উচ্চতা ও গভীরতা দুইই আছে

উচ্চতা ও গভীরতা দুইই আছে

ওয়াগরাম অ্যাভেনিউতে অবস্থিত মেটা সাইকিক ইনস্টিটিউটটা ছিল ব্যারনদের প্রাসাদের মতো পাথর দিয়ে গাঁথা একটা বড় বাড়ি। তার দরজাগুলো ছিল আকারে যেমন বড় তেমনি ভারী। সেদিন সন্ধ্যার সময় তিন বন্ধু একযোগে বাড়িটার সামনে গিয়ে উপস্থিত হতেই দারোয়ান তাদের সঙ্গে করে অভ্যর্থনা ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে ইনস্টিটিউটের কর্তা ডাক্তার মপুই তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। পরলোক বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ ড. মপুই পরলোক ও প্রেততত্ত্বের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষণার রত ছিলেন। তাঁর চেহারাটা ছিল বেঁটেখাটো ও মোটাসোটা, তাঁর দাড়িকামানো মুখে ছিল জাগতিক জ্ঞানের সঙ্গে মিশ্রিত পরার্থপরতার একটা ভাব। আগন্তুক তিনজনের বন্ধু ছিল মেইলি, লর্ড রক্সটন ও ম্যালন। ড. মপুই মেইলি ও লর্ড রক্সটনের সঙ্গে ফরাসী ভাষায় আলোচনা করছিলেন।

মেইলি ও রক্সটন ফরাসী ভাষায় ভালোই কথা বলতে পারে। কিন্তু ড. মপুইকে ম্যালনের সঙ্গে কথা বলার সময় ভাঙা ভাঙা ইংরাজী ভাষা ব্যবহার করতে হচ্ছিল। ম্যালন ভাঙা ভাঙা ফরাসী ভাষায় কথা বলছিল। ড. মপুই একজন ফরাসী ভদ্রলোক হিসাবে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, তিনি তাদের আগমনে বিশেষ আনন্দিত। এরপর তিনি মিডিয়াম প্যানবেকের আশ্চর্যজনক গুণাবলীর সম্বন্ধে কিছু বললেন। পরে তিনি অতিথিদের সঙ্গে করে নিচুতলায় একটা ঘরে নিয়ে গেলেন যেখানে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা হবে। ড. মপুই-এর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দেখে অতিথিরা বুঝতে পারলেন যারা মনে করেন ড. মপুই প্রতারকদের শিকারের বস্তু তাদের কথা বিশ্বাস করা কত বিপজ্জনক। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে তারা নিচের তলার একটা বড় ঘরে এসে ঢুকল। ঘরটাকে এক নজরে দেখে মনে হচ্ছিল সেটাই যেন রাসায়নিক গবেষণাগার। দেয়ালের তাকগুলোতে বোতল, ওজন দণ্ড ও নানা যন্ত্রপাতি সারবন্দিভাবে সাজানো আছে। ঘরের মাঝখানে ওক কাঠের একটা বড় টেবিল ছিল। আর তার চারপাশে দেয়ালে বেশকিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির বড় বড় ছবি ছিল। টেবিলের চারদিকে পাতা চেয়ারে কয়েকজন ভদ্রলোক কথা বলছিলেন। তাঁরা আলোচনায় এমনি মত্ত ছিলেন যে নবাগতদের দিকে তাঁরা ভাল করে তাকালেনই না।

ডা. মপুই ঘরের মধ্যে উপস্থিত ভদ্রলোকদের বললেন, এই তিনজন বিশিষ্ট অতিথি আপনাদের মতোই এ বিষয়ে আগ্রহী। ঘরের মধ্যে দু’জন গবেষণাগারের কর্মী ও প্যারিস শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও ছিলেন। মতিন পত্রিকার সহ- সম্পাদক মি. ফোর্তে সেদিন উপস্থিত ছিলেন। তাঁর চেহারাটা ছিল লম্বা এবং গায়ের রঙটা ছিল তামাটে। তাঁকে দেখে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাপতির মতো মনে হচ্ছিল। এরপর ড. মপুই মেইলিদের সঙ্গে একজন ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ইনি হচ্ছেন অধ্যাপক চার্লস রিচের্ট যিনি এ বিষয়ে বিশেষ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তবে তাঁর সিদ্ধান্ত আপনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। মনে রাখবেন আমরা এই ব্যাপারের সঙ্গে ধর্মকে যত কম ব্যবহার করব ততই চার্চের ঝামেলা কম হবে। কারণ এদেশে চার্চ খুবই শক্তিশালী। উঁচু কপাল বিশিষ্ট ঐ ভদ্রলোক হচ্ছেন কাউন্ট দ্য গ্রামাউন্ট। তাঁর পাশে জুপিটারের মতো মাথা এবং সাদা দাড়ি যুক্ত ঐ ব্যক্তি একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ড. মপুই এবার গলা উঁচিয়ে বললেন, হে ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা আসন গ্রহণ করলে আমরা কাজ শুরু করতে পারি।

