সাইলাস লিনডেনের শেষ কেরামতি
বহু পুরস্কার-বিজয়ী ভণ্ড মিডিয়াম সাইলাস লিনডেনের জীবনে ভাল দিক অনেক এসেছে। কিন্তু কোন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হওয়ার সৌভাগ্যের দিন কখনও আসেনি তার জীবনে। চিত্তশুদ্ধ না হলে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হওয়া খুবই বিপজ্জনক। সাইলাস লিনডেনের নামটা এই দৃষ্টান্তে সর্বাগ্রে যুক্ত করা উচিত। তার পাপের পেয়ালাটা কানায় কানায় এমনই পূর্ণ হয়েছিল যে তার বিচার শেষ হবার আগেই পেয়ালা উপচে পড়তে থাকে।
সাইলাস লিনডেন সেদিন মেইলির ঘর থেকে যখন বেরিয়ে গিয়েছিল তখন তার মনে এই ভয় ছিল যে লর্ড রক্সটনের পেশীবহুল হাত দুটো তাকে একবার ধরলে আর ছাড়বে না। মারামারির উত্তেজনায় সে তার আঘাতের পরিমাণ তখন ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। সে দরজার বাইরে গিয়ে তার গলার ক্ষতটার উপর হাত দিয়ে কর্কশ স্বরে গালাগালি দিতে লাগল। ম্যালন তার বুকের উপর হাত দিয়ে চাপ দেওয়ায় তার মুখটাতেও ব্যথা করছিল। যে হাত দিয়ে সে মেইলিকে ঘুষি মেরেছিল তার সেই হাতটাতেও ব্যথা করছিল। যাই হোক, এইসব কারণেই সাইলাসের মন মেজাজটা সেদিন ভালো ছিল না।
সে তখন তার শুয়োরের মতো চোখ দুটো দিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে আপন মনে গর্জন করে বলেছিল, ‘আমি তোমাদের একদিন না একদিন কাছে পাবই। এখন অপেক্ষা কর বাছাধনরা। তখন মজা দেখাব।’ তারপর সে হঠাৎ কী মনে করে বড় রাস্তা দিয়ে সোজা বার্ডসলে থানায় গিয়ে দেখল কালো মোঁচওয়ালা পুলিশ ইন্সপেক্টর মার্ফি তার টেবিলে বসে আছে।
তাকে দেখেই ইন্সপেক্টর কিছুটা রূঢ়স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী চাও? সাইলাস উত্তর করল, শুনেছি আপনারা মিডিয়াম টমাস লিনডেনকে ধরেছেন। হ্যাঁ, এবং আমরা জেনেছি যে সে তোমার ভাই।
সাইলাস কিছুটা রাগের সঙ্গে বলল, ওই ধরনের কোন লোকেরা সঙ্গে আমি কোন সম্পর্ক রাখি না। কিন্তু যাই হোক, আপনারা আসামীকে ধরেছেন। কিন্তু এতে আমার পাওনাটা কোথায়।
ইন্সপেক্টর বলল, এক শিলিংও পাবে না।
কি? আমি কি আপনাদের খবর দিইনি? আমি সব তথ্য না জানালে আপনি কি কিছু করতে পারতেন?
