অধ্যায় ৯
একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে। আগে থেকে এটা কে বুঝতে পারত? আমাদের বিপদের তো কোনও শেষ দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো এই বিচিত্র দুর্গম জায়গায় সারাটা জীবন কাটানোই আমাদের নিয়তি। আমি এতদূর বিচলিত হয়ে পড়েছি যে বর্তমানের ঘটনা বা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কোনওটা সম্পর্কেই স্পষ্ট করে ভাবতে পারছি না। আমার বিহ্বল বুদ্ধির কাছে একটিকে মনে হচ্ছে ভয়ংকর, আর অন্যটি রাতের মতো কালো।
এর চাইতে খারাপ অবস্থায় কেউ কোনওদিন পড়েনি; আমাদের সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান আপনাকে জানিয়ে কোনও লাভ নেই; বন্ধুদের কাছে সাহায্যকারী দল পাঠাবার অনুরোধ জানিয়েও কোনও লাভ হবে না। তারা যদি কাউকে পাঠাতেও পারে তাহলেও সেই সাহায্যকারী দল দক্ষিণ আমেরিকায় এসে পৌঁছবার আগেই হয়তো আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে।
প্রকৃতপক্ষে আমরা মানুষের সাহায্য থেকে এতদূরে চলে এসেছি যেন আমরা চাঁদের বাসিন্দা। আমাদের যদি বাঁচতে হয় নিজেদের গুণেই বাঁচতে হবে। আমার সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তি; তাঁরা অসাধারণ বুদ্ধি ও অবিচল সাহসের অধিকারী। সেটাই আমাদের একমাত্র আশা। সহকর্মীদের অবিচলিত মুখের দিকে তাকালেই আমি যেন অন্ধকারে আলোর রশ্মি দেখতে পাই।
যে ঘটনা-পরম্পরা এই বিপদের মধ্যে আমাদের ঠেলে দিয়েছে যতদূর সম্ভব তার একটা বিবরণ আপনাকে দিচ্ছি।
শেষ চিঠিতে আপনাকে লিখেছিলাম, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যে উপত্যকার কথা বলে থাকেন তার চতুর্দিকস্থ আলোহিত পর্বতশ্রেণীর সাত মাইলের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেছি। যত এগোতে লাগলাম ততই মনে হলো এই সব পাহাড়ের উচ্চতা কোনও কোনও জায়গায় অন্তত হাজার ফুট; পাহাড়গুলোর গায়ে বিচিত্র সব দাগকাটা। এডিনবরার সেলিসবুরি পাহাড়ে এ ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। শিখরদেশে প্রচুর গাছপালার লক্ষণ চোখে পড়ে; কোণের দিকে অনেক ঝোপঝাড়, আর পিছন দিকে অনেক উঁচু গাছ। জীবনের কোনও লক্ষণই চোখে পড়ছে না।
রাতের মতো শিবির ফেলা হলো ঠিক সেই পাহাড়ের নিচে—জায়গাটা যেমন বন্য, তেমনই নির্জন। সামনের পাহাড়গুলো শুধু যে খাড়া উঠে গেছে তাই নয়, একেবারে মাথার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে ছড়ানো; ফলে সেখানে উঠে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। পাহাড়ের চূড়ার উপরে একটা খুব উঁচু গাছ দাঁড়িয়ে আছে।
গাছটাকে দেখিয়ে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বললেন, “ঐ গাছটার উপরেই টেরোড্যাক্টিলটা বসে ছিল। পাহাড় বেয়ে অর্ধেকটা উঠে আমি সেটাকে গুলি করেছিলাম।”
প্রফেসর সামারলীর দিকে তাকালাম; এই প্রথম যেন তাঁর মুখে কিছুটা বিশ্বাস ও অনুশোচনার চিহ্ন দেখতে পেলাম। তাঁর ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসি নেই; তার বদলে দুই চোখে ফুটে উঠেছে উত্তেজনা ও বিস্ময়। সেটা চ্যালেঞ্জারেরও দৃষ্টি এড়াল না; প্রথম জয়ের আনন্দে তিনিও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।
টিপ্পনি কেটে বললেন, “অবশ্য প্রফেসর সামারলী বুঝতে পারবেন যে টেরোড্যাক্টিল বলতে আমি একটা বকের কথাই বলছি—শুধু এ বকের পালক নেই, আছে শুধু চামড়া, ঝিল্লিবিশিষ্ট ডানা, আর চোয়ালভর্তি দাঁত।” তিনি চোখ মিট- মিট করে ঠোঁট বেঁকিয়ে অভিবাদন করতে লাগলেন। আর তাঁর সহকর্মীটি মুখ ঘুরিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
সকালে কফি ও ম্যানিয়ক সহযোগে অতি সাধারণভাবে প্রাতঃরাশ শেষ করে আমাদের সমর-পরিষদের সভা বসল। আলোচনার বিষয় : উপরকার উপত্যকায় ওঠার সব চাইতে ভাল পদ্ধতি উদ্ভাবন।
সভাপতির আসন হিসাবে একটা পাথরের উপর বসে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বললেন, “বলা নিষ্প্রয়োজন যে আগের বারে এখানে এসে পাহাড়ে উঠবার সব রকম চেষ্টা আমি করেছিলাম; আমি যখন সে কাজে সফল হইনি তখন আর কেউ সফল হতে পারবে বলে আমি মনে করি না, কারণ পর্বত আরোহণের কিছু বিদ্যা আমার জানা আছে। সেবারে পর্বত আরোহণের কোনও উপকরণ আমার সঙ্গে ছিল না, কিন্তু এবার আমি সে সব সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সে সবের সাহায্যে এবার নিশ্চয় চূড়ায় উঠতে পারব। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত মূল পাহাড়টা ওভাবে ঝুলে আছে ততক্ষণ ওখানে ওঠাই তো অসম্ভব। বর্ষা নেমে যাওয়ায় এবং রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় গতবারে আমাকে অনেক তাড়াহুড়া করতে হয়েছিল; হাতে সময় ছিল কম। এবারে পাহাড়ের পুবদিকের প্রায় ছ’মাইল জায়গা ঘুরে দেখেছি, উঠবার কোনও পথ নেই। তাহলে এখন আমরা কী করব?”
