হারানো জগৎ – ৬

অধ্যায় ৬

লর্ড জন রক্সটন ও আমি একসঙ্গে ভিগো স্ট্রীট ধরে এগিয়ে বিখ্যাত অভিজাত গণিকাপল্লীর ঘিঞ্জি পথ ধরে এগোতে লাগলাম। একটা লম্বা বারান্দা পেরিয়ে আমার সদ্যপরিচিত বন্ধুটি একটা দরজা ঠেলে বৈদ্যুতিক সুইচটা ঘুরিয়ে দিলেন। অনেকগুলি বাতি একসঙ্গে জ্বলে উঠে মস্তবড় ঘরটাকে রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত করে দিল। দরজায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়েই আরাম ও সুরুচিসম্মত একটা পৌরুষময় আবহাওয়ার পরিচয় পেলাম। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বিলাসী ধনীর রুচি এবং অবিবাহিতের যত্নহীন অপরিচ্ছন্নতার স্পষ্ট আভাস। মেঝের উপর ছড়িয়ে আছে কোনও প্রাচ্য বাজার থেকে কেনা দামী লোমের কম্বল ও ইন্দ্রধনু রংয়ের মাদুর। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে নানা ছবি ও প্রিন্ট; আমার অনভ্যস্ত চোখেও বুঝতে ভুল হলো না ছবিগুলো খুব দামি ও দুষ্প্রাপ্য। অনেক মুষ্টিযোদ্ধা, নাচিয়ে মেয়ে এবং দৌড়ের ঘোড়ার ছবিও ঘরে টাঙানো রয়েছে। ঘরের মধ্যে ইতস্তত ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রাখা নানা বিজয়-স্মারক ও ট্রফি দেখে আমার মনে পড়ে গেল যে লর্ড জন রক্সটন একজন নাম-করা ক্রীড়াবিদ। দেয়াল থেকে মুখ বের করে আছে অনেক শিকার-করা জন্তুর মাথা; পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সেগুলো সংগৃহীত হয়েছে; তাদের মধ্যেই দেখতে পেলাম লাডো এনক্লেভের বিরল শ্বেত-গণ্ডারের মুখ।

ইঙ্গিতে একটা হাতল-চেয়ার দেখিয়ে, কিছু ভোজ্য-পানীয় আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি একটা লম্বা হাভানা চুরুট আমার হাতে দিলেন। তারপর আমার মুখোমুখি বসে মিট্‌মিটে উদ্ভ্রান্ত চোখে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। চোখ দুটি হাল্কা নীল, যেন দুটি বরফ-ঢাকা হ্রদ।

অনেক ফটোগ্রাফে লোকটির মুখ আগেও দেখেছি; এখন চুরুটের পাতলা ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে মুখখানি খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম—বাঁকা নাক, গর্তে-বসা শুকনো গাল, কালো লালচে চুল, কোঁকড়ানো গোঁফ, থুতনিতে একগুচ্ছ লোম মাথা খাড়া করে আছে। কিছুটা তৃতীয় নেপোলিয়নের মতো, কিছুটা ডন ক্যুইক্সোটের মতো, অথচ যে কোনও গ্রামীণ ইংরেজ ভদ্রলোকের সব বৈশিষ্ট্যই তাঁর মধ্যে রয়েছে। রোদ-বাতাসে গায়ের রং মেটে-লাল। মোটা ভুরু চোখের উপর ঝুলে পড়ায় চোখ দুটোতে একটা হিংস্র ভাব ফুটে উঠেছে। শরীর বেশ শক্ত-সমর্থ—এ সত্য অনেকবারই প্রমাণিত হয়েছে যে সারা ইংলন্ডে তার মতো দীর্ঘ পরিশ্রমকারী মানুষ খুব অল্পই আছে। উচ্চতা ছ’ ফুটের একটু বেশি হলেও অদ্ভুত গোলাকার কাঁধের জন্য তাঁকে কিছুটা ছোটই দেখায়।

অবশেষে তিনি বলে উঠলেন, “দেখ ইয়ং ফেলা মাই ল্যাড, আমরা তো ফেঁসেই গেছি।” (অদ্ভুত বাক্যাংশটিকে তিনি উচ্চারণ করলেন একটি যুক্ত-শব্দের মতো—ইয়ং-ফেলা-মাই-ল্যাড।) সত্যি, দু’জনই মস্ত ঝুঁকি নিয়েছি। আমার তো মনে হয়, ওখানে ঢোকবার সময় এ রকম কোনও কল্পনা আপনার মাথায়ই ছিল না—কি বলেন?”

