বড় রকমের অনুসন্ধানের জন্য ফাঁদ পাতা
ম্যালন কথা দিয়েছিল চ্যালেঞ্জার কন্যা এনিডের সঙ্গে আর কোন প্রেমের কথা বলবে না। কিন্তু তাদের দেখা হলেই চোখের দৃষ্টিতে কথা হতো, কারণ নীরব দৃষ্টিরও একটা ভাষা আছে। তাই তাদের সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়ে যায়নি। এছাড়া সে অন্য সবদিকে চুক্তি মতো কাজ করে যেত, যদিও পরিস্থিতিটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। চুক্তির শর্ত মেনে চলা সত্যিই কঠিন ছিল ম্যালনের পক্ষে। কারণ, ম্যালনকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জারের বাড়িতে যেতে হত। তর্ক-বিতর্কের উত্তেজনা যখন শেষ হয়ে যেত তখন সে সময়টা বড় ভাল লাগত ম্যালনের। ম্যালন শুধু যে পরলোকতত্ত্বের বিষয়টা তার মনটাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে যে বিষয়টার প্রতি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো একজন মহান ব্যক্তির একটুখানি সহানুভূতি আশা করত। এই আশাপূরণের জন্য একই সঙ্গে তৎপরতা এবং সতর্কতার সঙ্গে এগোত। সে জানত যে কোনও সময়েই বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে। একাধিকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। এর আগে দু’-একবার যখন বিস্ফোরণ ঘটবার উপক্রম হয়েছে তখন তা বুঝতে পেরে ম্যালন সমস্ত তর্ক-বিতর্ক বন্ধ করে দিত। তবে এর জন্য তাকে বিশেষ দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হয়েছে।
ম্যালন চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় বিশেষ চাতুর্যের আশ্রয় নেয়। ম্যালনের অন্যতম কৌশল ছিল বিজ্ঞানের কোনোও বিষয় নিয়ে চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে আলোচনা করা। যেমন পশুবিজ্ঞান বা কীটবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা। শেষে চ্যালেঞ্জার তাকে বলতেন, আমাদের এ বিষয়ের সব জ্ঞান আলফ্রেড রাফেল ওয়ালেস যা বলেছেন তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ম্যালন তখন নিরীহ লোকের মতো কিছু না জানার ভান করে প্রশ্ন করতো, যে ওয়ালেস পরলোকবাদী?
চ্যালেঞ্জার তখন রেগে দিয়ে প্রসঙ্গ পালটে দিতেন।
কখনও কখনও ম্যালন চ্যালেঞ্জারকে ফাঁদে ফেলার জন্য লজ-এর প্রসঙ্গ তুলত। বলত, আমি মনে করি এর প্রতি আপনার একটা উচ্চ ধারণা আছে।
চ্যালেঞ্জার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠতেন, সারা ইউরোপের মধ্যে উনিই হলেন, প্রথম বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তাই নয় কি? তিনিই এর সম্বন্ধে প্রথম সবচেয়ে বড় প্রামাণ্য তথ্য তুলে ধরেন।
ম্যালন বলল, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে অবশ্য আমি তাঁকে তাঁর পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধীয় কাজের জন্যই চিনি।
এরপর চ্যালেঞ্জার কথা বন্ধ করে দিতেন। ম্যালন কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করত এবং মাঝে মাঝে মন্তব্য করত, আপনি কি লম্ব্রসো-এর সঙ্গে কখনও দেখা করেছেন?
চ্যালেঞ্জার বলতেন, হ্যাঁ মিলান-এর কংগ্রেসে তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়।
ম্যালন, বলল, আমি এখন তাঁর একখানা বই পড়ছি।
আমার মনে হয় বইখানা অপরাধতত্ত্বের উপর।
ম্যালন বলল, না, বইটার নাম ‘আফটার ডেথ’ অর্থাৎ মৃত্যুর পরে।
চ্যালেঞ্জার আশ্চর্য হয়ে বললেন, কি? আমি বইটার নামই শুনিনি।
বইটাতে পরলোকতত্ত্বের উপর আলোচনা আছে। পরলোক সম্বন্ধে নানা প্রশ্নের উত্তর আছে।
চ্যালেঞ্জার বললেন, তার মানে তুমি বলতে চাও লম্বসের মতো এক তীক্ষ্ণ- বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি তার বইটিতে এই সব ভিত্তিহীন বাজে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
না, না, বইটি লেখা হয়েছে পরলোকবাদীদের সমর্থনে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনেক সময় কোনও কোনও বুদ্ধিমান ও মহান ব্যক্তি এমন দুর্বলতার পরিচয় দেন যা ব্যাখ্যা করা যায় না।
