ভেল্কিবাজির কল
প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের অবস্থা তখন অতীব সঙ্গীন। সবেমাত্র আমি হাতলে হাত রেখে আর মাদুরে পা রেখে তাঁর দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, তখনই আমার কানে এল একটি স্বগত ভাষণ—তাঁর কথাগুলি যেন গোটা বাড়িতে ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
“হ্যাঁ, আমি বলছি এই দ্বিতীয় বার টেলেফোনটা বাজল। একটা সকালেই দু’বার। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন একটি নির্বোধ মানুষ একটা তারের অপর প্রান্ত থেকে একজন বিজ্ঞানীকে বার বার তার জরুরি কাজে এ রকম বিঘ্ন সৃষ্টি করছে? এই মুহূর্তে ম্যানেজারকে পাঠিয়ে দিন। আহা! ম্যানেজার তো আপনারই লোক। আচ্ছা, কেন আপনারা সব কিছু দেখাশুনো করেন না? হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই আপনারা আমার এমন সব কাজে বিঘ্ন ঘটান যার গুরুত্ব অনুধাবন করার মতো মানসিকতাই আপনাদের নেই। আমি সুপারিন্টেন্ডেন্টকে চাই। তিনি ওখানে নেই? এটা আমারই বোঝা উচিত ছিল। এ রকম ঘটনা যদি পুনরায় ঘটে তাহলে আমি আপনাদের আদালতে নিয়ে ছাড়ব। কোঁকড়-কোঁ ডাকা অনেক মোরগকে আমি আগেও আদালত দেখিয়েছি। আমার স্বপক্ষে রায়ও পেয়েছি। কোঁকড়-কোঁ ডাকা মোরগদের যে-দশা হয়েছে, ঘণ্টা-বাজিয়েদেরই বা সে-দশা হবে না কেন? মামলাটা তো পরিষ্কার। একটা লিখিত ক্ষমা-ভিক্ষা। উত্তম কথা। আমি বিবেচনা করে দেখব। গুড মর্নিং।”
ঠিক সেই সময়েই আমি সেখানে ঢুকে পড়েছিলাম। খুবই দুর্ভগ্যের বিষয়। টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে আসার মুহূর্তেই আমি তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম— সিংহ তখন রেগে আগুন। তাঁর মস্ত বড় কালো দাড়ি খাড়া হয়ে উঠেছে, প্রশস্ত বক্ষ ক্ষোভে ওঠা-নামা করছে, আর তাঁর সেই উদ্ধত ধূসর দুটি চোখের দৃষ্টি আমাকে যেন উথাল-পাথাল করে তুলেছে।
এবার তিনি ক্রোধে ফেটে পড়লেন, “কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা-খাওয়া, অলস, নরকের কীট! আমি যখন একটা ন্যায়সঙ্গত অভিযোগ জানাচ্ছি, বেশ শুনতে পাচ্ছি তারা তখন হাসছে। আমাকে পদে পদে বিরক্ত করার একটা ষড়যন্ত্র চলেছে। আর এবার যুবক ম্যালোন, তুমিও এসে হাজির হয়েছ সারা সকালটাকে মাটি করে দিতে। আমি কি জানতে পারি তুমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছ, নাকি তোমার কোনও স্যাঙাৎ তোমাকে ডেকে এনেছে একটা সাক্ষাৎকার নিতে? বন্ধু হিসাবে তুমি স্বাগত—আর সাংবাদিক হিসাবে তোমার প্রবেশ নিষেধ।”
পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমি ম্যাআর্ডল-এর চিঠিটা খুঁজছিলাম এমন সময় হঠাৎই তাঁর মনে পড়ে গেল কিছু নতুন অভিযোগের কথা। মস্ত বড় লোমশ হাতটা বাড়িয়ে ডেস্কের উপরকার কাগজপত্রগুলি ওল্টাতে-ওল্টাতে শেষ পর্যন্ত একটা সংবাদপত্রের কাটিং টেনে বের করলেন।
“তোমার কাগজের টুকরোটাকে আমার দিকে নাচাতে নাচাতে তিনি বললেন, একটা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আমার নামটা উল্লেখ করেছ দেখে ভালই লেগেছে। একটা অনুচ্ছেদে তুমি এই কথাগুলি দিয়ে শুরু করেছ : প্রফেসর জি. ই. চ্যালেঞ্জার, যিনি আমাদের মহোত্তম জীবিত বিজ্ঞানীদের অন্যতম–”
“আচ্ছা স্যার?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।”
“এই ঈর্ষামূলক গুণকীর্তন এবং সীমাবদ্ধতার কি দরকার ছিল? তুমি তো সেই সব প্রধান বিজ্ঞানীদের নাম উল্লেখ করতে পারতে যাদের তুমি আমার সমকক্ষ, অথবা আমার চাইতে বড় বলে মনে কর?”
“শব্দগুলি সুপ্রযুক্ত হয়নি। আমার লেখা উচিত ছিল : আমাদের শ্রেষ্ঠ জীবিত বিজ্ঞানী”, আমি ত্রুটি স্বীকার করলাম। আমার নিজেরও সেই বিশ্বাসই ছিল। আমার শব্দগুলিই শীতকালকে গ্রীষ্মকালে পরিণত করে দিয়েছিল।
“প্রিয় বন্ধু আমার, তুমি আবার ভেবো না যে আমি বড় কঠোর প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু আমার চারদিকে এমন সব কুচুটে ও একগুঁয়ে সহকর্মীরা আছেন যে বাধ্য হয়েই আমাকে কঠোর মূর্তি ধরতে হয়। আত্ম-প্রচার আমার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। কিন্তু বিরোধিতার সঙ্গে লড়াই করেই তো আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। এস এস! এখানেই বস! এবার বল, কেন এসেছ?”
