অধ্যায় ৬ ॥ মহাজাগরণ
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অসাধারণ ঘটনাটির একেবারে শেষ পর্বে আমি পৌঁছে গেছি। এই বিবরণটি লিপিবদ্ধ করার শুরুতেই বলেছি, এই ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন এটাই অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণীর মধ্যে এক মহান গিরিশৃঙ্গের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ কখনও বুঝতে পারে না সে কত অক্ষম ও অজ্ঞান; একটি অদৃশ্য হাতের সে একটি পুতুলমাত্র। মৃত্যু আমাদের শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমরা জানি যে কোনও মুহূর্তে সে আবার হানা দিতে পারে।
অবশ্য আমাদের এই মহাজাগরণের সঠিক লগ্নটি সম্পর্কে বেশ কিছুটা মতভেদ আছে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে “বিগ বেন” ঘড়ির কাঁটা যে ছটা বেজে দশ মিনিটের ঘরে ছিল তার অসংখ্য সাক্ষী আছে। ‘এস্ট্রোনমার রয়েল’-এর মতে সময়টা ছিল গ্রীনউইচ সময় ছ’টা বেজে বারো মিনিট। অপরপক্ষে পূর্বএঙ্গলিয়ার অতি দক্ষ পর্যবেক্ষক সময়টা লিখে রেখেছিলেন ছ’টা বিশ। হেব্রাইডিস-এ সময়টা ছিল একেবারে সাতটা। আমাদের বেলায় কিন্তু সন্দেহের কোনও অবকাশই থাকতে পারে না, কারণ ঠিক সেই মুহূর্তটাতে আমি বসে ছিলাম চ্যালেঞ্জারের স্টাডিতে, আর তাঁর নিখুঁত স্কোনোমিটারটি ছিল আমার সমুকে। সময়টা ছিল ছ’টা বেজে পনেরো মিনিট
আমার মনের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছিল। আমার দেহটা ছিল জন্তুর মতো, আর আমার শারীরিক শক্তিও ছিল এত বেশি যে কোনও রকম মানসিক অস্পষ্টতা আমার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারত না। যে কোনও অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখাই ছিল আমার স্বভাব। কিন্তু সেই সময়টাতে আমিও যেন কেমন একটা বিষম অস্পষ্টতার শিকার হয়ে পড়েছিলাম। অন্য সকলেই নিচে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিলেন। আমি বসে ছিলাম খোলা জানালার পাশে, আমার থুতনিটা হাতের উপর রাখা ছিল, আর আমার মনটা ডুব দিয়েছিল দুঃখ- দুর্দশার অকূল পাথারে। আমরা কি বেঁচে থাকতে পারব? প্রশ্নটা নিজেকেই করতে শুরু করেছিলাম। একটা নিষ্প্রাণ জগতে বেঁচে থাকা কি সম্ভব? কেমন করে আসবে সেই শেষের দিনটি? বিষটা ফিরে আসার পরেই কি? অথবা এই সার্বিক পচনজনিত দুর্গন্ধে পৃথিবীটাই বাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে? আর, শেষ পর্যন্ত সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলব? একটা মৃত জগতে বাস করবে একদল উন্মাদ! এই সব দুশ্চিন্তার মধ্যে প্রায় ডুবে গিয়েছিলাম এমন সময় একটা তুচ্ছ শব্দ কানে আসতেই আমি নিচের রাস্তাটার দিকে তাকালাম। গাড়ি-টানা বুড়ো ঘোড়াটা পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠে আসছিল।
আবার সেই একই মুহূর্তে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম পাখিদের কিচির-মিচির, নিচের উঠোনে একজন কারও কাশির শব্দ, দূরে দূরে দেখতে পাচ্ছিলাম কিছু লোকের চলাফেরা। তবে এটাও মনে আছে যে আমার দৃষ্টিটা নিবদ্ধ ছিল সেই নড়বড়ে গাড়িটার দিকেই। তারপরেই আমার চোখ পড়ল গাড়ির বক্সের উপরে আসীন চালকটির উপর। এবং শেষ পর্যন্ত একটি যুবকের উপর যে জানালার ভিতর দিয়ে মুখটা বের করে উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে পথের নির্দেশ দিচ্ছিল। তারা সকলেই যে সত্যি সত্যি জীবিত ছিল সেটা তো স্পষ্টতই নিঃসন্দেহ!