প্রফেসর সামারলী বললেন, “পথ তো একটাই খোলা আছে। আপনি পুব দিকটা দেখেছেন, পাহাড়ের নিচে নিচে আমাদের পশ্চিম দিকটা দেখতে হবে—কোনও পথ পাওয়া যায় কি না।”
লর্ড জন বললেন, “ঠিক বলেছেন। উপত্যকাটা খুব বড় নয়, ফলে ঘুরতে ঘুরতে হয় একটা পথ পেয়ে যাব, আর না হয় তো আবার এখানেই ফিরে আসব।”
চ্যালেঞ্জার আমাকে দেখিয়ে বললেন, “এই তরুণ বন্ধুটিকে আমি আগেই বলেছি, এমন একটা জায়গা নিশ্চয়ই আছে যেখান দিয়ে একজন কুশলী পর্বতারোহী পাহাড়ের মাথায় উঠে যেতে পারে, অথচ কোনও বেঢপ ভারী জন্তু সে পথে নেমে আসতে পারে না। উপরে উঠবার একটা পথ যে আছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।”
“কিসে নিশ্চিত হলেন?” সামারলী শুধালেন।
“কারণ আমার পূর্বসূরী মার্কিন ম্যাল্ হোয়াইট সত্যি সত্যি পাহাড়ে উঠেছিলেন। না হলে ওই রাক্ষুসে পাখিটাকে দেখে নোট-বইতে সেটার ছবি আঁকলেন কেমন করে?”
সামারলী তবু আপত্তির সুরে বললেন, “উপত্যকাটাকে চোখে দেখতে পাচ্ছি, কাজেই সেটাকে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু ওখানে কোনও প্রাণী আছে সেটা এখনও প্রমাণ হয়নি। কাজেই সেটা আমি মানতে পারি না।”
“দেখুন স্যার, আপনার মানা না মানায় কিছু যায় আসে না। আমি মনে করি—” বলতে বলতেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জার লাফ দিয়ে উঠে সামারলীর গলাটা চেপে ধরে মুখটাকে আকাশের দিকে ফিরিয়ে উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “এবার স্যার! এবার বুঝতে পারছেন তো যে ঐ উপত্যকায় প্রাণী বাস করে?”
আগেই বলেছি যে পাহাড়ের মাথায় একেবারে প্রান্তদেশ থেকে সবুজ ঝোপ- ঝাড় ঝুলছিল। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটি চকচকে কালো প্রাণী। সেটা যখন ফাঁকা জায়গাটায় দুলতে লাগল তখন আমরা দেখলাম সেটা একটা বড় সাপ; মাথাটা অদ্ভুত, একটা কোদালের মতো চ্যাপ্টা। মিনিটখানেক সেটা ওইভাবেই থাকল। তার কুণ্ডলী পাকানো শরীরের উপর সকালের রোদ পড়ে চিক চিক করতে লাগল। তারপর সেটা ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সামারলী সেই দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন, “আপনার যা বলার আছে সেটা ঘাড় ধরে না বললেই আমি খুশি হব। একটা অতি সাধারণ পাহাড়ি পাইথন দেখাতে আপনি ও-কাজটা করতে পারেন না।”
চ্যালেঞ্জার সগর্বে বললেন, “কিন্তু উপত্যকায় প্রাণী তো আছেই। কাজেই এবার আমাদের কাজ হবে শিবির তুলে নিয়ে পশ্চিম মুখে এগিয়ে যাওয়া। উপরের উঠবার একটা পথ আমাদের পেতেই হবে।”
পাহাড়ের পাদদেশ এবড়ো-খেবড়ো ও পাথরে আকীর্ণ; কাজেই বেশ কষ্ট করে আমরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম। হঠাৎ একটা কিছু দেখতে পেয়ে আমাদের মন আনন্দে নেচে উঠল। এক জায়গায় পুরনো শিবিরের অনেক চিহ্ন পড়ে ছিল—‘শিকাগো মাংসের’ কয়েকটা খালি টিন, “ব্র্যান্ডি” ছাপ-মারা একটা বোতল, একটা ভাঙা টিন-খোলার যন্ত্র, আর পর্যটনের কিছু টুকিটাকি জিনিস। আর পেলাম একখানা দুমড়ানো সংবাদপত্র ‘শিকাগো ডেমোক্রাট’; তারিখটা মুছে গিয়েছিল।”
চ্যালেঞ্জার বললেন, “এটা আমার নয়। নিশ্চয় ম্যাপ্ল হোয়াইটের।’ পাশের একটা গাছের দিকে তাকিয়ে লর্ড জন বলে উঠলেন, “এদিকে দেখুন। এটা নিশ্চয় কোনও পথ-নির্দেশ।”
গাছটার গায়ে একটুকরো কাঠ এমনভাবে পেরেক দিয়ে এঁটে দেওয়া হয়েছে যাতে সেটার মুখ রয়েছে পশ্চিম দিকে।
চ্যালেঞ্জার বললেন, “পথ-নির্দেশ ছাড়া আর কি হতে পারে? হঠাৎ বিপদগ্রস্ত হয়ে আমাদের পূর্বগামী লোকটি এই নির্দেশটি রেখেছে যাতে পরে কেউ এলে ঠিক পথে চলতে পারে। আরও এগিয়ে হয়তো এরকম অনেক কিছুই দেখতে পাব।”
দেখতে ঠিকই পেলাম; কিন্তু সেটা যেমন ভয়ংকর তেমনই অপ্রত্যাশিত। তখন আমরা এগিয়ে চলেছি ঘন উঁচু বাঁশবনের ভিতর দিয়ে। হঠাৎ একটা চকচকে সাদা বস্তু আমার চোখে পড়ল। একটা মাংসহীন মড়ার খুলি। গোটা কংকালই সেখানে পড়ে আছে, তবে খুলিটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে একটু দূরে।
সঙ্গী ইন্ডিয়ানরা টাঙি চালিয়ে জায়গাটাকে একটু পরিষ্কার করে দিল। আমরা শোচনীয় দুর্ঘটনার স্থলে এগিয়ে গেলাম। ছেঁড়া পোশাকের কিছু অংশ দেখতে পেলাম; পায়ের বুটজোড়া তখনও অক্ষুণ্নই ছিল। মৃত লোকটি যে ইওরোপীয় সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল। নিউ ইয়র্কের হাডসন কোম্পানির একটা সোনার ঘড়ি; চেনের সঙ্গে একটা স্টাইলো পেন আটকানো; একটা রুপোর সিগারেট-কেস; তার ডালায় লেখা “জে. সি.-কে, এ.ই. এস.” ধাতুর অবস্থা দেখে মনে হলো দুর্ঘটনাটা খুব বেশি আগের নয়।
লর্ড জন বলে উঠলেন, “লোকটি কে হতে পারে? বেচারি! শরীরের প্রত্যেকটা হাড় ভেঙে গেছে।”
