো বছর আগের কথা। চ্যাং তখন ছিল জীবিত দার্শনিক।

যে প্রেতাত্মা এই প্রেতচর্চার অনুষ্ঠানটাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল সে বলল, এখন সময় নষ্ট কর না। আজ অনেক কাজ আছে। আজ অনেকের ভীড় লেগেছে। তাদের মধ্যে কেউ নতুন কেউ পুরনো। আমার জালে আজ অনেকে এসে পড়েছে। যাই হোক আমি এখন যাচ্ছি। এই বলে সে বালিশে হেলান দিয়ে বসল। এক মিনিট পরে সে উঠে বসল এবং শুদ্ধ ইংরোজী ভাষায় বলতে লাগল, আমি তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি দু’সপ্তাহ আগে এসেছিলাম। তোমাদের কথা আমি ভেবে দেখেছি। পথটা অনেক সহজ মনে হচ্ছে।

তুমি কি এমনি এক প্রেতাত্মা যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি রাগের মাথায় একথা বলেছিলাম। আমি তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। অফুরন্ত অন্তহীন সময় কাটতেই চায় না। হাতে কোন কাজ না থাকায় শুধু অনুশোচনা আর অনুতাপে বুক ভরে থাকত। সেই অনুশোচনাই ক্রমশ ভারী হয়ে আমার বুকের উপর চেপে বসে থাকত। আমি হতাশ হয়ে পড়তাম। একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তোমরাই আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলে। তুমি আর চীনদেশীয় প্রেতাত্মাটা আমাকে অনেক সদয় কথা বলেছিলে। আমি আমার মৃত্যুর পর থেকে এই ধরনের দয়ার কথা কারও কাছ থেকে শুনিনি। দয়ার দৃষ্টিতে কেউ আমাকে দেখেনি।

কখন তোমার মৃত্যু হয়?

মনে হয় অনন্তকাল আগে। আমরা তোমাদের মতো সময়কে ভাগ করে দেখতে পারি না। অন্তহীন এক ভয়ঙ্কর স্বপ্নের মতো সমস্ত কালকে মনে হয়—যে স্বপ্নের মধ্যে কোনও ছেদ নেই, কোনও শেষ নেই।

তোমার যখন মৃত্যু হয় তখন ইংল্যান্ডের রাজা কে ছিল।

তখন ছিল রানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকাল। আমি শুধু বর্তমানের যত সব পার্থিব ভোগসুখেই মত্ত হয়ে থাকতাম। কোনও দিনও ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবিনি। আমি নতুন অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারিনি। এখন বুঝতে পারছি কত ভুল আমি করেছি।

এখন যেখানে আছ সেই জায়গাটা কি খারাপ?

হ্যা, সমস্ত জায়গাটাই খারাপ। সব অন্ধকার। চারদিকের পরিবেশ খুবই ভয়ঙ্কর।

কিন্তু সেখানে তো আরও অনেকে আছে। তুমি তো একা নও।

হ্যাঁ আরও অনেকে আছে। কিন্তু তারা আমার থেকে বেশি জানে না। তারাও আমার মতো সংশয়ে আচ্ছন্ন, আমার মতোই দুঃখী।

শীঘ্রই তুমি সেখান থেকে মুক্তি পাবে।

ঈশ্বরের নামে অনুরোধ করছি। এই মুক্তি লাভের জন্য তোমরা আমাকে সাহায্য কর।

আহা বেচারা! মিষ্টি করুণ কণ্ঠস্বরে সহানুভূতির সঙ্গে মিসেস মেইলি কথাটা বলল। সে আরও বলল, তুমি অনেক দুঃখ ভোগ করেছ। কিন্তু শুধু নিজের কথা ভাবছ কেন? অপরের কথা চিন্তা কর। তোমার মতো একজনকে নিয়ে দেখবে তুমি নিজেকে নিজেই সবচেয়ে ভাল সাহায্যদান করতে পারছ।

ধন্যবাদ, হে মহিলা! এখানে একজন আছে যাকে আমি এনেছি। আমরা দু’জনেই একসঙ্গে পথ চলতে থাকব। একদিন হয়ত আমরা আলো খুঁজে পাবই।

তুমি কি চাও আমরা তোমার জন্য প্রার্থনা করি?

হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই তাই চাই।

ম্যালন বলল, আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করব। এই বলে ম্যালন সেই সার্বজনীন প্রার্থনা উচ্চারণ করে যেতে লাগল। কিন্তু তার প্রার্থনা শেষ হবার আগেই টার্বেন তার আসনে মূর্ছিত হয়ে ঢলে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই সে চ্যাং-এর মতো উঠে বসল। কন্ট্রোল বলল, আরও যে সব প্রেতাত্মা অপেক্ষা করছে ও এখন তাদের সময় দিতে চাইছে। এটা ভাল কথা। আমার হাতে এখন কঠিন কাজ।

অসমর্থনের সুরে জোরে চিৎকার করে উঠল মিডিয়াম।

পরক্ষণেই সে উঠে বসল। দেখা গেল তার মুখটা ভারী ও ফুলে ফুলে উঠেছিল। তার হাতের তালু দুটো জোড়া আছে।

সে কড়া গলায় বলল, এসব কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কোন অধিকারে এই চীনা লোকটা আমাকে এখানে ডেকে আনল? হয়ত তোমরা আসল কথাটা জানতে পারবে।

মনে হয় এ বিষয়ে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারব।

যখন আমার ইচ্ছা বা প্রয়োজন হয় তখন আমি সাহায্য চাই। এখন সাহায্যের প্রয়োজন নেই তাই আমি ইচ্ছা করি না। তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটার মধ্যে আছে প্রচুর স্বাধীনতার অবকাশ। এই চীনা লোকটি যতদূর আমাকে বুঝেছে তা হল এই যে, আমি হচ্ছি এক ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অনিচ্ছুক দর্শক

মেইলি বলল, আমরা হচ্ছি পরলোকবাদী প্রেতচক্রের লোক।

প্রেত বলল, তার মানেই তোমরা এক দুষ্টচক্রের লোক। এসব কাজ ঈশ্বরদ্রোহীতার কাজ। একজন গ্রাম্য যাজক হিসাবে বিনয়ের সঙ্গে ধর্মের এই অপবিত্রকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে পারছি না।

শোন বন্ধু, তোমার এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তুমি পিছিয়ে পড়েছ, তোমার উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে তুমিই কষ্ট পাচ্ছ। আমরা তোমাকে এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্ত করতে চাই। তুমি তোমার পূর্বজীবন শেষ করে পরলোকে গেছ, এটা বুঝতে পারছ।

তুমি বাজে কথা বলছ।

তুমি কি বুঝতে পারছ তুমি মৃত?

যদি আমি মৃত হই তবে আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি কীভাবে।

কারণ তুমি এই লোকটির দেহ ব্যবহার করছ।

আমি নিশ্চয় ঘুরতে ঘুরতে একটা আশ্রমে চলে এসেছি।

হ্যাঁ, তা বটে। তবে এ আশ্রম খারাপ কাজের জন্য। আমার ভয় হচ্ছে তুমি

তাদের একজন। তুমি এখন যেখানে আছে সেখানে সুখেই আছ তো?

সুখী? না, স্যার। আমি বর্তমানে যে পরিবেশের মধ্যে থাকি সে পরিবেশের কথা বুঝিয়ে বলা যায় না।

তুমি অতীতে যে কঠিন অসুখে ভুগেছিলে তার কোন কথা মনে আছে কি? সে ছিল খুবই কঠিন অসুখ।

এমনই কঠিন ছিল যার ফলে তোমার মৃত্যু হয়।

আমার মনে হচ্ছে তোমার মাথার ঠিক নেই। জ্ঞানবুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছ।

কি করে জানলে যে তুমি মৃত নও?

স্যার, আমি আপনাদের কিছু ধর্মোপদেশ দান করতে চাই। এক সম্মানিত জীবনযাপন করার পর কোন মানুষের মৃত্যু হলে সে গৌরবোজ্জ্বল দেহ ধারণ করে এবং দেবদূতদের সঙ্গে বাস করে। পূর্বজীবনে আমার যে দেহ ছিল এখন আমার অবিকল সে দেহই আছে। আমি এখন এক নীরস, নিরানন্দ বাজে জায়গায় বাস করি। যাদের সঙ্গে আমাকে বাস করতে হয় তাদের সঙ্গে বাস করতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। আমার বর্তমান সেই সব সঙ্গীদের কেউ কখনও দেবদূত বলে অভিহিত করতে পারে না। সুতরাং তোমাদের অনুমান অবান্তর, তাই মোটেই মানা যায় না।

বারবার নিজের সঙ্গে প্রতারণা কর না। আমরা তোমাকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু তুমি তোমার অবস্থাটা বুঝতে না পারলে আমরা এ বিষয়ে কিছুই করতে পারব না।

তোমরা খুব বেশি আমার ধৈর্য্যের উপর অত্যাচার করছ।

এই সময় মিডিয়াম তার আসনের উপর ঢলে পড়ল। চ্যাং নামে চীন দেশীয় যে প্রেতটি কন্ট্রোলের কাজ করছিল, সে চক্রের লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। সে বলল, লোকটা ভাল ও নিশ্চয় সব কিছু বুঝে নিতে পারবে; ওকে আর একবার নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না। ঈশ্বর ওকে সাহায্য কর। ওকে করুণা কর।

মিডিয়াম এবার সোফার উপর চিত হয়ে, উপর দিকে মুখ করে সটান শুয়ে পড়ল। তার মুখ থেকে এমন এক চিৎকারের ধ্বনি বেরিয়ে এল যা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে উপস্থিত সকলে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। মিডিয়ামের কণ্ঠস্বর আর্তনাদের মতো শোনাতে লাগল। ‘একটা করাত আন। একটা করাত’—এই বলে সে চিৎকার করতে লাগল।

এমন কি মেইলিও উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বাকি সকলে ভয় পেয়ে গেল। মেইলি বলল, মনে হয় কোন পাগল প্রেতাত্মা ওকে আঘাত করেছে।

পাদ্রী ম্যাসন মেইলিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি?

