অধ্যায় ২ ॥ মৃত্যুর জোয়ার
আমরা হলটা পার হতেই টেলিফোনটা বেজে উঠল, আর প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের প্রান্ত থেকে যে সংলাপ শুরু হলো আমরাও তার অনিচ্ছাকৃত শ্রোতা হয়ে গেলাম। আমি বললাম বটে “আমরা”, কিন্তু সেই রাক্ষুসে কণ্ঠস্বরের গর্জন সমস্ত বাড়িটাতে এমনভাবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল যে একশো গজের মধ্যে যে কোনও মানুষের সেটা না শোনার উপায় ছিল না। তার জবাবী কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই, আমিই বলছি… হ্যাঁ, নিশ্চয়, বিখ্যাত অধ্যাপক প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আবার কে?… অবশ্যই, এর প্রতিটি অক্ষর, অন্যথায় আমি এটা লিখতামই না।… আমার অবাক হওয়া উচিত নয়… এর সব রকম ইঙ্গিত তাতে আছে.. খুব বেশি হলে একটা দিন, বা তার কাছাকাছি… দেখুন, এ ব্যাপারে আমি নিরুপায়, নয় কি?… খুবই অপ্রীতিকর, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি তো মনে করি আপনার চাইতেও অনেক বেশি তালেবর মানুষরাও এতে আঘাত পাবে… এ নিয়ে ঘ্যান-ঘ্যান করে কোনও লাভ নেই।… না, সম্ভবত আমি পারিনি। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন।… সেটাই যথেষ্ট মশায়। বাজে কথা! এই সব বকানি শোনার চাইতে অনেক বড় কাজ আমার আছে।”
সশব্দে টেলিফোনটা রেখে দিয়ে তিনি আমাদের নিয়ে উপরতলার একটা বড় খোলামেলা ঘরে উঠে গেলেন। সেটাই তাঁর স্টাডি। মেহগেনি কাঠের মস্তবড় ডেস্কটার উপর সাত-আটটা না-খোলা টেলিগ্রাম পড়ে ছিল।
সেগুলো তুলে নিতে নিতে তিনি বলতে লাগলেন, “সত্যি, আমি ভাবছি যে আমার একটা টেলিগ্রাফের ঠিকানার ব্যবস্থা করতে পারলে আমার সংবাদদাতাদের অনেকগুলি টাকা বেঁচে যায়। সম্ভবত ‘নোয়া, রদারফিল্ড ‘-ই সব চাইতে উপযোগী হবে।”
যে কোনও রকম ঠাট্টা-তামাশার সময়ই তিনি যেটা করে থাকেন সেই মতোই ডেস্কটাতে হেলান দিয়ে তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, আর তাঁর হাত দুটো এমনভাবে কাঁপতে লাগল যে তিনি খামগুলি খুলতেই পারছিলেন না।
বীটপালংয়ের শিকড়ের মতো মুখ করে তিনি “নোয়া! নোয়া!” বলে হাঁপাতে লাগলেন। লর্ড জন ও আমি সহানুভূতির হাসি হাসলাম, আর সামারলী কপট মতানৈক্য জানাতে একটা পেট-রোগা ছাগলের মতো মাথাটা নাড়তে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জার কোনও রকমে টেলিগ্রামগুলি খুলতে শুরু করলেন। আমরা তিনটি প্রাণী অর্ধচন্দ্রকার জানালাটার কাছে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে বাইরের চমৎকার দৃশ্যাবলির প্রশংসা করতে লাগলাম।
সত্যি, চোখ মেলে চেয়ে দেখার যোগ্য বটে। আঁকাবাঁকা রাস্তাটা আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল বেশ কিছুটা উচ্চতায়—পরে জেনেছিলাম, সাতশো ফুট উঁচু। চ্যালেঞ্জারের বাড়িটা ছিল একটা পাহাড়ের একেবারে শেষ প্রান্তে, জানালাটা ছিল দক্ষিণমুখী—যতদূর চোখ যায় ঢেউ-খেলানো বনভূমি আন্দোলিত দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। কিছুটা দক্ষিণে দেখতে পেলাম লন্ডন থেকে ব্রাইটন-এ যাবার প্রধান রেল- পথের একটা অংশ। বাড়িটার ঠিক সম্মুখে একেবারে আমাদের নাকের ডগায় ছিল একটা ঘেরা উঠোন; সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল সেই গাড়িটা যাতে চেপে আমরা স্টেশন থেকে এসেছি।
চ্যালেঞ্জারের একটা উচ্ছ্বসিত কথা কানে যেতেই আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম। টেলিগ্রামগুলো পড়া হয়ে গেলে তিনি সেগুলিকে বেশ নিপুণভাবে সাজিয়ে রাখছিলেন। দাড়ির জঞ্জালে ঢাকা প্রশস্ত মুখের যতটা চোখে পড়ছিল সেটা তখনও বেশ রক্তিম দেখাচ্ছিল; মনে হচ্ছিল তিনি যেন খুবই উত্তেজিত হয়েছিলেন।
যেন কোনও জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন সেই রকম গলায় তিনি বলে উঠলেন, “শুনুন ভদ্রজনরা, এটা একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পুনর্মিলন, আর সেটা ঘটছে একটা অসাধারণ—বলতে পারি অভূতপূর্ব—পরিবেশে। আমি কি জিজ্ঞাসা করতে পারি যে শহর থেকে আসার পথে আপনারা কি কিছু লক্ষ্য করেছেন?”