যদি কিছু জরিমানা আদায় করতে পারতাম তার থেকে তোমাকে কিছু দিতে পারতাম। কিন্তু মেলরোজ ওকে কোর্টে পাঠিয়ে দিয়েছে। জরিমানা আদায় হলে তার থেকে আমরা কিছু পেতাম আর তুমিও কিছু পেতে। কিন্তু এখন কিছুই পাবে না।
আপনারা তা বলছেন বটে, কিন্তু আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, আপনি ও সেই মেয়ে দুটো কিছু পেয়েছেন। তাহলে কেন আমি আপনাদের মতো অবিবেচক লোকদের জন্য আমার ভাইকে ধরিয়ে দেব। এবার থেকে আপনারা নিজেরা যাকে ধরার ধরবেন।
মার্ফি ছিলেন রুক্ষ মেজাজের লোক। তাঁর নিজের গুরুত্ব সম্বন্ধে তিনি সব সময় সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁর আসনে বসে থাকা কালে তাঁকে কেউ এসে শাসাবে এটা তিনি চান না। মার্ফি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাগে লাল হয়ে উঠল তাঁর মুখটা। তিনি বললেন, আমি বলে দিচ্ছি সাইলাস লিনডেন আমি এই ঘরে বসেই দোষীদের ধরব। কোথাও যাব না। আমি ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না। তুমি বরং এই ঘর থেকে এখনই বেরিয়ে যাও। তা না হলে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাকে অনেক বেশি সময় এখানে থাকতে হবে। তুমি তোমার নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গে যে নির্দয় ব্যবহার কর সে বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি আমরা। শিশুরক্ষার ভার যাদের উপর আছে এ বিষয়ে তাদের নজর পড়েছে। আমরা কিন্তু এসব দেখি না।
সাইলাসের মেজাজটা আগের থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে ঘর থেকে তীর বেগে বেরিয়ে গেল। বাড়ি যাবার পথে একজায়গায় দু’-এক পাত্র কড়া মদ খেল। কিন্তু সাইলাস এমনি লোক যে রাগের সময় মদ পান করলেও তাঁর উত্তপ্ত মেজাজ শান্ত বা শীতল হওয়ার পরিবর্তে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তাঁর পরিচিত সঙ্গীরা কেউ তাঁর সঙ্গে মদ পান করতে চাইল না।
সাইলাস বাস করত টটেনহাম কোর্ট রোডের পিছন দিকে সারবন্দী কতকগুলো ছোটখাটো ইটের বাড়িতে। ছোট ছোট ইটের বাড়ির গা ঘেঁষে একটা মদের কারখানার উঁচু পাঁচিল খাড়া হয়ে ছিল। ঘরগুলোর মধ্যে জায়গা খুব কম ছিল। তাই বাসিন্দারা প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু নির্বিশেষে বেশির ভাগ সময় ঘরের বাইরে কাটাত। সাইলাস যখন তার ঘরে গেল তখন তার প্রতিবেশীদের অনেকে বাইরে বসে ছিল। তারা তাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। এই সব লোকদের কোন নীতিজ্ঞান ছিল না। তার বউ লেখাপড়া জানে না। সাইলাসের তো কথাই নেই। সাইলাস যে ঘরে থাকত তার পাশের ঘরে থাকত এক ইহুদি মহিলা। তার চেহারাটা ছিল রোগা রোগা কিন্তু চোখদুটো ছিল ভয়ঙ্কর। সেই ইহুদি মহিলার নাম ছিল রেবেকা লেডি। সাইলাস যখন তার ঘরে গেল তখন সেই মহিলা তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। একটি শিশু তার জামা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
সাইলাস যখন তার ঘরে ঢুকছিল তখন সেই মহিলা বলল, মি. লিনডেন, তোমার ছেলেমেয়েরা মোটেই যত্ন পায় না। শিশুকন্যা মার্গেরী এখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই শিশু পেট ভরে খেতে পায় না।
সাইলাস গর্জন করে বলে উঠল, তোমার নিজের কাজে মন দাও। আমি তোমাকে আগেই বলে দিয়েছি। আমার ব্যাপারে নাক গলাবে না। তুমি যদি পুরুষ হতে কীভাবে অপরের সঙ্গে কথা বলতে হয় শিখিয়ে দিতাম।
মহিলা বলল, যদি আমি পুরুষ হতাম তুমি আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলতে সাহস করতে না। তুমি যে ভাবে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ব্যবহার কর সেটা সত্যিই লজ্জার। এ নিয়ে পুলিশ কোর্টে মামলা হলে কীভাবে কথা বলতে হয় দেখিয়ে দিতাম।
জাহান্নামে যাও।
এই বলে সাইলাস তার ঘরের দরজায় লাথি মেরে ঘরে ঢুকল। ভেতর থেকে কোন ছিটকিনি আঁটা ছিল না। তার বসার ঘরে দরজার কাছে মোটাসোটা চেহারার একজন মহিলা বিগত যৌবনের কিছু অবশিষ্ট সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সাইলাসকে দেখেই বলল, ও তুমি?