ভদ্রলোকেরা এখানে-সেখানে বসে পড়লেন। ব্রিটেন থেকে আসা তিনজন অতিথি এক জায়গায় বসলেন। ঘরের একদিকে একটা ছোট টেবিলে দুটো দস্তার বালতি ছিল। বড় টেবিলটার একধারে ড. মপুই গিয়ে বসলেন। তাঁর ডান পাশে টাকমাথা ও মোচওয়ালা এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। তাকে বুদ্ধিমান বলে মনে হচ্ছিল।

ড. মপুই এবার সকল অতিথিদের সঙ্গে মি. প্যানবেককে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বললেন, আপনাদের মধ্যে অনেকেই মঁসিয়ে প্যানবেককে দেখেননি। আপনাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। তিনি পরলোক সম্বন্ধে আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে তাঁর সমস্ত উদ্যম ও শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের সাহায্য করছেন। তিনি আমাদের কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন এবং আমরা তাঁর কাছে ঋণী। তাঁর বয়স এখন সাতচল্লিশ। তাঁর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক, তবে কিছুটা বাতের ভাব আছে। মাঝে মাঝে তিনি কিছুটা স্নায়বিক উত্তেজনায় ভোগেন। তবে তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিক। তাঁর স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন বাহাত্তর। কিন্তু প্রেতচর্চার সময় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় এই স্পন্দন বেড়ে গিয়ে এক শ’ হয়। তাঁর চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক। আর কিছু বলার আছে বলে মনে করি না।

প্রফেসর রিচেট বললেন, মি. প্যানবেক কবিদের মত্যেই অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ। গুণই বলুন দোষই বলুন এগুলো কবিদের থাকে। একজন বড় দরের মিডিয়াম একজন বড় দরের শিল্পীর সমান। একই মাপকাঠিতে দু’জনকে বিচার করা চলে।

মিডিয়াম এবার মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে বললেন, উনি আমার সবচেয়ে খারাপ কাজ দেখার জন্য আপনাদের মানসিকতভাবে প্রস্তুত করে তুললেন।

এ কথায় উপস্থিত সকলে হেসে উঠলেন। এ হাসির মধ্যে দিয়ে মিডিয়ামের প্রতি সকলে সহানুভূতি দেখাল।

ড. মপুই নিরস ও আবেগহীন ভাষায় বললেন, আজ আমরা এখানে এই আশায় বসে আছি যে, আজ আবার প্রেতাত্মাকে মূর্তিদানের এমন এক ঘটনা দেখাব যা এক নজির হয়ে নথিভুক্ত হয়ে থাকবে। প্রেতাত্মাকে দেওয়া মূর্তি বা আকার যত ভয়াবহ হোক না কেন, আমি সকলকে অনুরোধ করছি তারা যেন কোনও ভয়কে প্রশ্রয় না দেয়। ভয় হলেও তারা যেন সে ভয়কে দমন করতে পারে। এ বিষয়ে এক শান্ত পরিবেশ দরকার যাতে মানুষের বিচারবুদ্ধি অক্ষুণ্ণ থাকে। এখন আমরা উজ্জ্বল সাদা আলোটা নিভিয়ে দিয়ে শুধু ক্ষীণ লাল আলোটা জ্বেলে রাখব যতক্ষণ না আলো জ্বালার প্রয়োজন হয়।

ড. মপুই আলো নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। প্রথমে সাদা আলোটা নিভিয়ে দিতেই সমস্ত ঘরখানা অন্ধকারে ডুবে গেল। তার পর একটা লাল আলোর শিখা ঘরের একটা কোণ থেকে আসতে লাগল। সেই আলোকছটায় দর্শকদের মাথাগুলোকে শুধু দেখা যাচ্ছিল। কোনও গানবাজনার শব্দ বা কোনও ধর্মীয় তৎপরতা ছিল না।

ম্যালন বলল, এটা ইংরেজ পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

মেইলি বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা যে কোনও বিপদের সামনে প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। মনে হচ্ছে ওরা বিপদের সম্ভাবনা বুঝতে পারছে না।

কি ধরনের বিপদ আসতে পারে?