একটু খিটখিটে হাসি হেসে সামারলী বললেন, “একমাত্র যে জিনিসটি আমি লক্ষ্য করেছি সেটা এই যে বিগত কয়েকটা বছর পরেও এখানে উপস্থিত আমাদের যুবক বন্ধুটির আচরণের কোনও উন্নতি ঘটেনি। আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি যে ট্রেনের মধ্যে তার আচরণ সম্পর্কে আমার গুরুতর অভিযোগ ছিল এবং আছে, এবং যদি আমি না বলি যে তার আচরণ আমার মনে অত্যন্ত অপ্রীতিকর একটা দাগ ফেলেছে সেটাই হবে আমার খোলা মনের অভাবের নিদর্শন।”
লর্ড জন বলে উঠলেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, কখনও কখনও আমরা সকলেই কিছুটা গদ্যময় হয়ে উঠি। যুবা মানুষটি কিন্তু আমাদের কোনও রকম সত্যিকারের আঘাত দিতে চায়নি। আর যাই হোক, সে একটি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, কাজেই সে যদি একটা ফুটবল খেলার বিবরণ দিতে আধা ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়, তাহলেও সেটা করার অধিকার অধিকাংশ মানুষের চাইতে তার কিছু বেশিই আছে।”
আমি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে বলে উঠলাম, “একটা খেলার বিবরণ দিতে আধা ঘণ্টা! সে কি, মহিষ সম্পর্কে একটা লম্বা, টানা গল্প বলতে আপনারও তো আধা ঘণ্টা লেগেছিল। প্রফেসর সামারলীই আমার সাক্ষী আছে।”
সামারলী বলে উঠলেন, “তোমাদের মধ্যে কে যে পুরোপুরিই ক্লান্তিকর ছিল তার বিচার আমি করতে পারব না। আর চ্যালেঞ্জার আপনাকেও বলে দিচ্ছি যে যতদিন বেঁচে আছি ততদিন আমি কখনও ফুটবল অথবা মহিষের কথা শুনতে চাইব না।”
“আজ কিন্তু আমি ফুটবল সম্পর্কে একটা কথাও বলিনি!” আমি প্ৰতিবাদ জানালাম।
লর্ড জন একটা কর্কশ শিস দিলেন, আর সামারলী বিষণ্ন ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে লাগলেন।
একসময় লর্ড জন বললেন, “দেখা যাচ্ছে যে অন্যে কে কী করেছে সেটা আমরা প্রত্যেকেই জানি, কিন্তু স্বয়ং কি করছেন সেটা কিন্তু আমরা কেউ জানি না। তাই একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করা যাক। আমরা একটা প্রথম শ্রেণীর ধূমপানের ঘরে ঢুকলাম; ঠিক আছে, তাই তো? তারপরেই ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত বন্ধুবর চ্যালেঞ্জারের একটা চিঠি নিয়ে আমরা ঝগড়া শুরু করে দিলাম।”
আমাদের গৃহকর্তার চোখের পাতা তখন বুজে আসছিল। তিনি হড়হড় করে বললেন, “ওঃ, তাই বুঝি? সত্যি নাকি?”
“সামারলী, আপনিই তো বলেছিলেন যে তার বক্তব্যের মধ্যে সত্যের লেশমাত্র ছিল না।”
দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে চ্যালেঞ্জার বুক চিতিয়ে বলে উঠলেন, “বলেন কি! লেশমাত্র নয়! মনে হচ্ছে কথাটা আগেও শুনেছি। আমি কি জিজ্ঞাসা করতে পারি, একটি সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের সম্ভাবনা সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশের দুঃসাহস করেছিল বলে তাকে ধূলিসাৎ করবার জন্য বিখ্যাত মহান প্রফেসর সামারলী মহোদয় কি কি যুক্তির অবতারণা করেছিলেন?’
স্বীয় গজবৎ রসিকতার কথাগুলি বলতে বলতে তিনি নতমস্তকে দুই কাঁথে ঝাঁকুনি দিয়ে খোলা হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
একগুঁয়ে স্বভাবের সামারলী বললেন, “কারণটি যথেষ্ট সহজ, সরল। আমার বক্তব্য ছিল, পৃথিবীর চারদিককার ইথার যদি একটা অঞ্চলে এতই বিষাক্ত হয়ে পড়ে যে তার ফলে সেখানে ভয়ংকর সব লক্ষণ দেখা দেয়, সে ক্ষেত্রে একটা রেলের কামরার মধ্যে আমরা তিনটি প্রাণীই সম্পূর্ণ অনাক্রান্ত থাকব সেটা কখনও হতে পারে না।”
এই ব্যাখ্যা শুনে চ্যালেঞ্জার তো হেসেই খুন। তার সেই হাসির দাপটে কামরার সব জিনিসপত্র খটাখট শব্দে কাঁপতে শুরু করল।
শেষ পর্যন্ত উত্তপ্ত ভুরুকে মুছতে মুছতে তিনি বলতে লাগলেন, “আমাদের সুযোগ্য সামারলীর যে বর্তমান ঘটনাবলীর সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ নেই, এটাই তার প্রথম প্রকাশ নয়। ভদ্রমহোদয়গণ, এবার বলি, আজকের সকালবেলায় আমি কী করেছি সেটা আপনাদের সবিস্তারে বলার চাইতে অন্য কোনও ভাবে আমার বক্তব্যটা পরিষ্কার করে বোঝাতে পারব না। বেশ কয়েক বছর যাবৎ আমাদের সংসারে সারা নাম্নী একজন গৃহরক্ষিকা আছেন—যাঁর দ্বিতীয় নামটা আমি কখনও মনে রাখার চেষ্টাও করিনি। তিনি একজন কঠোর এবং অপ্রীতিকর স্বভাবের মানুষ; অত্যন্ত উদাসীন, তার মধ্যে কখনও কোনও আবেগের লক্ষণ আমরা দেখিনি। আমি একাই প্রাতরাশে বসেছিলাম—সকালটা নিজের ঘরে কাটানোই মিসেস চ্যালেঞ্জারের স্বভাব। হঠাৎই আমার মাথায় ঢুকল যে সেই নারীটির স্থির প্রশান্তির সীমা-পরিসীমাটা কতদূর সেটা আবিষ্কার করাটা অবশ্যই মজাদার ও শিক্ষণীয় হবে। সঙ্গে সঙ্গে একটা সরল ও ফলপ্রসূ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিকল্পনাও আমার মাথায় এসে গেল। চাদরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে বসানো ছোট ফুলদানিটাকে উল্টে দিয়ে আমি ঘণ্টাটা বাজিয়েই টেবিলটার নিচে ঢুকে পড়লাম। তিনি ঘরে ঢুকলেন, ঘরটা ফাঁকা দেখে ধরে নিলেন আমি স্টাডিতে চলে গিয়েছি। আমার প্রত্যাশা মতোই তিনি এগিয়ে এসে ফুলদানিটা বসিয়ে দেবার জন্য টেবিলের উপর একটু ঝুঁকে দাঁড়ালেন। আমি দেখতে পেলাম একটি সুতীর মোজা আর ইলাস্টিক লাগানো একপাটি জুতো। মাথাটা বাড়িয়ে আমি তার পায়ের গুলিটাতে দাঁত বসিয়ে দিলাম। আমার হাতে-কলমে পরীক্ষাটা আশাতীত রকমের সাফল্য লাভ করল। আমার মাথার দিকে তাকিয়ে তিনি কয়েকটা মুহূর্ত অবশের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর একটা আর্তনাদ করে তিনি ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি তাঁর পিছু নিলাম, কিন্তু তিনি যেন উড়াল দিয়ে পথে নেমে গেলেন, এবং কয়েক মিনিট পরে আমি ফিল্ডগ্লাস দিয়ে দেখতে পেলাম তিনি অতি দ্রুত দক্ষিণ- পশ্চিম দিকে ছুটে চলেছেন। ঘটনাটা আমি যথাযথভাবেই আপনাদের বললাম। সব কিছু আপনাদের মস্তিষ্কে ঢেলে দিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। কোনও রকম আলোকপাত হচ্ছে কি? এটা আপনাদের মনের কাছে কিছু পৌঁছে দিয়েছে কি? এ বিষয়ে, আপনি কি ভাবছেন লর্ড জন?”