আবার সকলেই বেঁচে উঠেছে! তাহলে যা কিছু দেখেছিলাম সবই কি চোখের ভুল? এটা কি চিন্তাও করা যায় যে বিষাক্ত ভূখণ্ডের গোটা ব্যাপারটাই একটা দীর্ঘায়ত স্বপ্নমাত্র? নিচের দিকে তাকালাম—ওই তো দেখতে পাচ্ছি নতুন করে বেঁচে-ওঠা জগৎটাকে—যেন ভরা কোটালের জোয়ারে ভাসছে নতুন জীবন। সেদিকে তাকাই আদিগন্ত সেই একই দৃশ্য—যা ছিল স্তব্ধ, প্রাণহীন, কী আশ্চর্য, সে সবই এখন হয়ে উঠেছে চলমান। ওই তো সেই গল্ফ-খেলুড়ের দল। এও কি সম্ভব যে তারা একটানা খেলেই যাচ্ছে? ফসল-কাটিয়েরা আবার যার যার কাজে যাচ্ছে। নার্স-মেয়েটি একটি শিশুর গালে চড় কষিয়ে পেরাম্বুলেটারকে ঠেলে উপরে তুলে আনছে। প্রত্যেকেই যেখানে যে কাজটা করছিল আবার সেখান থেকেই শুরু করেছে।
ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম; দরজাটা হাট করে খোলা। শুনতে পেলাম উঠোনে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গীরা সবিস্ময়ে পরস্পরকে ডাকছেন, অভিনন্দন জানাচ্ছেন। লর্ড জন চেঁচিয়ে বলছেন, “নিশ্চয়ই ওরা এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল না! এ সব কথা ছাড়ুন তো চ্যালেঞ্জার। আপনি নিশ্চয় বিশ্বাস করেন না যে ওই মানুষগুলি তাদের স্থির দৃষ্টি, শক্ত, অচল হাত-পা এবং মৃত্যু-বিকৃত মুখ নিয়ে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল।’
চ্যালেঞ্জার বললেন, “এ সব কিছু কেবলমাত্র সেই অবস্থাটাই হতে পারে যাকে বলে অপস্মার রোগ। অতীতেও এই বিরল ঘটনাটা কখনও কখনও ঘটেছে এবং সেটাকে ভুল করে মৃত্যু বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এ সব ক্ষেত্রে মৃত্যুর সব লক্ষণই প্রকাশ পায়—বস্তুত সেটা মৃত্যুই, তবে ক্ষণকালের মৃত্যু।”
সামারলী টিপ্পনি কাটলেন, “আপনি এটাকে অপস্মার আখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু আর যাই হোক, ওটা তো একটা নামমাত্র, আর এই অবস্থাটাকে আমরা ঠিক ততটুকুই জানি যতটুকু জানি তার কারণস্বরূপ ওই বিষটাকে। খুব বেশি হলে আমরা কেবল এটাই বলতে পারি যে বিষাক্ত ইথার একটি ক্ষণস্থায়ী মৃত্যু ঘটিয়েছিল।”
এমন সময় কানে এল কাঁকর-ঢালা রাস্তায় গাড়ির চাকার ঘর্ঘর্ আওয়াজ। সেই গাড়িটাই চ্যালেঞ্জারের দরজায় এসে দাঁড়াল। যুবক যাত্রীটিকে গাড়ি থেকে নামতে দেখলাম। একটু পরেই হঠাৎ ঘুম থেকে ওঠা আলুথালু বেশে ট্রের উপরে একটা কার্ড নিয়ে কাজের মেয়েটি এসে হাজির হলো। সেদিকে চোখ পড়তেই চ্যালেঞ্জার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তাঁর মাথার সব চুল খাড়া হয়ে উঠল।
রাগে গর-গর করে তিনি গর্জে উঠলেন, “এক সাংবাদিক!” তার পরেই মৃদু হেসে বললেন, “আরে, এটাই তো স্বাভাবিক যে এই ঘটনাটা সম্পর্কে আমার চিন্তা-ভাবনার কথা জানতে সারা বিশ্বই তো এখানে এসে হাজির হবে।”
আমি কার্ডটার দিকে তাকালাম : “জেমস বাক্সটার, লন্ডনের সংবাদদাতা, ‘নিউ ইয়ক মনিটর’।”
“দেখা করবেন তো?” আমি বললাম।
“আমি করছি না।” মস্ত বড় একগুঁয়ে মাথাটা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ওহে ম্যালোন, এরা তো বিষ-কুম্ভের বাচ্চা! আমার সম্পর্কে কোনওদিন একটা ভাল কথা লিখেছে কি?”
