হারানো জগৎ – ৩

অধ্যায় ৩

আমার বন্ধুর আশঙ্কা বা আশা কোনওটাই পূর্ণ হলো না। বুধবার সেখানে পৌঁছে দেখলাম, পশ্চিম কেসিংটনের পোস্ট আপিসের ছাপ-মারা একটা চিঠি এসেছে; খামের উপর আমার নামটা খামের এ-পাশে থেকে ও-পাশ পর্যন্ত এমন হস্তাক্ষরে লেখা হয়েছে যে দেখলে কাঁটা-তারের বেড়া বলে মনে হয়। চিঠির বিষয়বস্তুটা এই রকম :

“এমোর পার্ক, ডব্লু।”

“মহাশয়,—আপনার চিঠি যথাসময়ে পেয়েছি। তাতে আপনি আমার মতামত সমর্থন করেছেন, যদিও সেগুলি আপনার বা অন্য কারও সমর্থনের উপর নির্ভর করে বলে আমি মনে করি না। ডারুউইনের মতবাদ সম্পর্কে আমার বিবৃতি প্রসঙ্গে আপনি যে সব শব্দ ব্যবহার করেছেন তার কিছু কিছু আপত্তিকর বলে মনে করি। অবশ্য আমি বুঝতে পারছি যে অজ্ঞতা ও কুশলতাহীনতার দরুনই আপনি এ অন্যায় করেছেন, ঈর্ষাপরবশ হয়ে নয়, তাই আমি এ বিষয়টা এড়িয়েই গেলাম। আমার বক্তৃতার একটিমাত্র বিচ্ছিন্ন পক্তি আপনি উদ্ধৃত করেছেন; মনে হচ্ছে সেটা সম্যক বুঝতে আপনার কিছু অসুবিধা ঘটেছে। আমি তো মনে করি, যে মানুষের বুদ্ধি সাধারণ মানুষের বুদ্ধাংকের নিচে, তার পক্ষেই এ কথাটা বুঝতে না পারা সম্ভব; কিন্তু সত্যি যদি ওটার আরও ব্যাখ্যার প্রয়োজন ঘটে থাকে, তাহলে উল্লেখিত সময়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আমি রাজী আছি, যদিও সব রকমের সাক্ষাৎকার ও সাক্ষাৎপ্রার্থীই আমার কাছে অতীব বিরক্তিকর। আমার অভিমত সংশোধনের ব্যাপারে আপনি যে প্রস্তাব করেছেন সে বিষয়ে আপনাকে একটি কথা জানাতে চাই যে একবার কোনও সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশের পরে তার কোনও সংশোধন করাটা আমার স্বভাব নয়। এখানে এসে এই চিঠির খামটা আমার লোক অস্টিনকে দয়া করে দেখাবেন, কারণ ‘সাংবাদিক’ নামধারী অসজ্জনদের হাত থেকে আমাকে আড়াল করবার সর্বপ্রকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তাকে নিতে হয়।

আপনার বিশ্বস্ত
“জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার।”

খবরটা জানতে টার্প হেনরিও সকাল-সকাল নিচে নেমে এসেছিলেন। চিঠিটা তাঁকে পড়ে শোনালাম। তিনি শুধু বললেন, “আর্নিকার চাইতেও ভাল ওষুধ আছে—কিউটিকিউর ঐ রকম কিছু।” কোনও কোনও লোকের হাসি-তামাশার রকমটাই অসাধারণ।

চিঠিটা যখন পেলাম তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে; তবু একটা ট্যাক্সি-গাড়ি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছে গেলাম। বারান্দাওয়ালা একটা বড় বাড়ির সামনে আমরা থামলাম। জানালার ভারী পর্দাগুলোতেই এই দুর্ধর্ষ অধ্যাপকের সম্পদের নিদর্শন পাওয়া গেল। তামাটে রংয়ের একটি শুঁটকো লোক দরজা খুলে দিল। তার গায়ে কালো নাবিকের কুর্তা, পায়ে চামড়ার পট্টি জড়ানো। পরবর্তী কালে জেনেছিলাম, সেই লোকটিই মোটর-চালক, পর পর অনেকগুলি খানসামা পালিয়ে যাওয়ায় তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। হাল্কা নীল চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে সে

আমাকে আপাদমস্তক ভাল করে দেখল।

প্রশ্ন করল, “আপনার আসার কথা ছিল?”