“কখনও ভাবিওনি।”

এখানেও তাই। কখনও মাথায়ই আসেনি। অথচ এখন আমরা এক-গলা জলে। আরে, আমি তো সবে তিন সপ্তাহ হলো উগান্ডা থেকে ফিরেছি, স্কটল্যান্ডে একটা জমি নিয়েছি, লীজ সই হয়েও গেছে। ভালই তো ছিলাম। তা আপনার কি রকম মনে হচ্ছে?”

“দেখুন, এটা তো আমার কাজেরই অঙ্গ। আমি ‘গেজেট’-এর একজন সাংবাদিক।”

“ঠিক, ঠিক, কাজটা নেবার সময়ই তো সে কথা আপনি বলেছেন। ভাল কথা, বন্দুক চালাতে জানেন?”

“মোটামুটি।”

“হা ভগবান! তাতে কি হবে? আজকালকার ছোকরারা এ কাজটাই ভাল করে শিখতে চায় না। আপনারা সবই হুলবিহীন মৌমাছি। আরে বাপু, দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে তো খাড়া পায় বন্দুক চালাতে হবে। আমাদের বন্ধু প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যদি পাগল বা মিথ্যাবাদী না হন তো ফিরে আসার আগে অনেক বিচিত্র জীবরে সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটতে পারে। আপনার বন্দুকটা কেমন?”

একটা ওক-কাঠের কাবার্ডের কাছে গিয়ে তিনি সেটাকে খুলে ফেললেন; অর্গ্যানের পাইপের মতো সার সার বন্দুকের নল চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে উঠল।

“আমার ভাণ্ডার থেকে আপনাকে কোনটা দিতে পারি তাই দেখছি”, তিনি বললেন।

একটার পর একটা সুন্দর সুন্দর রাইফেল বের করলেন, সশব্দে নল ভাঙলেন, বন্ধ করলেন, তারপর মা যে রকম আদর করে ছোট ছেলের গায়ে হাত বুলোয় সেই ভাবে পরম যত্নে সেগুলিকে আবার তাকে রেখে দিলেন।

“এটা হচ্ছে ব্ল‍্যান্ড্স .৫৭৭ এক্সপ্রেস। এটা দিয়েই তো ওই মশায়কে কাৎ‍ করেছিলাম।” তিনি চোখ তুলে শ্বেত-গণ্ডারের দিকে তাকালেন। “না, এটা আপনার চলবে না। আপনি বরং এটা নিন।” একটা বন্দুক আমার হাতে দিয়ে কাবার্ড বন্ধ করতে করতে বললেন, “কুঁদোয় রবার লাগানো আছে, শিকার দেখার ব্যবস্থাও ভাল, পাঁচটা কার্তুজ আছে। নিজের জীবনের জন্য এটার উপর ভরসা করতে পারেন।” আবার এসে চেয়ারে বসে শুধালেন, “আচ্ছা, এই প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সম্পর্কে আপনি কি জানেন?”