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বললেন, “লোকটিকে আমি চিনতে পেরেছি। ম্যাল হোয়াইট সম্পর্কে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে জেনেছিলাম যে তার সঙ্গে জনৈক মার্কিন ভদ্রলোকও ছিলেন, তার নাম জেম্স্ কল্ভার। কাজেই আমি মনে করি, আমরা এখন জেম্স্ কভারের দেহাবশেষই দেখছি।”
লর্ড জন বললেন, “কি করে সে মারা গেছে সে বিষয়েও সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। সে নিশ্চয় পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিল, অথবা তাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিচের তীক্ষ্ণ-মুখ বাঁশের কঞ্চি তার শরীরে গেঁথে গিয়েছিল। নইলে তার হাড়গোড় এ ভাবে ভাঙল কেমন করে, আর যে সব বাঁশগাছ আমাদের মাথা ছাড়িয়ে এত উপরে উঠে গেছে তাতেই বা দেহটা গেঁথে গেল কেমন করে?”
সকলেই নিশ্চুপ। লর্ড জন রক্সটনের কথাই ঠিক। পাহাড়ের ঝুঁকে-পড়া মাথাটা বাঁশবনের উপরে বেরিয়ে ছিল। কোনও সন্দেহ নেই যে সে উপর থেকেই পড়েছে। কিন্তু সত্যি কি পড়েছে? এটা কি একটা দুর্ঘটনা মাত্র? না কি—সেই অজ্ঞাত জগৎকে ঘিরে নানা ভয়ংকর অশুভ চিন্তা আমাদের মাথার মধ্যে পাক খেতে লাগল।
পাহাড়ের গা বেয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চললাম। পাঁচ মাইলের মধ্যে কোথাও কোনও পথ চোখে পড়ল না। তারপরই হঠাৎ এমন কিছু দেখতে পেলাম যাতে নতুন আশায় মন ভরে উঠল। পাহাড়ের গায়ে একটা গর্ত; বৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত; সেখানে খড়ি দিয়ে একটা তীর-চিহ্ন আঁকা; তার মুখ পশ্চিম দিকে।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বললেন, “আবার ম্যাল্ হোয়াইট। লোকটি আশঙ্কা করেছিল খুব শক্তিশালী কোনও প্রাণী তার পিছু নিয়েছিল।”
“তাহলে তার সঙ্গে খড়িও ছিল?”
“তার ঝোলার মধ্যে রঙিন খড়ির একটা বাক্স পেয়েছিলাম। মনে পড়ছে, সাদা খড়িটা ক্ষয় হয়ে খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল।
সামারলী বললেন, “এটা অবশ্য ভাল প্রমাণ। তার নির্দেশ মেনে আমাদের পশ্চিম দিকেই এগোতে হবে।”
মাইল পাঁচেক চলবার পরে পাহাড়ের গায়ে আবার একটা তীর-চিহ্ন দেখতে পেলাম। সেখানেই পাহাড়ের মুখটা দুই ভাগ হয়ে একটা সংকীর্ণ ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটলের ভিতরে আরও একটা নির্দেশ-চিহ্ন; এবার তার মুখটা উপরের দিকে।
জায়গাটা থম্থমে; প্রাচীরগুলো এত উঁচু আর নীল আকাশের ফোঁকরটা এতই সংকীর্ণ ও গাছপালায় ঢাকা যে অত্যন্ত অস্পষ্ট একটা ছায়া-ছায়া আলো মাত্র নিচে পর্যন্ত আসছিল। বেশ কয়েক ঘণ্টা পেটে কিছু পড়েনি, পাথুরে পথে চলতে চলতে সকলেই খুব ক্লান্ত; তবু আমাদের স্নায়ুর উত্তেজনা তখন এত বেশি ছিল যে কিছুতেই থামা হলো না। তাঁবু খাটাবার হুকুম দিয়ে এবং ইন্ডিয়ানদের উপর সে কাজের ভার দিয়ে দু’টি দো-আঁসলাসহ আমরা চারজন সংকীর্ণ গিরিখাদ বেয়ে উঠতে লাগলাম।
শুরুতে সেটা আড়াআড়িভাবে চল্লিশ ফুটের বেশি ছিল না, কিন্তু ক্রমেই ছোট হতে হতে এক সময় একটা সূক্ষ্ম কোণে শেষ হলো। সেটা এতই খাড়া ও মসৃণ যে তা বেয়ে ওঠা অসম্ভব। নিশ্চয় আমাদের পূর্ববর্তী পর্যটক এ-পথের নির্দেশ দেয়নি। সেখান থেকে ফিরলাম—গিরিখাদটা সিকি মাইলের বেশি গভীর নয়—আর তার পরেই লর্ড জনের চোখ পড়ল আমাদের আকাঙ্ক্ষিত জায়গাটার উপর। আমাদের মাথার অনেক উপরে কালো কালো ছায়ার মাঝখানে অন্ধকার- ঢাকা একটা বৃত্ত চোখে পড়ল। ওটা নিশ্চয় গুহার মুখ।
নিচে অনেক পাথর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল; কাজেই বেয়ে উঠতে কষ্ট হলো না। উপরে উঠেই সব সন্দেহের অবসান হলো। সেটা যে পাহাড়ে ওঠার একটা মুখ তাই শুধু নয়, পাশে আবার একটা তীর-চিহ্নও ছিল। এটা নিশ্চয় সেই জায়গা যেখান দিয়ে ম্যাল্ হোয়াইট ও তার ভাগ্যহীন সঙ্গীটি উপরে উঠেছিল। উত্তেজনায় আমরা শিবিরে ফেরার কথা ভুলে গেলাম; এখনই জায়গাটা আবিষ্কার করা চাই। লর্ড জনের ঝুলিতে একটা বৈদ্যুতিক টর্চ ছিল; টর্চের হলুদ আলোর বৃত্তটাকে সামনে রেখে তিনি এগাতে লাগলেন আর আমরা সার বেঁধে তাঁর পিছনে চলতে লাগলাম।
জল পড়ে পড়ে গুহাটা জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল; দুটো পাশ মসৃণ, মেঝেতে অনেক গোল পাথর ছড়ানো। গুহাটা এত ছোট যে একজন মানুষ উপুড় হয়ে কোনওও মতে চলতে পারে। পঞ্চাশ গজ পর্যন্ত সোজা চলে গুহাটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে উপরে উঠে গেছে। ক্রমেই আরও খাড়া। ছোট ছোট খোলা নুড়ির উপর দিয়ে আমরা হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগলাম। হঠাৎ লর্ড রক্সটনের আর্তকণ্ঠ শোনা গেল।
“পথ অবরুদ্ধ!”
