অধ্যায় ৫
যখন এমোর পার্কে ফিরে গেলাম তখন কিছুটা প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দৈহিক বিপর্যয়ে এবং কিছুটা দ্বিতীয় সাক্ষাতের দরুন মানসিক বিপর্যয়ে সাংবাদিক হিসাবে আমি বেশ কিছুটা পর্যুদস্ত। আমার বেদনাদীর্ণ মাথার মধ্যে তখন একটি কথাই দপ্ দপ্ করে ঘুরছিল যে লোকটির কাহিনির মধ্যে সত্য আছে, তার ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর যখন প্রকাশের অনুমতি মিলবে তখন ‘গেজেট’-এ প্রকাশ করার জন্য যে “কপি” তৈরি করব তার গুরুত্ব অচিন্ত্যনীয়। রাস্তার শেষে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। লাফিয়ে উঠে সোজা আপিসে ফিরে এলাম। ম্যাআর্ডল যথারীতি তাঁর আসনে সমাসীন।
অনেক আশা নিয়ে তিনি চেঁচিয়ে বললেন, “আরে, ব্যাপার কি? আমি তো ভাবছি যে আপনি যুদ্ধ করে ফিরছেন। আবার বলে বসবেন না যে তিনি আপনাকে মারধোর করেছেন।”
“প্রথমটায় একটু মতবিরোধ ঘটেছিল বৈকি।”
“কী লোক রে বাবা! আপনি কি করলেন?”
“অবশ্য পরে তার সুবুদ্ধি ফিরে এল। অনেক কথা হলো। অবশ্য তার মুখ থেকে কিছুই বের করা গেল না—মানে, কাগজে প্রকাশ করার মতো কিছু।”
“আমি কিন্তু সেটা ভাবতে পারছি না। তার হাতে আপনার চোখের নিচে কালসিটে পড়েছি। আর সেটাই তো খবর। দেখুন মি. ম্যালোন, এই সন্ত্রাসের রাজত্ব আমরা চলতে দিতে পারি না। তাকে ঢিট করা দরকার। কাল এমন একখানা ‘লিডার’ লিখব না—একেবারে হৈ-হৈ পড়ে যাবে। আপনি শুধু মাল-মশলাটা যোগান দিন, তারপর আমি বুঝে নেব। আচ্ছা, ‘প্রফেসর মুডৌসেন’ শিরোনাম দিলে কেমন হয়? স্যার জন ম্যান্ডেভিল-ক্যালিওস্ট্রো—ইতিহাসে এমন অনেক জোচ্চোরের নামই তো পাওয়া যায়। তার সব চালবাজি আমি ফাঁস করে দেব।”
“তাতে কোনও ফল হবে না স্যার।
“কেন হবে না?”
“কারণ লোকটি মোটেই জোচ্চোর নয়।”
“কী বললেন!” ম্যাকআর্ডল গর্জে উঠলেন, “আপনি নিশ্চয় মনে করেন না যে এই সব ম্যামথ, ম্যাস্টোডন ও প্রকাণ্ড সামুদ্রিক সরীসৃপের কথা সত্যি?”