আমাকেও সাবধানে পা ফেলতে হলো। কত সহজেই যে সিংহটি আবার গর্জে উঠবেন তা তো আমি জানতাম। ম্যাকআর্ডল-এর চিঠিটা মেলে ধরলাম।
“এটা কি আপনাকে পড়ে শোনাতে পারি স্যার? চিঠিটা লিখেছেন আমার সম্পাদক ম্যাআর্ডল।”
“লোকটিকে আমার মনে আছে, তার দলের অন্যদের মতো নয়।”
“অন্তত আপনাকে তিনি খুবই প্রশংসার চোখে দেখেন। কোনও তদন্তের ব্যাপারে গুণী লোকের দরকার হলে তিনি আপনার কাছেই আসেন। এটাও সেই রকমই একটা ব্যাপার।”
“তিনি কি চান?” এবার চ্যালেঞ্জার স্বমূর্তি ধারণ করলেন। কনুই দুটো ডেস্কের উপর রেখে বসলেন; দু’খানি গরিলা-হাত এক সঙ্গে জোড়া, দাড়িগুলো সমুখে খাড়া হয়ে আছে, চোখের পাতায় অর্ধেক ঢাকা বড় বড় ধূসর চোখ দুটি সানুগ্রহে আমার উপর নিবদ্ধ।
“তাঁর চিঠিটা আপনাকে পড়ে শোনাচ্ছি। তিনি লিখেছেন—
‘দয়া করে আপনার শ্রদ্ধেয় বন্ধু প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করুন, এবং নিম্নলিখিত ঘটনাবলী প্রসঙ্গে তাঁর সহযোগিতা প্রার্থনা করুন। থিয়োডোর নেমোর নামের ল্যাটভিয়াবাসী এক ভদ্রলোক হ্যাম্পস্টেডের ‘হোয়াইট ফ্রায়ার্স ম্যানসন্স’-এ আছেন। তিনি দাবি করছেন যে এমন একটি অসাধারণ যন্ত্র তিনি আবিষ্কার করেছেন যার আওতার মধ্যে রাখা যে কোনও বস্তুকে সেটা মৌলিক অংশে বিশ্লিষ্ট করতে অর্থাৎ ভাঙতে পারে। জড় পদার্থ বিশ্লিষ্ট হয়ে অর্থাৎ ভেঙে গিয়ে অণু বা পরমাণুতে পরিণত হয়। পদ্ধতিটাকে বিপরীত ভাবে পরিচালিত করে সেটাকে আবার পূর্বাস্থায়ও নিয়ে যাওয়া যায়। দাবিটাকে অযৌক্তিক বলেই মনে হতে পারে, তথাপি এই দাবির পিছনেও দুর্ভেদ্য প্রমাণ আছে; ফলে সেই লোকটি এটা উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন।
‘এই রকম একটা আবিষ্কারের বৈপ্লবিক চরিত্র নিয়ে, অথবা একটা সম্ভাব্য সমরাস্ত্রের চূড়ান্ত গুরুত্ব নিয়ে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। কিন্তু যে-শক্তি একটা যুদ্ধ-জাহাজকে মৌলিক অংশে বিশ্লিষ্ট করতে পারে, অথবা অল্প সময়ের জন্য হলেও একটা সেনা-বাহিনীকে পরমাণু সমষ্টিতে পরিণত করতে পারে, সেটা তো বিশ্ব-জয়ের ক্ষমতা রাখে। সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে এই ব্যাপারটাকে ভাল করে তলিয়ে দেখতে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত হবে না। লোকটি তার এই আবিষ্কারকে বিক্রি করতে খুবই আগ্রহী বলেই পরিচিতি লাভের জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়েছেন; সুতরাং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে কোনও অসুবিধা হবে না। এই সঙ্গে যে-কার্ডটা পাঠালাম সেটা দেখালেই দরজা খোলা পাবেন। আমার ইচ্ছা যে আপনি ও প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তাঁর সঙ্গে দেখা করুন, তাঁর আবিষ্কারটাকে ভাল করে পরিদর্শন করুন, এবং এই আবিষ্কারের মূল্যায়ন সম্পর্কিত একটি সুচিন্তিত প্রতিবেদন ‘গেজেট’-এর জন্য লিখে পাঠান। আশা করছি, আজ রাতেই আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে পারব।’—আর. ম্যাকআর্ডল।”
চিঠিটা পুনরায় ভাঁজ করতে করতে আমি বললাম, “দেখুন প্রফেসর, আমার মতামত এতেই লেখা আছে। আমি একান্তই ভাবেই আশা করছি যে আপনি আমার সঙ্গে যাবেন, কারণ আমার সীমিত ক্ষমতা নিয়ে একাকী এ রকম একটা ব্যাপার নিয়ে কাজ করতে আমি পারব কি করে?”