আমার দৃষ্টিকোণ থেকে যতখানি বুঝি, আমরা যেন এমন একটা পুকুরের কিনারায় বসে আছি যে পুকুরে নির্দোষ ব্যাঙ থাকতে পারে আবার মানুষ-খেকো কুমীরও থাকতে পারে। আপনারা বলতে পারেন না সে পুকুরে কী আছে?

প্রফেসর রিচেট ইংরাজী ভাষায় ভালই কথা বলতে পারতেন। তিনি মেইলির কথাগুলো শুনলেন।

তিনি এবার বললেন, আমি আপনার দৃষ্টিমত বুঝি। মনে ভাববেন না যে আমি ব্যাপারটা হাল্কাভাবে নিচ্ছি। প্রফেসর রিচেট আরও বললেন, আপনি ব্যাঙ ও কুমীরের যে দৃষ্টান্ত দিলেন তার তাৎপর্য আমি বুঝতে পেরেছি। আমি এ ব্যাপারে এমন কিছু দেখেছি যার ফলে আপনার কথার গুরুত্বটা বুঝতে পারলাম। আমি জানি এই ঘরে এমন কিছু জীব আছে যারা রেগে গেলে আমাদের পরীক্ষাকার্য বিপজ্জনক করে তুলবে। আমি আপনার সঙ্গে একমত যে, খারাপ লোকেরা যে- কোনও কাজে খারাপ প্রভাব বিস্তার করে।

মেইলি বলল, আমি আনন্দিত যে, আপনি আমাদের দিকেই এগোচ্ছেন।

অন্যান্য সকলের মতো মি. মেইলিও প্রফেসর রিচেটকে জগতের মহান ব্যক্তিদের অন্যতম বলে মনে করে।

রিচেট বললেন, আপনাদের দিকেই এগুচ্ছি বটে তবে এখনও আপনাদের কাছে গিয়ে একসঙ্গে প্রেতাত্মার অন্তর্নিহিত শক্তি এত বেশি আশ্চর্যজনক যে, তারা এমন সব ঊর্ধ্বতন স্তরে উঠে গিয়ে বিচরণ করে যেখানে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে যেতে পারে না বা বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে না। একজন পুরনো বস্তুবাদী হিসাবে আমি এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ইঞ্চি দখল করার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। তা সত্ত্বেও কয়েকটা জায়গা আমি হারিয়েছি। একথা আমি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করছি যে, আমার সুযোগ্য বন্ধু চ্যালেঞ্জার এই ক্ষেত্রের সামনের দিকটা দখল করে আছে।

ম্যালন বলল, হ্যাঁ, স্যার—তবু আমি কিছুটা আশা করি।

মপুই সহসা আগ্রহের সঙ্গে বললেন, চুপ

সমস্ত ঘরখানা মৃত্যুর মতো স্তব্ধ হয়ে উঠল। তারপরই একটা পাখির পাখা নাড়ার মতো শব্দ হলো। ভীতবিহ্বল এক দর্শক ফিস ফিস করে বলল, একটা পাখি।

তারপর আবার সব চুপ হয়ে গেল। সহসা আবার এক পাখির ডানার শব্দ হল।

মনে হলো পাখির মতো একটা জীব যেন পাখা নেড়ে উড়ে যাবার চেষ্টা করছে।

ড. মপুই বললেন, তুমি কি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রেনি?

সম্পূৰ্ণ প্ৰস্তুত।

তাহলে তোমার ক্যামেরার কাজ শুরু কর।

হঠাৎ ক্যামেরার শাটার থেকে এক ঝলক আলো বেরিয়ে এল। সেই আলোর ঝলকানিতে দর্শকরা এক অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পেল।

মিডিয়াম তার হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। তাকে অচেতন বলেই মনে হচ্ছিল। তার কাঁধের উপর একটা বড় শিকারী পাখি বসে ছিল। সেটা ছিল একটা ঈগল বা বাজপাখি। এই অদ্ভুত দৃশ্যটা মুদ্রিত হয়ে গেল দর্শকদের মনে। আবার অন্ধকারে ঘন হয়ে উঠল ঘরখানা। কেবল দুটো লাল বাতি জ্বলতে লাগল। মনে হলো যেন একটা দানব ঘরের এক কোণে তার রক্তলাল দৃষ্টি মেলে বসে আছে।

ম্যালন ব্যস্ত হয়ে মেইলিকে বলল, দেখতে পাচ্ছ?