তার পিছনে জড় হয়ে হলুদ আলোয় দেখলাম, কালো পাথরের একটা ভাঙা দেয়াল সিলিং পর্যন্ত খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“ছাদটাই ভেঙে পড়েছে!”
বৃথাই তার গা থেকে কয়েকটা পাথর খসালাম। তার একমাত্র ফল দাঁড়াল—বড় পাথরগুলো আলগা হয়ে যে কোনও সময় গড়িয়ে পড়ে আমাদের গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বুঝতে পারলাম, এ বাধা অপসারণের সাধ্য আমাদের নেই।
কথা বলারও শক্তি ছিল না। টলতে টলতে সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ-পথ ধরে আমরা শিবিরে ফিরে এলাম।
কিন্তু ফিরবার আগেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল।
গুহা-মুখ থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট নিচে ফাঁকা জায়গাটায় একটা ছোট দল হয়ে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড পাথর তীব্র গতিতে উপর থেকে গড়িয়ে পড়ে আমাদের ঠিক পাশ দিয়ে চলে গেল। অল্পের জন্য আমাদের জীবন রক্ষা পেল। পাথরটা কোন দিক থেকে এসেছিল সেটা আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না, কিন্তু যে দো-আঁসলা চাকর দুটো তখনও গুহা-মুখেই ছিল তারা বলল যে পাথরটা তাদের পাশ দিয়েই নেমে গেছে, কাজেই পাহাড়ের উপর থেকেই সেটা পড়েছে। উপরে তাকালাম, সবুজ জঙলা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। যাই হোক, পাথরটা যে আমাদের লক্ষ্য করেই গড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না, আর তা থেকেই নিশ্চিত বোঝা গেল যে ঐ উপত্যকায় মানুষ আছে—অনিষ্টকামী মানুষ
আমরা তাড়াতাড়ি ফাঁকা জায়গা থেকে সরে গেলাম। অবস্থা খুব সঙ্গীন; প্রকৃতির বাধা-বিঘ্নের সঙ্গে যদি মানুষের স্বেচ্ছাকৃত প্রতিরোধ যুক্ত হয়, তাহলে তো আমরা একান্তই অসহায়। তবু আবিষ্কারের কাজ বন্ধ রেখে লন্ডনে ফিরে যাবার কথা আমরা কেউই ভাবতে পারলাম না।
উপত্যকায় পৌঁছবার আর কোনও পথ পাওয়া যায় কি না তারই সন্ধানে আমরা আবার সেটাকে পাক খেতে শুরু করলাম। ভাবলাম, তাতে খারাপ তো আর কিছু হবে না; বড় জোর, ঘুরে ফিরে আবার সেই শুরুর জায়গাতেই ফিরে যাব।
সেদিন রাতে একটা বড় অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল; তার ফলে যে সব পরমাশ্চর্যের খুব কাছাকাছি আমরা এসে গেছি সে সম্পর্কে সব রকম সন্দেহেরই অবসান হলো।
প্রিয় মি. ম্যাক্আউল, এই চিঠি পড়তে পড়তে সম্ভবত এই সর্বপ্রথম আপনি উপলব্ধি করবেন যে সংবাদপত্রটি আমাকে বুনো হাঁস তাড়ানোর কাজে পাঠায়নি; প্রফেসরের অনুমতি মিললেই সারা বিশ্বের জন্য যে “কপি” আমি লিখে পাঠাতে পারব তা ধারণার অতীত। প্রমাণপত্রাদিসহ ইংলন্ডে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সে সব প্রকাশ করার সাহস আমার নেই, কারণ সেক্ষেত্রে সকলেই আমাকে সাংবাদিক “মুঞ্চৌসেন” বলে ঠাট্টা করবে।
ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল; আমাদের মনের দৃঢ় প্রত্যয় ছাড়া আর কিছুই পিছনে রেখে গেল না।
ঘটনাটি এই। লর্ড জন একটা আজৌতি—শুয়োরের মতো একজাতীয় ছোট জন্তু—শিকার করে তার অর্ধেকটা ইন্ডিয়ানদের দিয়েছিল, আর বাকি অর্ধেকটা আমরা আগুনে রান্না করছিলাম। অন্ধকার হবার পরে বাতাস বেশ ঠাণ্ডা ছিল, আমরা সকলেই আগুনটাকে ঘেঁষে বসেছিলাম। আকাশে চাঁদ ছিল না; কয়েকটা তারা ছিল; সামনে কিছুটা খোলা জায়গা। এমন সময় হঠাৎ অন্ধকারের ভিতর থেকে, রাতের বুক চিরে এরোপ্লেনের মতো হু-হু শব্দ করে কি যেন নেমে এল। চামড়া-ঢাকা ডানার একটা চাঁদোয়া যেন মুহূর্তের জন্য আমাদের সব্বাইকে ডেকে ফেলল; ক্ষণিকের জন্য দেখতে পেলাম সাপের মতো একটা লম্বা গলা, একটা হিংস্র লোভাতুর লাল চোখ, প্রকাণ্ড ঠোঁট, আর ছোট ছোট ঝকঝকে দাঁত। পরমুহূর্তেই সেটা উধাও হয়ে গেল, আর সেই সঙ্গে উধাও হলো আমাদের খাবার। প্রায় বিশ ফুট একটা প্রকাণ্ড কালো ছায়া বাতাস কেটে উড়ে চলল; মুহূর্তের জন্য তার দানবীয় ডানা তারাগুলোকে ঢেকে ফেলল; আর তারপরেই মাথার উপরকার পাহাড়ের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমরা আগুনের চারপাশে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। প্রথমে কথা বললেন সামারলী।
