একটি সন্ধ্যার বর্ণনা

একটি সন্ধ্যার বর্ণনা

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কন্যা এনিড ও ম্যালনের প্রেমের ব্যাপারের সম্বন্ধে পাঠকদের কোনও আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ এতে লেখকের নিজেরও কোনও আগ্রহ নেই।

মানব-জগতে সকল যুবক-যুবতীর মধ্যে সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে প্রেমের শিশু জন্ম নেয়। এটা এক সাধার ব্যাপার, আমি এ কাহিনিতে এমন এক বিষয়ের কথা আলোচনা করছি যা সাধারণের মধ্যে বিশেষ ঘটে না এবং যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা এই কারণেই উল্লেখ করা হলো যে, এই কাহিনিতে ক্রমান্বয়ে দেখা যাবে দু’জনের মধ্যে এক প্রাণখোলা ভাব ও এক অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে কীভাবে গড়ে উঠেছে। ইংল্যান্ড ও আয়ার্লান্ডের দেশগুলোতে মানবজাতির অন্তত একটা বিষয়ে উন্নতি হয়েছে। সেটা হলো এই যে, সেখানকার নরনারীরা অতীতের ভালবাসাবাসিকে কেন্দ্র করে যে প্রতারণার জাল বিস্তৃত হতো তার থেকে মুক্ত হয়েছে। আজকের যুবক-যুবতীরা সমান মর্যাদা ও সততার সঙ্গে প্রাণখোলা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। সেদিন সন্ধ্যায় পূর্বোক্ত অভিযানকারীদের নিয়ে একটি ট্যাক্সি এডগার রোড দিয়ে গিয়ে হেলবেক ট্রেরাস-এর রাস্তার ধারে একটি লাল ইঁটের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। বাড়ির ভিতর থেকে তখন জানলা দিয়ে এক ঝলক আলো এসে বাইরে পড়েছে।

এটা হলো পরলোকতত্ত্ববাদীদের চার্চ।

ম্যালন হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, আজকাল লোকে এই পর্যন্তই অগ্রসর হয়েছে।

আমরাও এই পর্যন্তই এগিয়েছি।

এনিড বলল, হ্যাঁ, আমরা এ বিষয়ে আমাদের কাজ দেখানোর জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু যদি ভিতরে ঢুকতে না পাই, তাহলে আমাদের ভাগ্য খারাপ বুঝতে হবে।

সেই লাল ইঁটের বাড়িটার বাইরে দরজার সামনে একদল লোক ভিড় করেছিল। তাদের মধ্যে একজন লোক উপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ম্যালনের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ইশারায় তাদের ফিরে যেতে বলল।

লোকটি এবার বলল, জানি বন্ধু, এটা ভাল কাজ হচ্ছে না। কিন্তু কোনও উপায় নেই। আমরা এখানে ভিড় করে আছি বলে আমাদের আইনে সোপর্দ করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়েছে। কোনও অর্থডক্স চার্চ এই নিয়ে যে কোনও সমস্যায় পড়ে, একথা কখনও শুনিনি।

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন কাতর কণ্ঠে বলল, আমি অ্যামারস্মিথ থেকে এত পথ হেঁটে এসেছি।

তার উদ্বেগাকীর্ণ মুখের উপর আলো পড়েছিল। সে আরও বলল, আমি শিশু কোলে এত পথ হেঁটে এসেছি। কালো পোশাক পরা শিশু কোলে নেওয়া সেই মহিলাই একথা বলল।

চার্চের একজন লোক মহিলার সামনে এসে বলল, আপনি তো এসেছেন অতীন্দ্রিয় দূরের অন্য জগতের এক বস্তুকে প্রত্যক্ষ করতে। আমাকে আপনার নাম ও ঠিকানা দিন। আমি আপনাকে চিঠি লিখে জানাব। এই ভিড়ের মধ্যে আপনার কোনও কাজ হবে না। মিসেস ডেবস বিনা পয়সায় আপনার কাছে বসে আপনার কাজ করে দেবে। এই ভিড়ের মধ্যে বৃথা চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। সে চেষ্টা না করাই ভাল।

এরপর সেই ঘোষক লোকটি ম্যালনের হাত ধরে বলল, সংবাদপত্র আমাদের বয়কট করছে। সাপ্তাহিক স্যাটারডে টাইমসে দেখবেন আমাদের পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে কোনও কথাই লেখেনি। আপনি কোন কাগজের তরফ থেকে এসেছেন?

ম্যালন বলল, ডেলি গেজেটের পক্ষ থেকে এসেছি। আমি আর এই মহিলা দু’জনে এসেছি। আমাদের এক বিশেষ রচনা লিখতে হবে।

লোকটি বলল, ঠিক আছে আমার কাছে কাছে থাকুন, দেখি কি করতে পারি।

জো দরজাটা বন্ধ করে দাও। বিল্ডিং ফান্ডের টাকা কিছু বাড়লে আমাদের ঘরের সংখ্যাও বাড়বে।

এইদিকে আসুন মিস।

সেই পথটা ধরেই তারা বড় রাস্তায় এসে পড়ল, তারপর একটা গলিপথ ধরে একটা দরজার কাছে এসে পড়ল। সেই দরজার উপর একটি লাল বাতি জ্বলছিল।

লোকটি বলল, আপনাদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। হলের ভিতর দাঁড়ানোর জায়গা নেই।

এনিড বলল, হা ভগবান!

লোকটি বলল, আপনি ভালভাবেই দেখতে পাবেন। ভাগ্য ভাল হলে আপনাদের জ্ঞাতব্য তথ্য সব পেয়ে যাবেন। যারা মিডিয়ামের খুব কাছে থাকে তারাই দেখাশুনার বেশি সুযোগ পায়। এটাই সাধারণত ঘটে থাকে।

লোকটি এবার ম্যালনকে বলল, এদিকে আসুন স্যার। লোকটি ওদের যে ঘরে ডাকল, সে ঘরে অনেকদিন চুনকাম করা হয়নি। সেই ঘরের একদিকে অনেকগুলো টুপি আর ওভারকোট ঝোলানো ছিল। গম্ভীর মুখওয়ালা এক রোগা মহিলা ঘরের মধ্যে জ্বলতে থাকা আগুনে তার শীর্ণ হাত দুটো গরম করছিল। চশমার কাঁচ থেকে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। আগুনের দিকে পিছন ফিরে একজন লম্বা মোটা চেহারার লোক ব্রিটিশদের কায়দায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখখানা ছিল রক্তশূন্য। আর মোচটা ছিল খোঁচাখোঁচা। তার চোখ দুটো ছিল হালকা নীল রঙের গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজের নাবিকদের চোখের মতন। আর্ আরেকজন ছিল ছোটখাট চেহারার টাক মাথাওয়ালা। তার চোখে ছিল একটা চশমা। মোটা ফ্রেমওয়ালা বড় চশমা। ওদের সঙ্গে ছিল সুগঠিত চেহারা ও বলিষ্ঠ চেহারার নীল রঙের পোশাক পরা এক যুবক।

ওদের মধ্যে মোটা লোকটা বলল, মি. পিবল, অন্য লোকেরা বাইরে গিয়ে চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচটা সীট আমাদের জন্য খালি আছে।

পিবল বলে যে লোকটাকে সম্বোধন করা হয়েছিল, সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, আমি জানি। আমি তা জানি।

রোগা রোগা স্নায়বিক দুর্বলতায় ভুগতে থাকা একটা লোক আলোর সামনে এগিয়ে এল। সে ম্যালনের সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের পরিচয় করিয়ে দিল। বলল, মি. বলসোভার, উনি ‘ডেইলি গেজেট’ কাগজের পক্ষ থেকে এসেছেন। ইনি এক বিশেষ তথ্য লিখতে চান। এর নাম ম্যালন। একজন গবেষক। তারপর লোকটি বলসোভারকে দেখিয়ে ম্যালনকে বলল, ইনি হচ্ছেন বলসোভার, আমাদের প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। ইনি হচ্ছেন লিভারপুলের মি. ভেকশ। ইন্দ্রাতীত দূরের বস্তুকে প্রত্যক্ষ করার বিষয়ে এর খ্যাতি ছিল। ইনি হচ্ছেন মি. ডোমস্ আর এই লম্বা ও শক্ত চেহারার যুবকটির নাম মি. হার্ড। ইনি আমাদের উদ্যমশীল কর্মতৎপর সেক্রেটারি। ইনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিল্ডিং ফান্ডের জন্য চাঁদা তোলেন। মি. উইলিয়াম যদি আপনার কাছে আসেন তাহলে আপনার পকেটের দিকে নজর রাখুন। কারণ উনি কিছু না কিছু চাঁদা আদায় না করে ছাড়বেন না।