লর্ড জন গম্ভীরমুখে মাথাটা ঝাঁকাতে লাগলেন। বললেন, “এসব কাণ্ড- কারখানা না থামলে যে কোনওদিন আপনি মহা বিপদে পড়বেন।”
“সামারলী, আপনার হয়তো কিছু বলার আছে?”
তিনি বললেন, “শুনুন চ্যালেঞ্জার, এই মুহূর্তে আপনার সব কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া উচিত। জার্মানির কোনও খনিজ জলের অঞ্চলে গিয়ে তিনটে মাস কাটিয়ে আসুন।”
চ্যালেঞ্জার চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী গভীর! গম্ভীর! তাহলে, তরুণ বন্ধু আমার, যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা এমন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন তখন তুমি সব কিছু বুঝতে পারবে এটা কি সম্ভব হতে পারে?”
কিন্তু সেটাই হয়েছিল। আমি সবিনয়েই বলছি, এটাই হয়েছিল। অবশ্য, যা ঘটেছিল সেটা জানবার পরে সব কিছুই সহজবোধ্য মনে হয়, কিন্তু এ সব কিছুই যখন ঘটেছিল তখন কিন্তু এতটা পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু এ জ্ঞানটা দৃঢ় প্রত্যয়ের পূর্ণ শক্তি নিয়ে হঠাৎই আমার মনে উদয় হয়েছিল।
“বিষ!” আমি চেঁচিয়ে বললাম।
এই কথাটা যখন আমি বললাম তখনই আমার মনের পটে ভেসে উঠল গোটা সকালবেলার অভিজ্ঞতাগুলি—লর্ড জন ও তার মহিষ, আমার মৃগীরোগগ্রস্তের মতো চোখের জল, প্রফেসর সামারলীর উৎকট আচরণ থেকে আরম্ভ করে লন্ডনের বিচিত্র কাণ্ডগুলি, শোফারের মোটর চালানো, অক্সিজেনের দোকানের ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত সব কিছু। হঠাৎ সব কিছুই ঠিক ঠিক মিলে গেল।
আমি আবার চেঁচিয়ে বললাম, “নির্ঘাৎ এটা বিষ। আমরা সকলেই বিষদুষ্ট।”
দুই হাত ঘষতে ঘষতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “ঠিক তাই, আমরা সকলেই বিষদুষ্ট হয়েছি। আমাদের গৃহটাই ইথারের বিষাক্ত অঞ্চলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এবং এখনও প্রতি মিনিটে কয়েক লক্ষ মাইল গতিতে তার গভীর থেকে গভীরতর অঞ্চলের অভ্যন্তরে উড়ে চলেছে। আমাদের যুবক বন্ধুটি একটি মাত্র শব্দে আমাদের সব বিপদ ও হতবুদ্ধিকর সংকটকে প্রকাশ করেছে, আর সে শব্দটি হচ্ছে—বিষ।”
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই পরিস্থিতিকে কোনও ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
চ্যালেঞ্জার বলতে শুরু করলেন, “এক ধরনের মানসিক সংযমের দ্বারা এই সব লক্ষণকে আটকানো যায় এবং নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। সেই শক্তিটা আমাদের সকলের মধ্যে একই স্তরে উন্নীত হবে এটা আমি আশা করতে পারি না। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে আমাদের এই যুবক বন্ধুটির মধ্যেও সেটা উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান আছে। শুরুতেই কিছু হৈ-চৈ তোলায় আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লেও আমি শান্ত হয়ে বসে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। নিজেকেই বোঝালাম যে আগে তো কখনও আমি আমার পরিবারের কাউকে কামড়ে দেবার কথা ভাবতেই পারিনি। সেই প্রবণতাটা তো অস্বাভাবিকই ছিল। তখন মুহূর্তের মধ্যেই সত্যটাকে উপলব্ধি করতে পারলাম। পরীক্ষা করে দেখলাম আমার নাড়ির গতি ছিল স্বাভাবিকের চাইতে দশবার বেশি, আর আমার রিফ্লেক্সগুলি খুবই বেড়ে গিয়েছিল। আমি স্মরণ করলাম আমার উচ্চতর ও বিজ্ঞতর সত্তাকে, আমার প্রকৃত জি. ই. সি.-কে; আমার সব আণবিক গোলযোগের পিছনে সেই তো বসে আছে শান্ত ও দুর্জয় রূপে। সত্যি বলছি, বিষ যে আমাদের নিয়ে অর্থহীন মানসিক ভেল্কি খেলতে পারে সেগুলি প্রত্যক্ষ করার জন্য আমি তাকে আহ্বান করলাম। তখনই বুঝতে পারলাম যে আমিই প্ৰকৃত মালিক। আমি চিনতে পারলাম আমার বিশৃঙ্খল মনটাকে, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনলাম। সেটাই ছিল বস্তুর উপর মনের জয়লাভের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন I আমি বরং এটাও বলতে পারি যে, ত্রুটিটা ছিল মনের, আর ব্যক্তিত্ব তাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। এইভাবে আমার