আবেগে উচ্ছ্বসিত গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন, “প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমারই ভুল। মিনতি করছি, অতীতের কথা আপনি ভুলে যান।”
দুই পণ্ডিত এই প্রথম করমর্দন করলেন। টেরোড্যাক্টিলের প্রথম দর্শনে এটাই আমাদের বড় লাভ হলো। এমন দুটি মানুষকে মেলাতে একটা রাতের খাবার চুরি যাওয়াটা তুচ্ছ ব্যাপার
উপত্যকায় প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর অস্তিত্ব থাকলেও তারা কিন্তু সংখ্যায় প্রচুর ছিল না, কারণ পরবর্তী তিন দিন আমরা আর কিছুই দেখতে পাইনি। এই ক’ দিন হেঁটেছি শুধু জনহীন নিষিদ্ধ দেশের ভিতর দিয়ে; কখনও পাথুরে মরুভূমি, কখনও পরিত্যক্ত জলাভূমি। এই ভাবে ছ’দিন হেঁটে আমাদের পাহাড়-পরিক্রমা শেষ হলো; আমরা ফিরে এলাম প্রথম শিবিরে। সকলেরই মন-মরা অবস্থা। সকলেই বুঝতে পেরেছি, এ পাহাড়ের প্রাচীরকে ডিঙিয়ে যাবার মতো একটি জায়গাও নেই। ম্যাল্ হোয়াইটের খড়ির চিহ্ন যে পথের হদিস দিয়েছিল সেটা এখন সম্পূর্ণ অগম্য।
এখন আমরা কী করি? ক্রমে রাত হলো। মুখে একটি কথাও না বলে বিষণ্ণ মনে সকলে যার যার কম্বল টেনে নিল। মনে পড়ছে, ঘুমিয়ে পড়ার আগে দেখেছিলাম একটা বিরাট কোলা ব্যাঙের মতো চ্যালেঞ্জার উবু হয়ে চুপচাপ বসে আছেন, মস্ত বড় মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরেছেন; মনে হলো, গভীর চিন্তায় ডুবে গেছেন; আমি যখন শুভরাত্রি জানালাম সেটা যেন শুনতেই পেলেন না।
সকালে যখন দেখা হলো তখন চ্যালেঞ্জার সম্পূর্ণ অন্য লোক। সন্তোষ ও আহ্লাদের প্রতিমূর্তি যেন। দাড়ির ফাঁকে দাঁতের ঝিলিক। হেসে বলে উঠলেন, “ইউরেকা! ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা আমাকে অভিনন্দন জানাতে পারেন; আমরাও পরস্পরকে অভিনন্দিত করতে পারি। সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।”
“পথ খুঁজে পেয়েছেন?”
“তাই তো মনে হচ্ছে।”
“কোথায়?”
জবাব হিসাবে তিনি ডান দিককার গির্জার চূড়ার মতো পর্বত-শিখরটা দেখালেন।
সেদিকে তাকিয়ে আমাদের মুখ—অন্তত আমার মুখ আনত হলো। আমাদের সঙ্গী বার বার বললেন যে ওটাতে চড়া যাবে। কিন্তু ঐ শিখর আর উপত্যকার মধ্যে তো একটা ভয়ংকর অতলস্পর্শ গহ্বর।
ঢোক গিলে বললাম, “ওটা তো কোনওদিন পার হওয়া যাবে না।”
তিনি বললেন, “আমরা সকলে চূড়ায় তো উঠতে পারব। তারপর দেখা যাবে কী করতে পারি।”
কাজটা খুবই শক্ত। চ্যালেঞ্জার কিন্তু অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে উপরে উঠে গেলেন এবং সেখানকার একটা বড় গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে দিলেন। তা না হলে আমি অথবা সামারলী সেখানে উঠতে পারতাম না। দড়ির সাহায্যে পাহাড়ের উঁচু-নিচু গা বেয়ে আমরাও উঠে গেলাম। যে কোনও দিকে পঁচিশ ফুটের মতো ঘাসে-ঢাকা সমতলভূমিতে চূড়াটা বিস্তৃত।
অবাক হয়ে চারদিকে তাকালাম। আমাদের নিচে গোটা ব্রাজিলীয় প্রান্তর বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে দিকচক্র-রেখার অস্পষ্ট নীল নীল কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেছে। বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পান করছিলাম, এমন সময় প্রফেসরের ভারী হাতটা পড়ল আমার কাঁধে।
তিনি বলে উঠলেন, “তরুণ বন্ধু গো, এই পথে। VESTIGIA NULLA RESTRORSUM. পিছনে তাকাবে না, সর্বদা তাকাবে গৌরবময় লক্ষ্যের দিকে।”
মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেটা উপত্যকার সঙ্গে একই সমতলে অবস্থিত। দুটোর মধ্যে ব্যবধান মোটামুটি চল্লিশ ফুট; কিন্তু আমার মনে হলো সেটা চল্লিশ মাইলও হতে পারে। গাছের গুঁড়িটাকে জড়িয়ে ধরে নিচে তাকালাম। অনেক-অনেক নিচে আমাদের চাকরদের কালো কালো ছোট মূর্তিগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পাথরের দেয়ালটা দুর্গম; যেটা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেটাও তথৈবচ।
“খুবই অদ্ভুত!” প্রফেসর সামারলীর খস্থসে আওয়াজ কানে এল।
ঘুরে দাঁড়ালাম। যে গাছটাকে আমি জড়িয়ে ধরে ছিলাম সেটাকেই সে গভীর আগ্রহে লক্ষ্য করছে। সত্যি তো, এ মসৃণ বাকল আর শিরাওয়ালা ছোট ছোট পাতা তো খুবই পরিচিত। চেঁচিয়ে বললাম, “আরে, এটা তো বীচ গাছ!”