জবাবটা আমিই দিলাম, “আপনিও কি কোনও দিন তাদের একটা ভাল কথা বলেছেন? ভেবে দেখুন স্যার, একটি অপরিচিত লোক অনেক পথ পার হয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আমি ঠিক জানি, আপনি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না।”
গজ গজ করতে করতে তিনি বললেন, “হয়েছে, হয়েছে, তুমিও আমার সঙ্গে চল। যা বলবার তুমিই বলবে। আমার ব্যক্তিগত জীবনের উপর এ রকম অযথা আক্রমণের বিরুদ্ধে আমি কিন্তু আগাম প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম।”
চটপটে মার্কিন যুবকটি নোট-বইটা বের করে সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে দিলেন। মুখে বললেন, “দেখুন স্যার, আমি এখানে ছুটে এসেছি কারণ আমেরিকার লোকরা আপনার মুখ থেকেই শুনতে চায় এই পৃথিবীটার উপর যে বিপদ নেমে এসেছে সে বিষয়ে আপনার কি বলার আছে।”
সাংবাদিকটি ঈষৎ বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকালেন। শুধালেন, “আপনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, তাই তো?”
“হ্যাঁ স্যার, ওটা আমারই নাম।”
“আমি বুঝতেই পারছি না তাহলে আপনি কি করে বলছেন যে সে রকম কোনও বিপদ নেই। লন্ডন ‘টাইমস্’-এর আজকের সকালের সংখ্যায়ই আপনার নিজের নামসহ যে চিঠিটা ছাপা হয়েছে আমি তার কথাই বলছি।”
এবার চ্যালেঞ্জারের অবাক হবার পালা।
তিনি বললেন, “আজ সকালে? আজ সকালে তো লন্ডন “টাইমস্’-এর কোনও সংখ্যা প্রকাশিতই হয়নি।”
মৃদু ক্ষোভের স্বরে মার্কিন যুবকটি বললেন, “অবশ্যই হয়েছে স্যার। লন্ডন ‘টাইমস্’ যে একটা দৈনিক পত্রিকা সেটা তো আপনাকে স্বীকার করতেই হবে।” তিনি ভিতরের পকেট থেকে একখানা পত্রিকা টেনে বার করলেন। “এই দেখুন, সেই চিঠি।”
চাপা হাসি হেসে চ্যালেঞ্জার নিজের হাত ঘষতে লাগলেন।
বললেন, “এবার বুঝেছি। তাহলে এই চিঠিটা আপনি পড়েছেন আজ সকালে?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“আর সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছেন আমার সাক্ষাৎকার নিতে?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“পথে আসতে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছে কি?”
“দেখুন স্যার, সত্যি কথা বলতে গেলে, আপনাদের লোকজনদের আগের চাইতে বেশি জীবন্ত ও মানবিক বলে মনে হয়েছে। মালবাহী লোকটি তো একটা মজার গল্পই বলতে শুরু করেছিল। এ দেশে এসে তো আমার নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে।”
“আর কিছু হচ্ছে না?”
“কৈ? না তো, সে রকম কিছু তো মনে পড়ছে না।”
“আচ্ছা, এবার বলুন তো কটার সময় আপনি ভিক্টোরিয়া ছেড়েছিলেন?” মার্কিন যুবকটি হাসলেন।
“প্রফেসর, আমি এসেছি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে, কিন্তু এখানে তো যা কিছু বক্ করার সেটা আপনিই করে যাচ্ছেন।”
“তার কারণ এই ব্যাপারটাতেই আমি অধিক আগ্রহী। যাত্রার সঠিক সময়টা কি আপনার মনে আছে?”