“দেখুন, সে সব আমি জানি না। সেরকম কোনও দাবিও তিনি করেন বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে একটা নতুন কিছু তিনি জেনেছেন।
“বেশ তো, সেটাই লিখে ফেলুন।”
“লিখতে তো চাই, কিন্তু তিনি আমাকে বিশ্বাস করে গোপনে সব কিছু বলেছেন এক শর্তে, আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারব না।” খুব সংক্ষেপে অধ্যাপকের কাহিনিটি তাকে বললাম।
ম্যাকআর্ডলের চোখে-মুখে গভীর অবিশ্বাস ফুটে উঠল।
শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘ দেখুন মি. ম্যালোন, আজ রাতের এই যে বৈজ্ঞানিক সভা বসছে, সেখানে তো কোনও ঢাক-ঢাক গুড়-গুড়ের ব্যাপার নেই। আপনি সেখানে যান। দেখুন, কোনও খবর ‘স্কুপ’ করতে পারেন কি না। মোট কথা, সেখানে চলে যান, আর একটা ভাল প্রতিবেদন পাঠান। মাঝরাত পর্যন্ত আপনার জন্য জায়গা রেখে দেব।”
সারাটা দিন ঝামেলায় কেটেছে। টার্প হেনরিকে সঙ্গে নিয়ে সকাল-সকাল স্যাভেজ ক্লাবে ডিনার খেয়ে নিলাম। আমার অ্যাডভেঞ্চারের কিছু বর্ণনাও তাকে শোনালাম। তার ঠোঁটে অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল।
“ও সব কথা কোনও উপন্যাস-লেখকের জন্য রেখে দাও। লোকটা মহা ফন্দিবাজ। সব বাজে কথা।”
“কিন্তু সেই মার্কিন কবি?”
“তার কোনও অস্তিত্বই ছিল না।”
“তার স্কেচ-বইটা আমি স্বচক্ষে দেখেছি।”
“ওটা চ্যালেঞ্জারের স্কেচ-বই।”
“তার মানে জন্তুটাকে তিনি নিজে এঁকেছেন?”
“নিশ্চয়। তাছাড়া আর কি হতে পারে?”
“আর ফটোগ্রাফগুলো?”
“ওতে তো কিছু নেই। আপনিই তো বলেছেন শুধু একটা পাখিই সে দেখেছে।”
“হ্যাঁ। একটা টেরোড্যাক্টিল।”
“ওটা তো তার কথা। টেরোড্যাক্টিলের কথাটা সেই তোমার মাথায় ঢুকিয়েছে।”
“বেশ তো, সেই হাড়গুলো?”
“প্রথমটা কোনও আইরিশ ‘স্টু’ থেকে সংগ্রহ করা, আর দ্বিতীয়টা দরকার মতো বানানো। বুদ্ধিশুদ্ধি থাকলে ফটোগ্রাফের মতোই একটা নকল হাড় যোগাড় করা কিছু শক্ত কাজ নয়।”
আমার অস্বস্তি হতে লাগল। হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এল।
বললাম, “আপনি আমার সঙ্গে সভায় যাবেন?”
টার্প হেনরি একটু ভেবে বললেন, “এই চ্যালেঞ্জার লোকটিকে কেউ পছন্দ করে না। অনেকের সঙ্গেই তার বিবাদ। বলা উচিত, লন্ডন শহরে সেই সর্বাধিক ঘৃণিত মানুষ। ডাক্তারী ছাত্ররা সভায় হাজির হলে তার দুর্গতির সীমা থাকবে না। কাজেই সে ভালুকের খেল দেখতে যাবার ইচ্ছা আমার নেই।”
“তার নিজের মুখ থেকে তার কথাগুলি শুনতে তো পাবেন।
“সেটা একটা কথা বটে। ঠিক আছে। আজ সন্ধ্যায় আমি আপনার সঙ্গেই আছি।”
.