“সাক্ষাৎকার পূর্বনির্দিষ্ট।”

“কোনও চিঠি আছে?”

খামটা বের করে দিলাম।

“ঠিক আছে।” লোকটি অল্প কথার মানুষ। বারান্দা দিয়ে তার সঙ্গে অগ্রসর হতেই খাবার ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে হঠাৎ একটি ছোটখাট স্ত্রীলোক আমাকে আটকে দাঁড়ালেন। বেশ উজ্জ্বল চেহারা, কালো চোখ, চেহারায় ইংরেজ অপেক্ষা ফরাসী ভাবটাই বেশি চোখে পড়ে।

তিনি বললেন, “এক মিনিট অস্টিন, এখানেই দাঁড়াও। আপনি এদিকে আসুন। আগে কখনও আমার স্বামীকে দেখেছেন কি?”

“না ম্যাডাম, সে সৌভাগ্য হয়নি।”

“তাহলে আপনার কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনাকে বলছি, তার সঙ্গে চলা অসম্ভব—একান্তই অসম্ভব। আগের থেকে সতর্ক করে দিলে আপনি হয়তো সেটা বুঝে চলতে পারবেন।”

“আপনি খুবই সুবিবেচক ম্যাডাম।”

“তাকে রেগে যেতে দেখলেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন। কখনও তর্ক করবেন না। তর্ক করে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। পরে তাই নিয়ে প্রকাশ্যে কেলেংকারি হয়, আর তার ফল ভুগতে হয় আমাকে ও আমাদের সকলকে। দক্ষিণ আমেরিকার ব্যাপারে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি তো?”

একটি মহিলার কাছে মিথ্যা বলতে পারলাম না।

“হায়রে! সেটাই তো সব চাইতে বিপজ্জনক বিষয়। তার একটা কথাও আপনার বিশ্বাস হবে না, কিন্তু সে কথা তাকে বলবেন না, শুনলেই তিনি হিংস হয়ে উঠবেন। তার সব কথা বিশ্বাস করার ভান করবেন, তাহলে হয়তো পার পেয়ে যাবেন। মনে রাখবেন, তিনি নিজে এ সবই বিশ্বাস করেন। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন। তার মতো সৎলোক দেখা যায় না। আর দেরি করবেন না, তিনি আবার সন্দেহ করতে পারেন। যদি দেখেন, তিনি খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন—সত্যি বিপজ্জনক—তাহলে ঘণ্টাটা বাজাবেন আর আমি না আসা পর্যন্ত তাকে ঠেকিয়ে রাখবেন। অবস্থা যত খারাপই হোক, আমি ঠিক সামাল দিতে পারব।”

মহিলাটি আমাকে অস্টিনের হাতে তুলে দিলেন। এতক্ষণ সে ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল। আমাকে নিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। দরজায় একটা টোকা পড়ল, ভিতরে একটা ষাঁড়ের হুংকার শোনা গেল, আর তার পরেই আমি প্রফেসরের মুখোমুখি হলাম।

তিনি বসে আছেন একটা ঘুরন্ত চেয়ারে। সামনে একটা চওড়া টেবিল, তাতে অনেক বই, মানচিত্র ও চিত্র। আমি ঘরে ঢুকতেই তিনি চেয়ারটা ঘুরিয়ে আমার মুখোমুখি হলেন। তাঁর চেহারা দেখেই আমি ঢোক গিললাম। একটা অদ্ভুত কিছু দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু এরকম একটি প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তাঁর আকৃতি দেখলেই লোকের দম বন্ধ হয়ে আসে। মাথাটা মস্ত বড়—মানুষের এত বড় মাথা আমি আর কখনও দেখিনি। তার টপ-হ্যাটটা যদি কখনও মাথায় পরতে চেষ্টা করি তাহলে সেটা নির্ঘাৎ আমার মাথায় গলে কাঁধে এসে বসবে। তার মুখ ও দাড়ি একটা এসিরীয় ষাঁড়কেই মানায়। অদ্ভুত চুলগুলি চওড়া কপালের উপর থাকে-থাকে পাট করে বসানো। কালো ভুরুর নিচে নীল- ধূসর চোখ দুটি যেমন স্বচ্ছ, তীক্ষ্ণ, তেমনই প্রভুত্বব্যঞ্জক। প্রকাণ্ড চওড়া কাঁধ আর পিপের মতো বুকটাই টেবিলের উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে; আর দেখা যাচ্ছে দুটি লম্বা, লোমশ হাত। তার সঙ্গে একটা গর্জনমুখর ঘর্ ঘর্ কণ্ঠস্বর মিলেই এই কুখ্যাত প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণাটা গড়ে উঠল

সদম্ভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন, “তারপর? কি ব্যাপার?”