অপরিসীম ধৈর্য ও চাতুর্যের সঙ্গে ম্যালন এক-এক বিন্দু করে যুক্তির ঔষধ ঢেলে পরলোক সম্বন্ধে চ্যালেঞ্জারের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত বিদ্বেষের ভাবটাকে কাটিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু এত সত্ত্বেও তার কোনও সুফল দেখা গেল না। তাই ম্যালন ভাবল এর থেকে আরও শক্তিশালী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। ম্যালন তাই মনে মনে এই সংকল্প করল যে, পরলোকবাদীদের প্রেত সম্পর্কিত কিছু কাজকর্ম প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জারকে দেখতে হবে। কিন্তু কোথায় এবং কবে তা হবে এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মেইলির সঙ্গে তাকে আলোচনা করতে হবে।
তখন ছিল বসন্তকাল। একদিন বিকালে ম্যালন, মেইলিকে তার বসার ঘরে সেইখানে বসে থাকতে দেখল যেখানে একদিন মেঝের উপর পাতা কার্পেটের উপর সাইলাস লিনডেনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। ম্যালন আরও দেখল সেখানে পাদ্রী চার্লস্ ম্যাসন ও সেদিনকার কুইন্স হল বিতর্কসভার নায়ক জেমস্ স্মিথ মেইলির সঙ্গে গভীরভাবে আলোচনা করছে। মনে হলো তাদের আলোচনার বিষয়বস্তুটা আজকের দিনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জনসাধারণের কাছে। পরলোক সম্বন্ধে চার্চ ও ধর্মের মতামত নিয়ে স্মিথ ও ম্যাসন দুই ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের মধ্যে যখন তর্ক-বিতর্ক চলছিল, তখন মেইলি রেফারির মতো দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
পাদ্রী ম্যাসন বললেন, জনসাধারণ বড় রকমের কোনও পরিবর্তন চায় না। আর সেটার প্রয়োজনও নেই। আমরা শুধু সেন্টদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। অতীতের সেন্টরা আজও মাঝে মাঝে চার্চে আবির্ভূত হয়ে নানা নির্দেশ দান করেন। এইভাবে আমরা সেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের দ্বারা এমন এক প্রেরণা ও শক্তি পাই—যা ধর্মের মধ্যে পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারে। তোমরা অতীতের কোনও বিষয়ের মূলটাকে একেবারে উৎপাটিত করতে পার না। প্রাচীনকালের ধর্মীয় নেতারাও তা করেননি। তাই তাঁরা তাঁদের চারপাশের সব ধর্মগোষ্ঠীগুলোকে কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন।
সেই কারণেই তাদের চরম সর্বনাশ হয়।
এইভাবে দু’জনের মধ্যে তর্কবিতর্ক বেড়ে চলল এবং মেইলি দু’জনকে থামাতে সচেষ্ট হল, কিন্তু স্মিথ এ ব্যাপারে ছিল একেবারে খাড়াখাড়ি আপোসহীন, বুল-ডগের মতো একগুঁয়ে।
সে বলল, যে লোক তার নিজের পরিবারের অর্ধেকটাকে নিজের হাতে ধ্বংস করে, সে লোককে তুমি আর কী নামে ভূষিত করতে পারো?
অবশ্য তার ব্যক্তিগত চরিত্র এখানে আলোচনা বিষয় নয়। আমরা আলোচনা করছি চার্চের সংগঠনের কথা।
আমি খুব সরলভাবে কথা বলছি। আমার এই সরলতার জন্য কিছু মনে করবেন না, মি. ম্যাসন।
পাদ্রী ম্যাসন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আনন্দের হাসি হাসলেন। তিনি বললেন, যতদিন পর্যন্ত নিউ টেস্টামেন্ট-এর অস্তিত্ব থাকবে ততদিন তোমরা কী কর না-কর সে বিষয় আমি গ্রাহ্য করি না। তামরা যদি জার্মানির ডুস-এর মতো একথা প্রমাণ কর যে ঈশ্বর এক কাল্পনিক রূপকমাত্র তাহলেও তোমাদের কথা আমাকে কিছুমাত্র বিচলিত করতে পারবে না। যতদিন পর্যন্ত আমি বাইবেলের মহান শিক্ষায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল থাকব ততদিন আমি কোনওভাবেই বিচলিত হব না। আমি কোথাও না কোথাও থেকে এই জগতে এসেছি এবং এই জগতের জীবনকে বরণ করে নিয়েছি এবং এটাই আমার ধর্ম।