হ্যাঁ, পুকুর থেকে আসা একটা কুমীর।

প্রফেসর রিচেট বললেন, তবে কুমীরটা কোন ক্ষতি করবে না। এর আগে আমরা কিছুক্ষণ ধরে একটা পাখি দেখেছি। পাখিটা তার ডান দিকে ছিল। এরপর আমরা আরও বিপজ্জনক অতিথিকে দেখতে পাব।

এরপর দর্শকরা প্রায় পনের মিনিট ধরে নীরবে বসে রইল। তারপর প্রফেসর রিচেট মেইলির একটা হাত ধরলেন। আপনি কিছুর গন্ধ পাচ্ছেন, মঁসিয়ে মেইলি?

মেইলি বাতাসটা শুঁকে দেখল। তারপর বলল, একটা গন্ধ পাচ্ছি এবং এই গন্ধটা লন্ডন জু-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কুকুর কোথায়?

না, কুকুর নয়। একটু অপেক্ষা করুন।

পশুদের গন্ধটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। অস্পষ্ট আলোর ছটায় ম্যালন দেখল টেবিলের উপর বড় জন্তুর মতো কী একটা মানুষের মতো ঘোরাফেরা করছে। দেখতে বিকৃতদেহ এক মানুষের মতো, মাথাটা সরু, ঘাড়টা ছোট, কান দুটো চওড়া, দেহটা মোটা।

ম্যালন দেখল সেই অদ্ভুত জীবটা ধীর গতিতে চলার পর থেমে গেল। ভয়ে ও বিস্ময়ে দর্শকরা চিৎকার করে উঠল।

ড. মপুই সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, ভীত হবেন না। এটা হচ্ছে পিথিক্যানথ্রোপাস। এটা মোটেই ক্ষতিকারক নয়।

একটা কণ্ঠস্বর চিৎকার করে বলল, এর নখগুলো লম্বা লম্বা। ওই নখগুলো আমার কাঁধের উপর রেখেছিল।

হ্যাঁ, ও আদর করতে চেয়েছিল। ওকে বিরক্ত করো না। আমাদের মতো ওরও অনুভূতি আছে। এখনও ভাল মেজাজে আছে। কিন্তু রেগে গেলে তার ফল খারাপ হতে পারে।

সেই অদ্ভুত প্রাণীটা এবার টেবিলের উপর আবার চলতে শুরু করল। কিছুটা পরে সে টেবিলের একধারে লন্ডন থেকে আসা তিন বন্ধুর পিছনে বসল। তার নিঃশ্বাস ওদের পিঠের উপর ঝরে পড়ছিল। লর্ড রক্সটন একবার বিরক্তিতে চিৎকার করল।

ড. মপুই বললেন, শান্ত হও।

রক্সটন বলল, ও আমার হাত চাটছে।

এক মুহূর্ত পরে ম্যালন অনুভব করল সেই বিকৃতদেহ জন্তুটা রক্সটন ও তার মধ্যে মাথাটা গলিয়ে দিয়েছে। ম্যালন তখন তার বাঁ হাতটা পিছন দিকে বাড়িয়ে দিতেই জন্তুটার গায়ের লোমগুলোতে লাগল। জন্তুটা তখন তার জিব দিয়ে হাতটা চেটে আদর করতে লাগল।

সে চিৎকার করে বলল, ঈশ্বরের নামে জিজ্ঞাসা করছি এটা কী?

মিডিয়ামের মুখ দিয়ে কে যেন বলল, আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে ওর যেন ফটো তোলা না হয়। ক্যামেরার আলো দেখলে ও ক্ষেপে উঠবে। আমরা শুধু বলতে পারি ও হচ্ছে বানরের মতো এক মানুষ অথবা মানুষের মতো বানর। আমরা এর আগে আরও ভাল করে দেখেছি। ওর গা-টা লোমে ঢাকা। মুখটা এক ধরনের বানরের মতো। চোখের ভুরুগুলো সরল রেখার মতো সোজা। হাতগুলো লম্বা।

মেইলি চুপি চুপি বলল, টম লিনডেন এ ধরনের একটা জীবকে আরও ভাল করে দেখিয়েছিল।

মেইলি কথাগুলো খুব নিচুস্বরে বললেও রিচেটের কানে গেল।

রিচেট বললেন, প্রকৃতির সব কিছুই আমাদের জানার বিষয়। আমরা গাছের অবহেলা করে ফুলের শ্রেণীবিন্যাস করতে পারি না।

কিন্তু আপনি স্বীকার করেছেন এটা বিপজ্জনক।

প্রথমে এক্সরে নিয়ে কাজ করা অর্থাৎ বুকের ফটো তোলার ব্যাপারটা ছিল বিপজ্জনক। কত লোক তাদের হাত হারিয়েছে এ কাজে। কিন্তু বিপদটা বুঝতে পারার পর কাজটা সহজ হয়ে যায়। আমরা যদি জগৎকে দেখাতে পারি পিথিক্যানথ্রোপাস নামে এই জীবটা এক অদৃশ্য জগৎ থেকে আমাদের কাছে এসে তার জায়গায় ফিরে যায়। তাহলে সেই জ্ঞানটা এমনই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে যে জন্তুটা যদি তার থাবার ধারালো নখ দিয়ে আমাদের দেহগুলোকে ছিঁড়ে ফেলে তবু আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ এটা আমাদের কর্তব্য।