মেইলি বলল, একটু অপেক্ষা করুন, এখনি ঠিক হয়ে উঠবে। দেখি কি হয়। মিডিয়ামের দেহটা যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠছিল। সে হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলল, ‘বলছি একটু করাত আন। হকিন্স এই কাজ করছে। সে আমার বুকের ভিতরের হাড়গুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। সে নিচ থেকে আমাকে টানছে। না না আরও খারাপ। আগুন সত্যি কি ভয়ঙ্কর!’

মিডিয়ামের এই আর্তনাদ শুনে সকলের গায়ের রক্ত হিম হয়ে জমাট বেঁধে যাচ্ছিল। এই সময় সেই চীনা কন্ট্রোল মেইলির দিকে মিটমিট করে তাকে জিজ্ঞাসা করল, এ বিষয়ে তুমি কি মনে করছো?

মেইলি উত্তর করল, এটা তো এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কেন এমন হচ্ছে?

ম্যালনের দিকে ঘাড় নেড়ে চ্যাং বলল, সে সংবাদপত্রে কাহিনি চায় আর আমি তাকে তা দিয়েছি। সে এটা বুঝবে। এখন অপেক্ষা করার মতো বেশি সময় নেই। এরপর একজন নাবিক আসবে। এই তো এসে গেছে।

এই বলে চ্যাং চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ামের দেহ মোচড়ানি বন্ধ হয়ে গেল। তার মুখে কিছুটা খুশীর ভাব দেখা গেল। মুচকি হাসির একটা ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠল। সে মাথা চুলকাতে লাগল। এইবার মিডিয়ামের মুখ দিয়ে এক নতুন প্রেত এসে বলল, আমি কখনও ভাবতে পারিনি একজন চীনা লোকের হুকুম আমাকে মানতে হবে। যাই হোক আমি এসেছি। বল তোমরা কি চাও?

আমরা কিছুই চাইনি।

ঠিক আছে। ওই চীনা লোকটি হয়তো ভেবেছিল আপনারা কিছু চান তাই আমাকে এখানে আসতে বলেছিল।

বরং তুমিই আমাদের কাছে কিছু জানতে চেয়েছিলে।

আমি আমার শরীরটাকে হারিয়েছি এটা সত্য। আমি মারা গেছি কারণ আমি এক বন্দুকের কারখানায় একটা চোরকে চুরি করতে দেখেছিলাম। অনেকগুলো বন্দুকের গুলিতে তার দেহটি টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে যায়। তার যদি মৃত্যু হয় তাহলে সেখানে উপস্থিত আমাদের সকলের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পাইলট অর্থাৎ জাহাজের চালক বেঁচে যায় এবং সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে।

তোমার জাহাজের নাম কি?

মনমাউথ।

জার্মানদের সঙ্গে যুদ্ধে কি জাহাজটা ডুবে যায়?

হ্যাঁ, দক্ষিণ আফ্রিকার সমুদ্রে ডুবে যায়। যেখানে জাহাজটা ডুবে যায়, সে জায়গাটা ছিল সাক্ষাৎ নরক। মৃত নাবিকের প্রেত আবেগের সঙ্গে কথাগুলো বলে উঠল। আবেগে তার কণ্ঠ কাঁপছিল। এরপর সে বেশ কিছুটা আনন্দের সঙ্গে বলল, শুনেছি আমাদের সঙ্গীরা সবাই সেই নরকে গিয়ে সবার সঙ্গে মিশে যায়। তাই নয় কি?