“আজকের আগে কখনও তাঁকে দেখিনি।”

“আমিও না। একটা অজানা মানুষের সিল-করা নির্দেশ দিয়ে আমরা জাহাজ ভাসাব—এটা ভাবতেও কেমন অবাক লাগে। লোকটিকে অহংকারী বলে মনে হলো। বিজ্ঞান জগতের কেউই তাঁকে ভাল চোখে দেখে বলেও মনে হলো না।”

আরও কিছু কথার পরে লর্ড রক্সটন দক্ষিণ আমেরিকার একখানা মানচিত্র বের করে টেবিলের উপর মেলে ধরলেন। তারপর আন্তরিকতার সঙ্গে বলতে লাগলেন, “তাঁর প্রতিটি কথাই আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি। দক্ষিণ আমেরিকাকে আমি ভালবাসি। ডারিয়েন থেকে ফুয়েগো পর্যন্ত যদি সোজা চলে যান তাহলেই দেখতে পাবেন পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর, সব চাইতে সম্পদশালী ও সব চাইতে আশ্চর্য এক দেশ। মানুষ এখনও সে দেশকে জানে না, সে যে কি হয়ে উঠতে পারে তাও বোঝে না। আমি সে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়িয়েছি, দুটো গরমকাল সেখানে কাটিয়েছি, অনেক রকম গাল-গল্পও শুনেছি। তার পিছনে নিশ্চয় সত্য কিছু আছে। সে দেশকে যত জানবেন ইয়ং-ফেলা-মাই- ল্যাড, ততই বুঝতে পারবেন যে সেখানে সবই সম্ভব—সব কিছু। প্রায় ইওরোপের আকারের একটা জঙ্গলেই আছে পঞ্চাশ হাজার মাইল জল-পথ। আপনি আর আমি ব্রাজিলের একটা বড় জঙ্গলে বাস করলেও দু’জনের মধ্যে দূরত্ব হতে পারে স্কটল্যান্ড থেকে কনস্টান্টিনোপ্‌ল পর্যন্ত। মানুষ তো সবে সে দেশের দু’এক টুকরো জায়গার সন্ধান জেনেছে। অর্ধেকটা দেশ তো এখনও এমন জলাভূমি যে আপনি সেটাকে পার হতেই পারবেন না। এমন দেশে নতুন ও আশ্চর্য কিছুর দেখা মিলবে না কেন? আর কেনই বা আমরা তার আবিষ্কর্তা হব না?” অনাগত সম্ভাবনার খুশি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মুখে।

কিন্তু নবপরিচিত লোকটি সম্পর্কে হয়তো বড় বেশি বলে ফেলেছি। কিন্তু তার সঙ্গে যে আমাকে অনেকগুলো দিন কাটাতে হবে, তাই তাকে ভাল করে জেনে-বুঝে নিতে চেষ্টা করলাম। যখন চলে এলাম তখনও একটা গোলাপি আলোর মধ্যে তিনি বসে ছিলেন, প্রিয় রাইফেলটির কল-কব্জায় তেল ঢালছেন; আসন্ন অভিযানের স্বপ্নে মুখে খুশির হাসি। একটা কথা অন্তত পরিষ্কার বুঝেছি যে আমাদের সামনে যদি কোনও বিপদ ওৎ পেতে থাকেই থাকে তাহলেও সে বিপদের অংশীদাররূপে এর চাইতে ঠাণ্ডা মাথা ও সাহসী মনের আর একটি মানুষ আমি সারা ইংলন্ডে খুঁজে পাব না।