স্ত্রী যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন তখন আমার খুবই ইচ্ছা হয়েছিল দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি, এবং একটা বিরাট চিৎকার করে তাঁকে ভয় দেখাই, কিন্তু আমি সে ইচ্ছাটার গলা টিপে ধরেছিলাম এবং মর্যাদা ও সংযমের সঙ্গে তাঁকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছিলাম। সেই একইভাবে পাতিহাঁসের মতো প্যাক প্যাক করে ডাকার দুর্বার ইচ্ছাটাকেও জয় করেছিলাম। পরে যখন আমি গাড়িটাকে ডাকতে নিচে নেমে গেলাম এবং দেখতে পেলাম যে অস্টিন গাড়িটার উপর উপুড় হয়ে মেরামতির কাজে ব্যস্ত আছে, তখন একবার আমার খোলা হাতটাকে তুলেও সেটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলাম। তাকে আঘাত তো করলামই না, বরং তার কাঁধের উপর হাতটা রেখে তাকে হুকুম করলাম সে যেন আপনাদের ট্রেনের সময় হলে গাড়িটাকে দরজায় এনে হাজির করে। এই মুহূর্তে আমার খুবই লোভ হচ্ছে প্রফেসর সামারলীর পাকা দাড়িটা চেপে ধরি, এবং তাঁর মাথাটাকে সজোরে একবার পিছনে, একবার সমুখে নেড়ে দেই। অথচ, আপনারাই দেখতে পাচ্ছেন যে আমি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছি। আমার এই দৃষ্টান্তটিকে আপনাদের জন্যও সুপারিশ করতে চাই।”
একটু চুপ করে থেকে চ্যালেঞ্জার মার্জিত গলায় বললেন, “আবার এটাও হতে পারে যে আপনাদের কথাই ঠিক। আমি স্বেচ্ছায় স্বীকার করছি যে আমার মনের অবস্থা এখন যতটা গঠনমূলক তার চাইতে বেশি সমালোচনামুখী। তাছাড়া, কোনও নতুন মতবাদকে আমি সহজে মেনে নিতে পারিও না, বিশেষ করে সেটা যদি অসাধারণ এবং কিম্ভুত কিছু হয়। যাই হোক, সব কিছু ভেবেচিন্তে আমিও সহজেই বিশ্বাস করতে পারছি যে কোনও রকম একটা তীব্র বিষই এইসব লক্ষণের কারণ।”
চ্যালেঞ্জার খোশ মেজাজেই সহকর্মীদের গর্দানে চড়-চাপাটি মারলেন। বললেন, “আমরা আরও এগিয়ে যাব। নির্ঘাৎ এগিয়ে যাব।”
সামারলী বিনীতভাবে বললেন, “দয়া করে বলুন তো স্যার, বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আপনার মতামতটা কি?”
“আপনাদের সকলের অনুমতি নিয়ে আমি কয়েকটি কথা বলব।”
নিজের ডেস্কটার উপর বসে ছোট কাঠের মতো পা দুটো সমুখে ঝুলিয়ে তিনি বললেন, “আমরা একটা প্রচণ্ড ভয়ংকর কর্তব্যের অংশীদার হতে চলেছি। আমার মতে, এই জগৎটার অবসান আসন্ন।”
জগতের অবসান! আমাদের সকলেরই চোখ ঘুরে গেল অর্ধচন্দ্রাকার জানালাটার দিকে। দেখতে পেলাম পল্লী অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন সৌন্দর্য। জগতের অবসান! কথাগুলি প্রায়ই শোনা যায়, কিন্তু সেটা যে কোনও দিন বাস্তবে ঘটবে, আর ঘটবে কোনও একটা অজানা তারিখে নয়, ঘটবে এখনই, আজই, এটা তো একটা ভয়ংকর ও হতবুদ্ধিকর চিন্তা। আমরা সকলেই থ হয়ে চ্যালেঞ্জারের বাকি কথাগুলি শোনবার জন্য অপেক্ষা করে থাকলাম।
তিনি বলতে লাগলেন, “আপনারা অবশ্যই এমন এক থোকা আঙুরের কল্পনা করতে পারেন যেটাকে ঘিরে ধরেছে অপরিমেয় সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক সব জীবাণু। বাগানের মালী সংক্রমণবিরোধী কোনও মাধ্যমের সাহায্যে ফলগুলি শোধন করে নিল। এমনও হতে পারে যে সে তার আঙুরগুলোকে সংক্রমণমুক্ত করতেই চায়। এমনও হতে পারে যে প্রাগুক্ত জীবাণুর চাইতে স্বল্পতর মারাত্মক কোনও জীবাণু সে সৃষ্টি করতে চায়। তারপর সেই জীবাণুকে বিষের মধ্যে ডুবিয়ে তার বিষক্রিয়াকে নষ্ট করে দিতে চায়। আমার মতে আমাদের মহান মালী গোটা সৌরজগৎকেই ডুবিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছেন। আর মানবরূপী জীবাণু অর্থাৎ যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মরণশীল পোকাগুলি পৃথিবীর বহিরাবরণের উপর এঁকেবেঁকে কিলবিল করছে সেগুলি মুহূর্তকালের মধ্যেই অনুর্বর হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।”
আবার নেমে এল নীরবতা। আর সে নীরবতা ভাঙল টেলিফোনের ঝংকারে। কুটিল হাসি হেসে তিনি বলে উঠলেন, “ঐ আমাদের আর এক জীবাণু কর্কশ গলায় সাহায্য প্রার্থনা করছে। তারা বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের অবিরাম বেঁচে থাকাটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাছে কোনও অন্যতম প্রয়োজন নয়।”