ওরা সবাই হেসে উঠল, উইলিয়াম হাসি মুখে বলল, চাঁদা আদায়ের কথা পরে হবে।

বলিষ্ঠ চেহারার সভাপতি বললেন, একটি ভাল সাড়া জাগানো রচনা সবচেয়ে বড় চাঁদা আমাদের কাছে।

ম্যালন ঘাড় নেড়ে বলল, না। তা ঠিক নয়। সভাপতি বলসোভার বললেন, আমার মনে হয় আপনি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানেন না।

ম্যালন সঙ্গে সঙ্গে বলল, বিশেষ কিছু জানি না।

বলসোভার বললেন, ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনি প্রথমে এক হাস্যকর দেবদূতকে দেখতে পাবেন। আপনাকে এক হাস্যকর রচনার তথ্য পরিবেশন করব আমরা। একজন এক ব্যক্তির মৃত স্ত্রীর প্রেতাত্মার মধ্যে এমন মজার ব্যাপার কখনও দেখিনি। তবে এটা নির্ভর করে ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপারে। তার সঙ্গে অবশ্য জ্ঞানের কথা জড়িয়ে আছে। যদি তারা এ বিষয়ে কিছু না জানে তবে এ ব্যাপারটাকে এত গুরুত্ব দেয় কেন। আমি তাদের দোষ দিই না। প্রধানত নিজেদের মতো করেই সব জিনিসকে দেখি। আমি হচ্ছি ব্যাড লাকের লোকদের একজন। আমি জোসেফ ম্যাগক্যারের কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় আমার বৃদ্ধ বাবা এসে আমাকে সেখান থেকে জোর করে টেনে নিয়ে গেলেন।

লিভারপুলের মিডিয়াম মিসেস ডেবস বললেন, ভালই হয়েছে তার পক্ষে।

এই সর্বপ্রথম আমি দেখলাম এ বিষয়ে আমার ক্ষমতা আছে। আমি তাকে দেখেছি, ঠিক যেমন তোমাকে দেখছি।

মিডিয়ামকে এই সময় প্রশ্ন করা হলো, তার শরীরটা কি আমাদেরই মতো?

এর বেশি কিছু জানি না।

এরপর তারা বাইরের দরজা দিয়ে এসে ঘরে ঢুকল।

মি. পিবল তাঁর হাতঘড়িটা ভাল করে দেখে নিয়ে বললেন, এখন সময় হয়ে গেছে। মিসেস ডেবস, আপনি কি প্রথমে যাবেন? তারপর যাবেন আমাদের সভাপতি। তারপর যাব আমি। মি. হডি উইলিয়াম, আপনি বাঁ দিকে দাঁড়ান। ওরা সবাই আপনাকে ধরেছে। আপনি এটা করতে পারেন। মঞ্চ আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। নবাগতরা সবাই সামনে আসতে চাইছিল। পিবল সবাইকে অভ্যর্থনা জানাবার পর কিছু উপদেশ দিলেন। সিটের উপর থেকে সমস্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য রাখতে লাগলেন। এই জায়গাটা তাদের পক্ষে খুব ভাল ছিল। তারা সব কিছু লক্ষ্য রাখতে পারছিল। তাদের সামনে জনতার ভিড় থাকলেও তারা তাদের নোট- বইটা ভালভাবে ব্যবহার করতে পারছিল।

এনিড একসময় ম্যালনকে ফিসফিস করে বলল, এ ব্যাপারে তোমার প্রতিক্রিয়া কি ও কি মনে হচ্ছে।

ম্যালন বলল, মুগ্ধ হবার মতো কিছু ঘটেনি।

এনিড বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে, তবে সব মিলিয়ে ব্যাপারটা অসহ্যজনক।

খুব একটা মন্দ লাগছে না। বাইরে থেকে যারা এসেছিল তারা সকলেই ছিল আগ্রহান্বিত ও নিষ্ঠাবান। সেটা ছিল দেখার মতন। তুমি তাদের সঙ্গে একমত না হতে পারলেও তাদের নিষ্ঠায় সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না। সমস্ত হলঘরটা মানুষের ভিড়ে ভরে গিয়েছিল। যেদিকেই তাকানো যায় দেখা যায় সারিবদ্ধ মানুষগুলো সবাই মুখ উঁচু করে একদিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সকলেরই চোখেমুখে কৌতূহলের ছাপ। মেয়েদের সংখ্যাই বেশি, তবে পুরুষরা তাদের কাছ ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সমবেত জনতার মধ্যে কোনও বিশিষ্ট বা বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিল বলে মনে হয় না। তবে যারা ছিল তারা সকলেই ছিল দৃঢ়সংকল্প। সততা, নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা বোধের অভাব ছিল না তাদের মধ্যে। সমবেত জনতার মধ্যে কিছু ছিল ব্যবসায়ী এবং তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ দুটোই ছিল। আর ছিল কিছু দোকান কর্মচারী, কিছু দক্ষ মিস্ত্রি বা হাতের কাজের লোক। আর ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মহিলা। যাদের চোখে-মুখে ছিল সাংসারিক অভাব- অনটন জনিত দুশ্চিন্তার ছাপ। কিছু যুবা এসেছিল উত্তেজনাময় কোনও ঘটনার সন্ধানে। অভিজ্ঞ ম্যালন সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে এইটা বুঝতে পারল।

স্থূলদেহী সভাপতি এবার উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুললেন। তিনি বললেন, বন্ধুগণ, আজ রাতে যারা এখানে আমাদের কাছে থাকতে এসেছেন তাদের অনেককেই বের করে দিতে হবে। সমস্যাটা হচ্ছে স্থান সঙ্কুলানের। আমাদের বিল্ডিং ফান্ডের অভাবে আমরা ঘর বাড়াতে পারছি না। আমার বাঁদিকে মি. উইলিয়াম বসে আছে। আপনাদের মধ্যে কারও কিছু বলার থাকলে তিনি সানন্দে তা শুনবেন। গত সপ্তায় একটা হোটেলে আমি গিয়েছিলাম। সেখানকার কর্তৃপক্ষ একটা নোটিশ লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। কোনও চেক গ্রহণ করা চলবে না। আমাদের বন্ধুবর মিস্টার উইলিয়াম অবশ্য এরকম কোনও কথা বলে না।

সমবেত জনতা হেসে উঠল। মনে হলো, এটা যেন কোনও চার্চের প্রার্থনা সভা। যেন কোনও যাজক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন।

সভাপতি মহাশয় আরও বললেন, আর একটা কথা আমার বলার আছে। আমি এখানে শুধু কথা বলতে আসিনি, আমি চেয়ার থেকে নেমে কাজ করতে এসেছি। আমি একজন পরলোক-তত্ত্ববাদী। রবিবার রাত্রিতে আমাকে বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হয়। অতিথিদের অবশ্যই থাকার ঘর চাই। আপনারা দাঁড়াবার মতো স্থান অবশ্যই পেয়েছেন। তবে অপরকে সুযোগ দেওয়া আপনাদের উচিত। যাঁরা রাত্রিতে সুযোগ পাবেন না তাঁরা কাল সকালে কাজ সারতে পারবেন।