মহান ব্যক্তিটি অনুচ্চ স্বরে বললেন, “খাঁটি কথা ম্যালোন! খুব খাঁটি কথা! যদিও তোমার বুদ্ধি-বিবেচনার কোনও রকম কমতি নেই, তথাপি আমি তোমার সঙ্গে একমত যে এমন একটা ব্যাপার তুমি আমার কাছে এনে হাজির করেছ যেটাকে কেবল তোমার কাঁধে চাপিয়ে দিলে বোঝাটা একটু বেশি ভারীই হবে। এই সব মানুষগুলোর কথা আর কহতব্য নয়। বার বার টেলিফোন করে ওরা আমার সকালবেলার কাগজগুলোই পণ্ড করেছে। তবু বোঝার উপর শাকের আঁটিতে কতটুকু বোঝা আর বাড়বে। অতএব, তোমার প্রস্তাবে আমি রাজী।”
তারপরের ঘটনা। সেই অক্টোবরের সকালেই আমি প্রফেসরের সঙ্গে টিউরে চেপে লন্ডনের উত্তরাঞ্চলে ছুটলাম, আর সেখানেই ঘটল আমার ঘটনাবহুল জীবনের এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা।
এনমোর গার্ডেন্স ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগেই আমি টেলিফোনে জেনে নিয়েছিলাম যে আমাদের সেই ব্যক্তিটি বাড়িতেই আছে, এবং আমরা যে তার কাছে যাচ্ছি সেটাও তাকে জানিয়েছিলাম। হ্যাম্পস্টেডের একটা আরামদায়ক ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন এবং তাঁর বাইরের ঘরে আমাদের আধা ঘণ্টা বসিয়ে রেখে তিনি একদল দর্শনার্থীর সঙ্গে উত্তপ্ত আলোচনায় কাটিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা যখন বিদায় নিয়ে হল থেকে বের হলেন তখন তাঁদের কথাবার্তা থেকেই বুঝতে পারলাম যে তাঁরা রাশিয়ার মানুষ। আধ-খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক তাঁদের দেখেই বুঝতে পারলাম যে আস্ত্রাখান কলারের কোট, ঝকঝকে টপ-হ্যাট, আর বুর্জোয়াসুলভ চেহারার এই মানুষগুলো খুবই সম্পন্ন ও বুদ্ধিমান। হলের দরজাটা বন্ধ করে পরমুহূর্তেই থিয়োডোর নেমোর আমাদের কামরায় ঢুকলেন। আমি দেখলাম, সূর্যের আলো সোজা এসে পড়ছে তাঁর উপর; লম্বা সরু হাত দু’খানি ঘষতে ঘষতে এবং খোলা মুখের হাসি হেসে আর দুটি ধূর্ত, হলুদ চোখে তাকিয়ে তিনি আমাদের দু’জনকে পর্যবেক্ষণ করলেন।
লোকটি বেঁটে, মোটা, ঈষৎ বিকলাঙ্গ, যদিও সেটা বোঝা শক্ত। তাঁকে বলা যেতে পারে একজন কুঁজো যার কুঁজ নেই। মুখটা চওড়া ও নরম। চোখ দুটো বিড়ালের মতো। খাড়া-খাড়া গোঁফটাও বিড়ালের মতোই। থিয়োডোর নেমোরকে দেখলে যে কেউ ভাবতেই পারে যে তাঁর দেহের নিচের দিকটা একটি অতি হীন, চক্রান্তকারীর এবং উপরের দিকটা পৃথিবীর এক মহান চিন্তানায়ক ও দার্শনিকের।
চোস্ত ইংরেজিতে কোমল কণ্ঠে তিনি বললেন, “আচ্ছা ভদ্রমহোদয়, ‘নেমোর-এর ভেল্কিবাজির কল’ সম্পর্কে কিছু জানতেই আপনারা এসেছেন। তাই তো?”
“ঠিক তাই।”
“আমি কি জিজ্ঞাসা করতে পারি আপনারা ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি কি না?”
“মোটেই না। আমি ‘গেজেট’-এর একজন সংবাদদাতা, আর ইনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।”
“একটি সম্মানিত নাম—একটি ইউরোপীয় নাম।” তাঁর হলদে সূঁচিমুখ দাঁতগুলো খোসামুদে অমায়িকতায় ঝক-ঝক করে উঠল। “আমি প্রায় বলতেই যাচ্ছিলাম যে ব্রিটিশ সরকার তার সুযোগটা হারিয়ে ফেলেছে। তারা আরও কি হারিয়েছে সেটা পরে বুঝতে পারবে। সম্ভবত সাম্রাজ্যটাও। প্রথম যে সরকার এটার সঠিক দামটা দেবে তাকেই এটা বিক্রি করে দেব বলে স্থির করেছিলাম, আর এখন যদি এটা এমন কোনও মানুষর হাতে চলে যায় যেটা আপনাদের মনঃপুত নয়, তাহলে তো সে দোষটা একমাত্র আপনাদের উপরেই বর্তাবে।”
“তাহলে আপনার গুপ্ত বস্তুটা বিক্রি করে ফেলেছেন?”
“আমার দামেই বিক্রি করেছি।”
“আপনি কি মনে করেন যে ক্রেতাটির একচেটিয়া অধিকার থাকবে?” “নিঃসন্দেহে থাকবে।”
“কিন্তু সেই যন্ত্রের গোপন কথাটা আপনি যেমন জানেন তেমনটি তো অন্যরাও জানে।”
“না, মশায়।” লোকটি তার কপালে হাত ছোঁয়াল। “এই সিন্দুকটার মধ্যেই সেই গোপন বস্তুটাকে নিরাপদে তালাবন্দী করে রেখেছি—এই সিন্দুকটা ইস্পাতের সিন্দুকের চাইতেও নিরাপদ এবং ইয়েল চাবির চাইতেও সুরক্ষিত। হয়তো কেউ কেউ ব্যাপারটার একটা দিক জানতে পারে, আর অন্যরা অপর দিকটা। একমাত্র আমি ছাড়া এ জগতের অন্য কেউ গোটা ব্যাপারটা জানে না।”
“আর জানেন সেই ভদ্রমহোদয়রা যাদের কাছে আপনি এটা বিক্রি করেছেন।”