মিনিট দু’য়েকের জন্য তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার বেশ মনে আছে তাঁর অনুপস্থিতিতে আমরা কেউ একটা কথাও বলিনি। তখন পরিস্থিতিটাই হয়ে গিয়েছিল সব কথা, সব মন্তব্যের বাইরে।
ফিরে এসে তিনি বললেন, “ব্রাইটন-এর স্বাস্থ্যবিভাগের ডাক্তারবাবু। যে কারণেই হোক সাগরের সমতলে লক্ষণগুলি বড় বেশি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। আমরা সাতশো ফুট উচ্চতায় আছি বলে কিছু সুবিধা পাচ্ছি। মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষরা জেনেই গেছে যে এ সমস্যায় আমিই সেরা বিশেষজ্ঞ। এটা যে ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত আমার চিঠির জন্যই হয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এখানে পৌঁছেই আমি যাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম তিনি একজন প্রাদেশিক শহরের মেয়র। টেলিফোনে আমার কথাবার্তা হয়তো আপনারাও শুনে থাকবেন।”
সামারলী উঠে গিয়ে জানালাটার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাড়সর্বস্ব সরু হাত দুটো আবেগে কাঁপছিল।
তিনি সাগ্রহে বললেন, “শুনুন চ্যালেঞ্জার, ব্যাপারটা এতই গুরুতর যে ব্যর্থ আলোচনা করে কোনও লাভ নেই। তবু আমি যদি কোনও প্রশ্ন করি তাহলে ভাববেন না যে আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাই। আমি শুধু বলতে চাই, আপনার এই সব তথ্য আর যুক্তিতে কোনও ভুল-ত্রুটি আছে কি না। নীল আকাশে সূর্যটা তো আগেকার মতোই কিরণ দিচ্ছে। লতাপাতা, ফুল, পাখি—সবই তো আছে। মানুষরা গল্ফ খেলছে, কিষাণরাও ফসল কাটছে। আর আপনি বলছেন যে তারা এবং আমরা সকলেই ধ্বংসের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি—যে-দিনটার জন্য গোটা মানব জাতি এতকাল ধরে অপেক্ষা করে আছে, আজকের এই সূর্যালোকিত দিনটাই হতে পারে সেই শেষ বিচারের দিন। কিসের উপর ভিত্তি করে আপনি এই চরম রায়টা দিচ্ছেন? একটা বর্ণচ্ছটার মধ্যে কয়েকটা অস্বাভাবিক রেখার উপর—সুমাত্রা থেকে পাওয়া কিছু গুজবের উপর—আমাদের মধ্যে কয়েকজনের কিছু ব্যক্তিগত উত্তেজনার উপর। শেষোক্ত লক্ষণটির উপর খুব বেশি গুরুত্ব দেবার দরকার আছে বলে মনে হয় না। দেখুন চ্যালেঞ্জার, এ ব্যাপারে আপনিও আমাদের দলে নাম লেখাতে পারেন না। এর আগেও আমরা একসঙ্গে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। খোলাখুলি কথা বলুন, আমাদের সঠিক জানতে দিন আমাদের অবস্থানটা কোথায়, আর আমাদের ভবিষ্যৎটাই বা কেমন?”
বৃদ্ধ প্রাণীবিজ্ঞানীর কথাগুলি যেমন সাহসিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। লর্ড জন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করলেন।
সামারলী বললেন, “আমাদের কথা থাক। আপনি বলুন চ্যালেঞ্জার, আমরা কোথায় আছি। আপনি ভালভাবেই জানেন যে আমরা দুর্বল মনের লোক নই, কিন্তু একটা সপ্তাহান্তিক ভ্রমণে এসে যখন দেখছি যে আপনার সমস্ত মনটা জুড়ে আছে শেষ বিচারের দিনটি, তখন তো তার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই দিতে হবে। বিপদটা কি, এবং তার পরিমাণ কতটা, আর সেটার মোকাবিলার জন্য আমরা কি করতে যাচ্ছি?”
বাদামি হাতখানা সামারলীর কাঁধের উপর রেখে প্রফেসর জানালাটার পাশে রোদে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি একটা হাতল-চেয়ারে পিঠ দিয়ে বসেছিলাম। আমার দুই ঠোঁটের মধ্যে ধরা ছিল একটা নেভানো সিগারেট। আমি ছিলাম একজন দর্শকমাত্র। ব্যাপারটাকে আমার নিজস্ব কিছু বলেও মনে হয়নি। কিন্তু সেখানে তিনটি শক্তিমান মানুষ একটা মহাসংকটে পড়েছিলেন। চ্যালেঞ্জার তাঁর মোটা ভুরু-যুগল বাঁকিয়ে দাড়িতে হাত বুলাচ্ছিলেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে তিনি বেশ মেপে কথা বলছিলেন।
তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনারা যখন লন্ডন থেকে বেরিয়েছিলেন তখন সর্বশেষ খবরটা কি ছিল?”