এই বলে সভাপতি তাঁর চেয়ারে বসে পড়লেন।

মি. পিবল লাফিয়ে উঠলেন। তিনি হচ্ছেন কাজের লোক। জনসাধারণের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায়; তবে সব জায়গাতেই তিনি মাতব্বরী করতে ভালবাসেন। তিনি যখন যে প্রতিষ্ঠানে যাবেন সেখানেই তাঁর স্বেচ্ছাচারিতামূলক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর সরু লম্বাটে ধরনের মুখখানায় ও চোখে সবসময় একটা কৌতূহল ও আগ্রহের ভাব ফুটে থাকে। তাঁর ক্ষিপ্র গতি হাত দুটো সব সময় কর্মতৎপরতায় চঞ্চল হয়ে থাকে। তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি যেন এক বাণ্ডিল বৈদ্যুতিক তার। তাঁর হাতের প্রতিটি আঙুলের ডগায় যেন বৈদ্যুতিক প্রবাহ খেলে যায়।

মি. পিবল চিৎকার করে উঠলেন, একটা স্তব গান কর।

একটা হারমোনিয়াম আনা হলো এবং শ্রোতৃবর্গ উঠে দাঁড়াল। একটা স্তব গান গাওয়া হলো। গানের ভাষাটা ছিল ভাল :

“আজ জগৎবাসী স্বর্গরূপ সমুদ্রের চিরন্তন উপকূল থেকে
বয়ে আনা পবিত্র বাতাস থেকে নিঃশ্বাস গ্রহণ করছে।
তার মৃত্যুর উপর বিজয়বার্তা ঘোষণা করছে।
মৃত মানুষের আত্মা স্বর্গ থেকে
মর্ত্যে আবার একবার ফিরে আসছে।”

এই গানের সুরের মধ্যে এক আনন্দের উত্তেজনা অনুরণিত হয়ে উঠছিল। গানের বাকি অংশটা ছিল—

“তাই আমরা আনন্দ করছি,
আনন্দে গান করছি।
সে সমাধি গহ্বর! কোথায় তোমার
বিজয় গৌরব।
হে মৃত্যু কোথায় তোমার
দংশন জ্বালা।”

হ্যাঁ, সত্যি যারা গান গাইছিল তাদের মধ্যে নিষ্ঠার কোনও অভাব ছিল না। যারা এই প্রার্থনাগান শুনছিল তাদের মনেও কোনও দুর্বলতা ছিল না, ছিল না পরলোক সম্বন্ধে কোনও সংশয়। ম্যালন ও এনিড দু’জনেই সেই সব লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে করুণা বোধ করতে লাগল তাদের অন্তরে। যে ব্যাপারটার মধ্যে এতখানি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা, সেখানে কোনও প্রতারণার পরিচয় পাওয়াটা কত দুঃখজনক। যদি কোনও প্রতারক তাদের পবিত্র অনুভূতি অপচয় করে মৃত প্রিয়জনদের আত্মাকে আনিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে তাহলে সে প্রতারণা সত্যি খুব দুঃখজনক। এই সব সরল প্রকৃতির সাধারণ নরনারী কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ চায় না। পরলোক বা প্রেততত্ত্ব সম্বন্ধে বিজ্ঞানের অমোঘ আইনের বিচার কী তা তারা জানতে চায় না। বেচারা সৎ নিষ্ঠাবান ও সরল প্রকৃতির ভ্রান্ত জনগণ।

এবার মি. পিবল চিৎকার করে বললেন, এখন আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত মুনরকে প্রেতদের আবাহন করার জন্য অনুরোধ করছি।

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত রকমের দেখতে একজন দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টিপাত করল। তার সে দৃষ্টির মধ্যে ছিল যেন এক সুপ্ত আগুন। কয়েক মুহূর্ত এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে তার প্রার্থনা শুরু করল। তার প্রার্থনাটা ছিল খুবই সরল, সাদাসিদে ধরনের ও অপরিকল্পিত। এই বিষয়ে কোনও ভাবনা-চিন্তা না করেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সে প্রার্থনার কথাগুলো বলে যাচ্ছিল।

ম্যালন প্রার্থনার প্রথম বাক্যটাকে লিখে ফেলল, হে পরম পিতা, আমরা অজ্ঞ সাধারণ মানুষ। কীভাবে তোমার কাছে যেতে হয় তা আমরা জানি না। তবে সাধ্যমতো আমরা প্রার্থনা করে যাব।

পুরো প্রার্থনাটাই ছিল বিনয়ের সুরে গাঁথা।

এনিড ও ম্যালন উভয়েই উভয়ের দিকে তাকাল। তাদের দু’জনের দৃষ্টির মধ্যেই ছিল অনুষ্ঠান সম্বন্ধে ভাল লাগার একটা নীরব স্বীকৃতি।

আরেকটি প্রার্থনা সঙ্গীত হলো, তবে সেটা প্রথমবারের মতো ভাল হলো না। এরপর সভাপতি ঘোষণা করলেন এখন নর্থ ওয়েলস্-এর জেমস জোনস্ তার ধ্যানলব্ধ বাণী একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করবেন। অ্যালাসা অ্যাটালানটিন নামে এক প্রেতাত্মার সুবিদিত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা জানা যাবে।

এরপর জেমস জোনস্ ব্যস্তভাবে সামনে এগিয়ে এলেন। তাকে দেখে দৃঢ়সংকল্পের মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তার পরনে ছিল চেক কাটা জামা-প্যান্ট। তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়েই এক গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে দু’-এক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তাঁর দেহটা প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি কার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। একথা স্বীকার করতে হবেই যে মি. জেমস জোনস্—এর স্থির চোখ দুটি আর তার শূন্য দৃষ্টি ছাড়া বক্তা হিসাবে তার কোনও অস্তিত্বই বোঝা যাচ্ছিল না। আর একটা কথা বলা উচিৎ যে মি. জোনস প্রথমেই যেভাবে তাঁর দেহটাকে কাঁপিয়েছিলেন তার মানে এই যে দর্শকরাও পরে তার মতো কাঁপতে থাকবে।

মি. জোনস্-এর কথা শুনে মনে হলো অ্যাটালানটিন নামে যে আত্মাকে তিনি আহ্বান করবেন সেটা এমন কিছু আগ্রহজনক হবে না। তারপর তিনি আপন মনে বিড়বিড় করে আত্মাকে ডাকার জন্য মিষ্টি ভাষায় তার প্রশংসাগান করতে লাগলেন।

তা দেখে ম্যালন এনিড-এর কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি বলল, অ্যাটালানটিন নামে আত্মাটা যদি এদের কাছে আদর্শ প্রেতাত্মা বলে গণ্য হয় তাহলে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর আমাদের ছোট জন্মভূমিকে গ্রাস করে ফেলবে। আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে।

মনে হলো জোনস্ যেন ধ্যান করছেন। চোখ বন্ধ করে তিনি যেন একভাবে সমাধিস্ত। সহসা ধ্যান ভঙ্গ করে এক অতি নাটকীয় ভঙ্গিতে তাঁর দেহটা আবার প্রবলভাবে কাঁপাতে লাগলেন। সভাপতি তাঁর চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন। তিনি এমন কর্মতৎপরতা দেখালেন যাতে বোঝা গেল অ্যাটালানটিনের প্রেতাত্মার এখনি আবির্ভাব ঘটবে।

তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, আজ রাতে আমরা সকলে এখানে উপস্থিত হয়েছি এক বিশেষ কারণে। আপনারা সকলেই জানেন, লিভারপুলের মিসেস ডেবস পরলোকতত্ত্ব বিষয়ে অনেক জ্ঞান ও গুণে ভূষিত, তার মধ্যে তাঁর একটি বড় গুণ হলো পরলোক হতে প্রেতাত্মাকে এনে মানুষকে দেখানো। সেন্ট পল এই সবের গুণের কথা বলেছেন। তবে পরলোক সম্বন্ধে এই সব ব্যাপার এমন সব নিয়মের অধীন যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু এজন্য এক সহানুভূতিমূলক আবহাওয়া এখানে সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজনীয়। এজন্য মিসেস ডেবস তাঁর কাজ শুরু করার আগে আপনাদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও প্রার্থনা করতে বলতে পারেন। এরপর তিনি পরলোকের রাজ্যে প্রবেশ করে সেই সব অন্য জগতের প্রেতাত্মাদের সংস্পর্শে আসার চেষ্টা করবেন। আশা করি আপনারা অনুগ্রহ করে আজ রাতে আমাদের এখানে এসে আমাদের এই অনুষ্ঠানটিকে সার্থক করে তুলবেন।