স্মিথ বলল, এ বিষয়ে আমাদের দু’জনের মধ্যে এমন কিছু মতপার্থক্য নেই। যদি এর থেকে ভাল শিক্ষা তাকে তো ভাল। তবে সেটা আমি এখনো দেখিনি। সুতরাং যে শিক্ষা আমি হাতের কাছে পাচ্ছি সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াই ভাল এবং মঙ্গলজনক। তবে আমরা এই শিক্ষার মধ্যে যে সব বাড়াবাড়ি ও অতিশয়োক্তি আছে সেগুলোকে ছেঁটে ফেলতে চাই। কিন্তু এইসব কোথা থেকে আসে? এই বাড়াবাড়িটা এসেছিল অন্য সব ধর্মের সঙ্গে আপোষ থেকে। আমাদের বন্ধু কনস্টানস্টাইন তাঁর জগৎজোড়া সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের একটা আদর্শ স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে একরূপতার সন্ধান করেছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে জোড়াতালি দেওয়ার মতো একটা কাজ করেন। তিনি মিশরের ধর্মীয় ক্রিয়াকাণ্ড ও পোশাক-আশাকগুলোকে গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের ঈস্টার উৎসব তাঁর কাছে ছিল পেগানদের ভারনাল ইকুইনিক্স বা বসন্ত উৎসবের মতো। কনফারমেশান, ব্যাপটিজ্ম প্রভৃতিরও কোন দাম ছিল না তাঁর কাছে। বলির রক্তকে তিনি জল মনে করতেন।
ম্যাসন তাঁর কানে আঙুল দিলেন। তারপর হেসে বললেন, তোমার কথাগুলো পুরোনো বক্তৃতার মতো। একটা হলঘর ভাড়া নাও, কিন্তু কোনো লোকের ব্যক্তিগত বাড়িতে যাবে না। সত্যি কথা বলছি স্মিথ, ওগুলো সব হচ্ছে মূল প্রশ্নের আনুষঙ্গিক ব্যাপার। এটা যদি সত্যি হয় অর্থাৎ তোমাদের চেষ্টা যদি সফল হয় তাতে আমার অবস্থার কিছু ক্ষতি হবে না। কারণ, আমাদের এমন কতগুলো জোরালো নীতি ও তত্ত্ব আছে যা যুগযুগ ধরে অসংখ্য মানুষের দ্বারা নন্দিত হয়ে আসছে এবং এই নীতি বা তত্ত্বকে খর্ব করা উচিত হবে না। এ বিষয়ে অবশ্য তুমি একমত হবে।
স্মিথ বলল, না। তুমি তোমাদের চার্চের ভক্তদের অনুভূতির কথাই শুধু ভাবছ। কিন্তু প্রতি দশজনের মধ্যে সেই নয়জনের কথাও তোমাকে ভাবতে হবে যারা কখনো চার্চে যায় না। যুক্তিহীন, অদ্ভুত যতসব ধারণা তাদের কণ্ঠরোধ করে আছে। যদি তুমি সেই একই যুক্তিহীন, অদ্ভুত ও আজগুবি জিনিস তাদের শেখাও তাহলে কি করে তাদের মন পাবে? যদি অবশ্য তুমি তোমার শিক্ষার সঙ্গে আত্মার কিছু শিক্ষা মিশিয়ে দাও তাহলে কিছুটা কাজের কাজ হয়। যাই হোক যদি তুমি এই সব অজ্ঞেয়বাদী ও নাস্তিকদের কাছে গিয়ে বলো, এসব শিক্ষা অসত্য এবং হিংসা- প্রতিহিংসার এক দীর্ঘ ইতিহাসের দ্বারা কলুষিত, তাহলে আমি তোমার সাথে একমত হব। এখানে আমাদের কাজের মধ্যে একটা বিশুদ্ধ অভিনব বস্তু আছে যার বলে আমি ওদের কান ধরে ঈশ্বরবিশ্বাস ও ধর্মের মূল বিষয়ে ফিরিয়ে আনব। যাতে ওরা হিংসা- প্রতিহিংসার দ্বারা ওদের নিজেদের কোনও ক্ষতি করতে না পারে। তোমাদের প্রচারিত ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাস করে ওরা নিজেদের ধর্মেরই ক্ষতি করেছে।
মেইলি কথাগুলো শুনতে শুনতে তার দাড়িটা ধরে টানাটানি করছিল। সে দেখল স্মিথ ও ম্যাসনের দু’জনের কথাই পরস্পরবিরোধী। দু’জনের মতের মধ্যে কোনও মিল নেই। স্মিথ খ্রীস্টকে ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন এক মানুষ বলে শ্রদ্ধা করে আর ম্যাসন খ্রীস্টকে মানুষরূপী ঈশ্বর হিসাবে শ্রদ্ধা করে। সুতরাং দু’জনের মতপার্থক্য যথেষ্ট রয়েছে। দু’জনের অনুগামীদের মধ্যেও বিরাট পার্থক্য। সুতরাং আপস অসম্ভব।
ম্যালন বলল, একটা কথা আমি বুঝতে পারি না। আপনারা কেন আপনাদের প্রেতাত্মা বন্ধুদের এই কথাটা জিঞ্জাসা করেন না এবং তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলেন না।
মেইলি উত্তর করল, তুমি কাজটা যত সহজ ভাবছ ততটা সহজ নয়। আমরা সকলেই মৃত্যুর পর এই মর্ত্যজীবনের ভাবধারা ও যত সব বিদ্বেষ-ভাব পরলোকে বহন করে নিয়ে যাই। আমাদের আত্মা পরলোকে গিয়ে দেখে সেখানেও মর্ত্যলোকের মতোই একই আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাই আমরা যখন পরলোক থেকে আগত কোনও প্রেতাত্মাকে এই বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করি তখন সে তার পূর্বজন্মের ভাবধারার প্রতিধ্বনি করে। কালক্রমে সেই প্রেতাত্মার ভাবধারা সমস্ত সঙ্কীর্ণতা হতে মুক্ত হয়ে প্রসারিত হয়। সে তখন বিশ্বমানবের ভ্রাতৃত্ব, ঈশ্বরের পরম পিতৃত্বের কথাই বলে। আমি সবচেয়ে গোঁড়া লোকদের কথা শুনেছি। কিন্তু, তাদের কথা কিন্তু তারা পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারে না। তাদের সব কথা হেঁয়ালিতে ভরা।