সাইলাস কড়াগলায় বলল, তুমি কি ভেবেছিলে ওয়েলিংটনের ডিউক?
আমি তো ভেবেছিলাম একটা পাগলা ষাঁড় গলি থেকে এসে দরজা ঠেলছে।
বেশ মজার কথা বলেছ তো।
কিন্তু এখানে মজার কথা বলার কিছু নেই। ঘরে এক শিলিংও নেই। কিছু মদ কেনার পয়সাও নেই। তার উপর তোমার এই অভিশপ্ত ছেলেমেয়েরা আমাকে বিব্রত করে তুলতে চাইছে।
সাইলাস দাঁত খিঁচিয়ে বলল, কি করেছে তারা?
নিজেদের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটির পর তারা দু’জনে ছেলেদের প্রসঙ্গ তুলে কথা বলতে লাগল। তারপর সাইলাস ঘরে ঢুকেই একটা কাঠের আর্মচেয়ারে বসে পড়ল।
মহিলা বলল, এই ভাবে বসে না থেকে কিছু কাজের কাজ করতে পারতে।
সাইলাস বলল, আমার ভাই যা করে আমি তাই করতে চেয়েছিলাম। আমার ছেলেটা হয়েছে তার কাকার মতো। ও যেন ওর কাকার প্রতিমূর্তি। মাঝে মাঝে ও ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়ে।
সাইলাস বলল, পুলিশ আমাদের পিছনে লেগেছে। ওরা যদি এসব জানতে পারে তাহলে তুমি আমি ধরা পড়ব। সাইলাস আরও বলল, তুমি আমার সন্তানদের সৎমা। তারা ভুল করলে তাদের সংশোধন করানো উচিৎ। ওদের মা এনি খুব ভাল মেয়ে ছিল। সে থাকলে এমন হত না।
এনি যখন বেঁচে ছিল তখন তার প্রতি তোমার কোনও দরদ ছিল না। তখন এমন দরদ দেখাওনি। ছেলে-মেয়েদের দেবার মতো ঘরে কিছু খাবার চাই। এখন কি করতে পারি আমি।
সাইলাস রেগে উঠে বলল, খুব হয়েছে চুপ কর। আজ আমাকে বিরক্ত করার মতো অনেক কথা বলেছ। আসল কথা তুমি আমার আগের স্ত্রীর উপর ঈর্ষান্বিত।
মহিলা এগিয়ে এসে সাইলাসের একটা হাত ধরে বলল, কিছু মনে কর না সাইলাস। আমি পাঁচ বছর ধরে তোমার সঙ্গে ঘর করছি। তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কেউ নেই।
সাইলাস বলল, এখন এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। তুমি বরং উইলি আর মর্গোরিকে আমার কাছে নিয়ে এস।
মহিলা বেরিয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘরের মধ্যে ফিরে এল। তার পর সাইলাসকে নিয়ে পিছনের দিকে রান্নাঘরে গেল। সেখানে গিয়ে ওরা দেখল চুল্লীর আগুন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সেই আগুনের ধারে একটা চেয়ারে দশ বছরের একটি ছেলে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার চেহারাটা রোগারোগা। সে তার শীর্ণ মুখখানা উপরে ছাদের দিকে তুলে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ দুটো ছিল আধখোলা। সেই চোখের শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছিল। গাম্ভীর্যে স্তব্ধ হয়ে ছিল তার শরীরটা। ঘরের এক কোণে তার থেকে দুই-এক বছরের ছোট একটি বালিকা বিষণ্ণ মুখে ভয়ে ভয়ে তার দাদার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মহিলা সাইলাসকে বলল, ওকে কেমন ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে, তাই নয় কি? মনে হচ্ছে ও যেন এ জগতের লোকই নয়। এতে কার কি ভালো হয় তার কিছুই বুঝি না।
সাইলাস ধ্যানমগ্ন ছেলেটার কাঁধ দুটো ধরে জোরে নাড়া দিয়ে বলল, ওঠ বাছাধন, জেগে ওঠ। কিন্তু ছেলেটার ঘুম ভাঙল না। সে যেন নিদ্ৰায় অভিভূত হয়েছিল। তার হাত দুটো কোলের উপর নামান ছিল। লাল একটা কাপড়ের আঁচল দিয়ে তার হাত দুটো ঢাকা ছিল।
আচ্ছা সারা, তুমি কি এর আগে ওকে জাগাবার জন্য ওর উপর গরম মোমটা ঢেলে দিয়েছিলে?