খামটা বাড়িয়ে দিয়ে সবিনয়ে বললাম, “আপনি দয়া করে আমাকে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন স্যার।”

ডেস্ক থেকে আমার চিঠিটা বের করে নিজের সামনে মেলে ধরলেন।

“ওঃ, তাহলে আপনিই সেই যুবক যে সহজ ইংরেজিও বোঝে না, তাই না? মনে হয়, আমার সাধারণ সিদ্ধান্তগুলি সম্পর্কে আপনি একমত?”

“সম্পূর্ণভাবে স্যার—সম্পূর্ণভাবে!” আমি বেশ জোর দিয়ে বললাম।

“তাই নাকি! তাহলে তো আমার অবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে, তাই না? আপনার বয়স ও চেহারাই আপনার সমর্থনকে দ্বিগুণ মূল্যবান করে তুলেছে। তবে এ কথা স্থির জানবেন যে নিজের লড়াই আমি নিজেই করতে জানি; আপনার সহানুভূতির কোনও দরকার আমার নেই। দেয়ালে পিঠ দিয়ে আমাকে একাই লড়তে দিন, তাহলেই জি. ই. সি. সব চাইতে সুখী থাকবে। আচ্ছা মশাই, তাহলে সাক্ষাৎকারটা যতদূর সম্ভব ছোট করা যাক, কারণ এটা আপনার পক্ষেও মুখরোচক নয় আর আমার পক্ষে তো বর্ণনাতীত রকমের বিরক্তিকর। যতদূর বুঝতে পেরেছি, আমার গবেষণা-পত্রে যে বক্তব্য আমি রেখেছি সে সম্পর্কে আপনার কিছু মন্তব্য ছিল।”

লোকটির এই সরাসরি প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া শক্ত। অথচ একটা ভাল সুযোগের অপেক্ষায় আমাকে এখনও ভান করেই চলতে হবে। দুই ইস্পাত-কঠিন চোখের দৃষ্টি আমার উপর স্থির নিবদ্ধ রেখে তিনি আবার গর্-গর্ করে বলে উঠলেন, “বলুন, বলুন কি বলবার আছে।”

নকল হাসি হেসে বললাম, “আমি অবশ্য একজন ছাত্র মাত্র; একজন আগ্রহী জিজ্ঞাসুর বেশি কিছু নই। সেই সঙ্গে আমার এটাও মনে হয়েছে যে উইজম্যান সম্পর্কে আপনি একটু কঠোর হয়েছেন। তারপর থেকে যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে—সেগুলি কি তার স্বপক্ষেই যায় না?”

“কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ?”

“দেখুন, আমি জানি নির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ বলতে যা বোঝায় সে রকম কিছু নেই। আমি শুধু আধুনিক চিন্তাধারার গতি এবং সাধারণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কথাই বলতে চেয়েছি।”

একান্ত আগ্রহে তিনি সামনে ঝুঁকলেন।

একটার পর একটা আঙুল ধরে ধরে তিনি বলতে লাগলেন, ‘আপনি নিশ্চয় জানেন যে করোটি সংক্রান্ত সূচী অপরিবর্তনীয়?”

“স্বভাবতই”, আমি বললাম।

“আর ‘টেলিগনি’ এখনও বিবেচনাধীন?”

“নিঃসন্দেহে।”

“আর জীব-কোষ যে গর্ভসঞ্চারবিহীন ডিম থেকে আলাদা সেটাও?”

“অবশ্য—অতি অবশ্য! “ আত্ম-গর্বে স্ফীত হয়ে আমি চেঁচিয়ে বললাম।

 “কিন্তু তাতে কি প্রমাণ হলো?” শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন।

“তাই তো, কি প্রমাণ হলো?” আমি অস্ফুটে বললাম।

“আমি বলে দেব কি?”