হল-এ পৌঁছে দেখলাম আশাতিরিক্ত জনসমাবেশ হয়েছে। সাদা দাড়িওয়ালা অধ্যাপক আর দরজায় ভিড়-করা সাধারণ পদাতিকদের দেখেই বুঝলাম, সাধারণ ও বিজ্ঞানী সব রকম শ্রোতাই সেখানে হাজির। এমন কি গ্যালারিতে এবং হলের পিছন দিকে কিছু উৎসাহী বালখিল্যের উপস্থিতিও চোখে পড়ল। তাদের মধ্যে অনেক পরিচিত ডাক্তারী ছাত্রের মুখও দেখতে পেলাম। বোঝা গেল, বড় বড় হাসপাতালগুলি থেকেও তাদের দলবল পাঠানো হয়েছে। চারদিকেই গোলমালের একটা চাপা আভাস।
বুড়ো ডক্টর মেলড্রাম যখন তাঁর অপেরা-হ্যাটটি মাথায় মাথায় দিয়ে মঞ্চে হাজির হলেন, অমনি চারদিক থেকে প্রশ্ন-বাণ শুরু হলো: “ওই টালিটা কোথা থেকে যোগাড় করলেন?” মেলড্রাম তাড়াতাড়ি হ্যাটটাকে চেয়ারের নিচে লুকিয়ে ফেললেন। বেতোরুগী প্রফেসর ওয়ালি যখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে তাঁর আসনে বসলেন, সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে প্রশ্ন হতে লাগল, তাঁর ভাঙা আঙুলের অবস্থা কি রকম? ফলে প্রফেসর খুবই বিব্রত হয়ে পড়লেন। সব চাইতে বেশি হল্লা শোনা গেল যখন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তাঁর কালো দাড়ি নিয়ে মঞ্চের প্রথম সারির একেবারে কোণের আসনটিতে গিয়ে বসলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সকলে এমন হৈ-হট্টগোল শুরু করে দিল যে টার্প হেনরির আশঙ্কাটাই আমার কাছে সত্য বলে মনে হতে লাগল।
যাই হোক, হট্টগোল একটু থিতিয়ে আসতেই সভাপতি প্রফেসর রোলান্ড মারে এবং বক্তা মি. ওয়ালড্রন মঞ্চের উপর সম্মুখে এগিয়ে এলেন। সভার কাজ শুরু হলো।
সভাপতির অনুচ্চ কণ্ঠের প্রস্তাবনার পরে মি. ওয়ালড্রন সৃষ্টি-তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ভাষণ শুরু করলেন। বিবর্তনের পথ ধরে জীব-জগতের ক্রম- বিকাশের ইতিহাস বিবৃত করে তিনি বলতে লাগলেন, “অতএব, ভদ্রমহোদয় ও মহোদয়াগণ উইল্ডেন বা সোলে হোপেন-এর কালো পাথরের দেশে যে সব আঁশওয়ালা ভয়ংকর সরীসৃপদের দেখে আজও আমরা শিউরে উঠি, পৃথিবীতে মানুষের প্রথম আবির্ভাবের অনেক কাল আগেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে—”
মঞ্চের উপর থেকে কে যেন ‘বুম’ করে বলে উঠল, “প্রশ্ন!”
মি. ওয়ালড্রন কঠোর শৃংখলাপরায়ণ মানুষ। বক্তৃতার মাঝখানে এভাবে বাধা পেতে তিনি অভ্যস্ত নন। একমুহূর্ত থেমে গলাটা আর একটু চড়িয়ে তিনি আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।”
আবার সেই কণ্ঠস্বর, “প্রশ্ন!”