মহিলা বলল, আমি হয়ত কিছুটা বেশিই ঢেলেছিলাম। কিন্তু তাতেও জাগেনি। ও এই অবস্থায় থাকলে কোনও কিছু অনুভব করে না। তুমি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। তুমি ওর কানের উপর যতই গর্জন কর সব ব্যর্থ হবে। ছেলেটার মাথার চুলগুলো শক্ত করে ধরে জোরে নাড়া দিতে লাগল। ছেলেটা না জেগেই ভাবের মধ্যেই আর্তনাদের মতো এক অস্ফুট চিৎকার করে উঠল এবং তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। তারপরই সে আবার ভাবের মধ্যে ডুবে গেল।
সাইলাস তার ছেলের থুতনিটা ধরে নাড়া দিয়ে বলল, ঠিকমতো যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে এর থেকে টাকা রোজগার হবে। লোকে জানে ওর কাকা একজন দক্ষ মিডিয়াম। আমার ছেলে ওই কাজ করলে সকলেই বিশ্বাস করবে।
সারা বলল, ব্যবসা করতে হয় তুমি করবে।
সাইলাস রাগের সঙ্গে বলল, ওসব কথা আমাকে বলবে না। আমার দ্বারা ও ব্যবসা হবে না। কেউ আমাকে বিশ্বাস করবে না। আমি একবার একাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাই। এ বিষয়ে আর কিছু বলে আমার রাগ বাড়িয়ে দিও না। তাহলে তার প্রতিফল পেতে হবে।
এই বলে সাইলাস ছেলেটার কাছে গিয়ে তার একটা বাহুতে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোর একটা চিমটি কাটল। তারপর বলল, আশ্চর্য! দেখা যাক এর শেষ কোথায়। এরপর সে চুল্লীর কাছে গিয়ে চিমটে দিয়ে আধপোড়া একটা কাঠ তুলে নিল। তারপর সেই জ্বলন্ত অঙ্গারটা ছেলেটার মাথার উপর রাখল। প্রথমে চুল পোড়ার গন্ধ আসতে লাগল। তার পর চামড়া পোড়ার গন্ধ। অবশেষে ছেলেটা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে উঠে পড়ল। তার সব ভাবের ঘোর কেটে গেল।
ছেলেটা মা মা বলে চিৎকার করতে লাগল। তার যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে ধ্বনি শুনে ঘরের কোণে বসে থাকা মেয়েটি ছুটে এল। তখন ছেলেটি ও মেয়েটি একযোগে দুটি মেষ শাবকের মতো চিৎকার করতে লাগল।
মহিলা ছোট মেয়ে মার্গেরির মুখে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে তার জামার কলার ধরে নাড়া দিয়ে বলল, চুপ কর পাজি মেয়ে কোথাকার। এমন সময় ছেলেটা মার্গেরিকে লাথি মারতে লাগল। তখন সাইলাস একটা ঘুষি মেরে ছেলেটাকে ফেলে দিল। সে মেঝের উপর পড়ে গেল। তারপর সাইলাস পশুর মতো রাগে উন্মত্ত হয়ে একটা ছড়ি তুলে ছেলে ও মেয়ে দু’-জনকেই মারতে লাগল। দু’জনেই চিৎকার করতে করতে তাদের ছোট ছোট হাত দিয়ে ছুরির আঘাত থেকে দেহটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করল।
এমন সময় দরজার কাছে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, থামো থামো।
মহিলা বলল, এই কণ্ঠস্বর হচ্ছে সেই ঝগড়াটে ইহুদি মেয়েটার