“না মশায়, আমি এত বোকা নই যে দামটা হাতে পাবার আগেই সে-জ্ঞানটা হস্তান্তরিত করব। তারপরেই তারা কিনবে আমাকে, এবং এই সিন্দুকটাকে”— আবার সে তার ভুরুর উপর টোকা দিল—“তার সব মালপত্রসমেত তাদের যেখানে খুশি নিয়ে যাবে—তা হবে না। এই সওদার ব্যাপারে আমার কাজটা একমাত্র তখনই করা হবে—এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে, নির্দয়ভাবেই করা হবে। তারপরেই সৃষ্টি হবে ইতিহাস।” লোকটি তার দুটো হাত ঘষতে লাগল, আর তার মুখের নিথর হাসিটা পাকিয়ে পাকিয়ে একটা গ্রন্থির রূপে নিল।
চ্যালেঞ্জার এতক্ষণ পর্যন্ত চুপচাপ বসে ছিলেন। এবার তিনি গর্জে উঠেেলন, “মাফ করবেন মশায়, এ বিষয়ে কোনওরকম আলোচনা করার আগে আমরা স্পষ্ট করে বুঝতে চাই যে আলোচনা করার মতো কিছু আছে। কি জানেন, সেই সাম্প্রতিক ঘটনাটার কথা আমরা ভুলে যাইনি যখন জনৈক ইতালিবাসী বলেছিল যে সে দূর থেকেই একটা খনিতে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, কিন্তু খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গিয়েছিল যে সে একটি কুখ্যাত প্রতারক। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও তো ঘটতে পারে। আপনি অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে একজন বিজ্ঞানী বলে আমার কিঞ্চিৎ খ্যাতি আছে। সতর্কতা একজন বিজ্ঞানীর অন্যতম গুণ। আপনি যে সব দাবি জানাচ্ছেন তা নিয়ে কোনও গুরুতর আলোচনা করবার আগে আপনাকে সেই সব দাবির প্রমাণ দিতে হবে।”
নেমোর তার দুটি হলুদ চোখের বিষ-দৃষ্টিতে আমার সঙ্গীর দিকে তাকাল, কিন্তু তার মুখে ফুটে উঠল নকল ভদ্রতার হাসি।
“প্রফেসর, অবশ্যই নিজের সুখ্যাতিকে মেনেই আপনি কাজ-কর্ম করেন। আমি তো সর্বদাই শুনে আসছি যে আপনাকে কেউ কখনও ঠকাতে পারে না। আমি আপনাকে এমন একটা বাস্তব খেল দেখাতে পারি যেটা বিশ্বাস করতে আপনি বাধ্য হবেন, কিন্তু সে কাজটা করবার আগে মূল নীতি সম্পর্কে কয়েকটা কথা আপনাকে বলে নিতে চাই।
“আপনি বুঝতেই পারছেন যে আমার গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে যে যন্ত্রটা আমি বানিয়ে রেখেছি সেটা একটা মডেল মাত্র, যদিও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেটা আশ্চর্য রকমের ভাল কাজ করে। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলতে পারি, আপনাকেই বিশ্লিষ্ট করে আবার আপনাকে নতুন করে গড়ে তুলতে বিশেষ কোনও অসুবিধা হবে না; কিন্তু সে রকম একটা কাজের জন্য কোনও বড় মাপের সরকারই তার মূল্য হিসাবে লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে রাজী হবেন না। আমার মডেলটা একটা বৈজ্ঞানিক খেলনা মাত্র। সেই শক্তিটাকে যখন একটা বৃহৎ মাপের কাজে লাগানো হবে একমাত্র তখনই সেই যন্ত্রটার প্রচণ্ড বাস্তব ফলটা পাওয়া যাবে।”
“আমরা কি মডেলটা দেখতে পারি?”
“দেখুন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আপনি যে সেটাকে দেখতে পাবেন শুধু তাই নয়, আপনার উপরেই সেই চূড়ান্ত খেলটা দেখানো হবে, অবশ্য তাতে রাজী হবার মতো সাহস যদি আপনার থাকে।”
“যদি!” সিংহ এবার গর্জে উঠর। “শুনুন মশায়, আপনার ঐ ‘যদি’ কথাটা ভীষণ রকমের আপত্তিকর।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনার সাহসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি শুধু বলতে চাই, খেলটা দেখাবার একটা সুযোগ আমি আপনাকে দেব। কিন্তু প্রথমেই এই ব্যাপারটা অন্তর্নিহিত বিধানগুলি সম্পর্কে কয়েকটা কথা আপনাকে বলে নিতে চাই।
“কতকগুলি বিশেষ স্ফটিক, যেমন লবণ অথবা চিনি, যখন জলের মধ্যে ফেলা হয় তখন সেগুলি গুলে যায় এবং অদৃশ্য হয়ে যায়। স্ফটিকগুলো যে সেখানেই ছিল সেটা আপনি বুঝতেই পারবেন না। তারপর বাষ্পীকরণ অথবা অন্য কোনও উপায়ে জলের পরিমাণটা কমিয়ে ফেলুন, আর তখনই—আরে! সেই স্ফটিকগুলিই ফিরে এসেছে; আবারও দৃশ্যমান হয়েছে, আর ঠিক আগের মতোই দেখাচ্ছে। আপনি কি এমন একটা পদ্ধতির কথা ভাবতে পারেন যেটা আপনার মতো একটা জীব-দেহকেও ঐ একই ভাবে একটা জগতের সঙ্গে গুলিয়ে দিতে পারে, এবং তার পরে একটা অতিসূক্ষ্ম বিপরীত পদ্ধতির দ্বারা আপনাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে পারে?”
চ্যালেঞ্জার চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “উপমাটা তো অসত্য। আর আমি যদি এমন একটা আসুরিক ব্যবস্থাকে মেনেও নিই সেক্ষেত্রেও আমাদের অণু- পরমাণুগুলি কোনও বিঘ্নসৃষ্টিকারী শক্তির দ্বারা বিস্তৃত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেগুলো ঠিক আগের মতোই পুনর্গঠিত হবে কেমন করে?”