সামারলী বললেন, “ঠিক। বহু দূর দেশে এক পরিচিত দেশের মানুষ।” চ্যালেঞ্জার বলে উঠলেন, “শুধু দেশের মানুষ নয় মশায়, আপনার উপমাটাকেই আর একটু টেনে বলছি, এ এক অতি মূল্যবান মিত্র। এই বীচবৃক্ষই হবে আমাদের ত্রাণকর্তা।”
লর্ড জন চেঁচিয়ে বললেন, “জর্জের দোহাই! একটা সেতু!”
“ঠিক ধরেছেন বন্ধু, একটা সেতু! কাল রাতে এই দিকে তাকিয়ে একটি ঘণ্টা বৃথাই কাটাইনি। ইচ্ছা-শক্তি আর বুদ্ধির মিলন যদি ঘটে, তাহলে পথ একটা পাওয়া যাবেই। এই খাদের উপর দিয়ে বানাতে হবে একটা সেতু। তাকিয়ে দেখুন!”
সত্যি, আশ্চর্য বুদ্ধিই বটে! গাছটা ষাট ফুট উঁচু তো হবেই। ঠিক মতো কেটে ফেলতে পারলে অনায়াসে তার উপর দিয়ে খাদটা পার হওয়া যাবে। উপরে উঠবার সময় শিবিরের কুড়ুলটা চ্যালেঞ্জার কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন। এবার সেটা আমার হাতে দিলেন।
বললেন, “আমাদের তরুণ বন্ধুটি শক্ত পেশী ও শিরার অধিকারী। আশা করি কাজটা তিনি ভালভাবেই করতে পারবেন।”
পেরেছিলাম। তাঁর নির্দেশমতো কুড়ুল চালালাম। কাটা গাছটা সশব্দে পড়ে গেল। অজ্ঞাত জগতে যাবার সেতু তৈরি হলো।
সকলে বিনা বাক্যব্যয়ে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে করমর্দন করলাম; খড়ের টুপিটা তুলে তিনিও এক একে আমাদের প্রত্যেককে অভিাবদন জানালেন।
বললেন, “অজ্ঞাত জগতে প্রথম পদক্ষেপ করার সম্মান আমি দাবি করছি। ভবিষ্যতের কোনও কালজয়ী চিত্রশিল্পের এটাই হবে উপযুক্ত বিষয়বস্তু।”
তিনি সেতুটার দিকে পা বাড়াতেই লর্ড জন তাঁর কোটের উপর হাতটা রাখলেন।
বললেন, “দেখুন মশায়, এটা আমি হতে দিতে পারি না।”
“পারেন না!” মাথাটা পিছনে সরে গেল, এগিয়ে এল দাড়ি।
“আপনি তো জানেন, বিজ্ঞানের ব্যাপারে আপনার নেতৃত্ব আমি মেনে চলেছি, কারণ আপনি একজন হবু বিজ্ঞানী। কিন্তু আমার এলাকায় এলে তো আপনাকেই আমার অনুসরণ করতে হবে।
“আপনার এলাকা?”
“আমাদের প্রত্যেকেরই একটা করে পেশা আছে, আমার পেশা যুদ্ধ করা। আমার তো ধারণা, আমরা চলেছি একটা নতুন দেশ আক্রমণ করতে; সেখানে অনেক রকম শত্রু থাকতে পারে। সাধারণ জ্ঞান ও ধৈর্যের অভাবে অন্ধের মতো সেখানে ধেয়ে যাওয়া আমি পছন্দ করি না।”
কথাগুলি যুক্তিযুক্ত। চ্যালেঞ্জারর মাথা দুলিয়ে দুই ভারী কাঁধে ঝাঁকুনি দিলেন। “তা, আপনি কি বলতে চান স্যার?”
সেতুর ওপারে তাকিয়ে লর্ড জন বললেন, “আমি যতদূর জানি ওই সব ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা নরমাংসাশী জাতি হয় তো মধ্যাহ্ন-ভোজনের অপেক্ষায় আছে। কড়াইতে পা দেবার আগে সব কিছু ভাল করে জেনে নেওয়া চাই। সুতরাং ম্যালোন ও আমি নিচে নেমে গিয়ে আমাদের চারটে রাইফেল এবং গোমেজ ও অন্যদের নিয়ে এখানে ফিরে আসব। একজন আগে সেতু পার হয়ে যাবে আর বাকিরা বন্দুক উঁচিয়ে তাকে পাহারা দেবে; যতক্ষণ না সে সব কিছু দেখে সকলকে যেতে বলবে ততক্ষণ অন্যরা অপেক্ষা করে থাকবে।”
কাটা গাছটার গুঁড়ির উপর বসে চ্যালেঞ্জার অধৈর্য হয়ে গজরাতে লাগলেন; কিন্তু সামারলী ও আমি লর্ড জনের প্রস্তাবই সঙ্গত বলে মেনে নিলাম। দড়ি ধরে উঠতে-নামতে এবার আর বেশি কষ্ট হলো না। এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা রাইফেল ও শট-গান নিয়ে হাজির হলাম। কিছু খাবারদাবার নিয়ে দো-আঁসলা দু’জনও উপরে উঠে এল। প্রত্যেকেই কার্তুজভর্তি একটা করে বেল্ট পেলাম।
উদ্যোগ-আয়োজন সম্পূর্ণ হলে লর্ড জন বললেন, “চ্যালেঞ্জার আপনি যদি প্রথম যেতে চান তো এবার—”
ক্রুদ্ধ প্রফেসর বললেন, “আপনার সানুগ্রহ অনুমতির জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। দয়া করে অনুমতি যখন দিলেন তখন এ অভিযানের পথিকৃৎ হবার দায়িত্ব আমি অবশ্যই নেব।”
খাদের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে বসে টাঙিটা পিঠের উপর ঝুলিয়ে চ্যালেঞ্জার ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে গাছটা বেয়ে অচিরেই ওপারে পৌঁছে গেলেন। মাটিতে দাঁড়িয়ে দুই হাত আকাশের দিকে নাড়তে লাগলেন।
চেঁচিয়ে বললেন, “শেষ পর্যন্ত! শেষ পর্যন্ত!”