আগন্তুক রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে বলল, পাগলের মতো কি করছ তোমরা। পশুর মতো অকারণে নিষ্ঠুরভাবে মারছ নিজেরই ছেলেমেয়েদের। ওসব এখনই বন্ধ কর। তা না হলে এর ফল খুব খারাপ হবে।
আমি যদি বাচ্চাগুলোকে আর একবার চিৎকার করতে শুনি তাহলে আমি পুলিশ ডাকতে যাব।
মিসেস লিনডেন ইহুদি মহিলাকে বলল, বেরিয়ে যাও এখান থেকে।
ইহুদি মহিলা রেগে গিয়ে তার নখ দিয়ে সারার মুখখানাকে ছিঁড়ে দিল। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বার হচ্ছিল। তা দেখে সাইলাস ছুটে এসে ইহুদি মহিলার কোমরটাকে দু’হাত দিয়ে ধরে তাকে বাড়ির বাইরে ফেলে দিল।
তারপর সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে ঘটনার কারণ জানতে চাইল।
মিসেস লিনডেন জানলা দিয়ে দেখতে পেল ইহুদি মহিলার আঘাত গুরুতর হয়নি। তা দেখে সে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। ইতিমধ্যে সে উঠে তার ঘরের দিকে যেতে লাগল এবং সেখান থেকে লিনডেনদের নাম ধরে গালাগালি করতে লাগল।
সারা এবার তার স্বামীকে বলল, আমি ভাবছিলাম তুমি মেয়েটাকে হত্যা করেছ।
সাইলাস বলল, ওকে খুন করাই উচিত ছিল। ও কেন নিজে থেকে আমার ঘরে এসে ঝগড়া করতে লাগল। এই সব কিছুর মূলে হচ্ছে উইলি। কোথায় সে? আমি ওর মাথা কেটে ফেলব।
ওরা ওদের ঘরে চলে গেল।
সাইলাস বলল, আমি শুনেছি ওরা ঘরে তালা দিয়েছে।
সারা বলল, এখন আমি ওদের ঘাঁটাবো না। প্রতিবেশীরা সবাই সজাগ হয়ে উঠেছে। এখন গোলমাল বা চেঁচামেচি করা ঠিক হবে না।
সাইলাস বিরক্তির সঙ্গে বলল, তুমি ঠিক বলেছ, তুমি ঠিক বলেছ। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এরকমই থাক।
তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আমি যাচ্ছি অ্যাডমিরাল ভারনন-এর কাছে। সেখানে লঙ ডেভিসের সহকর্মী হিসেবে একটা কাজ পাবার কথা আছে। ডেভিস সোমবার ট্রেনিং-এ যাচ্ছে। তাই আমার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন একটা লোকের দরকার।
আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। আশা করি কাজটা হয়ে যাবে। আমি অ্যাডমিরালকে চিনি।
সাইলাস বলল, আমার মনে হয় ঈশ্বরের সৃষ্ট এই বিরাট পৃথিবীর ওই স্থানে আমি কিছুটা শান্তি ও বিশ্রাম পাব। মনে হয় বেতন ভালই পাব। তোমাকে বিয়ে করার পর থেকে এরকম কোনও কাজ আমি পাইনি।
এই বলে সাইলাস টুপিটা তুলে নিয়ে মাথায় পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের বাইরে কাঠের পাটাতনের উপর তার ভারী জুতোর শব্দ হতে লাগল।
একটা খড়ের গদিওয়ালা বিছানার ধারে জানালার পাশে ছোট ছেলেমেয়ে দুটি বসে ছিল। তাদের হাত দুটো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। তাদের গাল দুটো পরস্পরের সঙ্গে ছুঁয়ে ছিল আর তার ফলে তাদের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মিশে যাচ্ছিল। শব্দ হওয়ার ভয়ে তারা নীরবে কাঁদছিল। পাছে তাদের কান্নার শব্দ বাইরে সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাক্ষসটাকে তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন করে তোলে, এই ভয়ে তারা চিৎকার করে কাঁদতে পারছিল না। মাঝে মাঝে তারা কান্নার বেগ দমন করতে না পেরে ফুঁপিয়ে উঠছিল। তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে ফিসফিস করে বলছিল, চুপ চুপ। এমন সময় তারা সদর দরজায় ভারী জুতোর শব্দ শুনতে পেল। তারা আনন্দে পরস্পরকে চিমটি কাটতে লাগল। হয়ত ওদের বাবা লাইলাস ফিরে এলে ওদের বধ করবে। কিন্তু ফিরে না আসা পর্যন্ত ওরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ওদের বিমাতা মহিলাটি ওদের ঘৃণা করে এবং ওদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করে ঠিক, কিন্তু সে ওদের বাবার মতো মারাত্মক বা ভয়ঙ্কর নয়। মনে হয় ওদের বাবা ওদের হত্যা করে কবরে মার কাছে পাঠিয়ে দেবে।
ঘরটা ছিল একেবারে অন্ধকার। ধুলোয় ভরা জানলার কাঁচের ভিতর দিয়ে এক টুকরো আলো এসে ঘরের মেঝের উপর পড়েছিল। কিন্তু তার চারপাশটা ছিল অন্ধকার। হঠাৎ ছেলেটার দেহটা শক্ত হয়ে উঠল। সে তার বোনের দেহটাকে জড়িয়ে ধরল আরও নিবিড়ভাবে। ঘরের অন্ধকার দিকটায় সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সে বিড়বিড় করে বলল, আমাদের মা আসছে।
ছোট বোন মার্গেরি তার দাদাকে জড়িয়ে ধরল। সে বলল, ও উইলি, ও কি আমাদের মা?
উইলি বলল, হ্যাঁ মার্গেরি, হলুদ রঙের সুন্দর একফালি আলো দেখতে পাচ্ছ না?
কিন্তু জগতের সাধারণ লোকদের মতো মার্গেরির পরলোক সম্বন্ধে কোন অন্তর্দৃষ্টি ছিল না। তার কাছে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছিল না।
মার্গেরি ফিসফিস করে বলল, বল উইলি, সত্যি কি আমাদের মা এসেছে?
মৃত মার কথায় মার্গেরি কিন্তু ভয় পায়নি। কারণ এর আগেও মা অনেকবার তার নিপীড়িত সন্তানদের সান্ত্বনা দেবার জন্য এসেছে।
উইলি বলল, হ্যাঁ আমাদের মা আসছে, আমাদের মা।
মা কি বলছে উইলি?
উইলি বলল, আমাদের মাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। মা কাঁদছে না। হাসি- খুশিতে তার মুখটাকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ছবিতে দেখা দেবদূতের মতো লাগছে মাকে। মা বলছে আমাদের দুঃখের দিন শেষ হয়েছে। মা হাত নেড়ে আশ্বাস দিয়ে আবার বলছে আমাদের দুঃখের অবসান হয়েছে। মা দরজার কাছে এগিয়ে যাচ্ছে।
ও উইলি, আমার দেখতে সাহস হচ্ছে না।
উইলি বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, মা আমাদের ঘাড় নেড়ে কি বলছে। মা আমাদের ভয় করতে নিষেধ করছে। এস মার্গেরি, উনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। দেখ দেখ
এখন না দেখলে আর দেখতে পাবে না।