ম্যালন বলল, আমিও বলেছি এবং সবকিছু শুনে এই কথাই আমারও মনে হয়। কিন্তু বস্তুবাদীদের খবর কি? তারা তো আর সারা জীবন অপরিবর্তিত থাকতে পারে না।
তারা মনের ভুলবশত নিষ্ক্রিয় ও জড় অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকে। পরে অবশ্য তাদের চৈতন্য হয়। এই সব বস্তুবাদীরা সকলেই ভাল চরিত্রের লোক এবং তারা কোনও না কোনও উন্নত ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়।
পাদ্রী ম্যাসন বলল, হ্যাঁ তারা হচ্ছে পৃথিবীর লবণের মতো।
স্মিথ বলল, আমাদের আন্দোলনে তারাই হচ্ছে সবথেকে ভাল হাতিয়ার। তাদের কথাবার্তা থেকে এই কথাই প্রমাণিত হয় যে তারা বুদ্ধিমান। বাইরে থেকে কি একটা শক্তি যেন তাদের বুদ্ধি দেয়। আপনারা যারা ধর্মের লোক তারা বুঝতে পারেন না, কোনও ব্যক্তি যদি শূন্যতার মধ্যে থাকে এবং সহসা সেই শূন্যতা পূরণের একটি বস্তুকে খুঁজে পায় তাহলে তার মনের অবস্থা কী হয়। যখন আমি কোনও লোককে অন্ধকারে কোনও কিছুর জন্য হাতড়ে বেড়াতে দেখি তখন আমি তার হাতে সেই জিনিসটা তুলে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
এমন সময় একই সঙ্গে মিসেস মেইলি ও চা এসে পড়ল। কিন্তু আলোচনা থামল না। যারা পরলোকতত্ত্ব নিয়ে চর্চা করে তাদের এটাই হলো বৈশিষ্ট্য। এই পরলোকতত্ত্বের বিভিন্ন দিক আছে এবং এই সব দিকগুলো জানার আগ্রহ তাদের এমনই নিবিড় যে যখনই তারা পরলোকতত্ত্বে বিশ্বাসী লোকদের পেয়ে যায় তখনই তারা নানা আলোচনার মধ্যে ডুবে যায়। এই আলোচনাটা তাদের কাছে খুবই মনোরম হয়ে ওঠে। তারা পরস্পরের সঙ্গে মত বিনিময় করতে থাকে এবং পরস্পরের অভিজ্ঞতার কথা বলাবলি করতে থাকে।
অবশেষে বেশ কিছুটা কষ্ট করে ম্যালন আলোচনার ধারাটাকে ঘুরিয়ে অন্য একটা বিষয়ের দিকে নিয়ে এল যে-বিষয়টা জানার জন্যই সে এ বাড়িতে এসেছে। সে এইসব লোকদের থেকে পরলোকতত্ত্বে অভিজ্ঞ লোক আর কোথাও পাবে না। এরা প্রত্যেকেই পরলোকতত্ত্বে আগ্রহী। তাই ম্যালন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সামনে একটা পারলৌকিক অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিল। চ্যালেঞ্জারের মতো একজন মহান ব্যক্তিকে যে হাতের কাছে পাওয়া যাবে এটা ভেবে সকলে খুবই উৎসাহ বোধ করল।
ওরা সবাই একটা বিষয়ে সম্মত হলো। সেটা হলো এই যে, চ্যালেঞ্জারের সামনে একটা প্রেতচর্চার অনুষ্ঠান করতে হবে। অনুষ্ঠানটা কোথায় হবে সে বিষয়েও ওরা ঠিক করলো যে, সাইকিক কলেজের প্রদর্শনী ঘরে অনুষ্ঠানটা হবে। সারা লন্ডন শহরের মধ্যে প্রেতচর্চার পক্ষে সেই ঘরটাই সবদিক থেকে ভাল। কিন্তু অনুষ্ঠানটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল। এ বিষয়েও ওরা একমত হলো। ওরা বলাবলি করতে লাগল, যে-কোনো পরলোকবাদী, যে- কোনো মিডিয়াম এই অনুষ্ঠানের কথা শুনলে সব কাজ ফেলে রেখে সে অনুষ্ঠানে যোগদান করবে।
কিন্তু মিডিয়াম কে হবে? এক্ষেত্রে বলসোভার চক্রই আদর্শ। এই চক্র অবৈতনিক এবং এক বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে বলসোভারের মেজাজটা বড় উগ্র এবং চ্যালেঞ্জারের কথাগুলো বড় অপমানজনক এবং বিরক্তিকর। অধিবেশনটা গোলমালের মধ্যে দিয়ে পণ্ড হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এ ধরনের ঝুঁকি না নেওয়াই ভাল। সেক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জারকে কি প্যারিসে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে? কিন্তু এইরকম একটি ষাঁড়কে প্যারিসে ড. মপুই-এর কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়ার দায়িত্বটা কে নেবে?