এই বলে সভাপতি তার ভাষণ শেষ করে বসে পড়লেন। আর তখন মিসেস ডেবস সম্মিলিত করতালি ও হর্ষধ্বনির মধ্যে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চেহারাটা ছিল লম্বা রোগারোগা। নাকটা ছিল খাড়া। মুখখানা ছিল ম্লান। সোনার চশমার মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল চোখ দুটি হতে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বেরিয়ে আসছিল। তিনি প্রত্যাশী দর্শকবৃন্দের সামনে মাথা নত করে দাঁড়ালেন। মনে হচ্ছিল তিনি যেন কি শুনছেন। সহসা মিসেস ডেবস চিৎকার করে বলে উঠলেন, আমি একটা কম্পন চাই। প্ৰাণস্পন্দন চাই। দয়া করে হারমোনিয়ামে একটা গান বাজাও।

হারমোনিয়াম আনা হলো। মিসেস ডেবস আবার আপন মনে বলে উঠলেন, যে যীশু আমার অন্তরাত্মার একমাত্র প্রেমের ধন।

প্রত্যাশী দর্শকবৃন্দ এক ভীতি-বিহ্বল নীরবতায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ঘরখানায় ঠিকমতো আলো না থাকায় অন্ধকার জমে ছিল ঘরের কোণে কোণে।

মিডিয়াম মিসেস ডেবস তখন মাথাটা নত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কান দুটো কি যেন শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে ছিল। সহসা তিনি হাত তুলতেই গান বন্ধ হয়ে গেল।

ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন সময়টা ভালই আছে।

মনে হলো মিসেস ডেবস যেন কোনও অদৃশ্য সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলছেন। এরপর তিনি দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, আমি মনে করি না আজকের রাতের অবস্থা ও পরিবেশটা খুব ভাল। তবে আমি তাদের এখানে আনার জন্য চেষ্টা করে যাব এবং তারাও আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তার আগে আমি আপনাদের কিছু বলব।

মিসেস ডেবস কথা বলতে লাগলেন। কিন্তু কার সঙ্গে কি কথা বলছিলেন তা কেউ বুঝতে পারল না। তার বলা কথাগুলোর মধ্যে কোনও যুক্তি-পরামর্শ ছিল না। কেবল বারবার তার মুখ থেকে বেরনো কয়েকটা বাক্য ও শব্দগুচ্ছ দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল।

ম্যালন তার স্টাইলোটা পকেটের মধ্যে ভরে রাখল। একজন পাগলের প্রলাপোক্তি নিয়ে কোনও রিপোর্ট লেখার প্রয়োজন নেই। পরলোকে বিশ্বাসী একজন ভদ্রলোক ম্যালনের হতবুদ্ধি ও বিতৃষ্ণ ভাবটা দেখে তার দিকে এগিয়ে তার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন।

সেই ভদ্রলোক চুপি চুপি বললেন, মিডিয়াম মিসেস ডেবস সুর করে বাতাসে তরঙ্গ তুলছেন। এটা হচ্ছে এক স্পন্দন সৃষ্টি করার ব্যাপার।

মিসেস ডেবস তখন একটা বাক্য বলতে বলতে মাঝখানে থেমে গেলেন। তারপরই তিনি ডান হাতটা বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়ানো এক বয়স্কা মহিলাকে দেখিয়ে বললেন, তুমি, হ্যাঁ, তুমি, তোমার পালকগুলো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মত পরিবর্তন করে বললেন, না না, তুমি নও। এরপর সামনের সারিতে দাঁড়ানো মোটা চেহারার মহিলার দিকে তেমনি করে হাত বাড়িয়ে বললেন, তোমার পিছনে এক প্রেতাত্মা দাঁড়িয়ে আছে। সে হচ্ছে এক পুরুষ। তার চেহারা লম্বা, প্রায় ছয় ফুট হবে। উঁচু কপাল, তার চোখ দুটো ধূসর বা নীল হবে, লম্বা চিবুক, বাদামী রঙের মোচ, সারা মুখখানা রেখায় ভর্তি। বন্ধু, তুমি তাকে চেন কি?

সেই মোটা চেহারার মহিলাটি এই কথায় ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলেন তিনি তাকে জানেন না।

তখন মিডিয়াম মিসেস ডেবস বললেন, তবে দেখ আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি কিনা। ও একটা বাদামী রঙের শক্ত মলাট দেওয়া বই ধরে আছে। ওটা হচ্ছে কোনও অফিসের লেজার বই। আমি জানতে পেরেছি, অফিসটার নাম ‘ক্যালিডোনিয়ান ইনসিওরেন্স’। এতে কিছু বুঝতে পারছ?

মোটা মহিলাটি ঠোঁট দুটি চেপে ঘাড় নাড়লেন।

মিডিয়াম বললেন, আমি তোমাকে আরও তথ্য দিতে পারি। ওই প্রেতাত্মাটি তার পূর্বজন্মে দীর্ঘ রোগভোগের পর মারা যায়। আমি জানি রোগটা ছিল তার বুকে, অ্যাজ্‌জ্মা বা হাঁপানি।

সেই মোটা চেহারার মহিলাটি তবু একগুঁয়েমির সঙ্গে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

এমন সময় ছোটখাট চেহারার এক মহিলা উঠে দাঁড়ালেন, এক অব্যক্ত ক্রোধে মুখখানা তাঁর লাল হয়ে গিয়েছিল। সে-মিডিয়ামের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, হ্যাঁ, ও আমার স্বামী ছিল। ওকে বলে দিন ম্যাডাম ওর সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। এই বলে বসে পড়ল সে।

মিডিয়াম বললেন, ও তোমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে তোমার কাছে এসে পড়েছে। সে বলতে চায় সে দুঃখিত। তবে তাতে কিছু হয় না। তুমি জান জীবিত মানুষ মৃত মানুষের কথা শুনতে চায় না। তাই বলি ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও। এখানেই সব শেষ। তোমার জন্য একটা কথাই বলার আছে। আমার কথামতো কাজ কর। তোমার প্রতি আমার আশীর্বাদ সব সময় থাকবে। এটা কি তুমি চাও? এর কি কোনও মূল্য আছে তোমার কাছে?

রোগা চেহারার রাগী মহিলাটি ঘাড় নেড়ে তাঁর সম্মতি জানালেন।

মিডিয়াম বললেন, খুব ভাল কথা। এই বলে তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার দিকে হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে এক সৈনিককে চিহ্নিত করলেন। খাকি পোশাক পরা একজন সৈনিক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। মিডিয়াম তার দিকে হাত বাড়াতেই সে বিস্মিত হয়ে তাকাল। আশ্চর্য হয়ে বলল, কি ব্যাপার আমি এক সৈনিক। তার পোশাকের উপর সৈনিকের ডোরাকাটা চিহ্ন ছিল। তার চেহারাটা ছিল লম্বা-চওড়া। তার মাথার চুলগুলোয় তেল চপচপ করছিল।

মিডিয়াম বললেন, আমার কাছে একজনের জে. এইচ এই সংক্ষিপ্ত নাম আছে। তুমি তাকে চেন?

হ্যাঁ চিনি, কিন্তু সে সৈনিকটি মৃত।

সৈনিকটি বুঝতে পারেনি এটা একটা সাধারণ গীর্জা নয়, পরলোক- তত্ত্ববাদীদের গীর্জা। এখানকার কাজকর্মের ধারা সব আলাদা। সৈনিকটির আশেপাশে যারা ছিল তাকে তারা বুঝিয়ে দিল। তখন সে আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল, হা ভগবান!