মেইলি বলল, বিজ্ঞান যে বীরের মতো অনেক বড় কাজ করতে পারে এ কথা কে অস্বীকার করতে পারে! তবু আমি বিজ্ঞানীদের মুখে শুনেছি যখন আমরা পরলোকের প্রেতাত্মাদের সংস্পর্শে আসি, তাদের নিয়ে কাজ করতে যাই তখন আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক যুক্তিকেই বিপন্ন করে তুলি। যদি আমরা দেখি মানবজগতে পার্থিব উন্নতির মতো আত্মিক উন্নতির ব্যাপারে তাদের সাহায্য করতে পারব তাহলে হয় আমরা যুক্তি না-হয় আমরা জীবনকে বলি দেব।

আবার আলো জ্বলে উঠল। বিশ্রামের জন্য কিছুক্ষণ বিরতি দেওয়া হলো। এরপর আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে ঘরে উপস্থিত দর্শকরা ছোট ছোট কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে আজকের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে চাপা গলায় আহ্লাদ করতে লাগল। আলোকিত ঘরের আধুনিক যন্ত্রপাতির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল একটু আগে স্বপ্নালোকিত ঘরে ছায়া-ছায়া অন্ধকারে দেখা সেই ঈগলের মতো বড় পাখিটা অথবা সেই ভয়ঙ্কর জন্তুটা স্বপ্নের মতোই অলীক। তথাপি তারা ছিল একেবারে বাস্তব। ফটোগ্রাফারের ছবি দেখে তা বেশ বোঝা যায় ফটোগ্রাফারকে প্রথমে ছবি তুলতে নিষেধ করলেও পরে পাশের ঘর থেকে ছবি তুলতে অনুমতি দেওয়া হয়।

মিডিয়াম তার টাকওয়ালা মাথাটা তার দুটো হাতের মধ্যে ধরে রেখে তখনও আধশোয়া অবস্থায় ছিল। এমন সময় ড. মপুই আনন্দে তাঁর মোটা ছোট হাত দুটো ঘষতে লাগলেন। যে কোনও ক্ষেত্রের অন্যান্য অগ্রণীদের মতো ড. মপুইকেও প্যারিসের সংবাদপত্রগুলোর পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে।

মিডিয়াম উঠে বসল, তার সামনে কিছু বিস্কুট ও এক পাত্র মদ রাখা ছিল। ম্যালন তার কাছে এগিয়ে গেল। সে দেখল মিডিয়াম জাতিতে ফরাসী হলেও আগে আমেরিকায় ছিল এবং কিছু ইংরাজী ভাষা জানে।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ক্লান্ত? এই ঘটনাটা কি আপনার উপর কোনও চাপ সৃষ্টি করেছে?

মিডিয়াম উত্তর করল, না। এমন কিছু না। সপ্তাহে দুটো করে অধিবেশনে আমায় কাজ করতে হয়। আমি সামান্য একটা বৃত্তি পাই। ড. মপুই এর চেয়ে বেশি দেবেন না।

আপনার কি কোনও ঘটনার কথা মনে আছে? ম্যালন জিজ্ঞাসা করল।

এখানে-সেখানে লাভ করা অভিজ্ঞতাগুলো আমার তো স্বপ্নের মতো মনে হয়।

এক অলৌকিক শক্তি কি সব সময় আপনার উপর ভর করে থাকে?

হ্যাঁ হ্যাঁ, শৈশব থেকেই এটা হয়ে আসছে। আমার বাবা-মা অনেক কল্পলোকের কথা বলত, আমার মন এমনভাবে তৈরি হয়ে উঠেছে যে একা যে কোনও বনে গিয়ে বসলে আমার চারদিকে বনের সব জন্তুরা এসে বসবে। ছোটবেলায় যখন দেখতাম অন্যান্য শিশুরা আমার মতো নয় তখন আমি আশ্চর্য হয়ে যেতাম।