“প্রতিবাদটা খুবই স্বাভাবিক, আর আমি কেবল একটা জবাবই দিতে পারি যে একেবারে শেষ পরমাণুটি পর্যন্ত সেগুলি পুনর্গঠিত হতে পারে। এই জগতে একটা অদৃশ্য কাঠামো আছে, আর তার প্রতিটা ইট সঠিক জায়গাতেই বসে যায়। আপনি হাসতে পারেন প্রফেসর, কিন্তু আপনার অবিশ্বাস, আপনার এই হাসি অচিরেই রূপান্তরিত হতে পারে অন্য একটি অনুভূতিতে।”
চ্যালেঞ্জার নিজের কাঁধ দুটি ঈষৎ ঝাঁকালেন। “এই পরীক্ষাটা মেনে নিতে আমি সম্পূর্ণ রাজী আছি।”
আবিষ্কারক বলল, “ঠিক আছে। দয়া করে আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।” আমাদের সঙ্গে নিয়ে সে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পিছনের ছোট বাগানটা পার হয়ে গেল। সেখানে একটা বড়সড় বহির্বাটি ছিল। সে দরজার তালাটা খুলল, আর আমরা সকলেই ঘরে ঢুকে গেলাম।
ভিতরে সাদা চুনকাম-করা বড় ঘরটার সিলিং থেকে অসংখ্য তামার তার মালার মতো ঝুলছিল, আর একটা বেদীর উপর বসানো ছিল একটা প্রকাণ্ড চুম্বক। তার ঠিক সমুখেই ছিল তিন ফুট লম্বা ও প্রায় এক ফুট ব্যাসের ত্রিশির কাঁচের মতো দেখতে একটা বস্তু। তার ডান দিকে ছিল একটা চেয়ার—দস্তার মঞ্চের উপর বসানো—এবং তার উপর একটা বার্নিশ-করা তামার টুপি ঝোলানো ছিল। টুপি এবং চেয়ার দুটোর সঙ্গেই ভারী ভারী সব তার লাগানো ছিল, আর তার পাশেই ছিল এমন একটা খাঁজ-কাটা দণ্ড যার প্রতিটা খাঁজেই একটা করে নম্বর বসানো ছিল, আর ছিল ইন্ডিয়া-রবার দিয়ে জড়ানো একটা হাতল; আপাতত সেই হাতলটা ছিল শূন্যের ঘরে।
যন্ত্রটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে অদ্ভুত লোকটি বলে উঠল, “এই সেই মডেল যেটা একটি জাতিসমূহের শক্তি-সাম্য ভেঙে দিয়ে বিখ্যাত হবেই। এটা যার অধিকারে থাকবে সেই জগৎটাকে শাসন করবে। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, এবার কি আপনি সাহসে ভর করে এই চেয়ারটাতে বসবেন, এবং এই নতুন শক্তির ক্ষমতাটা আপনার দেহের উপর পরীক্ষা করার অনুমতি কি আমাকে দেবেন?”
চ্যালেঞ্জারের সাহস ছিল সিংহের মতো, এবং কেউ তাঁকে তাচ্ছিল্য করলে তিনি মুহূর্তের মধ্যে উন্মাদ হয়ে যান। তিনি যন্ত্রটার দিকে পা বাড়াতেই আমি তাঁর হাতটা চেপে ধরে তাঁকে থামিয়ে দিলাম।
বললাম, “আপনি কিছুতেই যাবেন না। আপনার জীবন বড় মূল্যবান। এটা তো আসুরিক ব্যবস্থা। নিরাপত্তার কী গ্যারান্টি আপনার আছে? এই যন্ত্রটার প্রায় কাছাকাছি যায় এ রকম আর মাত্র একটা যন্ত্র আমি দেখেছি—সেটা সিং সিং-এর মৃত্যুঘাতী বৈদ্যুতিক চেয়ার।”
চ্যালেঞ্জার বললেন, “তুমি এখানে সাক্ষী আছ এটাই আমার নিরাপত্তার গ্যারান্টি। আমার যদি কোনও বিপদ ঘটে তাহলে অন্ততপক্ষে নরহত্যার দায়ে এই লোকটাকে অবশ্যই দায়ী করা হবে।”
“বিজ্ঞানসংক্রান্ত যে কাজ আপনি ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না সেই কাজ যদি অসমাপ্ত থেকে যায় তাহলে বিজ্ঞানের জগতের কাছে সেটা যে কোনও সান্ত্বনাই হতে পারে না। তাই বলছি, অন্তত প্ৰথমে আমাকে যেতে দিন, তারপর যদি প্রমাণিত হয় যে এই যন্ত্রটা ক্ষতিকারক নয়, তখন যাবেন আপনি স্বয়ং।”
ব্যক্তিগত বিপদ কখনও চ্যালেঞ্জারকে বিচলিত করতে পারত না, কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড অসমাপ্ত থেকে যাবে এই চিন্তাটা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করল। তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন, আর তিনি মনস্থির করবার আগেই আমি ছুটে গিয়ে একলাফে সেই চেয়ারটাতে বসে পড়লাম। চোখের সামনে দেখলাম, আবিষ্কারক লোকটি হাতলের উপর হাতটা রাখল। ক্লিক্ করে একটা শব্দও কানে এল। তারপর মুহূর্তকালের জন্য সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল; আমার দুই চোখের সামনে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ল। কুয়াশা যখন কেটে গেল তখন দেখলাম আবিষ্কারকটি বাঁকা হাসি মুখে নিয়ে আমার সমুখে দাঁড়িয়ে আছে, আর চ্যালেঞ্জার তার কাঁধের উপর দিয়ে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন—তাঁর আপেল-রাঙা কপাল দুটি তখন রক্তশূন্য, বিবর্ণ।
“ঠিক আছে, এবার আপনি উঠে পড়ুন!” আমি বললাম।
উত্তরটা দিল নেমোর। “কাজ শেষ হয়ে গেছে। আপনার প্রতিক্রিয়া বিস্ময়কর। নেমে আসুন। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এবার নিঃসন্দেহে তৈরি হতে পারেন।”
আগে কখনও আমার বৃদ্ধ বন্ধুটিকে এতটা বিপর্যস্ত হতে দেখিনি। তাঁর লৌহ- দৃঢ় স্নায়ু বুঝি সেই মুহূর্তে একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। কম্পিত হাতে তিনি আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলেন।
ঈশ্বরকে স্মরণ করে বলে উঠলেন, “সত্যি ম্যালোন, তুমি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মুহূর্তের জন্য একটা কুয়াশা দেখা দিল, আর তারপরেই সব ফাঁকা।
“আমি কতক্ষণ অদৃশ্য ছিলাম?”