আমার ধৈর্যশীল পাঠক-পাঠিকা, এখন থেকে আর আমি সরাসরি আপনাদের কোনও কথা শোনাতে পারব না। এখন থেকে যা কিছু জানাবার তা আপনারা জানতে পারবেন আমার সংবাদপত্রের মারফৎ। সর্বকালের একান্ত উল্লেখযোগ্য একটি অভিযানের প্রাক-বিবরণী আমি দিয়ে যাচ্ছি সম্পাদকের হাতে। ফলে আমি যদি কোনওদিন ইংলন্ডে ফিরে না আসি তবু একটা বিবরণ এখানে থেকেই যাবে। এই কথাগুলি আমি লিখছি “ফ্রান্সিস্কা” জাহাজের সেলুনে বসে। জাহাজের চালকের মারফৎ এ লেখা চলে যাবে বার্তা-সম্পাদক ম্যাআর্ডলের কাছে। তবে নোট-বইটা বন্ধ করার আগে যে পরিচিত দেশটার শেষ স্মৃতিটুকু নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি তার একটা শেষ রূপ-রেখা এঁকে যেতে চাই। শেষ বসন্তের একটি স্যাঁতসেঁতে কুয়াশাঢাকা সকাল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ম্যাকিন্টোসে ঢাকা তিনটি প্রাণী জাহাজ-ঘাটা ধরে এগিয়ে চলেছে। ট্রাংক, বিছানা ও বন্দুকের বাক্স বোঝাই একটা ট্রলিকে ঠেলতে ঠেলতে আগে আগে চলেছে একটি কুলি। প্রফেসর সামারলীর দীর্ঘ বিষণ্ন মূর্তি মাথা নুইয়ে পা টেনে টেনে চলেছে; যেন নিজের দুঃখের নিজেই আনত-দেহ। লর্ড জন রক্সটনের পদক্ষেপ দ্রুততর; শিকারী টুপি ও মাফলারের ফাঁকে তার সাগ্রহ মুখখানি জ্বলজ্বল করছে। সারাদিনের কাজকর্ম ও বিদায়-গ্রহণের পালা শেষ করে আমিও চলেছি খুশিমনে। হঠাৎ জাহাজে উঠবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পিছনে একটা চিৎকার শুনতে পেলাম। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। আমাদের তুলে দিতে এসেছেন; হাঁসফাঁস করতে করতে ছুটে আসছেন। মুখটা লাল; খিটখিটে চেহারা।

বললেন, “না, ধন্যবাদ; আমি জাহাজে উঠব না। যা বলার এখান থেকেই বলব। আমি বলতে এসেছি, আপনাদের এই অভিযানের ব্যাপারে আমার কিছুমাত্র ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব নেই। সত্য যা তা সত্য; আপনাদের প্রতিবেদন তার কোনও হেরফের ঘটাতে পারবে না। আমার যা কিছু নির্দেশ ও পরামর্শ সব এই সিল-করা খামটাতে আছে। আমাজন নদীর তীরবর্তী মানাওস শহরে পৌঁছে তবে এটা খুলবেন; তাও খামের উপরে যে তারিখ ও সময় লেখা আছে তার আগে নয়। তাহলে ঐ কথাই রইল। সব কিছু গোপন রাখার ব্যাপারটা আপনাদের মর্যাদাবোধের উপরেই ছেড়ে দিলাম। না, মি. ম্যালোন, আপনার চিঠিপত্র লেখার উপরে আমি কোনও বিধি-নিষেধ আরোপ করছি না, কারণ প্রকৃত তথ্য প্রকাশ‍ই আপনার এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য। কিন্তু আমি চাই, সঠিক গন্তব্যস্থলের কোনও বিবরণ আপনি দেবেন না, এবং ফিরে না আসা পর্যন্ত কোন কিছু সংবাদপত্রে প্রকাশ করবেন না। বিদায়। বিদায় লর্ড জন। আমি জানি, বিজ্ঞান আপনাদের কাছে সিল-করা পুঁথি; কিন্তু যে শিকার-ক্ষেত্র আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে সেজন্য আপনারা নিজেদের অভিনন্দিত করতে পারেন। আর অধ্যাপক সামারলী, আপনাকেও বিদায়-সম্ভাষণ জানাই। নিজেকে যদি আর একটু তুলে ধরতে পারেন, তাহলে অধিকতর জ্ঞানী মানুষ হয়েই লন্ডনে ফিরতে পারবেন।”

বলেই তিনি পা চালিয়ে দিলেন। এক মিনিট পরে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে দেখলাম, ছোটখাট মানুষটি ট্রেনের দিকে এগিয়ে চলেছেন আর আমরা চলেছি চ্যানেলের বুকে। ঐ তো শেষ ঘণ্টা বাজল; ওটা জাহাজের নাবিকের কাছ থেকে বিদায় নেবার সংকেত। এবার আমাদের যাত্রা হলো শুরু। যাদের পিছনে ফেলে গেলাম, ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন, আর আমাদের ফিরিয়ে আনুন নিরাপদে।