ওয়ালড্রন বিস্মিত দৃষ্টিতে মঞ্চে উপবিষ্ট অধ্যাপকদের দিকে চোখ ফেরালেন। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। মুখে খুশি-খুশি ভাব; যেন ঘুমের মধ্যেই হাসছেন।
ওয়ালড্রন কাঁধ ঝঁকুনি দিয়ে বললেন, “বটে! আমার বন্ধু প্রফেসর চ্যালেঞ্জার!” এইটুকু বলেই উচ্চ হাস্যরোলের মধ্যে তিনি আবার বক্তৃতা শুরু করলেন। কিন্তু ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হলো না। বক্তৃতা প্রসঙ্গে যতবার তিনি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কথা উল্লেখ করছেন ততবারই প্রফেসরের ষণ্ড-গর্জন তাঁকে বাধা দিতে লাগল। ছাত্র-বোঝাই বেঞ্চিগুলোও মজা পেয়ে গেল। যতবার প্রফেসরের দাড়ি ফাঁক হয়ে যায় ততবারই তার মুখ থেকে কোনও শব্দ বের হবার আগেই শত শত গলায় গর্জন শুরু হয় “প্রশ্ন!” অন্যদিক থেকে চিৎকার শোনা যায় “থামুন!” অন্য অনেকের কণ্ঠে “লজ্জা!” ওয়ালড্রন অভিজ্ঞ বক্তা, শক্ত মানুষ; তিনিও বিচলিত হলেন; ইতস্তত করলেন, তো-তো করে কী যেন বললেন, তাঁর বক্তব্য তালগোল পাকিয়ে গেল, আর শেষ পর্যন্ত জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সব নষ্টামির পাণ্ডাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ অসহ্য! প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আমি বলছি, এ ভাবে অভদ্রের মতো বক্তৃতার মাঝখানে বাধার সৃষ্টি করাটা বন্ধ করুন।”
সারা হল চুপ। “অলিম্পাস”-এ উপবিষ্ট দেবতারাই নিজেদের মধ্যে লড়াই করছেন দেখে ছাত্রদের মধ্যে চাপা খুশির উল্লাস। চ্যালেঞ্জার তার মোটা শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
বললেন, “মি. ওয়ালড্রন, তার আগে আমি বলছি বৈজ্ঞানিক সত্যবিরোধী এই সব উক্তি করা থেকে আপনি বিরত হন।”
হল-এর মধ্যে যেন ঝড় উঠল। চারদিকে শুরু হলো চিৎকার ও পাল্টা- চিৎকার। “কী লজ্জা! লজ্জা!” “ওকে বলতে দিন!” “ওকে বের করে দিন!” “মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিন!” “সুবিচার চাই!” সভাপতি উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিতভাবে হাত দুটোকে পানার মতো নাড়তে লাগলেন। থেমে থেমে কোনওরকমে বললেন, “প্রফেসর চ্যালেঞ্জার-ব্যক্তিগত—কথা—পরে বলবেন।’ বিঘ্ন সৃষ্টিকারী প্রফেসর মাথা নুইয়ে ঈষৎ হেসে দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন। মুখটা লাল করে ওয়ালড্রন অভিজ্ঞ যোদ্ধার মতো বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন।”
অবশেষে বক্তৃতা শেষ হলো। ওয়ালড্রন বসে পড়লেন। সভাপতির নির্দেশে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার উঠে মঞ্চের এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমার কাগজের স্বার্থে তার পুরো বক্তৃতাটা আমি টুকে নিলাম।