এই বলে সে ভিড়ের মধ্য থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। সমবেত জনতা কি সব বলাবলি করতে লাগল। মিডিয়াম তাঁর আসনে বসে বিড়বিড় করে কোনও এক অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

মিডিয়াম বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, একটু অপেক্ষা কর। তোমার পালা এলে তুমি অবশ্যই বলবে। হে নারী তার কাছে আসন গ্রহণ কর। আমি কি করে তার কথা জানব। আমি পারলে অবশ্যই তা করব।

মিডিয়ামকে দেখে মনে হলো তিনি যেন কোনও নাট্যশালার বাইরে টিকিটের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো জনতার ভিড় সামলাচ্ছেন। এক ব্যবস্থাপক প্রহরীর মতো। মিডিয়ামের পরবর্তী চেষ্টা ব্যর্থ হলো একেবারে। বলিষ্ঠ চেহারার একজন লোক যার গালপাট্টাগুলি ঝোপের মতো ভর্তি ছিল। মিডিয়াম এক বয়স্ক ভদ্রলোক তার সঙ্গে আত্মীয়তা আছে বলে দাবি করলে সে সম্পূর্ণরূপে তা অস্বীকার করল। মিডিয়াম এই কাজে প্রশংসনীয় ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। তিনি বারবার নানা খুঁটিনাটি উল্লেখ করে লোকটিকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাতে কোনও ফল হলো না। অবশেষে মিডিয়াম লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি পরলোকতত্ত্বে বিশ্বাসী?—হ্যাঁ, দশ বছর ধরে আমি তত্ত্বে বিশ্বাস করে আসছি।

মিডিয়াম বললেন, তুমি কি জান এতে কত কষ্ট ও বিপত্তি আছে?

আমি তা জানি।

এখন এসব কথা মন থেকে দূর করে দাও। তবে জানবে পরে এসব কথা তোমার মনে আসবে। তখন সব বুঝতে পারবে। আমি শুধু তোমার বন্ধুর জন্য দুঃখিত।

এরপর সব চুপ হয়ে গেল। মিডিয়াম স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। এর মাঝে এনিড ও ম্যালন পরস্পর কথা বলতে লাগল।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, এর থেকে কি বুঝলে এনিড?

এনিড উত্তরে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। যতই দেখছি ততই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছি।

আমার যতদূর বিশ্বাস এ ব্যাপারে অর্ধেকটা অনুমানভিত্তিক কাজ। আর বাকি অর্ধেক কাজটা নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের উপর।

এখানে যারা আসে তারা সবাই এই চার্চের সদস্য। পরস্পর পরস্পরকে চেনে। একজন অপরের কথা জানে। যদি কিছু না জানে তবে তা অপরের কাছে জেনে নেয়।

একজন বলে উঠল, মিডিয়াম হিসাবে মিসেস ডেবস আজ এখানে প্রথম এলেন। মিডিয়াম হিসাবে এটা তাঁর প্রথম কাজ।

আর একজন বলল, উনি নতুন হলেও কর্মকর্তারা ওঁকে শিখিয়ে নিতে পারতেন। এতক্ষণ পর্যন্ত যা হলো তা সব ছলচাতুরি আর মিথ্যা। একবার ভেবে দেখ তো বস্তুত যে যা নয় তাকে তা মনে করে লাভ কি।

একজন বলল, হয়ত এটা টেলিপ্যাথির ব্যাপার—অর্থাৎ এক মানুষের অন্তরের সঙ্গে অন্য মানুষের যোগাযোগ।

অন্য একজন বলল, ওই ধরনের ব্যাপার একটা আছে। ওই শোন, উনি আবার ধ্যানস্থ হলেন।

মিডিয়ামের পরের কাজটা ভালই হলো। এর আগের দুটো চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর এই চেষ্টাটা ফলবতী হলো। হলঘরের পিছনের দিকে মোটাসোটা চেহারার লোক সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত স্ত্রীর বর্ণনা এবং তার দাবি সব স্বীকার করে নিল। সে তার মৃত স্ত্রীর পরিচয় দিতেই তাকে সে চিনতে পারল।

মিডিয়াম বললেন, আমি জানি নামটা হলো ওয়ালটার। লোকটি বলল, হ্যাঁ আমিই সেই।

মিডিয়াম আবার বললেন, তোমার স্ত্রী তোমাকে কি ওয়াট বলে ডাকত?

লোকটি উত্তর করল না। মিডিয়াম বললেন, সে এখনও তোমায় ওয়াট বলে ডাকে। সে আমাকে বলেছে আপনি ওয়াটকে বলবেন, সে যেন ছেলেমেয়েদের আমার ভালবাসা জানায়। সে ছেলেমেয়েদের জন্য খুবই উদ্বিগ্ন। তাদের কথা খুব ভাবে।

লোকটি বলল, সে জীবিত অবস্থাতেও ছেলেদের কথা খুব ভাবত।

মিডিয়াম বললেন, মৃত্যুতেও ওদের মনের কোনও পরিবর্তন হয় না। এরপর সে আসবাবপত্রের কথা বলেছে। সে বলেছে তুমি বাড়িতে প্রায়ই ভাল ভাল আসবাবপত্র কিনে এনে তাকে দিতে।

লোকটি বলল, আমি তাকে হয়ত তা দিতাম।

দর্শকবৃন্দ এ বিষয়ে তাদের মানসিক প্রতিক্রিয়ার কথা বলতে লাগল। বলাবলি করতে লাগল নিজেদের মধ্যে। কি করে একটা গুরুগম্ভীর বিষয় একটা হাস্যরসাত্মক বিষয়ের সঙ্গে চিরদিনের জন্য মিলেমিশে এক হয়ে যায়—এটা সত্যিই আশ্চর্যের কথা। আশ্চর্যের হলেও এটা স্বাভাবিক এবং এর মধ্যে একটা মানবিক আবেদন আছে।

মিডিয়াম আরও বললেন, সে একটা সংবাদ তোমার জন্য রেখে গেছে। সব টাকা-পয়সা মিটিয়ে দিলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যিকারের একজন সৎ ও ভাল মানুষ হয়ে ওঠ। আমি আবার মর্ত্যে গেলে আবার আমরা এক সুখী জীবন যাপন করব।

লোকটি হাত দিয়ে চোখ দুটো ঢাকল। এমন সময় মিডিয়াম ভবিষ্যৎবক্তা ও সত্যদ্রষ্টার মতো উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর লম্বা আকারের যুব সচিব কিছুটা উঠে দাঁড়িয়ে মুখটা উঁচু করে তাঁর কানে কানে কি বলল। মিডিয়াম তখন দর্শকদের দিকে মুখ করে তাঁর বাঁ কাঁধের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।

তারপর বললেন, আমি আবার পুরনো কথায় ফিরে আসছি।

এই বলে তিনি দর্শকদের সামনে আরও দুটো বিষয়ে বিবরণ দান করলেন। এই দুটো বিবরণই অস্পষ্ট মনে হলো তাদের কাছে। এবং এই দুটি বিবরণের বিষয়গুলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুটা কুণ্ঠার সাথে মেনে নিল। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার যে মিডিয়াম তাঁর বিবরণে যে সব খুঁটিনাটির কথা বলছিলেন তিনি নিজেই যেন তা ভাল করে জানেন না। বিবরণে যাদের কথা বলা হচ্ছিল তিনি যেন তাদের বহু দূর থেকে দেখছিলেন।

এবার হলের শেষ দিকে দাঁড়ান একজনকে তার বিবৃত প্রেতাত্মার দ্বারা পরিগৃহীত রূপ বলে দাবি করলেন। তাকে ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না তবু তিনি তার গায়ের রং এবং মুখের কোথায় কি দাগ বা রেখা আছে তা স্পষ্ট বলে দিলেন।

ম্যালন মিডিয়ামের কথাগুলো লিখে নিচ্ছিল যাতে সে এইসব কথাগুলোর বিরূপ সমালোচনা হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। তার লেখা সবেমাত্র শেষ হয়েছে। এমন সময় মিডিয়ামের কণ্ঠস্বর খুব জোর হয়ে উঠল। সেই জোরালো কণ্ঠস্বর শুনে ম্যালন সেই দিকে তাকিয়ে দেখল মিডিয়াম তার দিকেই মুখ করে আছে। এবং তার চশমার উজ্জ্বল কাঁচ দুটোর ভিতর থেকে একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তারই উপর পতিত হয়েছে।