হ্যাঁ, তারা সকলেই সমুদ্রের তলদেশে চলে যায়।

আমরা এই মর্ত্যভূমিতে তাদের দেখতে পাইনি, তবে তাদের কথা ভুলিওনি। মেইলি বলল, তাদের খবর তোমাকে জানতেই হবে। আর এই জন্যই তোমাকে ডাকা হয়েছে। এই জন্যই চীনা কন্ট্রোল চ্যাং তোমাকে ডেকে এনেছে। আমরা তোমাকে কিছু শিক্ষা দান করতে চাই। তুমি আমাদের কথা তোমার সঙ্গীদের কাছে গিয়ে জানাবে। আমাদের বাণী তোমাকে বহন করে নিয়ে যেতে হবে।

আপনাদের মঙ্গল হোক, ওরা এখানে আমার পিছনেই আছে।

মেইলি বলল, তাহলে আমি তোমাকে ও তাদের একথা বলছি যে, যতকিছু দুশ্চিন্তা, জাগতিক দুঃখ কষ্ট ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের কাল শেষ হয়েছে। এখন তোমাদের দৃষ্টিকে সামনের দিকে প্রসারিত করতে হবে, পিছনের দিকে নয়। এই জগৎ ছেড়ে তোমাদের চলে যেতে হবে। কারণ এই জগৎই যতসব দুঃখ ও দুশ্চিন্তার বন্ধনে তোমাদের বেঁধে রেখেছে। এখন তোমাদের সমস্ত কামনা বাসনাকে ঊর্ধ্বে উঠিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন তোমাদের সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হয়ে এক উচ্চতর সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের যোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে, বুঝতে পারলে?

আমি তোমাদের কথা শুনলাম, আমার সঙ্গীরাও শুনল। এখন আমাদের ঠিকপথে চালিত করার মতো লোক চাই। আমরা এতদিন ভুল নির্দেশে চলছিলাম। আমরা কখনও আশা করতে পারিনি আমাদের জীবন এইভাবে কু- পথে চালিত হবে। আমরা স্বর্গের কথা শুনেছি, নরকের কথাও শুনেছি। আমাদের কাছে এই দুইয়ের কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু এই চীনা ভদ্রলোক বলেছেন এখন সময় হয়েছে। সব কিছু জানতে ও শিখতে হবে। ঠিক আছে। পরে আবার আমরা এসে সব কিছু জানাব। আমি আমার নিজের ও সঙ্গীদের পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আবার আসব।

এরপর সব চুপচাপ হয়ে গেল।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ম্যালন বলে উঠল, কি অবিশ্বাস্য আলোচনা! যদি আমি এই মৃত নাবিকের সব কথাগুলো ঠিকমতো লিখে প্রকাশ করি, তাহলে সেটা পড়ে সাধারণ মানুষ কী বলবে?

মেইলি কিছুটা হতাশভাবে কাঁধ দুটো নাড়ল। তারপর বলল, জনগণ কি বলল না বলল তাতে কি আসে যায়? এখন আমাকে অনেক সংবাদপত্রের আক্রমণ

সহ্য করতে হয়। আমার কাজ হলো সত্যের সন্ধ্যান। যে কোনও ব্যাপারে সত্যকে উদঘাটন করে দেখাতে পারলেই হলো। তারপর যে যা বলে বলবে।

লর্ড রক্সটন বললেন, আমি এই সব বিষয়ে বেশি কিছু জানতে চাই না। তবে একটা কথা আমি প্রায়ই ভাবি—এই সব নিচুস্তরের প্রেতাত্মারা মানুষ হিসাবে খুবই ভালো ছিল। তারা লেখাপড়া তেমন না শিখলেও সরল প্রকৃতির ছিল। তবে কেন তারা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াবে? আবার কেন চীনা কন্ট্রোল চ্যাং তাদের এখানে ধরে নিয়ে আসবে? যখন জীবনে তারা কারও কোন ক্ষতি করেনি?

মেইলি এর কারণ বিশ্লেষণ করে বলল, তারা অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় কারণ মৃত্যুর পরও এই পৃথিবীর ও পার্থিব ভোগবাসনার প্রতি তাদের প্রবল আসক্তি কিছুমাত্র কমেনি। এর টানেই তারা পরলোক থেকে বারবার এখানে আসে। তাছাড়া ন্যূনতম আধ্যাত্মিক চেতনাও নেই তাদের মধ্যে। এইসব প্রেতাত্মাদের মধ্যে একজন আছে চার্চের পাদ্রী। যার মনে আছে প্রথাগত ধর্মের কতকগুলো সূত্র আর আছে আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মের অভিজ্ঞতা। আর একজন আছে বস্তুবাদী যার মন বস্তুবাদী যার মন বস্তু ছাড়া কিছুই জানে না। আর একজন নাবিক আছে যার মনে আছে শুধু প্রতিহিংসার চিন্তা। এরকম লক্ষ লক্ষ প্রেতাত্মা আছে।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, তারা কোথায় আছে?