ড. মপুই দস্তার বালতির কাছে গিয়ে এক স্পিরিটের বাতি জ্বালালেন, বললেন, হে ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সকলকে এই পরীক্ষাকার্যে সহযোগিতা করতে হবে আমাদের। আপনারা দেখবেন, আমাদের পরিকল্পনা যদি ব্যর্থ না হয় তাহলে সমস্ত জগৎ একদিন এগিয়ে এসে আমাদের কাজ দেখবে এবং আমাদের দেখানো প্রেত-মূর্তিগুলো দেখবে। সেই সব মূর্তির আকার সম্বন্ধে অনেকের সংশয় থাকলেও আমাদের উদ্দেশ্য একই। আমাদের কাজের গুরুত্ব ম্লান হবে না।

ড. মপুই এবার দুটো বালতির একটিকে ধরে বললেন, প্রথমে আমি আপনাদের কাছে এই দুটি বালতির গুরুত্বের কথা ব্যাখ্যা করব। প্রথমে এই বালতিটি আমি গরম করছি। তাতে আছে মোম যা এখন গলতে শুরু করেছে। অন্য বালতিতে আছে জল। যাঁরা আগে কোনওদিন আমাদের এই ধরনের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না তাঁদের বোঝা উচিৎ প্যানবেক-এর প্রেতচর্চার প্রদর্শনী প্রত্যেকবার এইভাবেই ঘটে। আজকের এই সন্ধ্যায় এই মঞ্চে আমরা এক বৃদ্ধের প্রেতকে আশা করছি। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি এবং আশা করছি আমরা তাকে আমাদের প্রেততত্ত্ব গবেষণার ইতিহাসে অমর করে তুলব। আমি আমার আসনে পুনরায় বসছি এবং বসার আগে তিন নম্বর লাল বাতিটা জ্বেলে দিচ্ছি। তাতে করে আরো স্পষ্ট সবকিছু দেখা যাবে।

ঘরের মধ্যে টেবিলের ধারে চক্রাকারে বসে থাকা দর্শকদের দেখা যাচ্ছিল। মিডিয়াম সামনের দিকে ঝুঁকে বসে ছিল এবং নাক ডাকছিল। তার থেকে বোঝা যাচ্ছিল সে আগেই ধ্যান-সমাধিস্থ হয়ে পড়েছে। সকলের দৃষ্টি মিডিয়ামের উপর নিবদ্ধ হলো। কারণ এখানে প্রেতাত্মাদের বিচিত্র আকারে মূর্ত করে তোলার পদ্ধতি বড় আশ্চর্যজনক। প্রথমে একঝলক আলো দেখা দিল তাদের সামনে। তারপর একরাশ বাষ্প জমে উঠল মিডিয়ামের মাথার চারদিকে। এবার তার পিছনে একটা কাপড়ের আঁচল দেখা গেল, ক্রমে সেটা ঘন ও শক্ত হয়ে উঠল। ক্রমে তা একটা নির্দিষ্ট আকার ধারণ করল। প্রথমে মানুষের একটা মাথা দেখা দিল। এরপর দুটো হাত কাঁধ থেকে বেরিয়ে এল। এইভাবে ক্রমে ক্রমে একটা মানুষের মূর্তি গড়ে উঠল। তাতে কোন সংশয় রইল না। দেখা গেল সেটা একটা বৃদ্ধ লোকের মূর্তি। একটা চেয়ারের পেছনে মূর্তিটা দাঁড়িয়ে ছিল। সে এদিক- সেদিক তাকাচ্ছিল। তার হাবভাব দেখে মনে হলো সে বলতে চাইছে—আমি কোথায়? আমি কি জন্য এখানে এসেছি?

ড. মপুই বললেন, ও কথা বলতে পারে না, কিন্তু অপরের কথা শুনতে পায়। ওর বুদ্ধি আছে।

ড. মপুই এবার সেই প্রেতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, স্যার, আপনি এখানে আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকার্যে সহায়তা করার জন্য এসেছেন। আমরা কি আপনার সহযোগিতা আশা করতে পারি?

প্রেতমূর্তিটি সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথাটা নত করল।

ধন্যবাদ। যখন আপনি পূর্ণশক্তি অর্জন করবেন, তখন আমাদের সাহায্য করবেন। এখন আপনি মিডিয়ামের কাছ থেকে সরে যান।

প্রেতমূর্তি আবার মাথা নত করল, তারপর স্থির নিশ্চল হয়ে পড়ল। ম্যালন লক্ষ্য করল মূর্তিটা প্রতিমুহূর্তে আরও ঘন হয়ে উঠছে। সে তার মুখখানা চকিতে একবার দেখল। দেখল সেটা সত্যিই এক বৃদ্ধের মুখ। মুখখানা ভারী। লম্বা নাক। নিচের দিকের ঠোঁটটা বড় অদ্ভুত। সেটা বাইরে কিছুটা বেরিয়ে আছে। সহসা মূর্তি ব্যস্তভাবে প্যানবেকের কাছ থেকে সরে গিয়ে ঘরের ভিতর চলে এল।