মিডিয়াম বলছিলেন, আমি বক্তৃতামঞ্চে প্রায়ই বক্তৃতা করি না।

তিনি যখন একথা বলছিলেন তখন তাঁর চোখের দৃষ্টি ম্যালন ও দর্শকদের মধ্যে আবতির্ত হচ্ছিল। মিডিয়াম আরও বললেন, আজ রাতে এখানে কিছু বন্ধু আছে যারা এ বিষয়ে আগ্রহান্বিত এবং প্রেতাত্মার সংস্পর্শে আসবেন। মোচওয়ালা ওই ভদ্রলোকের পিছনে একজন যুবতী মহিলার পাশে বসে আছে। তিনি মোচওয়ালা ভদ্রলোককে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, হ্যাঁ স্যার, আপনার পিছনের ভদ্রলোকের কথা বলছি। তিনি বৃদ্ধ। তাঁর বয়স ষাট-এর বেশি। আর উচ্চতা মাঝারি ধরনের। একটু বেঁটে বেঁটে ভাব আছে। মাথার সব চুল সাদা। নাকটা বাঁকা এবং তাঁর মুখে অল্প দাড়ি আছে। লোকে যেটা ছাগলদাড়ি বলে। আমি যতদূর জানি তাঁর কোনও আত্মীয় নেই। কেবল আছে একজন বন্ধু।

এটা কি কারও সঙ্গে মেলে?

ম্যালন কিছুটা ঘৃণার সঙ্গে মাথা নাড়ল। ঘাড় নেড়ে তার অসম্মতি জানাল। তারপর সে ফিসফিস করে এনিডকে বলল, এটা তো যে কোনও বৃদ্ধ লোকের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে।

মিডিয়াম আরও বলতে লাগলেন, আমি আর একটু খুলে বলছি। তার মুখে আছে গভীর রেখা। জীবিত অবস্থায় লোকটি খিটখিটে মেজাজের ছিল। অর্থাৎ একটুতেই রেগে যেত। সে স্নায়ুরোগ দুর্বলতায় ভুগত। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছ কে সেই লোকটি? আশা করি আমি যা বললাম তাতে তোমাদের বুঝতে সুবিধা হবে।

ম্যালন আবার ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানাল। সে বিড়বিড় করে বলল, সব বাজে, একেবারে বাজে কথা।

মিডিয়াম আরও বললেন, তাকে দেখে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। সুতরাং তার জন্য কিছু করতে পারি কিনা দেখা উচিৎ।

তার হাতে একটা জ্ঞানের বই আছে। সে বইটা খুলেছে। তাতে কিছু রেখাচিত্র আছে, আমি সেগুলো দেখতে পাচ্ছি। বোধহয় বইটা তারই লেখা, বোধহয় এই বইটা থেকে সে শিক্ষাদান করত। হ্যাঁ, সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে, সে একজন শিক্ষক ছিল।

ম্যালন একথার উত্তর দিল না। সে একেবারে চুপ করে রইল।

মিডিয়াম এবার কিছুটা হতাশ হয়ে বললেন, এ ব্যাপারে আর তো আমার কিছু বলার নেই। তবে হ্যাঁ, তার ডানদিকের ভ্রূর উপরে একটা আঁচিল আছে।

ম্যালন চমকে উঠল। কে যেন তার গায়ে হুল ফুটিয়ে দিয়েছে।

এবার সে চিৎকার করে প্রশ্ন করল। মাত্র একটা আঁচিল?

মিডিয়াম-এর চোখ দুটো চশমার ভিতর থেকে জ্বলজ্বল করে উঠল। তিনি ম্যালনের দিকে তীক্ষ্ণ তাকিয়ে উত্তর করলেন, দুটো আঁচিল। একটা বড় একটা ছোট।

ম্যালন এবার বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠল, হা ভগবান! এত প্রফেসর সামারলি।

মিডিয়াম কিছুটা উৎসাহিত হয়ে বললেন, অবশেষে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে। তার কিছু বলার আছে। পুরনো পরিচিতদের প্রতি সে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তার নাকটা খুব লম্বা। আর তার প্রথম অক্ষর হলো সি। আমি ঠিক ধরতে পারিনি এর মানে কিছু বুঝতে পারছ?

হ্যাঁ।

এদিকে মিডিয়াম অন্য এক বিষয়ে অন্য একজনের কথা বলার জন্য মুখ ঘোরালেন। কিন্তু তাঁর পিছনে প্রবলভাবে কাঁপতে থাকা একটা মানুষ এসে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু তিনি সেদিকে তাকালেন না।

ঠিক এই সময় শৃঙ্খলার সঙ্গে চলতে থাকা মিডিয়ামের কাজকর্ম এমন একটা বাধা পেল যা সমবেত দর্শকবৃন্দের সঙ্গে অতিথি দু’জনকেও বিশেষভাবে বিস্মিত করল। সহসা সভাপতির পিছনে লম্বা চেহারার ম্লান মুখ ও দাড়িবিশিষ্ট একজন লোক এসে উপস্থিত হলো। তার পরনের পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল সে একজন কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মী। সে এমনভাবে হাত তুলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল যাতে মনে হলো সে কোনও প্রতিষ্ঠানের অন্য সকলের উপর তার প্রভুত্ব বিস্তার করতে অভ্যস্ত। লোকটি কিছুটা ঘুরে মি. বলসোভারকে একটা কথা বলল।

সভাপতি বললেন, ইনি হচ্ছেন ডালস্টনের মি. মিরোমার। এঁর একটা কথা বলার আছে। আমরা আনন্দের সঙ্গে মি. মিরোমারের কথা শুনতে চাই।

ম্যালন-এনিড ভাল করে ব্যাপারটা দেখতে পাচ্ছিল না। তারা যতটুকু দেখতে পাচ্ছিল তাতে সভাপতির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারা দেখে কিছুটা অভিভূত না হয়ে পারল না। তার মাথাটা ছিল বেশ বড় এবং ভারী। যা দেখে তার স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। সে যখন কথা বলতে লাগল তার স্পষ্ট গলার স্বরে হলটা গমগম করতে লাগল।

যদি আমি এখানে শোনার জন্য কোনও শ্রোতা পাই, তাকে আমি এক সংবাদ পরিবেশন করতে চাই, কারণ আমাকে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমি জানি এখানে কিছু লোক তা শুনতে চান। সেই জন্যই আমি এই সংবাদ বয়ে এনেছি। যাঁরা আমাকে এই সংবাদ দান করতে পাঠিয়েছেন তাঁরা চান মানবজাতি এই বার্তা শুনে মনে মনে সতর্ক ও শক্ত হয়ে উঠবে। যারা ভবিষ্যতে তার হঠাৎ দুঃখে অভিভূত ও সন্ত্রস্ত না হয়ে পড়ে। কয়েকজনের মধ্যে আমাকেই এই বার্তা বহনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

ম্যালন তার হাঁটুর উপর একটা জোর চাপড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল, লোকটা পাগল। হলঘরে অনেকের মুখে এক মৃদু হাসির ভাব ফুটে উঠল। তবু সেই লম্বা চেহারার লোকটির আচরণ, কথাবার্তা ও তার গলার স্বরের মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা সকলকে তার কথা আগ্রহের সঙ্গে শুনতে বাধ্য করে তুলল।

লোকটি গম্ভীর গলায় বলে যাচ্ছিল, অবস্থা এখন চরমে উঠেছে। এখন মানবজাতির সব উন্নতি ও অগ্রগতির ধারণা কেবল পার্থিব ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ। এখন উন্নতি বলতে বোঝায় তাড়াতাড়ি যাওয়া-আসা, তাড়াতাড়ি বার্তা পাঠানো আর নতুন নতুন যন্ত্রপাতি নির্মাণ। এটা হচ্ছে মানুষের প্রকৃত উচ্চাভিলাষকে অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল মাত্র। প্রকৃত উন্নতি বলতে একটা উন্নতিকেই বোঝায়, সেটা হলো আত্মিক উন্নতি। মানুষ মুখে এই আত্মিক উন্নতির কথা বললেও কিন্তু আসলে তারা পার্থিব বস্তুগত বিজ্ঞানের ভুল পথেই এগিয়ে চলে।