মেইলি উত্তর করল, তারা সব এখানেই আছে। অর্থাৎ পৃথিবীর উপরিপৃষ্টে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে অশরীরী অবস্থায়। তুমি নিজেই সেটা দেখেছ। তুমি যখন ডর্সেটশায়ারে গিয়েছিলে তখন পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে একজন প্রেতকে শরীরী অবস্থায় দেখেছ। এসব স্থূল ব্যাপার। তুমি প্রেতের ছায়াটাকে স্পষ্টতই দেখেছ। তবে এসব ব্যাপার ও নিয়ম সাধারণ নিয়ম-বহির্ভুত নয়। এইসব পৃথিবীমুখী কামনাসর্বস্ব প্রেতদের দ্বারা সারা পৃথিবী উপদ্রুত। যখন সংস্কার সাধন করা হয়, তখন তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে যেতে পারে। এইভাবে এইসব সংস্কার কার্যের দ্বারা জীবিতরাও উপকৃত হতে পারে।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, এই ধরনের কিছু আসন্ন ঘটনার কথা কি ভাবছেন?

ম্যাসন বলল, সে এক অন্য প্রসঙ্গ।

মেইলি বলল, সেটা এখন বলার পক্ষে একটা বিশাল প্রসঙ্গ। আরে এই তো চ্যাং আবার এসে গেছে।

চীনা কন্ট্রোল ওদের আলোচনায় যোগদান করল। সে বলল, তোমরা যা বলেছ, আমি এখানে বসে থেকে সব শুনেছি। এখন বল কী কাজ করতে হবে? যা হবার হোক। যা ঘটে সব কিছুই ভার। এখনও সময় হয়নি, সময় হলে যা জানার জানবে। ঈশ্বর মঙ্গলময়, তিনি কখনও ভুল করেন না।

এখানে আরও অনেকে আছে যারা তোমাদের সাহায্য চায়। আমি যাচ্ছি।

কয়েকজন প্রেতাত্মা পরপর এল। তাদের মধ্যে একজন ছিল স্থপতি। সে বলল, সে ব্রিস্টলে বাস করত। সে তার কাজে তেমন দক্ষ ছিল না। সে হতাশ হয়ে ভবিষ্যতের সব আশা ভরসা ত্যাগ করেছিল। এখন সে অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় এবং তাকে সঠিক পথে চালনা করার জন্য একজনের সাহায্য চায়। অন্য একজন বার্মিংহামে বাস করত। সে ছিল একজন শিক্ষিত লোক, কিন্তু বস্তুবাদী। মেইলির কোন আশ্বাস বাক্যে সে বিশ্বাস করতে চায়নি। সে যে মৃত একথা সে বুঝতে পারেনি। তারপর এল ভয়ঙ্করভাবে বিক্ষুব্ধ এক আত্মা। সে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগল, ‘এখানে এই সব লোকের ভীড় কেন? যত সব বাজে লোক।”

মেইলি বলল, বাজে লোক নয়, আমরা তোমাকে সাহায্য করার জন্য এখানে আছি।

সেই প্রেতাত্মা বলল, কে শয়তানের সাহায্য পেতে চায়?

সম্ভবত কোনও আত্মা বিপদে পড়লে শয়তানও তাকে সাহায্য করতে পারে। এটাও শয়তানের প্রতারণা, জেনে রাখ, আমি এতে আর কখনও অংশগ্রহণ করব না।

এক ঝলক চকিত আলোর মতো শান্ত প্রকৃতির খেয়ালী চ্যাং ঘরে এসে ঢুকল।

সে বলতে লাগল, লোকটি ভাল, কিন্তু নির্বোধ। এখনও অবশ্য প্রচুর সময় আছে। একদিন সে নিশ্চয় সব শিখে নিতে পারবে। যাই হোক আমি একটা খারাপ ব্যাপার নিয়ে এসেছি।

এরপর সে আসনে মাথা নিচু করে বসল। একজন নারীর কণ্ঠস্বর না শোনা পর্যন্ত সে মাথা তুলল না। হঠাৎ একটা নারী কণ্ঠস্বর ‘ডোনেট ডোনেট’ বলে চিৎকার করে বলতে লাগল, সকালের চা কোথায়, আমি তোমায় কত ডাকছি কিন্তু কোন সাড়া নেই। এটা অসহ্য।

মিডিয়াম এবার খাড়া হয়ে বসে মিটমিট করে তাকাতে লাগল। সেই নারীর প্রেতাত্মা মিডিয়ামের মুখ দিয়ে বলতে লাগল ‘কে তুমি? এখানে আসার কি অধিকার আছে? তুমি কি জান না যে এটা আমার বাড়ি!’

মেইলি বলল, না বন্ধু এটা আমার বাড়ি।

তোমার বাড়ি! কি করে তা হতে পারে। যখন এটা আমার শোবার ঘর।এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও।

না বন্ধু, তুমি তোমার অবস্থাটা বুঝতে পারছ না।

আমি তোমাদের ঘর থেকে বার করে দেব। কি ঔদ্ধত্য! জেনেট! জেনেট! আজ সকালে কি আমার দেখাশোনার কেউ নেই?