তারপর গেলেন সামারলী। তাঁর মতো পল্কা দেহে এতটা কর্মশক্তি সত্যি বিস্ময়কর। কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন দুটো রাইফেল, যাতে ওপারে পৌঁছে দুই অধ্যাপকই সশস্ত্র হতে পারেন। তারপর আমি। সামারলী তাঁর বন্দুকের কুঁদোটা বাড়িয়ে দিলেন; পরমুহূর্তেই আমি তাঁর হাতটা চেপে ধরলাম। আর লর্ড জন—তিনি হেঁটে পার হলেন, কোনও কিছু না ধরে সত্যি সত্যি হেঁটে গেলেন। তাঁর স্নায়ু লৌহকঠিন।
এবার আমরা চারজনই স্বপ্নের দেশে পা ফেললাম—ম্যাল্ হোয়াইটের বিলুপ্ত জগতে। সকলের কাছেই সেটা পরম জয়ের মুহূর্ত। তখন কে ভাবতে পেরেছিল যে সেটাই আমাদের চরম বিপদের সূচনা? সেই কথাই সংক্ষেপে বলছি।
উপত্যকার প্রান্ত থেকে সরে ঘন ঝোপের ভিতর দিয়ে সবে গজ পঞ্চাশেক ভিতরে ঢুকেছি এমন সময় একটা ভয়ংকর চড়ু-চড়ু শব্দ কানে এল। একসঙ্গে সকলে ছুটে গেলাম। সেতুটা নেই!
পাহাড়ের একেবারে পাদদেশে তাকিয়ে দেখলাম, একটা ভাঙা গাছ ডালপালাসুদ্ধ দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। আমাদের সেই বীচগাছটা। কি করে এই অঘটন ঘটল? পরমুহূর্তেই সম্মুখের পাহাড়-চূড়ার আড়াল থেকে একটা ফোলা- ফোলা মুখ দেখা দিল—সে-মুখ দো-আঁসলা গোমেজের। হ্যাঁ, গোমেজ, কিন্তু সে গোমেজ নয় যার মুখে ছিল শান্ত হাসির মুখোশ। এ বিকৃত মুখে দেখলাম জ্বলন্ত দুটি চোখ,—ঘৃণায় ও প্রতিশোধ গ্রহণের উন্মাদ আনন্দে কাঁপছে।
সে চিৎকার করে ডাকল, “লর্ড রক্সটন! লর্ড জন রক্সটন!”
আমাদের সঙ্গী সাড়া দিলেন, “আমি এখানে!”
খাদের ওপার থেকে ভেসে এল উন্মত্ত হাসি।
“হ্যাঁ, ইংরেজ কুত্তা, তুই ওখানে, আর ওখানেই থাকবি! আমি অনেক দিন অপেক্ষা করে আছি; এতদিনে সুযোগ পেয়েছি। অনেক কষ্ট করে ওখানে উঠেছিস, নামতে আরও অনেক বেশি কষ্ট পাবি। অভিশপ্ত মূর্খের দল, তোরা ফাঁদে পড়েছিস, প্রত্যেকে!
আমরা ভীত, বিহ্বল। মুখে কথা ফুটল না। অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম শুধু। ঘাসের উপর একটা মোটা ভাঙা ডাল পড়ে থাকতে দেখে বুঝলাম সেটার সাহায্যেই সে গাছটাকে ঠেলে নিচে ফেলে দিয়েছে। মুখটা সরে গেল। একটু পরেই আবার দেখা দিল। এবার আগের চাইতেও উন্মত্ত।
চিৎকার করে বলল, “গুহার মধ্যেই পাথর ফেলে তোদের প্রায় মেরে ফেলেছিলাম, কিন্তু এটা আরও ভাল হলো। এ মৃত্যু ঘটবে তিলে তিলে, ভয়ংকরভাবে। ওখানেই তোদের হাড়গুলো সাদা হয়ে যাবে; কেউ জানবে না তোরা কোথায় আছিস; কেউ আসবে না তোদের মাটি দিতে। মরণকালে স্মরণ কর সেই লোপেজকে, পাঁচ বছর আগে পুটোমায়া নদীতে যাকে তুই গুলি করে মেরেছিলি। আমি তার ভাই; আজ আমি সুখী, কারণ তার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নিয়েছি।”
প্রতিহিংসা সাধন করেই লোকটা যদি পালিয়ে যেত তাহলেই তার পক্ষে মঙ্গল হত। কিন্তু অতি-নাটকীয়তার ঝোঁকই তার পতন ডেকে আনল। তিন মহাদেশের মানুষ রক্সটনকে ডাকে “প্রভুর কুলো” বলে; কারও ঠাট্টা সহ্য করার পাত্র তিনি নন। দো-আঁসলাটি চূড়া থেকে নামছিল। সেই অবসরে লর্ড জন উপত্যকার প্রান্ত ধরে ছুটে এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন যেখান থেকে লোকটাকে স্পষ্ট দেখা যায়। তারপর রাইফেলের একটা শব্দ। আমরা কিছু দেখতে পেলাম না, তবে শুনতে পেলাম একটা আর্তনাদ ও দূরে একটা ভারী জিনিসের পতনের শব্দ। পাথরের মতো শক্ত মুখে রক্সটন ফিরে এলেন।
বললেন, “আমিই একটা বোকার ডিম। আমার বুদ্ধির দোষেই সকলের এই বিপদ। আমার মনে রাখা উচিত ছিল যে এরা রক্তঋণের কথা ভোলে না।”