আজ মানুষের বুদ্ধি থেকে এটাই জানা যায় পুরনো দিনের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথা- পদ্ধতি সম্পর্কে তারা বিমুখ হয়ে পড়েছে এবং নানা সংশয় দেখা যাচ্ছে। আর তার ফলে তারা সবকিছুর বিষয়ে যুক্তি ও প্রমাণ চাইছে। আমি সাক্ষ্যপ্রমাণ সহ বলতে পারি যে মৃত্যুর পরও পরলোকে জীবনের অস্তিত্ব আছে। আর মৃত্যুত্তীর্ণ মানবাত্মার সেই অস্তিত্ব আকাশের জ্বলন্ত সূর্যের মতোই সত্য। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই সত্যকে উপহাস করে। চার্চ তাকে ধিক্কার দেয় এবং সংবাদপত্রগুলি ঘৃণার সঙ্গে অস্বীকার ও বাতিল করে। এটাই হচ্ছে মানবজাতির শেষ ও সবচেয়ে বড় ভুল।

দর্শকবৃন্দ এবার মুখ তুলে তাকাল। এ বিষয়ে তাদের জল্পনা-কল্পনা তাদের মনের দিগন্তকে ছাড়িয়ে গেল। কিন্তু এটা তাদের স্পষ্টভাবে বোধগম্য হয়ে উঠল। এক সাধারণ সহানুভূতির কলগুঞ্জন উঠল। এক সমবেত হর্ষধ্বনি শোনা গেল। কিন্তু ব্যাপারটা হতাশাজনক হয়ে উঠল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন‍ই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল যে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। ঈশ্বরের দানকে অবহেলা করা হয়েছে এই ভেবে জনতা ক্ষেপে উঠেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে আরও কঠোর হাতের প্রয়োজন। তাই ঈশ্বরের চরম আঘাত নেমে এল মানবজাতির উপর। সে আঘাতে দশ মিলিয়ন মানুষ মৃত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ আহত হলো এবং অনেকের দেহগুলো বিকৃত হয়ে তালগোল পাকিয়ে গেল। এটাই হলো মানবজাতির প্রতি ঈশ্বরের প্রথম সতর্কবাণী। কিন্তু এ সতর্কবাণী ব্যর্থ হলো। নিরস বস্তুবাদ আগের মতোই পুরোদমে প্রভুত্ব করতে লাগল। এরপর মানবজাতিকে কয়েক বছরের জন্য সুযোগ দেওয়া হয় আর তার ফলে আমাদের মতো কিছু চার্চের আবির্ভাব দেখা যায়। এ ছাড়া কোথাও কোনও পরিবর্তন দেখা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি আবার নতুন করে পাপের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই করতে হবে। রাশিয়া এক বদ্ধ জলাশয়ের মতো প্রাণহীন হয়ে পড়ে। যে ভয়ঙ্কর বস্তুবাদ বিগত মহাযুদ্ধের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে, জার্মানি তার জন্য মোটেই অনুতপ্ত হয়নি। স্পেন ও ইটালি নিরীশ্বরবাদ ও কুসংস্কারের মধ্যে ডুবে যায়। ফ্রান্সে কোনও ধর্মাদর্শ ছিল না। ব্রিটেন হতবুদ্ধি ও মনের দিক থেকে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে পড়ে। সেখানকার মানুষ কাঠের পুতুলের মতো কয়েকটি ধর্ম সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে কোনও প্রাণচঞ্চলতা ছিল না। আমেরিকা এক গৌরবময় সুবর্ণ সুযোগকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং সমস্যাপীড়িত ইউরোপের সঙ্গে এক প্রেমময় ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার না করে তার নিজের আর্থিক দাবি তুলে ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথ বদ্ধ করে দেয়। আমেরিকা তার প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের অসম্মান করে শান্তি লীগে যোগদান করতে অস্বীকার করে। অথচ এই লীগই ছিল মানবজাতির ভবিষ্যতের একমাত্র আশা-ভরসার স্থল। পাপ সবাই করেছে। তবে কেউ কম কেউ বেশি এবং সেই পাপের শাস্তি সেই পাপের পরিণাম অনুসারে সমানুপাতিকভাবেই হবে।

সেই শাস্তি শীঘ্রই আসছে। অবিকল এই কথাটি বলার আদেশ পেয়ে আমি এখানে এসেছি। আমি এই বাণীটি পড়ে শোনাব। পাছে কোনও শব্দ বাদ পড়ে যায়।

এই বলে তিনি পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে পড়তে শুরু করলেন।

“আমরা যা চাই সেটা হলো এই যে আমরা সাধারণ মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে চাই না। আমরা শুধু চাই তারা নিজেদের পরিবর্তন সাধন করে আত্মিক উন্নতির জন্য সচেষ্ট হোক। আমরা জনগণকে শঙ্কিত করে তুলতে চাই না। আমরা শুধু তাদের প্রস্তুত করে তুলতে চাই। কারণ এখনও সময় আছে। জগৎ যেভাবে চলেছে সেভাবে চলতে পারে না। যদি তা চলে তাহলে জগৎ নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে। মোটকথা, ধর্মতত্ত্বে যে সংশায়ত্মক কৃষ্ণকুটিল মেঘমেলা ঈশ্বর ও মানবজাতির মধ্যে বাধাসৃষ্টি করছে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।”

এই পর্যন্ত বলে তিনি কাগজ ভাঁজ করে তাঁর পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলেন। এরপর তিনি বললেন, এই কথা বলার জন্যই আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আপনাদের আত্মার মধ্যে যে জানলা আছে সেই জানলার মধ্যে দিয়ে এই বাণী আপনারা প্রচার করুন, চারদিকে ছড়িয়ে দিন। তাদের বলুন, কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা কর। ধর্মের সংস্কার করার সময় এসেছে।

এই বলে তিনি থামলেন এবং ঘুরে দাঁড়ালেন। যে আবেশের সঙ্গে তিনি কথাগুলো বলছিলেন সেই আবেশটা কেটে গেল। দর্শকদের মধ্যে এক চাপা গুঞ্জনধ্বনি শোনা গেল। তারা একটু নড়েচড়ে আপন আপন আসনে হেলান দিয়ে বসল। এমন সময় পিছন দিক থেকে এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল :

জগতের এখানেই কি শেষ?

আগন্তুক বললেন, না।

আর এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ঈশ্বরের কি নতুন করে আবির্ভাব ঘটছে?

হ্যাঁ।

এরপর তাড়াতাড়ি নিঃশব্দে পা ফেলে আগন্তুক সমবেত দর্শকদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে পথ করে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ম্যালন কৌতূহলবশত যখন মুখ ঘুরিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করল তখন আর তাকে দেখা গেল না।

ম্যালন এনিডকে বলল, মনে হলো এটাই যেন ঈশ্বরের দ্বিতীয় আবির্ভাব। লোকটা এমনি একটা ভাব দেখাল যে, এই ধরনের আরও লোক আছে ওদের। ওদের বলা হয় খ্রিস্টাডেলফিনিস, রাসেলাইটস, ওরা সবাই বাইবেলের ছাত্র, আরও কত কি। তবে লোকটার কণ্ঠস্বর ও চেহারাটার মধ্যে সহপ্রসারী আবেদন আছে।