পিছন দিক থেকে অবিরাম বাধার মধ্যে তিনি বলতে শুরু করলেন, “ভদ্রমহোদয়া ও ভদ্রমহোদয়গণ, ক্ষমা করবেন—ভদ্রমিহলা, ভদ্রজন ও শিশুরা- আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি, কারণ অমনোযোগবশত শ্রোতাদের একটা বড় অংশের কথা উল্লেখ করতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। মি. ওয়ালড্রনের যে সুন্দর কাল্পনিক বক্তৃতাটি আপনার এতক্ষণ মন দিয়ে শুনলেন সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। বক্তৃতার অনেক কথার সঙ্গেই আমি একমত নই; যথাসময়ে সে আপত্তিও আমি জানিয়েছি। মি. ওয়ালড্রন আমাকে ক্ষমা করবেন, তাঁর বক্তৃতার অনেক কিছুই অত্যন্ত ভাসা-ভাসা ও ভ্রান্ত, কারণ একদল মূর্খ শ্রোতাকে শোনাবার জন্যই বক্তৃতাটা করা করা হয়েছে। ( বিদ্রূপ জনপ্রিয় বক্তৃতামালা স্বভাবতই পল্লবগ্রাহী হয়ে থাকে। ( মি. ওয়ালড্রনের ক্রুদ্ধ অঙ্গভঙ্গি)… কিন্তু এসব কথা তো অনেক হলো। আর নয়। (প্রলম্বিত হর্ষধ্বনি) এবার আসল কথায় আসি। একজন মৌলিক গবেষক হিসাবে আমাদের বক্তাটির কোন কথায় আমি আপত্তি জানিয়েছি? পৃথিবীতে কতকগুলি প্রাণীর স্থায়ী অস্তিত্ব সম্পকে। একজন শিক্ষানবীশ, অথবা একজন জনপ্রিয় বক্তা হিসাবে এ বিষয়ে আমি কথা বলছি না, কথা বলছি একজন বিবেকবান বিজ্ঞানী হিসাবে। ঘটনার বাস্তব সত্যই আমাকে বাধ্য করেছে তাঁর বক্তব্যে বাধা দিতে। মি. ওয়ালড্রন যেখানে ধরে নিয়েছেন যে তিনি নিজের চোখে ঐসব প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীকে দেখেননি বলেই তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই, সেখানেই তিনি ভুল করেছেন। তিনি ঠিকই বলেছেন যে তারাই আমাদের পূর্বপুরুষ, কিন্তু আমি বলতে চাই তারা আমাদের সমকালীন পূর্বপুরুষ, তাদের বাসস্থানকে খুঁজে বের করার মতো উদ্যম ও কষ্টসহিষ্ণুতা যাঁদের আছে তাঁরা আজও ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতিবিশিষ্ট সেই সব প্রাণীকে অবশ্যই দেখতে পান। যে সব প্রাণী জুরাসিক যুগে ছিল বলে মনে করা হয়, যে সব দৈত্যসদৃশ প্রাণী আজকের বৃহত্তম ও হিংস্রতম স্তন্যপায়ী জীবদের অনায়াসে গিলে খেতে পারে, তারা আজও আছে।” (“বাজে কথা!” “প্রমাণ করুন!” “আপনি কি করে জানলেন?” “প্রশ্ন”—প্রভৃতি নানান ধ্বনি।)”আপনারা জিজ্ঞাসা করছেন, আমি কি করে জানলাম? আমি জেনেছি কারণ তাদের সেই সব গোপন আস্তানায় আমি নিজে গিয়েছি। আমি জানি কারণ তাদের আমি দেখেছি। (প্রশংসা, উল্লাস, একটি কণ্ঠের “মিথ্যুক!”) আমি মিথ্যুক! কে যেন বললেন যে আমি মিথ্যাবাদী? তিনি দয়া করে উঠে দাঁড়াবেন কি? আমি তাঁকে চিনে রাখতে চাই। (একটি কণ্ঠ : “এই লোকটি স্যার!” একদল ছাত্র চশমা-পরা নিরীহ গোছের একটি লোককে জোর করে ঠেলে তুলে ধরল।) আপনি আমাকে মিথ্যুক বলেছেন? (“না স্যার, না!” চিৎকার করে বলতে বলতে খাঁচায়-ভরা শেয়ালের মতো লোকটি হাওয়া হয়ে গেল।) আমার বক্তব্যের সততায় সন্দেহ প্রকাশের সাহস যদি এই হলের কারও থাকে, বক্তৃতার শেষে তার সঙ্গে আলাপ করতে পারলে আমি খুশি হব।… যে কোনও মহৎ আবিষ্কর্তাকেই এই অবিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে—একদল মূর্খ তাকে অবিশ্বাস করেছে। কোনও বড় সত্য যখন আপনাদের কাছে প্রকাশ করা হয় তখন সেটাকে বুঝবার মতো বোধি ও কল্পনা-শক্তি আপনাদের থাকে না। বিজ্ঞানের নতুন পথ খুলে দিতে যারা নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করেছে, আপনারা পারেন শুধু তাদের দিকে কাদা ছুঁড়তে। আপনারা নির্যাতন করেছেন মহাপুরুষদের! গ্যালিলিওকে, মহাপুরুষদের! গ্যালিলিওকে, ডারুইনকে, আমাকে—” (প্রলম্বিত উল্লাস ও পূর্ণ বিঘ্নসৃষ্টি। )