আমি বললাম, “দশটা নাগাদ আমি ‘গেজেট’ আপিসে ছিলাম। সিঙ্গাপুর থেকে সবে খবর এসেছিল যে সুমাত্রায় মহামারী দেখা দিয়েছে, আর তার ফলে লাইটহাউসে আলো জ্বালানো হয়নি।”
টেলিগ্রামগুলি গুছিয়ে নিতে নিতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “তারপর থেকেই ঘটনার স্রোত বেশ দ্রুতবেগে বয়ে চলেছে। আমি কর্তৃপক্ষ এবং সংবাদপত্র উভয়ের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগ রাখছি। তার ফলে সব জায়গা থেকেই আমার কাছে খবর আসছে। বস্তুত, সকলেই পীড়াপীড়ি করছে যে আমাকে লন্ডনে যেতে হবে, কিন্তু আমি তার কোনও দরকার বোধ করছি না। যতদূর বুঝতে পারছি, বিষের ক্রিয়াটা শুরু হয় মানসিক উত্তেজনা দিয়ে, আজ সকালে প্যারিসের দাঙ্গা- হাঙ্গামাটা বেশ বড় রকমেরই হয়েছে, আর ওয়েলশ-এর কয়লাখনির মালিকরা তো হৈ-চৈ শুরু করেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ যা হাতে এসেছে তাতে বুঝতে পারছি যে এই ছোঁয়াচে প্রতিক্রিয়ার পরেই দেখা দিচ্ছে এক ধরনের উল্লাস ও মানসিক উচ্ছ্বাস—তার কিছু কিছু লক্ষণ এখানে আমার তরুণ বন্ধুটির মধ্যেও দেখতে পাচ্ছি—যেটা বেশ কিছু সময় পরে পরে কোমায় পরিণত হয় এবং অচিরেই মৃত্যু ঘটে। আমার উদ্ভিদ-বিজ্ঞানের যতটা বহর তাতে তো মনে হচ্ছে যে এমন কোনও বিষাক্ত উদ্ভিদ আছে—”
সামারলীই নামটা বলে দিলেন, “ডেটুরা (ধুতুরা?)।”
“চমৎকার!” চ্যালেঞ্জারও চেঁচিয়ে উঠলেন। “এটার বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হোক ‘ডেটুরন’। আমাদের ধ্বংসের দেবতা মহান উদ্যানপালের এই সংক্রমণ- নিয়ামক উদ্ভিদটির নামকরণের সম্মানটি আমার প্রিয়জন সামারলীরই প্রাপ্য—হায় রে! সে সম্মানটি মরণোত্তর হলেও অদ্বিতীয় তো বটেই। তাহলে ডেটুরন-এর লক্ষণগুলি কিন্তু আমার নির্দেশমতোই নির্ধারিত হবে। গোটা পৃথিবীই এর আওতায় আসবে; আমি নিশ্চিত যে একটি প্রাণীও এ ব্যাপারে বঞ্চিত থাকতে পারে না, কারণ ইথার একটি সর্বব্যাপক মাধ্যম। আমি যতদূর দেখতে পাচ্ছি—”
এখানে তিনি একবার টেলিগ্রামগুলোর দিকে তাকালেন—”অনগ্রসর জাতির মানুষরাই সর্বপ্রথম এই রোগের শিকার হয়েছে। আফ্রিকা থেকে যে বিবরণ এসেছে সেটা তো শোচনীয়। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা তো নির্মূল প্ৰায়। দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণীদের চাইতে উত্তরের মানুষরাই রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতাটা বেশি রাখে। এই দেখুন, মার্সিলেস থেকে পাঠানো এই তার-বার্তাটির তারিখ লেখা আছে আজ সকাল ন’টা পঁয়তাল্লিশ। আমি প্রতিটি শব্দ হুবহু শুনিয়ে দিচ্ছি :
‘গোটা প্রদেশ জুড়ে সবিকার উত্তেজনা। নিমেস্-এ দ্রাক্ষা-চাষীদের মধ্যে হুলুস্থুল কাণ্ড। তুলোঁ-তে সমাজবাদী অভ্যুত্থান। আজই সকালে ছড়িয়ে পড়েছে কোমাসহ অসুখ। রাজপথে মৃতদেহের স্তূপ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ আর সর্বত্র বিশৃঙ্খলা।’
“এক ঘণ্টা পরে সেই একই জায়গা থেকেই এটা এসেছে :-
—‘আমরা সমূলে উচ্ছেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। প্রধান গির্জা আর ছোট ছোট গির্জাগুলি লোকে-লোকারণ্য। জীবিতের চাইতে মৃতের সংখ্যা বেশি। অবস্থা ধারণার অতীত, ভয়ংকর। রোগটা দেখলে মনে হবে বেদনাবিহীন, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং অনিবার্য।’
“অনুরূপ টেলিগ্রাম এসেছে প্যারিস থেকে, সেখানে অবস্থাটা এখনও ততটা তীব্র নয়। ভারতবর্ষ এবং পারস্য তো মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে। অস্ট্রিয়ার স্লাভ—জনসংখ্যা নিম্নমুখী, আর টিউটানিকদের গায়ে আঁচড়ও লাগেনি আমার হাতে যে সীমিত সংবাদ পৌঁছেছে তা থেকে সাধারণভাবে বলা যায়, যারা সমুদ্র-তীর থেকে দূরে অথবা পাহাড়ের উচ্চতায় বাস করে তাদের তুলনায় সমতলে এবং সমুদ্র-তীরে বসবাসকারীদের উপরেই আঘাতটা বেশি করে পড়েছে। এমন কি সামান্যমাত্র উচ্চতায়ও তফাৎটা হচ্ছে অনেকটা বেশি। এমন কি আমাদের ছোট পাহাড়টাকেও এখনও পর্যন্ত বিপদ-সমুদ্রের মধ্যে একটা সাময়িক দ্বীপ বলে মনে হচ্ছে; কিন্তু যে হারে বিপদ বাড়ছে তাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের সকলকেই ডুবিয়ে মারবে।”
লর্ড জন রক্সটন নিজের ভুরুটা মুছলেন। মুছে বললেন, “একগাদা টেলিগ্রাম হাতে নিয়ে আপনি ওখানে বসে হাসছেন কেমন করে সেটা ভেবেই তো আমার তাক লেগে যাচ্ছে। অন্য অনেকের মতো আমিও অনেক মৃত্যু দেখেছি, কিন্তু এমন সার্বিক মৃত্যু—এ যে এক ভয়াবহ কাণ্ড!”