এনিড বলল, সত্যিই তা মনোগ্রাহী। সত্যিই তা বিশেষ মনোগ্ৰাহী।

সভাপতি তাঁর চেয়ারে বসে মন্তব্য করলেন, আমাদের বন্ধু এখনই যা বলে গেলেন তাতে আমরা সকলে বিশেষ আগ্রহান্বিত। আমাদের কাজকর্মের প্রতি মি. মিরোমারের আন্তরিক সহানুভূতি আছে। যদিও তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নন। মঞ্চে এসে তার ভবিষ্যৎবাণী জানাবার জন্যে আমরা তাকে আহ্বান করছি। আমার মনে হয় আমরা আগে থাকতে প্রকৃত অবস্থা না বুঝতে পারার জন্য বিশ্বজগৎকে অনেক বিপত্তিতে পড়তে হয়েছে। আমাদের বন্ধু যা বলে গেলেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে আমরা এ অবস্থার প্রতিকার করতে পারব না। আমরা কেবল আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যেতে পারি। আমাদের কর্তব্যকর্ম অবশ্যই করে যেতে হবে। তবে সেই সঙ্গে অবস্থার প্রতিকারের জন্য তাকিয়ে কোনও ঐশ্বরিক সাহায্যের জন্য আমাদের প্রতীক্ষায় থাকতে হবে। আমার মনে হচ্ছে আগামী কালই যেন শেষ দিন। অর্থাৎ আমি এই বলতে চাইছি যে হ্যামারস্মিথ-এ আমাদের ভাঁড়ারটা আমাকে একবার দেখতে যেতে হবে তবে আমাদের এখানকার কাজকর্ম সব চলবে।

আমাদের যুবক সেক্রেটারি বিল্ডিং ফান্ডে টাকার জন্য বারবার জোরালো আবেদন জানিয়েছেন। এটা ভাবতে লজ্জা লাগে যে রবিবার রাত্রে এখানে যাঁরা আসেন এই বাড়িতে স্থান সঙ্কুলান হয় না। এই বাড়ির ভেতরে যত লোক থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা সকলেই একটা পয়সা না নিয়েও আপন আপন কাজ করে যাই। মিসেস ডেবস তাঁর খরচের টাকা ছাড়া কিছু নেন না। কিন্তু এরপর কাজ শুরু করার আগে আরও এক হাজার পাউন্ড চাই। এখানে আমাদের এক ভাই আছেন যিনি আমাদের সাহায্য করার জন্য তাঁর বাড়ি বন্ধক রাখেন। এবার দেখি আজ রাতে আপনারা আমাদের জন্য কী করতে পারেন।

এই সময় বারোটা স্যুপ ভর্তি প্লেট পরিবেশন করা হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনার স্তোত্রগান শুরু হলো। সেই গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠং ঠং শব্দ হতে লাগল। ম্যালন ও এনিড নিচু গলায় কি বলাবলি করতে লাগল।

ম্যালন বলল, অধ্যাপক সামারলী গত বছর নেপল্স-এ মারা গেছেন। তুমি তা জান।

এনিড উত্তর করল, হ্যাঁ, তাঁর কথা আমার বেশ মনে আছে।

আরও এক প্রবীণ অধ্যাপক চ্যালেঞ্জার তোমার বাবা।

ঘটনাটা সত্যিই উল্লেখযোগ্য। হতভাগ্য বেচারা সামারলী ভাবতেন বেঁচে থাকাটা এক অবান্তর ব্যাপার। তাই তিনি পরলোকে চলে যান এবং পরলোক থেকে এখানে আসেন। তিনি এখানে আছেন বলে অনেকে মনে করে না।

যে স্যুপ প্লেটগুলো পরিবেশন করা হয়েছিল সেগুলো আবার এনে টেবিলের উপর রাখা হলো। স্যুপের রংটা ছিল বাদামী। সেক্রেটারি আগ্রহের সঙ্গে সেদিকে তাকিয়ে তাদের গুণ ব্যাখ্যা করে প্রশংসা করতে লাগল। এমন সময় অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত বেঁটেখাটো ও রোগারোগা চেহারার একজন লোক ঈশ্বরের এক আশীর্বাদবাণী শোনাতে লাগল। তা শুনে মনে হচ্ছিল তার কথাগুলো একজন মানুষের অন্তর থেকে বেরিয়ে এলেও সে কথা স্বর্গে ঈশ্বরের কাছে উঠে যাচ্ছে।

এবার দর্শকবৃন্দ সমবেত কণ্ঠে স্তোত্রগান শুরু করল। সে গানের সুর একই সঙ্গে করুণ ও মধুর ছিল। এনিডের চোখের জল তার দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। এই সব সাধারণ সরল প্রকৃতির লোক নিষ্ঠার সঙ্গে সরল বিশ্বাসে যে-সব কাজকর্ম করে গেল ও যে-সব স্তোত্রগান গাইল তাতে অভিভূত হয়ে গেল এনিড। অথচ কোনও বড় গীর্জার জাঁকজমকপূর্ণ বাদ্য সহকারে পাওয়া প্রার্থনা গান তার উপর এতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। ওরা গাইছিল, আমরা আবার মিলিত না হওয়া পর্যন্ত ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।

বলিষ্ঠ চেহারার সভাপতি মি. বলসোভার প্রতীক্ষাগারে ছিলেন। মিসেস ডেবসও ছিলেন।

মি. বলসোভার ম্যালনকে হাসতে হাসতে বললেন, আমাদের এই সব কথা আপনি কাগজে লিখবেন এবং আশা করি আমাদের একটা কপি দেবেন। এ বিষয়ে যে রচনা লিখবেন তাতেই আপনাদের মতামত জানা যাবে।

ম্যালন তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ঠিক আছে, আমি সহানুভূতির সঙ্গে ব্যাপারটা বিচার করে দেখব।

সভাপতি বললেন, ভাল কথা। আমরা আর কিছু চাই না।

মিডিয়াম মিসেস ডেবস তখন কনুই-এ ভর দিয়ে নির্বিকার ও গম্ভীরভাবে বসেছিলেন।

এনিড তাকে বলল, আমার মনে হয় আপনি বড় ক্লান্ত।

মিডিয়াম বললেন, না বাছা, এইসব প্রেতাত্মা নিয়ে কাজ করতে আমি কখনই ক্লান্ত বোধ করি না। এটা সকলেই দেখেছে।

ম্যালন সাহস করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, আপনি কি কখনও অধ্যাপক সামারলীকে জানতেন?

মিডিয়াম ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বললেন, না, স্যার, না। আমি ওদের কাউকেই চিনি না। ওরা যখন একে একে আসে তখন আমি তাদের কথা বর্ণনা করি।

ম্যালন আবার জিজ্ঞাসা করল, তাদের বাণী বা বক্তব্য আপনি জানতে পারেন কি করে?

দূরের কথা বা অন্য জগতের কথা যে ভাবে কোন কোন মানুষ শুনতে পায়। বেচারা অশরীরী প্রেতাত্মারা সবাই পরলোক থেকে আমার কাছে আসতে চায়। তারা এসে আমাকে মঞ্চে নিয়ে যেতে চায়। তারা একজনকে ডাকলে অন্য সবাই বলে “এরপর আমি এরপর আমি”। আমি শুধু এই কথাই শুনতে পাই। কিন্তু একা আমি তাদের সকলকে কীভাবে সন্তুষ্ট করব?

ম্যালন এবার সভাপতি বলসোভারকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা ভবিষ্যৎ বক্তা সম্বন্ধে আপনি কি কিছু বলতে পারেন?

মি. বলসোভার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাঁর কান দুটো নেড়ে হাসলেন। বললেন, ওরা স্বতন্ত্র লোক। আমরা যখন তখন দেখি, ওরা ধূমকেতুর মতো আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কখনও তাদের কেউ আমার কাছে এসে বলে “এই আমি যুদ্ধ সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী করে এলাম।” আমি বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। এই যুগে সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলার পক্ষে উপযুক্ত। আমরা বিনা বিলেই প্রচুর টাকা পাই। এর জন্য কোনও প্রতিশ্রুতি হয়। ঠিক আছে শুভ রাত্রি—যতটা সম্ভব সহানুভূতির সঙ্গে আমাদের কথা ভেবে দেখবেন।

এনিড বলল, শুভ রাত্রি।

মিসেস ডেবস বললেন, শুভ রাত্রি। আর এনিডের দিকে চেয়ে বললেন, তুমি তো নিজেই একজন মিডিয়াম। শুভ রাত্রি।

এরপর ম্যালন ও এনিড দু’জনে সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। দীর্ঘক্ষণ পর ফাঁকা জায়গায় এসে মুক্ত বাতাসে থেকে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস গ্রহণ করল। এরা এডগার স্ট্রীটে যেতেই ম্যালন ভিক্টোরিয়া গার্ডেনসে নিয়ে যাবার জন্য একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করল।