“নিশ্চয়! তখন বেলা সাড়ে বারোটা।”
“আর কখন এখানে পৌঁছলেন?”
“সওয়া দুটোর সময়।”
“তারপরেই আপনি গাড়িটা ভাড়া করলেন?”
“ঠিক তাই।”
“এ জায়গাটা স্টেশন থেকে কতটা দূরে বলে আপনার মনে হয়?”
“তা—অন্তত দুই মাইল তো বটেই।”
“এই পথটা আসতে কতটা সময় লেগেছে বলে আপনার ধারণা?”
“সেটাও আধ ঘণ্টা তো হবেই।”
“তাহলে এখন তো তিনটে বাজার কথা?”
“হ্যাঁ, অথবা একটু বেশিও হতে পারে।”
“আপনার ঘড়িটা দেখুন তো।”
মার্কিন যুবকটির তথাকরণ, আর তারপরেই তিনি অবাক বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকালেন।
চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “আরে, ঘড়িটা তো বন্ধ হয়ে গেছে। ঘোড়াটা এত দ্রুত ছুটে এসেছিল যে ভাবা যায় না। সূর্যটার দিকে তাকিয়ে দেখছি, সেটাও অনেকটা নিচে নেমে গেছে। কি জানেন, এখানে এমন অনেক কিছু দেখছি যা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
“পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা কি আপনার মনে পড়ছে?”
“দেখুন, এখন মনে হচ্ছে একবার বোধ হয় আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছিল। মনে পড়ছে, কোচোয়ানটিকে কি যেন বলতেও চেয়েছিলাম, অথচ আমার কথা তার কানেই ঢুকছিল না। হয়তো প্রচণ্ড গরমের জন্যই তেমনটি হয়েছিল। তবে এটা ঠিক যে এক মুহূর্তের জন্য আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গিয়েছিল—সব কিছুই অস্পষ্ট দেখছিলাম। ব্যস, ঐ পর্যন্তই।”
আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, “গোটা মানুষ জাতিরই ঐ রকম মাথা ঘুরে গেছে। মুহূর্তের জন্য সব কিছু আবছা, ভাসা-ভাসা হয়ে গেছে। এখনও কেউই বুঝতে পারছে না কী ঘটেছিল। সকলেরই হাতের কাজ থেমে গিয়েছিল। দেখো ম্যালোন, তোমার সম্পাদকও আবার তাঁর পত্রিকা প্রকাশ করবেন, আর যখন দেখবেন যে একটা সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না তখন তিনিও অবাক হয়ে যাবেন।” তারপর হঠাৎই মার্কিন সাংবাদিকটির দিকে মুখ ফিরিয়ে অতিমাত্রার হাল্কা মেজাজে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ গো, তরুণ বন্ধু একটা কথা জানতে হয়তো আপনিও আগ্রাহী হবেন। কি জানেন, সমগ্র জগৎটাই ইথার-মহাসমুদ্রে বহমান একটি বিষাক্ত ঘূর্ণাবর্তকে সাঁতার কেটে পার হয়ে এসেছে। আগামী দিনে আপনার কাজের সুবিধার জন্য দয়া করে আরও লিখে রাখুন যে আজকের দিনটা সাতাশে অগাস্ট শুক্রবার নয়, আঠাশে অগাস্ট শনিবার, এবং আপনি আঠাশটি ঘণ্টা আপনার গাড়ির মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে বসেছিলেন রদারফিল্ড পাহাড়ের বুকে।”
আর এখানেই আমার এই বিবৃতির উপর ইতি টানতে পারি। তুমি হয়তো বুঝতেই পেরেছ যে ‘ডেইলি গেজেট’-এর সোমবারের সংখ্যায় যে বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছিল—যেটা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক ‘স্কুপ’ হিসাবে সর্বসম্মত স্বীকৃতি লাভ করেছে, যার বিক্রয়-সংখ্যাটা সাড়ে তিন মিলিয়ন কপির নিচে নয়—বর্তমান বিবরণটি তারই একটি পূর্ণতর এবং অধিকতর বিস্তারিত রূপমাত্র।
আমার নিভৃত কক্ষের দেয়ালে ফ্রেমে-বাঁধানো সেই চমৎকার শিরোনামগুলি আজও সযত্নে রক্ষিত আছে :
আটাশ ঘণ্টা ব্যাপী বিশ্বময় অচৈতন্য
অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা
চ্যালেঞ্জার সমর্থিত
আমাদের সংবাদদাতা নিরাপদ
আকর্ষণীয় বিবরণ
অক্সিজেন কক্ষ
অলৌকিক মোটর-যাত্রা
নিষ্প্রাণ লন্ডন
হারানো পাতার পুনঃসংযোজন
ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড ও জীবনহানি
আবার ঘটবে কি?