“দয়া করে বলুন।”

অকস্মাৎ তীব্র ক্ষোভে তিনি ফেটে পড়লেন; গর্জন করে বললেন, “তাতে প্ৰমাণ হলো যে লন্ডন শহরের নিচতম জোচ্চোর হলেন আপনি—একটি শিরদাঁড়াহীন, জঘন্য সাংবাদিক। আপনার লেখায় না আছে বিজ্ঞানের স্পর্শ, না আছে সৌজন্যবোধ।”

দুই চোখে উন্মত্ত ক্রোধের আগুন জ্বালিয়ে তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সেই সংকট-মুহূর্তে আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম যে লোকটি খুবই খর্বকায়, তার মাথাটা আমার কাঁধের চাইতে উঁচু নয়—এক খর্বকায় হারকিউলিস যেন; তার প্রচণ্ড জীবনীশক্তি পৌঁছে গেছে গভীরতায়, প্রশস্ততায় ও মস্তিষ্কে

“বাজে কথা!” আঙুলগুলি টেবিলের উপর রেখে মুখটা বাড়িয়ে দিয়ে সামনে ঝুঁকে তিনি বললেন। “সেই কথাই তো আপনাকে বলছিলাম স্যার—বিজ্ঞানের এক জগাখিচুড়ি! আপনি কি মনে করেন বাদামের মতো একটা মস্তিষ্ক নিয়ে আপনি চালাকিতে আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেন? নারকীয় কলমচির দল, নিজেদের আপনারা সর্বশক্তিমান বলে মনে করেন, তাই না? আপনারা মনে করেন, আপনাদের স্তুতিবাদে একজন মানুষকে গড়তে পারেন, আবার নিন্দা করে থাকে ভেঙে ফেলতেও পারেন, তাই না? আমরা আপনাদের অভিবাদন জানাব এবং একটা ভাল কথা বের করতে চেষ্টা করব, তাই তো? বুকে-হাঁটা কীট, আপনাকে আমি চিনি। আপনি তো দু’কান কাটা। মাত্রাজ্ঞান পর্যন্ত নেই। যত সব ফাঁপা বেলুন! আপনাকে যথাস্থানেই পাঠাচ্ছি। হ্যাঁ স্যার, জি. ই. সি.-কে টেক্কা দিতে আপনি পারেননি। আপনার উপর প্রভুত্ব করার মতো একজন মানুষ এখনও বেঁচে আছে। আপনাকে আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম, তবু যদি আপনি আসেন, ঈশ্বর জানেন তার সব দায় আপনার। শাস্তি, ভাল মানুষ মি. ম্যালোন, আমি চাই শাস্তি! বড় সাংঘাতিক খেলায় আপনি নেমেছেন, আর সে খেলায় হেরেও গেছেন।”

পিছিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে আমি বললাম, “দেখুন স্যার, আপনি যতখুশি গালমন্দ করতে পারেন। কিন্তু তারও একটা সীমা আছে। আপনি আমাকে আঘাত করতে পারেন না।”

“পারি না বুঝি?” একটা অনিষ্টকর ভঙ্গিতে তিনি ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলেন; এবার থেমে বাচ্চা ছেলের মতো ছোট কুর্তাটার পাশ-পকেটে বড় হাত দুটো ঢুকিয়ে দিলেন। “আপনাদের অনেককে আমি এ বাড়ির বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। আপনি হবেন চতুর্থ বা পঞ্চম। প্রত্যেকের ওজন গড়ে তিন পাউন্ড পনেরো করে। খরচটা বেশি, কিন্তু খুব দরকারী। এখন বলুন, আপনিও আপনার দাদাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন না কেন? আমি তো মনে করি, করতে হবেই। আবার তিনি ধীর পায়ে এগোতে লাগলেন—নাচের শিক্ষকের মতো পায়ের আঙুলগুলি সামনের দিকে বাড়িয়ে।”

আমি হল-ঘরের দরজার দিকে ছুটে যেতে পারতাম, কিন্তু সেটা খুবই অসম্মানকর হত। তাছাড়া আমার মধ্যেও একটা ন্যায়সঙ্গত ক্রোধ ততক্ষণে ফুঁসে উঠেছে।

বললাম, “একটু কষ্ট করে হাত দুটো সরিয়ে নিন স্যার। আমি এটা বরদাস্ত করব না।”

“বাছারে আমার!” তার কালো গোঁফজোড়া খাড়া হয়ে উঠল; একটা সাদা ফণা যেন ঘৃণায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। “আপনি বরদাস্ত করবেন না, তাই না?”