মেইলি বলল, চ্যালেঞ্জার বোধহয় পিথিক্যানথ্রোপাসের গলাটা টিপে ধরে সেই ঘরের উপস্থিত সকলের জীবনকে বিপন্ন করে তুলবেন।
না, না, এসব ঝুঁকি না নেওয়াই ভাল—ওদের মধ্যে কে একজন বলল।
স্মিথ বলল, ব্যান্ডারবি হচ্ছে দেহগত সামর্থ্যের দিক থেকে ইংলন্ডের মধ্যে সবেচে শক্তিশালী মিডিয়াম। কিন্তু আমরা সবাই জানি তার ব্যক্তিগত চরিত্র কী রকম। তোমরা তার উপর নির্ভর করতে পারো না।
ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, কেন পারি না? তার দোষটা কোথায়?
স্মিথ তার হাত তুলে ঠোঁট দুটোর উপর রাখল। তারপর বলল, অন্য সব মিডিয়াম যে পথে চলে সেও সেই পথেই চলে।
ম্যালন বলল, ব্যাপারটা আমাদের স্বার্থের বিরোধী কি না তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। ফল যদি খারাপ হয় তাহলে সে কাজ ভাল হবে কী করে?
তুমি কি কাব্যকে ভাল জিনিস মনে করো?
ম্যালন বলল, আমি অবশ্যই কবিতা ভালভাসি।
কবি পো ছিলেন মদ্যপায়ী, মাতাল ও বদমেজাজী। বায়রন ছিলেন খুবই হঠকারী আর ভারলেইন ছিলেন দুশ্চরিত্র। কিন্তু আসল কথা হলো মানুষকে তার কাজ থেকে পৃথক করে দেখতে হবে। মানুষের প্রকৃতি যাই হোক না কেন সে তার কাজের দিক থেকে কতটা দক্ষ সেটাই দেখতে হবে। সকল প্রতিভাবান ব্যক্তিকেই তার অস্থির ও বদমেজাজের জন্য মূল্য দিতে হয়। একজন বড় দরের মিডিয়াম যে কোন প্রতিভাবান ব্যক্তির থেকেও বেশি সংবেদনশীল। তাদের কারও কারও জীবন সুন্দর হয়। আবার কারও কারও জীবন সুন্দর হয় না। আর তার কারণও আছে। তাদের পেশাটা এমনই কঠিন যে তাদের দেহমনের সব শক্তিকে এই কাজের মধ্যে সংহত করতে হয়। আর এর জন্য জোরালো উদ্দীপকের দরকার হয়। এই জন্য তারা অনেক সময় তাদের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। তবু তাদের দেহকে কাজ করে যেতে হয়।
এই কথা বলতে গিয়ে ব্যান্ডারবির কথাটা মনে পড়ে গেল। তুমি হয়ত তাকে দেখনি ম্যালন। লোকটা বড় অদ্ভুত। লোকটাকে দেখতে বেশ মজা লাগে। লোকটা বেঁটে, মোটা এবং গোলাকার। মনে হয় সে নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলটা দেখতে পায় না। মদ খেয়ে মাতাল হলে তার অবস্থাটা আরও মজার হয়ে ওঠে। কয়েক সপ্তাহ আগে আমি জরুরি খবর পাই যে সে কোনও একটা হোটেলে গিয়ে খুব বেশি মদ খেয়ে এমনই মাতাল হয় যে সে বাড়ি ফিরতে গিয়ে অন্যদিকে অনেক দূরে চলে যায়। এই কথা শুনে আমি আমার বন্ধুকে নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে যাই এবং অনেক কষ্টে তাকে খুঁজে পেয়ে তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। এই লোকটা প্রেতচর্চার অধিবেশনে তাকে ডাকার জন্য আমাদের বহুবার বলেছিল। আমরা তাকে সংযত করার চেষ্টা করলাম কিন্তু সত্যি সত্যি একদিন একটা অধিবেশনে এসে সে কাজ করতে লাগল। প্রেতচর্চার টেবিলের উপর একটা ছোট জার ঢাকা ছিল। ব্যান্ডারবি আলো নিভিয়ে দিয়ে সেটা বাজাতে লাগল। এমন সময় তার কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণকর্তা প্রেত প্রিন্সেপ এসে তার কাজে বাধা দিয়ে বলল, পাজি বদমাস কোথাকার। কোন সাহসে তুমি এ কাজ করছ? এই বলে প্রিন্সেপ জারটা কেড়ে নিতেই ব্রান্ডারবি রাগে গর্জন করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তখন আমরাও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
পাদ্রী ম্যাসন বললেন, যাই হোক ব্যান্ডারবি তখন মিডিয়াম ছিল না। কিন্তু কোন অধিবেশনে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার থাকলে সেখানে ব্যান্ডারবি মিডিয়ামের কাজের ঝুঁকি নেবে না।
মিসেস মেইলি বলল, টম লিনডেনের খবর কি?