“দুই বা তিন মিনিট। আমি স্বীকার করছি, সত্যি আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভাবতেই পারিনি যে তুমি ফিরে আসবে। অথচ লোকটি টঙ করে দণ্ডটাকে একটা নতুন স্লটের দিকে ঠেলে দিল, আর তুমি চেয়ারটার উপর উদয় হলে। তখন তোমাকে কিছুটা বিমূঢ় দেখাচ্ছিল। কিন্তু অন্য সব দিক থেকে একেবারে আগেকার মতো। তোমাকে দেখামাত্রই আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম!” বড় লাল রুমালটা দিয়ে তিনি তাঁর ভেজা ভুরুটা মুছে নিলেন।
আবিষ্কারক বলল, “এবার স্যার! না কি, আপনার স্নায়ু অপারগ হয়ে পড়েছে?”
স্পষ্টতই চ্যালেঞ্জার নিজেকে সামলে নিলেন। আমার প্রতিবাদী হাতটাকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। হাতলটা টঙ করে তিন নম্বরে চলে গেল। তাঁকে আর দেখা গেল না।
‘লোকটিকে সম্পূর্ণ শান্ত না দেখলে আমিও হয়তো ভয় পেতাম। পদ্ধতিটা খুবই আকর্ষণীয়, নয় কি?” সে মন্তব্য করল। “অবশ্য প্রফেসর এখন সম্পূর্ণভাবে আমার করুণার উপর নির্ভর করছেন। আমি যদি তাঁকে ঝুলিয়ে রাখতে চাই তাহলে পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে আমাকে বাধা দিতে পারে।”
“আপনাকে বাধা দেবার ব্যবস্থাটা আমি অচিরেই করব।”
এবার তার হাসিটা আবারও বড় কর্কশ মনে হলো। “এ রকম একটা ভাবনা যে কখনও আমার মনে আসতে পারে এটা আপনি কল্পনায়ও আনতে পারেননি। ঈশ্বর জানেন! একবার ভাবুন তো মহান প্রফেসর চ্যালেঞ্জার পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন—অদৃশ্য হয়ে গেছেন জগতের এক সীমাহীন প্রান্তে, আর তাঁর কোনও চিহ্ন পর্যন্ত রেখে যাননি! ভয়ংকর! ভয়াবহ! একই সঙ্গে তিনি যতটা শিষ্টাচারী হতে পারতেন তা কিন্তু হননি। আপনি কি মনে করেন না যে একটা ছোটখাট শিক্ষা—?”
“না, আমি মনে করি না।”
“দেখুন, এটাকে আমরা বলব একটা কৌতূহলী প্রদর্শনী। এমন কিছু যা আপনার পত্রিকার একটা আকর্ষণীয় অনুচ্ছেদ হতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমি আবিষ্কার করেছি যে একটা দেহের লোমগুলিকে ইচ্ছামতো রাখাও যেতে পারে, আবার বাদ দেওয়াও যেতে পারে। একটা ভালুককে লোমবিহীন অবস্থায় দেখতে আমার খুব ভাল লাগবে। তাকিয়ে দেখুন!
দণ্ডটা আবার টঙ করে একটা শব্দ করল। মুহূর্তকাল পড়েই চ্যালেঞ্জার আরও একবার তাঁর চেয়ারে আসীন হলেন। কিন্তু এ কোন্ চ্যালেঞ্জার! একটা লোম-ছাঁটা সিংহ! লোকটার ভেল্কি দেখে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলেও আমি অট্টহাসি না হেসে পারলাম না।
তাঁর মস্ত বড় মাথাটা হয়েছে একটা শিশুর মতো নেড়া, আর থুতনিটা হয়েছে একটি মেয়ের মতো মসৃণ। তাঁর মহান শ্মশ্রুবিহীন মুখের নিম্নাংশটা বড় বেশি ঝোলানো এবং শূকর-জংঘার মতো দেখাচ্ছিল, অথচ তাঁর গোটা চেহারাটা ছিল একজন বৃদ্ধ মল্লযোদ্ধার মতো, আহত ও স্ফীতদেহ; ভারী চিবুকের উপর বসানো ডালকুত্তার মতো দুটো চোয়াল।
আমাদের চোখ-মুখের ভাব-ভঙ্গি দেখেই হয়তো চ্যালেঞ্জারের একটা হাত তাঁর মাথার উপর চলে গেল, আর তাতেই তিনি নিজের অবস্থাটা সম্পর্কে সচেতন হলেন। পরমুহূর্তেই তিনি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে আবিষ্কারকের গলাটা চেপে ধরে তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। চ্যালেঞ্জারের প্রচণ্ড শক্তির কথাটা আমি জানতাম, তাই বুঝতে পারলাম যে তিনি লোকটাকে খুন করেই ফেলবেন।
চিৎকার করে বলে উঠলাম, “ঈশ্বরের দোহাই, আপনি সাবধান হোন। আপনি যদি লোকটাকে মেরে ফেলেন তাহলে কোনওদিনই আমরা সব কিছু আগের মতো করে নিতে পারব না!”