চ্যালেঞ্জার বলে উঠলেন, “হাসির কথাই যদি তোলেন তাহলেও মনে রাখবেন যে ইথারীয় বিষের প্রভাবে মস্তিষ্কের যে বিকার সৃষ্টি হচ্ছে তার কবল থেকে আপনাদের মতোই আমিও রেহাই পাইনি। কিন্তু এই সার্বিক মৃত্যু আপনাদের মনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে সেটাকে কিন্তু আমি কিছুটা বাড়াবাড়ি বলেই মনে করছি। যদি একটা খোলা নৌকোতে চাপিয়ে আপনাকে একাকী সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় কোনও অজ্ঞাত গন্তব্যের দিকে, তাহলে মনের দিক থেকে আপনার ভরাডুবি ঘটতেই পারে। একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা আপনাকে চেপে ধরতে পারেই। কিন্তু আপনার যাত্রা যদি শুরু হয় একটা সুদৃশ্য জাহাজে, আর তাতে যদি সঙ্গী হয় আপনার সকল আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব, তাহলে কিন্তু আপনার গন্তব্যস্থানটি যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, সেক্ষেত্রে আপনাদের সকলের মধ্যে যে সম-ভাবনা ও সম-অভিজ্ঞতা জন্মাবে সেটাই শেষ পর্যন্ত আপনাদের এক সূত্রে বেঁধে রাখবে। একটি নিঃসঙ্গ মৃত্যু ভয়ঙ্কর হতে পারে, কিন্তু এই যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর মতো যে-কোনও সার্বিক মৃত্যুই, অন্তত আমার বিচারে, আতঙ্কের কারণ হতে পারে না।”
এই প্রথম একজন ভাই-সমান বিজ্ঞানীর যুক্তিকে স্বীকৃতি জানাতে সামারলী মাথাটা নেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি তাহলে কি করতে চাইছেন?”
চ্যালেঞ্জার বললেন, “আমাদের লাঞ্চটা সেরে নিতে চাই।” তাঁর কণ্ঠস্বর শঙ্খধ্বনির মতো সারা বাড়িটতে গম্-গম্ করতে লাগল। “আমাদের একজন রাঁধুনি আছে যার হাতের ওমলেটকে হার মানাতে পারে কেবল তারই হাতের কাটলেট। আমাদের বিশ্বাস, কোনও মহাজাগতিক দুর্যোগই তার সেই চমৎকার ক্ষমতাটাকে ভোঁতা করে দিতে পারেনি। তাই বলছি, আসুন—বসুন, যদি তিলমাত্র সময়ও আমাদের হাতে থাকে তো তাকে আমরা একটি সংযত এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে উপভোগ করে নিই।”
সত্যি, খাবারটা খুবই মজাদার ছিল। এ কথা সত্যি যে আমাদের ভয়ংকর পরিস্থিতিকে আমরা ভুলে যেতে পারিনি। আমাদের জীবনের সেই মহালগ্নে এক সমবেত তিনটি পুরুষের প্রত্যেকের চোখেই মৃত্যু বুঝি এসে দাঁড়িয়েছিল এক পরিচিত বন্ধুর মতো। আর মহিলাটি তো তাঁর মহান স্বামীটির একেবারে পায়ে পায়ে ঘুরছিলেন। তখন আমাদের ভবিষ্যৎ ছিল ভাগ্যের হাতে, আর বর্তমান ছিল আমাদের নিজের হাতে। পরম বন্ধুত্বের সঙ্গে মহা আনন্দে আমরা সময়টা কাটিয়ে দিলাম। আর চ্যালেঞ্জারের কথা—তিনি তো এক আশ্চর্য মানুষ! সে মানুষটি যে এতই মহান সেটা আমি আগে কখনও বুঝিনি। সামারলী তাঁর কটু সমালোচনা সমানেই চালিয়ে গেলেন। দু’জনের লড়াই দেখে জন লর্ড ও আমি হেসেই বাঁচি না; ওদিকে মহিলাটি স্বামীর আস্তিনটা চেপে ধরে দার্শনিকপ্রবরের তর্জন-গর্জন থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জীবন, মৃত্যু, ভাগ্য, নিয়তি—সেই স্মরণীয় মুহূর্তে এই সবই ছিল আলোচ্য বিষয়বস্তু। আর তখনই ঘটল একটা আশ্চর্য ঘটনা। আমার মনের মধ্যে জেগে উঠল একটা আকস্মিক উল্লাস। আমার প্রতিটি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ শির-শির করতে লাগল। তারা যেন ঘোষণা করল, এক অদৃশ্য মৃত্যুর জোয়ার ধীরে ধীরে, অতি সন্তর্পণে আমাদের ঘিরে ধরছে। একবার দেখলাম, লর্ড জন হঠাৎই তাঁর হাতটা চোখ দুটোর উপর রাখলেন। আর সামারলীও মুহূর্তের জন্য তাঁর চেয়ারে এলিয়ে পড়লেন। আমাদের প্রতিটি প্রশ্বাস যেন এক আশ্চর্য শক্তিতে ভরপুর হতে লাগল। অথচ আমাদের মন ছিল খুশি ও সরল। ইতিমধ্যে অস্টিন সিগারেটগুলো টেবিলের উপর রেখে বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াল।
“অস্টিন”, তার মনিব হাঁক দিলেন।
“বলুন, স্যার।”
“তোমার বিশ্বস্ত সেবার জন্য ধন্যবাদ জানাই।”
সেবকের মোচড়ানো মুখে একটু হাসি দেখা দিল।
“আমি আমার কতর্ব্য পালন করছি স্যার।”
“আমি আশা করছি অস্টিন, আজই বিশ্বের শেষ দিন।”
“হ্যাঁ স্যার। কখন স্যার?”
“তা বলতে পারি না অস্টিন। সন্ধ্যার আগে।”
“খুব ভাল স্যার।”
স্বল্পভাষী অস্টিন একটা সেলাম ঠুকে বেরিয়ে গেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে চ্যালেঞ্জার তাঁর চেয়ারটা স্ত্রীর কাছে টেনে নিয়ে তাঁর একটা হাত নিজের হাতের উপর রাখলেন।
তারপর বললেন, “অবস্থাটা কি দাঁড়িয়েছে তা তো তুমি জান প্ৰিয়া। আমার বন্ধুদেরও সব কথা বুঝিয়ে বলেছি। তুমি ভয় পাওনি তো?”