হে ভদ্র মহোদয়া, ভাল করে বুঝুন ব্যাপারটা। এটা কি আপনার শোবার ঘর? টার্বেন ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল।

এই ঘর আমি জীবনে কখনও দেখিনি। আমি কোথায়?

আপনাকে দেখে তো সদয় ভদ্রমহিলা বলে মনে হচ্ছে। এসব কথার অর্থ কি? আমি খুব ভয় পেয়েছি। জন আর জেনেট কোথায়?

আপনার জীবনের শেষ কথা কি মনে আছে?

আমার মনে আছে আমি প্রায়ই জেনেটের সঙ্গে কথা বলতাম। তোমরা জান জেনেট আমার নারী ভৃত্য। এখন সে কর্তব্যে বড় অবহেলা করে। তার কাজে মন নেই। তার জন্য আমি খুব রেগে উঠি। আমি তার উপর এত রেগে যাই ও উত্তেজিত হয়ে পড়ি, যে, আমি একদিন পীড়িত হয়ে পড়ি। আমি অতিশয় অসুস্থ বোধ করতে থাকায় বিছানায় শুয়ে পড়ি। ওরা আমায় বলল, আমি যেন উত্তেজিত না হই। কারণ উত্তেজনাই হলো আমার অসুস্থতার কারণ। কিন্তু রেগে গেলে কেউ উত্তেজিত না হয়ে পারে কি? আমার মনে আছে একদিন আমার চোখ থেকে সব আলো নিভে যায় তখন আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ি।

রাত্রিকালেই আপনার জীবনাবসান হয়।

জীবনাবসান মানে? তোমরা কি মনে কর আমি মরে গেছি?

হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়া। আপনি মারা গেছেন।

এরপর অনেকক্ষণ ধরে নীরবতা বিরাজ করতে লাগল সমস্ত ঘরখানায়। সব চুপচাপ। তারপর সহসা এক তীক্ষ্ণ নারী কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেল। না, না, আমি মরিনি। এটা একটা স্বপ্ন। একটা দুঃস্বপ্ন। আমাকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে জাগাও। কি করে আমি মরতে পারি। আমি মরতে প্রস্তুত ছিলাম না, মরতে চাই না। আমি মৃত্যুর কথা কখনও ভাবিনি। যদি আমার মৃত্যু হয় তবে আমি স্বর্গে বা নরকে নেই কেন? তবে আমি এই ঘরখানায় আছি কেন? এই ঘরখানা তো একেবারে বাস্তব।

হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়া, আপনাকে এখানে আনা হয়েছে এবং এক পুরুষের দেহ ধারণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

একজন পুরুষের দেহ! এই বলে সে এক প্রবল মানসিক আলোড়নের সঙ্গে তার গায়ের কোটটা ভাল করে দেখে তার মুখের উপর হাত বোলাতে লাগল। তারপর বলল, সত্যি তো এটা পুরুষের দেহ, তাহলে সত্যিই তো আমি মৃত। আমি এখন আসতে পারি?

আপনাকে এখানে আনা হয়েছে বোঝাবার জন্য। বিগত জীবনে আপনি ছিলেন এমনি মহিলা যিনি পার্থিব ভোগসুখ ছাড়া জীবনে আর কিছু চাননি।

না, না। আমি প্রতি রবিবার চার্চে যেতাম। যেতাম সেন্ট জেভিয়ার চার্চে।

ওটা এমন কিছুই নয়। কারও মানসিক ইচ্ছা ও অভ্যন্তরীণ জীবনই বড় কথা। আপনি একেবারে বস্তুবাদী। আপনি এখন এই নরজগতে নেমে এসেছেন। আপনি এই পুরুষের দেহটা ত্যাগ করলেই আপনি আপনার নিজস্ব দেহ পাবেন এবং নিজের পরিবেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না। কারণ আপনার দেহটাকে সমাহিত করা হয়ে গেছে। তবু আপনার অশরীরী সত্ত্বাটা আগের মতোই থেকে যাবে।

আমাকে কী করতে হবে? আমি কী করতে পারি?

ভাল আত্মারা যা বলবে আপনি তাই করবেন। আপনার মনের সংস্কারসাধনের জন্য এটা দরকার। আমরা কেবল দুঃখ ভোগের দ্বারা অসংযত কামনার পীড়ন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারি। সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করব।

হ্যাঁ, তাই করুন, তাই করুন। আমার এটা দরকার। এই বলে কণ্ঠস্বরটি মিলিয়ে গেল।

চীনা কন্ট্রোল চ্যাং বলল, ব্যাপার খুবই খারাপ। মেয়েটা খারাপ ও স্বার্থপর। শুধু আনন্দের জন্য বাঁচতে চায়। তার চারপাশে যারা থাকে তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করে। তাকে অনেক দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হবে। তবে তোমরা তাকে ঠিকপথে চলতে সাহায্য করেছ। এখন আমার মিডিয়াম ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করা হয়েছে। আজ আর নয়।

আমরা কি ভাল কাজ করলাম চ্যাং?