কথাগুলো কাজে লাগল। যতই মাথা খারাপ হোক, চ্যালেঞ্জার সব সময় যুক্তি মেনে চলেন। মেঝে থেকে লাফিয়ে উঠে কম্পিত দেহ আবিষ্কারককে টানতে টানতে ক্রোধ-কম্পিত স্বরে বললেন, “তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। যদি এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি যেমনটি ছিলাম তেমনটি না হই, তাহলে তোমার এই ক্ষুদে দেহের দফা আমি রফা করে দেব।”
রেগে গেলে চ্যালেঞ্জার যুক্তি-তর্কের ধার ধারেন না। তখন তাঁকে দেখে অত্যন্ত সাহসী মানুষও ভয়ে কুঁকড়ে যায়। মি. নেমোরকে দেখে তো খুবই সাহসী মানুষ বলে মনে হয়। চেপে-ধরা গলায় সে কোনও রকমে বলল, “সত্যি বলছি প্রফেসর, এই হাঙ্গামার কোনও দরকারই ছিল না। বন্ধু-বাবন্ধবদের মধ্যে নিরীহ ঠাট্টা-তামাশা হতেই পারে। আমি চেয়েছিলাম এই যন্ত্রটার কতটা ক্ষমতা সেটা আপনাকে দেখাব। ধরেই নিয়েছিলাম যে আপনি পুরো ব্যাপারটাই জানতে চাইবেন। আমি আপনাকে নিশ্চিত করেই বলছি প্রফেসর, আপনার তিলমাত্র ক্ষতিও আমি করতে চাইনি!”
কোনও কথা না বলে চ্যালেঞ্জার চেয়ারটাতে গিয়ে বসলেন। বললেন, “লোকটার উপর নজর রাখো ম্যালোন। কোনও রকম ট্যাঁ-ফোঁ করতে দিও না।”
“সে দিকে আমি নজর রাখছি স্যার।”
“এবার তাহলে সব আগেকার মতো করে দাও, নইলে মজাটা টের পাবে।” সন্ত্রস্ত আবিষ্কারক যন্ত্রটার দিকে এগিয়ে গেল। পুনর্গঠনের কাজটা সম্পূর্ণ হলো। মুহূর্তের মধ্যে কেশরধারী বৃদ্ধ সিংহ ফিরে এলেন। লম্বা দাড়িতে সস্নেহে হাত বুলিয়ে এবং দুই হাত তুলে মাথার খুলিটা চেপে ধরে দেখে নিলেন সব কিছু ঠিকমতো করা হয়েছে কি না। তারপরে তিনি দাঁড় থেকে নেমে এলেন।
“দেখুন স্যার, আপনি খুশিমতো এমন সব কাজ করে ফেলেছিলেন যার পরিণাম আপনার পক্ষে খুব খারাপ হতে পারত। যাই হোক, আপনার কৈফিয়ৎটাই আমি মেনে নিচ্ছি যে সমস্ত ব্যাপারটা আমাদের দেখাবার জন্যই আপনি এতদূর এগিয়েছিলেন। এবার আপনার এই উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আপনাকে করতে পারি কি?”
“এই ক্ষমতার উৎস ছাড়া অন্য যে কোনও প্রশ্নের জবাব দিতে আমি প্রস্তুত। ওটা আমার মন্ত্রগুপ্তি।”
“আপনি কি ভাল করে ভেবেচিন্তেই আমাদের জানিয়েছেন যে একমাত্র আপনি ছাড়া জগতে অন্য কেউ এটা জানে না?”
“এর লেশমাত্রও কেউ জানে না।”
“কোনও সহকর্মীও নয়?”
“না স্যার। আমি একাই কাজটা করি।”
“খুব ভাল! অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আপনার ক্ষমতার পরীক্ষা আপনি দিয়েছেন, কিন্তু এটার বাস্তব প্রতিক্রিয়াগুলি আমি এখনও অনুধাবন করতে পারছি না। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝান না। ‘
“আমরা ধরে নিচ্ছি যে একটা দণ্ড আছে একটা ছোট জাহাজে এবং আর একটা দণ্ড আছে অন্য একটা ছোট জাহাজে; একটা যুদ্ধ-জাহাজ তাদের মাঝখানে এসে গেলেই সেটা নিছক অণুতে পরিণত হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। তাতে একটা সেনাবাহিনী থাকলে তারও ঐ একই পরিণতি হবে!”
“আর এই মন্ত্রগুপ্তিটা আপনি একচেটিয়া স্বত্ত্বে বিক্রি করেছেন একটি ইউরোপীয় শক্তিকে?”
“হ্যাঁ স্যার, তাই করেছি। টাকাটা দিয়ে দিলেই তারা এমন শক্তির অধিকারী হবে যা আজ পর্যন্ত কোনও দেশেরই ছিল না। এমন কি এখন পর্যন্ত আপনি নিজেও দেখতে পাচ্ছেন না যে, কোন সক্ষম হাতে পড়লে এটা আরও কত কি করতে পারে। সে সম্ভাবনা তো অপরিমেয়।”
লোকটির শয়তানী মুখে একটা কলুষিত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। “কল্পনা করুন, লন্ডনের কোনও একটা অঞ্চলে এ রকম একটা যন্ত্র বসানো হয়েছে। ভাবুন তো সেখানে এ রকম একটা বিদ্যুৎ-প্রবাহের ফলটা কি দাঁড়াতে পারে।” হো-হো করে হেসে উঠে লোকটি বলতে লাগল। “সে কি? আমি তো কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি যে গোটা টেম্স্ উপত্যকাটা বেমালুম ধুয়ে-মুছে গেছে; লক্ষ লক্ষ অধিবাসীর একটি পুরুষ, নারী, অথবা শিশুও অবশিষ্ট নেই।”
কথাগুলি শুনে আমি আতংকে শিউরে উঠলাম। আমার সঙ্গীটির উপর কিন্তু তাঁর প্রভাবটা পড়ল অন্য রকম। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি একটা খুশির হাসি হাসতে হাসতে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন আবিষ্কারকের দিকে।
বললেন, “মি. নেমোর, আপনাকে অভিনন্দন জানাতেই হবে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে আপনি প্রকৃতির একটা উল্লেখযোগ্য শক্তিকে করায়ত্ত করেছেন এবং সেটাকে মানুষের ব্যবহারযোগ্যও করতে পেরেছেন। সেই ব্যবহারটা যে ধ্বংসমূলকই হবে সেটা নিঃসন্দেহে নিন্দার্হ, কিন্তু বিজ্ঞান সে রকম কোনও পার্থক্য করে না; ফলাফল যাই হোক বিজ্ঞান সর্বদাই জ্ঞানের অনুসারী। আশা করি আমি যদি এই যন্ত্রটির গঠন-কর্মটা পরীক্ষা করে দেখতে চাই তাতে আপনার কোনও আপত্তি নেই?”