ড. মপুই এবার বললেন, এখন আমি আপনাকে অনুরোধ করছি স্যার, আপনি বাঁদিকে যে বালতিটা দেখছেন, এগিয়ে গিয়ে সেই বালতির মধ্যে ডান হাতটা ডুবিয়ে দিন।

প্রেতমূর্তিটি এগিয়ে গেল। তারপর ড. মপুই-এর নির্দেশ মতো সেই বালতির মধ্যে হাতটা ডুবিয়ে দিল।

ড. মপুই উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা কণ্ঠস্বরে বললেন, চমৎকার। এবার স্যার, আমি বলছি আপনার হাতটা পাশের বালতিতে রাখা ঠাণ্ডা জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিন।

প্রেতমূর্তি তাই করল।

এবার স্যার আমাদের পরীক্ষাকার্য আপনার সহায়তায় পূর্ণ সাফল্যলাভ করবে যদি আপনি আপনার হাতটা টেবিলের উপর রাখেন এবং ধীরে ধীরে নিজের দেহটা বিলোপ সাধন করে আবার মিডিয়ামের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করেন।

প্রেতমূর্তি কথাটা বুঝতে পারল এবং সম্মতিসূচকভাবে মাথা নত করল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের কাছে থামল। তারপর হাতটা বাড়িয়ে টেবিলের উপর রেখে সকলের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। মিডিয়ামের শ্বাস- প্রশ্বাসের ভারী শব্দটা থেমে গেল। সে অস্বস্তির সঙ্গে নাড়াচড়া করতে লাগল। মনে হলো সে যেন সম্পূর্ণরূপে জেগে উঠতে চাইছে। ড. মপুই এবার সাদা আলোটা জ্বেলে দিয়ে আনন্দে বিস্ময়ে হাত তুলে চিৎকার করে উঠলেন। সেই চিৎকার ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল দর্শকদের মধ্যে। চকচকে কাঠের টেবিলটার উপর যেখানে সেই বৃদ্ধের প্রেতটা হাতটা রেখেছিল সেখানে গলিত মোমের একটা হলুদ দাগ ছিল। মোপুই তখন সেই মোম-এর একটু টুকরো ভেঙে তার এক সহকারীর হাতে দিলেন। সহকারী সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ড. মপুই চিৎকার করে বললেন, এটাই হলো চূড়ান্ত পরীক্ষা। এবার তারা কী বলবে? ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা যে ঘটনা দেখলেন, তার কী ব্যাখ্যা করবেন? একটি প্রেত বালতি থেকে গলিত মোম এনে টেবিলে রেখে অদৃশ্য হয়ে গেল। এটা কি সেই প্রেতের বাস্তবরূপ ধারণের স্বপক্ষে যথেষ্ঠ যুক্তি নয়?

রিচেট বলল, এর আমি অন্য কোন ব্যাখ্যা দেখছি না। তবে কিছু একগুঁয়ে ও বিদ্বেষভাবাপন্ন লোক আছে—যারা এ ঘটনাটা অস্বীকার করবে না আবার পুরোপুরি মেনেও নেবে না।

ড. মপুই আরও বলতে লাগলেন, এখানে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা আছেন। সাংবাদিকরাই জনসাধারণের প্রতিনিধি। এখানে একজন ইংরেজ সাংবাদিকও আছেন। মি. ম্যালন আপনি কি বলেন?

ম্যালন বলল, আমি কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।

এরপর ড. মপুই মতিন পত্রিকার প্রতিনিধিকে বললেন, আর আপনি?

ফরাসী সাংবাদিক বললেন, আমরা যারা সকলে এখানে উপস্থিত রয়েছি, সকলেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। তবে আপনাদের কিছু আপত্তির সম্মুখীন হতে হবেই। সাধারণ লোক বলবে এটা মিডিয়ামেরই কলা-কৌশল।

ড. মপুই বিজয়গর্বে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন। এমন সময় তাঁর সহকারী পাশের ঘর থেকে একটুকরো কাগজ এনে তাঁর হাতে দিল।

তিনি তখন হাত তুলে কাগজটা দেখিয়ে বলে উঠলেন, আপনাদের সম্ভাব্য আপত্তি উত্তর পাওয়া গেছে। আমি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম তাই দস্তার বালতিতে গলিত মোমের সঙ্গে কিছু কলেস্টারিন আছে। আপনারা দেখেছেন আমি টেবিলের উপর থেকে শক্ত হয়ে যাওয়া মোম থেকে একটা টুকরো নিয়ে পাশের ঘরে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পরীক্ষা করে দেখা গেছে কলেস্টারিন পাওয়া গেছে।

ফরাসী সাংবাদিক বললেন, চমৎকার! আপনি শেষ ছিদ্রটাও বন্ধ করে দিয়েছেন। এরপর আর কি আছে?