দুই ভাই-বোন দরজার কাছে গেল। উইলি দরজাটা খুলল। দেখল ওদের মা আলো হাতে সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বলছে। ওরা ওদের মার পিছু পিছু রান্নাঘরে ঢুকল। ওদের বিমাতা তখন রান্নাঘরে ছিল না। ঘরখানা খালি ও নীরবতায় স্তব্ধ হয়ে ছিল। ওদের মার প্রেতাত্মা আলো দেখিয়ে ইশারায় আরও এগিয়ে যেতে বলল।
উইলি বলল, আমাদের বাড়ির বাইরে যেতে হবে। উনি আলো হাতে আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। উনি হাসি মুখে হাত নাড়ছেন।
মার্গেরি বলল, বাইরে গেলে বাবা আমাদের বধ করবে।
উইলি বলল, মা মাথা নেড়ে বলছে, আমরা যেন কোনও কিছুকে ভয় না করি।
ওরা সদর দরজা খুলে বড় রাস্তায় চলে গেল। তার পর ওদের মার আলোকিত প্রোতাত্মার পিছু পিছু টটেনহাম কোর্টে গিয়ে পড়ল। রাস্তায় চলমান জনস্রোতের মধ্যে দু’-একজন লোক থমকে দাঁড়িয়ে ওদের দেখতে লাগল। তাদের মনে হচ্ছিল তারা যেন এক দেবদূতকে আর তার পিছু পিছু দুটি ছেলেমেয়েকে কোথায় যেতে দেখছে। ছেলেটি স্থির দৃষ্টিতে নিবিষ্ট মনে সামনের দিকে চেয়ে পথ চলছে। আর মেয়েটি ভীতবিহ্বল দৃষ্টিতে ছেলেটির কাঁধের দিকে তাকিয়ে আছে।
লম্বা রাস্তাটা পার হয়ে ওরা আবার একটা নিম্নশ্রেণীর বস্তিতে গিয়ে উপস্থিত হলো। সেখানেও সারি সারি অনেকগুলো ইটের ঘর ছিল। এই ধরনের একটি বাড়ির সামনে এসে প্রেতাত্মা থমকে দাঁড়াল।
উইলি বলল, এই দরজায় কড়া নাড়তে হবে।
মার্গেরি বলল, ও উইলি, আমরা ওদের চিনি না। ওরা দরজা খুললে কী বলব ওদের?
দরজায় আমাদের করাঘাত করতে হবে। উইলি বারবার এই কথাটা বলতে লাগল।
সেই বাড়ির একটা ঘরে টম লিনডেনের স্ত্রী কারাবাসরত তার স্বামীর কথা ভাবছিল। এমন সময় তাকে কে যেন ডাকল। সে দরজা খুলেই তার স্বামীর ভাইয়ের ছেলে উইলি আর তার ছোট বোনকে দেখল। সঙ্গে সঙ্গে তার নারীসুলভ মাতৃসত্তা জেগে উঠল। সে দু’হাত দিয়ে স্নেহভরে দুঃস্থ ছেলেমেয়ে দুটির গলা জড়িয়ে ধরল। ছেলেমেয়ে দুটির মনে হলো এক বিশাল বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ওরা যেন এক শান্তির বন্দরে এসে পড়েছে। যেখানে আর কোন ঝড়ের আঘাতে জর্জরিত হতে হবে না ওদের।
সেদিন রাতে বলটোন কোর্টে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
সাইলাসের প্রতিবেশীদের অনেকে ভাবতে লাগল তারা যখন এক জায়গায় বাস করছে তখন তাদের মধ্যে সম্পর্ক আছে। তাদের মধ্যে কেউ কোন অন্যায় করলে তার প্রতিবাদ করা উচিৎ তাদের। আবার কেউ কেউ ভাবল যার যা খুশি করতে পারে। কারও কোন ব্যাপারে নাক গলানো উচিৎ নয় তাদের।
সেদিন রাতে ইহুদী মহিলা রেবেকা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল। সে তার ঘরের জানলা দিয়ে একা বাড়িগুলোর সামনে উপর থেকে আসা ল্যাম্পের আলোর হলুদ বৃত্তটার মধ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে ছিল। এমন সময় সাইলাস লিনডেন এসে ঘরে ঢুকল। সে যা আশা করে গিয়েছিল তা হয়নি। সে এবার এক বক্সিং খেলায় যোগাদান করে কিছুই