মি. মেইলি মাথা নাড়ল। তারপর বলল, কারাবাসের পর থেকে টম লিনডেন আর আগের মতো নেই। যে সব নির্বোধ লোকগুলো তাকে জেলে ঢুকিয়েছিল, তারা শুধু আমাদের শক্তিশালী ও জ্ঞানী মিডিয়ামকে নির্যাতিত করেনি, তার আত্মিকশক্তিগুলোকেও নষ্ট করে দিয়েছে। একটা ক্ষুরকে ভিজে জায়গায় রাখলে তার ধার তীক্ষ্ণ হবে এটা কখনও আশা করা যায় না।
কি? টম লিনডেন তার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে?
মেইলি বলল, আমি অবশ্য সে কথা বলছি না। তবে তার শক্তি আগের মতো নেই। টম লিনডেন এখন যে কোনও অধিবেশনে তার সামনে বসে থাকা অতিথিদের মধ্যে ছদ্মবেশী পুলিশকে দেখে। তার মনে হয় আবার হয়ত কোনও পুলিশ এই সভায় অতিথিরূপে এসে তাকে ধরতে এসেছে। তবুও মিডিয়াম হিসাবে একমাত্র সেই-ই নির্ভরযোগ্য এবং এখন আমাদের তারই খোঁজ করা উচিৎ।
সেই অধিবেশনে গ্রাহক কে হবে? আমার মনে হয় চ্যালেঞ্জার তার দু’- একজন বন্ধুকে আনতে পারে।
তারা এলে মিডিয়ামের কাজে ভয়ঙ্কর বাধা সৃষ্টি করবে। সে জন্য আমাদের দিক থেকে কিছু সহানুভূতিশীল লোক থাকা উচিৎ। ডেলিসিয়া ফ্রি-ম্যান আসবে, আমি নিজেও আসব। ম্যাসন, আপনি আসবেন তো?
অবশ্যই আমি আসব।
স্মিথ, তুমি?
স্মিথ বলল, না, না, পরের সপ্তায় আমার অনেক কাজ। দুটো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, একটা বিয়ে, পাঁচটা মিটিং। এছাড়া কিছু কাগজপত্র দেখতে হবে।
ম্যাসন বলল, পরের সপ্তাহে তোমার সব দিন কাজ থাকলেও একটা দিন আমরা অবশ্যই পাব। আট হচ্ছে লিনডেন-এর প্রিয় সংখ্যা। সুতরাং শোনো ম্যালন, এখন তোমাকে সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তাঁর অনুমতি নিয়ে সুবিধা মতো তারিখটা ঠিক করতে হবে।
ম্যাসন আরও বলল, এতে তাঁর সমর্থন আছে কিনা সেটা ভাল করে দেখবে। এ ব্যাপারে আমাদের কাজের অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখতে হবে।
ম্যালন বলল, হ্যাঁ অবশ্যই তা করতে হবে। এটাই হবে ঠিক পথ। এবার থেকে আমরা কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করব।
সেদিন সন্ধ্যায় ম্যালনের জন্য সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ঘটনা অপেক্ষা করছিল। দৈবাৎ সেদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে তার জীবনের পথ খুলে দিল। সেদিন সন্ধ্যার সে যখন নির্ধারিত সময়ে গেজেট-এর অফিসে গেল তখন তাকে জানানো হলো মি. বেমন্ট তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। ম্যালনের উপরওয়ালা ছিলেন সহ সম্পাদক ম্যাক আরডেল। তিনি ছিলেন জাতিতে স্কচ। প্রধান সম্পাদক সবার উপরে তাঁর ঊর্ধ্বতন পদে আসীন থাকতেন এবং তিনি খুব কমই তাঁর নিচের তলার কর্মীদের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। সেই মহান সম্পাদক তাঁর পবিত্র ঘরটিতে ওক্ কাঠের দামী আসবাবপত্রে পরিবৃত হয়ে তাঁর আসনে বসে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ম্যালন যখন তাঁর ঘরে ঢুকল তখন তিনি একখানি চিঠি লিখছিলেন। কয়েক মিনিট পর তিনি তাঁর ধূসর চোখের দৃষ্টি মেলে ম্যালনের দিকে তাকালেন।
সম্পাদক বললেন, এই যে ম্যালন, আমি অল্প কিছুক্ষণের জন্যে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। তুমি বসবে না? পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে তুমি যে সব রচনা লিখেছ সেই সম্বন্ধে আমি একটা কথা বলতে চাই। তুমি প্রথমে এ বিষয়ে সংশয়ের সঙ্গে লিখতে শুরু করেছিলে। তার ফলে তোমার সেই লেখাগুলো আমার ও আমাদের কাগজের পাঠকবর্গের কাছে সহজেই গ্রহণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করছি তোমার আগেকার সেই মতের পরিবর্তন হয়েছে এবং তুমি এখন প্রেতচর্চার যারা অনুষ্ঠান করে এবং পরলোক নিয়ে যারা মাথা ঘামায় তাদের কিছুটা সমর্থন করছ। এটা আমাদের কাগজের নীতি নয়। কারণ আমরা এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকতে চাই এবং আমরা আগেই ঘোষণা করেছিলাম, এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তের উপর ভিত্তি করে আমাদের কাগজে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু রচনা প্রকাশিত হবে। এসব রচনা অবশ্যই প্রকাশিত হবে, তবে লেখার সুরটার পরিবর্তন করতে হবে।
ম্যালন বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করল, আমাকে তাহলে কী করতে হবে স্যার?