“সেটা বেদানায়ক হবে না তো জর্জ?”
“দাঁতের ডাক্তারের লাফিং-গ্যাসের চাইতে বেশি কিছু নয়। প্রতিবারই সেটা নিতে গিয়ে তুমি তো মরতেই বসেছ।”
“কিন্তু, সে অনুভূতিটা বেশ আরামের।”
“মৃত্যুও সেই রকমই হবে হয় তো। আমাদের জীর্ণ দেহ-যন্ত্রটি তার দাগগুলি রেকর্ড করে রাখতে পারে না, কিন্তু স্বপ্নে অথবা অচৈতন্য অবস্থায় যে মানসিক সুখের উদয় হয় সেটা তো আমরা জানি। না সামারলী, আপনার জড়বাদকে আমি মেনে নেব না। আমার দেহটা, অর্থাৎ এক প্যাকেট লবণ আর তিন বালতি জলের সমষ্টিই তো আমার সত্তা নয় যে তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও শেষ হয়ে যাব। এখানে—এখানে—” নিজের মস্ত বড় লোমশ মুষ্টিটা দিয়ে মাথায় আঘাত করতে করতে তিনি বলে উঠলেন, “এখানে এমন কিছু আছে যা জড়বস্তুকে ব্যবহার করে, কিন্তু নিজে তার অংশ নয়—সে এমন কিছু যা মৃত্যুকেও ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মৃত্যু যাকে কদাপি ধ্বংস করতে পারে না।”
একসময় কথাপ্রসঙ্গে সামারলী প্রশ্ন করলেন, “বলুন তো চ্যালেঞ্জার, এটা কি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে এ ব্যাপারে আমরা কিছুই করতে পারি না?”
চ্যালেঞ্জার জবাব দিলেন, “আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে—কিছু করার নেই। আমাদের জীবনকে আরও কয়েক ঘণ্টা প্রলম্বিত করে নিজেরাও এক মহতী ট্র্যাজিডি-র সামিল হবার আগে তার বিবর্তনটাকে চাক্ষুষ করা—সেটা হয়তো আমার ক্ষমতার আয়ত্তাধীন হতে পারে। আমি কতকগুলি পদক্ষেপ করেছি—”
“অক্সিজেন?”
“ঠিক তাই। অক্সিজেন।”
“কিন্তু ইথারই যদি বিষাক্ত হয়ে যায় তাহলে অক্সিজেন কোন কাজে লাগবে? অক্সিজেন এবং ইথার তো দুটো ভিন্ন স্তরের পদার্থ। তারা তো একজন আরেক জনের উপর চেপে বসতে পারে না। অতএব চ্যালেঞ্জার, এ রকম একটা প্রস্তাবকে আপনি সমর্থন করতে পারেন না।”
“দেখুন ভাল মানুষ সামারলী, এটা খুবই নিশ্চিত যে ইথারীয় বিষ কতকগুলি বাস্তব শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই আমি বেশ জোরের সঙ্গেই মনে করি যে অক্সিজেনের মতো একটা গ্যাস যা দেহের প্রাণ-শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় সেটা অবশ্যই আপনারা যাকে ‘ডেটুরন’ আখ্যা দিয়েছেন তার ক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে। হতে পারে যে আমিই ভুল করছি, কিন্তু আমার যুক্তির সত্যতা সম্পর্কে আমি খুবই আস্থাবান।”
লর্ড জন বলে উঠলেন, “আরে বাবা, আপনারা যদি খোকা-খুকীদের মতো বোতল চোষার বদলে টিউব চুষতে শুরু করে দেন তো তার মধ্যে আমি অন্তত থাকছি না।”
চ্যালেঞ্জার জবাবে বললেন, “তার কোনও প্রয়োজনই হবে না। আমরা ব্যবস্থা করে ফেলেছি—আর আমার স্ত্রীর কল্যাণেই সেটা হয়েছে—মহিলাটির বুদোয়ার (নিভৃত কথা)-টিকে যথাসম্ভব বায়ু-নিরোধক করা হবে। মাদুর এবং বার্নিশ-করা কাগজ দিয়ে।”
“ঈশ্বরের দোহাই চ্যালেঞ্জার, আপনি কি ভেবেছেন, বার্নিশ-করা কাগজ দিয়ে ইথারকে ঠেকানো যায়?”
“সত্যি, বন্ধু আমার, আসল কথাটাই তো আপনি ধরতে পারেননি। ইথারকে ঠেকাতে আমরা এত ঝামেলা করতে যাইনি। আমরা চেয়েছি অক্সিজেনটাকে ভিতরে আটকে রাখতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি আমরা বায়ুমণ্ডলকে কিছু পরিমাণে অম্লজান-বাষ্পয়িত করতে পারি তাহলে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে অক্ষুন্ন রাখতে পারব। গ্যাসের দুটো টিউব আমাদেরই ছিল, আর আপনারা নিয়ে এসেছেন আরও তিনটে। সেটাও যথেষ্ট নয়, কিন্তু কিছুটা তো বটেই।”
“তাতে কতটা সময় চলবে?”
আমার কোনও ধারণা নেই। আমাদের লক্ষণগুলো অসহ্য না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেগুলি খুলবই না। জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলেই একটু একটু করে গ্যাসের মুখ খুলে দেব। তাতে আমরা হয় তো কয়েক ঘণ্টা, এমন কি কয়েকটা দিন সময় হাতে পাব এবং চোখের সামনে দেখতে পাব একটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের নিজেদের ভাগ্যটা ততদিন বিলম্বিত হবে, আর আমরা পাব একটা বিরল অভিজ্ঞতা—গোটা মানবজাতি যখন যাত্রা শুরু করবে অজানার পথে তখন হয়তো আমরা পাঁচজনই হব তাদের একমাত্র পশ্চাদ্বর্তী রক্ষীদল। এবার আপনারা দয়া করে এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে সিলিন্ডারগুলোতে হাত লাগান। মনে হচ্ছে, এর মধ্যেই বায়ুমণ্ডল কিছুটা মারাত্মক হয়ে উঠেছে।”