এ পরিস্থিতিতে কী করা হবে সেই কথাই আলোচনা করছিলাম এমন সময় নিচের একটা দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ল। সাদা পোশাক পরা দু’নম্বর দো- আঁসলাটি প্রাণভয়ে ছুটে পালাচ্ছে, আর তার পিছন-পিছন ছুটছে আমাদের বিশ্বস্ত ভৃত্য জাম্বোর আবলুস-কালো প্রকাণ্ড দেহটা। পলাতক লোকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে তার গলা জড়িয়ে ধরল। মাটিতে পড়ে দু’জন গড়াগড়ি খেতে লাগল। মুহূর্ত পরে জাম্বো উঠে দাঁড়াল, মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার দিকে একবার তাকাল, তারপর আনন্দে দুই হাত নাচাতে নাচাতে আমাদের দিকে ছুটে এল। মৃতদেহটা সেখানেই পড়ে রইল।
দুই বিশ্বাসঘাতক তো শেষ হলো, কিন্তু আমাদের যা ক্ষতি হবার তা তো হয়ে গেছে। ওই চূড়ার মাথায় তো আমরা কোনও মতেই উঠতে পারব না। আমরা ছিলাম পৃথিবীর অধিবাসী, এখন আমরা উপত্যকার অধিবাসী। দুই জগৎ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ঐ প্রান্তর পার হয়ে তবে পাব আমাদের ডিঙি। দূরে, অস্পষ্ট বেগুনি দিগন্ত-রেখার ওপারে আছে সেই নদী যা আমাদের নিয়ে যেতে পারে সভ্যতার জগতে। কিন্তু দুই জগতের মাঝখানের যোগসূত্র যে হারিয়ে গেছে। এক মুহূর্তে আমাদের জীবনের চেহারাটাই বদলে গেছে।
জাম্বোর কালো মুখটা দেখা দিল পাহাড়ের মাথায়; তার হারকিউলিসের মতো শরীরটা উঠে গেল চূড়ার উপরে।
চেঁচিয়ে বলল, “আমি এখন কী করব? আপনারা যা বলবেন তাই করব।”
প্রশ্ন করাটা সহজ, কিন্তু উত্তর দেওয়া শক্ত। তবু বাইরের জগতের সঙ্গে সেই আমাদের একমাত্র যোগসূত্র। তাকে কোনও মতেই আমাদের ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে না।
সে চেঁচিয়ে বলল, “না, না! আমি আপনাদের ছেড়ে যাব না। যাই ঘটুক না কেন, আমি এখানেই থাকব। কিন্তু ইন্ডিয়ানদের আর ধরে রাখা যাবে না। তারা অনেক কথা বলছে : এখানে কুরুপুরি আছে, তারা বাড়ি ফিরে যাবে। ওদের ছেড়ে দিন। ওদের ধরে রাখতে পারবেন না।”
আমি চেঁচিয়ে বললাম, “আগামীকাল পর্যন্ত ওদের আটকে রাখো জাম্বো; তাহলে ওদের হাত দিয়ে আমি চিঠি পাঠাতে পারব।”
জাম্বো বলল, “ঠিক আছে স্যার! কথা দিচ্ছি, আগামীকাল পর্যন্ত তারা থাকবে। কিন্তু আপনাদের জন্য আমি কী করতে পারি?”
করার তো অনেক কিছুই ছিল, আর সে সব কাজ সে ভালভাবেই করল। প্রথমেই আমাদের কথামতো গাছের গুঁড়ি থেকে দড়িটা খুলে একটা দিক আমাদের কাছে ছুঁড়ে দিল। বেশি মোটা না হলেও দড়িটা বেশ শক্ত; ওটা দিয়ে সেতু বানাতে না পারলেও পাহাড়ে ওঠার দরকার হলে খুব কাজে লাগবে। তারপর দড়ির অপর দিকটা রসদের থলের সঙ্গে বেঁধে দিল, আর আমরা সেটাকে টেনে নিয়ে এলাম। অন্তত এক সপ্তাহের মতো খাবারের সংস্থান তো হলো। শেষ পর্যন্ত সে নিচে নেমে এক বাক্স বারুদ ও অন্য টুকিটাকি জিনিসভর্তি দুটো প্যাকেট উপরে তুলে আনল, আর আমরা দড়ির সাহায্যে সেগুলো কাছে টেনে আনলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেলে সে নিচে নেমে গেল; আবার কথা দিয়ে গেল, পরদিন সকাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ানদের আটকে রাখবে।
আর এই পরিস্থিতিতেই উপত্যকার বুকে বসে একটিমাত্র মোম-লণ্ঠনের আলোয় আমাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেই প্রথম রাতটা কাটিয়ে দিলাম।
আগামীকাল (অথবা বলতে পারি আজ, কারণ লিখতে লিখতে ভোর হয়ে এসেছে) আমরা প্রথম ঢুকব সেই আশ্চর্য দেশে। আবার কবে লিখতে পারব—মোটেই লিখতে পারব কি না—জানি না। দেখতে পাচ্ছি, ইন্ডিয়ানরা এখনও অপেক্ষা করে আছে। আমি নিশ্চিত যে বিশ্বস্ত জাম্বো চিঠিটা নিতে আসবে। আমার বিশ্বাস, চিঠিটা যথাস্থানে পৌঁছবে।
পুনশ্চ—যত ভাবছি ততই অসহায় বোধ করছি। ফিরে যাবার কোনও আশাই নেই। উপত্যকার পাড়ির উপর যদি কোনও উঁচু গাছ থাকত তাহলে না হয় আর একটা সেতু বানাতে পারতাম, কিন্তু পঞ্চাশ গজের মধ্যে কোনও বড় গাছ নেই। সকলে মিলে চেষ্টা করলেও অত বড় একটা গাছকে আমরা বয়ে আনতে পারব না। দড়িটাও এত ছোট যে সেটা বেয়েও নিচে নামা যাবে না। না, আমাদের আশা নেই—কোনও আশা নেই!