ড. মপুই বললেন, আমরা যা একবার করেছি, তা আবার করতে পারি। এবার আমরা গলানো মোম দিয়ে কতগুলো ছাঁচ তৈরি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীগুলোতে পাঠিয়ে দেব—যাতে বিভিন্ন দেশের লোকেরা আমাদের পরীক্ষাকর্যের সত্যতার কথাটা বুঝতে পারে। যাতে এ বিষয়ে তাদের কোন সংশয় না থাকে। ব্যাপারটা সূক্ষ্ম ও জটিল। কিন্তু এটা করা যায়।

রিচেট অত্যুৎসাহী মপুইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, খুব বেশি আশা করবেন না।

মেইলি বলল, আমাদের অগ্রগতিকে মাঝে মাঝে নিয়ন্ত্রিত করতে হয়। আমাদের কথা যাতে লোকে বুঝতে পারে তার জন্য তাদের চিন্তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়।

রিচেট মৃদু হেসে ঘাড় নাড়লেন। তারপর বললেন, মঁসিয়ে মেইলি ঊর্ধ্ব- জগতের লোক। উনি যা কিছু চোখে দেখেন তার থেকে অনেক বেশি কিছু মনশ্চক্ষুতে দেখেন। উনি বিজ্ঞানকে দর্শনে পরিণত করেছেন। এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি যুক্তিপূর্ণ?

মেইলি বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে বলল, প্রফেসর রিচেট, যে-প্রশ্ন আগে আমাদের করা হয়েছিল এখন আমি সেই প্রশ্ন আপনাকে করব। আপনারা প্রতিভার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে এবং আপনার নিখুঁত কর্মনৈপুণ্যের প্রতিও সহানুভূতি আছে। আপনি যে অবস্থায় এখন এসে পড়েছেন তাতে আপনাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে এক বুদ্ধিমান প্রেত মানুষের আকার ধারণ করে (যাকে এক্টোপ্লাজম নামে কথিত বস্তু থেকে রূপ দান করা হয়) ঘরের মধ্যে চলাফেরা করে এবং নানা নির্দেশ পালন করে। তখন মিডিয়াম আমাদের চেখের সামনে শুয়ে থাকে। তবু আপনি এ কথা ঘোষণা করতে ইতস্তত করছেন প্রেতাত্মাদের একটা স্বতন্ত্ৰ অস্তিত্ব আছে। এটা কি যুক্তিসঙ্গত?

রিচেট এ কথার উত্তর না দিয়ে মৃদু হেসে ঘাড় নাড়লেন। তারপর তিনি ড. মপুইকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর কাছে বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিট পরেই অধিবেশন ভঙ্গ হলো। আমাদের অতিথিরা সভাগৃহ থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিযোগে দ্রুতবেগে হোটেলে চলে গেল। ম্যালন আজ সন্ধ্যায় যা যা দেখেছে তাতে সে মুগ্ধ হয়ে গেছে। সে অর্ধেক রাত পর্যন্ত বসে তার অভিজ্ঞতার কথাগুলোকে সংবাদ হিসাবে সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছিল। সে তার সংবাদের সঙ্গে সেই সব সম্মানিত লোকের নাম জড়িয়ে দিচ্ছিল, যারা ঘটনাগুলোকে সমর্থন করেছে, যাদের কাছে নির্বুদ্ধিতা বা প্রতারণার কোন স্থান নেই।

সে স্বপ্ন দেখছিল এটা যেন এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণ। দু’দিন পর ম্যালন লন্ডন ডেইলি পত্রিকার পাতাগুলো একটার পর একটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্রতিটি পাতার প্রতিটা স্তরের বিষয়বস্তুগুলো ভাল করে দেখল। এরপর সে টাইমস পত্রিকার পাতাগুলো ভাল করে খুঁটিয়ে দেখল। কিন্তু সে রাতে সেই প্রেতচর্চা অধিবেশনে যে আশ্চর্য ঘটনাসমূহের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল সে সম্বন্ধে কোন খবরই নেই। ম্যালন তার বিষণ্ন মুখকে নিজেই উপহাস করতে লাগল।

সে নিজের মনে বলল, সমস্ত জগৎটা যেন পাগল হয়ে গেছে। বিকৃতমস্তিষ্ক হয়ে গেছে। তবে জগতের এখানেই তো শেষ নয়।