ঘটনাস্থলে তাড়াহুড়া করে যা লিখেছিলাম তা থেকেই এটা উদ্ধৃত করে দিলাম। তখন যে ভয়াবহ গগুগোল দেখা দিয়েছিল এই প্রতিবেদন থেকে তার সম্যক ছবি পাওয়া যাবে না। কিছু মহিলা অতি দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়লেন। গম্ভীর ও সম্মানিত অধ্যাপকরা যেন ছাত্রদের দলেই মিশে গেলেন। পাকা দাড়িওয়ালা লোকগুলো অধ্যাপককে লক্ষ্য করে ঘুষি পাকাতে লাগলেন। গোটা হল যেন ফুটন্ত পাত্রের মতো টগ্গ্ করতে লাগল। প্রফেসর কয়েক পা এগিয়ে দুই হাত তুলে দাঁড়ালেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে হৈ-চৈ চিৎকার ধীরে ধীরে থেমে গেল। সকলে আবার চুপচাপ শুনতে লাগল।
প্রফেসর বললেন, ‘আর আপনাদের আটকে রাখব না। তার কোনও দরকারও নেই। সত্য যা তা সত্যই; কিছু মূর্খ যুবক—এবং সমান মূর্খ বৃদ্ধ—চিৎকার করলেই তার রং বদলে যাবে না। আমি দাবি করছি, বিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত আমি খুলে দিয়েছি। আপনারা সেটা অস্বীকার করছেন। (হর্ষধ্বনি।) বেশ তো, নিজেরাই পরীক্ষা করে দেখুন। আপনাদের প্রতিনিধি হিসাবে এক বা একাধিক জন কি এগিয়ে এসে আমার বক্তব্যকে পরীক্ষা করে দেখবেন?”
তুলনামূলক শারীরসংস্থান বিদ্যার প্রবীণ অধ্যাপক মি. সামারলী উঠে দাঁড়ালেন। দীর্ঘকায়, শুকনো, বিরক্ত চেহারার মানুষ। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে কতকগুলি প্রশ্ন করে জ্ঞাতব্য তথ্য জেনে নিয়ে তিনি তার প্রস্তাবে রাজী হলেন এবং যে দেশে ঐ সব প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী দেখতে পাওয়া যায় তার দ্রাঘিমা ও লঘিমা জানতে চাইলেন।
প্রফেসর উত্তরে জানালেন, ব্যক্তিগত কারণে সে সব তথ্য আপাতত একান্ত গোপনীয়; তবে শ্রোতাদের ভিতর থেকে গঠিত একটি’ কমিটিকে যথেষ্ট সতর্কতাসহকারে সে সব তথ্য জানাতে তিনি রাজী আছেন। মি. সামারলী কি সেই কমিটির সদস্য হয়ে ব্যক্তিগতভাবে তার কাহিনির প্রমাণ পেতে রাজী আছেন?
মি. সামারলী : “হ্যাঁ, আমি রাজী।” (হর্ষধ্বনি)
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার : “তাহলে আমিও কথা দিচ্ছি, সে পথ খুঁজে নিতে যে সব তথ্য প্রয়োজন সে সবই আমি আপনার হাতে তুলে দেব। অবশ্য মি. সামারলী
যখন কথার সত্যাসত্য নির্ধারণের জন্য আবার সেখানে যাবেন, তখন তাঁর কথার সত্যাসত্য নির্ধারণের জন্যও এক বা একাধিক লোককে আমি তাঁর সঙ্গে পাঠাতে চাই। তাঁর কাছ থেকে এ সত্যও আমি লুকিয়ে রাখব না যে এ পথে অনেক বাধা আছে, অনেক বিপদ আছে। মি. সামারলীর একজন তরুণ সহকর্মী দরকার। কেউ স্বেচ্ছায় তাঁর সঙ্গী হতে রাজী আছেন?”