তোমাকে আবার আগেকার সেই কৌতুকজনক ভঙ্গিতে লিখতে হবে। অর্থাৎ জনগণ এই পরলোক বিষয়ে মজার দিকটাই দেখতে ভালবাসে। কেবল মজার দিকটা তুলে ধরবে। কুমারী আন্টের হাস্যকর কথা স্মরণ কর এবং তাকে দিয়ে এ বিষয়ে কিছু বলাও। তুমি আমার কথার অর্থ বুঝতে পারলে?
আমার মনে হয় স্যার, এটা আমার কাছে আর কৌতুক বলে মনে হয় না। আমি বরং এটাকে ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
সম্পাদক গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।
দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের কাগজের গ্রাহকরা কী সব করেছে তা দেখ।
তাঁর সামনে পাঠকদের একগাদা চিঠি টেবিলের ওপর। তারপর একটা চিঠি তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন : ‘আমি আপনাদের কাগজকে ধর্মভীরু কাগজ হিসেবেই ভাবতাম। কিন্তু বর্তমানে পরলোক নিয়ে যা প্রকাশিত হচ্ছে তা সবদিক থেকেই নিষিদ্ধ। কেউই এই কাজ সমর্থন করবে না। যদি আমি গ্রাহক হিসাবে এই কাগজে প্রকাশিত লেখা পড়ি তাহলে অবশ্যই এই পাপের অংশীদার হতে হবে আমাকে।”
ম্যালন বিড় বিড় করে বলল, এসব গোঁড়ামি।
সেই গ্রাহক হয়ত ধর্মীয় গোঁড়ামিতে ভুগছে। কিন্তু সেই গোঁড়া গ্রাহকের পয়সার দাম অন্য যে-কোনও ব্যক্তির পয়সার সমান।
এই বলে সম্পাদক আর একটি চিঠি বার করে ম্যালনের হাতে দিয়ে বলল, স্বাধীন চিন্তা ও জ্ঞানের আলোর এই বিকাশের যুগে তুমি নিশ্চয় সেই আন্দোলনকে সাহায্য করতে চাইবে না যে আন্দোলন দেবদূত ও শয়তান সম্বন্ধীয় অতীতের সেই ভয়ঙ্কর ভাবধারার জগতে আমাদের নিয়ে যেতে চায়। যদি তা চাও তাহলে আমি বলব আপত্তিকারী গ্রাহকদের সঙ্গে তুমি আলোচনা কর।
ম্যালন বলল, তাহলে আপত্তিকারী সব গ্রাহকগুলোকে একটা ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে হবে যাতে তারা নিজেরাই সব বিতর্কের মীমাংসা করতে পারে। এটা কিন্তু সত্যিই মজার ব্যাপার স্যার।
তা হয়ত হতে পারে মি. ম্যালন, কিন্তু আমাদের গেজেটের প্রচারের সংখ্যাটাও ভেবে দেখতে হবে।
আপনি এটা ভেবে দেখছেন না স্যার যে জনসাধারণের মতের ঠিক মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। কিছু চরমপন্থী গ্রাহকদের অন্তরালে আছে বিশাল জনসাধারণ যারা এই সব প্রেতচর্চার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়। অনেক সম্মানীয় ব্যক্তি এই সব কাজ দেখেছেন এবং এই বিষয়ে সাক্ষ্য দান করেছেন। সুতরাং জনগণকে বোকা না বানিয়ে এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য তাদের জানানো কি আমাদের কর্তব্য নয়?