এই গৌরবময় শিরোনাম-তালিকার নিচেই ছিল সাড়ে নয় কলামব্যাপী একটি প্রতিবেদন যাতে লেখা হয়েছিল একটি গ্রহের প্রথম, শেষ এবং একমাত্র ইতিহাস, অবশ্য মাত্র একটি দিনের মধ্যে একজন পর্যবেক্ষকের পক্ষে তার যতটা চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। চ্যালেঞ্জার এবং সামারলী একটি যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু তার একটি জনপ্রিয় বিবরণ লেখার দায়িত্বটা একমাত্র আমার উপরেই বর্তেছিল। অতএব যবনিকা পতনের গানটি অবশ্য আমিই গাইতে পারি। এত সব ঘটনার পরে একজন সাংবাদিকের জীবনে অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স ছাড়া আর কীই-বা জুটতে পারে!
কিন্তু আলোড়নসৃষ্টিকারী শিরোনাম আর ব্যক্তিগত জয়-গৌরবের কথা দিয়েই আমার এই কাহিনিকে শেষ করতে চাই না। বরং এই বিষয়টি দিয়ে শ্রেষ্ঠ দৈনিক সংবাদপত্রটির যে প্রশংসার্হ সম্পাদকীয় নিবন্ধটি শেষ করা হয়েছিল—প্রত্যেক চিন্তাশীল মানুষই ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর জন্য যে নিবন্ধটিকে অবশ্যই নথিভুক্ত করে রাখতে পারেন—তারই কিছু গম্ভীর বাক্যাংশের উদ্ধৃতি দেবার অনুমতি আমি চেয়ে নিচ্ছি।’দি টাইমস’ পত্রিকায় বলা হয়েছিল
“…যথাযথ শিক্ষালাভের জন্য জগৎটাকে একটা ভয়ংকর দাম দিতে হয়েছে। এই আপৎকালের সম্পূর্ণ কাহিনি আমরা এখনও জানতে পারিনি, কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ফলে নিউ ইয়র্ক, অর্লিয়েন্স এবং ব্রাইটন ধ্বংস হয়ে যাওয়াই তো আমাদের জাতির ইতিহাসের অন্যতম এক মহত্তম ট্র্যাজিডি। তবু জীবন ও সম্পদের বস্তুগত ক্ষতিটা যত বড়ই হোক, আজ আমাদের মনে সেই চিন্তাটাই যেন সব চাইতে বড় হয়ে না ওঠে। কালের চক্রপথে একদিন হয়তো সে সব কিছুই আমরা ভুলে যাব। কিন্তু যা কোনও দিন ভুলব না, যা আমাদের কল্পনাকে চিরকাল আচ্ছন্ন করে রাখবে এবং রাখা উচিত সেটা হচ্ছে বিশ্বজগতের নানা বিচিত্র সম্ভাবনার এই প্রকাশ, আমাদের অজ্ঞান আত্ম-সন্তুষ্টির এই বিনষ্টি, আর আমাদের বাস্তব অস্তিত্বের পথটা কত সংকীর্ণ এবং তার দুই দিকে কী প্রকাণ্ড গহ্বর লুকিয়ে আছে তারই অখণ্ডনীয় প্রমাণ। আজ গাম্ভীর্য আর নম্রতাই আমাদের সমস্ত আবেগের ভিত্তিস্বরূপ। অধিকতর ঐকান্তিক এবং শ্রদ্ধাশীল একটা জাতি যেন সেই ভিত্তির উপরেই গড়ে তুলতে পারে একটি যোগ্যতর মন্দির।”
অনুবাদ : মণীন্দ্র দত্ত