অনেক ভাল কাজ, অনেক ভাল কাজ।

এইসব আত্মারা কোথায় থাকে চ্যাং?

আমি তোমাদের আগেই বলেছি।

কিন্তু এইসব ভদ্রলোকদের কথা আমি শুনতে চাই।

এই পৃথিবীকে ঘিরে সাতটা স্তর আছে। পৃথিবীর ঠিক উপরেই প্রথম স্তর। এইসব লোকেরা পৃথিবীর উপরিস্তরেই আছে। প্রতিটি স্তর অন্য স্তর থেকে পৃথক। সুতরাং এই উপরকার স্তরের লোকদের অন্যসব স্তরের লোকদের সাথে যোগাযোগ করা অনেক সহজ।

এবং আমাদের সঙ্গে কথা বলা তাদের পক্ষেও সহজ হবে।

তোমরা যখন জান না কার সঙ্গে কথা বলছ, তখন কথা বলার সময় খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

আচ্চা চ্যাং—তুমি কোন স্তরে বাস কর?

আমি চার নম্বর স্তর থেকে এসেছি।

প্রকৃতপক্ষে সর্বাপেক্ষা সুখী স্তর কোনটি?

সেটা হলো তিন নম্বর স্তর। তার নাম হলো সামারল্যান্ড। বাইবেল এটাকে তৃতীয় স্বর্গ বলেছে। বাইবেল গ্রন্থে চমৎকার জ্ঞানের কথা আছে। লোকে তা বোঝে না।

আর সপ্তম স্বর্গ?

ওই স্তরেই তো খ্রীস্টরা থাকে। সকলেই মৃত্যুর পর সেখানে যায়। তুমি আমি আর সকলেই পরিশেষে সেখানে যাবে।

তারপর?

খুব বেশি প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে মেইলি। এ সব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। বিদায়, ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন। আমি যাচ্ছি।

উদ্ধার চক্রের অধিবেশন এখানেই শেষ হলো। কয়েক মিনিট পরে টার্বেন উঠে বসল। তার মুখে হাসি থাকলেও তাকে সচকিত দেখাচ্ছিল। তবে যে সব ঘটনা একটু আগে ঘটে গেছে সে সব কথা তার মনে আছে বলে মনে হয় না। এখন তার হাতে আর সময় নেই। সে দূরে বাস করে তাই তাকে এখনই চলে যেতে হবে। যাদের সাহায্য করেছে, তাদের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছু পাবে না সে।

চক্রের অধিবেশনটা কিন্তু তখনই ভাঙল না। অতিথিরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। মেইলিরা সে সব কথা শুনতে চাইছিল।

রক্সটন বললেন, আমি বলতে চাই যে এইসব ব্যাপারগুলো খুবই আগ্রহজনক। তবে এর মধ্যে এক ধরনের বৈচিত্র্য আছে। যা একেবারে অভিনব। তবে এগুলো প্রকৃতপক্ষে সত্য কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন

ম্যালন বলল, আমিও তাই মনে করি। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে দেখতে এটা এতই ভালো যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই ঘটনার গুরুত্ব এত বেশি যে এর তুলনায় অন্যান্য ঘটনা অতি সাধারণ। কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। আমি মোর্টন প্রিন্স ও মিস বোচ্যম্প-এর মামলার কথা পড়েছি। তাছাড়া আমি হিপনোটিক স্কুলে চারকট-এর কথাও পড়েছি। ওরা যে কোন মানুষকে যে কোন বস্তুতে পরিণত করতে পারে। তাদের মনগুলো দড়ির মতো। যে দড়িটার পাকগুলো খুলে সুতোগুলোকে পৃথক করা যায়। আর সেই সব সুতোগুলোর প্রত্যেকটিতে আছে বিশেষ ব্যক্তিত্ব। যা এক-এক সময় এক-এক রকম নাটকীয় রূপ পরিগ্রহ করে, অভিনয় করে ও কথা বলে। চ্যাং নামে ওই লোকটা সৎ বলেই মনে হয়। সে এতসব কাণ্ড করতে পারে না। কিন্তু কেমন করে বুঝবে যে, সে নিজেই যাদুকরের মতো মায়া জানে না এবং সে নিজেই এক-একটি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কখন চ্যাং আবার কখনও নাবিক বা কখনও একজন নারীতে পরিণত হচ্ছে না?