সম্পাদক তাঁর কান দুটো বাঁকিয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, পরলোকবাদীদের নিজেদেরই দায়িত্বে লড়াই করতে হবে বিপক্ষের সঙ্গে। আমাদের কাগজ প্রচারভিত্তিক কোনও সংবাদপত্ৰ নয়। জনসাধারণকে ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে পরিচালনা করা আমাকের কাজ নয়।
ম্যালন বলল, না, না, আমি বাস্তব তথ্য ও ঘটনার কথা বলতে চাইছি। একবার ভেবে দেখুন কেমন বিধিবদ্ধভাবে জনগণকে এ ব্যাপারে অজ্ঞ রাখা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে করুন, যখন কেউ লন্ডনের কোনও পত্রিকায় প্রকাশিত এক্টোপ্লাজম-এর উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পাঠ করেন, তিনি ভেবে দেখেন এই রচনার বিষয়বস্তু বিজ্ঞানের লোকদের দ্বারা পরীক্ষিত ও সমর্থিত হয়েছে এবং লেখকের বক্তব্য প্রমাণিত করার অসংখ্য ছবি তার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে।
বেমন্ট অধৈর্য হয়ে বলল, ঠিক আছে, এখন আমি এমন ব্যস্ত যে এ বিষয়ে বিতর্ক করার মতো সময় আমার নেই। তোমাকে এখানে ডাকার কারণ হলো এই যে আমি মি. কর্নেলিয়াসের কাছ থেকে এই মর্মে একটি চিঠি পেয়েছি যে তোমাকে অবিলম্বে অন্য মত অবলম্বন করতে হবে।
মি. কর্নেলিয়াস গেজেট পত্রিকার মালিক। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কোনও গুণের জোরে এই মালিকানা লাভ করেননি। তাঁর বাবা কয়েক মিলিয়ান টাকা রেখে যান আর এই টাকার জোরেই তিনি এই মালিকানা পেয়েছেন। তিনি এই পত্রিকার অফিসে বিশেষ আসেন না। দরকার হলে অফিসের কর্মচারীদের ডেকে পাঠান। মি. কর্নেলিয়াসের মস্তিষ্কে জ্ঞানবুদ্ধি বলে কিছু নেই। তাঁর চরিত্র গৌরবজনক নয়। তবু মাঝে মাঝে জনসাধারণ সম্পর্কিত কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর মতামত পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়। মি. কর্নেলিয়াস টাকার জোরে বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই কিছু শৃঙ্খলতা-দোষ এসে গেছে তাঁর চরিত্রে।
বেমন্ট বললেন, তাহলে সব কথা হয়ে গেল।
তাঁর কথা শুনে মনে হলো তিনি এইখানেই সব বিতর্কের অবসান করে দিলেন।
ম্যালন বলল, সব কথা এমনভাবে শেষ হলো যাতে আপনার পত্রিকার সঙ্গে আমার সম্পর্কেরও শেষ সূচিত হলো। এই পত্রিকার সঙ্গে আমার ছয় মাসের চুক্তি আছে। এই ছয় মাস শেষ হলেই এই পত্রিকার সঙ্গে আমার আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। আমি চলে যাব।
মি. বেমন্ট একমনে লিখে যেতে যেতে বললেন, শান্ত হও ম্যালন।
ম্যালনের মুখের উপর প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বের ছাপ ফুটে ছিল। সে তখনই সহসম্পাদক ম্যাকআর্ডেল-এর ঘরে চলে গেল। স্কচ ম্যাকআর্ডেল ম্যালনের মুখে সব কথা শুনে বিশেষ বিচলিত হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, তোমার রক্তটা আইরিশ বলে এমন হলো। তুমি জাতিতে স্কচ হলে এমন হতো না। তুমি এখনই গিয়ে বল তুমি পুনর্বিবেচনা করে দেখবে।
ম্যালন বলল, না, আমি কখনই তা করব না। ভুঁড়ি মোটা, লালমুখো কর্নেলিয়াসের মতো লোকের মত আমি কখনই মেনে নেব না। এই লোকটা আমাকে পৃথিবীর সব চেয়ে পবিত্রতম বস্তুকে হাসির খোরাকে পরিণত করে তুলতে বলছে। তার কাছে এটা যেন এক কৌতুকজনক ব্যাপার।
ম্যাকআর্ডেল বললেন, শোন শোন, হঠকারিতা করো না। নিজের হাতে নিজের সর্বনাশ করো না।
এই কারণে সর্বনাশ ঘটাও ভাল। আর আমি একটা অন্য চাকরিও পাব।
না, কর্নেলিয়াস মনে করলে অন্য কোনও চাকরির পথ বন্ধ করে দিতে পারে। মালিকের কথা শোননি এই অপবাদ একবার যদি রটে যায় তাহলে এই ফ্লীট স্ট্রীটে তোমার আর স্থান হবে না।
ম্যালন বলল, এটা একসঙ্গে অভিশাপ আর লজ্জার কথা। আজ আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করা হলো তা সাংবাদিকদের পক্ষে অপমানের বিষয়। শুধু ব্রিটেন নয়। আমেরিকার অবস্থা আরও খারাপ। সংবাদপত্র জগতে কর্নেলিয়াসের মতো নীচ লোক আর একটাও পাবে না। ওর অন্তরটা পশুর মতো। আত্মা বলে কোনও জিনিস নেই, অথচ এরাই সমাজের নেতা।
সহসম্পাদক ম্যাকআর্ডেল পিতৃসুলভ ভঙ্গিতে তাঁর একটা হাত যুবক ম্যালনের উপর রাখলেন। তারপর বললেন, জগৎকে যেভাবে দেখব সেই ভাবেই তাকে গ্রহণ করব। আমরা জগৎ সৃষ্টি করিনি, সুতরাং সেটাকে ভাল করার দায়িত্ব আমাদের নেই। সেটা যেমন আছে তেমনি থাক, অপেক্ষা কর কালক্রমে যা হবার হবে। আমাদের শুধু দৌড়ে যেতে হবে। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাব, তোমার তরুণী প্রেমিকার কথা ভাব, তারপর যথারীতি বাস্তব জগতে ফিরে এসো এবং যে রুটি আমরা সকলে চিবোচ্ছি সেটাতে মন দাও। জগতের মধ্যে আমাদের টিকে থাকতে হবে, আপন আপন জায়গায় অধিষ্ঠিত থাকতে হবে।