লাভ করতে পারেনি। শুধু কয়েকটা আঘাত পেয়েছে। তার মনের অবস্থাটা তখন খুবই ভয়ঙ্কর ছিল। আসার পথে একটা মদের দোকানে এক পাত্র কড়া মদ পান করেছিল কিন্তু তাতে তার তৃপ্তি হয়নি। তার প্রতিবেশীদের বিশেষ করে তার পাশের ঘরে সেই ইহুদী মহিলার উপর মনোভাবটা হিংসা হয়ে উঠল। সে ভাবল সে তার ছেলেমেয়েদের ইচ্ছা মতো শ্যাসন করবে। এটা তার অধিকার। তার এই অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার কারও নেই। সে যখন তার ছেলেমেয়েদের শাসন করবে তখন প্রতিবেশীদের কেউ তাদের সামনে এসে ঝগড়া করে কোন অধিকার? সে তাই ঠিক করল—আগামী কাল সকালে সে তার ছেলেমেয়ে দুটোকে ঘর থেকে রাস্তায় টেনে এনে প্রতিবেশীদের সামনে দারুণভাবে প্রহার করবে। শুধু প্রাণে বাঁচিয়ে রাখবে। তখন তাকে বাধা দেবার ক্ষমতা আর আছে দেখে নেবে।
সাইলাস আবার ভাবল—কাল সকালে কেন, আজ এই নিশীথ রাতে এখনি তো সে কাজটা করা যায়। সে তার ছেলেমেয়ে দুটিকে বাইরে এনে প্রহার করবে। তাদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা সবাই জেগে উঠবে। সেটাই তো ভাল হবে। দেখা যাবে কে তাকে বাধা দিতে আসে।
এই ভাবে আরও জোরে পা চালিয়ে দিল সাইলাস।
সেদিন রাতে এক দারুণ দুর্ঘটনার কবলে পড়ল সাইলাস। নেশার ঘোষের বাড়ি ঢোকার পথে মদের কারখানার একটা শুকনো চৌবাচ্চার মধ্যে পড়ে গেল সে। সাধারণত সেটা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা থাকে। কিন্তু সেদিন ঢাকনাটা দেওয়া হয়নি কেন তা কেউ বলতে পারে না। ফলে সাইলাস অতর্কিতে আঠারো ফুট নিচে এবড়ো-খেবড়ো পাথরের নিচে পড়ে যায়। তার পিঠের মেরুদণ্ডটা ভেঙে যায়। রাত্রিবেলায় সেই অবস্থায় কেউ তাকে দেখতে পায়নি। সাইলাস একাই অন্ধকারে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে রক্তবমি করতে থাকে। রক্তের সঙ্গে কিছু মদও বেরিয়ে আসে। ক্রমে তার ভারী ও বলিষ্ঠ চেহারাটা নিথর ও নিস্পন্দ হয়ে যায় সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে।
এই রকম এক শোচনীয় অবস্থায় সাইলাসের নোংরা জীবনের অবসান হয়। সারা নামে যে মহিলাটি তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে থাকত, তার প্রতি কেউ সহানুভূতি জানাল না। তার ভার নেবার কেউ ছিল না। ফলে যেখান থেকে সাইলাস শুধু গায়ের জোর দেখিয়ে তাকে এনেছিল, সে নীরবে সেইখানে চলে গেল। সারা আগে পেশাদার গাইয়ে ছিল। বিভিন্ন হলঘরে মঞ্চের উপর বসে শ্রোতাদের সামনে গান গাইত। সেখান থেকে একদিন সাইলাস তার ষাঁড়ের মতন দৈহিক শক্তির ঐশ্বর্য দেখিয়ে সারাকে নিয়ে আসে। সাইলাসের মৃত্যুর পর তার আগের পেশায় ফিরে গেল সারা। কিন্তু তার আগেকার খ্যাতি সে ফিরে পেল না। কিছুদিন পর তাকে আর দেখা গেল না। তার নামও আর শোনা গেল না। জীবনের চোরাবালিতে কখন কীভাবে সে ডুবে গেল তা কেউ জানতে পারল না।