মেইলি হাসতে হাসতে বলল, প্রত্যেকে মানুষের প্রকৃতির মধ্যে একটা রহস্য আছে। কিন্তু এটা একটা যুক্তিপূর্ণ আপত্তি। সুতরাং তার সমাধান করতে হবে। আমরা কয়েকটি ঘটনার অনুসন্ধান করে দেখেছি। ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। নাম, ঠিকানা সব পাওয়া গেছে।

ম্যালন বলল, টার্বেন-এর স্বাভাবিক জ্ঞানের বিষয়টাও খতিয়ে দেখতে হবে। তবে আমার মনে হলো একজন রেলের কুলী এই ধরনের খবর সংগ্রহ করতে পারে।

মেইলি বলল, তুমি তার কেবল একটা অধিবেশন দেখেছ। তুমি যদি আমাদের মতো বিভিন্ন অধিবেশনে উপস্থিত থেকে তার কাজকর্ম দেখতে তাহলে তোমার মনে কোনো সংশয় থাকত না।

ম্যালন বলল, এটা খুবই সম্ভব। এ বিষয়ে আমার সংশয়টা তোমাদের পক্ষে বিরক্তিকর। তবে জানবে সংশয় থাকলেও আমার সততা আছে এ ব্যাপারে। কারণ যাই হোক, একটা কথা স্বীকার না করে পারছি না যে, এমন একটি রোমাঞ্চকর ঘটনা জীবনে আগে কখনও দেখিনি। এটা যদি সত্যি হয় তবে সেটা হবে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। যদি তোমাদের এই রকম হাজারটা চক্র থাকত তাহলে বহু প্রেতাত্মাই নবজীবন লাভ করত।

মেইলি ধীর স্থিরভাবে বলল, ভবিষ্যতে এই চক্রের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং আশা করি তোমাকে সেই সব চক্রের অধিবেশনে দেখতে পাব। তবে যদি এই ঘটনা জোর করে তোমার মনে একটা বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় তাহলে আমি দুঃখিত হব। যাই হোক তুমি আবার এসো।

সেদিন সন্ধ্যাতেই অদ্ভুতভাবে বিশ্বাসের প্লাবন বয়ে গেল ম্যালনের মধ্যে দিয়ে। ম্যালন তার অফিসে ফিরে গিয়ে তার টেবিলে সবে মাত্র বসে যখন তার নোট-বই থেকে দুপুরবেলা ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণগুলো খুঁটিয়ে দেখছিল তখন হঠাৎ মেইলি ব্যস্তভাবে ঘরে ঢুকল। উত্তেজনায় তার হলুদ দাড়িটা কাঁপছিল। তার হাতে ‘ইভিনিং নিউজ’ নামে একটি পত্রিকা ছিল। সে ম্যালনের পাশে বসে পত্রিকাটা খুলে একটা খবর পড়তে লাগল :

শহরে দুর্ঘটনা

আজ অপরাহ্ণে ৫টার পর পঞ্চাশ শতাব্দীর একটা পুরাতন বাড়ি সহসা ভেঙ্গে পড়ে। বাড়িটি লেসার কলম্যান স্ট্রীট ও ইলিয়াড স্কোয়ারের মাঝখানে অবস্থিত। তার পাশেই আছে পশু চিকিৎসালয়ের হেড্‌ কোয়ার্টার। বাড়িটাতে আগেই কিছু ফাটল দেখা যায়। আর তার ফলে বাড়ির অধিবাসীরা আগেই সতর্কবার্তা স্বরূপ বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। কিন্তু জেমস বিল, উইলিয়াম মুরসন ও একজন অজ্ঞাতনামা মহিলা বাড়িতে চাপা পড়ে। এদের মধ্যে দু’জন সঙ্গে সঙ্গে প্রাণত্যাগ করে। তৃতীয়জন জেমস বীল উপর থেকে পড়া কড়ি কাঠের দ্বারা আহত হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। একটি করাত আনা হয়। বড় ভারী কড়িকাঠ জেমস বিলের উপর এমনভাবে পড়ে যে তিনি তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। স্যামুয়েল হকিন্স নামে ওই বাড়িরই এক বাসিন্দা এসে সাহসের সঙ্গে উদ্ধারের কাজে লেগে যান। তিনি যখন করাত দিয়ে কড়িকাঠ কেটে বিলকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন, তখন সহসা নিকটবর্তী ভগ্নস্তূপে আগুন জ্বলে ওঠে। হকিন্সের দেহটা সেই আগুনের তাপে দগ্ধ হতে থাকে। তথাপি তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। দুর্ভাগ্যক্রমে শেষে তিনি ব্যর্থ হন। বিল শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় মারা যান। স্যামুয়েল হকিন্স অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় অচৈতন্য হয়ে পড়ে এবং তাকে লন্ডন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মেইলি খবরটা পড়ার পর পত্রিকাটা ভাঁজ করে বলল, এই হলো খবরটা। এর সিদ্ধান্তের ভার তোমার উপর ছেড়ে দিলাম। এই বলে অত্যুৎসাহী মেইলি যেমন ব্যস্তভাবে ঘরে ঢুকেছিল তেমনি ব্যস্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।