“একটুও না। যন্ত্রটা তো একটা কাঠামো মাত্র। কিন্তু তার যেটা আত্মা, জীবনদায়ী মন্ত্র, সেটাকে আয়ত্ত করার কোনও আশা আপনি করতে পারেন না।”
“ঠিক তাই। কিন্তু এর গঠন-শৈলীটাই তো প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে।” তিনি বারকয়েক যন্ত্রটার চারদিকে ঘুরলেন, কয়েকটি যন্ত্রাংশকে আঙুল দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। তারপর নিজের ভারী দেহটাকে তুলে দিলেন বিদ্যুৎ-নিরোধক চেয়ারটার ভিতরে।
“আপনি কি আরও একটা বিশ্ব-ভ্রমণে যেতে চান?” আবিষ্কারক জানতে চাইল।
“পরে, হয়তো—পরে কখনও! কিন্তু এদিকে—অবশ্য সেটা আপনি জানেন—বিদ্যুৎ-প্রবাহে কিছু ছিদ্র-পথ দেখা দিয়েছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি একটা ক্ষীণ প্রবাহ আমার ভিতর দিয়েও বয়ে চলেছে।
“অসম্ভব। এটা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ-নিরোধক।”
“কিন্তু আমি নিশ্চিত করেই বলছি যে আমি এটা অনুভব করছি।” বলেই তিনি দাঁড় থেকে নেমে এলেন।
আবিষ্কারক দ্রুত তার নিজের জায়গায় গিয়ে বসল।
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“আপনার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শিরশিরে ভাব নেমে আসছে না?”
“না স্যার, আমি সে রকম কিছু দেখছি না।”
হঠাৎ টঙ করে একটা শব্দ হলো, আর লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল। অবাক- বিস্ময়ে আমি চ্যালেঞ্জারের দিকে তাকালাম। “হা ঈশ্বর! আপনি কি যন্ত্রটাকে স্পর্শ করেছিলেন প্রফেসার?”
ঈষৎ বিস্মিত ভঙ্গিতে তিনি একটু হাসলেন। বললেন, “কি জান, আমি হয় তো অসাবধানে হাতলটাকে ছুঁয়েছিলাম। এ রকম একটা বাজে মডেল নাড়াচাড়া করতে গেলে এ ধরনের আনাড়ি ঘটনা তো ঘটতেই পারে। দণ্ডযন্ত্রটাকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখা উচিত।”
“ওটা তিন নম্বরে আছে। ঐ স্লটটাই ভেল্কিটা ঘটায়।”
“তোমাকে নিয়ে যখন পরীক্ষাটা করা হয়েছিল তখন আমিও সেই রকমই দেখেছি।”
“কিন্তু লোকটি যখন আপনাকে ফিরিয়ে আনল তখন আমি এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম যে ফিরিয়ে আনার জন্য কোন স্লটটা ব্যবহার করা হলো সেটা আমি দেখতেই পাইনি। আপনি সেটা লক্ষ্য করেছিলেন কি?”
“কি জানি, হয়তো লক্ষ্য করেছিলাম, কিন্তু ঐ সব ছোটখাট ব্যাপার দিয়ে আমি মনটাকে বোঝাই করতে চাই না। স্লট তো অনেকগুলো আছে; তাদের উদ্দেশ্য তো আমরা জানি না। অজানাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলে ব্যাপারটা হয়তো আরও গুলিয়ে যেতে পারে। হয়তো ওটা যেমন আছে তেমনটি রাখাই ভাল।”
“আপনি তাহলে—”
“ঠিক ধরেছ। সেটাই ভাল হবে। মি. থিয়োডোর নেমোরের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বটি সারা জগত্ময় ছড়িয়ে গেছে, তার যন্ত্রটাও অকেজো হয়ে গেছে, আর একটি বিদেশী সরকার এমন সব জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হলো যার সাহায্যে মানুষের অনেক ক্ষতি সাধিত হতে পারতো। সকালবেলার কাজটা খারাপ হলো না, কি বল হে যুবক ম্যালোন? কোনও সন্দেহ নেই যে তোমার পাঠকবৃন্দ লাটভিয়ার এক আবিষ্কর্তার এই রহস্যময় অন্তর্ধানের বিষয় নিয়ে লেখা সংবাদদাতার কলামটি ভালই উপভোগ করবে। এই অভিজ্ঞতাটি আমি নিজেও উপভোগ করেছি। এই সব হাল্কা মুহূর্তগুলি জীবনের রুটিন-বাঁধা কাজের উপর কিছুটা উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দেয়।”
পিছনে তাকিয়ে আমার মনে হলো যেন একটা ঈষৎ তৈলাক্ত কুয়াশা তখনও চেয়ারটাকে ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। “কিন্তু এটা তো ঠিক—” আমি কিছু বলতে গেলাম। কিন্তু প্রফেসার চ্যালেঞ্জার তার আগেই বলে উঠলেন, “দেখ, একজন আইন মেনে-চলা নাগরিকের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে হত্যাকে প্রতিরোধ করা। আমি সেটাই করেছি। যথেষ্ট হয়েছে ম্যালোন, যথেষ্ট! এ নিয়ে আর কোনও আলোচনা নয়। এই ঘটনাটা ইতিমধ্যেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে আমার চিন্তাধারাকে অনেকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে।”
অনুবাদ : মণীন্দ্র দত্ত