চেঁচিয়ে বললাম, “বোকার মতো কাজ করবেন না প্রফেসর! আপনি কি আশা করেন? আমার শরীরের ওজনও পনেরো স্টোন, বর্মের মতো শক্ত, প্রতি শনিবার লন্ডন আইরিশ দলের হয়ে ‘সেন্টার থ্রি-কোয়ার্টার’-এ খেলি। ভড়কাবার মতো মানুষ আমি নই যে —”

সেই মুহূর্তে তিনি আমার দিকে ধেয়ে এলেন। ভাগ্য ভাল যে দরজটা খুলে রেখেছিলাম। দুজনই বারান্দাময় ক্যাথারিন-চাকার মতো গড়াতে লাগলাম। পথে একটা চেয়ার পেয়ে গেলাম। আমার মুখ তার দাড়িতে ভর্তি, উভয়ের হাতে-হাতে জড়াজড়ি, দু’জনের শরীর পাকে-পাকে বাঁধা আর আমাদের চারদিকে অনবরত ঘুরছে সেই নারকীয় চেয়ারের পাগুলো। সদা-সতর্ক অস্টিন হল-ঘরের দরজাটা খুলেই রেখেছিল। উল্টো পাক খেতে খেতে আমরা সামনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম। নিচে ছিটকে পড়তেই চেয়ারটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। আমরা গড়িয়ে পড়লাম জঞ্জালের স্তূপে। তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন; হেঁপো রুগীর মতো ‘শাঁই-শাঁই’ শব্দ করে দুই মুষ্টিবদ্ধ হাত দোলাতে লাগলেন।

“যথেষ্ট হয়েছে তো?” তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন।

নিজেকে সামলে নিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, “তবে রে নরকের গুণ্ডা!”

তখনই একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেত, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলাম। নোট-বই হাতে নিয়ে একটি পুলিশের লোক এসে পাশে দাঁড়াল। বলল, “এসব কি হচ্ছে? আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত।” আমার দিকে ফিরে শুধাল, “ব্যাপার কি বলুন তো?”

“এই লোকটি আমাকে আক্রমণ করেছিল”, আমি বললাম।

“আপনিও ওকে আক্রমণ করেছিলেন?” পুলিশটি শুধাল।

প্রফেসর জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগলেন; কিছু বললেন না।

মাথা নেড়ে পুলিশটি কঠিন গলায় বলল, “এটাই প্রথমবার নয়। এই একই ব্যাপারে গত মাসেও আপনি ফ্যাসাদে পড়েছিলেন। এই যুবকটির চোখের নিচে আপনি কালসিটে ফেলে দিয়েছেন। আপনি কি ওর বিরুদ্ধে নালিশ করছেন?”

আপত্তি জানালাম। বললাম, “না, নালিশ করছি না।”

“সে আবার কি?” পুলিশটি বলল।

“দোষটা আমার। আমিই অনধিকার প্রবেশ করেছিলাম। উনি আমাকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন।” পুলিশ তার নোট-বইটা বন্ধ করল।

বলল, “এ রকম হুজ্জতি যেন আর কখনও না হয়।” ইতিমধ্যে কসাইদের একটা ছেলে, একটা দাসী ও দু’একটি বাউণ্ডুলে পথচারী জুটে গিয়েছিল। পুলিশ তাদের তাড়া দিল, “এই যে! কেটে পড়, কেটে পড়!” দলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে পুলিশ চলে গেল। প্রফেসর আমার দিকে তাকালেন; তাঁর চোখের কোণে কৌতুকের ঝিলিক।

বললেন, “ভিতরে আসুন! আপনার সঙ্গে আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি।”

কথাটায় বিপদের আভাস ছিল, তবু তাঁর সঙ্গে বাড়িতে ঢুকলাম। ভৃত্য অস্টিন দারু-মূর্তির মতো দরজাটা বন্ধ করে দিল