এমনি করেই বুঝি চরম মুহূর্ত আসে মানুষের জীবনে। সেই হলে ঢুকবার সময় আমি কি কল্পনায়ও ভেবেছিলাম যে অচিরেই একটি স্বপ্নাতীত উদ্দাম অভিযানে যোগ দিতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হব? কিন্তু গ্ল্যাডিস—এই রকম একটা সুযোগের কথাই সে বলত। আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কি যে বললাম তা নিজেই জানি না। সঙ্গী টার্প হেনরি আমার জামা ধরে টেনে ফিফিস্ করে বললেন, “বসে পড়ুন ম্যালোন! সকলের সামনে নিজেকে বোকা বানাবেন না।” ঠিক সেই মুহূর্তে একটি দীর্ঘকায়, শুকনো চেহারার লোকও ক্রুদ্ধ কঠিন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি হার মানতে রাজী নই।
বার বার বলতে লাগলাম, “আমি নিশ্চয় যাব মি. চেয়ারম্যান।”
“নাম! নাম!” শ্রোতারা চেঁচাতে লাগল।
“আমার নাম এডোয়ার্ড ডুয়ান ম্যালোন। ‘ডেইলি গেজেট’-এর প্রতিবেদক। আমি সর্বপ্রকার সংস্কারমুক্ত।”
চেয়ারম্যান আমার ঢ্যাঙা প্রতিদ্বন্দ্বীটিকে শুধালেন “আপনার নাম কি স্যার?”
“আমি লর্ড জন রক্সটন। আমি আগেই আমাজন ঘুরে এসেছি; জায়গাটা আমি ভাল করেই চিনি; এ ধরনের অনুসন্ধানের উপযোগী অনেক বিশেষ গুণ আমার আছে।”
চেয়ারম্যান বললেন, “ক্রীড়াবিদ ও পর্যটক হিসাবে লর্ড জন রক্সটন অবশ্য বিশ্ববিখ্যাত লোক; আবার এ ধরনের অভিযানে একজন সংবাদপত্রের লোক থাকাও নিশ্চয় ভাল।”
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বললেন, “অতএব আমি প্রস্তাব করছি, এই সভার প্রতিনিধিরূপে এই দু’জন ভদ্রলোককেই নির্বাচিত করা হোক; তাঁরা দু’জনই এই অনুসন্ধান-কর্মে অধ্যাপক সামারলীর সঙ্গী হবেন এবং আমার বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।”
এই ভাবে হৈ-হল্লা ও উল্লাস-ধ্বনির মধ্যে আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। আসন্ন ভবিষ্যতের চিন্তায় বিমূঢ় হয়ে জনস্রোতের টানেই হলের দরজায় পৌঁছে গেলাম। তারপর রিজেন্ট স্ট্রীটের রূপোলি আলোয় উদ্ভাসিত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গ্ল্যাডিসের কথা, ভবিষ্যতের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথাই ভাবতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার কনুইতে একটা স্পর্শ অনুভব করলাম। মুখ ফিরিয়ে দেখি, এই অপূর্ব অভিযানে আমার স্বেচ্ছাব্রতী ঢ্যাঙা সঙ্গীটি হাসি-হাসি অথচ গম্ভীর দুটি চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
তিনি বললেন, “আপনিই তো মি. ম্যালোন। আমরা তো সঙ্গী হতেই চলেছি—কি বলেন? আলবানিতে ঠিক রাস্তার উপরেই আমার বাসা। আশা করি আপনি অনুগ্রহপূর্বক আধ ঘণ্টা সময় আমাকে দিতে পারবেন; দু’একটা কথা আপনাকে বলা বড়ই জরুরি বলে মনে করি।”
